শ্রী শ্রী সীতারাম দাস ওমকার নাথআসন্ন গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে ভারতের কিছু মহান ও প্রখ্যাত গুরুদের মহিমা এবং অলৌকিক নানা ঘটনা বর্ণনা করা শুরু করেছি|আজকের পর্বেজানাবো মহান সাধক শ্রী শ্রীসীতারাম দাস ওমকার নাথ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং তার জীবনের কিছু অলৌকিক ঘটনা।শ্রী শ্রী সীতারাম দাস ওমকার নাথ ইংরেজি 1891 সালে হুগলীর ডুমুর দহে প্রান হরি চট্টোপাধ্যায় ও মালতি দেবীর গৃহে জন্মান তার নাম রাখা হয় প্রবোধ চন্দ্র|আত্মীয় স্বজন রা তাকে গৃহী দেখতে চেয়েছিলো তাই ঠাকুরচরণ ভট্টাচার্য্যের কন্যা সিদ্ধেশ্বরী দেবীর সঙ্গে তার বিবাহ দিলেন|কিন্তু ক্রমে আধ্যাত্মিক ভক্তির সমুদ্রে ডুবে যেতে থাকেন সীতারাম দাস ওঙ্কার নাথ এবং দুই সন্তান এর জন্মের পর ঘর ছেড়ে সন্যাসী হয়ে বেড়িয়ে পড়লেন তিনি।পরবর্তীতে সাধক দাশরথি মুখোপাধ্যায়ের কাছে দীক্ষা নিলেন|গঙ্গা যমুনা সঙ্গম এ রাম নাম মন্ত্রে তার দীক্ষা হয়েছিলো||সর্বত্র রাম নাম প্রচার করতেন তিনি|একবার পুরীর স্বর্গদ্বারে গিয়ে তিনি জগন্নাথ দেবের দর্শনের উদ্দেশ্যে ধ্যানে বসেন। মনে মনেসংকল্প করেন হয় প্রভু দেখা দেবেন নাহলে এই ভাবেই সমাধিস্ত অবস্থায় তিনি দেহ রাখবেন।দীর্ঘ সময় ধ্যান করার পর স্বয়ং জগন্নাথ দেব তাকে দর্শন দেন এবং আদেশ দেন রাম নাম প্রচার করতে। তিনি ফিরে আসেন বাংলায়।সীতারাম দাস মৌরিগ্রামের এসে আবিষ্কার করেন এক অরণ্যে ঢাকা অযত্নে পড়ে থাকা প্রাচীন চন্ডী বিগ্রহ। কয়েকজন ভক্ত শিষ্য নিয়ে তিনি সেই দুর্গম জঙ্গলে শুরু করেন পরিত্যক্ত বিগ্রহ উদ্ধারের কাজ। পদে পদে বাঁধা আসে। বিষধর সাপ। হিংস্র জন্তু আক্রমণ করে তাদের। অলৌকিক ভাবে সীতারাম দাস রাম নাম শুনিয়ে তাদের শান্ত করেন।পরবর্তীতে বহু কষ্টে ঘট স্থাপন করে পুজোর ব্যবস্থা হয়।পুজোর সময় ঘটে আরো এক অলৌকিক ঘটনা। বিদ্যুৎচমকের মতো এক লাল আভায় ঢেকে যায় আকাশ। তার পর সেই স্থানে শুরু হয় পুষ্প বৃষ্টি।রাশি রাশি লাল জবা ফুল ঝরে পড়তে থাকে আকাশ থেকে। বৃষ্টি থামতে দেখা যায়। মাটি ঢেকে গেছে লাল ফুলে। সবাই অবাক। সীতারাম কিন্তু এক মনে পূজোর ব্যবস্থা করে চলেছেন।এমন বহু ঘটনা আছে সীতারাম দাসের জীবনে।ধীরে ধীরে সাধক সীতারাম রাম নামের প্রচারে সপেঁ দেন জীবন|আজও অসংখ্য ভক্ত শিষ্য তার বাণী এবং দর্শন প্রচার করে চলেছেন।এই মহান সাধককে প্রণাম করে শেষ করছি আজকের পর্ব।দেখা হবে পরের পর্বে। থাকবে এমনই কোনো সিদ্ধ গুরুর অলৌকিক জীবন।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
গুরু কথা – গুরু গোরক্ষ নাথ
গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে ভারতের আধ্যাত্মিক গুরুদের নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে লেখা লেখি চলছে। আজ গুরু গোরক্ষ নাথ ও তার অলৌকিক জীবনে কিছুটা আলোকপাত করবো।গুরু গোরক্ষ নাথ ছিলেন নাথ সম্প্রদায়ের অন্যতমসন্ন্যাসী। তার সঠিক আবির্ভাব ও তিরোধান দিবস স্পষ্ট করে বলা যায়না। তিনি ছিলেন মতসেন্দ্র নাথের প্রধান শিষ্য এবং উত্তরসুরি। হট যোগ সাধনা করে তিনি সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। তার নানা বিধ অলৌকিক ক্ষমতার কথা শোনা যায়।গুরু গোরক্ষ নাথের কর্মকান্ড শুধু ভারত নয় নেপালেও তার বিস্তৃতি রয়েছে।