Home Blog Page 91

একান্ন পীঠ – বরাহী দেবী

পুরান অনুসারে দেবী সতীর নিচের পাটির দাঁত
সমুহ পরে ছিলো হরিদ্বার এর কাছে
পঞ্চসাগরে এই সতী পীঠে দেবী বরাহী নামে পূজিতা হন।পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে এটি চৌত্রিশ
তম সতী পীঠ।দেবীর ভৈরব হলেন মহারুদ্র।
পুরান , মহাভারত সহ একাধিক শাস্ত্রে এই পীঠের উল্লেখ আছে।পুরান মতে নিশাচর নামে এক দৈত্যকে হত্যার জন্য স্বয়ং বিষ্ণু বরাহী কে সৃষ্টি করেছিলেন।বরাহী হলেন বিষ্ণুর নারী শক্তি।
সনাতন ধর্মে যে সাত আট জন মাতৃ দেবীর কল্পনা করা হয়, তার মধ্যে দেবী বরাহী হলেন অন্যতম। দেবীর রূপ শূকরের মত। তার এক হাতে রয়েছে চক্র এবং অন্য আরেক হাতে রয়েছে তলোয়ার।
এই পীঠ বহুকাল অজ্ঞাত ছিলো তারপর মহাভারতের যুগে পান্ডবরা যখন বনবাসে দিন কাটাচ্ছিলেন তখন গভীর এবং দুর্গম স্থানে এই দেবীর পীঠ স্থান সন্ধান করেছিলেন কুন্তী পুত্র ভীম। তিনি সেই গভীর জঙ্গলে মা বরাহীর তপস্যা করলেন, মা বরাহী ভীমকে দর্শন দিলেন এবং তাকে রক্ষা করার আশীর্বাদ দিলেন।
তারপর মহাভারত পরবর্তী সময়ে আবার এই সতী পীঠ লোক চক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুকাল পরে সালে জনৈক প্রভুচন্দ্র নামের একজন মাতৃ সাধক মায়ের এই পীঠ স্থান আবিষ্কার ও সংস্কার করেন।আবার এই সতী পীঠ সবার কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং বহু তীর্থ যাত্রী আসতে শুরু করেন।
অনেকে আবার মনে করেন বৌদ্ধ দেবতা বজ্র বারাহি ও মরিচির মিশ্রনে এই বরাহী দেবী
সৃষ্টি হয়েছেন। দেবী বরাহীকে অনেক জায়গায় মহিষবাহনা হিসেবেও দেখানো হয়
আবার রক্ত বীজের কাহিনীতে দেখা যায় যে, একটি মৃতদেহের উপর বসে শূকরের বেশ ধরে দাঁত দিয়ে বরাহী দেবী শত্রু নিধন করছেন।
সব মিলিয়ে যেনো কোনো জটিল রহস্য জড়িয়ে আছে দেবী বরাহীর সাথে।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য একটি শক্তি পীঠ
এবং তার ইতিহাস নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – ত্রিপুর মালিনী

