Home Blog Page 55

গুরু কথা – গুরু নানকজী 

গুরু কথা – গুরু নানকজী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

গুরু কথার আজকের পর্বে আমরা জানার চেষ্টা করবো শিখ ধর্ম গুরু পরম শ্রদ্ধেয় নানকের জীবন এবং তার আধ্যাত্মিক কর্মকান্ড|

 

শিখ ধর্মের অন্যতম ধর্মগুরু গুরু নানক জন্ম

গ্রহণ করেন ১৪৬৯ সালে তালবন্ডী নামক স্থানে বর্তমানে এটি পাকিস্তানে অবস্থিত ও নানকানা সাহিব হিসেবে পরিচিত|

 

শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন উদাসীন প্রকৃতির|মনে করা হয় মাত্র ৭-৮ বছর বয়সে তিনি স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দেন|এই সময়ে থেকেই তার মধ্যে ভগবত প্রাপ্তি সম্পর্কে নানান প্রশ্ন উঁকি দিতে থাকে|পরবর্তীতে গুরু নানক অধিকাংশ সময় আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনা ও সৎসঙ্গে কাটাতে

শুরু করেন|

 

গুরু নানক প্রায় সব ধর্ম গ্রন্থ পাঠ করে ছিলেন এবং মক্কা সহ দেশ বিদেশের একাধিক তীর্থ স্থান পরিদর্শন করে ছিলেন।কঠোর সাধনার মধ্যে দিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে ঈশ্বর এক এবং অভিন্ন তিনি শুধু প্রথম এবং প্রধান শিখ

ধর্ম গুরু ছিলেন না তিনি ভারত তথা গোটা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক গুরু হয়ে উঠেছিলেন।

 

একটা সময়ের পর তার মধ্যে দৈব শক্তির প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়|বোঝাযায় তিনি কোনো সাধারণ মানুষ নয়|তার জন্ম হয়েছে একটি বিশেষ লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্য নিয়ে|কালক্রমে, আধ্যাত্মিক চর্চা ও সাধনার মধ্যে দিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন সকলের শ্রদ্ধেয় গুরুনানক|শিখ সম্প্রদায় তথা সমগ্র মানব জাতীর কাছে এক প্রণম্য ব্যাক্তিত্ব|গুরুনানকের জন্ম তিথিতেই প্রতি বছর পালিত হয় নানক জয়ন্তী|

 

শিখ ধর্ম গুরুরা নিজেদের অলৌকিক ক্ষমতা জাহির করতেন না। এই সম্পর্কে গুরু নানক কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলতেন আমি ঈশ্বরের আইনের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারি না। তিনিই একমাত্র অলৌকিক কাজ করতে পারেন।তবে একাধিক এমন ঘটনা আছে যেখানে তার অলৌকিক শক্তি প্রকাশ পেয়েছে। একবার তিনি তার এক তৃষ্ণার্থ শিষ্যকে জল পান করানোর জন্য শুষ্ক পাথুরে জমিতে ঝর্ণার সৃষ্টি করেছিলেন

বলে শোনা যায়।

 

এই মহান গুরুকে আমার প্রণাম এবং শ্রদ্ধা জানাই।আবার গুরু কথায় অন্য এক মহান

গুরুর জীবনী নিয়ে ফিরে আসবো যথ পরবর্তী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – তোতাপুরী মহারাজ 

গুরু কথা – তোতাপুরী মহারাজ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ঠাকুর রামকৃষ্ণ ছিলেন তার অসংখ্য ভক্তদের কাছে সাক্ষাৎ ব্রহ্ম স্বরূপ। স্বামী বিবেকানন্দ যেমন রামকৃষ্ণের শিষ্য ছিলেন তেমনই ঠাকুর রামকৃষ্ণ ছিলেন এক অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন যোগীর শিষ্য। ঠাকুর রামকৃষ্ণের দীক্ষা গুরু ছিলেন তোতাপুরী মহারাজ।

 

আজকের গুরু কথার এই পর্ব ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের দীক্ষা গুরু তোতাপুরী মহারাজকে নিয়ে।তোতাপুরীর মহারাজের সন্ন্যাস পূর্ব জীবন, তার জন্ম কাল বা জন্মস্থান এবং পরিবার সম্পর্কে সঠিক তথ্য কমই পাওয়া যায় তায় সেই দিকে না গিয়ে তার অলৌকিক ব্যাক্তিত্ব এবং রহস্যময় সন্ন্যাস জীনেরর কথা বলাই শ্রেয়।

 

তোতাপুরী লম্বা চওড়া সুদীর্ঘ পুরুষ ছিলেন।দীর্ঘ সময় ধ্যান ও যোগ সাধনার মাধ্যমে তিনি সাধনার অত্যন্ত উচ্ছ পর্যায়ে আরোহন করেছিলেন। তিনি ছিলেন পুরী সম্প্রদায় ভুক্ত এই নাগা সন্ন্যাসী।তোতাপুরী মহারাজ তিন দিনের বেশি কোথাও থাকতেন না কিন্তু ব্যতিক্রম হয়েছিলো দক্ষিনেশ্বর এসে|এখানে বেশ দীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়েছিলেন রামকৃষ্ণর সান্নিধ্যে|গুরুর নাম গ্রহণ করা শাস্ত্রমতে বারণ তাই শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে ‘ল্যাংটা’ বা ‘ন্যাংটা’ বলে উল্লেখ করতেন কারণ তিনি ছিলেন জটাধারী কৌপিন পরিহিত সন্ন্যাসী।গঙ্গার ধারে পঞ্চবটি উদ্যানে ধুনী জ্বালিয়ে তিনি সাধনা করতেন।

