আগে কলকাতার কালী মন্দির গুলি নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে বেশ কয়েকটি পর্বে বলেছিলাম|আজ কলকাতার আরো একটি প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক কালী মন্দির নিয়ে বলবো যাকে অনেকে ঘোমটা কালী মন্দির বলেন যদিও ভবতারিণী কালী মন্দির হিসেবও খ্যাতিআছে উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুরের বলরাম ঘোষ স্ট্রিটে অবস্থিত একটি এই প্রাচীন কালী মন্দিরের । মন্দিরটি স্থাপিত হয় ১৮৮৮ খ্রীষ্টাব্দর ৫ই বৈশাখ| দিনটি ছিল বাসন্তী পঞ্চমী।প্রতিষ্ঠা করেন সারদা প্রসাদ ঘোষের মাতা দয়াময়ী দাসী। বলরাম ঘোষ ঢাকায় মুর্শিদকুলি খাঁর অধীনে চাকরি করতেন। কলকাতায় এসে শ্যামপুকুর অঞ্চলে জমি কিনে বাড়ি তৈরি করেন। তাঁর নামে রাস্তার নাম বলরাম ঘোষ স্ট্রিট। এই বংশের তুলসীরাম ঘোষ কর্মসূত্রে ঢাকায় থাকতেন। ঢাকায় নবাবের অধীনে উচ্চ পদে চাকরি করতেন। তুলসীরামের নাতি সারদাপ্রসাদ। তুলসীরাম স্বপ্নে এক কালী মূর্তি দেখেছিলেন। স্বপ্নে দেখা কালী মূর্তি অনুযায়ী তিনি একটি ছবি আঁকিয়েছিলেন। সেটি মন্দিরের গর্ভগৃহের দেওয়ালে টাঙানো আছে। স্বামীর মৃত্যুর পর তুলসীরামের পুত্রবধূ দয়াময়ী দেবী ছেলের সঙ্গে কলকাতায় ফিরে আসেন। এই জমি কিনে মন্দির তৈরি শুরু করেন এবং তুলসীরামের আঁকানো ছবি অনুযায়ী কালী মূর্তি তৈরি করান। কিন্তু তিনি মন্দির প্রতিষ্ঠা দেখে যেতে পারেন নি। তাঁর অবর্তমানে তাঁর পুত্র সারদাপ্রসাদ সেই কাজ সমাপন করেন।উঁচু ভিত্তিবেদির স্থাপিত, ত্রিখিলান প্রবেশপথযুক্ত, দক্ষিণমুখী মন্দিরটি নবরত্ন শৈলীর। মন্দিরের খিলানের এক একটি স্তম্ভ ‘কলাগেছ্যা’ রীতির গোল ও সরু স্তম্ভগুচ্ছের সমষ্টি। গর্ভগৃহের সামনে ত্রিখিলান প্রবেশপথযুক্ত অলিন্দগর্ভগৃহে কষ্টিপাথরের দক্ষিণাকালী ‘ভবতারিণী’ নামে নিত্য পূজিতা। ভবতারিণী মন্দিরে কালী মূর্তিটি ঘোমটা দেওয়া।তাই এঁকে অনেকে ‘ঘোমটা কালী’ বলে থাকেন। মন্দিরের গর্ভগৃহের একদিকে নারায়ণ শিলা , কৃষ্ণ-রাধিকা মূর্তি, একটি একক কৃষ্ণ মূর্তি ইত্যাদিও নিত্য পূজিত। বড় কৃষ্ণ-রাধিকা মূর্তিদ্বয় এই মন্দিরের পূর্বতন এক পুরোহিতের। মন্দিরের দুপাশে আছে দুটি আটচালা শিব মন্দির। দুটি মন্দিরের ভিতরে যথাক্রমে হরেশ্বর ও হরপ্রসন্ন নামে দুটি কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ নিত্যপূজিত। তিনটি মন্দির একটি লম্বা বারান্দা দিয়ে যুক্ত। টানা বারান্দার সামনের দিকটা ও সিঁড়ি ঢালাই লোহার সুদৃশ্য রেলিং দিয়ে ঘেরা। তিনটি মন্দিরের চারিদিকে প্রদক্ষিণ করার প্রশস্ত জায়গা আছে। মন্দিরের সামনে একটি চাঁদনি আকৃতির নাটমন্দির আছে। মন্দিরটি পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। মন্দির প্রাঙ্গণের প্রবেশ-দ্বারের পাশে একটি প্রতিষ্ঠাফলক আছে। মন্দির প্রাঙ্গণ গাছের ছায়া-ঘেরা। ভবতারিণী মন্দিরে বৈষ্ণব মতে পূজা হয়। নিত্য পূজা ছাড়াও কালী পূজার সময় ও বাসন্তী পঞ্চমীর দিন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ধুমধাম সহকারে মন্দিরে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি অমাবস্যায় হোম হয়। কালী পূজায় অন্নভোগ ও আমিষ ভোগ হয় না। নুন ছাড়া লুচি, পাঁচ রকমের ভাজা, বোঁদে, মিষ্টি ইত্যাদি দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। এছাড়া দুর্গা পূজাতে নবমীর দিন এক দিনের দুর্গা পূজা, জগদ্ধাত্রী পূজা, চাঁচর, জন্মাষ্টমী ইত্যাদি মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয়। চার-পাঁচ জন সেবায়েত পালা করে মন্দিরে পূজা-কার্য করে থাকেন। শহর কলকাতার ঐতিহাসিক মন্দির গুলির মধ্যে ঘোমটা কালী বা ভবতারিণী মন্দির অন্যতম|আগামী 24 নভেম্বর দীপান্বিতা অমাবস্যা তিথিতে তারাপীঠ মহা