Home Blog Page 107

বাংলার ঐতিহাসিক পুজো – রাজা মান সিংহের আরাধ্যা দেবী

বাংলায় বারোয়ারী দূর্গা পুজোর সূচনা হয়েছিলো অনেক পরে প্রথমে দূর্গাপুজা শুরু হয় রাজ, জমিদার বা অভিযাত ব্যাবসায়ীদের বাড়িতে|তাই ঐতিহাসিক পুজো গুলির মধ্যে বেশি ভাগই প্রাচীন এই বনেদি বাড়ির পুজো|শুধু কলকাতায় নয় জেলার বহু পুজোর সাথে জড়িয়ে আছে বহু গল্প বহু ইতিহাস|এমনই এক পুজো বীরভূমে কীর্ণাহার এর ৩৫০ বছরের প্রাচীন দুর্গাপুজো|রাজা মান সিংহ এই পরিবারকে বীরভূমে জায়গীর প্রদান করেন। এবং তিনিই এই ‘সরকার’ উপাধিতে ভূষিত করেন।প্রাচীন এই জমিদার বাড়ির পুজোতে শুরুর দিন থেকে আজ পর্যন্ত একই রীতি চলছে|প্রতিপদ, দ্বিতীয়া এবং তৃতীয়ায় ৪০ কেজি চালের ভোগ দেওয়া হয়। এরপর চতুর্থী, পঞ্চমী এবং ষষ্ঠীতে ৬০ কেজি চালের ভোগ রান্না হয়। আর সবশেষে সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমী ৭০ কেজি থেকে ১ কুইন্টাল চালের ভোগ হয়।দেবী প্রতিমাতেও বিশেষত্ব আছে|সরকার বাড়ির দুর্গা দশভুজা হলেও তাঁর দুটি হাত বেশি বড়, বাকি ৮ হাত ছোট। তাছাড়া একমাত্র কার্তিকের ময়ূর ছাড়া আর কোনও বাহনকে দেখা যায় না। এমনকি দেবীর বাহন সিংহ-ও নেই, বদলে থাকে নরসিংহ। পুজোতে বলির প্রথা প্রচলিত। ছাগবলি এবং কুমড়ো বলি, দু’রকম বলি-ই হয়।পাশাপাশি দেবীর উদ্দেশ্যে মাছভোগ-ও নিবেদন করা হয়|রাজা মান সিংহের আরাধ্যা জগদ্ধাত্রী প্রতিষ্ঠিত এই বাড়িতে, আর তিনিই সরকারদের কুলদেবী।দুর্গাপুজো ঠিক বাড়ির ভেতরে হয় না‌। সামনেই একটি চণ্ডীমণ্ডপ, সেখানে হয়।রাজা মান সিংহের আরাধ্যা দেবী এই বাড়ির পুজোকে নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক ভাবে অন্য গুরুত্ব প্রদান করে আসছে|দশমীর বিসর্জনেও রয়েছে এক অদ্ভুত ও মজার রীতি রীতি। শোনা যায় বিসর্জনের আগে দেবীকে বহন করে নিয়ে যান এলাকার তথাকথিত নিন্ম বর্গের একটি বিশেষ জাতীর মানুষজন এবং তারা নাকি এ সময় নানা কুকথা বলতে থাকেন সরকার বাড়ির সদস্যদের উদ্দেশ্যে। কারন তারা এককালে জমিদারের প্রজা ছিলেন এবংঅতীতের জমিদারি প্রথার বিরোধিতা করতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন তারা । মজার বিষয় হল, বিসর্জন হয়ে যেতেই এরা রাতারাতি আমূল বদলে যান। সরকার বাড়ির সদস্যদের কাছে তারা ক্ষমা চান ও সৌজন্য বিনিময় করেন|জমিদার বাড়ির সদস্যরাও তাদের হাসি মুখে ক্ষমা করে দেন|বাংলার প্রাচীন ও ঐতিহাসিক এই পুজোয় মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বিদ্যাসাগর, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মনীষীরা এসেছেন । শোনা যায় এই বাড়িতে সাধক বামাক্ষ্যাপা-ও এসেছিলেন|বাংলার ঐতিহাসিক পুজো সংক্রান্ত আরো অনেক তথ্য নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

রানী রাসমনীর বাড়ির পুজো ও ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব

