Home Blog Page 101

মন্দির রহস্য – পুরুলিয়ার সীতা কুন্ড

বাংলায় বহু পৌরাণিক স্থান আছে যা সেই ভাবে প্রচারে আসেনি বা যা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়না। এমনই এক পৌরাণিক মন্দির ও জলাধার আছে পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। মন্দিরটি একটি প্রভু রামের মন্দির এবং জলাধারটি সীতা কুন্ড নামেই পরিচিত।

পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় বেশ জনপ্রিয় পর্যটন স্থল। এই পাহাড়েই আছে বাগান্ডি নামে একটি গ্রাম সেখানেই পাহাড়ি অঞ্চলে রয়েছে পাথর দিয়ে বাঁধানো ঠান্ডা জলের এক প্রাকৃতিক প্রস্রবণ। ‘সীতাকুণ্ড’ নামে পরিচিত এই জলের উৎসটি বেশ অদ্ভুত ভাবে মাটির নিচ থেকে অনবরত বেরিয়ে আসছে। সেই জল যথেষ্ট স্বচ্ছ পরিষ্কার এবং শীতল জল।ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায় মাছও রয়েছে সেখানে।

সীতা কুন্ডু নামের কারন হলো ত্রেতাযুগে
বনবাসের সময়ে এখানে কয়েকদিন ছিলেন রামচন্দ্র ও সীতাদেবী।তখন গ্রীষ্মের দাবদাহ চলছে। আশপাশে কোথাও পানীয় জল নেই সীতা তৃষ্ণার্থ হয়ে পড়লে প্রভু রামকে জল আনতে বলেন। অন্য কোথাও জল না পেয়ে প্রভু শ্রী রাম তির ছুঁড়ে মাটি ভেদ করে জল বের করে আনেন। সেই তীরের আঘাতে সৃষ্টি হওয়া এই সীতা কুন্ড থেকে এখনও বেরিয়ে চলেছে জল। অদ্ভুত এই কুন্ড দেখতে আসেন বহু মানুষ।

পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় ছাড়াও ভারতীয় উপমহাদেশের আরও অনেক জায়গায় সীতাকুণ্ড দেখা যায় এবং সেই সব জায়গা নিয়েও রয়েছে ত্রেতা যুগের প্রভু শ্রী রাম ও সীতাদেবীকে নিয়ে
বহু এরকম ঘটনা।

স্থানীয় দের কাছে জায়গাটা খুবই পবিত্র।
প্রথা মেনে প্রত্যেক বছর বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে স্থানীয় আদিবাসীরা এখানে পশু শিকারের উৎসবে মেতে ওঠেন।

সীতাকুণ্ডের কাছেই রয়েছে এক বহু প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক রামমন্দির। শোনা যায় প্রস্রবণের আরেকটি মুখ ছিলো যা এখন প্রায় বিপর্যস্ত। সেখান থেকে আর জল বের হয় না এখন।

ফিরে আসবো পরের পর্বে। অন্য কোনো বিষয় নিয়ে। ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করবো
দেবী মাহাত্ম নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

মন্দির রহস্য – হিড়িম্বা মন্দির

যদিও মহাভারতে হিড়িম্বা কে এক রাক্ষসী হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু মানালির এক মন্দিরে উপাস্য দেবী ‘রাক্ষসী’ হিড়িম্বা।হিমালয়ের পাদদেশে, পাইন-দেবদারু ঘেরা সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে প্যাগোডা স্টাইলে নির্মিত এই হিড়িম্বা মন্দির বেশ রহস্যময়।

মহাভারত অনুসারে হিড়িম্বা দেবীর দাদা হিড়িম্ব ছিলেন রাক্ষস দের রাজা ।মাতা কুন্তির সঙ্গে যখন এই সেই জঙ্গলে আশ্রুয় নিয়েছিলেন পঞ্চপান্ডব।
তখন দাদার আদেশে সুন্দরী রমণীর বেশে পঞ্চপান্ডবকে বধ করতে যান হিড়িম্বা।পান্ডব দের অন্যতম সদস্য ভীমকে দেখে প্রথম দর্শনেই ভাল লেগে যায় হিড়িম্বার এবং তিনি ভীমকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন।

গোটা ঘটনা জানতে পেরে নিজের বোনকেই হিড়িম্ব হত্যা করতে উদ্যত হলে হিড়িম্বকে বধ করেন ভীম। এর পরেই কুন্তির আদেশে হিড়িম্বাকে বিয়ে করেন ভীম। শর্ত ছিল একটাই তাঁদের সন্তান হওয়ার পর হিড়িম্বাকে ত্যাগ করবেন ভীম। ভীম এবং হিড়িম্বার সন্তান হলো ঘটোৎকচ যার জন্মাবার পর ভীম সেখান থেকে চলে এলে মানালির ওই জঙ্গলেই পুত্রসন্তানকে নিয়ে গভীর তপস্যায় মগ্ন হন হিড়িম্বা। পরবর্তীতে হিড়িম্বা নিজের করে তোলেন ঘটোৎকচকে এবং কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ঘটৎকচ অংশ নিয়ে ছিলেন।
 
