Home Blog Page 93

মন্দির রহস্য – পঞ্চানন্দ ঠাকুরের মন্দির রহস্য

দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জ এ প্রাচীন এক মন্দিরে পঞ্চানন ঠাকুরের মূর্তি সাড়ে তিনশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পূজিত হয়ে আসছে।আজকের পর্বে জানাবো এই মন্দিরের রহস্যময় ইতিহাস।পঞ্চানন বা পাঁচু ঠাকুর বাংলার এক বিখ্যাত লৌকিক দেবতা। লোকবিশ্বাসে ইনি মহাদেব শিবের এক লৌকিক রূপ আবার অন্যমতে,ইনি শিবের মানস পুত্র। মূলত গ্রামরক্ষক রূপে পঞ্চানন পূজিত শস্যদেবতা হিসাবেও তার পূজার প্রচলন আছে। মহাদেব শিবের সঙ্গে পঞ্চানন ঠাকুরের দেহাকৃতি ও বেশভূষার সাদৃশ্য আছে।পঞ্চাননের গাত্রবর্ণ লাল এবং চোখমুখের ভঙ্গি রুদ্ররূপী; বেশ বড় গোলাকার ও রক্তাভ তিনটি চোখ ক্রোধোদ্দীপ্ত। প্রশস্ত ও কালো টিকালো নাক, দাড়ি নেই, গোঁফ কান অবধি বিস্তৃত। মাথায় পিঙ্গলবর্ণের জটা চূড়া করে বাঁধা এবং তার মধ্যে জটা কিছু বুকে পিঠে ছড়ানো। কানে ধুতুরা ফুল বিরাজমান।গলায় ও হাতে বেশ বড় পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষমালা থাকে। হাতে ত্রিশূল ও ডমরু; পায়ে খড়ম এবং মাথায় বা দেহের উপর সাপ বিদ্যমান। পাশে থাকে পঞ্চরংয়ের বা পাঁচমুখো গাঁজার কলকে।উর্ধাঙ্গ অনাবৃত নিম্নাঙ্গ বাঘছাল পরিহিত।বহুকাল আগে যখন টালিগঞ্জের আদিগঙ্গার পাড়ে জন বসতি সেই ভাবে গড়ে ওঠেনি সেখানে বাস করতে বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য্য নামে এক পূজারী ব্রাহ্মণ। এক রাতে বৈদ্যনাথ স্বপ্ন দেখলেন, পঞ্চানন ঠাকুর এসেছেন। বর্তমানে যে মূর্তি আমরা দেখি, সেই রূপে। ঠাকুর বলছেন, এই গঙ্গার ঘাটে আমি তোর অপেক্ষায় আছি। জলের মধ্য থেকে উদ্ধার করে আমাকে নিয়ে চল দ্রুত।পুজো করার আদেশ ও পেলেন।পরের রাতে আবার একই স্বপ্ন ভোর হতে তখনো খানিকটা সময় বাকি, কিন্তু অপেক্ষা করলেন না তিনি। সেই রাতেই গ্রামের কয়েকজন ভক্তকে ডেকে নিয়ে, সস্ত্রীক চললেন গঙ্গার ঘাটে।ঘাটে এসে তিনি দেখলেন, তিনটে প্রায় চারকোণা আকৃতির পাথর রাখা আছে জলের ধারে, আর তিনটিই রক্তাভ। তিনটে পাথরকে এক বিরাট সাপ জড়িয়ে আছে। সেই পাথর তুলে এনে তিনি স্থাপন করলেন নিজের মন্দিরে। পরবর্তীতে স্বপ্নে দেখা রুপ মিলিয়ে তৈরি হলো মূর্তি শুরু হলো পুজো।এই রকম জনশ্রুতি আর ভক্তির সাথে মিলেমিশে রয়েছে এই পঞ্চানন ঠাকুরের মন্দির ও তার অস্তিত্ব।চলতে থাকবে দেবী মাহাত্ম ও মন্দির রহস্যনিয়ে আলোচনা। ফিরে আসবো পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম: বজ্রবরাহী দেবী

