চলছে চৈত্র মাস সারা চৈত্র মাস জুড়ে বিশেষ বিশেষ কিছু শিব ভূমি নিয়ে আলোচনা করবো , আজ আর কথা না বাড়িয়ে শুরু করি সেই আলোচনা , আজ নব কৈলাশ বা একশ আট শিব মন্দির|সারা ভারতে ১০৮ শিবমন্দির মাত্র দু’টি জায়গায় আছে। এবং এই দু’টি জায়গাই বাংলায়, পূর্ব বর্ধমানে। প্রথমটি বর্ধমান শহরের উপকণ্ঠে নবাবহাটে এবং দ্বিতীয়টি কালনাতে|সারা দেশে ১০৮ শিবমন্দির রূপে প্রচারিত হলেও কালনার এই মন্দিরের প্রকৃত নাম ‘নবকৈলাস মন্দির’,বর্ধমানরাজ তেজচন্দ্র ১৮০৯ সালে কালনার এই মন্দিরটি নির্মাণ করান যেখানে সাদা ও কালো শিব লিঙ্গের বৈচিত্রপূর্ণ সমাহার লক্ষ্য করা যায়, মনে করা হয় সাদা রং ত্যাগের প্রতীক এবং কালো ভোগের প্রতীক|কালনা রাজবাড়ি চত্বরের দক্ষিণ দিকে এই ১০৮ শিবমন্দির দু’টি বৃত্তকে কেন্দ্র করে নির্মিত। মোট ৭১টি সাদা ও ৩৭টি কালো শিবলিঙ্গ নিয়ে এই মন্দির অবস্থান করছে, ভিতরের বৃত্তের মাঝখানে রয়েছে একটি বিরাট কূপ, অনেকেই মনে করেন মন্দিরের পুজোর কাজে জলের চাহিদা মেটানোর জন্যই এই কূপ খনন করা হয়, আবার অন্য মতে এই বৃহৎ কূপটি শূন্য তথা নিরাকার ব্রহ্মস্বরূপ পরম শিবের প্রতীক|দেশ বিদেশের বহু তীর্থযাত্রী প্রায় সারা বছরই আসেন এই অপূর্ব শিব মন্দির দর্শন করতে,প্রতি বছর নীল ষষ্ঠী ও মহা শিব রাত্রি উপলক্ষে এখানে ভিড় হয় মানুষের, আপনারাও চাইলে ঘুরে আসতে পারেন|চলবে শিব ভূমি আগামী পর্বে অন্য কোনো শিব মন্দির,নিয়ে লিখবো হবে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
শিব ভূমি – বড়ো কাছারি শিব মন্দির
চৈত্র মাস শিবের মাস |আসন্ন নীল ষষ্ঠী ও আসলে শিব পুজো তাই আজ থেকে শুরু করছি বাংলার কিছু বিখ্যাত শৈব তীর্থ নিয়ে আলোচনা|আজ প্রথমেই বড়ো কাছারি শিব মন্দির|দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বিষ্ণুপুর থানার বাখরাহাটে অবস্থিত এক প্রাচীন শিব মন্দির বাবা বড়ো কাছারি নামেই জগৎ বিখ্যাত|এক সময়ে আজকের বাখরাহাট সংলগ্ন এলাকা ছিলো ঘন জঙ্গলে ঢাকা, এখানেই বাস করতেন এক সাধু, শোনা যায় স্থানীয় অধিবাসীদের সকল বিপদ থেকে রক্ষা করতেন ওই সাধু, তার মৃত্যুর পর তার মরদেহ না পুডিয়ে সেই শশ্মানে সমাধিস্থ করে ভক্তগণ। পরে সেই সমাধিক্ষেত্র হতে এক অশ্বত্থ গাছ জন্মায় এবং ওই স্থানে স্থাপন করা হয় এক শিবলিঙ্গ, স্থানটি ক্রমশঃ সর্বত্র বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং দূর দূর থেকে মানুষ আসতে থাকেন পুজো দিতে|কেনো বড়ো কাছারি নাম হলো সে নিয়েও এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ আছে,জনশ্রুতি অনুসারে এই শশ্মানে নাকি গভীর রাতে স্বয়ং শিবশম্ভু ভূতনাথ বেশে বিচার সভা বসাতেন। সেকারণে স্থানটিকে অনেকে এখনো ভূতের কাছারিও বলেন। আর যেহেতু সে বিচার ভূতনাথরূপী শিবের দরবারে, সুতরাং তাঁর বিচারই সর্বশ্রেষ্ঠ তাই সব কাছারির উর্ধে এই কাছারি ও তার বিচার তাই বড়ো কাছারি নামেই