মানালির এই হিড়িম্বা মন্দিরের ভিতর রয়েছে বিরাট এক কালো রঙের পাথর। লোকের বিশ্বাস ওই কালো পাথরের নিচেই ধ্যানে করেছিলেন হিড়িম্বা। কাঠের তৈরী মন্দির সাজানো রয়েছে বিভিন্ন পশুর শিঙ দিয়ে। রয়েছে এক বিশাল আয়তনের পায়ের ছাপ আছে এখানে যা স্থানীয়দের বিশ্বাস অনুসারে স্বয়ং মা হিড়িম্বার।
স্থানীয়দের বিশ্বাস আজও হিড়িম্বা মা আপদে বিপদে রক্ষা করে চলেছেন তাঁদের। রক্ষা করছেন গোটা অঞ্চলকে।

প্রতিবছর নব রাত্রি উপলক্ষে যখন সারা দেশ মা দুর্গার পুজো করেন তখন মানালি মেতে ওঠে এক ‘রাক্ষসী’র আরাধনায়।তিনি তখন আর রাক্ষসী নন তিনি দেবী হিড়িম্বা।হিড়িম্বা মন্দিরের কাছেই আছে হিড়িম্বা এবং ভীমের সন্তান ঘটোৎকচের মন্দির।সেই মন্দির ও এখানকার অন্যতম ধর্মীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়।

ফিরে আসবো পরের পর্বে। অন্য কোনো মন্দির রহস্য নিয়ে।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

মতুয়া মহোৎসব ও কামনা সাগর

তিথি অনুসারে প্রতি বছর মধু কৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মতিথি পালন করা হয় সারা বিশ্ব জুড়ে।এই বছর হরিচাঁদ ঠাকুরের ২১২ তম জন্ম তিথি উপলক্ষে ঠাকুরনগরে রবিবার থেকে শুরু হচ্ছে বারুনী মহামেলা। এই উৎসবের কেন্দ্র বিন্দুতে থাকে একটি অদ্ভুত জলাশয় যার প্রতিটি জলবিন্দু আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় পরিপূর্ণ। ভক্তদের কাছেএই জলাশয়টি কামনা সাগর নামে পরিচিত।এই উৎসব ও কামনা সাগরের মাহাত্ম জানতে হলে আগে মতুয়া দর্শন ও শ্রী শ্রী হরি চাঁদ ঠাকুরকে জানা প্রয়োজন।আজ দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মতুয়াদের কাছে  শ্রী শ্রী হরিচাঁদ চাঁদ ঠাকুর কলি যুগের শেষ এবং শ্রীহরি-র পূর্ণ অবতার|যথার্থ অর্থেই তিনি পতিতপাবন|তিনি ছিলেন মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রান পুরুষ|সারা জীবন তিনি উৎসর্গ করেন মতুয়া আদর্শের প্রচারে এবং প্রসারে|তিনি মনে করতেন ঈশ্বর প্রাপ্তির জন্য সন্ন্যাস নেয়ার প্রয়োজন নেই অন্তরে শ্রদ্ধা ও ভক্তি থাকলে এবং নিষ্ঠা সহকারে ঈশ্বর চিন্তা করলে গৃহীরও ঈশ্বর লাভ সম্ভব|নানা শ্রেণী ও জাতি তে বিভক্ত হিন্দু সমাজ কে তিনি ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন মতুয়াবাদের দ্বারা|তৎকালীন হিন্দু সমাজের অসংখ্য নিপিড়িত, দরিদ্র ও তথা কথিত নিম্ন শ্রেণীর মানুষ দের তিনি পরম স্নেহে বুকে টেনে নিয়েছিলেন এবং তাদের সার্বিক উন্নতি সাধনই ছিলো তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য|ঠাকুর বাড়ি ছিলো শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের দিব্য লীলা স্থল। কামনা সাগরের জল তার পদধূলিতে ধন্য। প্রতিটি জলবিন্দু তার চরণামৃত সমান যা অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন।ভক্তদের বিশ্বাস, এই জলে স্নান করলেই মেলে রোগ মুক্তি থেকে নানা সমস্যার সমাধান।কামনা সাগরে হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মতিথিতে স্নান করলে মনোবাসনা পূরন হয়।শুধু স্নান নয়। তারা এই জল বাড়ি নিয়ে যান। সারাবছর সংরক্ষন করে রাখেন। যেকোন শুভ অনুষ্ঠানে তারা এই কামনা সাগরের জল ব্যবহার করে থাকেন। এমনকী শরীরে কোন রোগ-ব্যধির প্রকোপ দেখা দিলে এই জল বিশ্বাস নিয়ে পান করলে সেরে যায় তাদের ব্যাধি।ঠাকুরবাড়ির মন্দির পার্শ্বস্থ মাঠেই সাত দিন ধরে চলবে বারুনী মহা মেলা। হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুর সহ বিনাপানি দেবী অর্থাৎ বড় মা’র মন্দিরে চলে ভক্তদের বিশেষ প্রার্থনা।ভারতের বাইরে বাংলাদেশেও ঠাকুরের জন্ম স্থানে ঠাকুরের জন্ম তিথি উপলক্ষে উৎসব পালন হয় মহা সমারোহে|সারা বিশ্বের মতুয়াদের কাছে এই উৎসব এক মহা মিলন উৎসব।জয় হরি চাঁদ ঠাকুরের জয়। জগৎ এর সব মতুয়া ভাই বোনেদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