দেবী মাহাত্ম নিয়ে এই ধারাবাহিক আলোচনায় আজ পর্যন্ত আপনাদের দেবী দূর্গা দেবী কালী সহ তাদের বিভিন্ন রূপ গুলি নিয়ে আলোচনা করেছি আজ এই পর্বে বৌদ্ধ দেবী বজ্র বরাহীর কথা হবে।উত্তর সিকিমের এক দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে এই বজ্রবরাহীর মন্দির আছে। প্রতি শনিবার রাতে সেখানে পূজা হয়।বলেও শোনা যায় তবে ব্লু পাইন,ফার আর বার্চের গভীর অরণ্যের মধ্যে অবস্থিত সেই মন্দিরে একমাত্র যারা বৌদ্ধ বজ্রযানীতন্ত্রে সিদ্ধ তারাই পূজা দিতে আসে।বহু মানুষ বিশ্বাস করেন তন্ত্রের এই দেবীর পূজা দিলে অনন্ত শক্তির মালিক হওয়া যায়। জগতের সমস্ত সাফল্য অর্জন করা যায়।বৌদ্ধ ধর্মের বজ্রযানি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে এই এই দেবীর মাহাত্ম উল্লেখ করা আছে।আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপালেও বহু প্রাচীন বজ্রবরাহী দেবীর মন্দির আছে।যারা এই দেবীর পুজো করেন তারা বিশ্বাস করেন বজ্রবরাহী দেবী তুষ্ট হলে ভক্তকে অভীষ্ট ঋদ্ধি আর সিদ্ধি প্রদান করেন। আবার,দেবীকে তুষ্ট করতে না পারলে বা সাধনায় কোনো ভণ্ডামি থাকলে দেবী সাধককে কঠোর শাস্তি দেন।দেবীর সঙ্গিনী মেখলা এবং কনখাল নামে দুই মায়াবী নারী অনেকটা সনাতন ধর্মের ডাকিনী যোগিনীর ন্যায়।দেবী বজ্রর ন্যায় কঠিন ও তার মাথা বরাহর। তিনি দুষ্টের দমন ও সিষ্টের পালন করেন।বজ্র বরাহী দেবী আগাগোড়া রহস্যআবৃত। তার মাহাত্ম বৌদ্ধ তন্ত্রে অপরিসীম।তার রূপ থেকে তার পুজো পক্রিয়া সবই রহস্যময় এবং সাধারণ ভাবেই বেশ কৌতূহলের বিষয়।ফিরে আসবো পরের পর্বে। অন্য কোনো দেবী মাহাত্ম নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্মা- সেবকেস্বরী

দার্জিলিং বেড়াতে গেলে অনেকেই একবার সেবক কালীবাড়ি ঘুরে আসেন। শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক যাওয়ার পথে ৩১ নম্বর জাতীস সড়কের ধারে কালী মন্দির।সেবকেশ্বরী নামে খ্যাত এই কালী মন্দির নিয়ে আজকের পর্ব।সেবকেশ্বরী মন্দিরে দেবী দর্শনের জন্য অন্তত ১০৭টি সিঁড়ি পেরতে হয়। খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে তৈরি হয়েছে এই সিঁড়ি। অদ্ভূত নির্জন পরিবেশ।দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে এই মন্দির এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করে।বিশেষ অমাবস্যা তিথি গুলিতে শিলিগুড়ি ও সংলগ্ন এলাকা থেকেই নয়, বহু দূর দূরান্ত থেকে ভক্তরা দেবী দর্শনের জন্য আসেন। রাতভর চলে দেবীর আরাধনা। এরপর সকাল থেকে শুরু হয় খিচুড়ি ভোগ নিবেদন। অন্তত দেড়শো কড়াই খিচুড়ি হয় কালীপুজোর রাতে।কালীপুজোর দিনগুলোতে এই সেবকেশ্বরী কালীমন্দিরে ভক্তদের ঢল নামে। পাহাড়ের নির্জনতায় কালী মায়ের আরাধনা। অনেকেরই বিশ্বাস, দেবী অত্যন্ত জাগ্রতা। দেবীর কাছে অন্তর থেকে প্রার্থনা করলে ভক্তের মনস্কামনা পূরণ করেন তিনি।সেবক পাহাড়ের উপর হয় দেবীর আরাধনা তাই দেবীর নাম সেবকেশ্বরী।