পুরাণ মতে দেবী কালী হলেন মহামায়ার কালিকা শক্তিরূপ। অসুরদের অত্যাচারে ও মানব সমাজের কান্না হাহাকার দেখে মহামায়া ভয়ঙ্কর ক্রোধ ধারণ করেন। সেই সময় তার শরীর থেকে তীব্র জ্যোতি বের হতে থাকে তখনই কালো রূপ ধারণ করেন মহামায়া। মায়ের এই শ্যামা রূপই পূজিত হন সর্বত্র। কিন্তু কুলটি তে রয়েছে এক অদ্ভুত কালী মন্দির যেখানে সাদা রূপে পূজিতা হন মা কালী|শোনা যায় এইরূপে ভবতারিণী প্রথম দর্শন দিয়েছিলেন সাধক রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে।সাধক মধুময় ঘোষ স্বপ্নাদেশ পেয়ে পুজো শুরু করেন এখানে । তবে কালীর এমন সাদা রূপের আরাধনা, সচরাচর দেখতে পাওয়া যায়না এই বাংলার বুকে।পশ্চিম বর্ধমান জেলায় একমাত্র এখানেই রয়েছে সাদা রংয়ের কালীমূর্তি। বাংলা জুড়ে সাদা রংয়ের কালীমূর্তি বিশেষ দেখতে পাওয়া যায় না। পাশের জেলা বাঁকুড়া একটি জায়গায় এই রূপে কালীপুজো হয়। তবে কুলটির ফলহারিণী কালী জেলার একমাত্র সাদা রূপের কালীপুজো। এই দেবী একইসঙ্গে অসুরদলনী ও অন্যদিকে রক্ষাকর্ত্রীওএই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা এবং পূজারী মধুময় ঘোষ স্বপ্নাদেশ পেয়ে এরূপে কালীর পুজো শুরু করেছেন।তিনি জানিয়েছেন, দেবী কালিকা তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন নিত্য পূজা করার জন্য। আর দেবী, এইরূপ আগে থেকেই নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। তারপর থেকে নিয়মিত পুজো নিয়ে আসছেন কুলটির ফলহারিণী কালী।আজ ওই নিদ্দিষ্ট পরিবারের পাশাপাশি গ্রামের মানুষও দেবী কালিকার সাধনায় মেতে ওঠেন। প্রত্যেক অমাবস্যায় জাঁকজমক সহকারে হয় পুজো। স্থানীয় মানুষজনও সেই পুজোয় অংশগ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠাতার বাড়ির পাশেই এক চিলতে মন্দিরে পুজো নেন কালীসাধক রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে দর্শন দেওয়া ভবতারিণী।ভবতারিণীর এই মন্দিরে সম্পূর্ণ প্রস্থর নির্মিত মূর্তি রয়েছে দেবীর। পাশের জেলা বাঁকুড়ার শুশুনিয়া থেকে মূর্তিটি নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সেই মূর্তির নিত্য পুজো হয়। প্রতিষ্ঠাতা মধুময় ঘোষ জানিয়েছেন, স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পরেই তিনি বাঁকুড়ায় উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সেখানে গিয়ে তিনি মায়ের মূর্তিটি পান এই রূপেই। তাই সেই রুপেরই আরাধনা শুরু করেছেন তিনি।আগামী পর্বে অন্য কোনো কালীতীর্থ নিয়ে ফিরে আসবো যথা সময়ে|পড়তে থাকুন|
কালীতীর্থ – রত্নাবলী