কলকাতার ঐতিহাসিক বা জমি দার বাড়ির পুজো গুলির কথা লিখতে গেলে সাধারণত দূর্গা পুজোর জাঁকজমক বা জৌলুস এবং আড়ম্বরের কথাই বেশি লিখতে হয়|কারন সেকালের এই পরিবার গুলোর মধ্যে দূর্গা পুজোকে ঘিরে এক ধরণের রেষারেষি বা প্রতিযোগিতা চলতো, যদিও ভক্তি বা নিষ্ঠার অভাব ছিলো না|তবে এই রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়ির পূজা গুলির মধ্যে একটি পরিবার ছিলো যারা বাহ্যিক জাঁকজমক থেকে নিষ্ঠা, সারল্য ও শাস্ত্রীয় আচরণকে বেশি গুরুত্ব দিতো|এই পুজো হতো কলকাতার জান বাজারের রানী রাশমনির পরিবারে|রানী রাসমণনীর বাড়ির পুজোর সাথে জড়িত আছে ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেবের নাম, রয়েছে অনেক গল্প|আজকের পর্বে রানী রাসমণির পরিবারের পুজো নিয়ে লিখবো|এই বাড়িতে দূর্গা পুজোর সূচনা করেন এই বংশের প্রাণপুরুষ ও রানী রাসমণির শশুর মশাই শ্রী প্রীতরাম দাস|তার পর পুজোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন পুত্র রাজেন্দ্র দাস এবং স্বামীর অবর্তমানে এই পরিবারের জমিদারি, ব্যবসা এবং দুর্গাপূজার দায়িত্বে আসেন রানী রাসমণি ও তার আমলে পুজোর শ্রী আরও বাড়ল|মনে করা হয় সেই সময়েই পুজোয় খরচ হত ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা|একবার বাবুঘাটে কলা বৌ স্নান করাতে যাওয়ার সময় রানী রাসমণির সাথে বিবাদ বাধে এক ইংরেজ সাহেবের|জল অনেক দূর গড়ায় এবং রানীকে পঞ্চাশ টাকা জরিমানাও করা হয়|কিন্তু দমবার পাত্রী ছিলেন না রানী রাসমণি|ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে তাদের উচিৎ শিক্ষা দিয়েছিলে তিনি এবং আরো বড়ো করে দূর্গা পুজোর আয়োজন করেছিলেন|বেগতিক দেখে পিছু হট তে বাধ্য হয়ে ছিলো ইংরেজরা|আরো একটি মজার ঘটনা ঘটেছিলো একবার এই বাড়ির পুজোয়|সেবার দূর্গা পুজো করতে এসেছিলেন স্বয়ং ঠাকুর রামকৃষ্ণ তবে ভিড় এড়াতে তিনি এক নারীর ছদ্মবেশ ধারন করেছিলেন|সখি বেশে চামর দুলিয়ে দূর্গাপুজো করেছিলেন রামকৃষ্ণদেব এবং জগদ্ধাত্রী পুজো অবধি তিনি এই বাড়িতেই ছিলেন|পুজো উপলক্ষে রানী রাসমণির পরিবারে কখনো বাই নাচ বা খানা পিনার আসর বসেনি সেই ভাবে তবে নিষ্ঠা ও ভক্তি সহকারে শাস্ত্রীয় পদ্ধতিতে মাতৃ শক্তির আরাধনার জন্য এই বাড়ির সুনাম ছিলো|পরবর্তীতে রানী রাসমণির জামাতা মথুর বাবু এই পুজোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন|বংশ পরম্পরায় সেই ঐতিহ্য আজও চলে আসছে|আজও এখানে সমান ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে দূর্গা পুজো অনুষ্ঠিত হয়|বাড়ির লোকেরা বিশ্বাস করেন দেবী এখানে সারা বছরই বিরাজ করেন|শোনা যায় এক কালে নাকি মধ্য রাত্রে, বাড়ির ঠাকুর দালানে দেবীর পায়ের নুপুরের শব্দও শোনা যেত|রাসমণি বাড়িতে কাঠামো পুজো হয় রথের দিন|প্রতিপদথেকে ঘরে পুজো শুরু হয়। ষষ্ঠীর দিন হয় বোধন এবং বেলবরণ। ওইদিনই দেবীর হাতে অস্ত্র দিয়ে গয়না পরানো হয়|সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমী এই তিনদিনই কুমারী পুজো হয়|এক কালে বলী প্রথা থাকলেও বলি বন্ধ হয়ে গিয়েছে বেশ কয়েকবছর|প্রথা মেনে এ বাড়িতে ভোগে দেবীকে লুচি ও পাঁচরকম ভাজা অর্পণ করা হয় আর থাকে নানা রকম মিষ্টি|থাকবে বনেদি বাড়ির পুজো, থাকবে থিম পুজো আর তার পাশাপাশি মহালয়া অমাবস্যা তিথিতে আপনাদের মা হৃদয়েশ্বরী সর্বমঙ্গলার মন্দিরে বিশেষ পুজো ও দোষ খণ্ডনের ব্যবস্থা থাকবে|দূর্গা পুজোও হবে প্রতিবারের ন্যায় নিষ্ঠার সাথে|পাশাপাশি ঐতিহাসিক পুজো নিয়ে আরো অনেক তথ্য নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