শ্মশানে হবে হোম যজ্ঞ ও তন্ত্র মতে গ্রহের প্রতিকার প্রদান|তারা পীঠে আমি নিজে উপস্থিত থাকবো|পাশাপাশি আপনাদের হৃদয়েস্বরী সর্ব মঙ্গলা মায়ের মন্দিরেও হবে গ্রহ দোষ খণ্ডন অনুষ্ঠান কারন আপনারা হয়তো জানেন শাস্ত্র মতে গ্রহ দোষ খন্ডনের অন্যতম শ্রেষ্ট তিথি দীপান্বিতা অমাবস্যা আবার একবছর পরে আসবে এই সুযোগ তাই আপনারা চাইলে এই মহা যজ্ঞে অংশ নিতে পারে ও গ্রহগত যেকোনো সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন|দুটি স্থান থেকে একযোগে সরাসরি পুজো ও হোম যজ্ঞের লাইভ সম্প্রচার দেখতে পাবেন আমার সোশ্যাল মিডিয়া পেজ ও প্রোফাইলে|সঙ্গে থাকবেন|ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকবে কালী তত্ত্ব ও বিভিন্ন কালী মন্দির নিয়ে আলোচনা|ফিরে আসবো আগামী পর্বে কালী কথা নিয়ে|থাকবে অন্য কোনো প্রাচীন মন্দিরের ইতিহাস ও কিংবদন্তী সাথে অনেক অলৌকিক ঘটনা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
মন্দির বাজারের শ্মশান কালী
দেবী কালী বিভিন্ন রূপে পূজিতা হন যার মধ্যে দেবীর শ্মশান কালী রূপ রয়েছে|দেবীর এই বিশেষ রূপের পুজো করতো বাংলার দুর্ধর্ষ ডাকাতরা এবং উচ্চ মার্গের তন্ত্র সাধকরা|আজ আপনাদের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মন্দির বাজারে অবস্থিত এক শ্মশান কালীর কথা বলবো|দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রাচীন মন্দিরবাজারের দক্ষিণ বিষ্ণুপুড়ে রয়েছে এক গা-ছমছমে শ্মশান। কথিত আছে এই শ্মশানে নাকি একসময় আস্তানা করত সব সাধক আর তান্ত্রিকদের দল। উদ্দেশ্য ছিল শব সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করা। এখনো পর্যন্ত এই শ্মশানে গেলে হাড় হিম হয়ে যাবে। আদিগঙ্গার পাড়ে এই শ্মশানে মা কালী পূজিতা হন করুণাময়ী নামে।প্রচলিত আছে এই মন্দিরে কালীপুজোয় নাকি গভীর রাত হলেই চলে নানান রোমাঞ্চকর ঘটনা। মন্দিরের সেবায়েতরা মেতে ওঠেন শ্মশান জাগানোর খেলায়। কথিত আছে, একসময় নরমুণ্ডর মালা দিয়ে চলত তন্ত্র মতে দেবীর আরাধনা। বর্তমানে বলি দেওয়া হয় না, কিন্তু কালীপুজোর দিন ডাকিনী যোগিনীকে দেওয়া হয় কাঁচা মাংস, মদ আর ছোলা। তার পাশাপাশি থাকে শিয়াল ভোগ। আজও নাকি নড়মুন্ডির মালা পুজোয় পুজোয় ব্যাবহার হয়|প্রচলিত এই সব জশ্রুতি আজও লোকের মুখে মুখে প্রচলিত|প্রায় ১০৭ বছর আগে এই শ্মশানে টালির ছাউনির মধ্যে কালী মায়ের আরাধনার সূচনা করেছিলেন তান্ত্রিক মণিলাল চক্রবর্তী। এখানে জনশ্রুতি রয়েছে, এই মণিলাল চক্রবর্তী নাকি যখন যুবক ছিলেন তখন তন্ত্রের দীক্ষা নিয়েছিলেন। সাধনার জন্য বেছে নেন এই শ্মশানকে।পরবর্তীকালে মা কালীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে শ্মশানের নিকটস্থ জঙ্গলেই দেবীর নিত্য পূজা শুরু করেন। সেই থেকে আজও এখানে ধুমধাম করে আরাধনা করা হয়ে আসছে মা কালীর। এখানে বলি দেওয়ার প্রথা নেই কিন্তু কাঁচা মাংস ভোগে দেওয়া হয়।বহুদিন আগেই মণিলাল বাবুর মৃত্যু হয়েছে, তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা এই শ্মশান কালীর মন্দিরের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন । তারা বংশ পরম্পরায় তন্ত্র শিক্ষা লাভ করেন এবং নানাবিধ গুপ্ত বিদ্যায় পারদর্শী বলে জশ্রুতি প্রচলিত আছে|দীপাবলী উপলক্ষে প্রতিবছর এই শ্মশানকালী মন্দিরে মহাসমারোহে পুজো অনুষ্ঠিত হয় যা দেখতে আসেন বহু মানুষ|আজকের কালী কথা শেষ করার আগে জানিয়ে রাখি দীপান্বিতা অমাবস্যা তিথিতে তারাপীঠ মহা শ্মশানে ও আমার নব নির্মিত গৃহ মন্দিরে বিশেষ হোম যজ্ঞর মাধ্যমে শাস্ত্রীয় পদ্ধতিতে গ্রহ দোষ খন্ডনের সব ব্যবস্থা থাকবে|আমি নিজে উপস্থিত থাকছি তারাপীঠে|যেকোনো জ্যোতিষ সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে যোগাযোগ করতে পারেন এখন থেকেই|দীপাবলী উপলক্ষে চলতে থাকবে এই কালী কথা ফিরে আসবো আগামী পর্বে কালী কথা নিয়ে|থাকবে অন্য কোনো মন্দিরের ইতিহাস|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
