Home Blog Page 51

ভক্তের ভগবান – মাতা সীতা এবং ভক্ত বজরংবলী

ভক্তের ভগবান – মাতা সীতা এবং ভক্ত বজরংবলী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

সবাই পবন পুত্র হনুমানকে রাম ভক্ত বলেই জানেন। কিন্তু শুধু রাম নন রূদ্র অবতার হনুমান ছিলেন মাতা সীতার ও ভক্ত। কবিরাজ তুলসী দাস তার হনুমান চালিশায় লিখেছেন যে হনুমানকে অষ্ট সিদ্ধি এবং নব নিধীর অধিকারী করেছেন মাতা সীতা।

 

রূদ্র অবতার নিজের জীবন তুচ্ছ করে লঙ্কায় গিয়ে শ্রী রামের দূত হিসেবে সীতা মাতার সঙ্গে দেখা করেন এবং সেই সময়ে তিনি মাতা সীতাকে উদ্ধার করতেও চান কিন্তু সীতা রাজি হননি কারন ভগবানের ইচ্ছে ছিলো অন্যরকম। স্বয়ং শ্রী রাম এসে রাবনকে তার পাপের শাস্তি দেবেন এবং সীতাকে উদ্ধার করবেন এই ছিলো ভবিতব্য।

 

আজ এই মহান বৈষ্ণব এবং মাতা সীতার একটি পৌরাণিক ঘটনা আপনাদের জানাবো যেখানে তার রাম ভক্তি খুব সুন্দর ভাবে

ফুটে উঠেছে।

 

পুরানে উল্লেখ আছে একদিন দেবী সীতাকে সিঁদুর পড়তে দেখে হনুমান সীতাকে জিজ্ঞেস করেন যে তিনি কেন সিঁদুর পড়ছেন, উত্তরে সীতা হনুমানকে জানিয়েছিলেন যে তার প্রভু শ্রী রামের দীর্ঘায়ুর জন্যই সিথিতে সিঁদুর পড়েন তিনি।হনুমান তখন ভাবেন যদি সিঁদুরই তাঁর প্রভু রামের দীর্ঘায়ুর চাবিকাঠি হয় তাহলে তিনিও সিঁদুর পড়বেন।তাই সীতার কথা শুনেই নিজের পুরো শরীরেই সিঁদুর মেখে নেন হনুমান।এখান থেকেই সূত্রপাত হয় তার সিঁদুর প্রীতির |গুরুর প্রতি শিষ্যের এমন ভালোবাসা ও ভক্তির কথা জানতে পেরে শ্রীরামচন্দ্র হনুমানকে আশীর্বাদ করেন যে, সবাই তাকে সিঁদুর দিয়ে পুজো করবে। আর সেই থেকে আজও ভগবান হনুমানকে সিঁদুর দান করে পুজো করা হয়।এরপর থেকেই হনুমান ভক্তরা মনে করেন বীর হনুমানকে সিঁদুর দান করলে তিনি সেই সিঁদুর নিজের গায়ে মাখেন এবং ভক্তের সমস্ত ইচ্ছে পূরণ করে দেন।

 

আবার লঙ্কা বিজয় করে অযোধ্যায় ফেরার পর মাতা সীতা যখন তার প্রিয় হনুমকে একটি বহু মূল্য রত্নের মালা দেন তখন হনুমান খেলার ছলে তা ছিঁড়ে ফেলেন এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সীতা তাকে তিরস্কার করেন এতে হনুমান জানান তিনি তাদের চরণে স্থান চান আর কিছু নয়। মাতা সীতা এবং প্রভু রাম তার হৃদয়ে বিরাজ করছেন। এই বলে হনুমান নিজের বুক চিরে রাম সীতার দর্শন করান।

 

ফিরে আসবো ভক্ত এবং ভগবানের আরো একটি দিব্য লীলা নিয়ে পরবর্তী পর্বে। পরতে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – কৃষ্ণ ভক্ত অর্জুন

ভক্তের ভগবান – কৃষ্ণ ভক্ত অর্জুন

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

সনাতন ধর্মে দেবতা অনেক আছে কিন্তু ভগবান একজনই।তিনি শ্রী কৃষ্ণ।তার মধ্যে সর্বগুন সর্বোচ্চ মাত্রায় বর্তমান তাই তিনি ভগবান। তিনিই অন্তিম আকর্ষণ তার দর্শন পাওয়ার পর আর কিছু আকর্ষণ থাকেনা।

 

তিনি একাধারে বীর যোদ্ধা আবার পরম দয়ালু তিনি দ্বারকাধীশ আবার অর্জুনের রথের সারথি|তার রূপ ও অনেক|তার একেকজন ভক্তকে তিনি এক এক রূপে দর্শন দিয়েছেন আজ আলোচনা করবো তার বিশ্বরূপ বা বিরাট রূপ নিয়ে। যে রূপে তিনি তার পরম ভক্ত অর্জুনকে দর্শন দিয়ে তার মনোস্কামনা পূর্ণ করেছিলেন।

 

