Home Blog Page 41

শিব অবতার – পিপলাদ

শিব অবতার – পিপলাদ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

সনাতন ধর্মে যেমন বিষ্ণুর দশ অবতারের উল্লেখ আছে তেমনই দেবাদিদেব মহাদেবের একাধিক অবতার ও আছে|নানা অবতারের রূপ ধারণ করে বারবার পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন মহাদেব। পুরাণ থেকে তাঁর মোট উনিশটি অবতারের কথা জানা যায়|যদিও বিভিন্ন সময়ে শিব বিশেষ বিশেষ কারণে আরো কিছু রূপে

অবতীর্ণ হয়েছেন।

 

আজ শিবের একটি বিশেষ অবতার পিপলাদ বা পিপ্পল্লাদ সম্পর্কে জানবো।পিপলাদ একজন তেজদীপ্ত ব্রহ্ম ঋষি ছিলেন এবং তাকে সাক্ষাৎ শিবের অবতার রূপেই বিবেচনা করা হয়।

 

ত্যাগের মূর্ত প্রতীক সাধু দধিচি ও তাঁর স্ত্রী স্বর্চার সন্তান পিপলাদ হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন শিব। শৈশবে পিসি দধিমতির কাছে পালিত হয়েছিলেন তিনি। প্রবল পরাক্রমী ছিলেন পিপলাদ|এই পিপলাদ ও গ্রহ রাজ শনির মধ্যে একবার বিবাদ দেখা দেয়|

 

বড় হয়ে যখন পিপলাদ জানতে পারেন যে তাঁর বাবাকে সমস্যায় ফেলেছিলেন শনি। ক্ষুব্ধ পিপলাদ শনিকে অভিশাপ দিলে স্বর্গ থেকে পতন হয় শনির। দেবতারা এসে পিপলাদের কাছে শনির হয়ে ক্ষমাভিক্ষা করলে পিপলাদ শনিকে ক্ষমা করে দেন এবং বলেন যে শনির দৃষ্টি যার ওপর পড়বে, তিনি শিবের পুজো করলে শনির দশারে অশুভ প্রভাব কেটে যাবে। শুধু তাই নয় তিনি শনি দেবের থেকে এই প্রতিশ্রুতিও আদায় করে নেন যে যে ১৬ বছর বয়সের আগে কোনো বালকের কোনো ক্ষতি শনিদেব করতে পারবেন না।

 

আজও জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে শিবের পুজো করলে ও শিব কৃপা লাভ করলে শনি গ্রহের কু প্রভাব থেকে মুক্তি লাভ হয় এবং এই আস্থার মূলে আছেন মহর্ষি পিপলাদ।

 

সমগ্র চৈত্র মাস ধরে শিব মহিমা এবং শিবের একাধিক এমন অবতার ও শিব মন্দিরের ইতিহাস আপনাদের সামনে তুলে ধরবো। ফিরে আসবো

আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব তীর্থ – ছাব্বিশ শিব মন্দির

শিব তীর্থ – ছাব্বিশ শিব মন্দির

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

এর আগে আপনাদের বাংলার একশো আট শিব মন্দিরের কথা বলেছি। বাংলার বিভিন্ন স্থানে এমন অনেক প্রাচীন শিব মন্দির আছে যেখানে একটি দুটি নয় একত্রে একাধিক শিব মন্দির এবং শিব লিঙ্গের সমাহার লক্ষ্য করা যায়।

আজ আপনাদের নবাবী আমলে গড়ে ওঠা এমন এক প্রাচীন শিব মন্দিরের ইতিহাস জানাবো

যেখানে একসাথে ছাব্বিশটি শিব মন্দির আছে।

এবং এটাই এই শিব মন্দিরের বিশেষত্ব।

 

কিভাবে এই ছাব্বিশ শিব মন্দির তৈরী হয় এবং কে করেন এই ঐতিহাসিক নির্মাণ সব তথ্য আপনাদের সামনে উপস্থাপন করবো।

 

