Home Blog Page 102

মন্দির রহস্য – দেবী ধুমাবতীর মন্দির রহস্য

দশ মহাবিদ্যার অন্যতম দেবী হলেন ধুমাবতী। আমাদের দেশে ধূমাবতীর মন্দিরের সংখ্যা অত্যন্ত অল্প।বারাণসীর একটি মন্দিরে ধূমাবতী হলেন প্রধান দেবতা।আজকের পর্বে আপনাদের এই মন্দিরের কথা জানাবো।বারাণসীতে অবস্থিত এই ধুমাবতী মন্দিরকে কিছু শাস্ত্রে শক্তিপীঠ বলে দাবি করা হয়। দেবী ধুমাবতীর রূপ কিছুটা ব্যাতিক্রমী।ধূমাবতী তন্ত্র গ্রন্থে তাঁকে বৃদ্ধা ও কুৎসিত বিধবার রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি শীর্ণকায়া, দীর্ঘাকার, রোগগ্রস্থা ও পাণ্ডুরবর্ণা। তিনি অশান্ত ও কুটিল হৃদয়। তাঁর দেহে অলংকারাদি নেই। তিনি পুরনো মলিন বস্ত্র পরিধান করে থাকেন। তিনি মুক্তকেশী।তিনি এক হাতে একটি কুলো ধরে থাকেন এবং অপর হাতে বরমুদ্রা বা চিন্মুদ্রা দেখান। তিনি অশ্ববিহীন রথে আরূঢ়া এবং তাঁর পতাকায় কাকের ছবি থাকে।তার এই পরিচিত রূপেই তিনি এই মন্দিরে বিরাজ করছেন।বারাণসীর এই মন্দিরে ফল ও ফুল দিয়ে দেবীর পূজা করা হয়। সাধারণ সন্ন্যাসী ও তান্ত্রিকরাই দেবীর পুজো করে থাকেন এবং দেবীর অমঙ্গলজনক সত্ত্বাটির জন্য কেবলমাত্র তান্ত্রিক বীরাচারেই দেবীর পূজা করা হয়। তবে এই মন্দিরে দেবী গ্রামদেবতা বা স্থানীয়দের রক্ষাকর্ত্রীরূপেও পূজিতা হন। এখানে বহু নব বিবাহিত যুগলেও দেবীর পূজা দিতে আসেন।কথিত আছে, ধূমাবতী মহাপ্রলয়ের সময় উপস্থিত হন। প্রলয়কালে উত্থিত প্রকাণ্ড কৃষ্ণ মেঘ তাঁর স্বরূপ। এই কারণে সহস্রনাম স্তোত্রে তাঁকে “প্রলয়রূপিণী” বা “প্রলয়মত্তা”, বলা হয়। অন্যমতে, তিনি মহাকালরূপী শিবের বিলোপের মনে করা হয় মহাপ্রলয় বা বিশ্ববিনাশের পর উত্থিত ধোঁয়ার প্রতীক দেবী ধুমাবতী।যিনি তিনি ধোঁয়ার আকারে বিহার করেনধূমাবতী সাধারণত অমঙ্গলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হলেও সহস্রনাম স্তোত্রে তাঁর কয়েকটি সদগুণেরও উল্লেখ রয়েছে। তিনি বরদাত্রী ও কোমলহৃদয়া। এবং সন্তানদাত্রী।কেতু যাদের অশুভ তারা ধুমাবতীর পুজো করলে সুফল পান।ফিরে আসবো আগামী পর্বে। দেবী মাহাত্ম নিয়ে।আলোচনা হবে নতুন কোনো মন্দির বাদেবী মাহাত্ম নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম – দেবী সিদ্ধেশ্বরী

দেবী মাহাত্মর আজকের পর্বে আপনাদের বাংলার কোচবিহার রাজ্যের দেবী সিদ্ধেশ্বরীর কথা লিখবো যার সাথে জড়িত আছে এক অদ্ভুত ও অলৌকিক ঘটনা।