 

তোতাপুরীর মতে সকলই ছিল মায়া। দেব-দেবীর মূর্তিপূজাকেও তিনি উপহাস করতেন। বিশ্বাস করতেন এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্মে কিন্তু রামকৃষ্ণ তার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেন, এক্ষেত্রে এক অলৌকিক ঘটনার ও উল্লেখ পাওয়া যায়, একবার দক্ষিনেশ্বরে থাকা কালীন পেটের যন্ত্রনায় কাবু তোতাপুরী গভীর রাতে গঙ্গায় প্রান বিসর্জন দিতে গিয়ে দেখলেন কোথাও ডুবজল নেই, হেঁটেই পার হওয়া যায় গঙ্গা, তিনি উপলব্ধি করলেন ভবতারিনীর লীলা, সাক্ষাৎ করলেন স্বয়ং মা জগদম্বাকে, শরীরের সব যন্ত্রনা মুহূর্তে গায়েব হয়ে গেলো|

শিষ্য কে বললেন সব কথা মেনে নিলেন মায়ের উপস্থিতি|মেনে নিলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণের শ্রেষ্ঠত্ব।

 

দক্ষিনেশ্বরের পঞ্চবটি বনে তোতাপুরীর কাছে দীক্ষা নিয়ে নিয়ে ছিলেন স্বয়ং রামকৃষ্ণ আবার আশ্চর্য জনক ভাবে ঠাকুরের অলৌকিক ক্ষমতা এবং তার অগাধ জ্ঞানের পরিচয় পেয়ে গুরু তোতাপুরী বিদায় নেয়ার আগে শিষ্য রামকৃষ্ণর কাছে দীক্ষা নিয়ে যান|গুরুকে পাল্টা দীক্ষা দানের এই ঘটনা ভারতের আধ্যাত্মিক জগতে বিরলতম|

 

যেহেতু পুরী সম্প্রদায়ভুক্ত তোতাপুরী মহারাজ ঠাকুর রামকৃষ্ণের দীক্ষা গুরু তাই সেই পরম্পরার অন্তরগত হয়ে রামকৃষ্ণ মিশন এবং মঠ

আজও পুরী সম্প্রদায়ের অংশ।

 

তোতাপুরী মহারাজ সম্পর্কে বলা হয় তিনি ছিলেন দীর্ঘ জীবী। আজ থেকে কয়েক বছর আগেই তাকে পুরী সহ বিভিন্ন তীর্থ স্থানে স্বশরীরে ঘুরে বেড়াতে গেছে বলে অনেকে দাবী করে থাকেন। তবে তার সত্যতা প্রমান করা সহজ নয়।

 

আজকের পর্ব এই মহান গুরুকে প্রনাম জানিয়ে শেষ করলাম।আবার আগামী পর্বে অন্য

এক গুরু প্রসঙ্গে আলোচনা নিয়ে ফিরে

আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

রথযাত্রার শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন

রথযাত্রার শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন

 

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রীজাতক

 

আজ পবিত্র রথযাত্রা সারা। আজ জগন্নাথ দেব তার রাজকীয় রথে করে পথে নামেন তার অগণিত ভক্তদের দর্শন দিতে।

 

মনে করা হয় দীর্ঘ বিরতির পর শ্রী কৃষ্ণর বৃন্দাবন যাত্রাকেই উদযাপন করা হয় রথ যাত্রা পালনের মাধ্যমে|প্রথম এবং প্রধান রথ যাত্রা নিঃসন্দেহে পালিত হয় জগন্নাথ ধাম পুরীতে|প্রথমে রাজ পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় ও পরবর্তীতে সরকার জনসাধারণএর উদ্যোগে প্রতি বছর পুরীতে ওই বিশেষ তিথী তে বিরাট আকারে পালিত হয় রথ যাত্রা|এই পরম্পরা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে|

বোন সুভদ্রা ও দাদা বলরাম বা বলভদ্রকে নিয়ে রথে চড়ে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের পত্নী গুন্ডিচারবাড়ি যান জগন্নাথদেব। সেখান থেকে সাতদিন পরে আবার নিজের মন্দিরে ফিরে আসেন। এই যাওয়াটাকেই জগন্নাথের মাসির বাড়ি যাওয়া বলে।

 

রথের দিন তিনটি রথ পর পর যাত্রা করে মাসির বাড়ি। প্রথমে যায় বলরামের রথ, তারপর সুভদ্রা এবং সবশেষে জগন্নাথের রথ। রথে চড়ে এই গমন ও প্রত্যাগমনকে সোজা রথ এবং উল্টোরথ বলে|তিনটি রথের প্রত্যেকের নিজস্ব বৈশিষ্ট আছে|জগন্নাথের রথের নাম নন্দী ঘোষ, বলরামের রথের নাম তালধ্বজ ও সুভদ্রার রথের নাম দর্পদলন|এই রথ নির্মানে কোনো আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি ব্যবহার হয়না এবং বংশ পরম্পরার কারিগররা সকল নিয়ম নিষ্ঠা ও প্রথা মেনে রথ প্রস্তুত করেন|আজও পুরীর বর্তমান রাজা সোনার ঝাড়ু ব্যবহার করে রথের যাত্রার আগে তার পথ পরিষ্কার করে থাকেন|প্রচলিত বিশ্বাস রথে পুরীতে