নেপালের গোরখা জনজাতি মহাযোগী গোরখনাথকে তাঁদের রক্ষাকারী দেবতারূপে পূজা করেন। এমনকি রাজতন্ত্রের যুগে নেপালের মুদ্রায় বা প্রশাসনিক বিভিন্ন চিহ্নে গোরখনাথের ছবি ব্যবহার করা হতো । ধৰ্মপ্রাণ নেপালীরা বিশ্বাস করেন, যুগ যুগ ধরে মহাসাধক গোরখনাথই তাদের রক্ষা করছেন।একবার কোনো কারণে গোরখনাথ নেপালবাসীর ওপর প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে নেপাল ছেড়ে চলে যান। নেপালের উপর যেন প্রকৃতির অভিশাপ নেমে আসে। অনাবৃষ্টি, দাবানল বা ভূমিকম্পের কবলে পড়ে। বহুদিন এই অবস্থা সহ্য করার পরে নেপাল রাজ সিদ্ধান্ত নেন যে সবাই মিলে গোরখনাথের শরণাপন্ন হবেন। সেই মতো দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজা রানি একসাথে গোরখনাথের আরাধনা শুরু করেন।নেপালবাসী এক অলৌকিক ঘটনা দেখতে পান, তাঁরা দেখেন পাহাড় চূড়া থেকে লোকালয়ে নেমে আসছেন মহাযোগী গোরখনাথ এবং তাঁর গুরু মৎস্যেন্দ্রনাথ। তাঁদের পিছনে এগিয়ে আসছে প্রবল বৃষ্টি। বারো বছর পর গোরখনাথ ও তাঁর গুরুর কৃপায় নেপাল আবার শস্য-শ্যামল, সজীব হয়ে ওঠে।আজও নেপালের লোককাহিনিতে এই ঘটনা বিশেষ ভাবে উল্লেখিত আছে।একবার গুরু গোরক্ষ নাথ তার গুরু মতসেন্দ্র নাথ কে যোগ বলে কামাখ্যার মায়াবী নারীদের থেকে রক্ষা করেছিলেন।বহু দিন গুরুর সান্নিধ্য না পেয়ে একবার ধ্যানস্ত গোরক্ষ নাথ ধ্যানের মধ্যে গুরুকে স্মরণ করলেন। ধ্যানাবিষ্ট অবস্থায় তিনি আশ্চর্য্য হয়ে দেখলেন গুরুদেব রয়েছেন কামরূপে। এবং সেখানে শত শত তরুণী দ্বারা তিনি বেষ্টিত। ভাবলেন কামরুপ রাজ্যের কুহুকিনি নারীদের মায়া জালে আটকে গুরুদেব ভোগসুখে ডুবে আছেন। যোগ বলে গোরক্ষনাথ গুরুদেবের উদ্ধারের নিমিত্ত সেখানে উপস্থিত হলেন। এবং অনেক চেষ্টায় সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে আনলেন।বাস্তবে হয়তো গুরু তার শিষ্যর ভক্তি এবং ক্ষমতার পরীক্ষা নিয়েছিলেন।বর্তমান উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুর শহর তার নামেই গড়ে উঠেছে। গোরক্ষ নাথ মন্দির ও রয়েছেএই স্থানেই এবং নাথ সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং পরম্পরা বর্তমানে সফল ভাবে বহন করে চলেছেন যোগী আদিত্যনাথ।পরবর্তী পর্বে আরো এক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন গুরুর জীবন কাহিনী নিয়ে ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
গুরুপূর্ণিমা উপলক্ষে বিশেষ পর্ব – যোগী রাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
আগামীকাল অর্থাৎ ৩ রা জুলাই গুরু পূর্ণিমা|আজকের পর্ব উৎসর্গ করবো এক মহান যোগী এবং বিশ্ববন্দিত গুরুকে। তবে তার আগে গুরুতত্ব নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা পাঠকদের জানাবো।জীবের অন্ধকারাচ্ছন্ন মনকে শ্রীগুরুই জ্ঞানালোক দ্বারা আলোকিত করতে পারেন । গীতা তে স্পষ্ট বলা হচ্ছে যিনি শিষ্য কে সকল জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্ত করে আধ্যাত্মিক মার্গে চালনা করবেন ও জন্ম মৃত্যুর আবর্ত থেকে নিষ্কৃতির পথ দেখবেন তিনিই প্রকৃত গুরু|অর্থাৎ পরম জ্ঞান লাভ হয় যার আশ্রয়ে, যার শিক্ষায়, তিনিই প্রকৃত গুরু|শাস্ত্রে আছে -গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণু গুরুর্দেবো মহেশ্বরগুরুরেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ’গুরুই হলেন ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর। তিনিই আমাদের সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের জ্ঞান বা পরম ব্রহ্মজ্ঞান দান করেন। সেই গুরুর উদ্দেশে প্রণাম জানাইআবার বৈষ্ণব মতে বলা হয় “গুরু রেখে যে গোবিন্দ ভজে তার দেহ নরকে মজে।”