রথ যাত্রার সূচনা যেমন হয় স্নান যাত্রা দিয়ে তেমনই সমাপ্তি হয় উল্টো রথ দিয়ে আর এই উল্টো রথ প্রসঙ্গে বার বার আলোচিত হয় গুন্ডিচা ম্পন্দিরের কথা|উল্টো রথে নয় দিন পর গুন্ডিচা মন্দির থেকে নিজ মন্দিরে ফিরে আসেন জগন্নাথ দেব|গুন্ডিচা মন্দির ভ্রমণকেই আবার মাসির বাড়ি যাওয়া মনে করেন অনেকে। গুণ্ডিচা মন্দির জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি বা বাগানবাড়ি নামেও পরিচিত। মন্দিরটি একটি স্বর্গীয় বাগানের মাঝে অবস্থিত। শ্রীজগন্নাথদেবের মূল মন্দির তথা “শ্রীমন্দির”-এর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে গুন্ডিচা মন্দির।বছরের অন্যান্য সময়ে মন্দিরটি প্রায় শূণ্য থাকে। রথযাত্রার ঠিক একদিন আগে থেকে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার থাকার উপযুক্ত করে তোলার জন্য ধর্মীয়ভাবে গুণ্ডিচা মন্দির সংস্কার করা হয় এবং আষাঢ় মাসের রথযাত্রার সাতদিন যাবৎ এই গুণ্ডিচা মন্দিরেই জগন্নাথ বলরাম ও সুভদ্রার আরাধনা করা হয়।আসলে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের স্ত্রীছিলেন গুণ্ডিচা।রাণী গুণ্ডিচার নামেই সংশ্লিষ্ট মন্দিরটি নির্মিত যা নিয়ে প্রচলিত রয়েছে একটি পৌরাণিক ঘটনা|দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা জগন্নাথ মূর্তি তৈরি করার সময় রাণী গুণ্ডিচা বন্ধ দরজার বাইরে থেকে নিষেধ অমান্য করে উঁকি মারেন এবং জগন্নাথের মহিমায় মুগ্ধ হয়ে তার জন্য একটি পৃথক মন্দির তৈরী করবেন ঠিক করেন|পরবর্তীতে জগন্নাথদেব তার জন্য তৈরি মন্দির দেখে সন্তুষ্ট হন ও রানী গুন্ডিচার ভক্তিতে প্রসন্ন হয়ে রাণী গুণ্ডিচাকে আশ্বস্ত করেন যে তিনি তার বাড়ীতে আসবেন। যেটি বর্তমানে গুণ্ডিচা মন্দির নামে খ্যাত।গুন্ডিচা মন্দির ও জগন্নাথ দেবের সাতদিন এই মন্দিরে থাকা নিয়ে একটি শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা আছে|অনেকে মনে করেন জগন্নাথ দেব গুণ্ডিচা মন্দিরে সাত দিন থাকার সময়ে তার স্ত্রী দেবী লক্ষ্মীকে মূল মন্দিরের সংগ্রহকক্ষে বন্দিনী করে রেখে আসেন এবং গুণ্ডিচা মন্দিরে তিনি তার প্রিয় গোপীগণের সাথে সময় অতিবাহিত করেন এটি বৃন্দাবনে কৃষ্ণের রাসলীলার মতো একটি বিশেষ লীলা|অন্য একটি ব্যাখ্যা অনুসারে “গুণ্ডিচা” ছিলেন স্থানীয় দেবী লৌকিক দেবী যিনি মা শীতলার ন্যায় গুটিবসন্ত রোগ নিরামক। ওড়িয়া ভাষাতে “গুণ্ডি” শব্দটির অর্থ গুটিবসন্ত, যা বাংলা “গুটি” শব্দটি থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়। এবং বাংলার গুটিবসন্ত নিরাময়ের দেবী “গুটিকা ঠাকুরাণী” এবং ওড়িয়া “গুণ্ডিচা”কে একই ব্যাক্তিচৈতন্য মহাপ্রভু একবার রথযাত্রার আগের দিন গুণ্ডিচা মন্দির পরিষ্কার করার দায়িত্ব নেন। এই রীতিটি বর্তমানেও রথযাত্রার আগের দিন গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ পালন করে থাকেন।চলতে থাকবে পৌরাণিক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা ও ব্যাখ্যা|গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে ভারতের আধ্যাত্মিক গুরু ও তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সব ঘটনা নিয়ে ফিরে আসবো|পড়তে থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – সুভদ্রার আসল পরিচয়
