Home Blog

লৌকিক দেবদেবী – ক্ষেত্র পাল

লৌকিক দেবদেবী – ক্ষেত্র পাল

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার আরো এক জাগ্রত এবং প্রসিদ্ধ লৌকিক দেবতা হলেন ক্ষেত্র পাল।ক্ষেত্রপাল মূলত ভূমিরক্ষক রূপে পূজিত হন আবার কোথাও কোথাও তিনি কৃষির দেবতা। ক্ষেত্রপালের কৃপায় কৃষকদের ভূমি রক্ষা পায় এবং ফসল ভালো হয় বলেই বিশ্বাস।কিছু ক্ষেত্রে তাকে চারটি দিকের দেবতা অর্থাৎ উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম দিকের দেবতা বলা হয়। শুধু হিন্দু ধর্ম নয় বৌদ্ধ ধর্মেও ক্ষেত্র পালের উল্লেখ আছে।

 

লৌকিক দেবতা হলেও কিছু পুরান এবং তন্ত্র শাস্ত্রে ক্ষেত্র পালের উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘প্রয়োগসার ’ নামক তন্ত্রগ্রন্থে ক্ষেত্রপালের নাম ‘ঘণ্টাদ ’ সেখানে ক্ষেত্র পালের রূপ, পূজো পদ্ধতি এবং মন্ত্রের উল্লেখ আছে।আবার তন্ত্রশাস্ত্রে শিবের একটি নাম ক্ষেত্রপাল বা ক্ষেত্রেশ এবং তিনি কৃষি কাজে যুক্ত থাকেন তাই ক্ষেত্রপালকে শিবের লৌকিক রূপ হিসেবেও দেখা হয়।

 

মৎস পুরান অনুসারে ক্ষেত্রপাল দিগম্বর , বিশালকৃতি, জটাধারী এবং সর্বদা

কুকুর ও শৃগাল বেষ্টিত হয়ে থাকেন।

বিভিন্ন শাস্ত্রে ক্ষেত্রপালের মোট উনোপঞ্চাশ

প্রকার রূপ বর্ণনা করা হয়েছে।প্রতিটি রূপের আলাদা আলাদা নাম আছে।

 

বাংলায় ক্ষেত্রপালের পূজো বহু প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে তবে তাঁর মন্দিরের সংখ্যা খুবই কম।

বর্ধমানের পানাগড়ের অধীনস্থ ক্ষেত্রপাল মন্দিরের পুজো আনুমানিক পাঁচশো বছরের পুরনো৷

ক্ষেত্রপাল এখানে প্রস্তরখণ্ড রূপে বিরাজ করছেন প্রথমে ক্ষেত্রপাল ছিল খোলা আকাশের নীচে৷ পরে স্থানীয়দের উদ্যোগে এবং বর্ধমান রাজপরিবারের

চেষ্টায় ক্ষেত্রপাল মন্দির নির্মাণ হয়।

কথিত আছে এই মন্দিরে ঘন্টা বাঁধলে সব মনস্কামনা পূর্ণ হয় তাই ক্ষেত্র পালের আশীর্বাদ পাবার আশায় ভক্তগণ মন্দিরে ঘন্টা অর্পণ করেন। তাছাড়া নিত্য পূজো উপলক্ষে প্রায় রোজই বহু ভক্তের আগমন হয়।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে ধারাবাহিক লৌকিক দেব দেবী প্রসঙ্গে লেখা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – দেবী ওলাই চন্ডী

লৌকিক দেব দেবী – দেবী ওলাই চন্ডী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজকের পর্বে লিখবো গ্রাম বাংলায় পূজিতা
দেবী ওলাই চন্ডীকে নিয়ে।।ওলাইন্ডী হলেন দেবী চণ্ডীরই লৌকিক রূপভেদ।আবার বিবি মাতা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলাম সাত বোন বা সপ্ত মাতার এক মাতা ওলা বিবি।হিন্দুর ঘরের ওলাইচন্ডীই মুসলমানের ঘরে গিয়ে হলেন ওলাবিবি।

