Home Blog

দাঁ বাড়ির পুজো

জমিদার বাড়ির দূর্গা পূজা

 

  • দাঁ বাড়ির পুজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দুর্গোৎসব এর এই পুন্য সময়ে আমি চেষ্টা করছি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে আমাদের বাংলার তথা কলকাতার এক হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস যে ইতিহাসের সাথে যুক্ত রয়েছে অসংখ্য গল্প ও ঘটনা।আজ বনেদি বাড়ির পুজোতে লিখবো দাঁ পরিবারের পুজোর কথা।

 

সেকালের কলকাতায় দূর্গা পুজো কে ঘিরে একটি প্রবাদ প্রচলিত ছিলো যে দেবী মর্ত লোকে পা রেখে প্রথমে সাজতে আসেন দাঁ বাড়িতে তার পর এখান থেকে অন্য কোথাও যান।

 

ব্রিটিশ আমলে ফ্রান্স এবং জার্মানি থেকে বিশেষ কাজ করা অলঙ্কার ও পোশাক আনানো হয়েছিলো ঠাকুরকে পরানোর জন্য|সোনা রুপো ও মূল্যবান রত্ন দিয়ে তৈরী পোশাক ও গয়নায় দেবীকে সাজানো হতো।

 

কালী প্রসন্ন সিংহ তার বিখ্যাত হুতোম পেঁচার নকশা গ্রন্থে এই পরিবার সম্পর্কে অনেক তথ্যই দিয়েছেন|এই বংশের প্রতিষ্ঠা ও দূর্গা পুজোর প্রচলন করেন এই বংশের গোকুলচন্দ্র দাঁ সময় টা খুব সম্ভবত 1840 সাল| তিনি পরবর্তীতে শিবকৃষ্ণ দাঁ কে দত্তক নেন|এই শিব কৃষ্ণ দাঁ এর আমলে এই পরিবারের ও তাদের দূর্গা পুজোর নাম ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র|পারিবারিক লোহা, কয়লা আর হার্ডওয়ারের ব্যবসায় প্রভূত লাভ করেন তিনি এবং লাভের একটা বড়ো অংশ ব্যয় করেন নিজের সৌখিনতা ও পরিবারের দূর্গা পুজোয়|শোনা যায়  শিবকৃষ্ণ দাঁ সাজগোজ করতে বড় ভালবাসতেন এবং দূর্গা পুজোয় দেবীর রূপ সজ্জায় তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন|

 

আর একটি মজার ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যায়|শোনা যায় জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির সঙ্গে ছিলো এই দাঁ পরিবারের খুব রেষারেষি তাই তাদের দেখিয়ে দেখিয়ে ঠাকুরবাড়ির সামনে দেবীকে বেশ কয়েকবার ঘুরিয়ে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে তারপর গঙ্গায় নিয়ে যাওয়া হতো বিসর্জনের জন্য|

 

সেই রাজা আর নেই, রাজত্বও নেই|সবই ধূসর অতীত|তবু দাঁ বাড়িতে পুজো হয়|দেবীর সেই বিখ্যাত সাজ আজও হয়|এখানে রথের দিন গড়ানকাঠ পুজোর মধ্য দিয়ে প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয় এবং জন্মাষ্টমীর দিন কাঠামোতে দেবীর মস্তক স্থাপন করা হয়|এ বাড়ির রীতি অনুসারে

দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠার সময় তেরোটি শাড়ি ও তেরোটি কাঁসার পাত্র দেওয়া হয়। এছাড়াও একশো আটটি পেতলের প্রদীপ সাজানো হয়|এখানে বলী প্রথা নেই কারন পুজো হয় বৈষ্ণব মতে|কুমারী পুজোও এই বাড়ির পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট|

 

আজকের এই পর্ব এখানেই শেষ করলাম।

ফিরবো আগামী পর্বে|অন্য এক বনেদি

বাড়ির পূজো নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

চাঁচল রাজবাড়ির দূর্গা পুজো 

জমিদার বাড়ির দুর্গাপূজা

 

চাঁচল রাজবাড়ির দূর্গা পুজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দুর্গা পূজো উপলক্ষে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করছি বাংলার পুরোনো বনেদি বাড়ি বা জমিদার বাড়ি গুলির পুজো নিয়ে।আজ লিখবো চাঁচল রাজ বাড়ির পুজো দিয়ে।

 

চাঁচল রাজ বাড়ির এই পুজো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অদ্ভুত নিদর্শন। সে বিষয়ে পরে আসছি আগে এই এই বাড়ির পূজোর ইতিহাস সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।

 

