Home Blog Page 43

ভক্তের ভগবান – কৃষ্ণ সুদামা

ভক্তের ভগবান – কৃষ্ণ সুদামা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ভক্ত এবং ভগবানের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গেলে শ্রী কৃষ্ণ এবং তার সখা এবং ভক্ত সুদামার প্রসঙ্গ উঠবেই।আজকের পর্বে এই দুই জনের বন্ধুত্ব নিয়ে লিখবো।

 

বৃন্দাবনের একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণকারী সুদামা এবং ভগবান কৃষ্ণ ছিলেন সহপাঠী যারা বৃন্দাবনে আচার্য সন্দীপনের আশ্রমে অধ্যয়ন করতেন এবং তখন থেকেই তাদের বন্ধুত্ব তৈরী হয়। কৃষ্ণের বাল লীলার প্রায় প্রতিটি পর্বে সুদামা স্বমহিমায় বিরাজমান।

 

কৃষ্ণ এবং সুদামা উভয়েই শিক্ষা সমাপ্ত করে নিজ নিজ গৃহে চলে যান। পরবর্তীতে যেখানে কৃষ্ণ দ্বারকা রাজ্যের সিংহাসন লাভ করেন অন্যদিকে সুদামা দারিদ্র্যতার জীবনে আবদ্ধ হয়ে পড়েন । এতো কিছুর পরেও তার ভক্তি, অনুরাগ এবং কৃষ্ণপ্রেম অব্যাহত ছিল।তিনি জানতেন বন্ধু তাকে ভুলবেননা। একদিন আবার ভক্ত এবং ভগবানের মিলন ঘটবেই।

 

সুদামার সর্বদা অর্থের অভাব ছিল। প্রায়শই তার বাচ্চারা রাতে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। বহু বছর পরেও কৃষ্ণের প্রতি সুদামার ভালোবাসা কমেনি এবং প্রভুর গল্প তার বাচ্চাদের শোনাতেন। তার স্ত্রী সুশীলা একবার তাকে জোর করে ভগবান কৃষ্ণের সাথে দেখা করতে পাঠান।

 

সুদামা তার স্বাভাবিক মলীন এবং ছেঁড়া কাপড় পরে সম্পূর্ণ খালি পায়ে দ্বারকার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।মনে অনেক প্রশ্ন ভগবান কৃষ্ণ কি তাকে চিনবেন? তাঁকে দেখে কৃষ্ণের প্রতিক্রিয়া কী হবে? প্রহরীরা কি তাকে কৃষ্ণের সাথে দেখা করতে দেবে? কেউ কি বিশ্বাস করবে যে আমি কৃষ্ণের বন্ধু?

 

অবশেষে ক্ষুধার্ত এবং ক্লান্ত সুদামা দ্বারকায় পৌঁছেন।দ্বারকার সৌন্দর্যে বিস্মিত হয়ে সুদামা কৃষ্ণের দুর্গ খুঁজতে থাকেন। রক্ষীরা তাকে অপমান করে দুর্গে প্রবেশ করতে বাধা দেয়।কীভাবে একজন ভিক্ষুকের সাথে কৃষ্ণর বন্ধুত্ব থাকতে পারে তা ভেবে তারা অবাক।

 

এদিকে কৃষ্ণের আগমনের খবর পৌছায় দ্বারকার অন্দর মহলে।সুদামা প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে আছেন শুনে কৃষ্ণ সরাসরি মূল ফটকের দিকে দৌড়ে গেলেন। কৃষ্ণের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে শুরু করে।আবেগে ভরা হৃদয় নিয়ে কৃষ্ণ সুদামাকে জড়িয়ে ধরে তাঁর সিংহাসন অর্পণ করেন । তিনি তার অশ্রু দিয়ে সুদামার পা ধুয়ে দিলেন। বসালেন স্ত্রী রুক্মিণীর আসনে। কিছু দিন সেবা এবং আতিথ্য গ্রহন করে সুদামা জাগতিক কিছু না চেয়ে খালি হাতেই ফিরে এলেন।