বিদ্যা সুন্দর কালী মন্দিরের ইতিহাস
বাংলার ইতিহাসের সাথে সমাজ জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত আছে অসংখ্য কালী মন্দির এবং দেবী কালী সংক্রান্ত নানা পৌরাণিক ঘটনাবলী|কালী কথায় বা বাংলার কালীতে আগেও এই নিয়ে আলোচনা করেছি|আসন্ন দীপান্বিতা অমাবস্যা উপলক্ষে আবার শুরু করছি দেবী কালী নিয়ে লেখা থাকবে দেবীরআধ্যাত্মিক মহিমা ও কিছু কালী মন্দিরের কথা|আজ লিখবো বর্ধমানের প্রসিদ্ধ এবং প্রাচীন বিদ্যাসুন্দর কালী মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে|বর্ধমানের বিদ্যাসুন্দর কালীপুজোর পেছনে জড়িয়ে রয়েছে এক অলৌকিক ঘটনা|বর্ধমানের রাজা তেজচাঁদের কন্যা বিদ্যা ও মন্দিরের পুজারি সুন্দর এই ঘটনার প্রধান দুই চরিত্র|তখন বর্ধমানের মহারাজা তেজচাঁদের আমল । রাজার এক কন্যা ছিল, নাম বিদ্যা ৷ আর রাজবাড়ির পুজারি ছিলেন সুন্দর নামে এক যুবক। সুন্দরের আর্থিক অবস্থা মোটেই ভাল ছিল না । রাজবাড়িতে ফুল দিতে আসত মালিনী মাসি নামে জনৈক ভদ্র মহিলা|তিনি প্রতি ঠাকুর বাড়িতে ফুলের মালা দিতেন। যথারীতি একদিন মালিনী মাসি মন্দিরে ফুলের মালা নিয়ে এসেছেন । সেই মালা দেখে পুজারি সুন্দর খুব আকৃষ্ট হন । তিনি মালিনী মাসিকে জিজ্ঞাসা করেন, এত সুন্দর ফুলের মালা কে গেঁথেছে ? যে মালা গেঁথেছে তাকে দেখার জন্য ছটফট করতে থাকে সুন্দর । মালিনী মাসি তাকে বলে, রাজকুমারী বিদ্যা মালা গেঁথেছে কিন্তু তাকে দেখা সম্ভব নয় ।পরবর্তীকালে বিদ্যার সঙ্গে সুন্দরের পরিচয় হয় । তাদের মধ্যে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে । এমনকী তারা নাকি মন্দিরের পাশ থেকে রাজবাড়ি পর্যন্ত একটা সুড়ঙ্গ বানিয়ে তার ভিতর দিয়ে বিদ্যা ও সুন্দর একে-অপরের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করতে যেত । একদিন চরের মাধ্যমে তেজচাঁদ বিদ্যা ও সুন্দরের প্রণয়ের ব্যাপারে জেনে ফেলেন । খবরটা কানে যেতেই রাজা প্রচণ্ড রেগে যান । তিনি বিদ্যা এবং সুন্দরকে কালীর সামনে বলি দেওয়ার আদেশ দেন ৷সেই সময়ে বর্ধমানের বেশিরভাগ এলাকা ছিল ঘন জঙ্গলে ভর্তি । বিশেষ করে দামোদর তীরবর্তী তেজগঞ্জ এলাকায় ছিল আরও গভীর জঙ্গল । সেখানেই কালী মন্দিরে পুজো হতো । ওই কালী মন্দিরে কেউ সচরাচর যেতেন না । কথিত আছে, যারা অন্যায় অত্যাচার করত, তাদের এই মন্দিরে দেবীর সামনে হাঁড়িকাঠে নরবলি দেওয়া হত । তাই সেই সময় এই কালী দক্ষিণ মশান কালী নামে পরিচিত ছিল । ফলে দিনের বেলাতেও ওই এলাকা দিয়ে যাতায়াত করার কেউ খুব একটা সাহস করত না ।রাজার হুকুম মতো তাদেরকে বলি দিতে নিয়ে যাওয়া হয় সেই মন্দিরে|বলি দেওয়ার আগের মুহূর্তে বিদ্যা ও সুন্দর সেই মন্দিরের কাপালিকের কাছে অনুরোধ জানায়, মৃত্যুর আগে তারা দেবীকে প্রণাম করে আসতে চায় । কাপালিক সেই অনুমতি দেন । প্রণাম করতে যাওয়ার সময় কাপালিক অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যান । তারপরেই বিদ্যা ও সুন্দর নাকি কোথায় যেন মিলিয়ে যায় । এরপর থেকে তাদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি । সেই সময় থেকেই মন্দিরের নামকরণ হয় বিদ্যাসুন্দর কালী মন্দির । তার পর থেকে বন্ধ হয়ে যায় নরবলিও ।এখানে দেবীর মন্দির ছাড়াও দুটো শিব মন্দির আছে, যা ভৈরব ও পঞ্চানন্দ নামে পরিচিত । নরবলি বন্ধের পরে মন্দিরে মেষ বলি ও পরে ভেড়া বলি দেওয়া হত । এখন ছাগল বলি দেওয়া হয় ।প্রাচীন সেই সুড়ঙ্গ নাকি ছিলো তবে সেই সুড়ঙ্গ আর এখন নেই তা বুজিয়ে ফেলা হয়েছে ।