Home Blog Page 92

বিশেষ পর্ব – পদ্মনাভ মন্দির রহস্য

আজকের পর্বে কেরলের বিখ্যাত ও বিতর্কিত পদ্মনাভ মন্দির নিয়ে আলোচনা করবো। এই মন্দির নিয়ে রহস্যর শেষ নেই। তবে সেই রহস্য ময় জগতে প্রবেশ করার আগে এই মন্দিরের প্রাচীন ইতিহাস কিছুটা জেনে নেয়া প্রয়োজন।এই মন্দিরটির উল্লেখ রয়েছে মহাভারত থেকে শুরু করে বিষ্ণু পুরাণ, মৎস পুরাণ, স্কন্দপুরাণ, বরাহপুরাণ, পদ্মপুরাণ সহ একাধিক ধর্মগ্রন্থে। ভগবান বিষ্ণু তাঁর অনন্তশয়ান মুদ্রায় পূজিত হন এখানে।মনে করা হয় খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে এই মন্দির নব রূপে প্রতিষ্ঠা করেন ত্রাভাংকোর প্রসিদ্ধ রাজাদের মধ্যে অন্যতম মার্তন্ডা বর্মা শ্রীপদ্মনাভস্বামী মন্দিরের বিষ্ণু মুর্তিটি গঠন শৈলীর জন্য জগৎ প্রসিদ্ধ কারন নেপালের গন্ডকী নদীর তীর থেকে নিয়ে আসা এক হাজারের বেশি শালগ্রাম শিলা দিয়ে নির্মিত এই মূর্তি |মন্দিরের গর্ভ গৃহে একটি পবিত্র বেদীর উপর আঠেরো ফুট দৈর্ঘ্যর দেবমূর্তিটি রয়েছে যা তিনটি ভিন্ন দরজা থেকে দর্শন করা যায়|ক্রমানুসারে মস্তক এবং বক্ষ প্রথম দরজা দিয়ে, হস্তগুলি দ্বিতীয় দরজা দিয়ে এবং পদযুগল তৃতীয় দরজা দিয়ে দর্শন করা যায়|সেই প্রাচীন কালে এই সুক্ষ জ্যামিতিক হিসেবে নিকেশ কিভাবে সম্ভব হয়েছিলো তাও এক রহস্য।এই মন্দিরের প্রধান রহস্য এই মন্দিরের বিপুল ধনভান্ডার যেখানে ঠিক কি কি আছে তার সন্ধান আজও পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।কয়েক বছর আগে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে অনুসন্ধান চালিয়ে এই মন্দিরের অভ্যন্তরে ৬টি প্রকোষ্ঠের সন্ধান পাওয়া যায়, যার প্রত্যেকটি থেকে উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ সোনা। সব মিলিয়ে কয়েক লক্ষ কোটি টাকার সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিস এখান থেকে পাওয়া যায়|তবে মূল রহস্য এই ৬টি প্রকোষ্ঠ ছাড়িয়ে ৭ নম্বরে প্রকোষ্ঠ কে কেন্দ্র করে । এই প্রকোষ্ঠটি আজ পর্যন্ত খোলা সম্ভব হয়নি যার প্রধান কারন ধর্মীয় বিশ্বাস ও কিছুটা আইনি জটিলতা| এই প্রকোষ্ঠের দরজায় দুটি সাপের চিহ্ন আঁকা রয়েছে। কিন্তু কোনও স্ক্রু, তালা বা অন্য কিছু নেই, যা দিয়ে তা খোলা যেতে পারে|একটি কিংবদন্তি অনুসারে এই প্রকোষ্ঠের দরজা ‘নাগবন্ধনম’ দ্বারা আবদ্ধ যা কেবল মাত্র একটি নিদ্দিষ্ট মন্ত্রের বিশেষ উচ্চারণেই খুলতে পারে|আজও এক রহস্য এই বন্ধ দরজা। প্রত্যক্ষদর্শী রা বলেন বন্ধ দরজায় কান পাতলে নাকি ভিতরে জলের স্রোতের শব্দ শোনা যায় এমনকি প্রকোষ্ঠের ভিতরে সাপের হিস-হিস শব্দও শোনা গিয়েছে বলে অনেকে জানান|ঠিক কি আছে এই বন্ধ দরজার ওপারে তা নিয়ে জলপনার শেষ নেই।কেউ কেউ মনে করেন ওই বন্ধ প্রকোষ্টে রয়েছে অপার ঐশ্বর্য, ধন সম্পদ আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন এর মধ্যে রাখা রয়েছে সৃষ্টিরহস্যের চাবিকাঠি|যতটা সম্পত্তির আভাস পাওয়া গেছে তাতেই পৃথিবীর ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত যত হিন্দু মন্দিরের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বিত্তশালী মন্দির পদ্মনাভস্বামীর মন্দির।ঠিক কি ভাবে এই মন্দিরে এই অতুল ঐশর্য জমা হয়েছে তা নিয়েও কয়েকটি মতবাদ আছে।অনেকে মনে করেন দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সোনার খনি ছিল একসময়। সুমেরীয় আমলে মালাবার অঞ্চলে ছিল ব্যবসা বাণিজ্যের বেশ কয়েকটি কেন্দ্র। বাণিজ্যে উন্নতির আশায় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময়ে নানা মূল্যবান সোনার নৈবেদ্য দান করত বিভিন্ন মন্দিরে।সেই ভাবে এই মন্দির এতো সম্পত্তির অধিকারী হয়েছে। আবার অনেকে মনে করেন মুসলিম যুগে নিজেদের ধন সম্পত্তি সুরক্ষিত রাখতে এই মন্দিরের মধ্যে গোপন কুঠুরিতে রাজারা তাদের সম্পদ লুকিয়ে রাখতো।সম্পদের উৎস যাই হোক এই মুহর্তে সব থেকে বেশি আলোচিত বিষয় এই গুপ্তধনের ঘরের বন্ধ দরজা।মন্দিরের পূজারী ও শাস্ত্রজ্ঞদের মতে, এই দরজা যে খুলবে প্রাণসংশয় হতে পারে তাঁর। জোর করে দরজা খোলার চেষ্টা হলে তা রাজ্য বা দেশের উপর বয়ে আনতে পারে সাংঘাতিক দুঃসময়। এমনকি একবার আইনি পথে দরজা খোলার পরিকল্পনা হয় কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আবেদনকারীর রহস্য জনক ভাবে মৃত্যু হয়।তারপর থেকে আর ওই দরজা খোলার চেষ্টা হয়নিজগতের কিছু রহস্য হয়তো রহস্য থাকাই শ্রেয়।ফিরে আসবো এমনই কোনো রহস্য নিয়ে আগামী পর্বে। থাকবে নতুন কোনো অজানা এবং অলৌকিক বিষয়। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বিশেষ পর্ব – অমর নাথ রহস্য

