Home Blog Page 44

শিব তীর্থ – বানেশ্বর শিব

শিব তীর্থ – বানেশ্বর শিব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের শিব তীর্থ পর্বে আলোচনা করবো

ঐতিহাসিক বানেশ্বর শিব মন্দির নিয়ে।

এই শিব মন্দির কোচ বিহার তথা সমগ্র উত্তর বঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় শিব তীর্থ।

বানেশ্বর রূপে ভগবান শিব এখানে পূজিত হয়ে আসছেন বহুদিন যাবত।

 

কোচ বিহারের আদি শাসক বংশ, অর্থাৎ কোচ রাজারা ছিলো বেজায় ধার্মিক ও পরম শিব ভক্ত যদিও কৃষ্ণ তাদের আরাধ্য তবু অন্যান্য দেব দেবীদের মূর্তিও তৈরি করিয়েছিলেন সারা রাজ্য জুড়ে, তাদের আমলের মন্দির গুলির মধ্যে অন্যতম একটি মন্দির হল ‘বানেশ্বর শিব মন্দির’।

 

যদিও মন্দির প্রতিষ্টার সঠিক দিন ক্ষণ পাওয়া যায়না তবে কোচবিহারের প্রবীণ মানুষেরা মনে করেন। কোচ রাজবংশের মহারাজা নর নারায়ণ এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার পরবর্তীকালে কোচবিহার রাজ্যের মহারাজা প্রাণ নারায়ণ এটিকে সংস্কার করেছিলেন এবং নব রূপ দিয়েছিলেন।

 

বানেশ্বর মন্দিরের প্রধান দালান থেকে ১০ ফুট নীচে, মন্দিররের গর্ভগৃহে রয়েছে আদি বানেশ্বর ‘শিব লিঙ্গ’ প্রধান মন্দিরের ডানদিকে সিমেন্টের তৈরি একটি নন্দী মূর্তি রয়েছে। মন্দিরের উত্তর দিকে একটি চালাঘরে শিব ও অর্ধনারীশ্বরের মূর্তি রয়েছে। অন্যান্য দিকে একটি কালী মূর্তি সহ আরও কিছু দেব দেবীর মূর্তিও রয়েছে।মন্দিরের সব থেকে বড় উৎসব শিব চতুর্দশীর সময় একটি সপ্তাহব্যাপী মেলা বসে এই মন্দির এলাকায়।তাছাড়া প্রতিদিনই পুজো হয় এবং বহু দর্শণার্থী আসেন পুজো দিতে|

 

মন্দিরের ঠিক পাশেই রয়েছে একটি বড় জলাশয় যেখানে অনেকগুলি কৃষ্ণ বর্নের বিরল প্রজাতির কচ্ছপ আছে। এই কচ্ছপ গুলি স্থানীয়ভাবে ‘মোহন’ নামে পরিচিত। এখানে এদেরকে খুব পবিত্র মনে করা হয় এবং এদের পুজোও করা হয়। আগে পুকুরের ঘাটের কাছে গিয়ে মোহন বলে ডাক দিলে দেখা পাওয়া যেত এদের।যুগ যুগ ধরে এই প্রাণী গুলি রয়েছে এই পুকুরে|কবে এবং কোথাথেকে তারা এই পুকুরে এলো সেই

প্রশ্নের উত্তর অজানা|তবে তারা কোচবিহারের বহু ইতিহাস ও বহু রাজনৈতিক এবং সামাজিক উত্থান পতনের নীরব সাক্ষী|বর্তমানে পুকুরটি ঘিরে দেওয়া হয়েছে তবুওদূর থেকেও কচ্ছপ গুলি দেখতে পাওয়া যায় মাঝে মাঝে।তাদের দর্শন পাওয়া সৌভাগ্যর ব্যাপারবলে মনে করা হয়।

 

বহু দুর দুর থেকে শিব ভক্তরা এই মন্দিরে আসেন তাদের মনোস্কামনা নিয়ে এবং বাবা বানেশ্বর তাদের মনোস্কামনা পূরণ করেন বলেই শোনা যায়।