রত্নাবলী কালী সতীর ৫১ পীঠের একটি হুগলির খানাকুলের রত্নাবলী কালী।কথিত আছে, শ্বেত পলাশ গাছের নিচে দেবীর দক্ষিণ স্কন্ধ অর্থাৎ ডান দিকের কাঁধ পড়েছিল। পরবর্তীতে স্বপ্নাদেশ পেয়ে এখানে মন্দির বানান সাধক স্বরূপানন্দ ব্রহ্মচারী। কথিত খানাকুলের উবিদপুর দিয়ে একসময় রত্নাকর নদী বয়ে যেত। সেই নদী আজ আর নেই। নদীর চিহ্ন হিসেবে পড়ে রয়েছে মাজা এক খাল। প্রশ্ন কী ভাবে হারিয়ে গেল সেই নদী স্থানীয়রা বলেন, একসময় এই নদী ছিল বিশাল চওড়া। গুপ্ত বৃন্দাবনের সাধক অভিরাম গোস্বামী এই নদীতটে একদিন স্নান করছিলেন। হঠাৎই নদীর জল ফুলে ফেঁপে জোয়ার আসে। সেই জোয়ারের জলে অভিরামের কৌপিন ভেসে চলে যায়। প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ সাধক তখন নদীকে শাপ দেন। বলেন, এই মুহূর্তে তুই অন্ধ হয়ে যা। আমি যতদিন বেঁচে থাকব ততদিনই তুই অন্তর্বর্তী শিলা হয়ে মাটির তলা দিয়ে বইবি। ওপরে ব্যাপ্তি আর থাকবে না। কথিত আছে এর পর থেকেই নদীর জল শুকোতে থাকে। নদী শুকিয়ে হয়ে যায় খাল যাকে এলাকায় কানা দ্বারকেশ্বর খাল বলেই পরিচিত।আদিকালের রত্নাকর নদী তথা বর্তমানের কানা দ্বারকেশ্বর খালের ধারেই কালীমন্দির। মন্দিরের পুরোহিতদের থেকে জানা গেল, আনুমানিক ৭১২ সালে খানাকুলে প্রতিষ্ঠিত হয় ঘন্টেশ্বর শিবমন্দির। তার দু’বছর পর অর্থাৎ ৭১৪ সালে মা কালীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন সাধক স্বরূপানন্দ ব্রহ্মচারী। তখন থেকেই দেবীর পূজা হয়ে আসছে। আজও একইভাবে পূজিত হন মা। প্রতি অমাবস্যায় ঘটা করে পুজো হয়। যারা জানেন, তাঁরা ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে আসেন। প্রতিষ্ঠার সময় এই মন্দিরটি ছিল একটি তালপাতার কুঁড়েঘর। বহু বছর পর বর্ধমানের মহারাজা এই মন্দিরটি পাকা করেন। সেই কাঠামোই এখনও রয়েছে।প্নাদেশ পাওয়া স্বরূপানন্দ ব্রহ্মচারী পাথরে পরিণত হওয়া দেবীর দক্ষিণ স্কন্ধটি মঙ্গলঘটের নীচে রেখে দেবীমূর্তির প্রতিষ্ঠা করেন। রত্নাকর নদীর তীরে মন্দিরটি গড়ে উঠেছিল বলেই এখানে মায়ের নাম রত্নাবলী বলে মনে করেন অনেকে। সাধক স্বরূপনারায়ণ মহারাজ পঞ্চমুণ্ডির আসনে ঘটে পুজো শুরু করেন। তার বহু কাল পরে মায়ের মূর্তি স্থাপন করা হয়। তাও আনুমানিক প্রায় ১২০০ বছর বা তারও আগের হবে।’এখানে মায়ের চার হাত।যথারীতি এই মন্দিরের প্রথম পূজারী ছিলেন স্বরূপানন্দ মহারাজ। ধ্যানমগ্ন অবস্থায় উজ্জ্বল আলোর বিচ্ছুরণ তাঁর মুখে এসে পড়েছিল। তিনি তা দেখতে পান। তখনই মায়ের এই আদেশ পান স্বরূপানন্দ এবং সূচনা হয় পুজোর|মন্দিরের পাশেই রয়েছে ঘণ্টেশ্বর শিবমন্দির যেখানে যা এই স্থানের অধ্যায়ত্মিক আরো বৃদ্ধি করে|যা দেখতে আসেন দূর দুরন্তের মানুষ|চলবে কালীতীর্থ ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য কোনো কালী মন্দির নিয়ে পড়তে থাকুন|
ঠাকুর রামকৃষ্ণর জন্মতিথিতে প্রণাম ও শ্রদ্ধার্ঘ্য
