Home Blog Page 83

একান্ন পীঠ – বক্রেশ্বর

আজ শক্তিপীঠ বক্রেশ্বর নিয়ে লিখবো।
পীঠমালা, কালিকাপুরাণ ও তন্ত্রচূড়ামণি গ্রন্থে বক্রেশ্বরের উল্লেখ আছে।
আজ থেকে পাঁচশো বছর আগে বক্রেশ্বর ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা নির্জন ভূমি। চৈতন্য ভাগবতে তার প্রমাণ মেলে। কাটোয়ায় সন্ন্যাস গ্রহণের পর মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য বলেছিলেন, ‘বক্রেশ্বর আছেন যে বনে, তথায় যাইনু মুঁঞ্চি থাকিমু নির্জনে।’ সেই সময়টায় তান্ত্রিক, ভৈরবী, অঘোরপন্থীদের দাপট ছিল বক্রেশ্বরে।
বক্রেশ্বরের সঙ্গে জড়িয়ে ঋষি অষ্টাবক্রের কাহিনি। কথিত আছে, অষ্টাবক্র মুনি প্রথমে কাশীতে উপাসনার সংকল্প নেন। কিন্তু কাশীর বিশ্বনাথ স্বয়ং তাঁকে গৌড়দেশের গুপ্তকাশী বক্রেশ্বরে গিয়ে সাধনা করতে বলেন
সতীর ভ্রুসন্ধি বা মনঃস্থান পড়েছিল বলে, ভারতবর্ষের একান্ন পীঠের মধ্যে বক্রেশ্বরকে মহাপীঠ হিসেবে গণ্য করা হয়। তন্ত্রের ভাষায় ওই মনঃস্থানকে আজ্ঞাচক্র বলে।
পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক তথ্যের নিরিখে আজকের বক্রনাথের মন্দির সাতশো বছরের বেশি পুরনো। নির্মাণ করিয়েছিলেন রাজা নরসিংহ দেব। বাংলায় সুলতানি শাসনে মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর রাজা দর্পনারায়ণ সতেরোশো একষট্টি খ্রিস্টাব্দে তা সংস্কার করেন।
মহাপীঠ বক্রেশ্বরকে বেষ্টন করে রয়েছে সাতটি উষ্ণ প্রস্রবণ এবং একটি শীতল জলের কুণ্ড। মাটির নিচ থেকে জলের নিরন্তর বিচ্ছুরণ হয়ে চলেছে অলৌকিক ভাবে।
বক্রনাথের মন্দিরে ভগবানের চেয়েও উচ্চাসনে রয়েছেন তাঁর ভক্ত। গর্ভৃগৃহে পিতলের ধাতু মণ্ডিত উঁচু যে শিলা রয়েছে তা অষ্টাবক্র মুনির। এর ঠিক পাশেই কিছুটা নিচে বক্রেশ্বর মহাদেবের ছোট শিলা।
দেবীমন্দিরে বেদীর ওপরে ভ্রুসন্ধির প্রস্তুরীভূত রূপটি রক্ষিত আছে। জনশ্রুতি আছে যে খাকি খাকিবাবা নামে খ্যাত এক সিদ্ধ সন্ন্যাসী শাস্ত্র মতে বহু যুগ আগে বেদীতে এটির প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রায় প্রত্যেক অমাবস্যায় এই বক্রেশ্বর পীঠে অসংখ্য দর্শণার্থী আসেন। তন্ত্র মতে পুজো এবং হোম যজ্ঞ হয়।
আজকের একান্ন পীঠ পর্ব এখানেই শেষ করছি পরবর্তী শক্তিপীঠ নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – প্রভাস

একান্ন পীঠের অন্যতম শক্তি পীঠ গুজরাটের সৌরাষ্ট্র অঞ্চলের সোমনাথ জেলায় অবস্থিত।এই শক্তি পিঠের নাম প্রভাস।সতীর পাকস্থলী অথবা উদারভাগ এই স্থানে পতিত হয়েছিল।
প্রভাস শক্তিপীঠে অধিষ্ঠিত দেবী হলেন চন্দ্রভাগা এবং ভৈরব হলেন বক্রতুণ্ড।
প্রভাস শক্তি পীঠের সাথে জড়িত রয়েছে একটি পৌরাণিক কাহিনী পৌরাণিক কাহিনীএই স্কন্ধ পুরাণ অনুসারে সত্য যুগে চন্দ্র প্রজাপতি দক্ষ রাজার ২৭ জন কন্যাকে বিবাহ করলেও শুধুমাত্র রোহিনীর প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন বেশি তার বাকি ২৬ জন স্ত্রী অবহেলিত ও অপমানিত বোধ করে তাদের বাবা দক্ষকে নালিশ করেন।
এই কথা শুনে দক্ষ রাজা, চন্দ্রকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে তিনি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যাবেন। তখন চন্দ্র শাপমোচনের জন্য এই প্রভাস নামক স্থানে এসে শিবের আরাধনা করতে শুরু করেন। শিবের কৃপায় তার শাপ মোচন হয় এবং পরবর্তীতে প্রভাস তীর্থের কাছেই স্বয়ং চন্দ্র দেব সোমনাথ মন্দির তৈরি করেছিলেন।
