Home Blog Page 82

বাংলার কালী – বেগুন বাড়ীর কালীপুজো 


আজকের বাংলার কালী পর্বে আপনাদের পাশকুড়ার বেগুনবাড়ি শ্রী শ্রী শ্মশান কালী মায়ের পুজোর ইতিহাস জানাবো।এই পুজোর বয়স আড়াইশো বছরের বেশি।

 

একটি প্রচলিত লোককাহিনী অনুসারে রাজা রাজনারায়ণ রায়ের প্রধান কুস্তিগীর ছিলেন হিনু ডাং এবং দিনু ডাং নামে দুই ভাই। এই দুই ভাই ছিলেন অতি দরিদ্র পরিবার থেকে। সেই সময়ে, কলেরার কোন চিকিৎসা ছিল না, কলেরার প্রকোপে গ্রামের পর গ্রামের মানুষ মারা যেত। একসময় এই এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে হিনু ডাঃ ও দিনু ডাং দুজনেই খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাঁচার আশা যখন প্রায় নেই তখন

তারা দেবী কালীর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন  এবং তার পূজা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আরোগ্য কামনা করেছিলেন। বেশ কিছু দিন পর দুই ভাই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে মন্দির তৈরি বা পূজার ব্যবস্থা করার সামর্থ্য তাদের ছিল না। আবিষ্কার। এরা ছিলো বাগদি সম্প্রদায় ভুক্ত অত্যান্ত শক্তি শালী এবং সাহসী। শেষ এই দুই ভাই তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ডাকাতি শুরু করেন এবং মায়ের পুজোর সাথে সাথে একটি মন্দিরও তৈরি করেন।সেই সময়ে এখানে বেগুন খেতে প্রচুর বেগুন ফলতো এবং বেগুন থেকে নাম হয় বেগুন বাড়ী। কালী মন্দিরের নাম হয় বেগুনবাড়ি কালী মন্দির।

 

অতীতে নর বলীর কথা শোনা গেলেও বর্তমানে ছাগ বলি প্রথা চালু রয়েছে আগত তীর্থযাত্রী গণ তাদের মানত পূরণের জন্য হাজার হাজার ছাগল বলি দেন।

 

প্রতি বছর বাংলা জৈষ্ট্য মাসের অমাবস্যা তে পুজো শুরু হয় এবং প্রতিমা নিরঞ্জন হয় আষাঢ় মাসের অমাবস্যা তে। সেই সময়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের হাজার হাজার তীর্থযাত্রী জড়ো হন এবং সেই সঙ্গে ওড়িশা, বিহার ও ঝাড়খন্ডের আদি জনজাতি

এসে উপস্থিত হন শিকার উৎসবের জন্যে।

 

ফিরে আসবো বাংলার কালীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে আগামী কাল। যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বর্ধমানের বিরহাটায় আছে এক জাগ্রত এবং অতি

প্রসিদ্ধ কালী মন্দির। এই মন্দির বিরহাটা কালী মন্দির নামে খ্যাত এবং দেবীকে স্থানীয়রা বড়মা বলে ডাকেন। আজ এই কালী মন্দিরের ইতিহাস আপনাদের জানাবো।

 

জনশ্রুতি আছে এক সময়ে বর্গী বা ডাকাত দের থেকে বাঁচতে স্থানীয় লোক জন বর্গী হটাও অভিযান চালায়। আর আজকের এই বীরহাটা শব্দটি বর্গী হটাও শব্দেরই পরিবর্তিত রূপ। আবার অনেকের মতে অনেক বীরাচারী সন্ন্যাসী প্রাচীন কালে এখানে আসতেন। বীরহাটা এই

নামকরণ হয়েছে সেখান থেকেই।

 