অর্থাৎ গুরু ভক্তি ছাড়া ঈশ্বরে ভক্তি বৃথা|ভগবান বা ভগবতী রুষ্ট হলে শ্রীগুরু রক্ষা করতে পারেন- কিন্তু শ্রীগুরু রুষ্ট হলে ব্রহ্মাণ্ডের কেউ রক্ষা করতে পারে না।এমনই এক গুরু ছিলেন যোগীরাজ শ্যামা চরণ লাহিড়ী। বর্তমানে গোটা বিশ্ব জুড়ে ক্রিয়া যোগ যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে তার জন্য লাহিড়ী মশাইয়ের অবদান অসামান্য।ব্রিটিশ ভারতবর্ষে 1895 সালে শ্যামাচরণ নদীয়া জেলায় এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শ্যামচরণ। তার জীবন ছিলো আর পাঁচটা সাধারণ গৃহস্ত বঙ্গ সন্তানের মতোই। চাকরি করতেন একটি বেসরকারি সংস্থায়। একবার কর্মসূত্রে তাকে যেতে হয় হিমালয়ের পাদদেশে এক এলাকায় এর এখানেই ঘটে এক অদ্ভূত ঘটনা।একদিন পাহাড়ে চলার সময় তিনি তাঁর গুরু কিংবদন্তী স্বরূপ মহাবতার বাবাজির দেখা পেলেন যিনি ক্রিয়া যোগের কৌশলগুলো তাকে শিখিয়ে তাকে দীক্ষা দিলেন।দীক্ষার পর চললো কঠোর অনুশীলন ধীরে ধীরে শ্যামচরণ হয়ে উঠলেন যোগীরাজ শ্যামাচরণ।পরবর্তীতে গৃহস্ত জীবনে থেকে তিনি সাধনা করেছেন। অসংখ্য ভক্ত শিষ্য হয়েছে। ঘটিয়েছেন বহু অলৌকিক ঘটনা যা নিয়ে আজও আলোচনা হয়।শোনা যায় একবার তাঁরই এক শিষ্যা অভয়া গুরুর সঙ্গে দেখা করতে হাওড়া থেকে বারাণসী আসছেন। মালপত্র নিয়ে ছুটতে ছুটতে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছতেই দেখলেন, বারাণসী এক্সপ্রেস স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে স্টেশনেই বসে পড়লেন তিনি। আস্তে আস্তে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ট্রেন। চূড়ান্ত হতাশ অভয়া তখন অঝোরে কাঁদছেন আর গুরুদেব শ্যামাচরণ লাহিড়িকে স্মরণ করছেন।হটাৎ অভয়া দেখলেন, ট্রেন থেমে গিয়েছে।ড্রাইভার ও গার্ড ও অবাক তৎক্ষণাৎ মালপত্র নিয়ে দৌড় দিলেন তিনিও। অভয়া ট্রেনে ওঠামাত্র থেমে যাওয়া বারাণসী এক্সপ্রেস আবার গড়গড় করে চলতে শুরু করল।বারাণসী পৌঁছে অভয়া তাঁর গুরুদেবের কাছে গেলেন। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা মাত্র যোগীরাজ শ্যামাচরণ বললেন, ‘ট্রেন ধরতে গেলে একটু সময় হাতে নিয়ে বেরোতে হয় মা,অত বড়ো ট্রেনকে কি আটকে রাখা যায়?গুরুর অলৌকিক ক্ষমতায় দেখে অবাক হলেন শিষ্যা অভয়া|বলা হয় তিনি যোগ বলে সুক্ষ দেহে যেখানে খুশি যেতে পারতেন। একবার তিনি বিলেতে থাকা অফিসের বড়ো বাবুর স্ত্রীর সব খবর কলকাতায় বড়ো বাবুকে বর্ণনা করেছিলেন। বিশ্বাস হয়নি বড়ো বাবুর। কিন্তু যখন স্ত্রী বিদেশ থেকে চিঠি লিখলেন জানা গেলো শ্যামচরণ যা যা বলেছেন সব সত্যি। পরবর্তীতে যখন সেই সাহেবের স্ত্রী বিলেত থেকে স্বামীর কাছে আসেন সেখানে শ্যামাচরণ কে দেখে অবাক হয়ে বলেন ইনি তো সেই ব্যাক্তি যিনি অসুস্থতার সময়ে তার সেবা করতে তার খবর নিতে গেছিলেন তার কাছে।এখানে আরো একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে হয় একবার বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ের বড়সাহেব ভগবতীচরণ ঘোষের অধস্তন কর্মচারী ছুটি নিয়ে বারাণসী যাবেন তাঁর গুরু শ্যামাচরণ লাহিড়ীর কাছে। ভগবতীবাবু ছুটি দেননি সেদিন বিকেলবেলা বাড়ি ফেরার পথে তিনি দেখলেনসেই কর্মচারী মাঠের রাস্তা ধরে বিষণ্ণ ভাবে বাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। তিনি পালকি থেকে নেমে তাঁকে ‘অযথা ছুটি কেন নেবে? চাকরিতে উন্নতি করো’ ইত্যাদি বোঝাচ্ছেন। আচমকা সেই মাঠে শূন্য থেকে ফুটে উঠল একটি ব্যাক্তি । দীপ্ত কণ্ঠে ভর্ৎসনা করে বললেন ‘ভগবতী, তুমি কর্মচারীদের প্রতি খুব নির্দয়।’ পরক্ষণেই মিলিয়ে গেল সেই মূর্তি। অধস্তন কর্মীটি তত ক্ষণে আবেগ চেপে রাখতে পারেননি, গুরুদেব বলে কেঁদে ফেলেছেন।কারন যিনি এসেছিলেন তিনি স্বয়ং শ্যামাচরণ লাহিড়ী। ছুটি মঞ্জুর হয় । পরবর্তীতে পুরো রহস্যটা ভাল ভাবে বুঝতে সেই কর্মচারীর সঙ্গে সস্ত্রীক বারাণসীতে রওনা হলেন ভগবতীবাবু। গিয়ে দেখেন, চৌকিতে পদ্মাসনে বসা সেই লোক। আবার শ্যামচরণ মৃদু ভৎসনা করলেন ভগবতী বাবুকে সে দিনই সস্ত্রীক লাহিড়ীমশাইয়ের কাছে দীক্ষা নিলেন ভগবতীবাবু।গুরুপূর্ণিমা উপলক্ষে সারা সপ্তাহ ধরে এমন সব গুরু ও তাদের অলৌকিক ঘটনাবলী নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে লেখা থাকবে।সবাইকে জানাই গুরু পূর্ণিমার শুভেচ্ছা।পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্ম – দেবী দয়াময়ী
দেবী আদ্যা শক্তি নানা রূপে নানা নানা নামে এই বঙ্গের নানা প্রান্তে পূজিতা হন। আজ দেবীর যে রূপটির কথা বলবো তা দয়াময়ী নামে খ্যাত।বর্তমান হুগলি জেলার চুঁচুড়ায় দয়াময়ী কালী মন্দির যার পথ চলা শুরু সেই মোঘল আমলে।আজ লিখবো প্রাচীন এই মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে।বাদশা আকবরের বিশ্বস্ত রাজস্বসচিব রাজা টোডরমল চুঁচুড়া অঞ্চলটি রেখেছিলেন তার অনুগত জায়গীরদার জিতেন রায়ের তত্ত্বাবধানে। শাক্ত জিতেন ছিলেন দেবী কালিকার ভক্ত।তিনিই এইখানে নির্মাণ করেন মন্দির এবং দেবী দয়াময়ীকে প্রতিষ্ঠা করেন শাস্ত্র মতে।সেই আমলে তৈরী বিশেষ পাতলা ইট দিয়ে গড়ে ওঠে এই মন্দির।অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে মন্দিরপ্রাঙ্গণ। উন্মুক্ত প্রাঙ্গনের পূর্বদিকে দেবী দয়াময়ীর মন্দির।পাশেই পরপর দাঁড়িয়ে চারটি শিবমন্দির। নাটমন্দিরহীন দেবী মন্দিরের চুড়ো গম্বুজাকৃতি। ছোট ছোট সিঁড়ির ধাপের মতো উঠে গিয়েছে নিচ থেকে উপর পর্যন্ত। মন্দির বিশাল নয় তবে ভারী সুন্দর গঠনশৈলী এবং প্রাচীনত্ত্ব এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্যর দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই দয়াময়ী দেবীর মন্দির।স্থানীয় দের কাছে অত্যান্ত জাগ্রত দেবী দয়াময়ী।পুরোনো এই মন্দিরের গর্ভগৃহে দেবী কালীর একটি বিগ্রহ রয়েছে যার উচ্চতা প্রায় দেড় থেকে পৌনে দু-হাত এবং মূর্তিটি কষ্টিপাথরে নির্মিত শাস্ত্র মতে দেবী দক্ষিণাকালী রূপেই বিরাজ করছেনপাথরের বেদিতে মহাদেব শুয়ে আছেন দয়াময়ীর পদতলে। কষ্টি পাথরের হলেও এখানে দেবী মূর্তি হাল্কা খয়েরি আভাযুক্ত তাই বিগ্রহের আকর্ষণই আলাদা।তীক্ষ্ণ নাক। উন্মুক্ত কেশ রাশি।বিগ্রহের মুখমণ্ডল সামান্য লম্বাটে।দেবীর ত্রিনয়ন এবং জিহ্বা স্বর্ণমণ্ডিত। কণ্ঠহার মুণ্ডমালা, হাতের খড়গ রুপোয় তৈরি।সব মিলিয়ে দয়াময়ী কালীর অপরূপ রূপ প্রত্যক্ষ করলে হৃদয় ও চোখ জুড়িয়ে যায়।প্রতিদিন দূর দূরান্ত থেকে অগণিত ভক্তের সমাগম ঘটে দেবীর শ্রীচরণে পুজাঞ্জলি নিবেদন করতে।আপনারাও সুযোগ পেলে এবং দেবীর ইচ্ছে হলে অবশ্যই দেবীর পুষ্পাঞ্জলি দেয়ার এবং প্রসাদ পাওয়া সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন।ফিরে আসবো আগামী দিনে। নতুন পর্ব নিয়ে। চলতে থাকবে এই ধারাবাহিক আধ্যাত্মিক আলোচনা। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।