প্রচলিত এই প্রাচীন অলৌকিক ঘটনা আজও মানুষের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়|বহু দুর থেকে মানুষ আসেন এই মন্দিরে দেবীকালীর দর্শন করতে|আগামী 24 নভেম্বর দীপান্বিতা অমাবস্যায় আমার তারাপীঠ মহা শ্মশানে হবে হোম যজ্ঞ ও তন্ত্র মতে গ্রহের প্রতিকার প্রদান|তারা পীঠে আমি নিজে উপস্থিত থাকবো|পাশাপাশি আপনাদের হৃদয়েস্বরী সর্ব মঙ্গলা মায়ের মন্দিরেও হবে গ্রহ দোষ খণ্ডন অনুষ্ঠান কারন আপনারা হয়তো জানেন শাস্ত্র মতে গ্রহ দোষ খন্ডনের অন্যতম শ্রেষ্ট তিথি দীপান্বিতা অমাবস্যা আবার একবছর পরে আসবে এই সুযোগ তাই আপনারা চাইলে এই মহা যজ্ঞে অংশ নিতে পারে ও গ্রহগত যেকোনো সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন|ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকবে কালী তত্ত্ব ও বিভিন্ন কালী মন্দির নিয়ে আলোচনা|ফিরে আসবো আগামী পর্বে কালী কথা নিয়ে|থাকবে অন্য কোনো প্রাচীন মন্দিরের ইতিহাস|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
দেবী লক্ষীর কথা
আজ লক্ষী পুজো উপলক্ষে আপনাদের জানাবো দেবী লক্ষীর উৎপত্তি এবং তার পৌরাণিক ব্যাখ্যা নিয়ে নিয়ে তবে শুরু করবো বাংলার এক প্রাচীন লক্ষী মন্দিরের কথা দিয়ে|বীরভূমের এক গ্রামে রয়েছে এই প্রাচীন লক্ষী মন্দির|শুরুতেই মন্দির নির্মাণের সাথে জড়িত অলৌকিক এক ঘটনার কথা বলি,প্রায় পাঁচশো বছর আগে বীরভূমে এই গ্রামে আসেন পূর্ববঙ্গের এক পরিব্রাজক সন্ন্যাসী কামদেব ব্রহ্মচারী। এই গ্রামের একটি নিমগাছের তলায় সাধনস্থল হিসেবে চিহ্নিত করে থাকতে শুরু করেন। কিছুদিনে পর এক গ্রামবাসী দীঘির ধারে জমিতে চাষ করছিলেন সে হটাৎ দেখতে পায়,দীঘির জলে একটি পদ্মফুল ভেসে যাচ্ছে।পদ্মফুল তুলতে নেমে পড়েন দীঘিতে ফুটে থাকা পদ্মফুল দেখতে পেলেও নাগাল পান না কিছুতেই।সেই রাতে মা লক্ষ্মীর স্বপ্নাদেশ পান ওই গ্রামবাসী, ওই দীঘির জলেই নিরাকার রূপে দেবী লক্ষী অবস্থান করছেন। পর দিনই দীঘিতে নিম কাঠ ভাসতে দেখেন তুমি । সেই কাঠ তুলে এনে দেবীর নির্দেশ মতো গ্রামের নিম গাছতলায় আসন পাতা কামদেব ব্রহ্মচারীর কাছে নিয়ে যান এবং সাধক ওই নিম কাঠ থেকে লক্ষ্মীমূর্তি গড়ে তোলেন। সেই দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠা হয় গ্রামেই।আজও ওই মূর্তি পুজো হয় এখানে|ব্রম্মবৈবর্ত পুরান অনুসারে দেবী লক্ষী উৎপন্ন হয়েছেন শ্রী কৃষ্ণের বাম দিক থেকে|বিষ্ণু পুরাণ, ভাগবত, মহাভারত প্রভৃতি গ্রন্থ অনুসারে লক্ষ্মী দেবীর উৎপত্তি হয়েছে সমুদ্র থেকে। দুর্বাসা মুনির শাপে স্বর্গ একদা শ্রীহীন বা লক্ষ্মী-ছাড়া হয়ে যায়। তখন বিষ্ণুর পরামর্শে স্বর্গের ঐশ্বর্য ফিরে পাবার জন্য দেবগণ অসুরদের সাথে নিয়ে সমুদ্র-মন্থন শুরু করেন। সেই ক্ষীর-সমুদ্র মন্থনের ফলে উঠে আসল নানা রত্ন, মণি-মাণিক্য, অমৃতসুধা আরও কত কি। এসব ছাড়াও সমুদ্র-মন্থনের ফলে উঠে আসলেন লক্ষ্মী লক্ষ্মী দেবী এবং ঠাই পেলেন বিষ্ণুর বক্ষে। সমুদ্র থেকে দেবীর উদ্ভব বলে দেবীকে বলা হয় সমুদ্রোদ্ভবা|শাস্ত্র মেনে সঠিক উপাচার পালন করে দেবী লক্ষীর আরাধনা করুন তিনি আপনাদের প্রার্থনা শুনবেন|আপনাদের সবাইকে আমার তরফ থেকে লক্ষীপুজোর শুভেচ্ছা|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
দেবী লক্ষীর পুজোর শাস্ত্রীয় বিধি নিষেধ
