বাংলার নববর্ষের সূচনা হয় চরক উৎসব দিয়ে আজকের পর্বে এই চরক উৎসব নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আপনাদের সামনে আনবো|চরক মূলত বাংলার লৌকিক উৎসব হলেও পুরানে এর উল্লেখ আছে , লিঙ্গ পুরানে স্পষ্ট বলা আছে চৈত্র মাসে শিবকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্য নিয়ে করা নাচ গানের প্রথাকে বলে চরক|আবার অন্য একটি তথ্য অনুসারে বানরাজ দ্বারকাধীশ কৃষ্ণর কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তার আরাধ্য মহাদেবকে নিজ রক্ত নিবেদন করে তুষ্ট করেন অমরত্ব লাভের আশায় সেই সাধনাকে স্মরণ করা হয় চরক উৎসবের মাধ্যমে।লোকমুখে শোনা যায় যে ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামের এক রাজা প্রথম করেছিলেন এই পুজো এবং ক্রমে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সারা বাংলা জুড়ে|এই চরক স্থান বিশেষে কোথাও নীল পুজো কোথাও গম্ভীরা কোথাও গাজন উৎসব , তবে উদ্দেশ্য একই শিবকে তুষ্ট করা ও তার আশীর্বাদ নিয়ে নতুন বছর শুরু করা|এককালে সাধু সন্ন্যাসীরা বিরাট শোভাযাত্রা বের করতো চরক উপলক্ষে, শরীরে তীক্ষ্ণ অস্ত্র বিঁধিয়ে দেয়া থেকে আগুন ঝাঁপ, কাঁটা ঝাঁপ, বঁটি ঝাঁপ অনেক রীতিই পালন হতো|গ্রামবাংলায় আজও চৈত্রের শুরু থেকেই ধ্বনিত হয় ‘বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগে’। সমাজের প্রান্তিক স্তরের নারী-পুরুষের একাংশ সন্ন্যাস পালন করেন। কেউ কেউ আবার শিব-পার্বতী সেজে হাতে ‘ভিক্ষাপাত্র’ নিয়ে বের হন।কিছু অঞ্চলে চরকের মেলাও বসে যা চলে পয়লা বৈশাখ অবধি|আমাদের বাংলায় চৈত্র সংক্রান্তি মানেই চরক উৎসব, এখন চরক উৎসবের সেই জৌলুস আর নেই শহর ও মফস্সল থেকে ক্রমশঃ লুপ্ত হচ্ছে এই ধার্মিক উৎসব তবে এখনো জেলায় বিশেষত গ্রাম অঞ্চলে চোখে পরে চরকের নানা রীতি নীতি।আপনাদের সবাইকে জানাই চরক উৎসবের অনেক শুভেচ্ছা ও নববর্ষর আগাম শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন।ফিরে আসবো পরের পর্বেপয়লা বৈশাখের বিশেষ পর্ব নিয়ে।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
নীল ষষ্টি বা নীল পূজোর শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা
কথায় বলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। এই তেরো পার্বণেরই অন্যতম হল নীল ষষ্ঠীর ব্রত।দুরকম ভাবে এই দিনটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা যায় একটি লৌকিক মতে দ্বিতীয়টি পৌরাণিক মতে।আজ দুটি দিক নিয়েই লিখবো।নীল ষষ্ঠীর ব্রত যারা করেন তারা সারাদিন নির্জলা উপোস রেখে সন্ধের পর শিবলিঙ্গে জল ঢেলে, মহাদেবের পুজো করেন এবং প্রসাদ খেয়ে তবে উপবাস ভঙ্গ করেন। সাধারণত গ্রাম বাংলায় আমাদের মায়েরা এই ব্রত করেন সংসারের ও বিশেষ করে সন্তানের কল্যাণের জন্য।