বছরের এই সময়ে রথ যাত্রা উপলক্ষে শুধু জগন্নাথ নন দুই দাদা জগন্নাথ ও বলরামের সঙ্গে রথে চড়ে মাসির বাড়ি যান তাদের বোন সুভদ্রাও।কিন্তু আসলে কে এই সুভদ্রা ও কি তার আসল পরিচয় আজকের পর্বে সেই কথাই বলবো|সুভদ্রা মহাভারতের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আবার সুভদ্রার উল্লেখ বারবার পুরাণেও পাওয়া যায়। বীরযোদ্ধা অভিমন্যুর মা তিনি। রথযাত্রার আগে মহাভারত অনুসারে কৃষ্ণ ও বলরামের ছোট বোন সুভদ্রাকে বিয়ে করেছিলেন তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন। সুভদ্রা ও অর্জুনের পুত্র অভিমন্যু চক্রব্যুহ ভেদ করে সপ্তরথীর সঙ্গে একা বীরের মতো যুদ্ধ করে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। তবে শুধু কৃষ্ণ ও বলরামের বোন, অর্জুনের স্ত্রী এবং অভিমন্যুর মা এই পরিচয়ই সুভদ্রার জন্য যথেষ্ট নয় তার আরো একটি পরিচয় আছে|সুভদ্রা আসলে সেই যোগমায়া, যাঁকে তাঁর জন্মের রাতেই মায়ের কোল থেকে সরিয়ে এনে তুলে দেওয়া হয়েছিল কংসের হাতে। সদ্যোজাত কৃষ্ণকে রক্ষা করতে তাকে ঘাতকের হাতে তুলে দিয়েছিলেন কৃষ্ণর পিতা বসুদেব|শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে একই সময়ে নন্দ ও যশোদার ঘরে জন্মেছিলেন যোগমায়া|তিনি স্বয়ং দেবী পার্বতী। প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির সেই রাতে কৃষ্ণকে কংসের কারাগার থেকে সরিয়ে ফেলতে গোকূলে যান বসুদেব। সেখানে অচেতন যশোদার পাশ থেকে সদ্যজাত যোগমায়াকে সরিয়ে সেখানে কৃষ্ণকে রেখে আসেন তিনি। যোগমায়াকে নিয়ে কংসের কারাগারে ফিরে এসে দেবকীর পাশে শুইয়ে দেন।পরের ঘটনা কম বেশি সবাই জানেন কংস এসে যোগমায়াকে নিধন করতে উদ্যত হলে তাঁর হাত ছাড়িয়ে আকাশে মিলিয়ে যান তিনি। যাওয়ার আগে কংসকে এই বলে সতর্ক করে দিয়ে যান, ‘তোমারে বধিবে যে, গোকূলে বাড়িছে সে।’পরবর্তীতে তাই হয়েছিলো কৃষ্ণের হাতে পরাজিত ও নিহত হন কংস|পার্বতীর অংশ যোগমায়াই পরে বসুদেব ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী রোহিনীর সন্তান হয়ে জন্ম নেন। তখন তাঁর নাম হয় সুভদ্রা, কৃষ্ণ ও বলরামের আদরের বোন। পুরীতে কৃষ্ণ জগন্নাথ রূপে পূজিত তাঁর সঙ্গে থাকেন দাদা বলরাম ও বোন সুভদ্রা|আগামী পর্বে আরো একটি রথ যাত্রা বিষয়ক পর্ব নিয়ে ফিরে আসবো|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
মাহেশের রথের অলৌকিক ঘটনা
আজ বলবো বিখ্যাত মাহেশ এর রথের কথা|পুরীর পরেই শ্রীচৈতন্য ও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতি বিজড়িত দ্বিতীয় বৃহত্তম ও প্রাচীন রথোৎসব হয় শ্রীরামপুরের এই মাহেশেই।রাধারানী’ উপন্যাসে মাহেশের রথের কথা লিখেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।কবে কিভাবে শুরু হয়েছিলো এই প্রাচীন রথ যাত্রা তা সঠিক ভাবে জানা না গেলেও কিছু কিছু ইতিহাস জানা যায়|শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতম পার্ষদ কলকাতার শ্যামবাজার নিবাসী বলরাম বসুর পিতামহ ছিলেন কৃষ্ণরাম বসু। তিনি একটি সুদৃশ্য উচ্চ কাঠের রথ করিয়ে দেন মাহেশ রথ যাত্রার উদ্দেশ্যে ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে। কালের নিয়মে এটি নষ্ট হয়ে যায়। কৃষ্ণরাম বসুর পুত্র গুরুপ্রসাদ বসু। তিনি আবার রথটি নির্মান করে দিলেন ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে। এবার রথটি অগ্নিদগ্ধ হল। ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় একটি নতুন রথ নির্মান করিয়ে দিলেন কালাচাঁদ বসু। এক সময় ওই রথটিতে জনৈক ব্যাক্তি মারা যান গলায় দড়ি দিয়ে। ফলে অপবিত্র জ্ঞানে পরিত্যক্ত হল সেটি। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে আবার একটি রথ তৈরি করিয়ে দিলেন বিশ্বম্ভর বসু। এমনই কপাল জগন্নাথের, সেটিও একদিন অগ্নিদাহে ভস্মীভূত হল। এরপর আর কাঠের নয়, তৈরি হল লোহার রথ। বর্তমানে সেই রথই চলছে যা 1885 সালে নির্মিত হয়েছিলো|মাহেশের রথ নিয়ে একটি অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ আছে|শোনা যায় একবার রথ যাত্রার সময়ে স্থানীয় এক মিষ্টির দোকানে হাজির হলো এক বালক|সে জিলিপি খেতে চাইলো কিন্তু তার কাছে অর্থ নেই|বালক তার হাতের বালা খুলে তার বিনিময়ে জিলিপি ক্রয় করতে চাইলে দোকানদার প্রথমে রাজি হলোনা|পরে বালকের জেদের কাছে হার মানলেন তিনি এবং বালা নিয়ে জিলিপি দিলেন|বালক জিলিপি নিয়ে চলে গেলো|রথ যাত্রার সময় প্রধান পুরোহিত লক্ষ্য করলেন প্রভু জগন্নাথ এর হাতে একটি বালা নেই|চিন্তায় পড়লেন তিনি|অনেক ভেবেও বুঝতে পারলেন না কোথায় গেলো প্রভুর হাতের বালা|রাতে স্বয়ং জগন্নাথ তার স্বপ্নে দেখা দিলেন এবং বললে যে তিনি নিজে বালা জোড়া মিষ্টির দোকানে দিয়ে তার বিনিময়ে জিলিপি খেয়েছেন|পরদিন সকালে পুরোহিত লোক জন নিয়ে সেই মিষ্টির দোকানে গেলেন এবং বালা জোড়া উদ্ধার করলেন|সবাই অবাক হয়েছিলো প্রভু জগন্নাথ এর অদ্ভুত লীলার কথা জানতে পেরে|আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে প্রভু জগন্নাথ ও তার রথ যাত্রা নিয়ে আলোচনায়|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
জয় জগন্নাথ – নানাবেশে জগন্নাথ দেব
নানা সময়ে নানা বেশে সাজেন জগতের নাথ আজ সেই বেশগুলির কয়েকটি নিয়ে আলোচনা করবো|প্রাচীন গ্রন্থ মাদলা পাঞ্জিতে উল্লেখ আছে ১৪৬০ খ্রিস্টাব্দে ওড়িশার গজপতি রাজা কপিলেন্দ্র দেব দাক্ষিণাত্যের এক রাজার বিরুদ্ধে ভীষণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দীর্ঘ সংগ্রামের পর কপিলেন্দ্র যুদ্ধে জয়লাভ করেন। লুঠে আনেন ষোলটি হাতির পিঠ বোঝাই করে সহস্র মণ সোনা। সমস্ত সোনা রাজা কপিলেন্দ্র জগন্নাথদেবের মন্দিরের ভাণ্ডারে পাঠিয়ে দিলেন এবং জগন্নাথদেবকে তিনি ওড়িশার প্রকৃত রাজা বলে স্বীকার করলেন ও নিজেকে তাঁর অনুগত সেবক বলে ঘোষণা করলেন|অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই ক্ষমতা হস্তান্তর সর্বসাধারণের সম্মুখে উদযাপনের জন্য তিনি এই সময় জগন্নাথের ‘রাজবেশ’-এর প্রবর্তন করলেন। সাধারণের কাছে এই ‘বেশ’ আর একটি নাম পেল, তা হল, ‘বড়া তাধাও বেশ’।জগন্নাথদেবকে পুরীতে সাধারণ দিনগুলিতে যে বেশে দেখা যায়, সেই বেশ পরিচিত সাদা বেশ নামে। এরপর রাতে যে বেশে জগন্নাথ, বলরাম, শুভদ্রাকে রাখা হয় তার নাম বড়সিংহের বেশ। চন্দনলাগি বেশ শুরু হয় বৈশাখ জৈষ্ঠের সময়, এই সময় ভগবানকে চন্দনের প্রলেপে রাখা হয় এবং ৪২ দিন ধরে চলে এই উৎসব।জগন্নাথদেবের আরকেটি বিখ্যাত বেশ হলো হাতি বেশ|হাতিবেশ রথযাত্রার আগে স্নান যাত্রার সময় দেখা যায় । এই সময়ে গণপতির বেশে জগন্নাথকে সাজানো হয় বলে নাম ‘হাতি বেশ’। গণেশের বেশে স্নানযাত্রার পর উঠে আসেন জগন্নাথ।হাতি বেশের নেপথ্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা আছে|বহু শতক আগে পুরীর রাজার রাজদরবারে এসেছিলেন পণ্ডিত গণেশ ভট্ট। রাজা তাঁকে জহগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা দেখবার জন্য আহ্বান জানান। তবে তা দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলনা গনেশ ভট্টর। কারণ তাঁর আরাধনার দেবতা গণপতি স্বয়ং। কিন্তু স্নানযাত্রায় গিয়ে গণেশ ভট্ট আবিষ্কার করেন, যে যে বিষ্ণুর অবতার জগন্নাথের স্নান তিনি দেখছেন, তাঁর রূপ যেন হুবহু গণেশ! সমস্ত ঈশ্বর তাঁর কাছে একই মনে হতে লাগল। আর সেই ঘটনার পর থেকেই স্নান যাত্রায় জগন্নাথের বেশ হয় হাতিবেশ।পুরীর জগন্নাদেবের থের বিভিন্ন বেশের মধ্যে অন্যতম হল কালিয়াদলন বেশ। ভাদ্র একাদশীর দিন পুরীর জগন্নাথকে সাজানো হয় এই বিশেষ বেশে। যেভাবে শ্রীকৃষ্ণ দুর্দমনীয় রাক্ষস কালিয়াকে হত্যা করেছিলেন, সেই বেশেই এদিন সাজানো হয় জগন্নাথকে।আশ্বিনে যে নয়নাভিরাম বেশকর্ম শ্রীমন্দিরে অনুষ্ঠিত হয়, তার নাম ‘রাধা-দামোদর বেশ’।আশ্বিনের শুক্ল পক্ষের একাদশী তিথিতে শুরু হয়ে এই ‘রাধা-দামোদর বেশ’ কার্তিকের শুক্ল দশমী অবধি নিত্যই অনুষ্ঠিত হয়।জগন্নাথদেবের আরো একটি বেশ হলো পদ্মবেশ|মাঘ ও বসন্তের শনিবার ও বুধবার জগন্নাথ ধারণ করেন পদ্মবেশ।আগামী দিনেও ফিরে আসবো প্রভু জগন্নাথদেবের মহিমা বর্ণনা করতে| আলোচনা চলবে উল্টো রথ অবধি|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – পুরীধাম ও মহাপ্রভু