পাঞ্জাবের জলন্ধরে রয়েছে অন্যতম তাৎপর্য পূর্ণ শক্তি পীঠ ত্রিপুর মালিনী। আজকের পর্বে এই শক্তি পীঠের কথা লিখবো ।জানবো
তার আধ্যাত্মিক মহাত্মা তবে এই যেখানে অবস্থিত সেই জ্বলন্ধর সম্পর্কে পৌরাণিক একটি ঘটনা
বলে দিই।
বহু প্রাচীন কালে জ্বলন্ধর নামে এক অত্যাচারী অসুর এই স্থানে শাসন করতো তার অত্যাচারে অতিষ্ট ধরিত্রীকে রক্ষা করতে ত্রিশুল দিয়ে জলন্ধর অসুরের মস্তক ছিন্ন করে তাকে বধ করেন শিব এবং ত্রিপুর মালিনী শক্তি পীঠের কাছেই তাকে সমাধি দেওয়া হয়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানে এই ঘটনার উল্লেখ আছে।
পীঠ নির্ণয় তন্ত্র এবং কালীকা পুরানে এই শক্তি পীঠের উল্লেখ আছে। পুরান মতে দেবীর ডান
বক্ষ এই স্থানে পতিত হয়েছিল। দেবীর নাম এখানে ত্রিপুর মালিনী আর ভৈরব হলেন ভীষণ।
আদি শঙ্করাচার্য্য তার অষ্টাদশ পীঠ বর্ণনায় শক্তিপীঠ ত্রিপুর মালিনীর উল্লেখ করেছেন। মহাভারতের বন পর্বেও এই শক্তিপীঠের উল্লেখ আছে।
ত্রিপুর মালিনী শক্তি পীঠে দেবীর মন্দির অতি প্রাচীন এবং খুবই মনোরম পরিবেশে অবস্থান করছে।মন্দিরের গর্ভে রয়েছে লক্ষী, সরস্বতী, মা বৈষ্ণবদেবীর তিনটি মূর্তি। পাশাপাশি মন্দিরের পাশে একটা ঘরে মায়ের শয্যা স্থান রয়েছে যেখানে মায়ের বিছানা সাজানো রয়েছে। লোকোমুখি শোনা যায় দুপুরের ভোগ গ্রহণ করার পর সেই বিছানাতে বিশ্রাম গ্রহণ করেন দেবী ত্রিপুর মালিনী।
নবরাত্রি সহ প্রায় সব বিশেষ তিথিতেই এখানে বড়ো আকারে পুজো হয় এবং সেই উপলক্ষে
বহু ভক্তের সমাগম হয়।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। থাকবে অন্য
এক শক্তি পীঠ নিয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনা এবং পৌরাণিক ব্যাখ্যা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – ক্ষীর ভবানী

পুরান মতে কাশ্মীরে পড়েছিল দেবীর কণ্ঠ যদিও ঠিক কোন স্থানে দেবীর শিলারূপ অঙ্গ অবস্থান করছে তা নিয়ে মতভেদ আছে। কাশ্মীরে অবস্থিত অমরনাথ, সারদা পীঠ এবং ক্ষীর ভবানী এই তিনটি মন্দিরকেই শক্তি পীঠের মর্যাদা দেয়া হয়।
যদিও দেবীর অঙ্গ সারদা পীঠে পড়ে ছিলো বলেই মনে করা হয় আমার আজকের আলোচ্য বিষয় সারদা পীঠ এবং ক্ষীর ভবানী।
দেবী এখানে ভগবতী এবং তার ভৈরব স্বয়ং অমরনাথ যদিও কোনো কোনো শাস্ত্রে দেবীর ভৈরব রূপে ত্রিসন্ধ্যেশ্বর এর নাম আছে।
সারদা পীঠ সম্পর্কে জানা যায় ঋষি পুলস্থ্য এই স্থানে সরস্বতী বন্দনা করে ছিলেন এবং দেবী তাকে দর্শন দিয়ে ছিলেন বলে একাধিক শাস্ত্রে উল্লেখ আছে। আবার মাতঙ্গ ঋষি কাশ্মীরের এই স্থানে সাধনা করে ছিলেন এবং দেবী দূর্গা কালী এবং সরস্বতী ত্রিশক্তি রূপে তাকে দেখা দিয়ে ছিলেন। তীর্থে ভ্রমণরত আদি শংকরাচার্য্য এই স্থানে এসে দেবীর স্তব করেছিলেন বলেও ইতিহাস থেকে জানা যায়।
সারদা পীঠ সংলগ্ন ক্ষীর ভবানী মন্দিরটি ও অনেকের কাছে দেবীর শক্তি পীঠের অঙ্গ।
অতি প্রাচীন এই মন্দির সম্পর্কে বলা হয় দেবী এক সময়ে লঙ্কায় থাকতেন রাবণ যখন মা সীতার অপহরণ করেছিলেন তখন দেবী ক্ষোভে ফেটে পড়েন আর নিজের স্থান ছেড়ে দেন। এরপর পবন পুত্র হনুমানকে নিজের মূর্তিকে লঙ্কা থেকে অনেক দূরে নিয়ে যেতে বলেন তিনি। তখন দেবীর আজ্ঞা পালন করে হনুমান মায়ের মূর্তি এখানে স্থাপনা করেন।সেই থেকে দেবী ভবানী এই মন্দিরেই বিরাজ করছেন।
অতীতে কাশ্মীর শাসন করতেন হরি সিংহের মতো হিন্দু রাজারা তারাই এই মন্দির নির্মাণ, মন্দির সংস্কার, রক্ষনাবেক্ষন এবং পুজোর দায়িত্ব পালন করতেন।
এক সময় সব স্থান ছিলো খুবই দুর্গম। সেই দুর্গম পথ অতিক্রম করে শুক্লা অষ্টমী তিথিতে যখন দেবী মন্দিরে বিশেষ পুজো হতো তখন অসংখ্য ভক্ত এই কষ্টসাধ্য পথ পেরিয়ে দেবী ভবানীর কাছে আসতেন। বেশি ভাগ তীর্থ যাত্রী এক সাথে অমরনাথ, সারদা পীঠ এবং ক্ষীর ভবানী মন্দির দর্শন করতেন।সেই পরম্পরা আজও চলছে।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। সাথে নিয়ে অন্য
এক শক্তি পীঠের ইতিহাস এবং পৌরাণিক ব্যাখ্যা নিয়ে। দেখতে থাকুন।