অভিভক্ত বাংলা বিহার উড়িষ্যায় পলাশী যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে নবাব বংশের সূর্য যখন অস্তমিত তখন সেই সময়ে এক শ্রেণীর মানুষ ব্রিটিশদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করে প্রচুর ধন সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। তাদের মধ্যে অনেকেই পরে হয়ে ধনী জমিদার রূপে আত্মপ্রকাশ করেন

 

এমনই এক উঠতি জমিদার ছিলেন রামহরি বিশ্বাস যিনি ব্রিটিশ কোম্পানির হয়ে দেওয়ানী করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। দানবীর ও ধর্মীয় কাজে উৎসাহী হিসাবে নাম হয় তার।

তিনি এক সময়ে খড়দায় বিরাট এক প্রাসাদ

নির্মাণ করে বাস করতে শুরু করেন। এই জমিদার ছিলেন শিব ভক্ত। তিনি খড়দায় তার প্রাসাদের কাছে বারোটি আটচালা শিব মন্দির

প্রতিষ্ঠা করেন।

 

পরবর্তীতে ১৮০৩ সালে জমিদার রামহরি

বিশ্বাস মারা যাওয়ার পর তাঁর দুই পুত্র প্রাণকৃষ্ণ বিশ্বাস ও জগমোহন বিশ্বাস জমিদারি দেখা শোনা করতেন তারাও ছিলেন ধার্মিক।ব্রিটিশ আমলে তীর্থযাত্রীদের তীর্থ কর দিতে হতো। জগমোহন বিশ্বাস এককালীন দু লক্ষ টাকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঘরে জমা দিয়ে সেই কর চিরদিনের মতো মুকুব করিয়ে দেন।

 

প্রাণকৃষ্ণ বিশ্বাসের তন্ত্র চর্চার অভ্যাস ছিল।পাশাপাশি শিবের উপাষক ছিলেন। তিনি পিতার তৈরি দ্বাদশ শিবমন্দিরের পরে আরও চোদ্দটি আটচালার শিব মন্দির তৈরী করেন। সেই নিয়ে খড়দহতে তাদের জমিদারিতে মোট ছাব্বিশটি মন্দির স্থাপিত হয়।একত্রে ছাব্বিশ শিব মন্দির নিঃসন্দেহে সেই সময়ে এক নজীর বিহীন

ঘটনা ছিলো।

 

জনশ্রুতি আছে প্রাণকৃষ্ণ বিশ্বাস তাদের শিব মন্দিরে শ্রীক্ষেত্র পুরীর মতো একটি ‘রত্নবেদী’ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। সেই জন্য তিনি

আশি হাজার শালগ্রাম শিলা ও কুড়ি হাজার বাণলিঙ্গ সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু ১৮৩৫

সালে অকাল প্রয়াণের পর সেই প্রক্রিয়া

অসম্পূর্ন থেকে যায়।

 

আজও বাংলার এই ঐতিহাসিক শিব মন্দির একটি অপূর্ব পুড়াতাত্ত্বিক এবং ধর্মীয়

নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে স্বমহিমায়।

 

ফিরে আসবো এমনই কোনো এক প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক শিব মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – নটরাজ রূপ

শিব অবতার – নটরাজ রূপ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

গোটা চৈত্র মাস ধরে ঠিক করেছি শিবের বিভিন্ন রূপ, শিব কে নিয়ে নানা পৌরাণিক ঘটনা এবং বাংলার প্রাচীন শিব মন্দির গুলি নিয়ে আলোচনা করবো।আজকের পর্ব শিবের নটরাজ রূপ নিয়ে|

 

পূরাণে কথিত আছে, শিব যখন ক্ষিপ্ত হন তখনই তার এই নটরাজ রূপ প্রকাশ্যে আসে, শিবের ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই নৃত্যরত নটরাজ রূপের মাধ্যমে|শিবের একশো টি নামের মধ্যেও আছে নর্তক ও নিত্যনর্ত নাম দুটি|

 