কুরুক্ষে যুদ্ধে কৃষ্ণ বার বার অর্জুনকে নিজের বিশ্বরূপ দেখার আজ্ঞা দেন, কিন্তু অর্জুন কিছু দেখতে পারেন না|তখন কৃষ্ণ বলেন-কিন্তু তুমি নিজের এই চোখ দিয়ে আমার দিব্য রূপ দেখতে পারবে না। তাই আমি তোমায় দিব্য চক্ষু দিচ্ছি। যার সাহায্যে তুমি আমার ঐশ্বরিক ক্ষমতা দেখতে পারবে|এরপর অর্জুনকে দিব্য দৃষ্টি দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে নিজের পরম ঐশ্বরিক বিরাট রূপ দেখান।গোটা বিশ্ব ব্রম্ভান্ড যেনো এই রূপের কাছে তুচ্ছ|মনে করা হয় যদি আকাশে একসঙ্গে হাজার সূর্যোদয় হয়, তখনও তাদের সকলের প্রকাশ মিলে সেই বিরাট রূপের প্রকাশের সামনে দাঁড়াতে পারবে না।শ্রী কৃষ্ণের এই রূপে অনেক মুখ ও চোখ আছে, অনেক অলৌকিক অলঙ্কার আছে, হাতে নানান দিব্য অস্ত্র-শস্ত্র আছে এবং তার গলায় নানান ধরণের দিব্য মালা আছে| তিনি একপ্রকার অলৌকিক বস্ত্র পরে আছেন এবং ললাট ও শরীরে দিব্য চন্দন, কুমকুম ইত্যাদি লাগানো রয়েছে|

 

শাস্ত্রে উল্লেখ আছে এমন বিরাট রূপ দেখে অর্জুন আশ্চর্যচকিত হয়ে পড়েন এবং তাঁর শিহরণ দেখা দেয়। তিনি করজোড়ে এবং মাথা নুইয়ে প্রণাম করে বিরাট রূপ শ্রীকৃষ্ণের স্তুতি করতে শুরু করেন|

 

শ্রী কৃষ্ণ শুধু তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভক্ত অর্জুনকে বিরাট রূপ দেখিয়ে বিরত থাকেন নি। তিনি যুদ্ধে স্বজন হত্যার চিন্তায় বিমর্শ অর্জুনকে দিব্য জ্ঞান দিয়ে ছিলেন এবং বুঝিয়ে ছিলেন মানুষ নিমিত্ত মাত্র স্বয়ং ভগবানই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং যা হবে তার ইচ্ছেতেই হবে। তাই মানুষের উচিৎ নিষ্কাম কর্ম করে যাওয়া।শুধু বাণী নয় যুদ্ধক্ষত্রে তিনি তার অনুগত ভক্ত কৃষ্ণের রথের সারথি হতেও দ্বিধা বোধ করেননি।

 

ভগবান আক্ষরিক অর্থেই ভক্তের ভগবান।

ভক্তকে সঠিক দিশা দেখিয়ে জীবনের সব যুদ্ধে জয়ী করার জন্য তিনি সদা সচেষ্ট।

 

আবার ভক্তের ভগবান এবং তার লীলা নিয়ে

ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে। পরতে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – কৃষ্ণ ভক্ত জয়দেব

ভক্তের ভগবান – কৃষ্ণ ভক্ত জয়দেব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ আপনাদের গীত গোবিন্দর রচয়িতা এবং মহান কৃষ্ণ ভক্ত পরম বৈষ্ণব শ্রী জয়দেব প্রসঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে আলোচনা করবো। জানাবো এক অলৌকিক ঘটনার কথা।

 

শ্রী জয়দেব গোস্বামী একাদশ শতাব্দীতে বিরহুম জেলার কেন্দুলি গ্রামে আবির্ভূত হন। তাঁর পিতার নাম ভোজাদেব এবং মাতার নাম বামা দেবী। তাঁর প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়, তবে বলা হয় যে তিনি অল্প বয়স থেকেই সংস্কৃতের পণ্ডিত ছিলেন এবং আধ্যাত্মিক জীবনে

আকৃষ্ট হন।যুবক বয়সে জয়দেব বহু তীর্থ স্থান পরিদর্শন করার পর জগন্নাথ পুরীতে যান। সেখানে তিনি পদ্মাবতী নামে এক ভক্ত মেয়েকে বিয়ে করেন।

 

রাধা কৃষ্ণের প্রেম লীলা নিয়ে জয়দেব গীত গোবিন্দ রচনা করে ছিলেন যা বৈষ্ণব সাহিত্যর এক অমূল্য সম্পদ।

 