পুরীধাম ও বিখ্যাত রথ যাত্রার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেছে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যর নাম এবং তার হাত ধরেই বাংলা ও পরবর্তীতে দেশের বাইরেও ছড়িয়েছে রথ যাত্রার মহিমা|সন্ন্যাস নেওয়ার অল্প দিন পরে, ১৫১০ সালে পুরীতে প্রথম বার পৌঁছে মহাপ্রভু ভাবে বিভোর হয়ে জড়িয়ে ধরতে গিয়েছিলেন দারুবিগ্রহ। জীবনের ২৪টা বছর শ্রীচৈতন্য পুরীতেই ব্যয় করলেন এই ২৪ বছরের মধ্যে প্রথম ৬ বছর অবশ্য তিনি বৃন্দাবনসহ উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারত সফরের জন্য পুরীকেই কেন্দ্র করেছিলেন। সেখান থেকেই নানা দিকে যাতায়াত করেছিলেন। মায়ের সঙ্গে শেষ বার দেখা করে আসার পর পুরীতে টানা ১৮ বছর বাস করেছেন, ১৫৩৩ সালে সেখানেই রহস্যজনক ভাবে বৈকুন্ঠে লীন হয়ে গেলেন।কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর ‘চৈতন্যচরিতামৃত‘-র মধ্যলীলা পর্যায়ে জানিয়েছেন, রাজা প্রতাপ রুদ্রদেব চৈতন্য ও তাঁর সঙ্গীদের রথযাত্রায় অভ্যর্থনা জানানোর জন্য দাঁড়িয়েছিলেন।আরো বর্ণনা আছে যে বিশাল দারুমূর্তিগুলি কী ভাবে রেশমি দড়িতে বেঁধে সেবকরা মন্দিরের বাইরে নিয়ে আসছেন, পুরু মাদুরের উপর দিয়ে সেগুলি রথে নিয়ে তুলছেন, সেই বর্ণনাও চরিতামৃতে আছে। রাজা নিজে সোনার হাতলওয়ালা ঝাঁটা নিয়ে জগন্নাথদেবের পথ পরিষ্কার করেন, সারা রাস্তায় সুগন্ধি চন্দনজল ছেটানো দেখে মহাপ্রভুও চমৎকৃত হয়েছিলেন।চৈতন্য বারংবার বলেছেন, পুরীর এই নীলমাধবই স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, তিনি তাঁরই আরাধনা করেন এবং তিনি শুধু শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মের ভক্ত, কোনও জাত বা সম্প্রদায়ে বিশ্বাসী নন।উল্লেখ যোগ্য বিষয় হলো পুরীবাসে চৈতন্যের প্রধান শিষ্যরা, যেমন রামানন্দ, শ্যামানন্দ, বলদেব বিদ্যাভূষণ কেউই ব্রাহ্মণ নন। পুরীর তৎকালীন ব্রাহ্মণ পান্ডা ও পুরোহিতেরা সারা বছর এই শূদ্রদের জগন্নাথ দর্শনের বিপক্ষে। শবরদের জগন্নাথ তখন ব্রাহ্মণদের অধিকারে মন্দিরের পুরোহিতেরা বিধান দিলেন, জগন্নাথদেব বছরে এক বারই মানুষের দরবারে বেরোতে পারবেন আর সেই দিনটা হলো রথ যাত্রা|খ্যাতির শীর্ষে থাকা কালীন রহস্যজনক ভাবে পুরী থেকে মহাপ্রভু হারিয়ে গেলেন। অচ্যুতানন্দ দাস, দিনকর দাস, ঈশ্বরদাসের মতো চৈতণ্য জীবনীকার ও টীকাকারেরা বারংবার বলেছেন, নীলমাধব বিগ্রহে মিশে গিয়েছে তাঁর শরীর, কিন্তু সে নিয়ে হরেক সন্দেহ আর বিতর্ক কারন বিভিন্ন ঠিকাকার তার অন্তর্ধান নিয়ে আলাদা আলাদা ব্যাখ্যা করেছেন|কোথাও বলার হয়েছে রথ যাত্রার সময়ে পায়ে আঘাত লেগে তার মৃত্যু হয়েছে আবার কেউ বলেছেন সমুদ্রে তার জলসমাধি হয়েছে|অনেকেই মনে করেন মহাপ্রভুর অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পেছনে অন্য কোনো কারন আছে হয়তো জাতি ভেদ ও বর্ণ ভেদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া অন্য দিকে তার শিষ্য হয়ে পুরীর রাজার যুদ্ধ ও রাজনীতি থেকে দূরে থাকা অনেকেরই পছন্দ হয়নি তাই মহাপ্রভুর বিরুদ্ধে চক্রান্ত হয়েছিলো|সব থেকে বড়ো প্রশ্ন তার যদি স্বাভাবিক মৃত্যু হয়ে থাকে তার কোনো সমাধি স্থান নেই কেনো? আর যদি জগন্নাথ মূর্তিতে তিনি বিলীন হয়ে যাবেন তবে তার সমসাময়িক টিকাকারদের মধ্যে এতো শ্ববিরোধী মন্তব্য