পরিচিত হয়েছে এই স্থান|প্রতি শনি ও মঙ্গলবার বেশ ধুমধাম সহ পূজা হয় এখানে, শিব রাত্রিতে ও বিশেষ বিশেষ তিথিতে ব্যাপক জনসমাগম হয়, দূর দূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন বাবার মাথায় জল ঢালতে|ভক্তরা এক ছোট্ট কাগজে তাদের প্রার্থনা দরখাস্তের আকার লিখে মন্দিরের গায়ে বেঁধে দেন|শোনা যায় এখানে করা কোনো প্রার্থনাই নাকি বিফলে যায় না|সময় সুযোগ হলে একদিন ঘুরে আসুন এই বিখ্যাত শিব মন্দির থেকে|আজ শুরু করলাম বড়ো কাছারি দিয়ে এবং চৈত্র মাস জুড়ে চলতে থাকবে শিব ভূমি নিয়ে ধারাবাহিক লেখা লেখি |দেখতে থাকুন|
কালী তীর্থ – বারাসাতের ডাকাত কালী
আজ আমার শহর বারাসাতের বিখ্যাত ডাকাত কালী মন্দিরের কথা লিখবো|এই শহরকেই কেন্দ্র করেই আছে বহু পুরনো স্থাপত্য। তেমনই এক পুরনো স্থাপত্য ডাকাত কালিবাড়ি যা তার জরাজীর্ণ দেহ আর রোমহর্ষক স্মৃতি নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে। বারাসাত চাঁপাডালি থেকে কাজীপাড়া পেরিয়ে নদীভাগ হয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার রাস্তা পার হয়ে পড়ে এই ডাকাত কালিবাড়ি।কথিত আছে সময়ের ভারে জরাজীর্ণ, ভগ্নপ্রায় মন্দিরটি প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ বছরের পুরোনো। রঘু ডাকাতের আরাধ্যা এই মন্দিরে বর্তমানে মুর্তির কোনো অস্তিত্ব নেই। মন্দির গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা বট গাছকেই পুজো করেন ভক্তরা।এই জাগ্রত কালিবাড়িকে ঘিরে আছে বহু জনশ্রুতি ও মানুষের ব্যাক্তিগত অভিমত। একসময় ঘন জঞ্জলে ঘেরা ছিল গোটা এলাকা। আর সেই সময় ডাকাতদের বিচরণক্ষেত্র ছিল এই অঞ্চল। রঘু ঘোষ ওরফে রঘু ডাকাত ও তার ভাই বিধূ ভূষণ ঘোষ ওরফে বিধূ ডাকাত দুজনই ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে এই মন্দিরে মায়ের আরাধনা করত। আরাধনায় কোনো ত্রুটি ছিল না তাদের। লোকমুখে শোনা যায় এক সময় ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পরে যাওয়ায় রাগে-ক্ষোভে মুর্তিটি তরোয়াল দিয়ে ভেঙে ফেলে রঘু ডাকাত। পরবর্তীতে এই ভগ্ন মুর্তিকেই পুজো করত সে। স্বাধীনতার পরও এখানে বাসুদেবের একটি মুর্তি ছিল। যদিও পরে এটি চুরি হয়ে যাওয়ায় এখানে আর মুর্তি স্থাপনের সাহস দেখায়নি কেউ।স্থানীয়দের থেকে জানা যায় এই মন্দিরে নাকি ঘটেছে নানান অলৌকিক ঘটনা তাছাড়াও স্বচক্ষে মাতৃদর্শনের সুযোগ হয়েছে নাকি অনেকের। একসময় এখানে অষ্টধাতুর প্রতিমাকে কালিরূপে পুজো করত রঘুডাকাত। ডাকাতি করার আগে নরবলি দিয়ে পাশের পুকুরে ভাসিয়ে দিত সে। এইভাবেই সে নরবলির মাধ্যমে মাকে প্রসন্ন করত। আজও মন্দিরের পাশে রয়েছে সেই পুকুরটি। মন্দিরের মূল ফটক দিয়ে ঢুকে বাঁ দিকে গাছের শিকড়ে দেখা যায় একটি হাতের ছাপের মত অবয়ব। গাছের যে অংশকে কালী রূপে পুজো করা হয় সেটিও মানব দেহের নিম্নাংশের মত দেখতে|প্রতি অমাবস্যা ও মঙ্গলবারে হোমযজ্ঞের মাধ্যমে মাকে স্বরণ করেন ভক্তরা। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন এখানে তাদের মনস্কামনা পূরণের জন্য। ভক্তদের কথায় মা নাকি তার সন্তানদের কখনো খালি হাতে ফেরান না। স্থানীয়রা আজও এই বহু প্রাচীন মন্দিরটির রক্ষণাবেক্ষণ করেন। মুর্তিহীন এই মন্দিরটির পুজো সমান তালে চলেছে৷ তাদের কথায় ভক্তিতেই আছে ভগবান। আর মাকে প্রসন্ন করতে মন প্রাণ দিয়ে আজও উদ্যত তাঁরা।চলতে থাকবে বিশেষ এই ধারাবাহিক লেখালেখি, ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
কালী তীর্থ – প্রল্হাদ ডাকাতের বামা কালী
আজ কালী ক্ষেত্রতে লিখবো ডাকাত সর্দার প্রহ্লাদের প্রতিষ্ঠিত কালী বামার কথা| পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের রামনগর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার পাণ্ডুক গ্রামের ডাকাত দলের প্রতিষ্ঠিত প্রায় ৩৫৩ বছরের পুরোনো বামা কালী বেশ বিখ্যাত ।পাণ্ডুক গ্রামের মেটে পরিবারের পূর্ব পুরুষেরা বর্ধমানের বিখ্যাত ডাকাত দলের সদস্য ছিলেন। বর্তমানে পরিবারের সদস্যরা জানান, তাঁদের পূর্ব পুরুষেরা সালারের কাছে কেতুগ্রাম থানার মেটলি গ্রামের ‘রামসীতা’ মন্দিরের স্বর্ণ অলঙ্কার ডাকাতি করতে গিয়েছিলেন। পথে বীরভূমের মুলুকের কাছে অপরূপা নারী মূর্তি দেখে ডাকাতরা চমকে ওঠেন। কিন্তু ডাকাত সর্দার প্রহ্লাদ মেটের নির্দেশ ছিল, ডাকাতির পথে মেয়ে মানুষ আর শিশুর গায়ে হাত তোলা যাবে না শোনা যায় একবার সে নীতি লঙ্ঘন করায় এক সদস্যকে সর্দার প্রহ্লাদ এক কোপে দু’টুকরো করে দেন। সেই অপরিচিতা নারীর কাছে জানতে চান, ‘এই রাত্রিকালে আপনি কে মা?’ তখন সেই নারী জানান, আমি কালী বামা।ডাকাতি করতে যাওয়ার পথে দলটি দেখে মা মৃন্ময়ী মূর্তি থেকে চিন্ময়ী মূর্তি ধরে জানান, আমাকে এখান থেকে নিয়ে না গেলে তোদের সর্বনাশ হবে। সেই মতো মায়ের এই বিশাল মূর্তিকে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে অসুবিধার কথা বলেন ডাকাত সর্দার প্রহ্লাদ। সেই সঙ্গে বলেন, আজকে রাতে ডাকাতিতে সাফল্য পেলে তবেই মা তোকে নিয়ে যাব। কথিত আছে, মায়ের আর্শীবাদে সাফল্যও পায় ডাকাত দলটি। তাই ডাকাতি করে ফেরার পথে বামা মায়ের ছোট শিলা মূর্তিকে সঙ্গে নিয়ে ফেরেন ডাকাত দলটি। পাণ্ডুক গ্রাম ঢোকার পথে মায়ের নির্দেশ মতো তির ছোড়েন এবং সেই তির এসে পাণ্ডুক গ্রামের মাঝখানে পড়ে। সেখানেই মা বামাকে স্থাপন করেন সাধক ডাকাত প্রহ্লাদ। কার্তিক মাসে আমাবস্যার গভীর রাতে, ঢাক ঢোল বাজিয়ে, মশাল জ্বালিয়ে ডাকাতদলের সদস্যরা মায়ের ঘট এনে পুজো করতেন। পুজো হয়ে গেলে পর দিন রাতে কাঁধে তুলে মাকে রসফাল্লা পুকুরে বিসর্জন করা হয় ।