Home Blog Page 65

বিশেষ পর্ব – শিব চতুর্দশীর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা

বিশেষ পর্ব – শিব চতুর্দশীর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রী জাতক

যদিও শিব ভক্তরা প্রায় সারা বছরই শিব পুজো করেন তবু শিব চতুর্দশী তিথির আলাদা মহাত্ম আছে। এই তিথি শিব পুজো করে শিব কৃপা লাভ করার শ্রেষ্ঠ তিথি। কিন্তু কেনো? দুটি কারন আছে এবং সেই দুটি কারন খুঁজতে হলে আমাদের পুরানের আশ্রয় নিতে হবে।

পুরান অনুসারে ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশী তিথির এই শিব রাত্রির তাৎপর্য সব থেকে বেশি কারন এটা আদি শিব লিঙ্গের আবির্ভাব তিথি ও একি সাথে শিব পার্বতীর বিবাহের দিন। স্বাভাবিক ভাবেই এই দিন উৎফুল্ল চিত্তে থাকেন শিব এবং পার্বতী দুজনেই এবং অল্প তেই তুষ্ট হন তারা। ভক্তের ডাকে এই দিন তাই সহজেই সাড়া দেন দেবাদিদেব এবং তার শক্তি পার্বতী।

শিব পূরাণ মতে এক সময় ভগবান বিষ্ণু এবং ব্রহ্মার মধ্যে নিজেদের শ্রেষ্টত্ত্ব প্রমানের জন্য ভিষণ বিবাদ দেখা দিয়েছিল। লড়াই প্রায় বাঁধে বাঁধে। সেই সময় হঠাৎ করেই আগুনে জ্বলতে থাকা একটা কালো স্তম্ভ দুই দেবাতার মাঝে আর্বিভাব হয়। এই স্তম্ভ হঠাৎ করে এল কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্রহ্মা ঠিক করেন স্তম্ভের উপরের দিকে গিয়ে দেখবেন কোথায় এর শেষ আর বিষ্ণু দেব যাবেন নিচের দিকে। দেখবেন এর সূচনা।

বলা বাহুল্য দুজনেই ব্যর্থ হন। কারন শিব অনাদি এবং সনাতন। তার না আছে আদি না আছে অনন্ত। আছে শুধু অফুরন্ত শক্তি এবং তেজ।
আদি শিব লিঙ্গের সেই সেই আবির্ভাব তিথিকেই
পালন করা হয় শিব রাত্রি রূপে।

কেনো এই শিব রাত্রিতে শিব লিঙ্গে জল ঢালা হয় তার ও নিদ্দিষ্ট কারন আছে, আসলে অগুনে জ্বলতে থাকা ওই কালো থামটি ছিল আদি শিব লিঙ্গ। যার মধ্যে উপস্থিত রয়েছে এ জগতের অনন্ত শক্তি। আর এত মাত্রায় শক্তি যেখানে মজুত রয়েছে তাকে ঠান্ডা রাখতে না পারলে যে বিপদ! আর ঠিক এই কারণেই শিব লিঙ্গের মাথায় জল ঢালার প্রথা শুরু হয়। যেখানে অনন্ত শক্তি বিরাজমান সেই শক্তির উৎস স্থান কে ঠান্ডা রাখা, শান্ত রাখাই মূল উদেশ্য |

আজ অবশ্যই শিব পুজো করুন। চেষ্টা করুন শিব মন্দিরে গিয়ে দেবাদিদেবকে জল অর্পণ করার। শিব লিঙ্গে জল, দুধ বা বেলপাতা অর্পণ করার সময়ে ” ওঁম নমঃ শিবায়ঃ ” মন্ত্র টি জপ করুন।
যদি সম্ভব হয় শিব লিঙ্গ প্রদক্ষিণ করে শিবকে নিজের মনোস্কামনা জানিয়ে প্রণাম করুন। দেবাদিদেব আপনাদের মনোস্কামনা পূর্ণ করবেন।

আপনাদের সবাইকে শিব রাত্রির শুভেচ্ছা জানিয়ে শেষ করছি আজকের বিশেষ পর্ব|সবাই ভালো থাকুন। দেখা হবে যথা রীতি আগামী পর্বে।
সঙ্গে থাকুন।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বামা খ্যাপার সিদ্ধি লাভ

আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে বিশেষ পর্ব

 

বামা খ্যাপার সিদ্ধি লাভ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

তারাপীঠ শক্তি না হলেও সিদ্ধ পীঠ তো বটেই। একাধিক সাধক এই তারাপীঠে সাধনা করে সিদ্ধি লাভ করেছেন তাদের মধ্যে যেমন আছেন বশিষ্ট দেব তেমনই আছেন স্বয়ং বামা ক্ষ্যাপা। আজকের পর্বে বামা ক্ষ্যাপার সিদ্ধি লাভ নিয়ে লিখবো।

 

গুরু কৈলাশ পতি বাবার দেখানো পথে তারাপীঠে অবস্থিত এক স্বেত শিমুল বৃক্ষের নিচে পঞ্চ মুন্ডির আসনে বসে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন বামা ক্ষ্যাপা।

এই পঞ্চমুন্ডির আসন সকলকে গ্রহণ করে না! সাধনার উচ্চস্তরে পৌঁছতে না পারলে পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসা দুঃসহ হয়ে ওঠে সাধকের।বামা নিজ সাধনা বলে এবং মা তারার আশীর্বাদে এবং গুরুর সান্নিধ্যে সেই যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন।