কুচবিহারের দ্বিতীয় মহারাজা নরনারায়ন ছিলেন দেবী কামাখ্যার ভক্ত। নিয়মিত তার রাজ্য থেকে নৈবেদ্য পাঠানো হতো দেবীর পূজায়। জনশ্রুতি আছে একবার সন্ধ্যা আরতির সময় মহারাজ নরনারায়ন এক পূজারীর সাহায্যে আড়াল থেকে  নৃত্যরতা দেবীকে দর্শন  করেন।মা কামাখ্যা এই বিষয়ে অবগত হয়ে ক্রুদ্ধ হন ও রাজাকে অভিশাপ দেন যে তিনি বা তার বংশের কেউ আর কোনো দিন কামাখ্যা দেবীকে দর্শন করতে পারবেননা।

সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের পশ্চিম প্রান্তে প্রাচীরবেষ্টিত একটি প্রাচীন কামরাঙা গাছ আছে। গাছটির গোড়া সুতো দিয়ে বাঁধানো এবং গোড়াতে সিঁদুর লিপ্ত কয়েকটি শিলাখণ্ড আছে।সেই প্রাচীন কাল থেকে দেবীর আদেশ অনুসারে এই কামরাঙা গাছটি দেবী কামাখ্যার প্রতীক এবং পীঠস্থান  রূপে পূজিত হয়।দেবী কামাখ্যা দর্শনের অভিশাপ থাকায় তৎকালীন কুচবিহার রাজ্যের মহারাজগণ,রাজগণ বর্তমান জেলার রাজজ্ঞাতী বা রাজগণ এই কামরাঙা গাছেই দেবী কামাখ্যাকে দর্শন করেন এবং পূজা দেন।

পরবর্তীতে মহারাজা নরনারায়ণ অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে মায়ের কাছে ব্যাথিত চিত্তে বলেন যে, তার অপরাধে তার বংশধরেরা মায়ের মূর্তি দর্শন ও পূজা দেওয়া থেকে কেন বঞ্চিত হবে। এতে মা কামাখ্যা সদয় হয়ে বলেন যে তিনি এবার থেকে তার রাজ্যের বানেশ্বর শিব মন্দির এর কাছে সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের দেবী বিগ্রহে এবং পাশে প্রাচীন কামরাঙা বৃক্ষে দেবীরূপে সর্বদা বিরাজ করবেন। মহারাজগন এবং রাজগণ  সেখানে পূজা দিলে মা কামাখ্যার দর্শন ও পূজা দেওয়া হবে।

আজও প্রথা মেনে স্বপ্ন প্রদত্ত মন্ত্র দিয়ে দেবী সিদ্ধেশ্বরীকে আরাধনা করা হয়।উত্তর বঙ্গ বাসির কাছে এই দেবস্থান বা পীঠস্থান হলো “দ্বিতীয় কামাখ্যাপীঠ” যেখানে প্রতিটি বিশেষ তিথিতে বহু মানুষ আসেন দেবীকে দর্শন করে তার আশীর্বাদ নিতে।

বহু এমন অলৌকিক ঘটনা ও মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা বাকি আছে। ফিরে আসবো যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম – ভিরিঙ্গি মায়ের মন্দির

