পুরীতে যাননি এমন বাঙালি কমই আছেন আমার একাধিকবার সৌভাগ্য হয়েছে এই তীর্থ ক্ষেত্র দর্শন করার আর যতবারই গেছি মুগ্ধ হয়েছি|আজ এই মন্দির সংক্রান্ত কিছু অদ্ভুত তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরবো|শাস্ত্র মতে হিন্দু দের পবিত্র চার ধামের মধ্যে পুরীর জগন্নাথ মন্দির অবশ্যই অন্যতম|পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য আছে যা কিন্তু যথেষ্ট রহস্যে মোড়া, তারই কিছু আজ পুরান কথায় আপনাদের সামনে আনবো এক এক করে|প্রথমেই বলি,মন্দিরের উপর দিয়ে কোন বিমান বা পাখি উড়ে যেতে পারেনা। অবিশ্বাস্য মনে হলেও বিষয়টি কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা অগ্রাহ্য করতে পারেন না|মন্দিরের চূড়ায় যে পতাকাটি লাগানো আছে তা রোজ নিয়ম করে পাল্টানো হয়,এই পতাকা সব সময় হওয়ার বিপরীতে ওড়ে। এর কারণ কিন্তু জানা যায় না কিন্তু এই অদ্ভূত ঘটনাটি ঘটে থাকে|আপনারা যারা পুরীর মন্দির দর্শন করেছেন হয়তো জানেন পুরীর যে কোন জায়গা থেকেই আপনি যদি মন্দিরের চূড়ার দিকে তাকান তাহলে সুদর্শন চক্র আপনার দিকে সম্মুখীন হয়ে থাকবে|এও এক রহস্য|মন্দির চত্বরের কোলাহলের জন্যে হয়তো খেয়াল থাকেনা কিন্তু মন্দিরের ভিতরে সিংহদ্বারে মন্দিরে প্রবেশ করার পর প্রথম সিঁড়িতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের আওয়াজ আর শুনতে পাওয়াযায় না কিন্তু সিঁড়ি টপকে গেলেই তারপর আবার সমুদ্রের আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়|মনে করা হয় পুরী হলো ভগবানের ভোজনের স্থান তাই এখানকার সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বৈশিষ্ট্যটি হল প্রসাদ। রহস্যময় বিষয় হলো সারাবছর ধরে সমপরিমাণ প্রসাদ রান্না করা হয়, কিন্তু একই পরিমাণ প্রসাদ দিয়ে কয়েক হাজার মানুষ হোক বা কয়েক লক্ষ মানুষকে খাওয়ানো হোক তবু প্রসাদ কখনো নষ্ট হয় না বা কখনো কম পড়ে না|এই প্রসাদ রন্ধন পক্রিয়াতেও রয়েছে এক রহস্য রান্নার পদ্ধতিতেও বেশ রহস্য আছে, মন্দিরের হেঁশেলে একটি পাত্রের উপর আরেকটি পাত্র এমন করে মোট সাতটি পাত্র আগুনের উপর বসে রান্না করা হয়। এই পদ্ধতিতে যেটি সবচেয়ে উপরে বসানো হয় থাকে, তার রান্না সবার আগে হয়। আর তার নিচেরগুলো তারপর , এভাবেই চলে আসছে যুগ যুগ ধরে|পুরী মন্দিরের এতো রহস্য এতো অলৌকিক বিষয় থেকে এটাই প্রমান হয় যে ভগবানের লীলা বোঝা দায়|তার ইচ্ছায় সবই সম্ভব|সাধারণ বুদ্ধি বা যুক্তি দিয়ে ভগবানের লীলার বিচার সম্ভব নয়|শুধু অন্তরে আস্থা ও ভক্তি থাকতে হবে|চলবে তীর্থ স্থান নিয়ে লেখা লেখি |দেখা হবে পরের পর্বে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – শক্তি পীঠ বিমলা দেবী
উড়িষ্যা বা পুরীর কথা উঠলেই আমাদের মাথায় আসে প্রভু জগন্নাথের নাম, এমন বাঙালি কমই আছে যে একবার হলেও পুরী যায়নি, পুরীকে বলা হয় বাঙালির সেকেন্ড হোম|তবে অনেকেই হয়তো জানেন না বা সেই ভাবে লক্ষ্য করেন না যে এই পুরীর জগন্নাথ মন্দির প্রাঙ্গনেই বিরাজ করছে একটি অন্যতম শক্তি পীঠ দেবী বিমলার মন্দির|জগন্নাথ মন্দির চত্ত্বরের দক্ষিণ পশ্চিম কোনে অবস্থান করছে দেবী বিমলার ছোট্ট কিন্তু সুন্দর এই মন্দির টি|শাক্ত ও তান্ত্রিক দের কাছে এই দেবী ও তার মন্দির অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ|মনে করা হয় দেবী বিমলা প্রভু জগন্নাথের রক্ষাকতৃ|জগন্নাথ দেবের পূজার পূর্বে দেবী বিমলার পূজা হয় এবং জগন্নাথ দেবের প্রসাদ বিমলা দেবীকে নিবেদন করার পর তা মহাপ্রসাদ হিসেবে গণ্য হয়|কালিকা পুরাণ গ্রন্থে তন্ত্র-সাধনার কেন্দ্র হিসেবে যে চারটি প্রধান পীঠের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলি ভারতের চার দিকে