 

বামাক্ষ্যাপার সিদ্ধিলাভ নিয়েও প্রচলিত আছে

বহু আখ্যান। তবে সবাই একমত যে এক কৌশিকী অমাবস্যার রাতের তিথিই সাক্ষী ছিল সেই

মহা সাধনার।প্রথমে কৈলাসপতি বাবার কুটিরে গিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল দীক্ষার অনুষ্ঠান। তখন মাতৃদর্শনের পর বাহ্যজ্ঞান লোপ পেয়েছে বামাচরণের। সে দিন অন্ধকারেও যেন এক অপার্থিব জ্যোতি ছড়িয়ে ছিল কৈলাসপতি বাবার কুটিরজুড়ে। বেদমন্ত্র পাঠ করে দীক্ষার উপচার সম্পন্ন করেছিলেন কৈলাসপতি বাবা।

 

তার পর সন্ধ্যায় বামাকে নিয়ে শ্মশানে এলেন কৈলাসপতি বাবা। শ্বেত শিমূল বৃক্ষের তলায় পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসিয়ে দিলেন শিষ্যকে। বললেন বীজমন্ত্র জপ করতে। মন্ত্র জপ করতে করতে ভাবে বিভোর হয়ে গেলেন বামাচরণ। কখন যে রাত ভোর হতে শুরু করেছে তার খেয়াল নেই। এমন সময়ে এক নারী কণ্ঠের ডাকে জ্ঞান ফিরল বামাচরণের। সেই ডাক স্বয়ং তাঁর বড়মায়ের। সিদ্ধিলাভের কথা নিজের ছেলেকে স্বয়ং বলছেন বড়মা। একই সঙ্গে ভবিষ্যদ্বাণী করছেন ওই শিমূল গাছ পড়ে যাওয়ার।কিছুক্ষণ পরেই পড়ে গেল শিমূল গাছ। সেই জায়গায় জ্যোতির মধ্যে আবির্ভূতা হলে স্বয়ং মা তারা।শুধু তাই না সেই রাতে দশমহাবিদ্যার দশ রূপে ধরা দিয়েছিলেন বামাচরণের বড়মা।সিদ্ধি লাভের পর বামা ক্ষ্যাপা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হন এবং সারা জীবন জুড়ে অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা ঘটান।

 

বামা ক্ষ্যাপা পরবর্তী সময়েও বহু সাধক সেই পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে সাধনা করেন এবং তাদের মধ্যে অনেকেই সিদ্ধি লাভ করেছিলেন বলে শোনা যায়। তবু বামা খ্যাপার উচ্চতায় হয়তো আর অন্য কেউ পৌঁছতে পারেননি। বামা ক্ষ্যাপা একজনই এবং তার তুলনা নেই। তিনি অতুলনীয়।

 

আজ আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে প্রণাম জানাই এই মহান সাধককে। পরবর্তীতে পর্বে যথা রীতি

ফিরে আসবো শিব রাত্রি সংক্রান্ত আধ্যাত্মিক আলোচনা নিয়ে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শ্রী শ্রী বামা ক্ষ্যাপা ও তারাপীঠ

আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে বিশেষ পর্ব

 

শ্রী শ্রী বামা ক্ষ্যাপা ও তারাপীঠ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বামা ক্ষ্যাপার সঙ্গে তারা মায়ের সম্পর্ক মানে মা ছেলের সম্পর্ক আর তারা পীঠ বামা ক্ষ্যাপার কাছে মায়ের কোলের মতো। বামা তারা মাকে বলতেন বড়মার এবং মা মৌলাক্ষীকে বলতেন ছোটমা। শুধু বামা নন অনেক সাধকই মনে করেন এই দুই দেবী আসলে দুই বোন। যাই ফিরে আসি বামা ক্ষ্যাপার কথায়।

 

তারা পীঠে আসার পর শুরুর দিন গুলিতে বামাক্ষ্যাপার কাজগুলো ছিল অদ্ভুত। কখনো কখনো সারাদিন পূজা করতেন। কখনও কখনও তিনি দু তিন দিন পূজা করেন না। কখনো দেবীকে মালা পরাতেন আবার কখনো নিজে পরতেন।কখনো নিজে খেয়ে ভোগ দিতে যাচ্ছেন আবার কখনো ভোগ তুলে নিজে খেয়ে নিচ্ছেন। সাধনার এই পর্যায়কে শাস্ত্রীয় পূজা পদ্ধতির সাথে বাকি পান্ডারা মেলাতে পারতেন না। তারা ভাবতেন বামা উন্মাদ। অশাস্ত্রীয় আচরণ করছেন।যদিও পরে তাদের ভুল ভাঙে।

 

একদিন খবর রটে যায় বামা ভোগ নিবেদন করার আগেই দেবীর প্রসাদ খেয়েছেন এবং এতে ঘোর পাপ হয়েছে।দেবী রাগান্বিত হবেন, সারা গ্রামকে তার ক্রোধ বহন করতে হবে তাই গ্রামবাসীরা বামাচরণকে কঠোরভাবে মারধর করে। তাকে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। তার মন্দিরে প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়।

 

