Home Blog Page 41

ভক্তের ভগবান – বাবা লোকনাথের লীলা

ভক্তের ভগবান – বাবা লোকনাথের লীলা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ভক্তদের কাছে বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী সাক্ষাৎ শিব স্বরূপ। জীবদ্দশায় তিনি যেমন তার ভক্তদের কাছে ছিলেন রক্ত মাংসের ভগবান তিরোধানের পরেও তার মহিমা এতো টুকু কমেনি। তার ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে যেকোনো বিপদ থেকে তাদের আরাধ্য লোকনাথ বাবা তাদের রক্ষা করেন।

 

সে অনেক কাল আগের কথা। বাবা লোকনাথ তখন বারদীর আশ্রমে থাকেন। তার এক ভক্ত বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী গোস্বামী তখন দেশ ভ্রমণে বেরিয়ে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে কিছু কাল ধ্যান জপ করে কাটাচ্ছিলেন।হটাৎ একদিন সেখানে দাবানলশুরু হয়েছিল।চারদিকে আগুন। পালানোর কোনো পথ নেই। ভক্ত তার ভগবানকে ডাকতে লাগলেন।

তারপর হঠাৎ সেখানে লোকনাথ ব্রহ্মচারী উপস্থিত হয়ে তাঁকে নিয়ে নিরাপদ স্থানে রেখে দিলেন।

বিজয়কৃষ্ণ দেশে ফিরে বারদীতে আসলে বাবা তাঁর সাথে স্নেহের আলিঙ্গন করেন।পরবর্তীতে বাবার আশীষে বিজয়কৃষ্ণ আধ্যাত্মিকতার

আরও উচ্চ স্তরে উপনীত হয়েছিলেন।

 

নিজের ভক্তদের যেকোনো পরিস্থিতিতে থেকে ক্ষা করতেন বাবা লোকনাথ। একবার বারদীর আশ্রমে কিছু দুষ্কৃতীদের আনাগোনা শুরু হয়।তারা আশ্রমে আসা ভক্তদের নানা ভাবে বিরক্ত এবং লুটপাট করতো।একবার গভীর রাতে তারা আশ্রমবাসীদের অনিষ্ট করার উদ্দেশ্যে আসলে একটি বাঘ গর্জন করতে করতে আশ্রমের দিকে ছুটে আসে। বাঘের ভয়ে তারা পালিয়ে যায় আর বাঘটি ছুটে এসে লোকনাথ বাবার পায়ে লুটিয়ে পড়ে। বাবা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে সে জঙ্গলে অদৃশ্য হয়।

 

ভক্তদের প্রতি বাবা লোকনাথ এতটাই স্নেহশীল ছিলেন যে জীবনের শেষদিকে তিনি এক যক্ষ্মা-রোগীর প্রতি করুণা পরবশ হয়ে তার সমস্ত রোগ নিজ দেহে গ্রহণ করেন। ফলে ঐ রোগীটি সুস্থ হয়ে উঠেন এবং বাবার দেহে যক্ষ্মার লক্ষণ দেখা যায়।

 

ভক্ত এবং ভগবানের সম্পর্ক এমনই হয়। ভক্তের বিপদে ভগবান চুপ করে থাকতে পারেন না। মন থেকে ডাকলে ভগবানের সব বিপদ দুর করেন।

শুধু সম্পূর্ণ রূপে স্মরণনাগত হতে হবে।

 

ভক্ত এবং ভগবানের এমন অনেক লীলা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকবে। ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান কালী ভক্ত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ

ভক্তের ভগবান

কালী ভক্ত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রী জাতক

আজ যে পরিচিত কালী মূর্তির বাংলার ঘরে ঘরে পুজো হয় তা এক কালী ভক্তের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা পায় এবং তার মাধ্যমেই ডাকাত এবং শ্মশান বাসি তান্ত্রিক কাপালিক দের পূজিতা দশ মহাবিদ্যার এক বিদ্যা দেবী কালী হয়ে ওঠেন ঘরের মেয়ে।
তিনি মহান তন্ত্র সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। আজকের পর্বে এই মহান কালী ভক্তের কথা জানবো।

তন্ত্র সাধক কৃষ্ণানন্দ সপ্তদশ শতকে পশ্চিমবঙ্গের নবদ্বীপে এক পণ্ডিত বংশে জন্মগ্রহণ করেন।
কৃষ্ণানন্দ ছিলেন তন্ত্র সাধক এবং তন্ত্র মতেই তিনি মাতৃ আরাধনা শুরু করেন।সাধনার শুরুতে কৃষ্ণানন্দ মহামায়াকে বললেন, ‘‘মা, তোমার যে রূপের পূজা আমি করব আমাকে সে রূপ দেখিয়ে দাও’’। তখন মা বললেন, ‘‘যে ভঙ্গীতে আমার এই বিগ্রহের পূজা তোমার দ্বারা প্রচলিত হবে, তা আমি মানবদেহের মাধ্যমেই দেখিয়ে দেব। এই রাত শেষে সর্ব প্রথম যে নারীকে যে রূপে যে ভঙ্গীতে দেখবে, ঐরকম মূর্তিতে আমার পূজার প্রচলন করবে। মায়ের নির্দেশমত পরদিন ভোরে কৃষ্ণানন্দ গঙ্গার দিকে কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর এক শ্যামাঙ্গিনী বালিকাকে দেখতে পান। ওই বালিকা তখন অপরূপ ভঙ্গীতে কুটিরের বারান্দার উপরে এবং বামপদ ভূতলে দিয়ে দাড়িয়ে ছিলেন। তিনি একতাল গোময়যুক্ত ডান হাত এমনভাবে উচু করে ধরেছিলেন যা দেখে বরাভয় মুদ্রার মত মনে হয়েছিল। বাম হাত দিয়ে তিনি কুটিরের দেয়ালে মাটির প্রলেপ দিচ্ছিলেন। তিনি একটি অতি সাধারণ শাড়ি পড়ে ছিলেন। সেই গ্রাম্য রমণী কৃষ্ণানন্দকে দেখে লজ্জায় জিভ কেটেছিলেন।তাঁর এরকম ভঙ্গী দেখে কৃষ্ণানন্দের মায়ের প্রত্যাদেশের কথা মনে পড়ে গেল। তারপরই তিনি মায়ের ঐরকম মূর্তি রচনা করে পূজার প্রচলন করলেন।