সতেরো শতকের শেষভাগ। সেই সময় উত্তর মালদহের বিস্তীর্ণ এলাকার রাজা ছিলেন রামচন্দ্র রায়চৌধুরি। প্রজাদরদী এবং ধর্মপ্রাণ রাজা ছিলেন তিনি। শোনা যায় একবার রাজা দেবী চণ্ডীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে মহানন্দার ঘাটে স্নান করতে যান। সেই সময় তাঁর হাতে অলৌকিক ভাবে চতুর্ভুজা অষ্টধাতুনির্মিত মূর্তি উঠে আসে। দেবী চণ্ডীর অষ্টধাতুর মূর্তি মহানন্দার ঘাট থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে রাজবাড়িতে এনে তিনি

প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেদিন থেকেই রাজবাড়িতে শুরু হয় দেবীর নিত্যপুজো।

 

সেই সময় থেকেই প্রতিবছর চাঁচল রাজবাড়িতে বেশ ধুমধাম করে দুর্গাপুজো শুরু হয়। পরবর্তীকালে পুজোর জন্য পাকা মন্দির নির্মাণের করেন রাজা । মন্দির তৈরির পর রাজা রামচন্দ্র দুর্গাপুজোর জন্য সেই সময় প্রায় সাত হাজার টাকাও বছরে বরাদ্দ করেন। আজও প্রাচীন প্রথা মেনে সপ্তমী তিথিতে রাজবাড়ি থেকে দুর্গাদালানে নিয়ে আসা হয় অষ্টধাতুর চতুর্ভুজা মা চণ্ডীকে। দশমীতে তিনি ফের রাজবাড়িতে ফিরে যান।

এখানে সতের দিন ধরে উৎসব পালিত হয় দূর্গাপূজা উপলক্ষে

 

সেই রাজা নেই সেই রাজ্যপাটও নেই। চাঁচল রাজবাড়িতে এখন স্থাপিত হয়েছে কলেজ, মহকুমা প্রশাসনিক ভবন, আদালত-সহ একাধিক সরকারি দপ্তর। তবে রাজবাড়ির একাংশে থাকা ঠাকুরবাড়ি এখনও আগের মতোই রয়ে গিয়েছে।পুজোও হয়।

দূর্গা পূজা উপলক্ষে বাড়ির সদস্যরা একত্রিত হয়।

সেই জৌলুস হয়তো নেই। তবে নিষ্ঠা সহকারে আজও দেবী এখানে পূজিতা হন। নিয়ম করে প্রতিটি শাস্ত্রীয় রীতি নীতি আজও পালিত হয়।

 

এই পুজোয় ভিন্ন ধর্মের মানুষেরও যোগদান আছে।এখানে বিসর্জনের সময় মহানন্দার নদীর ধারে বৈরগাছি নামক এলাকার মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ লণ্ঠন নিয়ে মাকে পথ দেখান।এই রীতি শুরুর দিন থেকে আজও প্রচলিত আছে।

 

আসন্ন দূর্গা পুজো উপলক্ষে চলতে থাকবে এই সব ঐতিহাসিক রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়ির পুজো গুলি নিয়ে আলোচনা। ফিরে আসবো

আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জমিদার বাড়ির দূর্গা পুজো – শোভা বাজার রাজবাড়ি

জমিদার বাড়ির দূর্গা পুজো

শোভা বাজার রাজবাড়ি

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলার দুর্গাপূজার নিজস্ব এক ইতিহাস এবং ঐতিহ্য আছে যা কয়েকশো বছরের পুরোনো|পলাশীর যুদ্ধ থেকে, স্বদেশী আন্দোলন, দেশ ভাগ থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ সবই এই ইতিহাসের অঙ্গ|দূর্গা পুজোকে কেন্দ্র করে শাস্ত্র এবং ধর্মীয় ভাবাবেগের পাশাপাশি এই ইতিহাসের ও এক আলাদা তাৎপর্য আছে এবং এই ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শোভা বাজার রাজবাড়ির পূজোর গুরুত্ব অপরিসীম।আজকের পর্বে শোভাবাজার রাজ বাড়ির পুজো।

সেকালে বলা হতো দেবী মর্তে থাকাকালীন তার মনোরঞ্জনের জন্য এই বাড়িতেই আসতেন|এমন ভাবনার পেছনে অনেক কারন আছে|তবে আগে এই বাড়ি ও তার ইতিহাস সংক্ষেপে জেনে নেয়া দরকার|যদিও এই পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিজয় হরি দেব তবে এই পরিবারের স্বর্ণযুগ বলা হয় রাজা নবকৃষ্ণ দেবের সময় কে এবং তার আমলেই শুরু হয় এই দূর্গা পূজা|নব কৃষ্ণদেব ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন সাধারণ কর্মচারী যিনি নিজের দক্ষতায় ও পরিশ্রমে কোম্পানির মুন্সী হয়ে ছিলেন|পলাশীর যুদ্ধে তিনি নানা ভাবে ক্লাইভ কে সাহায্য করেন ও পুরুস্কার স্বরূপ প্রচুর অর্থ লাভ করেন|