পুরান মতে দেবাদিদেব শিবের অপর নাম নীলকণ্ঠ বা নীল কারন সমুদ্র মন্থণের সময় উঠে আসা বিষ পান করে তার কণ্ঠ নীল বর্ণের হয়ে যায়।শাস্ত্র মতে এই তিথিতে শিবের সঙ্গে নীলচণ্ডিকা বা নীলাবতী পরমেশ্বরীর বিয়ে উপলক্ষ্যে লৌকিক আচার-অনুষ্ঠান সংঘটিত হয় । দক্ষযজ্ঞে দেহত্যাগের পর সতী পুনরায় নীলধ্বজ রাজার বিল্ববনে আবির্ভূতা হয়ে ছিলেন ৷ এরপর রাজা তাঁকে নিজের মেয়ের মতো করে বড় করে শিবের সঙ্গে ফের বিয়ে দেন ৷ সেই বিবাহের তিথি উদযাপন করা হয় নীল পূজায়।পৌরাণিক ব্যাখ্যার বাইরে যে লৌকিক ব্যাখ্যা আছে নীল ষষ্ঠী নিয়ে সেখানে একটিব্রত কথার উল্লেখ পাওয়ার যায়।এক গ্রামে এক ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী ছিলেন।তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। মন দিয়ে ঈশ্বরের আরাধনা করলেও তাঁদের সব ছেলে-মেয়েগুলি একে একে মারা যায়। এই ঘটনায় ঈশ্বরের উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন ব্রাহ্মণী। তাঁরা দু-জনে ঘরবাড়ি ছেড়ে মনের দুঃখে কাশীবাসী হন। কাশীতে গিয়ে একদিন গঙ্গায় স্নান সেরে মণিকর্ণিকা ঘাটে বসে আছেন, হঠাত্ই এক বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীকে দেখা দিয়ে একটি উপদেশ দেন। তিনি বলেন – চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন নির্জলা উপবাস রেখে মহাদেবের পুজো করবে। সন্ধেবেলা শিবের ঘরে বাতি দিয়ে তবেই জল খাবে।’ ষষ্ঠীবুড়ির কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে ফের সন্তান লাভ করেন ওই ব্রাহ্মণী।আসলে ওই বৃদ্ধা ছিলেন মা ষষ্ঠী। এবং সেইথেকে মর্তে নীল ষষ্ঠীর ব্রত প্রচলিত হয়।নীল পুজোর দিন নিরামিষ আহার করুন , ডাবের জল দিয়ে শিবের অভিষেক করে বারোটি প্রদীপ জালান ও 108 বার ওঁম নমঃ শিবায়ঃ জপ করুন আপনার সংসারে সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধি বিরাজমান থাকবে।ফিরে আসবো পরের পর্বে। ধারাবাহিক আলোচনা নিয়ে। সবাইকে জানাই নীল পূজোর শুভেচ্ছা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
শিব কথা – কেশবেশ্বর শিব
সারা বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য শিব মন্দির। চৈত্র সংক্রান্তি তথা নীল ষষ্ঠী উপলক্ষে প্রায় সবগুলি মন্দিরই বিশেষ সাজে সেজে ওঠে।
তেমনই একটি মন্দির দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কেশবেশ্বর শিব মন্দির যা নিয়ে লিখবো
আজকের পর্বে।
বিখ্যাত সাবর্ণ রায় চৌধুরী বংশের অন্যতম সদস্য ছিলেন জমিদার কেশবরাম রায় যিনি ছিলেন তৎকালীন বঙ্গ সমাজের অন্যতম গুণী ও সন্মানীয় ব্যাক্তি। কেশবরাম কাশীর বিশ্বনাথের স্বপ্নদর্শনে যে সন্তান লাভ করেছিলেন তাঁর নাম রাখেন শিবদেব, যিনি সন্তোষ রায় চৌধুরী নামে পরিচিত। কেশবরাম রায় ১৬৯৯ সালে ঔরঙ্গজেবের কাছ থেকে স্বতন্ত্র ‘রায় চৌধুরী’ খেতাব পেয়েছিলেনসেই থেকে তারা রায় চৌধুরী পদবি ব্যাবহার করছেন।