 

গ্রামে ফিরে দেখলেন তার পুরানো এবং ভাঙা কুঁড়েঘরটি একটি জমকালো প্রাসাদে রূপান্তরিত হয়েছে। স্ত্রীও রাজ রানী হয়েছেন। দারিদ্রতার অভিশাপ মুছে গেছে।সুদামা বুঝতে পেরেছিলেন যে এটি তাঁর লীলা ধর , তাঁর প্রিয় ভগবান শ্রী কৃষ্ণের লীলা। ভক্তের প্রতি ভগবানের অসীম করুন হয়েছে।

 

একদিকে কৃষ্ণের মতো বন্ধু পেয়ে সুদামা যেমন ভাগ্যবান তেমনই সুদামার ন্যায় ভক্ত বা বন্ধু পেয়ে কৃষ্ণও ধন্য।

 

আবার অন্য এক ভক্ত এবং তার ভগবানের কথা নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কার্তিক পুজোর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

  • কার্তিক পুজোর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আগামীকাল কার্তিক সংক্রান্তি,কার্তিক পুজোর এই পবিত্র সময়ে দেব সেনাপতি কার্তিকের জন্ম বৃত্তান্ত ও তার বাহন অর্থাৎ ময়ূর নিয়ে কিছু পৌরাণিক তথ্য ও ব্যাখ্যা আপনাদের সামনের উপস্থাপন করবো এই বিশেষ পর্বে|জানাবো কার্তিক পুজোর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য।

 

শাস্ত্র মতে কার্তিক পুজো করে তাকে তুষ্ট করতে পারলে কার্তিকের মতো সর্বগুন সম্পন্ন

পুত্র লাভ হয়।সেই বিশ্বাস থেকে নব বিবাহিত দম্পতিদের ঘরের সামনে গভীর রাতে কার্তিক ঠাকুর স্থপন করার রীতি শুরু হয়।

 

ভারতের কোথাও তিনি মুরগান, কোথাও শুভ্রমনিয়াম, আবার বাংলায় তিনি ঘরের ছেলে কার্তিক।কার্তিক শিব ও পার্বতীর সন্তান এ আমরা সবাই জানি, কিন্তু তার জন্মর একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে ছিলো|তারকাসুরের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য দেবতারা একজন শৌর্য-বীর্যসম্পন্ন দেবসেনাপতির খোঁজ করছিলেন। অবশেষে সকলে মিলে মহাদেবের শরণাপন্ন হলেন তপস্যা ভঙ্গ করে অন্তত যাতে একটা পুত্র তিনি দেবতাদের উপহার দেন। এতে শিব সম্মত হয়ে নিজের তেজ নিঃক্ষেপ করলেন, মহাদেবের তেজ গিয়ে পড়ল পৃথিবীতে। বসুন্ধরা এই তেজ সহ্য করতে না পেরে তা অগ্নিতে নিক্ষেপ করলেন। অগ্নি আবার সেই মহাতেজ শরবনে নিক্ষেপ করলেন। আর এই শরবনেই একটি সুন্দর সন্তানের জন্ম হল। ঠিক এই সময় ছয়জন কৃত্তিকা অগ্নির ছয় পত্নী সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন।তারা কার্তিকের লালন পালনের দায়িত্ব নিলেন|পরবর্তীতে তিনি হলেন দেব সেনাপতি এবং যুদ্ধে বধ করলেন তারকাসুর কে|কার্তিকের বিবাহ হয়েছিলো দেবসেনা নামক এক রমণীর সাথে|

 

