Home Blog Page 54

কালী কথা – কালনার সিদ্বেশ্বরী কালীর ইতিহাস

কালী কথা – কালনার সিদ্বেশ্বরী কালীর ইতিহাস

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলার প্রায় প্রতিটি জেলায় রয়েছে কিছু
বিখ্যত কালী মন্দির। যার মধ্যে অনেকগুলির
কথা ইতিমধ্যে কালী কথায় বলেছি। আজ জানাবো বর্ধমানের কালনার বিখ্যাত
সিদ্ধেশ্বরী কালী মায়ের কথা|

প্রাচীন তন্ত্র সাধনার পীঠস্থান হিসাবে এই অঞ্চলের উল্লেখ আছে বহু প্রাচীন গ্রন্থে।আসল মন্দির এখানে কবে তৈরি হয়েছিলো ঠিক জানা যায়না, তবে আনুমানিক পলাশীর যুদ্ধের ও আগে বর্ধমানের জমিদার চিত্রসেনের আমলে মন্দিরটি সংস্কার করা হয়|মনে করা জৈনদেবী অম্বুয়া বা হিন্দু দেবী অম্বিকাই। পরে তিনিই সিদ্ধেশ্বরীতে রূপান্তরিত হয়েছেন এবং বর্তমানে এখানে সিদ্বেশ্বরী কালী রূপে পূজিতা হন।

আবার অন্য একটি মত অনুসারে সিদ্ধেশ্বরী দেবীকে বিখ্যাত মাতৃ সাধক অম্বরীশের আরাধ্য দেবী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়|সেই দিক দিয়ে আগে এই দেবীকে অম্বরিশের কালীও বলা হতো।

এই মন্দিরে দেবী মূর্তি নির্মিত নিমকাঠ দিয়ে।
দেবী এখানে বামাকালী মূর্তিতে বিরাজমান এবং দেবী শবরুপী শিবের উপর ভয়ঙ্করী রূপে দণ্ডায়মান |বহু প্রাচীন রীতি অনুসারে সারা বছর দেবীকে দর্শন করা গেলেও শুধুমাত্র কোজাগরী পূর্ণিমার পরের কৃষ্ণা পঞ্চমী থেকে কৃষ্ণা ত্রয়োদশী পর্যন্ত দেবী দিগম্বরী থাকেন বলে ওই সময়ে মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে। পুজো হয় তবে বাইরে থেকে|এই রীতি চলে আসছে বহু যুগ থেকে।

এই কালী ক্ষেত্রর অন্যতম আকর্ষণ একটি পুকুর।মন্দিরের বাইরে রয়েছে একটি রহস্যময় বিরাট পুকুর যার নাম অম্বিকা পুকুর|শোনা যায় এক কালে পুকুরের জলের মধ্যে রাখা থাকত প্রচুর বাসনপত্র। গরিব মানুষ সেই বাসনপত্র বিয়ে বা অন্য কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহার করে, ফের জলের মধ্যে রেখে যেতেন। মন্দিরের নানা কাজে ওই পুকুরের জলই ব্যবহার করা হত। ওই পুকুরেই ছাগ স্নান করিয়ে মন্দিরে নিয়ে আসা হত বলির জন্য|

এক কালের তন্ত্র সাধনার জন্যে বিখ্যাত সিদ্বেশ্বরী কালী মন্দির বর্তমানেও সমান প্রসিদ্ধ ও বহু মানুষের আস্থার স্থল|প্রতি বছর কৌশিকী অমাবস্যা, দীপান্বিতা অমাবস্যা এবং ফলহারিনী অমাবস্যা উপলক্ষে এখানে বিশেষ পুজো হয় ও দূর দূর থেকে মানুষ আসেন দেবীকে দর্শন করতে, তার আশীর্বাদ নিতে ও নিজের মনোস্কামনা জানাতে|

ফিরে আসবো কালী কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে আগামী দিনে। চলতে থাকবে কালী কথা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভাইফোঁটার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

ভাইফোঁটার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পৌরাণিক ভাবে ভাতৃদ্বিতীয়া ভাইফোঁটার