ভারতের প্রাচীন তীর্থ ক্ষেত্র গুলি অনেক রহস্যগোপন করে রেখেছে নিজের মধ্যে। শুধু ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতা নয়। রয়েছে অনেক ইতিহাস এবংপৌরাণিক কাহিনী। এমনই এক প্রাচীন এবংনানা রকম রহস্য দিকে মোরা অমরনাথ।আজকের পর্বে লিখবো এই অমরনাথ নিয়ে।অমরনাথ গুহার আবিষ্কার সম্পর্কে একটি প্রাচীন জনশ্রুতি আছে। শোনা যায় এক রাখাল একদিন এই পাহাড়ি অঞ্চলে ভেড়া চড়ানোর সময়ে।এক জটাধারী সন্ন্যাসীর দেখা পায় তিনিতাকে কয়লা ভর্তি একটি ব্যাগ দিয়েছিলেন।সেই রাখাল বাড়িতে গিয়ে যখন সেই ব্যাগটিদেখে তখন তার মধ্যে শোনা দেখে চমকে ওঠে । অদ্ভূত ভাবে কয়লা সোনায় পরিণত হয়েছে।সে এই রহস্যর উত্তর পেতে সেই সন্ন্যাসীর সন্ধানে ফিরে যান সেই পাহাড়ে । সন্ন্যাসীকে খুঁজতে গিয়ে তিনি একটি পাহাড়ি গুহা দেখতে পান।তবে সেই সন্ন্যাসী সেখানে ছিলেন না। তখন থেকেই এই স্থানটি তীর্থস্থান হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।সেই গুহাই আজকের অমরনাথ গুহা।অমর নাথে বাবা মহাদেবকে বরফানি বাবানামে ডাকা হয়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ভাবে বরফ দিয়ে বছরের একটি নিদ্দিষ্ট সময়ে সৃষ্টি হওয়া শয়ম্ভু দেবাদিদেবের উচ্চতা পরিবর্তিত হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, বরফানি বাবার উচ্চতা চাঁদের আলোকে কমতে থাকে এবং বাড়তে থাকে। যখন পূর্ণিমা থাকে তখন শিবলিঙ্গ তার পূর্ণ আকারে থাকে। অন্যদিকে, অমাবস্যার দিনে শিবলিঙ্গের আকার কিছুটা কমে যায়।এই শিবলিঙ্গেঅবিরাম তুষার ফোঁটা পড়তে থাকে।যেনো বাবার জলাভিষেক হয়ে চলেছে প্রতি মুহূর্তে।পুরান অনুসারে এই গুহায় ভগবান শিব দেবী পার্বতীকে অমরত্বের গোপন রহস্য বর্ণনা করেছিলেন।প্রতি বছর অমরনাথ যাত্রার সময় পবিত্র গুহায় একজোড়া পায়রা উড়ে এসে বসে। গুহায় শিবলিঙ্গের পাশাপাশি ওই জোড়া পায়রা দর্শন করাও অত্যন্ত শুভ।কিভাবে এবং কেনোপায়রার এই জোড়া এখানে আসে সেই নিয়েএকটি পৌরাণিক কাহিনী আছে।আগেই বলেছি পৌরাণিক কাহিনি মতে অমরনাথের এই পবিত্র গুহায় দেবী পার্বতীকে ভোলেনাথ অমরত্তর রহস্য ব্যাখ্যা করেছিলেন।এই জায়গায় এই ঘটনা ঘটেছিলো কারন শর্ত ছিলো আর কেউ এই জ্ঞান শুনবে না।তাই নির্জন স্থানে মহাদেব দেবীকে নিয়ে যান।শিব যখন পার্বতীকে এই গোপন জ্ঞানপ্রদান করছিলেন, সেই সময় একই গুহায় একজোড়া পায়রা উপস্থিত ছিল।সেই পায়রা যুগল ও শুনলো জন্ম মৃত্যুর অমোঘ চক্র থেকে মুক্তির পথ সম্পর্কিত নানা কাহিনি।এবং এই কাহিনি শোনার পর জোড়া পায়রা অমরত্ব লাভ করে। সেই দিনের পর থেকে আজ অবধি পবিত্র গুহায় তাদের দেখা যায়।আগামী পর্বে আবার ফিরে আসবো এমনই অদ্ভুত এবং রহস্য ময় কোনো দৈব্য স্থনের অজানা ইতিহাস নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

বিশেষ পর্ব – তারাপীঠের ইতিহাস

বর্তমানে যে তারাপীঠ মন্দির বাংলার তন্ত্র সাধনার পীঠস্থান হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে তার ইতিহাস কিন্তু বহু প্রাচীন এবং নানা দিক দিয়ে বেশ রহস্যময়। মূলত দুভাবে এই মন্দিরের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যকে ব্যাখ্যা করা যায় এক পুরাণ এবং লোককথা।সেদিক দিয়ে এই মন্দির হাজার বছর পুরোনো আবার বর্তমান মন্দিরের স্থাপত্যর বিচারে বা বামা নাটোর রাজপরিবার এবং ক্ষেপার সময় কাল থেকে ধরলে কয়েকশো বছরের ইতিহাস।শুরু করবো জয়দত্ত সদাগরের কথা দিয়ে ।আজ থেকে প্রায় আটশো বছর আগের ঘটনা। তিনি ছিলেন বীরভূমের রত্নাগড় নিবাসী। একবার তিনি বাণিজ্যে প্রভূত সম্পদ, অর্থ লাভ করে বাড়ি ফিরছিলেন। চলার পথে অসুস্থতায় মৃত্যু হল তাঁর সঙ্গে থাকা প্ৰিয় পুত্রের। বাড়ি ফিরেই ছেলের অন্ত্যেষ্টি করবেন স্থির করে তিনি মাঝিদের বললেন, পুত্রের দেহটাকে ভালো করে সংরক্ষণ করে রাখতে।এদিকে সন্ধ্যা নেমেছে। রাত্রিটা তাই পথেই বিশ্রাম নিতে হবে। চলতে চলতে থামলেন এক বিশাল জঙ্গলের পাশে। স্থানটির নাম চণ্ডীপুর।নিদ্রাহীন জয় দত্ত তখন মৃত ছেলের দেহ আঁকড়ে রাত জাগছেন। সেই সময় এক কুমারী মেয়ে নৌকার কাছে এসে দাঁড়ালেন। দেখা গেলো রাত্তির আকাশজুড়ে অপূর্ব এক জ্যোতি। অপূর্ব সুন্দরী সেই মেয়েটি জয়দত্তকে জিজ্ঞাসা করলেন,‘ও বাছা, এত নৌকা ভরে কী নিয়ে চলেছো গো?’ পুত্রশোকে জয়দত্তের মন ভারাক্রান্ত ছিল। তাই তিনি রাগত স্বরে মেয়েটিকে বললেন, ‘ছাই আছে’। সে কথা শুনে মেয়েটি ‘আচ্ছা’ বলে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে জয়দত্ত দেখলেন তাঁর নৌকার সব বাণিজ্যসামগ্রী, অর্থ ছাইতে পরিণত হয়েছে। পরদিন সকালে মাঝিরা রান্নায় বসল। খেয়েদেয়ে নৌকা নিয়ে যাত্রা করতে হবে। কাটা শোল মাছ কাছেই এক কুণ্ডের জলে ধুতে গেল তারা। কী আশ্চর্য! জলের স্পর্শ পেয়ে মাছটি জ্যান্ত হয়ে সাঁতরে চলে গেল। মাঝিরা দৌড়ে এসে জয়দত্তকে সব কথা জানাল। জয়দত্তের মনে পড়ল আগের রাতের সেই মেয়েটির কথা। তিনি বুঝতে পারলেন কোনো দেবী এসেছিলেন তার কাছে। অজ্ঞানতা বসত তিনি বুঝতে পারেননি।সেই রাতে দেবী তারা স্বপ্নে দেখা দিলেন এবং বললেন কুণ্ডের জল ছেলের গায়ে ছড়ালেই সে বেঁচে উঠবে। পরদিন বশিষ্ঠকুণ্ডের জল ছেলের গায়ে ছেটাতেই ছেলে ‘তারা তারা’ বলে বেঁচে উঠল সে। শুধু তাই নয় তিনি হারানো সম্পদও ফিরে পেলেন। সেদিন রাতে বী তাঁকে স্বপ্নে দর্শন দিলেন। তাঁকে আদেশ করে বললেন যে এই জঙ্গলের মধ্যে একটা শ্বেতশিমুল গাছের নীচে একটা শিলাবিগ্রহ রয়েছে। সেই বিগ্রহ একটা মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে তার পুজোর ব্যবস্থা করবি। আমি হলাম উগ্রতারা। জঙ্গলের মধ্যে শ্মশানে আমার বাস।’ পরদিন সকালে জয় দত্ত আদেশ অনুসারে জঙ্গলে খুঁজে খুঁজে শ্বেতশিমুল গাছের নীচ থেকে শিলাবিগ্রহ আবিষ্কার করলেন এবং তার কাছেই পেলেন চন্দ্রচূড় শিবের মূর্তি। বশিষ্ঠকুণ্ড বা জীবিতকুণ্ডের সামনে তাড়াতাড়ি মন্দির নির্মাণ করে সেই শিলামূর্তি ও চন্দ্রচূড় শিবের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করলেন এবং কাছেই মহুলা গ্রামের এক ব্রাহ্মণকে নিত্যপূজার দায়িত্ব দিয়ে বিদায় নেন।এই ছিলো তারাপীঠ মন্দির সৃষ্টির ইতিহাস।সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।আবার শাস্ত্র মতে এখানে সতীর ঊর্ধ্ব নয়নতারা বা প্রজ্ঞানয়ন পড়েছিল।শুধু তাই নয় সতীহারা শিব দেবীকে কামনা করে এখানে এসে সাধনা করেন। তিন লক্ষ জপ করেছিলেন। তাঁর সাধনায় তুষ্ট হয়ে তারা বলেছিলেন, তিনি আবার উমারূপে তাঁর কাছে স্ত্রী রূপে যাবেন। বশিষ্ঠ ঋষি বিষ্ণুর দ্বারা আদিষ্ট হয়ে তারা পীঠের সেই স্বেত শিমুল গাছের নিচে বসে সাধনা করেছিলেন।এবং সিদ্ধি লাভ করে ছিলেন।সমুদ্র মন্থনে ওঠা বিষ ওপান করে মহাদেব যখন নীলকণ্ঠ তখন ‘দেবী তারা’ শিবকে আপন সন্তানের মতো কোলে নিয়ে আপন স্তন্য থেকে অমৃত পান করান সেই অমৃত পান করে শিবের বিষজ্বালা দূর হল। সেই থেকে দেবীর নাম হল তারিণী। তিনি শিবকে তারণ করেছেন। এই বিশ্বকেও তিনি তারণ করেন।সেই তারিণী থেকেই তারা নামের সৃষ্টি।পরবর্তীতে সাধক বামা ক্ষেপা থেকে সাধক কমলা কান্ত সবার ও অন্যতম প্ৰিয় সাধন স্থল ছিলো এই তারাপীঠ। বামা ক্ষেপা তো তার সারাটা জীবনই কাটিয়েছেন এই তারা পীঠ মহাশ্মশানে। সেই সময় দেশ বিদেশ থেকে বহু বিখ্যাত মানুষ তারাপিঠে আসতেন শুধু একবার এই মাতৃ মন্দির দর্শন করতে এবং বামা ক্ষেপার আশীর্বাদ পেতে। সেই পরম্পরা অবশ্য আজও চলছে। যদিও দ্বারকা নদী দিয়ে বহু জল প্রবাহিত হয়েছে। আজ বামা ক্ষেপাও নেই সশরীরে তবু মানুষের আস্থা আছে। ভক্তি আছে। আর আছে তারাপীঠের সমৃদ্ধ ইতিহাস।ফিরে আসবো আগামী পর্বে এমনই কোনো অজানা রহস্যময় আধ্যাত্মিক স্থানের ইতিহাস নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বিশেষ পর্ব – জ্ঞান গঞ্জ রহস্য

আজ লিখবো রহস্যময় জ্ঞানগঞ্জ নিয়ে যার কথা প্রথম লোকসমক্ষে আসে১৯৩৩ সালে জেমস্ হিলটনের লেখা বিখ্যাতবই ‘লষ্ট হরাইজন’ এর মাধ্যমে ৷ এই জ্ঞান গঞ্জ শ্যঙ্গড়ী-ল্যা বা সাম্বালা উপত্যকা নামেও খ্যাতজ্ঞানগঞ্জ হল হিমালয়ের দুর্গম স্থানে লুকিয়ে থাকা এক রহস্যময় নগররাষ্ট্র। তিব্বতে এই নগররাষ্ট্রটিকে বলা হয়ে শাম্বালা। ভারতে বলা হয় জ্ঞানগঞ্জ বা সিদ্ধাশ্রম। এই নগররাষ্ট্রে প্রবেশ করার অধিকার সাধারণ মানুষের নেই। কারণ জ্ঞানগঞ্জ হল অমরলোক। এখানে কারও মৃত্যু হয় না। চেতনা এখানে সদা জাগ্রত থাকে।হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের উচ্চকোটির যোগী, সাধু, ঋষি, মুনি ও সিদ্ধপুরুষরাই কেবলমাত্র জ্ঞানগঞ্জে বাস করার আমন্ত্রণ পান। তবে সিদ্ধপুরুষ হলেই জ্ঞানগঞ্জে প্রবেশের অনুমতি মেলে না। যাঁরা জীবনে একটিও পাপ করেননি, কেবলমাত্র সেইসব সিদ্ধপুরুষরাই সর্বোচ্চ জ্ঞানলাভ করার জন্য এই আধ্যাত্মিক নগরীতে প্রবেশ করতে পারেন। কারণ জ্ঞানগঞ্জে লুকিয়ে রাখা আছে এই গ্রহের সর্বোচ্চ জ্ঞান। যে জ্ঞান পৃথিবীর ভাগ্য নির্ধারণ করে চলেছে।হিন্দু বা সনাতন ধর্মে জ্ঞানগঞ্জের নাম ‘সিদ্ধাশ্রম’। সিদ্ধপুরুষদের নির্জন আবাস হলো ‘সিদ্ধাশ্রম’। সিদ্ধাশ্রমের কথা বলা হয়েছে চতুর্বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত সহ বিভিন্ন প্রাচীন পুঁথিতে। বিষ্ণুপুরাণে বলা হয়েছে সিদ্ধাশ্রম হল শ্রীবিষ্ণুর সর্বশেষ অবতার বা কল্কি অবতারের জন্মভূমি। পুরাণ অনুসারে এই সিদ্ধাশ্রমের অবস্থান, বামন অবতার হয়ে মর্ত্যে আসা শ্রীবিষ্ণুর আশ্রমের পূর্বদিকে।বাল্মিকী রামায়ণে বলা হয়েছে, সিদ্ধাশ্রমের আবাসিক ছিলেন মহামুনি বিশ্বামিত্র। সিদ্ধাশ্রমের পরিবেশকে কলুষিত করা এক দানবকে শাস্তি দেওয়ার জন্য রাম লক্ষ্মণকেও তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন সিদ্ধাশ্রমে। নারদপুরাণে বলা হয়েছে হিমালয়ের গভীরে থাকা সিদ্ধাশ্রম হলো সিদ্ধ পুরুষ দের আশ্রম যেখানে তপস্যারত অবস্থায় আছেন অনেক সিদ্ধ যোগী ও যোগিনী।অনেকে বিশ্বাস করেন মহাবতার বাবাজি এইআশ্রমের আচার্য্য। তার বয়স ২০০০ এর বেশি।জ্ঞানগঞ্জের সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। হিমালয়ের এক গোপনস্থানে, সিদ্ধ-হ্রদ নামে একটি সুবিশাল হ্রদকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার বছর আগে গড়ে উঠেছে এই নগররাষ্ট্রটি। জ্ঞানগঞ্জের সুদৃশ্য বাড়ি ও প্রাসাদগুলি বর্ণময় পাথর দিয়ে তৈরি। বাড়ি ও প্রাসাদের দেওয়ালগুলিতে খোদাই করা আছে জ্ঞানগঞ্জের প্রতীক। যে প্রতীকে দেখতে পাওয়া যাবে আট পাপড়ি যুক্ত একটি পবিত্র পদ্মফুলকে। পদ্মটিকে ঘিরে আছে তুষারাচ্ছাদিত পর্বতমালা। পদ্মের মাঝখানে ঝলমল করছে অতীব উজ্জ্বল একটি স্ফটিক।