এক সময়ে বাংলায় ওলাওঠা বা কলেরা রোগে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেতো। সেই সময়ে রোগ ভোগ থেকে বাঁচতে অসহায় মানুষ আশ্রয় নিতো ওলা বিবি বা ওলাই চন্ডীর থানে। তিনি কলেরা বা আঞ্চলিক ভাষায় ওলাওঠার অধিষ্ঠাত্রী দেবী ।

ওলাইচণ্ডী বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে তাঁর পূজা প্রচলিত।কোথাও ওলাইচণ্ডী শস্যদাত্রী দেবী আবার কোথাও প্রজননের দেবী বা সন্তানপ্রদায়িনী। তবে দক্ষিণ বঙ্গের বেশি ভাগ স্থানেই ইনি মহামারী প্রতিরোধক দেবী এবং তাকে ডাবের জলে স্নান করিয়ে তুষ্ট রাখতে হয়। তিনি রুষ্ট হলে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যায়।তাই কিছুটা ভয় এবং কিছুটা ভক্তিতে আজও অসংখ্য মানুষ তাঁর পূজো করেন।

বাংলার জনপ্রিয় ওলাই চন্ডীর মন্দির গুলির মধ্যে একটি রয়েছে ব্যান্ডেলের কাছে।মন্দিরটি বহু প্রাচীন।জনশ্রুতি অনুযায়ী একবার স্থানীয় বাগদী পরিবারের এক বৃদ্ধ স্বপ্ন দেখেন যে দেবী তাঁকে এক জলাশয় থেকে উদ্ধার করে একটি নিদ্দিষ্ট অসত্থ গাছের নিচে প্রতিষ্ঠা করতে বলছেন।স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী দেবীকে উদ্ধার করে মন্দির নির্মাণ করে প্রতিষ্ঠা করে পূজো শুরু হয়।

বাংলায় এমন বহু প্রাচীন ওলাই চন্ডীর মন্দির আছে। আসলে পৌরাণিক দেবী চন্ডী একটি নিদ্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষের কাছে সীমাবদ্ধ ছিলেন তবে তাঁর লৌকিক রূপ ওলাই চন্ডী জাতি, ধর্ম বর্ন এবং শ্রেণী নির্বিশেষে সবার আপন সবার বেশি কাছের।তার জনপ্রিয়তা তাই সীমাহীন।

ফিরে আসবো লৌকিক দেব দেবীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে আগামী দিনে। ধারাবাহিক ভাবে চলবে এই লেখনী। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – বনবিবি 

লৌকিক দেব দেবী – বনবিবি

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলায় পূজিত লৌকিক দেব দেবী দের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় হলেন বন বিবি।

এই বনবিবি মূলত দক্ষিণ বঙ্গের সুন্দর বনের অধিষ্টাত্রী দেবী, মূলত দক্ষিণ রায়ের সাথেই তার নাম উচ্চারিত হয়ে আসছে যুগ যুগ থেকে।বিপদ সংকুল সুন্দরবনের মানুষ যেকোনো বিপদ থেকে বাঁচতে বনবিবির স্মরণ নেন।

 

লৌকিক কিংবদন্তী অনুসারে বনবিবি মক্কার এক সুফি ফকিরের কন্যা। ফকিরের দুই বউ। প্রথম বউয়ের দেওয়া শর্তে, ঘটনাক্রমে দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভজ দুই ছেলেমেয়েকে ফকির রেখে আসতে বাধ্য হন গহন বনে । পরে অবশ্য ছেলেটিকে ঘরে নিয়ে যান ফকির কিন্তু একা মেয়েটি বড় হয় জঙ্গলে পশু পাখি দের সাথে এবং ক্রমে তিনিই হয়ে ওঠেন বনবিবি|এই বনবিবি যথার্থ অর্থে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অদ্ভুত নিদর্শন যাকে হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ ভক্তি করেন এবং পূজো করেন।

 

