Home Blog Page 52

ভক্তের ভগবান – শ্রী রাম এবং শবরী

ভক্তের ভগবান – শ্রী রাম এবং শবরী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের পর্বে শ্রী রামের এক এমন ভক্তের কথা আপনাদের বলবো যিনি অতি সাধারণ হয়েও অসাধারণ এবং স্বয়ং শ্রী রাম বন বাসের সময়ে তাকে দেখা দিয়ে তার উদ্ধার করে ছিলেন।

এই মহান ভক্ত হলেন শবরী।আজকের পর্বে শবরীর কথা।

 

শবরী ছিলেন ব্যাধ-কন্যা ৷ তিনি ছিলেন ভগবান রামচন্দ্রের অনুগত এক শিষ্যা ৷মতঙ্গ মুনির আশ্রমে থাকতেন তিনি ৷মতঙ্গ মুনি দেহ রাখার আগে শিষ্যা শবরীকে বলেছিলেন, একদিন এই আশ্রমে রাম আসবেন ৷ আশ্রম পবিত্র হয়ে উঠবে। শ্রী রামের দর্শন লাভই ছিলো শবরীর একমাত্র ইচ্ছা।

 

বৃদ্ধা শবরী রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবতেন আজই বোধহয় সেই দিন ৷ আজই হয়তো শ্রী রাম আসবেন।তাই রোজই ফুল, মালা, চন্দনে সাজিয়ে রাখতেন মতঙ্গ মুনির আশ্রম ৷নিজে হাতে বন থেকে নানা সুমিষ্ট ফল-মূল সংগ্রহ করে রাখতেন ৷ আর আশ্রমের দরজায় বসে বসে ভগবানের অপেক্ষা করতেন ৷ দিন শেষ হয়ে যেত ৷ রামচন্দ্র দেখা দিতেন না। পরদিন সকালে উঠে ফের নতুন উদ্যমে প্রভুর জন্য শুরু করতেন তাঁর অপেক্ষা ৷

 

অবশেষে একদিন বৃদ্ধা শবরীর তপস্যা পূর্ণতা পেল। রাবন যখন সীতা মাতাকে হরণ করে নিয়ে যায় তখন সীতাকে খুঁজতে খুঁজতে রাম-লক্ষ্ণ সেই মতঙ্গ মুনির আশ্রমে এসে উপস্থিত হলেন ৷ আনন্দে, প্রেম, ভক্তি, শ্রদ্ধায়, সমর্পনে শবরী অনবরত কাঁদতে লাগলেন ৷ তা দেখে রামচন্দ্রের চোখ দিয়েও অশ্রুজল নির্গত হতে লাগল।

ভক্ত এবং ভগবানের মিলনের সাক্ষী হয়ে থাকলো মাতঙ্গ ঋষির আশ্রম।

 

প্রথমে ভগবানের ধুয়ে দিলেন শবরী ৷ এরপর বন থেকে সংগ্রহ করে আনা ফলমূল সাজিয়ে খেতে দিলেন প্রভুকে ৷ ওই ফলের মধ্যে ছিল জামও ৷ ভাবে বিভোর শবরী ভাবলেন প্রভুকে কীভাবে এই জাম নিবেদন করবেন ? যদি জামগুলি টক হয় ৷ এই ভেবে শবরী নিজেই জামগুলি চেখে দেখতে লাগলেন ৷ টক জামগুলি ফেলে নিয়ে মিষ্টি জামগুলি দিলেন রামের হাতে ৷ ভক্তের এই ভক্তি দেখে প্রভুও শিষ্যার উচ্ছিষ্ট অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করে খেতে লাগলেন। এখানে উল্লেখ

করতে হয় শবরী ছিলেন তথাকথিত নিচু জাতের স্ত্রী কিন্তু ভগবান রাম সেই জাত পাতের ভেদাভেদ অগ্রাহ্য করলেন এবং ভক্তের ভক্তিকেই প্রাধান্য দিলেন।

 

এই ভাবেই নিজেকে ধন্য করলেন শবরী ৷ শেষে আরাধ্য দেবতার সামনেই দেহত্যাগ করে বৈকুন্ঠে গমন করলেন শবরী ৷এতো দিন রামের অপেক্ষাতেই তিনি দেহ ধারণ করে ছিলেন। ভগবানের সাক্ষাৎ পাওয়ার পর আর তার এই ধরাধামে থাকার প্রয়োজন ছিলোনা।

 

আবার পরের পর্বে এমন এক ভক্ত এবং তার

অসীম ভক্তির বৃত্তান্ত নিয়ে ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – শিব এবং নন্দী ভৃঙ্গী

ভক্তের ভগবান – শিব এবং নন্দী ভৃঙ্গী

 

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রী জাতক

 

দেবাদিদেব মহাদেবের অনেক বিখ্যাত এবং কুখ্যাত ভক্ত আছে তবে তার দুই ছায়া সঙ্গী

নন্দী ও ভৃঙ্গী তার মহানতম ভক্তদের অন্যতম

শিবের পাশে সর্বদা থাকেন এই দুজন প্রায় সব শিবমন্দিরের সামনে নন্দীর মূর্তিও থাকে। আজ শিবের এই দুই মহান ভক্ত সম্পর্কে লিখবো।

 