দেবী দুর্গার একত্রিশটি নাম

শাস্ত্রে দেবী দুর্গার একশো আটটি নামের উল্লেখ পাওয়া যায়|তার মধ্যে একত্রিশটি নাম ও তার অন্তর্নিহিত অর্থ আজ ব্যাখ্যা করবো|আর্যা : এটি মা দুর্গার কল্যাণময়ী রূপকে তুলে ধরে।ঐশানি : দেবী দুর্গার এই নামকে শক্তির প্রতীক মনে করা হয়।আদ্যা : এই নামের বেশ কিছু অর্থ আছে। প্রথমত আদি, এছাড়া এর আরও এক মানে পৃথিবী।অনিকা : দেবী দুর্গার এই নামে মায়ের অনুগ্রহ এবং প্রতিভা এবং সৌন্দর্য্য প্রকাশ পায়।বরুণি : এটি দেবী দুর্গার আরেক নাম এতে দেবী তেজ প্রকাশ পায়|ভার্গভী : এই নাম দেবী দুর্গার সর্বত সুন্দর এবং কমনীয় রূপকে তুলে ধরে।ভবানি : এই নামে দেবী দুর্গা ভব বা ভগবান শিবের ঘরণী।ভাব্য : এই নামের মধ্যে দিয়ে মায়ের সৌন্দর্য্য ও পবিত্রতাকে বর্ননা করা হয়।চণ্ডিকা : এটিও দেবীর আরেক নাম যা চন্দ্রর ক্ষুদ্র রূপে মাকে তুলে ধরে।চিতি : এই নামের অর্থ ঈশ্বরের উপহার।চিত্তরূপা : এই নামে দেবী সমগ্র সংসারের জন্য চিন্তাশীল।দক্ষণী : দক্ষ রাজের কন্যা হিসেবে দেবীর সতী রূপের নাম দক্ষিণী।দেবাশী : এই নামে দেবীকে দেবতাদের প্রধান রূপে বর্ণনা করা হয়।এশা : দেবীর পবিত্রতাকে এই নামে বর্ণনা করা হয়।গৌরি : দেবী পার্বতীর অপর নাম গৌরী এই নামে তিনি শিবের ঘরনী।গায়েত্রী : এটিও দেবী পার্বতীর একটি নাম যা ভারতে সকল বেদের মাতাএবং পরিত্রাণের স্তোত্রপাঠ হিসেবে বহুল প্রচারিত।হিমানি : হিমালয়ের কন্যা রূপে এটি দেবী পার্বতীর অপর নাম।ঈশা : এই নামের অর্থ যিনি সুরক্ষা প্রদান করেন।ইশি : এটি দেবী দুর্গার অপর নাম যার অর্থ চিরকালীন তারুন্য|জয়া : এর অর্থ হলো বিজয়। এটি দেবীর দুর্গা রূপের অপর নাম।জয়াললিতা : অর্থাৎ যিনি বিজয় লাভের জন্যই জন্মেছেন, মানে দেবী দুর্গা।কামাক্ষ্যা : দেবী এই নামে সকল ইচ্ছা ও কামনা পূরণ করেন।কৈশরী : দেবী পার্বতীর কৈশোর কালের নাম।কালাকা : দেবী দুর্গার এই নামের অর্থ চোখের তারারন্ধ্র মা নয়ন মনি কলাবতি : এই নামে দেবীর শিল্পসত্ত্বা প্রকাশিত।কন্যাকা : এই নামে দেবী কুমারী রূপে দর্শন দেন ।করলিকা : দেবীর এই নামের অর্থ যিনি ছিন্ন করতে পারেন।কাত্যায়নী : এই নামে দেবী লাল রঙের বস্ত্র পরিহিতা।কৌশিকী : দেবী দুর্গার অপর একটি নাম। এর অর্থ যিনি রেশমে আবৃতা।ক্রিয়া : এই নামের মধ্যে দিয়ে দেবীর কর্মদক্ষতা ফুটে ওঠে।কিরাতি : ভগবান শিব অর্থাৎ কীরাতেশ্বর এর ঘরণী রূপে দেবীর নাম কিরাতি।দেবী দূর্গা প্রসঙ্গে আরো অনেক কিছু বলার আছে তাই আসন্ন দূর্গা পুজো উপলক্ষে আরো অনেক এমন বিশেষ পর্ব আপনাদের জন্য নিয়ে আসবো|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধ ও দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা

আনুষ্ঠানিক ভাবে মহালয়ায় দেবী পক্ষের সূচনা হলেও বিশ্বকর্মা পুজো থেকেই আকাশে বাতাসে একটা পুজো পুজো গন্ধ পাওয়া যায়|উৎসবের সূচনা বলা যায় আজকের দিনটিকে|আজ বিশ্বকর্মাপুজোর দিনে প্রথমেই প্রনাম জানাই দেবশিল্পী বিশ্বকর্মাকে|প্রত্যক্ষ ভাবে না হলেও পরোক্ষ ভাবে দেবী দূর্গা কতৃক মহিষাসুর বধে বিশ্বকর্মার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে|বিষ্ণুপুরান অনুসারে সূর্যের তেজ ও রশ্মির ব্যবহার করে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা ত্রিশূল নির্মাণ করেন এবং তা শিবকে প্রদান করেন|এতে শিব ও তার অস্ত্র পান এবং সূর্যের তেজ কিছুটা কমায় বিশ্বকর্মার কন্যা এবং সূর্যপত্নী সংজ্ঞাও কিছুটা স্বস্তি পান|ত্রিশূল শুধু শিবের নয় দেবী দূর্গারও অস্ত্র কারন মহিষাসুর বধের জন্য বিভিন্ন দেবতা যখন দেবীকে বিভিন্ন অস্ত্রদান করেন তখন ভগবান শিব তাকে এই ত্রিশূলটি দান করেছিলেন,দেবী মহিষাসুরকে ত্রিশূল দিয়েই বধ করেন|দেবী দুর্গার অন্যতম প্রধান অস্ত্র সুদর্শনচক্র তৈরি করেছিলেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা, বৈষ্ণবরা বিশ্বাস করেন সুদর্শন চক্র ও বিষ্ণু এক এবং অভিন্ন|ভয়ংকর অসুররের কাছ থেকে সৃষ্টি কে রক্ষা করা হোক বা ক্রোধে উন্মত্ত মহাদেব কে শান্ত করতে সতীর দেহকে খণ্ডিত করা হোক সুদর্শন চক্র থাকে মুখ্য ভূমিকায়|প্রকৃত অর্থে সুদর্শন চক্র শুভ শক্তির প্রতীক যা অশুভ শক্তিকে বার বার পরাজিত করেছে|স্বয়ং বিষ্ণু দেবী দুর্গাকে অসুরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তার প্ৰিয় সুদর্শন চক্র দান করে ছিলেন|তার অন্য অন্য কীর্তি গুলি নিশ্চই আপনারা জানেন|রাবনের সোনার লঙ্কা থেকে জগন্নাথ বিগ্রহ কুবেরের অলকাপুরী থেকে ইন্দ্রের প্রাসাদ সবই তার সৃষ্টি|দেব শিল্পী বিশ্বকর্মাকে আমার প্রনাম ও শ্রদ্ধা জানাই|আপনাদের সবাইকে বিশ্বকর্মাপুজোর শুভেচ্ছা|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

