Home Blog Page 91

দেবী লক্ষীর পৌরাণিক ব্যাখ্যা এবং একটি প্রাচীন লক্ষী মন্দিরের ইতিহাস

শুরুতেই আপনাদের জানাই লক্ষীপুজোর অনেক শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন। আজকের এই বিশেষ পর্বে দেবী লক্ষী সংক্রান্ত পৌরাণিক কিছু ব্যাখ্যা আমি আপনাদের সামনের তুলে ধরবো। তারপর একটি প্রাচীন লক্ষী মন্দিরের ইতিহাস এবং কিছু আপনাদের জানাবো।পরাশর-সংহিতায় যে তিনটি শক্তির পরিচয় পাওয়া যায় তার মধ্যে অন্যতম শ্রী|আবার শ্রী শব্দের অর্থ সৌন্দর্য এবং দেবীর লক্ষীর আরেকটি নাম শ্রী। অন্য একটি ব্যাখ্যা অনুসারে যার দ্বারা সকলে আশ্রিত হয় তিনিই শ্রী|আবার শ্রী অর্থে ধন ও হয়|তাই যথার্থ অর্থে দেবী লক্ষী ধন, সম্পদ, শান্তি ও সৌন্দর্যর দেবী|দেবী লক্ষীর উৎপত্তি নিয়েও পুরানে একটি বিশেষ ঘটনার উল্লেখ আছে, বিষ্ণু পুরাণ ও ভাগবত অনুসারে লক্ষ্মী দেবীর উৎপত্তি হয়েছে সমুদ্র থেকে| দুর্বাসা মুনির শাপে স্বর্গ একদা শ্রীহীন বা লক্ষ্মী ছাড়া হয়ে যায়। তখন বিষ্ণুর পরামর্শে স্বর্গের ঐশ্বর্য ফিরে পাবার জন্য দেবগণ অসুরদের সাথে নিয়ে সমুদ্র-মন্থন শুরু করেন সমুদ্র-মন্থনের ফলে উঠে আসলেন দেবী লক্ষ্মী এবং আবির্ভাবের পর লক্ষ্মী দেবীর স্থান হয় বিষ্ণুর বক্ষে|লক্ষী ও বিষ্ণুর বিবাহ নিয়ে পুরানে উল্লেখ আছে যে একবার দেবী লক্ষী বিষ্ণুকে পতি রূপে পাওয়ার জন্য সমুদ্রের মধ্যে প্রবেশ করে বহুকাল কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন হলেন এবং লক্ষ্মীর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে একদিন বিষ্ণু নিজে লক্ষ্মীর সামনে উপস্থিত হলেন এবং তাঁর ইচ্ছায় বিশ্বরূপ দেখালেন তারপর বিষ্ণু ও লক্ষী দেবীর বিবাহ সম্পন্ন হলো|শ্রী বিষ্ণু এবং দেবী লক্ষী এই জগতের সমস্ত শক্তির উৎস এবং আধার।বাংলার কালী মন্দির বা শিব মন্দিরের সংখ্যা অসংখ্য যা নিয়ে আমি বহু অনুষ্ঠান করেছি। এই বাংলায় বীরভূমে রয়েছে এক প্রাচীন লক্ষী মন্দির যা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয়না।এবার সেই মন্দির নিয়ে এক অলৌকিক ঘটনার কথা আপনাদের বলি|জনশ্রুতি আছে প্রায় পাঁচশো বছর আগে বীরভূমে এই গ্রামে আসেন পূর্ববঙ্গের এক পরিব্রাজক সন্ন্যাসী কামদেব ব্রহ্মচারী। এই গ্রামের একটি নিমগাছের তলায় সাধনস্থল হিসেবে চিহ্নিত করে থাকতে শুরু করেন। কিছুদিনে পর এক গ্রামবাসী দীঘির ধারে জমিতে চাষ করছিলেন সে হটাৎ দেখতে পায়,দীঘির জলে একটি পদ্মফুল ভেসে যাচ্ছে।পদ্মফুল তুলতে নেমে পড়েন দীঘিতে ফুটে থাকা পদ্মফুল দেখতে পেলেও নাগাল পান না কিছুতেই।সেই রাতে মা লক্ষ্মীর স্বপ্নাদেশ পান ওই গ্রামবাসী, ওই দীঘির জলেই নিরাকার রূপে দেবী লক্ষী অবস্থান করছেন। পর দিনই দীঘিতে নিম কাঠ ভাসতে দেখেন তুমি । সেই কাঠ তুলে এনে দেবীর নির্দেশ মতো গ্রামের নিম গাছতলায় আসন পাতা কামদেব ব্রহ্মচারীর কাছে নিয়ে যান এবং সাধক ওই নিম কাঠ থেকে লক্ষ্মীমূর্তি গড়ে তোলেন। সেই দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠা হয় গ্রামেই।আজও ওই মূর্তি পূজিত হয় এখানে|ফিরে আসবো পরের পর্বে। থাকবে দেবী লক্ষীর পুজো প্রসঙ্গে শাস্ত্রীয় আলোচনা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী লক্ষীর আটটি রূপের ব্যাখ্যা