নন্দী ও ভৃঙ্গী কে নিয়ে পুরানে অনেক কথাই বলা আছে কূর্মপুরাণে নন্দী প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, মহাদেবের এই প্রধান অনুচরটি করালদর্শন, বামন, বিকটাকার, মুণ্ডিতমস্তক, ক্ষুদ্রবাহু ও মহাবল।পূর্বে নন্দী মহারাজ পৃথক দেবতা হিসেবেও পূজিত হতেন পরবর্তীতে তিনি শিবের বাহন হিসেবে স্থান পান। নন্দীর পিঠেই দেবাদিদেব বিরাজ করেন।

 

শিব মহাপুরাণ মতে, নন্দী শিলাদ মুনির পুত্র। শিলাদ ছিলেন ভগবান শিবের পরম ভক্ত এবং শিবের আশীর্বাদেই নন্দীর জন্ম হয়েছিলো এবং শিব স্বয়ং তাকে চিরঞ্জীবী হওয়ার বর দেন ও নিজের বাহন হিসেবে স্থান দেন|রামায়ণেও নন্দীর উল্লেখ পাওয়া যায় যেখানে অহংকারী রাবন কৈলাশ এসে নন্দীকে তার চেহারার জন্যে অপমান করেন ও বানর বলেন, নন্দী তাকে অভিশাপ দিয়েছিলো যে এক বানর তার পতন ডেকে আনবেন, পরে তাই হয়েছিলো। শিবের রূদ্র অবতার বজরংবলীর হাতেই রাবনের পতন হয়ে ছিলো।

 

নন্দীর ন্যায় ভৃঙ্গীও শিবের অনুচর। নন্দী যেমন হৃষ্টপুষ্ট, ভৃঙ্গী তেমনই রুগ্ন , কঙ্কালসার। ভৃঙ্গী আগে ছিলেন এক মুনি, শিবের উপাসক। তিনি শিবের সাথে পার্বতীর পুজোয় কিছুতেই রাজি নন। ক্রুদ্ধ পার্বতী অভিশাপ ভৃঙ্গী কে অভিশাপ দিলেন। সেই অভিশাপে ভৃঙ্গী কঙ্কালে পরিণত হলেন। দু’পায়ে আর দাঁড়াতে পারেন না তিনি, তখন শিবের আশীর্বাদে তাঁর তৃতীয় চরণের সৃষ্টি হল। কিন্তু তবু ভৃঙ্গী পার্বতীর পুজো করবেন না। তখন শিব তাঁকে নিজের অর্ধনারীশ্বর রূপ দেখালেন, যাতে তিনি বুঝতে পারেন যে পার্বতী শিবেরই অংশ। পরবর্তীতে তিনিও হয়ে উঠলেন শিবের অনুচর, একত্রে উচ্চারি হতে শুরু হয় নন্দী ও ভৃঙ্গীর নাম।

 

নন্দী এবং ভৃঙ্গীর নাম একত্রে উচ্চারিত হয় এবং শিবের সাথে তার এই দুই ভক্তও একত্রে পূজিত হন সর্বত্র। ভক্ত এবং ভগবান এক্ষেত্রে এক এবং অভিন্ন।

 

আবার পরের পর্বে ভক্ত এবং ভগবানের এমনই এক মেল বন্ধন এবং সেই সংক্রান্ত পৌরাণিক ঘটনা নিয়ে ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন।

ভক্তের ভগবান – মা তারা এবং শ্রী শ্রী বামা ক্ষ্যাপা

ভক্তের ভগবান

 

মা তারা এবং শ্রী শ্রী বামা ক্ষ্যাপা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ আপনাদের তারা মায়ের সর্বশ্রেষ্ঠ ভক্ত বামা

ক্ষ্যাপার কথা বলবো যিনি তারা মাকে বলতেন বড়মা।তারা পীঠ ছিলো বামা ক্ষ্যাপার কাছে মায়ের কোলের মতো। বামা তারা মাকে বলতেন বড়মার এবং মা মৌলাক্ষীকে বলতেন ছোটমা।

 

বামা ক্ষ্যাপার পুজোর নিদ্দিষ্ট নিয়ম ছিলোনা।কখনো কখনো সারাদিন পূজা করতেন।আবার কখনও কখনও তিনি দু তিন দিন পূজা করতেন

না। কখনো দেবীকে মালা পরাতেন আবার কখনো নিজে পরতেন।কখনো নিজে খেয়ে ভোগ দিতে যাচ্ছেন আবার কখনো ভোগ তুলে নিজে খেয়ে নিচ্ছেন। সাধনার এই পর্যায়কে শাস্ত্রীয় পূজা পদ্ধতির সাথে বাকি পান্ডারা মেলাতে পারতেন না। তারা ভাবতেন বামা উন্মাদ। অশাস্ত্রীয় আচরণ করছেন।যদিও পরে তাদের ভুল ভাঙে।তারা বুঝতে পারেন বামা সাধারণ ভক্ত নয় তিনি মাতারার স্নেহ ধন্য এবং তারই সন্তান সম।

 

একদিন খবর রটে যায় বামা ভোগ নিবেদন করার আগেই দেবীর প্রসাদ খেয়েছেন এবং এতে ঘোর পাপ হয়েছে।দেবী রাগান্বিত হবেন, সারা গ্রামকে তার ক্রোধ বহন করতে হবে তাই গ্রামবাসীরা বামাচরণকে কঠোরভাবে মারধর করে। তাকে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। তার মন্দিরে প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়।

 