বৃষ্টিপাত হবেই|

 

পরবর্তীতে পুরীর বাইরে বাংলায় রথযাত্রা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং মনে করা হয় এই সংস্কৃতির সম্ভবত সূচনা হয়েছিল শ্রীচৈতন্যদেবের নীলাচল অর্থাৎ পুরী যাওয়ার পর থেকে| চৈতন্যভক্ত বৈষ্ণবরা বাংলায় পুরীর অনুকরণে রথযাত্রার শুরু করেন এবং দেখতে দেখতে বহু রাজপরিবার ও এই মহা সমারোহে এই উৎসব পালন করতে শুরু করে|আরো কিছু কাল পরে ইসকন ও শ্রীল প্রভুপাদের হাত ধরে রথ যাত্রা দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে পা রাখে ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে সারা বিশ্ব জুড়ে|

 

আজ বাংলার নানা স্থানে বিরাট আকারে রথ যাত্রা উৎসব পালন হয় যার মধ্যে মাহেশের রথ যাত্রা বিশেষ উল্লেখযোগ্য|যাত্রা শব্দের প্রকৃত অর্থ গমন তাই জগন্নাথের রথযাত্রা এবং উল্টোরথ হিন্দু-বাঙালিদের কোনও কাজ বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সূচনার পবিত্র দিন হিসেবে গণ্য করা হয়| বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব দূর্গাপূজোর সূচনাও হয় এই রথ কিংবা উল্টোরথের দিন|

 

আজ আপনাদের সবাইকে জানাই পবিত্র

এই রথ যাত্রার অসংখ্য শুভেচ্ছা এবং

অভিনন্দন। জয় জগন্নাথ।

জগন্নাথদেবের ভোগ নিবেদন 

জগন্নাথদেবের ভোগ নিবেদন

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রীজাতক

 

পুরীর মন্দিরে জগন্নাথের ভোগ নিবেদন নিয়ে আছে অনেক পৌরাণিক ঘটনা অনেক ইতিহাস এই মন্দিরে ভোগ রান্না থেকে ভোগ নিবেদন সবেতেই আছে বৈচিত্র।আজকের পর্বে এই বিষয় নিয়ে লিখবো।

 

ভগবান বিষ্ণু মর্ত্যলোকে এসে চার ধামে যাত্রা করেন। এই চার ধাম হল- বদ্রীনাথ ধাম,দ্বারিকা ধাম,পুরী ধাম এবং রামেশ্বরম। প্রথমে হিমালয়ের শিখরে অবস্থিত বদ্রীনাথ ধামে স্নান করেন,তারপর গুজরাটের দ্বারিকা ধামে গিয়ে বস্ত্র পরিধান করেন, ওড়িশার পুরী ধামে ভোজন করেন আর সবশেষে রামেশ্বরমে গিয়ে বিশ্রাম নেন।অর্থাৎ পুরী হলো ভগবানের ভোজনের স্থান তাই এই স্থানে ভোগে কিছু বিশেষত্ব থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।

 

পুরীতে জগন্নাথকে অর্পণ করা হয় ছাপান্ন ভোগ।

পুরাণ মতে, যশোদা বালক কৃষ্ণকে আট প্রহর খেতে দিতেন। যখন ইন্দ্রের রোষে গোকুলে মহাপ্রলয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময় প্রাণীদের রক্ষা করতে নিজের কনিষ্ঠ আঙুলে গোবর্ধন পাহাড় তুলে নিয়েছিলেন তিনি। সাতদিন ওইভাবেই তিনি ছিলেন। এই সময়ে তিনি অনাহারে ছিলেন। প্রলয় থামলে যখন কৃষ্ণ ফিরে আসেন তখন

কৃষ্ণকে মা যশোদা সাতদিন ও আট প্রহরের হিসেবে ছাপান্ন টি পদ পরিবেশন করেছিলেন। আর সেই থেকেই ভগবানের ছাপ্পান্ন ভোগ চলে আসছে।

 

জগন্নাথ মন্দিরের একাংশেই হয়েছে বড় রান্নাঘর। সেখানে রয়েছে ৭৫২ টি উনুন, সেখানে এই ভোগ রান্নার কাজ করেন ৩০০-রও বেশি রাঁধুনি। এরাই বংশ পরম্পরায় যুগ যুগ ধরে ভোগ রান্না করেন।

জগন্নাথের ভোগে মূলত দুই ধরনের খাবার দেওয়া হয়। ভাত, ডাল, তরকারি, খিচুড়ি জাতীয় রান্না করা খাবার থাকে। আর থাকে খাজা, গজা, খই, মুড়কি জাতীয় শুকনো খাবার। সব মিলিয়ে ছাপান্ন টি পদ সর্বোচ্চ রান্না হয় এখানে।

 

এখানে দুটি অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করা যায়।

পুরী মন্দিরের প্রতিদিন সমপরিমাণ প্রসাদ রান্না করা হয়। কিন্তু ওই একই পরিমাণ প্রসাদ দিয়ে কয়েক হাজার বা কয়েক লক্ষ মানুষ সকলেরই পেট ভরে যায়।প্রসাদ কখনও কম পড়ে না বা