বাংলার দুর্গাপুর যেমন শিল্পাঞ্চল হিসাবে বিখ্যাত তেমনই বহু ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে দুর্গাপুরের শ্রী শ্রী ভিরিঙ্গি মায়ের শ্মশান কালি মন্দির বেশ পরিচিত স্থান।সিপাহী বিদ্রোহের পাঁচ বছর আগে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।এই মন্দির প্রাঙ্গনে মায়ের এক বিরল দৃশ্য দেখা যায়। বজরংবলী হনুমান এর কাঁধে নন্দী ভৃঙ্গি সহ মহাকালী মূর্তি এখানে বিরাজ করছে।মন্দিরের পশ্চাৎ দেশে সিদ্ধাসন নামক এক পবিত্র স্থান আছে যেখানে পঞ্চমুখী শিবলিঙ্গ বিরাজমান। একটি বাঁধানো ঘাট ও আছে।মায়ের মন্দিরের সামনে রয়েছে হাড়িখাট যেখানে বিশেষ সময়ে বলি হয়। তাছাড়াও এখানে আছে নাগেশ্বর, মহাকালভৈরবী, সিদ্ধিদাতা ও হনুমানজীর মন্দির আছে এখানে।ভিরিঙ্গি মন্দির যেখানে আছে বহুকাল আগে সেখান থেকে তিনটে বিষ্ণুমূর্তি ও মহাদেবের দুই সঙ্গী নন্দী ও ভৃঙ্গির মূর্তি উদ্ধার হয়েছিল বলে শোনা যায়।প্রথা মেনে মা কালীকে ভোগ নিবেদন করার আগে চন্ডভৈরব দের খাওয়ার নিবেদন করা হয়। বেশ কিছু অলৌকিক ঘটনাও শোনা যাও এই তীর্থস্থান কে কেন্দ্র করে।শোনা যায় মন্দিরের প্রতিষ্ঠতা অক্ষয় কুমার রায় যখন তার গুরুদেবের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ তখন তার গুরুদেব শেষ কৃত্যের সময়ে তাঁর চিতা ভস্মর মধ্যে রুপোর মোহর দেখতে পাওয়া যায়।মন্দিরের নীচে শায়িত আছেন মন্দিরের প্রতিষ্ঠতা অক্ষয় কুমার রায় ও তার পুত্র রবীন্দ্রনাথ রায় যাদের আন্তরিকে চেষ্টায় তৈরি হয়েছিল মন্দিরের বর্তমান রূপ।বর্ধমানে জেলায় খুব কম মানুষই আছেন যারা ভিরিঙ্গি কালি মায়ের কথা শোনেননি। সারা বছর বিভিন্ন জেলার মানুষের মনোস্কামনা পূরণের জন্য এখানে আসেন।বিশেষ তিথি গুলিতে জন সমাগম হয় যথেষ্ট।ফিরে আসবো দেবী মাহাত্ম নিয়ে। আগামী পর্বে। ধারাবাহিক ভাবে চলবে আলোচনা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