প্রহারের চোটে বেশ কিছুক্ষন অজ্ঞান থাকার পর যখন জ্ঞান ফিরল তখন বামাক্ষ্যাপা মায়ের উপর রেগে গেল।মনে মনে তারা মাকে বললো ওরা অকারণে আমাকে মারধর করেছ তাই আমি এখন আর তোমার কাছে আসব না।ঠিক অবোধ সন্তান যেমন মায়ের উপর রাগ করে তেমনই বামা মা তারার উপর রেগে গেছিলেন।

 

তারা মা তার সন্তানের যন্ত্রণা সইতে পারেননি।

সেই রাতেই মন্দিরের দায়িত্বে থাকা জমিদার বংশের রানীর স্বপ্নে দেখা দিল মা তারা

রাগান্বিত মা রাণীকে ভর্ৎসনা করলো-তোমার পুরোহিতরা আমার ছেলেকে আঘাত করেছে। আমি তোমার মন্দির ছেড়ে চলে যাচ্ছি। এখন তোমাকে ও তোমার রাজ্যকে আমার ক্রোধ সইতে হবে, তুমি যদি তা এড়াতে চাও, কাল আমার ছেলেকে ফিরিয়ে এনে মন্দিরে পূজার দায়িত্ব দাও, নইলে পরিণতি ভোগ করতে প্রস্তুত থাকো।

 

পরদিন তারাপীঠে গিয়ে রানীমা আদেশ দিলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বামাখেপাকে নিয়ে আসতে। বামাকে অনুরোধ করে মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হলো।সেই দিন রানীমা আদেশ জারি করেন এই মন্দিরের পুরোহিত বামাক্ষ্যাপা। সে স্বাধীন। তার পথে কেউ আসলে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।শুধু তাই না তারাপীঠে আগে বামা ক্ষ্যাপাকে ভোগ নিবেদন হবে তারপর তারা মাকে ভোগ দেয়া হবে।অর্থাৎ সন্তানকে খাইয়ে তারপর মা খাবেন। এই রীতি আজও একই ভাবে চলছে।

 

এমনই হয় পরম ভক্ত এবং তার ভগবানের সম্পর্ক। সেখানে আচার উপাচার। রীতি নীতি গৌণ হয়ে যায়। প্রধান বিষয় হল অন্তরের ভক্তি এবং ভাব।

 

আবার এক মহান ভক্ত ও তার জীবনী নিয়ে যথা সময়ে ফিরে আসবো এই ধারাবাহিক আলোচনায়।

থাকবে আরো এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – শ্রী রামকৃষ্ণ এবং মা কালী

ভক্তের ভগবান – শ্রী রামকৃষ্ণ এবং মা কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ এমন এক কালী সাধক ছিলেন যার কাছে তার আরাধ্যা মা কালী ছিলেন পরম ব্রহ্মস্বরূপ এবং তাকে সাক্ষাৎ কালী রূপে তিনি দেখা দিয়েছিলেন মৃন্ময়ী মা কালী তার কাছে হয়ে চিন্ময়ী রূপে ধরা দিয়ে ছিলেন। ভক্ত এবং ভগবানের মধ্যে মুছে গিয়ে ছিলো সব ব্যাবধান। শুধু তাই নয় শ্রী কৃষ্ণ তার ভক্তদের সাথে মা কালীর সাক্ষাৎ ও করিয়ে দিতে পারতেন। যেমন স্বামী বিবেকানন্দর সৌভাগ্য হয়েছিলো সেই অদ্ভুত অনুভূতির।

 

রানী রাসমণি দক্ষিনেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠা করার পর দাদা রামকুমারের হাত ধরে গদাধর দক্ষিনেশ্বরে এসে ছিলেন পুরোহিত হিসেবে পুজোর কাজে সাহায্য করতে। প্রথম যেদিন মন্দির বিগ্রহের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন, সেদিন কিন্তু তিনি সাধক ছিলেন না। শুরুর দিকে তিনি নির্জনে ধ্যান জপ করতেন, তন্ময় হয়ে গান গাইতেন, শিবপূজা করতেন এবং মাঝেমধ্যে ভাবসমাধিতেও ডুবে যেতেন। ধীরে ধীরে মা ভবতারিণীর সান্নিধ্যে এসে তার মধ্যে মা কালীর প্রতি অমোঘ টান জন্মায় এবং বহু অভিজ্ঞতা এবং সাধনার মধ্যে দিয়ে গিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন মাতৃ সাধক রামকৃষ্ণ। ভবতারিণীর মধ্যে খুঁজে পেলেন সাক্ষাৎ জগৎ জননীকে।

 

একেকজন ভক্ত ভক্তি মার্গে একেকরকম পন্থা অবলম্বন করেন।কেউ শাস্ত্রকে প্রাধান্য দেন কারুর সাধনা আবার ভাব সর্বস্ব।শ্রী রামকৃষ্ণর পুজো পক্রিয়া ছিলো ব্যতিক্রমী।পুজোর জন্য সকালে ফুল তুলে মালা গেঁথে দেবীকে সাজাতেই অনেকটা সময় চলে যেত। পূজায় বসে যথাবিধি নিজের মাথায় একটা ফুল দিয়েই ধ্যানস্থ হয়ে মাঝে মাঝে বসে থাকতেন আবার অন্ননিবেদন করে মা গ্রহণ করছেন ভেবে অনেকক্ষণ কাটিয়ে দিতেন । দেবীকে প্রসন্না করতে কখনও পূজার মাঝখানে গান ও গেয়ে উঠতেন।কাঁদতে কাঁদতে চোখের জলে বুক ভেসে যেত মাঝে মাঝে।তার এই মতী গতি দেখে অনেকেই তাকে পাগল ভাবতেন। অনেকে সমালোচনা করতেন আবার বিজ্ঞ জনেরা বুঝতেন এ মহান সাধকের লক্ষণ।সাধনার চরম পর্যায় পৌঁছে গেছেন শ্রী রামকৃষ্ণ।