শিল্প কলা বিশেষত নৃত্যের সঙ্গে শিবের গভীর সম্পর্ক রয়েছে|কথিত আছে নৃত্য ও সঙ্গীত শিবের সৃষ্টি, তিনিই এই নৃত্যকলার প্রবর্তক| তাই তার আরেকনাম নটরাজ।শিবের সব থেকে প্ৰিয় দুটি নৃত্যের নাম হল তাণ্ডব ও লাস্য| তাণ্ডব ধ্বংসাত্মক এবং পুরুষালি নৃত্য ও লাস্য হলো তাণ্ডবের নারীসুলভ বিকল্প যার মধ্যে লুকিয়ে আছে সৃষ্টির আনন্দ| তাণ্ডব ও লাস্য নৃত্য যথাক্রমে ধ্বংস ও সৃষ্টির প্রতীক|।

 

আবার পুরান মতে গজাসুর এবং কালাসুর নামক দুই ভয়ঙ্কর অসুরকে নিধন করার পর শিব নটরাজ রূপে তান্ডব নৃত্য নেচে ছিলেন।

 

সমগ্র ভারতে বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে নটরাজ বেশে শিবের মূর্তি অত্যন্ত জনপ্রিয়। তিনি সব শিল্পীর পরম শ্রদ্ধেয় তার আশীর্বাদ নিয়ে অনেক শিল্পীই তার নৃত্য অনুষ্ঠান আরম্ভ করেন|অনেকেই শিবের নটরাজ মূর্তি বাড়িতে সাজিয়ে রাখেন, এক্ষেত্রে বাস্তু শাস্ত্র মতে নৃত্যরত শিবের মূর্তি রাখলে ঘরে পজেটিভ শক্তির মাত্রা মারাত্মক বেড়ে যায় তাই সর্বদা একজন বাস্তুবিদের পরামর্শ মেনে নটরাজ মূর্তি গৃহে রাখা উচিৎ।

 

আজকের পর্বে নটরাজ রূপ নিয়ে এইটুকুই, আবার ফিরবো পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব তীর্থ – দুর্গেস্বর মহাদেব

শিব তীর্থ – দুর্গেস্বর মহাদেব

 

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রীজাতক

 

সম্প্রতি উত্তর ভারতের কিছু বিখ্যাত শিব মন্দির দর্শন করলাম। ফিরে এসে মনে হলো বাংলায় এমন কতো প্রাচীন শিব মন্দির আছে

যেগুলো হয়তো সেভাবে প্রচারের আলোয় আসেনি। চৈত্র মাস চলছে আর কদিন পরেই নীল ষষ্টি এই সময় ধারাবাহিক ভাবে বাংলার প্রাচীন কিছু শিব মন্দিরের অজানা কথা নিয়ে আলোচনা করবো।আজ লিখবো কলকাতায় অবস্থিত দুর্গেশ্বর মহাদেব’ মন্দির নিয়ে।

 

বিশালকায় এই মন্দিরের উচ্চতা আনুমানিক পঞ্চাশ ফুট, ভাস্কর্যের রূপকার ছিলেন শিল্পী গদাধর দাস। এই মন্দিরের ভিতরে রয়েছে প্রায় দশ ফুট উচ্চতার শিবলিঙ্গ। এতবড় শিব কলকাতার কোন মন্দিরে নেই,প্রকাণ্ড আয়তনের শিবলিঙ্গের মাথায় জল ঢালতে হয় লোহার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে|

 

কলকাতার নিমতলা অঞ্চলে অবস্থিত দুর্গশ্বর মহাদেব’ মন্দির বাংলার প্রাচীন আটচালা মন্দির শিল্পের উৎকৃষ্ট উদাহরণ, হাটখোলার দত্ত পরিবারের মদনমোহন দত্তের দুই পুত্র রসিকলাল দত্ত এবং জহরলাল দত্ত এর প্রতিষ্ঠা করেন।আনুমানিক ১৭৯৪ সালে অর্থাৎ প্রায় আড়াইশ বছর আগে। শোনা যায় সেকালে এর পাশ দিয়ে বয়ে যেত গঙ্গা|

 

এই শিব মন্দির ও প্রতিষ্ঠিত শিব লিঙ্গ নিয়ে একটি অদ্ভুত গল্পও প্রচলিত আছে।শোনা যায়, একসময় এই শিবলিঙ্গ মাঝে মাঝে ‘নিজের জায়গা থেকে সরে’ গঙ্গায় চলে যেত এবং এই চলে যাওয়া আটকাতে শিবলিঙ্গ কে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখার রীতি প্রচলিত হয়। আজও সেই রীতি বজায় আছে।