কেনো? চৈতণ্য অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে চলেছে গবেষণা একাধিক উপন্যাস ও লেখা হয়েছে|তবে সব প্রশ্ন ও দ্বিধা দূর হয় যদি চৈতণ্যদেবকে অবতার রূপে মেনে নেয়া হয়ে আর যদি তাকে সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখা হয়ে তবে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়|যাই হোক বিতর্ক নয় তার ভক্তি ও আদর্শ তাকে অমর করে রাখবে সারা বিশ্বে|পুরী ও রথ যাত্ৰা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকবে উল্টো রথ অবধি |পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – ছাপ্পান ভোগ
আমাদের সনাতন ধর্মে পবিত্র চার ধাম হল- বদ্রীনাথ ধাম,দ্বারিকা ধাম,পুরী ধাম এবং রামেশ্বরম। প্রথমে হিমালয়ের শিখরে অবস্থিত বদ্রীনাথ ধামে স্নান করেন,তারপর গুজরাটের দ্বারিকা ধামে গিয়ে বস্ত্র পরিধান করেন, ওড়িশার পুরী ধামে ভোজন করেন আর সবশেষে রামেশ্বরমে গিয়ে বিশ্রাম নেন।পুরী ধামে যেখানে তিনি ভোজন করেন সেখানে ভোগের কোনও চমক থাকবে না এটা কখনও হয়। সেখানেই তাঁকে ছাপ্পান্ন ভোগ দেওয়া হয়। আজ আসুন জেনে নিই কী এই ছাপ্পান্ন ভোগ| পুরাণ মতে, যশোদা বালক কৃষ্ণকে আট প্রহর খেতে দিতেন। যখন ইন্দ্রের রোষে পড়ে মহাপ্রলয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময় প্রাণীদের রক্ষা করতে নিজের কনিষ্ঠ আঙুলে গোবর্ধন পাহাড় তুলে নিয়েছিলেন তিনি। সাতদিন ওইভাবেই তিনি ছিলেন। খাবার ও জল কোনও কিছুই মুখে দেননি। প্রলয় বন্ধ হওয়ার পর সেই পাহাড় নামিয়ে রেখেছিলেন। এদিকে যে ছেলে দিনে আটবার খাবার খেত তাকে টানা সাতদিন অনাহারে থাকতে দেখে কেঁদে উঠেছিল যশোদার মন। তখন ব্রজবাসী-সহ যশোদা সাতদিন ও আট প্রহরের হিসেবে কৃষ্ণের জন্য ৫৬টি পদ পরিবেশন করেছিলেন। আর সেই থেকেই নারায়ণের ছাপ্পান্ন ভোগ চলে আসছে।পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দিরে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম রান্নাঘর। সেখানে বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না হয় ছাপ্পান ভোগ|জগন্নাথের ভোগে মূলত দুই ধরনের খাবার দেওয়া হয়। ভাত, ডাল, তরকারি, খিচুড়ি জাতীয় রান্না করা খাবার থাকে। আর থাকে খাজা, গজা, খই, মুড়কি জাতীয় শুকনো খাবার। মূলত ফুটন্ত জলে সবজি এবং মশলা দিয়ে চলতে থাকে মহাপ্রভুর রান্না। মশলা বলতে শুধুমাত্র নুন এবং হলুদের ব্যবহার। পেঁপে, আলু, টমেটো, কাঁচা লঙ্কা জাতীয় সবজি জগন্নাথের রান্নায় ব্যবহার করা হয় না। বাল্যভোগে জগন্নাথদেবকে দেওয়া হয় খই, চিঁড়ে, বাতাসা, মাখন, মিছরি, কলা, দই এবং নারকেল কোরা। এরপর দেওয়া হয় রাজা ভোগ। এই তালিকায় থাকে মিষ্টি চালের খিচুড়ি, ডাল, তরকারি, ভাজা এবং পিঠেপুলি। দুপুরের ভোগ মূলত অন্নভোগ। সেখানে থাকে ভাত, ডাল, শুক্তো, তরকারি ও পরমাণ্ণ। এছাড়াও থাকে ক্ষীর ও মালপোয়া। সন্ধেবেলায় দেওয়া হয় লেবু, দই দিয়ে মাখা পান্তাভাত। সঙ্গে খাজা, গজা এবং নানা ধরনের মিষ্টি। রাত ১১টার সময় ভাজা ও ক্ষীর দেওয়া হয় তাঁকে। আর মধ্যরাতে ডাবের জল খেয়ে শুতে যান ভগবান। এভাবেই তাঁক ছাপ্পান্ন ভোগ অর্পণ করা হয়ে থাকে।রথ যাত্রা উপলক্ষে চলতে থাকবে প্রভু জগন্নাথ ও তার নানা লীলা নিয়ে আলোচনা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – বলরাম এর প্রকৃত পরিচয়