এই মন্দিরের প্রাচীত্ত্ব নিয়ে কারুর মনে সংশয় নেই তবে প্রতিষ্ঠার সঠিক দিন ক্ষণ জানা যায়না।বহু প্রচীন কাল থেকে দেবী এখানে রক্ষা কালী রূপে অবস্থান করছেন। পরবর্তীতে বর্ধমানের রাজা এবং স্থানীয় বিত্ত শালী পরিবার গুলির চেষ্টায় উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাঁশ খড় তালপাতার ছাউনি ঘেরা দিয়ে, শক্তপোক্ত ভাবে বেদীটিকে পুনর্ণিমান করা হয়। এই জায়গার ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করা হয়। ত্রম্বকেশ্বরে শিব মন্দিরের চূড়ার আদলে এই মন্দিরের চূড়া এবং মন্দির অলঙ্কৃত করা হয়। শাস্ত্র মতে প্রতিষ্ঠিত হয় বিরাট এক কালী মূর্তি।

 

বীরহাটার বড়মা কালীর প্রতিষ্ঠার সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও এ সম্পর্কে যে জনশ্রুতি আছে

শোনা যায় যে যখন জি.টি. রোডের পীচ রাস্তা হচ্ছিল সেই সময়েও এই দেবী বিরাজমান ছিলেন। তখন এই অঞ্চল ছিল জঙ্গলে জঙ্গলে পূর্ণ এই স্থানে রাস্তা নির্মানের সময়ে একটি বেদীর অস্তিত্ব পাওয়া যায়।অস্থায়ী ভাবে ছাউনী বানিয়ে শুরু হয় পুজো।সেই সময়ে এই রক্ষাকালী পুজো করা হত যেকোনো মহামারির আবির্ভাব ঘটলে তার থেকে মুক্তিলাভের জন্য।

 

আজও সেই বিশ্বাস এবং ভক্তি অটুট আছে বড়মার প্রতি। আজও অসংখ্য ভক্ত আসেন নিজেদের মনোস্কামনা নিয়ে।বিশেষ বিশেষ তিথিতে বহু মানুষের ভিড় হয়।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। থাকবে

বাংলার অন্য একটি কালী মন্দিরের ইতিহাস

এবং অলৌকিক ঘটনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – ফৌজদারি কালীর পুজো

বাংলার কালী – ফৌজদারি কালীর পুজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বর্ধমানের খোসবাগান নামক স্থানে এক বিতর্কিত কালী পুজো অনুষ্ঠিত হয়। নামটিও বেশ বিচিত্র। ফৌজদারি কালী। কি সেই বিতর্ক এবং কেনই বা এমন নামকরম জানবো আজকের পর্বে।

 

প্রাচীন সময় থেকে চলে আসা এই কালী পুজো বাগদি সম্প্রদায়ের কালী পুজো নামেই শুরুর দিন থেকে পরিচিত। আজ থেকে বেশ কয়েকশো বছর আগে খোসবাগানের কয়েক ঘর অদিবাসী এই পুজো শুরু করেছিলেন। তারপর কোনো এক সময় প্রতিমা নিরঞ্জন কে কেন্দ্র করে কিছু সামাজিক সমস্যা তৈরি হয়।বাঁধা আসে প্রতিমা নিরঞ্জনে এবং সাময়িক ভাবে বন্ধ হয় পুজো পক্রিয়া।কি কি হয়েছিলো সে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না। তবে বিষয়টি আদালত অবধি

গেছিলো বলে জানা যায়।

 

তারপর বর্ধমান শহরের একাধিক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ একটি গোপন বৈঠকে মিলিত হন।

বৈঠকে স্থির হয় এরা প্রতিমা নিয়ে আইন অমান্য করে নিরঞ্জন সমাপন করবেন এবং আগের মতোই মহা সমারোহে পুজো পক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।

 