মন্দির রহস্য – শীল ফোর কালী মন্দিরের ইতিহাস

সামনেই অমাবস্যা এবং তারপর অন্নপূর্ণা কালী।
দেবী মাহাত্ম নিয়ে আলোচনা করছি ধারাবাহিক ভাবে। তবে আজ একটি প্রাচীন কালী মন্দিরের
কথা আপনাদের জানাবো যা শীল ফোর কালী মন্দির নামে খ্যাত। পুরুলিয়ার দুর্গম এক পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত এই কালী মন্দির।

স্বাধীনতার আগে ১৯৩৪ সালে  পুরুলিয়ার শিলফোড় পাহাড়ে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে কালীপুজো শুরু করলেন রায়সাহেব প্রেমচাঁদ মোদক।তিনি ছিলেন ঝালদার তৎকালীন জমিদার
তাকে রায় সাহেব উপাধি দিয়েছিল ব্রিটিশরা।সেই আনন্দে শ্যামা মায়ের আরাধনার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।তার চেষ্টায় ও অর্থ ব্যায়ে শিলফোড় পাহাড়ের মাথায় তৈরি হয় মন্দির।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন চলা কালীন দুর্গম এই শিলফোড় পাহাড়ের গুহাতে থাকতেন অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা। পুজোতে শামিল হন তাঁরাও।এই পুজো কে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক সাড়া পরে এক সময়ে।

জমিদার বাবু যে পুজো শুরু করে ছিলেন রায় বাহাদুর খেতাব পেয়ে সেই পুজো হয়ে ওঠে স্বাধীনতা সংগ্রামী দের মাতৃ আরাধনার কেন্দ্র এবং পরবর্তীতে সাধারন গ্রাম বাসীরা সেই পুজোকে বারোয়ারী পুজো রূপে এগিয়ে নিয়ে যায়।

শ্যামা কালীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে শিলফোড় পাহাড়ে  চারদিন ধরে রীতিমতো  উৎসব চলে। পরাধীন ভারতে যখন দিকে দিকে বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে। তখনও অন্ধকারে ডুবেছিল পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলের এই শিলফোড় পাহাড়। ঘন অরণ্য জীব জন্তু এবং তার সাথে ব্রিটিশ গুপ্তচর আনাগোনা লেগেই থাকতো এখানে। পরবর্তীতে বিপ্লবীদের আগমনে পাহাড় ও লাগোয়া এলাকার বাসিন্দারা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।

জমিদার রায় সাহেবের মন্দির তৈরির সূত্র ধরে পাহাড় ও লাগোয়া এলাকায় বদল আসে।বর্তমানে এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে এলাকার পর্যটন অন্য মাত্রা পেয়েছে কারন আজ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন শীলফোর পাহাড়ে
দেবী দর্শন করতে।

ধারাবাহিক এই আধ্যাত্মিক আলোচনা আবার হবে আগামী পর্বে। ফিরে আসবো অন্য কোনো মন্দিরের কথা নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম- নল হাটির গুহ্য কালীমাতা

তন্ত্র সাধনার পীঠস্থান হলো বীরভূমবীরভূমের নলহাটির কাছেই আকালীপুরে আছে ভীষণ দর্শনা এক যিনি দেবী গুহ্য কালিকা বা গোপন কালী নামে পরিচিত।আজকের পর্বেএই দেবীর মাহাত্ম নিয়ে লিখবো।যদিও মহারাজা নন্দকুমার কে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা রূপে ধরা হয় তবে এই বিচিত্র কালীমূর্তিটি তাঁর দ্বারা নির্মিত হয়নি। তা আরো প্রাচীন।জনশ্রুতি আছে মগধরাজ জরাসন্ধ এই মূর্তিটি নির্মাণ করেছিলেন। কালক্রমে বিভিন্ন রাজার হাতে পূজিত হওয়ার পর কাশীরাজ চৈত সিংহের রাজ্যের এক কৃষক তার জমিতে মূর্তিটি খুঁজে পান। সংবাদ পেয়ে চৈত সিংহ মন্দির প্রতিষ্ঠা করে দেবী গুহ্যকালিকার প্রতিষ্ঠা করতে চান।তখন ব্রিটিশ আমল ওয়ারেন হেস্টিংসও এই মূর্তির সন্ধান পেয়ে এটিকে লন্ডনের জাদুঘরে প্রেরণে উদ্যোগী হন। মূর্তিটি ব্রিটিশদের হাত থেকে রক্ষা করতে, চৈত সিংহ সেটিকে গঙ্গাবক্ষে লুকিয়ে রাখেন।বহু যুগ অতিক্রান্ত হয় তারপর মহারাজা নন্দকুমার স্বপ্নাদেশ পেয়ে সেটিকে কাশী থেকে নিজের চেষ্টায় উদ্ধার করে নিজ জন্মস্থান বীরভূমের ভদ্রপুর গ্রামে নিয়ে আসেন। নন্দকুমার নিজে ছিলেন পরম শাক্ত ও দেবী মহাকালীর ভক্ত। তিনি ১৭৭৫ সালের গোড়ায় তিনি মুর্শিদাবাদ-বীরভূমের সীমান্তবর্তী আকালীপুর গ্রামে দেবী গুহ্যকালীর মন্দির নির্মাণ শুরু করেন। তবে নির্মাণ শেষ করার আগেই বৈপ্লবিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরেন এবং ধরা পরেন স্বাস্তিস্বরূপ তারফাঁসি হয়মহারাজা নন্দ কুমারের পুত্র পিতার শেষ ইচ্ছে স্বরূপ দেবী গুহ্যকালীর মন্দির প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ করেন ও নিয়মিত দেবীর পূজার ব্যবস্থা করেন।গুহ্যকালী দ্বিভুজা, সর্পভূষিতা ও খড়্গহস্তা। তাকে সূর্যকালী নামেও অভিহিত করা হয়। যে কোন কালী মূর্তির সাথে আমরা শায়িত অবস্থায় দেবাদিদেব মহাদেব কে দেখতে পাই‌। কিন্তু গুহ্য কালীর মূর্তির সাথে শিব শায়িত অবস্থায় থাকে না‌।সাধারণত তান্ত্রিকরাই এই দেবীর পুজো করে থাকেন। গৃহস্ত পরিবারের গৃহ মন্দিরে দেবীর পুজো হয়না সাধারনত।বহু এমন ঐতিহাসিক মন্দির এবং দেবী আদ্যা শক্তির নানা রূপ নিয়ে আলোচনা বাকি আছে। চলতে থাকবে এই ধারাবাহিক অনুষ্ঠান। ফিরে আসবো। পরের পর্বে।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