 

ফিরে আসবো শিব তীর্থের পরবর্তী পর্ব নিয়ে আবার আগামী দিনে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব তীর্থ – ঘন্টেশ্বর শিব

শিব তীর্থ – ঘন্টেশ্বর শিব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

হুগলি জেলার এক বিখ্যাত শৈবক্ষেত্র হল খানাকুলের বাবা ঘণ্টেশ্বরের মন্দির। সতীপীঠ রত্নাবলী মন্দিরের কাছেই বাবা ঘণ্টেশ্বরের অবস্থান।আজকের পর্বের আলোচ্য বিষয়

ঘন্টেশ্বর শিব।

 

ঘন্টেশ্বর মন্দিরের শিবলিঙ্গ টি ‘শয়ম্ভু’ বলে উল্লেখ আছে প্রাচীন তন্ত্র শাস্ত্র গুলিতে।এখানে একইসঙ্গে আছে রত্নাবলী কালী মন্দির, যেখানে সতীর বাম স্কন্ধ পড়েছিল বলে কথিত আছে। এছাড়া বিশালাক্ষী, অন্নপূর্ণা, ষষ্ঠী, ধর্ম ঠাকুর,ক্ষুদিরায়, নিতাই গৌড় ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা আছে। জায়গাটির মহিমার জন্য একে গুপ্তকাশী বলেও উল্লেখ করা হয়।

 

শোনা যায়, বহুকাল আগে খানাকুলেরই পার্শ্ববর্তী এক গ্রামের বাসিন্দা বটুক কারকের একটি গরু রোজ একটি শিমূল গাছের পাশে দুধ দিত। কিন্তু কোনও দিনই বাড়িতে দুধ দিত না গরুটি। প্রতিদিন একই ঘটনা দেখে মনে প্রশ্ন জাগে বটুকবাবুর। কৌতুহলের বশেই তিনি একদিন সেই নির্দিষ্ট জায়গাটি খনন করেন। কিছুটা খনন করতেই দেখা মেলে শিব লিঙ্গ। সেই শিব লিঙ্গই ঘন্টেশ্বর শিব নামে পূজিত হচ্ছে।একসময় নাকি তালপাতা ও মাটির ঘরেই থাকতেন বাবা ঘণ্টেশ্বর ও মা রত্নাবলী। পরবর্তীকালে গ্রামবাসীদের দান করা জমিতে গড়ে ওঠে মন্দির।

 

বটুক কারকের পরিবারই বংশ পরম্পরায় মন্দিরের রক্ষনা বেক্ষন এবং পুজোর দায়িত্বে আছে এবং একাধিক বার মন্দিরের সংস্কার হয়।

 

একসময় আরামবাগ মহকুমা জুড়ে ডোম, বর্গ ক্ষত্রিয় ইত্যাদি সম্প্রদায়ের মানুষ আদি বাসিন্দা হিসেবে বসবাস করতেন। তাদের আরাধ্য দেবতা ছিলেন ধর্ম ঠাকুর। পরবর্তীতে তারাই হয়ে ওঠেন ঘন্টেশ্বর মহাদেবের ভক্ত এবং তাদের পুজো পদ্ধতি মিশে যায় শিবের গাজনের সাথে।

 

শিব চতুর্দশী এবং শিব রাত্রিতে এখানে বড়ো করে পুজো হয় এবং বহু ভক্তের সমাগম হয়।

 

আবার যথা সময়ে ফিরে আসবো শিব তীর্থ নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব তীর্থ – তারকেশ্বর শিব

শিব তীর্থ – তারকেশ্বর শিব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার জাগ্রত এবং প্রসিদ্ধ শিব মন্দির গুলির মধ্যে অন্যতম তারকেশ্বর শিব মন্দির যা হুগলীতে অবস্থিত। আজকের শিব তীর্থ পর্বে জানাবো এই ঐতিহাসিক শিব মন্দিরের ইতিহাস এবং মাহাত্ম।

 