সন্ধি পুজোর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

আপনারা নিশ্চই জানেন কুমারী পুজোর ন্যায় দূর্গাপুজোর অন্যতম অঙ্গ সন্ধি পুজো|শাস্ত্র মতে সন্ধি পুজোর আলাদা তাৎপর্য রয়েছে|আজকের পর্বে সন্ধি পুজো নিয়ে আলোচনা করবো|পড়তে থাকুন|দূর্গা পুজো প্রধানত তিনটি রীতিতে অনুষ্ঠিত হয় সাত্ত্বিক যেখানে, জপ, যজ্ঞ ও নিরামিষ ভোগ দ্বারা পূজা হয়|তামসিক, এতে জপ, যজ্ঞ ও মন্ত্র নেই। মদ, মাংস প্রভৃতি দ্বারা পূজা করা হয়|রাজসিক যাতে পশুবলি ও আমিষ ভোগ দ্বারা পূজা করা হয়|তিথি মেনে অষ্টমী তিথিতে হয় সন্ধি পুজো, সন্ধিপুজো আসলে অসুর নাশিনী দেবী দুর্গার আর এক অসুরদলনী রূপের পূজা। সেই দেবীর নাম ‘চামুণ্ডা’। অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে দেবী চামুণ্ডা চণ্ড ও মুণ্ড নামে দুই অসুরকে নিধন করেছিলেন। তাই অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে দেবী চামুণ্ডার পূজা করা হয়।অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথি শুরুর প্রথম ২৪ মিনিটকে বলা হয় সন্ধিক্ষণ। পুরাণ অনুসারে অসুরদের সঙ্গে যুদ্ধের সময়ে দেবী অম্বিকার কপালে থাকা তৃতীয় নেত্র থেকে দেবী কালিকা প্রকট হয়েছিলেন ঠিক এই সময়কালেই। আবার কিছু ক্ষেত্রে এমনটাও বলা হয়ে থাকে যে পরাক্রমী অসুর রক্তবীজের সমস্ত রক্ত এই সন্ধি মুহূর্তেই দেবী চামুণ্ডা কালিকা পান করেছিলেন। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায়, এই সন্ধিক্ষণ চলাকালীন সময়ে মা দুর্গার অন্তর থেকে সমস্ত স্নেহ, মমতা অদৃশ্য হয়ে যায়। সেই কারণেই সন্ধি পূজার সময়ে দেবীর দৃষ্টি পথ পরিষ্কার রাখা হয়, চামুণ্ডা দুর্গার চোখের সামনে দাঁড়াতে নেই।সন্ধিপূজা তান্ত্রিক মতে হওয়ার জন্য প্রাচীনকাল থেকেই সন্ধিপূজার সময় পশুবলি দেওয়ার প্রথা ছিল। পশুর মাংস, রক্ত ও সুরা উৎসর্গ করা হতো দেবী চামুণ্ডাকে। কিন্তু সেই প্রথা বর্তমানে অনেকটাই লুপ্ত হয়েএসেছে|সন্ধিপূজার সময় মায়ের পায়ে নিবেদিত হয় ১০৮ লাল পদ্ম। এই ১০৮ টি পদ্মের পিছনেও আছে একটি পৌরাণিক কাহিনি। কৃত্তিবাসের রামায়ণ থেকে জানা যায় অসুর নিধনকালে দেবী দুর্গার সারা অঙ্গ জুড়ে সৃষ্টি হয়েছিল ১০৮টি ক্ষত।সেই ক্ষত মেরামতের উদ্দেশ্যেই ওই পদ্ম নিবেদন করা|ত্রেতা যুগে লঙ্কেশ্বর রাবণকে বধ করার জন্য আশ্বিনমাসে দুর্গাপূজার আয়োজন বা অকালবোধন করেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র। সন্ধিপূজার শেষে শ্রীরামচন্দ্র দেবীর পায়ে ১০৮টি পদ্ম উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন।একটি পদ্ম কম পড়ায় নিজের একটি চোখ দিতে চেয়েছিলেন শেষে দেবী অবতীর্ন হয়ে তাকে বিরত করেন|আজও অনেক জায়গায় এই সন্ধিপূজার সময় বলি দেওয়ার প্রথা রয়েছে। বর্তমানে কোথাও কোথাও এখনো পশু বলি হয়| আবার যেখানে তা হয় না সেখানে প্রথা মেনে কলা, আঁখ, চালকুমড়ো ইত্যাদিও বলি দেওয়া হয়। সন্ধিপুজোর এই বলি দান অষ্টমী তিথিতে হয় না, তা হয় সন্ধি পুজোর প্রথম দণ্ড অর্থাৎ ২৪ মিনিট পার হওয়ার পরেই।আধুনিক সময়ে দূর্গা পুজোতে অনেক বাহ্যিক পরিবর্তন আসলেও শাস্ত্র মেনে যেখানে পুজো হয়ে সেখানে সন্ধি পুজোর গুরুত্ব একই আছে|জানিয়ে রাখি আসন্ন মহালয়া অমাবস্যা তিথিতে বিশেষ পুজো হোম যজ্ঞ ও গ্রহ দোষ খণ্ডন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে|আপনারা চাইলে সেই অংশ নিতে পারেন|মা হৃদয়েশ্বরী সর্বমঙ্গলা মন্দিরের পুজোতেও সন্ধিপুজো শাস্ত্র মেনে পালন করা হয়ে থাকে|যুক্ত থাকুন মা হৃদয়েশ্বরী সর্বমঙ্গলা মন্দিরের পুজোর সাথে|আসন্ন দূর্গা পুজো উপলক্ষে আরো অনেক এমন বিশেষ পর্ব আপনাদের জন্য নিয়ে আসবো|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

