Home Blog Page 42

ভক্তের ভগবান – মহাপ্রভু এবং ভক্ত হরিদাস

ভক্তের ভগবান – মহাপ্রভু এবং ভক্ত হরিদাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ভিন্ন ধর্মের সাথে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও একজন সাধক শুধু ভক্তির মাধ্যমে কিভাবে কৃষ্ণকে পেতে পারেন তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ ভক্ত হরিদাস।

 

ভক্ত হরিদাস বৈষ্ণব ধর্মের অন্যতম প্রচারক ছিলেন এবং মহাপ্রভুর সবথেকে প্রিয় শিষ্য হয়ে উঠেছিলেন।বাল্যকালে হরিদাস মুসলমানদের কাছে লালিত-পালিত হয়েছিলেন বলে তাকে যবন হরিদাস বলা হতো।

 

শ্রী চৈতন্য দেব যখন বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করছিলেন, সেই সময় কেঁড়াগাছি গ্রামের যবন হরিদাদের বড়ভাই সন্যাসী হয়ে চলে যান। যবন হরিদাস মায়ের গর্ভে থাকতে তার পিতাও সন্যাসী হয়ে অন্যত্র চলে যান এবং কিছু দিন পরে মৃত্যুবরণ করেন। এর পর এক মুসলিম দম্পতি হরিদাস কে সন্তান স্নেহে প্রতিপালন করতে থাকেন।

 

ক্রমে বয়স বাড়তে থাকলে হরিদাস সকল সময় হরিনাম জপ করতে শুরু করেন এবং একজন চৈতন্য ভক্ত হয়ে পড়েন। মুসলমান ঘরে হরিনাম জপ বন্ধ করার জন্য হাকিমপুরের প্রভাবশালী খাঁ সাহেবরা বিভিন্ন ভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। হরিদাস হাকিমপুর ছেড়ে যশোর জেলায় যান এবং কিছুদিন পরে তিনি শ্রী চৈতন্যদেবের শীষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং কয়েক মাসের মধ্যে হরিদাস শ্রী চৈতন্যের অন্যতম শীষ্য হন।

 

হরিদাস হরিনাম প্রচারে গৌরে থাকা কালীন গৌরের স্বাধীন সুলতান হোসেন শাহ সম্মানের সাথে গ্রহণ করেন।তিনি কোনদিন কোনও দেবদেবীর পুজা করেননি। হরিনাম জপ-ই ছিলো তার মূলমন্ত্র।

 

একবার কাগজপুকুরের জমিদার হরিদাসকে পরীক্ষা করার জন্য তার রক্ষিতা নর্তকী হীরামতিকে পাঠালেন। হীরামতি হরিদাসের ধ্যান ভঙ্গ করার জন্য রাতে কয়েক ঘন্টা নাচগান করে ক্লান্ত ও শ্রান্ত হয়ে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ে গেলো। অবশেষে স্বাভাবিক ভাবে হরিদাসের ধ্যান ভঙ্গ হলে তিনি রক্ষিতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- ‘মা তুই ছেলেকে দেখতে এসেছিস? মা ডাক শুনে সেই নর্তকী তার কাছে ক্ষমা চেয়ে সেই স্থান থেকে চলে যান।

 

শোনা যায় একবার হরিদাস ঠাকুরের নাম জপ বন্ধ করার জন্য এক দুষ্ট কাজী সাহেব তাকে বেত্রাঘাতের সাজা দেন। অসংখ্য বার বেতের আঘাত সহ্য করেও তার হরিনাম বন্ধ করা যায়নি। তিনি তিন লক্ষ বার হরে কৃষ্ণ মহা মন্ত্র জপ করেছিলেন।

 

প্রতিদিন তার গৃহে আসতেন মহাপ্রভু। দেহ ত্যাগের পর তার দেহ স্বয়ং মহাপ্রভু এবং তার পার্শদরা মিলে পুরীতে সমুদ্রের ধারে সমাহিত করেন এবং সেখানে গড়ে ওঠে হরিদাসের সমাধি মন্দির যেখানে আজও অখণ্ড হরিনাম হয়।

 

আবার এমনই এক ভক্তের ভক্তি এবং সেই সংক্রান্ত নানা ঘটনা নিয়ে ফিরে আসবো।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

 

ভক্তের ভগবান – শ্রী কৃষ্ণ এবং মীরা বাই

ভক্তের ভগবান – শ্রী কৃষ্ণ এবং মীরা বাই

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শ্রী কৃষ্ণ প্রেমের প্রতীক হিসেবে সারা বিশ্বে মীরা বাই এক পরিচিত নাম। তাকে নিয়ে লেখা হয়েছে অসংখ্য ভজন। বহু গান এবং কবিতা। আজকের পর্বে এই মহান ক্রিস ভক্ত এবং তার ভক্তি

প্রসঙ্গ নিয়ে লিখবো।

 

রাজস্থানের একটি রাজপুত পরিবারে রাজা রতন সিং এবং বীর কুমারীর ঘরে 1498 সালে মীরা বাই জন্মগ্রহন করেছিলেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিক প্রকৃতির এবং তার কণ্ঠে ছিলো অদ্ভুত সুর। ভক্তি গীতি গাইতে পারতেন এবং ভজন তৈরী করতে পারতেন।