দিনের বিভিন্ন সময় বদলে যায় জ্ঞানগঞ্জের পরিবেশ। গিরগিটি যেমন বিপদের আশঙ্কায় রূপ বদলে প্রকৃতিতে মিশে যায়। ঠিক সেরকমভাবেই হিমালয়ের বুকে প্রকৃতির রঙের মধ্যে হারিয়ে যায় জ্ঞানগঞ্জ। তাই ধরা পড়ে না সাধারণ চোখে। তাই নগররাষ্ট্রটির অবস্থান সম্পর্কেও কারও কোনও ধারণা নেই। বার বার রূপ বদলানোর ফলে জ্ঞানগঞ্জের হদিশ নাকি দিতে পারছে না বিজ্ঞানও। সত্যিই হিমালয়ে এরকম কোনও নগররাষ্ট্রের ধ্বংসাবশেষও খুঁজে পায়নি স্যাটেলাইট। অথচ অসংখ্য হিন্দু ও বৌদ্ধ পুরাণে হিমালয়ে লুকিয়ে থাকা এই নগররাষ্ট্রটির উল্লেখ আছেগৌতম সারাজীবন ধরে যা জ্ঞান অর্জন করেছিলেন তা জানিয়ে গিয়েছিলেন কয়েকজন শিষ্যকে। এই শিষ্যদের মধ্যে একজন ছিলেন শাম্ভালার রাজা সুচন্দ্র বা দাওয়া সাঙ্গপো।ভগবান বুদ্ধের কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞান লিপিবদ্ধ করে শাম্ভালায় নিয়ে গিয়েছিলেন দাওয়া সাঙ্গপো। লুকিয়ে রেখেছিলেন গোপন স্থানে। তিব্বতীরা বিশ্বাস করেন শাম্ভালা ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনও জায়গায় লিপির আকারে সেই জ্ঞান সংরক্ষিত নেই।তিব্বতীয় বৌদ্ধরা বিশ্বাস করেন রহস্যময় শাম্ভালা লুকিয়ে আছে ট্রান্স-হিমালয়ের কোনও দুর্গম জায়গায়। পৃথিবীর যখন ভয়ঙ্কর দুঃসময় আসবে, নীল পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে উদ্ধার করবেন শাম্ভালার ২৫ তম শাসক। ঔপন্যাসিক জেমস হিলটন শাম্ভালার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে লিখে ফেলেছিলেন ‘Lost Horizon, about the lost kingdom of Shangri-La’ নামের উপন্যাসটি। এখানে হিমালয়ের রহস্যময় নগররাষ্ট্র শাম্ভালা, তাঁর উপন্যাসে হয়ে গিয়েছিল শাংগ্রি-লা, যাতে তিব্বতীদের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত না লাগে।১৮৩৩ সালে হাঙ্গেরির গবেষক সিসোমা ডি কোরোস গবেষণা শুরু করেছিলেন জ্ঞানগঞ্জ বা শাম্ভালাকে নিয়ে। বছরের পর বছর তিব্বতে কাটালেও রহস্য ভেদ করতে পারেননি। এরপর জ্ঞানগঞ্জ রহস্যভেদ করতে ভারতে এসেছিলেন রাশিয়ার বিতর্কিত দার্শনিক ও রহস্যসন্ধানী মাদাম ব্লাভাটস্কি। রহস্যভেদ না করতে পারলেও রহস্যের আগুনে ইন্ধন দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন শাম্ভালা বা জ্ঞানগঞ্জ আসলে লুমেরিয়া ও অ্যাটলান্টিসের মতোই মায়াবী। তাকে খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব। কারণ নগরটি নিজে থেকে ধরা দিতে চায় নাজ্ঞানগঞ্জ বা শাম্ভালার ওপর গবেষণা করেছিলেন রাশিয়ার প্রখ্যাত দার্শনিক, লেখক, প্রত্নতাত্ত্বিক, চিত্রশিল্পী, ধর্মতত্ত্ববিদ নিকোলাই রোয়েরিখ। তাঁর মনে হয়েছিল জ্ঞানগঞ্জ বা শাম্ভালা লুকিয়ে আছে, মঙ্গোলিয়া ও তিব্বতের মাঝে থাকা আলতাই পর্বতশ্রেণির মধ্যে।ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ওয়েস্টার্ন কমান্ডের অফিসার ছিলেন এল পি ফারেল। ব্রিটিশ হলেও ভারতের দর্শন ও সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর ছিল ভীষণ আগ্রহ। সেই ফারেল সাহেব বলেছিলেন, ১৯৪২ সালে তিনি জ্ঞানগঞ্জে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। তাঁর ডায়রিতে ফারেল সাহেব লিখেছিলেন তার অভিজ্ঞতা।জ্ঞানগঞ্জ বা সিদ্ধাশ্রমের কথা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন প্রখ্যাত দার্শনিক, ভারত-তত্ত্ববিদ ও সংস্কৃত বিশারদ পন্ডিত গোপীনাথ কবিরাজ। জ্ঞানগঞ্জের কথা বলেছিলেন স্বামী বিশুদ্ধানন্দ পরমহংস। তিনি বলেছিলেন, তাঁকে ছোটবেলায় জ্ঞানগঞ্জে নিয়ে গিয়েছিলেন কোনও সিদ্ধপুরুষ এবং সেখানে বহু বছর সাধনা করেছিলেন তিনি । আজও ভারতে বহু ধর্মগুরু আছেন যারা জ্ঞান গঞ্জ প্রত্যক্ষ ভাবে দেখার কথা বলেন।অদ্ভূত তাদের অভিজ্ঞতা এবং সবার বর্ণনাই প্রায় একই রকম শোনায়।ফিরে আসবো আগামী পর্বে।এমনই কোনো রহস্য নিয়ে।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – যোগী রাজ কাঠিয়া বাবা

ভারতের সিদ্ধ যোগী দের মধ্যে অন্যতম একটি নাম শ্রী শ্রী রামদাস কাঠিয়া বাবাজি|তিনি আধ্যাত্বিক জগতের সিদ্ধ সাধকদের মধ্যে একজন এবং তার জীবন ও সাধনা আজও তার অসংখ্য ভক্ত ও অনুরাগীর ম্যধ্যে এক রহস্য স্বরূপ|আজকের পর্বে জানাবো কাঠিয়া বাবার জীবন সংক্রান্ত কিছু তথ্য এবং কিছু অলৌকিক ঘটনা।পাঞ্জাবের এক গ্রামে জন্মেছিলেন কাঠিয়া বাবা একবার কৈশোরে মাঠে মহিষ চরাতে চরাতে তিনি একজন উজ্জ্বলকান্তি সাধু পুরুষের দর্শন লাভ করলেন। অভুক্ত সেই সাধুকে তিনি আহার করান সাধু প্রসন্ন হয়ে তাঁকে বরদান করলেন যে, “তুমি যোগীরাজ হবে।” এই বরদান করে সাধু অন্তর্হিত হন।সেই সময় কাঠিয়া বাবাজী মহারাজের মনে হল যেন সংসারের প্রতি তাঁর সমস্ত আসক্তি কেটে গেছে|বড়ো হওয়ার সাথে সাথে সন্ন্যাস জীবন তাকে আকর্ষণ করতে শুরু করে।পরবর্তীতে তিনি পুরোপুরি গৃহ ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক সাধনার পথ বেছে নিলেন শুরু করলেন শাস্ত্র পাঠ ও ধ্যান জপ|খুব কম বয়সে তিনি গায়ত্রীতে সিদ্ধি লাভ করলেন|কথিত আছে স্বয়ং গায়ত্রীদেবী আবির্ভূত হয়ে তাঁকে দর্শন দিয়ে কৃতার্থ করেন|পরবর্তীতে শ্রীশ্রী দেবদাসজী কাঠিয়া বাবাজী মহারাজের সান্নিধ্যে আসেন তিনি যিনি ছিলেন একজন সিদ্ধ মহাপুরুষ|তার কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে তিনি।