একান্ন পীঠ – দেবী শিবানী

আজকের একান্ন পীঠ পর্বে মধ্যপ্রদেশের নাগ পুরের কাছে রামগিরিতে চিত্রকুট পর্বতে অবস্থিত শক্তি পীঠ শিবানী নিয়ে লিখবো।
পুরান অনুসারে এই স্থানে সতীর ডান বক্ষ পড়েছিল।আবার মতান্তরে এই স্থানে পড়েছিলো দেবীর জানু দেশ।এখানে অধিষ্ঠিত দেবীর নাম শিবানী এবং ভৈরব হলেন চন্ড।
ভরতচন্দ্রের অন্নদা মঙ্গল, বাল্মীকি রামায়ণ,কালীকা পুরানে সহ একাধিক প্রাচীন
গ্রন্থে এই শক্তি পিঠের উল্লেখ আছে।
রাম, সীতা এবং লক্ষণ যখন তাদের চোদ্দ
বছরের বনবাস কাটাচ্ছিলেন, তার মধ্যে সাড়ে এগারো বছর সময় অতিবাহিত করে ফেলেছিলেন এই শক্তি পীঠ সংলগ্ন চিত্রকূট পাহাড়ে।
সেই মহাভারতের সময়ে শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে অর্জুন
রামগিরি পর্বতে এসে সাধনা করেছিলেন এবং দেবী যোগ মায়া তাকে দেখা দিয়ে নিজের দিব্য শীলরূপটি কোথায় আছে তার নির্দেশ দেন। তারপর অর্জুন নিজে মাটি খুঁড়ে মাতা শিবানীকে শীলা রূপে উদ্ধার করে এই স্থানে মন্দির বানিয়ে স্থাপন করেন এবং তার অনুপস্থিতি তে স্থানীয় ফুলবাহক দের দেবীর নিত্য পুজোর আদেশ দেন।
এক সময় এই প্রাচীন মন্দির কালের নিয়মে
ধ্বংস হলে রাজা দ্বিতীয় রঘুজি ভোসলে নতুন ভাবে দেবী শিবানীর মন্দির বানিয়ে দেন।
বর্তমানে সাদা পাথরের তৈরি এই মন্দিরে দেবী শিবানীর শীলা রূপ টি কষ্টি পাথর এবং রুপো দিয়ে ঢাকা তার পাশাপাশি বহু দেবদেবীর মূর্তি খোদাই করা আছে। অনেকগুলি সিঁড়ি পেরিয়ে তারপরে একেবারে মন্দিরের প্রধান ফটকে উঠে আসতে হয়। তারপর এই মন্দিরের মূল অংশ শুরু হয়।
যাত্রাপথ বেশ দুর্গম এবং কষ্টসাধ্য।
অশ্বিন ও চৈত্র মাসের একটি বিশেষ সময়ে এখানে বিশেষ পুজো হয় এবং সেই সময়ে মায়ের প্রকৃত রূপ ভক্তরা দেখতে পান।
আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে।সাথে নিয়ে অন্য এক শক্তি পীঠের কথা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – গুহ্যেশ্বরী