মন্দিরের সামনে পঞ্চমুন্ডির আসন রয়েছে। সেটা স্বপ্নাদেশে পাওয়া। পুজোয় সাদা ভাত, পাঁচরকম ভাজা, তরকারি, পায়েস, লুচি, দই, মিষ্টি মাকে নিবেদন করা হয়। তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে বোয়াল মাছ দেবীর ভোগ হিসাবে নিবেদন করা হয়।। রাতভর চলে দেবীর আরাধনা। এরপর সকাল থেকে শুরু হয় খিচুড়ি ভোগ নিবেদন। অন্তত দেড়শো কড়াই খিচুড়ি হয় কালীপুজোর রাতে।শুধু শিলিগুড়ি ও সংলগ্ন এলাকা থেকেই নয়, বহু দূর দূরান্ত থেকে ভক্তরা দেবী দর্শনে। আগামী পর্বে আবার ফিরে আসবো দেবি মাহাত্ম নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম – দশ ভূজা কালী মূর্তি

বাংলায় দশ ভূজা মানে সাধারণ দেবী দুর্গাকেই বোঝায় আর দেবী কালী মানে চতুর্ভুজা।কিন্তু মায়ের এই দুই রূপই বহু বছর ধরে একত্রে পুজিতা হয়ে আসছে দক্ষিণ বঙ্গের প্রত্যন্ত এক অঞ্চলে।দেবী আদ্যাশক্তি এখানে অর্ধ কালী ও অর্ধ দুর্গারূপে বিরাজ করছেন। আজকের পর্বে এই অদ্ভুত কালী মূর্তিনিয়ে আলোচনা করবো।প্রায় দুই শতাব্দী প্রাচীন পুজোটির পিছনে রয়েছে এক অলৌকিক ঘটনা। শোনাযায় ১৮৬৪ সালে পূর্ববঙ্গের ঢাকার জেলায় দারোগা ছিলেন হরিকিশোর ঘোষ একরাত্রে স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন জগজ্জননী মায়ের।মূর্তি গড়ে পুজো করতে হবে।সঙ্গে সঙ্ঙ্গে শুরু হল পুজোর তোড়জোড়। এক শুভতিথিতে সূচনা করলেন মূর্তি তৈরির কাজ। ধীরে ধীরে চিন্ময়ী দেবী রূপ পেতে লাগলেন মৃন্ময়ী প্রতিমায়। কিন্তু মূর্তি তৈরির একেবারে শেষ পর্যায় পটুয়ারা হলুদ রঙ করা মাত্রই মূর্তির ডানদিকের অংশের রঙ বদলে যায় কালো রঙে।সবাই অবাক হলো। কিন্তু তখন হরিকিশোরের মনে পড়ল তার স্বপ্নের দেবীমূর্তিও যেন ঠিক সাধারণ ছিল না বিচিত্র ছিলো তাঁর রূপ। এই সঙ্কটের মুহূর্তে কুলপুরোহিত তাকে উপদেশ দিলেন দেবীকে অর্ধকালী অর্ধদুর্গা রূপ দিতে। কারন দেবীর হয়তো তাই ইচ্ছে। দেশভাগের পর ঘোষ বংশের উত্তরপুরুষরা চলে আসেন এপার বাংলায়।শুরু হয় দশ ভূজা দুর্গা ও ঘোর কৃষ্ণ বর্ণের পুজো একই কাঠামোতে। একই মূর্তিতে।নির্দিষ্ট মাপের পাটাতনের ওপর একচালার প্রতিমা। দেবীর শরীরের ঠিক মাঝ বরাবর চুলচেরা ভাগ- ডানদিকে অমানিশারূপী দেবী কালিকা এবং বামদিকে তপ্তকাঞ্চনবর্ণা দেবী দুর্গা।দূর্গা পুজোর সময় নতুন করে সাজানো হয় পূজা মণ্ডপ এবং দেবী মূর্তিও তৈরী হয় ঠাকুর দালানে।পুজোর আচার-বিধিও কিছু ভিন্ন।মায়ের প্রতীকরূপে দর্পনকে স্নান করানোর রীতি এখানে। স্নানে লাগে ১০৮রকমের জল।নিষ্ঠা সহকারে পুজো পরিচালিত হয় তিথি মেনে তারপর দশমীর সকালে দর্পন বিসর্জন হয়। সন্ধ্যাবেলা বাড়ির সধবা মহিলারা দেবীকে বরণ করেন। এরপর বাড়ির পুরুষেরা মহা সমারহে দেবীকে বিসর্জন দেন বাড়ির পুকুরে। দেবীর এই অদ্ভুত রুপ দেখতে আসেন বহু দর্শণার্থী।দেবী মাহাত্ম নিয়ে চলতে থাকবে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা।ফিরে আসবো পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম – চিনিশ পুর কালী বাড়ি

