Home Blog

পুরান কথা – কালভৈরব

পুরান কথা – কালভৈরব

 

পন্ডিত জি ভৃগুর শ্রী জাতক

 

শিবের বিভিন্ন রূপগুলির মধ্যে অন্যতম কাল ভৈরব যা শিবের অংশ বিশেষ। আজ পুরান থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে কাল ভৈরব রূপ

নিয়ে লিখবো।

 

শিব পুরান অনুযায়ী কোনো একসময় ব্রহ্মা নাকি কোনও ধর্মবিরোধী কাজ করেছিলেন যার ফলে শিব অত্যন্ত রেগে যান তাঁর উপর । তাই সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য কালভৈরবকে সৃষ্টি করেছিলেন করেছিলেন শিব। অর্থ্যাৎ শিবের ক্রোধ থেকে জন্ম কাল ভৈরবের আর সেই কালভৈরবই ব্রহ্মার একটি মাথা কেটে নিয়েছিল। কিন্তু তারপর সেই ছিন্ন মস্তক ছুঁড়ে ফেলতে চাইলেও কালভৈরনের হাতেই আটকে ছিল সেটি।সেই অবস্থায় কিছু কাল ভ্রাম্যমান অবস্থায় কাটান তিনি |এদিকে ব্রহ্ম হত্যার পাপ অন্য দিকে এই অসহায় অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে কপাল ব্রত পালন করতে হয় তাঁকে।তাতেও তেমন ফল হয়না, অবশেষে কাশীতে আসার পর তাঁর হাত থেকে হটাৎ খোশে পড়ে যায় সেই মস্তক। তার পর শিব কাল ভৈরব কে নিষ্ঠা সহকারে কাশী তেই স্থাপন করেন এবং কাশীকে রক্ষা করার দায়িত্ব দেন কালভৈরবকে। তাই শিব হলেন কাশীর রাজা আর কালভৈরব তাঁর কোতোয়াল। তিনিই আশীর্বাদ করেন, তিনিই অভিশাপ দেন। এমনকি স্বয়ং যমরাজেরও নাকি কাশীবাসীকে শাস্তি দেওয়ার কোনও অধিকার নেই।কাশী তে কাল ভৈরব ই শেষ কথা।

 

আবার আরেকটি ব্যাখ্যা অনুসারে বৈষ্ণবদের পাপের শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা যমের বা অন্য কোনো দেবতার নেই। তাই তাদের পাপ পুন্যর হিসেব করেন স্বয়ং কাল ভৈরব।

 

কাশীর কালভৈরব মন্দির ঘিরে রয়েছে অসংখ্য রহস্যময় আচার ও প্রথা,কথিত আছে কাল ভৈরব এর অনুমতি ছাড়া কাশী প্রবেশ বা এখানে থাকা সম্ভব নয়|

 

অনেকের কাছেই কালভৈরব শান্তি, সমৃদ্ধি ও সাফল্যের দেবতা, তার বাহন কুকুর।

পুরাণ মতে, কালভৈরব কাল বা সময়ের শাসক। বহু প্রাচীন মন্দিরে কালভৈরবের মূর্তি রয়েছে। এবং তিনি সেই মন্দিরের রক্ষক হিসেবে

বিবেচিত হন।

 

আগামী পর্বে অন্য কোনো পৌরাণিক বিষয়

নিয়ে ফিরবো। চলতে থাকবে

ধারাবাহিক পুরান কথা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গণেশ চতুর্থীর শাস্ত্রীয় তাৎপর্য 

গণেশ চতুর্থীর শাস্ত্রীয় তাৎপর্য

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ গণেশ চতুর্থী। গণেশ শুধু আর মহারাষ্ট্র বা হিন্দি বলয়ের আরাধ্য দেবতা নন। তিনি বাঙালির খুব কাছের। সারা বাংলা জুড়ে এখন মহা সমারোহে গণেশ পুজো হয়।আজ আসুন জেনে নেয়া যাক গণেশ পূজোর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য।

 

সিদ্ধিদাতা গণেশের পূজা ঘরে সুখ, সমৃদ্ধি ও বৃদ্ধি নিয়ে আসে। শিব পুরাণে ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থীকে গণেশের জন্মদিন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। গণেশ পুরাণের মতানুযায়ী এই গণেশ অবতারের আবির্ভাব ঘটেছিল ভাদ্রপদ শুক্লা চতুর্থীতে।

 

অর্থাৎ পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে, যেদিন ভগবান শিব ও মা পার্বতীর পুত্র গণেশের জন্ম হয়েছিল, সেই দিনটি ছিল ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী। তাই এই দিনটিকে গণেশ চতুর্থী ও বিনায়ক চতুর্থী নামে নামকরণ করা হয়।

 

পার্বতী পুত্র গণেশ প্রারম্ভের দেবতা। তিনি বিঘ্ননাশক দেবতা তাই তার অপর নাম বিঘ্নেশ বা বিঘ্নেশ্বর, আবার তিনিই শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক, এবং মহাবল, মেধা ও বুদ্ধির দেবতা।

 

বিভিন্ন পুরানে গণেশের একাধিক নামের অস্তিত্ব পাওয়া যায় যেমন হেরম্ব, বক্রতুণ্ড, একদন্ত, মহোদর, গজানন, লম্বোদর, বিকট ও বিঘ্নরাজ।

এদের মধ্যে একদন্ত নামটি নামটি হয়েছে তার একটি গজ দন্তের জন্য। এনিয়ে একটি পৌরাণিক ব্যাখ্যাও আছে।

 

একটি ব্যাখ্যা অনুসারে একবার পরশুরাম দেবাদিদেব মহাদেবের সঙ্গে দেখা করার জন্য তাঁর গৃহে যান। কিন্তু গণপতি দরজাতেই তাঁকে আটকে দেন। ভেতরে প্রবেশ করতে দেন না। কারণ সেই সময় মহাদেব ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। তখনই ক্রোধান্বিত হয়ে পরশুরাম গণপতির একটি দাঁত কেটে দেন তার অস্ত্র দিয়ে|