মূলত পলাশীর যুদ্ধ জয় কে স্মরণীয় করে রাখতেই নবকৃষ্ণ দেবে দূর্গা পুজো শুরু করেছিলেন তাছাড়াও তার উদেশ্য ছিলো ক্লাইভ কে খুশি করে নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা|এই উদ্দেশ্যে তিনি সফল হয়েছিলেন|তার দূর্গা পুজোয় অংশগ্রহণ করেছিলেন স্বয়ং লর্ড ক্লাইভ|আজও অনেক জায়গায় এই পুজো কে গোরা দের পুজো বা কোম্পানির পুজো বলা হয়|

উদেশ্য যাই থাকুক নিষ্ঠা সহকারে পুজো করতেন নবকৃষ্ণ দেব|প্রচুর অর্থ ব্যায় হতো এই পরিবারের দূর্গা পুজোয়|বসতো গান বাজনার আসর, নাচ, কবি গানের ও ব্যবস্থা থাকতো|দূর্গা পুজো উপলক্ষে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, ভোলা ময়রার মতো কবিয়ালরা এখানে এসেছেন কবির লড়াই করতে আবার  গহরজান, মালকাজান, নুর বক্স প্রমুখ নামী নর্তকী এই বাড়িতে এসেছেন নাচ করতে|
সব মিলিয়ে এলাহী আয়োজন হতো শোভাবাজার রাজ বাড়ির দূর্গা পুজোয় আর এই কারণেই মনে করা হতো যে এটা মর্তে দেবী দুর্গার মনোরঞ্জনের স্থান|

পরবর্তীতে দুই শরিকের মধ্যে ভাগ হয়ে যায় সম্পত্তি তবে প্রথা মেনে নিষ্ঠা সহকারে আজও শোভাবাজর রাজবাড়ি তে দূর্গা পূজা হয়|উল্টো রথের দিন কাঠামো পুজো দিয়ে শুরু হয় দেবীমূর্তি তৈরির কাজ|শোভাবাজার রাজবাড়ির মাতৃমূর্তির বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এছাড়া, এখানকার পুজোর উপাচারও বেশ চমকপ্রদ। সন্ধিপুজোতে কামানের গোলার শব্দে শুরু হত পুজো এবং শেষও হত একই ভাবে|মা দুর্গা এই বাড়িতে বৈষ্ণবী হিসেবে পূজিতা হন। তাই শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজোয় অন্নভোগ থাকে না। গোটা ফল, গোটা আনাজ, শুকনো চাল, কচুরি, খাজা, গজা, মতিচুর-সহ নানা ধরনের মিষ্টি দেবীকে উত্সর্গ করা হয়|বর্তমানে এখানে বলী প্রথা নেই|এবাড়ির পুজোয়|প্রতিমার সামনে একটা বড় হাড়িতে জল রাখা হয়। সেই জলে দেবীর পায়ের প্রতিবম্বের ছবি দেখে সবাই প্রণাম করে। একে দর্পণ বিসর্জন বলা হয়|তারপর প্রথা মেনে দশমীর দিনই হয় বিসর্জন|আগে নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর রীতি থাকলেও সরকারি নিয়মে তা এখন বন্ধ|

আজকের পর্বে এইটুকুই|ফিরবো পরের পর্বে।
অন্য এক রাজ বাড়ির পূজো নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জমিদার বাড়ির দুর্গা পূজো – মল্ল রাজবাড়ির দুর্গা পূজো

জমিদার বাড়ির দুর্গা পূজো – মল্ল রাজবাড়ির দুর্গা পূজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বিষ্ণুপুরের হাজার বছরের পুরনো মল্ল রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাস অতি প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ। আজ আপনাদের এই পূজো সম্পর্কে জানাবো।

 

বিষ্ণুপুরে মল্ল রাজবাড়িতে নয়টি তোপধ্বনির মধ্যে দিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে পুজো শুরু হয়।

শোনা যায় এই রাজপরিবারের পূর্ব পুরুষদের প্রথম রাজধানী ছিল জয়পুরের পদ্যুঘ্নগড়। মল্লরাজা জগত মল্লকে এক রাতে মা মৃণ্ময়ী রাজাকে স্বপ্নাদেশ দেন যে, আমি এখানকার মাটিতে রয়েছি। আমাকে প্রতিষ্ঠা কর। তারপর রাজা সেখানেই দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেন। আজও গঙ্গামাটির সেই বিগ্রহ অক্ষত রয়েছে এবং

পূজো হয়

 

প্রথা মেনে বড়ঠাকুরানী মহাকালী রূপে, মেজো ঠাকুরানী মহালক্ষ্মী রূপে এবং ছোট ঠাকুরাণী মহা সরস্বতী রূপে পূজিতা হন।

 