বর্তমানে সোমনাথ মন্দির থেকে কিছুটা দূরে প্রভাস শক্তি পীঠ বা চন্দ্রভাগা দেবীর এই মন্দিরটি অবস্থিত। সেই পৌরাণিক কালের ধ্বংস হয়ে যাওয়া মন্দিরটির রুপই এখনও বর্তমান।
পাথরের তৈরি এই মন্দিরের গায়ে বিভিন্ন দেবতার মূর্তি খোদাই করা আছে। সঠিক কোন সময়ে এই মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছিল তার কোন ঐতিহাসিক তথ্য আজও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
তবে ঐতিহাসিক তথ্য মতে চন্দ্রভাগা দশভুজা সিংহ বাহনা রূপে রানী অহল্যা বাইকে স্বপ্নে আদেশ দিয়ে বলেন যে, ভূগর্ভে চাপা পড়া সতীর অঙ্গ উদ্ধার করে মন্দির সংস্কার করে পুজো শুরু করতে ।এরপরই দেবীর স্বপ্নের আদেশ মতো অহল্যা বাই সেই অঙ্গশিলা উদ্ধার করে দেবীর মন্দির সংস্কার করে নিত্যদিনের পুজোর আয়োজন করেন।সেই সময় থেকেই প্রভাস শক্তিপীঠের জনপ্রিয়তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।দেবী চন্দ্র ভাগা কে দেবী উমা নামেও ডাকেন তার ভক্তরা।
শিবরাত্রি এবং কার্তিক পূর্ণিমার সময় সোমনাথ মন্দিরে ভিড় হওয়ার দরুন এখানেও ভিড় হয়। তবে নবরাত্রির সময় এখানে প্রচুর পরিমাণে ভক্তদের সমাগম দেখা যায়। তাছাড়া প্রায় সারা বছর ধরে এখানে পূজা অর্চনা চলতে থাকে। আর তাই সারা বছর সমগ্র দেশ থেকে এবং দেশের বাইরে থেকেও বিভিন্ন মানুষ এখানে আসেন পূজা দিতে।
আপাতত প্রভাস শক্তি পীঠ নিয়ে আলোচনা এখানেই শেষ করছি।ফিরে আসবো পরবর্তী শক্তিপীঠ নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – বৈদ্যনাথ

আজ একান্ন পীঠ পর্বে যে শক্তিপীঠের কথা জানাবো তা শক্তি পীঠ হওয়ার পাশাপাশি একটি দ্বাদশ জ্যোৎরলিঙ্গের অন্যতম অর্থাৎ একটি শৈব
তীর্থও বটে।আজ শক্তিপীঠ বৈদ্যনাথ নিয়ে আলোচনা করবো এই মন্দিরটি বর্তমানে ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের দেওঘর জেলায় অবস্থিত।
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এখানে সতীর হৃদয় বা হৃৎপিণ্ড পড়েছিল। বৈদ্যনাথ ধামে অধিষ্ঠিত দেবী জয় দুর্গা ও ভৈরব হলেন স্বয়ং শিব যিনি বৈদ্যনাথ রূপে এখানে বিরাজমান।
পুরানে আছে একবার রাবন শিবকে স্থায়ী ভাবে লঙ্কায় নিয়ে যেতে কঠোর তপস্যা করেন।তপস্যয় সন্তুষ্ট হয়ে চন্দ্রহাস নামে একটি বিরাট শক্তিশালী অস্ত্রও রাবণকে উপহার হিসেবে প্রদান করেন, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন রাবন, শেষমেষ শিব আত্মলিঙ্গ অর্পণ করে লঙ্কার প্রতিষ্ঠা করতে বলেন তাকে।শর্ত ছিলো কৈলাস থেকে লঙ্কার পথে যাওয়ার সময় কোথাও যদি রাবণ শিবলিঙ্গ কে কোন জায়গায় রেখে দেন, তাহলে তিনি সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবেন। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে লঙ্কায় যাওয়ার পথে ক্লান্ত এবং তৃষ্ণার্থ রাবন এই স্থানে শিবলিঙ্গ কিছুক্ষনের জন্য নামিয়ে রাখেন আর সেখানেই শিবলিটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। সেই শিব লিঙ্গই বৈদ্য নাথ রূপের এই শক্তি পীঠের ভৈরব রূপে বিরাজ করছে।
