আসন্ন কৌশিকী অমাবস্যাকে উপলক্ষ করে আবার শুরু করেছি কালী কথা। আজকের পর্বে আলোচনা করবো একদা বাংলা বিহার উড়িষ্যার রাজধানী মুর্শিদাবাদের প্রসিদ্ধ রাজরাজেশ্বরী দেবীর পুজো নিয়ে।অতীতে এই পুজো ছিলো মূলত লালগোলা রাজবাড়ির পুজো।দেবী কালী এখানে রাজ রাজেশ্বরী নামে খ্যাত।রাজরাজেশ্বরী কালী পুজোর শুরু ঠিক কবে হয়েছিল, সে নিয়ে কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই। তবে, কথিত রয়েছে এই পুজো প্রায় সাড়ে তিনশো বছর পুরনো।শোনা যায় এই কালীপুজোর শুরু করেছিলেনপ্রবল প্রতাপশালী জমিদার রাম শঙ্কর রায়। তিনি একদিন স্বপ্নদেশ পান, লালগোলার কলকলির চরে দেবী রাজরাজেশ্বরী অবস্থান করছেন এবং তাকে দেবীকে রাজবাড়ী এনে সেখানে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করতে হবে।তারপর জমিদার রাম শঙ্কর রায় রাজপুরোহিতকে সঙ্গে নিয়ে দেবীকে উদ্ধার করে এনে রাজপ্রাসাদের সামনে পাকা দালানবাড়ি তৈরি করে সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন তারপর থেকে শুরু হয় পুজো যা আজও চলছে।মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক এই পুজোর সাথে জড়িত আছে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর নাম। আনুমানিক প্রায় তিন মাস তিনি লালগোলা রাজ বাড়িতে ছিলেন। কারণ লালগোলার রাজা যোগীন্দ্রনারায়ণ রায়ের সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটা ভালো সম্পর্ক ছিল। এ ছাড়াও বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, লালগোলা রাজবাড়ির কালী মন্দিরের সঙ্গে কাজি নজরুল ইসলামের সম্পর্ক ছিল।যদিও সেই সম্পর্কে কোনো নিদ্দিষ্ট তথ্য প্রমান পাওয়া যায়নি।প্রথাগত কালী মূর্তি থেকে রাজরাজেশ্বরী কালি মুর্তি কিছুটা আলাদা। এখানে কালী মূর্তির পাশে রয়েছে লক্ষ্মী, সরস্বতী। শিবের ওপর এক পা দিয়ে ও এক পা তুলে নৃত্য রত অবস্থায় রয়েছে কালী। জমিদারি আমল থেকেই কালীপুজোয় অন্ন ভোগ দেওয়া হয় সঙ্গে পুরনো রীতি মেনে ইলিশ মাছের ভোগও দেওয়া হয়।পুজো তন্ত্র মতে হয়। বলী প্রথা আছে তবে তা বেশ অভিনব।পাঁঠাকে উৎসর্গ করে ছেড়ে দেওয়া হয়।ধারাবাহিক ভাবে চলবে কালী কথা। থাকবে এমনই সব কালী মন্দির এবং ঐতিহ্যপূর্ণবাংলার কালী পূজোর ইতিহাস।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
কালী কথা : সুন্দর বনের জমিদার বাড়ির কালী পুজো
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
একসময় প্রত্যন্ত সুন্দরবন এলাকার কয়াল বাড়িতেই জাঁকজমক করে হতো দুর্গাপূজা। কিন্তু কালের নিয়মে বন্ধ হয়ে যায় সেই পূজা, অবসান ঘটে জমিদারীত্বের আর তারপর থেকেই স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পরই শুরু হয় শ্যামা মায়ের আরাধনা।
আজ সুন্দর বনের এই প্রাচীন এই কালীপুজো নিয়ে লিখবো
এই পুজো সুন্দরবনের মথুরাপুরের জমিদার বাড়ি অর্থাৎ কয়াল বাড়ির পারিবারিক কালীপুজো। এই পুজোর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জমিদার যদু কয়াল।
বহু আগে জমিদারীত্ব সময় জমিদার কয়াল বাড়িতে দুর্গাপুজো হত। পরবর্তীকালে নানা বাধার কারণে বন্ধ হয়ে যায় দুর্গাপুজো। তারপর পরিবারের এক সদস্যর স্বপ্নাদেশে আবার শুরু হয় পুজো। সেই শুরু কালীপুজোর যা আজও চলছে।