মল্ল রাজবাড়ির পুজো হয় নিজস্ব নারায়নী পদ্ধতিতে। প্রাচীন হাতে লেখা পুঁথি আজও অমলিন। যা পাঠ করেই সম্পূর্ণ করা হয় মল্লরাজপরিবারের পুজো। প্রথা অনুযায়ী পূজোর শুরুতে বিল্লবরণ অনুষ্ঠান হয়। ওইদিন দেবী সারারাত বেলগাছে থাকেন তারপর সকালে স্থানীয় গোপালসায়রে স্নান করানোর পর পটের দেবী বড়ঠাকুরানীকে শাস্ত্রীয় আচার মেনে মৃন্ময়ী মন্দিরে প্রবেশ করানো হয়।

 

জনশ্রুতি আছে মল্লরাজার প্রধান সেনাবাহিনীর মধ্যে একজন ছবি আঁকতে খুব পছন্দ করতেন। তাঁর আঁকা ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে রাজপরিবারের পুজোয় তাঁকে পট আঁকার দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে তাঁর বংশধরেরা একইভাবে রাজবাড়ির পুজোয় পটের দেবী আঁকেন।

 

পুজোর আরো একটি বিশেষত্ব হল অষ্টমীর দিনে সন্ধিপুজোয় রাজবাড়িতে থাকা অষ্টধাতু দিয়ে তৈরি বিশালাক্ষ্মী উগ্রচণ্ডা মূর্তির বিশেষ পূজো হয়।স্বর্ণচাঁপা ফুল দিয়ে অঞ্জলি দেওয়া হয়। দশমীর দিন ঘট বিসর্জনের পর রামচন্দ্রের পুজো, অপরাজিতা বন্ধন এবং নীলকন্ঠ পাখি উড়িয়ে এবং দইয়ের মধ্যে চ্যাং মাছ ছেড়ে পুজো সমাপ্তি করা হয়।

 

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রায় অপরিবর্তিত আছে মল্ল রাজ বাড়ির পূজো যা দেখতে আসেন বহু মানুষ।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য একটি জমিদার বাড়ির পূজো নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জমিদার বাড়ির পূজো – বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গা পূজো

জমিদার বাড়ির পূজো

বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গা পূজো

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলার জমিদার বাড়ির বা রাজবাড়ি দুর্গাপূজো নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম কলকাতার একটি ঐতিহ্যসম্পন্ন বনেদি বাড়ির পূজো দিয়ে। আজ আপনাদের নিয়ে যাবো উত্তরে। জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির প্রাচীন দুর্গা পূজো নিয়ে আজকের পর্ব।

পাঁচশো বছরের বেশি প্রাচীন এই দুর্গাপূজো
জেলার রাজবাড়ির পূজো গুলির মধ্যে অন্যতম।
কালিকাপুরাণের বিধি মেনে অনুষ্ঠিত হয় বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। প্রাচীন আচার, স্বতন্ত্র প্রতিমার রূপ এবং নিজস্ব পুজোর রীতি এই পূজোর বিশেষত্ব।

এখানে দেবী তপ্ত কাঞ্চনবর্ণা। এখানে সিংহের পাশাপাশি বাঘ দুর্গার বাহন।দুর্গা পূজোর সময়ে প্রতি বছর রূপোর অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত করা হয় দেবীকে।প্রতি বছর নন্দ উৎসবে কাঠামো পুজোর মধ্যে দিয়ে প্রতিমা নির্মাণের কাজ শুরু হয়। বিশেষ উপায়ে সংরক্ষিত মাটি দিয়েই তৈরি করা হচ্ছে দেবী প্রতিমা।

পূজো পদ্ধতিতেও রয়েছে বিশেষত্ব।
এখানে মাকে মাছের বিভিন্ন পথ দিয়ে আমিষ ভোগ দেওয়া হয়ে পাশাপাশি দেবী দুর্গার সঙ্গে পূজিত হন গঙ্গা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, মহামায়া এবং দুই সখী জয়া ও বিজয়া।পূজোর সময় একটি রথের মধ্যে সাজিয়ে রাখা হয় দেব দেবীদের।অষ্টমীর রাতে অর্ধরাত্রির পুজো এই বাড়ির পূজোর আরেকটি বিশেষত্ব।

শোনা যায় অতীতে নরবলির প্রচলন ছিলো বর্তমানে চালের গুঁড়ো দিয়ে মানুষের অবয়ব তৈরি করে কুশ দিয়ে বিদ্ধ করার একটি বিশেষ আচার পালন করা হয়।

যুগ বদলেছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে।জমিদারি প্রথার অবসান হয়েছে।বদলেছে উৎসবের ধরন, কিন্তু বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর স্বাতন্ত্র্য আজও অমলিন।আজও ঐতিহ্য এবং ইতিহাসের টানে
বহু দর্শণার্থী এই পূজো দেখতে আসেন।

