Home Blog Page 42

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ – কেদারনাথ

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ – কেদারনাথ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গর মধ্যে অন্যতম জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির হলো উত্তর ভারতের হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত কেদারনাথ ধাম।

 

পঞ্চ কেদারের অন্যতম এই প্রাচীন তীর্থের জন্ম লগ্নের রহস্য জানতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে হাজার হাজার বছর আগে মহাভারতের সময় কালে|

 

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জিতে ছিলো পান্ডবরা কিন্তু বহু স্বজন কে হত্যা করতে হয়েছিলো যুদ্ধ ক্ষেত্রে,যুদ্ধ শেষে সেই পাপ থেকে মুক্তি পেতে পান্ডবরা শিবের শরণাপন্ন হন কিন্তু শিব তাদের ক্ষমা করতে প্রস্তুত ছিলেন না তাই তিনি একটি ষাঁড় এর রূপ ধরে গা ঢাকা দেন |কিছুকাল অনুসন্ধান চালানোর পর পান্ডব রা তার স্বরূপ চিনতে পারেন ও ভীম বহু চেষ্টার পর ষাঁড়রুপি শিব কে ধরে ফেলেন তখন শিব বাধ্য হয়ে নিজ মূর্তিতে আবির্ভুত হন, এই আবির্ভাবের মুহূর্তে ষাঁড়রুপি শিবের শরীরের যে অংশ যেখানে অবস্থান করছিলো সেখানে একটি করে শিব মন্দির সৃষ্টি হয় যেমন মাথা পশুপতি নাথে, বাহু তুঙ্গ নাথে,মুখ রূদ্রনাথে,নাভি মধ্য মহেশ্বরে চুল জল্পেশ্বরে ও পৃষ্ঠদেশ কেদারনাথে|এই পাঁচ টি মন্দির কে একত্রে পঞ্চকেদার ও বলা হয় যার মধ্যে কেদারনাথ জ্যোতির্লিঙ্গের স্বীকৃতি পায়।

 

আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দুদিক থেকেই কেদারনাথ অতি গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় এক তীৰ্থস্থান|মনে করা করা হয় শিব স্বয়ং বাস করেন এখানে।তার এটি অত্যন্ত প্ৰিয় স্থান|স্কন্দ পুরান অনুসারে কেদারনাথ এর এই পবিত্র স্থানেই শিব তার জটা থেকে মুক্ত করে ছিলো গঙ্গাকে|দেবাদিদেব এখানে পূজিত হন কেদার হিসেবে|প্রাচীন কালে এই অঞ্চলের নাম ছিলো কেদারখন্ড|

 

স্বাভাবিক ভাবেই আদি কেদারনাথ মন্দির প্রকৃতপক্ষে কবে নির্মাণ হয়েছিলো তার কোনো নিদ্দিষ্ট নথি নেই|মন্দির প্রাঙ্গনে আছে বিশালাকার নন্দীর মূর্তি, অভ্যন্তরে কৃষ্ণ ও স্বস্ত্রীক পঞ্চ পাণ্ডবের মূর্তি খোদাই করা আছে|ত্রিকোণাকৃতি জ্যোতির্লিঙ্গ টি রয়েছে মুলমন্দিরের এক বিশেষ গর্ভগৃহে|মনে করা হয় এক হাজার বছর আগে আদি শংকরাচার্য মন্দিরটির সংস্কার করেন ও বদ্রিনাথের পূজারী কে এনে কেদারে পূজার প্রচলন করেন|তার আগে কেদারনাথ এ কোনো নিদ্দিষ্ট পূজারী ছিলো না, পরে পাঁচ জন পূজারী নিয়োগ করা হয়, যে পরম্পরা আজও চলছে|

 

চারপাশে তুষার ঢাকা পর্বত মাঝ খানে কেদারনাথ মন্দির এক অপূর্ব অনুভূতি জাগায় মনে|একাধিক বার প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়েও আশ্চর্য ভাবে প্রতিবার রক্ষা পেয়েছে মুল মন্দিরটি|এক কালে অতি কষ্ট সাধ্য ছিলো এই মন্দির দর্শন কারন প্রতিকূল পরিবেশ ও দুর্গম পথ|তবুও সব বাধা বিপত্তি কাটিয়ে বাবার ভক্ত রা দলে দলে ছুটে আসতেন কেদারনাথ দর্শনে|আজও আসেন |কেদারনাথ ভারতের চারধাম তীর্থের মধ্যে অন্যতম|এই অঞ্চলের তীব্র শীতের ও প্রতিকূল পরিবেশের জন্য মন্দিরটি কেবল এপ্রিল মাসের শেষ থেকে কার্তিক পূর্ণিমা অবধি দর্শনার্থী দের জন্য খোলা থাকে। শীতকালে কেদারনাথ মন্দিরের মূর্তিগুলিকে ছয় মাসের জন্য উখিমঠে নিয়ে গিয়ে পূজা করা হয়|পরে আবার নিদ্দিষ্ট সময়ে মূর্তিগুলি কেদারনাথ মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়|যুগ যুগ ধরে এই পরম্পরা চলে আসছে|কেদারনাথ মন্দিরের কাছেই আছে আদি শঙ্করাচার্য্যর সমাধি মন্দির।

 

আজ জ্যোতির্লিঙ্গ কেদারনাথ নিয়ে এটুকুই।

ফিরে আসবো পরের পর্বে। অন্য একটি জ্যোতির্লিঙ্গের কথা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নৈনিতালে পন্ডিতজি