দেবী দুর্গার স্বপরিবারে কৈলাশ প্রত্যাবর্তনের পর আসেন মা লক্ষী। যদিও সনাতনধর্মবলম্বীরা প্রায় প্রতি দিন বিশেষ করে বৃহস্পতি এবং শুক্রবার দেবী লক্ষীর পুজো করেন তবুও এই কোজাগরী লক্ষী পূর্ণিমার মাহাত্ম অপরিসীম। আজ লক্ষী পুজো উপলক্ষে শাস্ত্রে যে অষ্ট লক্ষী অর্থাৎ দেবী লক্ষীর আটটি রূপের উল্লেখ আছে তাদের প্রতিটি রূপের ব্যাখ্যা ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আপনাদের সামনের তুলে ধরবো।প্রথম রূপ আদি লক্ষ্মী বা মহালক্ষ্মী — তিনি বিষ্ণুপ্রিয়া। বিষ্ণুর সঙ্গেই তিনি চিত্রিত হন।আদি লক্ষী বা মহা লক্ষী হলো আদিরূপ মা লক্ষীর। এই মা লক্ষী হলেন অফুরন্ত ধনসম্পদের অধিষ্ঠাত্রী| দ্বিতীয় রূপ ধনলক্ষ্মী বা ঐশ্বর্য্যলক্ষ্মী — তিনি সম্পদ ও সমৃদ্ধির দেবী।এই দেবীর ছটি হাত এবং মূলত লাল শাড়িতেই অধিষ্ঠাত্রী। প্রতিটি হাতে থাকে একে একে চক্র, শঙ্খ, একটি ঘটে বা পবিত্র কলসি, তীর ধনুক এবং একটি পদ্ম। সর্বশেষ হাতটি অভয় মুদ্রার ন্যায় রাখা এবং তা থেকে সোনার মোহর বা মুদ্রা বের হয়।তৃতীয় রূপ ধান্যলক্ষ্মী—ইনি শস্যর দেবী।শস্য ভালো হয়আর্থিক কষ্ট লাঘব হয় এই রূপের পুজো করলে|এই দেবী খাদ্যশস্যএর প্রতীক। দেবীর এক হাত চাষের জমির শস্য সম্পদের আশীর্বাদ স্বরূপ রয়েছে এবং আরেক হাতে থাকে মানব জীবনের প্রয়োজনীয় পুষ্টিদায়ক শস্যের সমাহার। এই দেবীর পরনে থাকে শস্যের রঙের সবুজ শাড়ি| চতুর্থ রুপ গজলক্ষ্মী— গজ বা হাতির সঙ্গে তাঁকে কল্পনা করা হয়। ব্যক্তির শ্রীবৃদ্ধি ঘটে তাঁর কল্যাণে|। এই দেবী হাতির ওপর সরাসরি অধিষ্ঠাত্রী না হলেও, তার চারিদিক আবর্ত থাকে হাতি দ্বারা। রাজকীয় ধন সম্পদের প্রতীক এই দেবী। কথিত আছে সমুদ্র মন্থন কালে ভগবান ইন্দ্রের হারিয়ে যাওয়া ধন সম্পদ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এই দেবী|পঞ্চম রূপ সন্তানলক্ষ্মী— সন্তানভাগ্য নিরূপণ করেন এই দেবীরূপ। ভালো সন্তান লাভ হয় এই দেবী সন্তুষ্ট হলে|দেবীর ষষ্ঠ রূপ বীরলক্ষ্মী— ইনি সাহসদাত্রী দেবী।সাহস ও আত্মবিশ্বাস যোগান|এই দেবীর আরাধনা মনের শক্তি, ধৈর্য্য যোগায়, যা জীবনের কঠিন ও ভালো সময়কে সঠিকভাবে পরিচালনা করার শক্তিও যোগায়|সপ্তম রূপে দেবী বিদ্যালক্ষ্মী—ইনি বিদ্যা লক্ষী জ্ঞানের দেবী। বিদ্যা লাভ হয় এই দেবীর পূজায়|বিদ্যার প্রতীক এই দেবী। সরস্বতী ঠাকুরের মতোই এই দেবী পদ্মের ওপর সাদা শাড়িতে অধিষ্টাত্রী হন|অষ্টম রূপে দেবী বিজয়লক্ষ্মী বা জয়লক্ষ্মী— ইনি বিজয়ের অধিষ্ঠাত্রী|বিজয় লাভ হয় এই দেবীর আশীর্বাদে|এই দেবী সর্বদা বিজয়এর প্রতীক স্বরূপ। কোনো সমস্যার থেকে মুক্তি পেতে বা বলা সাফল্য পেতে এই দেবীর পূজা হয়ে থাকে|চলবে দেবী লক্ষীকে নিয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনা। ফিরে আসবো আগামী পর্বে।জানাবো দেবী সম্পকে পৌরাণিক ব্যাখ্যা এবং একটি প্রাচীনদেবী লক্ষীর মন্দিরের ইতিহাস। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নব রাত্রি – দেবী কাত্যায়নী