ফিরে আসবো পরবর্তী জমিদার বাড়ির দুর্গা
পূজোর ইতিহাস নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জমিদার বাড়ির দুর্গাপূজো – লাহা বাড়ির পুজো

জমিদার বাড়ির দুর্গাপূজো – লাহা বাড়ির পুজো

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

দেবী পক্ষের সূচনার মধ্যে দিয়ে শুরু হয়ে গেছে এবছরের দুর্গা পূজোর প্রস্তুতি। আজ থেকে ধারাবাহিক ভাবে বাংলার কিছু বিখ্যাত রাজ বাড়ি বা জমিদার বাড়ির দুর্গা পূজো নিয়ে লিখবো।কলকাতার বড়ো পারিবারিক পুজো গুলির মধ্যে লাহা বাড়ির পূজো অন্যতম। আজ
শুরু করবো এই পুজো দিয়ে।

মনে করা হয় বর্ধমানের বড়শূলে প্রথম পুজো শুরু করেন বনমালী লাহা|পরবর্তীতে কলকাতায় এই পুজো শুরু করেন দুর্গাচরণ লাহা।শুরুর সময় থেকেই কলকাতার বনেদি বাড়ির পূজো গুলির মধ্যে বিশেষ স্থান করে নেই এই পূজো।

লাহা বাড়ির কুল দেবতা সিংহ বাহিনী এবং দূর্গা পুজোর সময়ের দেবী দূর্গা ও সিংহ বাহিনী একই সাথে পূজিতা হন|সিংহ বাহিনী কি করে এবাড়ির কুলদেবী হলো সে নিয়েও একটি অলৌকিক ঘটনার কথা শোনা যায়।

শোনা যায় কোনো এক সময় নাকি দেবীর এই মূর্তি কোন এক গভীর জঙ্গলে ডাকাতদের হাতে লাঞ্ছিত হয়ে অনাদরে অযত্নে পড়ে ছিল। এই বাড়িরই এক সদস্য দেবীর কাছ থেকে স্বপ্নাদেশ সেই দেবী মূর্তি উদ্ধার করে নিয়ে এসে  কুলদেবী রূপে পুজো করতে শুরু করেন।সেই থেকেই অষ্ট ধাতুর সেই মূর্তি কুল দেবী রূপে এবাড়িতে প্রতিষ্ঠিতা।

মনে করা হয় ওই ঘটনার পর থেকে লাহাদের ব্যাপক উন্নত হয়|পরবর্তীতে শিবচরণ লাহা ইংরেজদের সঙ্গে পেন খাতাপত্র এবং মূল্যবান রত্নের ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। পুজোর জাঁকজমকও বাড়ে এই সময়।

এ বাড়িতে দেবী দুর্গার রূপ একটু ভিন্ন।
তিনি এখানে হরপার্বতী রূপে পূজিতা হন|লাহা বাড়ির পুজো হয় বৈষ্ণব মতে।শিবের কোলে দেবী দুর্গা উপবিষ্টা|মহিষাসুর থাকেনা, দেবীর হাতে কোনো অস্ত্রও থাকেনা|লাহাবাড়ির পুজোর রীতিও একটু আলাদা লাহাবাড়িতে কাঠামো পুজো হয় জন্মাষ্টমীর পরে এবং দেবীপক্ষের শুরুতে বোধন হয়|প্রথা মেনে এখানে অন্ন ভোগ হয় না এখানে ভোগের বিশেষত্ব নানা ধরণের মিষ্টি|এখনো বলী প্রথা পুরো পুরি লুপ্ত হয়নি তবে প্রাণী হত্যা হয়না|বলী হয় কুমড়ো বা শসা।তাছাড়া অষ্টমীতে ধুনো পোড়ানোর রীতি রয়েছে।

শুধু পূজো নয় বিসর্জন ঘিরেও এবাড়িতে রয়েছে কিছু অদ্ভুত প্রথা। দোলায় করে বিসর্জনে নিয়ে যাওয়া হয় দেবীকে। বিসর্জনের পর কাঠামো সংগ্রহ করে রাখা হয় পরের বছরের জন্য প্রতিমা নির্মাণের উদ্দেশ্যে।বিসর্জন দিয়ে ফিরে বাড়ির পুরুষরা জিজ্ঞাসা করেন, ‘মা আছেন ঘরে’ ? তখন বাড়ির কোনও মহিলা ভিতর থেকে  উত্তর দেন, ‘হ্যাঁ মা আছেন।‘ বাইরে থেকে ফের জিজ্ঞাসা করা হয় ‘মা আছেন ঘরে ?’ একই উত্তর দেওয়া হয় ভিতর থেকে। এভাবে পরপর তিনবার জিজ্ঞাসা করার পর সবাই ভেতরে প্রবেশ করেন।