মনে করা হয় বাংলার সাধকগণ যখন তন্ত্রের মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছিলেন তখন আদ্যাশক্তি মহামায়া স্বয়ং তাঁকে তন্ত্রশাস্ত্রের পুনরুদ্ধার এবং তাঁর মাতৃরূপিণী বিগ্রহের পূজা করার নির্দেশ দেন।

কালী ভক্ত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের জীবনে একাধিক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে।একবার কৃষ্ণানন্দ কোনো এক ধনী ব্যক্তির বাড়ি দুর্গাপূজা করতে গিয়েছিলেন, সেখানে দুর্গাপূজার শেষে ওই বাড়ির কর্তা নিজের অহংবোধের বশবর্তী হয়ে কৃষ্ণানন্দকে বলেন যে তিনি শাস্ত্র মতে প্রতিমার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেননি। কৃষ্ণানন্দ ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন যে তিনি যদি প্রাণপ্রতিষ্ঠা না করে থাকেন এক্ষুনি তার প্রমাণ দেবেন এই বলে কৃষ্ণানন্দ একটি কুশি ছুঁড়ে দেন দেবী প্রতিমার ঊরুতে। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিমার ঊরু ফেটে রক্তপাত হয়।উপস্থিত সবাই সাধকের এই অলৌকিক কীর্তি দেখে হতবাক হয়ে যান।

একাধিক কঠিন সব সাধনা এবং তাতে সিদ্ধি লাভ করে ধীরে ধীরে তন্ত্র জগতে মাতৃ সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তী বা প্রবাদপ্রতিম। তার ভক্তি এবং নিষ্ঠা আজও প্রত্যেক মাতৃ সাধকের কাছে আদৰ্শ স্বরূপ।

পরের পর্বে আরো এক মহান ভক্ত এবং
তার সাধনার কথা নিয়ে ফিরে আসবো।
পড়তে থাকুনা।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – শিব ভক্ত রাবন

ভক্তের ভগবান – শিব ভক্ত রাবন

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দশানন রাবন যদিও তামসিক প্রবৃত্তির ছিলেন তবুও তার মতো শাস্ত্রজ্ঞ এবং শিব ভক্ত খুব কমই আছে। আজকের পর্বে রাবনের শিব ভক্তি নিয়ে আলোচনা করবো।

 

রাবন নিয়মিত নিজের আরাধ্য মহাদেবের ধ্যান করতেন এবং তার পুজো করতেন এবং প্রায়ই কৈলাসে আসতেন শিবের দর্শন করতে।

 

একবার রাবন শিবকে স্থায়ী ভাবে লঙ্কায় নিয়ে যেতে কঠোর তপস্যা করেন।তপস্যয় সন্তুষ্ট হয়ে চন্দ্রহাস নামে একটি বিরাট শক্তিশালী অস্ত্রও রাবণকে উপহার হিসেবে প্রদান করেন, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন রাবন, শেষমেষ শিব আত্মলিঙ্গ অর্পণ করে লঙ্কার প্রতিষ্ঠা করতে বলেন তাকে।শর্ত ছিলো কৈলাস থেকে লঙ্কার পথে যাওয়ার সময় কোথাও যদি রাবণ শিবলিঙ্গ কে কোন জায়গায় রেখে দেন, তাহলে তিনি সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবেন। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে লঙ্কায় যাওয়ার পথে ক্লান্ত এবং তৃষ্ণার্থ রাবন এই স্থানে শিবলিঙ্গ কিছুক্ষনের জন্য নামিয়ে রাখেন আর সেখানেই শিবলিটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। সেই শিব লিঙ্গই বৈদ্য নাথ রূপের এই শক্তি পীঠের ভৈরব রূপে বিরাজ করছে।

 

একবার রাবন স্বয়ং শিব এবং পার্বতীকে প্রণাম করতে গিয়ে কৈলাশ পর্বত তুলে নিজের

শক্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে ছিলেন। দেবাদিদেব নিজের একটি আঙুলের জোরে কৈলাশ পর্বতকে নিচে নামিয়ে এনে রাবনের দর্প চূর্ণ করেছিলেন। নিজের আরাধ্যা শিবের কাছে রাবন ক্ষমা চেয়ে ছিলেন এবং শিব কে সন্তুষ্ট করতে শিব স্তোত্র রচনা করে পাঠ করে শুনিয়ে ছিলেন। সেই শিব স্তোত্র আজও শিব পুজোয় ব্যবহার হয়।

 

শিবভক্ত রাবন শ্রী রামের হাতে প্রাণ ত্যাগ করে ছিলেন। এখনেও শিবের কৃপা লুকিয়ে আছে কারন ভগবানের অবতার শ্রী রাম কতৃক বধ হওয়া রাবনের পরম সৌভাগ্য। জন্ম মৃত্যু আবর্ত থেকে চীরতরে মুক্তি লাভ করে দুষ্ট রাবন ভগবত