যখন জ্ঞান ফিরল তখন বামাক্ষ্যাপা মায়ের উপর রেগে গেল। মাতারার উদ্যেশ্যে বামা বললেন আমি কি দোষ করেছি যে আপনি আমাকে মারধর করলেন। আপনাকে দেওয়ার আগে খাবারটি সুস্বাদু কি না তা পরীক্ষা করছিলাম। এতে আমার কি ভুল ছিল? ওরা অকারণে আমাকে মারধর করেছ তাই আমি এখন আর তোমার কাছে আসব না।

 

তারা মা তার সন্তানের যন্ত্রণা সইতে পারেননি।

সেই রাতেই রানীর স্বপ্নে দেখা দিল মা তারা

রাগান্বিত মা রাণীকে ভর্ৎসনা করলো-তোমার পুরোহিতরা আমার ছেলেকে আঘাত করেছে। আমি তোমার মন্দির ছেড়ে চলে যাচ্ছি। এখন তোমাকে ও তোমার রাজ্যকে আমার ক্রোধ সইতে হবে, তুমি যদি তা এড়াতে চাও, কাল আমার ছেলেকে ফিরিয়ে এনে মন্দিরে পূজার দায়িত্ব দাও, নইলে পরিণতি ভোগ করতে প্রস্তুত থাকো।

 

আতঙ্কে সারা রাত জেগে কাটালানে রানীমা ভোরে তিনি মন্দিরে ছুটে গেলেন। সব শুনলেন তারপর সেই সব পান্ডা দের তিরস্কার করলেন এবং তাদের মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ করলেন। তারপর তার ভৃত্যদের আদেশ দিলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বামাখেপাকে নিয়ে আসতে। বামা ক্ষ্যাপা প্রথমে আসতে রাজি হলেননা।অবশেষে রানী নিজেই পৌঁছে গেলেন বামা খ্যাপার কাছে । বামার কিছুক্ষনের মধ্যেই প্রশমিত হলো। তিনি তারাপীঠ মন্দিরে যেতে রাজি হলেন। সেই দিন রানীমা আদেশ জারি করেন এই মন্দিরের পুরোহিত বামাক্ষ্যাপা। সে স্বাধীন। তার পথে কেউ আসলে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।শুধু তাই না তারাপীঠে আগে বামা ক্ষ্যাপাকে ভোগ নিবেদন হবে তারপর তারা মাকে ভোগ দেয়া হবে।অর্থাৎ সন্তানকে খাইয়ে তারপর মা খাবেন। এই রীতি আজও একই ভাবে চলছে।

 

বামা ক্ষ্যাপার আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে তার অলৌকিক জীবন এবং মহিমা নিয়ে

ধারাবাহিক এই আলোচনা চলতে থাকবে।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বিশেষ পর্ব – বামাখ্যাপার অলৌকিক জীবন

বামা খ্যাপার আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে এই বিশেষ ধারাবাহিক অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে বামা ক্ষ্যাপার ব্যাক্তিত্বর একটি বিশেষ দিক নিয়ে আলোচনা করবো।তবে শুরুটা করবো স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে।

 

ভারতের আধ্যাত্মিক জগতের বহু সাধু সন্ন্যাসিদের সাথে সাক্ষাৎ করে ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তালিকায় যেমন ছিলেন কাশির ত্রৈলঙ্গ স্বামী তেমনই তারাপীঠের বামা খ্যাপার সাথেও বিবেকানন্দর সাক্ষাৎ হয়ে ছিলো।

স্বামীজী তখন কলেজ ছাত্র সবে রামকৃষ্ণের সংস্পর্শে এসেছেন সেই সময়ে তারাপীঠে গিয়েছিলেন বামাক্ষ্যাপাকে দর্শন করার জন্য।

এই প্রসঙ্গে এক বন্ধুর প্রশ্নের উত্তরে নরেন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে, ব্রহ্মজ্ঞানী সাধকদের চারটি অবস্থা হয় যথা, বালকবৎ, জড়বৎ, উন্মাদবৎ এবং পিশাচবৎ। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের মধ্যে বাকি তিনটি অবস্থা থাকলেও পিশাচবৎ অবস্থা ছিল না। তাই নরেন্দ্রনাথ পিশাচ লক্ষণধারী বামাক্ষ্যাপার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন।ঠিক কি এই বৈশিষ্ট

তা জানতে হলে একটি অলৌকিক ঘটনার কথা জানতে হবে।

 

সময় টা ১২৭৫ সনের এক গ্ৰীষ্মকাল। সেই বছর বৃষ্টি অভাবে বীরভূম জুড়ে প্রবল খরা। তখন হতাশাগ্ৰস্থ চাষীরা অনাহারে মৃত্যুবরণের ভয়ে বামদেব বাবার শরনাপন্ন হচ্ছে। তাদের আশা বামা খ্যাপা তার অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে এই প্রকৃতির রোষ থেকে তাদের বাঁচাবেন কয়েকজন চাষী একদিন বাবাকে বললো “তুমিতো তাঁরা মায়ের প্রিয় সন্তান তুমি থাকতে মা তাঁরা থাকতে আমরা অনাহারে মরবো? তুমি একটু তাঁরা মাকে বলো না।” সত্যি বিচলিত হলেন বামা খ্যাপা। তিনি