নষ্ট হয় না।রান্নার প্রক্রিয়াও বেশ মজার। মন্দিরের রান্নাঘরে একটি পাত্রের উপর আর একটি পাত্র এমন করে মোট ৭টি পাত্র আগুনে বসানো হয় রান্নার জন্য। এই পদ্ধতিতে যে পাত্রটি সবচেয়ে উপরে বসানো থাকে তার রান্না সবার আগে হয়। তার নিচে তারপরে রান্না হয়

 

সারাদিনের ভোগে থাকে নানা বৈচিত্র।জগন্নাথ খিচুড়ি খেতে ভালো বাসেন তাই তার জন্য বিশেষ খিচুড়ি তৈরী হয় এছাড়া বাল্যভোগে জগন্নাথদেবকে দেওয়া হয় খই, চিঁড়ে, বাতাসা, মাখন, মিছরি, কলা, দই এবং নারকেল কোরা। এরপর দেওয়া হয় রাজা ভোগ। এই তালিকায় থাকে মিষ্টি চালের খিচুড়ি, ডাল, তরকারি, ভাজা এবং পিঠেপুলি। দুপুরের ভোগ মূলত অন্নভোগ। সেখানে থাকে ভাত, ডাল, শুক্তো, তরকারি ও পরমাণ্ণ। এছাড়াও থাকে ক্ষীর ও মালপোয়া। সন্ধেবেলায় দেওয়া হয় লেবু, দই দিয়ে মাখা পান্তাভাত। সঙ্গে খাজা, গজায এবং নানা ধরনের মিষ্টি। শয়নের আগে মধ্যরাতে ডাবের জল খেয়ে শুতে যান জগন্নাথ।

 

চলতে থাকবে রথযাত্রা উপলক্ষে

জগন্নাথদেব প্রসঙ্গে আলোচনা। আবার রথ

যাত্রার ইতিহাস নিয়ে আগামী পর্বে

ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাথ দেব এবং কোহিনুর

জগন্নাথ দেব এবং কোহিনুর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীর মন্দিরেরের সাথে এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে বিশ্বের সবথেকে মূল্যবান হীরে কোহিনুরের।

আজ হয়তো ব্রিটিশ পরিবারের পরিবর্তে কোহিনুর জগন্নাথ দেবের রত্ন ভাণ্ডারে থাকতো। কিন্তু তা হয়নি। কি ভাবে তা সম্ভব হতো আর কেনো হয়নি সেই ইতিহাস নিয়ে আজকের পর্ব।

 

সকলেই জানেন যে কোহিনুরের যাত্রা গোলকুণ্ডায় শুরু হয়েছিল এবং মুঘল দিল্লি, পারস্য এবং আফগানিস্তানে পৌঁছেছিল তারপর ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে শিখ সাম্রাজ্যের প্রথম শাসক মহারাজা রঞ্জিত সিং কোহিনুর অধিকার করেন তার মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকার রাজা দিলীপ সিংহর হাত থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ইংল্যান্ডের রানী কোহিনুর উপহার হিসেবে পান।

 

মহারাজা রঞ্জিত সিং 1839 সালে তাঁর মৃত্যুর আগে হীরাটি পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে পাঠানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু মহারাজার অধীনে থেকেও পাঞ্জাবের তৎকালীন কিছু ক্ষমতাবান আমলা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন।

কিছু ইতিহাস বইয়ে মহারাজা রঞ্জিত সিং কর্তৃক পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের কাছে কোহিনূর বন্ধক হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।

 

মহারাজ রঞ্জিত সিংহ তার ইচ্ছে প্রকাশ করে কোহিনুরকে জগন্নাথ মন্দিরে দান করার জন্য একটি উইল ও লেখেন যাকে ভিত্তি করে আজও পুরীর মন্দির কতৃপক্ষ কোহিনুর তাদের বলে দাবী করে আসছেন এবং সেই সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আইনি লড়াই লড়তেও তারা প্রস্তুত।

রুঞ্জিত নিজেই মারা যান তার এই শেষ ইচ্ছে অপূর্ন রেখে এবং রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তার নাবালক উত্তরাধিকারের হাত থেকে কোহিনুর এক প্রকার ছিনিয়ে নেয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা।

 

এখন প্রশ্ন জাগে মহারাজা রঞ্জিত সিং মূল্যবান কোহিনুর দেওয়ার জন্য জগন্নাথ মন্দির বেছে নেওয়ার কারণ কী? আসলে বাঙালিদের মতো শিখ দের সাথে জগন্নাথ দেবের রয়েছে বিশেষ সম্পর্ক।উড়িষ্যার সাথে শিখদের এই নিবিড় সংযোগ প্রথমে গুরু নানকের সময়ে শুরু হয়।

শোনা যায় গুরু নানক একবার জগন্নাথ মন্দির দর্শন করতে এসেছিলেন এবং অন্য ধর্মের হওয়ায় তিনি প্রবেশেধিকার পাননি। পরে পুরীর সমুদ্র সৈকতে তারা যখন অভুক্ত অবস্থায় ছিলেন তখন প্রভু জগন্নাথ তাদের নিজের ভোগ পাঠিয়ে তাদের সেবা করেন। তারপরে গুরু গোবিন্দ সিংয়ের সময়েও শিখ ধর্মের মানুষ রা জগন্নাথের বিশেষ কৃপার পাত্র ছিলেন। আজও সেই পরম্পরা চলছে। তাই মহারাজা রঞ্জিত সিং তার দখলে থাকা সবচেয়ে দামি রত্ন কোহিনূরকে পুরী জগন্নাথ মন্দিরে দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।

