Home Blog Page 128

সাধক কথা – স্বামী প্রনবানন্দ সরস্বতী

আজ সাধক কথায় আলোচনা করবো দেশের অন্যতম বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধ যোগী পুরুষ স্বামী প্রনবানন্দ সরস্বতী কে নিয়ে|জানবো তার জীবন কাহিনী ও আধ্যাত্মিক কর্মকান্ড|ইংরেজির ১৮৯৬ সালে ২৯ জানুয়ারি একে মাঘী পূর্ণিমার দিন তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মাদারীপুরে অত্যান্ত সাধারন এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বালক প্রনবানন্দ|পিতার নাম বিষ্ণুচরন ভূইঞা ও মাতা ও মাতা সারদা দেবী|কথিত আছে স্বয়ং বাবা মহাদেবের বরপুত্র ছিলেন প্রনবানন্দ|বাল্যকালে তার নাম ছিলো বিনোদ|ছোটো বেলা থেকেই ঈশ্বর চিন্তা ও আধ্যাত্মিকতায় গভীর আকর্ষণ ছিলো তার|মাত্র সতেরো বছর বয়সে স্বামী গম্ভীরনাথ এর কাছে দীক্ষা নেন তিনি|মাত্র ২০ বৎসর বয়সে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন এবং ১৯২৪ সালে প্রয়াগে অর্দ্ধকুম্ভমেলায় স্বামী গোবিন্দানন্দ গিরির নিকট আনুষ্ঠানিক সন্ন্যাস গ্রহণ করেন ও হয়ে যানস্বামী প্রনবানন্দ|নানা দিক থেকে বর্ণময় ও তাৎপর্যপুর্ন ছিলো স্বামী প্রনবানন্দর আধ্যাত্মিক জীবন|একাধারে তিনি ছিলেন সন্যাসী, সমাজ সংস্কারক এবং স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী এক বীর সন্ন্যাসী|একজন বিপ্লবী দলের সক্রিয় সদস্য হিসেবে 1914 সাল গ্রেপ্তার ও হয়ে ছিলেন স্বামী প্রনবানন্দ|সারা জীবন তিনি একাধিক প্রাচীন তীর্থ ক্ষেত্র সংস্কার করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন|তবে স্বামী প্রনবানন্দর সর্ব শ্রেষ্ঠ অবদান অবশ্যই ভারত সেবাশ্রম তৈরি|তিনি ভারত সেবাশ্রম সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন 1917 সালে|বিশ্ব জুড়ে সমাজ সংস্কার, সেবা মূলক কর্ম সূচি ও সনাতন ধর্মের প্রচারে ভারত সেবাশ্রম আজ এক অতি পরিচিত নাম|সারাটা জীবন ধরে স্বামী প্রনবানন্দ সক্রিয় ছিলেন দেশের হিন্দু সমাজকে ঐক্য বদ্ধ করতে এবং সংকীর্ণ জাতপাতের বেড়া জাল থেকে সনাতন ধর্ম ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে|তিনি সকল রকম ধর্মীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ছিলেন|তিনি ব্যক্তি চরিত্র নির্মাণ, আদর্শ পরিবার গঠন যথাযত শিক্ষা ইত্যাদিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন|তিনি বলেছিলেন – হিন্দুদের মধ্যে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, চণ্ডাল আদির কোন ভেদ নেই|অর্থাৎ সব হিন্দু সমান, সবার সমান অধিকার এবং সবাইকে সমান চোখে দেখতে হবে|সনাতন ঐক্য ও বৈদিক সংস্কৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি হিন্দু মিলন মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন যা নানা রকম জন কল্যাণ মূলক কাজে নিয়োজিত ছিলো|আশ্রমে বড়ো করে দোল পূর্ণিমা পালন হতো প্রতিবার দোলের দিন একবার আকাশে দেখা দিল ঘোর কৃষ্ণবর্ণ মেঘ। ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনায় আশ্রমের সকলেই উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়লেন। এতবড় আয়োজন, এত লোক প্রসাদ পাবেন—ঝড় বৃষ্টি এলে সব যে পণ্ড হয়ে যাবে। প্রণবানন্দজি নির্দেশ দিলেন, সবাইকে তাড়াতাড়ি প্রসাদ দিয়ে দাও। কিন্তু এত লোককে আর কত তাড়াতাড়ি প্রসাদ দেওয়া সম্ভব ? তবু সবাইকে সারি দিয়ে বসিয়ে খিচুড়ি প্রসাদ দেওয়া আরম্ভ হল। যেই না প্রসাদ দেওয়া শুরু হল, অমনি চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। ভরদুপুরেই নেমে এল সন্ধ্যা, শুরু হল আকাশ কাঁপানো মেঘগর্জন। সবাই বুঝলেন, আর শেষরক্ষা করা সম্ভব হবে না—যাবতীয় আয়োজন এবার পণ্ড হয়ে যাবে। কারণ, বৃষ্টি এলো বলে।পরিস্থিতি যখন আয়ত্তের বাইরে এক ভক্ত ছুটে গেলেন প্রণবানন্দজির কাছে, হাতজোড় করে আচার্যদেবকে বললেন, ‘মহারাজ এবার আপনি রক্ষা করুন। ধ্যানস্থ হয়ে গেলেন তিনি। তারপর আত্মগত স্বরে বললেন, ‘না, বৃষ্টি আসবে না।’তারপরই ঘটল সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা। ঝেঁপে বৃষ্টি এল কিন্তু আশ্রমের পাশ দিয়ে যে খালটা বয়ে গেছে বৃষ্টি সেই খালের ওপারে এসে থমকে গেল। এপারে আর এল না। ওপার দিয়ে বৃষ্টিটা চলে গেল। অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন স্বামী প্রণবানন্দ|স্বামী প্রণবানন্দর জীবন এক আদর্শ স্বরূপ|নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে তিনি উৎসর্গ করে ছিলেন দেশ সেবায় ও সনাতন ধর্ম রক্ষার কাজে|আজও তিনি ঘরে ঘরে পূজিত হন এক আদর্শ গুরু ও এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক হিসেবে|১৯৪১ সালে ৮ জানুয়ারি মাত্র ৪৫ বৎসর বয়সে তিনি দেহ ত্যাগ করেন|কিন্ত তিনি অমরত্ব লাভ করেছেন তার ত্যাগ, জন সেবা ও আদর্শের মাধ্যমে|.মহান এই গুরু ও সাধক কে প্রনাম জানিয়ে আজকের পর্ব এখানেই শেষ করছি|চলতে থাকবে সাধক কথা পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