আজ রামকৃষ্ণদেবের 187 তম আবির্ভাব তিথিকথিত আছে, তিনি যখন জন্মগ্রহন করেছিলেন, কামারপুকুর বাটিতে তাদের শিব মন্দির চন্দ্রালোতে আলোকিত হয়ে উঠেছিল। রামকৃষ্ণদেবের গড়নে ছিল দৈবিকভাব|সেটাই স্বাভাবিক, তিনি কোনো স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন না, একাধারে সাধক ও দার্শনিক এই মানুষ টাকে হয়তো এখনো বাঙালি ঠিক চিনে উঠতে পারেনি, তার অবতার তত্ত্ব নিয়েও দ্বিমত আছে, তবে, সাধনার যে উচ্চস্তরে তিনি গিয়েছিলেন তা, কল্পনা করা কঠিন|শ্রী রামকৃষ্ণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসেছিলেন তার লীলা করতে, পরমহংসদেব যখন জগৎ সমক্ষে উদয় হন, তখন ঘোরতর ধর্মবিপ্লব চলছে চারপাশে, “জড়বাদী মুক্তকণ্ঠে বলছেন – “জড় হইতেই সমস্ত,জড়ের সংযোগেই আত্মা, জড় ব্যতীত আর কিছু নাই।“ব্রাহ্ম সমাজ বলছে – “বেদ, বাইবেল, কোরান প্রভৃতি কিছুই মানিবার আবশ্যক নাই, কোনটিই অভ্রান্ত নয়, কোনটিই ঈশ্বর বাক্য নয়”এমন সময় পরমহংসদেব প্রচার করলেন “কোন ধর্ম কোন ধর্মের বিরোধী নয়। বাহ্য দৃষ্টিতেই বিরোধ কিন্তু সকল ধর্মই মূলত এক কথা বলেআরো সহজ করে বললেন ” যত মত ততো পথ “তিনি শিব জ্ঞানে জীব সেবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তার ভাব শিষ্য নরেন কে, সেই আদর্শ আজও এগিয়ে নিয়ে চলেছে রামকৃষ্ণ মঠ,জন্ম তিথিকে মহা সমারোহে উদযাপন করা হয় মঠের প্রতিটি শাখায়,আজ প্রনাম ও শ্রদ্ধা জানাই এই মহান সাধককে, তারচরনে রইলো শত কোটি প্রনাম ও শ্রদ্ধার্ঘ্য |
কালীতীর্থ – বর্গ ভীমা
আজ কালীতীর্থ পর্বে আরো একটি সতী পীঠ নিয়ে লিখবো যা বর্গভীমা নামে খ্যাত পুরাণে কথিত একান্ন সতীপীঠের একপীঠ তমলুকের দেবী বর্গভীমা। কথিত আছে বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের খন্ডিত দেবী সতীর বাম পায়ের গোড়ালি এখানে পড়েছিল। পুরান মতে দেবী বর্গভীমা এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। এছাড়াও দেবীর মন্দির নির্মাণ নিয়ে আরো কয়েকটি মিথ প্রচলিত আছে।দেবী বর্গভীমা মায়ের মন্দির নির্মাণের পেছনে একটি অলৌকিক কাহিনী বর্তমান। এই কাহিনীটি গড়ে উঠেছে চন্ডীমঙ্গল কাব্যের নায়ক ধনপতি সওদাগরকে নিয়ে। ধনপতি সওদাগর তাম্রলিপ্ত বন্দর হয়ে বাণিজ্যতরী নিয়ে সিংহল যাত্রাকালে দেখতে পান এক লোক সোনার কলসি নিয়ে যাচ্ছে। ধনপতি সওদাগর কৌতূহলবশত ওই লোককে জিজ্ঞেস করেন এই সোনার কলসি কোথায় পেয়েছে, উত্তরে সেই লোক বলেন জঙ্গলের মধ্যে একটি পবিত্র কুণ্ড আছে যেখানে পেতলের পাত্র ডোবালে সোনার পাত্র হয়ে যায়। এরপর ধনপতি সওদাগর অনেক পেতলের পাত্র পবিত্র কুন্ডের জলে ডুবিয়ে সোনায় রূপান্তরিত করে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। বাণিজ্যে প্রভূত লাভ হয়। ফিরে আসার সময় তাম্রলিপ্ত বন্দরে নোঙ্গর করে ঐ পবিত্র কুণ্ড ঘিরে দেবী মায়ের মূর্তি ও মন্দির নির্মাণ করেন। তমলুকের বর্গভীমা মায়ের মন্দির নির্মাণ নিয়ে নানান কাহিনী থাকলেও পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এটি একটি সতীপীঠ হিসেবেই দেবী পুজিত হয়।