Home Blog Page 134

পুরান কথা – পুরীধাম ও মহাপ্রভু

পুরীধাম ও বিখ্যাত রথ যাত্রার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেছে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যর নাম এবং তার হাত ধরেই বাংলা ও পরবর্তীতে দেশের বাইরেও ছড়িয়েছে রথ যাত্রার মহিমা|সন্ন্যাস নেওয়ার অল্প দিন পরে, ১৫১০ সালে পুরীতে প্রথম বার পৌঁছে মহাপ্রভু ভাবে বিভোর হয়ে জড়িয়ে ধরতে গিয়েছিলেন দারুবিগ্রহ। জীবনের ২৪টা বছর শ্রীচৈতন্য পুরীতেই ব্যয় করলেন এই ২৪ বছরের মধ্যে প্রথম ৬ বছর অবশ্য তিনি বৃন্দাবনসহ উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারত সফরের জন্য পুরীকেই কেন্দ্র করেছিলেন। সেখান থেকেই নানা দিকে যাতায়াত করেছিলেন। মায়ের সঙ্গে শেষ বার দেখা করে আসার পর পুরীতে টানা ১৮ বছর বাস করেছেন, ১৫৩৩ সালে সেখানেই রহস্যজনক ভাবে বৈকুন্ঠে লীন হয়ে গেলেন।কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর ‘চৈতন্যচরিতামৃত‘-র মধ্যলীলা পর্যায়ে জানিয়েছেন, রাজা প্রতাপ রুদ্রদেব চৈতন্য ও তাঁর সঙ্গীদের রথযাত্রায় অভ্যর্থনা জানানোর জন্য দাঁড়িয়েছিলেন।আরো বর্ণনা আছে যে বিশাল দারুমূর্তিগুলি কী ভাবে রেশমি দড়িতে বেঁধে সেবকরা মন্দিরের বাইরে নিয়ে আসছেন, পুরু মাদুরের উপর দিয়ে সেগুলি রথে নিয়ে তুলছেন, সেই বর্ণনাও চরিতামৃতে আছে। রাজা নিজে সোনার হাতলওয়ালা ঝাঁটা নিয়ে জগন্নাথদেবের পথ পরিষ্কার করেন, সারা রাস্তায় সুগন্ধি চন্দনজল ছেটানো দেখে মহাপ্রভুও চমৎকৃত হয়েছিলেন।চৈতন্য বারংবার বলেছেন, পুরীর এই নীলমাধবই স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, তিনি তাঁরই আরাধনা করেন এবং তিনি শুধু শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মের ভক্ত, কোনও জাত বা সম্প্রদায়ে বিশ্বাসী নন।উল্লেখ যোগ্য বিষয় হলো পুরীবাসে চৈতন্যের প্রধান শিষ্যরা, যেমন রামানন্দ, শ্যামানন্দ, বলদেব বিদ্যাভূষণ কেউই ব্রাহ্মণ নন। পুরীর তৎকালীন ব্রাহ্মণ পান্ডা ও পুরোহিতেরা সারা বছর এই শূদ্রদের জগন্নাথ দর্শনের বিপক্ষে। শবরদের জগন্নাথ তখন ব্রাহ্মণদের অধিকারে মন্দিরের পুরোহিতেরা বিধান দিলেন, জগন্নাথদেব বছরে এক বারই মানুষের দরবারে বেরোতে পারবেন আর সেই দিনটা হলো রথ যাত্রা|খ্যাতির শীর্ষে থাকা কালীন রহস্যজনক ভাবে পুরী থেকে মহাপ্রভু হারিয়ে গেলেন। অচ্যুতানন্দ দাস, দিনকর দাস, ঈশ্বরদাসের মতো চৈতণ্য জীবনীকার ও টীকাকারেরা বারংবার বলেছেন, নীলমাধব বিগ্রহে মিশে গিয়েছে তাঁর শরীর, কিন্তু সে নিয়ে হরেক সন্দেহ আর বিতর্ক কারন বিভিন্ন ঠিকাকার তার অন্তর্ধান নিয়ে আলাদা আলাদা ব্যাখ্যা করেছেন|কোথাও বলার হয়েছে রথ যাত্রার সময়ে পায়ে আঘাত লেগে তার মৃত্যু হয়েছে আবার কেউ বলেছেন সমুদ্রে তার জলসমাধি হয়েছে|অনেকেই মনে করেন মহাপ্রভুর অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পেছনে অন্য কোনো কারন আছে হয়তো জাতি ভেদ ও বর্ণ ভেদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া অন্য দিকে তার শিষ্য হয়ে পুরীর রাজার যুদ্ধ ও রাজনীতি থেকে দূরে থাকা অনেকেরই পছন্দ হয়নি তাই মহাপ্রভুর বিরুদ্ধে চক্রান্ত হয়েছিলো|সব থেকে বড়ো প্রশ্ন তার যদি স্বাভাবিক মৃত্যু হয়ে থাকে তার কোনো সমাধি স্থান নেই কেনো? আর যদি জগন্নাথ মূর্তিতে তিনি বিলীন হয়ে যাবেন তবে তার সমসাময়িক টিকাকারদের মধ্যে এতো শ্ববিরোধী মন্তব্য কেনো? চৈতণ্য অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে চলেছে গবেষণা একাধিক উপন্যাস ও লেখা হয়েছে|তবে সব প্রশ্ন ও দ্বিধা দূর হয় যদি চৈতণ্যদেবকে অবতার রূপে মেনে নেয়া হয়ে আর যদি তাকে সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখা হয়ে তবে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়|যাই হোক বিতর্ক নয় তার ভক্তি ও আদর্শ তাকে অমর করে রাখবে সারা বিশ্বে|পুরী ও রথ যাত্ৰা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকবে উল্টো রথ অবধি |পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