সাধক কথা – মা আনন্দময়ী

সাধক কথার আজকের পর্বে পরম শ্রদ্ধেয়, পরম পূজনীয়া আনন্দময়ী মা কে নিয়ে বলবো ইংরেজির ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার খেওড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন| আন্দময়ীর প্রকৃত নাম ছিলো নির্মলা সুন্দরী তাঁর মধ্যে ঈশ্বরচেতনার বিকাশ হয় শৈশব থেকেই।তখন থেকেই হরিনামকীর্তন শুনে তিনি আত্মহারা হয়ে যেতেন| ইংরেজির ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে বিক্রমপুরের রমণীমোহন চক্রবর্তীর সঙ্গে তার বিবাহ হয়। ১৯২৬ সালে যখন সিদ্ধেশ্বরীতে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা হয় ধর্মকর্মে আত্মনিয়োগ করেন আনন্দ নির্মলাদেবী |এই মন্দিরেই একদিন দিব্যভাবে মাতোয়ারা নির্মলা আনন্দময়ী মূর্তিতে প্রকাশিত হন এবং তখন থেকেই তার নাম হয় আনন্দময়ী মা। স্বামীও পরবর্তীকালে সন্ন্যাস গ্রহণ করে ভোলানাথ নামে পরিচিত হন|১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে আনন্দময়ী স্বামীর সঙ্গে উত্তর ভারতের দেরাদুনে চলে যান এবং সেখানে তার লীলাক্ষেত্র ক্রমশ সম্প্রসারিত হয়|পরবর্তীতে সারা দেশ ভ্রমণ করেন আনন্দময়ী মা, অসংখ্য মানুষ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহন করেন|তৈরি হয় একাধিক আশ্রম| আনন্দময়ী মা বলতেন, ”খণ্ড আনন্দে প্রাণ তৃপ্ত হইতেছে না, তাই মানুষ অখণ্ড আনন্দ পাইবার জন্য অখণ্ডের সন্ধান করিতেছে।’ এই আনন্দের জন্যই তাঁর জীবন কেটেছে সাধনায়। কৈশোরে এবং পরবর্তীকালে বিবাহিত জীবনেও তিনি ভাবজগতে বেশিরভাগ সময় ডুবে থাকতেন| শোনা যায় আনন্দময়ী মা-কে তাঁর ভক্তরা কখনও ছিন্নমস্তার মূর্তিতে, কখনও ভুবনেশ্বরী মূর্তিতে আবার কখনও বা সরস্বতী রূপে দেখতেন| তার এক ভক্তের গৃহে একদিন কীর্তনের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। মা আনন্দময়ীর স্বর্গীয় কণ্ঠের কীর্তন শুনতে নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তীদেবী ও কন্যা অপর্ণাদেবী। কীর্তনের আসরে আনন্দময়ী মা বসে আছেন। পরনে তাঁর চওড়া লালপাড়ের শাড়ি। কপালে সিঁদুরের বড় ফোঁটা। এক দিব্য-ভাব তাঁর সর্বাঙ্গে, এক স্বর্গীয় সুষমা তাঁর মুখমণ্ডলে। সকলের অলক্ষে বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে বাসন্তীদেবী স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মা আনন্দময়ীর দিকে। অপলক নয়নে তাকিয়ে আছেন—কিছুতেই দৃষ্টি ফেরাতে পারছেন না। চিত্রার্পিতের মত বসে আছেন তিনি—যেন বাহ্যিক জ্ঞানও তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। একসময় অনেকেরই চোখ পড়ল বাসন্তীদেবীর উপর। সকলেই বাসন্তীদেবীর ওই ভাব বিহ্বল মূর্তি দেখে অবাক। কী এমন হল—কেনই বা তিনি মা আনন্দময়ীর দিকে ওভাবে অপলক নয়নে তাকিয়ে আছেন? তাঁর ঘনিষ্ঠ একজন মহিলা এগিয়ে গিয়ে বাসন্তীদেবীর সম্বিৎ ফেরালেন—কী এমন হয়েছে প্রশ্ন করায় বাসন্তীদেবী ধীর অথচ শান্ত কণ্ঠে বললেন—অনেক দিন আগেকার কথা—আমার ঠিক মনে নেই। তবে এই মূর্তিকেই যেন আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। স্বপ্নে দেখেছিলাম, তিনি আমাকে বলছেন—‘তুমি সাবধান হও। তোমার ভয়ানক বিপদ আসছে।’ এই স্বপ্ন দর্শনের কয়েকদিন পরই চিত্তরঞ্জন দাশ দেহত্যাগ করেন।  বহু এমন অলৌকিক ঘটনা শোনা যায় মা আনন্দময়ীর জীবনকে কেন্দ্র করে| ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন আনন্দময়ী মায়ের অন্যতম প্রধান শিষ্যা। সুভাষচন্দ্র বসু, কমলা নেহরু, পরমহংস যোগানন্দ ও মাধব পাগলার মতো ব্যাক্তিত্বরা মা আনন্দময়ীর শিষ্যত্ব গ্রহন করেছিলেন| 1982 সালে মহাসমাধিতে লীন হয়ে যান ভারতের এই মহান সাধিকা ও আধ্যাত্মিক গুরু|তাঁর দেহত্যাগের পর শিষ্যা ইন্দিরাগান্ধী শোক জানিয়ে বলেছিলেন ”আমার জীবনে মা আনন্দময়ীর আশীর্বাদ ছিল প্রধান শক্তি ও ভরসা। আজ আমার মর্মবেদনা জানাবার ভাষা নেই।” মহান সাধক ও গুরুরা স্থূল দেহ ত্যাগ করলেও তাদের আধ্যাত্বিক কর্মকান্ড তাদের দেয়া আধ্যাত্বিক শিক্ষা ও জ্ঞান তাঁদের অমরত্ব প্রদান করে|আনন্দময়ী মাও তাঁর অসংখ্য ভক্ত শিষ্য দের মনে সদা বিরাজমান| মহান এই গুরু ও সাধিকা কে প্রনাম জানিয়ে শেষ করছি আজকের পর্ব|আগামী পর্বে আবার দেখা হবে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

সাধক কথা – ঋষি অরবিন্দ

আজ সাধক কথায় এমন এক আধ্যাত্মিক গুরুর কথা বলবো যিনি এক কালে ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবের সৈনিক আবার পরবর্তীতে যোগ গুরু হিসাবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে আরোহন করেছিলেন|তিনি ঋষি অরবিন্দ|

আলিপুর বোমামামলা বদলে দিয়েছিল বিপ্লবী অরবিন্দের জীবন।অরবিন্দের হয়ে মামলা লড়েছিলেন উদীয়মান ব্যারিস্টার চিত্তরঞ্জন দাশ।
অলিপুর বোমা মামলার আসামী হিসেবে অরবিন্দকে জেলে কাটাতে হয় প্রায় একবছর।আর জেলে থাকাকালীনই তার মধ্যে এক দিব্য চেতনার সঞ্চার হয়।তাঁর কথায় তিনি ‘কৃষ্ণকে দর্শন করেছেন। যে উপলব্দধির কথা তিনি উল্লেখ করেন-‘কারা কাহিনী ‘ বই এ।

পরবর্তীতে চিত্তরঞ্জন অরবিন্দকে পণ্ডিচেরী থেকে ফিরিয়ে আনতে গেলে অরবিন্দ মৃদু হেসে চিত্তরঞ্জনকে বলেছিলেন, “আমি আর বিপ্লবী অরবিন্দ নই, আমি এখন যোগী অরবিন্দ।আমার পক্ষে ফেরা সম্ভব নয়।”

চিত্তরঞ্জন তখন বললেন, ” তা বেশ। আপনি যখন রাজনীতিতে ফিরবেন না তখন রাজনৈতিক দীক্ষা আর দিতে হবে না আমায়। আপনি বরং আমায় যোগ দীক্ষা দিন।” একথা শুনে অরবিন্দ চিত্তরঞ্জনকে বললেন-” আপনি বাংলার বিপ্লবী আন্দোলের একজন প্রবীন এবং শেষ প্রতিনিধি। আপনি রাজনীতি ছাড়বেন না। আপনি অনেকের অনুপ্রেরণা। আর রাজনীতির সংসর্গ ত্যাগ না করলে আপনার পক্ষে যোগের পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া আপনার স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়েছে।” অরবিন্দু তখন অন্য মানুষ বিপ্লবের কথা বলছেন না বলছেন। বলছেন আধ্যাতিক কথা। আত্মিক উন্নতির কথা।