সূচনা হয়েছিলো শ্রীকৃষ্ণর হাত ধরে।শাস্ত্রীয় ভাবে এও অনুষ্ঠানের আলাদা তাৎপর্য এবং ব্যাখ্যা আছে।আজ জানাবো সেই পৌরাণিক ব্যাখ্যা এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা।

 

পুরান অনুসারে ধনত্রয়োদশীর পরের দিন চতুর্দশী তিথিতে নরকাসুরকে বধ করলেন কৃষ্ণ। তার পর প্রাগজ্যোতিষপুর থেকে দ্বারকায় ফিরে এলেন এই দ্বিতীয়া তিথিতে। কৃষ্ণকে দেখে তার বোন সুভদ্রার উচ্ছ্বাস বাধা মানল না। তিনি বরাবরই কৃষ্ণের আদরের বোন। এই কয়েকদিন তিনি দাদাকে দেখতে পাননি। তার উপর আবার খবর পেয়েছেন সুভদ্রা যে নরকাসুরের অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়েছেন কৃষ্ণ। সেই থেকেই তিনি ভাইয়ের সুরক্ষা নিয়ে চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন।দ্বারকা পৌঁছতেই কৃষ্ণকে তিনি বসালেন আসনে। তাঁর কপালে পরিয়ে দিলেন বিজয়তিলক এবং নানাবিধ মিষ্টান্ন দিয়ে তাকে আপ্যায়ন করলেন। সেই প্রথাই স্বীকৃত হল ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বা ভাইফোঁটা নামে।

 

আরো আর একটি পৌরাণিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় ভাইফোঁটা নিয়ে যেখানে বর্ণনা আছে আজকের তিথিতে যমরাজ গিয়েছিলেন বোন যমুনার সঙ্গে দেখা করতে । যমুনা কপালে তিলক পরিয়ে তার অগ্রজকে বরণ করে নিয়েছিলেন দিনে এবং তার মঙ্গল কামনা করেছিলেন।

সেই থেকে সহোদরের মঙ্গলকামনায় পালিত হয়ে আসছে ভ্রাতৃদ্বিতীয়া।

 

আজ বাংলা প্রত্যেক বোনই তার ভাইয়ের কল্যানে তার কপালে তিলক পড়িয়ে দেন, মিষ্টি মুখ করান, এবং প্রার্থনা করেন যেনো তার ভাইয়ের থেকে দুরে থাকে সব বিপদ|প্রত্যেক বোন ও তার ভাইয়ের সম্পর্ক যেনো সুদৃঢ় হয় এই কামনাই করি। সবাইকে জানাই ভাতৃদ্বিতীয়ার অনেক শুভেচ্ছা|

 

ফিরে আসবো আগামী কালী কথা নিয়ে।

থাকবে একটি বিশেষ কালী মন্দির নিয়ে আলোচনা।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – মহাসরস্বতীর পুজো

কালী কথা – মহাসরস্বতীর পুজো

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাঁকুড়া শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে দ্বারকেশ্বর নদীর তীরে রয়েছে মহাসরস্বতীর মন্দির। প্রতি বছর এই মন্দিরে কালীপুজোর দিন ধুমধাম করে মহাসরস্বতীর পুজো হয়।আজকের কালী কথায় এই মহাসরস্বতী পুজোর
কথা লিখবো

পুজোর মূল দায়িত্বে থাকেন গ্রামের চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা। স্থানীয় চৌধুরী পরিবারের এক পূর্ব পুরুষ বিন্ধ্যাচলে গিয়েছিলেন। সেখানেই দেবীর স্বপ্নাদেশ পান। এরপর গ্রামে ফিরে মহাসরস্বতীর পুজো শুরু করেন।
পরবর্তীতে নিজের ভাই দের পুজোর দায়িত্ব দিয়ে বৃন্দাবনে চলে যান সেই পূর্ব পুরুষ। এখন এই পুজো পরিচালনার ভার এই পরিবারের সদস্যরাই বহন করে চলেছেন।