শুধু সুন্দরবন নয় খাস কলকাতাতেই রয়েছে এক বন বিবির মন্দির। এক কালে দক্ষিণের সাগর-ছোঁয়া জল-জঙ্গল বিস্তৃত ছিল আদিগঙ্গার পাড় অবধি যা বয়ে যেতো দক্ষিণ কলকাতার গা ঘেঁষে|খাঁড়ি, বাদাবন আর মউলি-মেছুয়ার জঙ্গলে দাপানো ‘বড় মিঞা’ বা ‘দক্ষিণ রায়’-এর রাজত্ব গড়িয়েছিল এখানেও। সেই দক্ষিণ রায়ের তর্জন-গর্জন থেকে বাঁচাবেন কে এক বনবিবি ছাড়া!তাই এই অঞ্চলেও গড়ে উঠেছিল বনবিবির মন্দির। আজ গ্রাম আর নেই। অরণ্য সংকুচিত।

এইসব অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবর্তন হয়েছে, আধুনিক হয়েছে মানুষের জীবনযাত্রা|কিন্তু এখনো সেই প্রাচীন লৌকিক পরম্পরাকে ধরে রেখেছে এই সুপ্রাচীন বন বিবির মন্দির।

 

আজও লৌকিক দেবী বন বিবি পূজিতা হন জাতি ধর্ম বর্ন নিবিশেষে তার অগণিত ভক্তদের দ্বারা।

 

আপাতত এই পর্বে বন বিবিকে নিয়ে এইটুকুই|আগামী পর্বে অন্য এক লৌকিক দেবীকে নিয়ে লিখবো। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – মাসান ঠাকুর

লৌকিক দেব দেবী – মাসান ঠাকুর

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আগের কয়েকটি পর্বে আপনাদের দক্ষিণ বঙ্গের কিছু বিখ্যাত লৌকিক দেব দেবীর কথা লিখেছি। আজ লিখবো উত্তর বঙ্গের প্রসিদ্ধ মাসান
ঠাকুরের কথা।

মাশান ঠাকুর অনেকের কাছে দেবী কালীর সন্তান আবার অনেকে মনে করেন তিনি ধর্ম ঠাকুরের মানস পুত্র।কোচবিহারের রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে মাশান ঠাকুর অত্যন্ত জাগ্রত এবং জনপ্রিয়।

কোথাও কোথাও প্রেত দেবতা বা অপদেবতা জ্ঞানেও পুজো করা হয় মাশান ঠাকুরকে মূলত ভাদ্রমাসে তার পূজো হয় তাছাড়াও সারা বছর এমনকী দীপান্বিতা অমাবস্যাতেও কোথাও কোথাও পুজো পান তিনিও।তার ভক্তরা মনে করেন যাঁকে তুষ্ট না রাখলে সর্বনাশ এবং তিনি তুষ্ট থাকলে সব বিপদ দুর হবে।

মনে করা হয় ভাদ্রমাসের শনিবারে মাসান ঠাকুরের জন্ম। জলে জন্ম তার জন্ম এবং এবং জন্মের পর মাসানের নাড়িকুণ্ডলী জলে ফেলে দেয়। সেখান থেকে কলমী শাকের জন্ম হয়। মাসান বাবাকে সম্মান জানাতে ভক্তরা ভাদ্র মাসে কলমীশাক খায় না।

মাসান দেবতা সর্ব ক্ষেত্রেই বিকট দর্শন। কোথাও বুকেই চোখ,মুখ, বিরাট জিহ্বা এবং ভয়াল চোখ।রয়েছে ভুঁড়ি এবং ক্রুর দৃষ্টি। কোথাও মাছের পিঠে আসীন। কোথাও শূকরপৃষ্ঠে।

মোট ১৮ প্রকার মাসান পুজো পান এই বঙ্গে। তাঁদের রয়েছে আলাদা আলাদা কাজ এবং বাসস্থান। তারা হলেন যথাক্রমে –

১) বাড়ীকা মাসান

২) তিসিলা মাসান

৩) ঘাটিয়া মাসান

৪) চুঁচিয়া মাসান

৫) চালান মাসান

৬) বহিতা মাসান

৭) কাল মাসান

৮) কুহুলীয়া মাসান

৯) নাঙ্গা মাসান

১০) বিষুয়া মাসান

১১) ওবুয়া মাসান

১২) শুকনা মাসান

১৩) ভুলা মাসান

১৪) ড্যামশা মাসান

১৫) অঙ্গিয়া মাসান

১৬) ছলনার মাসান

১৭) ন্যাড়া মাসান

১৮) কলি মাশান

মাসান ঠাকুরের ভক্তরা তাকে ভক্তিও করেন।
ভয় ও পান। তাই নিষ্ঠা সহকারে তার পূজো হয়ে
আসছে যুগ যুগ ধরে এই বঙ্গে।