চরণ লাভ করে ছিলেন।

 

ভক্ত এবং ভগবান নিয়ে আবার ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে থাকবে আরেক ভক্তের কথা এবং ভগবানের লীলা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – মহাপ্রভু এবং জগন্নাথদেব

ভক্তের ভগবান – মহাপ্রভু এবং জগন্নাথদেব

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

ভক্তি আন্দোলোনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন শ্রী চৈতণ্যদেব।১৪৮৬ সালের দোল পূর্ণিমায় বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার তৎকালীন পীঠস্থান নবদ্বীপে জন্মে ছিলেন গৌরাঙ্গ যিনি কৃষ্ণ সাধনায় নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে বিলিয়ে দিয়ে হয়ে উঠলেন মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য মহা প্রভুর জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিলো পুরীতে গিয়ে। প্রভু জগন্নাথের মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন পরম ব্রহ্মকে। সেই পরম ব্রহ্মতেই বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন তিনি এমনটা জনশ্রুতি আছে।আজ এই ভক্ত এবং তার সাথে তার আরাধ্য জগন্নাথ দেবের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করবো।

শ্রী চৈতণ্যদেব ভক্ত না স্বয়ং ভগবান এনিয়ে সংশয় আছে। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ বা ইস্কন তাকে অবতার হিসেবেই দেখে। তবে তিনি নিজে নিজেকে সাধারণ কৃষ্ণ ভক্ত বলে দাবী করতেন।

সন্ন্যাসী রূপে জীবনের শেষ চব্বিশ বছর তিনি অতিবাহিত করেন জগন্নাথধাম পুরীতে। ওড়িশার সূর্যবংশীয় হিন্দু সম্রাট গজপতি মহারাজা প্রতাপরুদ্র দেব চৈতন্য মহাপ্রভুকে কৃষ্ণের সাক্ষাৎ অবতার মনে করতেন।

একবার পুরীর সর্বভৌম পন্ডিত মহাপ্রভুর মাহাত্ম কে চ্যালেঞ্জ করে ছিলেন। মহাপ্রভু তার গৃহে অতিথি হয়ে এসেছিলেন এবং এক রাতে তিনি সার্বভৌম পন্ডিতকে শ্রী কৃষ্ণ রূপে দর্শন দিয়ে ছিলেন বলে শোনা যায়।

কিংবদন্তী আছে যে একবার রথের দিন রাজ কর্ম চারী দের তথা কথিত নিম্ন বর্ণের ভক্তদের সাথে দুর্ব্যবহার দেখে ক্ষুব্ধ জগন্নাথ দেব রথের গতি স্তব্ধ করে দেন তারপর রাজার দুর্গতি দেখে এগিয়ে আসেন মহাপ্রভু তার কথা মতো রথের দড়ি ধরার জন্য সব শ্রেণীর মানুষ এগিয়ে এলে রথের চাকা আবার গড়াতে শুরু করে।

শ্রী চৈতণ্য দেবের অন্তর্ধান ও রহস্যময় এবং জগন্নাথের সথে সম্পর্ক যুক্ত।চৈতণ্য মঙ্গল কাব্যে উল্লেখ আছে আষাঢ় মাসে, সপ্তমীতে, সপ্তমী তিথিতে, বিকেলে গুঞ্জাবাড়িতে শ্রীমান মহাপ্রভু শ্রী জগন্নাথের গর্ভগৃহে প্রবেশ করেন এবং তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে
অদৃশ্য হয়ে যান। এনিয়ে অবশ্য দ্বিমত বা কিছু বিতর্ক আছে।তবে কৃষ্ণ বা জগন্নাথ ভক্ত রূপে শ্রী চৈতণ্যদেব যে উচ্চতায় পৌঁছে ছিলেন তাতে ভক্ত এবং ভগবানের এমন মিলন অস্বাভাবিক কিছু নয় বলেও অনেকে মনে করেন।

আবার এমনই এক মহান ভক্ত এবং ভগবানের লীলা নিয়ে ফিরে আসবো পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – শ্রী কৃষ্ণ এবং বৃন্দাবনের সাধু

ভক্তের ভগবান – শ্রী কৃষ্ণ এবং বৃন্দাবনের সাধু

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজ ভক্ত এবং ভগবানের এই পর্বে আপনাদের ভগবান কৃষ্ণের এক অদ্ভুত লীলার কথা বলবো যা ঘটেছিলো বৃন্দাবনের বৈষ্ণব সাধুর সাথে।

বৃন্দাবনে এক জটাধারী বৈষ্ণব সাধু বাস করতেন একবার তার জটা পথে চলার সময় বৃক্ষের শাখা প্রশাখায় আটকে যায়। অনেক চেষ্টা করেও ঐ জটার প্যাঁচ কিছুতেই খুলতে পারলেন না এবং তখন তিনি আসন করে ওখানেই ধ্যানে বসে পড়লেন যারা সাহায্য করতে এগিয়ে এলো তাদের তিনি বললেন যিনি এই জটার প্যাঁচ লাগালো, তিনি এই জটারসপ্যঁচ খুলতে আসবে এবং যদি না আসে আমি এখানে আসন করে বসে থাকব।তাতে যদি প্রাণ ত্যাগ করতে হয় তো তাই হোক।