আবার বিবাহ সংক্রান্ত অন্য একটি পৌরাণিক ব্যাখ্যাও আছে যা মূলত লোককাহিনী যেখানে কার্তিক উষা নামে এক সুন্দরী রমণীকে বিবাহ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু মাতা পার্বতীর সম্মতি না দেয়ায় তিনি আর বিবাহ করেননি এবং চীরকুমার রয়ে গেছিলেন|যাইহোক অগ্নির ছয় পত্নী তাকে পালন কোরেছিলেন তাই তার নাম সড়ানন|

 

কার্তিকের বাহন ময়ূর কেনো হলো তা নিয়েও একটি ব্যাখ্যা আছে, ময়ূর খুব সামান্যই নিদ্রা যায়। সর্বদা সতর্ক। আলস্যহীন। ময়ুরের স্বজনপ্রীতি লক্ষণীয়। সৈনিক পুরুষ ময়ূরের মতো অনলস, কর্মকুশল এবং লোকপ্রিয় হবেন তা বলাই বাহুল্য। তাছাড়া, ময়ূর মেঘ দেখলে যেমন আনন্দে পেখম তুলে নৃত্য করে, তেমনই ধীর ব্যক্তি শত বিপদেও উৎফুল্ল থাকবেন। সম্ভবত এই সব কারণেই দেব সেনাপতি কার্তিকের উপযুক্ত বাহন হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে ময়ূর|

 

আপনাদের সবাইকে কার্তিক পুজোর শুভেচ্ছা এবং  অভিনন্দন। ফিরে আসবো আগামী পর্বে বিশেষ এক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – পুরুলিয়ার ডাকাত কালী

কালী কথা – পুরুলিয়ার ডাকাত কালী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

পুরুলিয়া জেলার প্রাচীন কালীপুজোগুলির মধ্যে চিড়াবাড়ি এলাকার নাক কাটা কালি পুজো অন্যতম । এক প্রাচীন বট গাছের নিচে রয়েছে দেবীর খণ্ডিত মূর্তি । এই কালীমূর্তির নাক কাটা অবস্থায় পুজো হয় নাক কাটা কালী নামেই খ্যাত।
এই কালী মুলত ডাকাত কালী।

শোনা যায় বহুকাল আগে এই অঞ্চলে ডাকাত দের উৎপাত ছিলো সেই সময়ে ডাকাতদের হাত থেকে ফসল বাঁচাতে পুজো শুরু করেছিলেন গ্রামবাসীরা সেই রাগে ডাকাতরা দেবীর মূর্তি ভেঙে দিয়েছিল । কেটে দিয়েছিল মূর্তির নাক ।সেই থেকে দেবী এখানে পূজিত হন নাক-কাটা কালীরূপে।
শুধু নাক নয় দেবী মূর্তি এখানে খণ্ডিত।
পরবর্তীতে মূর্তি ভাঙার অপরাধে সেই ডাকাত দলকে নিশ্চিহ্ন করে দেন দেবী।এমন টাই জনশ্রুতি আছে।

এই দেবীর পুজোর পর থেকেই বন্ধ হয় ডাকাতি এবং গ্রাম বাসীরা ফিরে পান তাদের হারানো শান্তি। সে প্রায় দুশো বছর আগের কথা সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই গ্রামকে সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করেন এই দেবী।

প্রত্যেক অমাবস্যায় এবং প্রতি বছর কালী পুজোর সময়ে মহা ধুমধামের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে এই পুজো । প্রাচীন প্রথা মেনে ছাগ বলিও হয় এই মন্দিরে এবং পুজো হয় তন্ত্র মতে।নাক কাটা কালীর উপরে গোটা পুরুলিয়া জেলার মানুষের অগাধ আস্থা এবং শ্রদ্ধা।

দেখা হবে আগামী পর্বে। সঙ্গে থাকবে অন্য
এক কালী মন্দিরের কথা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – পুঁটে কালীর পুজো