দেবী দুর্গার কৈলাশ এ প্রত্যাবর্তন ঘটেছে তবে আগামীকাল লক্ষী পুজো|আমরা সবাই তার আরাধনা করবো নিজের মতো করে|আসুন আজ জেনে নিই দেবী লক্ষীর পুজোয় কি করবেন কি করবেন না|আপনারা পুজোর দিন অন্ন বা যেকোনও খাবার নষ্ট করবেন না। এতে মা অসন্তুষ্ট হন। দেবী লক্ষ্মী অন্নের অপচয় সহ্য করেন না। ফলে বাড়িতে অর্থ ও খাবারের অভাব দেখা দিতে পারে। এই দিনে সম্ভব হলে অন্ন দান করুন|পুজোর ক্ষেত্রে লক্ষ্মী দেবীকে কোনও ভাবে সাদা রঙের ফুল দিয়ে পুজো করা যাবে না। সাদা রঙ ছাড়া লাল, হলুদ, গোলাপি রঙের ফুল ব্যবহার করা যাবে।লক্ষ্মীপুজো করার সময় কোনওভাবেই কালো পোশাক পরা যাবে না। কারন সাদা ও কালো রঙ দেবী পছন্দ করেননা তার প্ৰিয় রঙ হলুদ ও লাল|মা লক্ষ্মীর পুজোয় সাদা ফুল যেমন ব্যবহার করা যায় না, তেমনই আসনে সাদা বা কালো কাপড় পাতার নিয়ম নেই। ব্যবহার করা যেতে পারে লাল, গোলাপি প্রভৃতি রঙের কাপড়। বিশ্বাস, মা লক্ষ্মী এতে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন কারন ওই একই|মনে করা হয়, শ্রীলক্ষ্মীর পূজনে তুলসী ব্যবহার করলে দেবী অসন্তুষ্ট হন| কথিত আছে, তুলসির সঙ্গে শালগ্রাম শিলার বিবাহ হয়। শালগ্রাম গ্রাম শিলা নারায়ণের প্রতিভূ। যেহেতু শ্রীলক্ষ্মীও বিষ্ণুপত্নী তাই দুজনের সম্পর্ক মধুর নয় তাই এই পুজোয় তুলসির ব্যবহার চলে না।পুজোর পর মন্দির বা ঠাকুর ঘরের দক্ষিণমুখে প্রসাদ অর্পণ করার কথা বলে থাকেন অনেকে। এর শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা না থাকলেও বাস্তু শাস্ত্র মতে শুভ| লক্ষ্মীপুজোর প্রসাদে না বলতে নেই। অল্প হলেও মুখে তুলতে হয়।এতে দেবী প্রসন্ন হন|ঢাক ঢোল এবং কাঁসর ঘণ্টা লক্ষ্মীপুজোয় বাজানো যাবে না। অত্যধিক শব্দ পছন্দ করেন না শ্রীলক্ষ্মী। সব পুজোতেই বাদ্যি বাজানো হয়। কিন্তু মা লক্ষ্মীর পুজোয় কাঁসর ঘণ্টা বাজালে দেবীর অসন্তুষ্ট হন বলে মনে করা হয়।এবিষয়ে একটি পৌরাণিক ব্যাখ্যা আছে|পুরাণ মতে, ঘণ্টাকর্ণ নামে এক দেবতা পূজনীয় লক্ষ্মী দেবীকে দেখে অশালীন আচরণ করেছিলেন। যে দেবীকে গোটা দেবলোক পুজো করেন, সেই দেবীকেই কিনা অপমান করেন ঘণ্টাকর্ণ। এই ঘটনায় দেবী লক্ষ্মী ঘণ্টাকর্ণের উপর বেজায় ক্রুদ্ধ হন।বলা হয় সেই থেকেই অন্যান্য সমস্ত পুজোতে ঘণ্টা বাজালেও, লক্ষ্মী পুজোতে ঘণ্টা বাজানো নিষিদ্ধ। সেই থেকেই মা লক্ষ্মীর পুজোয় কোন ব্যক্তি ঘন্টা বাজালে, তাঁর উপর বেজায় ক্ষিপ্ত হন পদ্মাসনা দেবী লক্ষ্মী|আবার কিছু উপচার আছে যেগুলি ঠিক ভাবে পালন করলে দেবী আশীর্বাদ করেন লক্ষী পুজোর দিন স্নান করে শুদ্ধ হয়ে লক্ষ্মী গায়ত্রী মন্ত্র ১০৮ বার জপ করলে মা লক্ষ্মী অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন। এই মন্ত্র জপ করার সময় পদ্মবীজের মালা ব্যবহার করলে ভাল হয়।দক্ষিণাবর্ত শঙ্খকে বলা হয় মা লক্ষ্মীর শঙ্খ। লাল, সাদা বা হলুদ রংয়ের একটি পরিষ্কার কাপড়, একটি রুপোর পাত্র অথবা মাটির পাত্রের উপর রাখতে হয় এই শঙ্খ। এই শঙ্খের মধ্য দিয়েই বাড়িতে মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদ প্রবাহিত হয়।বলা হয়, সমস্ত দেবতা বাস করেন তুলসী গাছে। আবার অন্য একটি মত অনুযায়ী, দেবী তুলসী হলেন মা লক্ষ্মীরই এক রূপ। তাই বাড়িতে তুলসী গাছ থাকলে এবং সেখানে প্রতিদিন প্রদীপ জ্বাললে তুষ্ট হন মা লক্ষ্মী।পুজোর দিন লক্ষ্মী দ্বাদশ স্তোত্র ১২ বার উচ্চারণ করলে ঋণমুক্তি ঘটে অথবা লক্ষীর পাঁচালি অবশ্যই পরুন|আপনাদের সবাইকে আমার তরফ থেকে লক্ষীপুজোর আগাম শুভেচ্ছা|আগামীকাল আপনাদের জন্য দেবী লক্ষী সংক্রান্ত পৌরাণিক কিছু ঘটনা ও তার ব্যাখ্যা নিয়ে ফিরে আসবো| ভালো থাকুন|পড়তে থাকুন|ধন্যবাদ|
শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা
আপনাদের নবনির্মিত মা হৃদয়েস্বরী সর্বমঙ্গলা মন্দিরের এবছর ছিলো প্রথম দূর্গা পুজা তাই উৎসাহ এবং উদ্দীপনা ছিলো একটু বেশি|

পাশাপাশি আপনাদের ভালোবাসা ও সহযোগিতা ছিলো প্রত্যাশা মতো সব মিলিয়ে পুজো সুন্দর ও সার্থক ভাবে সম্পন্ন|তবে সব ভালো কিছুরই শেষ থাকে সেই নিয়ম মেনে আজ অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হবে বিজয়ার মধ্যে দিয়ে|তাই আজ আমাদের সবারই মন কম বেশি খারাপ, কারন আজ বিজয়া দশমী|আজ দেবী দুর্গার বিসর্জনের দিন|মা ফিরে যাবেন কৈলাশে|তারপর আবার এক বছরের প্রতীক্ষা|তবে প্রকৃত অর্থে কিন্তু আজ দুক্ষের দিন নয়, আজ গৌরবের দিন|অন্তত শাস্ত্র তাই বলছে|