অবস্থিত। এর মধ্যে পশ্চিম দিকের পীঠটি হল বিমলা দেবী পুরান মতে এখানে দেবী সতীর পা পতিত হয়েছিলো|এই পীঠের ভৈরব স্বয়ং জগন্নাথ কারন এখানে জগন্নাথদেব ও শিব অভিন্ন|এছাড়াও হেবজ্র তন্ত্র, মহাপীঠ নির্ণয় তন্ত্র, বামন পুরান, মৎস পুরান ও দেবী ভাগবত পুরান ইত্যাদি গ্রন্থেও এই শক্তি পীঠের উল্লেখ আছে|তন্ত্রগ্রন্থ কুব্জিকাতন্ত্র মতে, বিমলা ৪২টি সিদ্ধপীঠের একটি| নামাষ্টোত্তরশত গ্রন্থেও পুরুষোত্তমের বিমলার নাম পাওয়া যায়|যদিও এই পীঠের স্বরূপ এবং দেবীর দেহের কোন অংশ এখানে পতিত হয়েছিলো তা নিয়ে পন্ডিত দের মধ্যে ও কিছু গ্রন্থের মধ্যে কিঞ্চিৎ মত পার্থক্য ও বিরোধিতা আছে তবে এই শক্তি পীঠের অস্তিত্ব ও গুরুত্ব সর্বত্র স্বীকৃত|শঙ্করাচার্য বিমলা দেবীকে প্রতিষ্ঠা করে গোবর্ধন মঠ স্থাপন করেছিলেন|মনে করা হয় বিমলা দেবীর মন্দিরটি জগন্নাথদেবের মন্দিরের থেকেও প্রাচীন|স্থাপত্য শৈলী ও প্রাচীনত্বের দিক থেকে বলা যায় সোমবংশী রাজবংশের রাজা যযাতি কেশরী এই মন্দিরটি নির্মাণ করিয়েছিলেন পরে তা সংস্কার হয় নানা সময়ে|এক কালে শৈব্য ও তান্ত্রিক দের প্রভাব এখানে বেশি ছিলো এমনকি দেবী কে আমিষ ভোগ ও দেয়া হতো পরে তা বন্ধ হয়|যদিও বিশেষ বিশেষ তিথিতে এখনো দেবী বিমলা কে আমিষ ভোগ নিবেদন করা হয়|জগন্নাথের মিনারের পশ্চিম কোনে বেলে পাথর ও ল্যাটেরাইট নির্মিত পূর্ব মুখী মন্দির টি অবস্থিত |মন্দিরটি চারটি অংশে বিভক্ত, সভা কক্ষ,গর্ভ গৃহ,উৎসব কক্ষ ও ভোগ বিতরন কক্ষ |পাশেই রয়েছে রোহিনী কুন্ড|বর্তমানে মন্দিরের রক্ষনাবেক্ষন এর দায়িত্বে রয়েছে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া|মন্দিরের কেন্দ্রীয় গর্ভগৃহে রাখা আছে দেবী বিমলার মূর্তিটি। দেবী এখানে চতুর্ভূজা। তাঁর তিন হাতে জপমালা,বরমুদ্রা ও অমৃতকুম্ভ। চতুর্থ হাতের বস্তুটি ঠিক কী, তা এখনো স্পষ্ট নয় | তবে দেবী দুর্গার যে মূর্তি আমরা সচরাচর দেখতে অভ্যস্থ, দেবী বিমলার মূর্তি আদৌ সে রকম নয়। শুধু দেবী পার্বতীর দুই সখি জয়া ও বিজয়াকে দেবী বিমলার দুই পাশে দেখা যায়। মূর্তির উচ্চতা ৪ ফুটের কিছু বেশি।বিমলা মন্দিরের বিমানটির উচ্চতা ৬০ ফুট|প্রতি বছর আশ্বিন মাসে ষোলো দিন ধরে দুর্গাপূজা উদ্যাপিত হয়|নানান উৎসবের মধ্যে দুর্গাপূজা বিমলা মন্দিরের প্রধান উৎসব|দুর্গাপূজার শেষ দিন, অর্থাৎ বিজয়াদশমীতে পুরীর রাজা প্রথা মেনে বিমলাকে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা রূপে পূজা করেন|এই প্রথা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে|চলতে থাকবে পুরান কথা|ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্যকোনো পৌরাণিক বিষয় নিয়ে|পড়তে থাকুন|জ্যোতিষ সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে যোগাযোগ করুন উল্লেখিত নাম্বারে|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – কালভৈরব
শাস্ত্রে কাল ভৈরব নিয়ে হয়তো আপনারা পড়েছেন কিন্তু জানেনা কি কে এই কাল ভৈরব? কি ভাবেই বা তার আবির্ভাব হলো?এবং কি তার ধার্মিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব? কেনই বা তাকে নিয়ে এতো রহস্য|শিব পুরানে কাল ভৈরব এর উল্লেখ পাওয়া যায়, সাধারণত প্রত্যেক শিব মন্দিরেই থাকে কালভৈরবের মূর্তি। দাঁড়িয়ে থাকেন কালভৈরব। তাঁর চার হাত। হাতে থাকে ডোমরু, পাশা, নরমুণ্ড ও ত্রিশূল। কোনও কোনও মূর্তিতে চারটির বেশি হাতও থাকে। তাঁর এই মূর্তি দিগম্বর|প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাস মতে মহাজগতের বিশেষ স্থানগুলি ভৈরব রক্ষা করেন এবং ভৈরবের মোট সংখ্য ৬৪। এই ভৈরব দের ৮টি শ্রেণিতে ভাগ করা হয় প্রত্যেক ভৈরবের একজন করে ভৈরবী থাকেন। অষ্টাঙ্গ ভৈরবের নামগুলি এই রকম — অসিতাঙ্গ ভৈরব, রুরু ভৈরব, চণ্ড ভৈরব, ক্রোধ ভৈরব, উন্মত্ত ভৈরব, কপাল ভৈরব, ভীষণ ভৈরব এবং সংহার ভৈরব।