প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো কয়াল বাড়ির এই পুজো। এখানেও কালী মা দক্ষিনা কালী রূপে পূজিত হন। রীতি মেনে পুজোর দিনের গহনায়
তাঁর গা ভরিয়ে দেওয়া হয়।
ছোট থেকে বড়, সবাই এই পুজোতে অংশগ্রহণ করে। পুজোতে একসময় পশু বলি হতো, কিন্তু কালের নিয়মে সে পাঠা বলি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই পুজোর আরও একটি বৈশিষ্ট্য আছে। আজ থেকে ২০০ বছর আগে শুরুতেই প্রতিমার যে দৈর্ঘ্য ছিল, এখনও সেই দৈর্ঘ্যেই প্রতিমা তৈরি বানানো হয়।কোনো পরিবর্তন হয়নি।
পুজোকে ঘিরে নানা অনুষ্ঠানও হয়। কাজের সূত্রে দূর দূরান্ত থেকে পরিবারের সদস্যরা, কালী পুজোর দিনে একসঙ্গে মিলিত হয়। আজও নিয়ম করে মায়ের ভোগ তৈরি হয়। এখন জমিদারীত্ব না থাকলেও পুজোর ঐতিহ্য নিষ্টার সঙ্গে পালন করে আসছে এই কয়াল পরিবার।
জলে কুমির এবং ডাঙায় বাঘ বেষ্টিত সুন্দর বোনে এই পুজো নিয়ে সাধারণ মানুষের খুব আগ্রহ এবং আস্থা আছে।
সামনে কৌশিকী অমাবস্যা
আগামী দিনে ধারাবাহিক ভাবে কালী কথায়
দেবী কালী প্রসঙ্গে আরো অনেক আলোচনা হবে।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিশেষ পর্ব : স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কালী পুজো
এককালে স্বাধীনতা সংগ্রামী দের সঙ্গে থাকতো গীতা। স্বামী বিবেকানন্দর বই এবং আনন্দ মঠ।তারা অনেকেই কালী পুজোয় করতেন। মাতৃ আরাধনার মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করে দেশমাতৃকার পরাধীনতা ঘোচানোই ছিলো প্রধান উদ্দেশ্য।আজ এমনই দুটি পূজোর কথা লিখবো। যার মধ্যেএকটি কলকাতার এবং একটি জেলার পুজো।প্রথমে বলবো পাথুরিয়াঘাটা ব্যায়াম সমিতির পুজো। এই সমিতি প্রতিষ্ঠা হয় ইংরেজির ১৯২৪ সালে বিখ্যাত লাঠিয়াল অতুলকৃষ্ণ ঘোষের আদর্শে তৈরি হয় এই অনুশীলন সমিতি।স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন তিনি। এই সমিতির সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত ছিলেন বাঘা যতীন। তখনকার দিনে অনুশীলন সমিতি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ঘাঁটি ছিল। স্বাভাবিক ভাবেই পদার্পণ করেছেন বহু স্বনামধন্য মানুষ।পরবর্তীতে বিপ্লবী সদস্যরা মিলে ‘বড় কালী’র পুজো আরম্ভ করেন। বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং গুণীজন এই পূজোর সাথে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৩০ সালে এই পুজোর সভাপতিত্ব করেন স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। আজও পরম্পরা মেনে এই কালী পুজো হয়।শুধু কলকাতা নয় জেলা জেলায় বিপ্লবীরা কালী পুজো শুরু করেন।সালটা ১৯৩৯। স্বাধীনতা আন্দোলনের আগুন জ্বলছে সারা দেশে। মেদিনীপুরে আন্দোলনের পথ দেখাচ্ছেনবিমল দাশগুপ্ত, কিষাণ সাহা। আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে বহু তরতাজা প্রাণ।মেদিনীপুর শহরের কাছেই লাল দীঘি।দুধারে আদিবাসী জনবসতি,শ্মশান আর ঝোপঝাড়। সেখানেই ছিল বিমল দাশগুপ্তদের গুপ্ত ডেরা। আনাগোনা লেগে থাকতো তরুণদের। গোপনে চলতো ভারতমাতার সন্তানদের দীক্ষা দেওয়া। সেসময়ই বাঁদিকে এক জায়গায় গড়ে তোলা হোল অস্থায়ী বেদী। ঘট প্রতিষ্ঠা করা হলো দেবী কালীর। সামনে চলতে থাকল দেবীরপুজো আর গোপনে অস্ত্র শিক্ষা। স্বাধীনতা পাওয়ার পরও বিমল দাশগুপ্তরা নিয়ম করে আসতেন এই স্থানে। স্বাধীনতার পরে ১৯৬৮ সালে দক্ষিণাকালী প্রতিমা উপাসনার সূচনা। কার্তিক মাসের অমাবস্যায় পুজোর সময় এখন বড়ো করে পুজো হয় শ্রদ্ধা জানানো হয় স্বাধীনতা সংগ্ৰামিদের।