গীতা-গোবিন্দ রচনা করার সময়, জয়দেব একটি পদ লিখতে গিয়ে থেমে গিয়েছিলেন যেখানে কৃষ্ণ তাকে ছেড়ে যাওয়ার পরে রাধা অনুতপ্ত হন এবং কৃষ্ণ শ্রী রাধার ভক্ত সেবক হয়ে তার মান ভঞ্জন করছেন।কৃষ্ণ রাধার অনুগত বা তার অধীনে এটা লেখা যথাযত হবে কিনা এটা নিয়ে জয়দেব চিন্তিত ছিলেন।লেখা বন্ধ রেখে গঙ্গা স্নান করতে গেল। তাঁর অনুপস্থিতিতে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং জয়দেবের রূপে আবির্ভূত হন, স্বর্ণাক্ষরে একটি শ্লোক লেখেন এবং পদ্মাবতীর তৈরি খাবার গ্রহণ করেন । জয়দেব ফিরে এসে পদ্মাবতীকে তার সামনে খেতে দেখে অবাক হয়ে যান কারন পদ্মাবতী স্বামীর আগে খেতেন না। জিগেস করে জানতে পারেন তিনি নাকি একটু আগেই নিজে এসে খাবার খেয়েছেন এবং তার ঘরে চলে গেছেন।জয়দেব তার ঘরে গিয়ে স্বর্ণাক্ষরে লেখা শ্লোকটি দেখতে পেলেন, যে শ্লোকটি তিনি লিখতে দ্বিধাবোধ করেছিলেন। অশ্রুসজল চোখে তিনি স্ত্রীকে ডাকলেন এবং জানালেন তারা পরম সৌভাগ্য লাভ করেছেন আজ ভগবান স্বয়ং এসে তার হয়ে শ্লোক রচনা করেছেন।

 

জয়দেবের সময়ে গজপতি পুরুষোত্তমদেব ছিলেন পুরীর রাজা। তিনি জয়দেবের প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিলেন এবং নিজেকে জয়দেবের সমতুল্য একজন কবি মনে করে নিজে গীতা-গোবিন্দ নামে একটি কাব্য গ্রন্থ রচনা রচনা করেছিলেন।ঠিক হয়

দুটি পাণ্ডুলিপি রাতে ভগবান জগন্নাথের সামনে রাখা হবে এবং ভগবান তাঁর সিদ্ধান্ত নেবেন।তিনিই জানাবেন পরের দিন যখন ভক্তরা আসেন, তারা দেখতে পান জয়দেবের গীতা-গোবিন্দ জগন্নাথের বুকে আটকে আছে রাজার পাণ্ডুলিপি মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে।

 

আসলে ভক্ত যখন ভগবানের কাছে সম্পূর্ণ রূপে আত্মসমর্পণ করেন তখন তিনিই তাদের পরিচালনা করেন।

 

ভক্ত এবং ভগবানের পরবর্তী পর্ব নিয়ে আগামী পর্বে ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – কৃষ্ণভক্ত গোপেশ্বর মহাদেব

ভক্তের ভগবান – কৃষ্ণভক্ত গোপেশ্বর মহাদেব

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

দেবাদিদেব মহাদেব দেবতাদের আরাধ্য দেবতা। দেবতারা তার ধ্যান করেন কিন্তু তিনি নিজে পরম বৈষ্ণব এবং হরির ভক্ত। তিনি নিজে কৈলাশে সর্বদা হরির ধ্যানে মগ্ন থাকেন।একবার ভক্ত মহাদেব তার আরাধ্য বিষ্ণুকে কৃষ্ণ রূপে দেখতে এবং তার সান্নিধ্য লাভ করতে এক অদ্ভুত কান্ড ঘটিয়ে ছিলেন।

একবার মহাদেব যখন কৈলাশে গভীর ধ্যানে মগ্ন সেই অবস্তায় তিনি শ্রী কৃষ্ণের বাঁশির মধুর ধ্বনী শুনতে পেলেন।সেই অতীন্দ্রিয় শব্দ অনুসরণ করে তিনি বৃন্দাবনে পৌঁছান যেখানে ভগবান গোপীনাথ তাঁর গোপীদের সাথে মহা রাস-লীলা শুরু করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।

মহা-রাসে যোগদানের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় শিব নিধী বনের প্রবেশদ্বারের কাছে যান কিন্তু দ্বার রক্ষী যোগমায়া তাকে থামিয়ে দেন এবং বলেন – কৃষ্ণ ব্যতীত কোনও পুরুষের প্রবেশের অনুমতি নেই। প্রবেশ করতে চাইলে আপনাকে ব্রজের দাসী অর্থাৎ এক গোপীর রূপে থাকতে হবে।

এরপর শিব মানসরোবরের জলে ডুব দেন এবং সেখানে স্নান করার পর ভগবান শিব হ্রদ থেকে সুন্দরী গোপীনীর রূপে আবির্ভূত হন এবং সেই রূপে শ্রী কৃষ্ণের রাস স্থলে গিয়ে তার ভগবানের দর্শন লাভ করেন।

কিন্তু ভগবান অন্তর্যামী এবং তিনি শিবের এই ছদ্মবেশ ধরে ফেললেন এবং বললেন “হে গোপীশ্বর, তোমাকে গোপী রূপে দেখে আমি খুব খুশি হয়েছি। কিন্তু আপনি জানেন যে এই রস গৃহস্থদের জন্য নয়। অতএব, যেহেতু আপনি অংশগ্রহণ করেছেন এবং আপনার ইচ্ছা পূরণ করেছেন, তাই আমি আপনাকে রাস স্থানের দ্বার পাল নিযুক্ত করলাম এবং আপনি এই স্থানে সর্বদা গোপেশ্বর মহাদেব রূপে বিরাজ করবেন।