প্রচন্ড ক্রোধান্বিত হয়ে মায়ের মন্দিরে গিয়ে বিগ্ৰহের সম্মুখে বললো-“তুই বেটি দিন রাত বসে বসে খাচ্ছিস,আর তোর সব সন্তানরা উপোস করে মরছে। দাঁড়া তোর মাথায় বাজ ফেলবো।”

 

বামার এই উগ্র রূপ দেখে উপস্থিত সকল চাষী

এবং ভক্তরা সভীত হয়ে বাড়ি ফিরে গেলো।

ঠিক মধ‍্যাহ্নে প্রবল ঝড় বৃষ্টিতে মন্দিরের চূড়ায় বাজ পড়ল তা দেখে সবাই উপস্থিত হয়ে দেখলো মন্দিরের একপাশের কান্নিস ভেঙে পড়েছে কিন্তু গর্ভ গৃহ এবং বিগ্ৰহের কোনো ক্ষতি হয়নি।বামদেব বাবা সব শুনে মায়ের চরন তলে ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। এবং শোনা যায় এই সময়ে বামদেব বাবা তারা মায়ের হাস‍্যরত শ্রীমুখ দেখে বুঝতে পারলেন যে মা স্ব-ইচ্ছায় নিজের মন্দিরে বাজ

ফেলে তাকে বাক্ সিদ্ধ প্রমাণ করতে চেয়েছেন আসলে এই বাজ পাড়া মায়ের‌ই এক লীলা।

এবং এই ঘটনা থেকে হয়তো বোঝা যায় স্বামীজী সেদিন তার বন্ধুকে কি বলতে চেয়েছিলেন।

সত্যি যখন রেগে যেতেন বামা খ্যাপার মধ্যে

জেগে উঠত এক উগ্রতা। এক ধরণের

তামসিক পৈশাচিকতা। আবার ঠান্ডা হলে তিনি শিশুর মতোই সহজ এবং স্বাভাবিক।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে। চলবে এই ধারাবাহিক আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে বিশেষ পর্ব : শ্রী শ্রী বামা ক্ষ্যাপার শৈশবের অলৌকিক ঘটনা 

শিবচতুর্দশীর আর দেরি নেই। শিব চতুর্দশী যেমন আদি শিব লিঙ্গের আবির্ভাব তিথি তেমনই মহান সাধক শ্রী শ্রী বামা ক্ষ্যাপার আবির্ভাব তিথি সেই উপলক্ষে শুরু করেছি তার অলৌকিক জীবন নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা। শ্রী শ্রী বামা ক্ষ্যাপার শৈশব এবং পরবর্তী সাধক জীবন অসংখ্য জনশ্রুতি এবং কিংবদন্তী প্রচলিত আছে।আজকের পর্বে তার শৈশবের একটি বিশেষ ঘটনা নিয়ে লিখবো।

 

কিশোর বামাচরণ একবার আটলা গ্রামের নিজের বাড়ি থেকে তারাপীঠ মহাশ্মশানের দিকে যাচ্ছেন। এই সময় পিছন থেকে তাঁর নাম ধরে শিশুকন্ঠের ডাক। ডাকটি এলো পথের ধারে অবস্থিত চক্রবর্তীর বাড়ির দোতলা থেকে।বামা সেদিকে তাকিয়ে দেখেন বাড়ির দোতলায় জানালার ওপাশে এক দিব্য দর্শন ছেলে দাঁড়িয়ে।

বামা তখন এগিয়ে এসে তাকে পরিচয় জিজ্ঞেস করলে ছেলেটি জবাব দেয়, “আমি এ বাড়ির নারায়ণ। কিন্তু এরা আমাকে জলটুকুও দেয় না। তুই আমাকে নিয়ে চল।” কিন্তু দোতালায় বামা পৌঁছাবেন কিকরে। আবার স্বয়ং নারায়ণ তাকে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে বলছেন।

বামার অসহায় অবস্থা বুঝে সেই শিশু নিজেই একটি কাপড় ঝুলিয়ে দিলেন। উপরে উঠে এলেন বামা তারপর সেই শিশু নারায়ণ তাঁর হাতে রুপোয় বাঁধানো একটি শালগ্রাম শিলা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এক্ষুনি এটা নিয়ে চলে যা।”

 

আদেশ অনুসারে বামা অবিলম্বে সেই শালগ্রাম শিলা নিয়ে চলে আসেন দ্বারকা নদীর পাড়ে।এবং নদীর জলে শালগ্রাম শিলাকে বেশ খানিকক্ষণ ডুবিয়ে রেখে তারপর তাঁকে বালির ওপর শুইয়ে দিয়ে বললেন, “তুমি এবার একটু ঘুমোও, ঠাকুর। আমি আমার বড়মাকে এই বলে বামা চলে গেলেন।তারা পীঠে তারা মায়ের কাছে।

 

চক্রবর্তী বাড়ির নারায়ণ শিলা উধাও হয়েছে এই সংবাদ রটতে দেরি হয়নি গোটা এলাকা তন্ন তন্ন করে খুঁজে সবাই প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছে সেই সময়ে কোনো ভাবে বাড়ির কর্তা বামার খবর পায়

ক্ষ্যাপা হিসেবে তার কিছুটা খ্যাতি ছিলই

তাই সবাই ভাবলো এই কাজ তার পক্ষে মোটেই অসম্ভব নয়।

 