প্রতিটি শ্রেণির আবার একজন করে প্রধান ভৈরব রয়েছেন। প্রধান ৮ ভৈরবকে ‘অষ্টাঙ্গ ভৈরব’ বলা হয়। এই আটজন মহাবিশ্বের আটটি দিকের অধিপতি। এই আট জন আবার নিয়ন্ত্রিত হন মহা স্বর্ণ কালভৈরবের দ্বারা। তিনি সাধারণভাবে কালভৈরব নামেই পরিচিত।অর্থাৎ ভৈরব ও কাল ভৈরব আলাদা এবং ভিন্ন তাদের স্বরূপ ও তাৎপর্য|”কাল” অর্থাৎ সর্ব শক্তি মান সময় এবং “ভৈরব” একটি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ ‘ভয়ঙ্কর’ বা ‘ভয়াবহ’। কালভৈরব আসলে শিবেরই একটি বিশেষ রূপ বা শিবের অংশ বিশেষ । শিব অনুসারে কোনো একসময় ব্রহ্মা নাকি কোনও ধর্মবিরোধী কাজ করেছিলেন যার ফলে শিব অত্যন্ত রেগে যান ব্রহ্ম দেবের উপর। তাই সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য কালভৈরবকে সৃষ্টি করেছিলেন করেছিলেন শিব। অর্থ্যাৎ শিবের ক্রোধ থেকে জন্ম কাল ভৈরবের আর সেই কালভৈরবই ব্রহ্মার একটি মাথা কেটে নিয়েছিল। কিন্তু তারপর সেই ছিন্ন মস্তক ছুঁড়ে ফেলতে চাইলেও কালভৈরনের হাতেই আটকে ছিল সেটি।সেই অবস্থায় কিছু কাল ভ্রাম্যমান অবস্থায় কাটান তিনি |এদিকে ব্রহ্ম হত্যার পাপ অন্য দিকে এই অসহায় অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে কপাল ব্রত পালন করতে হয় তাঁকে।তাতেও তেমন ফল হয়না, অবশেষে কাশীতে আসার পর তাঁর হাত থেকে হটাৎ খোশে পড়ে যায় সেই মস্তক। তার পর শিব কাল ভৈরব কে নিষ্ঠা সহকারে কাশী তেই স্থাপন করেন এবং কাশীকে রক্ষা করার দায়িত্ব দেন কালভৈরবকে। তাই শিব হলেন কাশীর রাজা আর কালভৈরব তাঁর কোতোয়াল। তিনিই আশীর্বাদ করেন, তিনিই অভিশাপ দেন। এমনকি স্বয়ং যমরাজেরও নাকি কাশীবাসীকে শাস্তি দেওয়ার কোনও অধিকার নেই।কাশী তে কাল ভৈরব ই শেষ কথা |আগামী পর্বে ফিরে আসবো অন্য কোনো বিষয় নিয়ে|চলবে পুরান কথা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|নমস্কার|
পুরান কথা – প্রভু জগন্নাথের স্নান যাত্রা
আগামী 14 তারিখ রয়েছে দেবস্নান পূর্ণিমা বিশেষ একটি কারণে এই তিথি খুব গুরুত্বপূর্ণ|প্রাথমিক ভাবে নাম থেকেই বোঝা যায় এই পূর্ণিমা যে সে পূর্ণিমা নয় এ হলো দেবস্নান পূর্ণিমা, কারন এই পূর্ণিমা তিথিতে জগতের নাথ জগন্নাথের স্নান যাত্রার সূচনা হয়|শাস্ত্র মতে এই দিন জগন্নাথদেবের জন্মতিথি রথ যাত্রার সূচনা পর্ব|স্নানযাত্রা আমাদের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের খুবই পবিত্র উৎসব এবং এই স্নানযাত্রা উপলক্ষে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা এবং মদনমোহনের বিগ্রহ শোভাযাত্রা সহকারে গর্ভগৃহ থেকে স্নানবেদীতে আনা হয় এবং এই সময়ে ভক্তদের দর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়|স্নানযাত্রার দিন কূপের জল মন্ত্র দ্বারা শুদ্ধ করে ১০৮ কলস জলে বিগ্রহ স্নান করানো হয়। স্নানপর্বের পর বিগ্রহ সাজানো হয় গজবেশে। অনেকেই মনে করেন এই উৎসব কালে জগন্নাথ দর্শন করলে সব পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়| স্নানযাত্রার পর শুরু হয় অনসর। এই অনসরকালে জগন্নাথদেব অসুস্থতার কারণে ভক্তগণের অন্তরালে গোপন স্থানে চিকিৎসাধীন থাকেন,তিনি গৃহবন্দি হন,রথযাত্রা পর্যন্ত বিশ্রাম নেন,এই সময়ে জগৎ রক্ষাকারী এই দেবতাকে কম্বল চাপা দিয়ে রাখা হয়।