আজকের একান্ন পীঠ পর্বে আলোচনা করবো শক্তিপীঠ গুহ্যেশ্বরী নিয়ে এই মন্দিরটি নেপালের কাঠমাণ্ডুতে অবস্থিত।
পুরান মতে গুহ্যেশ্বরী মন্দিরটি যেখানে অবস্থিত, সেখানে দেবীর যোনি পতিত হয়েছিল।
গুহ্য শব্দের মানে ‘যোনি’ আর ঈশ্বরী হলেন ‘দেবী’। মন্দিরের অভ্যন্তরে একটি কলস দেবী রূপে পূজিত হন। কলসটি স্বর্ণ ও রৌপ্য এর স্তর দ্বারা আবৃত। মূল মন্দিরটি একটি খোলা প্রাঙ্গণের কেন্দ্রে অবস্থিত।মন্দিরের চূড়ায় চারটি সোনালি সর্প আছে।মন্দিরের দেবী গুহ্যকালী নামেও পরিচিতা।
মনে করা হয় গুহ্যেশ্বরী মন্দিরটি পশুপতিনাথ মন্দিরের শক্তির উৎস । সতেরশ শতকে নেপালের রাজা প্রতাপ মল্ল মন্দিরটি নির্মাণ করেন।
সংস্কৃত শব্দ ‘গুহ্য’ ও ‘ঈশ্বরী’ সন্ধিযুক্ত হয়ে গুহ্যেশ্বরী নামটি গঠন করেছে। ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ এর ললিতা সহস্রনাম অধ্যায়ের ললিতা দেবীর উল্লিখিত সহস্র নামের মধ্যে ৭০৭ তম নামটি হচ্ছে “গুহ্যরূপিণী” যার অর্থ যে দেবীর মাহাত্ম্য মানুষের উপলব্ধির বাইরে এবং যা গুপ্ত। মতান্তরে নামটি ষোড়শী মন্ত্রের ষোড়শ অক্ষর হতে উদ্ভূত। কিছু শাস্ত্রজ্ঞ মনে করেন যোনি নয় দেবীর হাঁটু এই স্থানে পড়েছিল।
গুহ্যেশ্বরী মন্দিরের শক্তি হলেন ‘মহাশিরা’ আর দেবীর ভৈরব হলেন ‘কাপালী’। এই মন্দিরটি তান্ত্রিকদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং এখানে বিবিধ তান্ত্রিক ক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। তন্ত্রশক্তি লাভের জন্য এই মন্দিরটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে কালীতন্ত্র, চণ্ডীতন্ত্র ও শিবতন্ত্ররহস্য গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু হিন্দু নয় বৌদ্ধদের কাছেও এই দেবীর বিশেষ মাহাত্ম রয়েছে।বজ্রযান বৌদ্ধগণ দেবী গুহ্যেশ্বরীকে বজ্রবরাহী রূপে পুজো করেন।
প্রায় সারা বছর এখানে দর্শণার্থীদের ভিড় লেগে থাকে এবং বিজয়া দশমী ও নবরাত্রির সময় মন্দিরে প্রচুর ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম হয়।
আবার আগামী পর্বে ফিরে আসবো অন্য একটি শক্তিপীঠ নিয়ে। থাকবে আধ্যাত্মিক এবং পৌরাণিক ব্যাখ্যা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্নপীঠ – কুরুক্ষেত্র

