প্রতি বছর ২৫ এ বৈশাখ এলেই কবি গুরুকে নিয়ে কিছু না কিছু বলে থাকি। শুধু তাই নয় তার গানে তার কবিতায় তাকে স্মরণ করার চেষ্টা করি নিজের মতো করে। এ অনেকটা গঙ্গা জলে গঙ্গা পুজো বলা যায়।বিগত বছর গুলিতে রবীন্দ্রনাথের রসবোধ নিয়ে লিখেছি। তার রসনা তৃপ্তি এমনকি তার পরলোক চর্চা নিয়েও আলোচনা করেছি। আজ তার পোশাক নিয়ে ভাবনা বা সাজ সজ্জা নিয়ে দুচার কথা বলি।রবীন্দ্রনাথ তার যথেষ্ট স্টাইলিশ বা ফ্যাসন সচেতন ছিলেন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি শেষের কবিতায় এক জায়গায় লিখছেন ফ্যাসন হলো মুখোশ আর স্টাইল হলো মুখ।অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন স্টাইল বলতে আমরা যা বুঝি তা হলো ব্যাক্তিত্ব যা সহজাত এবং সতস্ফূর্ত আর ফ্যাশন হলো আসল ব্যাক্তিত্বকে আড়াল করার প্রচেষ্টা যা পরিবর্তনশীল এবং ক্ষণস্থায়ী।তবে শুধু রবীন্দ্রনাথ নন তার পূর্ব পুরুষরাও তাদের পোশাক নিয়ে আলোচনায় থাকতেন।ঠাকুর বাড়ির সাজ পোশাকের ইতিহাস নিয়ে অনেক কথাই শোনা যায়।অবনীন্দ্র নাথ ঠাকুর শোভা বাজার রাজ বাড়ির এক জলসা প্রসঙ্গে লিখে ছিলেন ” জলসার দিন দেবেন্দ্রনাথ পরলেন— ‘সাদা আচকান জোড়া…মাথার পাগড়িটি অবধি সাদা। কোথাও জরি কিংখাবের নামগন্ধ নেই…পায়ে কেবল সেই মুক্তো বসানো মখমলের জুতো জোড়াটি।’ এ সাজ দেখে রাজবাড়ির কর্তা, সভার ছোটদের দেখিয়ে বলেছিলেন—‘দেখ, একেই বলে বড়লোক। আমরা যা গলার মাথায় ঝুলিয়েছি, ইনি তা পায়ে রেখেছেন!’ঠাকুর পরিবারের মহিলারাও পিছিয়ে ছিলেন না সেকালে বেনারসি জোড়, গলায় মুক্তোর মালা, হিরের কণ্ঠা, হাতে বালা, আঙুলে জড়োয়া আংটি’ পরে বিয়ে বাড়িতে যেতেন ঠাকুর পরিবারের গৃহিনীরা যা দেখে চোখ ধাধিয়ে যেত বনেদি বাড়ির অভিজাত অতিথিদের।সেই দিক দিয়ে দেখতে গেলে রবীন্দ্রনাথ যখন বড়ো হচ্ছেন তখন ঠাকুর পরিবারের আর্থিক প্রতিপত্তি তখন ওস্তাচলে যার প্রভাব পড়েছিল সেই পোশাক আশাকের আভিজাত্যতে রবীন্দ্রনাথ নিজেই নিজের জীবন স্মৃতিতে লিখেছেন— ‘বয়স দশের কোটা পার হইবার পূর্বে কোনওদিন কোনও কারণেই মোজা পরি নাই। শীতের দিনে একটা সাদা জামার উপরে আর একটা সাদা জামাই যথেষ্ট ছিল।’ এ তথ্য জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ কৌতুক করে বলেছেন আমাদের চটি-জুতা একজোড়া থাকিত। কিন্তু পা দুটা যেখানে থাকিত সেখানে নয়।’ তবে কৈশোরের প্রথমেই দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে হিমালয় যাত্রার সময়, পরিবারের উপযুক্ত সাজ তৈরি হয়েছিল তাঁর জন্য। ‘আমার বয়সে এই প্রথম আমার জন্য পোশাক তৈরি হইয়াছে। কী রঙের কী রূপ কাপড় হইবে—পিতা স্বয়ং আদেশ করিয়া দিয়াছেন। মাথার জন্য একটা জরির কাজ করা গোল মখমলের টুপি হইয়াছিল।’কৈশোরে বিলিতি শুট বা জুতো পড়লেও তাতে নানা রকম বৈচিত্র চোখে পড়তো। তার কুর্তা বা পাঞ্জাবীতেও ঠাকুর বাড়ির কিছু বৈশিষ্ট লক্ষ করা যেত।যৌবনে অবশ্য পোশাক নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা তিনি করেছেন তা তার নানা বয়সের ছবি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। বিদেশ ভ্রমণ কালে নানা দেশের পোশাক ও তিনি পড়েছেন এবং দিব্যি মানিয়েছে তাকে।আর মানাবে না কেনো আসল রহস্য তো লুকিয়ে তার রূপে তার ব্যাক্তিত্বে। তার রূপ সম্পর্কে প্রমথ চৌধুরী লিখেছেন, ‘আমি এর পূর্বে রবীন্দ্রনাথের মতো সুপুরুষ কখনো দেখিনি। তাঁর বর্ণ ছিল গৌর, আকৃতি দীর্ঘ, কেশ আপৃষ্ঠ-লম্বিত ও কৃষ্ণবর্ণ, দেহ বলিষ্ঠ, চরম মসৃণ ও চিক্কণ, চোখ-নাক অতি সুন্দর।