মন্দির রহস্য – শীতলা মন্দির রহস্য

পূর্ব মেদিনীপুরের নাচিন্দা গ্রামে রয়েছে এক জাগ্রত শীতলা মাতার মন্দির যেখানেদেবী শীতলা চণ্ডীকে নিয়ে প্রচলিত আছে বহু অলৌকিক জনশ্রুতি।আজ এই মন্দিরে কথা আপনাদের জানাবো।শোনা যায় যেখানে শীতলা মন্দির, তার কাছাকাছিই থাকতেন এক অসুস্থ বৃদ্ধা।একদিন রাতে ওই বৃদ্ধাকে স্বপ্নে দেখা দেন দেবী শীতলা এবং তিনি বলেন, ‘তুই চুপচাপ শুয়ে থাকিস না। তোর বাড়ির সামনের পুকুরে রোজ স্নান করবি।স্নান শেষে একট গাছের নীচে ঘট স্থাপন করবি।আমার পুজো করবি। আমার পুজো করলে তোর আর কোনো দুঃখ থাকবেনা। আমার পুজো করলে রোগগ্রস্ত মানুষ মুক্তি পাবে। সন্তানহীনা সন্তান লাভ করবে।স্বপ্ন দেখার পর বৃদ্ধর ঘুম ভেঙে যায়।সেদিন ছিল অক্ষয় তৃতীয়া।তিনি স্বপ্নে দেখানো দেবীর নির্দেশমতোই পুকুর থেকে স্নান সারেন। তারপর একটি গাছের নীচে জলভর্তি ঘট স্থাপন করেন।দেবীর পুজো করেন এবং সুস্থ হয়ে ওঠেন।সেই থেকে প্রতিবছর অক্ষয় তৃতীয়ায় বিশেষ পুজো হয় এই মন্দিরে। পুজো উপলক্ষে মেলাও বসে।এই অঞ্চলে দেবী শীতলা চন্ডীকে নিয়ে বহু অলৌকিক ও অদ্ভুত ঘটনা প্রচলিত আছেশোনা যায় দেবী শীতলা নানা রূপে এই মন্দিরের আশপাশে ঘুরে বেড়ান।একবার তিনি সাধারণ বিবাহিত মহিলার রূপ ধরে শাঁখা পরেছিলেন শাঁখারির থেকে আবার কোনো এক রাতে কয়েকজন জন ক্লান্ত পথিককে মন্দির চত্বরে আশ্রয় দিয়ে রেঁধে খাইয়েছিলেন।পরদিন ভোরে পূজারির ডাকে তাঁদের ঘুম ভাঙে। পূজারি তখন সেই পথিকদের জানান যে স্বপ্নে দেবী শীতলা তাঁকে দেখা দিয়েছিলেন। স্বপ্নে দেবী বলেছেন, রান্না করতে গিয়ে তাঁর হাত পুড়ে গেছে। শাড়িতে কালী লেগেছে।সেই সময়ে পূজারি এবং ওই চার ভক্ত দেখতে পান যে দেবী মূর্তির হাতে পোড়া দাগ। আর, শাড়িতে রান্নার কালির দাগ।অসংখ্য মানুষ এখানে আসেন পুজো দিতে তাদের বিশ্বাস দেবী ভক্তদের মনস্কামনা পূরণ করেন। মানত পূরণের পর এখানকার ভক্তরা মন্দিরে এসে পুজো দিয়ে যান।বহু এমন মন্দিরের কথা ও দেবী মাহাত্ম নিয়ে আলোচনা চলবে ধারাবাহিক ভাবে।ফিরে আসবো আবার যথা সময়ে। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

দোলপূর্ণিমার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন

আজ শুরুতেই সবাইকে দোল পূর্ণিমার শুভেচ্ছা জানাই। দোল পূর্ণিমার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য নিয়ে আজ আলোচনা করবো।ব্যবহারিক প্রয়োগ এক হলেও হোলি এবং দোল আদতে আলাদা আলাদা দুটি উৎসব।দোল পূর্ণিমায় ‘দোলযাত্রা’ আয়োজিত হয়। আর ‘হোলি’ পালিত হয় তারপরের দিন।শ্রীকৃষ্ণের জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত মথুরা ও রাধার জন্মস্থান হিসেবে জগদ্বিখ্যাত বৃন্দাবনে ১৬ দিন ধরে এই দোল উৎসব পালিত হয়। কথিত রয়েছে এই দিনেই রাধিকাকে ‘ফাগে’ মানে গুড়ো রঙ দিয়ে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ এবং এই তিথিতেই শ্রীকৃষ্ণ রাধিকাকে প্রেম নিবেদন করেছিলেন।তাই দোল পূর্ণিমা মূলত রাধা কৃষ্ণের প্রেম উদযাপনের উৎসব।আবার হোলির উৎপত্তি এক পৌরাণিক ঘটনা থেকে।রাজা হিরণ্যকশিপুর পুত্র ছিল প্রহল্লাদ। সে ছিল একজন ধর্মপ্রাণ বালক। বিষ্ণুর শত্রু হিরণ্য কশিপু এই প্রহল্লাদকে আগুনে পুড়িয়ে মারার প্রচেষ্টা করেন। হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকা সেই উদ্দেশে প্রহল্লাদকে নিয়ে আগুনে ঝাঁপ দেন । হোলিকা ভেবেছিলেন, তিনি তাঁর মায়াবী ক্ষমতাবলে বেঁচে যাবেন এবং পুড়ে ছাই হয়ে যাবে প্রহল্লাদ। কিন্তু আদতে দেখা যায় তার উল্টোটাই হয়। বিষ্ণুভক্ত বালকের গায়ে আগুনের এতটুকু আঁচও লাগেনি। অন্যদিকে আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয় হোলিকার কন্যার। তারপর থেকেই এই অশুভ শক্তির পরাজয় ও শুভ শক্তির জয়কে উদযাপন করতে পালিত হয় হোলি উৎসব।চৈতন্যদেবের সাথেও ও দোল পূর্ণিমার সম্পর্ক আছে কারন এই দোল পূর্ণিমা তিথি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মতিথি।পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার নবদ্বীপ, মায়াপুর, কৃষ্ণনগরে এই তিথি উপলক্ষে বিশেষ পুজো ও উৎসবের আয়োজন করা হয়। বাংলার বাইরে ওড়িশাতেও ধুমধাম করে পালিত হয় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মতিথি।দোল বলুন আর হোলি বলুন দুটোই নিজেকে রাঙিয়ে নেয়ার উৎসব।তারুণ্যর উৎসব|অশুভ শক্তিকে বিদায় জানিয়ে শুভ শক্তিকে স্বাগত জানানোর উৎসব।সবাইকে আরো একবার জানাই দোল পূর্ণিমার শুভেচ্ছ ও অভিনন্দন। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবীমাহাত্ম – প্রসন্নময়ী কালীর ইতিহাস