এখানে শিব বাবা তারকনাথ নামে পূজিত।তারক নাথের ধাম তারকেশ্বর নামে খ্যাতি লাভ করে।

শোনা যায়, রাজা ভরমল্ল জঙ্গলে একটি শিবলিঙ্গের স্বপ্ন দেখেন। তারপর তিনিই সেই শিবলিঙ্গ খুঁজে বের করেন। ১৭২৯ সালে সেই শিবলিঙ্গের ওপরেই গড়ে ওঠে বাবা তারকনাথের মন্দির।

 

আবার একটি প্রচলিত কিংবদন্তী অনুসারে তারকেশ্বর মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা বিষ্ণুদাস নামের এক শিবভক্ত।জনশ্রুতি আছে যে বিষ্ণুদাসের ভাই দেখেন স্থানীয় জঙ্গলে একটি কালো পাথরের ওপর গরুরা নিয়মিত দুধ দান করে আসে। এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে সে তিনি কথা বিষ্ণুদাসকে জানান। আর এর পরই স্বপ্নাদেশে ওই পাথরটিকে শিবজ্ঞানে পুজো শুরু করেন বিষ্ণুদাস।

শিবের তারকেশ্বর রূপ অনুসারে এই মন্দিরের নামকরণ করা হয়।

 

তারকেশ্বর মন্দিরটি বাংলা আটচালা শৈলীর মন্দির। মন্দিরের সামনে একটি নাটমন্দির অবস্থিত। অদূরেই কালী ও লক্ষ্মী-নারায়ণের দুটি মন্দির রয়েছে। তারকেশ্বর মন্দির সংলগ্নই রয়েছে একটি জলাশয়, যার নাম দুধপুকুর। ভক্তদের বিশ্বাস, দুধপুকুরে স্নান করলে মনের সব আশা পূর্ণ হয়। শোনা যায় শ্রী শ্রী সারদাদেবী নাকি বেশকয়েকবার এই মন্দির পুজো দিতে গিয়েছিলেন।

 

সারাবছরই তারকেশ্বর মন্দিরে পূণ্যার্থীদের ভিড় লেগে থাকে তবে শ্রাবণ মাসে শ্রাবনী মেলাতে প্রচুর জনসমাগম হয়। এছাড়া ফাল্গুন মাসে শিবরাত্রিও চৈত্র-সংক্রান্তিতে গাজন উৎসবেও বহু মানুষ আসেন। সমগ্র শ্রাবণ মাস জুড়ে প্রতি সোমবার শিবের বিশেষ পূজা হয়ে থাকে এবং সেই উপলক্ষে বহু মানুষের আগমন ঘটে এই শিব তীর্থে।

 

আবার ফিরে আসবো শিব তীর্থ নিয়ে যথা সময়ে। থাকবে একটি শিব মন্দিরের ইতিহাস এবং

শিব সংক্রান্ত নানা তথ্য। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মাহাত্ম – পশুপতি শিব

শিব মাহাত্ম – পশুপতি শিব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শিব যে শুধু দেবতাদের আরাধ্য দেবতা তা নয়। তিনি সমগ্র পশু সমাজের আরাধ্য। তাই শিবকে পশুপতি রূপেও পুজো করা হয়। নেপালে শিব পশু পতি রূপেই বিরাজমান। আজ শিবের এই বিশেষ রূপটি নিয়ে লিখবো।

 

কাঠমান্ডু শহরের খুব কাছে দিওপাটন শহরের বুকে,বাগমতি নদীর তীরে পশুপতিনাথ মন্দির অবস্থিত। হিন্দু ধর্মালম্বীদের কাছে এই মন্দিরটির গুরত্ব অপরিসীম|শিবের আরেক নাম হল পশুপতিনাথ। সেই নামেই এই মন্দিরটির নাম পশুনাথ মন্দির।নেপাল ভ্রমণকালে আমার এই মন্দির দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।

 