তিনদিন এমন করে মহাত্মাজী বসে রইলেন সেই স্থানে |তিন দিন পর এক ঘোর কৃষ্ণ বর্ণের সুন্দর রাখাল ছেলে এল। বালক বড় আদর করে বলল, বাবা তোমার তো জটা প্যাঁচ লেগে গেছে |আমি জটা খুলে দেব| আর যেই সেই বালক জটা খোলার জন্য এগিয়ে এল|সাধক বাঁধা দিয়ে বললেন যে জটা গাছের সাথে জড়াল সে এসে এই প্যাঁচ খুলবে। তা না হলে এখানে বসে গোবিন্দ নাম নিয়ে প্রাণ দিয়ে দেব। রাখাল ছেলে বলল- “আরে মহারাজজী যে এই কাজটা করল তার নাম তো বলুন, ওকে আমি খুঁজে ডেকে নিয়ে আসি।” সাধক বললেন যে সে আপনা আপনি এসে যাবে, ডাকতে হবে না। তুমি যাও|বালক তখন মৃদু হেসে রাখাল বেশ ত্যাগ করে বাঁকেবিহারী রূপে প্রকট হলেন এবং ভক্তর উদ্দেশ্যে বললেন মহাত্মাজী আমিই তো এই জটার প্যাঁচ লাগিয়েছি। আমি নিজেই এখন জটা খুলে দেবো এই বলে কৃষ্ণ স্বয়ং হাত বাড়ালেন মহাত্মাজী বললেন আমি তো নিত্য নিকুঞ্জবিহারীকৃষ্ণের পরম উপাসক|তুমি কি সে?কিন্তু তিনি তো শ্রীরাধারাণীকে বিনা এক মূহুর্ত থাকতে পারে না। কিন্তু তুমি বিহারীজী একা একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছ।না তুমি আমার আরাধ্য কৃষ্ণ হলে একা আসতেনা।

মহাত্মাজী এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে শ্যামের পাশে শ্রীজী রাধারানী বিরাজমান হলেন। শ্রীরাধারানী নিজের প্রিয়তম শ্যামের পাশে এসে মহাত্মাকে সাক্ষাৎ দর্শন দিলেন আর আরাধ্য ভগবানের দর্শন পেয়ে মহাত্মাজী আনন্দে বিভোর হয়ে গেলেন তার চোখ দিয়ে অশ্রুধারা পড়তে লাগল।

তিনি বুঝলেন এই সবই শ্রী কৃষ্ণের লীলা। আজ তার জীবন সার্থক হয়েছে। শ্রী কৃষ্ণ এবং রাধারানী তাকে দর্শন দিয়েছেন।এর পর রাধাকৃষ্ণ
তার জটার প্যঁচ খুলে তাকে মুক্তি দিলেন।

এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় ভগবান
তার ভক্তের সামান্য কষ্টও সহ্য করতে পারেন না এবং মন থেকে ডাকলে তিনি সাক্ষাৎ দর্শন দেন
এবং ভক্তকে উদ্ধার করেন।

ভক্ত এবং ভগবানের এমনই লীলা নিয়ে
আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – সাক্ষী গোপালের কথা

ভক্তের ভগবান – সাক্ষী গোপালের কথা

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

ভক্তের সাথে ভগবানের লীলা নতুন কিছু নয়। তবে একবার ভগবান শ্রী কৃষ্ণ তার এক গরীব ব্রাহ্মণ ভক্তের সাথে এমন এক লীলা করে ছিলেন যা আজও প্রবাদ রূপে মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে আছে।

ভারতের ওড়িশার কটক শহরে রয়েছে সাক্ষী গোপালের একটি মন্দির।শোনা যায় এই মন্দিরের বিগ্রহটি আগে ছিল বৃন্দবনের এক মন্দিরে। সেখান থেকে স্বয়ং ওড়িশার এই স্থানে এসেছিল ওই মূর্তি। আর এই মূর্তির নিজে পায়ে আসার ঘটনাই ভগবানের লীলা ।

একবার দক্ষিণ ভারতের এক ব্রাহ্মণ কৃষ্ণ ভক্ত। সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব নিজের ছেলের হাতে তুলে দিয়ে তীর্থদর্শনে বেরিয়ে পড়েন। মথুরায় তার সঙ্গে একজন যুবক ব্রাহ্মণের আলাপ হয় একসঙ্গে মিলেই তারা ঘুরে দেখতে থাকেন মথুরা এবং বৃন্দাবনের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। হঠাৎ করেই ব্রাহ্মণের মনে হয় এমন ছেলে তাঁর কন্যার জন্য একেবারে উপযুক্ত পাত্র। তৎক্ষণাৎ নিজের মনের কথা সেই যুবককে বলেন ব্রাহ্মণ। কিন্তু ব্রাহ্মণত্বের বিচারে সেই যুবক কুলীন ছিল না, তাই প্রাথমিক ভাবে এমন প্রস্তাবে অসম্মতি জানায় ওই যুবক। তার যুক্তি ছিল, এই বিয়ে ব্রাহ্মণ সমাজ কিছুতেই মেনে নেবে না। তখন ওই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ যুবককে আশ্বস্ত করেন যে এমন কোনও পরিস্থিতি তিনি তৈরি হতে দেবেন না। তখন তাঁরা দুজনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন বৃন্দাবনের এক গোপাল মন্দিরে। ব্রাহ্মণ সেই মন্দিরের দেবতাকে সাক্ষী করে শপথ করেন যে তিনি তাঁর কন্যার বিবাহ ওই যুবকের সঙ্গেই দেবেন।