নাম হয় রাম দাস কাঠিয়া বাবা।শুরুর পথ ছিলো খুবই কঠিন।পদে পদেগুরু শিষ্যের কঠিন পরীক্ষা নিতেন|একবার গুরু দেব নির্দেশ দিলেন যে, “যত ক্ষণ না আমি ফিরে আসি তুমি এখানে এই আসনে বসে থাকবে। আসন ছেড়ে অন্য জায়গায় কোথাও যাবে না।” শ্রীরামদাসজী আট দিন একটানা সেই আসনে বসে আহার নিদ্রা প্রকৃতির ডাক উপেক্ষা করে।ফিরে এসে তাঁর গুরু আজ্ঞা পালনের প্রতি এই একনিষ্ঠতা দৃঢ়তা দেখে গুরুদেব খুব প্রসন্ন হলেন এরকম আরো অনেক পরীক্ষা এবং সাধনার নানা স্তর অতিক্রম করে সিদ্ধি লাভ করে প্রকৃত অর্থে যোগিরাজ হয়ে উঠেছিলেন রাম দাস বাবাজি|সারা ভারতের তীর্থ দর্শন করে বৃন্দাবনে পাকাপাকি ভাবে থাকতে শুরু করেছিলেন তিনি|নির্বাক সম্প্রদায়ের গুরুদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ট গুরু ও সাধক যার কাছে দীক্ষা নিয়েছেন অসংখ্য মানুষ।আকাশমার্গে বৃন্দাবন থেকে কলকাতায় আগমন করে একজনকে মন্ত্র প্রদান করেছিলেন তিনি একবার তিনি দেহে থাকাকালীন নিজেরই ছবি থেকে বহির্গত হয়ে একজনকে দীক্ষা দিয়েছিলেন।শোনাযায় তিনি এক কালে দুই পৃথক স্থানে ভক্তদের দর্শন দান করতে সমর্থ ছিলেন। শুধু তাই নয় এখনো পর্যন্ত তিনি তার প্রকৃত ভক্তদের দর্শন প্রদান করে থাকেন।একবার কাশীতে মা অন্যেপূর্ণার দর্শন পাওয়ার জন্য কাঠিয়া কাঠিয়া বাবা অন্ন জল ত্যাগ করেন।তিন দিন শুধু ধ্যান জপ করে কাটান। অবশেষেস্বয়ং মা অন্নপূর্ণা তার কুটিরে আবীরভূতা হন। এবং তার জন্য নিয়ে আসা দুগ্ধ পান করিয়ে তার জীবন রক্ষা করেন।এই মহান সাধক ও গুরুকে প্রনাম জানিয়ে আজকের পর্ব শেষ করছি। চলতে থাকবে নানানআধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – মহা যোগী পাহাড়ি বাবা

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

ভারতের আধ্যাত্মিক জগতে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র পাহাড়ি বাবা। পাহাড়ি বাবা তার সন্ন্যাস জীবনে লোক মুখে প্রচারিত নাম। পাহাড়ি বাবার সন্ন্যাস পূর্ব জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়না তবে তার জীবনের বহু অলৌকিক ঘটনা আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে যার মধ্যে দুয়েকটি আজ আপনাদের জানাবো।সর্বদা হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ধ্যান মগ্ন থাকার জন্য বাবার নাম হয় পাহাড়ি বাবা।শোনা যায় একদিন শ্রী শুকদেব বাবাজির স্বপ্নে আবির্ভূত হয়ে বললেন, “এই জায়গার নীচে আমার একটি প্রাচীন বিগ্রহ আছে, এটি আবিষ্কার করুন এবং এটি স্থাপন করুন।” জেগে উঠে বাবা জায়গাটি খনন করেছিলেন এবং সেদিন ছিলো বৈশাখ অমাবস্যা বাবা খাক চক নামক সেই স্থানে শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে শ্রী শুকদেবের শ্রীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন।শোনা যায় পাহাড়ি বাবা একবার এক ভক্তের সাথে গঙ্গাসাগর যাত্রা করেছিলেন জল পথে জাহাজে পৌঁছতে হয় সাগর দ্বীপে বতখন বাবার বয়স ছিল একশোর বেশি তার সাথে ক্ষীণকায় শরীর । এই দেখে জাহাজের ক্যাপ্টেন তার বয়স এবং শারীরিক কাঠামোর কথা বলে বাবাকে জাহাজে চড়তে নিষেধ করেছিলেন।সেই সময়ে গঙ্গা নদী তীরবর্তী সৈকতে পড়ে ছিল বটবৃক্ষের বিশাল কাণ্ড। বাবা সেই বিশাল কাণ্ডটা মাথায় তুলে নিয়ে ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমাকে বলুন, এটা কোথায় রাখব?” ক্যাপ্টেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না।কিভাবে এক বৃদ্ধ সাধু এই বিশাল কান্ড এই ভাবে তুলতে পারে তা তার বোধ গম্য হয়নি। তবে তিনি বোঝেন বাবা কোনো সাধারণ ব্যাক্তি নন তিনি সাথে সাথে বাবার চরণে আত্মসমর্পণ করলেন। বাবা তাকে ক্ষমা করেন এবং বলেন “কোনও সাধুকে তার বার্ধক্য বা দুর্বলতার জন্য উপহাস করবেন না, তিনি শ্রী রামের শক্তিতে চলেন”।পাহাড়ি বাবা সম্পর্কে আরো একটি অদ্ভুত এবং অলৌকিক ঘটনার কথা আজ বলবো।বাবা তখন বৃন্দাবনে একবার একজন ভক্ত দীক্ষা নেয়ার আশায় বাবার কাছে আসছিলো । কিন্তু বৃন্দাবনে পৌঁছানোর আগেই বাবা সমাধি গ্রহণ করেন । বৃন্দাবন এসে সব শুনে মনের দুঃখে সেই ভক্ত খাক চকে বাবার সমাধিতে অন্ন-জল ছাড়াই বসে রইলেন। এই ভাবে তিন দিন অতিক্রান্ত হয় চতুর্থ দিনে বাবা অলৌকিকভাবে সমাধি থেকে আবির্ভূত হন এবং সেই ভক্তকে সম্পূর্ণ শাস্ত্রীয় পদ্ধতিতে দীক্ষা দেন।বাবার অসংখ্য ভক্ত শিষ্য আজও রয়েছে। পাহাড়ি বাবার প্রয়াণের পর তার তারা বাবার সাধন মার্গ অনুসরণ করেন এবং আজও পাহাড়ি বাবা তার শিষ্য ও ভক্ত দের সব বিপদ ও প্রতিকূলতাথেকে রক্ষা করেন বলে তাদের বিশ্বাস।ফিরে আসবো আগামী পর্বে।অন্য কোনোগুরুর জীবনী ও অলৌকিক ঘটনায় সমৃদ্ধ উপস্থাপনা নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের অলৌকিক জীবন

গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে আমার এই ধারাবাহিক পর্বগুলি আপনাদের ভালো লাগছে জেনে আনন্দ পাচ্ছি। কারন আপনাদের জন্যই আমার এই বিশেষ উপস্থাপনা।আজ যে অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন প্রকৃত গুরুর কথা আপনাদের জানাবো।তিনি শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর যার সন্যাসজীবনের পূর্বের নাম ছিলো রাম চন্দ্র চক্রবর্তী|পরাধীন ভারতে ১৮৬০সালে বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলয় শ্রীঁরাধামাধব চক্রবর্তী ও শ্রীমতি কমলাদেবীর সন্তান হিসাবে শ্রীশ্রী রামঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন|রাম ঠাকুরের আরেক যমজ ভাই ছিলো তার নাম ছিলো লক্ষণ|তাদের পারিবারিক গুরু ছিলেন শ্রীঁমৃত্যুঞ্জয় ন্যায়পঞ্চানন|বালক রামচন্দ্র শৈশব থেকেই আধ্যাত্মিক চেতনার অধিকারী ছিলেন|শাস্ত্রে তার খুব আগ্রহ ছিলো মাঝে মাঝেই ঈশ্বর চিন্তা করে তিনি ভাব তন্ময় হয়ে যেতেন |ঈশ্বরে কে কেন্দ্র করে নানা আধ্যাত্মিক প্রশ্ন তার মনে ঘুরপাক খেতো এই ঈশ্বরের খোঁজেই ১৮৭২ সালে সকলের অজ্ঞাতে অজানাকে জানার লক্ষ্যে গৃহত্যাগী হন|পরে পৌঁছান পৌঁছালেন আসামের শ্রীশ্রী কামাক্ষ্যাদেবীর মন্দিরে এবং এক অক্ষয় তৃতীয়ার দিন শ্রীশ্রী রামঠাকুর দেখেন জটাধারী, দীর্ঘাঙ্গী এক জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ সামনে দাঁড়িয়ে|গুরু হিসাবে তিনি সেই দিব্য পুরুষ কে গ্রহন করলেন শুরু হলো তার সাধনা ও আধ্যাত্মিক যাত্রা|কঠিন সাধনায় একসময় তিনি হয়ে উঠলেন অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন রাম ঠাকুর অষ্টসিদ্ধি লাভ করলেন তিনি |বহু অলৌকিক ঘটনা তিনি ঘটিয়েছেন তার জীবদ্দশায় যার মধ্যে দুটি ঘটনা আজ আপনাদের বলবো।একবার ঠাকুর কলকাতায় এক ডাক্তার ভক্তের বাড়িতে ছিলেন। একদিন সকালে তাঁর বৈঠকখানার ঘরে তিনি, ঠাকুর এবং সেই সময়ের বিখ্যাত কবিরাজ জানকীনাথ দাশগুপ্ত বসে আছেন। ঠাকুর তাঁদের ধর্মের শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা শোনাচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখা গেল, ঠাকুরের হাতে ছোট ছোট গুটি বেরোতে শুরু করল। ক্রমে সেই গুটি তাঁর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। কবিরাজ জানকীনাথ দেখামাত্র বুঝতে পারলেন যে ওগুলো গুটিবসন্ত। সবাইক আতঙ্কিত। ঠাকুর হেসে বললেন ভয় পাওয়ার কিছু নেই, এর জন্য ওষুধের প্রয়োজন হবে না’। এই কথা বলে ঠাকুর সেই গুটিগুলোকে এক এক করে টিপে টিপে বসিয়ে দিতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই সব গুটি ঠাকুরের গা থেকে ম্যাজিকের মতো মিলিয়ে গেল। ঠাকুর বললেন, ‘এ রোগ আমার নয়, অনেকদিন আগে আমার এক ভক্তের গুটিবসন্ত হয়েছিল। সে দিন তাঁকে পরিচর্যা করে যমের কাছ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলাম। যম ছেড়ে দিলেও রোগ কি ছাড়ে, সেই ভক্তের রোগ আজ আমাকে ভোগালেও মারতে পারল না’একবার ভক্ত রোহিনী বাবুর বাড়িতে এসেছেন ঠাকুর।সৎসঙ্গ শেষ করে খাওয়ার সময় ঠাকুর বললেন যে তিনি মাংস খাবেন। উপস্থিত সকলে চমকে উঠলেন। যে মানুষটা সারা দিনে একটা ফলও খায় না, সে আজ মাংস খেতে চাইছে! রোহিণীবাবু উল্লসিত, তাঁর বাড়িতে পরমপুরুষ শ্রী রামঠাকুর মাংস খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।অবাক কান্ড তো বটেই এ তাঁর পরম সৌভাগ্য। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঠাকুরকে এক বাটি মাংস এনে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে সেই মাংস খেয়ে নিয়ে ঠাকুর বললেন, ‘আরও মাংস নিয়ে এসো, তোমাদের কাছে যা আছে সব নিয়ে এসো’।সেই রাতে বাড়ির সব রান্না করা মাংস খেয়ে শেষ করেছিলেন ঠাকুর।সেই রাতে ঠাকুরের পেটে অসহ্য ব্যথা হয়। চিকিৎসা হওয়ার পর জানা যায় তার মাংসে বিষ ছিলো। বাড়ির লোক এবং পশু পাখিদের রক্ষা করতে তিনি বিষ নিজে খেয়েছেন।যদিও সেই বিষ শরীরে ধারণ করেও তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।আজকের পর্ব এখানেই শেষ করলাম।পরের পর্বে আবার অন্য কোনো গুরুর কথা নিয়েফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

গুরু কথা – সীতারাম দাস ওমকার নাথ

শ্রী শ্রী সীতারাম দাস ওমকার নাথআসন্ন গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে ভারতের কিছু মহান ও প্রখ্যাত গুরুদের মহিমা এবং অলৌকিক নানা ঘটনা বর্ণনা করা শুরু করেছি|আজকের পর্বেজানাবো মহান সাধক শ্রী শ্রীসীতারাম দাস ওমকার নাথ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং তার জীবনের কিছু অলৌকিক ঘটনা।শ্রী শ্রী সীতারাম দাস ওমকার নাথ ইংরেজি 1891 সালে হুগলীর ডুমুর দহে প্রান হরি চট্টোপাধ্যায় ও মালতি দেবীর গৃহে জন্মান তার নাম রাখা হয় প্রবোধ চন্দ্র|আত্মীয় স্বজন রা তাকে গৃহী দেখতে চেয়েছিলো তাই ঠাকুরচরণ ভট্টাচার্য্যের কন্যা সিদ্ধেশ্বরী দেবীর সঙ্গে তার বিবাহ দিলেন|কিন্তু ক্রমে আধ্যাত্মিক ভক্তির সমুদ্রে ডুবে যেতে থাকেন সীতারাম দাস ওঙ্কার নাথ এবং দুই সন্তান এর জন্মের পর ঘর ছেড়ে সন্যাসী হয়ে বেড়িয়ে পড়লেন তিনি।পরবর্তীতে সাধক দাশরথি মুখোপাধ্যায়ের কাছে দীক্ষা নিলেন|গঙ্গা যমুনা সঙ্গম এ রাম নাম মন্ত্রে তার দীক্ষা হয়েছিলো||সর্বত্র রাম নাম প্রচার করতেন তিনি|একবার পুরীর স্বর্গদ্বারে গিয়ে তিনি জগন্নাথ দেবের দর্শনের উদ্দেশ্যে ধ্যানে বসেন। মনে মনেসংকল্প করেন হয় প্রভু দেখা দেবেন নাহলে এই ভাবেই সমাধিস্ত অবস্থায় তিনি দেহ রাখবেন।