প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে সরলেও দেশের জন্য কলম ধরেছিলেন ‘কর্মযোগীন’ আর ‘ধর্ম’ পত্রিকার হয়ে। কিন্তু শুনলেন তার নামে ইংরেজরা ওয়ারেন্ট বের করছে। সব শুনে তার কি মনে হল একখানা নৌকো নিয়ে সোজা চলে গেলেন চন্দননগর। আশ্রয় নিলেন বিপ্লবী মতিলাল রায়ের বাড়িতে। তারপরই নিলেন এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। পন্ডিচেরী যাওয়ার। অরবিন্দ পন্ডিচেরীতে কাটিয়েছিলেন জীবনের চল্লিশ বছর। অরবিন্দ পণ্ডিচেরীতে প্রায় সারাদিন যোগাভ্যাস করতেন। ধীরেধীরে গড়ে ওঠে শ্রী অরবিন্দ আশ্রম|

বরোদায় অরবিন্দ ছিলেন অনেকটা সময়।।আর সেখানে থাকাকালে এক ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু দেবধরের কাছ থেকে প্রাণায়াম শেখেন তিনি। যদিও সে সময় অরবিন্দের যোগের প্রতি তীব্র বিরোধিতা ছিল। অরবিন্দের ধারনা বদলায়, যখন বারীনের কঠিন হিল ফিভারকে এক নাগা সাধু মুহূর্তের মধ্যে কেবল মন্ত্রপুত জল খাইয়েই ঠিক করে দিয়েছিল তা দেখে। যোগের প্রতি আকর্ষন তাকে নিয়ে যায় সেসময়ের বিখ্যাত মহারাষ্ট্রীয়ান যোগী বিষ্ণু ভাস্কর লেলের কাছে। তাঁর কাছেই যোগে হাতেখড়ি অরবিন্দের।

তার অসংখ্য ভক্ত ও শিষ্য দের কাছে ঋষি অরবিন্দর আশ্রম এক তীর্থ স্থান,অরবিন্দের পণ্ডিচেরী আশ্রমে এসেছিলেন অনেক বিখ্যাত মানুষজন,যার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীপুত্র দেবদাস, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র দিলীপ রায়, ঠাকুরবাড়ির সরলাদেবী ও আরও অনেকের নাম রয়েছে।আমি নিজেও ব্যাক্তিগত ভাবে ঋষি অরবিন্দুর আশ্রম দর্শন করে অভিভূত হয়েছি|

অরবিন্দর বয়স তখন প্রায় আটাত্তর। শরীর অসুস্থ। ওষুধ তিনি খাবেন না। কারন, দীর্ঘ চল্লিশ বছরের জীবনে একবারের জন্যেও ওষুধের প্রয়োজন হয় নি তাঁর। শ্রীরামকৃষ্ণকে যেভাবে নিজের ক্যান্সার সারিয়ে নেওয়ার জন্য ভক্তরা বলেছিলেন ঠিক একইভাবে অরবিন্দকে তাঁর ভক্তরা বললেন- “যোগশক্তি প্রয়োগ করছেন না কেন? ” অরবিন্দ মৃদু হেসে বললেন -“বোঝাতে পারব না, তোমরা বুঝবে না।” সেই রহস্য রহস্যই থেকে যায় ১৯৫০ এর ৫ ডিসেম্বর মধ্যরাতে হঠাৎ করে চলে গেলেন যোগী অরবিন্দ। পাঁঁচ দিন পর তার দেহ সমাধিস্থ করা হয় পণ্ডিচেরী আশ্রমের এক গাছতলায়।যে গাছের ফুল আজও ঝরে পড়ে তার সমাধির ওপর।

মহান এই গুরু ও সাধক কে আমার শ্রদ্ধা ও প্রনাম জানিয়ে শেষ করছি আজকের গুরু কথা|চলতে থাকবে এই ধরবাহিক আলোচনা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