 

আবার এটাও মনে করা হয় যে বেদব্যাসের সঙ্গে মহাভারত লিখতে বসে, গণেশের কলম ভেঙে গিয়েছিল। যেহেতু ব্যাসদেব তাঁকে শর্ত দিয়েছিলেন যে, লেখা থামাতে পারবেন না। তাই গণপতি নাকি নিজের একটা দাঁত ভেঙে তা কলম হিসেবে ব্যাবহার করে লেখা চালিয়ে যান।

সেই থেকে গণেশ একদন্ত এবং এই

রূপেই তাকে পুজো করা হয়।

 

আজ শাস্ত্র মতে গণেশ পুজো করুন।গণেশ আরতির সময়ে – ” ওম গণ গণপতায় নমঃ’ মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে সহজেই গণেশকে সন্তুষ্ট করে তার কৃপা লাভ করতে পারেন।বিঘ্নহর্তার আশীর্বাদে সব বিঘ্ন দূর হবে।

 

সবাইকে জানাই গণেশ চতুর্থীর শুভেচ্ছা।

ফিরে আসবো আরো অনেক পৌরাণিক এবং শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে।আগামী পর্বে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরান কথা – গণেশ পুজো কেনো আগে হয় 

পুরান কথা – গণেশ পুজো কেনো আগে হয়

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দেবতাদের মধ্যে সর্ব প্রথম গণেশের পুজোর রীতি প্রচলিত রয়েছে সেই পুরাকাল থেকে, তার পুজোর পর হয় অন্য সব পুজো। আজ গণেশ চতুর্থী উপলক্ষে এই বিশেষ পর্বে জানাবো এক পৌরাণিক ঘটনা যেখান থেকে এই রীতির সূত্রপাত।

 

একটি পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুসারে গণেশের মুন্ডচ্ছেদের পর যখন তার মাথায় হাতির মাথা স্থাপন করা হয় তখন দেবী পার্বতী তার প্রিয় সন্তানের মন কষ্ট কিছুটা দুর করতে এবং দেবতা দের মধ্যে তার মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে তাকে আশীর্বাদ করেন যে সমস্ত দেবতাদের মধ্যে

তার পূজো সবার প্রথমে হবে।

 

তবে গণেশের পূজো নিয়ে একটি পৌরাণিক ঘটনার উল্লেখ ও পাওয়া যায়। একবার

দেবলোকে কোন দেবতা শ্রেষ্ট এবং কার পূজা প্রথম হয়ে দরকার এই বিতর্ক দেখা দেয় এবং কিছুতেই এই বিতর্কের নিষ্পত্তি হচ্ছিল না, শেষে ঠিক হল, যে দেবতা ত্রিলোক পরিক্রমা করে একটি নিদ্দিষ্ট স্থানে প্রথমে পৌঁছবেন তিনিই শ্রেষ্ঠ এবং তাঁর পুজো প্রথম করা হবে।যেমন ভাবা তেমন কাজ|শুরু হলো প্রতিযোগিতা, অংশ নিলেন সব দেবতারা।ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে দেবতাগণ নিজ নিজ বাহনে চড়ে ত্রিলোক পরিক্রমা করতে চলে গেলেন।কিন্তু বুদ্ধিমান গণেশ সেই পথে গেলেননা তিনি তার পিতা মাতা অর্থাৎ শিব ও পার্বতীকে পরিক্রমা করলেন

 

সব দেবতারা যখন তার এই কর্মের ব্যাখ্যা চাইলেন তখন গণেশ বললেন পিতা মাতা তার সন্তানের জন্য ত্রিভুবন সমতুল্য|ত্রিলোকের সকল সুখ সম্পদ মাতা-পিতার চরণে বিরাজমান। মাতা-পিতার চরণের সেবাই সর্বোত্তম তাই পিতামাতার পরিক্রমা ত্রিলোক পরিক্রমার সমান।

 

যুক্তিতে জিতে গেলেন গণেশ, সব দেবতারা উপায় না দেখে গণেশদেবের কাছে পরাজয় স্বীকার করে নিলেন|সেই থেকে শুরু হয় সবার প্রথমে গণেশ পুজোর প্রচলন|আজও চলছে সেই রীতি।

 

সনাতন ধর্মে গণেশ বিঘ্নহর্তা এবং সিদ্ধিদাতা তাই তার আশীর্বাদে সব শুভ কাজ সফল হয় এবং বিঘ্ন নাশ হয়। তাই আজও যেকোনো শুভ কাজের সূচনা হয় গণেশ পুজোর মাধ্যমে।তাছাড়া বুদ্ধি এবং জ্ঞানের দেবতা রূপে পূজা করা হয়

গণেশকে। তাই ই যারা জ্ঞান বিজ্ঞান বা শিক্ষা নিয়ে চর্চা করেন তাদের আরাধ্যা দেবতা গণেশ।

 

ফিরে আসবো গণেশ সংক্রান্ত আরো কিছু

তথ্য এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নিয়ে

আগামী পর্বে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরান কথা – গনেশের মুন্ডুচ্ছেদ

পুরান কথা – গনেশের মুন্ডুচ্ছেদ

 

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রী জাতক

 

আসন্ন গণেশ চতুর্থী উপলক্ষে আজ পুরান কথায় এই পর্বে লিখবো সিদ্ধিদাতা গণেশ এবং

তার অদ্ভুত দর্শন রূপের সাথে জড়িয়ে

থাকা কিছু রহস্য ময় ঘটনা নিয়ে।

 

ভগবান গণেশের জন্ম, তাঁর শিরোচ্ছেদ এবং পরবর্তীতে তার স্থানে হাতির মাথা প্রতিস্থাপন নিয়ে