মন্দির রহস্য – কলকাতার বগলামুখীমন্দিরের ইতিহাস
শাস্ত্রে আছে সতী যখন মহাদেবের কাছে তাঁর পিতৃগৃহে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন, তখন মহাদেব তাঁকে অনুমতি দেননি। ক্ষুব্ধ দেবী সতী তাঁর দশটি রুদ্র রূপের মাধ্যমে সেই সময় মহাদেবকে দশ দিকে ঘিরে ধরেন। তাঁকে ভয় দেখান । এই দশটি রূপ মহাবিদ্যা নামে খ্যাত।এই দশ মহাবিদ্যার এক বিদ্যা বগলা মুখীর একটিপ্রাচীন মন্দির রয়েছে খাস কলকাতায়। আজ জানাবো কি ভাবে এই মন্দির তৈরী হলো এখানে।আজকের উত্তর কলকাতার দমদমে রয়েছে এই দশ মহাবিদ্যার অষ্টম মহাবিদ্যা দেবী বগলামুখীর মন্দির ।প্রায় একশো বছর স্থানীয় জমিদার রাধিকাপ্রসাদ সান্যাল স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্বপ্নাদেশে তিনি জানতে পেরেছিলেন যেখানে আজ মন্দির, তার মাটির নীচে দেবীমূর্তি রয়েছে। এরপর তিনি মাটি খুঁড়িয়ে সেখান থেকে দেবীর মূর্তিটি উদ্ধার করেন এবংসেখানে মন্দির তৈরী করে দেবীকে প্রতিষ্ঠিত করেন।দমদমে দেবী বগলার মন্দিরটি একটি পঞ্চরত্নের মন্দির। দেবীর বিগ্রহ এখানে পাথরের বেদিতে স্থাপিত। দেবীর পুজোয় লাগে হলুদ বস্ত্র, হলুদ ফুল, হলুদ মিষ্টি।ভক্তদের বিশ্বাস শতবর্ষ প্রাচীন এই দেবীর মন্দির অত্যন্ত জাগ্রত।মনস্কামনা পূরণের পাশাপাশি, বিভিন্ন গ্রহগত সমস্যা সমাধানের জন্যও দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা এই মন্দিরে ছুটে আসেন। এখানে প্রতিদিন একবেলা দেবীর অন্নভোগ হয়। সন্ধ্যায় দেওয়া হয় ফল এবং মিষ্টি।দেবী বগলার প্রকৃত অর্থ হল যিনি কোনও কিছুর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিতে সক্ষম। শাস্ত্র মতে দেবী যে কোনও দোষকে গুণে পরিণত করতে পারেন। যেমন তিনি বাক্যকে স্তবে, অজ্ঞানকে জ্ঞানে, শক্তিহীনতাকে শক্তিতে আর পরাজয়কে জয়ে পরিবর্তন করতে সক্ষম।তন্ত্র অনুযায়ী দেবী বগলা ভক্তের মানসিক ভ্রান্তিনাশের দেবী। অনেকে দেবী বগলাকে শত্রুনাশের দেবীও বলে থাকেন। দেবীর এক হাতে আছে মুগুর বা গদা এবং অন্য হাতে আছে কাটা মুন্ডু।দেবীর মন্দির এবং প্রতিমা সবই অত্যন্তসুন্দর এবং এবং এক অপার্থিব এবং আধ্যাত্মিক শান্তি পাওয়া যায় এখানে।ফিরে আসবো আগামী পর্বে। নতুন কোনো দেবী মাহাত্ম বা মন্দির রহস্য নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্ম – কমলে কামিনী
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
দেবী মাহাত্ম পর্বে আজ আপনাদের বাংলার
লোক কথায় উল্লেখিত দেবী কমলে কামিনীর কথা বলবো।জানাবো এমন এক বনেদি বাড়ির কথা যেখানে কুলদেবী রূপে আছেন
দেবী কমলে কামিনী।
কমল অর্থাৎ পদ্ম এবং কামিনী অর্থাৎ কন্যা।প্রস্ফুটিত চৌষট্টিদল পদ্মের ওপরে বসে এক দেবী যার দুই হাতে দুই হাতি।দেবী আদ্যাশক্তির একটি বিশেষ রূপ কমলে কামিনী।তিনি একই সাথে দয়া মায়া হীনা আবার বিশেষ ক্ষেত্রে পরম করুণাময়ী।
বণিক ধনপতি এবার সুদূর সিংহল দেশ থেকে চন্দন আনতে যায় । যাত্রাকালে দেবী চণ্ডীকে অবজ্ঞা করায় একটি বাদে তার সব ডিঙাই জলে ডুবে যায়।সেই সময় দেবী চণ্ডী প্রথম তাকে কমলে কামিনী মূর্তি দেখান।পরবর্তীতে ধন পতি সিংহল রাজের অনুরোধে তাকে সেই রূপ দেখাতে ব্যর্থ হন এবং রাজার কোপে পড়েন।চন্ডী মঙ্গল কাব্যের এই উল্লেখ আছে যে যখন ধনপতি পুত্র শ্রীমন্ত বাণিজ্য করার পথে বিপদে পড়েন।ঝড়ে মাঝ সমুদ্রে জলে ডুবে যাচ্ছিলেন সেই সময় মা দুর্গা কমলে কামিনী রূপে দেখা দেন এবং তার হাত ধরে তোলেন।পরবর্তীতে স্বপরিবারে ধনপতি শেঠ দেবী কমলে কামিনীর পুজোয় ব্রতী হন।