সকলে মিলে চড়াও হয় ব্রজবাসী কৈলাসপতির কুটীরে।তার কাছে প্রায় আসে বামা একথা সবার জানা।নিজ কুটিরেই ছিলেন কৈলাশপতি বাবা তিনি ভাবী শিষ্য বামাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, “এরা যা বলছে, তা কি সত্য?” সবাই বলছিল বামা নারায়ণ শিলা চুরি করে এনেছিলেন। বামা বলেন, “চুরি করতে যাব কেন? এঁদের নারায়ণ নিজেই আমাকে বলেছে, সে সামান্য জলটুকুও পায়না। তাই আমি তাঁকে জল খাওয়াতে নিয়ে এসেছিলাম।

সবাই সব শুনে হতবাক। যে নারায়নের দর্শন পেতে সাধক দের বছরের পর বছর সাধনা করতে হয় তিনি নিজে যে কিশোরের কাছে ধরা দিয়েছেন তিনি নিশ্চই কোনো সাধারণ মানুষ নয়। একথা সবাই সেদিন উপলব্ধি করেছিলেন।

 

সারা জীবনে বামা ক্ষ্যাপা অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছেন। তার কিছু নিয়ে আলোচনা হবে

সারা সপ্তাহ ধরে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বিশেষ পর্ব – বামাক্ষ্যাপার আবির্ভাব

বাংলার ১২৪৪ সনে তারাপুরের কাছে আটলা গ্রামে সর্বানন্দ চট্টোপাধ্যায় এবং রাজকুমারী দেবীর সংসারে বামা চরণ নামে এই অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন শিশুর জন্ম হয়।সেদিন ছিলো শিব চতুদর্শীর দিন। বামচরণ এর আরো এক ভাই এবং চারজন বোন ছিলেন কনিষ্ঠ ভাই ছিলেন রামচন্দ্র এবং চার বোনের নাম যথাক্রমে জয়কালী, দূর্গা, দ্রবময়ী এবং সুন্দরী।বাকিরা গৃহস্ত জীবনে সাধারণ জীবন যাপন করলেও শৈশব থেকে বামা ছিলেন ব্যতিক্রমী। অন্তরমুখী এবং আধ্যাত্মিক প্রকৃতির এই ছেলেই পরবর্তীতে তারাপীঠে গিয়ে আশ্রয় নেন। ধীরে ধীরে মহান সাধক কৈলাশপতির সান্নিধ্যে এবং মাতৃ সাধনা করে হয়ে ওঠেন জগৎ বিখ্যাত বামা ক্ষ্যাপা।

 

আজ তারা পীঠ আর বামা ক্ষ্যাপা যেনো সমার্থক।

তার অসংখ্য ভক্ত অনুরাগীরা এই শিব চতুর্দশীর সময়ে তারাপীঠে জমা হন কারন শিবচতুর্দশী তিথিতে বামাক্ষেপার আবির্ভাব তিথি পালন শুরু হয়। চারদিন ধরে চলে উৎসব। আটলা গ্রামে বসে মেলা এবং বামা ক্ষ্যাপার জন্মভিটেয় হয়চণ্ডীপাঠ।

দ্বারকা নদীর জলে স্নান করানো হয় বামা ক্ষ্যাপার মূর্তি। বিশেষ পুজো এবং হোম যজ্ঞে অংশ নেন

বহু দর্শণার্থী।

 

তন্ত্র সাধনায় যে উচ্চতায় বামা ক্ষ্যাপা পৌঁছে ছিলেন তা বহু সাধকের কাছেই স্বপ্ন। বামা যখন তারা পীঠে অবাধ বিচরণ করছেন তখন প্রায় প্রতিদিনই নানা অলৌকিক কান্ড ঘটাতেন তিনি।

কখনো বামা চরণ শ্মশানে জ্বলন্ত চিতার কাছে বসে থাকতেন, কখনো বাতাসে কথা বলতেন। তার অদ্ভুত আচরণ বা ক্ষ্যাপামির কারণে

তার নাম বামাচরণ থেকে বামাক্ষ্যাপা হয়। খেপা মানে পাগল। অর্থাৎ গ্রামবাসীরা তাকে অর্ধ পাগল মনে করত। আসলে তিনি ছিলেন অতি উচ্চ মানের সাধক এই ক্ষ্যাপামি ছিলো তার সত্ত্বার বাইরের আবরণ।

 

স্বয়ং তারা মা তাকে দেখা দিয়ে আশীর্বাদে করেছিলেন।সেটি ছিল ভাদ্রপদ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথি।ভগবতী তারার সিদ্ধির জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধ মুহুর্ত। তখন রাতের সময় বামাখেপা জ্বলন্ত চিতার পাশে শ্মশানে বসে ছিল, যখন নীল আকাশ থেকে আলো ফুটে চারদিকে আলো ছড়িয়ে পড়ে।

এই আলোকে বামাচরণ মা তারার দর্শন পেয়েছিলেন। কোমরে বাঘের চামড়া পরা! এক হাতে অস্ত্র।এক হাতে মাথার খুলি, এক হাতে নীল পদ্ম ফুল, এক হাতে খড়গ। সেই দিন মা তারা বামার মাথায় হাত রাখাতে বামাক্ষ্যাপা সেখানে সমাহিত হয়। সমাধি অবস্থায় তিনি তিন দিন তিন রাত শ্মশানে অবস্থান করেন। তিন দিন পর জ্ঞান ফেরে এবং জ্ঞান ফেরার সাথে সাথে বামা চিৎকার করে এদিক ওদিক দৌড়াতে থাকে। গ্রামবাসীরা নিশ্চিত হয় যে বামা সম্পূর্ণ পাগল হয়ে গেছে। বামার এই অবস্থা একমাস ধরে চলে বলে শোনা যায়। তারপর ধীরে কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায়