পীঠ নির্ণয় গ্রন্থ মতে একান্ন পীঠের পঞ্চাশতম শক্তিপীঠটি অবস্থিত হরিয়ানার কুরুক্ষেত্রে। অন্নদা মঙ্গল এবং শিব চরিতেও এই সতী পীঠের উল্লেখ আছে।
শক্তি পীঠ কুরুক্ষেত্রকে সাবিত্রীপীঠ ও বলা হয় কারন দেবী এখানে স্বাবিত্রী রূপে বিরাজ করছেন।
দেবীর ভৈরবের নাম থানেশ্বর।পুরান মতে দেবীর ডান পায়ের গোড়ালি এখানে পড়েছিল।
এই কুরুক্ষেত্র ময়দানে মহাভারতের পান্ডব এবং কৌরব দের যুদ্ধ হয়েছিলো এবং কথিত আছে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরুর আগে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে পঞ্চপাণ্ডব এখানে এসেই দেবীর আরাধনা করেছিলেন। স্মারক হিসেবে নিজেদের ঘোড়াগুলিও দান করেন। আর সেই থেকেই এখানে কোনও কিছু মানত করার আগে ধাতব ঘোড়া দান করার রীতি শুরু হয় যা আজও চলছে।
হরিয়ানার কুরুক্ষেত্র জেলায় দ্বৈপায়ন হ্রদের মনোরম এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশে মা স্বাবিত্রীর
এই মন্দির অবস্থিত।পুরান মতে পরশুরাম ধরিত্রীকে ক্ষত্রিয় শুন্য করার পরে এই হ্রদের জলে পিতৃ পুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পন করেছিলেন।
শাস্ত্র মতে দেবী সাবিত্রী সূর্য্য কন্যা এবং তিনিই গায়েত্রী মন্ত্রের অধীস্টাত্রী দেবী। তার আশীর্বাদে বৈকুণ্ঠ লাভ হয় বলেও বিশ্বাস।
এখানে মায়ের ‘কঠোর রূপ’ বা উগ্র রূপ দেখা যায়।দেশের প্রাচীনতম মন্দিরগুলির মধ্যে এটি একটি। মন্দিরে ঢোকার আগে শ্বেতপাথরের পা এর একটি অবয়বও রাখা আছে।
ভক্তরা আগে সেখানে পুজো করে তারপর মন্দিরে প্রবেশ করেন।সারা বছরই এখানে নিত্যপুজোর ব্যবস্থা থাকলেও কালীপুজোর তিথি ধরে এখানে হয় দেবীশক্তির আরাধনা। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, পবিত্র মনে কালিকাদেবী মায়ের কাছে যা চাওয়া হয় মা সেই মনস্কামনাই পূরণ করেন।
আজ এই শক্তি পীঠ নিয়ে এইটুকুই।ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য একটি শক্তি পীঠ নিয়ে।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – শোনদেশ

আজকের পর্বে লিখবো একান্নপীঠ  শোন্দেশ নিয়ে। দেবীর মন্দিরটি মধ্যপ্রদেশের অমরকন্টক এ অবস্থিত। পুরান অনুসারে এখানে দেবী সতীর ডান নিতম্ব পড়েছিল। এই শক্তি পীঠে নর্মদা রূপে বিরাজ করছেন। দেবীর ভৈরব হলেন ভদ্রসেন।

 

পুরানে মতে মহাদেব যখন ত্রিপুর অর্থাৎ তিনটি প্রাচীন নগরীকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ভষ্মিভূত করেছিলেন সেই সময় কিছু ভস্ম অথবা ছাই পড়েছিল কৈলাসে। কিছুটা পড়েছিল অমর কণ্ঠকে আর কিছুটা ছাই মহাদেব নিজে স্বর্গে সঞ্চিত রেখেছিলেন। এছাড়াও মনে করা হয় যে, যে ভস্ম অর্থাৎ ছাই অমর কন্ঠকে পড়েছিল তা থেকে পরে কোটি কোটি শিবলিঙ্গ সৃষ্টি হয়েছে।তাই এই পীঠটি একাধারে শক্তি পীঠ আবার শৈব্য তীর্থ।

 

মহাভারতের বনপর্বে এই পীঠের উল্লেখ আছে।

ঋষি পুলস্থ রাজা যুধিষ্টিরকে বলেছিলেন এই পবিত্র স্থানে নর্মদা নদীতে স্নান করলে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ হয়।আজও বিশ্বাস করা হয় যে অমরকন্টক এই জায়গাটিতে দেবতাদের বাসস্থান তাই এখানে যার মৃত্যু হবে সে সরাসরি বৈকুণ্ঠ যাত্রা করবে।

 

এই শোন্দেশ শক্তি পীঠ তথা নর্মদা মন্দিরটি আজ থেকে প্রায় ছয় হাজার বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল। মন্দিরের ভিতরের বেদীতে দেবী বিরাজ করছেন। সুন্দর এই বেদীটি রূপা দিয়ে তৈরি।

প্রাচীন কালে তৈরী এই মন্দিরের কারুকার্য এবং ভাস্কর্য আজও বিস্ময় জাগায়।মন্দিরের চারপাশে ছোট ছোট আরও অনেকগুলি পুষ্করিণী অথবা পুকুর আছে।মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নর্মদা নদী এবং কাছেই বিন্ধ্য পর্বত আর সাতপুরা পর্বত একসাথে মিশেছে।সব মিলিয়ে ওই শক্তি পীঠ সংলগ্ন প্রাকৃতিক পরিবেশ অতি মনোরম।