পশুপতি নাথ মন্দিরটি কবে প্রতিষ্ঠা হয়েছে, সে সম্পর্কে কোনও সঠিক তথ্য পাওয়া যায়না তবে ঐতিহাসিকদের মতে চতুর্থ শতাব্দী থেকেই নেপালের এই জায়গায় মন্দিরটির অস্তিত্ব ছিল।মন্দিরকে কেন্দ্র করে একটি পৌরাণিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।একবার শিব ও পার্বতী কাটমান্ডুর বাগমতী নতীর তীরে ভ্রমণ করতে এসেছিলেন। নদী তীরবর্তী উপত্যকায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুদ্ধ হয়ে হরিণের বেশ ধরে ওই এলাকায় ঘুড়ে বেড়াতে থাকেন দুজনে। কিন্তু দেবতারা পড়ে যান বিপদে ।শিব ছাড়া সৃষ্টি অচল প্রায়!অনেক কষ্টে শিবকে খুঁজে পেলেও দেবাদিদেব শিব এই স্থান থেকে যেতে নারাজ।বহু অনুরোধে পরে শিব ঠিক করেন তিনি কৈলাশে ফিরে গেলেও পশুদের পালন কর্তা হিসাবে এখানে তিনি পরিচিত হবেন। তারপর থেকেই এখানে শিবকে পশুপতিনাথ হিসেবে পূজা করা হয়।

 

পুরানে অবশ্য এই পশুপতি রূপে অন্য একটি ব্যাখ্যাও আছে যেখানে পশু অর্থাৎ সত্ত্বা এবং পতি অর্থাৎ অভিভাবক। একবার সব দেবতারা ব্রম্হার আহ্বানে সৃষ্টি যজ্ঞ করেন কিন্তু শিবকে আমন্ত্রণ জানাতে তারা ভুলে যান। শিব রুদ্র মূর্তি ধরে যজ্ঞ স্থলে আসলে দেবতারা ভীত হয়ে তার কাছে ক্ষমা চান এবং মহাদেবকে তাদের সমগ্র সত্ত্বার অধিকারী বা পশুপতি আখ্যা দেন।

 

শিব মাহাত্ম নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বে। থাকবে শিব সংক্রান্ত শাস্ত্রীয় আলোচনা এবং একটি শিব মন্দিরের কথা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব তীর্থ – শিব খোলার মহাদেব

শিব তীর্থ – শিব খোলার মহাদেব

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

শিলিগুড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দুরে পাহাড়ের আঁকা বাঁকা পথ পেরিয়ে নদী ও পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত রয়েছে এক বহু প্রাচীন শিবের মন্দির যা শিব খোলা শিব মন্দির নামে খ্যাত আজকের পর্বে এই শিব মন্দিরের মাহাত্ম আপনাদের জানাবো।

শতাব্দী প্রাচীন এই শিব ঠাকুরের মন্দির আজও রক্ষা করে চলেছে পাহাড়ের এই অপরূপ সৌন্দর্যকে তথা গোটা গ্রামকে।তবে এই মন্দিরে শুধু শিবের আরাধনা নয়, কালি থেকে বুদ্ধ প্রায় সকল দেব দেবীর পুজো অর্চনা হয়ে থাকে।

বর্তমান মন্দিরটি কয়েকশো বছরের পুরনো হলেও তার অনেক আগে থেকেই এখানে শিব মন্দিরের অস্তিত্ব ছিলো বলে মনে করা হয়।সঠিকভাবে তাই কেউই এই মন্দিরের বয়স আন্দাজ করতে পারেনা সবার বিশ্বাস মহাদেব নিজেই এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং মহাদেব স্বয়ং এই গ্রাম ও গ্রামের মানুষদের রক্ষা করে আসছেন। যুগ যুগ ধরে সব রকম বিপদ থেকে রক্ষা পেতে এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান ভরসা শিব খোলার বাবা মহাদেব।

প্রত্যেক মাসের বিশেষ পুজোর তিথিতে ও বিশেষ করে শিবরাত্রিতে এই মন্দিরে ভক্তদের ঢল নামে।
তাছাড়া প্রতি সোমবার করেই এই মন্দিরে
পুজো হয়। ভক্তরা বহুদুর থেকে মহাদেবের দর্শন করতে এই মন্দিরে আসেন।