কালী কথা – পুঁটে কালীর পুজো

পন্ডিতজি ভৃগুরশ্রী জাতক

আজ কালী কথায় আপনাদের কলকাতার এক অতি প্রাচীন কালী মন্দিরের কথা লিখবো।

কলকাতার ব্যাস্ততম অঞ্চল গুলির অন্যতম বড়ো বাজার অঞ্চলে কালীকৃষ্ণ ঠাকুর স্ট্রিটে অবস্থিত বিখ্যাত পুঁটে কালী মন্দির|এই মন্দিরের ইতিহাস অতি প্রাচীন ও বহু অলৌকিক ঘটনা এবং কিংবদন্তী জড়িত আছে এই মন্দির এবং দেবীর মূর্তির সাথে|

তখন ভারত শাসন করছেন সম্রাট আকবর। কলকাতা তখন ও শহর হয়ে ওঠেনি । উত্তর কলকাতার আজকের কালীকৃষ্ণ ঠাকুর স্ট্রীট তখন ছিলো গঙ্গা তিরবর্তী এক জনপদ।চারিপাশ ছিল জঙ্গলে ভর্তি।ডাকাত রা নরবলী দিয়ে ডাকাতি করতে যেতো। সেই সব নর মুণ্ড জমা হতো একটি কুয়ায়।ডাকাতদের নরমুণ্ড ফেলার জন্য ব্যবহৃত সেই কুয়োর মধ্যে দেবী পুটে কালী বাস করতেন।

বর্তমান মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন তান্ত্রিক মানিকচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রথম পাকা মন্দির স্থাপিত হয়েছিল ১৫৫৮ খ্রিষ্টাব্দে|যদিও প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে এই দেবী মূর্তি এখানে আরো আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিলো|

তান্ত্রিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ধমানের তৎকালীন মহারাজার দুরারোগ্য শ্বেতী সারিয়ে দিলে মহারাজা তাঁকে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেন এবং লক্ষ ব্রাহ্মণ ভোজন করান। দেবীর বর্তমান সেবাইতরা রাজা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৌহিত্র বংশ।

১৯৩০ সালে মন্দিরের সংস্কার করা হয়মন্দিরটি চারচালা ও তিনটি চূড়াবিশিষ্ট। চূড়াগুলির উপর চক্র, ত্রিশূল ও পতাকার চিহ্ন আছে। মন্দিরটির তলায় একটি পাতালকক্ষ আছে|মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত কালীমূর্তিটি ছয় ইঞ্চি লম্বা|

মন্দির এবং দেবী মূর্তির এই অদ্ভুত নামকরণ প্রসঙ্গে দুরকম ব্যাখ্যা রয়েছে|কেউ কেউ মনে করেন পুঁটি” অর্থে ছোটো মেয়ে বোঝায়|এই মন্দিরের কালীমূর্তিটির উচ্চতা মাত্র ছয় ইঞ্চি এত ছোটো মূর্তি বোঝাতেই তাই “পুঁটিকালী” বা নামটির প্রচলন হয় এবং পরবর্তীতে লোক মুখে তা বিকৃত হয়ে “পুঁটেকালী” হয়ে যায়|

নামের দ্বিতীয় ব্যাখ্যা অনুসারে একবার মন্দিরে হোম চলা কালীন গঙ্গার খাদ থেকে একটি পুঁটিমাছ লাফিয়ে হোমকুণ্ডের মধ্যে পড়ে যায়|পড়ে অর্ধদগ্ধ মাছটিকে তুলে জলে ফেলে দিতেই সেটি আবার জীবন্ত হয়ে হয়ে ওঠে এবং অলৌকিক ঘটনার জন্য দেবীর নাম হয় “পুঁটিকালী” বা “পুঁটেকালী”|

