Home Blog Page 89

বাংলার কালী – বীরভূমের কালী পীঠ

তারাপীঠ এবং একাধিক শক্তি পীঠের পাশাপাশি বীরভূমে রয়েছে বেহিরা নিম্ববাসিনী কালীপীঠ, আজকের বাংলার কালী পর্বে লিখবো এই

প্রাচীন মন্দিরের কথা।

 

বীরভূমের পুরন্দরপুর পঞ্চায়েতের বেহিরা গ্রামে কাশীর মা অন্নপূর্ণা বেহিরা নিম্ববাসিনী কালী নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।কিভাবে হলো প্রতিষ্ঠা তা নিয়ে একটি অলৌকিক ঘটনা প্রচলিত আছে।

 

পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, দ্বাপরযুগে অষ্টাবক্র মুনি দেবী অন্নপূর্ণাকে সতীপীঠ বক্রেশ্বরে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে নদীপথে নৌকা করে কাশী থেকে নিয়ে আসছিলেন। সেই সময়, পুরন্দরপুরের বেহিরা গ্রামের কাছে এসে দেবীর নৌকা ক্ষিণশ্রোতা বক্রেশ্বর নদীতে আটকে যায়। সেখানে তপস্যা করছিলেন ভরদ্বাজ মুনি। কথিত আছে, ভরদ্বাজ মুনির আহ্বানে দেবী অন্নপূর্ণা কালী রূপে একটি নিমগাছের তলায় বসে যান। তিনি সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হলেন, নাম হল নিম্নবাসিনী কালী। কালী মায়ের নিত্যসেবা শুরু করলেন ভরদ্বাজ মুনি। আজ সেখানেই তৈরি হয়েছে মন্দির। ভরদ্বাজ মুনির স্মৃতিধন্য তপভূমিতেই যুগ যুগ ধরে পূজিতা হচ্ছে দেবী।

 

প্রতিবছর দুর্গাপুজোর ত্রয়োদশীতে মহাধুমধাম করে বেহিরা কালীতলায় নিম্ববাসিনী মায়ের পুজো হয়। নিম্ববাসিনী মায়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, এখানকার মা দুর্গা পুজোর সময় দুর্গা রূপে এবং পরবর্তী সময়ে অন্নপূর্ণা, কালী এবং অন্যান্য রূপেও পূজিতা হন। বছরের পর বছর ধরে এই প্রথা চলে আসছে। ত্রয়োদশীতে এখানে মেলা বসে।

 

একদা এই অঞ্চল ছিল জঙ্গলে ঘেরা। আজও মন্দিরের চারদিক গাছগাছালি ঘেরা। মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে অতিকায় বাঁধানো যজ্ঞমণ্ডপ। সেখানেই রয়েছে ভরদ্বাজ মুনির মন্দির, পাশে অষ্টাবক্র মুনির মন্দির।

 

স্থাপত্যরীতিতে বাংলার চারচালা শৈলী দেখা যায়। উভয় মন্দিরেই রয়েছে শিবলিঙ্গ। প্রাচীন নিমগাছের তলায় নিম্ববাসিনী নামে রয়েছেন দেবী অন্নপূর্ণা। নিম্ববাসিনী মন্দির একচূড়া বিশিষ্ট। মন্দিরের একমাত্র কক্ষটিই গর্ভগৃহ। সেখানেই দেবী মূর্তি প্রতিষ্ঠিত। দেবীর অবস্থানটিও আর পাঁচটা মন্দিরের মতো নয়। অন্যান্য মন্দিরে দেবদেবী মন্দিরের মাঝে অবস্থান করেন। এই মন্দিরের একটি কোণায় প্রতিষ্ঠিত রয়েছে দেবীবিগ্রহ। প্রস্তর বেদীর উপরে পদ্মাসনে উপবিষ্টা দেবীমূর্তির কোমর পর্যন্ত দৃশ্যমান। দেবী মূর্তির উচ্চতা প্রায় চার ফুট, মৃন্ময়ী মূর্তি।

 

দেবীর সঙ্গে কোনও শিব নেই। তবে দেবী মূর্তির পাশে স্থাপিত রয়েছে একটি শিবলিঙ্গ। শোনা যায়, কাশিতে বাবা বিশ্বনাথকে একা রেখে দেবী এসেছিলেন বলে, দেবী মূর্তির সঙ্গে মহাদেব নেই।দেবী এখানে নিত্য পূজিতা। পঞ্চব্যঞ্জনে দেবীর নিত্যভোগ হয়।