বাংলার বিখ্যাত কালী মন্দির গুলির মধ্যে অনেকগুলি ব্রিটিশ আমলের জমিদারদের পৃষ্ঠেপোষকতায় গড়ে উঠেছিল যাদের ঘিরে আছে নানা রকম অলৌকিক ঘটনা। এমনই এক কালী মন্দির আছে উত্তর চব্বিশ পরগনার গোবর ডাঙায়
যা প্রসন্ন ময়ী কালী নামে খ্যাত।

শোনা যায় স্থানীয় জমিদারবাবুর স্ত্রীর গর্ভে কোন পুত্রসন্তান না হওয়ায় তিনি খুবই মনঃকষ্টে ছিলেন। সেই সময় এক সন্ন্যাসী এসে তাঁকে কালীমাতার প্রসাদী ফুল দৈব,ওষুধ হিসাবে ধারণ করতে বলেন। ওই ওষুধ ধারণের ফলে তার স্ত্রী একটি পুত্রসন্তান লাভ করেন। কালী মাতা প্রসন্ন হয়ে এই পুত্রসন্তান দেওয়ায় সেই পুত্রের নাম রাখা হয় কালীপ্রসন্ন এবং কালীমাতার প্রসাদে পুত্রসন্তান লাভ করায় জমিদার বাবু কালীমূর্তি ও কালীমন্দির স্থাপনে উদ্যোগী হন। কিন্তু মন্দির নির্মাণ কার্য শেষ হওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয় এবং পরবর্তীতে পুত্র কালীপ্রসন্ন জমিদার হন এবং মন্দির নির্মাণ কার্য শেষ করেন। এই কালী মন্দির প্রসন্ন ময়ী কালী মন্দির নাম প্রসিদ্ধ হয়।রীতি মেনে আজও ওই বংশের প্রতিটি পুরুষের নামের সঙ্গে ‘প্রসন্ন’ শব্দ যুক্ত করা হয়।

প্রসন্ন ময়ী কালী মন্দির উঁচু ভিত্তিবেদির উপর প্রতিষ্ঠিত। দক্ষিণমুখী মন্দিরটি একটি দালান বিশিষ্ট।গর্ভগৃহে শ্বেত পাথরের বেদির উপর শায়িত স্বেত পাথরের শিবের উপর দণ্ডায়মানা প্রায় ২.৫ ফুট উঁচু কষ্টি পাথরের সুন্দর কালিকা মূর্তি প্রতিষ্ঠিত।

প্রায় চারশো বছরের পুরোনো এই মন্দিরে প্রতিটি বিশেষ তিথি যেমন কৌশিকী বা দীপান্বিতা অমাবস্যায় উৎসব উপলক্ষ্যে আশেপাশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক লোকের সমাগম হয়। শনি-মঙ্গলবারে অনেকে মনোস্কামনা পূরণের জন্য পূজাও দিয়ে থাকেন।