গুরুকথা – শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র

গুরু কথার আজকের পর্বে আমি আমার গুরুর কথা বলবো|তিনি পরম পূজনীয় শ্রী শ্রী অনুকূল ঠাকুর|তার কথা যতই বলা হোক কথা শেষ হয় না এমনই অদ্ভুত তার অলৌকিক জীবন ও আধ্যাত্মিক সাধনা|জন্ম সূত্রে আমার পরিবার ওপার বাংলার অর্থাৎ অধুনা বাংলাদেশ|পারিবারিক সূত্রেও আমরা অনুকূল ঠাকুরের আশীর্বাদধন্য কারন আমার নিজের বড়োমামা ছিলেন স্বয়ং ঠাকুরের ছায়া সঙ্গী ও তার একজন একনিষ্ট ভক্ত|সেই সূত্রে ছোটো থেকেই ঠাকুরের মহিমাশুনে বড়ো হওয়া| তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির উপর আস্থা ও শ্রদ্ধা সেই সময় থেকেই পরবর্তীতে জীবনের এক কঠিন সময়ে অনুকূল ঠাকুরের অনুগত হয়ে দীক্ষিত হই|আশ্চর্য ভাবে দীক্ষা গ্রহনের পর থেকেই জীবনে ভালো সময় আসতে শুরু করলো|অন্ধকার কাটিয়ে আলোয় ফিরলাম, সকল দিক দিয়েই সফল হলাম জীবনে|একে ঠাকুরের মহিমা ছাড়া আর কিবা বলি|আজও ঠাকুরের প্রতিকৃতি বিরাজমান আমার গৃহ মন্দিরের সিংহাসনে|আজও প্রতিটা দিন তাঁর কাছে প্রার্থনা করে আমার দিন শুরু হয়|অনুকূলচন্দ্র চক্রবর্তী ১৮৮৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পাবনা জেলার হিমায়তপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন|তাঁর পিতার নাম শিবচন্দ্র চক্রবর্তী এবং মাতার নাম ছিলো মনমোহিনী দেবী|হিমায়তপুর গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয় পরে নৈহাটী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে স্কুল জীবনের পড়া শেষ করে তিনি কলকাতা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন|অনুকূল চন্দ্রের পরিবার ছিলো উত্তর ভারতের যোগীপুরুষ শ্রী শ্রী হুজুর মহারাজের শিষ্য তবে ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র মায়ের কাছেই অনুষ্ঠানাকি ভাবে দীক্ষা গ্রহন করেন|কঠোর পরিশ্রম ও দক্ষতার সঙ্গে তিনি জীবনে এগিয়ে চলেন, অনুকূলচন্দ্র ছিলেন একাধারে কবি, লেখক, ডাক্তার ও সর্বোপরি এক আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় গুরু|তিনি ছিলেন হিন্দু সমাজের একজন মহাপুরুষ, বিশ্ব মানবতাবাদী এবং পরম কৃষ্ণ ভক্ত।সারা জীবন তিনি চেষ্টা করে গেছেন কি ভাবে মানুষ ভাল থাকবে, সুস্থ থাকবে, শান্তিপূর্ণ ভাবে সবাই মিলে মিশে থাকবে|সেজন্য ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র সব সময় চাইতেন, তার অনুসারিরা সব সময় কৃষ্ণ ভক্তির পথে থাকুক|তাঁর এই দর্শন ও আদর্শ সাফল্যের সাথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাঁর পরিবার ও অগণিত ভক্ত শিষ্যরা|লোক শিক্ষার জন্য অনুকূলচন্দ্র ঠাকুর প্রায় ৪৬টি পুস্তক রচনা করেন|এগুলোতে ধর্মশিক্ষা, সমাজ সংস্কার প্রচলন প্রভৃতি বিষয়ে আদর্শ ও উপদেশসমূহ বর্ণিত হয়েছে|এগুলি ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে অত্যান্ত গুরুত্ব পুর্ন গ্রন্থ হিসেবে সর্বত্র সমাদৃত |বই গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য, সত্যানুসরণ, পুণ্যপুথি, অনুশ্রুতি, চলার সাথী, শাশ্বতী, বিবাহ বিধায়না,সমাজ সন্দীপন ইত্যাদি|পাবনা শহরের কাছে হেমায়েতপুর গ্রামে শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন সৎসঙ্গ আশ্রম ও মন্দির যা আজ লক্ষ লক্ষ ভক্ত শিষ্যর কাছে এক মহান তীর্থ ক্ষেত্র|1946 সালে অনুকূল ঠাকুর পাবনা থেকে দেওঘর আসেন ও দেওঘর আশ্রম তৈরি করেন|এই দেওঘরেই 1969 সালে ঠাকুর পরলোক গমন করেন|আজ এই আশ্রম ও ঠাকুরের সংগ্রহশালা দেও ঘরের মুখ্য আকর্ষণ হয়ে উঠেছে|অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা আছে ঠাকুরের জীবনে তার মধ্যে আজ তার শৈশবের একটি অদ্ভুত ঘটনার কথা বলি – বালক অনুকৃলচন্দ্রের বয়স যখন চার তখন আর একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে। প্রতিবেশী মুকুন্দলাল বসুর ভ্রাতুষ্পুত্র হেমেন্দ্র একটি সুন্দর ফুলবাগান করেছিলেন। বাগানটির তিনি চারদিকে শক্ত বেড়া দিয়ে ঘিরে অতি যত্তের সঙ্গে রক্ষা করতেন। কিন্তু এক বালক প্রায়ই বাগানের মধ্যে ঢুকে ফুল গাছগুলিকে উপড়ে ফেলতেন। এজন্য হেমেন্দ্র মনোদুঃখে কান্নাকাটি করতেন। বালক অনুকূল একদিন হেমেন্দ্রকে বললেন, তোমার বাগানের গাছগুলি আমি নষ্ট করি। যতবারই তুমি বাগান করবে, ততবারই আমি তা তছনছ করবো, কারন জিগেস করায় তিনি বলেন তোমার এখানে দুদিনের বাগান করে কি হবে? তুমি তো আর এখানে থাকবে না, তোমার যাওয়ার সময় হয়েছে। এই বলে বালক আকাশের দিকে মুখ তুলে আঙুল দেখিয়ে বললেন, তোমার জন্য ওখানে এক সুন্দর বাগান করা আছে। সে বাগান এ বাগানের চেয়ে অনেক ভাল।বালক অনুকূলের ভবিষ্যৎ বাণী কিছুদিনের মধ্যেই ফলে গেল। কিছুকালের মধ্যে হেমেন্দ্র পরলোক গমন করেন|আমার পরম পূজনীয় গুরুকে প্রনাম ও শ্রদ্ধা জানিয়ে আজকের গুরু কথা শেষ করলাম|অদ্ভুত ও অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন ভারতের সাধক দের নিয়ে লেখা লেখি আগামী দিনেও চলবে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

গুরু কথা – শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর

গুরু কথার আজকের পর্বে যে গুরুর কথা বলবো তিনি শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর যার সন্যাস জীবনের পূর্বের নাম ছিলো রাম চন্দ্র চক্রবর্তী|১৮৬০সালে বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলয় শ্রীঁরাধামাধব চক্রবর্তী ও শ্রীমতি কমলাদেবীর সন্তান হিসাবে শ্রীশ্রী রামঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন|রাম ঠাকুরের আরেক যমজ ভাই ছিলো তার নাম ছিলো লক্ষণ|তাদের পারিবারিক গুরু ছিলেন শ্রীঁমৃত্যুঞ্জয় ন্যায়পঞ্চানন|বালক রামচন্দ্র শৈশব থেকেই আধ্যাত্মিক চেতনার অধিকারী ছিলেন|শাস্ত্রে তার খুব আগ্রহ ছিলো মাঝে মাঝেই ঈশ্বর চিন্তা করে তিনি ভাব তন্ময় হয়ে যেতেন |ঈশ্বরে কে কেন্দ্র করে নানা আধ্যাত্মিক প্রশ্ন তার মনে ঘুরপাক খেতো এই ঈশ্বরের খোঁজেই ১৮৭২ সালে সকলের অজ্ঞাতে অজানাকে জানার লক্ষ্যে গৃহত্যাগী হন|পরে পৌঁছান পৌঁছালেন আসামের শ্রীশ্রী কামাক্ষ্যাদেবীর মন্দিরে এবং এক অক্ষয় তৃতীয়ার দিন শ্রীশ্রী রামঠাকুর দেখেন জটাধারী, দীর্ঘাঙ্গী এক জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ সামনে দাঁড়িয়ে|গুরু হিসাবে তিনি সেই দিব্য পুরুষ কে গ্রহন করলেন শুরু হলো তার সাধনা ও আধ্যাত্মিক যাত্রা|কঠিন সাধনায় একসময় তিনি হয়ে উঠলেন অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন রাম ঠাকুর ও অষ্টসিদ্ধি লাভ করলেন তিনি |এরপর গুরুর এদেশে গৃহে ফিরে মাতৃ সেবা কর্ম জীবনে কিছুকাল নিজেকে নিয়োজিত করলেন|এসবের মধ্যে থেকেও তার আধ্যাত্মিক শক্তি ও জ্ঞান গোপন রইলো না বেশি দিন|পরবর্তীতে নিজেকে পুরাপুরি সপেঁ দেন জগৎ কল্যানে ও মানব সেবায়|তার কাছে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শুচি, অশুচির কোনও ভেদ ছিল না|জীবনের দীর্ঘ সময় কঠিন যোগ সাধনায় মগ্ন থেকেও ভক্ত দের তিনি নিঃস্বার্থ ভাবে জীব সেবা করতে শিখিয়ে গেছেন|তার জীবন ও দর্শন তার অগণিত ভক্ত ও শিষ্য দের কাছে এক আদর্শ স্বরূপ|শ্রী শ্রী রামঠাকুর রামঠাকুর অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, তিনি একই সাথে দুই স্থানে থাকতে পারতেন, মানুষের মনের কথা পড়তে পারতেন, অদৃশ্য হতে পারতেন|তার এক শিষ্য একবার শ্রীশ্রী রামঠাকুরকে প্রশ্নকরেছিলেন,আচ্ছা মানুষ কি নিজ শরীর এবং পরিহিত বস্ত্রাদি সহ শূন্যে এক স্থান থেকে আর এক স্থানে চলে যেতে পারেন ? তো রামঠাকুর উত্তর দিয়েছিলেন, “হ্যাঁ যে যে স্থান দিয়ে বিদ্যুৎ যেতে পারে, মানুষ ঐ সব স্থান দিয়ে যেতে পারে, এবং একই সময় বহু স্থানে উপস্থিত থাকে পারে।”শ্রীশ্রী রামঠাকুরের নির্দেশে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ১৯৩০ সালে কৈবল্যধাম আশ্রম এবং ১৯৪২ সালে কলকাতার যাদবপুরে কৈবল্যধাম আশ্রম তৈরি হয় যেগুলি তার ভক্ত ও শিষ্য দের কাছে আজ তীৰ্থ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে|এছাড়াও ১৯৪৩ সালে তার জন্মভিটা ডিঙ্গামানিক গ্রামে সত্যনারায়ণ সেবা মন্দির তৈরি হয় যা তার আদর্শ কে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে চলছে|মহা মানব ও মহান গুরু শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের চরনে আমার শত প্রনাম জানিয়ে শেষ করছি আজকের গুরু কথা|দেখা হবে আগামী পর্বে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