ব্রিটিশ আমলে সমগ্র দক্ষিণবঙ্গের সমাজপতি কেশবরাম দক্ষিণ ২৪ পরগনার মন্দিরবাজারে যে শিবমন্দির এবং শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে যান তার কেশবরামের নামানুসারে নাম হয় কেশবেশ্বর।
মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছেন মহাদেব, লোকমুখে শোনা যায় যে কাশী থেকে আনা হয়েছিল এই শিবলিঙ্গ। শিবমন্দির, যা প্রায় ৬০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট আটচালা মন্দির। মন্দিরের ২১টি সিঁড়ির মধ্যে ১৬টি ধাপের সিঁড়ির বেশি ভাগই ইতিমধ্যেই মাটির তলায় লীন হয়েছে। সামান্য কয়টি সিঁড়ি দেখা যায়।বিশাল নন্দী মূর্তিও রয়েছে।
শিবরাত্রির দিন এবং নীল চৈত্র মাসের নীল ষষ্ঠীর সময়ে বিশেষ পূজা হয় কেশবেশ্বর মন্দিরে।সেই সময়ে বিশাল সংখ্যক ভক্তসমাগম ঘটে এই দিন মন্দিরচত্বরে।বহু মানুষ আসেন নিজের মনোস্কামনা নিয়ে। শোনা যায় বাবা কেশবেশ্বর তার ভক্তদের খালি হাতে ফেরান না।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। চৈত্র মাসের এই বিশেষ কয়েকটি দিনে। চরক উৎসব এবং নীল ষষ্ঠীর ধর্মীয় তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করবো। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
শিব কথা – বুড়ো শিব
বাংলায় শিবঠাকুরকে তার রূদ্র রূপ বা ধ্যানস্ত রূপের তুলনায় শান্ত সৌম্য রূপে বেশি দেখা যায়। কোথাও কোথাও আবার বুড়ো শিব বলেও সম্মোধন করা হয়। কিন্তু কেনো বুড়ো শিব?সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো আজকের পর্বে।জানবো এক প্রাচীন ঐতিহাসিক শিব মন্দির সম্মন্ধে।শিবের একটি লৌকিক রূপ হলো এই বুড়ো শিব। এই রূপে তিনি সাধারণ মানুষের মতো বয়স বাড়ার কিছু চিন্হ বহন করেন। যেমন মেদ বহুল ভারী শরীর, গোফ এবং জটা ও দাড়িতে বয়সের ছাপ।উত্তর ২৪ পরগনার আড়িয়াদহে আছে এক বুড়োশিব মন্দির যাঁর উৎপত্তির কাহিনি রীতিমতো অবাক করার মতোশোনা যায় এই বুড়োশিব স্বয়ম্ভূ। রাজা হোসেন শাহর আমলে এক ব্রাহ্মণ স্বপ্নে দেখেন যেমহাদেব তাঁকে বলছেন যে অনেকদিন গঙ্গার ধারে জঙ্গলের মধ্যে রয়েছি। এবার একটু সেবার ব্যবস্থা কর। পরদিন ওই ব্রাহ্মণ, গঙ্গাপারে গিয়ে দেখতে পান, সেখানে সত্যিই একটি শিবলিঙ্গ রয়েছে। ব্রাহ্মণের মুখ থেকে এই কথা শোনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ওই শিবলিঙ্গ জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে ও তার পূজার ব্যবস্থা করে।ব্রিটিশ আমলে তৎকালীন বড়লাট হেস্টিংসের কানে একবার পৌঁছল বুড়োশিবের সম্পর্কে নানা অলৌকিক কাহিনি। তিনি নিজেই গেলেন বুড়োশিবের মন্দিরে ভক্তদের বিশ্বাস ভাঙাতে। গিয়েই সঙ্গে উপস্থিত কর্মীদের নির্দেশ দিলেন এই পাথর বা শিবলিঙ্গ তুলে পাশের গঙ্গায় ফেলে দিতে।