মন্দির রহস্য – টাঙ্গিনাথ ধাম

আজকের পর্বে আপনাদের ঝাড় খন্ডের এক অদ্ভুত এবং রহস্যময় মন্দিরের কথা জানাবো। মানুষের বিশ্বাস এবং জনশ্রুতি অনুসারে এই মন্দিরেই আছে ভগবান পরশুরামের বিখ্যাত
সেই কুঠার।

বিখ্যাত মন্দির রয়েছে ঝাড়খণ্ডের রাজধানী রাঁচি থেকে ১৭৫ কিলোমিটার দূরে গুমলা জেলায়।
প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের ওপর অবস্থিত বাবা টাঙ্গিনাথ ধাম।

বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার হলেন পরশুরাম। পুরান ও অন্য বহু শাস্ত্রে উল্লেখ আছে যে তিনি অমর এবং অবিনাশি আজও তিনি পৃথিবীতেই আছেন।
আর এই টাঙ্গি নাথ এই মন্দিরে রয়েছে তাঁর কুঠার। ভক্তদের বিশ্বাস স্বয়ং পরশুরাম ও এখানে থাকেন।

ত্রেতাযুগে জনকপুরে সীতার স্বয়ম্বর সভায় হরধনু ভেঙেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র। শিবের থেকে প্রাপ্ত হরধনু পরশুরাম জনক রাজাকে দিয়েছিলেন। সেই হরধনু ভাঙার খবরে স্বভাবতই পরশুরাম উত্তেজিত হয়ে নিজের ক্রোধ প্রকাশ করেন পরে প্রভু রামের আসল পরিচয় জেনে নিজের ভুল বুঝতে পারেন কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য কুঠারটি এক পাহাড়ের ওপর পুঁতে দেন এবং জঙ্গলে গিয়ে তপস্যা শুরু করেন। টাঙ্গিনাথ ধাম সেই স্থান বলেই মনে করা হয়। টাঙ্গিনাথ ধামে পরশুরামের পদচিহ্নও আছে বলে অনেকের ধারণা।

কুঠারকে হিন্দিতে টাঙ্গি বলে।সেই থেকেই নাম টাঙ্গি নাথ।পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে টাঙ্গিনাথ ধাম অত্যন্ত বিখ্যাত।শাস্ত্র মতে ভগবান শিবের থেকেই টাঙ্গি বা কুঠার পেয়েছিলেন পরশুরাম। এই টাঙ্গিনাথ ধামও শিবের মন্দির। এই মন্দির অত্যন্ত প্রাচীন। এখানে পাওয়া বিশাল আকারের কুঠারটি দেখতে অনেকটা ত্রিশূলের মত।

টাঙ্গি নাথ ধামে যে বিশাল টাঙ্গি বা কুঠারটি মাটিতে পুঁতে রাখা আছে তা যুগ যুগ ধরে অক্ষত রয়েছে। তাতে কোনও মরচে ধরেনি। এই কুঠার মাটির নীচেও অনেকখানি রয়েছে। ভক্তদের দাবি, এই কুঠার বহুবার চুরি করা ও ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু, তাতে কোনও লাভ হয়নি। উলটে, যারা এই কুঠার চুরি বা ধ্বংসের চেষ্টা করেছিল, তাদের ক্ষতিই হয়েছে।যেমন একবার স্থানীয় এক উপজাতির লোকজন কুঠারটি উপড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। না-পেরে কুঠারের ওপরের অংশটি কেটে নিয়েছিল। এর জেরে লোহার সম্প্রদায়ের মধ্যে মরক লাগে। বহু মানুষের মৃত্যু হয়। লোহার উপজাতিরাও এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যায়।

প্রতি বছর মহাশিবরাত্রি উপলক্ষে তিন দিন ধরে টাঙ্গিনাথ ধামের মন্দির চত্বরে মেলা বসে এবং ব্যাপক ভক্ত সমাগম হয়।

