গুরু কথার আজকের পর্বে যে গুরুর কথা বলবো তিনি শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর যার সন্যাস জীবনের পূর্বের নাম ছিলো রাম চন্দ্র চক্রবর্তী|১৮৬০সালে বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলয় শ্রীঁরাধামাধব চক্রবর্তী ও শ্রীমতি কমলাদেবীর সন্তান হিসাবে শ্রীশ্রী রামঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন|রাম ঠাকুরের আরেক যমজ ভাই ছিলো তার নাম ছিলো লক্ষণ|তাদের পারিবারিক গুরু ছিলেন শ্রীঁমৃত্যুঞ্জয় ন্যায়পঞ্চানন|বালক রামচন্দ্র শৈশব থেকেই আধ্যাত্মিক চেতনার অধিকারী ছিলেন|শাস্ত্রে তার খুব আগ্রহ ছিলো মাঝে মাঝেই ঈশ্বর চিন্তা করে তিনি ভাব তন্ময় হয়ে যেতেন |ঈশ্বরে কে কেন্দ্র করে নানা আধ্যাত্মিক প্রশ্ন তার মনে ঘুরপাক খেতো এই ঈশ্বরের খোঁজেই ১৮৭২ সালে সকলের অজ্ঞাতে অজানাকে জানার লক্ষ্যে গৃহত্যাগী হন|পরে পৌঁছান পৌঁছালেন আসামের শ্রীশ্রী কামাক্ষ্যাদেবীর মন্দিরে এবং এক অক্ষয় তৃতীয়ার দিন শ্রীশ্রী রামঠাকুর দেখেন জটাধারী, দীর্ঘাঙ্গী এক জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ সামনে দাঁড়িয়ে|গুরু হিসাবে তিনি সেই দিব্য পুরুষ কে গ্রহন করলেন শুরু হলো তার সাধনা ও আধ্যাত্মিক যাত্রা|কঠিন সাধনায় একসময় তিনি হয়ে উঠলেন অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন রাম ঠাকুর ও অষ্টসিদ্ধি লাভ করলেন তিনি |এরপর গুরুর এদেশে গৃহে ফিরে মাতৃ সেবা কর্ম জীবনে কিছুকাল নিজেকে নিয়োজিত করলেন|এসবের মধ্যে থেকেও তার আধ্যাত্মিক শক্তি ও জ্ঞান গোপন রইলো না বেশি দিন|পরবর্তীতে নিজেকে পুরাপুরি সপেঁ দেন জগৎ কল্যানে ও মানব সেবায়|তার কাছে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শুচি, অশুচির কোনও ভেদ ছিল না|জীবনের দীর্ঘ সময় কঠিন যোগ সাধনায় মগ্ন থেকেও ভক্ত দের তিনি নিঃস্বার্থ ভাবে জীব সেবা করতে শিখিয়ে গেছেন|তার জীবন ও দর্শন তার অগণিত ভক্ত ও শিষ্য দের কাছে এক আদর্শ স্বরূপ|শ্রী শ্রী রামঠাকুর রামঠাকুর অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, তিনি একই সাথে দুই স্থানে থাকতে পারতেন, মানুষের মনের কথা পড়তে পারতেন, অদৃশ্য হতে পারতেন|তার এক শিষ্য একবার শ্রীশ্রী রামঠাকুরকে প্রশ্নকরেছিলেন,আচ্ছা মানুষ কি নিজ শরীর এবং পরিহিত বস্ত্রাদি সহ শূন্যে এক স্থান থেকে আর এক স্থানে চলে যেতে পারেন ? তো রামঠাকুর উত্তর দিয়েছিলেন, “হ্যাঁ যে যে স্থান দিয়ে বিদ্যুৎ যেতে পারে, মানুষ ঐ সব স্থান দিয়ে যেতে পারে, এবং একই সময় বহু স্থানে উপস্থিত থাকে পারে।”শ্রীশ্রী রামঠাকুরের নির্দেশে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ১৯৩০ সালে কৈবল্যধাম আশ্রম এবং ১৯৪২ সালে কলকাতার যাদবপুরে কৈবল্যধাম আশ্রম তৈরি হয় যেগুলি তার ভক্ত ও শিষ্য দের কাছে আজ তীৰ্থ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে|এছাড়াও ১৯৪৩ সালে তার জন্মভিটা ডিঙ্গামানিক গ্রামে সত্যনারায়ণ সেবা মন্দির তৈরি হয় যা তার আদর্শ কে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে চলছে|মহা মানব ও মহান গুরু শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের চরনে আমার শত প্রনাম জানিয়ে শেষ করছি আজকের গুরু কথা|দেখা হবে আগামী পর্বে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
গুরু কথা – মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য
গুরুপূর্ণিমা উপলক্ষে ধারাবাহিক ভাবে শুরু করেছিলাম গুরু কথা যা আপাতত চলবে সারা সপ্তাহ ধরে|ভারতের মহান সাধক ও আধ্যাত্মিক গুরু দের কথা বলা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি বাংলার নবজাগরনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ও মহান সাধক শ্রী চৈতন্যদেবের কথা না বলা হয় কারন তিনি ছিলেন প্রকৃত গুরু যিনি গোটা বিশ্ব কে বৈষ্ণব আদর্শ শিখিয়েছিলেন, শিখিয়েছেন হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপের মাহাত্ম্য|প্রথমে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ ও পরবর্তীতে ইস্কন সেই শিক্ষা ও আদৰ্শকে এগিয়ে নিয়ে গেছে|ইংরেজির 1486 সালের এক দোল পূর্ণিমায় বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার তৎকালীন পীঠস্থান নবদ্বীপে জন্মে ছিলেন গৌরাঙ্গ যিনি কৃষ্ণ সাধনায় নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে বিলিয়ে দিয়ে হয়ে উঠলেন মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য|নিম গাছের ছায়ায় তিনি জন্মে ছিলেন তাই নাম রাখা হয়ে ছিলো নিমাই|শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবন নিয়ে হয়েছে নানা গবেষণা ।