দুজনে তীর্থযাত্রা শেষে দুজনে ঘরে ফিরে যায়।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় সেই পাত্রের পরিচয় সকলে জানার পর। ব্রাহ্মণের নিজের পরিবার সহ সমাজের প্রত্যেকেই এই বিয়ের বিরুদ্ধে একেবারে বেঁকে বসেন। ফলত বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ পড়েন এক ভয়ানক ধর্মসঙ্কটে। একদিকে তাঁর প্রতিজ্ঞাভঙ্গের ভয়, অন্যদিকে সমাজচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা। এমন সময় হঠাৎই সেখানে হাজির হন সেই যুবক। কিন্তু তাঁকে চরম অপমান করে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেন গ্রামবাসী ও ওই বৃদ্ধের আত্মীয়রা। অপমানিত যুবক গ্রামবাসীদের উদ্দেশে ঘোষণা করেন, যে মন্দিরে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেই মন্দিরের বিগ্রহকেই তিনি সাক্ষী হিসেবে সকলের সামনে নিয়ে আসবেন।তিনি নিজে দেবেন সাক্ষী|মনের দুঃখে যুবক হাজির হন বৃন্দাবনের সেই গোপালের মন্দিরে। দেবতাকে জানান তাঁর সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের কথা। সেই ডাকে সাড়াও দেন স্বয়ং গোপাল। তিনি রাজি হন সাক্ষী দিতে এবং যুবকের কথামতোই পাথরের বিগ্রহ রূপে স্বশরীরে তিনি সাক্ষী দিতে রওনা হন দক্ষিণ ভারতের ওই গ্রামের উদ্দেশে।গোপালের একটি শর্ত ছিলো|যাওয়ার পথে যুবক যেন পিছন ফিরে মূর্তির দিকে না দেখে। পিছনে তাকালেই তিনি থেমে যাবেন ।যুবক শর্ত মেনেই নিতেই শুরু হয় যাত্রা। বেশ খানিকটা পথ যাওয়ার পর ওড়িশার কাছাকাছি একটি গ্রামে এসে যুবকের মনে হয় গোপালের বিগ্রহ আর সঙ্গে আসছেন না। সন্দেহের বশেই একটিবারের জন্য পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখেন|ব্যাস শর্ত অনুসারে গোপাল সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়েন।

ভগবানের উপর যতক্ষণ ভক্তের বিশ্বাস ছিলো ভগবান তার সাথে ছিলো|বিশ্বাস ভঙ্গ হতেই তিনি আবার পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলেন এবং তার গতি স্তব্ধ হলো|সর্বত্র রটে যায় ভগবানের এই লীলার কথা দলে দলে মানুষ ওড়িশার ওই গ্রামে জমায়েত হতে থাকেন। খবর পৌঁছায় সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের বাড়িতেও। তিনিও সদলবলে সেই গ্রামে উপস্থিত হন।সবাই নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং ব্রাহ্মণকন্যার সঙ্গে সেই যুবকের বিয়ের আয়োজন করেন|

যে স্থানে গোপালের গতি স্তব্ধ হয়ে ছিলো সেই স্থানে একটি মন্দির বানিয়ে দেওয়া হয়। মন্দিরে স্থাপিত সেই গোপালের বিগ্রহ পরিচিত হয় ‘সাক্ষী গোপাল’ নামে|

ফিরে আসবো ভগবানের আরো এক লীলা নিয়ে। থাকবে আরো এক ভক্তের কথা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – শ্রী রাম এবং শবরী

ভক্তের ভগবান – শ্রী রাম এবং শবরী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের পর্বে শ্রী রামের এক এমন ভক্তের কথা আপনাদের বলবো যিনি অতি সাধারণ হয়েও অসাধারণ এবং স্বয়ং শ্রী রাম বন বাসের সময়ে তাকে দেখা দিয়ে তার উদ্ধার করে ছিলেন।

এই মহান ভক্ত হলেন শবরী।আজকের পর্বে শবরীর কথা।

 

শবরী ছিলেন ব্যাধ-কন্যা ৷ তিনি ছিলেন ভগবান রামচন্দ্রের অনুগত এক শিষ্যা ৷মতঙ্গ মুনির আশ্রমে থাকতেন তিনি ৷মতঙ্গ মুনি দেহ রাখার আগে শিষ্যা শবরীকে বলেছিলেন, একদিন এই আশ্রমে রাম আসবেন ৷ আশ্রম পবিত্র হয়ে উঠবে। শ্রী রামের দর্শন লাভই ছিলো শবরীর একমাত্র ইচ্ছা।

 

বৃদ্ধা শবরী রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবতেন আজই বোধহয় সেই দিন ৷ আজই হয়তো শ্রী রাম আসবেন।তাই রোজই ফুল, মালা, চন্দনে সাজিয়ে রাখতেন মতঙ্গ মুনির আশ্রম ৷নিজে হাতে বন থেকে নানা সুমিষ্ট ফল-মূল সংগ্রহ করে রাখতেন ৷ আর আশ্রমের দরজায় বসে বসে ভগবানের অপেক্ষা করতেন ৷ দিন শেষ হয়ে যেত ৷ রামচন্দ্র দেখা দিতেন না। পরদিন সকালে উঠে ফের নতুন উদ্যমে প্রভুর জন্য শুরু করতেন তাঁর অপেক্ষা ৷

 

অবশেষে একদিন বৃদ্ধা শবরীর তপস্যা পূর্ণতা পেল। রাবন যখন সীতা মাতাকে হরণ করে নিয়ে যায় তখন সীতাকে খুঁজতে খুঁজতে রাম-লক্ষ্ণ সেই মতঙ্গ মুনির আশ্রমে এসে উপস্থিত হলেন ৷ আনন্দে, প্রেম, ভক্তি, শ্রদ্ধায়, সমর্পনে শবরী অনবরত কাঁদতে লাগলেন ৷ তা দেখে রামচন্দ্রের চোখ দিয়েও অশ্রুজল নির্গত হতে লাগল।