ফিরে আসবো আগামী দিনে। নতুন বিষয় নিয়ে। চলবে ধারাবাহিক আলোচনা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

মন্দির রহস্য – জগদীশ পন্ডিতের জগন্নাথ মন্দির

নদিয়া  জেলায় চাকদা থেকে অল্প দূরেই বাংলার অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক জগন্নাথ মন্দিরটি অবস্থিত।এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা চৈতন্য  মহাপ্রভুর  অন্যতম  পারিষদ  জগদীশ পণ্ডিত স্বয়ং। আজকের পর্বে এই জগন্নাথ মন্দির নিয়ে লিখবো । জানাবো অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।  গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু তখন সপারিষদ  নিলাচলে  অবস্থান  করছেন। প্রথা অনুসারে সেবার   জগন্নাথ  দেব যখন নবকলেবর  ধারণ করেন।তখন জগদীশ  পণ্ডিত  পুরীর  জগন্নাথ  দেবের  পরিত্যক্ত পুরোনো দারুময়  বিগ্রহটি  সংগ্রহ করেন এবং পুরীধাম থেকে  বহন  করে নবদ্বীপের  উদ্দেশে  যাত্রা  করেন।  তার উদ্দেশ্য ছিলো  বিগ্রহ  পুনঃ  প্রতিষ্ঠা  করা।  বিশাল  বিগ্রহ  দণ্ডে  ঝুলিয়ে  দুজনে  কাঁধে  করে  বয়ে  নিয়ে  চলেছেন। স্বাভাবিক ভাবেই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার ফলে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন এবং এই স্থানে রাত্রি  যাপন  করলেন।পরদিন সকালে জগন্নাথ দেবকে কাঁধে  তুলবার  সময়  আর  ওঠাতে  পারলেন  না। কাঠের মূর্তি যেনো   পাথরের থেকেও বেশি ভারী হয়ে গেছে কোনো যাদু বলে।দৈববাণী  হল যে আমি  এখানেই  অবস্থান  করব। সেই  থেকে  জগন্নাথ  এখানেই  আছেন।এখানেই তার মন্দির নির্মাণ হয় জগদীশ  পণ্ডিত তার বাকি  জীবন  এখানেই  বসবাস  করে  জগন্নাথ  সেব  করেন।স্বয়ং শ্রীচৈতন্যদেব  ও  শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু  এখানে  পদার্পণ  করে  ছিলেন।পূর্বে  মন্দির সংলগ্ন একটি  সুপ্রসিদ্ধ  দোলমঞ্চও ছিল।যা এখন প্রায় ধ্বংস  প্রাপ্ত।সুভদ্রা  ও  বলরাম  বিহীন  জগন্নাথ  দেবের  কাঠের  বিগ্রটির উচ্চতা  ৪ ফুট ।পুরীধাম  থেকে  জগন্নাথ  দেবের  বিগ্রটি বহন করে  আনবার  জন্য  জগদীশ  পণ্ডিত  যে  বড়  লাঠিটি  ব্যবহার করেছিলেন  সেটি  এখানে আজও  সযত্নে  রক্ষিত  আছে।জ্যৈষ্ঠ  পূর্ণিমায়  জগন্নাথ  দেবের  স্নানযাত্রা,পৌষমাসের  শুক্লা  তৃতীয়া  তিথিতে  জগদীশ  পণ্ডিতের  তিরোভাব  উৎসব  এখানে নিষ্ঠা সহকারে পালন করা হয়।বহু এমন ঐতিহাসিক মন্দির নিয়ে আলোচনাবাকি আছে। চলতে থাকবে এই ধারাবাহিক অনুষ্ঠান। ফিরে আসবো। পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম- চট্টেশ্বরী দেবী

