বাংলার বিভিন্ন স্থানে অনেক সুউচ্চ কালী মন্দির বা বিশালআকার কালী মূর্তি থাকলেও আজও বড়ো কালী বলতে অনেকেই বর্ধমানের কালনার ভট্টাচার্য পরিবার কতৃক স্থাপিত একটি বিশেষ কালী মূর্তির কথাই বোঝান|অনেক রহস্য ময় ঘটনা ও জনশ্রুতি সৃষ্টি হয়েছে এই প্রাচীন কালী মন্দিরকে কেন্দ্র করে|আজকের কালীক্ষেত্র পর্বে কালনার এই প্রসিদ্ধ এবং জাগ্রত বড়ো কালীর কথা লিখবো|ব্রিটিশ আমলে এই কালী মন্দির তৈরি হয়, আনুমানিক ভাবে বড়কালীর পুজো অন্তত ৪০০ বছরের প্রাচীন|৪০০ বছর আগে হোগলা পাতার ছাউনি দেওয়া মাটির মন্দিরে শুরু হয়েছিল পুজো|পরবর্তীতে স্থানীয় ভট্টাচার্য পরিবারের প্রচেষ্টায় তৈরি হয় পাকা মন্দির আজও বংশ পরম্পরায় তারাই বড়োকালীর পুজোর সমস্ত দায়িত্ব নিষ্ঠা সহকারে পালন করে আসছেন|দেবী হয়ে উঠেছেন তাদের পারিবারিক কুলদেবী|এলাকাও আজ পরিচিত বড়োকালী তলা নামে|এবার একটি অলৌকিক ঘটনার কথা উল্লেখ করবো,এখানে দেবীর পায়ে নূপুর থাকার জন্য পুজোর দায়িত্বে থাকা পরিবারের কারও নূপুর পরা বা নূপুর উপহার দেওয়া নিষিদ্ধ। কথিত আছে, একবার সেই রীতি ভেঙে পরিবারের এক মহিলা নুপুর পড়েছিলেন আশ্চর্য জনক ভাবে ওই দিনই সন্ধ্যাবেলায় সর্পদষ্ট হন তিনি পরে অবশ্য দেবীর কৃপায় প্রানে বাঁচেন তিনি|আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়, শোনা যায় একবার এলাকারই অন্য এক পরিবার বড়কালীর চেয়ে বেশি উচ্চতার প্রতিমা বানাবে বলে মাপ চুরি করে নিয়ে যায়। কিন্তু ভাগীরথীর ঘাটে বিসর্জনের সময়ে দেখা যায়, বড়কালীর উচ্চতাই সবথেকে বেশি|এই কালী মন্দিরের পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট মশাল|এক সময়ে এলাকায় ছিল ঘন বন। ছিলো ডাকাত,আনাগোনা ছিল বাঘেরও। বাঘের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অমাবস্যার রাতে দু’টি মশাল জ্বালিয়ে রাখা হত পুজোর সময়। সেই রীতি মেনে আজও পুজোর সময় দু’টি মশাল জ্বালিয়ে রাখা হয়|বাংলার তথা জেলার বিখ্যাত এই কালী মন্দিরে একাধিক সময়ে একাধিক বিখ্যাত মাতৃ সাধক এসেছেন যাদের মধ্যে রয়েছেন সাধক রামকৃষ্ণ,আনন্দ ময়ী মা, ভবা পাগলা ও ওমকার নাথের মতো ব্যাক্তিত্বরা|আজ এখানেই থামছি,তবে কালী তীর্থ নিয়ে এই বিশেষ পর্ব গুলি চলবে|পড়তে থাকুন|ধন্যবাদ|
কালীতীর্থ – হুগলী ডাকাতকালী মন্দির