রথ যাত্রা মূলত জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মাসির বাড়ি যাওয়ার অনুষ্ঠান। শ্রীকৃষ্ণের অন্য একটি রূপ জগন্নাথের কথা তো আমরা সবাই জানি যিনি এই উৎসবের কেন্দ্রে থাকেন এবং মূল আকর্ষন|বলরাম ও সুভদ্রা ও আধ্যাত্মিক ভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ|তাই আজকের পর্বে কৃষ্ণের বড় ভাই বলরামকে নিয়ে লিখবো|কৃষ্ণের সত্ মা রোহিণীর গর্ভে জন্ম হয় বলরামের। তিনি ছিলেন আসলে কংসের কারাগারে বন্দি বসুদেব ও দেবকীর সপ্তম গর্ভের সন্তান। কংসের হাত থেকে তাঁকে বাঁচানোর জন্য শ্রীহরির নির্দেশে সপ্তম গর্ভের ভ্রুণ রোহণীর গর্ভে প্রতিস্থাপিত করা হয়। কংসকে জানানো হয় যে দেবকী মৃত সন্তান প্রসব করেছেন।শক্তি ও আধ্যাত্মিকতার মিলন হয়েছে বলে তাঁর নাম বলরাম। অনেকের মতে বিষ্ণুর এক অবতার রামের ছোট ভাই লক্ষ্মণ দ্বাপর যুগে তাঁর বড় ভাই বলরাম হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন।মহাভারতে বলরামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলদেব, বলভদ্র বা হলায়ুধ নামেও পরিচিত। বৈষ্ণবরা বলরামকে বিষ্ণুর অবতার-জ্ঞানে পুজো করেন। ভাগবত পুরাণেও তাঁর নাম রয়েছে। বিষ্ণুর শয্যারূপী শেষনাগের একটি রূপেও তাকে দেখা হয় কোথাও কোথাও|আগামী দিনে সুভদ্রাকে নিয়েও আলাদা করে একটি পর্বে লিখবো|রথ সংক্রান্ত নানা কথা চলতে থাকবে ধারাবাহিক ভাবে উল্টো রথ পয্যন্ত|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – বৃন্দাবনে কৃষ্ণের অদ্ভুত লীলা
আজ পুরান কথায় আপনাদের ভগবান কৃষ্ণের এক অদ্ভুত লীলার কথা বলবো যা ঘটেছিলো বৃন্দাবনে|প্রকৃত সাধক মানেই তিনি ভগবানের প্রতি সদা আস্থাশীল ও সম্পূর্ণ রূপে নিবেদিত প্রাণ এমনই এক জটাধারী সাধুর জটা একবার বৃন্দাবনের পথে চলার সময় বৃক্ষের জটায় আটকে যায়। অনেক চেষ্টা করেও ঐ জটার প্যাঁচ কিছুতেই খুলতে পারলেন না এবং তখন তিনি আসন করে ওখানে বসে পড়লেন যারা সাহায্য করতে এগিয়ে এলো তাদের তিনি বললেন যিনি এই জটার প্যাঁচ লাগালো, তিনি এই জটারসপ্যঁচ খুলতে আসবে,তো ঠিক আছে। যদি না আসে আমি এখানে আসন করে বসে থাকব।তাতে যদি প্রাণ ত্যাগ করতে হয় তো তাই হোক|তিনদিন এমন করে মহাত্মাজী বসে রইলেন|তিন দিন পর এক শ্যামল সুন্দর রাখাল ছেলে এল। বালক বড় আদর করে বলল, বাবা তোমার তো জটা প্যাঁচ লেগে গেছে |আমি জটা খুলে দেব| আর যেই সেই বালক জটা খোলার জন্য এগিয়ে এল|সাধক বাঁধা দিয়ে বললেন যে জটা গাছের সাথে জড়াল সে এসে এই প্যাঁচ খুলবে। তা না হলে এখানে বসে গোবিন্দ নাম নিয়ে প্রাণ দিয়ে দেব। রাখাল ছেলে বলল- “আরে মহারাজজী যে এই কাজটা করল তার নাম তো বলুন, ওকে আমি খুঁজে ডেকে নিয়ে আসি।” সাধক বললেন যে সে আপনা আপনি এসে যাবে, ডাকতে হবে না। তুমি যাও|বালক তখন মৃদু হেসে রাখাল বেশ ত্যাগ করে বাঁকেবিহারী রূপে প্রকট হলেন এবং ভক্তর উদ্দেশ্যে বললেন মহাত্মাজী আমিই তো এই জটার প্যাঁচ লাগালাম। আমি তো এসে গেলাম। এখন জটা খুলে দিই এই বলে কৃষ্ণ স্বয়ং হাত বাড়ালেন মহাত্মাজী বললেন আমি তো নিত্য নিকুঞ্জবিহারীকৃষ্ণের পরম উপাসক|তুমি কি সে?কিন্তু তিনি তো শ্রীরাধারাণীকে বিনা এক মূহুর্ত থাকতে পারে না। কিন্তু তুমি বিহারীজী একা একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছ।মহাত্মাজী এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে শ্যামের কাঁধে উপরে শ্রীজী রাধারানীর মুখ দেখতেপেলেন অর্থাৎ শ্রীরাধারানী নিজের প্রিয়তম শ্যামের পাশে এসে মহাত্মাকে সাক্ষাৎ দর্শন দিলেন আর আরাধ্য ভগবানের দর্শন পেয়ে মহাত্মাজী আনন্দে বিভোর হয়ে গেলেন তার চোখ দিয়ে অশ্রুধারা পড়তে লাগল।তিনি বুঝলেন রাধা ও কৃষ্ণ আলাদা নয় এক ও অভিন্ন| রাধাকৃষ্ণ তার জটার প্যঁচ খুলে দিল।সাধক তার সর্বস্ব কৃষ্ণের চরনে নিবেদন করে বৈকুণ্ঠ লোকে স্থান পাওয়া নিশ্চিত করলেন|আবার আগামী দিনে ফিরে আসবো এমনই কোনো অদ্ভুত লীলা প্রসঙ্গ নিয়ে|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
রথযাত্রার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন
আজ পবিত্র রথযাত্রা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে যে সকল ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক উৎসবগুলি সর্বাধিক জনপ্রিয় ও পবিত্র তার মধ্যে একদম প্রথম সারিতে রয়েছে রথ এই রথ যাত্রা যা আজ আর শুধু উড়িষ্যা বা বাংলা নয় গোটা বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব গুলির অন্যতম|শাস্ত্র মতে তখন দ্বাপর যুগ, শেষ হয়েছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ|এক ব্যাধের বানের আঘাতে প্রান হারান শ্রী কৃষ্ণ তার সৎকার করেন অর্জুন কিন্তু অক্ষত থাকে কৃষ্ণের নাভী এই নাভী উদ্ধার করেন এক সবর রাজ তিনি নীল মাধব রূপে তা পূজা করতে লাগলেন|এর পর কেটে গেলো বহু যুগ পুরীর রাজা এক বিশাল দেবালয় গড়ে তুললেন এবং ইচ্ছা প্রকাশ করলেন নীল মাধব কে প্রতিষ্ঠিত করবেন তার মন্দিরে এবং নীল মাধবের সন্ধানে রাজা লোক পাঠালেন চারিদিকে, নেতৃত্বে রাজার বিশ্বস্ত লোক বিদ্যাপতি|এক জঙ্গলে পথ হারিয়ে বিদ্যাপতি আশ্রয় নিলেন এক সবর রাজের গৃহে, বিবাহ করলেন তার কন্যা কে এবং একদিন আবিষ্কার করলেন যে বংশ পরম্পরায় এই সবর রাজের কাছেই আছে নীল মাধব, অনুরোধ করে তা তিনি দর্শন করলেন|এবং ঘটনা চক্রে এই খবর রাজার কানে পৌছালো|সবর রাজ তার ইষ্ট দেব কে ছাড়তে না চাইলেও স্বয়ং নীল মাধবের ইচ্ছায় তা রাজার হাতে তুলে দিতে সম্মত হলেন কিন্তু|কিন্তু হটাৎ অদৃশ্য হয় নীল মাধব এবং দৈব বাণী হয় যে সমুদ্রে ভেসে আসবে কাঠ তা দিয়ে বানাতে হবে বিগ্রহ|তাই হলো কিন্তু যতক্ষণ না বিদ্যাপতি ও সবর রাজ হাত মিলিয়ে চেষ্টা করলেন নাড়ানো গেলোনা সেই কাঠ|বৃদ্ধের বেশে রাজ সভায় একদিন হাজির হয়ে মূর্তি তৈরির ভার নিলেন স্বয়ং বিশ্ব কর্মা|শর্ত রইলো একুশ দিনের আগে কেউ মূর্তি দর্শন করবেন না|কাজ শুরু হওয়ার চোদ্দো দিনের দিন রানী গুন্ডিচার কৌতূহলে খুলে গেলো শিল্পীর রুদ্ধ দ্বার|দেখা গেলো অদৃশ্য হয়েছেন শিল্পী এবং রয়েছে অসমাপ্ত তিনটি মূর্তি|রাজা মর্মাহত হলেন কিন্তু দৈব বাণী এলো যে জগন্নাথ অর্থাৎ জগতের নাথ স্বয়ং ভগবান ওই বিশেষ রূপেই পূজিত হতে চান|ওই বিগ্রহই প্রতিষ্ঠিত হলো মন্দিরের|মনে করা হয় দীর্ঘ বিরতির পর শ্রী কৃষ্ণর বৃন্দাবন যাত্রাকেই উদযাপন করা হয় রথ যাত্রা পালনের মাধ্যমে|প্রথম ও প্রধান রথ যাত্রা নিঃসন্দেহে পালিত হয় জগন্নাথ ধাম পুরীতে|প্রথমে রাজ পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় ও পরবর্তীতে সরকার জনসাধারণএর উদ্যোগে প্রতি বছর পুরীতে ওই বিশেষ তিথী তে বিরাট আকারে পালিত হয় রথ যাত্রা|এই পরম্পরা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে| বোন সুভদ্রা ও দাদা বলরাম বা বলভদ্রকে নিয়ে রথে চড়ে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের পত্নী গুন্ডিচারবাড়ি যান। সেখান থেকে সাতদিন পরে আবার নিজের মন্দিরে ফিরে আসেন। এই যাওয়াটাকেই জগন্নাথের মাসির বাড়ি যাওয়া বলে। রথের দিন তিনটি রথ পর পর যাত্রা করে মাসির বাড়ি। প্রথমে যায় বলরামের রথ, তারপর সুভদ্রা এবং সবশেষে জগন্নাথের রথ। রথে চড়ে এই গমন ও প্রত্যাগমনকে সোজা রথ এবং উল্টোরথ বলে|তিনটি রথ থাকে যাদের প্রত্যেকের নিজস্ব বৈশিষ্ট আছে|জগন্নাথের রথের নাম কপিদ্ধজ বলরামের রথের নাম তালধ্বজ ও সুভদ্রার রথের নাম দর্পদলন|এই রথ নির্মানে কোনো আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি ব্যবহার হয়না এবং বংশ পরম্পরার কারিগররা সকল নিয়ম নিষ্ঠা ও প্রথা মেনে রথ প্রস্তুত করেন|আজও পুরীর বর্তমান রাজা সোনার ঝাড়ু ব্যবহার করে রথের যাত্রার আগে তার পথ পরিষ্কার করে থাকেন|প্রচলিত বিশ্বাস রথে পুরীতে বৃষ্টিপাত হবেই|রথ যাত্রার সাথে জড়িয়ে আছে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যর