বাংলাদেশের বিখ্যাত মন্দিরসমূহের মধ্যে অন্যতম শ্রী শ্রী চট্টেশ্বরী কালী মায়ের বিগ্রহ মন্দির যা নিয়ে আমার আজকের পর্ব।জনশ্রুতি মতে এটি একটি সতীপীঠ । যেখানে দেবী সতীর দেহের কোনও একটি অংশ পড়েছিল দক্ষযজ্ঞের পরে ।প্রায় ৩০০-৩৫০ বছর পূর্বে আর্য ঋষি যোগী ও সাধু সন্ন্যাসীদের মাধ্যমে শ্রী শ্রী চট্টেশ্বরী দেবীর প্রকাশ ঘটে। এটি বাংলাদেশের বন্দর নগরী চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরী সড়কে তিন পাহাড়ের কোণে অবস্থিত।এখানে মন্দিরের বাঁধানো চত্বরটির বাঁদিকে কালী মন্দির ও ডানদিকে শিব মন্দির।শিব মন্দিরের পাশে রয়েছে একটি কুন্ড।মানুষ বিশ্বাস করেন এই কুন্ডের জলে অলৌকিক ক্ষমতা আছে।চট্টেশ্বরী মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত আদি কালীমূর্তি নিয়ে কিংবদন্তি রয়েছে। মন্দিরের সেবাইতেদের ধারণা অনুযায়ী স্বপ্নাদিষ্ট কালীমাতার একটি নিমকাঠের মূর্তি নির্মাণ করেছিলেন এখানকার মহারাজা।সেই মূর্তিটি ছিলো দক্ষিণকালীর। যাঁর পুজো করলে জাগতিক ও পারমার্থিক সবরকম ফললাভ হয় বলে মনে করা হতো ।পরবর্তীতে চট্টেশ্বরী মাতার সাধনা শুরু করেন চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালি থানার সরোয়াতলি গ্রামের অধিবাসী সাধক রামসুন্দর দেবশর্মণ।তন্ত্র সাধনার পাশাপাশি মায়ের পুজোও নিয়মিত চলতে থাকে।কথিত আছে স্বাধীনতার আগে কবি নবীন চন্দ্র সেন তথা তত্‍কালীন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এই মন্দিরে নিত্য পুজোর ব্যবস্থা করেছিলেন।পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকহানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা এই মন্দিরটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং মন্দিরের সেবায়েতের বাড়ি ও বিগ্রহ বিনষ্ট করা হয়। শ্রীচট্টেশ্বরী মাতার প্রাচীন নিমকাঠের মূর্তিটি খণ্ডবিখণ্ড করেছিল।পরে মূর্তিটির যে অংশগুলি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল সেগুলি জোড়া দেওয়া হয় এবং নতুন করে দেবী মূর্তি তৈরী হয়।তারপর বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করার পরে মন্দিরটি সংস্কার করা হয়।দেবী চট্টেশ্বরীর বর্তমান মূর্তিটি কষ্টিপাথরের। শ্বেতপাথরের শিব মায়ের শ্রীচরণতলে শায়িত।আজও তন্ত্র মতে নিষ্ঠা সহকারে দেবীর পুজো হয়।ফিরে আসবো। নতুন কোনো মন্দিরের কথা বা দেবী মাহাত্ম নিয়ে।ধারাবাহিক এই অনুষ্ঠানে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম- সিমলা গড়ের ডাকাত কালী

আজকের পর্বে আপনাদের নিয়ে যাবো সিমলা গড়। হুগলিতে অবস্থিত এই অঞ্চল এক সময় হরিহর পুর নামে পরিচিত ছিলো আর বিখ্যাত ছিলো এখানকার ডাকাতদের জন্য। সেই ডাকাত দলের সর্দার ছিলো বিশ্বনাথ ওরফে বিশে।

ডাকাত সর্দার বিশে অত্যাচারী জমিদারদের শায়েস্তা করতে ডাকাত দল তৈরি করে ডাকাতি করেন। তাকে ধরার জন্য ইংরেজরা নানা ধরনের ফাঁদ পেতেছিল কিন্তু তাৎক্ষণিক বুদ্ধির কৌশলে প্রতিবারই তিনি অধরা থেকে যেতেন।

অবশেষে ১৮১৮ সালে ডাকাতি করার সময় পুলিশের জালে ধরা পরে যায় বিশে ডাকাত এবং বিচারে তার ফাঁসি হয়।

সিমলাগড় ডাকাত কালীবাড়ি প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো, শোনা যায় ডাকাতরা ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে নরবলি দিত সিমলাগড় কালীবাড়িতে কিন্তু একবার এক তান্ত্রিক পুরোহিত তন্ত্রসাধনা করতে এসে নরমুন্ড দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এরপর থেকেই নরবলি বন্ধ হয়ে যায়, ছাগ বলি চালু থাকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে সৈন্যচলাচল বাড়তে শুরু করল ওই এলাকায়। মানুষরাও ভয় কাটিয়ে মায়ের পুজো দিতে শুরু করতে, ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো ভক্তের সংখ্যা। পরে মন্দির সংস্কার করে আরও বড় মন্দির তৈরী হল। মন্দিরে মায়ের মূর্তিটি মাটির নয় পাথরের। নিয়ম মেনে প্রতিবছর তা রঙ করা হয়।

আজও এখানে নিষ্ঠা সহকারে তন্ত্র মতে কালী পুজোয় মাছ-সহ ১০৮ রকমের ভোগ দেওয়া হয়। দীপান্বিতা অমাবস্যায় বিশেষ পুজো হয় এবং পয়লা বৈশাখে প্রচুর ভক্তের সমাগম ঘটে।

যথা সময়ে আবার ফিরে আসবো। নতুন কোনো মন্দিরের কথা বা দেবী মাহাত্ম নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একটি অলৌকিক অভিজ্ঞতা