আজ কালী তীর্থর এই পর্বে আপনাদের জন্যে নিয়ে এসেছি বাংলার এক প্রাচীন ডাকাত কালী মন্দিরের কথা যা অবস্থিত হুগলীর বাসুদেব পুরে|ত্রিবেণী ডাকাত কালী নামেও এই মন্দির পরিচিত|বাংলার এই ডাকাত কালী মন্দিরের সাথে জড়িত আছে কুখ্যাত রঘু ডাকাতের নাম|সাধক রামপ্রসাদ ও এই মন্দিরে এসেছিলেন ও এক অলৌকিক অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছিলেন|রঘু ডাকাতের আমল থেকেই মন্দিরের পুজো চলছে। মন্দিরে নরবলির প্রথা বহু পূর্বে বন্ধ হয়েছে। তবে এখনও মানত করা| ছাগবলি হয়|এই ডাকাত কালী মন্দিরের ইতিহাস বেশ প্রাচীন ও রোমাঞ্চকর|শোনা যায় আনুমানিক ৫০০ বছর আগে বাগহাটির জয়পুরের বাসিন্দা বিধুভূষণ ঘোষ ও তার ভাই রঘু ঘোষ ঘন জঙ্গলের মধ্যে হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী তাদের মায়ের মূর্তি স্থাপন করে। দিনের বেলায় দুই ভাই দিনমজুরের কাজ করলেও রাতে ধনীদের বাড়িতে ডাকাতি করত যদিও ডাকাতি করে আনা জিনিসপত্র এলাকার গরিব মানুষের মধ্যে বিলি করত এই দুই ডাকাত|সেকালে ডাকাত দলের ভয়ে দুপুরের পর থেকে এই রাস্তা দিয়ে মানুষ চলাচল করত না। কথিত আছে সেই সময়েরঘু ডাকাতের লোকজন রাস্তা দিয়ে যাওয়া কোনও মানুষকে ধরে বেঁধে রাখত। সন্ধ্যার পর পুরোহিতকে ডেকে এনে ঢাকঢোল বাজিয়ে নরবলি হতো| তারপর পুজো দিয়ে ও মহাপ্রসাদ খেয়ে ডাকাতি করতে বের হত। লুঠ করে সেই টাকার কিছুটা অংশ গরিবদের মধ্যে বিতরণ করত|সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন কোনও এক সময়ে এই রাস্তা ধরে ফিরছিলেন। ওই সময়ে রঘু ডাকাতের লোকজন তাকে নরবলি দেওয়ার জন্য ধরে নিয়ে এসে বেঁধে রাখে। অলৌকিক ভাবে ডাকাত দল বলি দেয়ার আগের মুহূর্তে হারিকাঠে রামপ্রসাদের পরিবর্তে মাকে দেখতে পায়। এরপর থেকে রঘু ডাকাত বলি বন্ধ করে রামপ্রসাদের সেবার ব্যবস্থা করে এবং পরের দিন সকালে নৌকায় করে রামপ্রসাদকে সসম্মানে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসে।এখানে চতুর্ভুজা কালিকার ঊর্ধ্ব বাম হস্তে খড়্গর পরিবর্তে রয়েছে তরবারি ও অন্যান্য হাতগুলিতে রয়েছে দেবী কালিকার মতোই নানা প্রহরণ৷ দেবী জোড় পায়ে শবরূপী শিবের হৃদপদ্মে দণ্ডায়মান৷ মায়ের মুখোমুখি মন্দির অঙ্গনে স্থাপিত শিবলিঙ্গ৷ রয়েছে জটাজাল বিস্তৃত প্রাচীন বটবৃক্ষ৷আজও রঘু ডাকাত কতৃক স্থাপিত এই কালী মন্দিরে পুজো হয়|বিশেষ বিশেষ তিথিতে বিশেষ পুজো ও সেই উপলক্ষে বহু মানুষের সমাগম হয়|বাংলার নানা স্থানে রয়েছে এমন বহু প্রাচীন ঐতিহাসিক কালী মন্দির|আগামী পর্বে আবার অন্য কোনো কালী মন্দিরের কথা লিখবো আপনাদের জন্য|পড়তে থাকুন|ধন্যবাদ|
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের শুভেচ্ছা