ঐতিহ্য পূর্ণ বনেদি বাড়ির পূজো নিয়ে
ধারাবাহিক লেখায় আবার ফিরবো
আগামী পর্বে।থাকবে আরো একটি
জমিদার বাড়ির পূজো। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

মহালয়ার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা 

মহালয়ার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ধারাবাহিক ভাবে পুরান এবং বিভিন্ন শাস্ত্র নিয়ে বেশ কয়েকদিন ধরে লিখছি ।আজ মহালয়া অর্থাৎ পিতৃ পক্ষের অবসান এবং দেবী পক্ষের সূচনা। এই মহালয়াও একটি পৌরাণিক এবং শাস্ত্রীয় বিষয়।আজকের এই বিশেষ পর্বে আপনাদের জানাবো শাস্ত্রীয় দৃষ্টি ভঙ্গী থেকে কি এই মহালয়া এবং কেনো পালন করা হয় কিবা এই মহালয়ার আধ্যাত্মিক বা শাস্ত্রীয় গুরুত্ব।

 

একটি শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুসারে জীবিত ব্যক্তির পূর্বের তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃলোকে বাস করেন। এই লোক স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। পিতৃ পক্ষে এই আত্মারা উত্তর পুরুষের তর্পনের মাধ্যমে চীরমুক্তি লাভ করে এবং পরম ব্রহ্মর সাথে বিলীন হয়।এই তর্পনের শাস্ত্র সম্মত তিথি হলো মহালয়া তিথি।একাধিক শাস্ত্রে এবং মহা কাব্যে মহা লয়া সংক্রান্ত তথ্য এবং ব্যাখ্যা লিপিবদ্ধ আছে।

 

মহাভারতে উল্লেখ আছে যে কর্ণের মৃত্যুর পরে তার আত্মা স্বর্গে গমন করলে, তাকে স্বর্ণ ও রত্ন খাদ্য হিসেবে প্রদান করা হয়। কর্ণ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে ইন্দ্র বলেন, কর্ণ সারা জীবন স্বর্ণ এবং রত্ন দান করেছেন, তিনি পিতৃপুরুষের আত্মার উদ্দেশ্যে কোনোদিনো কোনো খাদ্য দান করেননি।তাদের কাছে প্রার্থনা করেননি তাই স্বর্গে তাকে স্বর্ণই খাদ্য হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। পিতৃ পুরুষের আশীর্বাদ থেকেও তিনি বঞ্চিত। তার পুন্য সঞ্চয় অসম্পূর্ণ।

তার উত্তরে কর্ণ বলেন, তিনি যেহেতু তার পিতৃপুরুষ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। তাই তিনি অসহায় এবং অজ্ঞানতা বসত এই অন্যায় করে ফেলেছেন।তারপর কারণে কর্ণকে ষোলো দিনের জন্য মর্ত্যে গিয়ে পূর্ব পুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল প্রদান করার অনুমতি দেওয়া হয়। সেই সময়

কালকে পিতৃপক্ষ বলা হয়।

 

রামায়নে সরাসরি মহা লয়া সম্পর্কে কিছু না বলা হলেও অকাল বোধন হয় দেবী পক্ষে।আসল দুর্গা পূজা হলো বসন্তে, সেটাকে বাসন্তী পূজা বলা হয়। শ্রীরামচন্দ্র অকালে-অসময়ে পূজা করেছিলেন বলে এই শরতের পূজাকে শারদীয় পূজা ও দেবীর অকাল-বোধন বলা। মহা লয়া থেকে সূচনা হয় এই দেবী পক্ষের।

 

জ্যোতিষ শাস্ত্রর দৃষ্টি ভঙ্গিথেকেও এই তিথি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষ সূচিত হয়।এই সময় পূর্বপুরুষগণ আত্মা রূপে পিতৃলোক পরিত্যাগ করে তাদের উত্তরপুরুষদের গৃহে বা আশেপাশে অবস্থান করেন। এর পর সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করলে, তারা পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান এবং দেবী পক্ষের সূচনা হয়।যাদের জন্মছকে পিতৃ দোষ আছে তারা এই সময়ে গ্রহ দোষ খণ্ডন করালে পিতৃ দোষ থেকে স্থায়ী ভাবে রেহাই পেতে পারেন।

 

সবাইকে জানাই দেবী পক্ষের শুভেচ্ছা।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে।পুরান এবং শাস্ত্র সংক্রান্ত নানা বিষয় নিয়ে লেখা

চলতে থাকবে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

পুরান কথা – মধু কৈটভ বধ

পুরান কথা – মধু কৈটভ বধ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ পুরান কথায় আপনাদের দুই অত্যাচারী অসুর মধু এবং কৈটভের কথা জানাবো এবং জানাবো কিভাবে আদ্যাশক্তি মহামামায়ার ইচ্ছায় এই দুই দুরাত্মা বধ হয়েছিল নারায়ণের হাতে।