নৈনিতালে পন্ডিতজি

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আমার উত্তরাখন্ড ভ্রমণের শেষ পর্বর অভিজ্ঞতা আজ আপনাদের সাথে ভাগ করে নেবো।শেষ পর্বে নৈনিতাল এবং নৈনিতাল এবং তার আশেপাশের কিছু সুন্দর এবং ধার্মিক স্থান ঘুরে দেখলাম।

নৈনিতাল থেকে সামান্য দূরেই মুক্তেশ্ব‌রে শিবের মন্দির। পাহাড়ি নির্জনতার মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে শিব মন্দিরটি। পথ অত্যান্ত দুর্গম তাই শারীরিক এবং মানসিক জোর না থাকলে সেখানে যাওয়া অসম্ভব। তবে শিবের কৃপায় শেষ অবধি সেখানে পৌঁছতে এবং সুন্দর ভাবে সব দেখে ফিরে আসতে পেরেছি।

এই মন্দির অনেকের মতে সেই মহাভারতের যুগ থেকে আছে।মহাভারতের যুদ্ধর পর স্বজন হত্যার পাপ থেকে মুক্ত হতে পাণ্ডবদের দ্বারা শিবের আদেশে এই মন্দির গুলি নির্মিত হয়। যেহেতু পাপ মুক্তির জন্য এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা তাই মহাদেব এখানে মুক্তেশ্বর রূপে বিরাজমান।

আলমোড়া জেলায় অবস্থিত দেবী দুর্গার উদ্দেশ্যে নিবেদিত নন্দ দেবী মন্দির এই অঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় এবং প্রসিদ্ধ মন্দির। দেবী “নন্দ” কে “অশুভের বিনাশক” বলে মনে করেন।তিনি হিমালয় কন্যা।দেবীর মন্দিরটি ১০০০ বছরের পুরনো এবং এটি একটি শিব মন্দিরের প্রাঙ্গণে পাহাড়ি শৈলীতে নির্মিত। এখানে এসে শুনলাম ভাদ্র শুক্লার অষ্টমীতে মন্দিরে একটি বিশাল নন্দ দেবী মেলা অনুষ্ঠিত হয় । মেলার সময় হাজার হাজার ভক্ত আসেন।

বহুদিন যাবত আমার নীম কারোলি বাবার লীলা ক্ষেত্র এবং আশ্রম দর্শন করার ইচ্ছে ছিলো। এবার ইচ্ছে পূরণ হলো। যারা নীম কারোলি বাবা সম্পর্কে জানেন না তাদের জন্য বলছি।ব্রিটিশ ভারতে উত্তর প্রদেশের ফিরোজাবাদে জন্মেছিলেন এই মহা পুরুষ, প্রথম জীবনে বিবাহ করে সংসার ও শুরু করেছিলেন কিন্তু হটাৎ একদিন সব ছেড়ে ঈশ্বর অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন তিনি, বহু স্থান ঘুরলেন শেষে উত্তরা খন্ডের কাঁচি ধামে নিজের ছোট্ট একটি হনুমান মন্দির স্থাপন করে আধ্যাত্মিক সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করলেন। তিনি ছিলেন বজরংবলীর আশীর্বাদ ধন্য। অনেকেই তাকে বজরংবলীর সাক্ষাৎ অবতার বলে মনে করতো। বাবা ভিড় পছন্দ করতেন না তাই এই এই নির্জন প্রাকৃতিক স্থানে নিজের আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে সাধনা করতেন।তার এই লীলা ক্ষেত্র তার বহু অলৌকিক কর্ম কাণ্ডের সাক্ষী থেকেছে। বহু বিখ্যাত মানুষ বাবার টানে এখানে ছুটে এসেছেন। আজও বাবা নীম কারোলির অলৌকিক উপস্থিতি অনুভব করা যায় এই স্থানে এলে।

এবার ফেরার পালা। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে আবার সিটিভিএন এর অনুষ্ঠানে এবং নিয়মিত সব চেম্বারে আমাকে পাবেন। চলতে থাকবে শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠান এবং ধারাবাহিক লেখা লেখি।
ভালো থাকুন। পড়তে থাকুন। ধন্যবাদ।

আলমোড়ায় পন্ডিতজি

আলমোড়ায় পন্ডিতজি

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

দেবভূমি উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুন অঞ্চলে অবস্থিত, আলমোড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি এবং শান্ত স্থানগুলির জন্য বিখ্যাত।কেনো যে বিখ্যাত তা বেশ বুঝতে পারছি এখানে এসে।

আলমোড়ার অন্যতম দর্শনীয় স্থান হল কাসার দেবী, যেখান থেকে তুষারাবৃত হিমালয়ের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়। চার পাশ ঘন দেওদার বন এবং পাইন গাছ দ্বারা বেষ্টিত এই স্থান যুগ যুগ ধরে অসংখ্য দর্শণার্থীদের মুগ্ধ করে চলেছে।

কাসার দেবী দেবী দূর্গারই একটি রূপ।
প্রায় এক হাজার বছরের পুরনো এই মন্দিরটি চাঁদ রাজবংশের রাজারা দেবী নন্দ দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছিলেন। এর প্রাঙ্গণে কাঠের ছাদ দিয়ে ঘেরা একটি বিশাল পাথরের মূর্তি স্থাপিত রয়েছে

এখানে ভক্তরা ইচ্ছাপূরণের পর তামার ঘণ্টা দিয়ে থাকেন।বহু যুগ থেকে ঘন্টা জমে জমে আজ আজ অজস্র ঘন্টায় মন্দির প্রাঙ্গন পরিপূর্ণ হয়ে গেছে।