ভাবতেও গর্ব হয় আমার মাতৃ ভাষা বাংলাকে রক্ষা করতে, তার শ্রেষ্ঠত্ব ও স্বতন্ত্রতা বজায় রাখতে চলেছে লড়াই ৷ ঝরেছে রক্ত ৷ বিক্ষোভ মিছিলে কেঁপে উঠেছিল গোটা বাংলাদেশ ৷ শেষমেশ জিত হল সত্যের আর সেই জয়ের দিনটা ছিলো আজকের দিন, আজ আমাদের প্রতিটা বাঙালির বড়ো আনন্দেরে দিন, আজ মাতৃ ভাষা দিবস, তবে এখন তো এ এক আন্তর্জাতিক উৎসব|একুশ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতির প্রথম দাবি করা হয় ১৯৯৭ সালে ৷ ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বরের জন্মস্থান ময়মনসিংহ জেলার গফুরগাঁও উপজেলা থেকে ওঠে এই দাবি , পরবর্তীতে বহু প্রতীক্ষা ও চেষ্টার পর ১৯৯৯ সালে ১৭ নভেম্বর রাষ্ট্রসংঘের ৩০তম অধিবেশনে প্রস্তাবটি ওঠে ৷২০০৮ সাল থেকে জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ১৮৮ দেশ একযোগে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তজার্তিক ভাষা দিবস হিসেবে পালন করতে শুরু করে|ভাষাকে ঘিরে আন্দোলন, ভাষা কে ঘিরে একটা জাতীর, একটা রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ , এমন নজির গোটা বিশ্বের ইতিহাসে আর দ্বিতীয় নেই|যদিও আজীবন আমার মাতৃ ভাষাই আমার মনের কথা প্রকাশ করার প্রধান মাধ্যম, রোজ আমার ভাষা আমার সঙ্গেই থাকে, রোজ এই ভাষাতেই আমি আমার ক্লাইন্ট দের সাথে কথা বলি এবং আমার মতোই আমার বাংলা ভাষাও এগিয়ে চলেছে, পরিবর্তিত হচ্ছে, প্রতিনিয়ত, তবু আজ একজন বাঙালি হিসেবে এই দিনটায় আলাদা করে গর্ব হয় আনন্দ হয় এই ঐতিহ্যর কথা ভেবে|আজকের দিনে মাথা নত নিজের মাতৃ ভাষার জন্যে, নিজের সংস্কৃতি ও সাহিত্যর জন্যে, আর মাথা নত হয়ে আসে সেই বীর শহীদদের জন্যে যারা ভাষা আন্দোলনে প্রান বিসর্জন দিয়েছেন|পৃথিবীর সব বাংলাভাষী মানুষকে আমার ও আমার পরিবারের তরফ থেকে জানাই আন্তর্জাতিক মাতৃ ভাষা দিবসের অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন, ভালো থাকুন, ভালো রাখুন নিজের মাতৃ ভাষা কে|
কালী তীর্থ – কীর্তিশ্বরী মন্দির
বলা হয় বাংলার ছয়টি জাগ্রত কালী মন্দির, যেখানে গেলে সকল মনের বাসনা পূরণ হবেই।তার মধ্যে অন্যতম কালি তীর্থ কীর্তিশ্বরী মন্দির|কীর্তিশ্বরী মন্দির মুর্শিদাবাদে অবস্থিত যা কিছু প্রাচীন গ্রন্থ অনুসারে ৫১ পীঠের অন্যতম|দেবী সতীর মুকুট এই স্থানে স্থানে পড়েছিলে বলে মনে করা হয়|স্বাভাবিক ভাবেই পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় অবস্থিত এই মন্দিরটি এই জেলার অন্যতম প্রাচীন কালী মন্দির।একসময় এই মন্দিরের পুরাতন কাঠামো বর্তমানে নষ্ট হয়ে গেলেও গেলেও নতুন আঙ্গিকে এই মন্দির গড়ে তোলেন ঊনিশ শতকে রাজা দর্প নারায়ণ।