 

একাধিক বার তিনি মা কালীকে আকুল ভাবে বলতেন ‘মা তুই রামপ্রসাদকে দেখা দিয়েছিস, আমায় কেন তবে দেখা দিবি না? আমি ধন, জন, সুখভোগ কিছুই চাই না, আমায় দেখা দে’অর্থাৎ মা কালী কে সাক্ষাৎ দর্শন করার এক ব্যাকুলতা তার মধ্যে সৃষ্টি হয়ে ছিলো।ভক্তের ডাকে সাড়াও দিয়েছিলেন মা। দেখা দিয়ে তার জীবন ধন্য করেছিলেন।

 

মা ভবতারিণী ছিলেন শ্রী রামকৃষ্ণর ভক্তির শেষ কথা। মায়ের পুজো করতেন নিজের মতো করে। কারুর কথা শুনতেন না।কখনো পূজাসন ছেড়ে মা-র কাছে গিয়ে তাঁর চিবুক ধরে আদর করছেন। নানা রকম পরিহাস করছেন। হাত ধরে নাচছেন।পূজা না করে ভোগ নিবেদন করে দিচ্ছেন কিংবা নিবেদিত ভোগ নিজহাতে দেবীকে খাওয়াতে যাচ্ছেন আবার কখনো নৈবেদ্যর খানিকটা নিজেই খেয়ে দেবীকে খাওয়াতে চেষ্টা করছেন। বৈষ্ণব দর্শনে এই অবস্থা কে বলে সখা ভাব। অর্থাৎ ভক্ত এবং ভগবানের মধ্যে তৈরী হয় এক প্রকার বন্ধুত্ব মুছে যায় সব রকম ভেদাভেদ।

 

পরবর্তীতে ঠাকুর তন্ত্র সাধনা করেছেন। ইসলাম এবং খিস্টান মতে সাধনা করেছেন। আবার তোতা পুরী মহারাজের সান্নিধ্যে এসে দীক্ষা ও নিয়েছেন। সব শেষে তিনি আবিষ্কার করেছেন যত মত ততো পথ। সব পথ গিয়ে সেই পরম শক্তিতে মিশেছে সেই শক্তি তার কাছে মা কালী স্বয়ং যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে মাতৃ রূপে। স্বয়ং মা সারদার মধ্যেও তিনি মা কালীকে দেখছেন তার পুজোও করছেন তিনি।আজ যারা ভক্তি মার্গের সাধক তাদের কাছে শ্রী রামকৃষ্ণ এবং তার মাতৃ

ভক্তি এক প্রকার আদর্শ স্বরূপ।

 

আবার এমনই এক ভক্ত এবং তার সাধনার কথা নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – মহাপ্রভু এবং ভক্ত হরিদাস

ভক্তের ভগবান – মহাপ্রভু এবং ভক্ত হরিদাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ভিন্ন ধর্মের সাথে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও একজন সাধক শুধু ভক্তির মাধ্যমে কিভাবে কৃষ্ণকে পেতে পারেন তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ ভক্ত হরিদাস।

 

ভক্ত হরিদাস বৈষ্ণব ধর্মের অন্যতম প্রচারক ছিলেন এবং মহাপ্রভুর সবথেকে প্রিয় শিষ্য হয়ে উঠেছিলেন।বাল্যকালে হরিদাস মুসলমানদের কাছে লালিত-পালিত হয়েছিলেন বলে তাকে যবন হরিদাস বলা হতো।

 

শ্রী চৈতন্য দেব যখন বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করছিলেন, সেই সময় কেঁড়াগাছি গ্রামের যবন হরিদাদের বড়ভাই সন্যাসী হয়ে চলে যান। যবন হরিদাস মায়ের গর্ভে থাকতে তার পিতাও সন্যাসী হয়ে অন্যত্র চলে যান এবং কিছু দিন পরে মৃত্যুবরণ করেন। এর পর এক মুসলিম দম্পতি হরিদাস কে সন্তান স্নেহে প্রতিপালন করতে থাকেন।

 

ক্রমে বয়স বাড়তে থাকলে হরিদাস সকল সময় হরিনাম জপ করতে শুরু করেন এবং একজন চৈতন্য ভক্ত হয়ে পড়েন। মুসলমান ঘরে হরিনাম জপ বন্ধ করার জন্য হাকিমপুরের প্রভাবশালী খাঁ সাহেবরা বিভিন্ন ভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। হরিদাস হাকিমপুর ছেড়ে যশোর জেলায় যান এবং কিছুদিন পরে তিনি শ্রী চৈতন্যদেবের শীষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং কয়েক মাসের মধ্যে হরিদাস শ্রী চৈতন্যের অন্যতম শীষ্য হন।

 