ফিরে আসবো পরবর্তী পর্ব নিয়ে।
ধারাবাহিক ভাবে এই লেখনী চলতে।
থাকবে।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – শীতলা

লৌকিক দেব দেবী – শীতলা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

গ্রাম বাংলার এক অতি প্রসিদ্ধা এবং জাগ্রতা দেবী হলেন শীতলা দেবী।কিছু পুরানে তার উল্লেখ থাকলেও তাকে লৌকিক দেবী রূপেই প্রাধান্য এবং মান্যতা দেয়া হয়।

 

দেবী বসন্ত রোগের জ্বালা নিবারণ করেন এবং

শীতলতা প্রদান করেন তাই শীতলা নামে পরিচিত হয়েছেন। বসন্ত ও চর্মরোগ থেকে পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে শীতলা পূজা করা হয়।বিশেষ করে যখন চিকিৎসা ব্যাবস্থা উন্নত ছিলোনা তখন বহু মানুষ মারা যেতেন বসন্ত রোগে সেই সময় গ্রামে গ্রামে শীতলা দেবীর আরাধনা করা হতো। গ্রাম বাংলারা মানুষের অন্যতম ভরসা এই দেবী।

 

দেবী শীতলাকে দয়াময়ী নামেও অভিহিত করা হয়। কূলাকৃতির মুকুট এবং গর্দভের উপর উপবিষ্ট। দেবী শ্বেতবর্ণা।হাতে রয়েছে পূর্ণকুম্ভ পবিত্র জল অমৃতময় শীতল জল ছিটিয়ে রোগ, তাপ ও

শোক দূর করেন দেবী আবার কোথাও তিনি নিমের পাতা বহন করেন কারন নিম রোগ প্রতিরোধকারী উদ্ভিদ।আয়ুর্বেদিক গুনে ভরপুর।

 

সাধারণত শ্রাবণ মাসের শুক্লা সপ্তমী তিথিতে

দেবী শীতলার পূজা করা হয়।গ্রীষ্মের মরসুমি ফলই দেবীর প্রধান ভোগ হিসেবে

নিবেদন করা হয়।

 

পূর্ব মেদিনীপুরের নাচিন্দা গ্রামে রয়েছে এক জাগ্রত শীতলা মাতার মন্দির যেখানে

দেবী শীতলাকে নিয়ে প্রচলিত আছে

বহু অলৌকিক জনশ্রুতি।

 

শোনা যায় যেখানে শীতলা মন্দির, তার কাছাকাছিই থাকতেন এক অসুস্থ বৃদ্ধা।

একদিন রাতে ওই বৃদ্ধাকে স্বপ্নে দেখা দেন দেবী শীতলা এবং তিনি বলেন, ‘তুই চুপচাপ শুয়ে থাকিস না। তোর বাড়ির সামনের পুকুরে রোজ স্নান করবি।স্নান শেষে একট গাছের নীচে ঘট স্থাপন করবি।আমার পুজো করবি। আমার পুজো করলে তোর আর কোনো দুঃখ থাকবেনা। আমার পুজো করলে রোগগ্রস্ত মানুষ মুক্তি পাবে। সন্তানহীনা সন্তান লাভ করবে।

 

স্বপ্ন দেখার পর বৃদ্ধারা ঘুম ভেঙে যায়।সেদিন ছিল অক্ষয় তৃতীয়া।তিনি স্বপ্নে দেখানো দেবীর নির্দেশমতোই পুকুর থেকে স্নান সারেন। তারপর একটি গাছের নীচে জলভর্তি ঘট স্থাপন করেন।দেবীর পুজো করেন এবং সুস্থ হয়ে ওঠেন।সেই থেকে প্রতিবছর অক্ষয় তৃতীয়ায় বিশেষ পুজো হয় এই মন্দিরে। পুজো উপলক্ষে মেলাও বসে।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। থাকবে লৌকিক দেব দেবী নিয়ে আরো অনক তথ্য।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – মনসা