সারা বাংলায় এমন বহু পুজো আছে যা স্বাধীনতা সংগ্রামীরা শুরু করেছিলেন। আজও চলছে। আজ সময়ের অভাবে শুধু দুটো পূজোর কথাই বললাম। সামনেই কৌশিকী অমাবস্যা তাই আগামী দিনে দেবী কালী কালী বাংলার পুজোর ইতিহাস প্রসঙ্গে আরো আলোচনা হবে।থাকবে নানা পৌরাণিক ব্যাখ্যা। আজ ১৫ ই আগস্ট উপলক্ষে এই বিশেষ পর্বে বীর স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জানাই আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য এবং প্রণতি। আপনাদের সবাইকে আজ স্বাধীনতা দিবসের অসংখ্য শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন। বন্দে মাতারাম। জয় হিন্দ।ভালো থাকুন। পড়তে থাকুন। ধন্যবাদ।
শিব ও বাসুকি নাগ
ভগবান শিব কে আমরা যখনি দেখি, তার জটায় দেখতে পাই গঙ্গা আর তার পাশে বাসুকি নাগ, গঙ্গা কিভাবে শিবের জটায় স্থান পেলো সেই পৌরাণিক ঘটনা আমাদের অনেকেরই জানা কিন্তু বাসুকি নাগ কেনো সদা শিবের মাথায় সেই রহস্য অনেকের কাছেই রহস্য|আজ লিখবো এই রহস্য নিয়ে|
বহু উল্লেখযোগ্য পৌরাণিক ঘটনার সাথে জড়িয়ে আছেন এই বাসুকি নাগ |
কশ্যপ ও তার স্ত্রী কদ্রুর পুত্র হলেন বাসুকি। পরবর্তীতে পাতালের নাগগণ তাকে নাগরাজ বাসুকিরূপে বরণ করেন।
বাসুকীর বিশেষ অবদান ছিলো সমুদ্র মন্থন এর ক্ষেত্রে আবার কারাগারে জন্ম নেয়া কৃষ্ণ কে যখন পিতা বাসুদেব নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিচ্ছিলেন তখন নদী মধ্যে প্রবল বৃষ্টি পাত থেকে বাসুকি তার বিশাল ফনা দিয়ে শ্রী কৃষ্ণ কে রক্ষা করেছিলেন |
এই প্রবল পরাক্রমী বাসুকি কিভাবে শিবের মাথায়
স্থান পেলো তাই নিয়ে ভবিষ্য পুরানে বলা হচ্ছে যে নাগেরাই প্রথম শিব পূজা শুরু করে এবং নাগ রাজা হিসেবে বাসুকি শিবের তপস্যা করেন ও শিব কে তুষ্ট করে বরদান পান যে তিনি শিবের কণ্ঠে স্থান পাবেন ও সারা জীবন শিবের সবথেকে কাছে থেকে তার স্তুতি করবেন |তাই তিনি শিবের গলায় স্থান পান।
আরেকটি কাহিনী অনুসারে সমুদ্র মন্থন করে অমৃত সন্ধানের সময়ে বাসুকি রজ্জু হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে ছিলেন ও তার পরবর্তীতে শিব যখন হলা হল পান করেন তখনোও বাসুকি শিবের পাশে থেকে তার প্রতি নিজের অনুগত্য প্রকাশ করেন | বাসুকীর এই ভক্তি দেখে শিব সন্তুষ্ট হন ও বাসুকি কে তার শরীরে আশ্রয় দেন |
শিব ও বাসুকি কে নিয়ে আরো একটি পৌরাণিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় | মনে করা হয় শিব ও পার্বতীর বিবাহের সময় যখন শিবের অঙ্গ সজ্জার প্রয়োজন হয় তখন বাসুকি তার কণ্ঠে জড়িয়ে যান | শিব এতে এতটাই খুশি হন যে সদা সর্বদা তিনি বাসুকি কে ওই স্থানে ধারণ করে থাকেন|
এই পবিত্র শ্রাবন মাসে শিবকে সন্তুষ্ট করার একটি সহজ উপায় হলো শিবের উদ্দেশ্যে ধাতব নাগ অর্পণ করা। যদি তামার নাগ হয় তবে সব থেকে ভালো হয়।
শ্রাবন মাস জুড়ে থাকছে শিব নিয়ে নানা তথ্য। পৌরাণিক ঘটনা এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা।
পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
নন্দী ভৃঙ্গীর কথা
দেবাদিদেব মহাদেব কে নিয়ে আলোচনা হলে স্বাভাবিক ভাবেই তার দুই বিশ্বস্ত অনুচর নন্দী
এবং ভৃঙ্গীর প্রসঙ্গ এসে যায়।আজ এদের নিয়ে আলোচনা করবো। শেষে থাকবে এই সংক্রান্ত একটি উপাচার।