 

চার বছর বয়সে তিনি তার মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে তার বর কে হবে? তার মা মজা করে শ্রী কৃষ্ণের মূর্তির দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন যে তিনিই তার বর হবেন।

 

সেই মুহূর্ত থেকে মীরা শ্রী কৃষ্ণের প্রেমে হারিয়ে যান তিনি যখন বড় হচ্ছিলেন তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে শ্রী কৃষ্ণ তাকে বিয়ে করতে চলেছেন। মনে মনে তিনি তার আরাধ্য কৃষ্ণকে প্রেমিক বা স্বামী হিসেবে চেয়ে ছিলেন।

 

পরবর্তীতে তার বিয়ে হয় মেওয়ারের রানা সাঙ্গার সাথে। যদিও তিনি বিয়ে করতে চাননি কারণ তিনি শ্রী কৃষ্ণকে তার স্বামী বলে মনে করেন কিন্তু তিনি তার পরিবারের পীড়াপীড়িতে বিয়ে করেছিলেন। বিবাহিত হওয়ার পরেও কৃষ্ণের প্রতি তার ভালবাসা কমেনি এবং তিনি তার কৃষ্ণ মূর্তিটিকে তার স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যান।দিন রাত তিনি কৃষ্ণ প্রেমেই ডুবে থাকতেন।

 

সংসারের মীরা তার দৈনন্দিন সব কাজ শেষ করে প্রতিদিন শ্রী কৃষ্ণের মন্দিরে যেতে শুরু করে।তিনি শ্রীকৃষ্ণের পূজা করতেন এবং তার সুরেলা কণ্ঠে ভজন গাইতেন। এটা দেখে তার শাশুড়ি চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং কৃষ্ণের পরিবর্তে

তাকে কালী মাতার পূজা করতে বলেন।

 

মীরা তা করতে অস্বীকার করেন এবং তাদের জানান যে তিনি ইতিমধ্যেই কৃষ্ণকে তার

জীবন উৎসর্গ করেছেন। ধীরে ধীরে ভক্ত মীরা এবং তার ভগবানের মধ্যে প্রাচীর তৈরী করার চেষ্টা শুরু হয়। তার কৃষ্ণ প্রেম নিয়ে সংসারে অশান্তি দেখা দেয়। তা এতটাই চরমে পৌছায় যে মীরা বাইকে হত্যার চেষ্টা করা হয়।

 

একবার তাকে হত্যা করার জন্য সাপ সহ একটি মালা পাঠানো হয় কিন্তু ঝুড়িটি খুললেই মীরা বাই মালাগুলির মধ্যে একটি কৃষ্ণের মূর্তি দেখতে পান।

 

মীরাকে হত্যা করার জন্য আরও বেশ কয়েকটি প্রচেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু কৃষ্ণ সর্বদা তাকে রক্ষা করেছিলেন। এক সময় প্রসাদ আকারে তাকে বিষ খাওয়ানো হয় এই বলে যে এটা কৃষ্ণের প্রসাদ। যদিও তিনি জানতেন যে এটি বিষ ছিল কিন্তু তবুও তিনি এটি খেয়েছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা সেই বিষটি অমৃতে পরিণত হয়েছিল।

 

এরপর মীরা তুলসীদাসকে চিঠি লিখে তার মতামত জানতে চান। এর জবাবে তুলসীদাস বললেন শুধুমাত্র ঈশ্বরের জন্য ভালবাসা বাস্তব এবং অন্য সব সম্পর্ক এই প্রেমের কাছে তুচ্ছ।

এরপর মীরা কৃষ্ণের চরণে নিজেকে সম্পূর্ণ

ভাবে উৎসর্গ করতে দ্বারকা চলে যান।

 

মীরা বাইয়ের অন্তর্ধান ও বেশ অলৌকিক মনে করা হয় মীর বাইয়ের আত্মা চিরকালের জন্য শ্রী কৃষ্ণের মূর্তিতে বিলীন হয়েছিল।

 

আবার এক ভক্ত এবং তার ভক্তির কথা নিয়ে আগামী পর্বে ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – সাধক কমলাকান্ত এবং মা কালী

ভক্তের ভগবান

 

সাধক কমলাকান্ত এবং মা কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার মাতৃ সাধকদের মধ্যে সাধক কমলা কান্ত ছিলেন মাকালীর সাক্ষাৎ বরপুত্র। একাধিক বার তাকে নানা বিপদ থেকে স্বয়ং মা কালী রক্ষা করেছেন। আজ এই মহান কালী ভক্ত এবং তার জীবনে মা কালীর ঘটানো কিছু অলৌকিক ঘটনার কথা জানাবো।

 

কমলাকান্তের জন্মস্থান বর্ধমান জেলার গঙ্গাতীরস্থ অম্বিকা কালনা। মাতার নামা মহামায়া, পিতার নাম মহেশ্বর। দশ বছর বয়সে তাঁর পিতৃবিয়োগ হয়। বালক কমলাকান্ত সুগায়ক ছিলেন এবং রামপ্রসাদের গানে বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি মাঠে ঘাটে আপনমনে গান গেয়ে বেড়াতেন। শোনা যায়, একদিন রাত্রে গঙ্গাতীরের শ্মশানের অন্ধকারে আত্মমগ্ন হয়ে গান গাইবার সময় এক অশরীরী তান্ত্রিক কাপালিক তাঁকে কালীনামে দীক্ষা দিয়ে যান এবং সেই মন্ত্র জপ করতে করতে সেখানেই আনন্দময়ী নৃত্যরতা শ্যামা মায়ের দর্শন পান।