আসুন জেনে নিই এই দিন সম্পর্কে আমাদের সনাতন ধর্ম শাস্ত্র ঠিক কি বলছে|বিজয়া ও দশমী এই দুই শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সব প্রশ্নের উত্তর ও শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা|আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের দশমী তিথিতে পিতৃ গৃহ ছেড়ে কৈলাসে স্বামীগৃহে পাড়ি দেন দেবী|তাই দশমী শব্দটি ব্যবহিত হয়|এবার যদি বিজয়া শব্দটির বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যাবে পুরান অনুসারে নয় দিন ও নয় রাত্রি যুদ্ধ করার পর দশম দিনে দেবী মহিষাসুরকে বধ করে বিজয় লাভ করেন|অর্থাৎ বিজয়া রূপে আত্মপ্রকাশ করেন|তাই এই দিন টি বিজয়া দশমী রূপে চিহ্নিত হয়|

মহিষাসুর বধের পর দেবতাদের আলিঙ্গন থেকেই কোলাকুলি বা আলিঙ্গন করার সূচনা হয়|আর যেকোনো শুভ কাজ সফল ভাবে সম্পন্ন হলে মিষ্টি মুখতো থাকবেই|আবার উত্তর ও মধ্য ভারতে এই দিনে দশেরা উদযাপিত হয়|’দশেরা’ শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত শব্দ ‘দশহর’ থেকে এবং এখানে মূলত রাম কতৃক দশানন রাবন বোধের দিনটিকে উদযাপন করা হয়|বাল্মীকি রামায়ণ অনুসারে আশ্বিন মাসের শুক্লা দশমী তিথিতেই লঙ্কেশ্বর রাবণকে বধ করেছিলেন রাম ওই দিনটাই দশেরা এবং আশ্বিন মাসের ৩০ তম দিনে যে দিন অযোধ্যা প্রত্যাবর্তন করেন রাম সেদিনটি দীপাবলি রূপে পালিত হয়|অর্থাৎ এই দিন টা যথার্থ অর্থেই গৌরবের|তাই হয় তো স্নেহের আলিঙ্গন এবং মিষ্টি বিতরণের প্রচলন|তবু মন খারাপ থাকতেই পারে কারন নয় দিন ব্যাপী উৎসবের আজ সমাপ্তি|তবে দীপাবলি আসছে, আলোর উৎসবে আবার মেতে উঠবে দেশ|জ্যোতিষ ও তন্ত্র জগতের ক্ষেত্রে সর্ব শ্রেষ্ট সময় দীপান্বিতা অমাবস্যা আর কদিন পরেই|সে নিয়ে বলবো যথা সময়ে|সবাইকে শুভ বিজয়া|ভালো থাকুন|পড়তে থাকুন|ধন্যবাদ|
নবদূর্গার নবম রূপ – দেবী সিদ্ধিদাত্রী
নবদুর্গার নবম তথা শেষ রূপ হল সিদ্ধিদাত্রী। সিংহবাহিনী দেবীর চার হাতে আশীর্বাদী মুদ্রা। তিনি সিদ্ধি দান করেন। সবাইকে বরাভয় দেন এই মাতৃকামূর্তি ।যদিও বিভিন্ন পুরাণে দেবীর ভিন্ন রূপ বর্ণিত, কোথাও তিনি অষ্টভুজা, তো কোথাও তিনি অষ্টাদশভুজা আবার কোথাও দেবী ‘সিদ্ধিদাত্রী’ চতুর্ভুজা রূপেও পূজিত।দেবী সিদ্ধি দান করেন|দেবী ভগবত্ পুরাণে আছে, স্বয়ং মহাদেব দেবী পার্বতী কে সিদ্ধিদাত্রী রূপে পুজো করেছিলেন|এবং তার ফলে মহাদেব সকল সিদ্ধি লাভ করেন|দেবীর উপাসনায় সংসারে আসে সুখ এবং সমৃদ্ধি এবং সকল সিদ্ধি লাভ হয়| যারা কর্ম ক্ষেত্রে উন্নতি চায় শিক্ষা ক্ষেত্রে সমস্যা থেকে মুক্তি চায় এবং প্রকৃত জ্ঞান লাভ করতে চায় তারা দেবীর এই রূপের আরাধনা করতে পারেন|দেবী সিদ্ধিদাত্রীর আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য,নব রাত্রির এই বিশেষ দিনে আপনারা দেবীর মূর্তিকে গন্ধম, পুষ্পম, দীপম, সুগন্ধম এবং ভোগ নিবেদন করে পঞ্চোপচার পূজা করতে পারেনা । তাছাড়া দেবীর উদ্দেশ্যে আপনারা সিঁদুর, মেহেন্দি, কাজল নিবেদন করতে পারেনা তাতে আপনারা বিবাহিত জীবনে সুখের হবে দেবীর আশীর্বাদে|দেবী সিদ্ধিদাত্রীর পুজোয় এই মন্ত্রটি জপ করতে পারেন -ওম দেবী সিদ্ধিদাত্রায়ায় নমঃ। ওম দেবী সিদ্ধিদাত্রায় নমঃ ॥সিদ্ধ গন্ধর্ব যক্ষ্যাদিরসুরৈরমরপি। সেবামনা সর্বদা ভূয়াত সিদ্ধিদা সিদ্ধিদায়িনী।।সিদ্ধ গন্ধর্ব যক্ষদ্যারসুররমররাপি। সেবামনা সদা ভূয়াত সিদ্ধিদা সিদ্ধিদায়িনী ॥বা দেবী সর্বভূতেষু মা সিদ্ধিদাত্রী রূপেন সংস্থা। নমস্তস্য নমস্তস্য নমস্তস্য নমো নমঃ ॥