প্রকৃতি এবং আধ্যাত্মিকতার অদ্ভুত এক মেল বন্ধন ঘটেছে এই স্থানে যা প্রতিটি দর্শণার্থীর মনে এক অপার্থিব শান্তি এনে দেয়।

ফিরে আসবো আরো একটি শিব তীর্থ এবং শিব মাহাত্ম নিয়ে। শিব রাত্রি উপলক্ষে চলতে থাকবে এই ধারাবাহিক আলোচনা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মাহাত্ম – পঞ্চানন শিব

শিব মাহাত্ম – পঞ্চানন শিব

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

শিবের পঞ্চানন রূপকে দুই ভাবে দেখা যায় বা ব্যাখ্যা করা যায়।প্রথমত পঞ্চানন রূপের অন্তর্নিহত অর্থ বা শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা যে ব্যাখ্যা অনুসারে।দ্বিতীয়ত একজন লৌকিক দেবতা হিসেবে তার ব্যাখ্যা।আজ দুটি দিক নিয়েই লিখবো।

পাঁচ সংখ্যাটির সঙ্গে শিবের এক রহস্যময় ও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।শিবের পবিত্র সংখ্যা হল পাঁচ। পরম বৈষ্ণব শিবের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রগুলির একটি নমঃ শিবায় পাঁচটি অক্ষর দ্বারা গঠিত আবার শিবের শরীর পাঁচটি মন্ত্র দ্বারা গঠিত। এগুলিকে বলা হয় পঞ্চব্রহ্মণ।

পঞ্চানন রূপে শিবের পাঁচটি সত্তা বা রূপ প্রকাশিত হয়। এই পাঁচটি রূপ হলো

১- সদ্যোজাত
২- বামদেব
৩-অঘোর
৪- তৎপুরুষ
৫- ঈশান

বিভিন্ন শাস্ত্র অনুসারে আবার এই পাঁচটি রূপ পঞ্চভূত, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

দেবাদিদেবের পঞ্চানন রূপের আরো একটি ব্যাখ্যা হয় যেখানে পঞ্চানন শিবের এক লৌকিক রূপ। গ্রাম বাংলায় বহু জায়গায় পঞ্চানন শিবের মন্দির আছে। স্থানীয় ভাষায় তিনি “বাবাঠাকুর” নামে পরিচিত। আবার কারও কারও মতে তিনি “পাঁচু ঠাকুর”যিনি শিবের ই একটি বিশেষ রূপ।

গ্রাম বাংলায় লৌকিক দেবতা রূপে পূজিত পঞ্চানন ঠাকুরের সঙ্গে থাকেন তাঁর দুই অনুচর। ধনুষ্টংকার এবং জরাসুর নামক দুই অপদেবতা। এছাড়া থাকে ভূত-প্রেত, ঘোড়া ইত্যাদি পশু। যা
আবার অনেকের মতে তিনি শিবের পুত্র বা অবতার অনেকটা দক্ষযজ্ঞকালে জন্ম নেওয়া বীরভদ্রের মত।

ডোমজুড় সংলগ্ন প্রাচীন গ্রাম নারনা।
গ্রামের পশ্চিম দিকে রয়েছে বিরাট এক অশ্বত্থ গাছ। তার নীচে রয়েছে নারনা পঞ্চানন দেবের মন্দির। এককালে তুবারাম ঘোষ নামে এই গ্রামের এক বাসিন্দা পঞ্চানন দেবের স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন যে পাশের পুকুরে দেবতা আছেন। পরদিন সকালে তিনি পুকুরে গিয়ে দেখতে পেয়েছিলেন যে সেখানে একটি ঘট রয়েছে।
সেই ঘট স্থাপন করে শুরু হয় পুজো। পরবর্তীতে মন্দির এবং বিগ্রহ স্থাপন হয়। আজ এলাকাটি একটি তীর্থ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