 

বর্তমানে ভগ্নপ্রায় এই মন্দিরে আজও আসেন বহু দর্শনার্থী।বিশেষ বিশেষ তিথীতে বিশেষ পূজা ও জন সমাগম ও লখ্য করা যায়, অনেকেই মন্দিরকে বুড়ো শিবের মন্দির বা মোটা মহাদেব।

মন্দির ও বলেন|

 

আগামী দিনে এমন আরো অনেক প্রাচীন শিব মন্দিরে কথা নিয়ে ফিরে আসবো আপনাদের সামনে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – অর্ধনারীশ্বর রূপ

শিব অবতার – অর্ধনারীশ্বর রূপ

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

দেবাদিদেব মহাদেব বিষ্ণুর ন্যায় একাধিকবার একাধিক বিশেষ অবতারে ধরা দিয়েছেন এবং প্রতিটি রূপ বা অবতারের কিছু বিশেষ তাৎপর্য এবং কর্মকান্ড রয়েছে। শিবের এমনই এক তাৎপর্য পূর্ণ রূপ তার অর্ধনারীশ্বর রূপ। আজকের পর্বে এই রূপ নিয়ে লিখবো।

পুরান মতে শিবের বাহন ভৃঙ্গীর একবার ইচ্ছে হয়েছিল তার আরাধ্য শিবকে প্রদক্ষীণ করার। কিন্তু তাতে বাধ সাধলেন পার্বতী। তিনি তাঁর স্বামীর পাশে বসে থাকায় শিবকে প্রদক্ষীণ করতে পারলেন না ভৃঙ্গী কারন তিনি শুধু শিবকে প্রদক্ষিণ করবেন|উপায় না দেখে ভৃঙ্গী মাছির রূপ নিয়ে শিবকে প্রদক্ষীণ করার চেষ্টা করলেন। তখন পার্বতী তাঁর এবং শিবের মধ্যে সব ব্যবধান ঘুচিয়ে মিলে গেলেন মহেশ্বরের শরীরের সঙ্গে।সৃষ্টি হলো অর্ধনারীশ্বর রূপ|

বৈদিক একটি ব্যাখ্যাও আছে এই বিষয়ে|সৃষ্টির সূচনা লগ্নে ব্রহ্মার খেয়াল হয় যে জগত তো সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু প্রান চাই, আরো সৃষ্টি চাই। সেই ক্ষনে তার সামনে ভেসে উঠলো মহেশ্বরের আকার, যাঁর এক অংশ পুরুষের এবং বাকি অর্ধেক অংশ নারীর। এই দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রহ্মা নিজেকে দু’ভাগে বিভক্ত করে ফেললে তার ডান দিকের অংশ থেকে জন্ম নিল পুরুষ লিঙ্গের সব প্রাণী এবং বাঁ দিক থেকে জন্ম নিল সব প্রাণীর নারী লিঙ্গ।অর্থাৎ সৃষ্টিকর্মে ব্রম্ভাকে পথ দেখিয়েছিলো অর্ধ নারীশ্বর রূপ|

অর্ধনারীশ্বর রূপ সম্পর্কে আরো একটি পৌরাণিক ব্যাখ্যা আছে।একবার শিবের জটায় গঙ্গাকে অবস্থান করতে দেখে ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠেন পার্বতী। তাঁকে শান্ত করার জন্যে পার্বতীর শরীরের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দেন মহেশ্বর। একাংশে বর্তমান থাকে শিবের উপস্থিতি, অন্য অংশে বিরাজ করেন নারী শক্তি পার্বতী।শিব বুঝিয়ে দেন শিব ও পার্বতী এক এবং অভিন্ন।
তারা আলাদা নন|

শাস্ত্রে অর্ধনারীশ্বর রূপ নর এবং নারী শক্তির মিলিত রূপ যেখানে মহেশ্বর ত্রিনেত্র এবং চতুর্ভুজ রূপে বিরাজমান তার হস্তে রয়েছে
পাশ, রক্ত কমল, নরকপাল এবং শুল।অনন্ত
শক্তি এবং তেজের প্রতীক এই মূর্তি।