ফিরে আসেন বামা ক্ষ্যাপা।

 

তার শৈশব থেকে কৈশোর এবং পরবর্তীতে জীবনের শেষ দিন অবধি নানা বিধ অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে তারাপীঠে। আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে প্রায় সারা সপ্তা ধরে বামা ক্ষ্যাপার মহিমা বর্ণনা করবো। থাকবে তার জীবনের নানা অধ্যায় এবং নানা অলৌকিক ঘটনা।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

আজকের বাংলার কালী পর্বে কলকাতার একটি প্রাচীন কালীর পুজোর কথা আপনাদের জানাবো।

দেবী কালিকার এলোকেশী, করলবদনা রূপ দেখতেই আমরা অভ্যস্ত কিন্তু উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুরে রয়েছেন মা ভবতারিণী এখানে দেবী ঘোমটায় ঢাকা থাকেন, তাই তিনি ঘোমটা কালী।

ঐতিহাসিক এই মন্দিরটি ১৮৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দেবী কালিকা আদপে দক্ষিণাকালীরই ভিন্নরূপ। সাধক, সন্ন্যাসীরা দেবীকে ভবতারিণী বলেন। গর্ভগৃহে কষ্টিপাথরের দক্ষিণাকালী ভবতারিণী নামেই নিত্য পূজিতা। মন্দিরের  গর্ভগৃহের একদিকে শ্রীধর অর্থাৎ নারায়ণ শিলা, কৃষ্ণ-রাধিকা মূর্তি, গণেশ, কৃষ্ণ মূর্তিও নিত্য পূজিত হয়।  মন্দিরটি দক্ষিণমুখী। দক্ষিণেশ্বরের আদলে নবরত্নশৈলীতে মন্দিরটি নির্মিত।

বলরাম ঘোষের উত্তরসূরি তুলসীরাম ঘোষকে স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন দেবী।স্বপ্নে দেখা রূপ অনুযায়ীই এখানে দেবী কালীর মূর্তি তৈরি হয়েছে। মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ প্রথম গ্রহণ করেন সারদা প্রসাদ ঘোষের মা দয়াময়ী দাসী। তুলসীরাম ঘোষ স্বপ্নে দেখা কালী মূর্তি অনুযায়ী একটি ছবি আঁকিয়েছিলেন। সেই ছবিটি এখনও মন্দিরে রাখা আছে। তুলসীরামের পুত্রবধূ দয়াময়ী দেবী স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলের সঙ্গে কলকাতায় এসে জমি কিনে মন্দির তৈরি শুরু করেন এবং তুলসীরামের আঁকানো ছবি অনুযায়ী কালী মূর্তি তৈরি করান। পরবর্তীতে মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় স্থাপিত হয় একটি কষ্টি পাথরের কালী মূর্তি এবং নিয়মিত পুজো
শুরু হয়।

ভবতারিণী মন্দিরে বৈষ্ণব মতে পুজো হয়।
মন্দিরে প্রতিদিন নিত্য পুজো হয়। কার্তিক অমাবস্যায় ধূমধাম করে কালী পুজো হয়। এছাড়াও জন্মাষ্টমী,দুর্গাপুজো ও জগদ্ধাত্রী পুজো হয়ে থাকে। মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাসন্তী পঞ্চমীর দিন, সেই কারণে, প্রতি বছর বসন্ত পঞ্চমীর দিন মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষ্যে জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে পুজো হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা বিপদে-আপদে মন্দিরে ছুটে আসেন। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবীর কৃপায় যেকোনও বিপদ থেকে পরিত্রাণ মেলে।বর্তমানে এই
মন্দিরটি হেরিটেজ ঘোষিত হয়েছে।

ফিরে আসবো পরের অনুষ্ঠানে ।
বাংলার কালীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – অর্ধকালীর পুজো

শাস্ত্রে যতগুলি মাকালীর রূপের উল্লেখ আছে যেমন ভদ্র কালী, দক্ষিনা কালী ইত্যাদি তার বাইরেও বাংলায় নানা রূপে পূজিতা হন দেবী কালী। কোথাও তিনি সাদা কালী, কোথাও আবার ব্যাঘ্র কালী। এই প্রতিটি রূপের সাথে জড়িয়ে আছে কিছু ইতিহাস কিছু অলৌকিক ঘটনা আজ এমনই এক কালী পুজোর কথা জানাবো ।

 