ফিরে আসবো পরের পর্বে। অন্য কোনো মন্দিরের রহস্য বা দেবী মাহাত্ম নিয়ে।ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকবে এই বিশেষ পর্ব গুলি। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম- ঢাকার রক্ষা কালী

দুই বাংলা জুড়েই আছে অসংখ্য জাগ্রত কালী মন্দির যাদের ঘিরে বহু অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। আজ আপনাদের ওপার বাংলার এক প্রসিদ্ধ রক্ষা কালী মায়ের মন্দিরের কথা জানাবো।মন্দিরটি পুরনো ঢাকার শাঁখারী বাজারে আছে এক প্রাচীন রক্ষা কালী মন্দির । চার কাঠা জমির উপর চূড়া আকৃতির এই মন্দিরটি নির্মিত। শোনা যায় এই মন্দিরের মা ভক্তের সকল মনোবাসনা পূর্ণ করেন।তাই ভক্তদের ভিড় সারা বছর লেগেই থাকে।মন্দিরটি কবে এবং কে প্রতিষ্টা করেছিলেন তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়না। তবে কয়েকশো বছর ধরে এই মন্দির এখানে আছে।লোকমুখে শোনা যায়, একটি অলৌকিক ঘটনা।তখন চলছে বাংলাদেশ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ। সেই মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনীর কাছে কোন ঠাসা হয়ে একদল বাঙালি বিপ্লবী আশ্রয় নেয় এই মন্দিরে।তাদের পিছু নিয়ে পাক হানাদার বাহিনী মন্দিরে আসে। বিপ্লবিরা বাইরে আত্মসমর্পন করতে অস্বীকার করলে পাক বাহিনী মন্দির ভাঙতে উদ্যত হয়।সেই সময় আবির্ভাব হয় ছায়া মূর্তির।খর্গ হাতে দাঁড়িয়ে সেই মায়াবী নারী মূর্তি এই মন্দিরকে রক্ষা করেন। অনেকেই মনে করেন আজও কোনো এক অদৃশ্য শক্তি সর্বদা উপস্থিত থাকে মন্দিরে।মানুষের বিশ্বাস স্বয়ং মাকালী এই মন্দিরে সদা বিরাজ করছেন।প্রতি শনিবারে মায়ের বিশেষ পূজা হয় এবং শনিবারে ভক্তদের সমাগম থাকে অনেক বেশি। এছাড়াও প্রতি আমাবস্যার পূজাও হয় এই মন্দিরে। মায়ের পাশাপাশি শিবেরও পূজা করা হয় এই মন্দিরে।শিব রাত্রিতে বহু মানুষের আগমন ঘটে ঢাকার এই মন্দিরে।ফিরে আসবো পরের পর্বে। চলবে দেবী মাহাত্ম নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম – লুঠ কালীপুজো