লৌকিক দেব দেবী – মনসা

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

ধারাবাহিক ভাবে লিখছি বাংলার লৌকিক দেব দেবীদের নিয়ে।আজকের পর্ব
দেবী মনসা কে নিয়ে।

মনসা বাংলার লৌকিক দেবীদের মধ্যে সর্বাধিক জাগ্রতা।শ্রাবন মাসে বর্ষার প্রকোপে সাপের বিচরণ বেড়ে যায়। বহু মানুষের মৃত্যু হয় সাপের কামড়ে।তাই সর্পদংশন প্রতিরোধ ও সাপের বিষের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে তাঁর পূজা করা হয়।এক্ষেত্রে মনসা মূলত সাপের দেবী।

আবার বহু স্থানে ধন-সম্পদ এবং সমৃদ্ধির জন্য মা মনসার পূজা করা হয়। জনশ্রুতি, লোককথা বা কিংবদন্তী অনুসারে মনসা মূলত একজন আদিবাসী দেবতা কারণ শুরুতে নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের মধ্যে তাঁর পূজা প্রচলিত ছিল। পরবর্তীকালে উচ্চবর্ণীয় হিন্দুসমাজেও মনসা পূজা প্রচলন লাভ করে। বর্তমানে মনসা আর আদিবাসী দেবতা নন বরং তিনি একজন সনাতনী দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন।

মনসা মঙ্গল কাব্য অনুসারে শিব ভক্ত চাঁদ সওদাগরের মাধ্যমে মর্তে দেবী মনসার পুজো প্রচলন হয়|মঙ্গলকাব্যে তাঁকে শিবের কন্যা বলা হয়েছে আবার পুরাণ অনুসারে তিনি ঋষি কশ্যপের কন্যা। একদা সর্প ও সরীসৃপগণ পৃথিবীতে কলহ শুরু করলে কশ্যপ তাঁর মন থেকে মনসার জন্ম দেন।

বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত বিবরণ অনুযায়ী মনসা সর্বাঙ্গে সর্পাভরণভূষিতা এবং পদ্ম অথবা নাগপৃষ্ঠে আসীনা। তাঁর মাথার উপর সপ্তফণাযুক্ত নাগছত্র দেখা যায়। কখনো কখনো তাঁর কোলে একটি শিশুকেও দেখা যায়। মনে করা হয় এটি তাঁর পুত্র আস্তিক। মনসার একটি চোখে দৃষ্টি নেই কারণ তাঁর একটি চোখ সৎ-মা চণ্ডী কর্তৃক দগ্ধ হয়েছিল|

ফিরে আসবো পরবর্তী লৌকিক দেবী বা
দেবতাকে নিয়ে আগামী পর্বে।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – দক্ষিণরায়

লৌকিক দেব দেবী – দক্ষিণরায়

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলার অন্যতম প্রসিদ্ধ, জনপ্রিয় এবং রহস্যময় লৌকিক দেবতা হলেন দক্ষিণ রায়।মূলত দক্ষিণ বঙ্গ বিশেষ করে সুন্দরবন এবং বঙ্গপ সাগর লাগোয়া দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলাতেই তার পূজো বেশি হয়।বাঘসহ সুন্দরবনের সমস্ত পশু ও জঙ্গলের নিয়ন্ত্রক এবং রক্ষা কর্তা তিনি।

প্রচলিত বিশ্বাস এবং স্থানীয় লোককথাতেই তার অস্তিত্ব। অনেকে মনে করেন এক সময় তিঁনি রক্ত-মাংসের দেহধারী মানুষই ছিলেন এবং পরবর্তীকালে মানুষের আস্থা এবং শ্রদ্ধা অর্জন করে লৌকিক দেবতায় পরিণত হয়েছেন।বর্তমানে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে গোটা সুন্দরবন অঞ্চলে তিনি পুজো পান।