 

বর্ধমানের মহারাজ তেজ চাঁদ কমলাকান্তের গানে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে সভা পণ্ডিত করে বর্ধমান রাজবাড়িতে নিয়ে যান।মহারাজ তেজচাঁদ কমলাকান্তকে এই কালীমন্দির গড়ে দেন। এখানেই সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেন সাধক কমলাকান্ত।

 

তার তন্ত্র এবং অলৌকিক ক্ষমতা জানতে মহারাজ তেজ চাঁদ অমাবস্যার রাতে তার কাছে চাঁদ দেখতে চেয়েছিলেন। কমলাকান্ত তাকে চাঁদ দেখিয়ে ছিলেন।

 

একদিন রাজা জানতে পারেন কাজকর্ম ভুলে মদ্যপান করছেন কমলাকান্ত। রাজা সেখানে পৌঁছে ক্ষোভ প্রকাশ করলে কমলাকান্ত কমণ্ডলু থেকে রাজার হাতে ঢেলে দেন সুরা। কমলাকান্তের অলৌকিক ক্ষমতায় সেই সুরা পরিণত হয় দুধে।

 

মা কালীর মূর্তির প্রাণ রয়েছে দাবি করেছিলেন কমলাকান্ত। রাজা প্রমাণ চাইলে প্রতিমার পায়ে বেল কাঁটা ফুটিয়ে দেন কমলাকান্ত। রাজা দেখেন সেই ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছে।এমনই ছিলো তার ভক্তি এবং তার আরাধ্যা মা কালীর সাথে তার সম্পর্ক।

 

দেহত্যাগের সময় কমলাকান্তকে গঙ্গায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন রাজা। কমলাকান্ত যেতে চাননি। তারপরই দেখা যায় মাটি ভেদ করে উঠে জলের ধারা পড়ছে কমলাকান্তের মুখে। কমলাকান্ত নিজে যেতে না চাওয়ায় মা গঙ্গা এসেছিলেন তাঁর কাছে।

আজও সেই স্থান সংরক্ষিত আছে।

 

আগামী দিনে আরো অনেক ভক্ত এবং তাদের কর্মকান্ড নিয়ে ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান : জগন্নাথ দেব এবং গণেশ ভট্ট

ভক্তের ভগবান

জগন্নাথ দেব এবং গণেশ ভট্ট

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

নানা সময়ে পুরীর জগন্নাথদেবকে নানা বেশে সাজানো হয়।প্রতিটি বেশের আছে আলাদা ব্যাখ্যা এবং আধ্যাত্মিক তাৎপর্য।জগন্নাথদেবের একটি বিখ্যাত বেশ হলো হাতি বেশ বা গজ বেশ |হাতিবেশ রথযাত্রার আগে স্নান যাত্রার সময় দেখা যায় । এই সময়ে গণপতির বেশে জগন্নাথকে সাজানো হয় বলে নাম ‘হাতি বেশ’।এই গজ বেশের নেপথ্য একটি একটি বিশেষ ঘটনা আছে যে ঘটনার প্রধান চরিত্র ভক্ত গণেশ ভট্ট বা গণপতি ভট্ট।আজকের পর্বে এই ভক্ত এবং তার সাথে ভগবানের করা একটি লীলা সম্পর্কে আপনাদের জানাবো।

পন্ডিত গণেশ ভট্ট ছিলেন পুরান এবং বিভিন্ন শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ। তিনি ছিলেন গণপতির উপাষক
তিনি শাস্ত্র পড়ে জানতে পেরে ছিলেনযে পুরীতে ভগবানের বামন অবতার বিরাজমান এবং রথে সেই বামন অবতারকে দর্শন করলে ব্রহ্মজ্ঞান হয়। আত্মার মুক্তি হয়। তিনি পুরীর উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।পুরীর পথে তিনি দেখলেন বহু তীর্থ যাত্রী সেই বামন অবতার দর্শন করে আনন্দ করতে করতে ফিরে আসছেন। তার মন ভেঙে গেলো তিনি ভাবলেন যারা জগন্নাথ দর্শন করেছেন তাদের যদি মুক্তি লাভ হয় তবে তারা ফিরে আসে কি করে।তাদের তো পরমব্রহ্মতে বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা। তার মনের সন্দেহ দুর করতে জগন্নাথদেব ছদ্মবেশে তাকে দর্শন দিলেন এবং বললেন জগন্নাথ দেব সবার মনোস্কামনা পূর্ণ করেন। এই ভক্তরা বাড়ি ফেরার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল তাই তারা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।

তারপর গণেশ ভট্ট পুরীতে যান কিন্তু জগন্নাথদেব দর্শন করে তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি মনে মনে তার আরাধ্য গণেশের রূপ কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু জগন্নাথ দেবের রূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার মনের কথা বুঝতে পেরে প্রভু জগন্নাথ পুরীর রাজাকে আদেশ দেন যে তিনি যেনো আরো একবার গণেশ ভট্টকে নিয়ে আসেন।