মন্দিরের ভৈরবকে আরোগ্য বৈদ্যনাথ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যার অর্থ হল যিনি সর্বরোগহারি, রামায়ণেও এই বৈদ্যনাথ
মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়।শিব পুরাণে এই মন্দিরকে দুটি আত্মার মিলনস্থল বলেও বর্ণনা করা হয়েছে।কারন এটিই একমাত্র শক্তিপীঠ যেখানে বৈদ্যনাথে শিব এবং শক্তি একসাথে বিরাজমান।একটি প্রচলিত বিশ্বাস আছে যে এই শক্তি পীঠে বর ও কনের একসঙ্গে বিবাহ দিলে তাদেরও বন্ধন অটুট হয়।
প্রাচীন কালে মন্দিরের কিছু দূরে শ্মশান ছিল, যেখানে মায়ের হৃদয় পড়েছে বলে মনে করা হয়, এই জায়গাটি বর্তমানে “চিতাভূমি” নামে পরিচিত সকলের কাছে। মায়ের হৃদয় পতিত হওয়ার এই শক্তিপীঠ “হৃদয় পিঠ” নামেও ডাকা হয়।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী মোঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ এই বৈদ্যনাথ শক্তিপীঠের মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন এবং দেওঘর রাজ্যের রাজা দ্বিধাউর এই মন্দির নির্মাণের কাজে অনেকখানি সহযোগিতা করেছিলেন, পরবর্তী কালে এই মন্দির একাধিক বার সংস্কার করা হয় এমনকি ব্রিটিশ আমলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও এই মন্দিরের রক্ষনাবেক্ষনের ভার নিয়ে ছিলো।
শক্তি পীঠ হওয়ায় অমাবস্যা তিথি গুলিতে এখানে ধুমধাম করে পুজো হয় আবার জ্যোতির্লিঙ্গ থাকায় বৈদ্যনাথে বিরাট আকারে পালিত হয় মহা শিবরাত্রি।
আজকের একান্ন পীঠ পর্ব এখানেই শেষ করছি।
দেখা হবে পরের পর্বে থাকবে একটি অন্য
শক্তি পীঠের কথা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তিপীঠ – কাত্যায়নি

এই মাত্র কিছু দিন আগেই ঘুরে এলাম বৃন্দাবন থেকে যদিও বলতেই মনে আসে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রধান মন্দির গুলি, রাধা কৃষ্ণের স্মৃতি বিজড়িত স্থান গুলি, নিধী বনের রাশ লীলা, ইত্যাদি তবে এতো কিছুর মাঝে, এই বৃন্দাবনের পবিত্র ভূমিতেই রয়েছে ৫১ শক্তি পীঠের অন্যতম শক্তিপীঠ যার নাম কাত্যায়নী। আজকের পর্বে এই শক্তি পীঠ নিয়ে লিখবো।
শক্তিপীঠটি কাত্যায়নী নামে বেশি পরিচিত হলেও দেবী এখানে উমা বা যোগমায়া নামেও পূজিতা হন এবং দেবীর ভৈরব হিসেবে এই স্থানে পূজিত হন ভূতেশ।
সতীর দেহের কোন অংশ বৃন্দাবনের এই বিশেষ স্থানে পতিত হয়েছিলো তা নিয়ে বিভিন্ন শাস্ত্রে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। একটি মত অনুসারে এখানে দেবী সতীর কেশ রাশি পড়েছিলো আবার অন্য একটি মত অনুসারে অনুসারে এই স্থানে পড়েছিলো দেবীর আংটি।
বর্তমানে রঙ্গনাথ মন্দিরের কাছে রাধাবাগে শক্তি পীঠ কাত্যায়নী অবস্থিত এবং দেবীর ভৈরব ভূতেশ বৃন্দাবনের ভূতেশ্বর রোডের কাছে ভূতেশ্বর মহাদেব মন্দিরে পূজিত হয়ে থাকেন।
প্রাচীন কালে কবে কে কিভাবে এই শক্তিপীঠ আবিস্কার করেন তার কোনো সঠিক এবং নিদ্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়না তবে ১৯২৩ সালে যোগীরাজ স্বামী কেশবানন্দ এই স্থানটি চিহ্নিত করেন এবং দেবী মন্দির তৈরী করেন।এই মন্দিরের অন্যতম দর্শনীয় বস্তু একটি বিশাল আকৃতির তলোয়ার আছে যাকে উচ্ছল চন্দ্রহাস বলে।
ভাগবত পুরাণে আছে যে ব্রজের গোপীগন
শ্রীকৃষ্ণ কে পতি রূপে পাওয়ার জন্য সারা মাঘ মাস জুড়ে কাত্যায়নী ব্রত পালন করেছিলেন।