গুরু কথা – মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য

গুরুপূর্ণিমা উপলক্ষে ধারাবাহিক ভাবে শুরু করেছিলাম গুরু কথা যা আপাতত চলবে সারা সপ্তাহ ধরে|ভারতের মহান সাধক ও আধ্যাত্মিক গুরু দের কথা বলা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি বাংলার নবজাগরনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ও মহান সাধক শ্রী চৈতন্যদেবের কথা না বলা হয় কারন তিনি ছিলেন প্রকৃত গুরু যিনি গোটা বিশ্ব কে বৈষ্ণব আদর্শ শিখিয়েছিলেন, শিখিয়েছেন হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপের মাহাত্ম্য|প্রথমে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ ও পরবর্তীতে ইস্কন সেই শিক্ষা ও আদৰ্শকে এগিয়ে নিয়ে গেছে|ইংরেজির 1486 সালের এক দোল পূর্ণিমায় বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার তৎকালীন পীঠস্থান নবদ্বীপে জন্মে ছিলেন গৌরাঙ্গ যিনি কৃষ্ণ সাধনায় নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে বিলিয়ে দিয়ে হয়ে উঠলেন মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য|নিম গাছের ছায়ায় তিনি জন্মে ছিলেন তাই নাম রাখা হয়ে ছিলো নিমাই|শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবন নিয়ে হয়েছে নানা গবেষণা ।মহাপ্রভুর জীবনের কিছু অলৌকিক ঘটনা|সচি মাতার গর্ভে তার জন্ম, অকালে পিতৃ বিয়োগ,টোলে শিক্ষা দান, লক্ষী প্রিয়া এবং বিষ্ণু প্রিয়ার সাথে তার বিবাহ, পরবর্তীতে গয়ায় যাত্রা, সন্ন্যাস ও পুরী ভ্রমণ সারা বাংলায় কৃষ্ণ প্রেমের প্রচার এবং শেষে রহস্যময় অন্তর্ধান, এসবই হয়তো আপনারা জানেন, আগেও কোথাও শুনেছেন বহুবার|আজ মহাপ্রভুর জীবনের কিছু বিশেষ বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা আজ উল্লেখ করবো |বহু দূর দূর থেকে চৈতন্য দেবের ভক্তরা আসতেন তার সাথে দেখা করতে, এমনই একবার চৈতন্য দেবের সাথে সাক্ষাত করার জন্য সুদূর বৃন্দাবন থেকে নবদ্বীপ ধামে এসেছেন সনাতন নামে এক ব্যাক্তি।সারা দেহে খোস পাঁচড়া নিয়ে রোগ যন্ত্রণায় কাতর হয়ে তিনি মনে মনে স্থির করেছেন চৈতন্য দেবের সাথে দেখা করে আগামী রথযাত্রায় রথের চাকার তলায় আত্মহত্যা করবেন।একদিন চৈতন্যদেবের সাথে সনাতন গল্প করছিলেন। হটাৎ চৈতন্য দেব, সনাতনকে বললেন – সনাতন,আত্মহত্যার সংকল্প ত্যাগ কর। আত্মহত্যা মহাপাপ। এতে কখনো কৃষ্ণ প্রাপ্তি হয়না।অবাক হয়ে গেলেন সনাতন। আত্মহত্যা করার কথা কাউকে জানাননি। তাহলে কী করে চৈতন্য দেব এই কথা জানলেন। এই ভাবেই অপরের মনের কথা জানতে পারতেন চৈতন্য মহাপ্রভু|আরো আশ্চর্য জনক ঘটনা হলো এর কিছুদিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেন সনাতন|এর জন্য কোনো চিকিংসা করতে হয়নি।এবং আত্মহত্যার ভূত মাথা থেকে একদম মুছে যায়|আরেকটি ঘটনার কথা বলা যায়,একবার মহপপ্রভু শ্রীনিবাস ঠাকুরেরর বাড়িতে এক অপূর্ব অলৌকিক লীলা প্রদর্শন করেন। তখন প্রবলভাবে সংকীর্তন হচ্ছিল। তিনি ভক্তদের জিজ্ঞাসা করলেন যে, তাঁরা কি খেতে চান, এবং তাঁরা জানালেন যে, তাঁরা আম খেতে চান, তখন তিনি আমের আটি চাইলেন। তখন আমের সময় ছিল না, আঁটিটি যখন তাঁর কাছে আনা হল, তখন তিনি সেটি শ্রীনিবাস ঠাকুরের অঙ্গনে পুঁতলেন এবং তৎক্ষণাৎ সেই আঁটিটি অঙ্কুরিত হয়ে ক্রমন্বয়ে বর্ধিত হতে লাগল। অচিরেই সেটি একটি আম গাছে পরিণত হল এবং সেই গাছে এত সুপক্ব আম ধরল যে, ভক্তরা তা খেয়ে শেষ করতে পারলেন না। গাছটি শ্রীনিবাস ঠাকুরের অঙ্গনেই রইল এবং ভক্তরা সেটি থেকে তাঁদের যত ইচ্ছে আম নিয়ে খেল। ভক্তরা মহাপ্রভুর এই অপ্রাকৃত লীলা দেখে মুগ্ধ হলো|সেই অদ্ভুত আমাগাছ গাছ আজও শ্রীনিবাস গৃহের উঠোনে বর্তমান|আরো একটি ঘটনা বিশেষ ভাবে স্মরণীয়|নিত্যানন্দ একবার জগাই ও মাধাই নামক নদীয়ার দুই পাপিষ্ঠ ব্রাহ্মণকুমারকে উদ্ধার করতে চাইলেন। সে লক্ষ্যে তিনি অনেক ভক্তদের সাথে নিয়ে নাম-কীর্তন করতে করতে জগাই-মাধাইয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। জগাই-মাধাই সূরা পান করে ঘুমাচ্ছিলেন। নাম-কীর্তন শুনে তাদের ঘুম ভাঙায় তারা খুব বিরক্ত হলেন। নিত্যানন্দ বারংবার তাদেরতে হরিনাম করার অনুরোধ করলেন। মাধাই তখন ক্রোধান্বিত হয়ে নিকটস্থ একটি ভাঙ্গা কলসির টুকরা দ্বারা নিত্যানন্দকে আঘাত করল। ফলে নিত্যানন্দের কপাল কেটে রক্ত ঝরতে লাগল। চৈতন্যদেব খবর পেয়ে ঐ স্থানে ছুটে আসলেন। তিনি জগাই-মাধাই শাস্তি দেয়ার জন্য সুদর্শন চক্রকে স্মরণ করলেন। কিন্তু নিত্যানন্দ তাঁকে নিরস্ত করলেন।নিত্যানন্দের উদারতা ও মহত্ব দেখে জগাই-মাধাইয়ের বোধোদয় হয়। অবশেষে গৌর-নিতাইয়ের পরশে জগাই-মাধাই শুদ্ধ বৈষ্ণবভক্তে পরিণত হয়|মহা প্রভুর মাত্র আটচল্লিশ বছরের জীবন কালে এমন অনেক অলৌকিক ঘটনা আছে বলতে গেলে একটি পর্বে সম্ভব নয়|তিনি ছিলেন প্রকৃত গুরু যিনি সমগ্র বৈষ্ণব সমাজ কে একত্রিত করে তাদের পথ দেখিয়েছেন|আজ এই মহান গুরু মহাপ্রভুকে আমার শ্রদ্ধা ও প্রনাম জানিয়ে গুরু কথা থেকে বিদায় নেবো|চলতে থাকবে গুরু কথা পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