 

এমন বহু রহস্য এবং অজানা ইতিহাস আছে পুরীর মন্দিরকে কেন্দ্র করে। রথ যাত্রা উপলক্ষে আবার এক বিশেষ পর্ব নিয়ে আগামী পর্বে ফিরে আসবো পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরীর মন্দিরের পাঁচটি বিস্ময়

পুরীর মন্দিরের পাঁচটি বিস্ময়

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীর মন্দির ভারতের অন্যতম রহস্যময় মন্দির যেখানে নিত্যদিন ঘটে চলেছে জগন্নাথ লীলা এবং প্রতিদিন এই মন্দিরে আগত ভক্তরা একাধিক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী থাকেন। আজ পুরীর মন্দিরের পাঁচটি বিস্ময়কর তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরবো।

 

সমুদ্রের কাছেই জগন্নাথ মন্দির অবস্থিত।

পুরীর সমুদ্রের গর্জন কে না জানে। অনেক দূর পর্যন্ত সমুদ্রের গর্জন শোনা যায়। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে জগন্নাথ মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করলে সমুদ্রের গর্জন বা ঢেউয়ের কোনও শব্দ শোনা যায় না। কথিত আছে দেবী সুভদ্রা চেয়েছিলেন মন্দিরের ভিতর নীরবতা বজায় থাকবে। তাই মন্দিরের ভিতর সমুদ্রের শব্দ শোনা যায় না।

 

জগন্নাথ মন্দিরের চূড়ায় একটি সুদর্শন চক্র লাগানো রয়েছে।চক্রটির ওজন প্রায় এক টন। ১২ শতকে মন্দিরটি তৈরির সময় এটি চূড়ায় বসানো হয়েছিল। সেই সময় প্রযুক্তি বিশেষ উন্নত ছিল না। ফলে কীভাবে চূড়ার উপর অত ভারী চক্রটি বসানো হল, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।আশ্চর্যজনক বিষয় হল, যে কেউ যে কোনও প্রান্ত থেকে ওই চক্রের দিকে তাকান, মনে হবে চক্রটি তাঁর দিকেই ঘোরানো।

 

জগন্নাথ মন্দিরটি প্রায় ৪ লক্ষ বর্গফুট এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং ২১৪ ফুট উঁচু। অথচ এই মন্দিরের চূড়ার কোনও ছায়া দেখা যায় না। মাটিতে ছায়া না পড়া পুরীর মন্দিরে আরো একটি বড়ো বিস্ময়।

 

পুরীর মন্দিরের একেবারে চূড়ায় একটি পতাকা লাগানো থাকে। আশ্চর্যজনক বিষয় হল যে

দিকে হাওয়া।চলে সবসময় তার বিপরীত দিকে পতাকাটি ওড়ে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় পতাকা

পরিবর্তন হলেও পতাকা ওড়ার দিক কখনো পরিবর্তন হয়না।

 

সব শেষে যে রহস্যটির কথা বলবো তা হলো পুরীর

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের চূড়ায় কখনও কোনও পাখি বসতে দেখা যায় না। এমনকি মন্দিরের উপর দিয়ে কোনও পাখি উড়তে দেখা যায়নি।যেকোনো প্রাচীন মন্দিরে গেলে সর্বত্র পাখির অবাধ বিচরণ দেখা যায় কিন্তু পুরীর মন্দির সে দিক দিয়ে ব্যাতিক্রম।

 

আবার আগামী দিনে ফিরে আসবো রথ

যাত্রা উপলক্ষে এই বিশেষ ধারাবাহিক পর্ব

নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরীর মন্দিরের চারটি দ্বারের রহস্য

পুরীর মন্দিরের চারটি দ্বারের রহস্য

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীর মন্দিরে প্রবেশের চারটি প্রবেশদ্বার রয়েছে।

এই চারটি প্রবেশ দ্বারের রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। আজকের পর্বে এই চারটি দুয়ারের রহস্য জানাবো।

 

কথিত আছে চারটি গেট এই গেটের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে কিছু বিশেষ তাৎপর্য। জগন্নাথ ধাম প্রবেশের

 

এই চার দুয়ার চারটি প্রাণীর প্রতিনিধিত্ব করে এবং তাদের নাম যথা ক্রমে এই রূপ –

‘সিংহ দুয়ার’, ‘ব্যাঘ্র দুয়ার’ , ‘হস্তি দুয়ার’ এবং

‘অশ্ব দুয়ার’

 

পূর্ব দুয়ার বা সিংহ দুয়ার হলো শ্রী জগন্নাথ

মন্দিরে প্রবেশের প্রধান দরজা।নৃসিংহ ভগবানের একটি বিশেষ অবতার। তিনি বিরত্ব এবং পরাক্রমের প্রতীক। আবার সূর্য পূর্ব

দিক থেকে উদিত হয় যা তেজ এবং শক্তির উৎস এই সিংহ দুয়ার প্রধানত ভক্তি বা মোক্ষ লাভের দুয়ার হিসাবে পরিচিত।

 