শিব মহাপুরাণ মতে, নন্দী শিলাদ মুনির পুত্র। শিলাদ ছিলেন ভগবান শিবের পরম ভক্ত এবং শিবের আশীর্বাদেই নন্দীর জন্ম হয়েছিলো এবং শিব স্বয়ং তাকে চিরঞ্জীবী হওয়ার বর দেন ও নিজের বাহন হিসেবে স্থান দেন|রামায়ণেও নন্দীর উল্লেখ পাওয়া যায় যেখানে অহংকারী রাবন কৈলাশ এসে নন্দীকে তার চেহারার জন্যে অপমান করেন ও বানর বলেন, নন্দী তাকে অভিশাপ দিয়েছিলো যে এক বানর তার পতন ডেকে আনবেন, পরে তাই হয়েছিলো|
নন্দী ও ভৃঙ্গী কে নিয়ে পুরানে অনেক কথাই বলা আছে কূর্মপুরাণে নন্দী প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, মহাদেবের এই প্রধান অনুচরটি করালদর্শন, বামন, বিকটাকার, মুণ্ডিতমস্তক, ক্ষুদ্রবাহু ও মহাবল।পূর্বে নন্দী মহারাজ পৃথক দেবতা হিসেবেও পূজিত হতেন পরবর্তীতে তিনি শিবের বাহন হিসেবে স্থান পান|
নন্দীর ন্যায় ভৃঙ্গীও শিবের অনুচর। নন্দী যেমন হৃষ্টপুষ্ট, ভৃঙ্গী তেমনই রুগ্ন , কঙ্কালসার। ভৃঙ্গী আগে ছিলেন এক মশিবের উপাসক। তিনি শিবের সাথে একত্রে পার্বতীর পুজোয় কিছুতেই রাজি নন জেনে ক্রুদ্ধ পার্বতী ভৃঙ্গী কে অভিশাপ দিলেন। সেই অভিশাপে ভৃঙ্গী কঙ্কালে পরিণত হলেন। দু’পায়ে আর দাঁড়াতে পারেন না তিনি, তখন শিবের আশীর্বাদে তাঁর তৃতীয় চরণের সৃষ্টি হল। কিন্তু তবু ভৃঙ্গী পার্বতীর পুজো করবেন না। তখন শিব তাঁকে নিজের অর্ধনারীশ্বর রূপ দেখালেন, যাতে তিনি বুঝতে পারেন যে পার্বতী শিবেরই অংশ। পরবর্তীতে তিনিও হয়ে উঠলেন শিবের অনুচর, একত্রে উচ্চারি হতে শুরু হয় নন্দী ও ভৃঙ্গীর নাম|
শ্রাবন মাসে শিবের পাশাপাশি নন্দী ও ভৃঙ্গীর পুজো করলে শিব তাড়াতাড়ি সন্তুষ্ট হন এবং বাস্তু শাস্ত্র মতে বাড়িতে নন্দী মূর্তি থাকলে বাস্তু দোষ দূর হয়।
আগামী পর্বে আবার কোনো নতুন বিষয় নিয়ে আসবো আপনাদে সামনে।থাকবে এমনই গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রীয় উপদেশ। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
শিব পুজোয় বেলপাতা কেনো লাগে
বেল পাতা শিবের খুব প্রিয়। শাস্ত্র মতে বেল পাতা ছাড়া শিবের পুজো সম্পন্ন হয় না। তাই শিব পুজোয় বেলপাতার বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে, পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে। সব বলবো। তারসাথে জানাবো বেলপাতা নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ।পুরান অনুসারে সখি জয়া ও বিজয়া সহ এক পর্বতে ভ্রমন করার সময়ে পার্বতীর কপালের ঘাম মাটিতে পরে তৈরী হয় বেলগাছের। দেবী স্বয়ং গিরিজা রূপে শিকড়ে।কাত্যায়নী রূপে ফলে এবং দুর্গা রূপে বেল গাছে বিরাজ করেন।আবার সমুদ্র মন্থনে প্রাপ্ত হলাহল পান করার পর মহাদেবেকে বিশেষর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে দেবতারা প্রথম তাকে বেলপাতা অর্পণ করেন কারন বেলপাতা বিষের প্রভাব নষ্ট করে। অন্য একটি ব্যাখ্যা অনুসারে শিবলিঙ্গ পরম তেজোময় তাই তাকে জ্যোতির্লিঙ্গ বলা হয় শিবলিঙ্গ অফুরন্ত তেজ ধারণ করে নিজের মধ্যে। তাই শিবলিঙ্গের পুজোর সময়স্নান করিয়ে শীতল করা হয় । বেলপাতার ভেষজ গুন মহাদেবকে শান্ত আর শীতল রাখে।তিন পাতা বিশিষ্ট বেলপাতা শ্রেষ্ঠ।আমাদের শাস্ত্রে তিনের খুব গুরুত্ব। আমাদের গুণ তিনটি- স্বত্বঃ, রজঃ আর তমঃ। আমাদের পরম দেবতাও তিনজন- ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর মহেশ্বর। আমাদের তিনটে লোক- স্বর্গ, মর্ত্য আর পাতাল।