তার নির্দেশে শুরু হয় মাটি থেকে শিবলিঙ্গ তুলে ফেলার কাজ। কিন্তু, যতই খোঁড়াখুঁড়ি চলে, শিবলিঙ্গের তলের সন্ধান আর হেস্টিংসের লোকজন পান না। দিনভর খোঁড়ার শেষেও যখন শিবলিঙ্গের তল খুঁজে পাওয়া গেল না, তখন বড়লাট হেস্টিংসের ভুল ভাঙল। তিনি এই হিন্দু দেবতার অলৌকিক ক্ষমতা দেখে অবাক হয়ে ফিরে গেলেন।বুড়ো শিবের মহিমা আরো বেশি প্রচারিত হলো সারা বাংলায়।বহু প্রাচীন এই মন্দিরের স্থাপনা কবে হয়েছিলো তার সঠিক দিন ক্ষণ পাওয়া যায়না তবে একাধিক বার সংস্কার করা হয়েছে এই মন্দির সে বিষয়ে নানা তথ্য রয়েছে।ফিরে আসবো শিব কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে।থাকবে আরো এক মন্দিরের কথা সঙ্গে শিব সংক্রান্ত নানা অজানা তথ্য। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।
শিব কথা – জলেশ্বর মহাদেব
চৈত্র মাস প্রায় শেষ হতে চললো। সামনেই চরক উৎসব এবং নীল ষষ্ঠী।বাংলা নব বর্ষকে বরন করা আর কিছুদিন পরেই। আজ আপনাদের এমন এক অদ্ভুত শিব মন্দির নিয়ে লিখবো যার সাথে এই চরক উৎসবের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় রয়েছে জলেশ্বর শিব মন্দির যেখানে মূল বিগ্রহ বছরে মাত্র একবার উঠে আসে শিব পুকুর থেকে। বাকি সময় জলের নীচেই থাকেন মহাদেব।প্রতি চৈত্র মাসের তৃতীয় সোমবার চড়কের সময়ে সন্ন্যাসীরা এই শিব লিঙ্গ মন্দিরের সামনের শিব পুকুর থেকে তুলে আনেন। এবং তারপর হালিশহরের গঙ্গায় শিব লিঙ্গটি স্নান করান এবং স্নানের পর গ্রামের আটটি পরিবারে পূজিত হয় এই শিবলিঙ্গ।সব শেষে পয়লা বৈশাখের দিন আবার এই শিবলিঙ্গ ডুবিয়ে দেওয়া হয় শিবপুকুরে। যদিও মন্দিরে সারা বছর অন্য একটি বিগ্রহ রাখা হয় এবং পুজো করা হয়।জলের নীচে ঈশ্বর বাস করার কারনে শিব এখানে জলেশ্বর মহাদেব নাম খ্যাত।ইতিহাস বলছে সেন বংশের রাজত্বকালে, দ্বাদশ শতকের শেষের দিকে এখানে শিব পূজার প্রচলন শুরু হয়।পরবর্তীতে গোবরডাঙার জমিদার রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় শিবমন্দিরের জন্য বেশ কয়েক বিঘা জমি দান করেন। সেই জমিতে তৈরী হয় মহাদেবের মন্দির ও শিব পুকুর।মন্দিরের পাশেই রয়েছে এক বহু প্রাচীন গাছ। সেখানে মনস্কামনা পূরণের জন্য ভক্তরা ঢিল বেঁধে যান। সব মিলিয়ে জলেশ্বর শিব মন্দির, শিবপুকুর এবং এই মনোস্কামনা পূরণ করা বিশাল বৃক্ষ এক অদ্ভুত ও অলৌকিক পরিবেশ সৃষ্টি করে যা ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। উপলব্ধি করতে হয়।ফিরে আসবো শিব কথা নিয়ে আগামী পর্বে। থাকবে অন্য কোনো শিব মন্দিরের কথা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
কালী ক্ষেত্র – জহুরা কালী মন্দিরের ইতিহাস
বাংলার ইতিহাস জানতে হলে মালদার ইতিহাস জানতেই হবে কারন বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা শশাঙ্কের আমল থেকে পাল, সেন, সুলতানি, এবং মুঘল আমল পর্যন্ত একটা দীর্ঘ সময় অবধি মালদা ছিলো পূর্বাঞ্চলের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু।