 

পরের পর্বে আবার ফিরে আসবো

বাংলার কালী নিয়ে। থাকবে অন্য

এক কালী মন্দিরের ইতিহাস এবং

পৌরাণিক ঘটনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – বগুড়ার ডাকাত কালী

অবিভক্ত বাংলার বগুড়ার গ্রামে ছিলো এক প্রাচীন কালী মন্দির যে মন্দিরের পুজোয় এক অদ্ভুত রীতি পালন করা হতো। সেই অদ্ভুত প্রাচীন প্রথা নিয়ে পরে লিখবো আগে এই মন্দির এবং কালী পুজোর ইতিহাস নিয়ে বলে নিই।

 

প্রায় চরশো বছর আগে দুর্গম এই অঞ্চলে ছিলো হিংস্র পশু, ডাকাত এবং অশরীরী আত্মা দের বাস। এই কালী মন্দিরে পুজো দিতে আসতেন সাধারণ মানুষরা তাদের বিশ্বাস ছিলো এই মা তাদের সব বিপদ থেকে রক্ষা করবেন। আবার ডাকাতরা এখানে পুজো দিয়ে অমাবস্যার রাতে ডাকাতি করতে বেরোতো।

 

শোনা যায় মধুসুদন ভাদুরী নামে এক ব্যাক্তি স্বপ্নে দেবীর আদেশ পেয়ে এই পূজা স্থাপনা করেন এবং তার নাম অনুসারেই এলাকার নাম হয় মধু গঞ্জ এবং এই পুজোর মধুগঞ্জেশ্বরী কালী পূজা নামকরণ হয়।পরবর্তীতে মধুসুদন ভাদুরী তৎকালীন জমিদার রমন বিহারী সরকারকে পূজা-অর্চনা ও পরিচালনার দায়িত্ব অর্পন করেন।

 

এই কালী পুজোর অদ্ভুত যে ঐতিহ্য রয়েছে তা হলো পাঠা লুট- বলিকৃত পশু লুটের উদ্দেশ্যে লুটকারীদের মাঝে ছুঁড়ে ফেলা হয়, শক্তি খাটিয়ে নির্দিষ্ট সীমানা অতিক্রম করলেই সেই বলী প্রদত্ত পশু তার। আরেকটি প্রথা হলো থান লুট।

পূজার স্থানে বা প্রতিমার সামনে পূজাকৃত বা উৎসর্গ করা বিভিন্ন ধরনের প্রসাদ সাজানো থাকে যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর যার যে প্রসাদ পছন্দ তাই সেটা নিতে পারবে।

 

বর্তমানে এই পুজো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অপূর্ব

এক নজীর কারন এপার বাংলা ওপার বাংলা দুই বাংলার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এই পুজোয় অংশ গ্রহণ করেন সমান আস্থা এবং উৎসাহ নিয়ে।

 

 

এমন বহু প্রাচীন কালী মন্দির ও কালী পুজো হয়

সারা বাংলা জুড়ে। আগামী পর্বে ফিরে আসবো অন্য এক কালী পুজোর ইতিহাস নিয়ে।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – বীরভূমের লোবা মা

কথিত আছে তিন শতাধিক বছর আগে অবধূত রামেশ্বর দন্ডি নামে এক মাতৃ সাধক অজয় নদের তীরে তার আরাধ্য দেবী লোবা মায়ের তন্ত্র মতে প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর কোনো এক সময় তিনি ওই লোবা গ্রাম ছেড়ে চলে যান। গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার আগে তিনি যৌথ ভাবে পুজোর দায়িত্ব দিয়ে যান এলাকার ঘোষ পরিবারদের এবং চক্রবর্তী পরিবারের হাতে।

 

বর্তমানে বীরভূমে যতগুলো বড়ো কালীপুজো হয়ে থাকে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো এই দুবরাজপুরের লোবা গ্রামের লোবা মা। প্রায় তিন শতাব্দী প্রাচীন এই কালীপুজোকে কেন্দ্র করে মানুষের উৎসাহ উদ্দীপনা থাকে চোখে পড়ার মতো।

 