দক্ষিণ রায়ের একটি কল্পিত রূপ অনুসারে তার সারা গায়ে বাঘের মতো ডোরাকাটা দাগ, বিরাট পাকানো গোঁফ, মুখের দু’দিক থেকে ঝরছে লালা, আর লম্বা একটি লেজ। সর্বদা তীর-ধনুক, ঢাল-তলোয়ার-বল্লম নিয়ে যুদ্ধসাজে সজ্জিত।

শোনা যায় এক সময় চোরা শিকারি, অত্যাচারী জমিদার এবং জলদস্যু দের হাত থেকে তিনি সুন্দরবনের মানুষ, পশু পাখি এবং প্রকৃতিকে রক্ষা করতেন।তার বীরত্ব এবং দয়ালু স্বভাবের জন্য তিনি অরণ্যের প্রতিটি প্রাণী এবং অরণ্যের উপর নির্ভরশীল মানুষের কাছে ভরসা এবং শ্রদ্ধা পেয়ে থাকেন।

বর্তমানে বারুইপুর এর কাছে ধপধপি নামক স্থানে রয়েছে বাবা দক্ষিণ রায়ের বিশাল এবং প্রাচীন মন্দির। মন্দিরের নাম ও দক্ষিণ রায়ের নামে। দক্ষিনেশ্বর মন্দির।মন্দিরে নিত্য পুজো হয়। শনি, মঙ্গলবার বিশেষ পুজো হয়। প্রতি বছর ১লা মাঘ দক্ষিণ রায়ের জন্মদিনে বিশেষ পুজো হয়।এখানে দক্ষিণ রায়ের মূর্তিটি এক সুপুরুষ দেবতার। সাদা গায়ের রং, মোটা কালো গোঁফ, বড়ো বড়ো চোখ, পরনে জামা ও ধুতি। পায়ে বুট। মাথায় মুকুট। কোলে রয়েছে একটি আগ্নেয়াস্ত্র।

স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন এক সময়ে সুন্দরবন এই অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। তখন থেকেই এই অঞ্চলের রক্ষাকর্তা রূপে বিরাজমান রয়েছেন বাবা দক্ষিণরায়।

আজও সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অনেক অঞ্চলে ছোটো বড়, কাঁচা পাকা অনেক দক্ষিণ রায়ের মন্দিরের অস্তিত্ব রয়েছে। আজও কোনো বৈদিক বা পৌরাণিক দেবদেবী নয় বরং জলে জঙ্গলে বসবাসকারী মানুষের কাছে দক্ষিণরায়ই প্রধান দেবতা।

ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে অন্য
কোনো লৌকিক দেবততা বা দেবীর
কথা নিয়ে।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – বিবি মাতা

লৌকিক দেব দেবী – বিবি মাতা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার বিভিন্ন স্থানে একাধিক লৌকিক দেব দেবীর পূজো হয়।এমনই এক দেবী বিবি মাতা।অদ্ভুত ভাবে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়

এই দেবীর পুজোয় অংশগ্রহন করেন।

 

বিবিমাতার উৎপত্তি সম্পর্কে নানা মতবাদ আছে|

দক্ষিণ বঙ্গে প্রচলিত একটি কিংবদন্তী অনুসারে কোন এক হিন্দু জমিদারের সাত কন্যা সন্তান ছিলো|একদিন তাদের সঙ্গে দেখা করেন এক পীরবাবা।পীরবাবার ইচ্ছেতে সাত কন্যার বিবাহ হয় এক ধর্মপ্রাণ মুসলমান জমিদারেরে পুত্রের সঙ্গে এবং পরবর্তীতে ক্রমে এই নারীদের মধ্যে দৈবী শক্তির বিকাশ ঘটে।তারা দেবী মর্যাদা পান এবং লোকসমাজে সাতমা বলে পরিচিত হন।এই সাতবোন বা সপ্ত মাতারা যেহেতু মুসলিম পরিবারে বিবাহ হয়েছিলো তাই বিবি শব্দটি জুড়ে যায় নামের সাথে|

 