পরবর্তীতে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ায় মালদা ধীরে ধীরে তার গৌরব হারাতে থাকে। তবে অসংখ্য প্রত্নত্তাত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে মালদায় যার মধ্যে আছে বহু মন্দির এবং তীর্থ স্থান। পাশাপাশি প্রাচীন বাংলার বহু ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ এই মালদা জেলা|রয়েছে প্রাচীন গৌরের ধ্বংসাবশেষ, আদিনা মসজিদ, দাখিল দরজা, ফিরোজ মিনার, বড়ো সোনা মসজিদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান।
কিছু প্রচিন হিন্দু মন্দিরের কথা আলাদা করে বলা যায় যার মধ্যে অন্যতম জহুরা কালী মন্দির।
মালদার জহুরা কালী মন্দির খুবই প্রাচীন এবং বেশ জাগ্রত এই কালী মন্দিরকে কেন্দ্র করে অনেক রহস্যময় ও অলৌকিক ঘটনা প্রচলিত আছে।কেনো কালী মন্দিরের নাম জহুরা কালী মন্দির তার পেছনেও এক রোমাঞ্চকর গল্প আছে।
আগেই বলেছি জহুরা কালী মন্দিরের ইতিহাস বেশ প্রাচীন এবং কিভাবে এখানে পুজো শুরু হলো ও পরবর্তীতে মন্দির স্থাপিত হলো তানিয়ে একাধিক মতামত রয়েছে|কিছু ইতিহাস বিদ মনে করেন এই দেবীর পুজোর সূচনা হয়েছিলো সেন বংশের রাজা বল্লাল সেনের আমলে আবার মন্দিরের গায়ে যে পাথরের ফলক আছে, তা থেকে অনুমান করা যায়,আজ থেকে তিনশো বছর আগে উত্তরপ্রদেশের কোনো এক মাতৃ সাধক স্বপ্নাদেশ পেয়ে এখানে দেবী জহরা চণ্ডীর বেদি স্থাপন করেছিলেন|
ইংরেজবাজার থানা এলাকায় একটি প্রাচীন আমবাগানের মধ্যে রয়েছে এই প্রাচীন জহুরা কালীমন্দির।শোনো যায় এক কালে এই অঞ্চলে ছিলো ঘন অরণ্য|ডাকাতরাই একপ্রকার শাসন করতো এই এলাকা এবং এই দেবী এক সময়ে ছিলেন ডাকাতদের আরাধ্যা। এখানে দেবী চণ্ডীর পুজো করে ডাকাতরা যেত ডাকাতি করতে। ডাকাতি করে প্রচুর ধনরত্ন আনত তারা, তারপর সেগুলোকে এখানেই মাটির তলায় রাখত। সেই ধনরত্নের ওপরই দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয় যেহেতু ধনরত্নকে হিন্দিতে বলে ‘জওহর’। দেবীমূর্তির নিচে প্রচুর ধনরত্ন রাখা থাকত বলেই এখানে দেবী চণ্ডী ‘জহরা’ বা ‘জহুরা’ নামে বিখ্যাত|
শোনা যায় বহুকাল আগে এখানে দেবীর পূর্ণ অবয়ব মূর্তি ছিলো তবে বিদেশী শত্রুর আক্রমণের ভয়ে তা মাটির নিচে লুকিয়ে ফেলেন পুরোহিতরা|
বর্তমানে মন্দিরের অভ্যন্তরে লাল রঙের ঢিবির ওপর রয়েছে এক মুখোশ এবং ঢিবির দু’পাশে আরও দু’টি মুখোশ দেখা যায়। এছাড়া গর্ভগৃহে আছে শিব আর গণেশের মূর্তি|এখানে বৈশাখ মাসের মঙ্গল ও শনিবার থাকে বিশেষ পুজোর আয়োজন|উল্লেখযোগ্য বিষয় অন্যান্য কালীমন্দিরের মতো এখানে রাত্রিবেলা কোনো পুজো হয় না পুজো হয় দিনে|
দেবী জহুরা চন্ডিরই রূপ তিনি অত্যন্ত জাগ্রত ও প্রসিদ্ধ তার পুজো উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও বিহার, ঝাড়খণ্ড থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ সমবেত হন এই মন্দির প্রাঙ্গনে|প্রতিটি অমাবস্যা তিথিতে জহুরা কালী মন্দিরে তন্ত্র মতে পুজো হয় এবং বহু দর্শণার্থী আসেন সেই পুজো দেখতে।