তবে পরিণত বয়সে রবীন্দ্র নাথ গরদের ধুতি পাঞ্জাবি পরে, গলায় চাদর ঝুলিয়েশান্তিনিকেতনে বাকি জীবন টা কাটিয়ে ছিলেন।তখন তিনি শান্ত সমুদ্রের নেয় ধীর স্থির তার জীবন তখন আধ্যাত্মিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ।রবীন্দ্র নাথ কে নিয়ে আলোচনা হোক বা লেখা লেখি।অল্প কথায় তাকে ধরা মুশকিল। তাই আবার কখনো সময় সুযোগ হলে চেষ্টা করবো তার জীবনের অন্য কোনো আঙ্গিক ছুঁয়ে দেখার।সবাইকে পঁচিশে বৈশাখের শুভেচ্ছা।ভালো থাকুন রবীন্দ্র নাথ কে নিয়ে থাকুন। ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্ম – গন্ধেশ্বরী মাতা
যে শহরের নামের সাথে তার ইতিহাসের সাথে মিশে আছে দেবী কালীর অস্তিত্ব সেই শহরে যে অসংখ্য প্রাচীন দেবী মন্দির থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে কলকাতার কালী মন্দিরের কথা ইতিমধ্যে অনেক গুলি বলেছি। আজ আপনাদের দেবী আদ্যা শক্তির একটি ব্যাতিক্রমী রূপ তার মন্দিরের কথা বলবো।কলকাতায় বিখ্যাত ঠনঠনিয়া সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের কাছেই রয়েছে মা গন্ধেশ্বরীর মন্দির।রাজেন্দ্র দেব লেনের ছোট্ট এই মন্দিরটি পশ্চিমমুখী। মন্দিরের সামনে নাটমন্দির।গর্ভগৃহে রয়েছে দেবী গন্ধেশ্বরীর অষ্টধাতুর মূর্তি।বাংলার প্রাচীন গন্ধবণিক সম্প্রদায়ের আরাধ্যা দেবী হলেন গন্ধেশ্বরী মনে করা হয় দেবীর নাম থেকেই এই সম্প্রদায়ের নাম গন্ধেশ্বরী আবার অনেকে মনে করেন উল্টোটা মানে গন্ধ বণিক দের দ্বারা স্থাপিত হয়েছিলো তাই দেবী গন্ধেস্বরী নামে খ্যাত।নাম যাই হোক দেবী আসলে দেবী দুর্গারই একটি রূপ এবং পুরান মতে গন্ধেশ্বরী রূপে মহামায়া গন্ধাসুর নামক এক দুর্দান্ত অসুরকে বধ করেছিলেন।প্রাচীন বাংলায় সাজাগোজার জিনিসপত্র, ধূপ, চন্দন কাঠ, সিঁদুর, নানারকম মশলা- এই সব দ্রব্য সুদূর দেশ থেকে আমদানি রপ্তানি করতো এই গন্ধবণিক সম্প্রদায়। গন্ধবণিক সম্প্রদায়ের ধারণা দেবীর কৃপায় তাঁদের ব্যবসায়ের উন্নতি ঘটে এবং দেবী গন্ধেশ্বরীই তাঁদের ব্যবসাকে রক্ষা করেন।বর্তমানে যে মন্দির টি কলকাতায় দেখা যায়।সেই মন্দির তৈরি হয়েছিল ১৩৪৬ বঙ্গাব্দের ১৭ বৈশাখ। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গন্ধবণিক মহাসভার তৎকালীন সভাপতি। নাম তারিখ সবই মন্দিরের ফলকে আজও দেখা যায়।দেবী সিংহবাহিনী এবং চতুর্ভুজা। তাঁর চারটি হাতে যথাক্রমে শঙ্খ, চক্র এবং ধনুর্বাণ। দেবী গন্ধেশ্বরী অনেকটা দেবী জগদ্ধাত্রীর মতই দেখতে। প্রতি বছর বৈশাখী পূর্ণিমায় দেবীর বিশেষ পুজো হয়।গন্ধবণিকরা এদিন ব্যবসার খাতা এবং ওজন পরিমাপের যন্ত্র সাজিয়ে রাখেন দেবীর সামনে।ইতিহাস প্রসিদ্ধ চাঁদ সওদাগর এবং ধনপতি সওদাগর প্রমুখরা গন্ধবণিক সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন।এবং তারা নিষ্ঠা সহকারে দেবী গন্ধেশ্বরীর পুজো করতেন বলেও মনে করা হয়।দেবীআদ্যা শক্তির আশীর্বাদে শুধু ব্যবসা নয় জীবনের যেকোনো সমস্যা দূর হতে বাধ্য। আমাদের শুধু সঠিক শাস্ত্রীয় নিয়ম ও তিথি অনুসরণ করতে হবে। সামনের ফল হারিণী অমাবস্যা তিথি এমনই এক তিথি।গ্রহ দোষ খণ্ডন ও তন্ত্র ক্রিয়ার জন্য আদর্শ এই তিথিকে চাইলে আপনারাও কাজে লাগাতে পারেন।ফিরে আসবো আগামী পর্বে দেবী দেবী মাহাত্ম বা মন্দির রহস্যর নতুন পর্ব নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্ম – ঘাগর বুড়ির অলৌকিক বৃত্তান্ত