সেই সময়ে তারা প্রতিদিন কাত্যায়নী শক্তি পীঠে
দেবীর পুজো করতে আসতেন এবং
নিজেদের মনোস্কামনা দেবীকে জানাতেন।
শাস্ত্র মতে কাত্যায়নী রূপ নবদুর্গার ষষ্ঠ রূপ তাই নবরাত্রির সময় এখানে বিশেষ পুজো হয় এবং বেশ বড়ো আকারে উৎসব হয়।ভক্ত রা বিশ্বাস করেন কাত্যায়নী রূপে দেবী উমার পূজা করলে ভয়, শোক, দুঃখ দূর হয়ে যায় তার পরিবর্তে শান্তি ও শক্তির সঞ্চার হয়। তাই এই স্থানে বহু ভক্তের সমাগম হয়।
আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য কোনো শক্তিপীঠের কথা ও তার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা
নিয়ে। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তিপীঠ – কালমাধব

ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের অমরকণ্টক সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি মাহাত্ম্যপূর্ণ তীর্থস্থান। এখানেই অবস্থিত কালমাধব শক্তিপীঠ
একান্ন পীঠের অন্যতম একটি পীঠ হলো এই কালমাধব সতীপীঠ।পুরান অনুসারে সতীর বাম নিতম্ব পড়েছিলো এই স্থানে।কালমাধব মন্দিরে দেবী কালীরূপে পূজিতা হন এবং এই শক্তি পীঠে দেবীর ভৈরব হলেন অসিতাঙ্গ।
যে স্থানে কাল মাধব শক্তি পীঠটি নির্মিত হয়েছে তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়।মন্দিরের চারপাশে রয়েছে শ্বেত পাথর দিয়ে বাঁধানো পুকুর এবং মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে শোন নদী।
চার দিকে বিস্তৃত পার্বত্য ভূমি যা এখানকার একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান।
এই শক্তি পীঠ মন্দিরের ইতিহাস অতি প্রাচীন।
আমরা কোনো বস্তু বা স্থানের প্রাচীনত্ত্ব বোঝাতে একটি প্রবাদ ব্যবহার করে বলি ” মান্ধাতার আমল” এই মান্ধাতা আসলে প্রাচীন ভারতের
এক সূর্য বংশীয় সম্রাট ছিলেন। আজ থেকে আনুমানিক ৬০০০ বছর আগে এই সূর্যবংশীয় সম্রাট মান্ধাতা শোন নদীর তীরে অমরকন্টকে এই কালমাধব মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। সেই সময়ে শ্বেত শুভ্র পাথরের তৈরি করা হয় মন্দিরটি।
আজও এই মন্দিরের সৌন্দর্য এবং নির্মাণ শৈলী দর্শণার্থীদের মুগ্ধ করে।
সেই প্রাচীনকাল থেকে এই শক্তিপীঠে দেবী
কালীরই পুজো চলে এসেছে । তবে পরবর্তীতে এখানে দেবীকে নর্মদা মা রূপে পুজো শুরু হয় দেবীর বিগ্রহের দুই পাশে জয়া ও বিজয়ার মূর্তি আজও প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। কাল মাধবে নর্মদা মায়ের পূজা ও ধ্যান মন্ত্র চামুণ্ডার বিধি মতে হয়ে থাকে। পূজারীরা সেই হাজার হাজার বছর থেকে
বংশ পরম্পরায় পুজোর দায়িত্ব সামলে আসছেন।
যদিও প্রায় সারা বছর ধরেই এখানে অসংখ্য ভক্তদের সমাগম দেখা যায়। তবে দুর্গাপূজা বা নবরাত্রীর সময় এই মন্দিরে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয় এবং ভিড় হয় অনেক বেশি।
আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য
এক শক্তি পীঠের ইতিহাস ও পৌরাণিক ব্যাখ্যা নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তিপীঠ – বিশালক্ষী

সনাতন ধর্মে কাশি হল একটি মহা পুণ্যময় তীর্থ