দীর্ঘ সময় ধ্যান করার পর স্বয়ং জগন্নাথ দেব তাকে দর্শন দেন এবং আদেশ দেন রাম নাম প্রচার করতে। তিনি ফিরে আসেন বাংলায়।সীতারাম দাস মৌরিগ্রামের এসে আবিষ্কার করেন এক অরণ্যে ঢাকা অযত্নে পড়ে থাকা প্রাচীন চন্ডী বিগ্রহ। কয়েকজন ভক্ত শিষ্য নিয়ে তিনি সেই দুর্গম জঙ্গলে শুরু করেন পরিত্যক্ত বিগ্রহ উদ্ধারের কাজ। পদে পদে বাঁধা আসে। বিষধর সাপ। হিংস্র জন্তু আক্রমণ করে তাদের। অলৌকিক ভাবে সীতারাম দাস রাম নাম শুনিয়ে তাদের শান্ত করেন।পরবর্তীতে বহু কষ্টে ঘট স্থাপন করে পুজোর ব্যবস্থা হয়।পুজোর সময় ঘটে আরো এক অলৌকিক ঘটনা। বিদ্যুৎচমকের মতো এক লাল আভায় ঢেকে যায় আকাশ। তার পর সেই স্থানে শুরু হয় পুষ্প বৃষ্টি।রাশি রাশি লাল জবা ফুল ঝরে পড়তে থাকে আকাশ থেকে। বৃষ্টি থামতে দেখা যায়। মাটি ঢেকে গেছে লাল ফুলে। সবাই অবাক। সীতারাম কিন্তু এক মনে পূজোর ব্যবস্থা করে চলেছেন।এমন বহু ঘটনা আছে সীতারাম দাসের জীবনে।ধীরে ধীরে সাধক সীতারাম রাম নামের প্রচারে সপেঁ দেন জীবন|আজও অসংখ্য ভক্ত শিষ্য তার বাণী এবং দর্শন প্রচার করে চলেছেন।এই মহান সাধককে প্রণাম করে শেষ করছি আজকের পর্ব।দেখা হবে পরের পর্বে। থাকবে এমনই কোনো সিদ্ধ গুরুর অলৌকিক জীবন।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – গুরু গোরক্ষ নাথ

গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে ভারতের আধ্যাত্মিক গুরুদের নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে লেখা লেখি চলছে। আজ গুরু গোরক্ষ নাথ ও তার অলৌকিক জীবনে কিছুটা আলোকপাত করবো।গুরু গোরক্ষ নাথ ছিলেন নাথ সম্প্রদায়ের অন্যতমসন্ন্যাসী। তার সঠিক আবির্ভাব ও তিরোধান দিবস স্পষ্ট করে বলা যায়না। তিনি ছিলেন মতসেন্দ্র নাথের প্রধান শিষ্য এবং উত্তরসুরি। হট যোগ সাধনা করে তিনি সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। তার নানা বিধ অলৌকিক ক্ষমতার কথা শোনা যায়।গুরু গোরক্ষ নাথের কর্মকান্ড শুধু ভারত নয় নেপালেও তার বিস্তৃতি রয়েছে।নেপালের গোরখা জনজাতি মহাযোগী গোরখনাথকে তাঁদের রক্ষাকারী দেবতারূপে পূজা করেন। এমনকি রাজতন্ত্রের যুগে নেপালের মুদ্রায় বা প্রশাসনিক বিভিন্ন চিহ্নে গোরখনাথের ছবি ব্যবহার করা হতো । ধৰ্মপ্রাণ নেপালীরা বিশ্বাস করেন, যুগ যুগ ধরে মহাসাধক গোরখনাথই তাদের রক্ষা করছেন।একবার কোনো কারণে গোরখনাথ নেপালবাসীর ওপর প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে নেপাল ছেড়ে চলে যান। নেপালের উপর যেন প্রকৃতির অভিশাপ নেমে আসে। অনাবৃষ্টি, দাবানল বা ভূমিকম্পের কবলে পড়ে। বহুদিন এই অবস্থা সহ্য করার পরে নেপাল রাজ সিদ্ধান্ত নেন যে সবাই মিলে গোরখনাথের শরণাপন্ন হবেন। সেই মতো দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজা রানি একসাথে গোরখনাথের আরাধনা শুরু করেন।নেপালবাসী এক অলৌকিক ঘটনা দেখতে পান, তাঁরা দেখেন পাহাড় চূড়া থেকে লোকালয়ে নেমে আসছেন মহাযোগী গোরখনাথ এবং তাঁর গুরু মৎস্যেন্দ্রনাথ। তাঁদের পিছনে এগিয়ে আসছে প্রবল বৃষ্টি। বারো বছর পর গোরখনাথ ও তাঁর গুরুর কৃপায় নেপাল আবার শস্য-শ্যামল, সজীব হয়ে ওঠে।আজও নেপালের লোককাহিনিতে এই ঘটনা বিশেষ ভাবে উল্লেখিত আছে।একবার গুরু গোরক্ষ নাথ তার গুরু মতসেন্দ্র নাথ কে যোগ বলে কামাখ্যার মায়াবী নারীদের থেকে রক্ষা করেছিলেন।বহু দিন গুরুর সান্নিধ্য না পেয়ে একবার ধ্যানস্ত গোরক্ষ নাথ ধ্যানের মধ্যে গুরুকে স্মরণ করলেন। ধ্যানাবিষ্ট অবস্থায় তিনি আশ্চর্য্য হয়ে দেখলেন গুরুদেব রয়েছেন কামরূপে। এবং সেখানে শত শত  তরুণী দ্বারা তিনি বেষ্টিত। ভাবলেন কামরুপ রাজ্যের কুহুকিনি নারীদের মায়া জালে আটকে গুরুদেব ভোগসুখে ডুবে আছেন।  যোগ বলে গোরক্ষনাথ গুরুদেবের উদ্ধারের নিমিত্ত সেখানে উপস্থিত হলেন। এবং অনেক চেষ্টায় সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে আনলেন।বাস্তবে হয়তো গুরু তার শিষ্যর ভক্তি এবং ক্ষমতার পরীক্ষা নিয়েছিলেন।বর্তমান উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুর শহর তার নামেই গড়ে উঠেছে। গোরক্ষ নাথ মন্দির ও রয়েছেএই স্থানেই এবং নাথ সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং পরম্পরা বর্তমানে সফল ভাবে বহন করে চলেছেন যোগী আদিত্যনাথ।পরবর্তী পর্বে আরো এক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন গুরুর জীবন কাহিনী নিয়ে ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরুপূর্ণিমা উপলক্ষে বিশেষ পর্ব – যোগী রাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আগামীকাল অর্থাৎ ৩ রা জুলাই গুরু পূর্ণিমা|আজকের পর্ব উৎসর্গ করবো এক মহান যোগী এবং বিশ্ববন্দিত গুরুকে। তবে তার আগে গুরুতত্ব নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা পাঠকদের জানাবো।