আজও শিব শিব তার আরাধ্য হরির ইচ্ছেয় ওই স্থানে গোপেশ্বর রূপে বিরাজমান।
ভগবানের সাথে মিলিত হতে শুদ্ধ ভক্তরা সব কিছু করতে পারেনা এমনকি স্বয়ং মহাদেবও ব্যাতিক্রম নন।

আবার পরের পর্বে ভক্ত এবং ভগবানের আরো একটি লীলা নিয়ে ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – বাবা লোকনাথের লীলা

ভক্তের ভগবান – বাবা লোকনাথের লীলা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ভক্তদের কাছে বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী সাক্ষাৎ শিব স্বরূপ। জীবদ্দশায় তিনি যেমন তার ভক্তদের কাছে ছিলেন রক্ত মাংসের ভগবান তিরোধানের পরেও তার মহিমা এতো টুকু কমেনি। তার ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে যেকোনো বিপদ থেকে তাদের আরাধ্য লোকনাথ বাবা তাদের রক্ষা করেন।

 

সে অনেক কাল আগের কথা। বাবা লোকনাথ তখন বারদীর আশ্রমে থাকেন। তার এক ভক্ত বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী গোস্বামী তখন দেশ ভ্রমণে বেরিয়ে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে কিছু কাল ধ্যান জপ করে কাটাচ্ছিলেন।হটাৎ একদিন সেখানে দাবানলশুরু হয়েছিল।চারদিকে আগুন। পালানোর কোনো পথ নেই। ভক্ত তার ভগবানকে ডাকতে লাগলেন।

তারপর হঠাৎ সেখানে লোকনাথ ব্রহ্মচারী উপস্থিত হয়ে তাঁকে নিয়ে নিরাপদ স্থানে রেখে দিলেন।

বিজয়কৃষ্ণ দেশে ফিরে বারদীতে আসলে বাবা তাঁর সাথে স্নেহের আলিঙ্গন করেন।পরবর্তীতে বাবার আশীষে বিজয়কৃষ্ণ আধ্যাত্মিকতার

আরও উচ্চ স্তরে উপনীত হয়েছিলেন।

 

নিজের ভক্তদের যেকোনো পরিস্থিতিতে থেকে ক্ষা করতেন বাবা লোকনাথ। একবার বারদীর আশ্রমে কিছু দুষ্কৃতীদের আনাগোনা শুরু হয়।তারা আশ্রমে আসা ভক্তদের নানা ভাবে বিরক্ত এবং লুটপাট করতো।একবার গভীর রাতে তারা আশ্রমবাসীদের অনিষ্ট করার উদ্দেশ্যে আসলে একটি বাঘ গর্জন করতে করতে আশ্রমের দিকে ছুটে আসে। বাঘের ভয়ে তারা পালিয়ে যায় আর বাঘটি ছুটে এসে লোকনাথ বাবার পায়ে লুটিয়ে পড়ে। বাবা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে সে জঙ্গলে অদৃশ্য হয়।

 

ভক্তদের প্রতি বাবা লোকনাথ এতটাই স্নেহশীল ছিলেন যে জীবনের শেষদিকে তিনি এক যক্ষ্মা-রোগীর প্রতি করুণা পরবশ হয়ে তার সমস্ত রোগ নিজ দেহে গ্রহণ করেন। ফলে ঐ রোগীটি সুস্থ হয়ে উঠেন এবং বাবার দেহে যক্ষ্মার লক্ষণ দেখা যায়।

 

ভক্ত এবং ভগবানের সম্পর্ক এমনই হয়। ভক্তের বিপদে ভগবান চুপ করে থাকতে পারেন না। মন থেকে ডাকলে ভগবানের সব বিপদ দুর করেন।

শুধু সম্পূর্ণ রূপে স্মরণনাগত হতে হবে।

 

ভক্ত এবং ভগবানের এমন অনেক লীলা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকবে। ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান কালী ভক্ত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ

ভক্তের ভগবান

কালী ভক্ত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রী জাতক

আজ যে পরিচিত কালী মূর্তির বাংলার ঘরে ঘরে পুজো হয় তা এক কালী ভক্তের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা পায় এবং তার মাধ্যমেই ডাকাত এবং শ্মশান বাসি তান্ত্রিক কাপালিক দের পূজিতা দশ মহাবিদ্যার এক বিদ্যা দেবী কালী হয়ে ওঠেন ঘরের মেয়ে।
তিনি মহান তন্ত্র সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। আজকের পর্বে এই মহান কালী ভক্তের কথা জানবো।