দেবীর মন্দির নির্মাণ নিয়ে আরও দুটি কাহিনী উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান লাভ করেছে। একটি কাহিনী হলো শোল মাছের কাহিনী। কথিত আছে তাম্রলিপ্ত নগরীর রাজা তাম্রধ্বজ দেবীবরণ মায়ের মন্দির নির্মাণ করে। রাজা তাম্রধ্বজের নিয়োজিত এক জেলে প্রত্যহ রাজপরিবারে মাছ সরবরাহ করত। রাজ পরিবারে প্রতিদিন জ্যান্ত মাছ নিয়ে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঐ জেলে বউয়ের প্রতিদিন জ্যান্ত মাছ রাজ পরিবারের জন্য জোগাড় করা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। এরকম একদিনে ওই জেলে বউ মরা মাছ নিয়ে জঙ্গলের সম্পুর্ন পথ দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে রাজপরিবারের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় রাস্তায় অপরিচিতা নারীর দেখা পান। ঐ জেলে বউ তার কথা সবিস্তারে সেই নারীকে বলেন। তখন সেই অপরিচিতা নারী জেলে বউকে বলেন তার মরা মাছ জীবিত করা সম্ভব। জঙ্গলের মধ্যে এক কুন্ড আছে সেই কুন্ডের জল মাছের উপর ছড়ালেই মরা মাছ জ্যান্ত হয়ে যাবে। এই কথা বলার পর ওই অপরিচিতা নারীর দেখা আর পাননি ঐ জেলে বউ। অপরিচিতা নারীর বর্ণিত পবিত্র কুন্ডু খুঁজে পান জেলে বউ এবং কোন সেই কুণ্ডের জল মরা মাছের ওপর ছড়াতেই মাছ জ্যান্ত হয়ে যায়। এরপর জেলে বউ প্রতিদিনই কুন্ডে জল ছিটিয়ে মরা মাছ জ্যান্ত করে রাজপরিবারের জন্য নিয়ে যায়। প্রতিদিন জ্যান্ত মাছ সরবারহ দেখে তাম্রলিপ্ত রাজার সন্দেহ। জেলে বউকে জিজ্ঞেস করতেই সে সব সত্যি কথা বলে দেয়। রাজা তাম্রধ্বজ সপারিষদ সেই কুণ্ড দেখতে এলে দেখতে পান একটি বেদী ও বেদীর উপর অধিষ্ঠিত দেবী মূর্তি। রাজা তাম্রধ্বজ জঙ্গল পরিষ্কার করে ওই জায়গায় মন্দির নির্মাণ করেন। অনেকের মতে এটি দেবী বর্গভীমা মন্দির রূপে বর্তমানে পুজিত হয়।সতীর একান্ন পীঠের এক পীঠ তমলুকের দেবী বর্গভীমা, বর্তমানেও নিষ্ঠার সাথে পুজিত হয় মা, শক্তি পুজো শুরুর আগে রয়েছে অনুমতি নেওয়ার প্রথা। মন্দিরের গর্ভগৃহে কালো পাথরে তৈরি মায়ের মূর্তি বিরাজ করছে দেবী উগ্রতারা রূপে।পুরাণ বলে, দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগের পরমন্দিরের সেবায়েতের কথায় ধর্ম-অর্থ-কাম ও মোক্ষ। এই চারটি বর্গ দান করেন বলেই মায়ের নাম দেবী বর্গভীমা। নীল তন্ত্র মতে মায়ের আরাধনা করা হয় এখানে। কালীপুজোর দিন রাজবেশে মাকে সাজিয়ে মহা ধুমধামে পুজো হয়। বছরের অন্য দিনগুলিতে মাকে ভোর চারটেয় স্নান করিয়ে স্বর্নালঙ্কারে সাজানো হয়। অন্নভোগে নানা ব্যঞ্জনের পাশাপাশি এখনও রোজ মাকে নিবেদন করা হয় শোল মাছের ঝোল। আজও তমলুকের কোন কালীপুজো শুরু হয় না দেবী বর্গভীমা মায়ের পুজো না দিয়ে।চলবে কালীতীর্থ ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য কোনো কালী ক্ষেত্র নিয়ে পড়তে থাকুন|
কালী তীর্থ – মানকরের বড়োমা কালী