মনে করা হয় তিনটি পাতা সৃষ্টি কর্তা, পালন কর্তা এবং সংহার কর্তা কে বোঝায়।শিব লিঙ্গে বেলপাতা অর্পণ করার কিছু বিধি নিষেধ আছে। চতুর্থী, অষ্টমী, নবমী, চতুর্দশী, অমাবস্যা, সংক্রান্তি ও সোমবার বেলপাতা তুলতে নেই।শুধু বেলপাতা অর্পণ করবেন না বেলপাতার সঙ্গে জলধারাও অর্পণ করবেন।পাতা বিশিষ্ট বেলপাতা অর্পণ করা উচিত১ বা দুই পাতা বিশিষ্ট খুঁত যুক্ত পাতা কখনও অর্পণ করবেননা।বেলপাতার মধ্যবর্তী পাতাটি ধরে অর্পণ করতে হয়।যাদের বিবাহে বাঁধা আসছে তারা ১০৮ টি বেলপাতা নিয়ে তাতে লাল চন্দন দিয়ে ত্রিপুন্ড বানান তার পর ওম নমঃ শিবায় বলে একটি একটি করে বেলপাতা শিবলিঙ্গে অর্পণ করতে থাকুন এই ভাবে ১০৮ টি পাতা নিবেদন করুন। বিবাহের বাঁধা দূর হবে।আগামী পর্বে আবার কোনো নতুন বিষয় নিয়ে আসবো আপনাদে সামনে।থাকবে এমনই গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রীয় বিধি নিষেধ। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
মা হৃদয়েশ্বরী সর্বমঙ্গলার মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস এবং বাৎসরিক উৎসব
আজ আমার জীবনের এবং মা হৃদয়েশ্বরী সর্বমঙ্গলা মায়ের প্রতিটি ভক্তের জন্য একটি বিশেষ দিন।তিথি অনুযায়ী আজ আমাদের আরাধ্যা দেবী মা হৃদয়েশ্বরী সর্বমঙ্গলা মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস এবং বাৎসরিক উৎসব।ব্যাক্তিগত ভাবে আমি নিজে দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে মা সর্ব মঙ্গলার সেবক এবং উপাসক হিসেবে মা সর্বমঙ্গলা আরাধনায় নিয়োজিত রয়েছি|তবে অনুষ্ঠানিক ভাবে বেশ কয়েক বছর আগে এক ফল হারিনী অমাবস্যার পুন্য তিথিতে আপনাদের হৃদয়েশ্বরী সর্ব মঙ্গলা মন্দিরের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছিলো সর্ব সাধারণের জন্যে আমার হৃদয়পুর স্থিত বাস ভবনে। পরবর্তীতে মন্দির স্থানীনান্তরিত হয়। এবং নব রূপে সংস্কার ও শাস্ত্র মতে পুনয়ার পূজোআরম্ভ হয়।আজ দেবী সর্বমঙ্গলা মন্দিরে প্রতিষ্ঠা দিবস পালন এবং বাৎসরিক পুজোর আয়োজন করা হয়েছে।দেবী সর্বমঙ্গলা শক্তিস্বরূপা,তার পুজোয় ভক্তের সার্বিক উন্নতি হয়, মঙ্গল হয় তাই তিনি সর্ব মঙ্গলা, আর আমার ইষ্ট দেবী হৃদয়েশ্বরী মা সর্ব মঙ্গলা অত্যান্ত জাগ্রত ও ভক্তের মনোস্কামনা পুরুন করতে তার কোনো জুড়ি নেই। বিগত বছর গুলিতে তার চরনে রাখা প্রত্যেকের মনোস্কামনা তিনি পূর্ণ করেন প্রতিটি বিশেষ তিথিতে তার দরবারে অনুষ্টিত হোম যজ্ঞ ও দোষ খণ্ডন সব দিক দিয়ে সার্থক ও সফল হয়েছে|যেমন টা আপনারা ছবিতে বা ভিডিওতে দেখেছেন দেবী সর্বমঙ্গলা অষ্টাদশভূজা সিংহবাহিনী ‘মহিষমর্দিনী’ মহালক্ষীরূপিণী|কষ্টি পাথরে নির্মিত হওয়ায় দেবী মূর্তি স্বাভাবিক ভাবেই ঘোর কৃষ্ণবর্ণের |তাছাড়া তিনি আদ্যা শক্তি মহামায়ার রূপ বিশেষ তাই করল বদনা হওয়াটাই স্বাভাবিক|আমার গৃহমন্দিরে স্থাপিত হৃদয়েশ্বরী সর্বমঙ্গলার রূপ সৃষ্টির খেত্রে তার আদি ও প্রাচীনতম প্রচলিত রূপকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে| তিনি দূর্গা ও কালীর সম্মিলিত রূপ|প্রতিটি অমাবস্যায় হৃদয়েশ্বরী সর্বমঙ্গলার মন্দিরে পুজো হয় তন্ত্র মতে, শাস্ত্রীয় উপাচার অনুসরণ করে, হোম যজ্ঞ, চন্ডী পাঠ সবাই হয়, এই দিন ভোগ রান্না থেকে শুরু করে প্রসাদ বিতরণ হয় নিষ্ঠার সাথে তবে বলি প্রথার কোনো স্থান নেই মন্দিরে|আপনারা হয়তো জানেন জ্যোতিষ সংক্রান্ত সমস্যার প্রতিকার যেমন রত্ন বা কবজ ধারনের মাধ্যমে হয় তেমনি সঠিক পদ্ধতিতে মন্ত্র উচ্চারণ পূজা পাঠ ও হোম যজ্ঞের মাধ্যমে গ্রহদোষ খণ্ডনের মাধ্যমেও হয়|সেক্ষেত্রে হৃদয়েস্বরী সর্ব মঙ্গলা মায়ের মন্দিরে আমি নিজে উপস্থিত থেকে প্রতি অমাবস্যায় শাস্ত্র মতে এই আধ্যাত্মিক কর্মকান্ড সম্পন্ন করি।