পুরান কথা – ছাপ্পান ভোগ

আমাদের সনাতন ধর্মে পবিত্র চার ধাম হল- বদ্রীনাথ ধাম,দ্বারিকা ধাম,পুরী ধাম এবং রামেশ্বরম। প্রথমে হিমালয়ের শিখরে অবস্থিত বদ্রীনাথ ধামে স্নান করেন,তারপর গুজরাটের দ্বারিকা ধামে গিয়ে বস্ত্র পরিধান করেন, ওড়িশার পুরী ধামে ভোজন করেন আর সবশেষে রামেশ্বরমে গিয়ে বিশ্রাম নেন।পুরী ধামে যেখানে তিনি ভোজন করেন সেখানে ভোগের কোনও চমক থাকবে না এটা কখনও হয়। সেখানেই তাঁকে ছাপ্পান্ন ভোগ দেওয়া হয়। আজ আসুন জেনে নিই কী এই ছাপ্পান্ন ভোগ| পুরাণ মতে, যশোদা বালক কৃষ্ণকে আট প্রহর খেতে দিতেন। যখন ইন্দ্রের রোষে পড়ে মহাপ্রলয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময় প্রাণীদের রক্ষা করতে নিজের কনিষ্ঠ আঙুলে গোবর্ধন পাহাড় তুলে নিয়েছিলেন তিনি। সাতদিন ওইভাবেই তিনি ছিলেন। খাবার ও জল কোনও কিছুই মুখে দেননি। প্রলয় বন্ধ হওয়ার পর সেই পাহাড় নামিয়ে রেখেছিলেন। এদিকে যে ছেলে দিনে আটবার খাবার খেত তাকে টানা সাতদিন অনাহারে থাকতে দেখে কেঁদে উঠেছিল যশোদার মন। তখন ব্রজবাসী-সহ যশোদা সাতদিন ও আট প্রহরের হিসেবে কৃষ্ণের জন্য ৫৬টি পদ পরিবেশন করেছিলেন। আর সেই থেকেই নারায়ণের ছাপ্পান্ন ভোগ চলে আসছে।পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দিরে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম রান্নাঘর। সেখানে বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না হয় ছাপ্পান ভোগ|জগন্নাথের ভোগে মূলত দুই ধরনের খাবার দেওয়া হয়। ভাত, ডাল, তরকারি, খিচুড়ি জাতীয় রান্না করা খাবার থাকে। আর থাকে খাজা, গজা, খই, মুড়কি জাতীয় শুকনো খাবার। মূলত ফুটন্ত জলে সবজি এবং মশলা দিয়ে চলতে থাকে মহাপ্রভুর রান্না। মশলা বলতে শুধুমাত্র নুন এবং হলুদের ব্যবহার। পেঁপে, আলু, টমেটো, কাঁচা লঙ্কা জাতীয় সবজি জগন্নাথের রান্নায় ব্যবহার করা হয় না। বাল্যভোগে জগন্নাথদেবকে দেওয়া হয় খই, চিঁড়ে, বাতাসা, মাখন, মিছরি, কলা, দই এবং নারকেল কোরা। এরপর দেওয়া হয় রাজা ভোগ। এই তালিকায় থাকে মিষ্টি চালের খিচুড়ি, ডাল, তরকারি, ভাজা এবং পিঠেপুলি। দুপুরের ভোগ মূলত অন্নভোগ। সেখানে থাকে ভাত, ডাল, শুক্তো, তরকারি ও পরমাণ্ণ। এছাড়াও থাকে ক্ষীর ও মালপোয়া। সন্ধেবেলায় দেওয়া হয় লেবু, দই দিয়ে মাখা পান্তাভাত। সঙ্গে খাজা, গজা এবং নানা ধরনের মিষ্টি। রাত ১১টার সময় ভাজা ও ক্ষীর দেওয়া হয় তাঁকে। আর মধ্যরাতে ডাবের জল খেয়ে শুতে যান ভগবান। এভাবেই তাঁক ছাপ্পান্ন ভোগ অর্পণ করা হয়ে থাকে।রথ যাত্রা উপলক্ষে চলতে থাকবে প্রভু জগন্নাথ ও তার নানা লীলা নিয়ে আলোচনা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

পুরান কথা – বলরাম এর প্রকৃত পরিচয়

রথ যাত্রা মূলত জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মাসির বাড়ি যাওয়ার অনুষ্ঠান। শ্রীকৃষ্ণের অন্য একটি রূপ জগন্নাথের কথা তো আমরা সবাই জানি যিনি এই উৎসবের কেন্দ্রে থাকেন এবং মূল আকর্ষন|বলরাম ও সুভদ্রা ও আধ্যাত্মিক ভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ|তাই আজকের পর্বে কৃষ্ণের বড় ভাই বলরামকে নিয়ে লিখবো|কৃষ্ণের সত্‍ মা রোহিণীর গর্ভে জন্ম হয় বলরামের। তিনি ছিলেন আসলে কংসের কারাগারে বন্দি বসুদেব ও দেবকীর সপ্তম গর্ভের সন্তান। কংসের হাত থেকে তাঁকে বাঁচানোর জন্য শ্রীহরির নির্দেশে সপ্তম গর্ভের ভ্রুণ রোহণীর গর্ভে প্রতিস্থাপিত করা হয়। কংসকে জানানো হয় যে দেবকী মৃত সন্তান প্রসব করেছেন।শক্তি ও আধ্যাত্মিকতার মিলন হয়েছে বলে তাঁর নাম বলরাম। অনেকের মতে বিষ্ণুর এক অবতার রামের ছোট ভাই লক্ষ্মণ দ্বাপর যুগে তাঁর বড় ভাই বলরাম হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন।মহাভারতে বলরামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলদেব, বলভদ্র বা হলায়ুধ নামেও পরিচিত। বৈষ্ণবরা বলরামকে বিষ্ণুর অবতার-জ্ঞানে পুজো করেন। ভাগবত পুরাণেও তাঁর নাম রয়েছে। বিষ্ণুর শয্যারূপী শেষনাগের একটি রূপেও তাকে দেখা হয় কোথাও কোথাও|আগামী দিনে সুভদ্রাকে নিয়েও আলাদা করে একটি পর্বে লিখবো|রথ সংক্রান্ত নানা কথা চলতে থাকবে ধারাবাহিক ভাবে উল্টো রথ পয্যন্ত|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