বাংলার কালী মন্দির নিয়ে বলতে গেলে এমন কিছু কালী মন্দিরের কোথাও বলতে হবে যা দেশ ভাগের পর ওপার বাংলা অর্থাৎ বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এমনই এক কালী মন্দির ওপার বাংলার চিনিশ পুর কালী মন্দির।যতীন্দ্র মোহন রায়ের ‘ঢাকার ইতিহাস’ গ্রন্থে শ্রী শ্রী চিনিশপুর কালিবাড়ীটির ইতিহাস জানা যায়।আজ এই মন্দির নিয়ে লিখবো।নরসিংদী চিনিশপুর গ্রামে অবস্থিত এই প্রাচীন মন্দির।এই স্থানের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে প্রায় এক একর জমির উপর বেড়ে উঠা বিশালাকার বট বৃক্ষ যা আমাদের হাওড়ার বোটানিক্যাল গার্ডেনের বট গাছের কথা মনে করিয়ে দেয়।ব্রিটিশ আমলে নীলকর জেমস ওয়াইজের দেওয়ান রামকৃষ্ণ রায় বর্তমান মন্দিরটি নির্মাণ করেন।কালীবাড়ীর অদূরেই একসময়ে নীল কুঠি ছিল। বর্তমানে নীল কুঠির ভাঙ্গা ভিটা ও পরিত্যক্ত ইঁদারা কোনো রকমে টিকে আছে।চিনিশ পুর কালীবাড়ীর প্রতিষ্ঠাতা সাধক দ্বীজরাম প্রসাদ ‘চীন ক্রম’ নামের সাধন প্রণালীতে অভ্যস্ত ছিলেন। চীন ক্রম থেকেই চিনিশপুর গ্রামের নামকরণ হয় বলে ধারণা করা হয়।চিনিশ পুর কালী বাড়িতে কোন প্রতিমা নেই।দেবালয়ের মধ্যভাগে একটি চতুস্কোন বেদী এবং বেদীর উপর কালিকা যন্ত্র আঁকা আর এই যন্ত্রেই দেবী মায়ের অধিষ্ঠান।জাগ্রত এই মন্দির নিয়ে একটি অদ্ভুত কিংবদন্তী প্রচলিত আছে শুরুর দিন থেকেই।কথিত আছে এই মন্দিরে কেউ রাতে থাকতে পারে না আজ অবধি রাতে জপধ্যানে বসে কেউ জীবিত আসতে পারেনি এই মন্দির থেকে।শোনা যায় একবার শ্রী শ্রী নিগমানন্দ পরম হংস দেব তার চারজন অন্তরঙ্গ শিষ্য সহ উক্ত চিনিশপুর কালী দর্শন আসেন এবং রাতে থাকা মনস্থির করেন।তারপর গভীর রাতে মন্দিরে ঢুকেই ঠাকুর দরজার বন্ধ করে দিলেন। আসনে বসে একটু ধ্যানস্থ হতেই ঠাকুর কারও উপস্থিতি অনুভব করল। চোখ মেলে দেখেন এক কিশোরী তার বাম পা ঝুলিয়ে ও ডান পা তার বাম উরুতে রেখে বসে আছে, মুক্ত কেশী পরমাসুন্দরী লালচেলী পরা। তার রুপের জ্যোতিতে মন্দির আলোকিত।সাধক মায়ের চরণে প্রণাম জানিয়ে দিব্য অনুভূতি নিয়ে ফিরে এসেছিলেন।চিনিশপুর কালীবাড়ী নিয়ে বহু এমন সব অলৌকিক ঘটনার খোঁজ পাওয়া যায় যেমন কালীবাড়ীর পুকুরে হাত দেখিয়ে একবার দেবী তার ভক্তকে বলেছিলেন দেখ তোর শাঁখা আমি হাতে পরেছি।বহু এমন দেবী মন্দির রয়েছে সারা দেশে। আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য কোনো দেবী মাহাত্ম নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম – পুরুষোত্তম পুরের ডাকাত কালী