আজ থেকে প্রায় ছশো বছর আগে

অবিভক্ত বাংলার ময়মনসিংহের প্ৰখ্যাত কালীসাধক দ্বিজদেব নিজের নিঃসন্তান অবস্থা ঘোচানোর জন্য তার আরাধ্যা দেবী কালীর কাছে প্রার্থনা করেন।দীর্ঘ সময় ধরে প্রার্থনা করার পরে তার ডাকে সাড়া দেন মা কালী এক রাতে তিনি স্বপ্ন দেখলেন তাঁর পরমারাধ্যা তাঁর কাছে কন্যারূপে আসবেন। যথা সময়ে সন্তান সম্ভবা হলেন তার স্ত্রী এবং এক মাঘী পূর্ণিমার দিন এক কন্যা সন্তান ভূমিষ্ঠ হল। লোকমুখে শোনা যায় বিচিত্র ছিলো সেই কন্যা সন্তানের রূপ। সে না পুরোপুরি গৌরাঙ্গী আবার না সম্পূর্ণ শ্যামাঙ্গী। তার দেহের অর্ধেক গৌরবর্ণা আর বাকি অর্ধ ঘন শ্যামবর্ণা ।

 

তিনি আদর করে কন্যার নাম দিলেন জয়দুর্গা। তবে নিজে কন্যাকে অর্ধকালী বলে ডাকতেন। আসলে এই কন্যা কোনো সাধারণ কন্যা নন। তিনি বিশ্বাস করতেন এই কন্যা দেবী কালীর মানবী রূপ

এবং দেবী রূপেই তাকে মনে মনে ভক্তি করতেন।

 

কন্যা বড় হয়ে বিবাহযোগ্যা হলে দ্বিজ ঠাকুরের টোলের শিষ্য রাঘবরাম ভট্টাচার্যর সাথে জয় দুর্গার বিবাহ হয়। রাঘবরাম ভট্টাচার্য তন্ত্র জ্যোতিষ

চর্চা করতেন এবং পরবর্তীতে মাতৃ সাধক রূপে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

 

বিবাহ পরবর্তী জীবনেও জয় দূর্গা বা

অর্ধকালীকে কেন্দ্র করে একাধিক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।শোনা যায় একবার নব বধূর ঘোমটা জন সমক্ষে পড়ে যাওয়ায় তৎক্ষণাৎ এক জোড়া অদৃশ্য হাত সেই ঘোমটা আবার স্বস্থানে বসিয়ে দেয় যা দেখে হতবাক হায্য সবাই আবার একবার তাদের গৃহে কোনো এক কারণে দূর্গাপুজোর সময়ে চন্ডী পাঠ থেকে বিরত থাকেন সেই সময় তাদের কুল দেবী দুর্গা দক্ষিণমুখী

থেকে ঘুরে পশ্চিমমুখী হন আর কাঁচা হলুদ বর্ণা দেবী ক্রুদ্ধ রক্তবর্ণা রূপ ধারণ করেন।আজও নাকি অর্ধকাকালীর পরিবারের এই রূপেই

দেবীর পুজো হয়। হয়না চন্ডী পাঠ।

আজও এখানে পরম্পরা মেনে মৃন্ময়ী দুর্গাপূজা হয় শারদীয়া দুর্গা পুজোয় আর মাতা অর্ধকালীকে স্মরণ করা হয় গৃহদেবী রূপে।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে। থাকবে বাংলার অন্য এক ঐতিহাসিক কালী পুজো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – বসিরহাটের দক্ষিনা কালীর পুজো

বসিরহাটের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ইছমতী নদীর পাড়ে সংগ্রামপুর নামক ছোট্ট জনপদটি বেশ প্রাচীন শোনা যায় ইছামতীর তীরে মানসিংহের সঙ্গে বাংলার এক রাজা প্রতাপাদিত্যের যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধ বা সংগ্রাম থেকে এই জায়গার নাম হয় সংগ্রামপুর।আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় সেই ইতিহাস নয় বরং এই বসিরহাটের সংগ্রামপুরে দক্ষিণাকালীর একটি মন্দির।

 

জঙ্গলের মধ্যে ছিল কালীর থান। কালীভক্ত রাজা কৃষ্ণচন্দ্র একবার ইছামতীর বুকে নৌকো বিহারের সময়ে রাতে স্বপ্ন দেখেন ইছামতীর উত্তর দিকের জঙ্গলের মধ্যে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে এক মহিলা বলছেন এখানে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করতে। পর দিন সকালে স্বপ্নের কথা শুনে মন্ত্রীর পরামর্শে কৃষ্ণচন্দ্র জঙ্গল পরিষ্কার করে সেখানে দক্ষিণাকালীর মূর্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মন্ত্রীকে বলেন।রাজার নির্দেশ মতো বন জঙ্গল পরিষ্কার করে তৈরী হয় মন্দির শুরু হয় তৈরী। মন্দির তৈরী হলে দেবী দক্ষিনা কালীর মূর্তি স্থাপন করে শুরু হয় দেবী আরাধনা। সেই পরম্পরা আজও চলছে। যদিও সেই রাজাও নেই সেই রাজত্ব ও নেই। তবু দেবী দক্ষিনা কালী স্বমহিমায় বিরাজ করছেন এই মন্দিরে।

 

একাধিক কিংবদন্তী এবং অলৌকিক ঘটনার কথা শোনা যায় এই পুজোকে কেন্দ্র করে। শোনা যায় কৃষ্ণ চন্দ্র পরবর্তী সময়ে মন্দিরের কাঠামো ভেঙে পড়লে সেখানে টাকির রায়চৌধুরী জমিদারেরা কাছারিবাড়ি করেন।স্থানীয় এক সাধককে সাময়িক ভাবে পুজোর দায়িত্ব দেয়া হয়।এক রাতে দেবী সেই সাধককে স্বপ্নে জানান যে এখানে কালী মন্দির নির্মাণের করতে হবে । জমিদার বাবুর কানে পৌছায় সেই খবর। সাথে সাথে একটি অস্থায়ী মন্দির করে আবার দেবীকে সেখানে শাস্ত্র মতে স্থাপন করা হয়।পরবর্তীকালে টাকির জমিদার সূর্যকান্ত রায়চৌধুরী পাকা মন্দির তৈরি করেন।