ফিরে আসবো দেবাদিদেবের অন্য রূপ এবং তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা এবং সেই সম্পর্কিত পৌরাণিক ঘটনা নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – বীরভদ্র রূপ

শিব অবতার – বীরভদ্র রূপ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শিবের বিভিন্ন রূপের মধ্যে তার তার বীর ভদ্র রূপটি অন্যতম। এটি শিবের একটি

ভয়াল এবং উগ্র রূপ। আজকের পর্বে বীরভদ্রকে নিয়ে লিখবো।

 

বীর ভদ্র একই সাথে শিবের অনুচর এবং শিবের অংশ। শিবের শরীর থেকেই তার জন্ম। দক্ষযজ্ঞর সময়ে সতী অপমানে দেহ ত্যাগ করলে ক্রোধে ফেটে পড়েন মহাদেব তখন শিবের ক্রোধাগ্নি থেকে বীর ভদ্রর জন্ম হয়। শিব একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে বীর ভদ্র কে সৃষ্টি করেন।

 

বীর ভদ্রর রূপ অতি ভয়ঙ্কর বীরভদ্রকে বহু বাহু বিশিষ্ট জটা ধারী হিংস্র মুখভঙ্গির বিরাট দেহ ধারী রূপে পুরানে চিত্রিত করা হয়েছে।বায়ু পুরান মতে তার সহস্র বাহু সহস্র চোখ এবং সহস্র পা রয়েছে।

বীর ভদ্র তরবারি, ত্রিশূল এবং ধনুক সহ বিভিন্ন অস্ত্র ধারণ করেন।

 

সৃষ্টির পর বীরভদ্র তার অনুচর রৌম্য এবং রূদ্র তুল্যকে নিয়ে দক্ষর যজ্ঞ স্থল আক্রমণ করেন এবং সব ধ্বংশ করেন।দক্ষকে হত্যা করেন এবং তার পত্নীকে বন্দী করেন।এর পরেও তার ক্রোধ ঠান্ডা না হলে স্বয়ং ব্রম্ভা এসে তার স্তুতি করেন এবং বীর ভদ্র শান্ত হন।

 

বীরভদ্রকে প্রায়শই ধ্বংসের সাথে যুক্ত করা হয় এবং তাকে ন্যায়বিচারের রক্ষক এবং প্রয়োগকারী হিসাবে বিবেচনা করা হয়।নন্দী এন ভৃঙ্গীর ন্যায় বীর ভদ্র শিবের অত্যান্ত প্রিয় অনুচর এবং বীর ভদ্র সর্বদা শিব আজ্ঞা পালনে প্রস্তুত।

 

ফিরে আসবো পরের পর্বে শিব মাহাত্ম নিয়ে। থাকবে শিব সংক্রান্ত অন্য একটি পৌরাণিক বিষয় নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – শরভেশ্বর রুপ

শিব অবতার – শরভেশ্বর রুপ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

চৈত্র মাস শিবের গুনগান করার মাস।তাই সারা চৈত্র মাস ধরেই শিব মহিমা বর্ণনা করবো।

আজকের পর্বে শিবের একটি বিশেষ রূদ্র রূপ শর্বেশ্বর বা শরভ অবতার নিয়ে আলোচনা করবো

 

নৃসিংহ দেবের হাতে হিরণ্য কশিপুর বধ হলো কিন্তু নৃসিংহদেবের ক্রোধ কম হল না। তিনি ভয়ানক ধ্বংসলীলা চালিয়ে যেতে থাকেন। এই সময়ে সব দেবতারা একসাথে শিবের শরণ নেন। তাঁরা বুঝতে পারেন একমাত্র মহাদেবই নৃসিংহ দেবের ক্রোধ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারেন। শিব বীরভদ্র ও ভদ্রকালীকে প্রেরণ করেন নৃসিংহকে থামানোর জন্য। কিন্তু মহাপ্রতাপ নৃসিংহ সেই দুই মহাশক্তিকেও বিপর্যস্ত করে ফেলেন। এমতাবস্থায় মহাদেব নিজেই শরভ নামের এক বিচিত্রদর্শন প্রাণীর রূপ নিয়ে আবির্ভূত হন।