পুরান কথা – বৃন্দাবনে কৃষ্ণের অদ্ভুত লীলা

আজ পুরান কথায় আপনাদের ভগবান কৃষ্ণের এক অদ্ভুত লীলার কথা বলবো যা ঘটেছিলো বৃন্দাবনে|প্রকৃত সাধক মানেই তিনি ভগবানের প্রতি সদা আস্থাশীল ও সম্পূর্ণ রূপে নিবেদিত প্রাণ এমনই এক জটাধারী সাধুর জটা একবার বৃন্দাবনের পথে চলার সময় বৃক্ষের জটায় আটকে যায়। অনেক চেষ্টা করেও ঐ জটার প্যাঁচ কিছুতেই খুলতে পারলেন না এবং তখন তিনি আসন করে ওখানে বসে পড়লেন যারা সাহায্য করতে এগিয়ে এলো তাদের তিনি বললেন যিনি এই জটার প্যাঁচ লাগালো, তিনি এই জটারসপ্যঁচ খুলতে আসবে,তো ঠিক আছে। যদি না আসে আমি এখানে আসন করে বসে থাকব।তাতে যদি প্রাণ ত্যাগ করতে হয় তো তাই হোক|তিনদিন এমন করে মহাত্মাজী বসে রইলেন|তিন দিন পর এক শ্যামল সুন্দর রাখাল ছেলে এল। বালক বড় আদর করে বলল, বাবা তোমার তো জটা প্যাঁচ লেগে গেছে |আমি জটা খুলে দেব| আর যেই সেই বালক জটা খোলার জন্য এগিয়ে এল|সাধক বাঁধা দিয়ে বললেন যে জটা গাছের সাথে জড়াল সে এসে এই প্যাঁচ খুলবে। তা না হলে এখানে বসে গোবিন্দ নাম নিয়ে প্রাণ দিয়ে দেব। রাখাল ছেলে বলল- “আরে মহারাজজী যে এই কাজটা করল তার নাম তো বলুন, ওকে আমি খুঁজে ডেকে নিয়ে আসি।” সাধক বললেন যে সে আপনা আপনি এসে যাবে, ডাকতে হবে না। তুমি যাও|বালক তখন মৃদু হেসে রাখাল বেশ ত্যাগ করে বাঁকেবিহারী রূপে প্রকট হলেন এবং ভক্তর উদ্দেশ্যে বললেন মহাত্মাজী আমিই তো এই জটার প্যাঁচ লাগালাম। আমি তো এসে গেলাম। এখন জটা খুলে দিই এই বলে কৃষ্ণ স্বয়ং হাত বাড়ালেন মহাত্মাজী বললেন আমি তো নিত্য নিকুঞ্জবিহারীকৃষ্ণের পরম উপাসক|তুমি কি সে?কিন্তু তিনি তো শ্রীরাধারাণীকে বিনা এক মূহুর্ত থাকতে পারে না। কিন্তু তুমি বিহারীজী একা একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছ।মহাত্মাজী এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে শ্যামের কাঁধে উপরে শ্রীজী রাধারানীর মুখ দেখতেপেলেন অর্থাৎ শ্রীরাধারানী নিজের প্রিয়তম শ্যামের পাশে এসে মহাত্মাকে সাক্ষাৎ দর্শন দিলেন আর আরাধ্য ভগবানের দর্শন পেয়ে মহাত্মাজী আনন্দে বিভোর হয়ে গেলেন তার চোখ দিয়ে অশ্রুধারা পড়তে লাগল।তিনি বুঝলেন রাধা ও কৃষ্ণ আলাদা নয় এক ও অভিন্ন| রাধাকৃষ্ণ তার জটার প্যঁচ খুলে দিল।সাধক তার সর্বস্ব কৃষ্ণের চরনে নিবেদন করে বৈকুণ্ঠ লোকে স্থান পাওয়া নিশ্চিত করলেন|আবার আগামী দিনে ফিরে আসবো এমনই কোনো অদ্ভুত লীলা প্রসঙ্গ নিয়ে|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