আজ কালী তীর্থতে বর্ধমানের মানকরের বড়মাকালীর কথা বলবো|শোনা যায় এই গ্রামে আজ থেকে প্রায় সাতশো বছর আগে কালী পূজা শুরু করেন রামানন্দ গোস্বামী । তিনি ছোটবেলা থেকে কালী মায়ের একনিষ্ঠ সাধক ছিলেন । কাব্যতীর্থ পাশ করার পর বেশীর ভাগ সময়ে শ্মশানে পড়ে থাকতেন । তাঁর বাবা দেবভক্ত হলেও কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষিত হওয়ার জন্য পুত্রের কালী-মা ভক্তি মোটেই পছন্দ করতেন না তবে পরবর্তীকালে কঠোর সাধনা করে মায়ের দর্শন পেয়ে ছিলেন রামানন্দ গোস্বামী । মায়ের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন ঠাকুর রামানন্দ । তাঁর সাধনার স্থান ছিল কাশ আর বেতবনে ঘেরা শ্মশান বর্তমানে যা মানকর ভট্টাচার্য পাড়া নামে খ্যাত।বলা হয়, বড় মা কালী নাকি তিন বোন । মেজ বোন মানকর ডাঙাপাড়ায় ক্ষ্যাপা কালী, আর এক বোন পাল পাড়ায় পঞ্চানন কালী ।মন্দির প্রসঙ্গে একটি অলৌকিক ঘটনার কথাও শোনা যায় ঘটনাটি হলো সাধক রামানন্দ শ্মশানে ধ্যানে মগ্ন । পাড়ার কেউ তাঁর বাবাকে এই খবর দিয়েছেন । তাঁর কৃষ্ণভক্ত বাবা শ্মশানে এসে শুধু কৃষ্ণ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাননি ।পরবর্তীকালে মায়ের সেবার দায়িত্ব আসে ঠাকুর বাণীকণ্ঠ ভট্টাচার্যের হাতে । তিনি ছিলেন মানকরের তৎকালীন জমিদার সদাশিব ভট্টাচার্যের বংশধর ।আরো একটি অলৌকিক ঘটনা আছে , একদিন এক শাঁখারী মায়ের পুকুর পাড় দিয়ে যাচ্ছেন । এমন সময় একটি কালো বরণ বাচ্চা মেয়ে তাঁর কাছে শাঁখা পরতে চায় । শাঁখারী দু-হাতে শাঁখা পরাতেই আরও দুটি হাত বাড়িয়ে দেয় ওই মেয়েটি । শাঁখারী হতবাক হলেও আবারও দুটি শাঁখা পরিয়ে টাকা চায় । মেয়েটি তখন উত্তরে জানায়,’ মন্দিরের কুলুঙ্গিতে বেলপাতা ঢাকা দু-টাকা রাখা আছে ছেলেকে দিতে বলবি ।’শাঁখারী তাঁর কথা মতো বাণীকণ্ঠ ঠাকুরের কাছে সমস্ত কথা বলেন । ঠাকুর অবাক হলেও দু-টাকা সেখান থেকে দিয়ে শাঁখারীকে বলেন, আমার কোন মেয়ে নেই । যে মেয়েটি তোমার শাঁখা পরেছে তাঁর কাছে নিয়ে চল । শাঁখারী বাণীকণ্ঠকে নিয়ে গেলেও মেয়েটিকে আর দেখতে পায়নি । তখন ঠাকুর বুঝতে পেরে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়েই মাকে শাঁখা দেখানোর অনুরোধ করেন । সন্তানের অনুরোধে মা কালী স্বয়ং পুকুরের মাঝে চার হাত তুলে শাঁখা দেখায় । সেই থেকে ওই শাঁখারীর বংশধরেরা এখনও মায়ের পুজোয় শাঁখা দিয়ে যায়এই মন্দিরে দূর্গা পুজো হয় তবে রাত্রে মায়ের প্রতিমা তৈরীর কাজ নিষিদ্ধ । কথিত আছে বহু বছর আগে একবার এক প্রতিমাশিল্পী রাত্রে মায়ের চক্ষুদান করছেন । ওই সময় এক অদৃশ্য হাত প্রতিমা নির্মাণে বাঁধা দেয় তখন থেকে আজও মায়ের প্রতিমা দিনেই তৈরী করা হয়বাণীকণ্ঠ ঠাকুরের বর্তমান বংশধরদের উদ্যোগে নতুন মন্দির তৈরী করা হয়েছে|প্রতিটি বিশেষ তিথিতে বিশেষ পুজো উপলক্ষে জন সমাগম হয় ব্যাপক|আগামী পর্বে অন্য কোনো কালী মন্দিরের কথা নিয়ে আবার ফিরে আসবো|দেখতে থাকুন কালী ক্ষেত্র|
কালীতীর্থ – জয় কালী