ভক্ত এবং ভগবানের মিলনের সাক্ষী হয়ে থাকলো মাতঙ্গ ঋষির আশ্রম।

 

প্রথমে ভগবানের ধুয়ে দিলেন শবরী ৷ এরপর বন থেকে সংগ্রহ করে আনা ফলমূল সাজিয়ে খেতে দিলেন প্রভুকে ৷ ওই ফলের মধ্যে ছিল জামও ৷ ভাবে বিভোর শবরী ভাবলেন প্রভুকে কীভাবে এই জাম নিবেদন করবেন ? যদি জামগুলি টক হয় ৷ এই ভেবে শবরী নিজেই জামগুলি চেখে দেখতে লাগলেন ৷ টক জামগুলি ফেলে নিয়ে মিষ্টি জামগুলি দিলেন রামের হাতে ৷ ভক্তের এই ভক্তি দেখে প্রভুও শিষ্যার উচ্ছিষ্ট অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করে খেতে লাগলেন। এখানে উল্লেখ

করতে হয় শবরী ছিলেন তথাকথিত নিচু জাতের স্ত্রী কিন্তু ভগবান রাম সেই জাত পাতের ভেদাভেদ অগ্রাহ্য করলেন এবং ভক্তের ভক্তিকেই প্রাধান্য দিলেন।

 

এই ভাবেই নিজেকে ধন্য করলেন শবরী ৷ শেষে আরাধ্য দেবতার সামনেই দেহত্যাগ করে বৈকুন্ঠে গমন করলেন শবরী ৷এতো দিন রামের অপেক্ষাতেই তিনি দেহ ধারণ করে ছিলেন। ভগবানের সাক্ষাৎ পাওয়ার পর আর তার এই ধরাধামে থাকার প্রয়োজন ছিলোনা।

 

আবার পরের পর্বে এমন এক ভক্ত এবং তার

অসীম ভক্তির বৃত্তান্ত নিয়ে ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – শিব এবং নন্দী ভৃঙ্গী

ভক্তের ভগবান – শিব এবং নন্দী ভৃঙ্গী

 

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রী জাতক

 

দেবাদিদেব মহাদেবের অনেক বিখ্যাত এবং কুখ্যাত ভক্ত আছে তবে তার দুই ছায়া সঙ্গী

নন্দী ও ভৃঙ্গী তার মহানতম ভক্তদের অন্যতম

শিবের পাশে সর্বদা থাকেন এই দুজন প্রায় সব শিবমন্দিরের সামনে নন্দীর মূর্তিও থাকে। আজ শিবের এই দুই মহান ভক্ত সম্পর্কে লিখবো।

 

নন্দী ও ভৃঙ্গী কে নিয়ে পুরানে অনেক কথাই বলা আছে কূর্মপুরাণে নন্দী প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, মহাদেবের এই প্রধান অনুচরটি করালদর্শন, বামন, বিকটাকার, মুণ্ডিতমস্তক, ক্ষুদ্রবাহু ও মহাবল।পূর্বে নন্দী মহারাজ পৃথক দেবতা হিসেবেও পূজিত হতেন পরবর্তীতে তিনি শিবের বাহন হিসেবে স্থান পান। নন্দীর পিঠেই দেবাদিদেব বিরাজ করেন।

 

শিব মহাপুরাণ মতে, নন্দী শিলাদ মুনির পুত্র। শিলাদ ছিলেন ভগবান শিবের পরম ভক্ত এবং শিবের আশীর্বাদেই নন্দীর জন্ম হয়েছিলো এবং শিব স্বয়ং তাকে চিরঞ্জীবী হওয়ার বর দেন ও নিজের বাহন হিসেবে স্থান দেন|রামায়ণেও নন্দীর উল্লেখ পাওয়া যায় যেখানে অহংকারী রাবন কৈলাশ এসে নন্দীকে তার চেহারার জন্যে অপমান করেন ও বানর বলেন, নন্দী তাকে অভিশাপ দিয়েছিলো যে এক বানর তার পতন ডেকে আনবেন, পরে তাই হয়েছিলো। শিবের রূদ্র অবতার বজরংবলীর হাতেই রাবনের পতন হয়ে ছিলো।

 

নন্দীর ন্যায় ভৃঙ্গীও শিবের অনুচর। নন্দী যেমন হৃষ্টপুষ্ট, ভৃঙ্গী তেমনই রুগ্ন , কঙ্কালসার। ভৃঙ্গী আগে ছিলেন এক মুনি, শিবের উপাসক। তিনি শিবের সাথে পার্বতীর পুজোয় কিছুতেই রাজি নন। ক্রুদ্ধ পার্বতী অভিশাপ ভৃঙ্গী কে অভিশাপ দিলেন। সেই অভিশাপে ভৃঙ্গী কঙ্কালে পরিণত হলেন। দু’পায়ে আর দাঁড়াতে পারেন না তিনি, তখন শিবের আশীর্বাদে তাঁর তৃতীয় চরণের সৃষ্টি হল। কিন্তু তবু ভৃঙ্গী পার্বতীর পুজো করবেন না। তখন শিব তাঁকে নিজের অর্ধনারীশ্বর রূপ দেখালেন, যাতে তিনি বুঝতে পারেন যে পার্বতী শিবেরই অংশ। পরবর্তীতে তিনিও হয়ে উঠলেন শিবের অনুচর, একত্রে উচ্চারি হতে শুরু হয় নন্দী ও ভৃঙ্গীর নাম।

 