রথযাত্রার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন

আজ পবিত্র রথযাত্রা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে যে সকল ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক উৎসবগুলি সর্বাধিক জনপ্রিয় ও পবিত্র তার মধ্যে একদম প্রথম সারিতে রয়েছে রথ এই রথ যাত্রা যা আজ আর শুধু উড়িষ্যা বা বাংলা নয় গোটা বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব গুলির অন্যতম|শাস্ত্র মতে তখন দ্বাপর যুগ, শেষ হয়েছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ|এক ব্যাধের বানের আঘাতে প্রান হারান শ্রী কৃষ্ণ তার সৎকার করেন অর্জুন কিন্তু অক্ষত থাকে কৃষ্ণের নাভী এই নাভী উদ্ধার করেন এক সবর রাজ তিনি নীল মাধব রূপে তা পূজা করতে লাগলেন|এর পর কেটে গেলো বহু যুগ পুরীর রাজা এক বিশাল দেবালয় গড়ে তুললেন এবং ইচ্ছা প্রকাশ করলেন নীল মাধব কে প্রতিষ্ঠিত করবেন তার মন্দিরে এবং নীল মাধবের সন্ধানে রাজা লোক পাঠালেন চারিদিকে, নেতৃত্বে রাজার বিশ্বস্ত লোক বিদ্যাপতি|এক জঙ্গলে পথ হারিয়ে বিদ্যাপতি আশ্রয় নিলেন এক সবর রাজের গৃহে, বিবাহ করলেন তার কন্যা কে এবং একদিন আবিষ্কার করলেন যে বংশ পরম্পরায় এই সবর রাজের কাছেই আছে নীল মাধব, অনুরোধ করে তা তিনি দর্শন করলেন|এবং ঘটনা চক্রে এই খবর রাজার কানে পৌছালো|সবর রাজ তার ইষ্ট দেব কে ছাড়তে না চাইলেও স্বয়ং নীল মাধবের ইচ্ছায় তা রাজার হাতে তুলে দিতে সম্মত হলেন কিন্তু|কিন্তু হটাৎ অদৃশ্য হয় নীল মাধব এবং দৈব বাণী হয় যে সমুদ্রে ভেসে আসবে কাঠ তা দিয়ে বানাতে হবে বিগ্রহ|তাই হলো কিন্তু যতক্ষণ না বিদ্যাপতি ও সবর রাজ হাত মিলিয়ে চেষ্টা করলেন নাড়ানো গেলোনা সেই কাঠ|বৃদ্ধের বেশে রাজ সভায় একদিন হাজির হয়ে মূর্তি তৈরির ভার নিলেন স্বয়ং বিশ্ব কর্মা|শর্ত রইলো একুশ দিনের আগে কেউ মূর্তি দর্শন করবেন না|কাজ শুরু হওয়ার চোদ্দো দিনের দিন রানী গুন্ডিচার কৌতূহলে খুলে গেলো শিল্পীর রুদ্ধ দ্বার|দেখা গেলো অদৃশ্য হয়েছেন শিল্পী এবং রয়েছে অসমাপ্ত তিনটি মূর্তি|রাজা মর্মাহত হলেন কিন্তু দৈব বাণী এলো যে জগন্নাথ অর্থাৎ জগতের নাথ স্বয়ং ভগবান ওই বিশেষ রূপেই পূজিত হতে চান|ওই বিগ্রহই প্রতিষ্ঠিত হলো মন্দিরের|মনে করা হয় দীর্ঘ বিরতির পর শ্রী কৃষ্ণর বৃন্দাবন যাত্রাকেই উদযাপন করা হয় রথ যাত্রা পালনের মাধ্যমে|প্রথম ও প্রধান রথ যাত্রা নিঃসন্দেহে পালিত হয় জগন্নাথ ধাম পুরীতে|প্রথমে রাজ পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় ও পরবর্তীতে সরকার জনসাধারণএর উদ্যোগে প্রতি বছর পুরীতে ওই বিশেষ তিথী তে বিরাট আকারে পালিত হয় রথ যাত্রা|এই পরম্পরা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে| বোন সুভদ্রা ও দাদা বলরাম বা বলভদ্রকে নিয়ে রথে চড়ে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের পত্নী গুন্ডিচারবাড়ি যান। সেখান থেকে সাতদিন পরে আবার নিজের মন্দিরে ফিরে আসেন। এই যাওয়াটাকেই জগন্নাথের মাসির বাড়ি যাওয়া বলে। রথের দিন তিনটি রথ পর পর যাত্রা করে মাসির বাড়ি। প্রথমে যায় বলরামের রথ, তারপর সুভদ্রা এবং সবশেষে জগন্নাথের রথ। রথে চড়ে এই গমন ও প্রত্যাগমনকে সোজা রথ এবং উল্টোরথ বলে|তিনটি রথ থাকে যাদের প্রত্যেকের নিজস্ব বৈশিষ্ট আছে|জগন্নাথের রথের নাম কপিদ্ধজ বলরামের রথের নাম তালধ্বজ ও সুভদ্রার রথের নাম দর্পদলন|এই রথ নির্মানে কোনো আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি ব্যবহার হয়না এবং বংশ পরম্পরার কারিগররা সকল নিয়ম নিষ্ঠা ও প্রথা মেনে রথ প্রস্তুত করেন|আজও পুরীর বর্তমান রাজা সোনার ঝাড়ু ব্যবহার করে রথের যাত্রার আগে তার পথ পরিষ্কার করে থাকেন|প্রচলিত বিশ্বাস রথে পুরীতে বৃষ্টিপাত হবেই|রথ যাত্রার সাথে জড়িয়ে আছে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যর ও তার সনাতন গোস্বামীর ন্যায় তার পার্শদদের অনেক গল্প এবং পরবর্তীতে তাদের অনুপ্রেরণায় গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ ও কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘ গোটা বিশ্বে সফল ভাবে ছড়িয়ে দেয় রথ যাত্রার মহিমা|আজ বাংলার নানা স্থানে বিরাট আকারে রথ যাত্রা উৎসব পালন হয় যার মধ্যে মাহেশের রথ যাত্রা বিশেষ উল্লেখযোগ্য|যাত্রা শব্দের প্রকৃত অর্থ গমন তাই জগন্নাথের রথযাত্রা এবং উল্টোরথ হিন্দু-বাঙালিদের কোনও কাজ বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সূচনার পবিত্র দিন হিসেবে গণ্য করা হয়| বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব দূর্গাপূজোর সূচনাও হয় এই রথ কিংবা উল্টোরথের দিন|করোনা থাকার ফলে এবছর পুরী সহ সর্বত্র রথ যাত্রা অনুষ্ঠিত হবে কিছু বিধি নিষেধ বজায় রেখে তবে ধর্মীয় আবেগ ও নিষ্ঠার কোনো অভাব নেই প্রভুর অগনিত ভক্ত ও অনুরাগীদের মধ্যে|রথ যাত্রা থেকে উল্টোরথ অবধি চলতে থাকবে প্রভু জগন্নাথ ও তার লীলা প্রসঙ্গ নিয়ে ধারাবাহিক লেখা |পড়তে থাকুন|আপনাদের সবাইকে রথ যাত্রার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