একাধিক শাস্ত্রে নানা রকম ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

একটি পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুসারে বিষ্ণুর কৃপায় পার্বতীর এক পুত্র হয় এবং পুত্রের অন্ন প্রাসনে আমন্ত্রিত শনির দৃষ্টি পড়ায় মুণ্ড লোপ হল তার। তখন পুনরায় তাকে জীবিত করতে সেখানে বসানো হয় হাতির মাথা।সেই থেকে ওই রূপেই বিরাজমান গণেশ।

 

আরেকটা ব্যাখ্যা আছে যেখানে বলা হয় পার্বতী ধূলি কণা নিয়ে খেলার ছলে এক শিশু গড়ছেন। মাথার মাটি কম পড়েছে। তখন উপায় না দেখে মাথার স্থানে এক হাতির মাথা কেটে বসিয়ে দিয়ে মূর্তির সম্পূর্ণ করেন।সেই কারণে এই রুপ |

 

অন্য একটি পৌরাণিক ঘটনা অনুসারে একদিন শিব কৈলাশ ফেরার পর গুহা দ্বারে একটি বালককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। সেই গুহাতেই ছিলেন স্নান করছিলেন পার্বতী। মা-এর আদেশ মেনে শিবকে ওই গুফায় প্রবেশ করতে দেননি গণেশ। ফলে গণেশের ওপর রেগে যান মহাদেব। এর পরই শিবের অনুচরদের সঙ্গে গণেশের যুদ্ধ বাধে। একে একে সবাই গণেশের শক্তির সামনে পরাজিত হন। এর পর ত্রিশূল দিয়ে নিজের অজান্তেই পুত্র গণেশের শিরোশ্ছেদ করেন মহাদেব।পরে গণেশের মৃত্যুতে ক্রুদ্ধ পার্বতীকে শান্ত করতে গণেশের প্রাণ ফিরিয়ে দেন শিব এবং তা করতে হাতির মাথা ওই বালকের দেহে যুক্ত করা হয় শিবের নির্দেশে।

 

মনে করা হয় উত্তরাখণ্ডের পিথোরাগড়ে যে পাতাল ভুবনেশ্বর গুহা অবস্থিত।সেখানেই রয়েছে গনেশের কাটা যাওয়া মাথা যা দেখতে আসেন বহু মানুষ এমনকি দেবতারাও আসেন পুজো দিতে|

 

আজ এই পর্ব এখানেই শেষ করছি|ফিরবো আগামী পর্বে।গণেশ সংক্রান্ত অন্য শাস্ত্রীয়

বিষয় নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরান কথা – দধীচীর আত্ম ত্যাগ 

পুরান কথা – দধীচীর আত্ম ত্যাগ

 

পন্ডিত জি ভৃগুর শ্রীজাতক

 

সনাতন ধর্ম শাস্ত্রে নানা রকম আত্ম ত্যাগের উল্লেখ আছে। যেমন শ্রী রামের রাজ্য ত্যাগ।পিতামহ ভিষ্মর রাজ সিংহাসন ত্যাগ। তবে সৃষ্টি রক্ষায় ঋষি দধীচী যে ত্যাগ করেন তাকে সর্ব শ্রেষ্ঠ ত্যাগ বলা হয়। আজ এই মহান ঋষির আত্ম ত্যাগ

নিয়ে লিখবো পুরান কথায়।

 

সেই ঘটনায় পরে আসছি আগে দেবাসুর দ্বন্দ্বর কথা বলবো কারন এখানে ইন্দ্র এবং তার অস্ত্র বজ্রর বিশেষ ভূমিকা আছে।

 

অসুর ও দেবতা,অর্থাৎ শুভশক্তি ও অশুভ শক্তি | এই দুই শক্তির দ্বন্দ্ব চলছে সেই পুরা কাল থেকে |দেবতা দের বলে বলিয়ান হয়ে একের পর এক অসুর আক্রমণ করে বসেছে দেবতাদের কেই |অধিকার করে নিতে চেয়েছে স্বর্গ মর্ত পাতাল | আবার সেই দেবতা দের ই কৌশলে রক্ষা করতে হয়েছে সৃষ্টি কে ভয়ানক সব অসুরদেয় হাত থেকে।

হিন্দুধর্মে দেবতাদের অনেক ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতে দেখা যায়, যেমন – আগ্নেয়াস্ত্র, ব্রহ্মাস্ত্র, গরুড়াস্ত্র, কৌমদকী, নারায়ণাস্ত্র, পশুপতাস্ত্র, শিবধনু, সুদর্শন চক্র, ত্রিশূল, বৈষ্ণবাস্ত্র, বরুণাস্ত্র ও বায়বাস্ত্র।যেকোনো যুদ্ধে, যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি তে ইন্দ্রর সাথে সদা থাকে তার বজ্র।

এই জাতীয় অস্ত্র আর কোনো দেবতা কে ব্যবহার করতে দেখা যায়না, হয় তো তিনি দেবরাজ তাই |অসীম শক্তিশালী এই অস্ত্র বহু শত্রুর বিনাশ করে একাধিক বার সৃষ্টি রক্ষা করেছে এই বজ্র | যেমন শিবের ত্রিশূল, কালীর খরগ, তেমনি ইন্দ্রের বজ্র যেন একে ওপরের পরিপূরক|অসুর তৃষিরা সুর এর সাথে যুদ্ধে ইন্দ্রের বজ্র ধ্বংস হয়।

 

তবে অসুর দের আক্রমণ থামেনি। পরবর্তী

শুভ ও অশুভের যুদ্ধে ইন্দ্রের প্রতিপক্ষ বৃত্রাসুর,তিনি প্রজাপতি ত্বষ্টার পুত্র এক অসুর। ইন্দ্র ত্রিশিরাকে বধ করলে ত্বষ্টা ত্রুদ্ধ হয়ে ইন্দ্রকে বিনষ্ট করার জন্য অগ্নিতে আহুতি দিয়ে বৃত্রাসুরকে উৎপন্ন করেন। ত্বষ্টার নির্দেশে বৃত্রাসুর গিয়ে ইন্দ্রকে আতর্কিতে গ্রাস করেন। বৃত্রাসুর মুখ হাঁ করলে ইন্দ্র অবশ্য দেহ সংকুচিত করে বেরিয়ে আসতে পারলেন, কিন্তু বহুকাল যুদ্ধ করেও বিত্রাসুরকে পারাজিত করতে পারলেন না।