 

সৃষ্টির একদম আদি লগ্নে জীব জগৎ যখন সম্পূর্ণ ভাবে সৃষ্টি হয়নি এবং ত্রিভুবন জুড়ে শুধুই জল অনন্তনাগ নামে এক বিরাট সাপের উপর যোগনিদ্রায় নারায়ণ। আর তাঁর নাভিপদ্মের উপর বসে ধ্যানরত ব্রহ্মা। সেই সময় বিষ্ণুর কান থেকে জন্ম হয় দুই অসুরের।মধু এবং কৈটভ।

 

কঠোর তপস্যা শুরু করে তারা এবং দীর্ঘ তপস্যার পর তাদের সামনে হাজির হন দেবী সরস্বতী। তিনি দুই অসুরকে ইচ্ছামৃত্যুর বর প্রদান করেন। আর তা পেয়ে প্রথমেই তারা আক্রমণ করলো ব্রহ্মা এবং বিষ্ণুকে। ওই দুই অসুরের উপর অস্ত্র ব্যবহার করেননি নারায়ণ কারণ তারা নিরস্ত্র ছিলো।

কয়েক হাজার বছর ধরে বিষ্ণু আর ওই দুই অসুরের মধ্যে মল্লযুদ্ধ চলতে লাগল।

 

অবশেষে ব্রহ্মা শরণাপন্ন হলেন আদ্যাশক্তি মহামায়ার এবং সৃষ্টি রক্ষা করতে অবতীর্ণ হলেন মহামায়া।যুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে মধু ও কৈটভের উপর মায়া বিস্তার করলেন। মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে তারা বিষ্ণুকেই বর দিতে চাইল।

বিষ্ণু সুযোগ কাজে লাগালেন। তিনি বললেন তোমরা আমার হাতেই মরবে এই বর তোমরা আমাকে দাও। অসুররা রাজি হলেন তবে শর্ত দিলেন যে তাদের মারতে হবে এমন জায়গায় যেখানে জল নেই।তখন ত্রিভুবনে শুধুই জল।

তাই তারা ভেবে ছিলেন তাদের বধ করা অসাধ্য হবে।কিন্তু বিষ্ণু তাঁদের সুকৌশলে নিজের জানুতে শুইয়ে সুদর্শন চক্র দিয়ে তাদের মাথা ছিন্ন করে ফেললেন।

 

এই ভাবে আদ্যাশক্তি মহা মায়া এবং বিষ্ণুর যৌথ প্রয়াসে মধু এবং কৈটভের অত্যাচার থেকে রক্ষা

পেলো সৃষ্টি।একটি পৌরাণিক ব্যাখ্যা থেকে এই দুই অসুরের শরীরের মেদ থেকে তৈরি হল পৃথিবীর স্থল ভাগ তাই পৃথিবীর আরেক নাম মেদিনী।

 

আসন্ন মহা লয়া উপলক্ষে বিশেষ পর্ব নিয়ে

ফিরে আসবো আগামী দিনে। চলবে শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক নানা বিষয় নিয়ে

আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরান কথা – জটায়ু

পুরান কথা – জটায়ু

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

পুরানে বর্ণিত একাধিক প্রাণী বা অদ্ভুত দর্শন দেবতাদের কথা আগেও অনেক বার বলেছি পুরান কথায় আজ রামায়ণে উল্লেখিত পৌরাণিক চরিত্র জটায়ু এবং তার দাদা সম্পাতিকে নিয়ে লিখবো।

পুরান অনুসারে জটায়ুর দাদা ছিলেন সম্পাতি।
সম্পাতি ও জটায়ু ছিলেন মহর্ষি কশ্যপ ও বিনতার পুত্র।পক্ষীরাজ সম্পাতি ছিলেন অসীম শক্তিশালী এবং বাল্যকালে দুই ভাই নিজেদের মধ্যে শক্তির প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছিলেন। কে কত উঁচুতে উড়তে পারে, তা দেখতে দেখতে তাঁরা একদিন আকাশের সর্বোচ্চ সীমায় সূর্যের কাছে চলে গিয়েছিলেন। সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপে জটায়ুর ডানা পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। ছোট ভাইকে আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে সম্পাতি নিজের বিশাল ডানা দুটি মেলে ধরেন জটায়ুর ওপর। তাতে
জটায়ু রক্ষা পেলেও সূর্যের দহনে সম্পাতির দুই ডানা পুরোপুরি পুড়ে যায়।