পরিকল্পনা মাফিক পুজো পূজার সব শাস্ত্রীয় উপাচার পালন করে একটি যুবকের মাথায় প্রতিমা কে চাপিয়ে শহর পরিক্রমায় বের হয় সমবেত জনগন শোভাযাত্রা নিয়ে গিয়ে বিসর্জন করার পর যুবকরা গ্রেপ্তার বরণ করেন এবং করেন এবং তাদের এই কর্মের জন্য তাদের এবং তাদের আরাধ্যা দেবী কালীর বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা রুজু হয় ।

 

সামান্য কিছু দিন সাজা ভোগ করার পর সবাই মুক্তি পান এবং শোভাযাত্রা করার আইন সম্মত অধিকার লাভ হয় । সেই থেকেই এই দেবী ‘ফৌজদারি’ কালী নামে খ্যাত। বর্তমানে ফৌজদারী কালী মায়ের পুজো ও শোভাযাত্রা বেশ ধুমধামের সঙ্গে পালিত হয়।আজ এই পুজো সব বিতর্কের উর্দ্ধে এবং সব সম্প্রদায় ও সব শ্রেণীর মানুষ এই পুজোয় আনন্দে মেতে ওঠেন।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। অন্য এক কালী পুজোর ইতিহাস নিয়ে। চলতে থাকবে বাংলার কালী। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – বুধো ডাকাতের কালী পুজো

আজকের পর্বে আপনাদের আরো এক ডাকাত কালীর কথা জানাবো। আজকের পর্বে বুধো ডাকাতের পুজো। এককালে হুগলীর কুখ্যাত ডাকাত বুধো মাকালীর বিশাল উঁচু এবং ভয়াল মৃন্ময়ী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে বহু ধূমধাম করে তার পুজো শুরু করে সিদ্ধেশ্বরী রূপে। সেই পুজোই বুধো ডাকাতের পুজো নামে বিখ্যাত।

 

সে বহুকাল আগের কথা। হুগলীর ত্রিবেণীর জঙ্গলেই ছিল বিখ্যাত রঘু ডাকাতের ভাই জলদস্যু বুধোর ডেরা। ডেরার আশেপাশেই ছিল এক কালীমায়ের বিগ্রহ। এই মূর্তি রঘু ডাকাতের কালী নামেই প্রসিদ্ধ ছিল।রঘুর পরে দল ও পুজোর দায়িত্ব নেয় বুধো।

 

প্রতিবার মা কালীর পুজো করে তার আশীর্বাদ নিয়েই বুধোর দল বেরত ডাকাতি করতে। প্রায় সব ডাকাতিতে বুধোর দল সাফল্য পেত। ঘটনাক্রমে একবার ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পড়ে বুধোর দলের কয়েকজন। তবে সর্দার বুধো মা-কালীর কৃপায় পালাতে সক্ষম হয়। কিন্তু তাৎক্ষণিক ক্ষোভে বুধো ফেটে পড়ে। সে তার খাঁড়া দিয়ে দেবী অঙ্গে আঘাত হানে। পরোক্ষনে বুঝতে পারে ভারি ভুল হয়ে গাছে।তারপর স্বপ্নাদেশ পেয়ে বুধো

সেই মূর্তির ক্ষত সারিয়ে দেয়।

 

পরবর্তীকালে বুধোর ডাকাতি জীবনে আসে এক বিরাট পরিবর্তন। সে ডাকাতির প্রায় অধিকাংশ সম্পদ গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দেয় । বহু গরীব মেয়েদের বিয়ে পর্যন্ত দেয় নিজের টাকায়।

 

তারপর কেটে যায় বহু বছর। তখন বুধো আর নেই নেই তার ডাকাত দল। এই সময়ে একবার এই মন্দিরে ডাকাতি হয়। ডাকাতরা মায়ের সব অলঙ্কার চুরি করে নিয়ে যায়। যাবার আগে ভেঙে দিয়ে যায় প্রাচীন এই মৃণ্ময়ী কালী মূর্তিটিকেও। বর্তমানে যে মূর্তিটি আছে সেটি স্থাপন করেন জনৈক চিন্তাহরণ মহারাজ। সিমেন্টের তৈরি মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় সাত ফুট।পরবর্তীতে