আজ অবধি অসংখ্য মানুষ উপকৃত হয়েছেন এই সর্ব মঙ্গলা মায়ের মন্দিরে গ্রহ দোষ খণ্ডন করিয়ে। অনেকের জীবনের অনেক বাঁধা বিপত্তি দূর হয়ে জীবনে সাফল্য, সুখ ও সমৃদ্ধি এসেছে, অনেকেই এর কৃতিত্ব আমাকে দেন , তবে আমি বলি আমি নিমিত্ত মাত্র, এই মন্দিরের সাথে যুক্ত হওয়া ও এই আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা সবটাই মা হৃদয়েশ্বরীরে ইচ্ছে, আপনারা আসুন , যুক্ত হন, নিজের যেকোনো সমস্যা মাকে জানান, অসংখ্য মানুষ উপকৃত হয়েছেন, মায়ের কৃপা লাভ করেছেন, আপনারাও পারবেন মনে ইচ্ছা ও ভক্তি থাকলেই হবে|বিশেষ বিশেষ তিথিতে মন্দিরে পূজা পক্রিয়া এবং সব তথ্য সর্বমঙ্গলা মন্দিরে ওয়েবসাইট এবং সোশ্যাল মিডিয়া পেজে পাবেন।এবার ও তার ব্যাতিক্রম হবেনা। অনলাইনে এবং অফলাইন আপনার আপনারা হৃদয়েশ্বরী সর্বমঙ্গলা মায়ের মন্দিরে সাথে যুক্ত হতে পারেন।সবাইকে জা নাই স্বাগত।জয় মা হৃদয়েশ্বরী সর্বমঙ্গলার জয়|পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।
শিবের তৃতীয় নয়নের রহস্য
চলছে শ্রাবন মাস। ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করছি শিব সংক্রান্ত নানা পৌরাণিক বিষয় এবং তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নিয়ে। আজ জানাবো শিবের তৃতীয় নয়নের অদ্ভুত কিছু রহস্য।শেষে থাকবে একটি শিব কেন্দীক শাস্ত্রীয় উপদেশ।শিবের সর্বাধিক প্রচলিত রূপ- মাথায় জটা, হাতে-গলায় রুদ্রাক্ষ এবং গলায় জড়িয়ে থাকা সাপ। আর কপালে ত্রিনয়ন। শিবের তৃতীয় চক্ষুর ব্যাপারে অনেক রকম ব্যাখ্যা হয়।একটি পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে একদা কৈলাসে নিছক মজার ছলে পার্বতী দুহাতে শিবের দু চো ঢেকে দিয়েছিলেন প। তাতে গোটা দুনিয়া অন্ধকারময় হয়ে যায়। সৃষ্টিকে বাঁচাতে তৃতীয় নয়ন মেলেন শিব। গোটা দুনিয়ায় তখন আলোর প্রকাশ ঘটে সৃষ্টি রক্ষা পায়।মনে করা হয় শিবের এই তৃতীয় চোখ সূর্যের সমান। তেজ ও শক্তির আধার।আর একটি পৌরাণিক ঘটনা অনুযায়ী প্রজাপতি দক্ষ যখন যজ্ঞ নিজের অনুষ্ঠানে সতীর সামনেই শিবকে অপমানিত করেন অপমানে আত্মদাহ করেন সতী। এই ঘটনার পর ভেঙে পড়েছিলেন ভোলেনাথ। কয়েক বছর ধরে চলে গিয়েছিলেন গভীর তপে। তন্মধ্যে সতীর পুনর্জন্ম হয় হিমালয়পুত্রী হিসেবে। কিন্তু শিব ধ্যানে মগ্ন। জাগতিক কোনও ব্যাপারেই তাঁর আগ্রহ নেই। সকল দেবতা চাইছিলেন, শীঘ্রই মিলন হোক মহাদেব ও শক্তির। কিন্তু শিবের ধ্যান ভাঙানোর সব চেষ্টাই বিফল হয়। তখন কামদেবের সাহায্য নেন দেবতারা। কাম দেব বান নিঃক্ষেপ করে মহাদেবের ধ্যান ভাঙ্গায়। ক্রোধে তৃতীয় নয়ন সৃষ্টি হয় এবং মহাদেবে সেই নয়ন দিয়ে কাম দেবকে ভস্ম করেন।একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী শিবের তৃতীয় নয়ন আসলে তাঁর দিব্য দৃষ্টি। এই দিব্য দৃষ্টি থেকে কোনও কিছুই বাদ পড়ে না। ভোলানাথের তৃতীয় নয়নকে জ্ঞানচক্ষুও বলা হয়। এই নয়ন আত্মজ্ঞানের প্রতীক। স্বর্গ মর্ত পাতাল এই তিন লোকের গতিবিধির উপর নজর রাখতে পারেন তিনি। তৃতীয় চোখ দিয়ে সমস্ত বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন শিব । তৃতীয় নয়ন তাঁর শক্তি কেন্দ্রও। তাই মনে করা হয় যে শিব তৃতীয় চোখ খুললেই ভষ্মীভূত হয়ে যাবে গোটা সৃষ্টি।যারা শিব লিঙ্গ ব্যাতিত শিবের অন্য রুপ গৃহে রেখে পুজো করতে চান তারা ধ্যান মগ্ন রূপ না রেখে শিব পার্বতী ও তাদের কন্যা সন্তান সহ ছবি একসাথে রাখুন। গৃহের কল্যাণ হবে।আগামী পর্বে আবার কোনো নতুন বিষয় নিয়ে আসবো আপনাদে সামনে।থাকবে এমনই গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রীয় উপদেশ। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
শিব লিঙ্গের রহস্য
শিব হলেন, সর্বোচ্চ স্তরে, সর্বোৎকর্ষ, অপরিবর্তনশীল পরম ব্রহ্ম ।একদিকে যেমন শিবের অনেকগুলি সদাশয় ও ভয়ঙ্কর মূর্তিও আছে। আবার তিনি একজন সর্বজ্ঞ যোগী স্বর্ব ত্যাগী সন্যাসী । তিনি কৈলাস পর্বতে সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করেন।আবার গৃহস্থ রূপে তিনি পার্বতীর স্বামী। শিব লিঙ্গের ও নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে আজ শিব লিঙ্গের রহস্য জানবো। শেষে থাকবে শিব লিঙ্গ সংক্রান্ত কিছু বিধি নিষেধ।শিব পূরাণ মতে এক সময় ভগবান বিষ্ণু এবং ব্রহ্মার মধ্যে নিজেদের শ্রেষ্টত্ত প্রমান করার জন্য বিবাদ দেখা দিয়েছিল। লড়াই প্রায় বাঁধে বাঁধে। সেই সময় দুই দেবাতার মাঝে আর্বিভাব হয় আদি শিব লিঙ্গএই স্তম্ভ হঠাৎ করে এল কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর।এর শুরু ও শেষ কোথায় তা খুঁজতে ব্রহ্মা ঠিক করেন পিলারের উপরের দিকে গিয়ে দেখবেন কোথায় এর শেষ, আর বিষ্ণু দেব যাবেন নিচের দিকে এর শুরু কোথায়।দুজনেই ব্যার্থ হয়। কারন আদি শিব লিঙ্গ আদি ও অন্ত হীন।তাই শিব দেবতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং দেবতাদের আরাধ্য।আবার তিনি পরম বৈষ্ণব এবং সদা হরির ধ্যানে তিনি মগ্ন থাকেন।শিব লিঙ্গের মধ্যে উপস্থিত রয়েছে এ জগতের অনন্ত শক্তি। আর এত মাত্রায় শক্তি যেখানে মজুত রয়েছে তাকে ঠান্ডা রাখতে না পারলে যে বিপদ! আর ঠিক এই কারণেই শিব লিঙ্গের মাথায় জল ঢালার প্রথা শুরু হয়। যেখানে অনন্ত শক্তি বিরাজমান সেই শক্তির উৎস স্থান কে ঠান্ডা রাখা, শান্ত রাখাই মূল উদেশ্য।আবার সমুদ্র মন্থন কালে বিষ পান করার পরে দেবতারা মহাদেবকে বেলপত্র খাওয়ান কেননা বেলপত্র বিষের প্রভাবকে কম করে দেয়। শিব লিঙ্গ মানে ‘শিবের আবাস’ মানে, বাসস্থান। অর্থাত্ শিবঠাকুর যেখানে বাস করেন বা বিরাজ করেন। শিবের মাথায় জল ঢালার পর যে যে স্থান দিয়ে জল প্রবাহিত হয়ে যায় সেটা পার্বতীর পিঠ। পুরাণ মতে জ্ঞাণের বিকাশ হয় শক্তির পিঠের উপর। শিব লিঙ্গে যে তিনটি দাগ থাকে তা আসলে ত্রিপুন্ড বা শিবের মাথার তিলক যা প্রত্যেক শৈব্যর মাথায় ও বিরাজমান।এবার আসি বিধি নিষেধের দিকে।বাড়িতে শিব লিঙ্গ রাখলে তার উচ্চতা খুব কম হওয়া উচিৎ। ঈশান কোনে শিব লিঙ্গ রাখুন এবং শিবলিঙ্গের বেদীর মুখ উত্তর দিকে হওয়া উচিত।গৃহে একের বেশি শিবলিঙ্গ একসাথে রাখা উচিৎ নয়।পাথরে পরিবর্তে ধাতুর শিব লিঙ্গ গৃহের জন্য বেশি শুভ।শ্রাবন মাস জুড়ে চলতে থাকবে শিব নিয়ে আলোচনা আগামী পর্বে আবার কোনো নতুন বিষয় নিয়ে আসবো আপনাদে সামনে। থাকবে শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