নব রাত্রির ষষ্ঠ রাতে পুজো করা হয় দেবী কাত্যায়নীর। আজকের পর্বে জানবো দেবী দুর্গার কাত্যায়নী রূপ সম্পর্কে।পুরান অনুসারে ঋষি কাত্যায়ন দেবী দুর্গাকে কন্যারূপে লাভ করার জন্য তপস্যা করেছিলেন। তাঁর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে দেবী দুর্গা কাত্যায়নের কন্যা রূপে জন্মগ্রহণ করে ‘কাত্যায়নী’ নামে পরিচিতা হন।দ্বিতীয় ব্যাখ্যাঅনুসারে ঋষি কাত্যায়ন প্রথম দেবী দুর্গাকে পূজা করেছিলেন বলে তার নাম অনুসারে দেবীর নাম হয় ‘কাত্যায়নী’।দেবী কাত্যায়নী চতুর্ভুজা–তাঁর ডানদিকের দুটি হাত বর ও অভয়মুদ্রা প্রদর্শন করে, বাঁ দিকের দুই হাতে পদ্ম ও খড়্গ। দেবী সিংহবাহিনী। তাঁর গায়ের রং সোনার মতো উজ্জ্বল।তন্ত্রসার-এর ধ্যানমন্ত্রে তাঁকে বর্ণনা করা হয়েছে দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী রূপে। আবার হরিবংশ গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি অষ্টাদশভুজা।পতঞ্জলির মহাভাষ্য ও কৃষ্ণযজুর্বেদীয় তৈত্তিরীয় আরণ্যক-এ কাত্যায়নীর উল্লেখ রয়েছে। দেবীর মাহাত্ম বর্ণিত হয়েছে মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর অন্তর্গত শ্রীশ্রীচণ্ডী, দেবীভাগবত পুরাণ, কালিকা পুরাণ এবং বামন পুরানে।শাস্ত্রে উল্লেখ আছে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীর দিন দেবী কাত্যায়নীর জন্ম। তারপর শুক্লা সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর দিন ঋষি কাত্যায়নের পূজা গ্রহণ করে দশমীর দিন তিনি যুদ্ধ খেত্রে অসুররাজকে বধ করেছিলেন।গৃহস্তরা দেবী কাত্যায়নীর পূজা করলে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ–এই চার ফল লাভ করে এবং তার সমস্ত রোগ-শোক-ভয়এবং জন্ম-জন্মান্তরের পাপ দুর হয় ।ভাগবত পুরাণ-এ আছে, বৃন্দাবনের গোপীগণ কৃষ্ণকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য সারা মাঘ মাস জুড়ে কাত্যায়নী ব্রত পালন করেছিলেন। তাই মনোমত স্বামী প্রার্থনায় এক মাস ধরে কাত্যায়নী ব্রত পালনেরও প্রথা রয়েছে।তাছাড়া শাস্ত্র মতে যাদের সন্তান লাভ করতে সমস্যা হয় দেবী কাত্যায়নীর পুজো করলে তাদের সমস্যা দুর হয়|কাশীর আত্মাবীরেশ্বর মন্দিরের গর্ভগৃহের একটি কুলুঙ্গিতে দেবী কাত্যায়নীর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত।স্বামী বিবেকানন্দের মা ভুবনেশ্বরী দেবী এই আত্মাবীরেশ্বর মন্দিরে মানত করেই স্বামীজিকে পুত্ররূপে লাভ করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে|আত্মাবীরেশ্বর মন্দিরে অষ্টভূজা মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তি রয়েছে|মূর্তিটি কষ্টিপাথরে নির্মিত, উচ্চতা এক হাত।আত্মাবীরেশ্বর শিবই দেবী কাত্যায়নীর ভৈরব। শারদীয়া ও বাসন্তী নবরাত্রির ষষ্ঠ দিনে এখানে প্রচুর ভক্তসমাগম হয়।যারা দেবী কাত্যায়নীর পুজো করবেন তারা সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে শুদ্ধ ভাবে লাল বস্ত্র পড়ে এই বেদীর পূজা করবেন ।পূজার আগে ঠাকুররে আসন ভালো করে পরিস্কার করে দেবীর মূর্তি বা ছবিতে লাল কাপড় পড়াতে হয়। দেবীর উদ্যেশ্যে লাল ফুল নিবেদন করে এবং হাতে চন্দন মালা নিয়ে ১০৮ বার দেবীর বীজ মন্ত্র জপ করলে, দেবীর আশর্বাদ পাওয়া যায়।নব রাত্রি উপলক্ষে চলবে ধারাবাহিক ভাবে দেবীর নয়টি রূপ নিয়ে আলোচনা|আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে|দেবীর পরবর্তী রূপ নিয়ে|পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নবরাত্রি – দেবী কুষ্মান্ডা