ফল হারিণী অমাবস্যা যত এগিয়ে আসছে ততই জমে উঠছে দেবী মাহাত্ম পর্ব গুলি। আমি নয় আপনাদের প্রতিক্রিয়া এবং উৎসাহ তাই বলছে।সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই আজ এক অদ্ভুত এবং অলৌকিক ঘটনায় ভরপুর দেবী উপাখ্যান নিয়ে আমি আবার আপনাদের সামনে উপস্থিত।আজকের পর্বে শোনাবো ঘাগর বুড়ির অলৌকিক বৃত্তান্ত।প্রথমে একটু ভূমিকা করে নেয়া প্রয়োজন তাতে আপনাদেরই সুবিধা হবে বুঝতে।সে আজ প্রায় পাঁচশো বছর আগেকার কথা। আজকের আসানসোল মহানগর তখন ধূ ধূ করা মাঠ এবং আসান গাছের জঙ্গল এই আসান গাছ থেকেই পরবর্তীতে এলাকার নাম হয় আসানসোল।সেই সময়ে এই অঞ্চলে এক গরীব ব্রাহ্মণ কাঙালীচরণ চক্রবর্তী বাস করতেন।সামান্য কয়েকজন জজমানের বাড়িতে পুজো করে যা পেতেন তাই দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলতো।আবার কোনো দিন অনাহারেও দিন কাটতোএকবার এক শীতের দিনে ক্ষুধা তৃষ্ণায় ক্লান্ত কাঙালীচরণ এক গাছতলার শীতল ছায়ার নীচে শুয়ে ছিলেন। দুর্ভাগ্য বসত সেদিন তার কিছুই জোটেনি। কাতর ভাবে ডাকতে লাগলেন মা চণ্ডীকে।তারপর কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎ চোখ খুলে গেলো এক শব্দে। দেখলেন সন্ধ্যে হয়েছে। দূর থেকে এক বৃদ্ধাকে লাঠি ঠুকে আসতে দেখলেন।জীর্ণ শির্ণ এক বৃদ্ধা কাঙালী চরণের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার দিকে তাকাতেই কাঙালীচরণের চোখ যেন ঝলসে গেল সারা শরীর দিয়ে যেন বিদ্যুৎ ঝলক বয়ে গেল। ক্রমশঃ যেনো তিনিঘুমের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে থাকলেন তবে তার অবচেতন মন পরিষ্কার শুনতে পেলেন – ‘তোর আর উঞ্চবৃত্তির দরকার নেই, তোর কোলেই দেখবি তিনটি ছোট পাথরের ঢিবি রেখে এসেছি। মাঝখানে আমি – মা ঘাগরবুড়ি, আমার বাঁয়ে মা অন্নপূর্ণা, ডাইনে পঞ্চানন মহাদেব। এইখানেই মন্দির প্রতিষ্ঠা কর, আর কোথাও যেতে হবে না।’পরবর্তীতে স্থানীয় রাজার পৃষ্ঠেপোষকতায় তৈরী হয় ঘাঘর বুড়ির মন্দির।দেবী ঘাঘর বুড়ি আদতে দেবী শ্রীশ্রী চন্ডী। এখানে তার কোন মূর্তি নেই।শুধু তিনটি শীলা দেবী রূপে পূজিতা হয়।দেবীর অদ্ভুত এই নামের দুটি ব্যাখ্যা হয়।প্রথমত ঘাঘর শব্দের অর্থ হল ঘুঙুর। পুরানে দেব-দেবীর বিভিন্ন পুজা পদ্ধতির উল্লেখ আছে- তার মধ্যে নৃত্য গীত-বাদ্য সহকারে বহু দেবীর পূজার প্রচলন ছিল সে ক্ষেত্রে ঘুঙুর ব্যাবহার হতোতাই হয়তো এই নাম অর্থ হল নদী। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা অনুসারে ঘাঘর মানে নদী তীর বর্তী স্থান নুনীয়া নদীর দক্ষিন তীরে মায়ের মন্দির- এমনও হতে পারে- যে এই জন্যই দেবী চন্ডীর এখানে নাম হয়েছিল ” ঘাঘর বুড়ি”।দেবীর অনেক মহিমা শোনা যায় তার অগণিত ভক্তদের মধ্যে। দেবী অত্যান্ত জাগ্রত এবং তিনি তার ভক্ত দের খালি হাতে ফেরান না বলেই বিশ্বাস। প্রতিটি বিশেষ তিথিতে তার পুজো হয়ধুম ধাম করে। মেলা বসে। বহু মানুষের মিলন ক্ষেত্রে পরিণত হয় এই পবিত্র স্থান।ফিরে আসবো পরের পর্বে। ফল হারিণী অমাবস্যা পর্যন্ত চলতে থাকবে দেবী মাহাত্ম নিয়ে আলোচনা। থাকবে মন্দির রহস্য নিয়ে পর্ব। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
বুদ্ধ পূর্ণিমার শুভেচ্ছা
আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা। আজ শুধু গৌতম বুদ্ধের জন্ম নয় আজকের এই বিশেষ তিথিতে সাধনায় সিদ্ধি লাভও করে ছিলেন গৌতম বুদ্ধ।আজও সারা পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ বিশেষ ভাবে পালন করে এই দিনটা |বৌদ্ধ মঠ গুলিতে সন্ন্যাসীরা প্রদীপ জ্বালিয়ে সমবেত ভাবে বিশেষ প্রার্থনা করেন |এই বিশেষ তিথি বৈশাখী পূর্ণিমা নামেও পরিচিত|নেপালের লুম্বিনী তে শুদ্ধধোন ও মায়াদেবীর সন্তান হিসেবে জন্মে ছিলেন সিদ্ধার্থ |যৌবনে রাজকুমারী যশোধরা দেবীর সাথে বিবাহ হয় সিদ্ধার্থর এক পুত্র ও হয়, নাম রাহুল |কিন্তু তিনি তো সংসার করতে আসেননি তিনি বুদ্ধ, তিনি আবির্ভুত হয়েছিলেন মানুষ কে সংসারের যাবতীয় দুক্ষ, কষ্ট ও মায়া থেকে মুক্তি দিয়ে মহানির্বানের পথ দেখাতে |একবার রাজকুমার সিদ্ধার্থ প্রাসাদ থেকে ভ্রমণে বেরোলে, প্রথমে দেখলেন একজন বৃদ্ধ মানুষ তারপর একজন অসুস্থ মানুষ শেষে একজন মৃত মানুষ ও এই সবের পর এক সন্ন্যাসীকে দেখতে পান। এই দিন জীবনের এক চরম সত্য উপলব্ধি করলেন সিদ্ধার্থ, ভোগের রাস্তা ত্যাগ করে বেড়িয়ে পড়লেন ত্যাগের পথে, মুক্তির পথে এবং কঠোর সাধনার পর অবশেষে সিদ্ধি লাভ অর্থাৎ তার বুদ্ধ হয়ে ওঠা এবং বিশ্ববাসীকে মুক্তির পথ দেখানো যে পথে আজ হাটছে কোটি কোটি মানুষ |বৈষ্ণব মতে বুদ্ধকে আবার ভগবানের নবম অবতার মনে করা হয় বেদ অমান্য কারীদের ভিন্ন পথ প্রদর্শন করতে ও প্রানী হত্যা বন্ধ করতে তিনি আবির্ভূত হয়ে ছিলেন |যদিও এই মতবাদ নিয়ে কিছু ভিন্ন মতও আছে |বর্তমানে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর অনেকেই বুদ্ধকে সনাতন ধর্ম থেকে আলাদা করে রাখার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে থাকেন।সে বিতর্ক আজ থাক|আসলে বুদ্ধ বলতে শুধু একজন ব্যাক্তিকে বোঝায় না। বুদ্ধ একটি আধ্যাত্মিক অবস্থা। সাধনার একটি বিশেষ স্তরে পৌঁছে সাধক বুদ্ধত্ব অর্জন করেন। গৌতম বুদ্ধ ছিলেন সেই সাধন মার্গের পথ প্রদর্শক।স্বামী বিবেকানন্দ গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে বলতে গেলে বার বার আবেগ প্রবন হয়ে যেতেন। তিনি বুদ্ধ সম্পর্কে বলতে গিয়ে একবার বলেছিলেন যেসব মানুষের মধ্যেই বুদ্ধ হয়ে ওঠার সম্ভবনা আছে।সবাইকে জানাই বুদ্ধ পূর্ণিমার শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন। ফিরে আসবো আগামী পর্বে। ধারাবাহিক ভাবে দেবী মাহাত্ম এবং মন্দির রহস্যনিয়ে আলোচনা হবে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
মন্দির রহস্য – ডোমজুড়ের নারনা কালী মন্দির
বাংলায় জাগ্রত এবং প্রসিদ্ধ কালী মন্দিরের অভাব নেই যার মধ্যে প্রায় সব গুলিতেই ফল হারিণী অমাবস্যা উপলক্ষে বিশেষ পুজো বা মাতৃ আরাধনার ব্যবস্থা করা হয়। কারণ ফল হারিণী অমাবস্যা দেবীকে ভক্তি দ্বারা প্রসন্ন করে সহজেইপুন্য সঞ্চয় করা যায় এবং অশুভ গ্রহের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আজ এমনই এক প্রাচীন কালী মন্দিরের কথা বলবো যা নারনা কালী মন্দির নামে বিখ্যাত।নারনা কালী মন্দির রয়েছে হাওড়া জেলার ডোমজুড়ের নারনা গ্রামে প্রায় ২৫০ বছর আগে স্থানীয় এক বাসিন্দা এই জঙ্গলঘেরা নারনা গ্রামের পুকুরে স্নান করতে নেমে একটি ঘট খুঁজে পেয়েছিলেন এবং অলৌকিক ভাবে সেই রাতেই স্বপ্নে তিনি দেবী কতৃক ঘট স্থাপন এবং পূজাশুরুর স্বপ্নাদেশ লাভ করেন । নির্দেশ মতো সেই বছর থেকে শুরু হয় ঘটপুজো। পরবর্তীতে তিনি দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তি স্থাপন করেন এবং মন্দির সংস্কার করে পুজো শুরু করেন।নারনা কালী মন্দিরের পাশেই রয়েছে একটি পুকুর। স্থানীয় বাসিন্দারা এই পুকুরকে ‘কালী পুকুর’ বলে থাকেন। এখানে জাল ফেলা, জলে নামা বা অন্য যে কোনও কাজকর্ম করা নিষিদ্ধ। কারণ, ভক্তদের বিশ্বাস এখানে প্রতিরাতে দেবী তাঁর সন্তানদের নিয়ে স্নান করেন।