পুঁটে কালীর মন্দিরে পূজা হয় তন্ত্রমতে। দীপান্বিতা কালীপূজার রাতে প্রতিমার স্বর্ণবেশ হয় এবং ভৈরবী পূজাও অনুষ্টিত হয়|এখানে আজও কালী পূজা উপলক্ষে কুমারী পূজা হয়|এছাড়াও বিশেষ বিশেষ তিথিতে ছাগ বলীর ও ব্যবস্থা করা হয়|দেবীর উদেশ্যে আমিষ ও নিরামিষ দু রকম ভোগ ই নিবেদিত হয়|লক্ষণীয় বিষয় এই মন্দিরে দেবী কালীর পাশে দেবী শীতলার ও পূজা করা হয় নিষ্ঠা সহকারে|

আজকের কালী কথা পর্ব এখানেই শেষ করছি।ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – জোড়া কালীর পুজো

কালী কথা – জোড়া কালীর পুজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

নদিয়ার ভীমপুরের ময়দানপুরের কালীবাড়িতে একই মন্দিরে পাশাপাশি পূজিতা হন রক্ষাকালী এবং দক্ষিণকালী।আজ কালী কথায় এই পুজোর ব্যতিক্রমী এবং ঐতিহাসিক কালী পুজো নিয়ে আলোচনা করবো।

 

বহু বছর আগে এক কালীর পুজোর আগের রাতে দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন স্থানীয় এক মহিলা। দেবী তাঁকে স্বপ্নে জানিয়েছিলেন, তাঁর বাড়ির কাছেই মনসা গাছ রয়েছে। সেই গাছের মাটির তলায় তাঁরা আছেন। তাঁদের মাটি থেকে তুলে পুজো করতে হবে।

 

প্রথমে কেউ তাঁকে বিশ্বাস করেননি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তাঁর জোরাজুরিতে শুরু হয় মাটি খোঁড়া। বেশ কিছুটা মাটি খোঁড়ার পর উদ্ধার হয় জোড়া কালীমূর্তি। এরপর যেখান থেকে কালীমূর্তি দুটি উদ্ধার হয়, সেই মনসা গাছের পাশেই তৈরি করা হয় দেবীর বেদী।শুরু হয় পুজো। আজ সেই পুজোই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে গোটা নদীয়া

জেলা জুড়ে।

 

বিশেষ তিথি তে বিশেষ পুজোর আয়োজন হয়। এখানে দেবীকে এখানে নিত্য পুজো করা হয়। এই মন্দিরে দুই কালী প্রতিমার পাশে দেবী লক্ষ্মীর মূর্তিও রয়েছে। দেবী লক্ষ্মীকেও এখানে নিত্য পুজো করা হয়।পাশাপাশি দুই কালী মূর্তি বিরাজ করছে শিবের ওপর।

 

বর্তমানে সেই মহিলার পরিবারের লোকজন বংশপরম্পরায় এই পুজো করে চলেছেন।পাশাপাশি অসংখ্য ভক্ত যুক্ত হয়েছে এই পুজোর সাথে।কালীপুজোর দিনগুলোয় এই মন্দির পরিসর যেন বিরাট এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। বিপুলসংখ্যক ভক্ত এখানে ভিড় করেন।

গোটা নদীয়া জেলায় এই জোড়া কালীর বিশেষ খ্যাতি আছে।

 

আজকের এই পর্ব এখানেই শেষ করছি।

ফিরে আসবো কালীর কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে আগামী দিনে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – কালনার সিদ্বেশ্বরী কালীর ইতিহাস

কালী কথা – কালনার সিদ্বেশ্বরী কালীর ইতিহাস

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলার প্রায় প্রতিটি জেলায় রয়েছে কিছু
বিখ্যত কালী মন্দির। যার মধ্যে অনেকগুলির
কথা ইতিমধ্যে কালী কথায় বলেছি। আজ জানাবো বর্ধমানের কালনার বিখ্যাত
সিদ্ধেশ্বরী কালী মায়ের কথা|