বাংলার কালী মন্দির গুলি নিয়ে লিখতে বা বলতে গেলে অনিবার্য ভাবে ডাকাত কালী প্রসঙ্গ আসবেই।আজ আপনাদের জানাবো।হুগলির পুরুষোত্তম পুরের সনাতন ডাকাতের কালীপুজোর কথা।স্বাধীনতার বহু আগে। দুর্গম এই অঞ্চলে ডাকাতরাই দাপিয়ে বেড়াতো। প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে যারা একটু অর্থবান তারা সনাতন ডাকাতের ভয়ে সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকতো।দুঃসাহসী ডাকাত সর্দার ছিলেন সনাতন বাগদী। নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে দেবী কালীর উপাসনা করতেন তিনি।তার ডাকাত দল নিয়ে বহু কিংবদন্তী প্রচলিত আছে যার একটি আজ আপনাদের বলছি।একদিন সনাতন বাগদী ডাকাতি করতে বের হবেন। অমাবস্যার রাতে মায়ের পূজা দিয়ে তবেই কাজে বেরোবে তারা। সেইমতো নানা পূজার উপাচারে সেজে উঠেছে মন্দির। এদিকে সেদিকে ছড়িয়ে বসে আছে ডাকাত দল। সবাই অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত এবং সুরাপনে মত্ত। হঠাৎ সনাতন উচ্চকণ্ঠে ‘বলি কোথায়?’ বলে চিৎকার করে উঠলো। সবাই দেখলো তাইতো। মায়ের বলীর ব্যবস্থা করা হয়নি।দলের ডাকাতেরা ভয়ে জানালো চৈত্র মাস! ঝড় বৃষ্টি লেগেই আছে! সব ওলট-পালট করে দিচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ । ঘর থেকে বের হতে পারেনি কেউ।তাই মায়ের বলীর ব্যবস্থাও করা হয়নি।সর্দার সনাতন রাগে গর্জে উঠলো ‘সে কী! চৈত্র মাস বলে মা অনাহারে থাকবেন? বলী হবেনা।না তা হবে না! গভীর রাতেই হুকুম হলো।যে ভাবে পারিস বলি ধরে আন।’ কিন্তু সেদিন ডাকাতরা তার কথা শুনলোনা কারন ডাকাতির ভাগবখরা নিয়ে আগে থেকেই দলে অসন্তোষ ছিল। সর্দারের বিরুদ্ধে তলে তলে বিদ্রোহ হচ্ছিলো আগে থেকেই।নিজের চ্যালাদের এই অবহেলায় ক্ষেপে উঠলেন সনাতন ডাকাত ।রাগে কাঁপতে কাঁপতে তিনি বললেন, “আমার আদেশ অমান্য করা! এত বড় স্পর্ধা! তোদের সবকটাকে আজ মায়ের পায়ে বলি দেব।”এই বলে হুঙ্কার দিয়ে রাগে আক্রোশে উন্মুক্ত তরবারি হাতে নিজের দলের লোকেদের ওপরেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন ডাকাত-সর্দার সনাতন।বহু ডাকাত নাকি সেদিন তার হাতে প্রাণ হারায়। তার দল ও ক্ষমতা হারায় এবং ক্রমে ডাকাতি প্রায়বন্ধ হয়।তবে আজও ডাকাত কালীর পুজো হয় নিষ্ঠা সহকারে। দেবী খুবই জাগ্রত এবং বহু মানুষ নিজের মনোস্কামনা নিয়ে আসেন দেবীর কাছে।ফিরে আসবো পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম- পাথুরিয়া ঘাটার কালী

যে শহরের নামই দেবী কালীর নামে। সেই শহরে যে অসংখ্য কালী মন্দির থাকবে সেটাই স্বাভাবিক এবং আমি আগেও কলকাতার কালী মন্দির গুলি নিয়ে অনুষ্ঠান করেছি।কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ সব জায়গায় আছে প্রসিদ্ধ সব কালী মন্দির এবং তাদের নিয়ে রয়েছে বহু গল্প ও জনশ্রুতি। আজ আপনাদের জন্য উত্তর কলকাতার পাথুরিয়াঘাটার কালী মন্দিরের কথা নিয়ে এসেছি এই পর্বে।সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসও। খোদ বাঘাযতীনের হাত দিয়ে শুরু পাথুরিয়াঘাটা ব্যায়াম সমিতির কালীপুজো।