 

অবশেষে ঋষিরা বৃত্রকে ইন্দ্রের সঙ্গে সন্ধি করার প্রস্তাব দিলে বৃত্র সব শুনে বললেন যে, তিনি তাতে রাজি আছেন। কিন্তু ঋষিদের কথা দিতে হবে যে, শুষ্ক বা আদ্র্র বস্তু দ্বারা, প্রস্তর কাষ্ঠ বা অস্ত্রশস্ত্র দ্বারা, দিবসে বা রাত্রিতে ইন্দ্র অথবা অন্যদেবতারা ওঁকে বধ করতে পারবেন না। ঋষিরা তাতে রাজি হলে সন্ধি স্থাপিত হল।অর্থাৎ দেবতা দের সব অস্ত্র সস্ত্র বৃত্যাসুর কে বধ করার ক্ষমতা হারালো|

 

এদিকে ক্রমে বৃত্যাসুর যখন অত্যাচারি হয়ে উঠতে লাগলো এবং এক সময় তাকে বধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় রইলো না, কিন্তু অস্ত্র নেই | তখন ঋষিরা একটা উপায় বাতলালেন | কোনো ত্যাগী এবং তেজময় সন্যাসীর অস্থি থেকে অস্ত্র তৈরী করে বৃত্যাসুর কে বধ করতে হবে |কিন্তু কে করবেন এই ত্যাগ?

 

ত্যাগের জন্য সদা প্রস্তুত সেই বৈদিক ঋষি হলেন দধীচি | দেবতারা দধীচীর কাছে তার অস্থি চাইলেন | এই অনুরোধ শুনে দধীচি নামক এই মহুমুনি সাধক আত্মত্যাগ করতে রাজি হন। দধীচিকে হত্যা করা হয় এবং তার দেহের হাড় দিয়ে বৃত্তাসুরকে হত্যার জন্য ইন্দ্রের জন্য একটি বিশেষ বজ্র তৈরি করা হয়|তার পর ইন্দ্র ও বৃত্তাসুরের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ হলো |অবশেষে সেই বজ্র দিয়ে ইন্দ্র বৃত্যাসুর কে যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং হত্যা করেন |ঋষি দের বর অটুট থাকলো এবং অশুভ শক্তির বিনাশ হলো, রক্ষা পেলো স্বর্গ মর্ত পাতাল।

 

ইন্দ্রের বজ্র একদিকে যেমন ত্যাগের প্রতীক অন্যদিকে শৌর্য ও বীর্যের প্রতীক, মহা বিনাশকারী এই অস্ত্র জন্ম নিয়েছে আত্মত্যাগের মাধ্যমে যা রক্ষা করে চলেছে স্বর্গের সিংহাসন|

 

আবার ফিরবো পুরান কথা নিয়ে।

থাকবে আরো একটি পৌরাণিক ঘটনা নিয়ে

শাস্ত্রীয় আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – তারাপীঠের ইতিহাস 

কালী কথা – তারাপীঠের ইতিহাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

প্রতিবছর কৌশিকী অমাবস্যায় জ্যোতিষ এবং তন্ত্র জগতের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে যে তারাপীঠ আকর্ষনের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয় সেই তারাপীঠের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে আজ এই বিশেষ পর্বে আলোচনা করবো।

 

শুরু করবো জয়দত্ত সদাগরের কথা দিয়ে ।

আজ থেকে প্রায় আটশো বছর আগের ঘটনা। তিনি ছিলেন বীরভূমের রত্নাগড় নিবাসী। একবার তিনি বাণিজ্যে প্রভূত সম্পদ, অর্থ লাভ করে বাড়ি ফিরছিলেন। চলার পথে অসুস্থতায় মৃত্যু হল তাঁর সঙ্গে থাকা প্ৰিয় পুত্রের। বাড়ি ফিরেই ছেলের অন্ত্যেষ্টি করবেন স্থির করে তিনি মাঝিদের বললেন, পুত্রের দেহটাকে ভালো করে সংরক্ষণ করে রাখতে।এদিকে সন্ধ্যা নেমেছে। রাত্রিটা তাই পথেই বিশ্রাম নিতে হবে। চলতে চলতে থামলেন এক বিশাল জঙ্গলের পাশে। স্থানটির নাম চণ্ডীপুর।

নিদ্রাহীন জয় দত্ত তখন মৃত ছেলের দেহ আঁকড়ে রাত জাগছেন। সেই সময় এক কুমারী মেয়ে নৌকার কাছে এসে দাঁড়ালেন। দেখা গেলো রাত্তির আকাশজুড়ে অপূর্ব এক জ্যোতি। অপূর্ব সুন্দরী সেই মেয়েটি জয়দত্তকে জিজ্ঞাসা করলেন,‘ও বাছা, এত নৌকা ভরে কী নিয়ে চলেছো গো?’ পুত্রশোকে জয়দত্তের মন ভারাক্রান্ত ছিল। তাই তিনি রাগত স্বরে মেয়েটিকে বললেন, ‘ছাই আছে’। সে কথা শুনে মেয়েটি ‘আচ্ছা’ বলে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে জয়দত্ত দেখলেন তাঁর নৌকার সব বাণিজ্যসামগ্রী, অর্থ ছাইতে পরিণত হয়েছে। পরদিন সকালে মাঝিরা রান্নায় বসল। খেয়েদেয়ে নৌকা নিয়ে যাত্রা করতে হবে। কাটা শোল মাছ কাছেই এক কুণ্ডের জলে ধুতে গেল তারা। কী আশ্চর্য! জলের স্পর্শ পেয়ে মাছটি জ্যান্ত হয়ে সাঁতরে চলে গেল। মাঝিরা দৌড়ে এসে জয়দত্তকে সব কথা জানাল। জয়দত্তের মনে পড়ল আগের রাতের সেই মেয়েটির কথা। তিনি বুঝতে পারলেন কোনো দেবী এসেছিলেন তার কাছে। অজ্ঞানতা বসত তিনি বুঝতে পারেননি।