ভক্তদের সৌজন্যে মন্দিরটির সংস্কারসাধনও ঘটে।

 

আগে বিশেষ বিশেষ অমাবস্যার পুজোতে

নরবলি হতো বলে শোনা যায়। এখনও

ছাগবলির রীতি আছে।পুজো হয় তন্ত্র মতে এই মন্দিরটি এখনও বুধো ডাকাতের কালীবাড়ি হিসেবেই খ্যাত।

 

চলতে থাকবে বাংলার কালী মন্দিরগুলি নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা। ফিরে আসবো

আগামী পর্বে যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

 

বাংলার কালী – ডুমুর কালীর পুজো

আমাদের সনাতন ধর্মে বিভিন্ন গাছকে অত্যন্ত শুভ এবং পবিত্র বলে মনে করা হয়। সেই সব গাছে বিভিন্ন দেবতার বাস বলে বিশ্বাস করা হয় আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে গাছ কেই স্বয়ং দেবী রূপে পুজো করা হয়।আজকের বাংলার কালী পর্বে আপনাদের এক এমন গাছের কথা লিখবো যে গাছে স্বয়ং মা কালী বাস করেন বলে বিশ্বাস করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

 

বাংলা বিহার উড়িষ্যা যখন থেকে অভিভক্ত ছিলো তখন থেকেই এই গাছে দেবী কালীর বাস বলে বিশ্বাস করা হয়।বর্তমানে গাছটি অবস্থান করছে বিহারের পূর্ণিয়ায়।বিহারের পূর্ণিয়া জেলার কেনাগর নামক স্থানেবহু বছর ধরে রয়েছে একটি ডুমুর গাছ। এই গাছেই মা কালীর অধিষ্ঠান বলে প্রচলিত বিশ্বাস মানুষের মনে।সেই থেকে দেবীকে গাছ কালী বা ডুমুর কালী বলেও ডাকেন অনেকে।

 

আজ থেকে প্রায় ছয়শো বছর আগে

স্বয়ং মা কালী নিজেই নাকি গ্রামবাসীদের স্বপ্নাদেশ দিয়ে জানিয়েছেন যে ওই গাছে তিনি বাস করেন।সেই থেকেই ডুমুর গাছের পুজো শুরু হয়।

 

এই ডুমুর গাছের নীচে রয়েছে মা কালীর ছবি।

বহু দূর দূর থেকেও এই গাছ দর্শন করতে মানুষ আসেন এখানে।বিশেষ বিশেষ তিথিতে বিশেষ পুজো উপলক্ষে বহু মানুষের ভিড় হয়। বহু মানুষ আসেন তাদের মনোস্কামনা নিয়ে। মনোস্কামনা

পূর্ণ হওয়ার পর আবার আসে পুজো দিতে।

 

সব থেকে আশ্চর্য বিষয় হলো প্রচণ্ড ঝড়েও ওই গাছের কিছু হয় না। একাধিক ঝড় ঝাপটা সাইক্লোন সহ্য করে আজও কয়েকশো

বছর ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে

দেবীর বাসস্থান এই ডুমুর গাছটি।

 

ফিরে আসবো বাংলার কালীর পরবর্তী পর্বে। থাকবে এমন কোনো ঐতিহাসিক কালী পুজো

নিয়ে আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – মঙ্গল পুরের ডাকাত কালী পুজো

আউশগ্রামের সংলগ্ন অজয় নদের তীরবর্তী সেনপাহাড়ি এলাকার কৃষি প্রধান এক গ্রাম মঙ্গলপুর।এই গ্রামেই আছে এক ডাকাত কালী মন্দির। এই পুজো নিয়ে আছে এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ। আজকের পর্বে এই পুজো