কোনো কোনো গ্রন্থে প্রাচীন এই মন্দিরটি মুক্তেশ্বরী মন্দির নামেও পরিচিত। এই মন্দিরে বিশেষ কোন বিগ্রহের পূজা করা হয় না একটি কালো পাথরকেই বিগ্রহ রূপে পূজা করা হয়ে থাকে|কীর্তিশ্বরী মন্দির অত্যন্ত জাগ্রত মন্দির বলে প্রসিদ্ধ সারা বাংলা জুড়ে এবং প্রায় সারা বছর জুড়েই ধৰ্মপ্রাণ হিন্দুরা ও মায়ের উপাসকরা এই মন্দিরে ভক্তিভরে পূজা দিয়ে যান এবং তাদের মনষ্কামনা পূর্ণ করেন বলেই এই মন্দিরের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে|আবার আগামী দিনে অন্য কোনো কালী তীর্থ নিয়ে বলবো অনেক অজানা কথা দেখতে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
কালী তীর্থ – কাটোয়ার ডাকাত কালী
বাংলার কালী ক্ষেত্র গুলির মধ্যে রয়েছে অসংখ্য ডাকাত কালী মন্দির, এই মন্দির গুলির সাথে জড়িয়ে আছে বহু গল্প ও দুর্ধর্ষ সব ডাকাতদের নাম, একসময় গ্রাম বাংলায় ডাকাতরা কালী পুজো করে ডাকাতি করতে যেতো কেউ কেউ আবার ডাকাতির পর ফিরে এসে কালী পুজো করতো|সেই দিন আর নেই, সেই ডাকাতরাও নেই সবই আজ ইতিহাস তবে রয়ে গেছে তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ডাকাত কালীর মন্দির গুলি|এমনই এক কালী মন্দির রয়েছে বর্ধমানের কাটোয়ায় যা কাটোয়ার খেপি মায়ের মন্দির বলে বিখ্যাত|একসময়ে ডাকাতদের হাতে পূজিত কালী আজ কাটোয়ার অন্যতম বিখ্যাত কালী ক্ষেত্র|শোনা যায় আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে কাটোয়া শহরের ভাগীরথীর তীরে খ্যাপাকালী পাড়া জঙ্গলে ভরা ছিল। কথিত আছে, সেই জঙ্গলে বাস করত এক দুর্ধর্ষ ডাকাত। ওই ডাকাত জঙ্গলে কালী ঠাকুরের পুজো করত। ডাকাতি করার সময় কালী মাকে পুজো করে সে ডাকাতি করতে বের হতো। ওই ডাকাতের ভয়ে তটস্থ থাকত বর্ধমান, নদীয়া ও মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষজন।পুলিশের ভয়ে ডাকাত সর্দার কালি ঠাকুরকে জঙ্গলের ভেতরে লুকিয়ে রাখত|আজ সেই জঙ্গলে গড়ে উঠেছে খ্যাপাকালী পাড়া। চারিদিকে জনবসতি। এখন ঝা চকচকে সুবিশাল মন্দিরে ডাকাতের হাতে পূজিত কালীর পুজো হয় মহা ধুমধামে। কালী পুজোর সময় মূর্তিকে প্রায় পাঁচ কেজি সোনা ও নয় কেজি রুপো দিয়ে সাজানো হয়,সোনার মুকুট, থেকে শুরু করে সোনার সিতা হার, সোনার বালা থেকে শুরু করে সোনা-রুপোর নানান গয়নায় ভরে ওঠে মায়ের মূর্তি। ডাকাতদের হাত দিয়ে শুরু সেই পুজো আজ কাটোয়া শহরের খেপি মায়ের পুজো বলেই বিখ্যাত।ক্ষেপী মায়ের পুজোয় আশপাশের জেলা থেকে শুরু করে সারা বাংলার মাতৃ সাধক ও ভক্তরা আসেন তাদের মনোস্কামনা নিয়ে|আবার যথা সময়ে ফিরে আসবো কালীক্ষেত্র নিয়ে থাকবে কালী প্রসঙ্গে নানা আলোচনা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
কালী তীর্থ – সর্বমঙ্গলা মন্দির গড়বেতা