প্রতি অমাবস্যায় এখানে কালীপুজো হয়। তবে দীপাণ্বিতা কালীপুজোয় প্রচুর ভিড় হয়। বাইরে থেকে লোকজন আসেন এখানে। নানারকম অনুষ্ঠানও হয়। যাত্রা, কীর্তন এবং নানা রকম অনুষ্ঠান হয়। এখানে রীতি অনুসারে পুজো রাত বারোটার টার আগে শুরু হয় না।

দেবী মহাসরস্বতী সিংহের উপর উপবিষ্ট, অষ্টভূজা। বাঁ পায়ের নিচে অসুর। দু’পাশে রয়েছে ডাকিনী যোগিনীও। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, নারায়ণ, গণেশ ও দুই সখীও রয়েছে সঙ্গে।

বহু বছর আগে মাটির প্রতিমায় পুজো হলেও এখন পাথরের মূর্তি গড়া হয়েছে। তবে প্রস্তর মূর্তিতে নিয়ম মেনে মাটি ছোঁয়ানো হয়। মাটি ছোঁয়াতে আসেন নিদ্দিষ্ট পরিবারের এক ব্যক্তি। আগে এখানে বলি প্রথা ছিল তা এখন হয়না তবে পুরোনো সমস্ত নিয়ম ও আচার মেনে এখনও পুজো হয় মহা সরস্বতীর।

ফিরে আসবো কালী কথা নিয়ে আবার পরবর্তী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – খলিসানী কালীর পুজো 

কালী কথা – খলিসানী কালীর পুজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

তন্ত্র অনুসারে কালী দশমহাবিদ্যা-র প্রথম দেবী। শাক্তমতে কালী বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আদি কারণ। বাঙালি হিন্দু সমাজে কালীর মাতৃরূপের পূজা বিশেষ জনপ্রিয়।বাংলায় তিনি দেবী দুর্গার ন্যায় ঘরের মেয়ে। দুর্গাপুজোর পর আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি দেবী কালীর পুজোর জন্য। বাংলায় কালী মন্দিরের সংখ্যাও অগণিত। এমনই এক কালী মন্দির হাওড়ার খলিসানি কালী মন্দির যা নিয়ে আজকের কালী কথা।

 

বর্তমানে হাওড়ার ষোলো নম্বর জাতীয় সড়কের খলিশানী কালীতলা স্টপেজ থেকে পশ্চিমদিকে কিছুটা এগিয়ে গেলেই এই মন্দির যা স্থানীয়দের মতে চারশো বছরেরও বেশি প্রাচীন।

 

এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা কালী প্রসন্ন ভট্টাচার্য। প্রথমে তিনি দেবীর ঘট প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু করেন।পরে দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে গৌরী নদীর তীরে শ্মশানের মাঝে কালীমূর্তি স্থাপন ও প্রতিষ্ঠা করেন কালীপ্রসন্ন ভট্টাচার্য।

সেই সময়ে এই এলাকায় জনসংখ্যা খুবই কম ছিল। ফলে এলাকাটি ছিল ডাকাতদের এবং বন্যা জন্তুদের আখড়া। পরবর্তীতে এই কালী মন্দিরের প্রসিদ্ধি ছড়িয়ে পরে সব জায়গায়।

 

স্থানীয়দের কাছে দেবী বুড়িমা নামেই বেশি জনপ্রিয়।সারা বছর বহু দূর থেকে অজস্র মানুষ ছুটে আসেন খলিশানীর এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরে।সবার বিশ্বাস মায়ের কাছে নিষ্ঠা ভরে মানত করলে সব মনস্কামনা পূর্ণ হয়।সেরে যায় কঠিন ব্যাধি।

 

বর্তমানে প্রায় শতাধিক কালীপুজো হয়। কিন্তু সকলেই আগে বুড়িমার কাছে পুজো নিবেদন করেন, তারপর কালীপুজো হয়।এমনকি বুড়িমার কাছে পুজো না দিয়ে এলাকায় একটিও শুভ কাজ সম্পন্ন হয়না।

 

এই কালী মন্দিরে দীপান্বিতা অমাবস্যায় কার্যত তিল ধারণের জায়গা থাকে না। দীপান্বিতা অমাবস্যাই এই মন্দিরের প্রধান উৎসব বলা যায়।