 

শরভ এক সুবিশাল পাখি। তাঁর সহস্রবাহু এবং পশুর মতো দেহ|নৃসিংহ ও শরভ অবতারের মধ্যে ভয়ানক যুদ্ধ হয়|শরভের আঘাতে নৃসিংহ আত্মসংবরণ করেন। শরভই শেষ করেন নৃসিংহের লীলা।নৃসিংহ দেবের ক্রোধ থেকে রক্ষা পায় সৃষ্টি |

 

শিব নিজে একজন পরম বৈষ্ণব এবং নৃসিংহ দেব স্বয়ং বিষ্ণু| ভক্তের দ্বারা ভগবানের বধ বা ভক্ত এবং ভগবানের যুদ্ধ সনাতন ধর্ম শাস্ত্রের অতি বিরল ঘটনা|এই যুদ্ধ ও দুর্লভ অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় নৃসিংহ পুরান ও শিব পুরানে।

শরবেশ্বর শিবের উগ্র এবং ভয়াল একটি রূপ তাই সাধারণত সাধারণ ভক্তরা এই রূপের পুজো করেন না।

 

আগামী পর্বে শিব কে নিয়ে অন্য কোনো পৌরাণিক কাহিনী আপনাদের শোনাবো থাকবে তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা এবং তাৎপর্য। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ – ওঙ্কারেশ্বর

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ – ওঙ্কারেশ্বর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের পর্বে জানাবো মধ্যপ্রদেশের ওঙ্কারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গর কথা যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা পৌরাণিক ঘটনা।

 

মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর স্টেশন থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ওঙ্কারেশ্বর মন্দির। পাঁচতলা এই মন্দিরের গর্ভগৃহেই রয়েছে শিবলিঙ্গ। জাতিধর্ম নির্বিশেষে সবাই এখানকার শিবলিঙ্গ স্পর্শ করে পুজো দিতে পারেন। সারা বছর ধরেই পুণ্যার্থীরা এখানে পুজো দিতে আসেন।

 

কথিত আছে, শ্রীরামচন্দ্রের পূর্বপুরুষ ইক্ষাকু বংশের রাজা মান্ধাতা ও তাঁর দুই সন্তান অম্বরীশ ও মুচুকুন্দ এখানেই ভগবান শিবকে সন্তুষ্ট করেছিলেন।

 

হিন্দু শাস্ত্রমতে বিন্ধ্যাচল পর্বতমালার রক্ষক অসুর বিন্ধ্য নিজের পাপ স্খলনের জন্য মহাদেবকে প্রসন্ন করেছিলেন। তিনি বালি ও পলির মিশ্রণে একটি শিবলিঙ্গ তৈরি করেছিলেন এবং সাধনা করে ছিলেন।শিব তাঁর তপস্যায় প্রসন্ন হয়ে দুটি রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। একটি রূপ হল ওঙ্কারেশ্বর, অপরটি অমরেশ্বর।

নদীগর্ভের পলি ঘনীভূত হয়ে এখানে দেবনাগরী ‘ওঁ’ এর আকৃতি ধারণ করেছিল। সেই কারণে দ্বীপটির নাম রাখা হয় ওঙ্কারেশ্বর। সেখানেই আত্মপ্রকাশ করেছিল ওঙ্কারেশ্বর ও অমরেশ্বর। এখানকার মন্দিরে শিবের পাশাপাশি একটি পার্বতী ও একটি পঞ্চমুখী গণেশের মূর্তি রয়েছে।

 

ওঙ্কারেশ্বর দ্বীপটি প্রায় তিন বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত। মধ্যপ্রদেশের খাণ্ডোয়া জেলার এই মন্দির নর্মদা নদী ও তার উপনদী কাবেরীর তীরে মান্ধাতা দ্বীপে। যা ওঙ্কারেশ্বর দ্বীপ নামেও পরিচিত।রাজা মান্ধাতার নামে এই দ্বীপটি মান্ধাতা দ্বিপ নামেও খ্যাত।