পরবর্তীতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু স্বয়ং সভাপতিত্ব করেছেন এই পুজোর।লোকমুখে এই কালী বড়োকালী নামেই পরিচিত। আকারে তা যে বেশ বড়ো, তাতে সন্দেহ নেই। ৩১ ফুট উঁচু মূর্তির হাতে ৬ ফুটের খড়গ। দক্ষিণা কালীর মতোই এই মূর্তির বামহাতের একটিতে খড়গ অন্যটিতে অসুরমুণ্ড। ডানহাতে বরাভয় মুদ্রা।প্রথমে একটু গোড়ার কথা বলে নেয়া দরকার।পুজোর শুরু হয় স্বদেশি যুগের প্রথম যুগে। তখন অনুশীলন সমিতির শাখা তৈরি হচ্ছিল নানা জায়গায়। এর মধ্যেই ১৯০৮ সালে অতুলকৃষ্ণ ঘোষ এবং যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে তৈরি হয় পাথুরিয়াঘাটা ব্যায়াম সমিতি। এই যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ই বাঘাযতীন।তারপর ঘটে যায় আলিপুর বোমা কান্ড । অনুশীলন সমিতি নিষিদ্ধ হয়। গোপনে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড চলতেই থাকে। কিন্তু প্রকাশ্যে অনুশীলন সমিতির সমস্ত কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় পাথুরিয়াঘাটা ব্যায়াম সমিতির কাজও।ব্রিটিশ বিরোধী যুদ্ধে ১৯১৫ সালে বুড়িবালামে প্রাণ হারালেন বাঘাযতীন। এরপর ১৯২৮ সালে জেল থেকে মুক্তি পান অতুলকৃষ্ণ। আবার শুরু হয় কালীপুজো। এই ১৯২৮ সালকেই পুজোর শুরু ধরা হয়। ২ বছর পর ১৯৩০ সালে পুজোর সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র।বনেদি বাড়ির পুজো গুলির পাশাপাশি পুরোনো দিনের কলকাতার পুজো আজও বেশ আলোচিত।ফিরে আসবো আগামী পর্বে। দেবী মাহাত্ম নিয়ে। সঙ্গে থাকবে নতুন কোনো দেবী পুজোর কথা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্মা – দশ মাথার কালী মূর্তি

বাংলা হলো শক্তি সাধনার আদি ভূমি। তাই বাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য কালী মন্দির। দেবী বিভিন্ন রূপে বিরাজ করছেন বিভিন্ন স্থানে। আজ আপনাদের যে দেবীর কথা বলবো তিনি দশ মাথা বিশিষ্ট কালী।দেবী খুবই জাগ্রত বলে মানুষের বিশ্বাস।দেবীর এই রূপে পূজিতা হন মালদার ইংরেজ বাজার এলাকায়।শাস্ত্রে দেবীর এই রূপ মহাকালী নামে পরিচিত।মালদার এই পুজোর ইতিহাস বেশ রোমাঞ্চকর এবং কিছু রীতি নীতি বেশ অদ্ভুত। আজও প্রথা মেনে দিনের আলোয় পূজিতা হন দশ মাথা কালী। বলি প্রথা আজও আছে এবং শোল মাছের টক বিশেষ প্রসাদ হিসেবে চলে আসছে বহু দিন থেকে তখন ১৯৩০ সাল, দেশে তখন শাসন করছে ইংরেজরা। মালদহে চরম অত্যাচার চালিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার।ব্রিটিশের অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষজন বিদ্রোহ করার সিদ্ধান্ত নেন। তখন নিজেদের মধ্যে শক্তি আর সাহস বৃদ্ধি করতে শুরু হয় এই কালীপুজো।