পুরান কথা – মহা প্রসাদ কি জানুন

যারা পুরীতে গেছেন তারা হয়তো দেখেছেন জগন্নাথ দেবের মন্দিরের পাশে বিমলাদেবীর মন্দির আছে। সেখানে জগন্নাথের প্রসাদ প্রথমে দেবী পার্বতীকে অর্পন করা হয়। পরে সেই মহাপ্রসাদ সবাইকে বিতরন করা হয়।আজ জানাবো কি ভাবে সৃষ্টি হলো এই মহা প্রসাদ ও কেনো তা আগে বিমলাদেবীর মন্দিরে নিবেদন করা হয়|নারদ মুনির একবার বাসনা হলো যে তিনি ভগবান নারায়নের প্রসাদ পেতে চান যার উপর অধিকার আছে শুধু মা লক্ষীর নারদ মুনি লক্ষীদেবী কে প্রসন্ন করার হেতু তপস্যা শুরু করলেন এবং ১২ বছর তপস্যার পর দেবী লক্ষী প্রসন্ন হলেন এবং নারদ মহা প্রসাদের ভাগ চাইলে লক্ষীদেবী বললেন ঠিক আছে তুমি এখানে অপেক্ষা কর, নারায়নের ভোজনশেষে তার অবশেষ প্রসাদ তুমি পাবে। অবশেষে যখন নারদ মুনি সেই প্রসাদ পেলেন এবং তা গ্রহন করে তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন|শিব তখন নারদ মুনিকে তার আনন্দের হেতু জানতে চাইলেন।নারদ মুনি তখন সবিস্তারে সব বর্ননা করলেন। তা শুনে শিবের ও ইচ্ছা হলো যে সেও নারায়নের প্রসাদ পেতে চান। নারদ মুনি বললেন যে তিনি সব খেয়ে ফেলেছেন কিন্তু নারদ মুনি তার হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলেন যে হাতের একপাশে একবিন্দু প্রসাদ লেগে আছে। শিবজী সেটা জল দিয়ে ধুয়ে গ্রহন করলেন। সেই চিন্ময় প্রসাদের এমনই স্বাদ ছিল যে ওইটুকু খেয়েই শিব আনন্দে তান্ডব নৃত্য শুরু করে দিলেন।সব জানতে পেরে মাতা পার্বতী বললেন তিনিও নারায়নের প্রসাদ পেতে চান। কিন্তু এখনতো আর কোন ভাবে সম্ভব না। পার্বতী দেবী অভিমান করলেন এবং মাতা পার্বতী নারায়নের ধ্যান শুরু করলেন। দেবী পার্বতীর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে নারায়ন তাকে দর্শন দেন এবং বললেন বলো পার্বতী তুমি কি বর চাও। উত্তরে পার্বতী বললেন আমি আপনার মহা প্রসাদ চাই তবে হে ভগবান সন্তানদের রেখে আপনার প্রসাদ শুধু আমি একা পাব তা কখনই হতে পারে না।তাই আপনার মহাপ্রসাদ যাতে জগতের সবাই পায়,সেটাই আমার প্রর্থনা।উত্তরে ভগবান বললেন- কলিকালে আমি যখন জগন্নাথদেব রুপে লীলা করব তখন আমি আকাতরে আমি আমার মহাপ্রসাদ বিতরন করব। সেই প্রসাদ প্রথমে তোমাকে দেয়া হবে,পরে তা জগতের সবাইকে দেয়া হবে।পুরীতে পার্বতী দেবীই বিমলা দেবী রূপে বিরাজ করছেন এবং এই কারনেই চলে আসছে এই রীতি|আরো অনেক শাস্ত্রের কথা ও পৌরাণিক তথ্য নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