নব রাত্রি উপলক্ষে পূজিতা দেবী দুর্গার চতুর্থ রূপ হলো কুষ্মাণ্ডা রূপ এই রূপে দেবী পূজিতা হন নব রাত্রির চতুর্থ রাত্রে|আজকের পর্বে দেবীর এই রূপ নিয়ে লিখবো।দেবীর এইরকম অদ্ভুত নাম এর নিদ্দিষ্ট শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা আছে ‘কু’ শব্দের অর্থ কুৎসিত এবং ‘উষ্মা’ শব্দের অর্থ ‘তাপ’; ‘কুষ্মা’ শব্দের একত্রিত অর্থ কুৎসিত বা তাপ কে হরণ করেন যিনি। কুষ্মান্ডা রূপে দেবী জগতের সকল দুঃখ কষ্ট বা কিছু আপাত দৃষ্টিতে কুৎসিত সব কিছুকে গ্রাস করে নিজের উদরে ধারণ করেন তাই তার নাম ‘কুষ্মাণ্ডা’।মহাপ্রলয়ের পরে যখন সর্বত্র শুধু নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ছেয়ে রয়েছে, তখন এই দেবী কুষ্মাণ্ডা নব রূপে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছিলেন|দেবী অষ্টভুজা” নামেও পরিচিতা আবার দেবীকে “কৃষ্ণমাণ্ড” নামেও ডাকা হয়|দেবী সিংহবাহিনী ও ত্রিনয়নী দেবীর হাতে থাকে সুদর্শনচক্র, ধনুর্বাণ, রক্তপদ্ম, কমণ্ডলু, অমৃত কলস ও জপমালা|মনে করা হয়, দেবী কুষ্মাণ্ডা অল্প পূজাতেই সন্তুষ্ট হন। তার পূজায় কুষ্মাণ্ড বা কুমড়ো বলি দেওয়ার রীতি প্রচলিত আছে।কাশীতে দেবী কুষ্মাণ্ডার মন্দির বিখ্যাত। কাশীতে তিনি দুর্গা নামেই পূজিতা হন।তিনি কাশীর দক্ষিণ দিকের রক্ষয়িত্রী। কাশীখণ্ড তে উল্লেখ রয়েছে, অসি নদীর সঙ্গমস্থলে কুষ্মাণ্ডার অধিষ্ঠান।নব রাত্রিতে যারা দেবীর কুষ্মান্ডা রূপের পুজো করবেন তারা প্রথমে একটি কলস স্থাপন করবেন তারপর সাধ্য মতো অন্যান্য দেবতাদের পূজা করবেন । তাঁদের পূজা করার পর, দেবী কুষ্মান্ডার পূজা শুরু করুন।পুজোর দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে হাতে ফুল নিয়ে দেবীর পূজা করা উচিত।দেবী কুষ্মান্ডার ধ্যান করার পর, তাঁকে ধূপ, লাল ফুল, সাদা ফল নিবেদন করুন। এই ভাবে পুজো করলে দেবীর আর্শীবাদ এবং সৌভাগ্যবান হয়ে উঠতে পারেন।দেবী কুষ্মান্ডার ভোগ হিসেবে হালুয়া এবং দই দিন। আপনি এটিকে প্রসাদ হিসেবে নিতে পারেন।পুজোর শেষে দেবীর আরতি করুন।শাস্ত্র মতে দেবীর কুষ্মান্ডা রূপের আরাধনায় বৈভব, সুখ সমৃদ্ধি ও যশ এবং খ্যাতি বাড়ে বলে মনে করা হয়|আপনারাও নবরাত্রির এই পবিত্র সময়কে শাস্ত্র মতে ব্যবহার করে নিজের জীবনের যাবতীয় সমস্যা দূর করতে পারেন কারন নবরাত্রির এই সময় গ্রহ দোষ খন্ডনের শ্রেষ্ঠ সময়। ফিরে আসবো আগামী পর্বে দেবীর পরবর্তী রুপ নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নব রাত্রি – দেবী স্কন্দমাতা

নব রাত্রি উপলক্ষে দেবীর যে রূপ গুলির পুজো করা হয় তাদের মধ্যে যেমন বিনাশকারিণী কাল রাত্রি রূপ আছে তেমনই আছে স্নেহময়ী স্কন্দমাতা রূপ।নবরাত্রির পঞ্চম দিনে দেবী স্কন্দ মাতার পূজা করা হয়।আজকের পর্বে দেবী স্কন্দ মাতা নিয়ে আলোচনা হবে।দেবাদিদেব মহাদেব এবং দেবী পার্বতীর পুত্র কার্তিকের আরেক নাম স্কন্দ তাই মাতা পার্বতীর অপর নাম স্কন্দমাতা । দেবীর এই স্কন্দমাতা রূপে তিনি শিশু স্কন্দকে কোলে নিয়ে থাকেন । দেবী চতুর্ভুজা এক হাতে তিনি স্কন্দকে ধরে রেখেছে।অন্য দুটি হাতে তিনি দুটি পদ্ম ধারণ করেন এবং তার চতুর্থ হাতটি আশীর্বাদ দেয়ার জন্য ব্যাবহিত হয়|পুরাণ অনুযায়ী দেবী স্কন্দমাতা আগুনের দেবী।দেবীর গায়ের রং সাদা । তিনি একটি পদ্মের উপর উপবিষ্ট। তিনি তার ভক্তদের অমূল্য জ্ঞান দান করেন।সেদিক দিয়ে তিনি জ্ঞান দাত্রী।যারা নবরাত্রির পঞ্চম দিনে বাড়িতে স্কন্দমাতার পুজো করবেন তারপর প্রথমে গঙ্গাজল দিয়ে গৃহ শুদ্ধ করুন। একটি রৌপ্য, তামা বা মাটির পাত্রে নারকেল রেখে একটি কলস স্থাপন করুন। এরপর শ্রীগণেশ, বরুণ, নবগ্রহ ইত্যাদি দেব দেবীর উদ্দেশ্যে সাতটি সিঁদুরের বিন্দু স্থাপন করুন। তারপর বৈদিক মতে এবং ষোড়শপচার সহ সমস্ত প্রতিষ্ঠিত দেবতার পূজা করুন।পুজোর সময় এই মন্ত্রটি এগারো বার জপ করবেন – ” যা দেবী সর্বভূতেষু মা স্কন্দমাতা রূপেন সংস্থা।নমস্তস্য নমস্তস্য নমস্তস্য নমো নমঃ”পুজোর দিনে নীল বর্নের পোশাক পরিধান করা শ্রেয় ভোগে কলা অবশ্যই নিবেদন করবেন।পূজোর পর শিশুদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করলে বিশেষ শুভ ফল লাভ করবেন।পুজোয় সন্তুষ্ট হলে মা স্কন্দমাতা তাঁর ভক্তদের প্রতি অগাধ ভালবাসা ও স্নেহ বর্ষণ করেন।চলতে থাকবে এই ধারাবাহিক আলোচনা।ফিরে আসবো আগামী পর্বে দেবীর পরবর্তী রূপ নিয়ে|পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নবরাত্রি – দেবী চন্দ্রঘন্টা