বাবা পঞ্চাননের এমন অনেক প্রাচীন মন্দির আছে এই বাংলার বিভিন্ন স্থানে।বাংলার অন্যতম প্রাচীন তথা জনপ্রিয় লৌকিক দেবতা “ধর্মঠাকুর” আসলে শিবের পঞ্চানন রূপ বলেও অনেকে মনে করেন।

আসন্ন শিব রাত্রি উপলক্ষে শিব তীর্থ এবং শিব মাহাত্ম নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চলতে থাকবে
ফিরে আসবো পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব তীর্থ – মথুরাপুরের বড়াশির শিব

শিব তীর্থ – মথুরাপুরের বড়াশির শিব

 

মথুরাপুর

 

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার বড়াশির শিব মন্দির দক্ষিণ বঙ্গের অন্যতম প্রসিদ্ধ শিব মন্দির।এই মন্দিরে বিরাজ করেন বাবা বজুরকিনাথ শিব।

এই প্রাচীন শিব মন্দির নিয়ে বহু কিংবদন্তী প্রচলিত আছে।

 

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মথুরাপুরের এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল সম্বন্ধে সঠিক ধারণা পাওয়া যায় না। তবে মনে করা হয় শশাঙ্কের আমলে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে ব্রিটিশ যুগে সুন্দরবনের প্রাচীন এই মন্দির প্রথম সর্বসমক্ষে আসে। পরবর্তীতে বেশ কয়েকবার এই অতি প্রাচীন মন্দিরের সংস্কার করা হয়েছে।জনপ্রিয়তাও দিনে দিনে বেশি হয়েছে।

 

স্থানীয়দের দাবি এই মন্দিরে বহু অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। একবার গরুরা নিজে দুধ দিয়েছিল। এখানকার শিবলিঙ্গের মাথায়।এলাকা যখন জঙ্গলাকীর্ণ ছিল তখন গরুর পাল এই মন্দিরের কাছে চলে আসত। সেই সময় এক রাখাল বালক গরুর খোঁজে মন্দিরের কাছে এসে দেখতে পান গরুর পাল নিজেরাই শিবলিঙ্গে দুধ দান করছে! এরপর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বাবা মহাদেবের মাহাত্ম্যের কথা।আগে মন্দিরের পাশ দিয়ে বাবা ভোলানাথ স্বয়ং হেঁটে যেতেন এমন কথাও শোনা যায়।

 

এই মন্দিরে মানত করলে সব সমস্যার সমাধান হয় বলে বিশ্বাস। এর জন্য মানত করে পুণ্যার্থীরা মন্দিরের গায়ে ধাগা বাঁধেন। যা এখানে গেলেই দেখা যায়। মন্দিরের গায়ে সর্বত্র বাঁধা রয়েছে। শিব রাত্রি এবং চড়কের আগে ব্যাপক ভিড় এই মন্দিরে।বহু দুর দূরান্ত থেকে বাবা মহাদেবের ভক্তরা এই মন্দিরে আসেন তাদের মনোস্কামনা নিয়ে।

 

আবার যথা সময়ে ফিরে আসবো পরবর্তী শিব তীর্থ নিয়ে। চলতে থাকবে ধারাবাহিক শিব তীর্থ।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

শিব তীর্থ – বুধেশ্বর শিব

শিব তীর্থ – বুধেশ্বর শিব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শিব তীর্থের আজকের পর্বে লিখবো

বাংলার প্রতিবেশী রাজ্য ছোত্রিশ গড়ে অবস্থিত এক অতি জাগ্রত ও জনপ্রিয় শিব মন্দির নিয়ে যা স্থানীয়দের কাছে বুধেস্বর শিব মন্দির নাম খ্যাত।

 

ছত্তিশগড়ের বিখ্যাত এবং ঐতিহাসিক শিব মন্দিরগুলির মধ্যে বুধেশ্বর মহাদেব মন্দিরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।ছত্রিশ গড়ের রায়পুরের এই শিব মন্দিরের ইতিহাস প্রায় ছয়শো বছরের পুরনো।বুধেশ্বর মহাদেবের নামকরণ করা হয়েছে এক আদিবাসী দেবতার নামে।