 

এই ওঙ্কারেশ্বরের কাছে রয়েছে আদি শংকরাচার্যর গুহা। যেখানে গুরু গোবিন্দপাদের দর্শন পেয়েছিলেন আদি শংকরাচার্য। সেই গুহাটি রয়েছে ওঙ্কারেশ্বর মন্দিরের ঠিক নীচে। সেখানে আদি শংকরাচার্যের একটি মূর্তিও রয়েছে।

 

সারা বিশ্বের শিবভক্তদের কাছে ওঙ্কারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। শ্রাবণ মাসে এবং শিব চতুর্দশীর সময়ে এখানে ভক্তদের বেশি সংখ্যায় ভক্তদের আগমন ঘটে।

 

ফিরে আসবো শিব সংক্রান্ত ধারাবাহিক আলোচনা নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ – রামেশ্বরম মন্দির

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ – রামেশ্বরম মন্দির

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গগুলির মধ্যে যে মন্দিরটি নিয়ে আলোচনা করবো তা হলো ভারতের শেষ প্রান্তে অবস্থিত জ্যোতির্লিঙ্গ রামেশ্বরম।

 

ভারতের উত্তরে কেদারনাথ ও দক্ষিনে রামেশ্বরম,এক সরল রেখায় অবস্থান করছে,তার সাথে আরো অনেক গুলি শিব মন্দির মিলিত হয়েছে ওই একি সরলরেখায় এও এক বিস্ময়|

 

রামেশ্বরম ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের রামনাথপুর জেলার পাম্মান দ্বীপে অবস্থিত|এই দ্বীপ পাম্মান সেতু দ্বারা ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত এই সেতু কে অনেকে রামেশ্বর ব্রিজ ও বলে থাকেন|অপূর্ব সুম্দর এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বিশেষত সমুদ্র ও তার দুদিকের দুটি ভিন্ন রং দেখলে অবাক হতে হয়|সমুদ্র সৈকতটিও অতি সুম্দর|এখান থেকে শ্রীলংকার মান্নার দ্বীপের দূরত্ব মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার যা দূরবীনে চোখ রাখলে বেশ স্পষ্ট দেখা যায়।

 

রামানায়নে রাম ও রাবনের যুদ্ধতে রাবন বধ হন রামের হাতে, কিন্তু রাবন ছিলো নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ও বড়ো শিব ভক্ত তাই রাবন কে হত্যা করে ব্রহ্ম হত্যার জন্য দায়ী হন শ্রী রাম এবং সেই মহা পাপ থেকে মুক্তি পেতে তিনি ভারতের মাটিতে পা রেখে একটি শিব লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে তার আরাধনা করেন এবং ব্রহ্ম হত্যার পাপ থেকে মুক্ত হন।

ঠিক যেমন ব্রম্ভার একটি মাথা কেটে ফেলার পর শিব ব্রহ্ম হত্যার পাপ থেকে মুক্ত হতে কাশীতে এসে গঙ্গা স্নান করে ছিলেন সেই রকমই।

 

শ্রী রাম দ্বারা স্থাপিত সেই বিশেষ শিব লিঙ্গটি হলো এই রামেশ্বর শিব লিঙ্গ যা দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম|এই শিব লিঙ্গ শ্রীরামনাথস্বামী হিসাবে পরিচিত|

 

রামায়ন মহাভারতের ন্যায় সনাতন ধর্মশাস্ত্র গুলি যে নিছক মহাকাব্য নয়, তার প্রতিটি অক্ষর সত্যি তা উপলব্ধি করতে হলে একবার না একবার এখানে আসতেই হবে|রাম সেতু এবং রামেশ্বর মহাদেব সেই পুরাকাল থেকেই সেই সত্যকে প্রমান করে আসছে।রামেশ্বর শুধু দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ নয় ভারতের জনপ্রিয় চারধাম তীর্থের মধ্যে অন্যতম।

 

জনশ্রুতি আছে পুরী যেমন ভগবানের ভোজনের স্থান তেমনই রামেশ্বরম ভগবানের বিশ্রাম স্থান।

 