আজ এই পর্বে যে দেবীর কথা লিখবো তিনি ঠিক কালী না হলেও মাতৃ শক্তির এক রূপ এবং তার মন্দিরের কিছু বিশেষত্ত্ব আছে যা এই কালী ক্ষেত্রতে আপনাদের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন বলে মনে হয়|আজ গড়বেতার মা সর্বমঙ্গলার কথা বলবো অনেকেই মনে করেন এই মা সর্বমঙ্গলা দুর্গারই আর এক রূপ।গড়বেতা বললেই প্রথমে আসে সর্বমঙ্গলা মন্দিরের কথা।এককালে গড়বেতা সংলগ্ন বিরাট অঞ্চল জঙ্গলাকীর্ণ ছিল এবং অনার্য উপজাতদের বাসভূমি ছিল। শিকারই ছিল তাদের প্রধান উপজীবিকা। শিকার করতে যাওয়ার আগে তারা এক বনদেবীর পুজো করত। এই বনদেবী পরবর্তীকালে বগড়ীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলা নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। কথিত আছে, মহারাজ বিক্রমাদিত্য সর্বমঙ্গলা মায়ের সামনে তপস্যায় বসেন। তাঁর তপস্যায় মুগ্ধ হয়ে দেবী তাঁকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী করে দেন।নিজের অলৌকিক ক্ষমতা পরখ করতে রাজা বিক্রমাদিত্য তার অনুগত বেতালকে নির্দেশ দেন মন্দিরের মুখ দক্ষিণ থেকে উত্তরে করতে। সঙ্গে সঙ্গে বেতাল মন্দিরের মুখ পরিবর্তন করে দেন।আজও মন্দির সেই ভাবেই অবস্থান করছে|পরবর্তীতে রাজা গজপতি সিংহ এই মন্দিরটি সংস্কার করে বিগ্রহ নব রূপে প্রতিষ্ঠা করেন।মন্দির স্থাপত্যশৈলীর নিরিখে এই মন্দিরটি পীর দেউল পর্যায়ে পড়ে অর্থাৎ ওপরদিকে ধাপে ধাপে ক্রমহ্রাসমান এবং সেখানে আকারে ছাদ বিশিষ্ট মন্দির রয়েছে|এই মন্দিরের বিশেষত্ব হলো সাধারণত হিন্দু দেবদেবীর মন্দিরের মুখ হয় দক্ষিণে। তবে সর্বমঙ্গলা মন্দিরের মুখ উত্তর দিকে|এই মন্দিরটি ভারতের একমাত্র উত্তরমুখী মন্দির|সর্বমঙ্গলা মন্দিরের পাশাপাশি এখানে রয়েছে ১২টি শিবের মন্দিরও।সব মিলিয়ে কিংবদন্তী, ইতিহাস ও প্রাচীন জশ্রুতিতে ভরপুর এই তীর্থক্ষেত্র|চলতে থাকবে কালী তীর্থ নিয়ে লেখালেখি ও কালী তত্ত্ব নিয়ে নানা ব্যাখ্যা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
কালী তীর্থ – সোনামুখীর মাইতো কালী
আজ কালী তীর্থতে লিখবো বাঁকুড়ার সোনামুখীতে অবস্থিত মাইতো কালী মন্দিরের কথা শুরু করবো একটি ঐতিহাসিক ঘটনা দিয়ে যা আবার অলৌকিক ও বটে|বাংলায় নবাবি আমল তখনো আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয় নি, সময় টা ১১৪৯ সাল, মারাঠা সেনাপতি ভাস্করপন্ডিত বর্গীদের একটি দলসহ বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর থেকে সোনামুখিতে যায়|মা কালীর মন্দিরের সামনে বর্গীদস্যুদল সমবেত হয় লুঠতরাজের জন্য। এই এলাকার চারদিক তখন গাছপালায় ভরা ছিল। তারই মধ্যে ছিল কালীর মন্দির।