সাত বোন বা সপ্ত মাতার নাম যথাক্রমে ওলাবিবি, ঝোলাবিবি, ঝড়িবিবি, চাঁদবিবি, বহেড়াবিবি, মড়িবিবি ও আসানবিবি।সাতটি বিবি সাতটি রোগের নিরাময়কারী দেবী হিসাবে পুজিত হন।যার মধ্যে কলেরা বা ওলাওটা রোগের দেবী হিসাবে ওলাবিবি বা ওলাইচন্ডী দেবী পরিচিত।।

বিবিমাতা হলেন ওলাবিবি বা ওলাইচন্ডী।

তিঁনিই বাকিদের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয়।

 

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনারা বহু স্থানে তার মন্দির রয়েছে যেখানে নিষ্ঠা সহকারে পুজো হয় এবং বছরের নিদ্দিষ্ট কিছু সময়ে উৎসব ও মেলার আয়োজন হয় যাদের মধ্যে বারুইপুরের এবং মগরাহাট অঞ্চলের বিবি মাতা মন্দিরগুলি বিশেষ ভাবে প্রসিদ্ধ।পুরান বা অন্য কোনো প্রাচীন প্রামাণ্য ধর্মগ্রন্থে বা শাস্ত্রে উল্লেখিত না থাকলেও অসংখ্য মানুষের আস্থা ও ভরসা রয়েছে এই বিবিমাতার প্রতি।

 

আরো অনেক লৌকিক দেব দেবীর কথা জানানোর আছে। ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকবে লৌকিক দেব দেবী নিয়ে লেখা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেবদেবী – পাঁচু ঠাকুর 

লৌকিক দেবদেবী – পাঁচু ঠাকুর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরান বা বেদের বাইরেও অনেক লৌকিক দেব দেবীর অস্তিত্ব আছে। এমনই কিছু লৌকিক দেবদেবী নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে এই সপ্তাহে লিখবো। আজ শুরু করবো বাবা পঞ্চানন্দ বা পাঁচু ঠাকুরকে দিয়ে।

 

পঞ্চানন বা পাঁচু ঠাকুর বাংলার এক বিখ্যাত লৌকিক দেবতা। লোকবিশ্বাসে ইনি মহাদেব শিবের এক লৌকিক রূপ আবার অন্যমতে,

ইনি শিবের মানস পুত্র। মূলত গ্রামরক্ষক রূপে পঞ্চানন পূজিত শস্যদেবতা হিসাবেও তার পূজার প্রচলন আছে। আবার কোথাও তিনি

শিশুদের রক্ষাকর্তা।

 

মহাদেব শিবের সঙ্গে পঞ্চানন ঠাকুরের দেহাকৃতি ও বেশভূষার সাদৃশ্য আছে।পঞ্চাননের গাত্রবর্ণ লাল এবং চোখমুখের ভঙ্গি রুদ্ররূপী; বেশ বড় গোলাকার ও রক্তাভ তিনটি চোখ ক্রোধোদ্দীপ্ত। প্রশস্ত ও কালো টিকালো নাক, দাড়ি নেই, গোঁফ কান অবধি বিস্তৃত। মাথায় পিঙ্গলবর্ণের জটা চূড়া করে বাঁধা এবং তার মধ্যে জটা কিছু বুকে পিঠে ছড়ানো। কানে ধুতুরা ফুল বিরাজমান।গলায় ও হাতে বেশ বড় পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষমালা থাকে। হাতে ত্রিশূল ও ডমরু; পায়ে খড়ম এবং মাথায় বা দেহের উপর সাপ বিদ্যমান। পাশে থাকে পঞ্চরংয়ের বা পাঁচমুখো গাঁজার কলকে।উর্ধাঙ্গ অনাবৃত নিম্নাঙ্গ বাঘছাল পরিহিত।

 

দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জ এ প্রাচীন এক মন্দিরে পঞ্চানন ঠাকুরের মূর্তি সাড়ে তিনশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পূজিত হয়ে আসছেন।