তন্ত্র সাধক কৃষ্ণানন্দ সপ্তদশ শতকে পশ্চিমবঙ্গের নবদ্বীপে এক পণ্ডিত বংশে জন্মগ্রহণ করেন।
কৃষ্ণানন্দ ছিলেন তন্ত্র সাধক এবং তন্ত্র মতেই তিনি মাতৃ আরাধনা শুরু করেন।সাধনার শুরুতে কৃষ্ণানন্দ মহামায়াকে বললেন, ‘‘মা, তোমার যে রূপের পূজা আমি করব আমাকে সে রূপ দেখিয়ে দাও’’। তখন মা বললেন, ‘‘যে ভঙ্গীতে আমার এই বিগ্রহের পূজা তোমার দ্বারা প্রচলিত হবে, তা আমি মানবদেহের মাধ্যমেই দেখিয়ে দেব। এই রাত শেষে সর্ব প্রথম যে নারীকে যে রূপে যে ভঙ্গীতে দেখবে, ঐরকম মূর্তিতে আমার পূজার প্রচলন করবে। মায়ের নির্দেশমত পরদিন ভোরে কৃষ্ণানন্দ গঙ্গার দিকে কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর এক শ্যামাঙ্গিনী বালিকাকে দেখতে পান। ওই বালিকা তখন অপরূপ ভঙ্গীতে কুটিরের বারান্দার উপরে এবং বামপদ ভূতলে দিয়ে দাড়িয়ে ছিলেন। তিনি একতাল গোময়যুক্ত ডান হাত এমনভাবে উচু করে ধরেছিলেন যা দেখে বরাভয় মুদ্রার মত মনে হয়েছিল। বাম হাত দিয়ে তিনি কুটিরের দেয়ালে মাটির প্রলেপ দিচ্ছিলেন। তিনি একটি অতি সাধারণ শাড়ি পড়ে ছিলেন। সেই গ্রাম্য রমণী কৃষ্ণানন্দকে দেখে লজ্জায় জিভ কেটেছিলেন।তাঁর এরকম ভঙ্গী দেখে কৃষ্ণানন্দের মায়ের প্রত্যাদেশের কথা মনে পড়ে গেল। তারপরই তিনি মায়ের ঐরকম মূর্তি রচনা করে পূজার প্রচলন করলেন।

মনে করা হয় বাংলার সাধকগণ যখন তন্ত্রের মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছিলেন তখন আদ্যাশক্তি মহামায়া স্বয়ং তাঁকে তন্ত্রশাস্ত্রের পুনরুদ্ধার এবং তাঁর মাতৃরূপিণী বিগ্রহের পূজা করার নির্দেশ দেন।

কালী ভক্ত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের জীবনে একাধিক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে।একবার কৃষ্ণানন্দ কোনো এক ধনী ব্যক্তির বাড়ি দুর্গাপূজা করতে গিয়েছিলেন, সেখানে দুর্গাপূজার শেষে ওই বাড়ির কর্তা নিজের অহংবোধের বশবর্তী হয়ে কৃষ্ণানন্দকে বলেন যে তিনি শাস্ত্র মতে প্রতিমার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেননি। কৃষ্ণানন্দ ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন যে তিনি যদি প্রাণপ্রতিষ্ঠা না করে থাকেন এক্ষুনি তার প্রমাণ দেবেন এই বলে কৃষ্ণানন্দ একটি কুশি ছুঁড়ে দেন দেবী প্রতিমার ঊরুতে। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিমার ঊরু ফেটে রক্তপাত হয়।উপস্থিত সবাই সাধকের এই অলৌকিক কীর্তি দেখে হতবাক হয়ে যান।

একাধিক কঠিন সব সাধনা এবং তাতে সিদ্ধি লাভ করে ধীরে ধীরে তন্ত্র জগতে মাতৃ সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তী বা প্রবাদপ্রতিম। তার ভক্তি এবং নিষ্ঠা আজও প্রত্যেক মাতৃ সাধকের কাছে আদৰ্শ স্বরূপ।

পরের পর্বে আরো এক মহান ভক্ত এবং
তার সাধনার কথা নিয়ে ফিরে আসবো।
পড়তে থাকুনা।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – শিব ভক্ত রাবন

ভক্তের ভগবান – শিব ভক্ত রাবন

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দশানন রাবন যদিও তামসিক প্রবৃত্তির ছিলেন তবুও তার মতো শাস্ত্রজ্ঞ এবং শিব ভক্ত খুব কমই আছে। আজকের পর্বে রাবনের শিব ভক্তি নিয়ে আলোচনা করবো।

 

রাবন নিয়মিত নিজের আরাধ্য মহাদেবের ধ্যান করতেন এবং তার পুজো করতেন এবং প্রায়ই কৈলাসে আসতেন শিবের দর্শন করতে।

 

একবার রাবন শিবকে স্থায়ী ভাবে লঙ্কায় নিয়ে যেতে কঠোর তপস্যা করেন।তপস্যয় সন্তুষ্ট হয়ে চন্দ্রহাস নামে একটি বিরাট শক্তিশালী অস্ত্রও রাবণকে উপহার হিসেবে প্রদান করেন, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন রাবন, শেষমেষ শিব আত্মলিঙ্গ অর্পণ করে লঙ্কার প্রতিষ্ঠা করতে বলেন তাকে।শর্ত ছিলো কৈলাস থেকে লঙ্কার পথে যাওয়ার সময় কোথাও যদি রাবণ শিবলিঙ্গ কে কোন জায়গায় রেখে দেন, তাহলে তিনি সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবেন। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে লঙ্কায় যাওয়ার পথে ক্লান্ত এবং তৃষ্ণার্থ রাবন এই স্থানে শিবলিঙ্গ কিছুক্ষনের জন্য নামিয়ে রাখেন আর সেখানেই শিবলিটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। সেই শিব লিঙ্গই বৈদ্য নাথ রূপের এই শক্তি পীঠের ভৈরব রূপে বিরাজ করছে।