আর রথযাত্রার দিন আত্মপ্রকাশ করেন। রথের দিন রাজবেশে ভক্তদের সাথে মিলিত হতে সবার সামনে আসেন জগতের নাথ|স্নান যাত্রার ইতিহাস অতি প্রাচীন, স্কন্দপুরাণ মতে পুরীর মন্দির প্রতিষ্ঠার পর রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন এই অনুষ্ঠান প্রচলন করেন এই বিশেষ তিথিতে|জ্যৈষ্ঠী পূর্ণিমায় শ্রী হরির স্নানযাত্রা দর্শনের মাধ্যমে অনায়াসেই জীব মুক্তি লাভ করতে পারে। এমন কি কেউ যদি ভক্তি সহকারে একবারও স্নান যাত্রা মহোৎসব দর্শন করেন, তাঁর সংসার বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ সুনিশ্চিত হয়ে যায়। তার আর শোক করতে হয় না। জৈমিনি মুনি স্নান যাত্রার মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ভগবান পুরুষোত্তমের স্নানযাত্রা দর্শন করলে জীব তীর্থ সমূহে় স্নান করার থেকেও শতগুণ অধিক ফল প্রাপ্ত হয় এবং এতে কোনো সংশয় নেই। যদি কেউ আন্তরিকতার সাথে স্নান কালে ভগবানকে নিরীক্ষণ করে, তাদের মোক্ষ লাভ হয়। জীবগণ ভবসাগর থেকে উদ্ধার লাভ করতে পারে এবং আজন্ম যা পাপ করেছে তা বিনষ্ট হয়ে যায় স্নান যাত্রা দর্শন করে|চলবে পুরানকথা জগন্নাথ ধাম পুরী ও তার মন্দিরে নিয়ে আরো আলোচনা থাকবে আগামী দিনে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – ত্রিশূল
পুরান কথায় বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র নিয়ে আগে বলেছি আজ বলবো শিবের ত্রিশূল নিয়ে|ত্রিশূল বলতেই প্রথমে মনে ভেসে ওঠে দেবাদিদেব মহাদেবের নাম|পুরান অনুসারে শিব হলেন স্বয়ম্ভু যিনি নিজের চেতনায় নিজ ইচ্ছায় সৃৃষ্ট হন এবং যাকিছু অশুভ বা সৃষ্টির জন্যে বিপদজনক তা সংহার করার দায়িত্বে থাকেন তিনি স্বয়ং কিন্তু সংহার কর্তার এই সংহার লীলার জন্যে প্রয়োজন অস্ত্র, এই অস্ত্র নির্মাণের ভার স্বাভাবিক ভাবেই গিয়ে পরে দেব শিল্পী বিশ্বকর্মার উপর|বিষ্ণুপুরান অনুসারে সূর্যের তেজ ও রশ্মির ব্যবহার করে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা ত্রিশূল নির্মাণ করেন এবং তা শিবকে প্রদান করেন|এতে শিব ও তার অস্ত্র পান এবং সূর্যের তেজ কিছুটা কমায় বিশ্বকর্মার কন্যা এবং সূর্যপত্নী সংজ্ঞাও কিছুটা স্বস্তি পান|ত্রিশূল শুধু শিবের নয় দেবী দূর্গারও অস্ত্র কারন মহিষাসুর বধের জন্য বিভিন্ন দেবতা যখন দেবীকে বিভিন্ন অস্ত্রদান করেন তখন ভগবান শিব তাকে এই ত্রিশূলটি দান করেছিলেন,দেবী মহিষাসুরকে ত্রিশূল দিয়েই বধ করেন|আবার ত্রিশূল দিয়ে শিব দ্বারা গণেশের মুন্ড ছেদের ঘটনারও উল্লেখ আছে শাস্ত্রে|ত্রিশূল শুধু অস্ত্র নয় সনাতন ধর্মে ত্রিশূল সমৃৃদ্ধির প্রতীক আবার ত্রিশূলের তিনটি ফলার আলাদা আলাদা ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য রয়েছে|মনে করা হয় তিনটি ফলা যথাক্রমে সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশ কে চিহ্নিত করে আবার অন্য একটি বাখ্যা অনুসারে তিনটি ফলার অর্থ যথাক্রমে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত যা শিব তথা মহাকালের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে|শিবের ত্রিশূলে সব সময় বাঁধা থাকে ডমরু। এই ডমরু বেদ এবং তার উপদেশের প্রতীক যা আমাদের জীবনে এগিয়ে চলার রাস্তা দেখায়|শুধু হিন্দু নয় বৌদ্ধ ধর্মেও ত্রিশূল একটি পবিত্র প্রতীক হিসেবে সমাদৃত|বৈদিক বাস্তু শাস্ত্রেও ত্রিশূল ব্যাবহার হয়|বাস্তু শাস্ত্র মতে গৃহের প্রধান ফটকে ত্রিশূল চিহ্ন বা ত্রিশূল রাখলে গৃহে অশুভ শক্তি প্রবেশ করেনা ও গৃহে সুখ ও সমৃদ্ধি বিরাজ করে|চলবে পুরান কথা|আগামী পর্বে আবার কোনো নতুন বিষয় নিয়ে আসবো আপনাদে সামনে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
তীর্থ ক্ষেত্রে পন্ডিতজি – বৈষ্ণদেবীর মন্দির