নিয়ে লিখবো।

 

এই মঙ্গলপুর গ্রামে প্রাচীন বটবৃক্ষের নীচে গ্রামের ডাকাত সর্দার নলিনাক্ষ মেটে, আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে খয়েরবুনি গ্রামের শ্মশান থেকে কালীকে চুরি করে এনে প্রতিষ্ঠা করেন এবং পুজো শুরু করেন।

 

শোনা যায় একবার মৃতদেহ পোড়াতে গিয়ে ডাকাত সর্দার নেশা করে অচৈতন্য হয়ে পরলে, তাকে ফেলে সহযাত্রীরা পালিয়ে আসে। পরে গভীর রাতে জ্ঞান ফিরতেই ডাকাত সর্দার দেখেন এক অসহায় বৃদ্ধা তার শিয়রের কাছে বসে। মাথায় হাত বুলাচ্ছেন। চমকে ওঠেন নলি ডাকাত। বৃদ্ধা তখন মা কালীর রূপ ধরে সর্দারকে দেখা দেন এবং বলেন শ্মশানে অবিহেলিত হয়ে তিনি পড়ে আছেন। নিয়মিত তার পুজো হয়না। তাকে নিয়ে গিয়ে মন্দির প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু করতে আদেশ করেন।

 

তখনই এই বট বৃক্ষের নিচে এনে মাকে প্রতিষ্ঠা করেন নলি ডাকাত । সে সময় সর্দার মায়ের পুজো করে মশাল জ্বালিয়ে ডাকাতদল নিয়ে বেরুতেন সন্ধ্যা রাতে ডাকাতি করতে আবার ফিরে এসে ভোর রাতে করতেন কালীর পুজো।

 

আজও এখানকার ডাকাত সর্দারের বংশধরাই

পুজোর দায়িত্ব পালন করেন।অতীতে পুজোর সময়ে সারারাত দলবেঁধে খেলা হতো লাঠি। এখনও সে রেওয়াজ বজায় রয়েছে।

 

এখানে পুজোর ক্ষেত্রে আরো একটি অদ্ভুত রীতি আছে।যেহেতু অতীতে ডাকাত দের ভয়ে পুরোহিত পুজো করতে আসতে চাইতেন না তাই ডাকাত সর্দার বামুন চুরি করে এনে পুজো করতো।

আজও এখানে না বলে বাড়ি থেকে বামুন

তুলে এনে কালীর পুজো করতে বাধ্য করা হয়।

এই ঘটনায় আর কোনো আতঙ্ক নেই।এই ঘটনাটি বেশ আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করেন সাধারণ মানুষ।ঠাকুর মশাই ও মেনে নেন এই প্রথা এবং খুশি মনে পুজোর দায়িত্ব নেন।

 

আবার ফিরে আসবো বাংলার কালীর অন্য একটি পর্ব নিয়ে। যথা সময়ে। থাকবে এমন।অনেক ইতিহাস এবং অলৌকিক ঘটনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

স্বরস্বতী পুজো উপলক্ষে বিশেষ পর্ব : বাংলার একটি স্বরস্বতী মন্দিরের ইতিহাস 

বাংলায় কালী মন্দিরের সংখ্যা অসংখ্য যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করছি।

আজ স্বরস্বতী পুজোর এই পুন্য তিথিতে আপনাদের এই বাংলার এক প্রাচীন সরস্বতী মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে কিছু তথ্য জানাবো ।

 

এই স্বরস্বতী মন্দির রয়েছে হাওড়ার পঞ্চানন তলায়। উমেশ চন্দ্র দাস লেনে। বাংলার এটিই একমাত্র সরস্বতী মন্দির না হলেও এই সরস্বতী মন্দিরে মা সরস্বতীর নিত্য পুজো হয় যা আর খুব একটা চোখে পড়েনা।

 