তারপরই ডাকাত সর্দার প্রহ্লাদ-সহ সকলে কাঁদতে থাকেন মায়ের টানে। তাই মা বামার নির্দেশে পরবর্তীতে বারমাস পুজোর জন্য আর একটি মূর্তি গড়ে ডাকাত দলটি। সেখানে পুজো দিয়েই ডাকাতিতে বের হতেন তাঁরা। বর্তমানে দেবীর বিশাল মন্দির তৈরি হয়েছে। যা দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে। তবে পুরোনো রীতি মেনে এখনও ডাকাত পরিবারের সদস্যরা বামা কালীর পুজোতে কোনও না কোনও জিনিস চুরি করে আনেন|এখানে মায়ের বাঁ পা-টি এগিয়ে থাকে। কার্তিক মাসের আমাবস্যায় ২২ ফুট উচ্চতার মৃন্ময়ী মূর্তি তৈরি করে পুজো হয়।বাংলার ডাকাত কালী গুলির মধ্যে অন্যতম এই প্রহ্লাদ ডাকাতের বামা কালী|চলতে থাকবে কালী ক্ষেত্র|দেখতে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
কালী তীর্থ – বেনে পাড়ার কালী
আজকের কালী তীর্থ পর্বে লিখবো আড়বেলিয়া বেনে পাড়ায় অবস্থিত পাঁচশো বছরের বিখ্যাত কালী মন্দিরের কথা|আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে বসিরহাট মজুমদার বাড়িতে কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। কথিত আছ যশোহরের রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজত্বের শেষদিকে যখন রাজ্যে বিশৃঙ্খল অবস্থা। সেই সময় রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্যের দেওয়ান ছিল আড়বেলিয়ার এই মজুমদার পরিবারের পূর্বশূরী এক বংশধর। রাজা প্রতাপাদিত্য দ্বারা প্রতিষ্ঠিত যশোরের বিখ্যাত য কালী মন্দির যা যশোরেশরী নামে খ্যাত|এই যশোরেশ্বরী কালীমাতা দ্বারা মজুমদার পরিবারের ওই পুরুষ স্বপ্নে আদেশ পান, “আমাকে এখান থেকে তুই নিয়ে চল, এখানে আমি থাকতে পারছিনা।” দেবীর নির্দেশ মতো তিনি মন্দিরের দেবী ঘট ও মায়ের হাতের খাঁড়া নিয়ে যশোহর ত্যাগ করেন।বেনে পাড়ায় একটি খড়ের চালা ঘরে দেবীর ঘট স্থাপন করে পুরোহিতকে দিয়ে পুজো শুরু করেন। দেবী স্বপ্নাদেশ দেন মন্দিরে যেন কোনও বিগ্রহ বা প্রতিমা স্থাপন না করা হয়। সেই থেকে আজ অবধি বিনা বিগ্রহে কেবলমাত্র ঘটে এই মন্দিরে কালীমাতার পূজা অর্চনা চলে আসছে।বর্তমানে মন্দিরে একটি বেদীর উপর কাঠের বড়ো সিংহাসন ও রুপার খাটে দেবীর তামার ঘট প্রতিষ্ঠিত আছে। মজুমদার পরিবারের সদস্যরা জানান, এই মজুমদার পরিবারে ভিটায় প্রতিমা সহযোগে কোনওরকম পূজা অর্চনা করা নিষেধ। এমনকি কোনরকম দেবদেবীর ক্যালেন্ডার এই পরিবারের ঘরে টানানো যাবেনা। এই বিধান সেই প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে।প্রতি বছর কার্তিক মাসে আড়ম্বরপূর্ণ ভাবে মন্দিরে পূজা হয়। পাশাপাশি আড়বেলিয়া গ্রামে কোন কালীপূজা করতে হলে প্রথমে এই বেনে পাড়ার কালী মন্দিরে পূজা উৎসর্গ করে তবেই কালীপূজা করতে হয়|আবার ফিরে আসবো কালী তীর্থ নিয়ে যথা সময়ে|পড়তে থাকুন|
কালী ক্ষেত্র- গোকর্ণের শ্মশান কালী