শিবের ত্রিশূলের রহস্য
দেবাদিদেব মহাদেবেকে নিয়ে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায় যদি তার চির সঙ্গী ত্রিশূলের কথা না বলা হয়। সংহার কর্তা মহাদেবের প্রধান অস্ত্রতার ত্রিশূল। আবার এই ত্রিশূলই তিনি তুলে দেন দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুর বধের সময়ে।শুধু অস্ত্র নয় শুভ শক্তির প্রতীক এই ত্রিশূল বাস্তু এবং জ্যোতিষ শাস্ত্রেও ব্যবহার হয়। সে বিষয়ে পরে আসছি আগে ত্রিশূলের শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা টা জেনে নেয়া প্রয়োজন।পুরান অনুসারে শিব হলেন স্বয়ম্ভু তার আদি অন্ত কিছুই নেই। তার সৃষ্টি নেই তার বিনাশ ও নেই।নিজের চেতনায় নিজ ইচ্ছায় সৃৃষ্ট হন এবং যাকিছু অশুভ বা সৃষ্টির জন্যে বিপদজনক তা সংহার করার দায়িত্বে থাকেন তিনি। কিন্তু সংহার কর্তার এই সংহার লীলার জন্যে প্রয়োজন অস্ত্র, এই অস্ত্র নির্মাণের ভার স্বাভাবিক ভাবেই গিয়ে পরে দেব শিল্পী বিশ্বকর্মার উপর|বিষ্ণুপুরান অনুসারে সূর্যের তেজ ও রশ্মির ব্যবহার করে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা ত্রিশূল নির্মাণ করেন এবং তা শিবকে প্রদান করেন|এতে শিব ও তার অস্ত্র পান এবং সূর্যের তেজ কিছুটা কমে তাতে বিশ্বকর্মার কন্যা এবং সূর্যর পত্নী সংজ্ঞা স্বামীর অতিরিক্ত তেজ থেকে কিছুটা স্বস্তি পান|এখানে ত্রিশুল একসাথে দুটি সমস্যার সমাধান করে।আগেই বলেছি ত্রিশূল শুধু শিবের নয় দেবী দূর্গারও অস্ত্র কারন মহিষাসুর বধের জন্য বিভিন্ন দেবতা যখন দেবীকে বিভিন্ন অস্ত্রদান করেন তখন ভগবান শিব তাকে এই ত্রিশূলটি দান করেছিলেন,দেবী মহিষাসুরকে ত্রিশূল দিয়েই বধ করেন|আবার ত্রিশূল দিয়ে শিব দ্বারা গণেশের মুন্ড ছেদের ঘটনারও উল্লেখ আছে শাস্ত্রে|ত্রিশূল শুধু অস্ত্র নয় সনাতন ধর্মে ত্রিশূল সমৃৃদ্ধির প্রতীক আবার ত্রিশূলের তিনটি ফলার আলাদা আলাদা ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য রয়েছে|মনে করা হয় তিনটি ফলা যথাক্রমে সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশ কে চিহ্নিত করে আবার অন্য একটি বাখ্যা অনুসারে তিনটি ফলার অর্থ যথাক্রমে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত যা শিব তথা মহাকালের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে|শিবের ত্রিশূলে সব সময় বাঁধা থাকে ডমরু। এই ডমরু বেদ এবং তার উপদেশের প্রতীক যা আমাদের জীবনে এগিয়ে চলার রাস্তা দেখায়|শুধু হিন্দু নয় বৌদ্ধ ধর্মেও ত্রিশূল একটি পবিত্র প্রতীক হিসেবে সমাদৃত|এবার আসি বৈদিক বাস্তু শাস্ত্রের দিকে, অশুভ শক্তিকে দূরে রাখতে ত্রিশূল ব্যাবহার হয়|বাস্তু শাস্ত্র মতে গৃহের প্রধান ফটকে ত্রিশূল চিহ্ন বা ত্রিশূল রাখলে গৃহে অশুভ শক্তি প্রবেশ করেনা ও গৃহে সুখ ও সমৃদ্ধি বিরাজ করে|জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে শ্রাবন মাসে শিবকে ত্রিশূল অর্পণ করলে শিব সন্তুষ্ট হন এবং মনোস্কামনা পূর্ণ করেন।কবচ আকারে পবিত্র ত্রিশুল ধারন করলেও ভালো ফল পাওয়া যায় বলে অনেকে বিশ্বাস করেন।শ্রাবন মাস জুড়ে চলতে থাকবে শিব নিয়ে আলোচনা আগামী পর্বে আবার কোনো নতুন বিষয় নিয়ে আসবো আপনাদে সামনে|পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।