দেবীর ১০ মাথা, ১০ হাত এবং ১০ পা রয়েছে। প্রতিমায় শিবের কোন অস্তিত্ব নেই। দেবীর পায়ের তলায় রয়েছে অসুরের কাটা মুণ্ডু।কিছু ধর্ম শাস্ত্রে এই রূপের উল্লেখ থাকলেও দেবীর এই রূপের পুজোর প্রচলন খুব একটা হয়নি।শোনা যায় বিহারের বিন্দুবাসিনীতে পাহাড়ের গায়ে প্রাচীন যুগে খোদাই করা রয়েছে এই মূর্তি। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে যেখানে মহাকালীর মন্দির রয়েছে, সেখানে তন্ত্র সাধনা করতেন এলাকার এক তন্ত্র সাধক।সাধনার জন্য তৈরি করেন পঞ্চমুণ্ডির আসন। সেই আসনের ওপরে দেবীর বেদি নির্মিত হয়েছে। আজও তন্ত্র মতেই দেবীর পুজো হয়।প্রতিবছর কালী পুজোয় প্রথা মেনে এখানে শোভাযাত্রা সহকারে মন্দির পর্যন্ত মাকে নিয়ে যাওয়া হয়। দেবীর পুজো দেখতে আসেন দূর দূরান্তর মানুষ।আবার ফিরে আসবো পরের পর্বে।দেবী মাহাত্ম নিয়ে পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মহাত্ম- রাজবল্লবী মাতার মন্দির

দেবী মহাত্ম শীর্ষক এই পর্বেআপনাদের হুগলি জেলার অন্তর্গত রাজবলহাটের দেবী রাজবল্লভী মন্দিরের কথা লিখবো।দেবী রাজবল্লভী দ্বিভূজা। তাঁর ডান হাতে একটি ছুরি আর বাঁ হাতে ধরা সিঁদুরের পাত্র। কটিদেশে ছোট ছোট হাতের কোমরবন্ধ, গলায় নরমুণ্ডের মালা‌। সব মিলিয়ে দেবী কালিকার সঙ্গে রাজবল্লভীর কিছু মিল আছে তবে গায়ের রং সাদা।দেবীর পায়ের নিচে একটি নয়, বরং দুটি শিবমূর্তি দেখতে পাওয়া যায়। ডান পা রয়েছে কালভৈরবের বুকের উপরে। আর বাম পা রাখা আছে বিরূপাক্ষ শিবের মাথায়।বহু ঐতিহাসিক মনে করেন রাজবল্লভী মায়ের নামেই রাজ বল হাট নাম হয়েছে এই স্থানের।শোনা যায়, বহুকাল আগে যখন এই অঞ্চলের পাশ দিয়ে কংসাবতী নদী বয়ে যেত, তখনই এক সদাগর দেবীর দেখা পান। তিনিই এখানে মন্দির তৈরি করেন। তবে এটি নিছক জনশ্রুতি হতে পারে কারন ইতিহাস অন্য কথা বলছে।রাজবলহাট তথা দেবী রাজবল্লভীর প্রতিষ্ঠা করেন রাজা সদানন্দ রায়।স্থানীয় রাজা সদানন্দ রায় একবার দামোদর ও রণ নদীর মধ্যবর্তী জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে মৃগয়া করতে গিয়েছিলেন। সেখানে থেকে ফিরে প্রাণীহত্যার জন্য গভীর মনস্তাপে পড়ে যান। পরবর্তীতে সেই মনোস্তাপ থেকে মুক্তি পেতে গুরুর নির্দেশে গভীর অরণ্যে মাতৃ সাধনা শুরু করেন এবং দ্বিভূজা, ষোড়শীর বেশে রাজাকে দর্শন দিয়ে দেবী নির্দেশ করেন, এই জঙ্গলেই যেন তার মূর্তি প্রতিষ্ঠা এবং নিত্য পুজোর ব্যবস্থা করা হয়। আর রাজা যেন নিজের রাজ্যে ফিরে গিয়ে পুনরায় রাজধর্ম পালনে ব্রতী হন।সেই আদেশ অনুসারে স্থাপিত হয় রাজবল্লভী মায়ের মন্দির।সম্ভবত ব্রাহ্মণ বা উচ্চবর্ণের রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা পান বলেই দেবীর নাম রাজবল্লভী।