আজ অবধি আপনাদের অনেক অলৌকিক কাহিনী বলেছি, অনেক আধ্যাত্মিক রহস্য নিয়ে আলোচনা করেছি, বহু প্রাচীন মন্দিরের অদ্ভুত সব ইতিহাস আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি।তবে সেগুলি প্রায় সবই প্রচলিত কিংবদন্তী বা জনশ্রুতি যার মধ্যে কিছু শাস্ত্র থেকে পাওয়া পৌরাণিক ঘটনাও আছে। কিন্তু আজ আপনাদের নিজের নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া একটি অদ্ভূত ঘটনার কথা বলবো। ঘটনাটি অলৌকিক কিনা তা আপনারাই ঠিক করবেন।সময়টা আশির দশকের মাঝামাঝি। তখন ছাত্র জীবন। খুব সম্ভবত দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা সবে শেষ হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই হাতে অফুরন্ত সময়। কি করবো কোথায় যাবো এই যখন ভাবছি একদিন এক বন্ধু প্রস্তাব দিলো পুরুলিয়া যাওয়ার। তার বাবার একটি যাত্রার দল আছে।পুরুলিয়ায় তার বাবার যাত্রা মঞ্চস্ত হবে।সেই উপলক্ষে সে যাবে। চাইলে সাথে আমিও যেতে পারি। শুনেই যেনো হাতে চাঁদ পেলাম। কারন নাটক থিয়েটার যাত্রার প্রতি আমার একটা টান ছিলো। পুরুলিয়ার ছোউ নাচ নিয়ে অনেক শুনেছি। পত্র পত্রিকায় বিস্তর ছবিও দেখেছি। কখনো সামনাসামনি দেখার অভিজ্ঞতা হয়নি। তাছাড়া ভ্রমন কাহিনীতে মামা ভাগ্নে পাহাড় জয় চন্ডী পাহারের কথাও শুনেছি। ভেবে দেখলাম নিখরচায় এমন বেড়ানোর সুযোগ কোনোমতে হাত ছাড়া করা যাবেনা।কোনো রকমে বাবা মাকে রাজি করিয়ে। ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।প্রথমে ট্রেনে করে পুরুলিয়া তারপর গাড়িতে কয়েক কিলোমিটার পেরিয়ে পৌছালাম। এক প্রত্যন্ত গ্রামে। এখানেই হবে যাত্রা।পৌঁছাতে রাত হয়ে গেছিলো। দূর থেকে ভেসে আসা ধামসা মাদলের শব্দ। ঝিঁঝি পোকার ডাক। বাতাসের সো সো শব্দ। অন্ধকার এক মায়াবী রাজ্যে এনে ফেলেছিলো আমাদের। থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিলো এক স্কুল বাড়িতে। রাতে মোটা চালের ভাত। কুমড়োর ঘ্যাট আর সোনা মুগের ডাল দিয়ে খাওয়া দাওয়া সেরে কিছুক্ষন স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরে চাঁদের আলোয় ঢাকা কোনো এক নাম না জানা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বেশ কিছুক্ষন গল্প করলাম দুই বন্ধু। দলের বাকিরা ততক্ষন ঘুমের দেশে।আমরাও দেরি না করে শুতে গেলাম। ক্লান্তিতে বেশি দেরি হলোনা ঘুম আসতে।পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতে নিজেকে এক অদ্ভুত অপার্থিব জগতে নতুন করে আবিষ্কার করলাম। দূষণ হীন। কোলাহল মুক্ত নির্মল প্রকৃতি। যেদিকে দুচোখ যায় সবুজ আর সবুজ। মেঠো রাস্তা। দূরে উঁচু উঁচু টিলা গুলো যেনো হাতছানি দিয়ে ডাকছে। স্কুল মাঠেই যাত্রার মঞ্চ ও অস্থায়ী দর্শকসন তৈরী হয়েছে। গোটা দল ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে নিজের ঝালিয়ে নেয়ার কাজে। স্থানীয় একটি ছেলের সাথে বেশ আলাপ জমে যায়। শুনলাম কাছেই। বিখ্যাত এক প্রাকৃতিক জলপ্রপাত আছে। নাম বামনি জল প্রপাত।রুটি তরকারি দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে সেই নতুন বন্ধু ও আমরা দুজন বেরিয়ে পড়লাম। সেই জলপ্রপাত দেখতে। বিকেল বিকেল ফিরে এসে বিশ্রাম নিয়ে রাতে যাত্রা দেখবো। এই ছিলো পরিকল্পনা।কিছুটা মেঠো পথ। মাঝে মাঝে সবুজ উন্মুক্ত প্রান্তর। কথাও আবার লাল মাটির কাঁচা রাস্তা দুদিকে জঙ্গল। এই সব পেরিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম। নতুন আলাপ হওয়া ছেলেটির সাথে কথা বলে জানলাম যে সে এখানকার বাসিন্দা নয়। আসলে সে মামার বাড়ি বেড়াতে এসেছে। আগে দু একবার মাত্র সে এই পথে এসেছে।তার বাড়ি গিরিডিতে। যাই হোক সূর্য যখন মাথার উপর থেকে কিছুটা ঢলে পড়েছে পশ্চিম দিকে তখন এসে পৌছালাম সেই বিখ্যাত জলপ্রপাতের সামনে।সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে। একটা ছোটো পাহাড় থেকে প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্টি জল রাশি প্রবল তেজে আছড়ে পড়ছে নিচে পাথুরে জমিতে। একটা শির্ণ নদী বয়ে চলেছে দূরে কোথাও।