কথিত আছে সেদিন এই অঞ্চলের মানুষজন সকলে বর্গী দস্যুদের ভয়ে বাইরে বেরোননি।শুধু এক বৃদ্ধ সাহস করে সন্ধ্যায় দেবীমন্দিরে আলো দেওয়ার জন্য একটি প্রদীপ নিয়ে মন্দিরে ঘটের সামনে রেখে বলিস্থানে হাড়িকাঠের সামনে প্রণাম করছিলেন।এই ঘটনায় প্রবল রাগে বর্গীদলের সর্দার একটি খাঁড়া উঠিয়ে প্রণামরতবৃদ্ধকে বলি দিতে উদ্যত হয়।কিন্তু বলী দেয়া যায়নি অলৌকিক কোনো শক্তির প্রভাবে খাড়া নিচে নামেনি|এমনকি বর্গীদের সর্দার অন্ধও হয়ে যান। পরে ওই বৃদ্ধের চেষ্টাতেই সর্দার দৃষ্টি শক্তি ফিরে পান। এই সময় বর্গীদল বলে তারা আর লুঠপাট করবে না এবং তারা ফিরে যায় ওই স্থান ছেড়ে|কেনো দেবীকে মাইতো কালী বলে তার ও ব্যাখ্যা আছে, শোনা যায় ডাকাত দল যাওয়ার সময় ‘মায়ী-ত কালী হ্যায়, মায়ী-ত কালী হ্যায়” বলতে বলতে জয়ধ্বনি দিতে দিতে যায় । তখন থেকেই এই কালীর নাম হয় ” মাই- তো- কালী “।মাইতো কালী মন্দিরে কালীপুজোর সময় পাঁচদিন ধরে পুজো চলে আড়ম্বরের সঙ্গে। একসময় এই পুজো স্থানীয় বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের পুজো হলেও এই পুজো আজ সকলের এবং গোটা বাংলার প্রসিদ্ধ কালীক্ষেত্র গুলির মধ্যে অন্যতম|আবার আগামী পর্বে অন্য কোনো কালী তীর্থ নিয়ে ফিরে আসবো|দেখতে থাকুন|ধন্যবাদ|
কালী তীর্থ – দুর্লভা কালী, বর্ধমান
আজ থেকে শুরু করছি কালী তীর্থ নিয়ে একটি বিশেষ সিরিজ|কালী তীর্থ পর্বে আজ আপনাদের নিয়ে যাবো বর্ধমান, বলবো বর্ধমানের প্রসিদ্ধ কালী মন্দির গুলির মধ্যে অন্যতম দুর্লভা কালী নিয়ে ।বর্ধমানের দুর্লভা কালীর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য অলৌকিক জশ্রুতি ও ঘটনা|স্বাগত আপনাদের কালীতীর্থর এই পর্বে যে অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে গড়ে ওঠে এই প্রাচীন কালী মন্দির সেই ঐতিহাসিক ঘটনার প্রধান দুটি চরিত্র হোলেন প্রখ্যাত তান্ত্রিক সাধক গোকুলানন্দ ব্রহ্মচারি ও বর্ধমানের মহারাজা তেজচাঁদ|জনশ্রুতি অনুসারে ঘটনাটি অনেকটা এই রকম|লোকমুখে তাঁর নানান অলৌকিক ক্ষমতা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই ক্ষমতার কথা শুনে একদিন রাত্রে বর্ধমানের মহারাজ তেজচাঁদ মন্ত্রী সান্ত্রীদের নিয়ে সেখানে গেলেন গোকুলানন্দ কাছে|চারদিকে ঘন জঙ্গল। তার মাঝে বসে কালী সাধনা করছেন তান্ত্রিক গোকুলানন্দ ব্রহ্মচারী। বর্ধমানের মহারাজ দেখতে চান তান্ত্রিকের অলৌকিক ক্ষমতা। সেদিন ঘোর অমাবস্যা। রাজা জানতে চাইলেন, আজ কি তিথি? তান্ত্রিক জানালেন, আজ পূর্ণিমা। রাজা বললেন, আমাকে পূর্ণিমার চাঁদ দেখাতে পারেন।