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

শাস্ত্র মতে শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত ন’টি রাত্রি পর্যন্ত দুর্গার নয়টি রূপের পুজো করা হয়ে থাকে।যেহেতু শরৎকালে এই উত্‍সব হয় তাই অনেক জায়গায় একে শারদ নবরাত্রিও বলা হয়।
দেবীর প্রথম ও দ্বিতীয় রুপ নিয়ে আগে বলেছি।
আজ দেবীর তৃতীয় রুপ নিয়ে লিখবো।

নবরাত্রিতে তৃতীয় দিনে পূজিতা হন নব দুর্গার তৃতীয় রূপ অর্থাৎ চন্দ্র ঘন্টা|পুরান অনুসারে শিব পার্বতীর বিবাহের সময় হঠাৎ তারকাসুর প্রেত পিশাচ দৈত দানব সহ আক্রমণ করে বসে তখন দেবী পার্বতী এক দশ ভুজা রুপী মঙ্গলময়ী দেবী রূপে চন্দ্র সম বিশাল শুভ ঘণ্টা বাজিয়ে সকল অশুভ শক্তি কে নিরস্ত্র করেন|দেবীর এই রূপ চন্দ্র ঘন্টা নামে পরিচিত|

দেবীর আবির্ভাব সম্পর্কে আরো একটি ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে যেখানে মনে করা হয় শিব
বিবাহ কালে চন্ড রূপ ধারণ করলে তাকে দেখে মেনকা সহ উপস্থিত অথিতিরা ভীত হয়ে পড়েন তখন দেবী পার্বতী শিবের এই রূপের প্রত্যুত্তরে চন্দ্রঘণ্টা রূপ ধারণ করেন। দেবীর এই রনমূর্তি দেখে শিব তার নিজের চন্ড রূপ ত্যাগ করে বিবাহের জন্যে নিজের সৌম ও শান্ত রূপে ফিরে আসেন|

দেবী চন্দ্রঘন্টা তৃতীয় নয়ন দ্বারা সমৃদ্ধ যা শুধুমাত্র যুদ্ধের সময় খোলে।দেবীর মস্তকে অর্ধচন্দ্র থাকে , তাই দেবীকে চন্দ্রঘণ্টা নামে ডাকা হয় । দেবীর শরীরের রং স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল । এই দেবী দশভুজা । দেবীর হাতে কমণ্ডলু , তরোয়াল , গদা , ত্রিশূল , ধনুর্বাণ , পদ্ম , জপ মালা থাকে| দেবীর বাহন সিংহ|

দেবীর চন্দ্র ঘন্টার পুজো করতে চাইলে একটি প্রদীপ ঘি বা তিলের তেল দিয়ে জ্বালান এবং দেবীর মূর্তি মূর্তির কাছে বেদীতে রাখুন।গন্ধম, পুষ্পম, দীপম, সুগন্ধম এবং নৈবেদ্যম অর্থাৎ পঞ্চোপচার মতে দেবীর পুজো করতে পারেন।

দেবী চন্দ্র ঘন্টার আহ্বানে নিম্নলিখিত মন্ত্রটি উচ্চারন করতে পারেন- ওম দেবী চন্দ্রঘণ্টায় নমঃ ॥পিন্ডজা প্রভাররুধা চন্দকোপাস্ত্রকৈর্যুতা।প্রসাদম্ তনুতে মহ্যম চন্দ্রঘণ্টেতি বিশ্রুতা ॥ইয়া দেবী সর্বভূতেষু মা চন্দ্রঘণ্টা রূপেন সংস্থিতা। নমস্তস্যায় নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥

দেবী দুর্গার এই রূপ তার ভক্তদের অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করেন। এই দেবীর আরাধনা জীবনে সাংসারিক সুখ ও শান্তি এনে দেয়।জীবন সবদিক থেকে পরিপূর্ণ হয় দেবীর আশীর্বাদে|

আগামী দিনের পর্বে দেবীর চতুর্থ রূপ নিয়ে ফিরে আসবো। নব রাত্রি উপলক্ষে চলতে থাকববে এই ধারাবাহিক আলোচনা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নবরাত্রি – দেবী ব্রহ্মচারিনী