 

এখানে একটি বহু প্রাচীন জলাশয় আছে। স্থানীয় আদিবাসীদের আরাধ্য দেবতা বুদ্ধদেবের নামানুসারে পুকুরটির নাম বুধতালাব বা বুধ পুকুর। এই পুকুরের পাড়ে একটি শিবলিঙ্গ ছিল এবং তার চারপাশে ভয়ঙ্কর বিষধর সাপ বাস করত এবং শিবলিঙ্গের চারপাশে সাপগুলি সর্বদা আবৃত থাকত। বুধতালাবের তীরে থাকায় শিবলিঙ্গটির নাম হয় বুধেশ্বর মহাদেব। পরবর্তীতে স্থানীয় আদিবাসিদের উদ্যোগে পুকুরের পাড়ে একটি ছোট মন্দির তৈরি করে শিবলিঙ্গকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বুধেশ্বর মন্দিরে দুশো বছরের পুরনো একটি বটগাছ রয়েছে।এই বট গাছের গোড়াটি অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয় এবং বিশেষ কিছু তিথিতে সেখানেও বিশেষ পুজোর আয়োজন হয়।

 

মহাশিবরাত্রির সময়ে অসংখ্য ভক্ত এই মন্দির দেখার জন্য ভিড় করেন।মহাশিবরাত্রির সকালে শিবলিঙ্গে ভস্ম আরতি করা হয়।শিব রাত্রিতে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত হয় জলাভিষেক এবং সন্ধ্যায় গাঁজা, ধুতুরা অর্পণ করার পাশাপাশি এখানে রূপার সাপ নিবেদন করার রীতি আছে।

 

আবার শিব তীর্থ নিয়ে ফিরে আসবো পরের পর্বে। এখনো অনেক শিব মন্দির নিয়ে আলোচনা

বাকি আছে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব তীর্থ – রাজরাজেশ্বর শিব

শিব তীর্থ – রাজরাজেশ্বর শিব

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

প্রায় আড়াইশো বছরের পুরোনো গৌরবময় রাজ রাজেশ্বর মন্দির রয়েছে নদিয়ার কৃষ্ণ নগরের কাছে শিব নিবাসে যে মন্দিরের সাথে জড়িত আছে অনেক ইতিহাস অনেক কিংবদন্তী।

শোনা যায় যে কৃষ্ণনগরের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র নসরত খাঁ নামে এক ডাকাতকে দমন করতে কৃষ্ণগঞ্জের কাছে গভীর বনের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন রাতে আহার করার পর পাশে বয়ে যাওয়া চূর্নী নদীতে মুখ ধুচ্ছিলেন রাজা মশাই সেই সময় একটি রুই মাছ তার কাছে চলে আসে। তাই দেখে এক রাজ কর্মচারী বলেন যদি এখানে বসবাস করেন তবে রাজার ভালোই হবে।কথাটা রাজা কৃষ্ণ চন্দ্রের মনে ধরে।পরবর্তীতে নিজের রাজ্য মারাঠাদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য  সাময়িকভাবে কৃষ্ণনগর থেকে শিবনিবাসে তার রাজধানী স্থানান্তরিত করেন মহারাজা কৃষ্ণ চন্দ্র।

জনশ্রুতি আছে মহাদেবের সপ্নাদেশ পেয়ে তাকে সন্তুষ্ট করতে মহারাজা শিবনিবাসে মন্দির স্থাপন করেছিলেন। মন্দিরের নাম রাখা হয় রাজ রাজেশ্বর মন্দির।এই মন্দিরে স্থাপিত শিবলিঙ্গ এশিয়ার বৃহত্তম বলে মনে করা হয়। রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ার পরে মহারাজা সম্ভবত এই জায়গাটির নাম শিবনিবাস নামকরণ করেন।  আবার অনেকে বলেন এই নামটি তাঁর পুত্র শিবচন্দ্রের নামে রাখা হয়েছিল।