হরিদাস হরিনাম প্রচারে গৌরে থাকা কালীন গৌরের স্বাধীন সুলতান হোসেন শাহ সম্মানের সাথে গ্রহণ করেন।তিনি কোনদিন কোনও দেবদেবীর পুজা করেননি। হরিনাম জপ-ই ছিলো তার মূলমন্ত্র।

 

একবার কাগজপুকুরের জমিদার হরিদাসকে পরীক্ষা করার জন্য তার রক্ষিতা নর্তকী হীরামতিকে পাঠালেন। হীরামতি হরিদাসের ধ্যান ভঙ্গ করার জন্য রাতে কয়েক ঘন্টা নাচগান করে ক্লান্ত ও শ্রান্ত হয়ে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ে গেলো। অবশেষে স্বাভাবিক ভাবে হরিদাসের ধ্যান ভঙ্গ হলে তিনি রক্ষিতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- ‘মা তুই ছেলেকে দেখতে এসেছিস? মা ডাক শুনে সেই নর্তকী তার কাছে ক্ষমা চেয়ে সেই স্থান থেকে চলে যান।

 

শোনা যায় একবার হরিদাস ঠাকুরের নাম জপ বন্ধ করার জন্য এক দুষ্ট কাজী সাহেব তাকে বেত্রাঘাতের সাজা দেন। অসংখ্য বার বেতের আঘাত সহ্য করেও তার হরিনাম বন্ধ করা যায়নি। তিনি তিন লক্ষ বার হরে কৃষ্ণ মহা মন্ত্র জপ করেছিলেন।

 

প্রতিদিন তার গৃহে আসতেন মহাপ্রভু। দেহ ত্যাগের পর তার দেহ স্বয়ং মহাপ্রভু এবং তার পার্শদরা মিলে পুরীতে সমুদ্রের ধারে সমাহিত করেন এবং সেখানে গড়ে ওঠে হরিদাসের সমাধি মন্দির যেখানে আজও অখণ্ড হরিনাম হয়।

 

আবার এমনই এক ভক্তের ভক্তি এবং সেই সংক্রান্ত নানা ঘটনা নিয়ে ফিরে আসবো।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

 

ভক্তের ভগবান – শ্রী কৃষ্ণ এবং মীরা বাই

ভক্তের ভগবান – শ্রী কৃষ্ণ এবং মীরা বাই

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শ্রী কৃষ্ণ প্রেমের প্রতীক হিসেবে সারা বিশ্বে মীরা বাই এক পরিচিত নাম। তাকে নিয়ে লেখা হয়েছে অসংখ্য ভজন। বহু গান এবং কবিতা। আজকের পর্বে এই মহান ক্রিস ভক্ত এবং তার ভক্তি

প্রসঙ্গ নিয়ে লিখবো।

 

রাজস্থানের একটি রাজপুত পরিবারে রাজা রতন সিং এবং বীর কুমারীর ঘরে 1498 সালে মীরা বাই জন্মগ্রহন করেছিলেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিক প্রকৃতির এবং তার কণ্ঠে ছিলো অদ্ভুত সুর। ভক্তি গীতি গাইতে পারতেন এবং ভজন তৈরী করতে পারতেন।

 

চার বছর বয়সে তিনি তার মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে তার বর কে হবে? তার মা মজা করে শ্রী কৃষ্ণের মূর্তির দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন যে তিনিই তার বর হবেন।

 

সেই মুহূর্ত থেকে মীরা শ্রী কৃষ্ণের প্রেমে হারিয়ে যান তিনি যখন বড় হচ্ছিলেন তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে শ্রী কৃষ্ণ তাকে বিয়ে করতে চলেছেন। মনে মনে তিনি তার আরাধ্য কৃষ্ণকে প্রেমিক বা স্বামী হিসেবে চেয়ে ছিলেন।

 

পরবর্তীতে তার বিয়ে হয় মেওয়ারের রানা সাঙ্গার সাথে। যদিও তিনি বিয়ে করতে চাননি কারণ তিনি শ্রী কৃষ্ণকে তার স্বামী বলে মনে করেন কিন্তু তিনি তার পরিবারের পীড়াপীড়িতে বিয়ে করেছিলেন। বিবাহিত হওয়ার পরেও কৃষ্ণের প্রতি তার ভালবাসা কমেনি এবং তিনি তার কৃষ্ণ মূর্তিটিকে তার স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যান।দিন রাত তিনি কৃষ্ণ প্রেমেই ডুবে থাকতেন।

 

সংসারের মীরা তার দৈনন্দিন সব কাজ শেষ করে প্রতিদিন শ্রী কৃষ্ণের মন্দিরে যেতে শুরু করে।তিনি শ্রীকৃষ্ণের পূজা করতেন এবং তার সুরেলা কণ্ঠে ভজন গাইতেন। এটা দেখে তার শাশুড়ি চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং কৃষ্ণের পরিবর্তে

তাকে কালী মাতার পূজা করতে বলেন।

 

মীরা তা করতে অস্বীকার করেন এবং তাদের জানান যে তিনি ইতিমধ্যেই কৃষ্ণকে তার

জীবন উৎসর্গ করেছেন। ধীরে ধীরে ভক্ত মীরা এবং তার ভগবানের মধ্যে প্রাচীর তৈরী করার চেষ্টা শুরু হয়। তার কৃষ্ণ প্রেম নিয়ে সংসারে অশান্তি দেখা দেয়। তা এতটাই চরমে পৌছায় যে মীরা বাইকে হত্যার চেষ্টা করা হয়।