নিশুতি রাতে তাদের অলৌকিক উপস্থিতি অনেকেই উপলব্ধি করেছেন বলে শোনা যায়।পূজার সেই ঐতিহ্য আজও বয়ে নিয়ে চলেছেন নারনা গ্রামের বাসিন্দারা। নারনা কালী মন্দিরে নানা উপাচারের মধ্যে রয়েছে সকাল-সন্ধ্যায় দেবীর আরাধনা।সারা বছরই মন্দিরে দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তের আনাগোনা লেগেই থাকে। মনস্কামনা পূর্ণ হলে দেবীকে যথাযথ উপাচারে পূজা দিয়ে যান ভক্তরা।ফল হারিণী অমাবস্যায় বড়ো করে পূজোর আয়োজন হয়। হোম যজ্ঞ হয়।বিশেষ উৎসবে এই মন্দির প্রাঙ্গণে দুটি উনানে চলে ভোগরান্না। শোনা যায় এই মন্দিরে ভক্তসংখ্যা যতই হোক না-কেন, দেবীর আশীর্বাদে কোনওদিন আয়োজনে কমতি হয় না।ফল হারিণী অমাবস্যা উপলক্ষে চলতে থাকবে দেবী মহাত্ম ও মন্দির রহস্য নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা। ফিরে আসবো পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্ম- জক পুরের মা মনসা
বাংলার দেবী শক্তির আরাধনা সারা দেশে প্রসিদ্ধ। সেই দেবী কখনো দুর্গা কখনো কালী কখনো জগদ্ধাত্রী আবার কখনো লৌকিক দেবী মা শীতলা বা নাগেদের দেবী মনসা। সামনেই ফল হারিণী অমাবস্যা তাই দেবী মাহাত্মা নিয়ে আলোচনায় আরো জোর দেবো সেটাই স্বাভাবিক। দেবী মাহাত্ম বর্ণনা করার এবং দেবী মহিমা শ্রবণ করার এটাই শ্রেষ্ঠ সময়। আজকের পর্বে এক রহস্য ময় এবং অলৌকিক দেবী ও তার মন্দির নিয়ে আলোচনা করবো।পশ্চিম মেদিনীপুরের একটি প্রাচীন স্থান হলো জকপুর যা এককালে ডাকাত ও তান্ত্রিকদের বাসস্থান ছিলো কারন গোটা এলাকা ছিলোজঙ্গলে ঢাকা। শোনা যায় সেই গভীর অরণ্য ভেদ করে দিনের আলো মাটিতে এসে পৌঁছাতো না।সে যুগে লোকে বলতো মনসার জঙ্গল। কারন দুর্গম সেই অঞ্চলে যাতায়াত করতে হলে পদে পদে ছিলো সর্প দংশনের ভয়।জঙ্গলের মধ্যে জরাজীর্ণ এক মনসা মন্দির নির্মাণ করে কৃষকরা মনসার আরাধনা করে আসছিলো বছরের পর বছর ধরে।এবং দেবীর উপর তাদের ছিলো অগাধ বিশ্বাস।শুধু সাপের কারণেই নয় মনসাকে তারা কৃষিদেবী রূপেও মানতো।তবে যুগ যুগ ধরে অবহেলায় থাকা সেই মনসা মন্দির এক সময় লোক চক্ষুর অন্তরালে চলে যায়।তারপর কিভাবে দেবী পুনরায় প্রচারে এলেন এবং তার মাহাত্মা লোক মুখে ছড়িয়ে পড়লো সেই নিয়ে আছে এক অলৌকিক কাহিনী।জকপুরের জমিদার যোগেশ্বর রায় একদিন ভোর রাতে মা মনসার স্বপ্নাদেশ পেলেন । তিনি স্পষ্ট দেখেন, চতুর্ভুজা মা মনসা হাত নেড়ে নেড়ে তাকে বলছেন, ঐ জঙ্গলেই মা আছেন । জমিদার যেন মায়ের পুজোর প্রচার করেন। ঘুম ভাঙতে জমিদার স্ত্রীকে ডেকে বলেন সব কথা । মূহুর্তের মধ্যে কাকভোরে জমিদার বাড়িতে যে যেখানে ছিল হাজির হয়ে যায় ।শুরু হলো জঙ্গল অভিযান উদ্দেশ্য মা মনসার প্রাচীন থানটি উদ্ধার করা।ঐ জঙ্গলের সাপের কথা সকলের জানা । সেই ভয় উপেক্ষা করে জমিদার সদলবলে ঐ স্থানে গিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে মায়ের থানটি খুঁজে বের করেন একটি প্রকান্ড উই পোকার ঢিবির তলা থেকে।যদিও অসংখ্য বিষধর সাপ ছুটে আসে কিন্তু সেদিন কারুর কোনো ক্ষতি হয়নি দেবীর কৃপায়। হয়তো মা মনসাই তাদের রক্ষা করেছেন।তারপর জমিদার দেবীকে নিয়মিত পুজো করার নির্দেশ দেন।মন্দির তৈরীর ব্যবস্থা হয়।পরবর্তীতে উইঢিপিটিকে কংক্রিটে মুড়ে দেওয়া হয় পাশে একটি লাল পদ্ম বানানো হয় তৈরী হয় সুন্দর এবং সু সজ্জিত এক মনসা মন্দির। যে মন্দিরে আজও স্বমহিমায় বিরাজ করছেন মা মনসা।