ও তার সনাতন গোস্বামীর ন্যায় তার পার্শদদের অনেক গল্প এবং পরবর্তীতে তাদের অনুপ্রেরণায় গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ ও কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘ গোটা বিশ্বে সফল ভাবে ছড়িয়ে দেয় রথ যাত্রার মহিমা|আজ বাংলার নানা স্থানে বিরাট আকারে রথ যাত্রা উৎসব পালন হয় যার মধ্যে মাহেশের রথ যাত্রা বিশেষ উল্লেখযোগ্য|যাত্রা শব্দের প্রকৃত অর্থ গমন তাই জগন্নাথের রথযাত্রা এবং উল্টোরথ হিন্দু-বাঙালিদের কোনও কাজ বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সূচনার পবিত্র দিন হিসেবে গণ্য করা হয়| বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব দূর্গাপূজোর সূচনাও হয় এই রথ কিংবা উল্টোরথের দিন|করোনা থাকার ফলে এবছর পুরী সহ সর্বত্র রথ যাত্রা অনুষ্ঠিত হবে কিছু বিধি নিষেধ বজায় রেখে তবে ধর্মীয় আবেগ ও নিষ্ঠার কোনো অভাব নেই প্রভুর অগনিত ভক্ত ও অনুরাগীদের মধ্যে|রথ যাত্রা থেকে উল্টোরথ অবধি চলতে থাকবে প্রভু জগন্নাথ ও তার লীলা প্রসঙ্গ নিয়ে ধারাবাহিক লেখা |পড়তে থাকুন|আপনাদের সবাইকে রথ যাত্রার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – মহা প্রসাদ কি জানুন
যারা পুরীতে গেছেন তারা হয়তো দেখেছেন জগন্নাথ দেবের মন্দিরের পাশে বিমলাদেবীর মন্দির আছে। সেখানে জগন্নাথের প্রসাদ প্রথমে দেবী পার্বতীকে অর্পন করা হয়। পরে সেই মহাপ্রসাদ সবাইকে বিতরন করা হয়।আজ জানাবো কি ভাবে সৃষ্টি হলো এই মহা প্রসাদ ও কেনো তা আগে বিমলাদেবীর মন্দিরে নিবেদন করা হয়|নারদ মুনির একবার বাসনা হলো যে তিনি ভগবান নারায়নের প্রসাদ পেতে চান যার উপর অধিকার আছে শুধু মা লক্ষীর নারদ মুনি লক্ষীদেবী কে প্রসন্ন করার হেতু তপস্যা শুরু করলেন এবং ১২ বছর তপস্যার পর দেবী লক্ষী প্রসন্ন হলেন এবং নারদ মহা প্রসাদের ভাগ চাইলে লক্ষীদেবী বললেন ঠিক আছে তুমি এখানে অপেক্ষা কর, নারায়নের ভোজনশেষে তার অবশেষ প্রসাদ তুমি পাবে। অবশেষে যখন নারদ মুনি সেই প্রসাদ পেলেন এবং তা গ্রহন করে তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন|শিব তখন নারদ মুনিকে তার আনন্দের হেতু জানতে চাইলেন।নারদ মুনি তখন সবিস্তারে সব বর্ননা করলেন। তা শুনে শিবের ও ইচ্ছা হলো যে সেও নারায়নের প্রসাদ পেতে চান। নারদ মুনি বললেন যে তিনি সব খেয়ে ফেলেছেন কিন্তু নারদ মুনি তার হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলেন যে হাতের একপাশে একবিন্দু প্রসাদ লেগে আছে। শিবজী সেটা জল দিয়ে ধুয়ে গ্রহন করলেন। সেই চিন্ময় প্রসাদের এমনই স্বাদ ছিল যে ওইটুকু খেয়েই শিব আনন্দে তান্ডব নৃত্য শুরু করে দিলেন।সব জানতে পেরে মাতা পার্বতী বললেন তিনিও নারায়নের প্রসাদ পেতে চান। কিন্তু এখনতো আর কোন ভাবে সম্ভব না। পার্বতী দেবী অভিমান করলেন এবং মাতা পার্বতী নারায়নের ধ্যান শুরু করলেন। দেবী পার্বতীর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে নারায়ন তাকে দর্শন দেন এবং বললেন বলো পার্বতী তুমি কি বর চাও। উত্তরে পার্বতী বললেন আমি আপনার মহা প্রসাদ চাই তবে হে ভগবান সন্তানদের রেখে আপনার প্রসাদ শুধু আমি একা পাব তা কখনই হতে পারে না।তাই আপনার মহাপ্রসাদ যাতে জগতের সবাই পায়,সেটাই আমার প্রর্থনা।উত্তরে ভগবান বললেন- কলিকালে আমি যখন জগন্নাথদেব রুপে লীলা করব তখন আমি আকাতরে আমি আমার মহাপ্রসাদ বিতরন করব। সেই প্রসাদ প্রথমে তোমাকে দেয়া হবে,পরে তা জগতের সবাইকে দেয়া হবে।পুরীতে পার্বতী দেবীই বিমলা দেবী রূপে বিরাজ করছেন এবং এই কারনেই চলে আসছে এই রীতি|আরো অনেক শাস্ত্রের কথা ও পৌরাণিক তথ্য নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|