মন্দিরের চূড়া সমেত উচ্চতা একশো কুড়ি ফুট।মন্দিরের ভিতর কালো শিবলিঙ্গ যার উচ্চতা প্রায় বারো ফুট এবং বেড় ছত্রিশ ফুট। সিঁড়ি দিয়ে উঠে শিবের মাথায় জল ঢালতে হয়।
শিবভক্তরা শ্রাবণ মাসে প্রতি সোমবার নবদ্বীপের গঙ্গা থেকে জল নিয়ে হেঁটে শিবনিবাসে এসে শিবের মাথায় জল ঢালেন। শিব রাত্রিতেও বিশেষ পুজো হয়। নদীয়া তথা বাংলার ঐতিহাসিক এবং প্রাচীন শিব মন্দিরগুলির মধ্যে এটি
অন্যতম জনপ্রিয় শিব তীর্থ

ফিরে আসবো শিবতীর্থ নিয়ে আগামী পর্বে।
শিবরাত্রি উপলক্ষে চলতে থাকবে এই
ধারাবাহিক আলোচনা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব তীর্থ – চক্রেশ্বর শিব

শিব তীর্থ – চক্রেশ্বর শিব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুক শহর রাজ্য তথা দেশের অন্যতম প্রাচীন শহর। যার প্রাচীন নাম ছিল তাম্রলিপ্ত নগরী। এই শহরেই আছে বহু প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক চক্রেশ্বর শিব মন্দির।

 

এই চক্রেশ্বর শিব লিঙ্গের উল্লেখ আছে মহাভারত সহ একাধিক প্রাচীন গ্রন্থে। জেলার অন্যতম প্রাচীন এই শিব মন্দির তমলুকের মানুষের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এবং তাৎপর্যপূর্ণ।আজও ইতিহাসের আকর্ষনে বা ভক্তির টানে বহু মানুষ ছুটে আসেন এই মন্দিরে।

 

আগেই বলছি এই শিব মন্দিরের নিদর্শন পাওয়া যায় মহাভারতে। কথিত আছে পান্ডবদের অজ্ঞাতবাসের সময় পঞ্চপান্ডবসহ কুন্তী ও দৌপ্রদী পুজো দিয়েছিলেন এই শিব মন্দিরে।চক্রেশ্বর মন্দির মোট চারটি শিবের লিঙ্গ দেখতে পাওয়া যায়। জানা যায় তার মধ্যে একটি স্বয়ং প্রকটিত হয়েছে। অর্থাৎ স্বয়ম্ভু।কথিত আছে বাকি তিনটি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যুধিষ্ঠির ভীম ও অর্জুন।তারাই পুজো শুরু করেন এই মন্দিরে। আজও সেই পরম্পরা বয়ে নিয়ে চলেছেন তমলুকের মানুষ।

 

চক্রেশ্বর নামের সাথেও যোগ রয়েছে মহাভারতের শোনা যায় মহাদেবের চক্রান্তের কারণেই গান্ধারী পূজা দিতে পারেনি এই মন্দিরে তাই গান্ধারী নাম রাখেন চক্রেশ্বর। তিনি এই মন্দির সংক্রান্ত একটি পুকুরকেও অভিশাপ দিয়ে বলেন যে তার জলও পুজোয় কাজে লাগবেনা। সেই পুকুরের জল আজও দূষিত এবং শুভ কাজে ব্যবহার হয়না।

 

বর্তমানে চক্রেশ্বর শিব মন্দিরে প্রতিদিন নিত্য পুজো হয় এর পাশাপাশি প্রতি সোমবার বিশেষ পুজো পাঠ চলে। শিবরাত্রি ও চৈত্র মাসের নীল সংক্রান্তির পূজো হয় এই মন্দিরে। সেই সময়ে অসংখ্য শিব ভক্তর আগমন ঘটে এখানে।

 

ফিরে আসবো শিব তীর্থ নিয়ে আগামী পর্বে। থাকবে অন্য একটি প্রাচীন শিব মন্দিরের ইতিহাস এবং আরো অনেক তথ্য। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।