দায়িত্ব প্রাপ্ত পরিবার গুলির পারিবারিক প্রভাব এবং প্রতিপত্তি কমে এলে স্থানীয় মানুষ জন স্বেচ্ছায় পুজো পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। শুরুর দিন থেকে প্রথা মেনে লোবা মায়ের মূর্তি তৈরি করার ক্ষেত্রে এলাকার বাগদী সম্প্রদায় মানুষদের আনা মাটি দিয়েই মায়ের প্রতিমা তৈরি করা হয়। এক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষত্ব। বিজয়া দশমীর দিন বর্ধমান জেলার গৌরবাজারের তালপুকুরের ঈশান কোণ থেকে আনা হয় মায়ের মূর্তি তৈরি করার জন্য পর্যাপ্ত মাটি। সেদিন থেকেই মূর্তি তৈরি করার কাজ করেন বাউরি বাগদী এবং সূত্রধর সম্প্রদায়ের মানুষেরা।

 

মায়ের মূর্তি রঙের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভেষজ রং ব্যবহার করা হয়ে থাকে।কোনো রূপ রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়না।কালীপুজোর আগের দিন মায়ের গায়ে খড়ি দেওয়া হয়ে থাকে। পুজোর দিন রং করা থেকে সমস্ত কিছু হয়ে থাকে। আর রাতে চক্ষুদান করা হয়।রীতি মেনে প্রতিবছর দীপান্বিতা অমাবস্যার রাতে এই লোবা মায়ের পুজো হয় এবং ঠিক তার পরদিন মায়ের বিসর্জন হয়ে থাকে।

 

মায়ের অঙ্গরাগ থেকে পুজোর বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারিবারিক ভাগ রয়েছে। ঘোষ পরিবারের সদস্যরা মায়ের অলংকার পরান। প্রদীপের জন্য ঘি বংশপরম্পরায় সরবরাহ করে থাকেন গোয়ালা পরিবার।

 

আরো একটি বিষয় উল্লেখ করতেই হয়।

এখানে লোবা মায়ের আরও দুই বোন রয়েছে। পাশের দুই গ্রামে দুই বোনেরা পুজো হয়। প্রতি বছর বিসর্জনের সময়ে পাশের গ্রামের মেজো বোন এবং ছোট বোনকে আনা হয় লোবা মন্দির চত্বরে।

 

এই পুজো উপলক্ষে উৎসবে মেতে ওঠেন জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ।সব মিলিয়ে সত্যি ব্যাতিক্রমী এবং ঐতিহ্যসম্পন্ন

পুজো এই বীরভূমের লোবা মায়ের পুজো।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। অন্য এক কালী মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে। দেখতে থাকুন।

বাংলার কালী – চরণ পাহাড়ি কালী

আজ পুরুলিয়ার এক কালী মন্দিরের কথা আপনাদের জানাবো। এই মন্দির চরণ পাহাড়ি কালী মন্দির নামে খ্যাত এবং একটি বিশেষ কারণে হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের খুব শ্রদ্ধার স্থান এই কালী ক্ষেত্র।

 

স্বাধীনতার আগে পুরুলিয়ার পুঞ্চা নামক এই ছোট্ট স্থান তখন একটা গঞ্জ। ব্রিটিশ আমলে এখানেই ইংরেজ পুলিশ একটি পুলিশ ফাঁড়ি তৈরি করেন। ওসি নিযুক্ত হন এক সৎ এবং কর্মনিষ্ঠ মুসলিম ব্যক্তি তার পুলিশ ফাঁড়ি থেকে কিছুটা দূরেই ছিলো এক দুর্গম পাহাড়ি এলাকা।

 

শোনা যায় জঙ্গলে ঘেরা সেই পাহাড়ি এলাকায় ওই ওসি এক পাথরে দেবীর পায়ের ছাপ দেখেন। এরপরই তিনি দেবীর স্বপ্নাদেশ পানযে ওখানে দেবী পুজো পেতে চান। তাই হয় মন্দির তৈরী করে শুরু হয় পুজো।এই ভাবে শুরু হয় চরণপাহাড়ি কালীপুজোর। যেহেতু মায়ের পদচিহ্ন পড়েছিল এই পাহাড়ে তাই পাহাড়ের নাম হয় চরণপাহাড়ি। আর সেখানকার কালী হয়ে ওঠে চরণপাহাড়ি কালী।