যখনই এই ঐতিহাসিক মালদা সফরের সুযোগ হয় তখনই চেষ্টা করি কিছুটা সময় বের করে দেবী জহুরার মন্দির দর্শন করতে। আজ এই মন্দির সম্পর্কে আমার জানা কিছু তথ্য ও ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথেও ভাগ করে নিলাম যা আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।
আবার পরের পর্বে ফিরে আসবো নতুন কোনো আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্ম – কাঠের কালী মূর্তি
বীরভূমের ঐতিহ্যবাহী কালীপুজোগুলির মধ্যে অন্যতম সাঁইথিয়ার কাঠের কালীপুজো এই ব্যাতিক্রমী কাঠের কালী প্রতিমা নিয়ে লিখবো আজকের পর্বে।এই পূজোর বিশেষত্ব হলো এখানকার কালী প্রতিমা দারু অর্থাৎ কাঠের তৈরী । দীপান্বিতা অমাবস্যায় পুজোর পর সারাবছর প্রতিমা মন্দিরেই থাকে। পুজোর দুদিন আগে সেই দারু মূর্তি বিসর্জন করা হয় মন্দিরের পিছনে থাকা কালী গড়েতে।আবার নতুন কাঠের মূর্তি তৈরী হয় নিয়ম করে যথা সময়ে।এখানে মায়ের মূর্তি বলতে শুধু গলা থেকে মুখটুকু। ৩ খণ্ড নিমকাঠ দিয়ে বংশ পরম্পরায় যা তৈরি করেন সাঁইথিয়ার পাথাই গ্রামের সূত্রধর বংশ।আরো একটি অদ্ভুত ও অলৌকিক বিষয় হলো বিসর্জনের সময় এই দারু মূর্তি শিকল দিয়ে বেঁধে বিসর্জন করার রীতি । শিকল দিয়ে বেঁধে দারু মূর্তি বিসর্জন করা করা হয় যাতে সেই মূর্তি কোথাও পালিয়ে না যায় তার জন্য।বেঁধে রাখার পেছনে আসলে অসংখ্য ভক্তদের শ্রদ্ধা ও মায়ের প্রতি টান আসল কারন।শোনা যায় একসময় মাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হত মন্দিরে। এমনকী বিসর্জনের পর যাতে গ্রাম ছেড়ে মা চলে না যান, তার জন্য দিন-রাত পুকুর পাড়ে পাহারা দেন ভক্তরা।অদ্ভুত এই রীতি আজও পালন হয়।প্রতিবছর দীপান্বিতা অমাবস্যায় ধুমধামে এখানে কালীপূজো করা হয়ে থাকে।দূর দূর থেকে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে বহু মানুষ আসেন।দেবী মাহাত্ম নিয়ে ফিরে আসবো পরের পর্বে।পাশাপাশি চলবে মন্দির রহস্য নিয়ে আলোচনা।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্ম- জীবন্ত কালীমূর্তি
আজকের পর্বে আপনাদের দুর্গাপুরের কল্যাণী কালী মন্দিরের কথা বলবো। এই মন্দিরের অধিষ্টিত্রী দেবী ভক্তদের কাছে জীবন্ত কালী রূপে বেশি জনপ্রিয়।কেনো এই খ্যাতি এবং এই অদ্ভুত নাম সেটা জানতে হলে পড়তে হবে।
অজস্র ঘটনার উল্লেখ রয়েছে দেবী জীবন্ত কালীকে ঘিরে। তার মধ্যে দুটি ঘটনার কথা আজ বলবো। শোনা যায় একবার এক মহিলা কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন যার ফলে তাঁর মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত হয়ে পরে।সেই সময় তিনি এই