পুরান কথা – বজরংবলী ও অষ্ট সিদ্ধি

হনুমানজী হলেন শিবজীর অবতার পুরানে বলা রয়েছে দেবী সীতার আশীর্বাদে তিনি অষ্ট সিদ্ধি ও নব নিধীর অধিকারী ছিলেন|হনুমান চালিসাতেও অষ্ট সিদ্ধির কথা উল্লেখ আছে|আজ জানাবো কি এই অষ্ট সিদ্ধি|সিদ্ধি লাভ করে কোন ব্যক্তি মহাজাগতিক শক্তির অধিকারী হন অষ্ট সিদ্ধি হলো আটটি অলৌকিক গুন|তার এই আটটি অলৌকিক ক্ষমতা হলো|অণিমা : এই সিদ্ধি লাভে সাধক তার শরীরকে অত্যন্ত ছোট করার ক্ষমতা রাখে। এক অনুর ন্যায় সাধক তার শরীর ছোট করতে পারে। হনুমানজীও তাঁর এই অণিমা সিদ্ধির দ্বারা লঙ্কাপুরী নিরক্ষণ করেন এবং সেখানে প্রবেশ করেন। মহীমা : এই সিদ্ধিটি উপরের অণিমা সিদ্ধির একদম বিপরীত। এই মহীমা সিদ্ধিতে সাধক তার শরীরের আকৃতি পাহাড় সমান বড় করতে পারে। এই সিদ্ধির মাধ্যমে হনুমানজী তার শরীর একশত যোজন বড় করতে পারতেন|গরীমা : গরীমা সিদ্ধির প্রয়োগে সাধক তার তার নিজের ইচ্ছা অনুসারে দেহের ওজন বাড়াতে পারে। হনুমানজীর এই সিদ্ধির প্রয়োগ আমরা মহাভারতে দেখতে পাই। তিনি ভীমের অহম চূর্ণ করবার জন্য এই সিদ্ধির প্রয়োগ করেছিলেন এবং শক্তিমান ভীম তার লেজ সরাতে ব্যার্থ হয়ে ছিলেন|লঘিমা : এই সিদ্ধি উপরের গরীমা সিদ্ধির একবারে বিপরীত সিদ্ধি। এতে সাধক তার শরীরের ওজন তার মনের ইচ্ছা অনুসারে লঘু অর্থাৎ কম করতে পারে। অশোকাবাটিকাতে সীতা মাতা যখন রাক্ষসী ও রাবণ সেণার পরিবেষ্টিত ছিলেন তখন তিনি গাছের পাতায় বসে নিজের দেহের ওজন হাল্কা করে সেই জায়গার নিরীক্ষণ করে ছিলেন হনুমান|প্রাপ্তি : এই সিদ্ধি লাভে সাধক ভবিষ্যত দ্রষ্টা হতে পারেন এবং পশু পাখি জীব জন্তুর ভাষা বোঝার ক্ষমতা লাভ করে। হনুমানজী রাবণ দ্বারা সীতা হরণের পর সীতা মাতার খোঁজ করতে গিয়ে অনেক পশু পাখি ও জীব জন্তুর কাছে সীতা মাতার খোঁজ করেন।প্রাকাম্য : অষ্ট সিদ্ধির মধ্যে ষষ্ঠ সিদ্ধি হল প্রাকাম্য। এই সিদ্ধি বলে সাধক যেকোন জায়গায় যাবার ক্ষমতা লাভ করে। এর প্রভাবে সাধক আকাশে উড়তে পারে, পাতালের কেন্দ্রে পর্যন্ত যেতে পারে। জলে জীবিত থাকতে পারে, সাধক চিরকাল যুবক থাকতে পারে এবং যেকোন দেহ ধারন করতে পারে।মহাবীর হনুমান রামায়নে একাধিকবার এই শক্তি প্রয়োগ করছেন|ঈশিত্ব : এই সিদ্ধি হল নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা। যে সাধক এই সিদ্ধি লাভ করেন তিনি দক্ষ নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা পায়। হনুমানজীও এই সিদ্ধির কার্যকরীতায় বানর সেনাকে সঠিক নেতৃত্ব দান করেন এবং শ্রীরাম চন্দ্রের জয় সুনিশ্চিত করেন। এছাড়াও এই সিদ্ধি প্রাপ্ত হওয়াতে সাধক কোন মৃত জীবের প্রান ফেরত দিতে পারে। বশিত্ব : এই সিদ্ধি লাভে সাধক জিতেন্দ্রিয় হয়। অর্থাৎ সাধক তার ইন্দ্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারে। সাধক পশু পাখি এমনকি মানুষেকে নিজের বশে আনতে পারে।বজরংবলী এই বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন|সংক্ষেপে এই ছিলো অষ্ট সিদ্ধি|আগামী পর্বে এমনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে ফিরে আসবো|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

পুরান কথা – ভক্তের সাথে জগন্নাথের লীলা

শাস্ত্র মতে জগন্নাথ হলেন স্বয়ং ভগবান|তিনিই জগতের নাথ|তার মন্দির নিয়ে যেমন রয়েছে অসংখ্য অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ তেমন তার নিজের বহু লীলা আলোচনায় উঠে আসে বার বার এমনই এক লীলার কথা আজ বলবো|অত্যন্ত দরিদ্র এক ব্যক্তি সদা ভগবানের চিন্তা, ভজন, কীর্তন, স্মরণ, সৎসঙ্গ করত। একদিন সেই ব্যক্তি তার মনিবের কাছে, শ্রীজগন্নাথ ধাম যাত্রার জন্য ছুটি চাই। শেঠজী ছুটি দিল আর সেই ব্যক্তিকে বলল, “ভাই আমি তো সংসারী মানুষ, সবসময়ই ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকি তার কারণে কখনো তীর্থযাত্রার সুযোগ হয় না। তুমি তো যাচ্ছো এই ১০০ টাকা আমার নামে প্রভু জগন্নাথের চরণে সেবায় সমর্পিত করে দিও।” সেই ব্যক্তি টাকাটা নিয়ে জগন্নাথ দর্শনে যাত্রা শুরু করল।অনেকদিন পায়ে হেঁটে যাত্রা করে সে জগন্নাথ পুরী পৌঁছাল। মন্দিরে যাওয়ার সময় সে রাস্তায় দেখল অনেক সাধুসন্ত,ভক্তজন, বৈষ্ণবজন, হরিনাম সংকীর্তনে খুব আনন্দ করছিল। তাড়া সবাই ছিলো খুব ক্ষুধার্ত। সে এই ক্ষুধার্ত ভক্তদের দেখে চিন্তা করল, “শেঠজী আমাকে যে টাকা দিল তার থেকে ভক্তদের ভোজনের ব্যবস্থা করি।” সে ব্যক্তি ঐ ১০০ টাকা থেকে ভোজনের ব্যবস্থা করল। সবাইকে ৯৮ টাকা দিয়ে ভোজন করালেন। সকলে খুব তৃপ্ত হলেন। তার কাছে শুধু দুই টাকা আছে, সে ভাবল “এই দুইটাই আমি জগন্নাথের চরণে শেঠজীর নামে সমর্পণ করব। যখন আমি শেঠের কাছে পৌছাব। তখন আমি বলব শেঠজীকে আমি টাকা সমর্পন করেছি। শেঠজী তো জিজ্ঞাসা করবে না যে ১০০টাকা আমি জগন্নাথের চরণের সমর্থন করেছি কিনা। শেঠজী বলবে টাকা সমর্পণ করলে। আমি হ্যাঁ বললে ওটা তো মিথ্যা বলা হবে না এবং কাজও হয়ে যাবে।” ভক্ত সেই ব্যক্তি আকুল মনে জগন্নাথজীর দর্শন করল মন্দিরে প্রবেশ করল। শ্রীজগন্নাথদেবের দর্শন করে জগন্নাথজীর চরণে সেই দুটাকা দিয়ে বলল, এই দুইটাকা আমার শেঠজী দিয়েছে।আশ্চর্য জনক ভাবে সেই রাতে শেঠজী স্বপ্ন দেখল শ্রীজগন্নাথজীকে। জগন্নাথ তার স্বপ্নে এসে বলল শেঠজীকে, “তোমার ৯৮ টাকা আমি পেয়েছি। ” এই বলে শ্রী জগন্নাথজী অন্তর্ধান হয়ে গেলেন।কিছুদিন পর সেই ব্যক্তি তীর্থ করে ফিরে আসল| শেঠজী তখন তাকে জিজ্ঞাসা করল “আমার টাকা জগন্নাথজীকে সমর্পন করেছ তো?” ভক্ত বলল, ” হে শেঠজী টাকা আমি সমর্পণ করেছি।” শেঠজী বলল, “কিন্তু তুমি তো ৯৮ টাকা কেন দিলে, দুই টাকা কি কাজে খরচ করলে? ” তখন ভক্ত চিন্তা করলছিল শেঠজী কিভাবে জানল, ভক্ত তখন সকল কথা খুলে বলল শেঠজীকে। বলল,” সে ৯৮ টাকা দিয়ে ভক্ত সাধুসন্তদের সেবা করেছে ।আর দুই টাকা শুধু প্রভু জগন্নাথের চরণে সমর্পন করেছে ” শেঠজী সকল কথা শুনে বড় খুশি হল এবং তার চরণ স্পর্শ করে বললো ” তুমি ধন্য তোমার জন্য আমি শ্রীজগন্নাথদেবের দর্শন ঘরে বসে পেলাম।”প্রভু জগন্নাথের এই লীলা থেকে বোঝা যায় ভগবান ঐ ৯৮ টাকা স্বীকার করল কারণ ওটা যে ভক্তের সেবাতে লেগেছে। কারণ, ভক্তের হৃদয়ে ভগবানের বাস। যে দুইটাকা চরনে দেয়া হলো ঐ টাকাটার কোন মূল্য নেই প্রভুর কাছে।রথ যাত্রা উপলক্ষে প্রভু জগন্নাথে প্রসঙ্গে আরো আলোচনা থাকবে আগমনী পর্ব গুলিতে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