 

পাহাড়ি দুর্গমতার কারণে এখানে খুব কম মানুষই যাতায়াত করতেন। কখনও কখনও তান্ত্রিকরা আসতেন পুজো করতে।বর্তমানে যাতায়াতের সুবিধা হওয়ায় বহু মানুষ আসেন পুজো দিতে তবে আজও সেই সম্প্রীতি বজায় রেখেই পুজো হয়ে চলেছে।পুজোয় যোগ দেন সব ধর্মের মানুষ।

 

প্রাকৃতিক পরিবেশ খুব মনোরম। এখানে পাহাড়ে এক উঁচু টিলার উপর চরণপাহাড়ির মন্দির।

অবস্থিত। পুজো হয় তন্ত্র মতে। কথিত আছে যেকোনো ব্যাক্তি পবিত্র মনে কোনো আশা নিয়ে এসে দেবীর পুজো দিলে দেবী মনের আশা

পূরণ করেন।সব থেকে বেশি ভিড় হয় কার্তিক মাসের অমাবস্যায়।অসংখ্য দর্শণার্থী আসেন সেই

সময়ে।

 

বাংলার কালীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে ফিরে আসবো আগামী দিনে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – সাগর দীপের আদি কালী মন্দির

সাগর দ্বীপ বলতেই মনে আসে গঙ্গাসাগর মেলা এবং কপিল মুনির আশ্রম। কিন্তু এই সাগর দ্বীপে আছে এক প্রাচীন কালী মন্দির যা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয়না।সাগরদ্বীপ যবে থেকে গঠিত হয়েছে তবে থেকেই সেখানে তাঁর অধিষ্ঠান ৷

 

তখন এই স্থান ঘন জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। জল দস্যু, বাঘ কুমির আর অশরীরী আত্মা দের বাস ছিলো এই দুর্গম স্থান সেই সময়ে অর্থাৎ প্রায় চারশো থেকে পাঁচশো বছর আগে স্বপ্নাদেশে পুজো

শুরু হয়

 

তৎকালীন সময়ে জঙ্গলের হিংস্র জীবজন্তুর হাত থেকে নিজেদেরকে বাঁচাতে একটি বটবৃক্ষের তলায় পূজার্চনা করে জঙ্গলে যেতো মৎসজীবি এবং মধু সংগ্রহ কারীরা। পাশাপাশি বণিকরাও এই দেবী মন্দিরে পুজো করে সমুদ্র যাত্রা করতো

 

দেবীর উপস্থিতির জন্য নাকি এই স্থানে হিংস্র জীবজন্তুর আক্রমণে মৃত্যুর পরিমাণ অনেকটাই কমে গিয়েছিল ৷ তখন থেকে বেশ কয়েকজন উপকূল তীরবর্তী এলাকার মানুষজনেরা জঙ্গল পরিষ্কার করে এই সাগরদ্বীপেই বসবাস শুরু করে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বৃহত্তর জন পদ।

 

এখানে দেবীর পাঁচটি বড় মূর্তি রয়েছে ৷ এছাড়াও ছোট ছোট অনেক কালীমূর্তি রয়েছে ৷ মানত করে এগুলি ভক্তরা দিয়ে গিয়েছেন ৷ তখন থেকে সব মূর্তিই পুজো হচ্ছে ৷ নিত্যপুজো ছাড়াও প্রতি মঙ্গল ও শনিবার বিশেষ পুজো হয় এখানে ৷ এছাড়াও প্রতিবছর কালীপুজোর দিন জাঁকজমকের সঙ্গে পুজো হয় ৷ এই মন্দিরের মা খুবই জাগ্রত । এখানে পুজো দিতে বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসে । মা করুণাময়ী সকলের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন ।”

আদি কালী মন্দির নামে সমগ্র দক্ষিণ বঙ্গ বাসির কাছে দেবী পরিচিতা

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। অন্য এক কালী মন্দিরের কথা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শুভ মকর সংক্রান্তির শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

আজ মকর সংক্রান্তি।বাংলা মাস অনুযায়ী পৌষ মাসের শেষ দিনটিতে এই উৎসব পালন করা হয় তবে শুধু বাংলায় বাঙালিরাই নন, আমাদের দেশের নানা প্রান্তে এই দিনটিকে নানা ভাবে বিশেষ বিশেষ উৎসবের সঙ্গে পালন করা হয়, পালন করা হয় কিছু উপাচার ও অবশ্যই গঙ্গা স্নানের মাধ্যমে পূর্ণতা পায় এই মকর সংক্রান্তি|