 

সেই রাতে দেবী তারা স্বপ্নে দেখা দিলেন এবং বললেন কুণ্ডের জল ছেলের গায়ে ছড়ালেই সে বেঁচে উঠবে। পরদিন বশিষ্ঠকুণ্ডের জল ছেলের গায়ে ছেটাতেই ছেলে ‘তারা তারা’ বলে বেঁচে উঠল সে। শুধু তাই নয় তিনি হারানো সম্পদও ফিরে পেলেন। সেদিন রাতে বী তাঁকে স্বপ্নে দর্শন দিলেন। তাঁকে আদেশ করে বললেন যে এই জঙ্গলের মধ্যে একটা শ্বেতশিমুল গাছের নীচে একটা শিলাবিগ্রহ রয়েছে। সেই বিগ্রহ একটা মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে তার পুজোর ব্যবস্থা করবি। আমি হলাম উগ্রতারা। জঙ্গলের মধ্যে শ্মশানে আমার বাস।’ পরদিন সকালে জয় দত্ত আদেশ অনুসারে জঙ্গলে খুঁজে খুঁজে শ্বেতশিমুল গাছের নীচ থেকে শিলাবিগ্রহ আবিষ্কার করলেন এবং তার কাছেই পেলেন চন্দ্রচূড় শিবের মূর্তি। বশিষ্ঠকুণ্ড বা জীবিতকুণ্ডের সামনে তাড়াতাড়ি মন্দির নির্মাণ করে সেই শিলামূর্তি ও চন্দ্রচূড় শিবের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করলেন এবং কাছেই মহুলা গ্রামের এক ব্রাহ্মণকে নিত্যপূজার দায়িত্ব দিয়ে বিদায় নেন।

 

পরবর্তীতে বর্তমানের মন্দিরটি ১২২৫ বঙ্গাব্দে তৈরি করান মল্লারপুরের জগন্নাথ রায়|

 

আবার কিছু শাস্ত্র মতে এখানে সতীর ঊর্ধ্ব নয়নতারা বা প্রজ্ঞানয়ন পড়েছিল।শুধু তাই নয় সতীহারা শিব দেবীকে কামনা করে এখানে এসে সাধনা করেন। তিন লক্ষ জপ করেছিলেন। তাঁর সাধনায় তুষ্ট হয়ে তারা বলেছিলেন, তিনি আবার উমারূপে তাঁর কাছে স্ত্রী রূপে যাবেন। বশিষ্ঠ ঋষি বিষ্ণুর দ্বারা আদিষ্ট হয়ে তারা পীঠের সেই স্বেত শিমুল গাছের নিচে বসে সাধনা করেছিলেন।

এবং সিদ্ধি লাভ করে ছিলেন।

 

সমুদ্র মন্থনে ওঠা বিষ ওপান করে মহাদেব যখন নীলকণ্ঠ তখন ‘দেবী তারা’ শিবকে আপন সন্তানের মতো কোলে নিয়ে আপন স্তন্য থেকে অমৃত পান করান সেই অমৃত পান করে শিবের বিষজ্বালা দূর হল। সেই থেকে দেবীর নাম হল তারিণী। তিনি শিবকে তারণ করেছেন। এই বিশ্বকেও তিনি তারণ করেন।

সেই তারিণী থেকেই তারা নামের সৃষ্টি।

 

পরবর্তীতে সাধক বামা ক্ষেপা থেকে সাধক কমলা কান্ত সবার ও অন্যতম প্ৰিয় সাধন স্থল ছিলো এই তারাপীঠ। বামা ক্ষেপা তো তার সারাটা জীবনই কাটিয়েছেন এই তারা পীঠ মহাশ্মশানে। সেই সময় দেশ বিদেশ থেকে বহু বিখ্যাত মানুষ তারাপিঠে আসতেন শুধু একবার এই মাতৃ মন্দির দর্শন করতে এবং বামা ক্ষেপার আশীর্বাদ পেতে। সেই পরম্পরা অবশ্য আজও চলছে। যদিও দ্বারকা নদী দিয়ে বহু জল প্রবাহিত হয়েছে। আজ বামা ক্ষেপাও নেই সশরীরে তবু মানুষের আস্থা আছে। ভক্তি আছে। আর আছে তারাপীঠের সমৃদ্ধ ইতিহাস।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে এমনই কিছু

অজানা এবং রহস্যময় আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে

শাস্ত্রীয় আলোচনায়। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – দশমহা বিদ্যা রূপে দেবী তারা

কালী কথা – দশমহা বিদ্যা রূপে দেবী তারা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দশ মহাবিদ্যা,তন্ত্র বা কৌশিকী অমাবস্যা নিয়ে আলোচনা শুরু করলে দেবী তারা ও তারাপীঠ প্রসঙ্গ আসবেই কারন কৌশিকী অমাবস্যা হলো তারা নিশি যা দেবী কৌশিকীর আবির্ভাব তিথি রূপে পালিত হয়, দেবী কৌশিকীর একটি বিশেষ রূপ দেবী তারা,আবার দেবী তারা দশ মহাবিদ্যার অন্যতম দেবী।তাই কৌশিকী অমাবস্যার ঠিক আগে আজ দশ মহা বিদ্যা রূপে দেবী তারার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য নিয়ে লিখবো।

 