 

ফিরে আসবো পরের পর্বে কালী কথার আরো একটি অধ্যায় নিয়ে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – কল্যাণময়ী কালীর ইতিহাস

কালী কথা – কল্যাণময়ী কালীর ইতিহাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ দীপাবলীর এই পবিত্র দিনে আপনাদের উত্তর চব্বিশ পরগনার বাদুর কল্যাণময়ী কালীর কথা জানাবো যে কালীকে অনেকে কাঞ্চন তলার কালী বলেও চেনেন।

 

যে সময়ের কথা বলছি বাদু তখন গ্রামাঞ্চল।

বাদুর কাছেই কাঞ্চনতলায় বসবাস করতেন মাতৃসাধক দিলীপ চট্টোপাধ্যায়।একটি বড় নিম গাছের নীচে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঈশ্বরচিন্তা করতেন তিনি। তাকিয়ে থাকতেন সামনের এক শান্ত এবং বিরাট জলাশয়ের দিকে।একদিন

মা কালী স্বপ্নাদেশ দিয়েছিলেন ভক্ত দিলীপকে।

 

স্বপ্নে দেখা দিয়ে দেবী বললেন, “নিমগাছের পাশের পুষ্করিণীতে আমার কষ্টি পাথরের মূর্তি আছে। ওই মূর্তি উদ্ধার করে তুই প্রতিষ্ঠা কর। নিত্যপুজো করবি। বৈষ্ণব মতে পুজো হবে। বলিদান বা আমিষ ভোগ নয়। এটি আমার কল্যাণময়ী রূপ।”

 

পরদিন ঠিক কথা মতো পুকুর থেকে পাওয়া গেল ছোট্ট একটি কষ্টি পাথরের মাতৃমূর্তি।

দিলীপ চট্টোপাধ্যায় পরম যত্নে মায়ের মূর্তি এনে বসালেন নিম গাছের নীচে। এখানেই তৈরি হল কল্যাণময়ী মায়ের মন্দির। মন্দির চত্বরে আছেন দেবদিদেব মহাদেবও। সেই শিবলিঙ্গও খুব জাগ্রত। তিনিও ভক্তকে সবরকম বিপদ থেকে রক্ষা করেন। আছেন শালগ্রাম শিলাও।বর্তমানে সেই নিম গাছটিকে ভক্তরা কল্যাণময়ী মায়ের কল্পতরু বৃক্ষ মনে করেন।  মায়ের কাছে মনোস্কামনা জানিয়ে গাছে ডোর বাঁধেন এবং দেবী প্রতি তাদের অগাধ আস্থা।

 

এখানে কালীপুজোর রাতে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কল্যাণময়ী মায়ের আরাধনা করেন প্রয়াত মাতৃসাধক দিলীপ চট্টোপাধ্যায়ের বংশধরেরা।

মায়ের স্বপ্নে দেয়া আদেশ অনুসারে পুজো হয় বৈষ্ণব মতে। আমিষ ভোগ থাকেনা। তার বদলে

ঘিয়ের পরমান্ন আর খিচুড়ি। তার সঙ্গে থকে পাঁচ রকম ভাজা, তরকারি, চাটনি। এছাড়া মায়ের পছন্দের খাদ্যতালিকায় আছে চিঁড়ে, গুড় , নারকেল এই সব প্রসাদ যা পরম আনন্দে গ্রহন করেন দুর দুর থেকে আসা ভক্তবৃন্দ।

 

আবার কালী কথা নিয়ে আগামী পর্বে ফিরে আসবো। থাকবে অন্য এক কালী মন্দিরের ইতিহাস। সবাইকে জানাই শুভ দীপাবলী

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বিশেষ পর্ব – ভূত চতুর্দশী 

বিশেষ পর্ব – ভূত চতুর্দশী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলায় কালীপুজোর আগের দিন ভূত চতুর্দশী পালন করা হয়। ভূত চতুর্দশী নামটার মধ্যেই যেন লুকিয়ে থাকে একটা অলৌকিক এবং ভৌতিক বিষয়। কিন্তু শাস্ত্র মতে ভূত চতুর্দশীর আলাদা ব্যাখ্যা আছে। আজকের এই পর্বে সেই ব্যাখ্যাই আপনাদের শোনাবো।