তারপর পুরীর রাজা তাঁকে জহগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা দেখবার জন্য আহ্বান জানান। রাজার অনুরোধে স্নানযাত্রায় গিয়ে গণেশ ভট্ট আবিষ্কার করেন জগন্নাথ গণেশ রূপেই তাকে দেখা দিয়েছেন।সেই ঘটনার পর থেকেই স্নান যাত্রায় জগন্নাথের বেশ হয় হাতিবেশ।

ভক্তের মনে যদি ভক্তি অটুট থাকে এবং আস্থা থাকে ভগবান তার মনোস্কামনা পূর্ণ করেন। তার জন্য তিনি নিজের রূপ বদলাতেও দ্বিধা করেননা।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে আরো ভক্তের কথা নিয়ে। থাকবে আরো একটি অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান – বজরংবলী এবং তুলসী দাস

ভক্তের ভগবান – বজরংবলী এবং তুলসী দাস
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
তুলসী দাস শুধু রামচরিত মানস বা হনুমান চালিসার রচয়িতা ছিলেনন তিনি ছিলেন বজরংবলীর এক মহান ভক্ত যাকে দেখা দিয়েছিলেন স্বয়ং হনুমান এবং তিনি শ্রী রামের দর্শনও পেয়েছিলেন।আজ আপনাদের জানাবো মহান এই সাধক এবং তার আরাধ্য বজরংবলীর মিলনের এক অদ্ভুত ঘটনা।
বৃন্দাবনে থাকা কালীন প্রতিদিন স্নান করে ফিরে আসার সময় তুলসীদাস তার জলের পাত্রে থেকে যাওয়া জল একটি গাছের গোড়ায় ফেলে দিতেন।
এই গাছে বাস করতো এক প্রেত আত্মা। একদিন সে তুলসী দাসের সামনে প্রকট হলো।
তুলসীদাসের উপর খুব খুশি হয়ে সেই আত্মা বলল, “হে সাধক আপনার এই জলদান আমাকে ধন্য করেছে। আমি মুক্তির পথ পেয়েছি ! আমি আপনার কি সাহায্য করতে পারি।তুলসীদাস উত্তর দিলেন, “আমাকে ভগবান রামের দর্শন করতে দাও”। আত্মা বলল, “হনুমান মন্দিরে যান সেখানে হনুমান একজন কুষ্ঠরোগীর ছদ্মবেশে প্রথম শ্রোতা হিসেবে রামায়ণ শোনার জন্য আসেন এবং সবার শেষে যান। তাকে আগে দর্শন করুন। তিনি পথ বলে দেবেন।
সেই কথা মতো তুলসী দাস রাম কথায় যান
এবং হনুমানকে চিনতে পেরে তাকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। হনুমান দিব্য দর্শন দিলে তুলসীদাস সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পায়ে পড়ে যান। তার চোখে আনন্দর অশ্রু চলে আসে।হনুমান তার ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে প্রভু রামের দর্শন পাওয়ার বর দেন।
স্বয়ং হনুমানের দর্শন পেয়ে তুলসীদাস হনুমান চালিসা রচনা করেন। শোনা যায় একধিক বার বজরংবলী তার সামনে হাজির হন এবং তাঁকে ঐশ্বরিক জ্ঞান দিয়ে আশীর্বাদ করেন।
রামচরিতমানস লেখার সময়ও হনুমান তুলসীদাসকে সাহায্য করেছিলেন। তুলসীদাস যখন একটি শ্লোকে আটকে যেতেন হনুমান এসে পরবর্তী শ্লোক তৈরীতে সাহায্য করতেন।
ভক্ত এবং ভগবানের এমন অনেক ঘটনা এবং
তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নিয়ে আবার পরবর্তী পর্বে ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান : তিরুপতি বালাজি এবং অনন্ত আচার্য্য

ভক্তের ভগবান

 

তিরুপতি বালাজি এবং অনন্ত আচার্য্য

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ভগবান বহুবার বহু অবতারে, ভিন্ন ভিন্ন রূপে ভক্তের উদ্ধারের জন্য পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন

মনে করা হয় কলিযুগের দুঃখ ও যন্ত্রণা থেকে মানব সমাজকে মুক্ত করতে ভগবান বিষ্ণু তিরুমালায় ‘ভেক্টেশ্বর’ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

তিরুপতি মন্দিরের আরাধ্য দেবতা ভেঙ্কটেশ্বর। তাকে ভগবান বিষ্ণুর অবতার রূপেই দেখা হয়।

আজকের পর্বে আপনাদের তিরুপতি বালাজির এক অদ্ভুত লীলার কথা লিখবো।

 

একবার তিরুপতি মন্দিরে বালাজি দর্শনে এসেছিলেন পরম বৈষ্ণব এবং বালাজির

ভক্ত অন্তত আচার্য্য এবং তার স্ত্রীর। প্রচন্ড গরমে বালাজির কষ্ট ভক্তের মনকে দুঃখ দিয়েছিলো। তিনি বুঝলেন এই রুক্ষ পাহাড়ি অঞ্চলে আদ্রতা এবং গরমের জন্য বালাজির কষ্ট হচ্ছে। কিছু একটা করা দরকার। তিনি ঠিক করলেন এই মন্দির পরিসরে তিনি নিজে হাতে একটি পুকুর খনন করবেন যাতে বালাজির চারপাশ ঠান্ডা থাকে এবং ইচ্ছে হলে তিনি নৌকা বিহার ও করতে পারেন।