স্থানীয় দাস পরিবার এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করে।

এই মন্দির স্থাপিত হয় আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে।এই বংশের অন্যতম কৃতি সন্তান রণেশ চন্দ্র ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার। তিনি একবার কর্মসূত্রে রাজস্থানে ছিলেন। ফেরার সময় জয়পুর থেকে তিনি মা সরস্বতীর চার ফুটের শ্বেত পাথরের একটি মূর্তি  এনেছিলেন। সেই মূর্তি আনার পর তার বাবা উমেশ চন্দ্র দাসের ইচ্ছেতে এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় শুরু হয় দেবী সরস্বতীর নিত্য পুজো।

 

সে যুগে বনেদি বাঙালি পরিবারে দুর্গাপূজা বা কালী পুজোই হতো প্রধান উৎসব হিসেবে। তাই সরস্বতী পুজো শুরু করে এই দাস পরিবার চলে আসে আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে।শুধু তাই নয় এই পরিবার মা সরস্বতীর বিশেষ কৃপা লাভ করে এবং একের পর এক উচ্চ শিক্ষত এবং কৃতি সন্তান জন্মায় এই বাড়িতে।কেউ ছিলেন বিখ্যাত ডাক্তার।আবার কেউ উকিল।

 

যখন বঙ্কিমচন্দ্র ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলেন, তখন তিনি পঞ্চানন তলার বাড়িতে বেশ কয়েক বছর ছিলেন।বিধানচন্দ্র রায় এবং রবীন্দ্রনাথ সহ বাংলার বহু বিখ্যাত মনীষীরা এই বাড়িতে এসেছেন।

 

বৈশাখ মাসে প্রতিদিন তিন বেলা নিত্য সেবা করা হয় দেবীর। স্বরস্বতী পুজো হয় মহা সমারোহে।মন্দিরের দেওয়াল হাঁস ও বীণা দ্বারা সজ্জিত।

মন্দিরের রঙ মা স্বরস্বতীর প্রিয় রঙ হলুদ।

 

আবার ফিরে আসবো বাংলার কালী নিয়ে যথা সময়ে। আজ সবাইকে জানাই সরস্বতী পুজোর অনেক শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – কৃষ্ণগঞ্জের রক্ষা কালী পুজো

শ্রীচৈতন্য দেবের জন্মভূমি নদীয়া যদিও বৈষ্ণব ধর্মের প্রাণ কেন্দ্র কিন্তু এই নদীয় তেই আছে এমন এক কালী পুজোর ইতিহাস যা নানা কারণে বেশ তাৎপর্য পূর্ণ।মাজদিয়া অঞ্চলের কৃষ্ণগঞ্জ এর ডাকাত কালী রক্ষা কালী রূপেই পূজিত হয়ে আসছেন বহু বছর ধরে।এই পুজোর সঙ্গে জড়িত আছে স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অধ্যায় ।

 

শোনা যায় স্বাধীনতার আগের ব্রিটিশদের অত্যাচার যখন চরমে তখন ইংরেজ দের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গ্রামের মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় তারা সংঘবদ্ধ হয়ে সসস্ত্র সংগ্রাম করবে। প্রয়োজন তারা ব্রিটিশ দের থেকে লুট করবে অর্থ এবং বিপ্লব শুরু করবে।পরিকল্পনা মতো ইংরেজ কোম্পানির ট্রেন লুট করে বিপ্লবীরা আশ্রয় নেয় জঙ্গলে।

 

এই দলের সর্দার ছিলেন হেমন্ত বিশ্বাস। সেই সময়ে সাধারণ মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়েছিল

সেই লুট করা অর্থ ও খাদ্য সামগ্রী। ব্রিটিশ বাহিনী

যথা সাধ্য চেষ্টা করে স্বাধীনতা সংগ্রামী বা তাদের ভাষায় ডাকাত দের ধরতে। কিন্তু দূর্গম অরণ্য ভেদ করে তাদের কাছে পৌঁছানো সহজ ছিলো না। অবশেষে হাল ছেড়ে দেয় ব্রিটিশ বাহিনী।