 

একবার তাকে হত্যা করার জন্য সাপ সহ একটি মালা পাঠানো হয় কিন্তু ঝুড়িটি খুললেই মীরা বাই মালাগুলির মধ্যে একটি কৃষ্ণের মূর্তি দেখতে পান।

 

মীরাকে হত্যা করার জন্য আরও বেশ কয়েকটি প্রচেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু কৃষ্ণ সর্বদা তাকে রক্ষা করেছিলেন। এক সময় প্রসাদ আকারে তাকে বিষ খাওয়ানো হয় এই বলে যে এটা কৃষ্ণের প্রসাদ। যদিও তিনি জানতেন যে এটি বিষ ছিল কিন্তু তবুও তিনি এটি খেয়েছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা সেই বিষটি অমৃতে পরিণত হয়েছিল।

 

এরপর মীরা তুলসীদাসকে চিঠি লিখে তার মতামত জানতে চান। এর জবাবে তুলসীদাস বললেন শুধুমাত্র ঈশ্বরের জন্য ভালবাসা বাস্তব এবং অন্য সব সম্পর্ক এই প্রেমের কাছে তুচ্ছ।

এরপর মীরা কৃষ্ণের চরণে নিজেকে সম্পূর্ণ

ভাবে উৎসর্গ করতে দ্বারকা চলে যান।

 

মীরা বাইয়ের অন্তর্ধান ও বেশ অলৌকিক মনে করা হয় মীর বাইয়ের আত্মা চিরকালের জন্য শ্রী কৃষ্ণের মূর্তিতে বিলীন হয়েছিল।

 

আবার এক ভক্ত এবং তার ভক্তির কথা নিয়ে আগামী পর্বে ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – সাধক কমলাকান্ত এবং মা কালী

ভক্তের ভগবান

 

সাধক কমলাকান্ত এবং মা কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার মাতৃ সাধকদের মধ্যে সাধক কমলা কান্ত ছিলেন মাকালীর সাক্ষাৎ বরপুত্র। একাধিক বার তাকে নানা বিপদ থেকে স্বয়ং মা কালী রক্ষা করেছেন। আজ এই মহান কালী ভক্ত এবং তার জীবনে মা কালীর ঘটানো কিছু অলৌকিক ঘটনার কথা জানাবো।

 

কমলাকান্তের জন্মস্থান বর্ধমান জেলার গঙ্গাতীরস্থ অম্বিকা কালনা। মাতার নামা মহামায়া, পিতার নাম মহেশ্বর। দশ বছর বয়সে তাঁর পিতৃবিয়োগ হয়। বালক কমলাকান্ত সুগায়ক ছিলেন এবং রামপ্রসাদের গানে বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি মাঠে ঘাটে আপনমনে গান গেয়ে বেড়াতেন। শোনা যায়, একদিন রাত্রে গঙ্গাতীরের শ্মশানের অন্ধকারে আত্মমগ্ন হয়ে গান গাইবার সময় এক অশরীরী তান্ত্রিক কাপালিক তাঁকে কালীনামে দীক্ষা দিয়ে যান এবং সেই মন্ত্র জপ করতে করতে সেখানেই আনন্দময়ী নৃত্যরতা শ্যামা মায়ের দর্শন পান।

 

বর্ধমানের মহারাজ তেজ চাঁদ কমলাকান্তের গানে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে সভা পণ্ডিত করে বর্ধমান রাজবাড়িতে নিয়ে যান।মহারাজ তেজচাঁদ কমলাকান্তকে এই কালীমন্দির গড়ে দেন। এখানেই সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেন সাধক কমলাকান্ত।

 

তার তন্ত্র এবং অলৌকিক ক্ষমতা জানতে মহারাজ তেজ চাঁদ অমাবস্যার রাতে তার কাছে চাঁদ দেখতে চেয়েছিলেন। কমলাকান্ত তাকে চাঁদ দেখিয়ে ছিলেন।

 

একদিন রাজা জানতে পারেন কাজকর্ম ভুলে মদ্যপান করছেন কমলাকান্ত। রাজা সেখানে পৌঁছে ক্ষোভ প্রকাশ করলে কমলাকান্ত কমণ্ডলু থেকে রাজার হাতে ঢেলে দেন সুরা। কমলাকান্তের অলৌকিক ক্ষমতায় সেই সুরা পরিণত হয় দুধে।

 

মা কালীর মূর্তির প্রাণ রয়েছে দাবি করেছিলেন কমলাকান্ত। রাজা প্রমাণ চাইলে প্রতিমার পায়ে বেল কাঁটা ফুটিয়ে দেন কমলাকান্ত। রাজা দেখেন সেই ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছে।এমনই ছিলো তার ভক্তি এবং তার আরাধ্যা মা কালীর সাথে তার সম্পর্ক।

 

দেহত্যাগের সময় কমলাকান্তকে গঙ্গায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন রাজা। কমলাকান্ত যেতে চাননি। তারপরই দেখা যায় মাটি ভেদ করে উঠে জলের ধারা পড়ছে কমলাকান্তের মুখে। কমলাকান্ত নিজে যেতে না চাওয়ায় মা গঙ্গা এসেছিলেন তাঁর কাছে।

আজও সেই স্থান সংরক্ষিত আছে।

 