গুরু কথা – শ্রী শ্রী সীতারামদাস ওঙ্কারনাথ 

ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হচ্ছে এই গুরু শিষ্য পরম্পরা|আর এই পরম্পরা বা ঐতিহ্য কে উদযাপন করার দিন হচ্ছে গুরু পূর্ণিমা|আজ 13 জুলাই এবছর গুরু পূর্ণিমা পালন হচ্ছে |আর এই বিশেষ সময়ে আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরছি আমাদের হাজার হাজার বছরের এই গুরু শিষ্য ঐতিহ্যর নানা দিক, ব্যাখ্যা করছি গুরুতত্ব কে নিজের মতো করে আর লিখছি জগৎ বিখ্যাত কিছু গুরুর কথা|আমাদের দেশের এমনই এক পরম শ্রদ্ধেয় ও মহাজ্ঞানী গুরু ছিলেন ঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কার নাথ দেব|আজ এই মহান গুরুর জীবন নিয়ে কিছু কথা বলবো|ইংরেজিরা 1891 সালে হুগলীর ডুমুর দহে প্রান হরি চট্টোপাধ্যায় ও মালতি দেবীর গৃহে জন্মায় এক শিশু নাম রাখা হয় প্রবোধ চন্দ্র|শৈশব থেকেই কিছুটা ভাবুক প্রকৃতির ছিলেন প্রবোধ চন্দ্র, ঈশ্বর চিন্তায় মগ্ন থাকতেন |পরবর্তীতে শিক্ষাগুরু ও সাধক দাশরথি মুখোপাধ্যায়ের কাছে দীক্ষা নিলেন|শিক্ষাগুরু হলেন দীক্ষাগুরু। প্রবোধচন্দ্রের নাম হলো ‘সীতারাম’|গঙ্গা যমুনা সঙ্গম এ রাম নাম মন্ত্রে তার দীক্ষা হয়েছিলো|আত্মীয় স্বজন রা তাকে গৃহী দেখতে চেয়েছিলো তাই ঠাকুরচরণ ভট্টাচার্য্যের কন্যা সিদ্ধেশ্বরী দেবীর সঙ্গে তার বিবাহ দিলেন|কিন্তু ক্রমে আধ্যাত্মিক ভক্তির সমুদ্রে ডুবে যেতে থাকেন সীতারাম দাস ওঙ্কার নাথ এবং দুই সন্তান এর জন্মের পর ঘর ছেড়ে সন্যাসী হয়ে বেড়িয়ে পড়লেন তিনি|সর্বত্র রাম নাম প্রচার করতেন তিনি|ক্রমেই এক দিব্য ও অলৌকিক শক্তি উৎপন্ন হয় তার মধ্যে|সারা ভারত পরিক্রমা করে ১৯৩৬ সালের পৌষ মাসে সীতারাম ফিরে এলেন তাঁর দীক্ষালাভের স্থান ত্রিবেণীতে এবং স্থাপন করলেন একটি মঙ্গলঘট|এরপর বস্ত্র ত্যাগ করে কৌপিন পরিহিত সন্ন্যাসী রূপে পদার্পন করেন নিজের জন্ম স্থানে|ততো দিনে তিনি এক আধ্যাত্মিক শক্তি সম্পন্ন মহাপুরুষ|রাম নামের প্রচারে সপেঁ দিয়েছেন জীবন|অসংখ্য ভক্ত শিষ্য তার অনুগামী|লিখেছেন ১৫০ টি গ্রন্থ ও প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন ভাষার ১৩ টি পত্রপত্রিকা|প্রথমদিকে নাম প্রচার করলেও সীতারামদাস কাউকে আক্ষরিক অর্থে মন্ত্রদীক্ষা দিতেন না। কিন্তু শোনা যায়, পুরীতে তাঁর জগন্নাথের বিশেষ দর্শন ঘটেছিল। তিনি নাকি সাধারণকে মন্ত্রদীক্ষা দিতে জগন্নাথ কর্তৃক আদিষ্ট হয়েছিলেন|তার পরই তিনি দীক্ষাদান শুরু করেন। এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে তিনি দীক্ষা দেন। তিনি ছিলেন এক প্রকৃত সাধক ও আদর্শ গুরু যিনি তার ভক্ত ও শিষ্য দের আধ্যাত্মিক পথে চলতে শিখিয়েছেন,ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে জীবন উৎসর্গ করতে ও দেশকে ভালো বাসতে শিখিয়েছেন|১৯৮২ সালের ৫ ডিসেম্বর তিনি পরলোক গমন করেন|দেশ ও সারা বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা তার অগণিত ভক্ত শিষ্য আজও তার আদৰ্শ কে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে|গুরু পূর্ণিমার এই বিশেষ সময় এই গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা আমার অন্তরের শ্রদ্ধা রইলো|প্রনাম জানাই এই মহান সাধক কে|আজকের গুরু কথা শেষ করবো শ্রী শ্রী সীতারাম দাস ওঙ্কার নাথ এর চরনে আমার প্রণাম ও শ্রদ্ধা জানিয়ে|আপনাদের সবাইকে গুরুপূর্ণিমারা শুভেচ্ছা জানাই|গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে সারা সপ্তাহ ধরে চলবে গুরু কথা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