বাংলার প্রাচীন পারিবারিক পুজো গুলির মধ্যে অন্যতম বনগাঁর দাঁ বাড়ির দুর্গাপুজো। দেবী এখানে কমলে কামিনী রূপে পূজিতা হন।
প্রায় দেড়শ বছর আগে বৈঁচি থেকে গোপালনগরের দাঁ বাড়িতে এসে পুজোর সূচনা করেন এই বংশের কৃষ্ণচন্দ দাঁ । শোনা যায় সেই সময় বৈঁচিতে বর্গী আক্রমণ হওয়ার সেখান থেকে বাঁচার জন্য কৃষ্ণচন্দ্র দাঁ তার পরিবার নিয়ে চলে আসেন গোপালনগরে। ইছামতি নদী পথে গোপালনগরে এসে একদিকে বাণিজ্য শুরু করেন তিনি এবং ক্রমেই ব্যবসায় প্রচুর সুনাম ও সম্মাপ্তি অর্জন করে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার অন্যতম ধনী।এই বংশের কুল দেবী হলেন কমলেকামিনী।
বর্গীর আক্রমন থেকে বাঁচতে পরিবার যখন অন্যত্র স্থানান্তরিত হয় সেই সময় থেকে কমলে কামিনী রূপেই গোপালনগর দাঁ বাড়িতে দেবীর পুজো শুরু হয় । আজও সেই পরম্পরা চলছে।
জনশ্রুতি আছে দেবীর কৃপায় প্রভূত ধন সম্পত্তি এবং নাম যশ ও খ্যাতি লাভ হয়।
চলতে থাকবে মন্দির রহস্য এবং দেবী মাহাত্ম নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা ফিরে আসবো আগামী পর্বে। নতুন বিষয় এবং জানা অজানা অনেক নতুন তথ্য ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
বিশেষ পর্ব – উল্টো রথের শুভেচ্ছা
বাস্তবে রথ যাত্রা ঠিক একদিনের উৎসব নয়। আসলে রথ যাত্রার সূচনা হয় দেবস্নান পূর্ণিমায় প্রভু জগন্নাথের স্নানের মধ্যে দিয়ে আর শেষ হয়উল্টো রথ যাত্রার দিনে জগন্নাথদেব তার ভাই ও বোন কে নিয়ে মাসির বাড়ি থেকে নিজগৃহে রাজকীয় প্রত্যাবর্তন করেন।তবে মাসির বাড়ি থেকে ফিরেও পুরীর মূল মন্দিরে সাথে সাথে প্রবেশের অনুমতি মেলেনা স্বয়ং জগন্নাথ দেবের। মন্দিরে ঢুকতে গেলেই লক্ষ্মী দেবী সটান মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেন কারণ তিন ভাইবোন মাসির বাড়ি থেকে আনন্দ করে এসেছেন অথচ তাঁকে নিয়ে যাননি। অভিমানী লক্ষ্মী দেবী এই কয়দিন একা একা শ্রীমন্দিরে ছিলেন। সেই থেকে তিন দিন এরকম ভাবেই বাইরে থাকে রথ সহ বিগ্রহ। এই তিন দিন পালিত হয় কিছু অনুষ্ঠান তারপর মহালক্ষীর মান ভঞ্জন হলে পুনরায় মন্দিরের রত্ন বেদিতে স্থান পান জগন্নাথ শুভদ্রা এবং বলরাম।সাধারণত উল্টো রথে যখন জগন্নাথ ফিরে আসেন এই যাত্রাকে বহুদা যাত্রা বলা হয়। এরপর আছে অধরপানা এবং নীলাদ্রি বিজয়। অধরপানায় জগন্নাথকে বিশেষ পানীয় পান করানো হয়। সেটাকে ঘিরেও উৎসব হয় । এর পরদিন নীলাদ্রি বিজয় উৎসব হয়। এক হিসেবে এই দিনেই রথযাত্রা শেষ হয়। উল্টো রথ উপলক্ষে প্রভু জগন্নাথসহ সুভদ্রা-বলরাম ও সেজে ওঠেন নানা সোনারগয়নার সাজে।এই বেশ কে সোনা বেশ বলা হয়।মন্দিরে ফিরলে জগন্নাথদেবের উদ্দেশ্যেনিবেদন করা হয় কয়েকশ হাড়ি রসগোল্লা নানা রকম মিষ্টান্ন সর্বশেষে নীলাদ্রিবিজয় উৎসবেরমাধ্যমে শেষ হয় এই সমস্ত রীতি -রেওয়াজ এবং তার পর জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরাম কে মন্দিরেরমূল রত্নবেদি-তে তোলা হয়। আজ এই বিশেষ পর্ব এখানেই শেষ করছি। আপনাদের সবাইকে উল্টোরথ যাত্রার অনেক শুভেচ্ছা। ফিরে আসবো আগামী পর্বে ধারাবাহিক আলোচনা নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্ম – জগন্নাথ ও বিমলা দেবী