যদিও শৈব্য তীর্থ হিসেবেই বেশি পরিচিত তবু এই কাশির অধীস্টাত্রী দেবী মা অন্নপূর্ণা এবং কাশির সুরক্ষার ভার অর্পণ করা হয়েছে স্বয়ং কাল ভৈরবকে।প্রায় সবকটি পুরাণে এই নগরের মাহাত্ম্য উল্লেখ রয়েছে। পুরানে বলা হয়েছে কাশি নগর ভগবান শিবের ত্রিশূলের উপরে অবস্থিত। এই কাশিতেই রয়েছে একটি শক্তি পীঠ শাস্ত্রে
যার নাম বিশালক্ষী।
এই কাশিতে বিশালক্ষী মন্দির যে স্থানে আছে সেখানে দেবীর কানের দুল পতিত হয়েছিল।
শিবপুরানেও এই শক্তি পীঠের উল্লেখ আছে এবং বলা হয়েছে এখানে দেবীর দেহের কোন অংশ পড়েনি তবে দেবীর গহনা অথবা অলংকার পড়েছিল। দেবী হলেন অন্নপূর্ণা আর ভৈরব হলেন বিশ্বনাথ।দেবীর আরেক নাম মনিকর্নিকা তার নামেই মনিকর্নীকা ঘাট এবং এখানে দেবীর ভৈরব হলেন স্বয়ং কালভৈরব।
পুরান অনুসারে ভগবান বিষ্ণু কাশিতে এসে সুদর্শন চক্র দিয়ে একটি পুষ্করিণী খনন করেছিলেন এবং সেখানে বসে হর গৌরীর তপস্যা করেন। সেই সময় ভগবান বিষ্ণুর শরীর থেকে ঘাম নির্গত হয়ে এই পুষ্করিণী টি জলে পূর্ণ হয়।পরবর্তীতে বিষ্ণুর ধ্যানে সন্তুষ্ট হয়ে হর গৌরী দেখা দেন।
শাস্ত্র মতে মা গৌরীর কানের দুল এই জলে পতিত হয়েছিল।তখন থেকেই এই জলাশয়ের নাম হয় মনিকর্নিকা। পরবর্তীতে এই জলাশয় গঙ্গাতে মিলিত হয় এবং গঙ্গার ঘাটটির নাম হয় মণিকর্নিকা।
বিশালক্ষী শক্তি পীঠের আশেপাশের পরিবেশ এক কথায় অপূর্ব। মন্দিরে দুটি বিশালক্ষী দেবীর মূর্তি আছে। মনে করা হয় প্রথম মূর্তিটির আড়ালে আছে আদি বিশালক্ষী মূর্তি যা স্বয়ম্ভু অর্থাৎ অলৌকিক ভাবে দেবী নিজেই এখানে প্রকট হয়েছেন।
সারা বছর পুজো হলেও নব রাত্রি এই শক্তিপীঠে প্রধান উৎসব। নবরাত্রিতে দেবীর বিশেষ পুজো হয় এবং প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়।
আবার অন্য একটি শক্তিপীঠের ইতিহাস এবং পৌরাণিক ব্যাখ্যা সাথে শাস্ত্রীয় তথ্য নিয়ে
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্নপীঠ – পাটনেশ্বরী

ভারতের একান্নটি সিদ্ধ শক্তি পীঠের মধ্যে
একটি পাটনেশ্বরী শক্তিপীঠে। পুরান মতে
দেবী সতীর ‘ডান উরু’ এই স্থানে পড়েছিল।
আজকের পর্বে এই শক্তিপীঠ নিয়ে লিখবো।
বিহারের পাটনায় অবস্থিত এই ঐতিহাসিক পাটনেশ্বরী মন্দির।সর্ব প্রথম পাটন দেবী মন্দিরটি গুপ্ত রাজবংশের দ্বারা খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। পরবর্তীতে সেই প্রাচীন মন্দির কোনো ভাবে কালের গহব্বরে অদৃশ্য হলে পুনরায় মুঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মান সিং ওই মন্দির স্থাপন করেছিলেন। দেবীর মন্দিরে দূর্গা সহ গণেশ, বিষ্ণু এবং সূর্য দেবের মূর্তি রয়েছে এবং নিয়মিত
তাদের পুজো হয়।
মন্দিরের মূর্তিগুলো সবই কালো পাথরে তৈরি। মন্দিরের প্রবেশপথে একটি বারান্দা রয়েছে। এর পরে, মহাকালী, মহালক্ষ্মী, মহা সরস্বতী। ভৈরব ব্যোমকেশের জন্য রয়েছে আলাদা কক্ষ।
পাটনেশ্বরী শক্তিপীঠে ভৈরব ব্যোমকেশ নামে পরিচিত। দেবী সতীকে এখানে পাটনেশ্বরী রূপে পুজো করা হয়।মনে করা হয় দেবীর নামেই এই শহরের নাম হয় পাটনা।
মন্দিরের গর্ভ গৃহে একটি রাজকীয় সিংহাসনে দেবী মূর্তি রাখা আছে। মূর্তির উচ্চতা প্রায় সাত ফুট। বিশেষ বিশেষ দিনে দেবীর বিশেষ অঙ্গ সজ্জা হয় সেই সময়ে দেবীকেপরানো হয় বিশেষ শাড়ি।