জগন্নাথ লীলা – কাঁঠাল চুরি

পুরী সহ গোটা বিশ্বে চলছে রথ যাত্রার প্রস্তুতি|আজ প্রভু জগন্নাথের একটি বিশেষ লীলা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করবো|পুরীতে একবার ভগবান শ্রীজগন্নাথ তার এক ভক্ত রঘুর কাছে এলেন এবং তাঁকে রাজার বাগান থেকে কাঁঠাল চুরি করতে তাঁর সঙ্গে যেতে বললেন। রঘু বলল, “তুমি কেন কাঁঠাল চুরি করতে চাও? তোমার যদি কাঁঠাল খাবার ইচ্ছা হয়, আমাকে বল-আমি তোমার জন্য সুন্দর একটি কাঁঠাল এনে দেব।” বালকরূপী জগন্নাথ বললেন, “এইভাবেই আমি আমার ভক্তের কাছ থেকে সবকিছুই নিয়ে থাকি। বস্তুত, আমার সবকিছুই আছে। মা যশোদা আমাকে কত ননী-মাখন খাওয়াতো, আমাকে আনন্দ দিত। কিন্তু তবুও আমি অন্যদের বাড়িতে মাখন চুরি করতে যেতাম। চুরি করা দ্রব্য ভোজনে বিশেষ আনন্দ আছে। আজ তোমাকে আমি উপলব্ধি করাব-চুরি করা কি আনন্দের। আমার সঙ্গে এসো।” রঘু বুঝলো এ প্রভুর লীলা|নিরুপায় হয়ে রঘু প্রভুর প্রস্তাবে সম্মত হল এবং তাঁর সঙ্গ নিল। তাঁরা উভয়ে চুপিসারে রাজার বাগানে প্রবেশ করলেন। জগন্নাথ রঘুকে বললেন, “তুমি গাছে চড়বে। আমি মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকব। তুমি সবচেয়ে সুন্দর ও বড় কাঁঠালটি পাড়বে এবং মাটিতে ফেলবে। আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকব। তারপর আমরা উভয়ে কাঁঠাল নিয়ে পালাব।” রঘু যথাযথভাবে প্রভুর নিদের্শ অনুসরণ করল। রঘু কাঁঠাল গাছে উঠে সবচেয়ে বড় ও ভাল কাঁঠালটি খুঁজে বের করল এবং সেটা পাড়ল। ‘জগন্নাথ’, চাপাস্বরে রঘু জগন্নাথকে ডাকল। ‘তুমি কি তৈরি?’ জগন্নাথ উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি তৈরি, নিচে ফেল !’ রঘু কাঁঠাল নিচে ফেলল- জগন্নাথ সেটা ধরবেন ভেবে। কিন্তু কোথায় জগন্নাথ ! তিনি ইতিমধ্যেই বাগান থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। কাঁঠাল ধরার জন্য কেউই সেখানে ছিল না। সশব্দে কাঁঠালটি মাটিতে পড়ে ফেটে চৌচির হল। যখন রাজার বাগানের মালী ঐ শব্দ শুনল,রঘু ধরা পড়লো এবং রাজার কাছে খবর গেলো|রাজা তাঁর মন্ত্রীদের সাথে নিয়ে মালীর নির্দেশিত স্থানে গেলেন। তিনি রঘু দাসকে গাছে চড়ে থাকতে এবং নিচে কাঁঠাল পড়ে থাকতে দেখে আশ্চর্য হলে। রাজার অনুরোধে রঘু গাছ থেকে নেমে এল। রাজা রঘুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রভু, তোমার যদি কাঁঠাল খাওয়ার ইচ্ছা হয়ে থাকে, তাহলে গভীর রাত্রে আমার বাগানে এসে গাছে চড়ার কি প্রয়োজন ছিল? তুমি আমাকে একবার বলতে পারতে। আমি কাঁঠাল পাড়ার ব্যবস্থা করে তোমার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতাম!’ রঘু তখন প্রভু জগন্নাথ কিভাবে তাঁকে ঠকিয়েছে- সব বৃত্তান্ত বলল। প্রত্যেকেউ প্রভুর রম্য এই লীলা শুনে খুবই আনন্দ পেল এবং সকলেই হাসতে লাগল। তাঁরা রঘুর মহত্ত্বের জন্য তাঁর গুনগান করলেন।সখ্যরসে এই ভাবে প্রভু জগন্নাথ রঘুর সঙ্গে অনেক লীলা করেছিলেন।আবার ফিরে আসবো এমনই অন্য কোনো ঘটনা নিয়ে পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