প্রাচীন তন্ত্র সাধনার পীঠস্থান হিসাবে এই অঞ্চলের উল্লেখ আছে বহু প্রাচীন গ্রন্থে।আসল মন্দির এখানে কবে তৈরি হয়েছিলো ঠিক জানা যায়না, তবে আনুমানিক পলাশীর যুদ্ধের ও আগে বর্ধমানের জমিদার চিত্রসেনের আমলে মন্দিরটি সংস্কার করা হয়|মনে করা জৈনদেবী অম্বুয়া বা হিন্দু দেবী অম্বিকাই। পরে তিনিই সিদ্ধেশ্বরীতে রূপান্তরিত হয়েছেন এবং বর্তমানে এখানে সিদ্বেশ্বরী কালী রূপে পূজিতা হন।

আবার অন্য একটি মত অনুসারে সিদ্ধেশ্বরী দেবীকে বিখ্যাত মাতৃ সাধক অম্বরীশের আরাধ্য দেবী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়|সেই দিক দিয়ে আগে এই দেবীকে অম্বরিশের কালীও বলা হতো।

এই মন্দিরে দেবী মূর্তি নির্মিত নিমকাঠ দিয়ে।
দেবী এখানে বামাকালী মূর্তিতে বিরাজমান এবং দেবী শবরুপী শিবের উপর ভয়ঙ্করী রূপে দণ্ডায়মান |বহু প্রাচীন রীতি অনুসারে সারা বছর দেবীকে দর্শন করা গেলেও শুধুমাত্র কোজাগরী পূর্ণিমার পরের কৃষ্ণা পঞ্চমী থেকে কৃষ্ণা ত্রয়োদশী পর্যন্ত দেবী দিগম্বরী থাকেন বলে ওই সময়ে মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে। পুজো হয় তবে বাইরে থেকে|এই রীতি চলে আসছে বহু যুগ থেকে।

এই কালী ক্ষেত্রর অন্যতম আকর্ষণ একটি পুকুর।মন্দিরের বাইরে রয়েছে একটি রহস্যময় বিরাট পুকুর যার নাম অম্বিকা পুকুর|শোনা যায় এক কালে পুকুরের জলের মধ্যে রাখা থাকত প্রচুর বাসনপত্র। গরিব মানুষ সেই বাসনপত্র বিয়ে বা অন্য কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহার করে, ফের জলের মধ্যে রেখে যেতেন। মন্দিরের নানা কাজে ওই পুকুরের জলই ব্যবহার করা হত। ওই পুকুরেই ছাগ স্নান করিয়ে মন্দিরে নিয়ে আসা হত বলির জন্য|

এক কালের তন্ত্র সাধনার জন্যে বিখ্যাত সিদ্বেশ্বরী কালী মন্দির বর্তমানেও সমান প্রসিদ্ধ ও বহু মানুষের আস্থার স্থল|প্রতি বছর কৌশিকী অমাবস্যা, দীপান্বিতা অমাবস্যা এবং ফলহারিনী অমাবস্যা উপলক্ষে এখানে বিশেষ পুজো হয় ও দূর দূর থেকে মানুষ আসেন দেবীকে দর্শন করতে, তার আশীর্বাদ নিতে ও নিজের মনোস্কামনা জানাতে|

ফিরে আসবো কালী কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে আগামী দিনে। চলতে থাকবে কালী কথা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভাইফোঁটার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

ভাইফোঁটার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পৌরাণিক ভাবে ভাতৃদ্বিতীয়া ভাইফোঁটার

সূচনা হয়েছিলো শ্রীকৃষ্ণর হাত ধরে।শাস্ত্রীয় ভাবে এও অনুষ্ঠানের আলাদা তাৎপর্য এবং ব্যাখ্যা আছে।আজ জানাবো সেই পৌরাণিক ব্যাখ্যা এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা।

 