দক্ষিণ ভারতের তীর্থ ক্ষেত্র গুলি নিয়ে ইতিমধ্যে লিখেছি বেশ কয়েকটি পর্ব আজ বলবো ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থস্থান বৈষ্ণদেবীর মন্দির নিয়ে| বৈষ্ণদেবী স্বয়ং আদ্যাশক্তির একটি রূপ হিসেবে বিবেচিত হলেও তার উৎপত্তি নিয়ে কিছু লৌকিক কাহিনী প্রচলিত আছে|কথিত আছে এক ব্রাহ্মণ দম্পতির কন্যা ছিলেন বৈষ্ণদেবী|মাত্র নয় বছর বয়সে সে রাম ও বিষ্ণুকে তুষ্ট করার জন্য তপস্যা শুরু করতে শুরু করেন|অবশেষে ভগবান শ্রী রাম ও বিষ্ণু দুজনেই সন্তুষ্ট হয়ে আশীর্বাদ করেন বৈষ্ণোদেবী কে।দুর্গম পাহাড়ে একটি গুহার মধ্যে থাকতে শুরু করেন বৈষ্ণোদেবী এবং সেখানে তাঁর নিরাপত্তার জন্য শ্রীরাম একটি সিংহ ,হনুমান ও তীর-ধনুক দেন। এরপর থেকেই বৈষ্ণোদেবী ওই মন্দিরে থাকতে শুরু করেন এবং পরবর্তীকালে মাতা বৈষ্ণোদেবী নামে পূজিত হয়।আরো একটি কিংবদন্তী অনুসারে শ্রীধর নামে এক ভক্তকে স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন স্বয়ং বৈষ্ণদেবী। পাশাপাশি জানিয়ে দিয়েছিলেন কোন গুহার মধ্যে তাঁর মন্দির গড়বেন ভক্ত।দেবী আদেশানুয়ারী গুহা খুঁজে সেখানে শ্রীধর নির্মাণ করেন বৈষ্ণদেবী মন্দির। পরবর্তীতে এই মন্দিরই পরিচিতি পায় বৈষ্ণদেবী মাতার মন্দির নামে।আজও বৈষ্ণ দেবী পুজো উপলক্ষে কারণেই নয় দিন ধরে নবরাত্রি পালন করা হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে|বৈষ্ণ দেবীর মন্দিরটি বিশ্বে সবচেয়ে পবিত্রতম স্থান হিসাবেও পরিচিত। এই মন্দিরের মধ্যে রয়েছে তিনটি গুহা। তবে এই মন্দির গুলির মধ্যে একটি গুহা বছরে বিভিন্ন সময় বন্ধ থাকে। শুধুমাত্র ভক্তদের জন্য এই গুহা সব সময় খোলা থাকে। কথিত আছে, সংকীর্ণ ও দুর্গম পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে বৈষ্ণো দেবীর মন্দিরে একবার যিনি যান ও দেবীর দর্শন লাভ করেন তার জীবন ধন্য হয়ে যায়|আমার জীবনে এই দুর্লভ সৌভাগ্য লাভ হয়েছে|প্রকৃতপক্ষেই দেবী দর্শনে দূর হয় ক্লান্তি, দেবী পূর্ণ করেন মনোস্কামনা।কথিত আছে মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে পাণ্ডবরা বৈষ্ণদেবীর উপাসনা করেছিলেন এবং তারাই এই দুর্গম স্থানে এই মন্দির নির্মান করেছিলেন|আদিম রহস্য, পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে দুর্গম এই বৈষ্ণদেবী মন্দিরে যা অনুভব করতে হয় ভাষায় প্রকাশ করা মুশকিল|তবু চেষ্টা করলাম সেই অভিজ্ঞতা ও কিছু তথ্য ভাগ করে নেয়ার|আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে|ভালো থাকুন|পড়তে থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরানকথা – শনিদেবের কৃপা
আপনাদের পুরান গুলিতে ও একাধিক প্রাচীন ধর্ম শাস্ত্রে শনিদেবকে কেন্দ্র করে বহু রোমাঞ্চকর ঘটনার বর্ণনা আছে|আজ পুরান কথায় গ্রহরাজের কৃপাধন্য একটি রহস্যময় গ্রাম নিয়ে বলবো যে গ্রামের নামকরন হয়েছে গ্রহরাজ শনি ও তার একটি মন্দির কে কেন্দ্র করে|শিঙ্গাপুর গ্রামের অবস্থান ভারতের মহারাষ্ট্র প্রদেশে। জেলার নাম নাভাসা। মহারাষ্ট্রের সুপরিচিত শহর আহমেদ নগর থেকে গ্রামটির দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার। শনি শিঙ্গাপুর গ্রামটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে এখানে হিন্দু ধর্মের অন্যতম দেবতা শনির একটি মন্দির রয়েছে যাকে কেন্দ্র করে রহস্য অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত আছে|এই গ্রামে দিন-রাত ২৪ ঘন্টা সবার ঘরের দরজা খোলা থাকে। ‘খোলা থাকে’ বললেও কিঞ্চিত ভুল হবে, কেননা সেই গ্রামের ঘর-বাড়ির দরজাতে কপাটই নেই; মানে চাইলেও দরজা বন্ধ করার সুযোগ নেই। অদ্ভুত এই নিয়মের সাথে জড়িত শনিদেবের নাম|কথিত আছে, প্রায় ৩০০ বছর আগে গ্রামটিতে একবার প্রচন্ড বৃষ্টি ও বন্যা হয়। বন্যা শেষ হলে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পানাশালা নদীর তীরে বিশালাকৃতির কালো রঙের একটি পাথর পাওয়া যায়, এই সময়ে একদিন সবাই যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন একই সময় গ্রামের সবার সাথে স্বপ্নে কথা