স্বামী বিবেকানন্দর অন্ত্যন্ত প্রিয় ছিলো এই স্থান।
স্বামীজি প্রথমবার আলমোড়া এসেছিলেন ১৮৯০ সালে তারপর ১৮৯৭ ও ১৮৯৮ সালে বিবেকানন্দ আলমোড়ায় ফিরে এসেছিলেন। স্বামীজি এই স্থানে ধ্যানে বসে থাকতেন দীর্ঘ সময় ধরে। তার বহু লেখায় এবং তার গুরু ভাইদের লেখায় আলোমরা সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়।

কাসার দেবীর মন্দিরের পাহাড়ের পাশ দিয়ে একটা পরিষ্কার রাস্তা উপরের দিকে উঠে গেছে। সেদিকে পাহাড়ের একেবারে উপরে জঙ্গলে ঘেরা নিঃশব্দ পরিবেশে রয়েছে সারদা মঠ।সারদা মঠ দর্শন করার সৌভাগ্য লাভ করে নিজেকে ধন্য মনে করছি।

আলমোড়া আকাশবাণী ভবনের কাছে। রাস্তার ওপরে স্বামীজির বিরাট মূর্তি আজও তার স্মৃতি বহন করে চলেছে। সেই মূর্তির পাশ দিয়ে নেমে গেছে সিঁড়ি। অনেকগুলো ধাপ নেমে মন্দিরে প্রবেশ করতে রামকৃষ্ণ কুঠিতে। রামকৃষ্ণ কুঠি বা মঠ দর্শন করা অত্যন্ত সৌভাগ্যর বিষয়।

আলোমোড়া এবং তার আশপাশের দর্শনীয় স্থান গুলি দেখা শেষ করে এবার যাবো নৈনিতালের দিকে। সেই অভিজ্ঞতাও যথা সময়ে আপনাদের সাথে ভাগ করে নেবো। সঙ্গে থাকুন।

দেবভূমিতে পন্ডিতজি – দ্বিতীয় পর্ব

দেবভূমিতে পন্ডিতজি – দ্বিতীয় পর্ব

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

ভ্রমণের দ্বিতীয় পর্বে মৌসুরি এবং পিথোরা গড় সংলগ্ন কিছু প্রাকৃতিক বিস্ময় এবং একাধিক প্রাচীন মন্দির ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হলো।

মুসৌরিকে ভগবান যেনো তার নিজের হাতে যত্ন এবং সময় নিয়ে সাজিয়েছেন।এই মুসৌরির নাম মনসুর শব্দ থেকে এসেছে, যা একটি গুল্মকে বোঝায় যা এখানে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। গাড়ওয়াল হিমালয় পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত, মুসৌরিতে সারা বছর মনোরম আবহাওয়। ঠিক যেনো চীর বসন্তের দেশ।

মুসৌরির পর্যটন স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম কেম্পটিবীর্থি ফলস, ক্যামেলস ব্যাক রোড, লাল টিব্বা এবং কোম্পানি বাগান।চার পাশে হিমালয়ের অনেক গুলি সুন্দর তুষারবৃত শৃঙ্গ রয়েছে তবে
গান হিল হল মুসৌরির সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলির
মধ্যে একটি

এখানে পুরান, ইতিহাস, কিংবদন্তী এবং প্রকৃত মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। যেমন এই সাপের চূড়া বা নাগ টিব্বা নিম্ন হিমালয় অঞ্চলের সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলির মধ্যে একটি। এই শৃঙ্গের নামকরণ করা হয়েছে সাপের দেবতার নামে। কিংবদন্তী অনুসারে তিনি গ্রামের গবাদি পশুদের রক্ষা করেন।

এই অঞ্চলের প্রাচীন মন্দিরগুলি ভারতের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, উন্নত স্থাপত্য শৈলী এবং ইতিহাসের কথা বলে। নন্দ দেবী মন্দির থেকে শুরু করে মা দুনাগুড়ি এবং পাতাল দেবী মন্দির পর্যন্ত প্রতিটি আলাদা করে আপনার নজর কাড়বে।

এই অঞ্চলে রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রাচীন এবং প্রসিদ্ধ শিব মন্দির। যার মধ্যের বৈজনাথ মন্দিরটি অন্যতম।বাগেশ্বর জেলার বৈজনাথ শহরের কাছে গরুড় উপত্যকায় এটি অবস্থিত। দ্বাদশ শতাব্দীর এই মন্দিরটিতে জটিল পাথরের কারোকার্য রয়েছে এবং এটি তার স্থাপত্য সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত।

তারপর গেছিলাম নকুলেশ্বর মন্দির যা পিথোরাগড় শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি শিব মন্দির।প্রাচীন এই শিব মন্দির এবং চার পাশের প্রকৃতি দেখে মুগ্ধ হলাম।

এরপর আছে অর্জুনেশ্বর মন্দিরটি। পিথোরাগড় শহরের এটি একটি বিখ্যাত শিব মন্দির । বিশ্বাস করা হয় যে মন্দিরটি অর্জুন কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল।অর্থাৎ সেই মহাভারতের যুগ থেকে মন্দিরটি আছে। ভাবলেও শিহরিত হতে হয়।

আজ পাতাল ভুবনেশ্বর গুহায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়ে ছিলো। এখানে যাওয়ার পথটি একটি দীর্ঘ এবং সরু সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে গেছে। ভগবান শিব ছাড়াও শেষনাগ, কাল ভৈরব, গণেশ এবং আরও অনেক দেবতার রূপ পাতাল ভুবনেশ্বরে দেখা যায়। বিশ্বাস করা হয় যে এই গুহাটি ৩৩ কোটি দেবদেবীর আবাসস্থল।তাই সনাতন ধর্মে এই স্থানের আলাদা তাৎপর্য আছে।