আজকের পর্বে আলোচনা করবো গোকর্ণের শ্মশান কালী নিয়ে শতাধিক বছর আগে গ্রামে কালীপুজো হত একটিই। গোটা গ্রামের মানুষ স্থানীয় জমিদার হট্টেশ্বর রায়ের বাড়িতে ভিড় করত। এখন সেই জমিদারিও নেই। কিন্তু রায় বাড়ির পুজো ঘিরে গ্রামের আবেগ এখনও একই রকম।প্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ কান্দীর গোকর্ণ গ্রাম। শক্তির আরাধনা হয় এই গ্রামের অলিগলিতে। আর প্রাচীন পুজো গুলির মধ্যে অন্যতম বড়রায়,শ্যামরায়ের পুজো। স্থানীয়রা বলেন বড়রায় কালী পুজোর সূচনা কাল নির্দিষ্ট করে বলা যায় না, ধরে নেওয়া হয় আনুমানিক এক হাজার বছরের পুরনো এই পুজো। শায়িত অবস্থায় রয়েছে বড়রায় মন্দিরের বেদি। দেবীর সামনে পুরোহিতদের বসার জন্য পঞ্চমুণ্ডির আসন রয়েছে। দেবীর পেছনে ১০৮ টি প্রদীপ দানের ব্যবস্থাও রয়েছে। কালী পুজোয় সেজে উঠেছে মন্দির।গোকর্ণের অন্যতম শ্যামরায় কালীপুজোর প্রচলন করেন প্রয়াত জমিদার হটেশ্বর রায়। তবে গ্রামের বাইরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শ্মশান কালীর। হট্টরায় কালী থেকে ওই বংশেরই এক সাধকের নামানুসারে পরবর্তীতে নাম হয় শ্যামরায় কালী। আগে শ্মশানে মায়ের আসনে রত্নবেদির ওপর পুজো হত। রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে নানা রকম অসুবিধা দেখা দেয়। কালী প্রতিমা গ্রামের বাইরে থাকার কারনে পরবর্তীতে হট্টেশ্বর রায়ের বংশধর শ্যামচরণ রায় স্বপ্নাদেশ পেয়ে গোকর্ণের পুকুরপারের শ্মশান বেদী থেকে পাঁচবাড়ি পাড়াতে ওই কালীকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করেন। পঞ্চমুণ্ডি আসনে প্রতিষ্ঠিত এই শ্মশান কালীর পুজো হয় তান্ত্রিক মতে। লোক মুখে প্রচলিত আনুমানিক দুশো বছর আগে এই পুজোর সূচনা।কথিত, গোকর্ণে বহুবছর আগে ‘ঘোষকুঁড়ো’ নামে এক পুকুর ছিল। পুকুরের ধারে গোকর্ণ গ্রামের জমিদার হট্টেশ্বর রায় প্রথম শ্মশানকালীর পুজো শুরু করেছিলেন। তবে দেবীপ্রতিমা গ্রামের বাইরে থাকায় প্রতিমার বেদির রক্ষণাবেক্ষণ ঠিক ভাবে হত না। কথিত আছে, হট্টেশ্বর রায়ের বংশধর শ্যামাচরণ রায় স্বপ্নাদেশ পান, পুকুরের ধার থেকে প্রতিমা জমিদার বাড়িতে অথবা জনবসতিপূর্ণ কোনও স্থানে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনশ্রুতি, সেই নির্দেশ পেয়ে শ্যামাচরণ গ্রামের মধ্যে বেদি প্রতিষ্ঠা করেন। চারশো বছরের পুরনো ওই পুজো। বর্তমানে স্থায়ী মন্দিরে পুজো হয়।ফিরে আসবো পরের পর্বে পড়তে থাকুন|
কালনার বিখ্যাত সিদ্ধেশ্বরী মায়ের কথা
আজ কালী ক্ষেত্রতে বলবো কালনার বিখ্যাত সিদ্ধেশ্বরী মায়ের কথা|তন্ত্র পুরাণে দেবী কালীর একাধিক রূপভেদের উল্লেখ পাওয়া যায়। তোড়লতন্ত্র অনুসারে, কালী আট প্রকার। যথা: দক্ষিণকালিকা, সিদ্ধকালিকা, গুহ্যকালিকা, শ্রীকালিকা, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালিকা, শ্মশানকালিকা ও মহাকালী। মহাকাল সংহিতার অনুস্মৃতিপ্রকরণে নয় প্রকার কালীর উল্লেখ পাওয়া যায়। যথা: দক্ষিণাকালী, ভদ্রকালী, শ্মশানকালী, কালকালী, গুহ্যকালী, কামকলাকালী, ধণকালিকা, সিদ্ধিকালী, সিদ্ধিকালী, চণ্ডিকালিকাকালনার এই কালী ক্ষেত্র প্রাচীন তন্ত্র সাধনার পীঠস্থান হিসাবে উল্লেখিত আছে