আজ কালীক্ষেত্র পর্বে শ্যামবাজারের জয়কালী বাড়ির কথা লিখবো|এই কালী মন্দিরের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে নানা অলৌকিক ঘটনা ও অদ্ভুত সব জশ্রুতি|শাস্ত্র মতে পুজোয় ডিম ব্যবহার হয়না,কিন্তু এই মন্দিরে নিজের পুজোয় ডিমও নিয়েছেন দেবী জয়কালি। অবিশ্বাস্য হলেও এমনটাই সত্যি। কি করে শুরু হলো ডিম দিয়ে পুজোর তা নিয়েও এক ঘটনা আছে শোনা যায় বহুকাল আগে পরিবারের সদস্যরা এক বিকাল বেলা নিজেদের মধ্যেই আলচনা করছিলেন আলোচনার বিষয় ছিল ঠাকুরের খাবার।” ঠাকুরের খাবারের জন্য মিষ্টি , ফল এসব দিয়ে পুজো দিয়ে যায়। আবার ঠাকুরের মাছ, মাংস ভোগ হিসাবে নিবেদন করার রীতিও রয়েছে। কিন্তু সেদিন তাঁরা আলোচনা করছিলেন কেউ যদি এই পুজোর উদ্দেশ্যে ফল , মিষ্টির জায়গায় ডিম দেয় তখন কি হবে? ঠাকুর কি তা গ্রহন করবেন ? মিতা চৌধুরী জানিয়েছেন।, “অদ্ভুত ভাবে কিছুক্ষণ পরেই একজন মন্দিরে পুজো দিতে আসেন ডিম নিয়ে।” ডিম দিয়ে পুজো শুনেই সবাই নাকচ করে দেন। অনেকে আবার কিছুটা ভয়ও পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই ভক্ত নাছোড়বান্দা ছিলেন। কিছুতেই তিনি না পুজো দিয়ে ফিরে যাবেন না। আর পুজো দিলে তিনি দেবেন ওই ডিম দিয়েই। কারন তিনি সম্প্রতি ডিমের ব্যবসা শুরু করেছেন এবং তিনি ঠিক করেছেন ব্যবসা শুরুর আগে মা’কে পুজো দেবেন। আর যেহেতু তিনি ডিমের ব্যবসায়ী তাঁর বিশ্বাস ওই ডিম দিয়ে পুজো অর্পণ করলেই দেবী খুশি হবেন। ব্যবসায় উন্নতি হবে তাঁর। শেষে ডিম দিয়েই পুজো হয় তবে ওই ব্যবসায়ী একবারের জন্যও মন্দিরে প্রবেশ করেননি। বাইরে থেকেই পুজো নিয়ে চলে গিয়েছিলেন।সেই থেকে ডিম দিয়ে পুজোর প্রচলন হয়|মন্দির নির্মাণের সাথেও জড়িত আছে অলৌকিক এক ঘটনা|সাড়ে তিনশো বছর আগে এই পরিবারের পরিবারেরই এক সদস্য গঙ্গার স্নান করার পথে এই মূর্তিকে দেখেন। তিনি সেখানে মা’কে প্রনাম করে বারি চলে যান। সেদিনই তিনি স্বপ্নাদেশ পান যে মা চাইছেন তিনিই তাঁর পুজো করুন। সেই শুরু হয় জয়কালির আরাধনা। জঙ্গলে ভরা তৎকালীন কলকাতার থেকে সাড়ে তিনশো পেরিয়ে বর্তমানে নগর সভ্যতার সাক্ষী দেবী জয়কালি। অবিশ্বাস্য হলেও অত বছর আগে পাওয়া একটি মাটির মূর্তি এখনও অবিকল একরকম থেকে গিয়েছে।আগামী পর্বে অন্য কোনো কালী মন্দিরের কথা নিয়ে আবার ফিরে আসবো|পড়তে থাকুন কালী তীর্থ |
শিব রাত্রির আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
সাধারণত ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসে শিবরাত্রির তিথি পড়ে। এই বছর ১ মার্চ, মঙ্গলবার পড়েছে মহাশিবরাত্রির তিথি। ২৮ ফেব্রুয়ারি রাত ২.২৩ মিনিট থেকে ১ মার্চ রাত ১২.৩৯ মিনিট পর্যন্ত থাকবে শিব চতুর্দশীর তিথি। শিবরাত্রি’ কথাটা দুটি শব্দ থেকে এসেছে। ‘শিব’ ও ‘রাত্রি’, যার অর্থ শিবের জন্য রাত্রী। শিবরাত্রির সঙ্গে প্রচলিত আছে নানা কথা। পুরাণ মতে দেবী পার্বতীর সঙ্গে এদিন দেবাদিদেব মহাদেবের মিলন হয়।