পশ্চিম দুয়ার বা ব্যাঘ্র দুয়ার হল ইচ্ছার প্রতীক। জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশের পশ্চিম গেটে বাঘের মূর্তি রয়েছে। এই গেট দিয়ে সাধারনত সাধু সন্ন্যাসী এবং বিশেষ ভক্তরা মন্দিরে প্রবেশ করেন।বাঘ যেমন রাজশক্তির প্রতীক তেই তেমনই এই দ্বার

বিশেষ ক্ষমতাকে নির্দেশ করে।

 

পুরীর মন্দিরের উত্তরে আছে দুয়ার বা হস্তি দুয়ার

বিদেশী শত্রুর আক্রমণে এই দ্বার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।পরে আবার তৈরী করা হয়। হাতি সম্পদের দেবী মহা লক্ষ্মীর বাহন তাই সম্পদের প্রতীক হিসাবে, মন্দিরের উত্তর গেটে হাতির প্রতীক ছিল। বিশ্বাস করা হয় এই দরজা দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করলে ধনসম্পদ লাভ হয়।

 

দক্ষিণ দুয়ারটির নাম অশ্ব দুয়ার।

জগন্নাথ ধামে দক্ষিণের প্রবেশ দ্বার বিজয়ের রাস্তা হিসাবে পরিচিত। এই প্রবেশদ্বারের বাইরে দুটি ছুটন্ত ঘোড়ার মূর্তি রয়েছে। প্রাচীনকালে রাজারা যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য প্রভুর আশীর্বাদ নিতে এই দরজা দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করতেন। বিশ্বাস করা হয় এই দরজা দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করলে ইন্দ্রিয় অধীনে থাকে।এখানে দেবী লক্ষ্মী, নৃসিংহ এবং তপস্বী হনুমানের প্রতীক রয়েছে।

 

এইরূপ আরো অনেক অজানা বিষয় এবং বিস্ময়কর তথ্য নিয়ে আমি আপনাদের সামনের ফিরে আসবো রথ যাত্রা উপলক্ষে এই বিশেষ

পর্বগুলিতে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাথদেবের রত্ন ভান্ডার

জগন্নাথদেবের রত্ন ভান্ডার

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ভারতের প্রাচীন মন্দির গুলিতে রয়েছে বহু ধন রত্ন এবং সেই নিয়ে চালু রয়েছে বহু কিংবদন্তী। দক্ষিন ভারতের পদ্মনাভ স্বামী মন্দির বা তিরুপতি বালাজি মন্দিরের পাশাপাশি চার ধামের মধ্যে অন্যতম পুরীর মন্দির একদমই পিছিয়ে নেই।

 

প্রভু জগন্নাথের রয়েছে অগাধ সম্পত্তি। সেই তালিকায় রয়েছে বহু মূল্য হীরে, মূল্যবান অনেক রত্ন, সোনার এবং রুপোর নানা রকম অলংকার।

শুধু জগন্নাথ নন বলরাম এবং সুভদ্রার ও রয়েছে নিজস্ব রত্ন ভান্ডার।

 

বিশেষ বিশেষ সময়ে প্রভুর মাথায় ব্রহ্মজ্যোতি হীরা শোভা পায়।সেই হীরের জ্যোতি কি কেউ খালি চোখে সইতে পারেনা।এছাড়া বলরামের মাথার নীলা বা সুভদ্রার মাথার মানিক, সবই রত্নভান্ডারে গচ্ছিত আছে।বিশেষ বিশেষ সময়ে প্রভুকে সোনার গয়নায় সাজানোর জন্য তার রত্ন ভান্ডার থেকে গহনা বের করে আনা হয় তবে তারও একটা নিদ্দিষ্ট পক্রিয়া আছে।

 

মন্দিরের অভ্যন্তরে কয়েকটি বিশেষ কক্ষে এই অতুল ঐশর্য রাখা আছে। সেখানে বাইরের কারুর প্রবেশের অধিকার নেই।বহুকাল এই রত্ন ভাণ্ডারের সমীক্ষা বা হিসেবে নিকেশ হয়নি। ভারত সরকার একবার উদ্যোগ নিলেও চাবি না পাওয়ার জন্য কাজ স্থগিত রাখতে হয়।বর্তমান সময়েও রত্ন ভাণ্ডারের ধন দৌলতের পরিমান জন সমক্ষে আনার জন্য আলোচনা চলছে তবে শেষ মেষ তা হবে কিনা নিশ্চিত করে বলা যায়না। সবই এক কথায় প্রভু জগন্নাথের ইচ্ছার উপর নির্ভর করছে।

 

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সিংহদুয়ারের ঠিক সামনে ইমার মঠ। সেখান থেকে একাধিক বার উদ্ধার হয়েছে গুপ্তধন।২০১১-তে ও ২০২১-এ, পরপর দু’বার এই মঠ থেকে পাওয়া যায় কয়েক কোটি টাকার সম্পদ উদ্ধার হয় অন্তত ৫০০ রূপোর বাট।

 

ভবিষ্যতে হয়তো প্রভু জগন্নাথের রত্ন ভান্ডারে গচ্ছিত ধন দৌলতের পরিমান ঠিক কতো তা জানা যাবে আরো অনেক রহস্য হয়তো প্রকাশিত হবে।

ততো দিন পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

 