 

রাজা বলীকে পরাস্ত করে পাতালে পাঠানোর পর ভগবান বিষ্ণু রাজা বলির নরকাসুর রূপের পুজোর প্রবর্তন করেন। পুরান মতে নরকাসুররূপী রাজা বলি কালীপুজোর আগের দিন ভূত চতুর্দশীর তিথিতে তার অসংখ্য অনুচর ভূত, প্রেত নিয়ে মর্ত্যে নেমে আসেন পুজো নিতে।

 

আবার অন্য একটি শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা হলো এই তিথিতে দেবী কালী চামুণ্ডা রূপে ভূত এবং প্রেতাত্মা সঙ্গে নিয়ে মর্তে আসেন অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটাতে।

 

ভূত চতুর্দশীতে সন্ধ্যাবেলা চোদ্দ প্রদীপ দেওয়ার নিয়ম প্রচলিত রয়েছে, এ ছাড়া এই দিন চোদ্দ শাক খাওয়ার নিয়মও রয়েছে। কথিত রয়েছে, এই চোদ্দ প্রদীপ আমাদের পূর্বপুরুষ অর্থাৎ আমাদের চোদ্দ পুরুষদের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়।এই শাকের ও একটি তালিকা আছে যার নাম বিভিন্ন অঞ্চলে বদলে যায়।

 

মনে করা হয় পূর্বপুরুষের আত্মা এই তিথিতে মর্ত্যলোকে আসেন।তাদের উদ্দেশ্যে এই প্রদীপ এবং তাদের কথা স্মরণ করে এই রীতি

পালন করা হয়।

 

আবার কিছু ব্যাখ্যায় অমাবস্যার আগে অশুভ শক্তির আগমনের উল্লেখ পাওয়া যায় এবং বলা হয় এই অশুভ শক্তির থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যেই জ্বালানো হয় চোদ্দ প্রদীপ।

 

অর্থাৎ এই ভূত চতুর্দশীর ভূত অর্থাৎ আত্মাও হয় আবার আমাদের পূর্বপুরুষ দের স্মৃতিও হয়।

সবাইকে জানাই দীপাবলীর আগাম শুভেচ্ছা। ফিরে আসবো কালীকথার পরবর্তী পর্ব

নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ধনতেরাসের শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

ধনতেরাসের শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ধনতেরাস উপলক্ষে আজকের এই বিশেষ পর্বে আলোচনা করবো ধনতেরাস নিয়ে, জানবো এই উৎসবের সাথে জড়িত এক অদ্ভুত পৌরাণিক ঘটনা এবং এই উৎসবের গুরুত্ ও তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা।

 

ধনতেরাস অনেকের কাছেই কুবের পুজোর দিন এই দিন কুবের আরাধনা করলে তিনি অর্থ এবং সম্পদ দেন বলে বিশ্বাস।তাই ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কাছে এই দিনটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা এ দিন দামি ধাতু কেনেন। সম্পদের দেবতা

 

পুরান অনুসারে একসময় দুর্বাশা মুনির অভিশাপে স্বর্গ হয় লক্ষ্মীহীন। অসুর দের সঙ্গে লড়াই করে সমুদ্রমন্থনের পর ধনতেরাসের এই দিনেই

দেবতারা ফিরে পান দেবী লক্ষ্মীকে। শ্রীহীন অবস্থাথেকে লক্ষীপ্রাপ্তির পুন্য তিথিই ধনতেরাস রূপে পালিত হয় যা ক্রমে একটি উৎসবের রূপ নেয়।

 