 

শব্দের মানে খুঁজলে দেখা যায় সংক্রান্তি শব্দের অর্থ সঞ্চার বা গমন করা। সূর্যের মকর রাশিতে গমন হয় এই তিথিতে|সেই দিক দিয়েএই তিথি

জ্যোতিষ শাস্ত্রে একটা বড়ো ইভেন্ট।

 

এই আধুনিক সময়েও এখনও দূর গাঁয়ে পৌষ সংক্রান্তির উৎসব নিয়ে আসে আনন্দ বার্তা। পৌষ সংক্রান্তিতে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় স্নিগ্ধ সবুজ গ্রাম। শহরের ব্যস্ত জীবনেও দোকানে দোকানে সেজে উঠা তিল, কদমা, প্যাকেটের চালের গুঁড়োর প্যাকেট, ঝোলা গুড়ের হাঁড়ি জানান দেয় চলে এসেছে পৌষ সংক্রান্তি। হালে পিঠে থেকে পায়েস সবই সহজলভ্য নির্দিষ্ট দোকানে। তবে শুধু গ্রামে নয়, শহরেও বেশ কিছু পরিবার আজও সমান আন্তরিকতার সঙ্গে এবং নানা আয়োজনে পালন করে পৌষ সংক্রান্তির উৎসব। বাড়িতেই তৈরি করেন পিঠে-পুলি। এই পৌষ বা মকর সংক্রান্তি বাঙালি সংস্কৃতির একটি বিশেষ উৎসব বা বিশেষ ঐতিহ্যবাহী দিন।আবার কৃষি প্রধান বাংলায় এই সময়ে নতুন ফসল বিশেষ করে ধান তোলা হয়।

 

পুরান মতে অনুযায়ী, এই দিনই দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের যুদ্ধ শেষ হয়েছিল। বিষ্ণু অসুরদের বধ করে তাঁদের কাটা মুন্ডু মন্দিরা পর্বতে পুঁতে দিয়েছিলেন, মকর সংক্রান্তি তে, তাই মকর সংক্রান্তির দিনই সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাস হয়ে শুভ শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে আজও মানা হয়ে থাকে, মকর সংক্রান্তির এই মহাতিথিতেই মহাভারতের পিতামহ ভীষ্ম শরশয্যায় ইচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করেছিলেন।

 

মকর সংক্রান্তির দিন সাধারণত সূর্যদেবের পুজো করা হয়। তাঁর আশীর্বাদে আমাদের সকল রোগ-ব্যাধি দূর হয় বলে শাস্ত্রে উল্লেখ আছে তাই এই বিশেষ দিনটিতে সকলেই নিজের ঘরবাড়ি, বিশেষ করে রান্নাঘর ও রন্ধন দ্রব্যাদি পরিষ্কার করেন, যাতে সমস্ত রকম ‘অপরিশুদ্ধতা’ দূর হয়।

 

নিজের মতো করে অল্প কথায় আজ এই বিশেষ তিথি অর্থ্যাৎ মকর সংক্রান্তির আধ্যাত্মিক এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করলাম এই পুন্য তিথিতে। আশা করি এই প্রচেষ্টা আপনাদের ভালো লাগবে।সবাইকে মকর সংক্রান্তির অসংখ্য শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।ভালো থাকুন।

পড়তে থাকুন।ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – বিশ্বেস

প্রাচীন কুব্জিকা তন্ত্র গ্রন্থে স্বয়ং শিব একটি শক্তি পীঠের উল্লেখ করে দেবী পার্বতীকে বলছেন –

” কামগিরি মহাপিঠঙ তথা গোদাবরী প্রিয়ে ”

এই শক্তি পীঠ বিশ্বেসী নামে খ্যাত এবং বাস্তবে দক্ষিন ভারতের গোদাবরী নদীর তীরে অবস্থিত।