আসন্ন রথ যাত্রা উপলক্ষে সারা সপ্তাহ জুড়ে থাকবে জগন্নাথদেব এবং পুরীর মন্দির নিয়ে আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাথদেবের ভোগ নিবেদন 

জগন্নাথদেবের ভোগ নিবেদন

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীর মন্দিরে জগন্নাথের ভোগ নিবেদন নিয়ে আছে অনেক পৌরাণিক ঘটনা অনেক ইতিহাস এই মন্দিরে ভোগ রান্না থেকে ভোগ নিবেদন সবেতেই আছে বৈচিত্র।আজকের পর্বে এই বিষয় নিয়ে লিখবো।

 

ভগবান বিষ্ণু মর্ত্যলোকে এসে চার ধামে যাত্রা করেন। এই চার ধাম হল- বদ্রীনাথ ধাম,দ্বারিকা ধাম,পুরী ধাম এবং রামেশ্বরম। প্রথমে হিমালয়ের শিখরে অবস্থিত বদ্রীনাথ ধামে স্নান করেন,তারপর গুজরাটের দ্বারিকা ধামে গিয়ে বস্ত্র পরিধান করেন, ওড়িশার পুরী ধামে ভোজন করেন আর সবশেষে রামেশ্বরমে গিয়ে বিশ্রাম নেন।অর্থাৎ পুরী হলো ভগবানের ভোজনের স্থান তাই এই স্থানে ভোগে কিছু বিশেষত্ব থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।

 

পুরীতে জগন্নাথকে অর্পণ করা হয় ছাপান্ন ভোগ।

পুরাণ মতে, যশোদা বালক কৃষ্ণকে আট প্রহর খেতে দিতেন। যখন ইন্দ্রের রোষে গোকুলে মহাপ্রলয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময় প্রাণীদের রক্ষা করতে নিজের কনিষ্ঠ আঙুলে গোবর্ধন পাহাড় তুলে নিয়েছিলেন তিনি। সাতদিন ওইভাবেই তিনি ছিলেন। এই সময়ে তিনি অনাহারে ছিলেন। প্রলয় থামলে যখন কৃষ্ণ ফিরে আসেন তখন

কৃষ্ণকে মা যশোদা সাতদিন ও আট প্রহরের হিসেবে ছাপান্ন টি পদ পরিবেশন করেছিলেন। আর সেই থেকেই ভগবানের ছাপ্পান্ন ভোগ চলে আসছে।

 

জগন্নাথ মন্দিরের একাংশেই হয়েছে বড় রান্নাঘর। সেখানে রয়েছে ৭৫২ টি উনুন, সেখানে এই ভোগ রান্নার কাজ করেন ৩০০-রও বেশি রাঁধুনি। এরাই বংশ পরম্পরায় যুগ যুগ ধরে ভোগ রান্না করেন।

জগন্নাথের ভোগে মূলত দুই ধরনের খাবার দেওয়া হয়। ভাত, ডাল, তরকারি, খিচুড়ি জাতীয় রান্না করা খাবার থাকে। আর থাকে খাজা, গজা, খই, মুড়কি জাতীয় শুকনো খাবার। সব মিলিয়ে ছাপান্ন টি পদ সর্বোচ্চ রান্না হয় এখানে।

 

এখানে দুটি অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করা যায়।

পুরী মন্দিরের প্রতিদিন সমপরিমাণ প্রসাদ রান্না করা হয়। কিন্তু ওই একই পরিমাণ প্রসাদ দিয়ে কয়েক হাজার বা কয়েক লক্ষ মানুষ সকলেরই পেট ভরে যায়।প্রসাদ কখনও কম পড়ে না বা

নষ্ট হয় না।রান্নার প্রক্রিয়াও বেশ মজার। মন্দিরের রান্নাঘরে একটি পাত্রের উপর আর একটি পাত্র এমন করে মোট ৭টি পাত্র আগুনে বসানো হয় রান্নার জন্য। এই পদ্ধতিতে যে পাত্রটি সবচেয়ে উপরে বসানো থাকে তার রান্না সবার আগে হয়। তার নিচে তারপরে রান্না হয়

 

সারাদিনের ভোগে থাকে নানা বৈচিত্র।জগন্নাথ খিচুড়ি খেতে ভালো বাসেন তাই তার জন্য বিশেষ খিচুড়ি তৈরী হয় এছাড়া বাল্যভোগে জগন্নাথদেবকে দেওয়া হয় খই, চিঁড়ে, বাতাসা, মাখন, মিছরি, কলা, দই এবং নারকেল কোরা। এরপর দেওয়া হয় রাজা ভোগ। এই তালিকায় থাকে মিষ্টি চালের খিচুড়ি, ডাল, তরকারি, ভাজা এবং পিঠেপুলি। দুপুরের ভোগ মূলত অন্নভোগ। সেখানে থাকে ভাত, ডাল, শুক্তো, তরকারি ও পরমাণ্ণ। এছাড়াও থাকে ক্ষীর ও মালপোয়া। সন্ধেবেলায় দেওয়া হয় লেবু, দই দিয়ে মাখা পান্তাভাত। সঙ্গে খাজা, গজায এবং নানা ধরনের মিষ্টি। শয়নের আগে মধ্যরাতে ডাবের জল খেয়ে শুতে যান জগন্নাথ।

 

চলতে থাকবে রথযাত্রা উপলক্ষে

জগন্নাথদেব প্রসঙ্গে আলোচনা। আবার রথ

যাত্রার ইতিহাস নিয়ে আগামী পর্বে

ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী সাধনা – কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ

কালী সাধনা – কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রী জাতক

আজ যে পরিচিত কালী মূর্তির বাংলার ঘরে ঘরে পুজো হয় তা এক মাতৃ সাধকের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা পায় এবং তার মাধ্যমেই ডাকাত এবং শ্মশান বাসি তান্ত্রিক কাপালিক দের পূজিতা দশ মহাবিদ্যার এক বিদ্যা দেবী কালী হয়ে ওঠেন ঘরের মেয়ে।
তিনি মহান তন্ত্র সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। আজকের পর্বে তার কালী সাধনা নিয়ে লিখবো।

তন্ত্র সাধক কৃষ্ণানন্দ সপ্তদশ শতকে পশ্চিমবঙ্গের নবদ্বীপে এক পণ্ডিত বংশে জন্মগ্রহণ করেন। মনে করা হয় বাংলার সাধকগণ যখন তন্ত্রের মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছিলেন তখন আদ্যাশক্তি মহামায়া স্বয়ং তাঁকে তন্ত্রশাস্ত্রের পুনরুদ্ধার এবং তাঁর মাতৃরূপিণী বিগ্রহের পূজা করার নির্দেশ দেন।

কৃষ্ণানন্দ ছিলেন তন্ত্র সাধক এবং তন্ত্র মতেই তিনি মাতৃ আরাধনা শুরু করেন।সাধনার শুরুতে কৃষ্ণানন্দ মহামায়াকে বললেন, ‘‘মা, তোমার যে রূপের পূজা আমি করব আমাকে সে রূপ দেখিয়ে দাও’’। তখন মা বললেন, ‘‘যে ভঙ্গীতে আমার এই বিগ্রহের পূজা তোমার দ্বারা প্রচলিত হবে, তা আমি মানবদেহের মাধ্যমেই দেখিয়ে দেব। এই রাত শেষে সর্ব প্রথম যে নারীকে যে রূপে যে ভঙ্গীতে দেখবে, ঐরকম মূর্তিতে আমার পূজার প্রচলন করবে। মায়ের নির্দেশমত পরদিন ভোরে কৃষ্ণানন্দ গঙ্গার দিকে কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর এক শ্যামাঙ্গিনী বালিকাকে দেখতে পান। ওই বালিকা তখন অপরূপ ভঙ্গীতে কুটিরের বারান্দার উপরে এবং বামপদ ভূতলে দিয়ে দাড়িয়ে ছিলেন। তিনি একতাল গোময়যুক্ত ডান হাত এমনভাবে উচু করে ধরেছিলেন যা দেখে বরাভয় মুদ্রার মত মনে হয়েছিল। বাম হাত দিয়ে তিনি কুটিরের দেয়ালে মাটির প্রলেপ দিচ্ছিলেন। তিনি একটি অতি সাধারণ শাড়ি পড়ে ছিলেন। সেই গ্রাম্য রমণী কৃষ্ণানন্দকে দেখে লজ্জায় জিভ কেটেছিলেন।তাঁর এরকম ভঙ্গী দেখে কৃষ্ণানন্দের মায়ের প্রত্যাদেশের কথা মনে পড়ে গেল। তারপরই তিনি মায়ের ঐরকম মূর্তি রচনা করে পূজার প্রচলন করলেন।

অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা রয়েছে এই মহান মাতৃ সাধকের জীবন জুড়ে। শোনা যায় একবার কৃষ্ণানন্দ কোনো এক ধনী ব্যক্তির বাড়ি দুর্গাপূজা করতে গিয়েছিলেন, সেখানে দুর্গাপূজার শেষে ওই বাড়ির কর্তা নিজের অহংবোধের বশবর্তী হয়ে কৃষ্ণানন্দকে বলেন যে তিনি শাস্ত্র মতে প্রতিমার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেননি। কৃষ্ণানন্দ ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন যে তিনি যদি প্রাণপ্রতিষ্ঠা না করে থাকেন এক্ষুনি তার প্রমাণ দেবেন এই বলে কৃষ্ণানন্দ একটি কুশি ছুঁড়ে দেন দেবী প্রতিমার ঊরুতে। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিমার ঊরু ফেটে রক্তপাত হয়।উপস্থিত সবাই সাধকের এই অলৌকিক কীর্তি দেখে হতবাক হয়ে যান।

একাধিক কঠিন সব সাধনা এবং তাতে সিদ্ধি লাভ করে ধীরে ধীরে তন্ত্র জগতে মাতৃ সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তী বা প্রবাদপ্রতিম|তিনি ছিলেন সাধক রামপ্রসাদ সেনের তন্ত্রগুরু।সারা জীবন ব্যাপী তন্ত্র সাধনার পাশাপাশি কৃষ্ণানন্দ তন্ত্রসার ও শ্রীতত্ত্ববোধিনী নামক দুখানা গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছিলেন যা সর্বত্র সমাদৃত হয়েছিলো এবং আজও তন্ত্র সাধনার ক্ষেত্রে বা মাতৃ শক্তির উপাসনার ক্ষেত্রে এই বই দুটির ভূমিকা অপরিসীম|

এরম বহু মাতৃ সাধক বা কালী সাধক জন্মেছেন বাংলার এই পুন্য ভূমিতে। তাদের জীবন এবং সাধনা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকবে।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।