দশ মহাবিদ্যার দ্বিতীয় রূপ হল তারা। ভীষণ দর্শনা দেবী কালীর ভয়ে মহাদেব ভীত হলে সতী দ্বিতীয় বার আবির্ভূত হন তারা রূপে। তাঁর গায়ের রং নীল, নব যৌবনা, পরিধানে ব্যাঘ্র চর্ম। দেবীর চারটি হাত। দেবীর অবস্থান প্রজ্জলিত চিতার মধ্যে। তাঁর বাম পা শিবের বুকে অবস্থিত। তন্ত্রশাস্ত্রে ইনি মহানীল সরস্বতী।

 

শাস্ত্র মতে সমুদ্রমন্থনের পর স্বয়ং মহাকাল তার আরাধনা করে ছিলেন এবং তাতে সন্তুষ্ট হয়ে মা তারা তাঁকে পুত্ররূপে গ্রহণ করেন|হিন্দু ধর্ম ছাড়াও বৌদ্ধ ধর্মে দেবী তারার উল্লেখ রয়েছে

 

বাংলার তারাপীঠে অধিষ্টান করছেন দেবী তারা|জ্যোতিষ ও তন্ত্র জগতে প্রসিদ্ধ এই তারাপীঠ এবং তারাপীঠ মহা শ্মশান যা তন্ত্র সাধনার এক উৎকৃষ্ট স্থান কারন এটি কোনো সাধারণ শ্মশান নয় এটি মহা শ্মশান এই মহাশ্মশানেই জীবন আর মৃত্যুর পটভূমি নিত্য রচনা করে চলেন দেবী তারা|প্রচলিত বিশ্বাস বলে তারাপীঠের মহাশ্মশানেও জ্যোতিরূপে বাস করেন দেবী।

 

কিংবদন্তী অনুসারে দ্বারকা নদী মহাশক্তির উৎস। এই নদীজলে স্নান করলেই সিদ্ধিলাভের যোগ্যতা অর্জন করেন মানুষ। দূর হয় সব পাপ|আশ্চর্যজনক ভাবে এই নদী উত্তর মুখী|তারাপীঠের পঞ্চমুন্ডীর আসন ও জগৎ প্রসিদ্ধ এই পঞ্চমুণ্ডের আসন আলাদা। এখানে পাঁচটি মুণ্ড সাপের, ব্যাঙের, খরগোশের, শিয়ালের এবং মানুষের। এই আসনে বসেই বহু যুগ পূর্বে দেবীকে তুষ্ট করে তারাপীঠকে সিদ্ধপীঠে পরিণত করেছিলেন ঋষি বশিষ্ঠ, পরবর্তীতে বামা ক্ষেপা|মাতারার মুল প্রস্তর নির্মিত মূর্তি টি রয়েছে একটি ধাতব মূর্তির অভ্যন্তরে|এই মূর্তিটি ভীষণা চতুর্ভূজা, মুণ্ডমালাধারিণী এবং লোলজিহ্বা মূর্তি। এলোকেশী দেবীর মস্তকে রয়েছে একটি রৌপ্যমুকুট |বহির্মূর্তিটি সাধারণট শাড়ি-জড়ানো অবস্থায় গাঁদা ফুলের মালায় ঢাকা অবস্থায় থাকে। মূর্তির মাথার উপরে থাক একটি রূপোর ছাতা।

 

তারাপীঠ সিদ্ধ পীঠ না কেবল মাত্র একটি জাগ্রত শক্তি পীঠ বা উপপীঠ এ নিয়ে বিতর্ক ও মতান্তর বহু যুগ ধরে চলে আসছে|কথিত আছে বশিষ্ট দেব সাধনা করতেন কামাখ্যায় কিন্তু কোনো কারনে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি কামাখ্যা ত্যাগ করেন ও বাংলার বীরভূমের এই বিশেষ স্থানে এসে পঞ্চমুন্ডীর আসন প্রতিষ্ঠা করে দেবী উগ্রতারার সাধনা শুরু করেন ও দুর্লভ কৌশিকী অমাবস্যা তিথিতে তিনি সিদ্ধি লাভ করেন|পরবর্তীতে ধীরে ধীরে এই স্থান মাহাত্ম লোক মুখে প্রচারিত হয় এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠে তারাপীঠ।

 

ফিরে আসবো কৌশিকী অমাবস্যা উপলক্ষে আরো একটি বিশেষ পর্ব নিয়ে

আগামী কাল।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – পুঁটে কালী

কালী কথা – পুঁটে কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার সাথে দেবী কালীর সম্পর্ক অতি প্রাচীন এবং গভীর।বাংলার প্রায় সব জেলায় রয়েছে কিছু প্রাচীন ঐতিহাসিক কালী মন্দির।তাদের নিয়ে রয়েছে অনেক কিংবদন্তী। এমনই সব মন্দিরের কথা বলছি কৌশিকী অমাবস্যা উপলক্ষে এই কালী কালী কথায়।আজ কালী কথায় জানাবো পুঁটে কালীর কথা।

 

কলকাতার বড়ো বাজার অঞ্চলে কালীকৃষ্ণ ঠাকুর স্ট্রিটে অবস্থিত বিখ্যাত পুঁটে কালী মন্দির। ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ এবং প্রাচীন।তখন ভারত শাসন করছেন সম্রাট আকবর। কলকাতা তখন ও শহর হয়ে ওঠেনি । উত্তর কলকাতার আজকের কালীকৃষ্ণ ঠাকুর স্ট্রীট তখন ছিলো গঙ্গা তিরবর্তী এক জনপদ।চারিপাশ ছিল জঙ্গলে ভর্তি।

ডাকাতরা নরবলী দিয়ে ডাকাতি করতে যেতো।সেই সময় থেকে হয়ে আসছে পুটে কালীর পুজো।

 