জনশ্রুতি আছে যে কয়েকশো বছর আগে বিশু নাথ নামে এক সিদ্ধ যোগী এই দুর্গম অরণ্যঘেরা অঞ্চলে তপস্যা করতেন।এক রাতে তার আরাধ্যা দেবী কালী তাকে স্বপ্নে দেখা দেন এবং বলেন কাছেই দক্ষিণ দিকে এক জলাশয়ে একটি রুপোর ঘটে দেবী বিরাজ করছেন এবং তিনি যেনো তাকে উদ্ধার করে মন্দিরে স্থাপন করেন। আদেশ অনুসারে সেই মাতৃ সাধক পুকুর থেকে ঘট তুলে এনে পুজো শুরু করেন।

এর কিছুদিন পরে আবার এক সপ্নাদেশ এলো।
দেবী বললেন সামনেই আছে এক নীম গাছ সেই নীম গাছের ডাল থেকে যেনো দেবীর মূর্তি তৈরী হয়।একই সাথে রাজাও সেই রাতে স্বপ্ন দেখলেন যে মাতৃ সাধক বিশুনাথকে তিনি যেনো দেবীর মূর্তি নির্মাণ এবং মন্দির তৈরীতে সাহায্য করেন।
শুধু তাই নয় ভৈরব দন্ডপানি কে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করার কথাও দেবী বলে দেন।সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন হয়।

শাস্ত্র মতে এই এই অলৌকিক ঘটনা থেকে দেবীর শক্তি পীঠের হদিশ পাওয়া যায়। এখানেই পড়েছিলো দেবীর গন্ডদেশ। যদিও দেবীর শ্রী অঙ্গ এবং স্থান টি নিয়ে কিঞ্চিৎ মতপার্থক্য আছে।
তবে একাধিক শাস্ত্রে এই স্থানকে একান্ন পীঠের অন্যতম স্থানের মর্যাদা দেয়া হয়েছে।

দেবী এখানে বিশ্বেশী। শান্ত, স্নিগ্ধ এবং মমতাময়ী রূপে দেবী এখানে বিরাজ করছেন। এই স্থান তন্ত্র সাধনার উপযুক্ত বলে মনে করা হয়। শোনা যায় বহু মানুষ এই স্থানে পুজো দিয়ে স্বপ্নে
দেবীকে দর্শন করেছেন এবং তাদের সমস্যার সমাধান পেয়েছেন।

ফিরে আসবো আগামী পড়বে। চলতে থাকবে বাংলার নানা কালী ক্ষেত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্নপীঠ – গায়েত্রী

আজ যে শক্তি পীঠ নিয়ে লিখবো তা

অবস্থিত রাজস্থানের পুস্করে। এখানে দেবীর হাতের তালু থেকে কনুই অবধি অর্থাৎ মণিবন্ধ পড়েছিল এখানে। দেবী সতী এখানে পূজিত হন গায়ত্রী
নামে এবং দেবীর ভৈরবের নাম সর্বানন্দ।

দেবী গায়েত্রী হলেন বেদ মাতা। দেবী গায়েত্রী থেকেই বেদ পুরান সৃষ্টি হয়েছে। এই গায়েত্রী দেবী সাক্ষাৎ বিরাজ করছেন এই শক্তি পীঠে।

রাজস্থানের শুষ্ক মরু অঞ্চলে অবস্থিত এই
শক্তিপীঠ পীঠ নির্ণয় তন্ত্র সহ একাধিক শাস্ত্রেই খুব গুরুত্বপূর্ণ পীঠ রূপে উল্লেখিত।

এখানে একটি পবিত্র কুন্ড আছে। যার নাম পুস্কর
এই কুন্ডের জল মহাপবিত্র এবং এর সাথে জড়িয়ে আছে বহু অলৌকিক ঘটনা।

শোনা যায় রাজপুতনার পরিহার বংশীয় রাজা লহোর ছিলেন কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত। একবার তিনি এই অঞ্চলে শিকারে আসেন। একটি শ্বেত বরাহের পেছনে ছুটতে ছুটতে তিনি এই এলাকায় এসে তৃষ্ণার্ত হয়ে এই কুন্ডের জল পান করেন।
এতে তার শরীরের সব রোগ হটাৎ সেরে যায়।
তারপর এই কুন্ডের এবং শক্তিপীঠের মহাত্ম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

পদ্মপুরান অনুযায়ী এই কুন্ডের ধারে প্রজাপতি ব্রহ্মা যজ্ঞ করেছিলেন।ভারতের একমাত্র ব্রম্হার মন্দিরটিও এখানেই অবস্থিত।