আগামী দিনে আরো অনেক ভক্ত এবং তাদের কর্মকান্ড নিয়ে ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান : জগন্নাথ দেব এবং গণেশ ভট্ট

ভক্তের ভগবান

জগন্নাথ দেব এবং গণেশ ভট্ট

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

নানা সময়ে পুরীর জগন্নাথদেবকে নানা বেশে সাজানো হয়।প্রতিটি বেশের আছে আলাদা ব্যাখ্যা এবং আধ্যাত্মিক তাৎপর্য।জগন্নাথদেবের একটি বিখ্যাত বেশ হলো হাতি বেশ বা গজ বেশ |হাতিবেশ রথযাত্রার আগে স্নান যাত্রার সময় দেখা যায় । এই সময়ে গণপতির বেশে জগন্নাথকে সাজানো হয় বলে নাম ‘হাতি বেশ’।এই গজ বেশের নেপথ্য একটি একটি বিশেষ ঘটনা আছে যে ঘটনার প্রধান চরিত্র ভক্ত গণেশ ভট্ট বা গণপতি ভট্ট।আজকের পর্বে এই ভক্ত এবং তার সাথে ভগবানের করা একটি লীলা সম্পর্কে আপনাদের জানাবো।

পন্ডিত গণেশ ভট্ট ছিলেন পুরান এবং বিভিন্ন শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ। তিনি ছিলেন গণপতির উপাষক
তিনি শাস্ত্র পড়ে জানতে পেরে ছিলেনযে পুরীতে ভগবানের বামন অবতার বিরাজমান এবং রথে সেই বামন অবতারকে দর্শন করলে ব্রহ্মজ্ঞান হয়। আত্মার মুক্তি হয়। তিনি পুরীর উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।পুরীর পথে তিনি দেখলেন বহু তীর্থ যাত্রী সেই বামন অবতার দর্শন করে আনন্দ করতে করতে ফিরে আসছেন। তার মন ভেঙে গেলো তিনি ভাবলেন যারা জগন্নাথ দর্শন করেছেন তাদের যদি মুক্তি লাভ হয় তবে তারা ফিরে আসে কি করে।তাদের তো পরমব্রহ্মতে বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা। তার মনের সন্দেহ দুর করতে জগন্নাথদেব ছদ্মবেশে তাকে দর্শন দিলেন এবং বললেন জগন্নাথ দেব সবার মনোস্কামনা পূর্ণ করেন। এই ভক্তরা বাড়ি ফেরার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল তাই তারা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।

তারপর গণেশ ভট্ট পুরীতে যান কিন্তু জগন্নাথদেব দর্শন করে তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি মনে মনে তার আরাধ্য গণেশের রূপ কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু জগন্নাথ দেবের রূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার মনের কথা বুঝতে পেরে প্রভু জগন্নাথ পুরীর রাজাকে আদেশ দেন যে তিনি যেনো আরো একবার গণেশ ভট্টকে নিয়ে আসেন।

তারপর পুরীর রাজা তাঁকে জহগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা দেখবার জন্য আহ্বান জানান। রাজার অনুরোধে স্নানযাত্রায় গিয়ে গণেশ ভট্ট আবিষ্কার করেন জগন্নাথ গণেশ রূপেই তাকে দেখা দিয়েছেন।সেই ঘটনার পর থেকেই স্নান যাত্রায় জগন্নাথের বেশ হয় হাতিবেশ।

ভক্তের মনে যদি ভক্তি অটুট থাকে এবং আস্থা থাকে ভগবান তার মনোস্কামনা পূর্ণ করেন। তার জন্য তিনি নিজের রূপ বদলাতেও দ্বিধা করেননা।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে আরো ভক্তের কথা নিয়ে। থাকবে আরো একটি অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – বজরংবলী এবং তুলসী দাস

ভক্তের ভগবান – বজরংবলী এবং তুলসী দাস
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
তুলসী দাস শুধু রামচরিত মানস বা হনুমান চালিসার রচয়িতা ছিলেনন তিনি ছিলেন বজরংবলীর এক মহান ভক্ত যাকে দেখা দিয়েছিলেন স্বয়ং হনুমান এবং তিনি শ্রী রামের দর্শনও পেয়েছিলেন।আজ আপনাদের জানাবো মহান এই সাধক এবং তার আরাধ্য বজরংবলীর মিলনের এক অদ্ভুত ঘটনা।
বৃন্দাবনে থাকা কালীন প্রতিদিন স্নান করে ফিরে আসার সময় তুলসীদাস তার জলের পাত্রে থেকে যাওয়া জল একটি গাছের গোড়ায় ফেলে দিতেন।
এই গাছে বাস করতো এক প্রেত আত্মা। একদিন সে তুলসী দাসের সামনে প্রকট হলো।
তুলসীদাসের উপর খুব খুশি হয়ে সেই আত্মা বলল, “হে সাধক আপনার এই জলদান আমাকে ধন্য করেছে। আমি মুক্তির পথ পেয়েছি ! আমি আপনার কি সাহায্য করতে পারি।তুলসীদাস উত্তর দিলেন, “আমাকে ভগবান রামের দর্শন করতে দাও”। আত্মা বলল, “হনুমান মন্দিরে যান সেখানে হনুমান একজন কুষ্ঠরোগীর ছদ্মবেশে প্রথম শ্রোতা হিসেবে রামায়ণ শোনার জন্য আসেন এবং সবার শেষে যান। তাকে আগে দর্শন করুন। তিনি পথ বলে দেবেন।
সেই কথা মতো তুলসী দাস রাম কথায় যান
এবং হনুমানকে চিনতে পেরে তাকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। হনুমান দিব্য দর্শন দিলে তুলসীদাস সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পায়ে পড়ে যান। তার চোখে আনন্দর অশ্রু চলে আসে।হনুমান তার ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে প্রভু রামের দর্শন পাওয়ার বর দেন।
স্বয়ং হনুমানের দর্শন পেয়ে তুলসীদাস হনুমান চালিসা রচনা করেন। শোনা যায় একধিক বার বজরংবলী তার সামনে হাজির হন এবং তাঁকে ঐশ্বরিক জ্ঞান দিয়ে আশীর্বাদ করেন।
রামচরিতমানস লেখার সময়ও হনুমান তুলসীদাসকে সাহায্য করেছিলেন। তুলসীদাস যখন একটি শ্লোকে আটকে যেতেন হনুমান এসে পরবর্তী শ্লোক তৈরীতে সাহায্য করতেন।
ভক্ত এবং ভগবানের এমন অনেক ঘটনা এবং
তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নিয়ে আবার পরবর্তী পর্বে ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান : তিরুপতি বালাজি এবং অনন্ত আচার্য্য