তান্ত্রিক গোকুলানন্দ ব্রহ্মচারী বুঝলেন, রাজা তাঁর ক্ষমতার পরীক্ষা নিতে এসেছেন। মৃদু হাসলেন গোকুলানন্দ। চারদিক জ্যোৎস্না আলোকিত হয়ে উঠলো। আকাশের দিকে আঙুল দেখিয়ে তান্ত্রিক বললেন, ওই পূর্ণিমার চাঁদ। দেখুন মহারাজ|বিস্মিত চোখে তন্ত্র শক্তির অদ্ভুত প্রয়োগ দেখলেন রাজা|পরবর্তীতে মহারাজ তেজচাঁদ কালী মন্দির করে দিলেন। সেদিন থেকেই বর্ধমানের লাকুড্ডির দুর্লভা কালীবাড়িতে নিত্য পুজো চলছে।এই কালীমন্দিরে ঘটের আবাহন বা বিসর্জন নেই। ঘট ছাড়াই শুধু বিগ্রহের নিত্য পূজা হয় এই কালী মন্দিরে।বর্ধমানের রাজারা এই মন্দিরে ভোগঘর তৈরি করে দেন। পুজোর ব্যয়ভার বহন করতেন তাঁরাই। এখানে আজও নিত্য পূজার পাশাপাশি দেবীকে অন্নভোগ নিবেদন করা হয়।দীপান্বিতা কালীপুজোয় অগণিত ভক্তের সমাগম হয় মন্দিরে। মনে করা হয় দেবীর দর্শন পাওয়া অতি দুর্লভ। তাই নাম দুর্লভা কালী। প্রায় আড়াইশো বছর আগে তান্ত্রিক গোকুলানন্দ ব্রহ্মচারী পাশের জলাশয়ে স্নান করতে নেমে একটি পাথর পান।সেই পাথরকেই মা কালী রূপে পুজো করেন তিনি। সেই পাথর খণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয় রাজার তৈরি করে দেওয়া মন্দিরে। পরে কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হলেও আজও সেখানে সেই পাথর খণ্ড সামনে রেখেই পুজো করা হয়। সাধক কমলাকান্তও এখানে তন্ত্র সাধনা করতে আসতেন বলে শোনা যায়|কালী তীর্থ নিয়ে আজকের কথা এখানেই শেষ করলাম|তবে চলতে থাকবে কালী কথা, পড়তে থাকুন|সঙ্গে থাকুন|ধন্যবাদ|
বাংলার কালী – হট নগর কালী মন্দির
বাঁকুড়ার সোনামুখী তে রয়েছে এক অদ্ভুত নামের কালী মন্দির এবং তার সাথে জড়িত জশ্রুতিটিও বেশ অলৌকিক|হট্নগর’ কালীর নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন লোককথা প্রচলিত। কেউ বলেন, হট্ নামে এক যোগী পুরুষ এই কালীর পুজো করতেন বলে এ রকম নামকরণ। আবার অনেকে বলেন, মা কালী হঠাৎ এসেছিলেন। তাই ‘হট্ নগর’ কালী নামকরণ হয়েছে।
কথিত আছে, গ্রামের পথে চিঁড়ে বিক্রি করে ফেরার পথে একটি শ্যামাঙ্গী মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয় সোনামুখীর তারিণী সূত্রধরের বাচ্ছা মেয়েটি তার ঝুঁরিতে চেপে বসে পরে বাড়িতে এসে তারিণী দেবী দেখেন ওই মায়ের জায়গায় দুটি পাথর রয়েছে, পরবর্তীতে তিনি সপ্নাদেশ পান যে ওই মেয়ে মা কালী এবং মন্দির নির্মাণ হয় স্থানীয় জমিদারের সহায়তায়|
চারশো বছরের পুরোনো এই মন্দিরের গঠনশৈলী অদ্ভুত। মন্দিরের সামনে রাখা রয়েছে তারিণী সূত্রধরের একটি মূর্তি। সেখানে দেখা যায়, মাথায় ধানের ঝুড়িতে চেপে মা আসছেন। অন্য দিকে সিদ্ধপুরুষ হট্ যোগীর মূর্তি। সবার উপরে শিব।যদিও বহুবার সংস্কার হয়েছে মন্দিরের তবে সেই দৈব পাথর আজও সংরক্ষিত আছে মন্দিরে|মন্দিরে ঘট রেখে পুজো করা হয়। পরে বছর বাৎসরিক পুজোর সময় সেই ঘট বিসর্জন দিয়ে নতুন ঘট আনা হয়।