গুরু কথা – ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব

গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে দেশের আধ্যাত্মিক গুরুদের নিয়ে যে আলোচনা শুরু করেছি তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি প্রেমের ঠাকুর ও বাংলার আধ্যাত্মিক জগতের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব প্রসঙ্গে না বলি|গুরু পূর্ণিমার ঠিক আগে আজ বলবো এই মহান গুরুর কথা|ইংরেজির ১৮৩৬ সালে একটি সাধারণ বাঙালি গ্রামীণ পরিবারে জন্মগ্রহণকারী রামকৃষ্ণ ছিলেন একজন যোগসাধক, দার্শনিক ও ধর্মগুরু। তিনি উনিশ শতকের এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি বাঙালি নবজাগরণে এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। তার গর্ভে থাকাকালীন তার বাবা-মা তার অলৌকিক উপস্থিতি অনুভব করেছিলেন এবং যেমনটি প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তিনি শৈশবকালেই রহস্যময় ও অলৌকিক শক্তির অভিজ্ঞতা অর্জন শুরু করেছিলেন। শ্রী রামকৃষ্ণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসেছিলেন তার লীলা করতে, পরমহংসদেব যখন জগৎ সমক্ষে উদয় হন, তখন ঘোরতর ধর্মবিপ্লব চলছে চারপাশে, “জড়বাদী মুক্তকণ্ঠে বলছেন – “জড় হইতেই সমস্ত,জড়ের সংযোগেই আত্মা, জড় ব্যতীত আর কিছু নাই “ব্রাহ্ম সমাজ বলছে – “বেদ, বাইবেল, কোরান প্রভৃতি কিছুই মানিবার আবশ্যক নাই, কোনটিই অভ্রান্ত নয়, কোনটিই ঈশ্বর বাক্য নয়”এমন সময় পরমহংসদেব প্রচার করলেন “কোন ধর্ম কোন ধর্মের বিরোধী নয়। বাহ্য দৃষ্টিতেই বিরোধ কিন্তু সকল ধর্মই মূলত এক কথা বলেআরো সহজ করে বললেন ” যত মত ততো পথ “কথিত আছে, ঠাকুর যখন জন্মগ্রহন করেছিলেন, কামারপুকুর বাটিতে তাদের শিব মন্দির চন্দ্রালোতে আলোকিত হয়ে উঠেছিল। রামকৃষ্ণদেবের গড়নে ছিল দৈবিকভাব|সেটাই স্বাভাবিক, তিনি কোনো স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন না, একাধারে সাধক ও দার্শনিক এই মানুষ টাকে হয়তো এখনো বাঙালি ঠিক চিনে উঠতে পারেনি, তার অবতার তত্ত্ব নিয়েও দ্বিমত আছে, তবে, সাধনার যে উচ্চস্তরে তিনি গিয়েছিলেন তা, কল্পনা করা কঠিন|তার দক্ষিনেশ্বর মন্দিরে থাকা কালীন অদ্ভুত এক অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছিলেন ঠাকুর|দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক মথুর বিশ্বাস একবার রামকৃষ্ণের কাছে আব্দার করেন যে, ঠাকুরের যেমন ভাবসমাধি হয়, তেমনই ভাবসমাধির অভিজ্ঞতা লাভ করতে চান তিনিও। ঠাকুর মথুরবাবুকে বিরত করার অনেক চেষ্টা করেন। কিন্তু মথুরবাবু নাছোড়। শেষে ঠাকুর বাধ্য হয়ে বলেন, ”ঠিক আছে, মা-কে বলব, তিনি যা করার করবেন।” এর কয়েকদিন পরেই সমাধিস্থ হন মথু‌রবাবু। তাঁর চোখ থেকে অবিরল ধারায় ঝরতে থাকে জল। সেই অবস্থায় ঠাকুরকে দেখে তাঁর পা জড়িয়ে ধরেন মথুর। গদগদ কন্ঠে বলেন, ”এ কী করলে ঠাকুর! আমার যে বিষয়কর্ম কিছুতেই মন বসে না আর। আমাকে মুক্তি দাও এ থেকে।” ঠাকুর হেসে বললেন, ”আগেই বলেছিলেম, ভাবসমাধি সকলের সয় না।” মথুরবাবু বুঝলেন কি অদ্ভুর ক্ষমতার অধিকারী ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব ১৮৬১ সাল থেকে ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত মহিলা সাধু এবং ভৈরবী ব্রাহ্মণীর কাছ থেকে তন্ত্র পদ্ধতি শিখেছিলেন। রামকৃষ্ণ তন্ত্রের ৬৪ টি সাধনা পূরণ করেছিল|১৮৬৪ সালে তোতাপুরী নামক জনৈক পরিব্রাজক বৈদান্তিক সন্ন্যাসীর কাছ থেকে রামকৃষ্ণ সন্ন্যাস গ্রহণ করেন|পরবর্তীতে বিদায় বেলায় তোতাপুরী আবার তার এই শিষ্যের কাছে দীক্ষা গ্রহন করেন|গুরু শিষ্য পরম্পরার এ এক বিরল ঘটনা|বেশ অল্প সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ১৮৭৯ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নিজের প্রধান শিষ্যদের সঙ্গে রামকৃষ্ণ পরমহংসের সাক্ষাৎ হয়। এঁদের অনেকেই ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত। কেউ আবার ছিলেন একান্তই নাস্তিক|নিছক কৌতূহলের বশেই তাঁরা শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশ এঁদের সকলের মধ্যেই গভীর প্রভাব বিস্তার করে এবং এঁরা সকলেও তাঁর অনুরাগী ভক্তে পরিণত হন। প্রবল যুক্তিবাদী সুরেন্দ্রনাথ মিত্র তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন,তাকে সমালোচনা করার জন্যে|কিন্তু শেষপর্যন্ত তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের একনিষ্ঠ ভক্তে পরিণত হন। তাঁর অননুকরণীয় ধর্মপ্রচারের ভঙ্গি অনেক সংশয়বাদী ব্যক্তির মনেও দৃঢ় প্রত্যয়ের উন্মেষ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল|তাই তিনি সব সমালোচনারা উর্ধে এবং ভারতের শ্রেষ্ট গুরুদের একজন|ঠাকুর রামকৃষ্ণের চরনে প্রণাম জানিয়ে গুরু কথার আজকের পর্ব এখানেই শেষ করছি|চলতে থাকবে গুরু কথা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