মহিষাসুর এর ইতিবৃত্ত

দেবী দূর্গাকে নিয়ে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি মহিষাসুরকে নিয়ে না বলি কারন দেবী দূর্গা যেমন শুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুর তেমন অশুভ শক্তির প্রতিনিধি|মহিষাসুর বধের জন্যই দেবীর আবির্ভাব হয় একটি বিশেষ সময়ে|অসংখ্য দেব দেবীর পাশাপাশি আমাদের পুরানে অসুরের সংখ্যাও কিছু কম নয়|তাদের মধ্যে সব থেকে আলোচিত এবং জনপ্রিয় অসুর চরিত্র বোধহয় মহিষাসুর|দেবী দুর্গার সাথে পূজিত হওয়ার দরুন মহিষাসুর বাংলা তথা গোটা বিশ্বের দরবারে এক অতি পরিচিত মুখ|তার বোধ হওয়ার কাহিনী হয়তো আমরা সবাই জানি কিন্তু তার জন্ম বৃত্তান্ত সহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনেকেরই অজানা|আজ চেষ্টা করবো মহিষাসুর সম্পর্কে কিছু স্বল্প প্রচারিত বিষয়ে আলোকপাত করার|মহিষাসুরের পিতাও ছিলেন এক অসুর তার নাম রম্ভ|অগ্নিদেবকে মতান্তরে মহাদেবকে তপস্যায় প্রসন্ন করে রম্ভ বর লাভ করেছিলো যে সে এক ত্রিকাল জয়ী বলশালী পুত্রের পিতা হবে|এই পুত্রকে কোনো পুরুষ বোধ করতে পারবেনা|পরবর্তীতে এক মহিষী কে ভালো বেশে তার সাথে মিলিত হয় রম্ভ|কিছুকাল পরে এক মায়াবী মহিষের সাথে সংঘর্ষে মৃত্য হয় রম্ভের|যক্ষেরা মিলে রম্ভর চিতায় অগ্নি সংযোগের ব্যবস্থা করে|রম্ভের অর্ধাঙ্গিনী সেই মহিষীও রম্ভার সাথে মৃত্যু বরণ করতে চেয়ে সেই চিতায় উঠে বসে|কিন্তু দেবতাদের বর মিথ্যে হতে পারেনা তাই সেই জ্বলন্ত চিতায় মাতৃ গৰ্ভ থেকে বেড়িয়ে আসে এক অসুর শিশু|এই শিশুই পরবর্তীতে হয় মহিষাসুর|পরবর্তীতে অত্যাচারী হয়ে ওঠে মহিষাসুর ও স্বর্গ মর্ত পাতাল অধিকার করে নেয়|তাকে বোধ করতে আবির্ভুত হন দশ ভুজা দেবী দূর্গা|মহিষাসুর কে বধ করে দেবী হন মহিষাসুর মর্দিনী|ত্রিকাল জয়ী বীর যোদ্ধা মহিষাসুরকে বধ করা সহজ ছিলোনা|মহিষাসুর একাধিক বার একাধিক রূপে দেবীর সাথে যুদ্ধ করেছিলেন|দেবীর দুর্গাও একাধিক রূপে একাধিক বার তার বিনাশ করেছেন যুদ্ধ ক্ষেত্রে|মহিষাসুর জন্মগ্রহণ করেন তিনবার। ত্রিবিধ রূপ ধারণ করে তাঁকে তিনবারই বিনাশ করেন এই দেবী। মহিষাসুরকে বধ করার জন্য প্রথমে অষ্টাদশভুজা উগ্রচণ্ডা রূপে, দ্বিতীয়বার ভদ্রকালী এবং তৃতীয়বার বধ করলেন দশভুজা দেবী দুর্গা রূপে|দেবীর এই দশ ভুজা মহিষাসুর মর্দিনী রুপই পূজিত হয় বাংলার ঘরে ঘরে|দেবী মূর্তির সাথে সর্বত্র মহিষাসুর কেনো পূজিত হন শাস্ত্রে এরও নিদ্দিষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে|মৃত্যুর পূর্বে মহিষাসুর স্বপ্নে দেবীর দর্শন করেন এবং দেবীকে অনুরোধ করে বলেন যে আপনার হাতে মৃত্যুর জন্য কোনও দুঃখ বা ক্ষোভ নেই এতটুকুও। কিন্তু আপনার সঙ্গে আমিও যাতে সকলের পূজিত হই তারই ব্যবস্থা করুন দেবী। এছাড়া আর কিছুই চাই না আমি।’দেবী তখন মহিষাসুরকে আশীর্বাদ করে বললেন, ‘উগ্রচণ্ডা, ভদ্রকালী আর দুর্গা, এই তিন মূর্তিতে আমার পদলগ্ন হয়ে তুমি সব সময়েই পূজ্য হবে দেবতা, মানুষ ও রাক্ষসদের।’ সেই থেকেই এই রীতি প্রচলিত|আমাদের দেশের কিছু আদিবাসী ও বিশেষ জনগোষ্ঠীর মধ্যে আশ্চর্য জনক ভাবে মহিষাসুরকে প্রধান আরাধ্য দেবতা হিসেবে পূজা করার রীতিও আছে|এমনকি উত্তর বঙ্গের একটি বিশেষ জন সমাজ নিজেদের আজও মহিষাসুরের বংশধর বলে দাবী করে ও যথেষ্ট গর্ব অনুভব করেন|সামনেই মহালয়া|মহালয়া উপলক্ষে আপনাদের হৃদয়েশ্বরী সর্বমঙ্গলা মায়ের মন্দিরে বিশেষ পূজা, হোম যজ্ঞ ও গ্রহ দোষ খণ্ডনের ব্যবস্থা করা হয়েছে|প্রযুক্তির ব্যবহারে এই আধ্যাত্মিক কর্মকান্ড পৌঁছে দেয়া হবে আপনাদের কাছে|তাছাড়া সরাসরি অংশ নিতে যোগাযোগ করতে পারেন|আজ মহিষাসুর কে নিয়ে এই পর্ব এখানেই শেষ করছি|দূর্গা পুজো উপলক্ষে চলতে থাকবে এই বিশেষ পর্ব গুলি ধারাবাহিক ভাবে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