চলছে নবরাত্রি আজকের পর্বে নবরাত্রি উপলক্ষে দেবী দুর্গার দ্বিতীয় রূপ নিয়ে লিখবো ।নব রাত্রির দ্বিতীয় দিনে ব্রহ্মচারিনীর বেশে ধরা দেন মা|এখানে ‘ব্রহ্ম’ শব্দের অর্থ হল তপস্যা। ব্রহ্মচারিণী অর্থাৎ তপস্বীনি|ভগবান শঙ্করকে পতিরূপে লাভ করার জন্য দেবী পার্বতী কঠিন তপস্যা করেন। সেই কঠিন তপস্যার জন্য তাকে তপশ্চারিনী বা ব্রহ্মচারিণী বলা হয়|দেবীর তপস্যা সার্থক হয় এবং বিবাহ হয় শিব ও পার্বতীর। বিবাহের পরে জন্ম নেন তাঁদের সন্তান কার্তিক বা ষড়ানন যিনি দেব সেনাপতি হন এবং বধ করেন তারকাসুরকে।দেবীর ব্রহ্মচারিণীর রূপ জ্যোতিতে পূর্ণ, অতি মহিমামণ্ডিত। তিনি ডান হাতে জপের মালা এবং বাঁ হাতে কমণ্ডলু ধারণ করে আছেন। প্রেম, আনুগত্য, প্রজ্ঞা এবং জ্ঞানের প্রতীক হিসেবেও তিনি পরিচিত। সাদা রঙ দেবীর প্রিয় তাই দেবী ব্রহ্মচারিনীর পুজোয় স্বেত চন্দন ও সাদা ফুল ব্যাবহার হয়|যারা দেবীর ব্রহ্মচারীনি রূপের পুজো করবেন তারা এই মন্ত্রটি জপ করতে পারেন|”ইয়া দেবী সর্বভূতেষু মা ব্রহ্মচারিণী রূপেন সংস্থিতা নমস্তস্যই নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ” শাস্ত্রে আছে এই রূপের পূজায় বৃদ্ধি পায় মনোসংযোগ এবং সব ভয় সংশয় ও মানসিক দুর্বলতা দূর হয়|জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে দেবী মঙ্গল গ্রহ শাসন করেন। যাদের মঙ্গল সংক্রান্ত কোনো গ্রহ দোষ আছে তারা দেবীর এই রূপের পুজো করলে ভালো ফল পাবেন।আগামী দিনের পর্বে দেবীর তৃতীয় রূপ এবং তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নিয়ে ফিরে আসবো যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নব রাত্রি – দেবী শৈল পুত্রী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

শুরু হয়ে গেছে দেবীপক্ষের|শাস্ত্র মতে প্রতিপদের সূচনা লগ্নে এসে পৌঁছেছি আমরা|বাংলার দূর্গা পূজার পাশাপাশি একই সময়ে সারা দেশ জুড়ে পালিত হয় নব রাত্রি উৎসব|মূলত দেবী দুর্গার নয় টি ভিন্ন রূপের পূজা হয় নয় দিন ধরে| বাংলার অনেক দূর্গা পূজা তেও নব দুর্গার আরাধনা হয়|এই রূপ গুলির আছে নিজস্ব শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা এবং আধ্যাত্মিক তাৎপর্য|আজ লিখবো দেবীর প্রথম রূপ শৈল পুত্রী নিয়ে|

নবরাত্রি উৎসবের প্রথমদিনের পুজো হয় দেবী শৈলপুত্রীর। দেবী শৈলপুত্রী আসলে প্রকৃতির দেবী। শৈলপুত্রীর বাহন বৃষ । এঁনার দক্ষিণ হস্তে ত্রিশূল আর বাম হস্তে কমল আছে তাই দেবীর অপর নাম শুলধারিনি|আবার তাকে দেবী হৈমবতী বলে ডাকা হয়।
দেবী শৈলপুত্রীর আবির্ভাব হয়েছিলো একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে।

প্রজাপতি দক্ষএকবার বিরাট যজ্ঞ করেন ।তার যজ্ঞে সতী কে নিমন্ত্রণ করা হয়নি । সতী পিতৃ গৃহে যাবার জন্য অস্থির হলেন কিন্তু ভগবান শঙ্কর সাবধান করলেন যে কোন কারনে তিনি উমার উপর রেগে আছেন । কিন্তু সতীর মন মানল না তখন শঙ্কর জী অনুমতি দিলেন যাবার জন্য । কিন্তু পিতৃ গৃহে গিয়ে পৌঁছে দেখলেন কেউ তাকে সেরকম স্নেহ ভরে কাছে ডাকছে না । একমাত্র মা জড়িয়ে ধরলেন । স্বয়ং দক্ষ তাকে নানা খারাপ কথা বললেন । তখন রাগে দুঃখে যজ্ঞাগ্নির সাহায্যে নিজে কে ভস্মীভূত করলেন ।সতীর এই পরিনতির সংবাদ শুনে শিব ও তার অনুগামীরা প্রচন্ড ক্রোধে দক্ষের যজ্ঞ ধ্বংস করলেন এবং দক্ষকে উচিৎ শিক্ষা দিলেন।