বহু প্রাচীন গ্রন্থে, আসল মন্দির এখানে কবে তৈরি হয়েছিলো ঠিক জানা যায়না, তবে আনুমানিক ১৭৪০ খ্রিষ্টাব্দে বর্ধমানের জমিদার চিত্রসেনের আমলে মন্দিরটি সংস্কার করা হয়|মনে করা জৈনদেবী অম্বুয়া বা অম্বিকাই পরে সিদ্ধেশ্বরীতে রূপান্তরিত হয়েছেন এবং বর্তমানে এখানে সিদ্বেশ্বরী কালী রূপে পূজিতা হন, আবার অন্য একটি মত অনুসারে সিদ্ধেশ্বরী দেবীকে বিখ্যাত মাতৃ সাধক অম্বরীশের আরাধ্য দেবী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়|এই মন্দিরে দেবী মূর্তি নির্মিত নিমকাঠ দিয়ে।দেবী এখানে বামাকালী মূর্তিতে বিরাজমান, দেবী শবরুপী শিবের উপর ভয়ঙ্করী রূপে দণ্ডায়মান |বহু প্রাচীন রীতি অনুসারে সারা বছর দেবীকে দর্শন করা গেলেও শুধুমাত্র কোজাগরী পূর্ণিমার পরের কৃষ্ণা পঞ্চমী থেকে কৃষ্ণা ত্রয়োদশী পর্যন্ত দেবী দিগম্বরী থাকেন বলে ওই সময়ে মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে পুজো হয় তবে বাইরে থেকে|মন্দিরের বাইরে রয়েছে একটি রহস্যময় বিরাট পুকুর যার নাম অম্বিকা পুকুর|শোনা যায় এক কালে পুকুরের জলের মধ্যে রাখা থাকত প্রচুর বাসনপত্র। গরিব মানুষ সেই বাসনপত্র বিয়ে বা অন্য কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহার করে, ফের জলের মধ্যে রেখে যেতেন। মন্দিরের নানা কাজে ওই পুকুরের জলই ব্যবহার করা হত। ওই পুকুরেই ছাগ স্নান করিয়ে মন্দিরে নিয়ে আসা হত বলির জন্য|এক কালের তন্ত্র সাধনার জন্যে বিখ্যাত সিদ্বেশ্বরী কালী মন্দির বর্তমানেও সমান প্রসিদ্ধ ও বহু মানুষের আস্থার স্থল|প্রতি বছর কৌশিকী অমাবস্যা, দীপান্বিতা অমাবস্যা এবং ফলহারিনী অমাবস্যা উপলক্ষে এখানে বিশেষ পুজো হয় ও দূর দূর থেকে মানুষ আসেন দেবীকে দর্শন করতে, তার আশীর্বাদ নিতে ও নিজের মনোস্কামনা জানাতে|চলতে থাকবে কালী প্রসঙ্গে আলোচনা ফিরে আসবো অন্য কালী ক্ষেত্রে নিয়ে|দেখতে থাকুন|
কালীতীর্থ – বীরভূমের বৈষ্ণব দ্বারা পূজিত শ্মশান কালী
বীরভূমে রয়েছে এমন এক শশ্মান কালী যেখানে বৈষ্ণব রাগ পুজো করেন, এখানে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে শ্মশানকালীর পুজো চলে আসছে। একসময় এই এলাকা ঘন জঙ্গল এবং শ্মশান ছিল, যা থেকেই এই কালীর না ম হয়েছে শ্মশানকালী।বৈষ্ণব হলেও শাক্তমতেই পূজিতা হন এই দেবী |অন্ধকার ঘরে কাঁটার আসনে বসে পুজো দেন পুরোহিত। সেই পুজো দেখার অনুমতি নেই কারোর। পাহাড়েশ্বরের শ্মশানকালীর পুজোর নিয়ম এমনই অদ্ভুত|অন্যান্য কালীপুজোর মতো এই কালীরও পুজো হয় অমাবস্যায়। এই কালী সারা বছর মন্দিরে থাকেন, বিসর্জন দুর্গা পুজোর পরের একাদশীতে। মা কালীর নাম শ্মশানকালী হওয়ার নেপথ্যে এলাকায় শ্মশানের অস্তিত্বকেই বোঝায়।এই দেবীর পুজো যাঁরা করেন তাঁরাই দেবী মূর্তি তৈরি করেন। মূর্তি তৈরি করতে শ্মশান থেকে আনা হয় কাঠ, অঙ্গার, হাড়-সহ অন্যান্য দ্রব্যাদি। মায়ের মূর্তি শুকোনোর জন্য ব্যবহার করা হয় শ্মশানের পোড়া অবশিষ্ট কাঠের জ্বালানি, মায়ের অঙ্গরাগ থেকে শুরু করে যাবতীয় সমস্ত কিছু শ্মশানের সামগ্রী দিয়ে সাজানো হয়।