কুমারী পুজোর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

শাস্ত্র মতে দূর্গাপুজোর অন্যতম অঙ্গ কুমারী পুজো|দেবী দুর্গার আরাধনার সময়ে যে কুমারী পুজো হয় তার আলাদা তাৎপর্য রয়েছে|আজকের পর্বে কুমারী পুজো ও তার অন্তর্নিহিত অর্থ নিয়ে লিখবো জানাবো কুমারী পুজোর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য|সন্ধি পুজোর ন্যায় দূর্গাপূজার একটি বিশেষ অধ্যায় হল কুমারী পূজা।বাংলায় এই বিশেষ আচার অনুষ্ঠানকে প্রথম প্রাধান্য দিয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। ১৯০১ সালে স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে দুর্গাপূজার শুরু করেন |সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি|আগে কুমারী পুজোর শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা শুনে নেয়া উচিত|শাস্ত্রমতে কুমারী পূজার উদ্ভব হয় কোলাসুর বধ করার মধ্য দিয়ে।পুরানে রয়েছে, বানাসুর এক সময় স্বর্গ-মর্ত্য অধিকার করায় বাকি বিপন্ন দেবগণ মহাকালীর শরণাপন্ন হন। সে সকল দেবগণের আবেদনে সাড়া দিযে় দেবী পুনর্জন্মে কুমারীরূপে আবীরভূতা হয়ে কোলাসুরকে বধ করেন। এরপর থেকেই মর্ত্যে কুমারী পূজার প্রচলন শুরু হয়।কুমারীরা শুদ্ধতার প্রতীক হওয়ায় মাতৃরূপে ঈশ্বরের আরাধনার জন্য কুমারীকন্যাকে নির্বাচন করা হয়। হিন্দু শাস্ত্রে ১ থেকে ১৬ বছর বয়সী অজাতপুষ্পবালাকে কুমারী বলা হয়। বয়স অনুযায়ী ১ বছর বয়সী কন্যাকে সন্ধ্যা ২ বছর বয়সী কন্যাকে স্বরসতী, ৩ বছর বয়সী কন্যাকে ত্রিধা ৪ বছর বয়সের কন্যাকে কালিকা ৫ বছর বয়সী কন্যাকে সুভগা, ৬ বছর বয়সী কন্যাকে উমা, ৭ বছর বয়সী কন্যাকে মালিনী, ৮ বছর বয়সী কন্যাকে কুব্জিকা, ৯ বছর বয়সী কন্যাকে অপরাজিতা, ১০ বছর বয়সী কন্যাকে কালসন্ধর্ভা, ১১ বছর বয়সী কন্যাকে রুদ্রাণী, ১২ বছর বয়সী কন্যাকে ভৈরবী, ১৩ বছর বয়সী কন্যাকে মহালক্ষ্মী ১৪ বছর বয়সী কন্যাকে পীঠনায়িকা, ১৫ বছর বয়সী কন্যাকে ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ১৬ বছর বয়সী কন্যাকে অম্বিকা বলা হয়। তবে কুমারী পূজার জন্য সাধারণত ৫ থেকে ৭ বছরের কুমারীকন্যাকে মনোনীত করা হয়।কুমারী পূজার দার্শনিক তত্ত্ব বা অন্তর্নিহিত অর্থ হলো নারীতে পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ অর্জন। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যে ত্রিশক্তির বলে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় ক্রিয়া সাধিত হচ্ছে, সেই ত্রিবিধ শক্তিই বীজাকারে কুমারীতে নিহিত। কুমারী প্রকৃতি বা নারী জাতির প্রতীক ও বীজাবস্থা। তাই কুমারী বা নারীতে দেবীভাব আরোপ করে তার সাধনা করা হয়।দক্ষিনেশ্বরে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজের স্ত্রীকে ষোড়শী জ্ঞানে পূজা করেছিলেন।পরবর্তীতেবেলুড় মঠে প্রথম দুর্গা পুজোর সময়ে বিবেকানন্দ একসঙ্গে অনেক কুমারীর পুজো করেছিলেন। এখন সেখানে একজন কুমারীকেই অষ্টমীর সকালে নিষ্ঠা ভরে পুজো করা হয়।বাংলার বহু বনেদি বাড়ি ও বারোয়ারী পুজোতেও কুমারী পুজোর প্রচলন রয়েছে।আসন্ন মহালয়া অমাবস্যা তিথিতে মা হৃদয়েশ্বরী সর্বমঙ্গলা মন্দিরের পুজো বিশেষ পুজো হোম যজ্ঞ ও গ্রহ দোষ খণ্ডন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে|আপনারা চাইলে সেই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন|দূর্গা পুজো উপলক্ষে আরো অনেক এমন বিশেষ পর্ব আপনাদের জন্য নিয়ে আসবো আগামী দিনগুলিতে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