দূর্গাপুজো বা নব রাত্রি এই শক্তিপীঠের প্রধান উৎসব এবং এই সময়ে অসংখ্য ভক্ত সারা দেশ থেকে এই শক্তিপীঠে আসেন এবং নিজের মনোস্কামনা জানিয়ে পুজো দেন।এই সময়ে এখানে দেবীর উদ্দেশ্যে নারকেল নিবেদনের রীতি আছে।
ফিরে আসবো অন্য একটি শক্তি পীঠের ইতিহাস নিয়ে আগামী পর্বে। এখনো বহু শক্তিপীঠ সম্পর্কে আলোচনা বাকি আছে। ধারাবাহিক ভাবে এই একান্ন পীঠ নিয়ে পর্ব গুলি চলতে থাকবে।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – জয়ন্তী

আজকের একান্ন পীঠ পর্বে যে শক্তি পীঠটি নিয়ে আলোচনা করবো তার সঠিক অবস্থান নিয়ে কিঞ্চিৎ বিতর্ক আছে।আজকের পর্বে শক্তি পীঠ জয়ন্তী নিয়ে লিখবো ।
অনেকের মতে এই শক্তি পীঠের প্রকৃত স্থান পশ্চিমবঙ্গর হাওড়ার কোনো এক স্থানে আবার অনেকে মনে করেন ভারত ভূটান সীমান্তে এক দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে এই পীঠ অবস্থিত।তবে বাংলা দেশের শ্রীহট্টর জয়ন্তী অঞ্চলে এই শক্তি পীঠ অবস্থিত বলেই বেশি ভাগ শাস্ত্রজ্ঞ মনে করেন এবং এখানেই আছে দেবীর মন্দির।জ্ঞানার্ণব তন্ত্র ও বিশ্বসার তন্ত্রে এই স্থানের উল্লেখ আছে ।
পুরান মতে এই স্থানে সতীর ‘বামজঙ্ঘা’ পতিত হয়ে ছিলো । দেবী জয়ন্তীর ভৈরব ক্রমদীশ্বর শ্রীহট্ট জেলার অন্তর্গত জয়ন্তিয়া নামক পার্বত্য অঞ্চলে
রয়েছে দেবীর মন্দির। দুর্গম পাহারে চারকোণা অগভীর গর্তের মধ্যে একটি চৌকো পাথরের মধ্যে দেবীর অবস্থান ।
মন্দিরের অনতিদূরে আর একটি কুণ্ড আছে। স্বচ্ছ জলের এই কুন্ডের জলে দেবীর পূজো হয় । মন্দিরের থেকে অল্প দূরে আর একটি শিবলিঙ্গ দেখা যায়।পাহাড়ে তিনটি গুহা । খুব সরু এবং দুর্গম প্রবেশ পথ । তিনটি প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্টি প্রাচীন গুহা আছে । একটি হল মহাকাল ভৈরবের গুহা। একটি জয়ন্তী রূপী মহাকালী মায়ের গুহা। অপর একটি গুহাতে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ দেখা যায়।এখানে শিবলিঙ্গ ও শয়ম্ভু।
বহু কাল পূর্বে এই পাহাড়ে জয়ন্তীর রাজা দেবীর পুজো করতেন । পাহাড় কেটেই এক কালে তৈরী হয়েছিলো মন্দির যা আদতে গুহারই অংশ বলে মনে করা হয়।মন্দির তৈরীর সাথে জড়িয়ে আছে এক অলৌকিক ঘটনা।স্থানীয় আদিবাসী গ্রামের এক আদিবাসী সর্দার স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই স্থানে দেবীর পুজো শুরু করেন সেই সময়ে আদিবাসী মেয়েরা খড় বাঁশের মন্দির নির্মাণ করে দেবী আদ্যা শক্তি ও শিবের পূজা করতেন। পড়ে স্থানীয় রাজা মন্দির নির্মাণ এবং পুজোর দায়িত্ব নিজের হাতে নেন। সেই থেকে এই দেবী রাজ পরিবারের পৃষ্ঠেপোষকতায় পূজিতা হন।
শোনা যায় এক সময়ে শ্রীহট্টের এই মন্দিরে জয়ন্তীর রাজা দুর্গাপূজার নবমীর দিন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বলী দিতেন।পুজো হতো তন্ত্র মতে।পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে রাজ তন্ত্রর অবসান ঘটলে বলী প্রথা বন্ধ হয়।
আজও এই শক্তি পীঠ অসংখ্য তন্ত্র সাধক ও মাতৃ সাধকদের আস্তানা। বিশেষ বিশেষ তিথিতে এখানে আগত ভক্তরা আজও পদে পদে অলৌকিক শক্তির উপস্থিতি অনুভব করেন
ফিরে আসবো অন্য এক শক্তি পীঠের কথা নিয়ে আগামী পর্বে যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – জ্বালা মুখী

আজকের শক্তিপীঠ পর্ব জ্বালামুখী নিয়ে।ভারতের হিমাচল প্রদেশের কাংড়া উপত্যকায় অবস্থিত জ্বালা মুখী শক্তি পীঠ।
ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যেও এই পীঠের উল্লেখ আছে, সেখানে বলা হচ্ছে-
“জ্বালমুখে জিহ্বা তাহে অগ্নি অনুভব
দেবী অম্বিকা নাম উন্মত্ত ভৈরব”
পুরান মতে এখানেই কালীধর পাহাড়ে কোথাও দেবী সতীর জিহ্বা পতিত হয়েছিল।
এই শক্তি পীঠে দেবতাদের তেজ সম্পন্ন হয়ে একটি অগ্নিশিখা সর্বদা নাকি জ্বলছে সেই থেকেই নাম জ্বালা মুখী।রাজা ভূমিচন্দ্র সেই স্থানের অনেক সন্ধান করেন কিন্তু খুঁজে না পেয়ে নগরকোটের সামনে একটি দেবীর মন্দির নির্মাণ করেন পরে একদিন রাজা এক গোয়ালার কাছে দেবীর অগ্নি শিখার কথা শুনলেন এবং সেই স্থান খুঁজে পেয়ে সেখানেই দেবীর মন্দির নির্মাণ করলেন ।মহাভারত কালে নাকি পঞ্চপাণ্ডব এই স্থানে মন্দির নির্মাণ করেছিলেন এমনটাও শোনা যায়|
বহু কিংবদন্তী ও অলৌকিক মহিমা প্রচারিত আছে এই শক্তি পীঠ ঘিরে|এই পীঠের দেবী হলেন- সিদ্ধিদা আর ভৈরব হলেন উন্মত্ত । আবার কারোর মতে এই পীঠের দেবী হলেন অম্বিকা, ভৈরব হলেন উন্মত্ত |মন্দিরের কাছেই এক পাহাড়ে ভৈরব বিরাজমান |
মায়ের মন্দিরে কোনো বিগ্রহ নেই|এক জ্বলন্ত দিব্য অগ্নি শিখাকে দেবী রূপে পূজা করা হয়|মায়ের মন্দিরের উত্তর দিকের দেওয়ালের মাঝে মায়ের মূল জ্যোতি বা আগুনের শিখা বিরাজমানা|বলা হয় এই আগুনের শিখাই হলেন মা জগদম্বা সিদ্ধিদা বা অম্বিকা যা জ্বালামুখী নামেই বেশি বিখ্যাত ভক্তেরা যে যে নামে ডাকবে মা তাদের কে সেই রূপেই কৃপা করবেন । এই আগুনের শিখা অনবরত জ্বলছে| কোনদিন নেভেনি |
বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এই শক্তি পীঠ| মুঘল সম্রাট আকবর, দেবীর মহিমা প্রত্যক্ষ করতে একবার এই পীঠে আসেন। আবুল ফজলের রচিত ‘আইন- ই – আকবরি’ তেও এই পীঠের কথা উল্লেখ আছে।দেবীর অলৌকিক ক্ষমতার প্রমান পেয়ে আকবর দেবীর মহিমা স্বীকার করেন এবং দেবীর মন্দিরে একটি সোনার ছাতা প্রদান করেন|
একবার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ফিরোজ শাহ জ্বালা দেবীর মন্দির লুঠপাঠ ও ধ্বংস করার জন্য রওনা হয়েছিলেন কিন্তু পথে এক জায়গা তে তারা মৌমাছিল আক্রমণের শিকার হলেন| কাতারে কাতারে ফিরোজের সেনারা মৌমাছির বিষাক্ত হূলে মারা পড়তে লাগলো|অবশেষে ফিরোজ শাহ পরাজয় স্বীকার করে পিছু; হটলেন|মনে করা হয় দেবীর ইচ্ছাতেই মৌমাছির আক্রমণের স্বীকার হয়েছিলেন ফিরোজ শাহ|কিছু ঐতিহাসিকের মতে ঔরংজেবও এই মন্দির ধ্বংস করতে চেয়ে ব্যর্থ হন|শিখদের দশম গুরু গোবিন্দ সিং এই মন্দিরে তাঁদের ধর্মগ্রন্থ ‘গ্রন্থসাহিব’ নিত্য পাঠ ও দেবীর পূজা করতেন । তিনি ১৮১৫ খ্রীঃ মন্দির সংস্কার করে এক ভব্য মন্দির নির্মাণ করেন|পরবর্তীতে মহারাজা রঞ্জিত সিং দেবীর মন্দিরের চূড়া শোনা দিয়ে বাধিয়ে দেন।
বর্তমানে প্রায় সারা বছরই এই মন্দিরে দর্শনার্থীদের ভীড় থাকে| মন্দিরের তোরণদ্বার টি বিশাল। দুপাশে দুটি বাঘের মূর্তি এত সুন্দর মনে হয় যেনো জীবন্ত। বাঘ হল ভগবতীর বাহন । তাই মায়ের মন্দিরে মায়ের বাহন কেও পূজা করা হয় । এর পর সূর্য কুন্ডের পাশ দিয়ে মন্দিরের দিকে যেতে হয় । সূর্য কুন্ড এক অপূর্ব দিব্য অলৌকিক কুন্ড। মানুষের বিশ্বাস এখানে স্নান করলে সর্ব পাপ নাশ হয় । মন্দির প্রাঙ্গনে রয়েছে রুদ্রকুন্ড, গোমুখী, ব্রহ্মকুন্ড নামক তিনটি কুণ্ড| রুদ্রকূন্ডর জল অনবরত ফোটে তবে তাপমাত্রা কম।