এই দেবীর বৈষ্ণব পূজারীরাগ জানান, প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে শ্মশানকালীর পূজা চলে আসছে। একসময় এই এলাকা ঘন জঙ্গল এবং শ্মশান ছিল, যা থেকেই এই কালীর নাম হয়েছে শ্মশানকালী। ৩৫০-৪০০ বছর আগে হারাধন চক্রবর্তী সুদূর কামাক্ষ্যা থেকে নিয়ে এসেছিলেন এই কালীমূর্তি। তারপর থেকে বংশপরম্পরায় তারাই পুজোর দায়িত্বে রয়েছেন। পরবর্তীকালে, ওই হারাধন চক্রবর্তীর পরিবার বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন। কিন্তু, শাক্তমতেই পুজো হয় দেবীর।এখানে মায়ের প্রতিমার পাশাপাশি থাকেন মায়ের দুই সঙ্গী ডাকিনী ও যোগিনী। বর্তমানে এলাকায় জনবসতি বেড়ে যাওয়ায় শ্মশান সরে গিয়েছে। কালীপুজোর রাতে পুজোর সময় যে আসন ব্যবহার করা হয় তা আসলে কাঁটার আসন। যিনি পুজো করেন তিনি ওই কাঁটার আসনে বসে থাকেন। অন্ধকার ঘরে মায়ের হোমযজ্ঞ দেখতে পেলেও পুজো দেখার অনুমতি নেই কারোর। বংশপরম্পরাতেই এই রীতি চলে আসছে।বৈষ্ণব হলেও যেহেতু তন্ত্র মতে পুজো হয়, তাই এর উপাচারও তন্ত্রমতেই পালিত হয়। দেবীর ভোগের জন্য নিবেদিত হয় চ্যাং মাছ পোড়া ও কারণবারি অর্থাত্ মদ। মন্দিরের পাশেই রয়েছে একটি জলকুণ্ড। পাহাড়ি-পাথরময় পরিবেশে ওই কুণ্ডের কাছে দুই ফুট মাটি খোঁড়া হলেই জল পাওয়া যায়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে মায়ের মূর্তি তৈরি হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই জল শুকিয়ে যায়।পুজোর দায়িত্ব এলাকার ওই বৈষ্ণব পরিবার থাকলেও বিসর্জনের দায়িত্বে থাকেন এলাকার দাস পরিবাররা। শ্মশান কালী বিসর্জন হয় দুর্গাপুজোর দশমীর পরের দিন অর্থাৎ একাদশীর দিন। বিসর্জন ঘিরে একাদশীর দিন এলাকার দাস পরিবারের মধ্যে দেখা যায় আলাদা উৎসাহ-উদ্দীপনা, বাড়িতে বাড়িতে ভিড় জমান আত্মীয় স্বজনেরা। তবে একাদশীতেই একমাত্র দাস পরিবার মায়ের বিসর্জনের অনুমতি পান। তাই এই দিনটি তাঁদের কাছে আলাদা আনন্দের।আগামী পর্বে অন্য কোনো কালী মন্দির ফিরে আসবো কালী তীর্থতে|দেখতে থাকুন|ধন্যবাদ|
কালীতীর্থ – জ্বালাজি মন্দির
আজকের কালী তীর্থ পর্বে জ্বালাজি মন্দির নিয়ে লিখবো|হিমাচল প্রদেশের অতি সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে অবস্থিত এই রহস্যময় প্রাচীন মন্দির এই মন্দির সতী মাকে উৎসর্গ করা , এই মন্দিরে এক রহস্য ময় অগ্নি প্রজ্বলিত আছে যেটা কয়েক শতাব্দীর বেশি সময়ে ধরে জ্বলছে|জ্বালাজি মন্দিরে ৭টি আগুনের শিখা দেখা যায় যেগুলি আজ পর্যন্ত কখনও নিভে যায়নি। কখনও কখনও শিখাগুলির সংখ্যা বেড়ে হয় ৯টি। ভক্তদের বিশ্বাস, শিখাগুলি মা ভগবতীর সাত বোনের বহিঃপ্রকাশ। কেউ আবার বলেন, শিখাগুলি আসলে মা দুর্গার ন’টি অবতারের প্রতীক। ভক্তদের ব্যাখ্যা যা-ই হোক, ঘটনা হল, এই শিখাগুলি জ্বলছে স্মরণাতীত কাল থেকে।