 

একবার রাবন স্বয়ং শিব এবং পার্বতীকে প্রণাম করতে গিয়ে কৈলাশ পর্বত তুলে নিজের

শক্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে ছিলেন। দেবাদিদেব নিজের একটি আঙুলের জোরে কৈলাশ পর্বতকে নিচে নামিয়ে এনে রাবনের দর্প চূর্ণ করেছিলেন। নিজের আরাধ্যা শিবের কাছে রাবন ক্ষমা চেয়ে ছিলেন এবং শিব কে সন্তুষ্ট করতে শিব স্তোত্র রচনা করে পাঠ করে শুনিয়ে ছিলেন। সেই শিব স্তোত্র আজও শিব পুজোয় ব্যবহার হয়।

 

শিবভক্ত রাবন শ্রী রামের হাতে প্রাণ ত্যাগ করে ছিলেন। এখনেও শিবের কৃপা লুকিয়ে আছে কারন ভগবানের অবতার শ্রী রাম কতৃক বধ হওয়া রাবনের পরম সৌভাগ্য। জন্ম মৃত্যু আবর্ত থেকে চীরতরে মুক্তি লাভ করে দুষ্ট রাবন ভগবত

চরণ লাভ করে ছিলেন।

 

ভক্ত এবং ভগবান নিয়ে আবার ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে থাকবে আরেক ভক্তের কথা এবং ভগবানের লীলা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – মহাপ্রভু এবং জগন্নাথদেব

ভক্তের ভগবান – মহাপ্রভু এবং জগন্নাথদেব

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

ভক্তি আন্দোলোনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন শ্রী চৈতণ্যদেব।১৪৮৬ সালের দোল পূর্ণিমায় বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার তৎকালীন পীঠস্থান নবদ্বীপে জন্মে ছিলেন গৌরাঙ্গ যিনি কৃষ্ণ সাধনায় নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে বিলিয়ে দিয়ে হয়ে উঠলেন মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য মহা প্রভুর জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিলো পুরীতে গিয়ে। প্রভু জগন্নাথের মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন পরম ব্রহ্মকে। সেই পরম ব্রহ্মতেই বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন তিনি এমনটা জনশ্রুতি আছে।আজ এই ভক্ত এবং তার সাথে তার আরাধ্য জগন্নাথ দেবের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করবো।

শ্রী চৈতণ্যদেব ভক্ত না স্বয়ং ভগবান এনিয়ে সংশয় আছে। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ বা ইস্কন তাকে অবতার হিসেবেই দেখে। তবে তিনি নিজে নিজেকে সাধারণ কৃষ্ণ ভক্ত বলে দাবী করতেন।

সন্ন্যাসী রূপে জীবনের শেষ চব্বিশ বছর তিনি অতিবাহিত করেন জগন্নাথধাম পুরীতে। ওড়িশার সূর্যবংশীয় হিন্দু সম্রাট গজপতি মহারাজা প্রতাপরুদ্র দেব চৈতন্য মহাপ্রভুকে কৃষ্ণের সাক্ষাৎ অবতার মনে করতেন।

একবার পুরীর সর্বভৌম পন্ডিত মহাপ্রভুর মাহাত্ম কে চ্যালেঞ্জ করে ছিলেন। মহাপ্রভু তার গৃহে অতিথি হয়ে এসেছিলেন এবং এক রাতে তিনি সার্বভৌম পন্ডিতকে শ্রী কৃষ্ণ রূপে দর্শন দিয়ে ছিলেন বলে শোনা যায়।

কিংবদন্তী আছে যে একবার রথের দিন রাজ কর্ম চারী দের তথা কথিত নিম্ন বর্ণের ভক্তদের সাথে দুর্ব্যবহার দেখে ক্ষুব্ধ জগন্নাথ দেব রথের গতি স্তব্ধ করে দেন তারপর রাজার দুর্গতি দেখে এগিয়ে আসেন মহাপ্রভু তার কথা মতো রথের দড়ি ধরার জন্য সব শ্রেণীর মানুষ এগিয়ে এলে রথের চাকা আবার গড়াতে শুরু করে।

শ্রী চৈতণ্য দেবের অন্তর্ধান ও রহস্যময় এবং জগন্নাথের সথে সম্পর্ক যুক্ত।চৈতণ্য মঙ্গল কাব্যে উল্লেখ আছে আষাঢ় মাসে, সপ্তমীতে, সপ্তমী তিথিতে, বিকেলে গুঞ্জাবাড়িতে শ্রীমান মহাপ্রভু শ্রী জগন্নাথের গর্ভগৃহে প্রবেশ করেন এবং তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে
অদৃশ্য হয়ে যান। এনিয়ে অবশ্য দ্বিমত বা কিছু বিতর্ক আছে।তবে কৃষ্ণ বা জগন্নাথ ভক্ত রূপে শ্রী চৈতণ্যদেব যে উচ্চতায় পৌঁছে ছিলেন তাতে ভক্ত এবং ভগবানের এমন মিলন অস্বাভাবিক কিছু নয় বলেও অনেকে মনে করেন।