দেবীর কাছে নিজের জীবনভিক্ষা করেন । অদ্ভুত ভাবে কিছু দিনের মধ্যে সুস্থ্য হয়ে ওঠেন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ওই মহিলা। শুধু সেরে যাওয়াই নয়। তিনি দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন।
বহু অলৌকিক ঘটনার মধ্যে দ্বিতীয় যে ঘটনাটি নিয়ে বলবো তা এক চুরির ঘটনা।একবার এই মন্দিরে এক চোর চুরি করেছিল। কিন্তু চুরির পরে প্রণামীর অর্থ সে আর নিয়ে যেতে পারেনি। পথেই আচমকা সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে।প্রবল জ্বর আসে তার।চোর বুঝতে পারে কেনো এমন হলো। সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরে ফিরে এসে দেবী কল্যাণী কালীকে চুরি যাওয়া প্রণামীর অর্থ ফিরিয়ে দেয় এবং নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেয় দেবীর কাছে। অলৌকিক ভাবে পর মুহূর্তেই সেরে যায় ওই চোরের জ্বর। বাড়ি ফিরে যায় সে।
ভক্তদের মতে নানা রকমের অলৌকিক ঘটনা নিত্য ঘটে থাকে এই মন্দিরে।অনেক ভক্তর মতে এখানে এলে প্রায়ই অনুভব করা যায় যে দেবী তাদের আশপাশেই আছেন। মন্দির চত্বরেই তিনি ঘোরাঘুরি করছেন।প্রতি মুহূর্তেই দেবী কালী যেন বুঝিয়ে দেন, তিনি জড় বিগ্রহ নন। তিনি জীবন্ত।তার উপস্থিতি উপলব্ধি করতে হলে অন্তরে শ্রদ্ধা এবং ভক্তি থাকলেই হবে।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। নতুন কোনো দেবী মাহাত্মা নিয়ে। থাকবে এমনই সব অদ্ভুত
এবং অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
শুভ হনুমান জয়ন্তী
আজ হনুমানজির আবির্ভাব তিথি বা ‘হনুমান জয়ন্তী’ তাই আজকের পর্বে আপনাদের জানাবো রূদ্র অবতার হনুমান সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য|হনুমানের পিতার নাম ছিল কেশরী, মায়ের নাম ছিল অঞ্জনা। হনুমানের পালক পিতা হলেন পবন দেবতা|রাক্ষস বাহিনীর অত্যাচার থেকে ধরিত্রীকে মুক্ত করতে, তথা ভগবান রামের সেবা ও রাম নাম প্রচারের জন্যই রুদ্র অবতার হনুমানের আবির্ভাব।পুরানের একটি ঘটনা অনুসারে একদা দশানন রাবণ কৈলাশে পাহারারত নন্দীকে ব্যাঙ্গ করলেন বানর বলে|ক্ষিপ্ত হয়ে নন্দী রাবণকে অভিশাপ দিলেন এক বানরের হাতেই রাবণ আর তার কূল ধ্বংস হবে|এই অভিশাপই পরবর্তীতে সত্য হয়েছিলো। রাবনের পতনের বড়ো ভূমিকা নিয়েছিলেন হনুমানজি।হনুমানজী দ্বাপর যুগেও ছিলেন। মহাভারতেও তার উল্লেখ রয়েছে মনে করা হয় কুরুক্ষে যুদ্ধে অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণের রথের ধ্বজা হিসেবে ছিলেন। তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছায়।কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করেছেন। হনুমানজীর অনুরোধে শ্রীকৃষ্ণ রামচন্দ্রের রূপ ধারণ করে হনুমানকে একবার দর্শন দিয়েছিলেন।শাস্ত্র মতে হনুমান চার যুগে অমর অর্থাৎ তিনি আজও স্বশরীরে এই পৃথিবীতে বিরাজমান।