এই মন্দিরের পাশেই রয়েছে মাঈ কি বাগিয়া অর্থাৎ দেবী মায়ের বাগান। জনশ্রুতি আছে যে এই বাগানে নাকি দেবী নর্মদা নিয়মিত

ফুল তুলতে আসেন।

 

শোনদেশ শক্তি পীঠে সারা বছরই পূজা হয়

এবং প্রতিদিন ভক্তদের ভিড় লেগে থাকে।

তাছাড়া এই শক্তিপীঠ মহাশিবরাত্রি পালনের জন্য খুবই বিখ্যাত।

 

আগামী পর্বে আবার ফিরে আসবো অন্য একটি শক্তি পীঠের কথা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বর্ধমানের তীর্থখেত্রে

শিরোনাম থেকেই নিশ্চই বুঝতে পারছেন আজ আপনাদের সাথে আমার সাম্প্রতিক তীর্থ দর্শনের কিছু অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধি ভাগ করে নেবো।
বেশি দূর নয় এই কাছেই বর্ধমান গেছিলাম গোটা পরিবার নিয়ে, উদ্দেশ্য কয়েকটি মন্দির পরিদর্শন এবং কিছু মানুষের যথা সাধ্য পাশে দাঁড়ানো।


প্রথমেই বলবো বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দিরের কথা।টেরাকোটার কাজের অপূর্ব নিদর্শন এই সর্বমঙ্গলা মন্দির।কথিত আছে, প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর আগে বর্ধমানের উত্তরাংশে বাহির সর্বমঙ্গলা পাড়ায় বাগদিরা পুকুরে মাছ ধরতে গিয়ে জেলেরা এই শিলামূর্তি রুপী মা সর্বমঙ্গলা দেবীকে খুঁজে পান।পরবর্তীতে রাজা স্বপ্নাদেশ পেয়ে দেবীকে মন্দির বানিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন।বর্তমানে সিংহবাহিনী দুর্গাই পুজিত হন সর্বমঙ্গলা রূপে। তিনশো পয়ষট্টি দিনই সর্বমঙ্গলা মন্দিরে পুজো হয়।আজ দেবীকে কাছ থেকে দর্শন করে ধন্য হলাম।শুধু তাই নয় আমার নিবেদন করা শাড়িতে মাকে সাজানো হলো। সন্ধ্যা আরতি ও পুজো দেখার সৌভাগ্যহলো।

এর পর দু’হাজার বছরেরও বেশি পুরনো নব রত্ন মন্দিরে স্থাপিত দেবী কঙ্কালেশ্বরীকে দর্শন করতে গেলাম।বর্ধমানের মহারাজ বিজয়চাঁদ মহাতাবের উদ্যোগে এই মূর্তি অতি প্রাচীন কাঞ্চন নগরের মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়। শোনা যায় এক
ধার্মিক পরিব্রাজক কমলানন্দ মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি দামোদরের তীরে থেকে শীলয় খোদাই করা মাতৃ মূর্তি উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিলেন।
বহু তীর্থে ঘুরেছি তবে কালো পাথরে ফুটে ওঠা এমন কঙ্কালসার দেবী মূর্তি বাংলায় আর কোথাও আমি অন্তত দেখিনি।অদ্ভুত এক ভক্তি এবং শ্রদ্ধা জাগরিত হয় এই মন্দির প্রাঙ্গনে এসে দাঁড়ালে। এই অনুভূতি ঠিক শব্দে প্রকাশ করার বিষয় নয়।

বর্ধমান এসে বর্ধমানেশ্বর যাবোনা তাই আবার হয় নাকি। অবশ্য মোটা শিব নামেই এই শিব মন্দির বেশি বিখ্যাত। আকার আয়তনে বিশাল এই
শিব লিঙ্গ।শোনা যায় কুশান যুগে রাজা কণিষ্ক এই শিবলিঙ্গ পুজো করতেন।শুনেছি শিবরাত্রিতে এখানে বিরাট মেলা বসে। যদি ভবিষ্যতে কখনো সুযোগ হয় অবশ্যই শিব রাত্রিতে আসবো এখানে।