প্রতি শনিবার এবং মঙ্গলবার হাজার হাজার পূণ্যার্থী পূজা দিতে আসেন । এছাড়া বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে পূণ্যাথীর ভিড়ে মন্দির প্রাঙ্গণ ক্ষুদ্র মেলার রুপ ধারন করে ।জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মা মনসাকে এখানে পুজো করেন।সামনেই ফল হারিনী অমাবস্যা। দেবী মহাত্মা নিয়ে চর্চা করার জন্য এই সময় অতি উত্তম। পাশাপাশি গ্রহ দশ খণ্ডন ও তন্ত্র মতে প্রতিকার নিতে চাইলেও এই সময়কে কাজে লাগাতে পারেন। ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
অক্ষয় তৃতীয়ার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
তিথি অনুসারে আজ থেকেই সূচনা হচ্ছে এবছরের অক্ষয় তৃতীয়ার।আমাদের বৈদিক জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে যেকোনো শুভ কাজ শুরু করা যেতে পারে আজকের দিনে|আজকের দিনে সোনা রুপো বা মূল্যবান রত্ন ক্রয় করে গৃহে আনলে গৃহস্তের কল্যাণ হয় তাছাড়া আজ লক্ষী ও কুবেরের পুজোর মাধ্যমেও সৌভাগ্য লাভ করা যায়|পুরান এবং বিভিন্ন শাস্ত্রে এই উৎসব সম্পর্কে অনেক তথ্য আছে এবং সেখান থেকেই জানা যায় ঠিক কেনো এই অক্ষয় তৃতীয়া এতো গুরুত্বপূর্ণ। আসুন আজ জেনে নিই সেই শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা।বেশ কিছু পৌরাণিক ঘটনার সাথে জড়িয়ে আছে আজকের এই পবিত্র তিথি অর্থাৎ এই অক্ষয় তৃতীয়া।সনাতন ধর্মে ধন ও সম্পদের দেবতা হলেন রাবনের ভ্রাতা এবং মহাদেবের অন্যতম ভক্ত কুবেরদেব|আসলে হলেন দেবতাদের কোষাধক্ষ্য তাকে প্রতারিত করে লঙ্কা থেকে বিতাড়িত করেন রাবন এবং ছিনিয়ে নেন তার পুস্পক রথ, যে ব্যবহিত হয়েছিলো পরবর্তীতে রামায়নের সময়ে|তবে কুবের হাল ছাড়েননি কঠোর তপস্যায় মহাদেবকে সন্তুষ্ট করে তিনি জগতের সমস্ত বৈভব ও ঐশ্বর্যর দেবতা হন|পুরাণ মতে আজকের এই অক্ষয় তৃতীয়ার তিথিতেই কুবেরকে তাঁর অনন্ত বৈভব দান করেছিলেন স্বয়ং মহাদেব। পরবর্তীতে দেব শিল্পী বিশ্বকর্মা কৈলাসের কাছে অলকায় কুবেরের প্রাসাদ তৈরি করে দেন যা অলোকাপুরী নামে খ্যাত|তাই আজ বিশ্বাস করা হয় আজ তার পুজো করলে এবং তার কাছে নিজের অভাব অভিযোগ জানালে তিনি কাউকে শুন্য হাতে ফেরান না।আবার এই দিনই মহাভারত রচনা শুরু করেছিলেন ব্যসদেব। তিনি এই চান্দ্র বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতেই মহাভারতের শ্লোক উচ্চারণ শুরু করেন আর সিদ্ধিদাতা গণেশ তা লিখতে শুরু করেন।মূলত এই কারনেই যে কোনও কাজ আরম্ভের জন্য এই দিনটিই প্রশস্ত বলে মনে করা হয়|আজ যেকোনো শুভ কাজ শুরু হলে তাসফল এবং স্বার্থক হয়।বিষ্ণুর দশাবতারের ষষ্ঠ অবতার পরশুরামের জন্ম চান্দ্র বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে অর্থাৎ এই অক্ষয়তৃতীয়ার দিনে হয়েছিলো।তাই দেশের বহু স্থানে আজকের দিনটি ‘পরশুরাম জয়ন্তী’ হিসেবেও পালিত হয়|সবাইকে জানাই শুভ অক্ষয় তৃতীয়া।ফিরে আসবো পরের পর্ব নিয়ে। ধারাবাহিক আধ্যাত্মিক আলোচনা নিয়ে। পড়তে থাকুনভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
দেবী মাহাত্ম- সুন্দরবনের ত্রিপুরেশ্বরী দেবী