মহাপ্রভুর জীবনের কিছু অলৌকিক ঘটনা|সচি মাতার গর্ভে তার জন্ম, অকালে পিতৃ বিয়োগ,টোলে শিক্ষা দান, লক্ষী প্রিয়া এবং বিষ্ণু প্রিয়ার সাথে তার বিবাহ, পরবর্তীতে গয়ায় যাত্রা, সন্ন্যাস ও পুরী ভ্রমণ সারা বাংলায় কৃষ্ণ প্রেমের প্রচার এবং শেষে রহস্যময় অন্তর্ধান, এসবই হয়তো আপনারা জানেন, আগেও কোথাও শুনেছেন বহুবার|আজ মহাপ্রভুর জীবনের কিছু বিশেষ বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা আজ উল্লেখ করবো |বহু দূর দূর থেকে চৈতন্য দেবের ভক্তরা আসতেন তার সাথে দেখা করতে, এমনই একবার চৈতন্য দেবের সাথে সাক্ষাত করার জন্য সুদূর বৃন্দাবন থেকে নবদ্বীপ ধামে এসেছেন সনাতন নামে এক ব্যাক্তি।সারা দেহে খোস পাঁচড়া নিয়ে রোগ যন্ত্রণায় কাতর হয়ে তিনি মনে মনে স্থির করেছেন চৈতন্য দেবের সাথে দেখা করে আগামী রথযাত্রায় রথের চাকার তলায় আত্মহত্যা করবেন।একদিন চৈতন্যদেবের সাথে সনাতন গল্প করছিলেন। হটাৎ চৈতন্য দেব, সনাতনকে বললেন – সনাতন,আত্মহত্যার সংকল্প ত্যাগ কর। আত্মহত্যা মহাপাপ। এতে কখনো কৃষ্ণ প্রাপ্তি হয়না।অবাক হয়ে গেলেন সনাতন। আত্মহত্যা করার কথা কাউকে জানাননি। তাহলে কী করে চৈতন্য দেব এই কথা জানলেন। এই ভাবেই অপরের মনের কথা জানতে পারতেন চৈতন্য মহাপ্রভু|আরো আশ্চর্য জনক ঘটনা হলো এর কিছুদিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেন সনাতন|এর জন্য কোনো চিকিংসা করতে হয়নি।এবং আত্মহত্যার ভূত মাথা থেকে একদম মুছে যায়|আরেকটি ঘটনার কথা বলা যায়,একবার মহপপ্রভু শ্রীনিবাস ঠাকুরেরর বাড়িতে এক অপূর্ব অলৌকিক লীলা প্রদর্শন করেন। তখন প্রবলভাবে সংকীর্তন হচ্ছিল। তিনি ভক্তদের জিজ্ঞাসা করলেন যে, তাঁরা কি খেতে চান, এবং তাঁরা জানালেন যে, তাঁরা আম খেতে চান, তখন তিনি আমের আটি চাইলেন। তখন আমের সময় ছিল না, আঁটিটি যখন তাঁর কাছে আনা হল, তখন তিনি সেটি শ্রীনিবাস ঠাকুরের অঙ্গনে পুঁতলেন এবং তৎক্ষণাৎ সেই আঁটিটি অঙ্কুরিত হয়ে ক্রমন্বয়ে বর্ধিত হতে লাগল। অচিরেই সেটি একটি আম গাছে পরিণত হল এবং সেই গাছে এত সুপক্ব আম ধরল যে, ভক্তরা তা খেয়ে শেষ করতে পারলেন না। গাছটি শ্রীনিবাস ঠাকুরের অঙ্গনেই রইল এবং ভক্তরা সেটি থেকে তাঁদের যত ইচ্ছে আম নিয়ে খেল। ভক্তরা মহাপ্রভুর এই অপ্রাকৃত লীলা দেখে মুগ্ধ হলো|সেই অদ্ভুত আমাগাছ গাছ আজও শ্রীনিবাস গৃহের উঠোনে বর্তমান|আরো একটি ঘটনা বিশেষ ভাবে স্মরণীয়|নিত্যানন্দ একবার জগাই ও মাধাই নামক নদীয়ার দুই পাপিষ্ঠ ব্রাহ্মণকুমারকে উদ্ধার করতে চাইলেন। সে লক্ষ্যে তিনি অনেক ভক্তদের সাথে নিয়ে নাম-কীর্তন করতে করতে জগাই-মাধাইয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। জগাই-মাধাই সূরা পান করে ঘুমাচ্ছিলেন। নাম-কীর্তন শুনে তাদের ঘুম ভাঙায় তারা খুব বিরক্ত হলেন। নিত্যানন্দ বারংবার তাদেরতে হরিনাম করার অনুরোধ করলেন। মাধাই তখন ক্রোধান্বিত হয়ে নিকটস্থ একটি ভাঙ্গা কলসির টুকরা দ্বারা নিত্যানন্দকে আঘাত করল। ফলে নিত্যানন্দের কপাল কেটে রক্ত ঝরতে লাগল। চৈতন্যদেব খবর পেয়ে ঐ স্থানে ছুটে আসলেন। তিনি জগাই-মাধাই শাস্তি দেয়ার জন্য সুদর্শন চক্রকে স্মরণ করলেন। কিন্তু নিত্যানন্দ তাঁকে নিরস্ত করলেন।নিত্যানন্দের উদারতা ও মহত্ব দেখে জগাই-মাধাইয়ের বোধোদয় হয়। অবশেষে গৌর-নিতাইয়ের পরশে জগাই-মাধাই শুদ্ধ বৈষ্ণবভক্তে পরিণত হয়|মহা প্রভুর মাত্র আটচল্লিশ বছরের জীবন কালে এমন অনেক অলৌকিক ঘটনা আছে বলতে গেলে একটি পর্বে সম্ভব নয়|তিনি ছিলেন প্রকৃত গুরু যিনি সমগ্র বৈষ্ণব সমাজ কে একত্রিত করে তাদের পথ দেখিয়েছেন|আজ এই মহান গুরু মহাপ্রভুকে আমার শ্রদ্ধা ও প্রনাম জানিয়ে গুরু কথা থেকে বিদায় নেবো|চলতে থাকবে গুরু কথা পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
গুরু কথা – শ্রী শ্রী সীতারামদাস ওঙ্কারনাথ
ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হচ্ছে এই গুরু শিষ্য পরম্পরা|আর এই পরম্পরা বা ঐতিহ্য কে উদযাপন করার দিন হচ্ছে গুরু পূর্ণিমা|আজ 13 জুলাই এবছর গুরু পূর্ণিমা পালন হচ্ছে |আর এই বিশেষ সময়ে আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরছি আমাদের হাজার হাজার বছরের এই গুরু শিষ্য ঐতিহ্যর নানা দিক, ব্যাখ্যা করছি গুরুতত্ব কে নিজের মতো করে আর লিখছি জগৎ বিখ্যাত কিছু গুরুর কথা|আমাদের দেশের এমনই এক পরম শ্রদ্ধেয় ও মহাজ্ঞানী গুরু ছিলেন ঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কার নাথ দেব|আজ এই মহান গুরুর জীবন নিয়ে কিছু কথা বলবো|ইংরেজিরা 1891 সালে হুগলীর ডুমুর দহে প্রান হরি চট্টোপাধ্যায় ও মালতি দেবীর গৃহে জন্মায় এক শিশু নাম রাখা হয় প্রবোধ চন্দ্র|শৈশব থেকেই কিছুটা ভাবুক প্রকৃতির ছিলেন প্রবোধ চন্দ্র, ঈশ্বর চিন্তায় মগ্ন থাকতেন |পরবর্তীতে শিক্ষাগুরু ও সাধক দাশরথি মুখোপাধ্যায়ের কাছে দীক্ষা নিলেন|শিক্ষাগুরু হলেন দীক্ষাগুরু। প্রবোধচন্দ্রের নাম হলো ‘সীতারাম’|গঙ্গা যমুনা সঙ্গম এ রাম নাম মন্ত্রে তার দীক্ষা হয়েছিলো|আত্মীয় স্বজন রা তাকে গৃহী দেখতে চেয়েছিলো তাই ঠাকুরচরণ ভট্টাচার্য্যের কন্যা সিদ্ধেশ্বরী দেবীর সঙ্গে তার বিবাহ দিলেন|কিন্তু ক্রমে আধ্যাত্মিক ভক্তির সমুদ্রে ডুবে যেতে থাকেন সীতারাম দাস ওঙ্কার নাথ এবং দুই সন্তান এর জন্মের পর ঘর ছেড়ে সন্যাসী হয়ে বেড়িয়ে পড়লেন তিনি|সর্বত্র রাম নাম প্রচার করতেন তিনি|ক্রমেই এক দিব্য ও অলৌকিক শক্তি উৎপন্ন হয় তার মধ্যে|সারা ভারত পরিক্রমা করে ১৯৩৬ সালের পৌষ মাসে সীতারাম ফিরে এলেন তাঁর দীক্ষালাভের স্থান ত্রিবেণীতে এবং স্থাপন করলেন একটি মঙ্গলঘট|এরপর বস্ত্র ত্যাগ করে কৌপিন পরিহিত সন্ন্যাসী রূপে পদার্পন করেন নিজের জন্ম স্থানে|ততো দিনে তিনি এক আধ্যাত্মিক শক্তি সম্পন্ন মহাপুরুষ|রাম নামের প্রচারে সপেঁ দিয়েছেন জীবন|অসংখ্য ভক্ত শিষ্য তার অনুগামী|লিখেছেন ১৫০ টি গ্রন্থ ও প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন ভাষার ১৩ টি পত্রপত্রিকা|প্রথমদিকে নাম প্রচার করলেও সীতারামদাস কাউকে আক্ষরিক অর্থে মন্ত্রদীক্ষা দিতেন না। কিন্তু শোনা যায়, পুরীতে তাঁর জগন্নাথের বিশেষ দর্শন ঘটেছিল। তিনি নাকি সাধারণকে মন্ত্রদীক্ষা দিতে জগন্নাথ কর্তৃক আদিষ্ট হয়েছিলেন|তার পরই তিনি দীক্ষাদান শুরু করেন। এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে তিনি দীক্ষা দেন। তিনি ছিলেন এক প্রকৃত সাধক ও আদর্শ গুরু যিনি তার ভক্ত ও শিষ্য দের আধ্যাত্মিক পথে চলতে শিখিয়েছেন,ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে জীবন উৎসর্গ করতে ও দেশকে ভালো বাসতে শিখিয়েছেন|১৯৮২ সালের ৫ ডিসেম্বর তিনি পরলোক গমন করেন|দেশ ও সারা বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা তার অগণিত ভক্ত শিষ্য আজও তার আদৰ্শ কে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে|গুরু পূর্ণিমার এই বিশেষ সময় এই গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা আমার অন্তরের শ্রদ্ধা রইলো|প্রনাম জানাই এই মহান সাধক কে|আজকের গুরু কথা শেষ করবো শ্রী শ্রী সীতারাম দাস ওঙ্কার নাথ এর চরনে আমার প্রণাম ও শ্রদ্ধা জানিয়ে|আপনাদের সবাইকে গুরুপূর্ণিমারা শুভেচ্ছা জানাই|গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে সারা সপ্তাহ ধরে চলবে গুরু কথা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
গুরু কথা – ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব
গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে দেশের আধ্যাত্মিক গুরুদের নিয়ে যে আলোচনা শুরু করেছি তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি প্রেমের ঠাকুর ও বাংলার আধ্যাত্মিক জগতের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব প্রসঙ্গে না বলি|গুরু পূর্ণিমার ঠিক আগে আজ বলবো এই মহান গুরুর কথা|ইংরেজির ১৮৩৬ সালে একটি সাধারণ বাঙালি গ্রামীণ পরিবারে জন্মগ্রহণকারী রামকৃষ্ণ ছিলেন একজন যোগসাধক, দার্শনিক ও ধর্মগুরু। তিনি উনিশ শতকের এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি বাঙালি নবজাগরণে এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। তার গর্ভে থাকাকালীন তার বাবা-মা তার অলৌকিক উপস্থিতি অনুভব করেছিলেন এবং যেমনটি প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তিনি শৈশবকালেই রহস্যময় ও অলৌকিক শক্তির অভিজ্ঞতা অর্জন শুরু করেছিলেন। শ্রী রামকৃষ্ণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসেছিলেন তার লীলা করতে, পরমহংসদেব যখন জগৎ সমক্ষে উদয় হন, তখন ঘোরতর ধর্মবিপ্লব চলছে চারপাশে, “জড়বাদী মুক্তকণ্ঠে বলছেন – “জড় হইতেই সমস্ত,জড়ের সংযোগেই আত্মা, জড় ব্যতীত আর কিছু নাই “ব্রাহ্ম সমাজ বলছে – “বেদ, বাইবেল, কোরান প্রভৃতি কিছুই মানিবার আবশ্যক নাই, কোনটিই অভ্রান্ত