দলের কাউকে খুঁজে না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। ব্রিটিশ বাহিনী ফিরে যাওয়ার পরের দিন ছিল দীপান্বিতা আমাবস্যা। সেই দিন থেকে এখানে তারা কালীপুজো শুরু করেছিলেন।

 

স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দলের মনে আস্থা ছিলো যে স্বয়ং মা কালী তাদের সহায়। দেবীর আশীর্বাদেই পরাস্ত হয়েছে ব্রিটিশ বাহিনী। দেবীই তাদের এবং গ্রাম বাসীদের রক্ষা করেছেন।

 

সেই থেকে এইখানে রক্ষা কালী রূপে দেবী কালীর পুজো চলে আসছে। অনেকের কাছেই এই পুজো ডাকাত কালীর পুজো নামে পরিচিত।আজও মানুষ বিশ্বাস করেন এই অঞ্চলকে স্বয়ং এই রক্ষা কালী সব বিপদ থেকে রক্ষা করেন।

 

পুজো হয় শাক্ত মতে। এককালে নর বলীর দেয়া হতো বলে জনশ্রুতি আছে। বর্তমানে পুজোর ভোগে নিরামিষ খিচুড়ি থেকে একাধিক রকম ভাজা তরকারি ফল মিষ্টি দেওয়া হয়।

 

সমগ্র নদীয়া জেলা জুড়ে দেবীর অসংখ্য ভক্ত আছেন। কালী পুজোর সময়ে বহু দূর দূরান্ত

থেকে মানুষ আসেন। কালী পুজোর পাশাপাশি এখানে এসে মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ও শ্রদ্ধা জানিয়ে যান।

 

ফিরে আসবো স্বরস্বতী পুজো উপলক্ষে বিশেষ পর্ব নিয়ে। আগামী দিনে। তারপর যথারীতি চলতে থাকবে বাংলার কালী। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – নীলু ভুলুর কালী পুজো

বাংলার কালী নিয়ে বলতে গিয়ে বার বার উঠে এসেছে ডাকাত কালী নিয়ে আলোচনা। তার মধ্যে জেলার প্রসিদ্ধ ডাকাত কালীর পুজো গুলো নিয়েই আলোচনা হয়েছে বেশি। তবে কলকাতাও পিছিয়ে নেই এক সময়ে এই খাস কলকাতাতেও চলে ফিরে বেড়াত ডাকাতরা। আর সেসব ডাকাতরাও পুজো করতেন কালীর।আজ এমনই এক পুজোর কথা বলবো। এই পুজো বিখ্যাত ছিলো নীলু ভুলুর পুজো নামে।

 

নীলু ভুলু ছিলো দুই ডাকাতের নাম তারা একসাথে দল বেঁধে ডাকাতি করতো জন্মসূত্রে তারকেশ্বরের সাথে যোগ থাকলেও তাদের খ্যাতি এবং কর্মকান্ড ছড়িয়ে পড়েছিল কলকাতা পর্যন্ত চেতলা অঞ্চলে এক কালী মন্দির গড়ে তারা পুজো করতো।এই অঞ্চলের ত্রাস হয়ে উঠেছিলো নীলু ভুলু।

 

চেতলা বাজার অঞ্চলের চেতলা রোডে অবস্থিত এই কালী মন্দির। এখানে কালী মূর্তিটি চব্বিশ ফুট উঁচু।নীচের বেদিটি অসুর মুণ্ডু দিয়ে তৈরি। উগ্রচণ্ডা রূপে দেবী সেই বেদীর উপরে স্বামী সহ বিরাজ করছেন।তবে সব থেকে যে বিষয়টি ব্যতিক্রমী তা হলো এখানে দেবী কালী মূর্তির হাতপা বাঁধা থাকে শেকল দিয়ে।