পুরাকালে ব্রহ্মা যে স্থানে যজ্ঞ করেছিলেন সেই যজ্ঞবেদীর পশ্চিম দিকে গায়ত্রী মাতার মন্দির আছে।মহাভারতে এই তীর্থের বর্ণনা আছে। বন পর্বে পান্ডবরা এই স্থানে এসে পুজো দিয়ে ছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়।

বলা হয় এখানে স্নান করে গায়েত্রী দেবীর মন্দিরে পুজো দিলে সমস্ত মনোবাসনা পূর্ণ হয়।

দেবী গায়েত্রীকে প্রণাম জানিয়ে আজকের পর্ব এখানেই শেষ করছি।ফিরে আসবো পরবর্তী শক্তিপীঠ নিয়ে।আগামী পর্বে।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্নপীঠ – কামাখ্যা

আজকের একান্ন পীঠ পর্বে লিখবো

অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি পীঠ কামরুপ কামাখ্যা নিয়ে। এই কামরূপ কামাখ্যায় নিহিত আছে বহু রহস্য, রোমাঞ্চএবং পৌরাণিক গল্পগাথা।আজ চেষ্টা করছি এই প্রতিটি আঙ্গিক ছুঁয়ে যেতে।

 

বলা হয় একসময় এ জায়গায় কেউ গেলে আর ফিরে আসত না। এখনো জাদুবিদ্যা সাধনার জন্য বেছে নেওয়া হয় কামাখ্যা মন্দিরকেই। কামরূপ কামাখ্যার আশপাশের অরণ্য আর নির্জন পথে নাকি ঘুরে বেড়ায় ভালো-মন্দ আত্মারা। এমনকি এক কালে বৈদেশিক শত্রুরা বিশ্বাস করতো কামরূপ-কামাখ্যার অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন মায়াবী নারীরা পুরুষদের মন্ত্রবলে ভেড়া বানিয়ে রাখতো|তাই অনেকেই এই পথ মাড়াতে চাইতো না সহজে|

 

মহাভারতের যুগে এই স্থনের নাম ছিল প্রাগজ্যোতিষ। পাল রাজারা এককালে শাসন করতো এই প্রদেশ|এই আসামেরই কামরুপ জেলার নীলকন্ঠ পাহাড়ের চূড়ায় প্রাচীন মন্দিরটি অবস্থিত।পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে সিদ্ধ পীঠ কামরূপে মায়ের মাতৃ যোনি পতিত হয়েছিল কামাখ্যাকে বলা হয় তীর্থচূড়ামণি। তীর্থচূড়ামনির অর্থ হলো সব তীর্থের মধ্যে সেরা তীর্থ স্থান।

 

এই স্থানে নরকাসুর এবং দেবী কামাখ্যাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন বশিষ্ট দেব। এই স্থানেই শিবের অভিশাপে নিজ রূপ হারিয়ে পুনরায় নিজের স্বরূপ ফিরে পেয়েছিলেন কামদেব।

 

যেখানে সতীর যোনি মন্ডল পতিত হয়েছিল সেই জায়গাটাকে বলে কুব্জিকাপীঠ।কথিত আছে যোনিরূপ যে প্রস্তরখণ্ডে মা কামাক্ষা অবস্থান করছেন, সেই শিলা স্পর্শ করলে মানুষ মুক্তিলাভ করে। কালিকাপুরাণে বলা হয়েছে সতীর অঙ্গ পতিত হওয়ার পর এই উচ্চ পর্বত মহামায়ার শ্রী অঙ্গের ভার সহ্য করতে না পেরে কেঁপে উঠলো এবং ক্রমশঃ পাতালে প্রবেশ করতে লাগলো। তখন দেবতাদের অনুকম্পায় এই পর্বত পাতালে প্রবেশ থেকে রক্ষা পায়। কিন্তু মতৃ যোনি পতিত হওয়ার ফলে পর্বতের রং নীল বর্ণ ধারণ করেছিল তাই পর্বতের নাম হলো নীলকণ্ঠ বা নীলচল পর্বত।

 

এই মন্দির চত্বরে দশমহাবিদ্যার মন্দিরও বিদ্যমান।

দেবীর ভৈরব একজন নয় নয়জন।তাই মনে করা হয় সুদূর অতীতে কোনো এক সময়ে হয়তো এখানে নয়টি শক্তিপীঠ ছিলো। যদিও এখন একটি শক্তিপীঠ ই জনসমক্ষে অবস্থিত।