আবার ধনতেরাস নিয়ে একটি পৌরাণিক কাহিনীও আছে।প্রাচীন কালে ভারতবর্ষে এক রাজা ছিলেন, তার নাম ছিলো রাজা হিমা, রাজা হিমার ১৬ বছরের ছেলের কোষ্টিতে লেখা ছিল বিয়ের চার দিনের মাথায় সাপের কামড়ে তার মৃত্যু হবে। তার স্ত্রীও জানত সেই কথা। তাই সেই অভিশপ্ত দিনে সে তার স্বামীকে সে দিন ঘুমোতে দেয়নি। শোয়ার ঘরের বাইরে সে সমস্ত গয়না ও সোনা-রূপার মুদ্রা জড়ো করে রাখে। সেই সঙ্গে সারা ঘরে বাতি জ্বালিয়ে দেয়। স্বামীকে জাগিয়ে রাখতে সে সারারাত তাকে গল্প শোনায়, গান শোনায়। পরের দিন যখন মৃত্যুর দেবতা যম তাদের ঘরের দরজায় আসে, আলো আর গয়নার জৌলুসে তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে যায়। রাজপুত্রের শোয়ার ঘর পর্যন্ত তিনি পৌঁছন ঠিকই। কিন্তু সোনার উপর বসে গল্প আর গান শুনেই তাঁর সময় কেটে যায়। সকালে কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই চলে যান তিনি। রাজপুত্রের প্রাণ বেঁচে যায়। পরদিন সেই আনন্দে ধনতেরাস পালন শুরু হয়।এই জন্যে ধনতেরাসে সোনা কেনা শুভ বলে মনে করা হয়।

 

দীপাবলী মূলত পাঁচ দিনের উৎসব যার মধ্যে ধনতেরাস অন্যতম।এর আর এক নাম আছে।ধনাত্রয়োদশী বা ধনবত্রী ত্রয়োদশী। ‘ধন’ শব্দের মানে সম্পত্তি। ত্রয়োদশী হলো তিথি।দীপাবলীর সময় লক্ষ্মীপুজোর দিন দুই আগে ধনতেরাস হয়।বলা হয়, ধনতেরাসের দিন দেবী লক্ষ্মী তার ভক্তদের গৃহে যান ও তাঁদের ইচ্ছাপূরণ করেন।

 

আপনাদের সবাইকে জানাই ধনতেরাসের অনেকে শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন। শাস্ত্র মতে ধনতেরাস পালন করুন।মা লক্ষী এবং কুবেরের কৃপায় আপনাদের মঙ্গল হবে। ফিরে আসবো কালী কথা নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – পঞ্চুদত্ত ঘাটের শ্মশান কালী

কালী কথা – পঞ্চুদত্ত ঘাটের শ্মশান কালী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

একটা সময় ছিল যখন গঙ্গার প্রায় প্রত‍্যেকটা ঘাটের পাশেই শ্বশান ছিল এবং সেগুলি ছিলো ডাকাত এবং তান্ত্রিকদের আস্তানা। তারা ছিলেন শ্মশান কালীর উপাসক।আজ সেই ডাকাত ও নেই সেই প্রকৃত তান্ত্রিকের সংখ্যাও কমেছে কিন্তু কালী মন্দির গুলো রয়েছে। এমনই এক শ্বশান কালী আছেন হুগলীর কোন্নগরের পঞ্চুদত্ত ঘাটের কালী মন্দিরে।

কোন্নগর পঞ্চুদত্ত ঘাটের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা।মন্দিরটি প্রায় দুশ বছর আগেকার। প্রথমে মায়ের মূর্তিটি মাটির তৈরী ছিল।সেই সময়ে এই অঞ্চল ছিলো বেশ দুর্গম। ঘন বনে দিনের বেলায় সূর্যের আলো পৌঁছতো না। ডাকাত রা এই অঞ্চল শাসন করতো। আর ছিলো কাপালিক তান্ত্রিকদের আসা যাওয়া। তখন থেকেই এখানে শ্মশান কালীর পুজো হয়ে আসছে।

পরবর্তী কালে মানিক সাধু নামে এক মাতৃ সাধক । মায়ের মাটির মূর্তিটির পরিবর্তন করে পাথরের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করান। মন্দির ও সংস্কার হয়।বর্তমানে মায়ের মন্দিরের ঠিক বিপরীত দিকে শান বাঁধানো আর একটি মন্দির আছে।