নয়, কোনটিই ঈশ্বর বাক্য নয়”এমন সময় পরমহংসদেব প্রচার করলেন “কোন ধর্ম কোন ধর্মের বিরোধী নয়। বাহ্য দৃষ্টিতেই বিরোধ কিন্তু সকল ধর্মই মূলত এক কথা বলেআরো সহজ করে বললেন ” যত মত ততো পথ “কথিত আছে, ঠাকুর যখন জন্মগ্রহন করেছিলেন, কামারপুকুর বাটিতে তাদের শিব মন্দির চন্দ্রালোতে আলোকিত হয়ে উঠেছিল। রামকৃষ্ণদেবের গড়নে ছিল দৈবিকভাব|সেটাই স্বাভাবিক, তিনি কোনো স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন না, একাধারে সাধক ও দার্শনিক এই মানুষ টাকে হয়তো এখনো বাঙালি ঠিক চিনে উঠতে পারেনি, তার অবতার তত্ত্ব নিয়েও দ্বিমত আছে, তবে, সাধনার যে উচ্চস্তরে তিনি গিয়েছিলেন তা, কল্পনা করা কঠিন|তার দক্ষিনেশ্বর মন্দিরে থাকা কালীন অদ্ভুত এক অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছিলেন ঠাকুর|দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক মথুর বিশ্বাস একবার রামকৃষ্ণের কাছে আব্দার করেন যে, ঠাকুরের যেমন ভাবসমাধি হয়, তেমনই ভাবসমাধির অভিজ্ঞতা লাভ করতে চান তিনিও। ঠাকুর মথুরবাবুকে বিরত করার অনেক চেষ্টা করেন। কিন্তু মথুরবাবু নাছোড়। শেষে ঠাকুর বাধ্য হয়ে বলেন, ”ঠিক আছে, মা-কে বলব, তিনি যা করার করবেন।” এর কয়েকদিন পরেই সমাধিস্থ হন মথুরবাবু। তাঁর চোখ থেকে অবিরল ধারায় ঝরতে থাকে জল। সেই অবস্থায় ঠাকুরকে দেখে তাঁর পা জড়িয়ে ধরেন মথুর। গদগদ কন্ঠে বলেন, ”এ কী করলে ঠাকুর! আমার যে বিষয়কর্ম কিছুতেই মন বসে না আর। আমাকে মুক্তি দাও এ থেকে।” ঠাকুর হেসে বললেন, ”আগেই বলেছিলেম, ভাবসমাধি সকলের সয় না।” মথুরবাবু বুঝলেন কি অদ্ভুর ক্ষমতার অধিকারী ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব ১৮৬১ সাল থেকে ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত মহিলা সাধু এবং ভৈরবী ব্রাহ্মণীর কাছ থেকে তন্ত্র পদ্ধতি শিখেছিলেন। রামকৃষ্ণ তন্ত্রের ৬৪ টি সাধনা পূরণ করেছিল|১৮৬৪ সালে তোতাপুরী নামক জনৈক পরিব্রাজক বৈদান্তিক সন্ন্যাসীর কাছ থেকে রামকৃষ্ণ সন্ন্যাস গ্রহণ করেন|পরবর্তীতে বিদায় বেলায় তোতাপুরী আবার তার এই শিষ্যের কাছে দীক্ষা গ্রহন করেন|গুরু শিষ্য পরম্পরার এ এক বিরল ঘটনা|বেশ অল্প সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ১৮৭৯ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নিজের প্রধান শিষ্যদের সঙ্গে রামকৃষ্ণ পরমহংসের সাক্ষাৎ হয়। এঁদের অনেকেই ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত। কেউ আবার ছিলেন একান্তই নাস্তিক|নিছক কৌতূহলের বশেই তাঁরা শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশ এঁদের সকলের মধ্যেই গভীর প্রভাব বিস্তার করে এবং এঁরা সকলেও তাঁর অনুরাগী ভক্তে পরিণত হন। প্রবল যুক্তিবাদী সুরেন্দ্রনাথ মিত্র তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন,তাকে সমালোচনা করার জন্যে|কিন্তু শেষপর্যন্ত তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের একনিষ্ঠ ভক্তে পরিণত হন। তাঁর অননুকরণীয় ধর্মপ্রচারের ভঙ্গি অনেক সংশয়বাদী ব্যক্তির মনেও দৃঢ় প্রত্যয়ের উন্মেষ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল|তাই তিনি সব সমালোচনারা উর্ধে এবং ভারতের শ্রেষ্ট গুরুদের একজন|ঠাকুর রামকৃষ্ণের চরনে প্রণাম জানিয়ে গুরু কথার আজকের পর্ব এখানেই শেষ করছি|চলতে থাকবে গুরু কথা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
গুরু কথা – শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর
আসন্ন গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে শুরু করছি গুরু কথা আজ শুরুতে থাকবে এক মহান আধ্যাত্মিক গুরুর জীবন কাহিনী|গুরু কথার প্রথম পর্বে শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর|অবিভক্ত বাংলার গোপালগঞ্জ জেলার সফলাডাঙ্গা গ্রামে 1812 ক্রিস্টাব্দর 11 মার্চ যশোমন্ত ও অন্নপূর্ণা দেবীর গৃহে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন কলি যুগের এই অন্যতম শ্রেষ্ট মহাপুরুষ|তার পরিবার ছিলো নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব পরিবার|ফলে শৈশব থেকেই শাস্ত্র পাঠ ও ধর্ম আলোচনার প্রতি তার এক গভীর আগ্রহ ও নিষ্ঠা বর্তমান ছিলো|যত বয়স বাড়তে লাগলো শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের মধ্যে এক ঐশরিক শক্তির বিকাশ হতে থাকলো|যথাযত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তিনি একজন জ্ঞানী শাস্ত্রজ্ঞ ও বৈষ্ণব শাস্ত্রে অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন|মূলত প্রেম-ভক্তির কথা সহজ-সরলভাবে প্রচার করতেন তিনি|পরবর্তীতে তার প্রচলিত সাধন পদ্ধতি মতুয়াবাদ রূপে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে|তিনি মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রান পুরুষ|সারা জীবন তিনি উৎসর্গ করেন মতুয়া আদর্শের প্রচারে এবং প্রসারে|তিনি মনে করতেন ঈশ্বর প্রাপ্তির জন্য সন্ন্যাস নেয়ার প্রয়োজন নেই অন্তরে শ্রদ্ধা ও ভক্তি থাকলে এবং নিষ্ঠা সহকারে ঈশ্বর চিন্তা করলে গৃহীরও ঈশ্বর লাভ সম্ভব|নানা শ্রেণী ও জাতি তে বিভক্ত হিন্দু সমাজ কে তিনি ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন মতুয়াবাদের দ্বারা|তৎকালীন হিন্দু সমাজের অসংখ্য নিপিড়িত, দরিদ্র ও তথা কথিত নিম্ন শ্রেণীর মানুষ দের তিনি পরম স্নেহে বুকে টেনে নিয়েছিলেন এবং তাদের সার্বিক উন্নতি সাধনই ছিলো তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য|আজ দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মতুয়াদের কাছে শ্রী শ্রী হরিচাঁদ চাঁদ ঠাকুর কলি যুগের শেষ এবং শ্রীহরি-র পূর্ণ অবতার|যথার্থ অর্থেই তিনি পতিতপাবন|শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরে তার জীবনে অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছেন|ঠাকুর হরিচাঁদ তাঁর বাল্য সখাদের নিয়ে মাঠে গরু চড়াতেন এবং সেই সময়ে খেলার ছলে গোপালের ব্রজলীলার ন্যায় লীলা ও কার্যকলাপ প্রকাশ পেতো। বিষধর সাপ ধরে খেলানো, গরুদের ডাকা মাত্র ছুটে আসা,মৃত পশু কে জীবন দান প্রভৃতি লীলা দেখে সাধারন মানুষ বলতো, হরিচাঁদ অলৌকিক ও দৈব্য শক্তির অধিকারী ।পরবর্তীকালেও তিনি অনেক অলৌকিক লীলা করেছেন । হীরমনের রাম-রূপ দর্শন, ঠাকুর হরিচাঁদের সহিত গোস্বামী লোচনের মিলন, গোস্বামী গোলকচাঁদের চতুর্ভূজ রুপ দর্শন, শ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের পদে রামচাদের পদ্ম দর্শন, কলমদাস বৈরাগীকে কৃষ্ণ রুপ দেখানো ইত্যাদি আরো অসংখ্য ঘটনা ঠাকুরের অলৌকিক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় ।শোনা যায় তার মুখের কথায় কত অপুত্রক পুত্র পেয়েছে , কত মৃত ব্যাক্তি প্রাণ ফিরে পেয়েছে,কত অন্ধ ফিরে পেয়েছে তার দৃষ্টি শক্তি, কত রোগী রোগ মুক্ত পেয়েছে তার হিসেব নেই আজও|যে অলৌকিক ঘটনাগুলি উল্লেখ করলাম সেগুলি শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত গ্রন্হে ঠাকুরের অলৌকিক লীলা প্রসঙ্গে লিপিবদ্ধ আছে|শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ৫ মার্চ ১৮৭৮ সালে ৬৫ বছর বয়সে মর্তলোক ত্যাগ করেন|তার মহা প্রয়ানের পর তার পুত্র শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর মতুয়া সমাজের উন্নতি সাধনে ব্রতী হন|আজও বংশ পরম্পরার শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরহরিচাঁদ ঠাকুরের সুযোগ্য বংশধরেরা মতুয়া সমাজ কে নেতৃত্ব দান করে চলেছেন|আজ অসংখ্য মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁরঠাকুরবাড়ি ও মতুয়া ধাম একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে|প্রতি বছর চৈত্র মাসে মতুয়া ধামে মতুয়া মহামেলা বসে যাতে অংশগ্রহণ করেন অগুনতি মানুষ| এই সময়ে ভক্তরা কামনা সাগর’-এ ডুব দিয়ে পুণ্যস্নান করেন|ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য কোনো গুরুর কথা নিয়ে|আজ এই মহান গুরুর শ্রী চরনে আমার শতকোটি প্রণাম জানিয়ে শেষ করছি আজকের গুরু কথা|চলতে থাকবে গুরু কথা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
সাধক কথা – শ্রী শ্রী ভবা পাগলা
সামনেই গুরু পূর্ণিমা, আমাদের দেশে অদ্ভুত প্রতিভা সম্পন্ন বহু গুরু ও সাধক সাধিকা জন্মেছেন যাদের সম্পর্কে অনেক কিংবদন্তী ও লোককথা প্রচলিত আছে, ধারাবাহিক ভাবে এমন কিছু গুরু ও সাধক সাধিকা দের নিয়ে বলবো আগামী কিছুদিন গুরুর কথা|আজ শুরু করবো শ্রী শ্রী ভবা পাগলা কে দিয়ে|ভারতের সাধকদের মধ্যে যারা সঙ্গীত ও আধ্যাত্মিকতা এক সূত্রে গেথে ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ভবেন্দ্র মোহন সেন ওরফে ভবাপাগলা, তিনি ছিলেন পাগল সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং বহু মানুষ তার আদর্শে দীক্ষিত হয়ে তার চরনে নিজেদের জীবন সমর্পন করেছেন|ভবা পাগলার জন্ম আনুমানিক ১৮৯৭ খৃস্টাব্দে বাংলাদেশে, তার পিতার নাম গজেন্দ্র কুমার সাহা, পারিবারিক সূত্রেই ভবা