 

নিজে হাতে কোদাল চালিয়ে তিনি পুকুর খনন করতে শুরু করলেন এবং স্ত্রীকে আদেশ দিলেন মাটি একটি ঝুড়িতে করে দূরে একটি নিদ্দিষ্ট স্থানে ফেলে আসতে। তার মাটি কাটার সাথে সাথেই তার স্ত্রী ঝুড়ি খালি করে ফিরে আসছিলেন। এতো তাড়াতাড়ি কি করে এ কাজ সম্ভব এটা ভেবে অবাক হয়ে যান অনন্ত আচার্য্য। স্ত্রীকে প্রশ্ন করতে তিনি বললেন একটি চতুর্ভুজ কৃষ্ণ বর্ণের বালক তার হাত থেকে ঝুড়ি নিয়ে নিজেই মাটি অন্য জায়গায় ফেলে আসছে। ভক্ত বুঝলেন এ নিশ্চই স্বয়ং ভগবান বালাজি। তিনি স্ত্রীকে অনুসরণ করে বালাজিকে দেখে ফেললেন।বালাজি বললেন তাদের এই কষ্ট তিনি দেখতে পারছেন না তাই সাহায্য করতে এসেছেন।

 

বালাজির প্রতি তার বাতসল্য ভাব ছিলো। নিজের সখা হিসেবে তিনি বালাজিকে তিরস্কার করে লাঠি উঁচিয়ের বললেন তিনি এটা ঠিক করছেন না। ভক্তের অধিকার ভগবানের সেবা করা। এই অধিকার ভগবানও কেড়ে নিতে পারেনা।বালাজি তার ধমক খেয়ে অন্তর্ধান হলেন।

 

সেই রাতে তিরুপতির রাজাকে বালাজি স্বপ্নে দেখা দিলেন এবং নির্দেশ দিলেন মন্দিরে একটি পুকুর খনন করতে। এক রাতেই রাজা সেই পুকুর খনন করিয়ে ছিলেন।

 

আজও তিরুপতি মন্দিরে ভক্ত অনন্ত আচার্য্যর সেই লাঠি রাখা আছে যা মন্দিরে আগত দর্শণার্থীরা দর্শন করেন।

 

আবার পরের পর্বে ভগবানের এমনই এক দিব্য এবং অলৌকিক লীলা নিয়ে ফিরে আসবো।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান : সাধক রামপ্রসাদ এবং মা কালী

ভক্তের ভগবান

সাধক রামপ্রসাদ এবং মা কালী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

ভারতের শক্তি সাধক বা মা কালীর উপাসক হিসেবে সাধক রাম প্রসাদ এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
কালী ভক্ত হিসেবে তিনি শ্যামা সংগীতকেই নিজের সাধনার মাধ্যম করেছিলেন। তার জীবনে একাধিক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে তবে এজ এমন একটি ঘটনার উল্লেখ করবো যেখানে এই মাতৃ ভক্তকে স্বয়ং মা কালী দেখা দেন এবং সাহায্যর হাত বাড়িয়ে দেন।

কবিরঞ্জন রামপ্রসাদ সেনের জন্ম আনুমানিক ১৭১৮ থেকে ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে। তাঁর প্রয়াণ আনুমানিক ১৭৭৫ সালে।

নিজের হাতে ছোট্ট এক ছাউনি তে মাতৃ প্রতিমা গড়ে মায়ের ধ্যান, পূজা, হোম, যজ্ঞ নিয়ে তার দিন কাটতো । মায়ের নাম জপ করতেন অষ্টপ্রহর। এরই ফাঁকে মাকে শোনাতেন স্বরচিত শ্যামাসঙ্গীত। গান গাইতে গাইতে চোখ দিয়ে নেমে আসতো অশ্রু।রামপ্রসাদ রচিত শ্যামাসংগীতে মা কালী ভয়ংকর ও উগ্ররূপিণী দেবী নন। কখনও তিনি মা, কখনও মেয়ে।তার কালী সাধনা ছিলো সহজ সরল এবং আবেগ সর্বস্ব। এই সাধনাতেই তুষ্ট হয়ে মা কালী রামপ্রসাদকে দর্শন দিয়ে ছিলেন।

একবার তিনি একবার বাড়িতে নিজে হাতে বেড়া বাঁধছিলেন। সেই সময় কাছেই তাঁর মেয়ে খেলা করছিল। মেয়ের থেকে দড়ি চেয়েছিলেন রামপ্রসাদ। মেয়ে খেলার আনন্দে সেই ডাককে গুরুত্ব দেয়নি। সেই সময়ে দেবী নিজে তাঁর মেয়ের রূপ ধরে রামপ্রসাদের হাতে বেড়ার দড়ি তুলে দিয়েছিলেন। পরে আসল সত্য উপলব্ধি করেছিলেন রামপ্রসাদ। বুঝে ছিলেন তার কালী সাধনা স্বার্থক হয়েছে। তিনি মা কালীর দেখা পেয়েছেন। কন্যা রূপে মা তাকে দেখা দেন।
তার গানে তিনি এই ঘটনার উল্লেখ করছেন।