নন্দী এবং ভৃঙ্গীর নাম একত্রে উচ্চারিত হয় এবং শিবের সাথে তার এই দুই ভক্তও একত্রে পূজিত হন সর্বত্র। ভক্ত এবং ভগবান এক্ষেত্রে এক এবং অভিন্ন।

 

আবার পরের পর্বে ভক্ত এবং ভগবানের এমনই এক মেল বন্ধন এবং সেই সংক্রান্ত পৌরাণিক ঘটনা নিয়ে ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন।

ভক্তের ভগবান – মা তারা এবং শ্রী শ্রী বামা ক্ষ্যাপা

ভক্তের ভগবান

 

মা তারা এবং শ্রী শ্রী বামা ক্ষ্যাপা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ আপনাদের তারা মায়ের সর্বশ্রেষ্ঠ ভক্ত বামা

ক্ষ্যাপার কথা বলবো যিনি তারা মাকে বলতেন বড়মা।তারা পীঠ ছিলো বামা ক্ষ্যাপার কাছে মায়ের কোলের মতো। বামা তারা মাকে বলতেন বড়মার এবং মা মৌলাক্ষীকে বলতেন ছোটমা।

 

বামা ক্ষ্যাপার পুজোর নিদ্দিষ্ট নিয়ম ছিলোনা।কখনো কখনো সারাদিন পূজা করতেন।আবার কখনও কখনও তিনি দু তিন দিন পূজা করতেন

না। কখনো দেবীকে মালা পরাতেন আবার কখনো নিজে পরতেন।কখনো নিজে খেয়ে ভোগ দিতে যাচ্ছেন আবার কখনো ভোগ তুলে নিজে খেয়ে নিচ্ছেন। সাধনার এই পর্যায়কে শাস্ত্রীয় পূজা পদ্ধতির সাথে বাকি পান্ডারা মেলাতে পারতেন না। তারা ভাবতেন বামা উন্মাদ। অশাস্ত্রীয় আচরণ করছেন।যদিও পরে তাদের ভুল ভাঙে।তারা বুঝতে পারেন বামা সাধারণ ভক্ত নয় তিনি মাতারার স্নেহ ধন্য এবং তারই সন্তান সম।

 

একদিন খবর রটে যায় বামা ভোগ নিবেদন করার আগেই দেবীর প্রসাদ খেয়েছেন এবং এতে ঘোর পাপ হয়েছে।দেবী রাগান্বিত হবেন, সারা গ্রামকে তার ক্রোধ বহন করতে হবে তাই গ্রামবাসীরা বামাচরণকে কঠোরভাবে মারধর করে। তাকে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। তার মন্দিরে প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়।

 

প্রহারের চোটে বেশ কিছুক্ষন অজ্ঞান থাকার পর যখন জ্ঞান ফিরল তখন বামাক্ষ্যাপা মায়ের উপর রেগে গেল।মনে মনে তারা মাকে বললো ওরা অকারণে আমাকে মারধর করেছ তাই আমি এখন আর তোমার কাছে আসব না।ঠিক অবোধ সন্তান যেমন মায়ের উপর রাগ করে তেমনই বামা মা তারার উপর রেগে গেছিলেন।

 

তারা মা তার সন্তানের যন্ত্রণা সইতে পারেননি।

সেই রাতেই মন্দিরের দায়িত্বে থাকা জমিদার বংশের রানীর স্বপ্নে দেখা দিল মা তারা

রাগান্বিত মা রাণীকে ভর্ৎসনা করলো-তোমার পুরোহিতরা আমার ছেলেকে আঘাত করেছে। আমি তোমার মন্দির ছেড়ে চলে যাচ্ছি। এখন তোমাকে ও তোমার রাজ্যকে আমার ক্রোধ সইতে হবে, তুমি যদি তা এড়াতে চাও, কাল আমার ছেলেকে ফিরিয়ে এনে মন্দিরে পূজার দায়িত্ব দাও, নইলে পরিণতি ভোগ করতে প্রস্তুত থাকো।

 

পরদিন তারাপীঠে গিয়ে রানীমা আদেশ দিলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বামাখেপাকে নিয়ে আসতে। বামাকে অনুরোধ করে মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হলো।সেই দিন রানীমা আদেশ জারি করেন এই মন্দিরের পুরোহিত বামাক্ষ্যাপা। সে স্বাধীন। তার পথে কেউ আসলে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।শুধু তাই না তারাপীঠে আগে বামা ক্ষ্যাপাকে ভোগ নিবেদন হবে তারপর তারা মাকে ভোগ দেয়া হবে।অর্থাৎ সন্তানকে খাইয়ে তারপর মা খাবেন। এই রীতি আজও একই ভাবে চলছে।

 

এমনই হয় পরম ভক্ত এবং তার ভগবানের সম্পর্ক। সেখানে আচার উপাচার। রীতি নীতি গৌণ হয়ে যায়। প্রধান বিষয় হল অন্তরের ভক্তি এবং ভাব।

 

আবার এক মহান ভক্ত ও তার জীবনী নিয়ে যথা সময়ে ফিরে আসবো এই ধারাবাহিক আলোচনায়।

থাকবে আরো এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – শ্রী রামকৃষ্ণ এবং মা কালী