ইয়া দেবী সর্বভূতেষু মা সিদ্ধিদাত্রী রূপেনা সংস্থিতা। নমস্তস্যায় নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥পদ্মাসনে বসা দেবীকে তিলের তৈরি নাড়ু বা খাবার ভোগ হিসেবে দেওয়ার চল রয়েছে। মনে করা হয়, তাতে ভক্তের শারীরিক ও মানসিক পীড়া দুর হয়|পরিবারের ও কল্যান হয়|আসন্ন দূর্গা পুজো উপলক্ষে যুক্ত থাকুন হৃদয়েশ্বরী সর্বমঙ্গলা মায়ের মন্দিরের পুজোর সাথে|আবার দেখা হবে পরের পর্বে আধ্যাত্মিক ও পৌরানিক আরো অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা থাকবে প্রতিটি অনুষ্ঠানে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
নবদূর্গা – দেবী মহাগৌরী
নব দুর্গার অষ্টম রূপ হল মায়ের মহাগৌরী রূপ|হিমায়লকন্যা ছিলেন গৌরবর্ণা। শিবের জন্য কঠোর তপস্যা করে রৌদ্রে তিনি কৃষ্ণবর্ণা হন| মহাদেব যখন গঙ্গাজল দিয়ে তাকে স্নান করান, তখন তিনি হয়ে ওঠেন পুনরায় গৌর বর্ণা|দেবীর এই রূপের নাম হয় মহাগৌরী|এই রূপে হাতির পিঠে চার হাতে অস্ত্র নিয়ে দেখা যায় মা দূর্গাকে|মহা গৌরী গায়ের রং শ্বেতবর্ণ, তিনি শান্ত প্রকৃতির দেবী। আট বছরের বালিকার রূপে তিনি পূজিত হন। দেবীর এক হাত শোভিত বরাভয় মুদ্রায়। বাকি তিন হাতে থাকে পদ্ম, ত্রিশূল এবং ডমরু।শাস্ত্র মতে এই রূপের পুজোয় কেটে যায় বিবাহ সম্পর্কিত বাধা| যাদের বিবাহে বিলম্ব বা বাঁধা আসছে অথবা বিবাহিত জীবন সুখের নয় তারা এই দেবীর আশীর্বাদে সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন|যারা দেবীর এই রূপের পুজো করবেন সকালে উঠে স্নান সেরে ঠাকুর ঘর পরিষ্কার করুন। এবার দেবীর সামনে ধূপ ও প্রদীপ জ্বালুন। গণেশ পুজো করুন সবার আগে। তারপর দেবীর বন্দনা করুন।দেবীকে নৈবেদ্য ও ফল অর্ঘ্য দিন। এক মনে দেবীর বন্দনা করুন। পুজো শেষে নিরামিশ ভোজন করে উপবাস ভাঙতে হয়|নিষ্ঠার সঙ্গে মায়ের পুজো করুন। আরতি করে পুজো শেষ করুন। । নিষ্ঠার সঙ্গে মায়ের পুজো করলে সব কাজে সফল হবেনআসন্ন দূর্গা পুজো উপলক্ষে যুক্ত থাকুন হৃদয়েশ্বরী সর্বমঙ্গলা মায়ের মন্দিরের পুজোর সাথে|আবার দেখা হবে পরের পর্বে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
নব দুর্গা : দেবী কালরাত্রি
নব দুর্গার সপ্তম রূপ হল কালরাত্রি। বিভিন্ন অস্ত্র ও গহনায় সজ্জিত হয়ে দেবী ধরা দেন কালরাত্রি রূপে|দেবী কৃষ্ণবর্ণা ও ত্রিনয়না|দেবীর বাহন গর্ধব|চতুর্ভুজা দেবী ভীষণদর্শনা|দেবীর তিন হাতে অস্ত্র | এক হাতে ভক্তদের প্রতি বরাভয় | এই রূপের আরাধনায় কেটে যায় সব সংকট|কালরাত্রি দুর্গাপূজার সপ্তম দিনে পূজিত হন।শাক্ত শাস্ত্রানুযায়ী, “সেই দিন সাধকের মন সহস্রার চক্রে অবস্থান করে। তাঁর জন্য ব্রহ্মাণ্ডের সকল সিদ্ধির দ্বার অবারিত হয়ে যায়। এই চক্রে অবস্থিত সাধকের মন সম্পূর্ণভাবে মাতা কালরাত্রির স্বরূপে অবস্থান করে। তাঁর সাক্ষাৎ পেলে সাধক মহাপুণ্যের ভাগী হন। তাঁর সমস্ত পাপ ও বাধাবিঘ্ন নাশ হয় এবং তিনি অক্ষয় পুণ্যধাম প্রাপ্ত হন।সনাতন ধর্মীরা বিশ্বাস করেন, কালরাত্রি দুষ্টের দমন করেন,অশুভ গ্রহের বাধা দূর করেন এবং ভক্তদের আগুন, জল, জন্তুজানোয়ার, শত্রু ও রাত্রির ভয় থেকে মুক্ত করেন।তারা বিশ্বাস করেন, কালরাত্রির উপাসক তাকে স্মরণ করলেই দৈত্য, দানব, রাক্ষস, ভূত ও প্রেত পালিয়ে যায়।কালরাত্রির রূপ ভয়ংকর হলেও তিনি শুভফলের দেবী।তার অপর নাম শুভঙ্করী|ভগবত্ পুরাণ অনুসারে দেবী কালরাত্রি চণ্ড ও মুণ্ডর চুলের মুঠি ধরে তা ধড় থেকে আলাদা করে দেন। চণ্ড ও মুণ্ডের হত্যা করার জন্য দেবী কালরাত্রি চামুণ্ডা নামেও পরিচিত।যারা কালরাত্রি রূপের পুজো করবেন তারা পুজোয় অবশ্যই ভোগ হিসেবে ক্ষীর ও খিচুড়ি নিবেদন করবেন|দেবীর প্রিয় ফুল হল রক্তজবা। ১০৮টি জবা ফুল দিয়ে গাঁথা মালা দেবীর চরণে অর্পণ করতে হয়।গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে যেকোনো গ্রহ দোষ খণ্ডন ও জ্যোতিষ প্রতিকারের জন্যে যোগাযোগ করুনআগামী পর্বে ফিরবো পরবর্তী রূপ নিয়ে|দেখতে থাকুন |