তার মৃত্যু নিয়েও আছে একটি অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ।জীবনান্তের পূর্ব লক্ষণ বুঝতে পেরে তিনি বিশেষ পূজা করেন তাঁর আরাধ্যার। মৃন্ময়ীর মূর্তি বিসর্জনের কালে তিনি তাঁর নিজের লেখা গান গাইতে গাইতে হালিশহরের ভাগীরথী তীরে উপস্থিত হন। গঙ্গা বক্ষে অর্ধনাভি নিমজ্জিত রেখে দণ্ডায়মান অবস্থাতেই ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। কথিত আছে প্রয়াণ মুহূর্তেও তিনি একটি শ্যাম সংগীতের পদ উচ্চারণ করছিলেন – ‘মা গো, ও মা আমার দফা হল রফা। এমনই ছিলো তার মাতৃ ভক্তি।

আবার ফিরে আসবো অন্য এক ভক্ত এবং ভগবানের লীলা নিয়ে আগামী পর্বে।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান : জগন্নাথদেব এবং কর্মা বাই

ভক্তের ভগবান

 

জগন্নাথদেব এবং কর্মা বাই

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শাস্ত্রে আছে শ্রী ক্ষেত্র পুরী ভগবানের ভোজনের স্থান। অন্যান্য খাদ্যের মধ্যে জগন্নাথ দেবের প্রিয় খাদ্য খিচুড়ি এবং খিচুড়ি সাধারণ খিচুড়ি নয়।এই খিচুড়ির নাম কর্মাবাই খিচুড়ি’। এই খিচুড়ির সাথে জড়িয়ে আছে ভক্তের সাথে ভগবানের এক অপূর্ব লীলা। আজকের পর্বে সেই লীলা এবং তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা আপনাদের সামনে তুলে ধরবো।

 

পুরীতে এক সময়ে কর্মাবাই নামে একজন বৃদ্ধা বাস করতেন। তিনি জগন্নাথকে নিজের পুত্র রূপে দেখতেন এবং তাঁকে বালক রূপে সেবা করতেন।

মনে করা হয় ভগবানকে ভক্ত যে রূপে পুজো করবে ভগবান সেই রূপেই ধরা দেবে।জগন্নাথও কর্মা বাইকে পুত্র রূপে ধরা দিয়েছিলেন।

 

কর্মা বাইয়ের মনে হত সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই জগন্নাথ দেবের খিদে পেয়ে যায়। তাই তিনিও খুব সকালে ঘুম থেক উঠে স্নান না করেই খিচুড়ি রান্না করতে বসতেন।প্রতিদিন ভোরে বালক রূপ ধরে জগন্নাথদেব কর্মাবাইয়ের খিচুড়ি খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতেন। এই খিচুড়ির স্বাদ ছিল জগন্নাথদেবের বড়ই প্রিয়।

 

খুব ভরে বৃদ্ধা কর্মা বাইয়ের পক্ষে প্রতিদিন স্নান করা সম্ভব হতোনা।একদিন মন্দিরের এক পূজারী কর্মাবাইকে স্নান না করেই খিচুড়ি রান্না করে জগন্নাথদেবকে ভোগ নিবেদন করতে দেখেন। তিনি কর্মাবাইকে নিষেধ করে বলেন যে প্রভুর ভোগ রান্না এবং নিবেদনের আগে দেহে এবং মনে বিশুদ্ধ হওয়া জরুরি।স্নান না করে ভোগ রান্না শাস্ত্র বিরুদ্ধ।পরদিন সাধুর কথামতো কর্মাবাই স্নান সেরে নিয়ম মেনে যখন জগন্নাথ দেবকে খিচুড়ি ভোগ দেন।তাতে দেরি হয়ে যায় অনেকটা। সকাল থেকে ক্ষুদার্থ জগন্নাথ দেব বেলার দিকে

কর্মা বাইয়ের বানানো গরম খিচুড়ি খেয়ে দুপুরে আর ভোগ গ্রহণ করলেন না।

 

পরে সেবাইতএ অনুসন্ধান করে দেখেন যে

প্রভুর মুখে খিচুড়ি লেগে আছে।পরবর্তীতে জগন্নাথদেব স্বয়ং তার বিশেষ এবং ঘনিষ্ট কয়েকজন সেবককে স্বপ্নে কর্মাবাইয়ের বৃত্তান্ত শোনান এবং তাদের আদেশ করেন তিনি যেন আগের মতোই খুব ভোরে স্নানের আগেই জগন্নাথের জন্য খিচুড়ি রান্না করে ভোগ নিবেদন করেন।সেবকরা কর্মাবাই এর কাছে ছুটে গিয়ে ক্ষমা চান এবং প্রভুর আদেশ শোনান।

 

তারপর থেকে শুরু হয় খুব সকালে বাল্য ভোগে জগন্নাথ দেবকে খিচুড়ি দেওয়ার নিয়ম।যতদিন কর্মা বাই জীবিত ছিলেন তিনি নিজেই খিচুড়ি বানাতেন।শোনা যায় কর্মাবাইয়ের মৃত্যুতে জগন্নাথদেব কেঁদে ছিলেন।