যেখানে যেখানে রঘুনাথের গুণগান করা হয় সেখানে সেখানেই তিনি অবস্থান করেন|আবার হনুমান চালিসা অনুসারে রোগ ভোগ, ভুত পিশাচ এবং যেকোনো সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া যায় হুনুমানের স্মরণ নিলে, তাকে ভক্তি সহকারে ডাকলে|আজও রামকৃষ্ণ মিশনের বহু প্রচলিত একটি রীতি হলো যেখানেই সাধুরা রাম নাম করবেন , কীর্তন ভজন হবে সেখানেই একটি ফাঁকা আসন রাখা হবে, মনে করা হয় ওই ফাঁকা আসনে এসে বসেন স্বয়ং হনুমান তারপর নাম গান শেষ হলে আবার অদৃশ্য হন|বজরংবলী অষ্ট সিদ্ধির অধিকারী। অর্থাৎ আটটি দুর্লভ ক্ষমতা রয়েছে তার। আবার তার স্মরণাগত দের গ্রহ রাজ শনিদেব কোনো ক্ষতি করেন না কারন রাবনের কারাগার থেকে তিনি শনিদেবকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং শনিদেব খুশি হয়ে তাকে এই বর দিয়েছিলেন।রূদ্র অবতার হনুমানের চরনে প্রনাম জানিয়ে আজকের এই বিশেষ পর্ব শেষ করছি।আপনাদের সবাইকে জানাই হনুমান জয়ন্তীর অনেক শুভেচ্ছা|ফিরে আসবো পরের পর্বে দেবী মাহাত্ম নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্ম – লাল দূর্গা
নবদ্বীপে ভট্টাচার্য্য বাড়ির দুর্গাপুজো বাংলার প্রাচীনতম পারিবারিক দুর্গাপূজাগুলির অন্যতম।এই পূজোর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো প্রতিমার গায়ের রং। দেবী এখানে সম্পূর্ণ লাল রঙের। কেনো এই অদ্ভুত রূপ সেই নিয়েই আজকের পর্ব।দেবীর এই রক্তবর্ণ রূপের পেছনে একটি অলৌকিক ঘটনা রয়েছে।কথিত আছে একবার দুর্গাপুজোর সময় মায়ের পূজা চলাকালীন ভুল চণ্ডীপাঠের কারণে আশ্চর্যজনকভাবে মায়ের মূর্তি দিক পরিবর্তন করে দক্ষিণমুখী হয়ে যায় এবং সম্পূর্ণ রূপ পরিবর্তন করে রক্তবর্ণ ধারণ করে। কার্তিক ও গণেশের স্থান বদল হয়ে যায় একে অপরের সাথে।শুধু তাই নয় চণ্ডীপাঠ রত ভট্টাচার্য্য বাড়ির ওই সদস্যের সারা শরীর ফ্যাকাসে ও রক্তশূন্য হয়ে যায়। পরবর্তীতে ওই সদস্য প্রাণ ত্যাগ করেন বলেও শোনা যায়।অলৌকিক এই ঘটনার কারন হিসেবে তারা মনে করেন পুজোয় ভুল থাকায় দেবী বেজায় ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন বলেই তিনি রক্ত বর্ণের হয়ে যান।ফল স্বরূপ পরিবারের সদস্যর প্রাণ হানী হয়।সেই থেকে এই রক্ত বর্ণ দূর্গামূর্তি পূজিতা হয়ে আসছেন এখানে।প্রতি বছর দূর্গা পুজোয় নিষ্ঠা সহকারে দেবী দুর্গার পুজো করা হয় এখানে। দেবী লাল দূর্গা নামেই জনপ্রিয়। পুজোতে মাকে বোয়াল মাছ ও থোড় দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। পূর্বে বলির প্রথা থাকলেও বর্তমানে কুমড়ো বলি দেয়া হয় মায়ের পুজো তে।খুব সচেতন ভাবে প্রতিটি নিয়ম ও রীতি পালন করা হয় যাতে আর কখনো দেবীর ক্রোধ না জন্মায়।ফিরে আসবো পরের পর্বে এমনই কোনো দেবী মাহাত্ম নিয়ে। থাকবে অলৌকিক সব ঘটনার সম্ভার ও তাদের ব্যাখ্যা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।