 

দেবীকে কেনো শেকলে বেঁধে রাখা হয়েছে তা নিয়ে একটি জনশ্রুতি প্রচলিত আছে।শোনা যায় এখানে নাকি এক সময় চলে ফিরে বেড়াতেন মা কালী। পুরোনো দিনের অনেক মানুষই নাকি মাকে শিবের বুক থেকে নেমে মন্দিরে হেঁটে চলে বেড়াতে দেখেছেন । তাই মনে করা হয় হয় মা কালী যাতে মন্দির ছেড়ে চলে যেতে না পারেন তাই সেইসময়ের ডাকাতরা মাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করেছিল। আজও তাই মায়ের হাত পা শেকল দিয়ে বাঁধা আছে ।

 

এই প্রাচীন কালী মন্দির নিয়ে অনেক কিংবদন্তী আছে।একবার তারকেশ্বর যাওয়ার পথে মা সারদাকে নীলু ও ভুলু নামের দুই ডাকাত ধরে নিয়ে তাদের আখড়ায় বেঁধে রাখে বলে শোনা যায়।

পরে ডাকাতরা দেখে মা সারদার জায়গায় বসে স্বয়ং মা কালী। এরপর নিজেদের ভুল বুঝতে

পেরে তারা মা সারদাকে ছেড়ে দেয়।

 

বাংলার ডাকাত কালী পুজো গুলির মধ্যে এই পুজো নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান

অধিকার করে আছে।

 

ফিরে আসবো বাংলার কালীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে যথা সময়ে। থাকবে এক ঐতিহাসিক কালী পুজো নিয়ে আলোচনা।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – নাক কাটা কালীর পুজো

পুরুলিয়া জেলার প্রাচীন কালীপুজোগুলির মধ্যে চিড়াবাড়ি এলাকার নাক কাটা কালি পুজো অন্যতম । এক প্রাচীন বট গাছের নিচে রয়েছে দেবীর খণ্ডিত মূর্তি । এই কালীমূর্তির নাক কাটা অবস্থায় পুজো হয় নাক কাটা কালী নামেই খ্যাত।

 

শোনা যায় বহুকাল আগে এই অঞ্চলে ডাকাত দের উৎপাত ছিলো সেই সময়ে ডাকাতদের হাত থেকে ফসল বাঁচাতে পুজো শুরু করেছিলেন গ্রামবাসীরা সেই রাগে ডাকাতরা দেবীর মূর্তি ভেঙে দিয়েছিল । কেটে দিয়েছিল মূর্তির নাক ।সেই থেকে দেবী এখানে পূজিত হন নাক-কাটা কালীরূপে।

শুধু নাক নয় দেবী মূর্তি এখানে খণ্ডিত।

পরবর্তীতে মূর্তি ভাঙার অপরাধে সেই ডাকাত দলকে নিশ্চিহ্ন করে দেন দেবী।এমন টাই জনশ্রুতি আছে।

 

এই দেবীর পুজোর পর থেকেই বন্ধ হয় ডাকাতি এবং গ্রাম বাসীরা ফিরে পান তাদের হারানো শান্তি। সে প্রায় দুশো বছর আগের কথা সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই গ্রামকে সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করেন এই দেবী।

 

প্রত্যেক অমাবস্যায় এবং প্রতি বছর কালী পুজোর সময়ে মহা ধুমধামের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে এই পুজো । প্রাচীন প্রথা মেনে ছাগ বলিও হয় এই মন্দিরে এবং পুজো হয় তন্ত্র মতে।নাক কাটা কালীর উপরে গোটা পুরুলিয়া জেলার মানুষের অগাধ আস্থা এবং শ্রদ্ধা।

 

দেখা হবে আগামী পর্বে। সঙ্গে থাকবে অন্য এক কালী মন্দিরের কথা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।