পিথোরাগড় জেলার মনোরম পার্বত্য স্থানে অবস্থিত কপিলেশ্বর মহাদেব মন্দিরটির কথাও না বললে নয়। আধ্যাত্মিক এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যর অদ্ভুত মেল বন্ধন ঘটেছে এখানে।

জলপ্রপাত, মন্দির, পর্বত শৃঙ্গ সব মিলিয়ে বেশ স্বর্গীয় অনুভূতি হচ্ছে যার সবটা হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। তাও এই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলাম। আবার যা কিছু দেখবো। সব ভাগ করে নেবো যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।

দেবভূমিতে পন্ডিতজি – দ্বিতীয় পর্ব

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

ভ্রমণের দ্বিতীয় পর্বে মুন্সীয়ারি এবং পিথোরা গড় সংলগ্ন কিছু প্রাকৃতিক বিস্ময় এবং একাধিক প্রাচীন মন্দির ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হলো।

মুন্সীয়ারিকে ভগবান যেনো তার নিজের হাতে যত্ন এবং সময় নিয়ে সাজিয়েছেন।খুব সম্ভবত এই এলাকার নাম মনসুর শব্দ থেকে এসেছে, যা একটি গুল্মকে বোঝায় যা এখানে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। গাড়ওয়াল হিমালয় পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত, মুন্সীয়ারিতে সারা বছর মনোরম আবহাওয়। ঠিক যেনো চীর বসন্তের দেশ।

এখানকার পর্যটন স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম কেম্পটি ফলস, ক্যামেলস ব্যাক রোড, লাল টিব্বা এবং কোম্পানি বাগান।চার পাশে হিমালয়ের অনেক গুলি সুন্দর তুষারবৃত শৃঙ্গ রয়েছে তবে
গান হিল হল এখানে সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলির
মধ্যে একটি

এখানে পুরান, ইতিহাস, কিংবদন্তী এবং প্রকৃত মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। যেমন এই সাপের চূড়া বা নাগ টিব্বা নিম্ন হিমালয় অঞ্চলের সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলির মধ্যে একটি। এই শৃঙ্গের নামকরণ করা হয়েছে সাপের দেবতার নামে। কিংবদন্তী অনুসারে তিনি গ্রামের গবাদি পশুদের রক্ষা করেন।

এই অঞ্চলের প্রাচীন মন্দিরগুলি ভারতের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, উন্নত স্থাপত্য শৈলী এবং ইতিহাসের কথা বলে। নন্দ দেবী মন্দির থেকে শুরু করে মা দুনাগুড়ি এবং পাতাল দেবী মন্দির পর্যন্ত প্রতিটি আলাদা করে আপনার নজর কাড়বে।

এই অঞ্চলে রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রাচীন এবং প্রসিদ্ধ শিব মন্দির। যার মধ্যের বৈজনাথ মন্দিরটি অন্যতম।বাগেশ্বর জেলার বৈজনাথ শহরের কাছে গরুড় উপত্যকায় এটি অবস্থিত। দ্বাদশ শতাব্দীর এই মন্দিরটিতে জটিল পাথরের কারোকার্য রয়েছে এবং এটি তার স্থাপত্য সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত।

তারপর গেছিলাম নকুলেশ্বর মন্দির যা পিথোরাগড় শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি শিব মন্দির।প্রাচীন এই শিব মন্দির এবং চার পাশের প্রকৃতি দেখে মুগ্ধ হলাম।

এরপর আছে অর্জুনেশ্বর মন্দিরটি। পিথোরাগড় শহরের এটি একটি বিখ্যাত শিব মন্দির । বিশ্বাস করা হয় যে মন্দিরটি অর্জুন কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল।অর্থাৎ সেই মহাভারতের যুগ থেকে মন্দিরটি আছে। ভাবলেও শিহরিত হতে হয়।

আজ পাতাল ভুবনেশ্বর গুহায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়ে ছিলো। এখানে যাওয়ার পথটি একটি দীর্ঘ এবং সরু সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে গেছে। ভগবান শিব ছাড়াও শেষনাগ, কাল ভৈরব, গণেশ এবং আরও অনেক দেবতার রূপ পাতাল ভুবনেশ্বরে দেখা যায়। বিশ্বাস করা হয় যে এই গুহাটি ৩৩ কোটি দেবদেবীর আবাসস্থল।তাই সনাতন ধর্মে এই স্থানের আলাদা তাৎপর্য আছে।

পিথোরাগড় জেলার মনোরম পার্বত্য স্থানে অবস্থিত কপিলেশ্বর মহাদেব মন্দিরটির কথাও না বললে নয়। আধ্যাত্মিক এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যর অদ্ভুত মেল বন্ধন ঘটেছে এখানে।

জলপ্রপাত, মন্দির, পর্বত শৃঙ্গ সব মিলিয়ে বেশ স্বর্গীয় অনুভূতি হচ্ছে যার সবটা হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। তাও এই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলাম। আবার যা কিছু দেখবো। সব ভাগ করে নেবো যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।

দোল পূর্ণিমার পৌরাণিক ব্যাখ্যা

দোল পূর্ণিমার পৌরাণিক ব্যাখ্যা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ পবিত্র দোল পূর্ণিমা। বর্তমানে দোল একটি সামাজিক আনন্দ উৎসব রূপে পালিত হলেও আসলে দোল পূর্ণিমা কিন্তু একটি পৌরাণিক বা শাস্ত্রীয় উৎসব কারন এই উৎসবের সূচনা করে ছিলেন স্বয়ং শ্রী কৃষ্ণ।আজ জানাবো সেই পৌরাণিক ব্যাখ্যা।