আগামী পর্বে যথা সময়ে ফিরে আসবো পরবর্তী জ্যোতির্লিঙ্গ নিয়ে আলোচনায়। পড়তে থাকুন।

  • ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ – মল্লিকার্জুন

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ – মল্লিকার্জুন

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীশৈলমে রয়েছে মল্লিকার্জুন জ্যোতির্লিঙ্গ যা অত্যন্ত জাগ্রত বলেই ভক্তদের বিশ্বাস।আজকের পর্বে এই জ্যোতির্লিঙ্গ নিয়ে লিখবো।

 

শ্রীশৈলমের মল্লিকার্জুন মন্দির একই সাথে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ এবং মহাশক্তিপীঠেরও অন্যতম। কথিত আছে, এখানে সতীর ওপরোষ্ঠ পড়েছিল।

তবে আজ শক্তি পীঠ হিসেবে নয় জানবো এই জ্যোতির্লিঙ্গর বিশেষত্ব এবং তাৎপর্য।

 

এখানের শিবমন্দিরটি পূর্বমুখী। এর মূল মণ্ডপে অনেকগুলো স্তম্ভ রয়েছে এবং নন্দীকেশ্বরের বিরাট মূর্তি রয়েছে।

 

শ্রীশৈলমের শিবমন্দির তৈরির পিছনে রয়েছে এক পৌরাণিক কাহিনি।যখন শিব এবং পার্বতী তাঁদের দুই ছেলে গণেশ ও কার্তিকের জন্য উপযুক্ত পাত্রীর সন্ধান করছিলেন। সেই সময় কার্তিক নাকি তর্ক জুড়েছিলেন, কে আগে বিয়ে করবেন, সেই ব্যাপারে। শিব তখন জানিয়েছিলেন, যে আগে বিশ্ব প্রদক্ষিণ করে আসতে পারবে, তারই আগে বিয়ে হবে। কার্তিক তাঁর বাহন ময়ূরে চেপে বিশ্ব প্রদক্ষিণে বেরিয়ে পড়েছিলেন। অপর দিকে বুদ্ধিমান গণেশ শুধু শিব-পার্বতীকেই সাতবার প্রদক্ষিণ করেছিলেন। শাস্ত্রমতে নিজের মা-বাবাকে প্রদক্ষিণ করলেই বিশ্ব প্রদক্ষিণ হয়ে যায়।গণেশ তাই সেই পথ বেছে নেয়।

 

পরবর্তীতে বুদ্ধি, ঋদ্ধি ও সিদ্ধির সঙ্গে গণেশের বিয়ে সম্পন্ন হয় । বিশ্ব প্রদক্ষিণ করে ফিরে এসে সেসব দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন কার্তিক। তিনি কুমার এবং ব্রহ্মচারী হিসেবে থাকার জন্য ক্রৌঞ্চ পর্বতে চলে যান। ছেলেকে ফিরিয়ে নিতে শিব এবং পার্বতীও সেখানে যান। কিন্তু, কার্তিক ফিরতে রাজি হননি। তখন শিব ও পার্বতী কাছাকাছি এক স্থানে থাকা শুরু করেন। যেখান থেকে শিব প্রতি অমাবস্যা এবং পার্বতী প্রতি পূর্ণিমায় গিয়ে কার্তিককে দেখে আসতেন। যে জায়গায় শিব ও পার্বতী নির্বাচন করেন সেই জায়গাই পরিচিত হয় শ্রীশৈলম নামে।সেই পবিত্র স্থানেই জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে স্বয়ং শিব বিরাজ করছেন।

 

সারা বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু ভক্ত আসেন এই মন্দিরে নিজের মনস্কামনা পূরণের প্রার্থনা জানাতে। তবে, অন্যান্য শিব মন্দিরের মতই শিবচর্তুদর্শী বা শিবরাত্রির দিন এই মন্দিরে ব্যাপক ভক্ত সমাগম হয়।এই স্থান দর্শন করলে একই সাথে শক্তি পীঠ এবং জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শনের পুন্য লাভ হয়।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী জ্যোতির্লিঙ্গ এবং সেই

সংক্রান্ত পৌরাণিক ঘটনা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।