সাধারণত ত্রিপুরেস্বরী মন্দির বা দেবীত্রিপুরেস্বরীর কথা উঠলেই আমরা ত্রিপুরার বিখ্যাত ত্রিপুরেস্বরী মায়ের মন্দিরের কথা স্মরণ করে থাকি। কিন্তু ওই বাংলার বাঘ ও কুমিরের রাজ্য অর্থাৎ সুন্দরবনেও আছে এক ত্রিপুরেস্বরী মায়ের মন্দির। আজকের পর্বে সুন্দর বনের ত্রিপুরেস্বরী দেবীর মাহাত্ম নিয়ে লিখবো।দক্ষিণ বঙ্গের এই ত্রিপুরেস্বরী দেবীর মন্দিরের ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।ত্রিপুরা রাজ্যের প্রাচীন তম ঐতিহাসিক গ্রন্থ রাজমালাতে এই মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়।আবার একটি পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুসারে রাজা যজাতির পুত্র দুহ্য শাপভ্রষ্ট হওয়ার পর শাপমুক্তির লক্ষ্যে গঙ্গা সাগরের কাছে অর্থাৎ এই সুন্দরবন অঞ্চলে কপিলমুনির আশ্রমে এসেছিলেন। তাঁরই এক বংশধর যার নাম পতদ্রুন কিরাত এই এলাকায় ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।পরবর্তীতে তাঁর বংশধররা ত্রিপুরায় চলে যান।এবং সেখানে দেবী ত্রিপুরেশ্বরীর মন্দির নির্মাণ করেন।প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ কুব্জিকা তন্ত্র অনুযায়ী এই ত্রিপুরেশ্বরী মায়ের মন্দিরটি একটি শক্তিপিঠ।এবং মনে করা হয় এখানে সতীর ছাতি বা ছত্র পড়েছিল সেজন্য এই এলাকার নাম ছত্রভোগ।সুন্দরবনের প্রাচীন মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম এই ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির যা কৃষ্ণচন্দ্রপুরের ছত্রভোগ নামক স্থানে অবস্থিত। এই ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির প্রায় হাজার বছরের পুরানো এবং মনে করা হয় এও মন্দির গুপ্তযুগের সমসাময়িক।এই মন্দির সম্পর্কে এই ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া গেছে এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময়ে পাওয়া প্রাচীন বিভিন্ন নিদর্শন থেকে।রহস্য দিয়ে মোড়াসুন্দরবনের বহু রহস্য ও উত্থান পতনের সাক্ষী এই ত্রিপুরেশ্বরী মায়ের মন্দির।কালীপুজোর দিন এই মন্দিরে হাজার হাজার দর্শনার্থী ভিড় জমান।এই মন্দির আগে ত্রিপুরার রীতি মেনে পুজো হত। এই মন্দিরের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হল এই মন্দিরে ত্রিপুরাসুন্দরী কালীর সঙ্গে শিব নেই। শিব থাকেন অন্যত্র, ভিন্ন একটি স্থানে।দেবীর থেকে আলাদা হয়ে তিনি এখানে বিরাজমান।আগামী দিনে ফিরে আসবো অন্য এক দেবীর মাহাত্ম নিয়ে। থাকবে অলৌকিক ঘটনায় সমৃদ্ধ নতুন এক পর্ব।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্ম – তকি পুরের বড়মা
বর্ধমানে এক ছোট্ট গ্রাম তকিপুর। এখানেই পূজিত হন বড়ো মা কালী পুজো শুরু করেছিলো বর্ধমানের রাজ পরিবার। তারপর একাধিকবার পূজোর দায়িত্ব হস্তান্তর হয়েছে নাটকীয় ভাবে। আজকের পর্বে তকিপুরের বড়মার পুজো নিয়ে।সে প্রায় পাঁচশো বছর আগের কথা তখন এই অঞ্চলের রাজা বিজয় চাঁদ মহতাব একদিন তাকে স্বপ্নে দেখা দেন বড়মা। নির্দেশ দেন মন্দির প্রতিষ্ঠা করে পুজো করতে। সেই স্বপ্নাদেশ পেয়ে।বিজয়চাঁদ শুরু করেছিলেন এই পুজো। তবে তার ও আগে থেকে ওই স্থানে দেবীর পুজো চলে আসছিলো। পূজোর দায়িত্বে ছিলো ডাকাতরা দেবীর নির্দেশে রাজা বহুদিন অবহেলিত হয়ে পড়ে থাকা দেবীর মুর্তি ও মন্দির নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেন মাত্র।তারপর আবার বহুকাল অবহেলিত হয়ে পরে ছিলো ওই মন্দির।অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বা তার আগে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র জানতে পারেন আউশগ্রামের তকিপুর জঙ্গলে একটি কালীমূর্তিআছে যেখানে বর্তমানে মায়ের সঠিক সেবা হচ্ছেনা দেবী সেখানে অবহেলিত। খবর জানা মাত্রই রাজা কৃষ্ণচন্দ্র শতাধিক ঘোড়া, হাতি, ঢাকি নিয়ে হাজির হন তকিপুরে এবং ধুমধাম করে পুজো করেন তিনি। তারপর থেকেই তকিপুরের কালীর সমাদর ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন প্রান্তে।