ছিলেন কালী সাধক|পরবর্তীতে দেশ ভাগ হলে ভবাকে চলে আসতে হয় ভারতে, সেখানেও তার সঙ্গে ছিলো একটি কালী মূর্তি,থাকতে শুরু করেন শোভাবাজার অঞ্চলে এক ভক্তের গৃহে, সেখান থেকেই ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়তে থাকে তার গান ও অলৌকিক কীর্তি|শৈশব থেকেই ভবা ছিলেন ভাবুক প্রকৃতির ও সর্বদা কালী সাধনায় মগ্ন,প্রথা গত শিক্ষা খুব বেশি না থাকলেও আধ্যাত্মিক ভাবে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন ভবা পাগলা|ভবা পাগলার সহজাত প্রতিভা ছিলো গান লেখার ও সুর করার, প্রায় ছেয়াশি হাজার সংগীত রচনা করেছিলেন ও তাতে সুর দিয়েছিলেন,ভবা পাগলা, শ্যামা সংগীত বা ভক্তি গীতিই ছিলো তার সংগীতের প্রধান ভিত্তি|কালী সাধনার মাধ্যম হিসেবে সংগীত কে তিনি সফল ভাবে ব্যবহার করে ছিলেন এবং হয়ে উঠেছিলেন একজন সিদ্ধ পুরুষ|তার গান ” বারে বারে আর আসা হবেনা ” আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে|হালকা পাতলা গড়ন, গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, চিবুকে এক গোছা দাড়ি, এই অতি সাধারণ চেহারার ভবাপাগলার মধ্যে ছিলো অসীম আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও বিশাল অলৌকিক ক্ষমতা, যা বার বার ধরা দিয়েছে তার নানান কর্ম কাণ্ডে, শোনা যায় একবার এক দুরারোগ্য ব্যাধি তে আক্রান্ত ব্যাক্তি কে অলৌকিক ভাবে সুস্থ করে দিয়েছিলেন ভবাপাগলা|আরো এমন বহু অলৌকিক কীর্তি আছে তার সারা জীবনে|নিজের জীবদ্দশায় প্রায় সাতটি কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি|এই মহান সাধক ১৯৮৪ খৃস্টাব্দে দেহ ত্যাগ করেন, আজও তিনি স্মরণীয় তার অলৌকিক কীর্তি ও তার গানের জন্যে|এই মহান কালী সাধককে আমার শ্রদ্ধা ও প্রনাম জানিয়ে শেষ করছি আজকের লেখা|চলতে থাকবে এই ধরবাহিক লেখা লেখি|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – গুন্ডিচা মন্দির
রথ যাত্রার সূচনা যেমন হয় স্নান যাত্রা দিয়ে তেমনই সমাপ্তি হয় উল্টো রথ দিয়ে আর এই উল্টো রথ প্রসঙ্গে বার বার আলোচিত হয় গুন্ডিচা ম্পন্দিরের কথা|উল্টো রথে নয় দিন পর গুন্ডিচা মন্দির থেকে নিজ মন্দিরে ফিরে আসেন জগন্নাথ দেব|গুন্ডিচা মন্দির ভ্রমণকেই আবার মাসির বাড়ি যাওয়া মনে করেন অনেকে। গুণ্ডিচা মন্দির জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি বা বাগানবাড়ি নামেও পরিচিত। মন্দিরটি একটি স্বর্গীয় বাগানের মাঝে অবস্থিত। শ্রীজগন্নাথদেবের মূল মন্দির তথা “শ্রীমন্দির”-এর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে গুন্ডিচা মন্দির।বছরের অন্যান্য সময়ে মন্দিরটি প্রায় শূণ্য থাকে। রথযাত্রার ঠিক একদিন আগে থেকে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার থাকার উপযুক্ত করে তোলার জন্য ধর্মীয়ভাবে গুণ্ডিচা মন্দির সংস্কার করা হয় এবং আষাঢ় মাসের রথযাত্রার সাতদিন যাবৎ এই গুণ্ডিচা মন্দিরেই জগন্নাথ বলরাম ও সুভদ্রার আরাধনা করা হয়।আসলে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের স্ত্রীছিলেন গুণ্ডিচা।রাণী গুণ্ডিচার নামেই সংশ্লিষ্ট মন্দিরটি নির্মিত যা নিয়ে প্রচলিত রয়েছে একটি পৌরাণিক ঘটনা|দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা জগন্নাথ মূর্তি তৈরি করার সময় রাণী গুণ্ডিচা বন্ধ দরজার বাইরে থেকে নিষেধ অমান্য করে উঁকি মারেন এবং জগন্নাথের মহিমায় মুগ্ধ হয়ে তার জন্য একটি পৃথক মন্দির তৈরী করবেন ঠিক করেন|পরবর্তীতে জগন্নাথদেব তার জন্য তৈরি মন্দির দেখে সন্তুষ্ট হন ও রানী গুন্ডিচার ভক্তিতে প্রসন্ন হয়ে রাণী গুণ্ডিচাকে আশ্বস্ত করেন যে তিনি তার বাড়ীতে আসবেন। যেটি বর্তমানে গুণ্ডিচা মন্দির নামে খ্যাত।গুন্ডিচা মন্দির ও জগন্নাথ দেবের সাতদিন এই মন্দিরে থাকা নিয়ে একটি শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা আছে|অনেকে মনে করেন জগন্নাথ দেব গুণ্ডিচা মন্দিরে সাত দিন থাকার সময়ে তার স্ত্রী দেবী লক্ষ্মীকে মূল মন্দিরের সংগ্রহকক্ষে বন্দিনী করে রেখে আসেন এবং গুণ্ডিচা মন্দিরে তিনি তার প্রিয় গোপীগণের সাথে সময় অতিবাহিত করেন এটি বৃন্দাবনে কৃষ্ণের রাসলীলার মতো একটি বিশেষ লীলা|অন্য একটি ব্যাখ্যা অনুসারে “গুণ্ডিচা” ছিলেন স্থানীয় দেবী লৌকিক দেবী যিনি মা শীতলার ন্যায় গুটিবসন্ত রোগ নিরামক। ওড়িয়া ভাষাতে “গুণ্ডি” শব্দটির অর্থ গুটিবসন্ত, যা বাংলা “গুটি” শব্দটি থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়। এবং বাংলার গুটিবসন্ত নিরাময়ের দেবী “গুটিকা ঠাকুরাণী” এবং ওড়িয়া “গুণ্ডিচা”কে একই ব্যাক্তিচৈতন্য মহাপ্রভু একবার রথযাত্রার আগের দিন গুণ্ডিচা মন্দির পরিষ্কার করার দায়িত্ব নেন। এই রীতিটি বর্তমানেও রথযাত্রার আগের দিন গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ পালন করে থাকেন।