গুরু কথা – শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর

আসন্ন গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে শুরু করছি গুরু কথা আজ শুরুতে থাকবে এক মহান আধ্যাত্মিক গুরুর জীবন কাহিনী|গুরু কথার প্রথম পর্বে শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর|অবিভক্ত বাংলার গোপালগঞ্জ জেলার সফলাডাঙ্গা গ্রামে 1812 ক্রিস্টাব্দর 11 মার্চ যশোমন্ত ও অন্নপূর্ণা দেবীর গৃহে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন কলি যুগের এই অন্যতম শ্রেষ্ট মহাপুরুষ|তার পরিবার ছিলো নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব পরিবার|ফলে শৈশব থেকেই শাস্ত্র পাঠ ও ধর্ম আলোচনার প্রতি তার এক গভীর আগ্রহ ও নিষ্ঠা বর্তমান ছিলো|যত বয়স বাড়তে লাগলো শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের মধ্যে এক ঐশরিক শক্তির বিকাশ হতে থাকলো|যথাযত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তিনি একজন জ্ঞানী শাস্ত্রজ্ঞ ও বৈষ্ণব শাস্ত্রে অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন|মূলত প্রেম-ভক্তির কথা সহজ-সরলভাবে প্রচার করতেন তিনি|পরবর্তীতে তার প্রচলিত সাধন পদ্ধতি মতুয়াবাদ রূপে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে|তিনি মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রান পুরুষ|সারা জীবন তিনি উৎসর্গ করেন মতুয়া আদর্শের প্রচারে এবং প্রসারে|তিনি মনে করতেন ঈশ্বর প্রাপ্তির জন্য সন্ন্যাস নেয়ার প্রয়োজন নেই অন্তরে শ্রদ্ধা ও ভক্তি থাকলে এবং নিষ্ঠা সহকারে ঈশ্বর চিন্তা করলে গৃহীরও ঈশ্বর লাভ সম্ভব|নানা শ্রেণী ও জাতি তে বিভক্ত হিন্দু সমাজ কে তিনি ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন মতুয়াবাদের দ্বারা|তৎকালীন হিন্দু সমাজের অসংখ্য নিপিড়িত, দরিদ্র ও তথা কথিত নিম্ন শ্রেণীর মানুষ দের তিনি পরম স্নেহে বুকে টেনে নিয়েছিলেন এবং তাদের সার্বিক উন্নতি সাধনই ছিলো তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য|আজ দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মতুয়াদের কাছে শ্রী শ্রী হরিচাঁদ চাঁদ ঠাকুর কলি যুগের শেষ এবং শ্রীহরি-র পূর্ণ অবতার|যথার্থ অর্থেই তিনি পতিতপাবন|শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরে তার জীবনে অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছেন|ঠাকুর হরিচাঁদ তাঁর বাল্য সখাদের নিয়ে মাঠে গরু চড়াতেন এবং সেই সময়ে খেলার ছলে গোপালের ব্রজলীলার ন্যায় লীলা ও কার্যকলাপ প্রকাশ পেতো। বিষধর সাপ ধরে খেলানো, গরুদের ডাকা মাত্র ছুটে আসা,মৃত পশু কে জীবন দান প্রভৃতি লীলা দেখে সাধারন মানুষ বলতো, হরিচাঁদ অলৌকিক ও দৈব্য শক্তির অধিকারী ।পরবর্তীকালেও তিনি অনেক অলৌকিক লীলা করেছেন । হীরমনের রাম-রূপ দর্শন, ঠাকুর হরিচাঁদের সহিত গোস্বামী লোচনের মিলন, গোস্বামী গোলকচাঁদের চতুর্ভূজ রুপ দর্শন, শ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের পদে রামচাদের পদ্ম দর্শন, কলমদাস বৈরাগীকে কৃষ্ণ রুপ দেখানো ইত্যাদি আরো অসংখ্য ঘটনা ঠাকুরের অলৌকিক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় ।শোনা যায় তার মুখের কথায় কত অপুত্রক পুত্র পেয়েছে , কত মৃত ব্যাক্তি প্রাণ ফিরে পেয়েছে,কত অন্ধ ফিরে পেয়েছে তার দৃষ্টি শক্তি, কত রোগী রোগ মুক্ত পেয়েছে তার হিসেব নেই আজও|যে অলৌকিক ঘটনাগুলি উল্লেখ করলাম সেগুলি শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত গ্রন্হে ঠাকুরের অলৌকিক লীলা প্রসঙ্গে লিপিবদ্ধ আছে|শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ৫ মার্চ ১৮৭৮ সালে ৬৫ বছর বয়সে মর্তলোক ত্যাগ করেন|তার মহা প্রয়ানের পর তার পুত্র শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর মতুয়া সমাজের উন্নতি সাধনে ব্রতী হন|আজও বংশ পরম্পরার শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরহরিচাঁদ ঠাকুরের সুযোগ্য বংশধরেরা মতুয়া সমাজ কে নেতৃত্ব দান করে চলেছেন|আজ অসংখ্য মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁরঠাকুরবাড়ি ও মতুয়া ধাম একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে|প্রতি বছর চৈত্র মাসে মতুয়া ধামে মতুয়া মহামেলা বসে যাতে অংশগ্রহণ করেন অগুনতি মানুষ| এই সময়ে ভক্তরা কামনা সাগর’-এ ডুব দিয়ে পুণ্যস্নান করেন|ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য কোনো গুরুর কথা নিয়ে|আজ এই মহান গুরুর শ্রী চরনে আমার শতকোটি প্রণাম জানিয়ে শেষ করছি আজকের গুরু কথা|চলতে থাকবে গুরু কথা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

সাধক কথা – শ্রী শ্রী ভবা পাগলা

সামনেই গুরু পূর্ণিমা, আমাদের দেশে অদ্ভুত প্রতিভা সম্পন্ন বহু গুরু ও সাধক সাধিকা জন্মেছেন যাদের সম্পর্কে অনেক কিংবদন্তী ও লোককথা প্রচলিত আছে, ধারাবাহিক ভাবে এমন কিছু গুরু ও সাধক সাধিকা দের নিয়ে বলবো আগামী কিছুদিন গুরুর কথা|আজ শুরু করবো শ্রী শ্রী ভবা পাগলা কে দিয়ে|ভারতের সাধকদের মধ্যে যারা সঙ্গীত ও আধ্যাত্মিকতা এক সূত্রে গেথে ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ভবেন্দ্র মোহন সেন ওরফে ভবাপাগলা, তিনি ছিলেন পাগল সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং বহু মানুষ তার আদর্শে দীক্ষিত হয়ে তার চরনে নিজেদের জীবন সমর্পন করেছেন|ভবা পাগলার জন্ম আনুমানিক ১৮৯৭ খৃস্টাব্দে বাংলাদেশে, তার পিতার নাম গজেন্দ্র কুমার সাহা, পারিবারিক সূত্রেই ভবা ছিলেন কালী সাধক|পরবর্তীতে দেশ ভাগ হলে ভবাকে চলে আসতে হয় ভারতে, সেখানেও তার সঙ্গে ছিলো একটি কালী মূর্তি,থাকতে শুরু করেন শোভাবাজার অঞ্চলে এক ভক্তের গৃহে, সেখান থেকেই ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়তে থাকে তার গান ও অলৌকিক কীর্তি|শৈশব থেকেই ভবা ছিলেন ভাবুক প্রকৃতির ও সর্বদা কালী সাধনায় মগ্ন,প্রথা গত শিক্ষা খুব বেশি না থাকলেও আধ্যাত্মিক ভাবে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন ভবা পাগলা|ভবা পাগলার সহজাত প্রতিভা ছিলো গান লেখার ও সুর করার, প্রায় ছেয়াশি হাজার সংগীত রচনা করেছিলেন ও তাতে সুর দিয়েছিলেন,ভবা পাগলা, শ্যামা সংগীত বা ভক্তি গীতিই ছিলো তার সংগীতের প্রধান ভিত্তি|কালী সাধনার মাধ্যম হিসেবে সংগীত কে তিনি সফল ভাবে ব্যবহার করে ছিলেন এবং হয়ে উঠেছিলেন একজন সিদ্ধ পুরুষ|তার গান ” বারে বারে আর আসা হবেনা ” আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে|হালকা পাতলা গড়ন, গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, চিবুকে এক গোছা দাড়ি, এই অতি সাধারণ চেহারার ভবাপাগলার মধ্যে ছিলো অসীম আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও বিশাল অলৌকিক ক্ষমতা, যা বার বার ধরা দিয়েছে তার নানান কর্ম কাণ্ডে, শোনা যায় একবার এক দুরারোগ্য ব্যাধি তে আক্রান্ত ব্যাক্তি কে অলৌকিক ভাবে সুস্থ করে দিয়েছিলেন ভবাপাগলা|আরো এমন বহু অলৌকিক কীর্তি আছে তার সারা জীবনে|নিজের জীবদ্দশায় প্রায় সাতটি কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি|এই মহান সাধক ১৯৮৪ খৃস্টাব্দে দেহ ত্যাগ করেন, আজও তিনি স্মরণীয় তার অলৌকিক কীর্তি ও তার গানের জন্যে|এই মহান কালী সাধককে আমার শ্রদ্ধা ও প্রনাম জানিয়ে শেষ করছি আজকের লেখা|চলতে থাকবে এই ধরবাহিক লেখা লেখি|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|