কিন্তু শিব আর পার্বতী এক এবং অভিন্ন তাই শিবের সঙ্গে পুনরায় মিলিত হতে সতীর পুনর্জন্ম হলো শৈলরাজ হিমালয়ের কন্যা রুপে।শৈলরাজ হিমালয়ের কন্যা হবার জন্য দেবীর এক নাম হয় শৈলপুত্রী এবং এই জন্মেই তিনিই পার্বতী রূপে শিবের অর্ধাঙ্গিনী হলেন|

শাস্ত্র অনুযায়ী ব্রহ্মার শক্তির প্রতীক হলেন দেবী শৈলপুত্রী কারন একবার দেব ও অসুরের যুদ্ধে ব্রহ্মা দেবতাদের জয়ী করেছিলেন। কিন্তু ব্রহ্মার শক্তি ভুলে দেবতারা জয়ের গৌরব নিজেরাই নিতে উদ্যত হলেন। ব্রহ্ম তখন নিজে এলেন দেবতাদের দর্পচূর্ণ করতে। তিনি একখণ্ড তৃণ রাখলেন দেবতাদের সম্মুখে। কিন্তু দেবতারা আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, অগ্নি সেই তৃণখণ্ডটি দহন করতে বা বায়ু তা একচুল পরিমাণ স্থানান্তরিত করতে অসমর্থ হলেন। তখন ইন্দ্র এলেন সেই অনন্ত শক্তির উৎসকে জানতে। সেই মুহূর্তে ব্রহ্মশক্তি শৈলপুত্রীর রূপ ধারন করে দেবরাজ ইন্দ্র কে দেখা দিলেন।

দেবী শৈলপুত্রী সম্পর্কে বর্ণনা আছে কালিকা পুরাণে|শাস্ত্র মতে এই রূপের আরাধনায় বৃদ্ধি পায় মনোবল|মানসিক অস্থিরতা ও অবসাদ মুক্তি হয় দেবী শৈল পুত্রীর আরাধনায়|

নব রাত্রি উপলক্ষে ধারাবাহিক ভাবে চলবে এই আলোচনা|আগামী পর্বে দেবীর পরবর্তী রূপ
নিয়ে লিখবো। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

মহালয়ার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

আজ মহালয়া অর্থাৎ পিতৃ পক্ষের অবসান এবং দেবী পক্ষের সূচনা। আজকের এই বিশেষ পর্বে আপনাদের জানাবো শাস্ত্রীয় দৃষ্টি ভঙ্গী থেকে কি এই মহালয়া এবং কেনো পালন করা হয় কিবা এই মহালয়ার আধ্যাত্মিক গুরুত্ব।মহাভারতে উল্লেখ আছে যে পকর্ণের মৃত্যুর পরে তার আত্মা স্বর্গে গমন করলে, তাকে স্বর্ণ ও রত্ন খাদ্য হিসেবে প্রদান করা হয়। কর্ণ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে ইন্দ্র বলেন, কর্ণ সারা জীবন স্বর্ণ এবং রত্ন দান করেছেন, তিনি পিতৃপুরুষের আত্মার উদ্দেশ্যে কোনোদিনো কোনো খাদ্য দান করেননি।তাদের কাছে প্রার্থনা করেননি তাই স্বর্গে তাকে স্বর্ণই খাদ্য হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। পিতৃ পুরুষের আশীর্বাদ থেকেও তিনি বঞ্চিত। তার পুন্য সঞ্চয় অসম্পূর্ণ।তার উত্তরে কর্ণ বলেন, তিনি যেহেতু তার পিতৃপুরুষ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। তাই তিনি অসহায় এবং অজ্ঞানতা বসত এই অন্যায় করে ফেলেছেন।তারপর কারণে কর্ণকে ষোলো দিনের জন্য মর্ত্যে গিয়ে পূর্ব পুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল প্রদান করার অনুমতি দেওয়া হয়। সেই সময়কালকে পিতৃপক্ষ বলা হয়।একটি শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুসারে জীবিত ব্যক্তির পূর্বের তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃলোকে বাস করেন। এই লোক স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। পিতৃ পক্ষে এই আত্মারা উত্তর পুরুষের তর্পনের মাধ্যমে চীরমুক্তি লাভ করে এবং পরম ব্রহ্মর সাথে বিলীন হয়।এই তর্পনের শাস্ত্র সম্মত তিথি হলো মহালয়া তিথি|জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুসারে অনুযায়ী, সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষ সূচিত হয়।এই সময় পূর্বপুরুষগণ আত্মা রূপে পিতৃলোক পরিত্যাগ করে তাদের উত্তরপুরুষদের গৃহে বা আশেপাশে অবস্থান করেন। এর পর সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করলে, তারা পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান এবং দেবী পক্ষের সূচনা হয়।যাদের জন্মছকে পিতৃ দোষ আছে তারা এই সময়ে গ্রহ দোষ খণ্ডন করালে পিতৃ দোষ থেকে স্থায়ী ভাবে রেহাই পেতে পারেন।যেহেতু মহালয়া মৃত্যু ও শোকের সাথে সংযুক্ত তাই শুভ মহালয়া বলা যায় কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে যেহেতু এই তিথিতে পিতৃ পক্ষের অবসান হয়ে দেবী পক্ষের সূচনা হয় তাই আসন্ন দেবী পক্ষের শুভেচ্ছা এবং শারদৎসবের আগাম শুভেচ্ছা দেয়াই যায়।ফিরে আসবো আগামী পর্বে দূর্গা পুজো উপলক্ষেবিশেষ ধারাবাহিক লেখনী নিয়ে।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দূর্গা কথা – নবকৃষ্ণ দেবের দূর্গা পুজো