বাংলায় মা কালীর সঙ্গে ডাকাতদের যোগ বেশ আত্মিক এবং প্রাচীন।এক সময়ে রাতের অন্ধকারে ডাকাতদের গোপন আস্তানায় চলত মা কালীর আরাধনা। পুজো শেষে মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে রওনা দিত ডাকাতেরা। পুজোয় বলি দেওয়া হত পাঁঠা থেকে মানুষ সবই।আজ সেইসব ইতিহাস তবে রীতি নীতি বজায় রেখে পুজো চলে আসছে। আজকের পর্বে এমনই এক পুজোর কথা লিখবো।আজ থেকে প্রায় তিন-চার শতাব্দী আগের কথা। তখন গ্রামজুড়ে ঘন জঙ্গল, চারিদিকে ডাকাতদের আধিপত্য। দুর্ধর্ষ এক ডাকাত দলের হাত ধরেই হাওড়ার পাঁচলার সাহাপুর গ্রামে শুরু হয়েছিল কালীপুজো।লুঠ করে হতো পুজো। পুজোর পর প্রসাদ ও ডাকাতরা নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি করে বা লুঠ করে খেতো।মাঝে কেটে গিয়েছে কয়েকশো বছর। গ্রামজুড়ে আজ উধাও জঙ্গল, গ্রামে ডাকাতির ঘটনাও আজ প্রায় অতীত। কিন্তু আজও ঐতিহ্য ও নিয়মে অটুট ডাকাতদের হাতে শুরু হওয়া সাহাপুরের ‘লুট কালী’ পুজো।আজও রীতি মেনে পুজোর বেশ কিছুদিন আগে থেকে প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হলেও পুজোর দিন প্রতিমায় রঙ করে তা পুজো করা হয়।প্রথা মেনে আজও ডাকাত কালীপুজোয় হয় লুঠ। সাহাপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, গ্রামের বহু মানুষ মা’য়ের কাছে পুজো হিসাবে বিভিন্ন ফল নিবেদন করেন। সেই ফল বাঁশ দিয়ে ঘেরা থাকে।বহু প্রাচীন রীতি মেনে আজও পুজো চলাকালীন একাধিক বার সেই ফল বা প্রসাদ লুঠ করেন ভক্তরা।গোটা জেলা থেকে মানুষ এখানে আসেন অদ্ভুত এই লুঠ কালী পুজো দেখতে। এখানে আজও তন্ত্র মতে পুজো হয়। ফিরে আসবো পরের পর্বে।অন্য কোনো দেবী মাহাত্ম নিয়ে আলোচনা করতে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

মন্দির রহস্য – পঞ্চানন্দ ঠাকুরের মন্দির রহস্য

দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জ এ প্রাচীন এক মন্দিরে পঞ্চানন ঠাকুরের মূর্তি সাড়ে তিনশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পূজিত হয়ে আসছে।আজকের পর্বে জানাবো এই মন্দিরের রহস্যময় ইতিহাস।পঞ্চানন বা পাঁচু ঠাকুর বাংলার এক বিখ্যাত লৌকিক দেবতা। লোকবিশ্বাসে ইনি মহাদেব শিবের এক লৌকিক রূপ আবার অন্যমতে,ইনি শিবের মানস পুত্র। মূলত গ্রামরক্ষক রূপে পঞ্চানন পূজিত শস্যদেবতা হিসাবেও তার পূজার প্রচলন আছে। মহাদেব শিবের সঙ্গে পঞ্চানন ঠাকুরের দেহাকৃতি ও বেশভূষার সাদৃশ্য আছে।পঞ্চাননের গাত্রবর্ণ লাল এবং চোখমুখের ভঙ্গি রুদ্ররূপী; বেশ বড় গোলাকার ও রক্তাভ তিনটি চোখ ক্রোধোদ্দীপ্ত। প্রশস্ত ও কালো টিকালো নাক, দাড়ি নেই, গোঁফ কান অবধি বিস্তৃত। মাথায় পিঙ্গলবর্ণের জটা চূড়া করে বাঁধা এবং তার মধ্যে জটা কিছু বুকে পিঠে ছড়ানো। কানে ধুতুরা ফুল বিরাজমান।গলায় ও হাতে বেশ বড় পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষমালা থাকে। হাতে ত্রিশূল ও ডমরু; পায়ে খড়ম এবং মাথায় বা দেহের উপর সাপ বিদ্যমান। পাশে থাকে পঞ্চরংয়ের বা পাঁচমুখো গাঁজার কলকে।উর্ধাঙ্গ অনাবৃত নিম্নাঙ্গ বাঘছাল পরিহিত।বহুকাল আগে যখন টালিগঞ্জের আদিগঙ্গার পাড়ে জন বসতি সেই ভাবে গড়ে ওঠেনি সেখানে বাস করতে বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য্য নামে এক পূজারী ব্রাহ্মণ। এক রাতে বৈদ্যনাথ স্বপ্ন দেখলেন, পঞ্চানন ঠাকুর এসেছেন। বর্তমানে যে মূর্তি আমরা দেখি, সেই রূপে। ঠাকুর বলছেন, এই গঙ্গার ঘাটে আমি তোর অপেক্ষায় আছি। জলের মধ্য থেকে উদ্ধার করে আমাকে নিয়ে চল দ্রুত।পুজো করার আদেশ ও পেলেন।পরের রাতে আবার একই স্বপ্ন ভোর হতে তখনো খানিকটা সময় বাকি, কিন্তু অপেক্ষা করলেন না তিনি। সেই রাতেই গ্রামের কয়েকজন ভক্তকে ডেকে নিয়ে, সস্ত্রীক চললেন গঙ্গার ঘাটে।ঘাটে এসে তিনি দেখলেন, তিনটে প্রায় চারকোণা আকৃতির পাথর রাখা আছে জলের ধারে, আর তিনটিই রক্তাভ। তিনটে পাথরকে এক বিরাট সাপ জড়িয়ে আছে। সেই পাথর তুলে এনে তিনি স্থাপন করলেন নিজের মন্দিরে। পরবর্তীতে স্বপ্নে দেখা রুপ মিলিয়ে তৈরি হলো মূর্তি শুরু হলো পুজো।এই রকম জনশ্রুতি আর ভক্তির সাথে মিলেমিশে রয়েছে এই পঞ্চানন ঠাকুরের মন্দির ও তার অস্তিত্ব।চলতে থাকবে দেবী মাহাত্ম ও মন্দির রহস্যনিয়ে আলোচনা। ফিরে আসবো পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম: বজ্রবরাহী দেবী