তারাপীঠ মহা শ্মশানের রহস্য

আগামী 28 তারিখ অমাবস্যা|স্বাভাবিক ভাবেই তন্ত্র ও শক্তি সাধনার উপযুক্ত তিথি|আজ তারাপীঠের কিছু রহস্যজনক বিষয় আপনাদের সামনে উপস্থাপন করবো|বাংলার তন্ত্র সাধনায় তারাপীঠ একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে যুগ যুগ ধরে আর এই তন্ত্র সাধনায় পঞ্চমুন্ডির আসনের একটা বড়ো ভূমিকা থাকে, তারাপীঠের পঞ্চমুণ্ডের আসন একটি রহস্যময় বিষয়। পঞ্চ মুন্ডির পাঁচটি মুণ্ড সাপের, ব্যাঙের, খরগোশের, শিয়ালের এবং মানুষের। এই আসনে বসেই বহু যুগ পূর্বে দেবীকে তুষ্ট করে তারাপীঠকে সিদ্ধপীঠে পরিণত করেছিলেন ঋষি বশিষ্ঠ। সাধক বামাখ্যাপাও এই আসনে বসে তন্ত্রসাধনায় সিদ্ধি লাভ করেন অর্থাৎ|সেই আসন আজও বিদ্যমান।অশুচি চিত্তে আসনে বসেছিল বসলে সাধক শাস্তি পায় বলে বিশ্বাস|দেবী তারার রূপের মধ্যে লুকিয়ে আছে বহু রহস্য এবং তারাপীঠ মহা শ্মশান ও রহস্য দিয়ে ঢাকা|তারাপীঠ শ্মশান দেবী তারার আবাস। তারাপীঠের মহাশ্মশানেও জ্যোতিরূপে বাস করেন দেবী। তা ঠিক যেন একটি তারার মিটমিটে আলো|দেবীর সঙ্গে থাকেন যোগিনীরা। অনেকেই তারাপীঠের মহাশ্মশানে অন্ধকারের মধ্যে এই মিটমিটে আলো দেখতে পান। লোকবিশ্বাস বলে, সেই আলো দেখে কাছে যেতে নেই। তাতে দেবী রুষ্টা হন! দেবীর উপস্থিতিই এই শ্মশানের তিন মহারহস্যের মধ্যে প্রথম।তারাপীঠের মহাশ্মশানের মাহাত্ম্য বুঝতে গেলে তাকাতে হবে তারার তন্ত্রোক্ত রূপবর্ণনায়।দেবীর বামপদ অগ্রগামী, তাই দেবী ‘বামাকালী’ নামেও পরিচিতা।দেবীর গাত্রবর্ণ ঘননীল। অগ্নিময় শ্মশানে জ্বলন্ত চিতার মধ্য থেকে বিনির্গতা এই দেবী লোলজিহ্বা, লম্বোদরী, নবযৌবনা এবং মুণ্ডমালিনী। দেবীর আসনস্বরূপ জ্বলন্ত চিতা জ্ঞানাগ্নির প্রতীক। চতুর্ভুজা এই দেবীর ডানদিকের উপরের হাতে খড়্গ এবং নিচের হাতে কাটারি। বামদিকের উপরের হাতে পদ্মফুল এবং নিচের হাতে নরকপাল। দেবীর কটিদেশ ব্যাঘ্রচর্মে আবৃত। দেবীর মস্তকে ‘পঞ্চমুদ্রাবিভুষিত’ পিঙ্গলবর্ণের একজটা। ‘পঞ্চমুদ্রা’ অর্থাৎ শ্বেত অস্থি নির্মিত চারটি পটি দিয়ে ত্রিকোণাকারে গাঁথা পাঁচটি নরকরোটি। মু্ণ্ড জ্ঞানের প্রতীক। এখানে পঞ্চমুণ্ড শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধের প্রতীক।তারাপীঠের মহাশ্মশানের আরো একটি রহস্য লুকিয়ে আছে শ্মশান-সংলগ্ন দ্বারকা নদীর জলে।দ্বারকা নদী উত্তরবাহিনী অর্থাৎ এর স্রোত বইছে উত্তর দিকে। হিন্দু ধর্মে উত্তরবাহিনী নদী বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কেন না, ভারতের প্রায় সব নদীই নেমেছে উত্তর দিকে স্থিত হিমালয় থেকে। অতএব, তাদের ধারা কখনই উত্তর অভিমুখী হবে না। হলে তা বইবে উল্টো খাতে। একমাত্র কাশীতে গঙ্গা উত্তরবাহিনী। আর বীরভূমে দ্বারকা। তাই দ্বারকা নদী মহাশক্তির উৎস। কথিত আছে এই নদীজলে স্নান করলেই সিদ্ধিলাভের যোগ্যতা অর্জন করেন মানুষ। ফিরে আসবো আগামী পর্বে আরো অনেক রহস্য ও পৌরাণিক তথ্য নিয়ে|আগামী অমাবস্যায় অর্থাৎ 28 তারিখ থাকছি এই তারাপীঠে সেই মহাযজ্ঞ ও আপনারা দেখতে পাবেন যথা সময়ে পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|