পুরান অনুসারে ধনত্রয়োদশীর পরের দিন চতুর্দশী তিথিতে নরকাসুরকে বধ করলেন কৃষ্ণ। তার পর প্রাগজ্যোতিষপুর থেকে দ্বারকায় ফিরে এলেন এই দ্বিতীয়া তিথিতে। কৃষ্ণকে দেখে তার বোন সুভদ্রার উচ্ছ্বাস বাধা মানল না। তিনি বরাবরই কৃষ্ণের আদরের বোন। এই কয়েকদিন তিনি দাদাকে দেখতে পাননি। তার উপর আবার খবর পেয়েছেন সুভদ্রা যে নরকাসুরের অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়েছেন কৃষ্ণ। সেই থেকেই তিনি ভাইয়ের সুরক্ষা নিয়ে চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন।দ্বারকা পৌঁছতেই কৃষ্ণকে তিনি বসালেন আসনে। তাঁর কপালে পরিয়ে দিলেন বিজয়তিলক এবং নানাবিধ মিষ্টান্ন দিয়ে তাকে আপ্যায়ন করলেন। সেই প্রথাই স্বীকৃত হল ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বা ভাইফোঁটা নামে।

 

আরো আর একটি পৌরাণিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় ভাইফোঁটা নিয়ে যেখানে বর্ণনা আছে আজকের তিথিতে যমরাজ গিয়েছিলেন বোন যমুনার সঙ্গে দেখা করতে । যমুনা কপালে তিলক পরিয়ে তার অগ্রজকে বরণ করে নিয়েছিলেন দিনে এবং তার মঙ্গল কামনা করেছিলেন।

সেই থেকে সহোদরের মঙ্গলকামনায় পালিত হয়ে আসছে ভ্রাতৃদ্বিতীয়া।

 

আজ বাংলা প্রত্যেক বোনই তার ভাইয়ের কল্যানে তার কপালে তিলক পড়িয়ে দেন, মিষ্টি মুখ করান, এবং প্রার্থনা করেন যেনো তার ভাইয়ের থেকে দুরে থাকে সব বিপদ|প্রত্যেক বোন ও তার ভাইয়ের সম্পর্ক যেনো সুদৃঢ় হয় এই কামনাই করি। সবাইকে জানাই ভাতৃদ্বিতীয়ার অনেক শুভেচ্ছা|

 

ফিরে আসবো আগামী কালী কথা নিয়ে।

থাকবে একটি বিশেষ কালী মন্দির নিয়ে আলোচনা।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – মহাসরস্বতীর পুজো

কালী কথা – মহাসরস্বতীর পুজো

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাঁকুড়া শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে দ্বারকেশ্বর নদীর তীরে রয়েছে মহাসরস্বতীর মন্দির। প্রতি বছর এই মন্দিরে কালীপুজোর দিন ধুমধাম করে মহাসরস্বতীর পুজো হয়।আজকের কালী কথায় এই মহাসরস্বতী পুজোর
কথা লিখবো

পুজোর মূল দায়িত্বে থাকেন গ্রামের চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা। স্থানীয় চৌধুরী পরিবারের এক পূর্ব পুরুষ বিন্ধ্যাচলে গিয়েছিলেন। সেখানেই দেবীর স্বপ্নাদেশ পান। এরপর গ্রামে ফিরে মহাসরস্বতীর পুজো শুরু করেন।
পরবর্তীতে নিজের ভাই দের পুজোর দায়িত্ব দিয়ে বৃন্দাবনে চলে যান সেই পূর্ব পুরুষ। এখন এই পুজো পরিচালনার ভার এই পরিবারের সদস্যরাই বহন করে চলেছেন।

প্রতি অমাবস্যায় এখানে কালীপুজো হয়। তবে দীপাণ্বিতা কালীপুজোয় প্রচুর ভিড় হয়। বাইরে থেকে লোকজন আসেন এখানে। নানারকম অনুষ্ঠানও হয়। যাত্রা, কীর্তন এবং নানা রকম অনুষ্ঠান হয়। এখানে রীতি অনুসারে পুজো রাত বারোটার টার আগে শুরু হয় না।