 

মনেকরা হয় মূল কামাখ্যার মন্দিরটি নাগারা স্থাপত্যশৈলীর মন্দির ছিল। বর্তমান কামাখ্যা মন্দিরে গর্ভগৃহ ও তিনটি মণ্ডপ সম্বলিত চারটি কক্ষ রয়েছে যেগুলোর স্থানীয় নাম চলন্ত, পঞ্চরত্ন এবং নাটমন্দির। গর্ভগৃহটি পঞ্চরথ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত।বর্তমান মন্দিরটি সংস্কার করেছিলেন কোচ বিহারের রাজা নরনারায়ণ।

 

অম্বুবাচি কামাখ্যা মন্দিরের প্রধান উৎসব। অম্বু বাচির সময়ে দেশ বিদেশথেকে মাতৃ সাধক এবং তীর্থযাত্রীরা এখানে আসেন।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য এক শক্তিপীঠ সংক্রান্ত আলোচনা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্নপীঠ – মঙ্গলচন্ডী

আজকের একান্ন পীঠ পর্বে লিখবো বর্ধমান তথা বাংলার অন্যতম জাগ্রত শক্তিপীঠ মঙ্গলচন্ডী নিয়ে।

পুরান অনুসারে অজয় নদীর পাড়ে দেবীর ডান কব্জি পতিত হয়েছিল।শক্তি পীঠে দেবীর নাম মঙ্গলচন্ডী আর দেবীর ভৈরব কপিলাম্বর।

প্রাচীন মঙ্গল চন্ডীর মূর্তিটি ছিলো পাল যুগের।পরবর্তীতে র্ভগৃহের মধ্যেই মা মঙ্গলচন্ডীর ছোট কালো পাথরের দশভূজা মূর্তি বসানো হয়।
ভৈরবের মূর্তির সামনে নন্দীর কালো পাথরের একটি ছোট্ট মূর্তি আছে। ভৈরবের বাঁদিকে রয়েছে বুদ্ধমূর্তি। তাই স্থানটি একাধারে শাক্ত, শৈব্য এবং বৌদ্ধদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

লোক কাহিনী অনুসারে এক ব্যবসায়ী ব্যবসা করতে গিয়ে সমুদ্রে নিখোঁজ হয়ে যান তারপর তার স্ত্রী খুল্লনা মঙ্গল চন্ডী কে পুজোয় সন্তুষ্ট করে তার স্বামীর ফিরে আসার জন্য প্রার্থনা করেন।
অলৌকিক ভাবে কিছুদিন পর ওই ব্যবসায়ী ফিরে আসেন সুস্থ শরীরে। তারপর দেবীর মহিমা ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে।সেই থেকে মঙ্গলচন্ডীর পূজা হয়ে আসছে অজয় নদীর পাড়ে অবস্থিত এই মন্দিরে।

তবে মা মঙ্গলচন্ডীর আখ্যান আরো প্রাচীনকাল থেকেই নানা শাস্ত্রে লিপিবদ্ধ। কথিক আছে রাজা বিক্রমাদিত্যর কুল দেবী ছিলেন মা মঙ্গলচন্ডী। সপ্নাদেশ দিয়ে দেবী বিক্রমাদিত্যকে বলেন গভীর জঙ্গল থেকে তাকে উদ্ধার করে মন্দিরে স্থাপিত করে পুজো করতে। বিক্রমাদিত্য জ্যোতি রূপে দেবীর উপস্থিতি দেখতে পান এবং দেবীকে জঙ্গল থেকে লোকালয়ে এনে স্থাপন করেন।

পরবর্তীতে মুসলিম শাসন কালে দেবীর লোক চক্ষুর আড়ালে চলে যান এবং নতুন করে তার মহিমা প্রচারিত হয় সেই ব্যবসায়ীর নিখোঁজ হওয়ার এবং ফিরে আসার মধ্যে দিয়ে।

বর্তমানে প্রতি মঙ্গলবার দেবীর পুজো করা হয়। এছাড়াও সারা বছর ধরে এখানে দুর্গাপূজা, কালীপূজা সবই হয়।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। নতুন একটি
শক্তি পীঠের কথা নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।