চলছে রথ যাত্রা উৎসব। উল্টো রথ দিয়ে হবে এই শাস্ত্রীয় উৎসবের সমাপ্তি। এই সময় প্রভু জগন্নাথের নানা বিধ লীলা এবং শ্রী ক্ষেত্রের মহিমা বর্ণনা করার উত্তম সময়।এই পুরী ধাম শুধু জগন্নাথ ধাম নয়।দেবী বিমলা এই শ্রী খেত্রেই অধিষ্টান করেন।পীঠনির্ণয় তন্ত্রে আছে – “উৎকলে নাভিদেশশ্চ বিরিজাক্ষেত্রমুচ্চতে বিমলা মা মহাদেবী, জগন্নাথস্ত ভৈরব”অর্থাৎ তিনি শ্রীমন্দিরের কত্রী।প্রভু জগন্নাথ তাঁর ভৈরব হিসেবে অবস্থান করেন।আবার তিনিদেবী মহামায়ার অংশ এবং একান্ন টি সতীপীঠের অন্যতমা দেবী বিমলার মন্দির ।আজও জগন্নাথের ভোগ সবার আগে সমর্পন করা হয় তাঁকেই। দেবীর পুজো হয় তন্ত্রমতে। মনে করা হয় দেবী বিমলার দর্শন না করা অবধি জগন্নাথ দর্শন সম্পূর্ণ হয় না।পুরান মতে বিষ্ণু দর্শন হেতু মহাদেব একবার বৈকুণ্ঠে হাজির হন। সেই সময় বিষ্ণু আহারে বসেছেন। যা দেখে শিবের ইচ্ছা হয় নারায়ণের প্রসাদ গ্রহন করবেন তাই আহার শেষে নারায়ণের থালায় পড়ে থাকা সামান্য অংশ মুখে দেন তিনি। নারায়ণের ভাবে তিনি এতটাই আবিষ্ট ছিলেন যে সেই প্রসাদের কিছুটা তাঁর মুখে লেগে যায়। কৈলাসে ফিরে নারদকে দেখতে পান মহাদেব। বিষ্ণুভক্ত নারদ মহাদেবের মুখে লেগে থাকা প্রসাদ দেখেই বুঝতে পারেন এই প্রসাদ তাঁর উপাস্যের। সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে প্রসাদ নিয়ে মুখে পোড়েন তিনি। দেবী পার্বতীও সেখানে উপস্থিত হন। প্রসাদ পাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেন কিন্তু শিব তো অপারগ কারন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। ক্রোধান্নিতা পার্বতী হাজির হন নারায়ণের কাছে। সব শুনে নারায়ণ তাঁকে বলেন এবার থেকে পুরী ধামে তাঁর শক্তি রূপে অবস্থান করবেন দেবী।এবং নারায়ণের প্রসাদ সবার আগে তাঁকে অর্পন করা হবে। যে প্রথা আজও এতটুকু বদল হয়নি। দেবী বিমলাকে অর্পন করার পরই জগন্নাথের প্রসাদ হয়ে ওঠে মহাপ্রসাদ।সেই প্রসাদ পরবর্তীতে বিতরণ করা হয় ভক্তদের মধ্যে।শ্রীমন্দিরে চত্বরেই দেবী বিমলার মন্দির। আবার পুরাণমতে সতীর ডান পায়ের কড়ে আঙুল পড়েছিল এই খানে তাই এটি সতী পীঠ।ফিরে আসবো আগামী পর্বে উল্টোরথ উপলক্ষে বিশেষ পর্ব নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
বিশেষ পর্ব – অম্বুবাচির প্রকৃত অর্থ
অম্বুবাচী নিয়ে বিগত সপ্তাহে বিভিন্ন আঙ্গিকে আলোচনা করেছি জানিয়েছি তার শাস্ত্রীয় এবং আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা এবং বিধিনিষেধ। আজ অম্বুবাচি পরবর্তী এই পবিত্র সময়ে জানাবো অম্বুবাচির প্রকৃত বা অন্তর নিহিত অর্থ।পুরানে পৃথিবীকে নানা রূপে দেখানো হয়েছে।শাস্ত্র মতে তিনি কশ্যপ প্রজাপতির কন্যা ভূদেবী। আবার রামায়ণে তিনি সীতার মা। অন্য একটি পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুসারে দ্বাপরযুগে কৃষ্ণের স্ত্রী সত্যভামা রূপে এই ভুদেবী জন্মেছিলেন।আবার বরাহ অবতারে এই বসুন্ধরাকেই অতল সাগর থেকে রক্ষা করেছিলেন স্বয়ং বিষ্ণু।