বর্তমান মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন তান্ত্রিক মানিকচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।শোনা যায় তান্ত্রিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ধমানের তৎকালীন মহারাজার দুরারোগ্য ব্যাধি সারিয়ে দিলে মহারাজা তাঁকে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেন এবং লক্ষ ব্রাহ্মণ ভোজন করান। দেবীর বর্তমান সেবাইতরা রাজা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৌহিত্র বংশ।

 

প্রথম পাকা মন্দির স্থাপিত হয়েছিল ১৫৫৮ খ্রিষ্টাব্দে|যদিও প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে এই দেবী মূর্তি এখানে আরো আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিলো।১৯৩০ সালে মন্দিরের সংস্কার করা হয় মন্দিরটি চারচালা ও তিনটি চূড়াবিশিষ্ট। চূড়াগুলির উপর চক্র, ত্রিশূল ও পতাকার চিহ্ন আছে। মন্দিরটির তলায় একটি পাতালকক্ষ আছে|মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত কালীমূর্তিটি ছয় ইঞ্চি লম্বা|

 

মন্দির এবং দেবী মূর্তির এই অদ্ভুত নামকরণ প্রসঙ্গে দুরকম ব্যাখ্যা রয়েছে|কেউ কেউ মনে করেন পুঁটি” অর্থে ছোটো মেয়ে বোঝায়|এই মন্দিরের কালীমূর্তিটির উচ্চতা মাত্র ছয় ইঞ্চি এত ছোটো মূর্তি বোঝাতেই তাই “পুঁটিকালী” বা নামটির প্রচলন হয় এবং পরবর্তীতে লোক মুখে তা বিকৃত হয়ে “পুঁটেকালী” হয়ে যায়।

 

নামের দ্বিতীয় ব্যাখ্যা অনুসারে একবার মন্দিরে হোম চলা কালীন গঙ্গার খাদ থেকে একটি পুঁটিমাছ লাফিয়ে হোমকুণ্ডের মধ্যে পড়ে যায়|পড়ে অর্ধদগ্ধ মাছটিকে তুলে জলে ফেলে দিতেই সেটি আবার জীবন্ত হয়ে হয়ে ওঠে এবং অলৌকিক ঘটনার জন্য দেবীর নাম হয় “পুঁটিকালী” বা “পুঁটেকালী”|

 

পুঁটে কালীর মন্দিরে পূজা হয় তন্ত্রমতে। দীপান্বিতা কালীপূজার রাতে প্রতিমার স্বর্ণবেশ হয় এবং ভৈরবী পূজাও অনুষ্টিত হয়|এখানে আজও কালী পূজা উপলক্ষে কুমারী পূজা হয়|এছাড়াও কৌশিকী অমাবস্যা সহ বিশেষ বিশেষ তিথিতে ছাগ বলীর ও ব্যবস্থা করা হয়|দেবীর উদেশ্যে আমিষ ও নিরামিষ দু রকম ভোগ ই নিবেদিত হয়|লক্ষণীয় বিষয় এই মন্দিরে দেবী কালীর পাশে দেবী শীতলার ও পূজা করা হয় নিষ্ঠা সহকারে|

 

আজকের কালী কথা পর্ব এখানেই

শেষ করছি।আবার ফিরে আসবো

যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কৌশিকী অমাবস্যা এবং তন্ত্র শাস্ত্র 

কৌশিকী অমাবস্যা এবং তন্ত্র শাস্ত্র

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

সনাতন ধর্মে তন্ত্র মন্ত্র এবং যন্ত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। এই সবের সাফল্য নির্ভর করে সঠিক স্থান এবং তিথির উপরে। সেদিক দিয়ে কৌশিকী অমাবস্যা তন্ত্র শক্তি প্রয়োগের শ্রেষ্ঠ তিথি।

 

শুধু হিন্দু মতে নয়, বৌদ্ধ মতেও তন্ত্র সাধনার জন্য এই দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ|সহজ ব্যাখ্যার কৌশিকী অমাবস্যা অশুভ শক্তির উপর শুভ শক্তির জয়কে উদযাপন করার একটি ধর্মীয় উৎসব যা মহাসমারোহে পালিত হয়ে আসছে দেশের শক্তি উপাসকদের দ্বারা যুগ যুগ ধরে|

 

তারাপীঠে কৌশিকী অমাবস্যা তিথি তারানিশি রূপে পালিত হয়|আজ আপনাদের কৌশিকী অমাবস্যা ও তারাপীঠ এবং তন্ত্র শাস্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে বলবো|

 

তারা পীঠ ও দেবী তারার সাথে এই কৌশিকী অমাবস্যা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত তার কারন দশ মহাবিদ্যার অন্যতম মা তারা এই তিথি তে মর্ত ধামে আবির্ভূত হন|তারাপীঠ শ্মশানে জ্যোতিরূপে বাস করেন মা তারা|কৌশিকী অমাবস্যায় এই স্থানেই সাধনা করে সিদ্ধি লাভ করেন বশিষ্ঠ দেব এবং বাবা ক্ষেপা|প্রতি বছর কৌশিকী অমাবস্যা উপলক্ষে তারাপীঠে এই উপলক্ষে বিশাল উত্‍সব হয়|দেশ বিদেশ থেকে তান্ত্রিকরা আসেন এই পবিত্র তিথিতে তন্ত্র ক্রিয়া সম্পন্ন করে নিযেদের কার্য সিদ্ধি করতে।

 

তন্ত্রে কৌশিকী অমাবস্যার অর্থ হল তারা নিশি।তন্ত্র মতে অনেক কঠিন ও গুপ্ত সাধনা এই অমাবস্যায় করলে আশাতীত ফল মেলে|তন্ত্র শাস্ত্র মতে সাধনার মাধ্যমে সাধক কুলকুণ্ডলিনী চক্রকে জয় করে ও সীমাহীন ক্ষমতার অধিকার লাভ করে।