দেবী দুর্গার বিভিন্ন বাহনে আগমন

আমরা জানি দেবী দুর্গার বাহনটির নাম সিংহ। কিন্তু নবরাত্রির সময় দেবী দুর্গা মর্তে আসার জন্য এবং কৈলাসে ফেরার জন্য ভিন্ন বাহন ব্যবহার করেন। এই সময়ে দেবী দুর্গার বাহন হয় গজ, ঘোড়া, দোলা, এবং নৌকা।দেবী ভাগবত পুরাণ মর্তে নেমে আসার জন্য যে বাহনের ব্যবহার করেন ও ফিরে যাওয়ার জন্য যে বাহন ব্যবহার করেন তার বিচার করেই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কেমন হতে চলেছে তা বোঝা যায়।আসন্ন দূর্গাপূজায় দেবী দুর্গার আগমন গজে, যার অর্থ শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা এবং উমা কৈলাসে ফিরবেন নৌকায় যার অর্থ শস্য বৃদ্ধি ও জল বৃদ্ধি।দেবীর আগমন ও ফিরে যাওয়া কোন ক্ষেত্রে কোন বাহনে হয় এবং তার অর্থ কি আসুন জেনে নেয়া যাক|দেবীর আগমন কোন বারে হচ্ছে এবং দেবী কোন বারে ফিরে যাচ্ছে তার উপর নির্ভর করে বাহন নির্ধারিত হয়|রবি অথবা সোমবার দেবীর আগমন হওয়ার অর্থ হল উমা এবার গজের পিঠে চেপে আসবেন। গজ সবসময়ই শুভ। এর অর্থ হল শস্য ফলবে অফুরন্ত। পৃথিবীতে মানুষের খাদ্যের আকাল হবে না। আবার গজে ফিরে যাওয়ার অর্থ হল সারা বছরই মায়ের আশীর্বাদ পাবে জীবকুল। ভালোবাসা এবং আনন্দে পূর্ণ থাকবে জীবন।শনি ও মঙ্গল বার দেবীর আগমনের অর্থ হল তিনি আসবেন ঘোড়ায় চেপে। ঘোটকে আসা খুব একটা শুভ নয়। এর অর্থ হল বিপদ ও ধ্বংস বাড়বে। এই ঘোড়া রাজায় রাজায় যুদ্ধ হওয়ার প্রতীক। অর্থাৎ বিভিন্ন দেশের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয় ঘোড়া। রাজনৈতিক ক্ষেত্র ও সামাজিক ক্ষেত্রে অস্থিরতার ইঙ্গিত দেবীর ঘোড়ায় আগমন এবং গমন|বৃহঃস্পতিবার ও শুক্রবার দেবীর আগমন হলে পালকিতে আগমন হয়, দেবীর পালকিতে যাত্রা অশুভ ইঙ্গিত দেয়। এর অর্থ অত্যন্ত খারাপ দিন অপেক্ষা করে আছে পৃথিবীবাসীর জন্য। খরা, মহামারী অপেক্ষা করে আছে আগামী দিনে। দোলা বহন করেন চারজন মানুষ। এর অর্থ হল মানুষ একজোট না থাকলে খারাপ সময় পেরনো অসম্ভব হবে।বুধবার দেবী দুর্গার আগমন অথবা গমন হলে নৌকায় যাত্রা করেন দেবী, নৌকা যাত্রা হলে তা ইচ্ছা পূরণের ইঙ্গিত দেয়। এর অর্থ হল পৃথিবীতে শস্যের কোনও অভাব হবে না।তবে একইসঙ্গে বন্যা হওয়ারও ইশারা করে এই বাহন। ফসল ভাল হলেও অতিবৃষ্টি এবং বন্যাতেও ভুগতে হতে পার. মানুষকে।পরের পর্বে দেবী দূর্গা সংক্রান্ত আরো অনেক পৌরাণিক তথ্য ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা নিয়ে ফিরে আসবো|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

দূর্গা পুজা ও নীলকণ্ঠ পাখি

দেবী দুর্গার বাহন, তার দশ হাত, দেবীর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আগের পর্বগুলিতে বলেছি, দূর্গাপুজো উপলক্ষে চলবে দেবী দূর্গা বিষয়ক আলোচনা, আজ আলোচনা করবো দেবীর বিসর্জনের সাথে যুক্ত একটি অদ্ভুত রীতি ও তার কেন্দ্রবিন্দু একটি পৌরাণিক পাখি নিয়ে|বাংলার বনেদি বাড়ির পুজোয় এক এক রকম আচার রয়েছে|সন্ধি পুজোয় কামন দাগা, আখ বা চাল কুমড়ো বলি দেয়া, কত রকম প্রথা রয়েছে আর সেইসবের সঙ্গেই জুড়ে হাজির হয় নীলকণ্ঠ পাখি। দশমীর দিন এই পাখি না থাকলে বাংলার অনেক বনেদি মনে করা হতো আসল উপাচারই যে করা হলো না তাই বহু কষ্টে জোগাড় হতো নীলকণ্ঠ পাখি|বর্তমানে অবশ্য এই পাখির দর্শন অতি দুর্লভ আর কিছু আইনি জটিলতা ও রয়েছে তাই সাধ থাকলেও অনেকেরই সাধ্য নেই নীলকণ্ঠ পাখি জোটানোর|বর্তমানে এই প্রথা লুপ্তপ্রায়|দূর্গাপুজোর বিভিন্ন রীতি নীতির মধ্যে একটি অদ্ভুত নিয়ম হলো বিসর্জনে এই নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো যা বহুকাল থেকে পালন করা হচ্ছে|কিন্তু জানেন কি নীলকণ্ঠ পাখির আসল পরিচয় কি এবং কেনো তা বিসর্জনে ওড়ানোর রীতি|উত্তর লুকিয়ে আছে পুরানে এবং রামায়নে|সেই রামায়ণের কাহিনি থেকেই নীলকণ্ঠ পাখি দূর্গা পুজোর অঙ্গ হিসাবে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছে। কথিত আছে রাবণবধের ঠিক আগে এই পাখিটির দেখা পান রামচন্দ্র। তার ঠিক আগেই যে তিনি সম্পন্ন করেছিলেন অকাল বোধন|আবার অনেকের মতে, রাবণবধের আগে এবং সেতুবন্ধনের সময় হাজির হয়েছিল নীলকণ্ঠ পাখি। পথ দেখিয়ে রাম-বাহিনীকে লঙ্কায় নিয়ে গিয়েছিল সে। তখন থেকেই প্রচারিত হয়, এই পাখির দর্শন অত্যন্ত শুভ এবং এইসব পৌরাণিক কাহিনি থেকেই এই পাখির মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে সব জায়গায়।ইংরেজিতে নীলকণ্ঠ পাখির নাম্বার ‘ইন্ডিয়ান রোলার’ তবে বাংলা নামটি এই পাখির চেহারার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মানানসই।পুরান অনুসারে সমুদ্রমন্থনের সময় হলাহল উঠে এলে দেবতা ও অসুরদের রক্ষা করতে চলে আসেন দেবাদিদেব মহাদেব। সেই তীব্র বিষ নিজেই পান করেন আর বিষের জ্বালায় তাঁর কণ্ঠ নীল হয়ে যায়। সেখান থেকেই তাঁর আরেক নাম ‘নীলকণ্ঠ’। এই পাখিটির নীল রঙের শরীর ও কণ্ঠ দেখলে অনেকটা সেই কথাই মনে পরে । তাই নীলকণ্ঠ নাম সার্থক|আমাদের শাস্ত্র মতে এই পাখি অত্যন্ত পবিত্র। এমনকী তার দেখা পাওয়াটা সৌভাগ্যের বিষয়। বাংলায় বিসর্জনের রীতিতে এই পাখির ব্যবহার প্রচলিত ছিল অনেক আগে থেকেই|নীলকণ্ঠ পাখির অবাধ যাতায়াত রয়েছে দেবাদিদেবের কৈলাশ পর্বতেও এবং বিসর্জনের সময় এই পাখি আগে কৈলাশে পৌঁছে মায়ের মর্ত থেকে আগমনের বার্তা দেয়|তাই বিসর্জনের সময়ে নীলকণ্ঠ পাখি মুক্ত করে দেয়া হয়|শুধু বাংলায় নয়, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড ও আরো বেশ কিছু রাজ্যে নীলকণ্ঠ পাখিকে রীতিমতো দেবতার আসনে বসানোর রীতি রয়েছে। অনেকে এই পাখিকে ভগবান শিবের এক রূপ বলে মনে করেন। এই পাখি দেখার অর্থ স্বয়ং শিব দর্শন। এই পাখি দেখে মনোবাসনা জানিয়ে আশিস চাওয়ার রীতি রয়েছে বহু সমাজে|দূর্গা পুজো উপলক্ষে আরো অনেক এমন বিশেষ পর্ব আপনাদের জন্য নিয়ে আসবো|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|