আষাঢ় মাসে বর্ষার আগে অম্বুবাচীতেঋতুমতী হন তিনি। এই সময়ে কৃষকরা কৃষি কাজ থেকে বিরত থাকেন ও ধরিত্রী কে বিশ্রাম দেন|আবার অম্বুবাচীউপলক্ষে উড়িষ্যায় ভূদেবীর বিশেষ পূজা মেলা ও উৎসবের আয়োজন করা হয় ও ব্যাপক জন সমাগম হয়|ভূদেবী কে উড়িষ্যায় স্বয়ং জগন্নাথ দেবের স্ত্রী হিসেবে কল্পনা করা হয় এবং তার ঋতুমতী হওয়ার সময় কাল কে চারদিনের রজ উৎসব হিসেবে পালন করা হয়|চারদিনের এই উৎসব কে চারটি আলাদা পর্যায় উদযাপন করা হয় প্রথম দিনকে বলা হয় পহিলি রজ। দ্বিতীয় দিন মিথুন সংক্রান্তি| তৃতীয় দিন ভূদহ বা বাসি রজ এবং চতুর্থ দিন বসুমতী স্নান। বাংলাও কোনো কালে পিছিয়ে ছিলোনা এই শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠান পালনে অম্বুবাচী উপলক্ষে গ্রামবাংলার বিধবা মহিলারা তিন দিন ধরে ব্রত রাখেন|দেশ তথা বাংলার প্রায় সব গুলো শক্তি পীঠেই নিষ্ঠার সাথে অম্বুবাচী পালন হয় ও সেই উপলক্ষে বিশেষ উৎসব এবং কোথাও কোথাও মেলার আয়োজন করা হয়|অম্বুবাচি সর্বাধিক জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে পালন করা হয় আসামে|দেশের অন্যতম শক্তি পীঠ কামরূপ কামাখ্যায় অম্বুবাচী একটি মহোৎসবের রূপ নেয়।সনাতন ধর্মে চন্দ্র সূর্য বায়ু পর্বত বা গঙ্গা যেমন দেবতা বা দেবী রূপে পূজিত হন তেমনই প্রকৃতিএখানে দেবীর মর্যাদা পায়। যে প্রকৃতি আমাদের খাদ্য দেয় অক্সিজেন দেয় জল দেয় সেই প্রকৃতিকে মাতৃ শক্তি রূপে পুজো করা এবং তার জীবনের একটি বিশেষ পর্যায়কে সন্মান জানানোই অম্বুবাচির প্রকৃত উদ্দেশ্য।পরবর্তী পর্বে ফিরে আসবো দেবী মাহাত্মা নিয়ে। ধারাবাহিক ভাবে চলবে মন্দির রহস্য এবং দেবী মাহাত্মা নিয়ে আলোচনা।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
বিশেষ পর্ব – অম্বুবাচির আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা
চলতি বছরে অম্বুবাচী প্রবৃত্তিঃ অর্থাৎ শুরু হবে ২২ জুন অর্থাৎ ৬ আষাঢ় এবং নিবৃত্তি হবে ২৬ জুন অর্থাৎ ১০ আষাঢ়। আধ্যাত্মিক ভাবে অত্যান্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই সময়ে প্রতিটি পর্বে আপনাদের জানাচ্ছি কি এই অম্বুবাচি এবং কিভাবে ও কেনো এই ধর্মীয় উৎসব পালন করা হয়।
সহজ ব্যাখ্যায় সনাতন ধর্মে পৃথিবী কোনো জড় বস্তু নয় বসুন্ধরাকে কে আমরা এক দেবী বা মাতৃ রূপে দেখি ও পূজা করি তাই স্বাভাবিক ভাবেই এক নারী যেমন সন্তান ধারনের পূর্বে ঋতুমতী হয় ধরিত্রী ও তেমন ফসল উৎপাদনের পূর্বে রজঃস্বলা হয় ও পরবর্তীতে ফসল উৎপাদনের জন্য আরো বেশি উর্বর হয়ে ওঠে|জীবন চক্রের এই বিশেষ পর্যায়কেই অম্বুবাচি বলা হয়।
আষাঢ় মাসে মৃগশিরা নক্ষত্রের তিনটি পদ শেষ হলে অম্বুবাচী কালের সূচনা হয় হন|শুরুর দিনটি অম্বুবাচী প্রবৃত্তি ও ও শেষের দিনটি হলো অম্বুবাচী নিবৃত্তি|
অম্বুবাচি নিবৃত্তি কাল সব দিক দিয়ে অত্যন্ত শুভ।
জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে সঠিক পরামর্শ মেনে ও উপযুক্ত প্রতিকার নিয়ে বহু মানুষকে জীবন যুদ্ধে জয়ী হতে দেখেছি এবং এই সব সাফল্যের পেছনে
অবশ্যই থাকে কিছু বিশেষ তিথি ও গ্রহগত সংযোগ|অম্বুবাচী এমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় যে সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহন করলে জ্যোতিষের মাধ্যমে অনেক কঠিন সমস্যার সমাধান সম্ভব।
আগামী ২৬ অম্বুবাচি নিবৃত্তি এবছর প্রথা মেনে মা হৃদয়েশ্বরী সর্বমঙ্গলা মায়ের মন্দিরে বিশেষ পূজা ও গ্রহ দোষ খণ্ডনের আয়োজন করা হয়েছে। বলতে বাঁধা নেই বিগত বছর গুলিতে এই তিথিতে
গ্রহ দোষ করিয়ে অসংখ্য মানুষ সাফল্য পেয়েছেন।
আমি থাকছি। চাইলে এখনই যোগাযোগ করতে পারেন।
ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নিয়ে।
পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।