জীবের অন্ধকারাচ্ছন্ন মনকে শ্রীগুরুই জ্ঞানালোক দ্বারা আলোকিত করতে পারেন । গীতা তে স্পষ্ট বলা হচ্ছে যিনি শিষ্য কে সকল জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্ত করে আধ্যাত্মিক মার্গে চালনা করবেন ও জন্ম মৃত্যুর আবর্ত থেকে নিষ্কৃতির পথ দেখবেন তিনিই প্রকৃত গুরু|অর্থাৎ পরম জ্ঞান লাভ হয় যার আশ্রয়ে, যার শিক্ষায়, তিনিই প্রকৃত গুরু|শাস্ত্রে আছে -গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণু গুরুর্দেবো মহেশ্বরগুরুরেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ’গুরুই হলেন ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর। তিনিই আমাদের সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের জ্ঞান বা পরম ব্রহ্মজ্ঞান দান করেন। সেই গুরুর উদ্দেশে প্রণাম জানাইআবার বৈষ্ণব মতে বলা হয় “গুরু রেখে যে গোবিন্দ ভজে তার দেহ নরকে মজে।”অর্থাৎ গুরু ভক্তি ছাড়া ঈশ্বরে ভক্তি বৃথা|ভগবান বা ভগবতী রুষ্ট হলে শ্রীগুরু রক্ষা করতে পারেন- কিন্তু শ্রীগুরু রুষ্ট হলে ব্রহ্মাণ্ডের কেউ রক্ষা করতে পারে না।এমনই এক গুরু ছিলেন যোগীরাজ শ্যামা চরণ লাহিড়ী। বর্তমানে গোটা বিশ্ব জুড়ে ক্রিয়া যোগ যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে তার জন্য লাহিড়ী মশাইয়ের অবদান অসামান্য।ব্রিটিশ ভারতবর্ষে 1895 সালে শ্যামাচরণ নদীয়া জেলায় এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শ্যামচরণ। তার জীবন ছিলো আর পাঁচটা সাধারণ গৃহস্ত বঙ্গ সন্তানের মতোই। চাকরি করতেন একটি বেসরকারি সংস্থায়। একবার কর্মসূত্রে তাকে যেতে হয় হিমালয়ের পাদদেশে এক এলাকায় এর এখানেই ঘটে এক অদ্ভূত ঘটনা।একদিন পাহাড়ে চলার সময় তিনি তাঁর গুরু কিংবদন্তী স্বরূপ মহাবতার বাবাজির দেখা পেলেন যিনি ক্রিয়া যোগের কৌশলগুলো তাকে শিখিয়ে তাকে দীক্ষা দিলেন।দীক্ষার পর চললো কঠোর অনুশীলন ধীরে ধীরে শ্যামচরণ হয়ে উঠলেন যোগীরাজ শ্যামাচরণ।পরবর্তীতে গৃহস্ত জীবনে থেকে তিনি সাধনা করেছেন। অসংখ্য ভক্ত শিষ্য হয়েছে। ঘটিয়েছেন বহু অলৌকিক ঘটনা যা নিয়ে আজও আলোচনা হয়।শোনা যায় একবার তাঁরই এক শিষ্যা অভয়া গুরুর সঙ্গে দেখা করতে হাওড়া থেকে বারাণসী আসছেন। মালপত্র নিয়ে ছুটতে ছুটতে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছতেই দেখলেন, বারাণসী এক্সপ্রেস স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে স্টেশনেই বসে পড়লেন তিনি। আস্তে আস্তে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ট্রেন। চূড়ান্ত হতাশ অভয়া তখন অঝোরে কাঁদছেন আর গুরুদেব শ্যামাচরণ লাহিড়িকে স্মরণ করছেন।হটাৎ অভয়া দেখলেন, ট্রেন থেমে গিয়েছে।ড্রাইভার ও গার্ড ও অবাক তৎক্ষণাৎ মালপত্র নিয়ে দৌড় দিলেন তিনিও। অভয়া ট্রেনে ওঠামাত্র থেমে যাওয়া বারাণসী এক্সপ্রেস আবার গড়গড় করে চলতে শুরু করল।বারাণসী পৌঁছে অভয়া তাঁর গুরুদেবের কাছে গেলেন। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা মাত্র যোগীরাজ শ্যামাচরণ বললেন, ‘ট্রেন ধরতে গেলে একটু সময় হাতে নিয়ে বেরোতে হয় মা,অত বড়ো ট্রেনকে কি আটকে রাখা যায়?গুরুর অলৌকিক ক্ষমতায় দেখে অবাক হলেন শিষ্যা অভয়া|বলা হয় তিনি যোগ বলে সুক্ষ দেহে যেখানে খুশি যেতে পারতেন। একবার তিনি বিলেতে থাকা অফিসের বড়ো বাবুর স্ত্রীর সব খবর কলকাতায় বড়ো বাবুকে বর্ণনা করেছিলেন। বিশ্বাস হয়নি বড়ো বাবুর। কিন্তু যখন স্ত্রী বিদেশ থেকে চিঠি লিখলেন জানা গেলো শ্যামচরণ যা যা বলেছেন সব সত্যি। পরবর্তীতে যখন সেই সাহেবের স্ত্রী বিলেত থেকে স্বামীর কাছে আসেন সেখানে শ্যামাচরণ কে দেখে অবাক হয়ে বলেন ইনি তো সেই ব্যাক্তি যিনি অসুস্থতার সময়ে তার সেবা করতে তার খবর নিতে গেছিলেন তার কাছে।এখানে আরো একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে হয় একবার বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ের বড়সাহেব ভগবতীচরণ ঘোষের অধস্তন কর্মচারী ছুটি নিয়ে বারাণসী যাবেন তাঁর গুরু শ্যামাচরণ লাহিড়ীর কাছে। ভগবতীবাবু ছুটি দেননি সেদিন বিকেলবেলা বাড়ি ফেরার পথে তিনি দেখলেনসেই কর্মচারী মাঠের রাস্তা ধরে বিষণ্ণ ভাবে বাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। তিনি পালকি থেকে নেমে তাঁকে ‘অযথা ছুটি কেন নেবে? চাকরিতে উন্নতি করো’ ইত্যাদি বোঝাচ্ছেন। আচমকা সেই মাঠে শূন্য থেকে ফুটে উঠল একটি ব্যাক্তি । দীপ্ত কণ্ঠে ভর্ৎসনা করে বললেন ‘ভগবতী, তুমি কর্মচারীদের প্রতি খুব নির্দয়।’ পরক্ষণেই মিলিয়ে গেল সেই মূর্তি। অধস্তন কর্মীটি তত ক্ষণে আবেগ চেপে রাখতে পারেননি, গুরুদেব বলে কেঁদে ফেলেছেন।কারন যিনি এসেছিলেন তিনি স্বয়ং শ্যামাচরণ লাহিড়ী। ছুটি মঞ্জুর হয় । পরবর্তীতে পুরো রহস্যটা ভাল ভাবে বুঝতে সেই কর্মচারীর সঙ্গে সস্ত্রীক বারাণসীতে রওনা হলেন ভগবতীবাবু। গিয়ে দেখেন, চৌকিতে পদ্মাসনে বসা সেই লোক। আবার শ্যামচরণ মৃদু ভৎসনা করলেন ভগবতী বাবুকে সে দিনই সস্ত্রীক লাহিড়ীমশাইয়ের কাছে দীক্ষা নিলেন ভগবতীবাবু।গুরুপূর্ণিমা উপলক্ষে সারা সপ্তাহ ধরে এমন সব গুরু ও তাদের অলৌকিক ঘটনাবলী নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে লেখা থাকবে।সবাইকে জানাই গুরু পূর্ণিমার শুভেচ্ছা।পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।