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রীজাতক

বাংলার বনেদি বাড়ির পুজো ঐতিহাসিক পুজোর মধ্যে রাজা নব কৃষ্ণ দেবের শোভাবাজার রাজবাড়ীর পুজো থাকবে একদম প্রথম শাড়িতে|
আজকের পর্ব এই ঐতিহাসিক পুজো নিয়ে।

সেকালে বলা হতো দূর্গা পূজোর সময়ে দেবী মর্তে থাকাকালীন তার মনোরঞ্জনের জন্য এই বাড়িতেই আসতেন|এমন ভাবনার পেছনে অনেক কারন আছে|সে বিষয়ে পরে আসছি আগে এই বাড়ি ও তার ইতিহাস সংক্ষেপে জেনে নেয়া দরকার|

যদিও এই পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিজয় হরি দেব তবে এই পরিবারের স্বর্ণযুগ বলা হয় রাজা নবকৃষ্ণ দেবের সময় কে এবং তার আমলেই শুরু হয় এই দূর্গা পূজা|নব কৃষ্ণদেব ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন সাধারণ কর্মচারী যিনি নিজের দক্ষতায় ও পরিশ্রমে কোম্পানির মুন্সী হয়ে ছিলেন|পলাশীর যুদ্ধে তিনি নানা ভাবে ক্লাইভ কে সাহায্য করেন ও পুরুস্কার স্বরূপ প্রচুর অর্থ লাভ করেন|

মূলত পলাশীর যুদ্ধ জয় কে স্মরণীয় করে রাখতেই নবকৃষ্ণ দেবে দূর্গা পুজো শুরু করেছিলেন তাছাড়াও তার উদেশ্য ছিলো ক্লাইভ কে খুশি করে নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা|বলা বাহুল্য এই উদ্দেশ্যে তিনি সম্পূর্ণ সফল হয়েছিলেন|তার দূর্গা পুজোয় অংশগ্রহণ করেছিলেন স্বয়ং লর্ড ক্লাইভ। সাহেব দের উপস্থিতির জন্য সেকালে এই পুজো কে গোরা দের পুজো বা কোম্পানির পুজো বলা হতো|

উদেশ্য যাই থাকুক শাস্ত্র মতে নিষ্ঠা সহকারে পুজো করতেন নবকৃষ্ণ দেব|প্রচুর অর্থ ব্যায় হতো এই পরিবারের দূর্গা পুজোয়|বসতো গান বাজনার আসর, নাচ, কবি গানের ও ব্যবস্থা থাকতো|দূর্গা পুজো উপলক্ষে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, ভোলা ময়রার মতো কবিয়ালরা এখানে এসেছেন কবির লড়াই করতে আবার গহরজান নুর বক্স প্রমুখ নামী নর্তকীরা এই বাড়িতে এসেছেন নাচ করতে|সব মিলিয়ে এলাহী আয়োজন হতো শোভাবাজার রাজ বাড়ির দূর্গা পুজোয় আর এই কারণেই মনে করা হতো যে এটা মর্তে দেবী দুর্গার মনোরঞ্জনের স্থান|

পরবর্তীতে দুই শরিকের মধ্যে ভাগ হয়ে যায় সম্পত্তি তবে প্রথা মেনে নিষ্ঠা সহকারে আজও শোভাবাজর রাজবাড়ি তে দূর্গা পূজা হয়|উল্টো রথের দিন কাঠামো পুজো দিয়ে শুরু হয় দেবীমূর্তি তৈরির কাজ|শোভাবাজার রাজবাড়ির মাতৃমূর্তির বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এছাড়া, এখানকার পুজোর উপাচারও বেশ চমকপ্রদ।স্বাধীনতার আগে সন্ধিপুজোতে কামানের গোলার শব্দে শুরু হত পুজো এবং শেষও হত একই ভাবে|মা দুর্গা এই বাড়িতে বৈষ্ণবী হিসেবে পূজিতা হন। তাই শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজোয় অন্নভোগ থাকে না। গোটা ফল, গোটা আনাজ, শুকনো চাল, কচুরি, খাজা, গজা, মতিচুর-সহ নানা ধরনের মিষ্টি দেবীকে উত্সর্গ করা হয়|বর্তমানে এখানে বলী প্রথা নেই|এবাড়ির পুজোয়|প্রতিমার সামনে একটা বড় হাড়িতে জল রাখা হয়। সেই জলে দেবীর পায়ের প্রতিবম্বের ছবি দেখে সবাই প্রণাম করে। একে দর্পণ বিসর্জন বলা হয়|তারপর প্রথা মেনে দশমীর দিনই হয় বিসর্জন|আগে নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর রীতি থাকলেও সরকারি নিয়মে তা এখন বন্ধ|

আজও বহু মানুষ শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো দেখার জন্য ভিড় করেন।

আজকের পর্বে এইটুকুই|ফিরবো পরের পর্বে|থাকবে দূর্গা পুজো উপলক্ষে আরো একটি
বিশেষ পর্ব।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।