বললেন স্বয়ং শনি দেবতা। সবাইকে তিনি জানালেন,এটি কোনো সাধারণ মূর্তি নয়, এটি আমার প্রতিমূর্তি। যদি তোমরা আমার উপাসনা করো তাহলে আমি তোমাদের সবার মুক্তি ও নিরাপত্তা দান করবো|শনি দেবতা তার উপাসনার পদ্ধতি হিসেবে দুটি শর্ত জুড়ে দেন। প্রথমত, এই গ্রামের কোনো এক জায়গায় আমার এ পবিত্র প্রতিমূর্তিটিকে সংরক্ষণ রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, গ্রামের কেউ তাদের ঘরের দরজার কপাট বন্ধ করতে পারবে না। যদি কেউ ঘরের দরজার কপাট বন্ধ করে তাহলে তিনি তাদের নিরাপত্তার দায়দায়িত্ব নিবেন না। কেননা সবার নিরাপত্তা প্রদানের জন্য দেবতাকে যখন তখন সবার ঘরে প্রবেশের সুযোগ থাকতে হবে। তাছাড়া দরজার কপাট বন্ধ থাকলে দেবতার সুনজর থেকেও গৃহবাসী বঞ্চিত হবে|এরপর তৈরি হলো এক শনি মন্দির প্রতিষ্টিত হলেন শনিদেব|এখানে শনি মন্দিরের উপরে কোনো ছাদ নেই। খোলা আকাশের নিচেই বেদি নির্মাণ করে শনি দেবতার পবিত্র পাথরটি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।গ্রহ রাজ শনিদেবের এই আদেশ আজও অক্ষরে অক্ষরে পালন করে আসছেন এই গ্রামের মানুষ তাই এই রীতি যা ভাবতেও অবাক লাগে|আবার ফিরবো আগামী পর্বে|চলবে পুরান কথা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|নমস্কার|
তীর্থক্ষেত্রে পন্ডিতজি – তিরুপতি বালাজি
তীর্থ ক্ষেত্র গুলি নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে বহু দিন থেকেই বলছি আজকের পরপর্বে বলবো দক্ষিণ ভারতের তিরুপতি বালাজি মন্দির নিয়ে|মনে করা হয় কলিযুগের দুঃখ ও যন্ত্রণা থেকে মানব সমাজকে মুক্ত করতে ভগবান বিষ্ণু তিরুমালায় ‘ভেক্টেশ্বর’ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন|অন্ধ্রপ্রদেশের চিত্তুর জেলার অন্তর্গত তিরুপতির তিরুমালা শৈলশহরে অবস্থিত ভগবানের ভেঙ্কটেশ্বরের তিরুমালা মন্দির যা বালাজি মন্দির নামেও প্রসিদ্ধ এবং ধন সম্পদের দিক দিয়ে বিশ্বের বিশ্বের ধনিতম মন্দির গুলির অন্যতম|বহু পুরান কাহিনী,কিংবদন্তি ও রহস্য জড়িয়ে আছে এই মন্দির ঘিরে যার কিছু আজ আমি আপনাদের সামনে আনবো|অনেকেই জানেন এই মন্দিরের দেবতার উদ্দেশ্যে মাথার চুল নিবেদন করা হয়|কিন্তু কেনো? তা জানতে হলে একটি পৌরাণিক ঘটনা জানতে হবে|একবার ভগবান ভেঙ্কটেশ্বরের মাথায় এক নাবালক রাখাল নিজের অজান্তেই আঘাত করেছিলেন যার ফলে ভগবানের মাথার কিছু অংশের চুল ছিঁড়ে পড়ে যায়। নীলাদেবী নামে এক গন্ধর্ব রাজকুমারী এই ঘটনাটি দেখতে পান| নীলাদেবী মনে করেন, ভগবান ভেক্টেশ্বরের সৌন্দর্যে কোন ক্ষুত থাকা উচিত নয় তিনি তখন নিজের মাথার চুল কেটে জাদুশক্তির সাহায্যে ভগবান ভেক্টেশ্বরের মাথায় প্রতিস্থাপন করেন|নীলাদেবী যেহেতু নিজের সৌন্দর্যের কথা না ভেবে ভগবান ভেক্টেশ্বরের সৌন্দর্যের বিষয়ে ভেবে নিজের মাথার চুল তাঁকে দান করেছিলেন, তাই ভগবান ভেক্টেশ্বরও রাজকুমারী নীলাদেবীকে এক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন|সেই প্রতিশ্রুতি অনুসারে এই ভেক্টেশ্বর মন্দিরে আগত প্রত্যেক ভক্ত তাঁদের নিজের মাথার চুল অর্পণ করবেন ভগবান ভেক্টেশ্বরকে। এবং সেই চুল প্রকৃত অর্থে পাবেন রাজকুমারী নীলাদেবী।সেই প্রথা আজও চলে আসছে|কেনো তিরুপতি মন্দিরে এতো ধন সম্পদ দান করেন ভক্তরা তাও এক রহস্য যা জানতে হলে আমাদের আরো একটা পৌরাণিক ঘটনা জানতে হবে|তিরুমালার রাজকুমারী পদ্মাবতীর সঙ্গে শ্রীবিষ্ণুর বিবাহ স্থির হয় এবং এই বিবাহের জন্যই বিষ্ণু সম্পদের দেবতা কুবেরের কাছ থেকে বিবাহ উপলক্ষে বিপুল ঋণ গ্রহণ করেন।ঋণ করার কারণ পদ্মাবতীর বাবা এই অর্থ দাবি করেছিলেন। কুবের এই শর্তে ঋণ দান করেন যে, বিষ্ণু যতদিন পর্যন্ত এই ঋণ শোধ করতে পারছেন না, ততদিন তিনি বৈকুণ্ঠে প্রবেশ করতে পারবেন না। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বিষ্ণু কুবেবের ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি। ভক্তরা ভগবানকে বিপুল অর্থ ও সম্পদ প্রদান করেন, যাতে তিনি ঋণমুক্ত হন|আজও অগণিত ভক্ত ভগবানের ঋণ পরিশোধ করতে মুক্ত হস্তে দান করে চলেছেন|ভগবান ভেঙ্কটেশ্বরের চোখ কেনো ঢাকা তারও নানা রকম ব্যাখ্যা হয়|অনেকে বিশ্বাস করেন এই বিপুল ঋণের কারণেই লজ্জিত বালাজি নাকি চোখের অর্ধাংশ ঢেকে রাখেন|কিছু শাস্ত্রজ্ঞ মনে করেন ভগবান বিষ্ণুর অন্যতম অবতার বুদ্ধ। বুদ্ধের একটি রূপ হল অবলোকিতেশ্বর। এই রূপে বুদ্ধের চোখ অর্ধনিমিলিত থাকে। বালাজির মূর্তি আসলে অবলোকিতেশ্বরেরই মূর্তি|তবে স্থানীয়রা মনে করেন বালাজির তিরুপতির চোখ যাতে ঢাকা থাকে, তা আসলে তিলক|বালাজির দৃষ্টি অতীব অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন। এই শক্তির প্রভাব সকলের সহ্য হবে না তাই ওই বিশেষ তিলক দ্বারা তাঁর নয়নকে অর্ধনিমিলিত রাখা হয়|রহস্য একটি দুটি নয় অনেক|প্রচলিত বিশ্বাস ভগবানের বুকে কান পাতলে শোনা যায় সমুদ্রের শব্দ|ভগবানের কপালে জমে বিন্দু বিন্দু ঘাম|ভগবানের চুল ও কোনো সাধারণ চুল নয়,তা আসল, অকৃত্তিম|বালাজির পূজা সামগ্রীও আসে একটি মাত্র নিদ্দিষ্ট গ্রাম থেকে|এই প্রথা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে|আমি নিজেও তিরুপতি বালাজি মন্দির দর্শন করে ধন্য হয়েছি|চলবে তীর্থক্ষেত্র নিয়ে লেখা লেখি আগামী পর্বে আবার অন্য কোনো পৌরাণিক বিষয় নিয়ে বলবো|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – গরুড়দেব ও সাপেদের শত্রুতা
পুরানে দেবতা অসুর ও মানুষের পাশাপাশি কিছু অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন অদ্ভুত প্রাণীর ও উল্লেখ আছে|গরুড় দেব এদের অন্যতম|তিনি স্বয়ং ভগবান বিষ্ণুর বাহন|তিনি মহাবীর, তার প্রশ্নের উত্তরে সৃষ্টি হয়েছে গরুড় পুরান|তবে সব থেকে বেশি যে বিষয়টা আলোচিত হয় তা হলো গরুড়ের সাথে সাপেদের প্রবল শত্রুতা|কিন্তু কেনো এই শত্রুতা আর কবে তার সূচনা হলো? এসব জানার আগে গরুড়ের আসল পরিচয় ও স্বরূপ জানা দরকার|গরুড় আসলে হিন্দু ও বৌদ্ধপুরাণে উল্লিখিত একটি বৃহদাকার পৌরাণিক পাখি বা পক্ষীতুল্য জীব। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, গরুড় বিষ্ণুর বাহন।গরুড় কশ্যপ মুনির সন্তান। কশ্যপের অনেক স্ত্রী ছিলেন। বিনতা তাঁদের অন্যতমা। এই বিনতার দুই পুত্র: গরুড় এবং অরুণ। কশ্যপের আর এক স্ত্রীর নাম কদ্রু। তাঁর অনেক সন্তান, সবাই সাপ। এখানে পারিবারিক ভাবে গরুড় ও সাপেদের শত্রুতার একটা ইঙ্গিত খুঁজে পাওয়া যায় |পড়ে বিষ্ণু গরুড় কে তার বাহন হিসেবে পান তার পেছনে ও আছে এক রোমাঞ্চকর পৌরাণিক কাহিনী |পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে গরুড়ের একবার অমৃতর খুব প্রয়োজন হয়ে পড়ে । অমৃত আছে দেবতাদের কাছে। গরুড় দেবলোকে অভিযান করলেন। দেবতাদের যুদ্ধে হারিয়ে অমৃতের ভাণ্ড নিয়ে গিয়ে দিলেন বিষ্ণুর কাছে। কিন্তু নিজে সেই অমৃত পান করলেন না। এই সংযম ও ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু গরুড়কে বর দিতে চাইলেন। গরুড় অমৃত চাইলেন না, কিন্তু অমরত্ব চাইলেন। তার সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থনা করলেন যে, তিনি বিষ্ণুর রথের উপরে থাকতে চান। বিষ্ণু তাঁর সেই প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। এই কাহিনির আর একটি রূপও আছে। তাতে বলা হয়েছে, বিষ্ণু যেমন গরুড়কে বর চাইতে বললেন, গরুড়ও তেমনই বিষ্ণুকে বর দিতে চাইলেন বিষ্ণু তখন গরুড়কে তাঁর বাহন হতে বললেন এবং রথের ধ্বজায় অধিষ্ঠিত হতে অনুরোধ করলেন। গরুড় রাজি হলেন |সেই থেকে গরুড় বিষ্ণুর বাহন |তিনি অমরত্ব ও লাভ করলেন|বিষ্ণুর আশীর্বাদে অমর হয়ে অমৃতের ভাণ্ডটি নিয়ে গরুড় আবার ডানা মেললেন, সেটি যথাস্থানে রেখে আসতে হবে। দেবরাজ ইন্দ্র অমৃত কেড়ে নেওয়ার জন্য চড়াও হলেন বজ্র দিয়ে আঘাত করলেন গরুড় কে । গরুড় তো অমর, কিন্তু দেবরাজের অস্ত্র বলে কথা, তার ওপর দধীচীর সম্মানও রক্ষণীয়, অতএব গরুড় তাঁর দেহের একটি পালক নিক্ষেপ করলেন, অর্থাৎ যুদ্ধে অক্ষত থাকলেন না তিনি। ইন্দ্র তাতেই সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে বন্ধু করে নিলেন|গরুড়ের সঙ্গে সর্পকুলের প্রবল শত্রুতা। তার অনেক কারন আছে|একটি কারন হলো কদ্রু গরুড়ের মা বিনতাকে দাসী করে রেখেছিলেন। বিমাতার দাসত্ব থেকে জননীকে মুক্ত করতে চান গরুড়। যেহেতু ভাইরা সব সাপ গরুড় বরাবরই সাপেদের সহ্য করতে পারতেন না |আবার নাগেদের সঙ্গেও বিষ্ণুর একটা সম্পর্ক আছে। নাগকুলে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলেন অনন্তনাগ বা শেষনাগ। বিষ্ণু তাঁর ওপর শয়ন করেন। অনন্তনাগ যখন নিজের দেহটি পাকিয়ে ফেলেন, তখন সময় পিছন দিকে যায়, ব্রহ্মাণ্ডের লয় হয়। তিনি যখন পাক খোলেন, সময় এগিয়ে যায়, ব্রহ্মাণ্ডের আবার সৃষ্টি হয়|এই নাগও আবার পরম বিষ্ণু ভক্ত অর্থ্যাৎ দুই বিষ্ণু ভক্তের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা বা মৃদু শত্রুতা কিছু অস্বাভাবিক নয়|প্রাকৃতিক ভাবে গরুড়ের সাথে নাগেদের সম্পর্ক খাদ্য ও খাদকের |গরুড়ের প্রধান খাদ্য সাপ তাই গরুড় কে সাপেরা ভয় পাবে এটাই স্বাভাবিক|প্রাকৃতিক নিয়মে এরা একে অপরের শত্রু|গরুড় ও সাপেদের শত্রুতা নিয়ে শাস্ত্র গুলিতে একাধিক ঘটনার বর্ণনা আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য রামায়ণ এর একটি ঘটনা যখন রাম সেনা নাগ পাশে আবদ্ধ তখন তাদের উদ্ধার করতে আসে স্বয়ং গরুড় দেব | তার আসার পর সকলে নাগ পাশ থেকে মুক্ত হয়ে আবার রাবন সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ন হয় |চলবে পুরান কথা|আবার অন্য কোনো পৌরাণিক বিষয় নিয়ে ফিরে আসবো যথা সময়ে|ভালো থাকুন|পড়তে থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – নিধীবনের রহস্য
বৃন্দাবনে অবস্থিত নিধীবন নিয়ে, যাকে ঘিরে আছে অজস্র লোক কথা ও রহস্যময় ঘটনা বৃন্দাবনের নিধীবনের পাশেই রয়েছে বিখ্যাত বাঁকে বিহারীর মন্দির মনে করা হয় প্রতি রাতেই এই মন্দিরে বিশ্রাম করতে আসেন স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণ|তার রাত কাটানোর নানা প্রমান পাওয়াযায় সকালে মন্দিরের দরজা খোলার পর যা অলৌকিক কিন্তু বাস্তব|মনে করা হয়, এই বনেই গোপিনীদের সঙ্গে রাস লীলায় মেতে উঠেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ ৷ এই বনের গাছ চির সবুজ ৷ কখনও, কোনও কারণে, এমনকী গাছ ফাঁপা হয়ে গেলেও বা জলের অভাব ঘটলেও গাছের পাতা কখনও হলুদ হয় না বা শুকিয়ে যায় না|আজও প্রতি রাতে কৃষ্ণ তার গোপিনীদের নিয়ে রাসলীলায় মেতে ওঠেন নিধীবনে|আশ্চর্যজনক ভাবে সূর্য ডোবার সাথে সাথে প্রতিটি প্রাণী বন ছেড়ে চলে যায়|কথিত আছে রাতে বনের প্রতিটি গাছ গোপিনীর রূপ ধরে শ্রী কৃষ্ণের সাথে রাসলীলায় অংশ নেয় এবং সূর্যউদয়ের আগে আবার সবকিছু ফিরে যায় আগের অবস্থায়|এমনকি এই বনে রাতে নূপুরের শব্দও শোনা যায়|সন্ধের পর এখানে প্রবেশ নিষেধ|এই নির্দেশ যারা মানেননি তাদের করুন পরিণতির কোথাও শোনা যায়|এমনকি আশপাশের বাড়ি গুলির জানালা যদি নিধীবনের দিকে থাকে তবে সেগুলিও বন্ধ রাখা হয় রাতে|পুরান ও শাস্ত্র গুলিতে কতইনা রহস্য লুকিয়ে আছে আগামী পর্বে ফিরে আসবো অন্য কোনো বিষয় নিয়ে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|