আরো একটি শৈব্য ক্ষেত্র আজ ঘুরে দেখলাম।
বর্ধমানের নবাবহাটে প্রায় দুশো তিরিশ বছর আগে বহু অর্থ ব্যয় করে জপ মালার আকারে একশো আটটি শিব মন্দির গড়েছিলেন বর্ধমানের এক মহারানি।বর্ধমানের একশো আট মন্দিরের খ্যাতি এখন ভারত জোড়া। সারা বছর দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে ভক্তরা এই মন্দিরে পুজো দিতে আসেন।আমিও আজ এই অপূর্ব মন্দির দর্শন করে ধন্য হলাম।

তারাপীঠ বললেই যেমন বামা ক্ষেপার কথা মনে আসে বা দক্ষিনেশ্বর বললেই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তেমনই বর্ধমানে এলে মনে পরে মাতৃ সাধক কমলা কান্তের কথা। আজ আজ এই বিখ্যাত এবং অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন মাতৃ সাধকের মন্দির দর্শন করার সৌভাগ্য অর্জন করলাম।এই মন্দিরে পঞ্চমুণ্ডির আসনে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন কমলাকান্ত। তাঁর ইচ্ছা ছিল, মৃত্যুর পর মায়ের চরণতলে তাঁকে ঠাঁই দেওয়া হয় এবং মায়ের থেকে তাঁকে যেন কোনওভাবেই আলাদা না করা হয়। সেই ইচ্ছানুসারে, তাঁর সমাধির উপরই প্রতিষ্ঠা করা হয় মায়ের মূর্তি ও মন্দির। কমলাকান্তকালী বাড়িতে ধাতুর তৈরি এক অনিন্দ সুন্দর মূর্তি আছে যার দর্শন দেহ মনে এক অপার্থিব আধ্যাত্মিক রোমাঞ্চ জাগায়।

সব শেষে বলবো শুধু মন্দির আর মূর্তি দর্শন নয়। শিব জ্ঞানে জীব সেবার আদর্শ কে সামনে রেখে কিছু মানুষকে আহার করিয়ে বা ভান্ডারার আয়োজন করতে পেরে এবং কিছু বস্ত্র তাদের তুলে দিতে পেরে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করছি। এই কাজে আমার সহ যাত্রী অর্থাৎ আমার পরিবারের সদস্য এবং সর্বপরি সংশ্লিষ্ট মন্দির কতৃপক্ষর সহযোগিতার জন্য তাদের আমার ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাই।

যখনই সুযোগ আসবে আবার তীর্থে যাবো।আবার মানুষের পাশে দাঁড়াবো। আবার যথা সময়ে সেই তথ্য আপনাদের সাথে ভাগ করে নেবো। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – হিংলাজ

আজ শক্তি পীঠ হিংলাজ নিয়ে লিখবো ।
পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে একান্ন পীঠের অন্যতম প্রধান পীঠ হিংলাজ অবস্থিত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানে।পাকিস্তানের বালোচিস্তান প্রদেশের লাসবেলা জেলায় হিঙ্গোল নদীর ধারে এই
শক্তি পীঠটি রয়েছে।
পাকিস্তানে হিন্দুরা ছাড়াও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দেবীর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা এবং
ভক্তি দেখা যায় তারা দেবী হিংগুলা বা দেবী কোট্টরা কে ‘নানী’ বলে ডাকে। মন্দিরের দেবীর নামেই পুরো গ্রামটির নাম হয়ে গিয়েছে হিংলাজ গ্রাম।
শাস্ত্র মতে এই স্থানে দেবী সতীর ব্রহ্মরন্ধ্রটি পড়েছিল তাই দেবীকে এখানে “কোট্টারী” রূপে পুজো করা হয়। দেবীর ভৈরবকে এখানে “ভীমলোচন” রূপে পূজা করা হয়।
পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে হিংলাজ পীঠস্থানটি একান্ন পীঠের প্রথম পীঠ। কুলার্ণব তন্ত্র মতানুসারে আঠারোটি পীঠের তৃতীয় পীঠ আবার কুব্জিকা
তন্ত্র গ্রন্থ অনুসারে বিয়াল্লিশটি সিদ্ধপীঠের
পঞ্চম পীঠ এটি।
এক সময়ে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে মরুভুমির মধ্যে দিয়ে উটের পীঠে চেপে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এই মন্দিরে যেতে হতো। এই কষ্ট সাধ্য যাত্রা নিয়ে একটি সিনেমাও হয়েছে যার নাম মরুতীর্থ হিংলাজ
ওই তীর্থ যাত্রাকে স্থানীয়র বলতো “নানী কি হজ “
শাস্ত্র মতে রাবন কে বধ করে রামের যখন
ব্রহ্ম হত্যার পাপ হয়েছিলো তখন এই হিংলাজ শক্তি পিঠে এসে দেবীকে দর্শন করে সেই পাপ
দূর হয়েছিলো।
দুর্গম অঞ্চলে একটি গুহায় দেবী ও তার ভৈরব অবস্থান করছেন। দীর্ঘ সিঁড়ি অতিক্রম করে সেখানে প্রবেশ করতে হয়। একটি বেদীতে
শিলা রূপে দেবী অধিষ্টান করছেন।
এখানে সিঁদুর দানের রীতি আছে।
বাস্তবে হিংগুলা শব্দের অর্থই সিঁদুর।
বহু ভক্ত এখানে আসেন নিজের মনোস্কামনা নিয়ে এবং বিশ্বাস করেন তাদের সব দুঃখ কষ্ট দূর হবে
দেবীর আশীর্বাদে।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। সাথে থাকবে অন্য একটি শক্তি পীঠের মাহাত্ম এবং
পৌরাণিক ব্যাখ্যা।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – খাদান কালী