যখন রাজ তন্ত্র বা জমিদারি প্রথা লোপ পায় তখন তৈরী হয় পুজো কমিটি এবং তারাই এই পাঁচশো বছরের পুরনো এই কালীর পূজোর ঐতিহ্য স্বগৌরব বহন করে চলেছেন।যখন ডাকাতরা কালী পুজো করতো তখন মধ্যরাতে মশাল জেলে পুরোহিতমশাইকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসা হতো। আজও সেই প্রাচীন প্রথা মেনে আলো দেখিয়ে পুরোহিত কে নিয়েআসা হয় পূজোর আগে এবং পূজোর পর পুনরায়তাকে আলো দেখিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেয়া হয়।সারা দেশে অসংখ্য এমন রহস্যময় মন্দির আছে।আগামী দিনগুলিতেও এমন সব দেবী মাহাত্মএবং মন্দির রহস্য নিয়ে ফিরে আসবো।দেখা হবে পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
শিব মাহাত্ম – ফুলেশ্বর মহাদেব
সোমবার মানেই শিবের বার। সোমবার শিব মহিমা বর্ণনা করার আলাদা মাহাত্ম আছে। তাই আমি চেষ্টা করি প্রতি সোমবার আপনাদের জন্য শিব নিয়ে কিছু লিখতে।আজকের পর্বে আপনাদের একটি অদ্ভুত শিব মন্দিরের কথা বলবো যাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য অলৌকিক জনশ্রুতি বা ঘটনা শোনা যায়।ফুলেশ্বর বাবার অবস্থান আমতা কুশবেড়িয়া বিখ্যাত বানেশ্বর শিব মন্দিরের কিছুটা আগে। জায়গাটির নাম তাজপুর।প্রায় তিনশো আশি বছর প্রাচীন এই ফুলেশ্বর বাবার মন্দির। মন্দির বাবার ভক্তদের দ্বারা একাধিক বার সংস্কার হয়েছে। তবে আসলে কবে এবং কে এই মন্দির বা শিব লিঙ্গ স্থাপন করেছিল তা নিয়ে একটি কিংবদন্তী প্রচলিত আছে এই এলাকায়।বহু বছর আগে এই তাজপুর ছিলো ঘন জঙ্গলে ঢাকা। তখন ডাকাত বা তান্ত্রিক সন্ন্যাসীরা ছাড়া বড়ো একটা কেউ আসতো না এদিকে।সেই জঙ্গলে নাকি জমিদার বাড়ির কামধেনু গাই যেত নিয়ম করে এবং সেই কামধেনু গাই প্রতিদিন একটি শিলা মূর্তিতে দুধ দিয়ে আসত। এই ঘটনা স্বপ্নাদেশে জানতে পারেন জমিদার এবং তিনি সেখানে গিয়ে পাথর খণ্ডটি দেখে বুঝতে পারেন যে এটি আসলে পঞ্চশীরের শিবমূর্তি। তারপর আবার স্বপ্নাদেশ হয় এবং সেই স্থানে জমিদার মন্দির নির্মাণ করে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। আগে বাবার মূর্তি প্রায় দু-ফুট উচ্চতায় জেগে ছিল। বর্তমানে ফুলেশ্বর বাবা প্রায় মাটির অনেকটা গভীরে অবস্থান করছেন। অনেকে মনে করেন মহাদেব ধীরে ধীরে পাতালে প্রবেশ করছেন। এই শিব ক্ষেত্রে অলৌকিক ঘটনার শেষ নেই।নীল ষষ্ঠীতে বাবার অভিষেক হয়। এই দিন ভক্ত ও সন্ন্যাসীরা বাবার মাথায় কয়েকশো ঘরা জল, ডাব, দুধ এবং গঙ্গাজল ঢালেন। বিস্ময়কর ঘটনা হল সর্বশেষ মূল সন্ন্যাসী বাবার মাথায় জল ঢালেন। সেই জল ঢালার পর বাবার কৃপায় চরণামৃত উঠে আসে পাতাল থেকে।এই মন্দিরের ভিতরে নাকি নিয়মিত জোয়ার ভাটা খেলে। রহস্যজনক ভাবে এই জল মন্দিরে আসে পাতাল থেকে এবং আবার যথা সময়ে পাতালেই মিলিয়ে যায়।প্রতিদিন দুপুরে মধ্য গগনে সূর্য অবস্থান হলে। তার রশ্মি বাবার মাথায় পড়লে তবেই পুজো শুরু হয়। এ ভাবেই চলে সারা বছর।দু-বেলা পুজো হয় নিয়ম মেনে।তবে নীল ষষ্ঠীর দিন এবং শিব রাত্রিতে জাঁকজমক করে পুজো হয়।ফিরে আসবো পরের পর্বে। নতুন কোনো বিষয় নিয়ে।থাকবে পৌরাণিক এবং অলৌকিক ঘটনায় ভরপুর আধ্যাত্মিক আলোচনা।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।