ভক্তের ভগবান – শ্রী রামকৃষ্ণ এবং মা কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ এমন এক কালী সাধক ছিলেন যার কাছে তার আরাধ্যা মা কালী ছিলেন পরম ব্রহ্মস্বরূপ এবং তাকে সাক্ষাৎ কালী রূপে তিনি দেখা দিয়েছিলেন মৃন্ময়ী মা কালী তার কাছে হয়ে চিন্ময়ী রূপে ধরা দিয়ে ছিলেন। ভক্ত এবং ভগবানের মধ্যে মুছে গিয়ে ছিলো সব ব্যাবধান। শুধু তাই নয় শ্রী কৃষ্ণ তার ভক্তদের সাথে মা কালীর সাক্ষাৎ ও করিয়ে দিতে পারতেন। যেমন স্বামী বিবেকানন্দর সৌভাগ্য হয়েছিলো সেই অদ্ভুত অনুভূতির।

 

রানী রাসমণি দক্ষিনেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠা করার পর দাদা রামকুমারের হাত ধরে গদাধর দক্ষিনেশ্বরে এসে ছিলেন পুরোহিত হিসেবে পুজোর কাজে সাহায্য করতে। প্রথম যেদিন মন্দির বিগ্রহের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন, সেদিন কিন্তু তিনি সাধক ছিলেন না। শুরুর দিকে তিনি নির্জনে ধ্যান জপ করতেন, তন্ময় হয়ে গান গাইতেন, শিবপূজা করতেন এবং মাঝেমধ্যে ভাবসমাধিতেও ডুবে যেতেন। ধীরে ধীরে মা ভবতারিণীর সান্নিধ্যে এসে তার মধ্যে মা কালীর প্রতি অমোঘ টান জন্মায় এবং বহু অভিজ্ঞতা এবং সাধনার মধ্যে দিয়ে গিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন মাতৃ সাধক রামকৃষ্ণ। ভবতারিণীর মধ্যে খুঁজে পেলেন সাক্ষাৎ জগৎ জননীকে।

 

একেকজন ভক্ত ভক্তি মার্গে একেকরকম পন্থা অবলম্বন করেন।কেউ শাস্ত্রকে প্রাধান্য দেন কারুর সাধনা আবার ভাব সর্বস্ব।শ্রী রামকৃষ্ণর পুজো পক্রিয়া ছিলো ব্যতিক্রমী।পুজোর জন্য সকালে ফুল তুলে মালা গেঁথে দেবীকে সাজাতেই অনেকটা সময় চলে যেত। পূজায় বসে যথাবিধি নিজের মাথায় একটা ফুল দিয়েই ধ্যানস্থ হয়ে মাঝে মাঝে বসে থাকতেন আবার অন্ননিবেদন করে মা গ্রহণ করছেন ভেবে অনেকক্ষণ কাটিয়ে দিতেন । দেবীকে প্রসন্না করতে কখনও পূজার মাঝখানে গান ও গেয়ে উঠতেন।কাঁদতে কাঁদতে চোখের জলে বুক ভেসে যেত মাঝে মাঝে।তার এই মতী গতি দেখে অনেকেই তাকে পাগল ভাবতেন। অনেকে সমালোচনা করতেন আবার বিজ্ঞ জনেরা বুঝতেন এ মহান সাধকের লক্ষণ।সাধনার চরম পর্যায় পৌঁছে গেছেন শ্রী রামকৃষ্ণ।

 

একাধিক বার তিনি মা কালীকে আকুল ভাবে বলতেন ‘মা তুই রামপ্রসাদকে দেখা দিয়েছিস, আমায় কেন তবে দেখা দিবি না? আমি ধন, জন, সুখভোগ কিছুই চাই না, আমায় দেখা দে’অর্থাৎ মা কালী কে সাক্ষাৎ দর্শন করার এক ব্যাকুলতা তার মধ্যে সৃষ্টি হয়ে ছিলো।ভক্তের ডাকে সাড়াও দিয়েছিলেন মা। দেখা দিয়ে তার জীবন ধন্য করেছিলেন।

 

মা ভবতারিণী ছিলেন শ্রী রামকৃষ্ণর ভক্তির শেষ কথা। মায়ের পুজো করতেন নিজের মতো করে। কারুর কথা শুনতেন না।কখনো পূজাসন ছেড়ে মা-র কাছে গিয়ে তাঁর চিবুক ধরে আদর করছেন। নানা রকম পরিহাস করছেন। হাত ধরে নাচছেন।পূজা না করে ভোগ নিবেদন করে দিচ্ছেন কিংবা নিবেদিত ভোগ নিজহাতে দেবীকে খাওয়াতে যাচ্ছেন আবার কখনো নৈবেদ্যর খানিকটা নিজেই খেয়ে দেবীকে খাওয়াতে চেষ্টা করছেন। বৈষ্ণব দর্শনে এই অবস্থা কে বলে সখা ভাব। অর্থাৎ ভক্ত এবং ভগবানের মধ্যে তৈরী হয় এক প্রকার বন্ধুত্ব মুছে যায় সব রকম ভেদাভেদ।

 

পরবর্তীতে ঠাকুর তন্ত্র সাধনা করেছেন। ইসলাম এবং খিস্টান মতে সাধনা করেছেন। আবার তোতা পুরী মহারাজের সান্নিধ্যে এসে দীক্ষা ও নিয়েছেন। সব শেষে তিনি আবিষ্কার করেছেন যত মত ততো পথ। সব পথ গিয়ে সেই পরম শক্তিতে মিশেছে সেই শক্তি তার কাছে মা কালী স্বয়ং যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে মাতৃ রূপে। স্বয়ং মা সারদার মধ্যেও তিনি মা কালীকে দেখছেন তার পুজোও করছেন তিনি।আজ যারা ভক্তি মার্গের সাধক তাদের কাছে শ্রী রামকৃষ্ণ এবং তার মাতৃ

ভক্তি এক প্রকার আদর্শ স্বরূপ।

 

আবার এমনই এক ভক্ত এবং তার সাধনার কথা নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।