শিব রাত্রির এই তিথিতেই প্রকট হয়েছিলো আদি শিব লিঙ্গ। যজ্ঞের মধ্যে যেমন অশ্বমেধ যজ্ঞ, তীর্থের মধ্যে যেমন গঙ্গা তেমনই পুরাণ অনুযায়ী ব্রতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হল শিব চতুর্দশীর ব্রত। তাই শিবরাত্রির ব্রত পালন করলে ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ- এই চতুর্বিধ ফল লাভ হয়। দেবাদিদেব মহাদেবের আরাধনা করার সর্বশ্রেষ্ঠ দিন মহা শিবরাত্রি এদিন ভক্তি মনে পুজো করলে বাবা ভোলেনাথের ভক্তদের মনবাঞ্ছা পূরণ হয়। মাঘ মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে শিবরাত্রি পালন করা হয়। শিব রাত্রির পরদিন 2 মার্চ থাকছে অমাবস্যা ওই তিথিতে আমি থাকছি তারাপীঠে|হবে হোম যজ্ঞ ও গ্রহ দোষ খণ্ডন|এখন থেকেই আপনারা যোগাযোগ করতে পারেন যেকোনো গ্রহ গত সমস্যা নিয়ে|এই তিথিতে গ্রহ দোষ খন্ডনের সুযোগ বার বার আসেনা|সবাইকে শিব রাত্রির আগাম শুভেচ্ছা|ভালো থাকুন|হর হর মহাদেব|
কালীতীর্থ – শেকলে বাঁধা কালী
আজ একটি অদ্ভুত কালী মন্দিরের কথ লিখবো এই কালী তীর্থ অনুষ্ঠানে যা মুর্শিদাবাদের লাল গোলার প্রসিদ্ধ শিকলে বাঁধা কালী বা শৃঙ্খলিত কালী নামে প্রসিদ্ধ|মুর্শিদাবাদের লালগোলার শ্রীমন্তপুরের এই কালী মন্দির অবস্থিত|সালটা 1790, স্বপ্নাদেশে তৎকালীন লালগোলার রাজা রামশঙ্কর রায় নির্দেশ পান,এই রাজ পরিবারের দ্বারা অধিষ্ঠিত হয়েই কালীমন্দির পূজিত হবেন দেবী। সেইমতো এই কালীমন্দিরের পিছন দিয়ে প্রবাহিত পদ্মার শাখা নদীতে হটাৎই একটি দেবীর কাঠামো ভাসতে দেখা যায়। পরে এতেই মাটি লাগিয়ে দেবীর প্রায় ৪ফুট উচ্চতার একটি মূর্তি তৈরি করা হয়।অদ্ভুত ভাবে এই মন্দিরে লোহার শিকল দিয়ে বাঁধা আছেন মা। যেই কারণে ‘শৃঙ্খলিতা কালী’ নামে ডাকা হয় দেবীকে কিন্তু কেনো এই শৃঙ্খল? তার পেছনেও রয়েছে কয়েকটি অদ্ভুত জনশ্রুতি|শোনা যায় পদ্মা থেকেই স্বপ্নাদেশে ভেসে আসা দেবী আবার সেই পথ ধরেই পদ্মাতেই ফিরে যেতে চেয়েছিলেন ,আর তার ফিরে যাওয়া আটকাতে এই শেকলের ব্যবহার|তবে মা কালীর এই শৃঙ্খলিত রূপ বাংলার আরো এক স্থানে দেখা যায়, বাঁকুড়ার সোনামুখির ধর্মতলার রায় পরিবারের খেপা কালী মন্দিরেও মা কালী কে শেকলে বেঁধে রাখা হয়েছে বহু কাল ধরে|কথিত আছে মন্দিরে কালী প্রতিমা নাকি মন্দির থেকে পালিয়ে যান। আগেরকার দিনে অনেক সময় দেখা গেছে রাতে পুজো শেষে মন্দিরে আর মূর্তির দেখা মেলেনি। অনেকবার রাতে পায়ের নুপুরের শব্দও শোনা গেছে। পরে মন্দিরে ‘খেপা কালী’কে আটকে রাখতে প্রতিমার পায়ের শিকল বাঁধার ব্যবস্থা করা হয় এবং এই প্রথা এখানে আজও বজায় আছে|কতইনা না রহস্য, দেবী কে ঘিরে,কতইনা অলৌকিক ঘটনা, আবার লিখবো অন্য কোনো কালী ক্তীর্থ নিয়ে, অন্য কোনো পর্বে|দেখতে থাকুন|
কালীতীর্থ – আম্বাজী