এই পবিত্র জল স্পর্শের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যায়| প্রথা অনুসারে এই পীঠ দর্শন করে এখানে একটি অতি প্রাচীন ভগবান রামচন্দ্রের মন্দির দর্শন করতে হয় এবং শেষে উন্মত্ত ভৈরবের পুজো করতে হয়।
আজ এখানেই শেষ করছি।ফিরে আসবো পরবর্তী একান্ন পীঠ পর্ব নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – প্রয়াগ

সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত একান্ন
পীঠের অন্যতম শক্তি পীঠ হল উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদের ত্রিবেণী সঙ্গমে অবস্থিত প্রয়াগ শক্তিপীঠ যা নিয়ে আমার আজকের পর্ব।
প্রয়াগে গঙ্গা, যমুনা এবং সরস্বতী নদীর মিলন স্থলে অবস্থিত এই শক্তিপীঠ প্রয়াগ শক্তিপীঠ নামেই বিখ্যাত।পুরান অনুসারে এখানে সতীর হাতের দশটি আঙুল পতিত হয়েছিল। এখানে অধিষ্ঠিত দেবীকে অলোপি মাতা বা ললিতা রূপে পুজো করা হয় এবং দেবীর ভৈরব হলেন ভব যিনি অনেকের কাছে বেনীমাধব।
অলোপী কথার অর্থ হল লুপ্ত না হওয়া।সতীর দেহ যখন বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের আঘাতে খন্ড-বিখন্ড হয়ে যাওয়ার পরেও দেবীর অস্তিত্ব রক্ষিত ছিল তার দেহ খণ্ড গুলির মধ্যেই। তাই লুপ্ত হয়ে লোপ না পাওয়ায় দেবীর নাম হয় অলোপি।
প্রাচীনকালে এই ত্রিবেণী সঙ্গম অঞ্চল ঘন বন জঙ্গলে ঢাকা ছিল, আর সেই সব ঘন জঙ্গলে থাকতো দুর্ধর্ষ সব ডাকাত। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যখনই কোন বিবাহ যাত্রীর দল যেত, ডাকাতরা তাদেরকে আটক করে সর্বস্ব লুট করে নিত।
সেই সময়ে দেবী ললিতা রূপে এই অঞ্চলের রক্ষাকত্রী রূপে দেখা দেন।
আবার পুরান মতে সত্য যুগে ভন্ডাসুর নামে এক অসুর শিবের বর পেয়ে দেবতাদের হেনস্থা করতে শুরু করে।স্বর্গ অধিকার করে নেয়ার উপক্রম দেখা দিলে ইন্দ্র এবং আরও অন্যান্য দেবতারা যজ্ঞের মাধ্যমে মহাশক্তির জাগরণ ঘটান।তখনই যজ্ঞের আগুন থেকে রক্ত বস্ত্র পরিহিতা চতুর্ভূজা দেবী ললিতার আবির্ভাব ঘটে। ভন্ডাসুর এর সঙ্গে যুদ্ধ করে সর্বলোক পুনরায় অসুর মুক্ত করে দেন।
দেবীর সেই ললিতা রূপেই এই শক্তিপীঠে
পূজিতা হন।
প্রয়াগ শক্তিপীঠে মূলত তিনটি মন্দির আছে, অক্ষয়বট, মীরাপুর এবং অলোপি।
এই মন্দিরের বিশেষত্ব হলো এখানে একটি পালকিকে দেবী রূপে পূজা করা হয়।তার একটি কারন হলো দেবী পালকিতে করে নববধূ রূপে এখানে আবীরভূতা হয়েছিলেন বলে মনে করা হয়।
যদিও পালকির পাশাপাশি দেবীর নব দুর্গা রূপের পুজোও হয় দেবীর বেদির নিচে একটি গর্ত তে জল আছে। মনে করা হয় যে, এই জল আসলে স্বয়ং মা গঙ্গার। অক্ষয় বটের নিচে দেবীর
ভৈরবের মন্দির রয়েছে।
প্রয়াগ এই জায়গাটি সাধারণভাবে কুম্ভ মেলার জন্য বিখ্যাত হলেও প্রয়াগ শক্তি পীঠে নবরাত্রি উৎসব খুবই জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে পালন করা হয়।নবরাত্রীর সময় এখানে প্রচুর লোক জমা হয়, নিয়ম মত নারকেল ফাটিয়ে নারকেলের জল দেবীকে অর্পণ করে অর্ধেক নারকেল মন্দিরের সমর্পণ করেন ভক্তরা।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য একটি শক্তিপীঠের কথা নিয়ে।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।