দেবী দুর্গার বাহন

দেবী দুর্গার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আগেই বলেছি আজকের পর্বে দেবীর বাহন নিয়ে বলবো তবে শুরুতে দেবীর গহনা ও সাজসজ্জা নিয়ে কিছু তথ্য জানিয়ে রাখি|দেবতাদের দেয়া অস্ত্রে সজ্জিত দেবীকে অলঙ্কারে ভূষিত করেন কুবের, সূর্যদেব দেবীকে কাঞ্চন বর্ণের সৌন্দর্যময় দ্যুতি প্রদান করেন। বিশ্বকর্মা প্রদান করেন দুর্ভেদ্য কবচ-কুণ্ডল ও অক্ষয় বস্ত্র। এতে দেবীর সুরক্ষিত হয়ে উঠেন। আর হিমালয় তাকে দেন বাহনদেব সিংহ।সবকিছুর সম্মিলনে দেবী হয়ে ওঠেন অনন্ত শক্তি ও অপার রূপ এবং ঐশর্যর প্রতীক।প্রচলিত মতে সিংহ হলো দুর্গার বাহন, এজন্য যারা দুর্গার মূর্তি বানায়, তারা সিংহের পিঠের উপরই দুর্গাকে স্থাপন করে দেয়, এতে খুব সহজেই বোঝা যায় বা মনে হয় যে, সিংহই দুর্গাকে বহন করে নিয়ে এসেছে; কিন্তু বাস্তব ব্যাপার তা নয় সিংহ হিংস্র, আক্রমণাত্মক। সিংহ শৌর্যের প্রতীক। এই সব গুণ দুর্গার মধ্যেও দেখা যায়। আবার সিংহের গর্জনকে দুর্গার ধ্বনি মনে করা হয়, যার সামনে সংসারের সমস্ত আওয়াজ দুর্বল হয়ে যায়|অর্থাৎ সিংহ মা দুর্গার তেজ ও পরাক্রমের প্রতীক|আবার পদ্মপুরানে আরও বলা আছে যে, দুর্গার ক্রোধ থেকে সিংহের জন্ম|কালিকাপুরাণ মতে শ্রীহরি দেবীকে বহন করছেন। এই হরি শব্দের এক অর্থ সিংহ।আবার শ্রীশ্রীচণ্ডীতে উল্লেখ আছে গিরিরাজ হিমালয় দেবীকে সিংহ দান করেন।শিবপুরাণ বলে, ব্রহ্মা দুর্গাকে বাহনরূপে সিংহ দান করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল শুম্ভ ও নিশুম্ভ বধের সুবিধাঅসীম শক্তিশালী সিংহের কাছে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে আত্মসর্মপণের। কারণ সে এতো শক্তিশালী হয়েও দেবীর পদতলে নিত্য শরনাগত|যেহেতু বৈষ্ণব ধর্ম হিংস্রতাক সমর্থন করেনা এবং সম্পূর্ণ ভাবে সাত্ত্বিক জীবন ধরনে বিশ্বাসী তাই বৈষ্ণব মতে যেখানে যেখানে দেবীর পুজো হয় সেখানে সিংহকে ঘোড়ার অবয়বে প্রতিষ্ঠা করা হয়|বাংলার বহু প্রাচীন বনেদি বা জমিদার বাড়ির পুজোতে দেবীর বাহন হিসেবে এই রূপ সিংহ মূর্তি দেখা যায়|আগামী পর্বগুলিতে দেবী দূর্গা সংক্রান্ত আরো অনেক তথ্য ও পৌরাণিক ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকবে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|