প্রত্যেক দিনই ভক্তদের ভিড় লাগে থাকে হট নগর কালী মন্দিরে এবং বিশেষ বিশেষ তিথিতে হয় বিশেষ পুজো|আজ বাংলার কালী এই খানেই শেষ করছি|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
মন্দির রহস্য – পঞ্চানন তলার সরস্বতী মন্দির
সারা দেশের বহু শিব মন্দির, কালী মন্দির, হনুমান মন্দিরের কথা আপনাদের বলছি আগেই, এমনকি রহস্যময় শনি মন্দির ও যমরাজ এর মন্দির ও আছে সেই তালিকায়|কিছু দিন আগেই গেছে সরস্বতী পুজো তাই ভাবলাম আজ এই বাংলার সম্ভবত একমাত্র সরস্বতী মন্দির ও তার নির্মাণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আপনাদের সামনে তুলে ধরি|হাওড়া পঞ্চানন তলায় ১৯২৩ সালের ২৮ জুন প্রতিষ্ঠিত হয় এই মন্দির|যা বাংলার প্রথম সরস্বতী মন্দির|মন্দির নির্মাণের প্রধান কান্ডারী উমেশ চন্দ্র দাস ও তার পরিবার।তাঁর আদি বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতে।বর্গী হানার আশঙ্কায় তাঁরা সেখান থেকে হুগলির বাঁশবেড়িয়ায় চলে যান। ১৮৫৬ থেকে ১৮৮৭ পর্যন্ত হাওড়া জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি|অবসর নিয়ে জয় পুর থেকে স্বেত পাথরের মূর্তি আনিয়ে তিনি সরস্বতী পুজোর সূচনা করেন|তবে ইচ্ছে থাকলেও উমেশচন্দ্র ওই মন্দির প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারেননি। ১৯১৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর বছর দশেক পরে ১৯২৩ এর ২৮ জুন মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০১ এ সেটির সংস্কার হয়।বরাবরই শিক্ষা ক্ষেত্র কে সর্বাধিক গরুত্বদেয়া উমেশ বাবু সরস্বতী আরাধনাকেই অবসর জীবনের ব্রত করে নিয়েছিলেন এবং তার ইচ্ছাকে মর্যাদা দিয়ে তৈরী হয় এই সরস্বতী মন্দির|মন্দির ও দেবী প্রতিমা অপূর্ব সুন্দর|মূর্তি একটি শ্বেতপাথর কেটে তৈরি মূর্তিটি চার ফুট লম্বা। শ্বেতপাথরের তৈরি মা সরস্বতী দাঁড়িয়ে আছেন হাঁসের উপরে, বাঁ হাতে ধরা বীণা|বাসন্তী রঙের মন্দিরের চূড়া। চূড়ায় রয়েছে ধাতুর ত্রিশূল আর চক্র। চূড়ার চার কোণে ফুলের আকৃতি। চার কোণে রয়েছে দেবীর বাহন হাঁস। তাদের নিচে রয়েছে বীণা। রয়েছে শঙ্খ।অনেকেই হয়তো দেখেছেন বা জানেন এই মন্দিরের কথা তবে বিস্তারিত ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অনেক তথ্যই হয়তো এতদিন অজানা ছিলো সেই অজানা ইতিহাস আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|