ভক্তের ভগবান

 

তিরুপতি বালাজি এবং অনন্ত আচার্য্য

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ভগবান বহুবার বহু অবতারে, ভিন্ন ভিন্ন রূপে ভক্তের উদ্ধারের জন্য পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন

মনে করা হয় কলিযুগের দুঃখ ও যন্ত্রণা থেকে মানব সমাজকে মুক্ত করতে ভগবান বিষ্ণু তিরুমালায় ‘ভেক্টেশ্বর’ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

তিরুপতি মন্দিরের আরাধ্য দেবতা ভেঙ্কটেশ্বর। তাকে ভগবান বিষ্ণুর অবতার রূপেই দেখা হয়।

আজকের পর্বে আপনাদের তিরুপতি বালাজির এক অদ্ভুত লীলার কথা লিখবো।

 

একবার তিরুপতি মন্দিরে বালাজি দর্শনে এসেছিলেন পরম বৈষ্ণব এবং বালাজির

ভক্ত অন্তত আচার্য্য এবং তার স্ত্রীর। প্রচন্ড গরমে বালাজির কষ্ট ভক্তের মনকে দুঃখ দিয়েছিলো। তিনি বুঝলেন এই রুক্ষ পাহাড়ি অঞ্চলে আদ্রতা এবং গরমের জন্য বালাজির কষ্ট হচ্ছে। কিছু একটা করা দরকার। তিনি ঠিক করলেন এই মন্দির পরিসরে তিনি নিজে হাতে একটি পুকুর খনন করবেন যাতে বালাজির চারপাশ ঠান্ডা থাকে এবং ইচ্ছে হলে তিনি নৌকা বিহার ও করতে পারেন।

 

নিজে হাতে কোদাল চালিয়ে তিনি পুকুর খনন করতে শুরু করলেন এবং স্ত্রীকে আদেশ দিলেন মাটি একটি ঝুড়িতে করে দূরে একটি নিদ্দিষ্ট স্থানে ফেলে আসতে। তার মাটি কাটার সাথে সাথেই তার স্ত্রী ঝুড়ি খালি করে ফিরে আসছিলেন। এতো তাড়াতাড়ি কি করে এ কাজ সম্ভব এটা ভেবে অবাক হয়ে যান অনন্ত আচার্য্য। স্ত্রীকে প্রশ্ন করতে তিনি বললেন একটি চতুর্ভুজ কৃষ্ণ বর্ণের বালক তার হাত থেকে ঝুড়ি নিয়ে নিজেই মাটি অন্য জায়গায় ফেলে আসছে। ভক্ত বুঝলেন এ নিশ্চই স্বয়ং ভগবান বালাজি। তিনি স্ত্রীকে অনুসরণ করে বালাজিকে দেখে ফেললেন।বালাজি বললেন তাদের এই কষ্ট তিনি দেখতে পারছেন না তাই সাহায্য করতে এসেছেন।

 

বালাজির প্রতি তার বাতসল্য ভাব ছিলো। নিজের সখা হিসেবে তিনি বালাজিকে তিরস্কার করে লাঠি উঁচিয়ের বললেন তিনি এটা ঠিক করছেন না। ভক্তের অধিকার ভগবানের সেবা করা। এই অধিকার ভগবানও কেড়ে নিতে পারেনা।বালাজি তার ধমক খেয়ে অন্তর্ধান হলেন।

 

সেই রাতে তিরুপতির রাজাকে বালাজি স্বপ্নে দেখা দিলেন এবং নির্দেশ দিলেন মন্দিরে একটি পুকুর খনন করতে। এক রাতেই রাজা সেই পুকুর খনন করিয়ে ছিলেন।

 

আজও তিরুপতি মন্দিরে ভক্ত অনন্ত আচার্য্যর সেই লাঠি রাখা আছে যা মন্দিরে আগত দর্শণার্থীরা দর্শন করেন।

 

আবার পরের পর্বে ভগবানের এমনই এক দিব্য এবং অলৌকিক লীলা নিয়ে ফিরে আসবো।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।