কালীতীর্থ অনুষ্ঠানে শক্তি পিঠের কথা আগেও বলেছি, আজ আপনাদের আরো একটি শক্তিপীঠের কথা লিখছি,আজকের পর্বে গুজরাটের আম্বাজী শক্তি পীঠ|আমাদের শাস্ত্রে বর্ণিত একান্নটি শক্তিপীঠের মধ্যে অন্যতম এই আম্বাজী মাতার মন্দির যা গুজরাটের পালনপুর থেকে 65 কিলোমিটার এবং মাউন্ট আবু থেকে 45 কিলোমিটার দুরে অবস্থিত|শাস্ত্র মতে এখানে দেবী সতীর হৃদয় পতিত হয়েছিলো|অত্যান্ত জাগ্রত ও প্রসিদ্ধ এই আম্বাজী মন্দির|সারা বছর লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম হয় এই মন্দিরে|এখানে এক পুজোর এক অদ্ভুত রীতি লক্ষ্য করা যায়|দেবীর কোনো মূর্তি বা প্রতিরূপ এখানে নেই তার বদলে রয়েছে একটি শ্রীযন্ত্র যা ভক্তি ভরে পুজো করেন দর্শনার্থীরা তবে কিছু বিধি নিষেধ মেনে এবং ছবি তোলা কিন্তু কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ|রহস্যজনক ভাবে এই শ্রীযন্ত্র কিন্তু জন সমক্ষে আনা হয়না,পুজোর সময় পুরোহিতের চোখ ও ঢেকে দেয়া হয় বলে শোনা যায়|স্বর্ণ জড়িত এই প্রাচীন শ্রী যন্ত্র টি স্থাপিত আছে মন্দিরের অভ্যন্তরে একটি বিশেষ কক্ষে|এখানে অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় বিশেষ পুজো উপলক্ষে ভিড় হয় বেশি|তবে প্রায় সারাবছরই মানুষ আসেন, মন্দির দর্শন করেন ও দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন|আজ এই শক্তি পীঠের কথা এখানেই শেষ করছি, আবার দেখা হবে আগামী পর্বে|সঙ্গে থাকবে অন্য কোনো কালী তীর্থ কথা|দেখতে থাকুন|
কালীক্ষেত্র – শক্তি পীঠ দন্তেশ্বরী
আজকের কালী তীর্থ একটি শক্তি পীঠ নিয়ে|আজকের পর্বে শক্তি পীঠ দন্তেশ্বরী|শক্তি পীঠ দন্তেশ্বরী অবস্থিত বাংলার পার্শ্ববর্তী রাজ্য ছত্তিশগড়ে|ছত্তিশ গড়ের দান্তেওয়ারা অঞ্চলে এই দেবীর মন্দির শক্তি পিঠের অন্তর্গত|শাস্ত্র মতে দেবী সতীর দাঁত পতিত হয়েছিলো এখানে|মন্দিরের ইতিহাস বেশ প্রাচীন,এই স্থানে দেবী দন্তেশ্বরীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন কাকতীয় বংশের রাজারা|দেবী দন্তেশ্বরী এই প্রাচীন রাজ বংশের কুল দেবী|দেবী দন্তেশ্বরীর নাম থেকেই এই অঞ্চলের নাম করণ হয় দন্তেওয়ারা|চতুৰ্দশ শতাব্দীতে তৈরী হয়েছিলো এই মন্দির|মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে দেবীর মূর্তি যা একটি কৃষ্ণ বর্ণের পাথর থেকে তৈরী|মূল মন্দির চারটি ভাগে বিভক্ত যথা গর্ভ গৃহ,মহা মণ্ডপ, মুখ্য মণ্ডপ এবং সভা মণ্ডপ|মূল মন্দির কে ঘিরে রয়েছে একটি সুউচ্চ প্রাচীর|স্থানীয় অধিবাসী দের কাছে দেবী দন্তেশ্বরী অত্যান্ত প্রসিদ্ধ এবং শ্রদ্ধার|বিশেষ বিশেষ তিথিতে বিশেষ পুজো ছাড়াও প্রতিবছর নব রাত্রি ও দশেরা উৎসব এখানে মহাসমারোহে পালিত হয় ও সেই উপলক্ষে ব্যাপক জনসমাগম হয়|আজকের পর্বে এই টুকুই আগামী দিনের কালী ক্ষেত্র অনুষ্ঠানে থাকবে আরো অনেক শক্তি পিঠের কথা ও তার সঙ্গে জড়িত অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা|পড়তে থাকুন|জ্যোতিষ সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলতে বা সাক্ষাৎ এর জন্য যোগাযোগ করুন উল্লেখিত নাম্বারে|