 

কয়েক শতাব্দী ধরে দেবী এখানে পূজিতা হচ্ছেন একই ভাবে।ভক্তদের বিশ্বাস, মা কালী এখানে লালপাড় শাড়ি পরে ভক্তদের খোঁজ নিতে গভীর রাতে গ্রামে ঘুরে বেড়ান।

 

এই মন্দিরে পুজোর ক্ষেত্রে বিশেষ করে ভোগের ক্ষেত্রে কিছু বৈচিত্র চোখে পড়ে।মটর ডালে কচুরমুখির সঙ্গে এঁচোড়-চিংড়ি ও সাদা ভাতের ভোগ রান্না হয় মাটির হাঁড়িতে।জনশ্রুতি আছে

এক বার মন্দিরের পুকুরের পোনা মাছ ধরে রান্না হয়। ভোগ খেতে খেতে বসে সবাই দেখেন, তা চিংড়ি মাছ। সেই থেকে সেবাইতদের রান্না করা ভোগে চিংড়ি মাছ দেওয়ার রীতি চালু করেন।

 

বসিরহাট সংলগ্ন একাধিক গ্রামে এই দেবী সর্বাধিক জাগ্রত এবং প্রসিদ্ধ। এই পুজোই একমাত্র বড়ো পুজো হিসেবে পালিত হয়।

দ্বিতীয় মৃন্ময়ী মূর্তি তৈরী হয়না এই মন্দির সংলগ্ন এলাকায়।

 

পরবর্তী পর্বে ফিরে আসবো বাংলার এক অন্য প্রাচীন কালী মন্দিরের ইতিহাস এবং

অনেক অলৌকিক ঘটনানিয়ে।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – যোগমায়া কালীর পুজো

বাংলার জেলায় জেলায় বিভিন্ন কালী মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে বহু ইতিহাস। সেইরকমই এক অলৌকিক ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে ঝাড়গ্রামের যোগমায়া মন্দিরের সাথে রয়েছে এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ।

 

এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা হাড়িরাম দাস নামে এক মাতৃ সাধক।শোনা যায় তিনি তন্ত্রসিদ্ধ হয়ে স্বপ্নাদেশে দেবীকে কন্যারূপে পেয়েছিলেন।

আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগের ঘটনা হাড়িরামের কন্যা মাত্র দেড় বছরে অসুস্থ হয়ে মারা যায় মেয়েকে হারিয়ে উন্মাদের মতো হয়ে যান হাড়িরাম। গ্রামের অদূরে শ্মশানের মাটি চাপা দিয়ে সমাহিত করেন মেয়েকে। কিন্তু সন্তানহারা বাবার মন সর্বক্ষণই মেয়ের জন্য কেঁদে উঠত। রাত হলেই শ্মশানে গিয়ে মাটি সরিয়ে মেয়ের দেহ বুকে চেপে কান্নায় ভেঙে পড়তেন তিনি। এই শ্মশানে এক গভীর রাতে দেবী যোগমায়ার দর্শন পেলেন হাড়িরাম। দেবী জানালেন, এভাবে রোজ মেয়ের দেহ দেখতে আসার দরকার নেই। তিনিই কন্যারূপে হাড়িরামের ঘরে আসবেন।

 

তারপর দেবীর আদেশে বাড়ির উঠোনে বেলগাছের তলায় পঞ্চমুণ্ডির আসনে সাধনা শুরু করলেন তিনি। এক অমাবস্যায় সিদ্ধিলাভ হল।

তৈরী হলো মাটির একটি ছোট্ট মন্দির যোগমায়াকে প্রতিষ্ঠা করেন হাড়িরাম। নিজের কন্যা রূপে যোগ মায়া কে পেয়েছিলেন তিনি।

 

দ্রুত যোগমায়া দেবীর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। হাড়িরামের মৃত্যুর পর মন্দিরের পাশেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। পরে তাঁর স্ত্রী মনোরমার মৃত্যু হলে তাঁকেও হাড়িরামের সমাধির পাশেই সমাধিস্থ করা হয়। পরবর্তীতে ভক্তদের দানে সেখানে তৈরি হয়েছে সমাধি মন্দির। মন্দিরে মায়ের বিগ্রহের পাশেই রয়েছে হাড়িরামের মূর্তিও। দেবীর পুরনো মাটির মূর্তি প্রতি বছর নবকলেবর ধারণ করে।আজও বংশ পরম্পরায় হাড়িরামের পরিবারের সদস্যরাই পুজো করেন।

 

কালীপুজোর রাতে এখানে প্রচুর ভক্ত আসেন। গভীর রাতে হয় পুজো।ভক্তিভরে মায়ের কাছে প্রার্থনা জানালে মা ভক্তের কথা শোনেন।

সেই বিশ্বাসেই বহু মানুষ আসেন।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে বাংলার কালী নিয়ে।

চলতে থাকবে এই ধারাবাহিক আলোচনা।

পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।