 

শাস্ত্র মতে বসন্তের পূর্ণিমার এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেশি নামক অসুরকে বধ করেন।

আবার কিছু শাস্ত্রে অরিষ্টাসুর নামক অসুর বধের কথাও আছে। অন্যায়কারী, অত্যাচারী এই অসুরকে বধ করার পর তার রক্ত ছিটিয়ে সকলে আনন্দ করে। এই অশুভ শক্তিকে ধ্বংসের আনন্দ মহানন্দে পরিণত হয়।সেই উৎসবই পরবর্তীতে রঙের উৎসব হয়ে ওঠে

 

আবার দৈত্যরাজ হিরণ্যকিশপুর কাহিনি আমরা সকলে জানি। ভক্ত প্রহ্লাদ অসুর বংশে জন্ম নিয়েও পরম ধার্মিক ছিলেন। তাঁকে যখন বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও হত্যা করা যাচ্ছিল না তখন হিরণ্যকিশপুর বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ হোলিকা এই বর পেয়েছিল যে আগুনে তার কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু অন্যায় কাজে শক্তি প্রয়োগ করায় এবং বিষ্ণু ভক্তকে হত্যার অপরাধে হোলিকা প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করলে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।প্রহ্লাদ অক্ষত থাকেন এই ঘটনার জন্য এই দিনটি আনন্দ উৎসবে

পরিণত হয়।

 

বাংলায় যেদিন দোল পূর্ণিমা পালিত হয় তার আগের দিন সারা দেশে পালিত হয় হোলি। আবার বাংলার কোথাও কোথাও ওই দিন আগুন জ্বালানোর রীতি ও আছে যা অশুভ শক্তিকে ধ্বংস করার প্রতীক।

 

আবার বাঙালি তথা হিন্দু সমাজের অন্যতম মহাপুরুষ শ্রীচৈতন্যের জন্মতিথি হচ্ছে এই পূর্ণিমা তিথি তথা হোলি তিথি। এই মহান পুরুষের জন্ম উৎসবের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ ও পরবর্তীতে ইস্কন এই দোল উৎসবকে আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করেছে|আজ প্রায় সারা বিশ্ব জুড়ে পালিত হয়

দোল উৎসব।

 

সবাইকে আমার তরফ থেকে দোল যাত্রার অসংখ্য শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন। শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক বিষয় নিয়ে আলোচনা চলতে থাকবে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবভূমিতে পন্ডিতজি

দেবভূমিতে পন্ডিতজি

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

দেবভূমি উত্তরাখন্ড কেনো যে দেব ভূমি তা এখানকার কয়েকটি বিশেষ স্থানে এলে বেশ বোঝা যায়। এমনই একটি স্থান রানীক্ষেত এবং এর আশেপাশের এলাকা। এখানেই আছে ঝুলা দেবী মন্দির। এই পবিত্র মন্দিরটি দেবী দুর্গার উদ্দেশ্যে নিবেদিত এবং এর নামকরণ করা হয়েছে ঝুলা দেবী কারণ অধিষ্ঠাত্রী দেবীকে দোলনার উপর বসে থাকতে দেখা যায়। এই মন্দিরটি ৭০০ বছরের পুরনো। চার পাশের প্রকৃতি এক কথায় অপূর্ব।
আমি এবং আমার পরিবার আজ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করে এক কথায় মুগ্ধ।

তারপর গেলাম জিম করবেট জাতীয় উদ্যান দেখতে।এই উদ্যানটি বিপন্ন প্রজাতি, অনন্য উদ্ভিদ ও প্রাণী, শান্ত পরিবেশ এবং অনুকূল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেয়। উত্তরাখণ্ডের পৌরি গাড়োয়াল, আলমোড়া এবং নৈনিতালের মনোরম অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত, জিম করবেট কেবল ভারতের প্রাচীনতম জাতীয় উদ্যানগুলির মধ্যে একটি নয়, বরং বিপন্ন বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।নৈনিতাল জেলায় এই অঞ্চলে এক সময় বাঘ শিকার করতেন করবেট সাহেব তার নামেই এই পার্কের নাম। তবে তিনি নিছক শিকারি ছিলেন না তিনি ছিলেন বণ্য প্রাণ প্রেমিক কেবল মাত্র নর খাদক বাঘ সংহার করতে তার ডাক পড়তো।

কৌশানির কথা আলাদা করে বলতে হয় ছোট্ট রাজ্য উত্তরাখণ্ডের কৌশানি শহর অনেকটা রূপকথার রাজ্যের মতো। তুষারশুভ্র হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এই ছোট্ট শহরের রূপসৌন্দর্য এক কথায় অতুলনীয় ।

একবার ১৯২৯ সালে মহাত্মা গান্ধী এই স্থানে ভ্রমণ করে অভিভূত হয়েছিলেন । কৌশানির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি এই শহরকে ভারতের সুইজারল্যান্ড হিসেবে আখ্যা দেন । পরবর্তী কালে গান্ধীজীর এই স্মৃতিবিজড়িত স্থানটিকে গান্ধী আশ্রমে পরিণত করা হয় । বর্তমানে এটি একটি রিসার্চ সেন্টার।
গান্ধীজীর বই এবং চিত্র সহযোগে এটি একটি মিউজিয়ামে পরিণত হয়েছে।এই সংগ্রহশালাও এখানে এসে ঘুরে দেখলাম এবিং ইতিহাসের সাক্ষী থাকলাম।

আবার পরবর্তী ভ্রমনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে আসবো খুব তারাতাড়ি। দেখতে থাকুন।