চলতে থাকবে পৌরাণিক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা ও ব্যাখ্যা|গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে ভারতের আধ্যাত্মিক গুরু ও তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সব ঘটনা নিয়ে ফিরে আসবো|পড়তে থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – সুভদ্রার আসল পরিচয়
বছরের এই সময়ে রথ যাত্রা উপলক্ষে শুধু জগন্নাথ নন দুই দাদা জগন্নাথ ও বলরামের সঙ্গে রথে চড়ে মাসির বাড়ি যান তাদের বোন সুভদ্রাও।কিন্তু আসলে কে এই সুভদ্রা ও কি তার আসল পরিচয় আজকের পর্বে সেই কথাই বলবো|সুভদ্রা মহাভারতের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আবার সুভদ্রার উল্লেখ বারবার পুরাণেও পাওয়া যায়। বীরযোদ্ধা অভিমন্যুর মা তিনি। রথযাত্রার আগে মহাভারত অনুসারে কৃষ্ণ ও বলরামের ছোট বোন সুভদ্রাকে বিয়ে করেছিলেন তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন। সুভদ্রা ও অর্জুনের পুত্র অভিমন্যু চক্রব্যুহ ভেদ করে সপ্তরথীর সঙ্গে একা বীরের মতো যুদ্ধ করে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। তবে শুধু কৃষ্ণ ও বলরামের বোন, অর্জুনের স্ত্রী এবং অভিমন্যুর মা এই পরিচয়ই সুভদ্রার জন্য যথেষ্ট নয় তার আরো একটি পরিচয় আছে|সুভদ্রা আসলে সেই যোগমায়া, যাঁকে তাঁর জন্মের রাতেই মায়ের কোল থেকে সরিয়ে এনে তুলে দেওয়া হয়েছিল কংসের হাতে। সদ্যোজাত কৃষ্ণকে রক্ষা করতে তাকে ঘাতকের হাতে তুলে দিয়েছিলেন কৃষ্ণর পিতা বসুদেব|শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে একই সময়ে নন্দ ও যশোদার ঘরে জন্মেছিলেন যোগমায়া|তিনি স্বয়ং দেবী পার্বতী। প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির সেই রাতে কৃষ্ণকে কংসের কারাগার থেকে সরিয়ে ফেলতে গোকূলে যান বসুদেব। সেখানে অচেতন যশোদার পাশ থেকে সদ্যজাত যোগমায়াকে সরিয়ে সেখানে কৃষ্ণকে রেখে আসেন তিনি। যোগমায়াকে নিয়ে কংসের কারাগারে ফিরে এসে দেবকীর পাশে শুইয়ে দেন।পরের ঘটনা কম বেশি সবাই জানেন কংস এসে যোগমায়াকে নিধন করতে উদ্যত হলে তাঁর হাত ছাড়িয়ে আকাশে মিলিয়ে যান তিনি। যাওয়ার আগে কংসকে এই বলে সতর্ক করে দিয়ে যান, ‘তোমারে বধিবে যে, গোকূলে বাড়িছে সে।’পরবর্তীতে তাই হয়েছিলো কৃষ্ণের হাতে পরাজিত ও নিহত হন কংস|পার্বতীর অংশ যোগমায়াই পরে বসুদেব ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী রোহিনীর সন্তান হয়ে জন্ম নেন। তখন তাঁর নাম হয় সুভদ্রা, কৃষ্ণ ও বলরামের আদরের বোন। পুরীতে কৃষ্ণ জগন্নাথ রূপে পূজিত তাঁর সঙ্গে থাকেন দাদা বলরাম ও বোন সুভদ্রা|আগামী পর্বে আরো একটি রথ যাত্রা বিষয়ক পর্ব নিয়ে ফিরে আসবো|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
মাহেশের রথের অলৌকিক ঘটনা
আজ বলবো বিখ্যাত মাহেশ এর রথের কথা|পুরীর পরেই শ্রীচৈতন্য ও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতি বিজড়িত দ্বিতীয় বৃহত্তম ও প্রাচীন রথোৎসব হয় শ্রীরামপুরের এই মাহেশেই।রাধারানী’ উপন্যাসে মাহেশের রথের কথা লিখেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।কবে কিভাবে শুরু হয়েছিলো এই প্রাচীন রথ যাত্রা তা সঠিক ভাবে জানা না গেলেও কিছু কিছু ইতিহাস জানা যায়|শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতম পার্ষদ কলকাতার শ্যামবাজার নিবাসী বলরাম বসুর পিতামহ ছিলেন কৃষ্ণরাম বসু। তিনি একটি সুদৃশ্য উচ্চ কাঠের রথ করিয়ে দেন মাহেশ রথ যাত্রার উদ্দেশ্যে ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে। কালের নিয়মে এটি নষ্ট হয়ে যায়। কৃষ্ণরাম বসুর পুত্র গুরুপ্রসাদ বসু। তিনি আবার রথটি নির্মান করে দিলেন ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে। এবার রথটি অগ্নিদগ্ধ হল। ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় একটি নতুন রথ নির্মান করিয়ে দিলেন কালাচাঁদ বসু। এক সময় ওই রথটিতে জনৈক ব্যাক্তি মারা যান গলায় দড়ি দিয়ে। ফলে অপবিত্র জ্ঞানে পরিত্যক্ত হল সেটি। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে আবার একটি রথ তৈরি করিয়ে দিলেন বিশ্বম্ভর বসু। এমনই কপাল জগন্নাথের, সেটিও একদিন অগ্নিদাহে ভস্মীভূত হল। এরপর আর কাঠের নয়, তৈরি হল লোহার রথ। বর্তমানে সেই রথই চলছে যা 1885 সালে নির্মিত হয়েছিলো|মাহেশের রথ নিয়ে একটি অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ আছে|শোনা যায় একবার রথ যাত্রার সময়ে স্থানীয় এক মিষ্টির দোকানে হাজির হলো এক বালক|সে জিলিপি খেতে চাইলো কিন্তু তার কাছে অর্থ নেই|বালক তার হাতের বালা খুলে তার বিনিময়ে জিলিপি ক্রয় করতে চাইলে দোকানদার প্রথমে রাজি হলোনা|পরে বালকের জেদের কাছে হার মানলেন তিনি এবং বালা নিয়ে জিলিপি দিলেন|বালক জিলিপি নিয়ে চলে গেলো|রথ যাত্রার সময় প্রধান পুরোহিত লক্ষ্য করলেন প্রভু জগন্নাথ এর হাতে একটি বালা নেই|চিন্তায় পড়লেন তিনি|অনেক ভেবেও বুঝতে পারলেন না কোথায় গেলো প্রভুর হাতের বালা|রাতে স্বয়ং জগন্নাথ তার স্বপ্নে দেখা দিলেন এবং বললে যে তিনি নিজে বালা জোড়া মিষ্টির দোকানে দিয়ে তার বিনিময়ে জিলিপি খেয়েছেন|পরদিন সকালে পুরোহিত লোক জন নিয়ে সেই মিষ্টির দোকানে গেলেন এবং বালা জোড়া উদ্ধার করলেন|সবাই অবাক হয়েছিলো প্রভু জগন্নাথ এর অদ্ভুত লীলার কথা জানতে পেরে|আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে প্রভু জগন্নাথ ও তার রথ যাত্রা নিয়ে আলোচনায়|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
জয় জগন্নাথ – নানাবেশে জগন্নাথ দেব
নানা সময়ে নানা বেশে সাজেন জগতের নাথ আজ সেই বেশগুলির কয়েকটি নিয়ে আলোচনা করবো|প্রাচীন গ্রন্থ মাদলা পাঞ্জিতে উল্লেখ আছে ১৪৬০ খ্রিস্টাব্দে ওড়িশার গজপতি রাজা কপিলেন্দ্র দেব দাক্ষিণাত্যের এক রাজার বিরুদ্ধে ভীষণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দীর্ঘ সংগ্রামের পর কপিলেন্দ্র যুদ্ধে জয়লাভ করেন। লুঠে আনেন ষোলটি হাতির পিঠ বোঝাই করে সহস্র মণ সোনা। সমস্ত সোনা রাজা কপিলেন্দ্র জগন্নাথদেবের মন্দিরের ভাণ্ডারে পাঠিয়ে দিলেন এবং জগন্নাথদেবকে তিনি ওড়িশার প্রকৃত রাজা বলে স্বীকার করলেন ও নিজেকে তাঁর অনুগত সেবক বলে ঘোষণা করলেন|অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই ক্ষমতা হস্তান্তর সর্বসাধারণের সম্মুখে উদযাপনের জন্য তিনি এই সময় জগন্নাথের ‘রাজবেশ’-এর প্রবর্তন করলেন। সাধারণের কাছে এই ‘বেশ’ আর একটি নাম পেল, তা হল, ‘বড়া তাধাও বেশ’।জগন্নাথদেবকে পুরীতে সাধারণ দিনগুলিতে যে বেশে দেখা যায়, সেই বেশ পরিচিত সাদা বেশ নামে। এরপর রাতে যে বেশে জগন্নাথ, বলরাম, শুভদ্রাকে রাখা হয় তার নাম বড়সিংহের বেশ। চন্দনলাগি বেশ শুরু হয় বৈশাখ জৈষ্ঠের সময়, এই সময় ভগবানকে চন্দনের প্রলেপে রাখা হয় এবং ৪২ দিন ধরে চলে এই উৎসব।জগন্নাথদেবের আরকেটি বিখ্যাত বেশ হলো হাতি বেশ|হাতিবেশ রথযাত্রার আগে স্নান যাত্রার সময় দেখা যায় । এই সময়ে গণপতির বেশে জগন্নাথকে সাজানো হয় বলে নাম ‘হাতি বেশ’। গণেশের বেশে স্নানযাত্রার পর উঠে আসেন জগন্নাথ।হাতি বেশের নেপথ্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা আছে|বহু শতক আগে পুরীর রাজার রাজদরবারে এসেছিলেন পণ্ডিত গণেশ ভট্ট। রাজা তাঁকে জহগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা দেখবার জন্য আহ্বান জানান। তবে তা দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলনা গনেশ ভট্টর। কারণ তাঁর আরাধনার দেবতা গণপতি স্বয়ং। কিন্তু স্নানযাত্রায় গিয়ে গণেশ ভট্ট আবিষ্কার করেন, যে যে বিষ্ণুর অবতার জগন্নাথের স্নান তিনি দেখছেন, তাঁর রূপ যেন হুবহু গণেশ! সমস্ত ঈশ্বর তাঁর কাছে একই মনে হতে লাগল। আর সেই ঘটনার পর থেকেই স্নান যাত্রায় জগন্নাথের বেশ হয় হাতিবেশ।পুরীর জগন্নাদেবের থের বিভিন্ন বেশের মধ্যে অন্যতম হল কালিয়াদলন বেশ। ভাদ্র একাদশীর দিন পুরীর জগন্নাথকে সাজানো হয় এই বিশেষ বেশে। যেভাবে শ্রীকৃষ্ণ দুর্দমনীয় রাক্ষস কালিয়াকে হত্যা করেছিলেন, সেই বেশেই এদিন সাজানো হয় জগন্নাথকে।আশ্বিনে যে নয়নাভিরাম বেশকর্ম শ্রীমন্দিরে অনুষ্ঠিত হয়, তার নাম ‘রাধা-দামোদর বেশ’।আশ্বিনের শুক্ল পক্ষের একাদশী তিথিতে শুরু হয়ে এই ‘রাধা-দামোদর বেশ’ কার্তিকের শুক্ল দশমী অবধি নিত্যই অনুষ্ঠিত হয়।জগন্নাথদেবের আরো একটি বেশ হলো পদ্মবেশ|মাঘ ও বসন্তের শনিবার ও বুধবার জগন্নাথ ধারণ করেন পদ্মবেশ।আগামী দিনেও ফিরে আসবো প্রভু জগন্নাথদেবের মহিমা বর্ণনা করতে| আলোচনা চলবে উল্টো রথ অবধি|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|