এতো জোরে জলের শব্দ হচ্ছে কিছুই আর শোনা যাচ্ছেনা। কিছুক্ষন একটা পাথরের উপর বসে তিন জন সবটুকু প্রাণ ভরে দেখে নিলাম। বিকেল গড়িয়ে আর কিছুক্ষন পর সন্ধ্যে হয়ে যাবে। আলো থাকতে থাকতে ফিরতে হবে। তাই উঠে রওনা দিলাম।কিছুক্ষন হেঁটেই বুঝলাম কি মস্ত ভুল হয়েছে। তিন জনেরই খিদেতে পেট চুই চুই করছে। সাথে খাবার নেয়া উচিৎ ছিলো। ভেবেছিলাম হাতে কিছু টাকা আছে কিছু কিনে খেয়ে নেবো। কিন্তু এই পান্ডব বর্জিত দেশে কোনো দোকান পাঠ চোখেই পড়লোনা।খিদে তেষ্টায় আর ক্লান্তিতে অবস্থা বেশ কাহিল। হাঁটতেও বেশ কষ্ট হচ্ছে।কোনো রকমে সামনের একটা বাঁক ঘুরতেই চোখে পড়লো এক গাছে তলায় এক বৃদ্ধা বসে আছেন। পরনে লাল পাড় দেয়া সাদা তবে মলিন শাড়ি। পাশে একটি পুটলি রাখা আছে।আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখে তিনি যেনো মৃদু হাসলেন। আমরাও মন্ত্র মুগ্ধর মতো তার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম। জিগেস করলাম আপনি কে? এখানে কি করছেন? মৃদু হেসে বৃদ্ধা বললেন। আমি এখানেই থাকি। তোমাদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি। আমার কাছে খাবার আছে। তোমরা আগে খেয়ে নাও। আমরা কিছু বলার আগেই তিনি পুটলি খুলে কলা পাতায় আমাদের জন্য মোটা চালের ভাত আর কলাইয়ের ডাল বেড়ে দিলেন।কথা না বাড়িয়ে আমরা খেতে শুরু করলাম। মনে হলো এমন সুস্বাদু খাবার আর এতো তৃপ্তি করে জীবনে আগে কখনো খাইনি। খাওয়া শেষে তিনি বললেন ওই দূরে একটা পুকুর আছে যাও জল খেয়ে হাত মুখ ধুয়ে এসো। তার কোনো কথাই যেনো অগ্রাহ্য করা যায়না। এগিয়ে গেলাম তিনজন। সত্যি একটা পুকুর আছে। নির্মল জল। খেলাম। হাত মুখ ধুলাম।তারপর আবার আগের জায়গায় ফিরে এলাম। কিন্তু আশ্চর্য সেই বৃদ্ধা আর নেই। তার কোনো চিহ্নই নেই। মনে হলো যেনো স্বপ্ন দেখলাম একটু আগে। অবাক হয়ে যখন পরস্পরের মুখ চাওয়া চাই করছি তখন বন্ধু বললো। চল আর দেরি করলে সন্ধ্যে হয়ে যাবে। অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলবো।সে রাতে যাত্রার ভালোই জমে ছিলো। সব শেষে যখন শুতে গেলাম তখন প্রায় ভোর হতে যায়। কিন্তু ঘুম আসেনি। সারারাত সেই বৃদ্ধার হাসি মাখা মুখখানি যেনো চোখের উপর ভাসছিলো। ভোর হয়ে গেলো কখন বুঝতেই পারলাম না। সকালে এলাকার মুরুব্বি গোছের লোক এসে বললো আজ আমাদের ঘুরতে নিয়ে যাবে। কেউ যেতে চাইলো না। রাতে ট্রেন গোছ গাছ আছে। সেই আমরা তিন তার গাড়িতে বেরোলাম ঘুরতে। কাছেই বড়ন্তি বলে একটি পাহাড় ঘেরা সুন্দর গ্রাম আছে। সেখানে যাওয়া হবে। গেলাম সেখানে। সারাদিন ঘুরলাম। অপূর্ব অভিজ্ঞতা।সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে সেখানে।একটি হ্রদ এবং চারপাশে পাহাড় রয়েছে। বিকেলে ফেরার পথে একটি জায়গায় এসে সেটা চিনতে পারলাম। হ্যা কাল এখানেই সেই বৃদ্ধার সাথে দেখা হয়েছিলো। গাড়িটা থামাতে বলে তিন জন নামলাম। এক কাঠুরিয়া কিছু কাঠ কেটে মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছে। কথা বলে জানলাম স্থানীয় লোক। তাকে সেই বৃদ্ধার কথা জিগেস করতে তিনি যেনো আকাশ থেকে পরলেন। বললেন এখানে অমন কেউতো থাকেনা। জীবনেও তিনি দেখেননো ওই রকম কোনো বৃদ্ধাকে এখানে।বাকি পথটা গাড়িতে প্রায় চুপ চাপ এলাম। কারুর মুখে কোনো কথা নেই। সবাইকে অন্যমনস্ক।জানিনা তিনি কে ছিলেন। আমার কাছে অন্তত তিনি সাক্ষাৎ মা অন্নপূর্ণা। যিনি কাউকে অভুক্ত থাকতে দেননা।প্রতি বছর অন্নপূর্ণা পুজোর সময়ে আমার বৃদ্ধার কথা মনে পরে। সামনের ২৯ মার্চ আমার গৃহ মন্দিরে অন্নপূর্ণা পুজো অনুষ্ঠিত হবে।জানিনা আর তার দেখা পাবো কিনা। তবে তার আরাধনা করে ধন্য হবো সেই দিন।জানাবেন কিরকম লাগলো আমার এই অভিজ্ঞতা। আমন্ত্রণ রইলো অন্নপূর্ণা পুজোর। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।