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ – কাশী বিশ্বনাথ মন্দির

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ – কাশী বিশ্বনাথ মন্দির

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

ভারতের উত্তর প্রদেশের বারাণসী তে গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত “কাশী বিশ্বনাথ ” দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম|বারাণসীর অপর নাম কাশী তাই এই মন্দির কে কাশী বিশ্বনাথ বলা হয়|

কথিত আছে কাশী এই জগতের বাইরে। শিবের ত্রিশুলে অবস্থিত এই নগরী। মহা প্রলয়ে সব ধ্বংশ হয়ে গেলেও কাশী অক্ষত থাকবে।কাশীতে স্নান করে মহাদেব ব্রহ্ম হত্যার পাপ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন তাই তাকে মুক্তেশ্বর মহাদেব ও বলা হয়।

শিব এখানে বিশ্বনাথ বা বিশ্বেস্বর রূপে প্রতিষ্ঠিত|
মন্দির ও শিব লিঙ্গ এখানে কবে থেকে প্রতিষ্ঠিত তা সঠিক ভাবে বলা যায়না|স্কন্দ পুরাণেও এই জ্যোতির্লিঙ্গের উল্লেখ আছে|কথিত আছে, সতীর দেহত্যাগের পর শিব মণিকর্ণিকা ঘাট দিয়ে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরে এসেছিলেন|বিশ্বাস করা হয় শিব স্বয়ং এখানে বাস করতেন|এই মন্দির ও শিব লিঙ্গ নিয়ে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে অসংখ্য প্রচলিত কিংবদন্তী যা প্রতিটি শিব ভক্তের কাছে ধ্রুব সত্য|এই মন্দিরের ইতিহাসও বৈচিত্রময় ও বর্ণময়|বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী কাশী বিশ্বনাথ মন্দির|

অতীতে বিশেষত মুসলিম শাসন কালে বহুবার ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে এই মন্দির এবং পুনরায় নতুন করে সৃষ্টিও হয়েছে|পুরাকাল থেকে এই মন্দিরের অস্তিত্ব থাকলেও একাদশ শতাব্দীতে হরি চন্দ্র মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেছিলেন|তারপর পর্যায়ক্রমে মোহাম্মদ ঘোরী,কুতুবুদ্দিন আইবক, ফিরোজ শাহ তুঘলক ও ঔরংযেব মন্দির টি ধ্বংস করেন|প্রতিবারই অবশ্যই পুনরায় মাথা তুলে দাঁড়ায় কাশী বিশ্বনাথ মন্দির|বর্তমান সময়ে যে মন্দিরটি রয়েছে তা ১৭৮০ সালে ইন্দোরের মহারানি অহিল্যা বাই হোলকর তৈরি করে দিয়েছিলেন|পরবর্তীকালে ১৮৩৫ সালে পাঞ্জাবের শিখ সম্রাট রঞ্জিত সিংহমন্দিরের চূড়াটি ১০০০ কিলোগ্রাম সোনা দিয়ে মুড়ে দেন|বর্তমান মন্দিরটির উচ্চতা 15.5 মিটার এবং চুড়োটি সোনায় মোড়ানো বলে অনেকে এই মন্দির কে স্বর্ন মন্দিরও বলেন|

প্রধান মন্দিরের মধ্যে একটি ৬০ সেন্টিমিটার উঁচু ও ৯০ সেন্টিমিটার পরিধির শিবলিঙ্গ রুপোর বেদির উপর স্থাপিত।মুল মন্দির প্রাঙ্গনে একটি প্রাচীন কূপ লখ্য করা যায়, কথিত আছে অতীতে একবার শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে মন্দিরের পুরোহিত শিব লিঙ্গ নিয়ে ওই কূপে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন|

সনাতন ধর্মে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলির মধ্যে একদম প্রথম সারিতে রয়েছে বারাণসী বা কাশী আর এই প্রাচীন ধর্মীয় নগরীর ধর্মচর্চার প্রানকেন্দ্র হচ্ছে কাশী বিশ্বনাথ মন্দির।

ফিরে আসবো পরবর্তী জ্যোতির্লিঙ্গ নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ – বৈদ্যনাথ ধাম

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ – বৈদ্যনাথ ধাম

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের পর্বে বৈদ্যনাথ ধাম নিয়ে আলোচনা করবো। এটি দ্বাদশ জ্যোৎরলিঙ্গের অন্যতম অর্থাৎ একটি শৈব তীর্থ আবার শক্তি পীঠ ও বটে।

এই মন্দিরটি বর্তমানে ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের দেওঘর জেলায় অবস্থিত।

 

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এখানে সতীর হৃদয় বা হৃৎপিণ্ড পড়েছিল। বৈদ্যনাথ ধামে অধিষ্ঠিত দেবী জয় দুর্গা ও ভৈরব হলেন স্বয়ং শিব যিনি বৈদ্যনাথ রূপে এখানে বিরাজমান।

 

পুরানে আছে একবার রাবন শিবকে স্থায়ী ভাবে লঙ্কায় নিয়ে যেতে কঠোর তপস্যা করেন।তপস্যয় সন্তুষ্ট হয়ে চন্দ্রহাস নামে একটি বিরাট শক্তিশালী অস্ত্রও রাবণকে উপহার হিসেবে প্রদান করেন, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন রাবন, শেষমেষ শিব আত্মলিঙ্গ অর্পণ করে লঙ্কার প্রতিষ্ঠা করতে বলেন তাকে।শর্ত ছিলো কৈলাস থেকে লঙ্কার পথে যাওয়ার সময় কোথাও যদি রাবণ শিবলিঙ্গ কে কোন জায়গায় রেখে দেন, তাহলে তিনি সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবেন। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে লঙ্কায় যাওয়ার পথে ক্লান্ত এবং তৃষ্ণার্থ রাবন এই স্থানে শিবলিঙ্গ কিছুক্ষনের জন্য নামিয়ে রাখেন আর সেখানেই শিবলিটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। সেই শিব লিঙ্গই বৈদ্য নাথ রূপের এই শক্তি পীঠের ভৈরব রূপে বিরাজ করছে।