নবদুর্গার ষষ্ঠ রূপ – দেবী কাত্যায়নী
আজ দেবী দুর্গার কাত্যায়নী রূপ নিয়ে বলবো|পুরান অনুসারে ঋষি কাত্যায়ন দেবী দুর্গাকে কন্যারূপে লাভ করার জন্য তপস্যা করেছিলেন। তাঁর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে দেবী দুর্গা কাত্যায়নের কন্যা রূপে জন্মগ্রহণ করে ‘কাত্যায়নী’ নামে পরিচিতা হন।দ্বিতীয় ব্যাখ্যাঅনুসারে ঋষি কাত্যায়ন প্রথম দেবী দুর্গাকে পূজা করেছিলেন বলে তার নাম অনুসারে দেবীর নাম হয় ‘কাত্যায়নী’।নবরাত্রি উৎসবের ষষ্ঠ দিনে তাঁর পূজা করা হয়।দেবী কাত্যায়নী চতুর্ভুজা–তাঁর ডানদিকের দুটি হাত বর ও অভয়মুদ্রা প্রদর্শন করে, বাঁ দিকের দুই হাতে পদ্ম ও খড়্গ। দেবী সিংহবাহিনী। তাঁর গায়ের রং সোনার মতো উজ্জ্বল। তন্ত্রসার-এর ধ্যানমন্ত্রে তাঁকে বর্ণনা করা হয়েছে দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী রূপে। আবার হরিবংশ গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি অষ্টাদশভুজা।পতঞ্জলির মহাভাষ্য ও কৃষ্ণযজুর্বেদীয় তৈত্তিরীয় আরণ্যক-এ কাত্যায়নীর উল্লেখ রয়েছে। তাঁর কাহিনি বর্ণিত হয়েছে মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর অন্তর্গত শ্রীশ্রীচণ্ডী, দেবীভাগবত পুরাণ, কালিকা পুরাণ ও বামন পুরাণ-এ।শাস্ত্রে উল্লেখ আছে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীর দিন দেবী কাত্যায়নীর জন্ম। তারপর শুক্লা সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর দিন ঋষি কাত্যায়নের পূজা গ্রহণ করে দশমীর দিন তিনি যুদ্ধ খেত্রে তিনি অসুররাজকে বধ করেছিলেন।গৃহস্তরা দেবী কাত্যায়নীর পূজা করলে ভক্ত ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ–এই চার ফল লাভ করে এবং তার সমস্ত রোগ-শোক-ভয়এবং জন্ম-জন্মান্তরের পাপ দুর হয় । ভাগবত পুরাণ-এ আছে, বৃন্দাবনের গোপীগণ কৃষ্ণকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য সারা মাঘ মাস জুড়ে কাত্যায়নী ব্রত পালন করেছিলেন। তাই মনোমত স্বামী প্রার্থনায় এক মাস ধরে কাত্যায়নী ব্রত পালনেরও প্রথা রয়েছে।তাছাড়া যাদের সন্তান লাভ করতে সমস্যা হচ্ছে দেবী কাত্যায়নীর পুজো করলে তাদের সমস্যা দুর হয়|কাশীর আত্মাবীরেশ্বর মন্দিরের গর্ভগৃহের একটি কুলুঙ্গিতে দেবী কাত্যায়নীর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত।স্বামী বিবেকানন্দের মা ভুবনেশ্বরী দেবী এই আত্মাবীরেশ্বর মন্দিরে মানত করেই স্বামীজিকে পুত্ররূপে লাভ করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে|আত্মাবীরেশ্বর মন্দিরে অষ্টভূজা মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তি রয়েছে|মূর্তিটি কষ্টিপাথরে নির্মিত, উচ্চতা এক হাত।আত্মাবীরেশ্বর শিবই দেবী কাত্যায়নীর ভৈরব। শারদীয়া ও বাসন্তী নবরাত্রির ষষ্ঠ দিনে এখানে প্রচুর ভক্তসমাগম হয়।যারা দেবী কাত্যায়নীর পুজো করবেন তারা সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে শুদ্ধ ভাবে লাল বস্ত্র পড়ে এই বেদীর পূজা করবেন ।পূজার আগে ঠাকুররে আসন ভালো করে পরিস্কার করে দেবীর মূর্তি বা ছবিতে লাল কাপড় পড়াতে হয়। দেবীর উদ্যেশ্যে লাল ফুল নিবেদন করে এবং হাতে চন্দন মালা নিয়ে ১০৮ বার দেবো মন্ত্র জপ করলে, দেবীর আশর্বাদ পাওয়া যায়।নব রাত্রি উপলক্ষে চলবে এই ধারাবাহিক ভাবে নয়টি রূপ নিয়ে আলোচনা|আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে|দেবীর পরবর্তী রূপ নিয়ে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|