শিল্প নগরী দুর্গাপুরে রয়েছে এক অদ্ভুত কালী মন্দির যে মন্দিরে কালীমাকে স্থানীয়রা খাদান কালী বলে ডাকেন। আজকের পর্বে জানাবো এই মন্দিরের ইতিহাস। শুরু করবো একটি
অলৌকিক ঘটনা দিয়ে।
সময়টা ষাটের দশক। খাদান অঞ্চলে একটি কয়লা বোঝাই ট্রাক খনিগর্ভে পড়ে যায়। ট্রাকটি তুলতে বড় বড় ক্রেন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু যতবারই ট্রাকটি তুলতে যায় ততবারই ক্রেনের শেকল ছিঁড়ে যায়। কলকাতা থেকে লোকজন নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যায়। খনির পাশেই ছিল ঝোঁপজঙ্গলে ঘেরা উঁচু ঢিপিতে মা কালীর এক বেদী। কোলিয়ারির ম্যানেজার ছিলেন বেজায় কালী ভক্ত তিনি সেই কালী মায়ের কাছে মানত করেন ট্রাকটি উদ্ধার করার জন্য। এরপরে নাকি সহজেই ট্রাকটি উদ্ধার করা যায় খাদ থেকে। তখন থেকেই অখ্যাত এই জঙ্গল এলাকায় সেই কালীথান বিখ্যাত হয়ে ওঠে ‘খাদান কালী’ নামে।
খাদান কালীর ইতিহাস আরো প্রাচীন যখন এই এলাকা ছিলো ঝোঁপজঙ্গলে ঘেরা তখন ওই উঁচু ঢিবিতে বেদী তৈরি করে কয়েকশো বছর ধরে স্থানীয় মতিলাল চক্রবর্তীর বংশধরেরা কালী মায়ের পুজো করতেন। অর্থাভাবে প্রতিমা তৈরি xtকরতে পারেননি তাঁরা। তাই খোলা আকাশের নীচে বেদী তৈরি করে ছোট পাথরকে কালী রূপেই পুজো করতেন।
ট্রাক উদ্ধারের কিছুদিন পর মা কালীর স্বপ্নাদেশ পান সেই ম্যানেজার । স্বপ্নে দেবীর মন্দির নির্মাণের আদেশ পান তিনি তবে তাকে বলা হয় সেই মন্দিরে যেন কোনও ছাদ না থাকে। মায়ের স্বপ্নাদেশ মতো মন্দির তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন স্থানীয়রা।
যথা সময়ে নির্দেশ মতো সেই প্রাচীন ঢিবিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় মন্দির। বেদীর চারদিক সাজানো হয় কলস দিয়ে। তার উপর দেওয়া হয় ত্রিশূল। এখানে দেবীর কোন মূর্তী নেই। পটের মধ্যে শ্যামবর্ণের কালী মূর্তী আঁকা।
আজও খাদান কালী মন্দিরে নিত্য পুজো হয়। অমাবস্যায় বিশেষ পুজো হয়।বহু দূরদূরান্ত থেকেও ভক্তরা আসেন এখানে পুজো দিতে।
ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে।
নতুন কালী কথা নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।