একটি প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে কিংবদন্তি অনুসারে, সম্রাট আকবর নাকি একবার এই অগ্নিশিখাগুলি নেভানোর অনেক চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তিনিও ব্যর্থ হন|এটাই এই মন্দিরের প্রধান রহস্য যার উদ্ঘাটন আজও সম্ভব হয়নি|এমন কি বিজ্ঞানীরাও এটা খুজে বের করতে পারেনি এই অগ্নি কোথা থেকে এর জ্বালানি তেল পাচ্ছে এবং কিভাবে আদি অনন্ত কাল ধরে জ্বলছে এই দিব্য অগ্নি শিক্ষা|হয়তো এই রহস্য চিরকাল রহস্যই থেকে যাবে আর সেখানেই আমাদের আধ্যাত্মিকতার জয়, আমাদের সনাতন ধর্ম বিশ্বাসের জয়|আগামী পর্বে আবার লিখবো নতুন কোনো মন্দির ও তার রহস্য নিয়ে|পড়তে থাকুন|
কালী তীর্থ – বোল্লা কালী মন্দির
আজ কালী তীর্থ পর্বে বাংলার একটি অন্যতম জাগ্রত ও বিখ্যাত কালী মন্দিরের কথা আপনাদের জন্য লিখবো|আজকের পর্বে বোল্লা কালী মন্দির|বোল্লা কালীমন্দির আমাদের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার একটি বিখ্যাত কালী মন্দির। বালুরঘাট শহর থেকে এই মন্দিরের দূরত্ব মাত্র কুড়ি কিলোমিটার|মন্দিরটি দক্ষিণ দিনাজ পুরের বোল্লা গ্রামে অবস্থিত এবং মূলত গ্রামের নাম থেকেই বোল্লা কালী মন্দিরের নামকরণ|আজ থেকে চারশো বছর এই অঞ্চলের জমিদার ছিলেন বল্লভ চৌধুরি|তার নাম অনুসারেই এলাকার নাম হয়েছে বোল্লা|মন্দির প্রতিষ্ঠার সাথেও জড়িয়ে আছে এক অলৌকিক ঘটনা|কথিত আছে একবার স্থানীয় জমিদার মুরারী মোহন চৌধুরি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে মামলায় জড়িয়ে যান। তারপর তিনি বোল্লা মায়ের কাছে মানত করে মামলায় জয় লাভ করেন শোনা যায় দেবী কালি স্বয়ং তার উদ্ধারের জন্য এসেছিলেন এবং পরবর্তী দিনই জমিদার মুক্তি পেয়েছিলেন|কৃতজ্ঞতার প্রতীক হিসাবে তিনি দেবী কালির একটি সুদৃশ্য মন্দির নির্মাণ করেছিলেন|যদিও অনেক আগে থেকেই এখানে কালী পুজোর প্রচলন ছিলো|বহুকাল আগে এখানে এক মহিলা স্বপ্নাদেশে একটি কালো পাথরখণ্ড কুড়িয়ে পেয়ে সেটিকে প্রথম মাতৃরূপে পুজো শুরু করেছিলেন|কথিত আছে একবার এই এলাকায় পরপর ডাকাতের অত্যাচার শুরু হয়, বোল্লাকালী তখন রুদ্রমূর্তি ধারণ করে বাসিন্দাদের রক্ষা করেন। বর্তমানে রাস পূর্ণিমা উপলক্ষে দক্ষিণ বোল্লা কালী মন্দিরে পুজো ও বিরাট মেলা অনুষ্ঠিত হয়|সমগ্র উত্তর বঙ্গ সহ বাংলা দেশ থেকেও বহু মানুষ আসেন মা বোল্লা কালীর দর্শন করতে ও তার পুজোয় অংশ নিতে|জনশ্রুতি অনুসারে, দেবী অত্যন্ত জাগ্রত ও তার কাছে নিবেদিত প্রতিটি মনোস্কামনা তিনি পূর্ণ করেন|চলবে কালী তীর্থ ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য কোনো কালী মন্দির নিয়ে পড়তে থাকুন|জ্যোতিষ সংক্রান্ত প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন উল্লেখিত নাম্বারে|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|