আহত অবস্থায় তিনি মহেন্দ্র পর্বতের ওপর আছড়ে পড়েন। সেখানেই এক গুহায় আশ্রয় নেয়।অন্যদিকে জটায়ু শক্তিশালী এবং জ্ঞানী হয়ে ওঠেন। রাম অবতারকে সাহায্য করতে গিয়ে সীতা হরণের সময় রাবনের হাতে প্রান দেন।
রাম যখন দিশেহারা হয়ে সীতার খোঁজ করছেন তখন জটায়ুর মৃত্যুর খবর শুনে তিনি অত্যন্ত শোকাতুর হন এবং গুহা থেকে বেরিয়ে এসে রামের দূতদের নিজের পরিচয় দেন।

জটায়ুর ন্যায় তিনিও ছিলেন রাম ভক্ত এবং দিব্য দৃষ্টি প্রাপ্ত।ভাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এবং শ্রী রামকে সাহায্য করতে তিনি এগিয়ে আসেন।তিনি রামকে বলেন আমি আমার এই দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখতে পাচ্ছি রাবণ সীতাকে নিয়ে লঙ্কায় অবস্থান করছে। তোমরা সমুদ্র লঙ্ঘন করলেই তাঁর দেখা পাবে।তার দেয়া তথ্য পেয়েই রাম লঙ্কায় যাওয়া স্থির করেন।

জটায়ু প্রান ফিরে পাননি তবে সম্পাতি শ্রী রামের কৃপায় তাঁর দগ্ধ ডানা দুটি পুনরায় ফিরে পান।
বাকি জীবন তিনি রামের কার্যে সহায়তা করে ধর্মের পথে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন।
আজও রামায়ণ সহ একাধিক শাস্ত্রে জটায়ু এবং তার ভাই সম্পাতির আত্মত্যাগের কথা শ্রী রামের ভক্তি এবং শ্রদ্ধাকে অনুপ্রাণিত করে।

ফিরে আসবো পুরান কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে আবার আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরান কথা – কাক ভূষন্ডি

পুরান কথা – কাক ভূষন্ডি

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

সাধারণত দীর্ঘ জীবন প্রাপ্ত ব্যক্তিকে ভূষন্ডির কাক বলা হয়। এই প্রবাদের সাথে জড়িয়ে আছে কাকভূশুন্ডি নামের এক পৌরাণিক পক্ষী ঋষি। আজ পুরান কথায় জানাবো সেই কাক ভূশুন্ডির কাহিনী।

 

ত্রেতাযুগে অযোধ্যায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন ভুশুণ্ডি নামের এক ব্রাহ্মণ। বেদ-উপনিষদের চর্চা আর ভগবান শিবের তপস্যার মাধ্যমে সত্যকে উপলব্ধি করে মোক্ষলাভ করাই ছিলো তার জীবনের লক্ষ্য।

 

আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং শাস্ত্র অধ্যায়ন করতে লোমস মুনির আশ্রমে যান ভূষন্ডি।কিন্তু কোনো এক কারণে ভুশুন্ডির উপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হন লোমস মুনি। আর সেই ক্রোধে তিনি ভুশুন্ডিকে কাক হয়ে যাওয়ার অভিশাপ দিয়ে বসেন। ফলে ততক্ষনাৎ ব্রাহ্মণ যুবক ভুশুণ্ডি পরিনত হলেন কদাকার কাক পক্ষীতে।শুরু হলো তার জীবনের অন্য এক অধ্যায়।

 

কাক রূপেই সে দেবাদিদেব মহাদেবের তপস্যা চালিয়ে যায় এবং তার তপস্যায় সন্তুষ্ট হলেন ভগবান শিব। শিব তাঁকে দেখা দেন এবং অমরত্ব, অসীম জ্ঞান ও সময়চক্রের উর্দ্ধে উঠে সৃষ্টিচক্র অবলোকন করার বর দেন।

 

সেই থেকে যুগ যুগ ধরে তিনি স্বমহিমায় বিরাজমান এবং পৌরাণিক ঘটনার সাক্ষী।

রামায়ণ, মহাভারত সহ একাধিক ভগবানের দিব্য লীলার তিনি সাক্ষী।তিনি রাম অবতার এর সন্ন্যিধ্যও পেয়েছেন আবার কৃষ্ণের লীলাও দেখেছেন।আবার দক্ষ যজ্ঞওতেও তিনি ছিলেন নীরব দর্শক।

 

কিছু শাস্ত্র মতে কাকভুশুন্ডি ছিলেন গরুড়দেবের শিক্ষক। তিনি গরুড়দেবের কাছে ব্যাখ্যা করেছিলেন ভক্তি এবং জ্ঞানের পথ।

 

পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুসারে কাকভুশুন্ডি আজও জীবিত আছেন এবং আজও জ্ঞান চর্চা বা আধ্যাত্মিক সাধনা করে চলেছে।তিনি অমর এবং পরম জ্ঞানের অধিকারী।

 

ফিরে আসবো পুরান কথার পরের পর্ব নিয়ে।

থাকবে আরো অনেক পৌরাণিক চরিত্র এবং ঘটনা নিয়ে আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।