আজও পূজার্চনার রীতিনীতিতে নানা তান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ দেখা যায়। রাজবল্লভী দেবীর স্বভাবও রাজকীয়। তিনি প্রতি রাত্রে কাঠের পালঙ্কে নিদ্রা যান। রাতে হঠাৎ তামাক সেবনের ইচ্ছাও হয় মাঝে মাঝে। তাই মন্দিরের এক কোণেই প্রস্তুত রাখা থাকে গড়গড়া। তবে খাবারের বিষয়ে তাঁর কোনো আড়ম্বর নেই। কোনোরকম সম্বরা না দিয়ে প্রতিদিন সিদ্ধ ভোগ রান্না হয় মন্দিরের লাগোয়া রন্ধনশালায়। বহু ভক্তকে সেই ভোগ পরিবেশন করা হয়।ফিরে আসবো পরের পর্বে অন্য কোনো দেবী মহাত্ম নিয়ে।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

আন্তর্জাতিক মাতৃ ভাষা দিবসের শুভেচ্ছা

ভারতবর্ষ এমনই এক বৈচিত্রপূর্ণ দেশ যে দেশে কয়েক কিলোমিটার অন্তর অন্তর বদলে যায় ভাষা। এই ভাষাকে নিয়ে আমাদের অনেক গর্ব অনেক অহংকার। প্রত্যেকের কাছেই তার মাতৃভাষা মধুরতম এবং সুন্দরতম। আজ এই মাতৃভাষাকে সন্মান জানানোর দিন।তাই প্রথমেই আপনাদের সবাইকে জানাই আন্তর্জাতিক মাতৃ ভাষা দিবসের অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন|আজ ভাষা দিবসের ইতিহাসকেও এক বার ফিরে দেখা যেতে পারে|তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান জন্ম হওয়ার পর পশ্চিম পাকিস্তানের ঊর্দুভাষীরা ধর্মের দোহাই দিয়ে উপনিবেশবাদী ভাবধারায় পূর্ব পাকিস্তানকে করায়ত্ত করতে চাইল ঐ ভাষাকে আশ্রয় করেই, অর্থাৎ উর্দু কে প্রায় জোর করেই চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছিলো বাঙালির জাতীয় ভাষা হিসেবে, প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিলো লক্ষ লক্ষ বাঙালি, শুরু হয়েছিলো ভাষা আন্দোলন|এরপর দীর্ঘ পথ, বহু আন্দোলন, রক্তাক্ত সংগ্রাম এবং ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্র‌ুয়ারি বাংলার ৮ই ফাল্গ‌ুন ১৩৫৮ অধুনা বাংলাদেশের সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, প্রানের বিনিময়ে এলো সাফল্য ও স্বীকৃতি যা পরবর্তীকালে পথ দেখালো সারা পৃথিবীকে, হয়ে রইলো এক অনন্যা সাধারণ নিদর্শন|পরবর্তীতে রাষ্ট্র সংঘে প্রস্তাব রাখা হলো, ওই বিশেষ দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃ ভাষা দিবসের স্বীকৃতি দানের জন্যে, ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা-বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা, ইউনেস্কো ২১শে ফেব্র‌ুয়ারি “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসাবে স্বীকৃতি দিল এবং ২০০০ সাল থেকে প্রায় গোটা বিশ্ব জুড়ে আন্তর্জাতিক মাতৃ ভাষা দিবসে হিসেবে পালিত হচ্ছে|আজ একুশে ফেব্রুয়ারীরে আর কোনো নিদ্দিষ্ট দেশের নয়, তা গোটা বিশ্বের মাতৃ ভাষা প্রেমী মানুষের উৎসবের দিন।ভাষা আন্দোলনে শহীদ হওয়া বীর বঙ্গ সন্তান দের শ্রদ্ধা জানানোর দিন।সবাইকে আরো একবার আন্তর্জাতিক মাতৃ ভাষা দিবসের শুভেচ্ছা|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|