এই মন্দিরের সাথে ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের স্মৃতি জড়িত আছে।কথিত আছে ১৮৮২ সালের ৩ রা ডিসেম্বর রবিবার শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরম হংস দেব গঙ্গা পার হয়ে এই ঘাটে এসেছিলেন। এবং এখানে বেশ কিছু সময় অতিবাহিত করেছিলেন।

এই মন্দিরে নিত‍‍্য পূজোর পাশাপাশি দীপান্বিতা অমাবস্যা বিশেষ গুরুত্ব সহকারে পালিত হয়।
এছাড়াও তারা মায়ের আবির্ভাব দিবসেও বিশেষ পূজো হয়। বহু ভক্ত আসেন এই সময়গুলিতে।

ফিরে আসবো কালী কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে
যথা সময়ে। থাকবে বাংলার আরেকটি
প্রাচীন কালী মন্দিরের ইতিহাস।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – বিষ্ণুপুরের শ্মশান কালীর পুজো

কালী কথা – বিষ্ণুপুরের শ্মশান কালীর পুজো

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

দেবী কালীকার বিভিন্ন রূপের মধ্যে তার শ্মশান কালী রূপ অন্যতম। একটা সময় পর্যন্ত এই রূপের পুজোর প্রচলনই বাংলায় বেশি ছিলো। ডাকাত এবং তান্ত্রিকরাই শ্মশানে কালী পুজো করতো।পরবর্তীতে সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগিশ এর হাত ধরে দেবী দক্ষিনা কালী বঙ্গ সমাজে জনপ্রিয়তা পায়।আজকের কালী কথায় আপনাদের দক্ষিণ বঙ্গের একটি শ্মশান কালীর পুজোর কথা লিখবো।

আজ থেকে বহু বছর আগে বিষ্ণুপুরে আদিগঙ্গার পাড়ে শ্মশানে ভিড় জমাতেন তান্ত্রিক ও সাধকরা। শব সাধনায় বসতেন অনেকেই। এখনও শ্মশানে ঢুকলে গা ছমছমে পরিবেশ। স্থানীয়দের বিশ্বাস, তান্ত্রিকদের সাধনার জোরে আজও রাতের অন্ধকারে জেগে ওঠে শ্মশান। ঘোরাফেরা করে অপঘাতে মৃতদের আত্মা।আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে এই শ্মশান লাগোয়া জঙ্গলেই টালির ছাউনির নীচে কালী পুজো শুরু করেছিলেন তান্ত্রিক মণিলাল চক্রবর্তী। একশো আটটি নরমুণ্ড দিয়ে চলত তন্ত্রমতে দেবীর উপাসনা।তারপর বহু সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। পাল্টেছে এই স্থানের পরিবেশ তবে একই রয়ে গেছে সেই পুজো এবং এই পুজোর প্রতি মানুষের আস্থা।

আজও পুরনো রীতি মেনে তন্ত্রমতে গা ছমছম পরিবেশে একশো আটটি নরমুণ্ড সহযোগে পুজো হয় মা কালীর। রাতে শিয়ালভোগের পাশাপাশি মদ, মাংস, ছোলা নিবেদন করা হয়।

আজও দক্ষিণ বিষ্ণুপুরের চক্রবর্তী পরিবার বংশ পরম্পরায় এই পুজো চালিয়ে আসছে।প্রতি অমাবস্যায় তন্ত্র সাধনার জন্য বহু মাতৃ সাধক আসেন। আসেন বহু সাধারণ ভক্ত।

এখানে দেবী কালীর চোখ আর জিভ সোনা দিয়ে তৈরি। হাতে থাকে রুপোর খাঁড়া। মাকে পুজোর দিন পরানো হয় সোনার গয়না।

শোনা যায় সাধক মণিলাল চক্রবর্তী মায়ের স্বপ্নাদেশ পান। মা বলেন।বছরে একবার পুজো করলে হবে না। নিত্যপুজো করতে হবে। সেই নির্দেশ মেনেই গঙ্গার পাড়ে কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন তিনি শুরু হয় নিত্য পুজো।

দীপান্বিতা অমাবস্যা উপলক্ষে চলত থাকবে
ধারাবাহিক কালী কথা। ফিরে আসবো অন্য
একটি মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – বর্ধমানের ক্ষ্যাপা কালীর পুজো