দেবী মাহাত্ম নিয়ে এই ধারাবাহিক আলোচনায় আজ পর্যন্ত আপনাদের দেবী দূর্গা দেবী কালী সহ তাদের বিভিন্ন রূপ গুলি নিয়ে আলোচনা করেছি আজ এই পর্বে বৌদ্ধ দেবী বজ্র বরাহীর কথা হবে।উত্তর সিকিমের এক দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে এই বজ্রবরাহীর মন্দির আছে। প্রতি শনিবার রাতে সেখানে পূজা হয়।বলেও শোনা যায় তবে ব্লু পাইন,ফার আর বার্চের গভীর অরণ্যের মধ্যে অবস্থিত সেই মন্দিরে একমাত্র যারা বৌদ্ধ বজ্রযানীতন্ত্রে সিদ্ধ তারাই পূজা দিতে আসে।বহু মানুষ বিশ্বাস করেন তন্ত্রের এই দেবীর পূজা দিলে অনন্ত শক্তির মালিক হওয়া যায়। জগতের সমস্ত সাফল্য অর্জন করা যায়।বৌদ্ধ ধর্মের বজ্রযানি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে এই এই দেবীর মাহাত্ম উল্লেখ করা আছে।আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপালেও বহু প্রাচীন বজ্রবরাহী দেবীর মন্দির আছে।যারা এই দেবীর পুজো করেন তারা বিশ্বাস করেন বজ্রবরাহী দেবী তুষ্ট হলে ভক্তকে অভীষ্ট ঋদ্ধি আর সিদ্ধি প্রদান করেন। আবার,দেবীকে তুষ্ট করতে না পারলে বা সাধনায় কোনো ভণ্ডামি থাকলে দেবী সাধককে কঠোর শাস্তি দেন।দেবীর সঙ্গিনী মেখলা এবং কনখাল নামে দুই মায়াবী নারী অনেকটা সনাতন ধর্মের ডাকিনী যোগিনীর ন্যায়।দেবী বজ্রর ন্যায় কঠিন ও তার মাথা বরাহর। তিনি দুষ্টের দমন ও সিষ্টের পালন করেন।বজ্র বরাহী দেবী আগাগোড়া রহস্যআবৃত। তার মাহাত্ম বৌদ্ধ তন্ত্রে অপরিসীম।তার রূপ থেকে তার পুজো পক্রিয়া সবই রহস্যময় এবং সাধারণ ভাবেই বেশ কৌতূহলের বিষয়।ফিরে আসবো পরের পর্বে। অন্য কোনো দেবী মাহাত্ম নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।