আবার এমনই এক মহান ভক্ত এবং ভগবানের লীলা নিয়ে ফিরে আসবো পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – শ্রী কৃষ্ণ এবং বৃন্দাবনের সাধু

ভক্তের ভগবান – শ্রী কৃষ্ণ এবং বৃন্দাবনের সাধু

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজ ভক্ত এবং ভগবানের এই পর্বে আপনাদের ভগবান কৃষ্ণের এক অদ্ভুত লীলার কথা বলবো যা ঘটেছিলো বৃন্দাবনের বৈষ্ণব সাধুর সাথে।

বৃন্দাবনে এক জটাধারী বৈষ্ণব সাধু বাস করতেন একবার তার জটা পথে চলার সময় বৃক্ষের শাখা প্রশাখায় আটকে যায়। অনেক চেষ্টা করেও ঐ জটার প্যাঁচ কিছুতেই খুলতে পারলেন না এবং তখন তিনি আসন করে ওখানেই ধ্যানে বসে পড়লেন যারা সাহায্য করতে এগিয়ে এলো তাদের তিনি বললেন যিনি এই জটার প্যাঁচ লাগালো, তিনি এই জটারসপ্যঁচ খুলতে আসবে এবং যদি না আসে আমি এখানে আসন করে বসে থাকব।তাতে যদি প্রাণ ত্যাগ করতে হয় তো তাই হোক।

তিনদিন এমন করে মহাত্মাজী বসে রইলেন সেই স্থানে |তিন দিন পর এক ঘোর কৃষ্ণ বর্ণের সুন্দর রাখাল ছেলে এল। বালক বড় আদর করে বলল, বাবা তোমার তো জটা প্যাঁচ লেগে গেছে |আমি জটা খুলে দেব| আর যেই সেই বালক জটা খোলার জন্য এগিয়ে এল|সাধক বাঁধা দিয়ে বললেন যে জটা গাছের সাথে জড়াল সে এসে এই প্যাঁচ খুলবে। তা না হলে এখানে বসে গোবিন্দ নাম নিয়ে প্রাণ দিয়ে দেব। রাখাল ছেলে বলল- “আরে মহারাজজী যে এই কাজটা করল তার নাম তো বলুন, ওকে আমি খুঁজে ডেকে নিয়ে আসি।” সাধক বললেন যে সে আপনা আপনি এসে যাবে, ডাকতে হবে না। তুমি যাও|বালক তখন মৃদু হেসে রাখাল বেশ ত্যাগ করে বাঁকেবিহারী রূপে প্রকট হলেন এবং ভক্তর উদ্দেশ্যে বললেন মহাত্মাজী আমিই তো এই জটার প্যাঁচ লাগিয়েছি। আমি নিজেই এখন জটা খুলে দেবো এই বলে কৃষ্ণ স্বয়ং হাত বাড়ালেন মহাত্মাজী বললেন আমি তো নিত্য নিকুঞ্জবিহারীকৃষ্ণের পরম উপাসক|তুমি কি সে?কিন্তু তিনি তো শ্রীরাধারাণীকে বিনা এক মূহুর্ত থাকতে পারে না। কিন্তু তুমি বিহারীজী একা একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছ।না তুমি আমার আরাধ্য কৃষ্ণ হলে একা আসতেনা।

মহাত্মাজী এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে শ্যামের পাশে শ্রীজী রাধারানী বিরাজমান হলেন। শ্রীরাধারানী নিজের প্রিয়তম শ্যামের পাশে এসে মহাত্মাকে সাক্ষাৎ দর্শন দিলেন আর আরাধ্য ভগবানের দর্শন পেয়ে মহাত্মাজী আনন্দে বিভোর হয়ে গেলেন তার চোখ দিয়ে অশ্রুধারা পড়তে লাগল।

তিনি বুঝলেন এই সবই শ্রী কৃষ্ণের লীলা। আজ তার জীবন সার্থক হয়েছে। শ্রী কৃষ্ণ এবং রাধারানী তাকে দর্শন দিয়েছেন।এর পর রাধাকৃষ্ণ
তার জটার প্যঁচ খুলে তাকে মুক্তি দিলেন।

এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় ভগবান
তার ভক্তের সামান্য কষ্টও সহ্য করতে পারেন না এবং মন থেকে ডাকলে তিনি সাক্ষাৎ দর্শন দেন
এবং ভক্তকে উদ্ধার করেন।

ভক্ত এবং ভগবানের এমনই লীলা নিয়ে
আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – সাক্ষী গোপালের কথা

ভক্তের ভগবান – সাক্ষী গোপালের কথা

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

ভক্তের সাথে ভগবানের লীলা নতুন কিছু নয়। তবে একবার ভগবান শ্রী কৃষ্ণ তার এক গরীব ব্রাহ্মণ ভক্তের সাথে এমন এক লীলা করে ছিলেন যা আজও প্রবাদ রূপে মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে আছে।

ভারতের ওড়িশার কটক শহরে রয়েছে সাক্ষী গোপালের একটি মন্দির।শোনা যায় এই মন্দিরের বিগ্রহটি আগে ছিল বৃন্দবনের এক মন্দিরে। সেখান থেকে স্বয়ং ওড়িশার এই স্থানে এসেছিল ওই মূর্তি। আর এই মূর্তির নিজে পায়ে আসার ঘটনাই ভগবানের লীলা ।