তন্ত্র মতে এই তিথিতে এক বিশেষ মুহূর্তে স্বর্গ ও নরক দুইয়ের দরজা মুহূর্তের জন্য খোলে ও সাধক নিজের ইচ্ছা মতো ধনাত্মক অথবা ঋণাত্মক শক্তি গ্রহন করেন ও সিদ্ধি লাভ করেন|।

 

জ্যোতিষ জগতেও এই তিথির আলাদা গুরুত্ব আছে তন্ত্র মতে বা পূজা ও হোম যজ্ঞর মাধ্যমে গ্রহের অশুভ প্রভাব কাটাতে এই এই কৌশিকী অমাবস্যা সব থেকে কার্যকর সময় হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে|মনে করা হয় এই দিন তারাপীঠে পুজো দিলে সকল মনোস্কামনা পুর্ন হয় এবং পুজো দিয়ে দ্বারকা নদীতে স্নান করলে শত জন্মের পুন্যলাভ হয়|

 

আগামী পর্ব গুলিতে কালী কথায় কৌশিকী অমাবস্যা, তন্ত্র এবং জ্যোতিষ জগতের আরো অনেক তথ্য এবং তার ব্যাখ্যা নিয়ে

ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – দেবী কৌশিকীর শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা 

কালী কথা – দেবী কৌশিকীর শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

 

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রীজাতক

 

আসন্ন কৌশিকী অমাবস্যার প্রাক্কালে আজকের এই বিশেষ পর্বে আসুন জেনে নিই কে এই দেবী কৌশিকী এবং শাস্ত্রে তার সম্পর্কে কি কি তথ্য আছে।

 

শাস্ত্রে আছে পূর্ব জন্মে দেবী পার্বতী যখন সতী রূপে দক্ষ যজ্ঞ স্থলে আত্মাহুতি দেন তখন দেবীর গাত্র বর্ণ হয় কালো মেঘের মতো। তাই ভোলানাথ তাঁকে কালিকা ডাকতেন। একদিন অসুর দের দ্বারা পীড়িত ক্লান্ত দেবতারা যখন কৈলাশে আশ্রয় নিলেন, শিব সব দেবতাদের সামনেই পার্বতীকে বললেন, “কালিকা তুমি ওদের উদ্ধার করো।” সবার সামনে ‘কালী’ বলে ডাকায় পার্বতী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ, অপমানিত ও ক্রোধিত মনে মানস সরোবরের ধারে কঠিন তপস্যা করলেন।

 

তপস্যান্তে শীতল মানস সরোবরের জলে স্নান করে নিজের দেহের সব কালো রঙ পরিত্যাগ করলেন ও পূর্ণিমার চাঁদের মতো গাত্র বর্ণ ধারণ করলেন।দেবীর দেহ হতে নির্গত ওই কালো কোশিকাগুলি থেকে এক অপূর্ব সুন্দর কৃষ্ণবর্ণ দেবীর সৃষ্টি হয়। ইনি দেবী কৌশিকী| এই কৌশিকী অমাবস্যার তিথিতেই দেবীর উৎপত্তি হয় এবং তিনি শুম্ভ ও নিশুম্ভকে বধ করেন। তাই এই অমাবস্যার নাম কৌশিকী অমাবস্যা।

 

শ্রীশ্রীচণ্ডীতে বর্ণিত মহা সরস্বতী দেবীর কাহিনীতে বলা আছে পুরাকালে একবার শুম্ভ ও নিশুম্ভ কঠিন সাধনা করে ব্রহ্মাকে তুষ্ট করলে চতুরানন তাঁদের বর দেন যে কোনও পুরুষ তাঁদের বধ করতে পারবেন না৷ শুধু কোনও অ-যোনি সম্ভূত নারী তাঁদের বধ করতে পারবেন। অর্থাৎ এমন এক নারী, যিনি মাতৃগর্ভ থেকে জন্ম নেননি, তাঁর হাতেই এই দুই অসুর ভাই-এর মৃত্যু হবে। এই বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আবির্ভাব হয় দেবী কৌশিকীর।

 

মৎস পূরাণ এবং মার্কন্ডেয় পূরাণে বলা হয়,অত্যাচারি অসুর দ্বয় শুম্ভ ও নিশুম্ভকে বধ করতে দেবী পার্বতী সাধনা শুরু করেন। তপস্যার পর, নিজের শ্বেতশুভ্র গায়ের রঙ পরিত্যাগ করে ,উজ্জ্বল কালো বর্ণে ভয়াল রূপ ধারণ করেন দেবী। সেই রূপে দেবী পার্বতী হয়ে ওঠেন ‘কৌশিকী’। আর এই কৌশিকীই অমাবস্যার এক বিশেষ কালক্ষণে দেবী বধ করেন শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামের দুই অসুরকে। সেই কালক্ষণকে স্মরণ করেই অনুষ্ঠিত হয় কৌশিকী অমাবস্যার পূজা।

 

সহজ ব্যাখ্যায় কৌশিকী অমাবস্যা অশুভ

শক্তির উপর শুভ শক্তির জয়কে উদযাপন করার একটি ধর্মীয় উৎসব যা মহাসমারোহে পালিত হয়ে আসছে দেশের শক্তি উপাসকদের দ্বারা যুগ যুগ ধরে|

 

শাস্ত্র মতে গ্রহ দোষ খণ্ডনের ক্ষেত্রে এই অমাবস্যা অন্যান্য সব অমাবস্যার থেকে অনেকটাই এগিয়ে।

কারন কৌশিকী অমাবস্যার একটি বিশেষ মুহূর্তে সাধকের করা তন্ত্র সাধনা সব দিক দিয়ে সফল হয় এবং দেবী কৌশিকীর আশীর্বাদে সব

অন্ধকার দুর হয়।

 

আবার পরের পর্বে কৌশিকী অমাবস্যা সংক্রান্ত কিছু শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা থাকবে।

থাকবে জ্যোতিষ এবং তন্ত্র জগৎ নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।