 

এই শিব খেত্রে শিবকে বৈদ্যনাথ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যার অর্থ হল যিনি সর্বরোগহারি, রামায়ণেও এই বৈদ্যনাথ

মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়।শিব পুরাণে এই মন্দিরকে দুটি আত্মার মিলনস্থল বলেও বর্ণনা করা হয়েছে।কারন এটিই একমাত্র শক্তিপীঠ যেখানে বৈদ্যনাথে শিব এবং শক্তি একসাথে বিরাজমান।একটি প্রচলিত বিশ্বাস আছে যে এই মন্দিরে বর ও কনের একসঙ্গে বিবাহ দিলে তাদেরও বন্ধন অটুট হয়।

 

প্রাচীন কালে মন্দিরের কিছু দূরে শ্মশান ছিল, যেখানে মায়ের হৃদয় পড়েছে বলে মনে করা হয়, এই জায়গাটি বর্তমানে “চিতাভূমি” নামে পরিচিত সকলের কাছে। মায়ের হৃদয় পতিত হওয়ার এই শক্তিপীঠ “হৃদয় পিঠ” নামেও ডাকা হয়।

 

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী মোঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ এই বৈদ্যনাথ মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন এবং দেওঘর রাজ্যের রাজা দ্বিধাউর এই মন্দির নির্মাণের কাজে অনেকখানি সহযোগিতা করেছিলেন। পরবর্তী কালে এই মন্দির একাধিক বার সংস্কার করা হয় এমনকি ব্রিটিশ আমলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও এই মন্দিরের রক্ষনাবেক্ষনের ভার নিয়ে ছিলো।

 

শক্তি পীঠ হওয়ায় অমাবস্যা তিথি গুলিতে এখানে ধুমধাম করে পুজো হয় আবার জ্যোতির্লিঙ্গ থাকায় বৈদ্যনাথে বিরাট আকারে পালিত হয় মহা শিবরাত্রি।

 

আজকের একান্ন পীঠ পর্ব এখানেই শেষ করছি।

দেখা হবে পরের পর্বে থাকবে পরবর্তী জ্যোতির্লিঙ্গ নিয়ে আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ – মহাকালেশ্বর মন্দির 

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ – মহাকালেশ্বর মন্দির

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের প্রায় প্রতিটির সাথেই জড়িত আছে একাধিক পৌরাণিক ঘটনা এবং ইতিহাস আজকের পর্বে জানবো জ্যোতির্লিঙ্গ মহাকালেশ্বরের কথা|

 

বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম এই মহাকালেশ্বর অবস্থিত মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে, রূদ্র সাগর হ্রদের তীরে|শিব এখানে সয়ম্ভু|এই শিব লিঙ্গ কে দক্ষিনা মূর্তিও বলা হয় কারন তাঁর অবস্থান দক্ষিণ মুখী|এই জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো তান্ত্রিক নেত্র যা আর কোনো মূর্তিতে চোখে পরে না|ওঙ্কারেশ্বর এর ন্যায় এই শিব মন্দির ও পাঁচটি তল বিশিষ্ট যা মহাকাল মন্দির নামে খ্যাত।

 

মহাদেবে’র মূর্তিটি মহাকাল মন্দিরের গর্ভগৃহের উপরে স্থাপিত|এছাড়াও মন্দিরের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে গনেশ, পার্বতী, কার্তিক ও নন্দীর মূর্তি|সুবিস্তৃত মন্দির প্রাঙ্গন ও সুউচ্ছ চূড়া মহাকাল মন্দিরের সৌন্দর্য বহু অংশে বৃদ্ধি করে|ভূগর্ভস্থ কক্ষটির পথটি পিতলের প্রদীপ দ্বারা আলোকিত হয়। মনে করা হয়, দেবতাকে এই কক্ষেই প্রসাদ দেওয়া হয়|এ এক ব্যতিক্রমী ও স্বতন্ত্র প্রথা।

 

এবার আসি পুরানের কথায় পুরাণ অনুসারে উজ্জয়িনী শহরটির নাম ছিল অবন্তিকা|অবন্তিকার রাজা ছিলেন শিব ভক্ত কিন্তু এই সৎ এবং শিব ভক্ত রাজার শত্রুও ছিলো অনেক |একবার ব্রহ্মার আশীর্বাদে দূষণ নামে এক দৈত্য অদৃশ্য হয়ে যাবার ক্ষমতা পেয়েছিল। প্রতিবেশী শত্রুরাজারা দূষণের সাহায্যে উজ্জয়িনীর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে এবং উজ্জ্বয়ীনি আক্রমণ করেন। যুদ্ধে তাদেরই জয় হয় এবং তারা সকল শিবভক্তের উপর অত্যাচার শুরু করে দেন।অসহায় ভক্তদের প্রার্থনা শুনে শিব মহাকালের রূপে উজ্জয়িনীতে আবির্ভূত হয়ে অসুর ও রাজার বাকি শত্রুদের পরাজিত করেন।ভক্ত দের অনুরোধে শিব উজ্জয়িনীতে বাস করতে রাজি হন|সেই থেকে তিনিই হন রাজ্যের প্রধান দেবতা এবং শিবভক্তদের রক্ষাকর্তা।