একবার দক্ষিণ ভারতের এক ব্রাহ্মণ কৃষ্ণ ভক্ত। সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব নিজের ছেলের হাতে তুলে দিয়ে তীর্থদর্শনে বেরিয়ে পড়েন। মথুরায় তার সঙ্গে একজন যুবক ব্রাহ্মণের আলাপ হয় একসঙ্গে মিলেই তারা ঘুরে দেখতে থাকেন মথুরা এবং বৃন্দাবনের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। হঠাৎ করেই ব্রাহ্মণের মনে হয় এমন ছেলে তাঁর কন্যার জন্য একেবারে উপযুক্ত পাত্র। তৎক্ষণাৎ নিজের মনের কথা সেই যুবককে বলেন ব্রাহ্মণ। কিন্তু ব্রাহ্মণত্বের বিচারে সেই যুবক কুলীন ছিল না, তাই প্রাথমিক ভাবে এমন প্রস্তাবে অসম্মতি জানায় ওই যুবক। তার যুক্তি ছিল, এই বিয়ে ব্রাহ্মণ সমাজ কিছুতেই মেনে নেবে না। তখন ওই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ যুবককে আশ্বস্ত করেন যে এমন কোনও পরিস্থিতি তিনি তৈরি হতে দেবেন না। তখন তাঁরা দুজনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন বৃন্দাবনের এক গোপাল মন্দিরে। ব্রাহ্মণ সেই মন্দিরের দেবতাকে সাক্ষী করে শপথ করেন যে তিনি তাঁর কন্যার বিবাহ ওই যুবকের সঙ্গেই দেবেন।

দুজনে তীর্থযাত্রা শেষে দুজনে ঘরে ফিরে যায়।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় সেই পাত্রের পরিচয় সকলে জানার পর। ব্রাহ্মণের নিজের পরিবার সহ সমাজের প্রত্যেকেই এই বিয়ের বিরুদ্ধে একেবারে বেঁকে বসেন। ফলত বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ পড়েন এক ভয়ানক ধর্মসঙ্কটে। একদিকে তাঁর প্রতিজ্ঞাভঙ্গের ভয়, অন্যদিকে সমাজচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা। এমন সময় হঠাৎই সেখানে হাজির হন সেই যুবক। কিন্তু তাঁকে চরম অপমান করে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেন গ্রামবাসী ও ওই বৃদ্ধের আত্মীয়রা। অপমানিত যুবক গ্রামবাসীদের উদ্দেশে ঘোষণা করেন, যে মন্দিরে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেই মন্দিরের বিগ্রহকেই তিনি সাক্ষী হিসেবে সকলের সামনে নিয়ে আসবেন।তিনি নিজে দেবেন সাক্ষী|মনের দুঃখে যুবক হাজির হন বৃন্দাবনের সেই গোপালের মন্দিরে। দেবতাকে জানান তাঁর সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের কথা। সেই ডাকে সাড়াও দেন স্বয়ং গোপাল। তিনি রাজি হন সাক্ষী দিতে এবং যুবকের কথামতোই পাথরের বিগ্রহ রূপে স্বশরীরে তিনি সাক্ষী দিতে রওনা হন দক্ষিণ ভারতের ওই গ্রামের উদ্দেশে।গোপালের একটি শর্ত ছিলো|যাওয়ার পথে যুবক যেন পিছন ফিরে মূর্তির দিকে না দেখে। পিছনে তাকালেই তিনি থেমে যাবেন ।যুবক শর্ত মেনেই নিতেই শুরু হয় যাত্রা। বেশ খানিকটা পথ যাওয়ার পর ওড়িশার কাছাকাছি একটি গ্রামে এসে যুবকের মনে হয় গোপালের বিগ্রহ আর সঙ্গে আসছেন না। সন্দেহের বশেই একটিবারের জন্য পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখেন|ব্যাস শর্ত অনুসারে গোপাল সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়েন।

ভগবানের উপর যতক্ষণ ভক্তের বিশ্বাস ছিলো ভগবান তার সাথে ছিলো|বিশ্বাস ভঙ্গ হতেই তিনি আবার পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলেন এবং তার গতি স্তব্ধ হলো|সর্বত্র রটে যায় ভগবানের এই লীলার কথা দলে দলে মানুষ ওড়িশার ওই গ্রামে জমায়েত হতে থাকেন। খবর পৌঁছায় সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের বাড়িতেও। তিনিও সদলবলে সেই গ্রামে উপস্থিত হন।সবাই নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং ব্রাহ্মণকন্যার সঙ্গে সেই যুবকের বিয়ের আয়োজন করেন|

যে স্থানে গোপালের গতি স্তব্ধ হয়ে ছিলো সেই স্থানে একটি মন্দির বানিয়ে দেওয়া হয়। মন্দিরে স্থাপিত সেই গোপালের বিগ্রহ পরিচিত হয় ‘সাক্ষী গোপাল’ নামে|

ফিরে আসবো ভগবানের আরো এক লীলা নিয়ে। থাকবে আরো এক ভক্তের কথা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।