কর্মা বাইয়ের অনুপস্থিতিতে পুরীর রাজার নির্দেশে পুরী মন্দিরের বাল্যভোগে ” কর্মাবাই খিচুড়ি ” রান্না চালু হয়।আজও জগতের নাথের দিন শুরু হয় তার ভক্তের নামাঙ্কিত ভোগ দিয়ে।

 

ভক্তের ভক্তি যদি নিখুঁত হয় ভগবান তাকে বুকে টেনে নেন এবং ভক্তের দুঃখে ভগবানের চোখেও জল আসে। এই ঘটনা তা আরো একবার প্রমান করে।

 

ভক্ত এবং ভগবানের এমন নিবিড় সম্পর্ক এবং লীলা নিয়ে আবার ফিরে আসবো যথা সময়ে।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ভক্তের ভগবান : জগন্নাথদেব এবং ভক্ত রঘু

ভক্তের ভগবান

 

জগন্নাথদেব এবং ভক্ত রঘু

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ভক্তের প্রতি ভগবানের এবং ভগবানের প্রতি ভক্তের যতগুলি ভাব শাস্ত্রে উল্লেখিত আছে তার মধ্যে অন্যতম সখা ভাব। এই ভাবে ভগবান হয়ে ওঠেন ভক্তের বন্ধু।আজ প্রভু জগন্নাথের একটি বিশেষ লীলা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করবো। এই লীলাতে প্রভুর সখা ভাব ফুটে উঠেছে।

 

জগন্নাথ ধামে রঘু নামে জগন্নাথের এক ভক্ত ছিলো।সে নিজেকে জগন্নাথের সখা রূপে কল্পনা করতো।জগন্নাথদেব ও তাকে বালক রূপে দর্শন দিতো।

 

একবার ভগবান জগন্নাথ তার ভক্ত রঘুকে বালক রূপে দর্শন দিলেন এবং তাঁকে রাজার বাগান থেকে কাঁঠাল চুরি করতে তাঁর সঙ্গে যেতে বললেন। রঘু বলল, “তুমি কেন কাঁঠাল চুরি করতে চাও? তোমার যদি কাঁঠাল খাবার ইচ্ছা হয়, আমাকে বল-আমি তোমার জন্য সুন্দর একটি কাঁঠাল এনে দেব।” বালকরূপী জগন্নাথ সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললেন কৃষ্ণরূপে আমি অন্যদের বাড়িতে মাখন চুরি করতে যেতাম। চুরি করা দ্রব্য ভোজনে বিশেষ আনন্দ আছে। আজ তোমাকে আমি উপলব্ধি করাব চুরি করা কি আনন্দের। আমার সঙ্গে এসো।”

 

রঘু বুঝলো আজ আর মুক্তি নেই।

নিরুপায় হয়ে রঘু প্রভুর প্রস্তাবে সম্মত হল এবং তাঁর সঙ্গ নিল।

 

চুপিসারে তারা দুজনে রাজার বাগানে প্রবেশ করলেন। চারিদিকে কাঁঠাল গাছ তাতে শোভা পাচ্ছে বড়ো বড়ো পাকা কাঁঠাল। বাতাসে পাকা কাঁঠালের মিষ্টি গন্ধ।জগন্নাথ রঘুকে বললেন, “তুমি গাছে চড়বে। আমি মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকব। তুমি সবচেয়ে সুন্দর ও বড় কাঁঠালটি পাড়বে এবং মাটিতে ফেলবে। আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকব। তারপর আমরা উভয়ে কাঁঠাল নিয়ে পালাব।” রঘু যথাযথভাবে প্রভুর নিদের্শ অনুসরণ করল। রঘু কাঁঠাল গাছে উঠে সবচেয়ে বড় ও ভাল কাঁঠালটি খুঁজে বের করল এবং সেটা পাড়ল। ‘জগন্নাথ’, চাপাস্বরে রঘু জগন্নাথকে ডাকল। ‘তুমি কি তৈরি?’ জগন্নাথ উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি তৈরি, নিচে ফেল !’ রঘু কাঁঠাল নিচে ফেলল- জগন্নাথ সেটা ধরবেন ভেবে। কিন্তু কোথায় জগন্নাথ ! তিনি ইতিমধ্যেই বাগান থেকে অদৃশ্য হয়েছেন।কাঁঠাল ধরার জন্য কেউই সেখানে ছিল না। সশব্দে কাঁঠালটি মাটিতে পড়ে ফেটে চৌচির হল। যখন রাজার বাগানের মালী ঐ শব্দ শুনল তখন রঘু

ধরা পড়লো এবং রাজার কাছে খবর গেলো|

 

রাজা জানতেন রঘু জগন্নাথদেবের অত্যন্ত প্রিয় ভক্ত এবং খুবই সৎ আর নিষ্ঠাবান।নিছক চুরি করার জন্য সে এই কাজ করবে না। নিশ্চই এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য আছে।রাজা রঘুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার যদি কাঁঠাল খাওয়ার ইচ্ছা হয়ে থাকে, তাহলে গভীর রাত্রে আমার বাগানে এসে গাছে চড়ার কি প্রয়োজন ছিল? তুমি আমাকে একবার বলতে পারতে। আমি কাঁঠাল পাড়ার ব্যবস্থা করে তোমার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতাম!’ রঘু তখন প্রভু জগন্নাথের এই অদ্ভুত লীলা সবিস্তারে বললো । সেখানে উপস্থিত সবাই প্রভুর রম্য এই লীলা শুনে খুবই আনন্দ পেল এবং সকলেই হাসতে লাগল। তাঁরা রঘুর সৌভাগ্যর জন্য তাঁর গুনগান করলেন।কারন জগতের নাথের ভক্তের প্রতি এই সখা ভাব খুবই দুর্লভ।অনেক সৌভাগ্য এবং পূর্ব জন্মের পুন্যর ফল হিসেবে এই অতি সাধারণ বালক জগন্নাথদেবকে তার সখা রূপে পেয়েছে।