 

সনাতন ধর্ম বিশ্বাস অনুসারে, এই মন্দিরের প্রধান উপাস্য দেবতা শিব অনন্তকাল ধরে উজ্জয়িনীর শাসক|তিনি পার্বতী সহ এখানে স্বমহিমায় বিরাজমান|এই চত্বরেই রয়েছে শক্তি পীঠ মহাকালী ও স্বপ্নেশ্বর মহাদেবের মন্দির|

 

 

ইতিহাস অনুসারে সুলতান ইলতুৎমিসের শাসন কালে ধ্বংস করা হয় মহাকাল মন্দির|পরবর্তীতে শিব ভক্ত মারাঠা পেশোয়ারা আবার এই মন্দির পুনর্নির্মাণ করান|ভারতের স্বাধীনতার পর দেবস্থান ট্রাস্টের পরিবর্তে উজ্জয়িনী পৌরসংস্থা এই মন্দিরের ভার নেয়। বর্তমানে এটি একটি স্বাধীন কমিটির অধীনে রয়েছে।

 

অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী প্রায় সারা বছরই আসেন মহাকাল মন্দিরে, তাদের মনোস্কামনা জানান ও প্রচলিত বিস্বাস বাবা মহাকালেশ্বর কাউকে খালি হাতে ফেরান না|প্রতি বছর শিব রাত্রিতে এখানে মেলা বসে ও সেই উপলক্ষে ব্যাপক জন

সমাগম হয়|

 

আবার আগামী পর্বে আলোচনা করবো অন্য একটি জ্যোতির্লিঙ্গ নিয়ে এবং শিব সংক্রান্ত এই ধারাবাহিক আলোচনা চলতে

থাকবে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ – ভীমা শঙ্কর শিব মন্দির 

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ – ভীমা শঙ্কর শিব মন্দির

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শক্তি পীঠ বা সিদ্ধ পীঠের সংখ্যা এবং প্রকৃত স্থান নিয়ে যেমন বিতর্ক আছে বা মত পার্থক্য আছে তেমনই কিছু জ্যোতির্লিঙ্গের স্থান নিয়েও বিতর্ক আছে।এমনই এক জ্যোতির্লিঙ্গ ভীমা শঙ্কর যা আমার আজকের পর্বে আলোচ্য বিষয়।

 

অনেকেই মনে করেন পুনেতে অবস্থিত ভীমা শংকর হচ্ছে প্রকৃত জ্যোতির্লিঙ্গ আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন আসামে অবস্থিত এই ভীমেস্বরই হচ্ছেন ভীমাশংকর এবং এই স্বয়ংভু শিব লিঙ্গই প্রকৃত জ্যোতির্লিঙ্গ।

 

আজ আমি আসামের ভীমা শঙ্করের কথাই বলছি কারন জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে এই মন্দির অধিক জনপ্রিয় এবং স্বীকৃত।আসামের গুয়াহাটির কাছে দীপর হ্রদের ধারে ডাইনি পাহাড় বা ডাকিনি পাহাড় নামে এক বেশ রহস্যময় স্থানে ভীমশঙ্কর অবস্থিত|এখানে শিব মন্দির ও শিব লিঙ্গ প্রায় প্রাকৃতিক ভাবেই তৈরি যা আধ্যাত্মিক ভাবে দর্শনার্থীদের মোহিত করে|

 

শিব লিঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এক প্রাকৃতিক জলধারা বা ঝর্না|দু ধারে সবুজ বনাঞ্চল ও জল ধারা দেখতে দেখতে পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে এই স্থানে পৌঁছানো এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।জ্যোতির্লিঙ্গ থেকে কিছু দূরেই রয়েছে একটি গণেশ মন্দির|সেখানেও ভক্তিভরে পূজা দেন দর্শনার্থীরা|

 

এই শিব লিঙ্গ ও শিব মন্দির তৈরির পেছনে রয়েছে এক পৌরাণিক ঘটনা|শিব পুরান মতে কুম্ভ কর্ণ ও পাতাললোকের রাজকুমারী কর্কটির পুত্র ছিলেন ভীমাসুর যিনি ব্রম্ভার বর লাভ করে অজেও হয়ে উঠেছিলে|অহংকার ও ঔদ্ধত্যর বশবর্তী হয়ে তিনি কামরূপ রাজ প্ৰিয়ধর্ম কে হত্যা করতে যান|রাজা ছিলেন পরম শিব ভক্ত|তিনি শিবের কাছে প্রার্থনা করলে যথা সময়ে স্বয়ং শিব প্রকট হয়ে ভীমাসুর কে হত্যা করেন ও কাম রূপ রাজ কে রক্ষা করেন|পরবর্তীতে রাজা এবং অন্যান্য ঋষি মুনি দের অনুরোধ রাখতে শিব সেই স্থানে বিরাজমান হতে সম্মতি দেন|আজও তিনি ডাকিনি পাহাড়ে অবস্থিত ভীমশংকরে জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে স্বমহিমায় বিরাজমান|ভীমাসুরের নাম থেকেই ভীমেস্বর বা ভীম শংকর নামের সৃষ্টি|

 

বেশ কয়েক বছর আগে আমি ধন্য হয়েছি এই জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করে। এখানকার প্রকৃতি এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশ নানা দিক দিয়ে অতুলনীয়।

 

পরবর্তী জ্যোতির্লিঙ্গ সংক্রান্ত আলোচনা এবং

শিব মহিমার বর্ণনা নিয়ে ফিরে আসবো

আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।