কালী কথা – বর্ধমানের ক্ষ্যাপা কালীর পুজো

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বর্ধমানের অন্যতম প্রসিদ্ধ এবং জাগ্রত দেবী হলেন

ক্ষ্যাপা কালী।আজকের কালী কথায় জানাবো

এই দেবীর মাহাত্ম এবং এই কালী পুজোর ইতিহাস।

আজও এই এই অঞ্চলে এই পুজোকে কেন্দ্র করে একটি অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।

এই এলাকায় অন্যতম প্রতিষ্ঠিত এবং প্রভাবশালী পরিবার ছিলো ভট্টাচার্য পরিবার। এই ভট্টাচার্য বাড়ির প্রবীণ সদস্য নিমাই ভট্টাচার্য একদিন নিজেদের পৈত্রিক পুকুর থেকে স্নান করে বাড়ি ফিরছিলেন ।পথে হঠাৎ দেখতে পেলেন তার পিছনে পিছনে একটা এলোচুলের কালো কিশোরী মেয়ে আসছে।মেয়ের রূপ দেখে প্রথমে তিনি ভাবলেন কোনো সাঁওতাল মেয়ে হবে।কিন্তু যে মুহূর্তে বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়েছেন হঠাৎ শুনতে পেলেন – “আমাকে নিয়ে যাবিনা ?” চমকে ওঠেন নিমাই বাবু পিছনে তাকিয়ে সেই কিশোরী মেয়েটিকে আর দেখতে পাননি।সেই মেয়ে

অদৃশ্য হয়েছে।

সেই রাতেই ধার্মিক নিমাই ভট্টাচার্য স্বপ্নে মা কালী কে দেখেন এবং মা কালী তাকে তার পুজো শুরু করার নির্দেশ দেন।মা’কালীর নির্দেশে শুরু হয় কালী পুজো।সেই পুজোই আজ ক্ষ্যাপা কালীর পুজো নামে সমগ্র বর্ধমানে প্রসিদ্ধ।

সেই এলোচুলের মেয়েটিকে ক্ষেপির মত দেখতে লাগছিল তাই মায়ের নাম রাখা হয় ক্ষ্যাপাকালী। যেহেতু তার গায়ের রঙ ছিল কালো তাই মায়ের গায়ের রঙ করা হয় কালো ।স্বপ্নে পাওয়া মায়ের নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট একটি জায়গা থেকে গভীর রাতে মায়ের ঘট আনা হয় । আজও সেই রীতি চলে আসছে।

প্রথম দিকে তালপাতার ছাউনি দেওয়া ঘরে মায়ের পুজো হতো।পরবর্তীতে মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়ে গ্রামের এক বাসিন্দা নিদিষ্ট একটি জায়গা দান করেন। পরবর্তীতে সেখানেই গড়ে উঠেছে স্থায়ী মন্দির। প্রতিষ্ঠিত হয় পঞ্চমুণ্ডীর আসন। যা আজও আছে।

প্রতিটি বিশেষ অমাবস্যা তিথিতে বিশেষ পুজোর আয়োজন হয় এবং বহু ভক্ত সমাগম হয়।

ভক্তরা বলেন এখনো মায়ের ভোগের থালায় দেখা যায় হাতের দাগ দেখলে মনে হবে কেউ যেন সেখান থেকে খাবার তুলে খেয়েছে। মনে করা হয় সবার অলক্ষ্যে স্বয়ং ‘মা’ এসে ভোগ খেয়ে গেছেন।

এই অঞ্চলের যেকোনো শুভ কাজে ক্ষ্যাপা পায়ের আশীর্বাদ নেয়ার রীতি আছে।শুভ কাজে

যাওয়ার অনেকেই ক্ষ্যাপা কালীর পূজায় ব্যাবহিত

ফুল নিজের সঙ্গে রাখেন।

আসন্ন দীপান্বিতা অমাবস্যা উপলক্ষে বাংলার এমন সব প্রাচীন কালী মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে চলতে থাকবে কালী কথা।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।