 

পরবর্তী পর্বে অন্য এক ভক্ত এবং এবং তার ভগবানের আরো একটি অদ্ভুত লীলা নিয়ে আলোচনা করবো। পড়তে থাকুন।

ভক্তের ভগবান – প্রল্লাদ এবং নৃসিংহ দেব

ভক্তের ভগবান

 

প্রল্লাদ এবং নৃসিংহ দেব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

যারা ভক্তি মার্গে চলেন তাদের ভক্তি যদি খাঁটি হয় যদি সম্পূর্ণ রূপে স্মরনাগতি আসে তবে ভগবান তার জন্য সবকিছু করতে পারেন

এমনকি অবতার রূপে অবতীর্ণ হতে পারেন

যেমনটা হয়েছিলো ভক্ত প্রল্লাদের খেত্রে।

 

বিষ্ণু বরাহ অবতারে হিরণ্যাক্ষ নামে এক রাক্ষসকে বধকরেন ও পৃথিবীকে রক্ষা করেন এই হিরণ্যাক্ষের ভাই হিরণ্যকশিপু স্বাভাবিক ভাবেই প্রবল বিষ্ণুবিদ্বেষী হয়ে ওঠেন। তিনি বিষ্ণুকে হত্যা করার পথ খুঁজতে থাকেন।তিনি বহু বছর ব্রহ্মার কঠোর তপস্যা করেন। ব্রহ্মাও হিরণ্যকশিপুর তপস্যায় সন্তুষ্ট হন। তিনি হিরণ্যকশিপুর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে তাঁকে বর দিতে চান। হিরণ্যকশিপু অমরত্ত চাইলেন। কিন্তু তা পেলেন না তখন তিনি বললেন আপনি আমায় এমন বর দিন যে বরে আপনার সৃষ্ট কোনো জীবের হস্তে আমার মৃত্যু ঘটবে না, আমার বাসস্থানের অন্দরে বা বাহিরে আমার মৃত্যু ঘটবে না, দিবসে বা রাত্রিতে, ভূমিতে বা আকাশে আমার মৃত্যু হবে না, শস্ত্রাঘাতে, মনুষ্য বা পশুর হাতে আমার মৃত্যু হবে না,।বাধ্য হয়ে ব্রম্হা তাকে ইচ্ছা মতো বর দেন|

 

পরবর্তীতে হিরণ্য কশিপুর পুত্র প্রহ্লাদ হয়ে ওঠেন পরম বিষ্ণুভক্ত।এতে তাঁর পিতা হিরণ্যকশিপু অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। ক্রমে প্রহ্লাদের বিষ্ণুভক্তিতে হিরণ্যকশিপু এতটাই ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হন যে তিনি নিজ পুত্রকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন।

 

হোলিকা রাক্ষসী প্রল্লাদকে আগুনে দগ্ধ করতে চাইলে বিষ্ণু তাকে রক্ষা করেন এবং হোলিকা আগুনে পুড়ে মারা যায়।

 

তারপর বিষ্ণু স্বয়ং নৃসিংহ অবতারে হিরণ্য কশিপুরকে বধ করে প্রহ্লাদকে রক্ষা করেন|দেবতা মানুষ বা পশু হলে হবেনা কারন ব্রহ্মার বর হিরণ্য কশিপুর কে রক্ষা করবে তাই নৃসিংহ পরিপূর্ণ দেবতা, মানব বা পশু নন; হিরণ্যকশিপুকে দিবসে বা রাত্রিতে বধ করা যাবে না, তাই নৃসিংহ দিন ও রাত্রির সন্ধিস্থল গোধূলি সময়ে তাঁকে বধ করেন; হিরণ্যকশিপু ভূমিতে বা আকাশে কোনো শস্ত্রাঘাতে বধ্য নন, তাই নৃসিংহ তাঁকে নিজ জঙ্ঘার উপর স্থাপন করে নখের আঘাতে হত্যা করেন; হিরণ্যকশিপু নিজ গৃহ বা গৃহের বাইরে বধ্য ছিলেন না, তাই নৃসিংহ তাঁকে বধ করেন তাঁরই নিজের গৃহদ্বারে।

 

ভগবানের প্রতি ভক্ত প্রল্লাদের বিশ্বাস এতটাই ছিলো যে তিনি একটি পাথরের স্তম্ভ থেকে অবির্ভুত হয়েছিলেন কারন প্রল্লাদ দাবী করেছিল যে বিষ্ণু জগতের সর্বত্র বিরাজমান।

 

আবার পরের পর্বে অন্য এক ভক্ত এবং তার ভগবানের দিব্য লীলা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।