দেবী মহাসরস্বতী সিংহের উপর উপবিষ্ট, অষ্টভূজা। বাঁ পায়ের নিচে অসুর। দু’পাশে রয়েছে ডাকিনী যোগিনীও। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, নারায়ণ, গণেশ ও দুই সখীও রয়েছে সঙ্গে।

বহু বছর আগে মাটির প্রতিমায় পুজো হলেও এখন পাথরের মূর্তি গড়া হয়েছে। তবে প্রস্তর মূর্তিতে নিয়ম মেনে মাটি ছোঁয়ানো হয়। মাটি ছোঁয়াতে আসেন নিদ্দিষ্ট পরিবারের এক ব্যক্তি। আগে এখানে বলি প্রথা ছিল তা এখন হয়না তবে পুরোনো সমস্ত নিয়ম ও আচার মেনে এখনও পুজো হয় মহা সরস্বতীর।

ফিরে আসবো কালী কথা নিয়ে আবার পরবর্তী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – খলিসানী কালীর পুজো 

কালী কথা – খলিসানী কালীর পুজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

তন্ত্র অনুসারে কালী দশমহাবিদ্যা-র প্রথম দেবী। শাক্তমতে কালী বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আদি কারণ। বাঙালি হিন্দু সমাজে কালীর মাতৃরূপের পূজা বিশেষ জনপ্রিয়।বাংলায় তিনি দেবী দুর্গার ন্যায় ঘরের মেয়ে। দুর্গাপুজোর পর আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি দেবী কালীর পুজোর জন্য। বাংলায় কালী মন্দিরের সংখ্যাও অগণিত। এমনই এক কালী মন্দির হাওড়ার খলিসানি কালী মন্দির যা নিয়ে আজকের কালী কথা।

 

বর্তমানে হাওড়ার ষোলো নম্বর জাতীয় সড়কের খলিশানী কালীতলা স্টপেজ থেকে পশ্চিমদিকে কিছুটা এগিয়ে গেলেই এই মন্দির যা স্থানীয়দের মতে চারশো বছরেরও বেশি প্রাচীন।

 

এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা কালী প্রসন্ন ভট্টাচার্য। প্রথমে তিনি দেবীর ঘট প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু করেন।পরে দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে গৌরী নদীর তীরে শ্মশানের মাঝে কালীমূর্তি স্থাপন ও প্রতিষ্ঠা করেন কালীপ্রসন্ন ভট্টাচার্য।

সেই সময়ে এই এলাকায় জনসংখ্যা খুবই কম ছিল। ফলে এলাকাটি ছিল ডাকাতদের এবং বন্যা জন্তুদের আখড়া। পরবর্তীতে এই কালী মন্দিরের প্রসিদ্ধি ছড়িয়ে পরে সব জায়গায়।

 

স্থানীয়দের কাছে দেবী বুড়িমা নামেই বেশি জনপ্রিয়।সারা বছর বহু দূর থেকে অজস্র মানুষ ছুটে আসেন খলিশানীর এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরে।সবার বিশ্বাস মায়ের কাছে নিষ্ঠা ভরে মানত করলে সব মনস্কামনা পূর্ণ হয়।সেরে যায় কঠিন ব্যাধি।

 

বর্তমানে প্রায় শতাধিক কালীপুজো হয়। কিন্তু সকলেই আগে বুড়িমার কাছে পুজো নিবেদন করেন, তারপর কালীপুজো হয়।এমনকি বুড়িমার কাছে পুজো না দিয়ে এলাকায় একটিও শুভ কাজ সম্পন্ন হয়না।

 

এই কালী মন্দিরে দীপান্বিতা অমাবস্যায় কার্যত তিল ধারণের জায়গা থাকে না। দীপান্বিতা অমাবস্যাই এই মন্দিরের প্রধান উৎসব বলা যায়।

 

ফিরে আসবো পরের পর্বে কালী কথার আরো একটি অধ্যায় নিয়ে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।