বহুকাল আগে যখন টালিগঞ্জের আদিগঙ্গার পাড়ে জন বসতি সেই ভাবে গড়ে ওঠেনি সেখানে বাস করতে বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য্য নামে এক পূজারী ব্রাহ্মণ। এক রাতে বৈদ্যনাথ স্বপ্ন দেখলেন, পঞ্চানন ঠাকুর এসেছেন। বর্তমানে যে মূর্তি আমরা দেখি, সেই রূপে। ঠাকুর বলছেন, এই গঙ্গার ঘাটে আমি তোর অপেক্ষায় আছি। জলের মধ্য থেকে উদ্ধার করে আমাকে নিয়ে চল দ্রুত।

পুজো করার আদেশ ও পেলেন।পরের রাতে আবার একই স্বপ্ন ভোর হতে তখনো খানিকটা সময় বাকি, কিন্তু অপেক্ষা করলেন না তিনি। সেই রাতেই গ্রামের কয়েকজন ভক্তকে ডেকে নিয়ে, সস্ত্রীক চললেন গঙ্গার ঘাটে।ঘাটে এসে তিনি দেখলেন তিনটে প্রায় চারকোণা আকৃতির পাথর রাখা আছে জলের ধারে, আর তিনটিই রক্তাভ। তিনটে পাথরকে এক বিরাট সাপ জড়িয়ে আছে। সেই পাথর তুলে এনে তিনি স্থাপন করলেন নিজের মন্দিরে। পরবর্তীতে স্বপ্নে দেখা রুপ মিলিয়ে তৈরি হলো মূর্তি শুরু হলো পুজো।এই রকম জনশ্রুতি আর ভক্তির সাথে মিলেমিশে রয়েছে এই পঞ্চানন ঠাকুরের মন্দির ও তার অস্তিত্ব।

 

চলতে থাকবে লৌকিক দেবদেবীদের নিয়ে ধারাবাহিক লেখা। ফিরে আসবো পরের পর্বে।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – বোম্বেটে কালী

কালী কথা – বোম্বেটে কালী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

নদীয়া জেলা সাধারণত মহাপ্রভুর ভক্তি আনন্দ বা বৈষ্ণব দের জন্য বিখ্যাত হলেও এই জেলার কিছু কালী পুজো বেশ প্রসিদ্ধ তার মধ্যে অন্যতম শান্তিপুরের বোম্বেটে কালী।আজকের কালী কথায় বোম্বেটে কালী নিয়ে লিখবো।

“বোম্বেটে” শব্দটি পর্তুগিজ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ বোমাবাজ বা জলদস্যু। এটি মূলত ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ে যুক্ত একদল স্বাধীনতাসংগ্রামীকে বোঝাতে ব্যবহৃত হতো, এবং পরে জলদস্যুদেরও বোঝাতো। অনেকটা আমাদের দেশের বর্গীদের ন্যায়।

প্রথমে ব্রিটিশ আমলে এই দেবীর পুজোর প্রচলন করেছিলেন একদল সসস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রামী, যারা ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং বিদেশি শাসকদের কাছে তারা ছিলেন ভয়ঙ্কর অপরাধী। তাই তাদের প্রচলিত কালী পুজো হয়ে ওঠে বোম্বেটেদের কালী পুজো এবং দেবী হয়ে যান বোম্বেটে কালী।

ভিন্ন একটি মত অনুসারে জলদস্যুদের বলা হতো বোম্বেটে। একদল ডাকাত এই পুজোর প্রচলন করে ছিলো এবং তারা প্রধানত জল পথে ডাকাতি করতো। তাই তাদের কালীকে বোম্বেটে কালী বলা হয়।

এই কালীর মূর্তিতে দেবী শিবের বুকের ওপর বাম পা রাখেন, যা তাকে অন্যান্য কালীমূর্তি থেকে আলাদা করে। দেবীকে শাস্ত্র মতে বামা কালী রূপে পুজো করা হয়।

শান্তি পুর সহ গোটা নদীয়া জেলায় দেবীকে অত্যন্ত জাগ্রত বলে মানা হয় এবং লক্ষ লক্ষ ভক্ত এই দেবীর আরাধনা করেন।নিজেদের মনোস্কামনা জানান। দেবী কাউকে নিরাশ করেননা বলেই বিশ্বাস।শোনা যায় এক কালে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগিশের পরিবার এই কালীর পূজো করতেন।

আবার কালী কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে ফিরে আসবো আগামী দিনে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।