Home Blog Page 79

একান্নপীঠ – গায়েত্রী

আজ যে শক্তি পীঠ নিয়ে লিখবো তা

অবস্থিত রাজস্থানের পুস্করে। এখানে দেবীর হাতের তালু থেকে কনুই অবধি অর্থাৎ মণিবন্ধ পড়েছিল এখানে। দেবী সতী এখানে পূজিত হন গায়ত্রী
নামে এবং দেবীর ভৈরবের নাম সর্বানন্দ।

দেবী গায়েত্রী হলেন বেদ মাতা। দেবী গায়েত্রী থেকেই বেদ পুরান সৃষ্টি হয়েছে। এই গায়েত্রী দেবী সাক্ষাৎ বিরাজ করছেন এই শক্তি পীঠে।

রাজস্থানের শুষ্ক মরু অঞ্চলে অবস্থিত এই
শক্তিপীঠ পীঠ নির্ণয় তন্ত্র সহ একাধিক শাস্ত্রেই খুব গুরুত্বপূর্ণ পীঠ রূপে উল্লেখিত।

এখানে একটি পবিত্র কুন্ড আছে। যার নাম পুস্কর
এই কুন্ডের জল মহাপবিত্র এবং এর সাথে জড়িয়ে আছে বহু অলৌকিক ঘটনা।

শোনা যায় রাজপুতনার পরিহার বংশীয় রাজা লহোর ছিলেন কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত। একবার তিনি এই অঞ্চলে শিকারে আসেন। একটি শ্বেত বরাহের পেছনে ছুটতে ছুটতে তিনি এই এলাকায় এসে তৃষ্ণার্ত হয়ে এই কুন্ডের জল পান করেন।
এতে তার শরীরের সব রোগ হটাৎ সেরে যায়।
তারপর এই কুন্ডের এবং শক্তিপীঠের মহাত্ম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

পদ্মপুরান অনুযায়ী এই কুন্ডের ধারে প্রজাপতি ব্রহ্মা যজ্ঞ করেছিলেন।ভারতের একমাত্র ব্রম্হার মন্দিরটিও এখানেই অবস্থিত।

পুরাকালে ব্রহ্মা যে স্থানে যজ্ঞ করেছিলেন সেই যজ্ঞবেদীর পশ্চিম দিকে গায়ত্রী মাতার মন্দির আছে।মহাভারতে এই তীর্থের বর্ণনা আছে। বন পর্বে পান্ডবরা এই স্থানে এসে পুজো দিয়ে ছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়।

বলা হয় এখানে স্নান করে গায়েত্রী দেবীর মন্দিরে পুজো দিলে সমস্ত মনোবাসনা পূর্ণ হয়।

দেবী গায়েত্রীকে প্রণাম জানিয়ে আজকের পর্ব এখানেই শেষ করছি।ফিরে আসবো পরবর্তী শক্তিপীঠ নিয়ে।আগামী পর্বে।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্নপীঠ – কামাখ্যা

আজকের একান্ন পীঠ পর্বে লিখবো

অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি পীঠ কামরুপ কামাখ্যা নিয়ে। এই কামরূপ কামাখ্যায় নিহিত আছে বহু রহস্য, রোমাঞ্চএবং পৌরাণিক গল্পগাথা।আজ চেষ্টা করছি এই প্রতিটি আঙ্গিক ছুঁয়ে যেতে।

 

বলা হয় একসময় এ জায়গায় কেউ গেলে আর ফিরে আসত না। এখনো জাদুবিদ্যা সাধনার জন্য বেছে নেওয়া হয় কামাখ্যা মন্দিরকেই। কামরূপ কামাখ্যার আশপাশের অরণ্য আর নির্জন পথে নাকি ঘুরে বেড়ায় ভালো-মন্দ আত্মারা। এমনকি এক কালে বৈদেশিক শত্রুরা বিশ্বাস করতো কামরূপ-কামাখ্যার অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন মায়াবী নারীরা পুরুষদের মন্ত্রবলে ভেড়া বানিয়ে রাখতো|তাই অনেকেই এই পথ মাড়াতে চাইতো না সহজে|

 

মহাভারতের যুগে এই স্থনের নাম ছিল প্রাগজ্যোতিষ। পাল রাজারা এককালে শাসন করতো এই প্রদেশ|এই আসামেরই কামরুপ জেলার নীলকন্ঠ পাহাড়ের চূড়ায় প্রাচীন মন্দিরটি অবস্থিত।পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে সিদ্ধ পীঠ কামরূপে মায়ের মাতৃ যোনি পতিত হয়েছিল কামাখ্যাকে বলা হয় তীর্থচূড়ামণি। তীর্থচূড়ামনির অর্থ হলো সব তীর্থের মধ্যে সেরা তীর্থ স্থান।

 

এই স্থানে নরকাসুর এবং দেবী কামাখ্যাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন বশিষ্ট দেব। এই স্থানেই শিবের অভিশাপে নিজ রূপ হারিয়ে পুনরায় নিজের স্বরূপ ফিরে পেয়েছিলেন কামদেব।

 

যেখানে সতীর যোনি মন্ডল পতিত হয়েছিল সেই জায়গাটাকে বলে কুব্জিকাপীঠ।কথিত আছে যোনিরূপ যে প্রস্তরখণ্ডে মা কামাক্ষা অবস্থান করছেন, সেই শিলা স্পর্শ করলে মানুষ মুক্তিলাভ করে। কালিকাপুরাণে বলা হয়েছে সতীর অঙ্গ পতিত হওয়ার পর এই উচ্চ পর্বত মহামায়ার শ্রী অঙ্গের ভার সহ্য করতে না পেরে কেঁপে উঠলো এবং ক্রমশঃ পাতালে প্রবেশ করতে লাগলো। তখন দেবতাদের অনুকম্পায় এই পর্বত পাতালে প্রবেশ থেকে রক্ষা পায়। কিন্তু মতৃ যোনি পতিত হওয়ার ফলে পর্বতের রং নীল বর্ণ ধারণ করেছিল তাই পর্বতের নাম হলো নীলকণ্ঠ বা নীলচল পর্বত।

 

এই মন্দির চত্বরে দশমহাবিদ্যার মন্দিরও বিদ্যমান।

দেবীর ভৈরব একজন নয় নয়জন।তাই মনে করা হয় সুদূর অতীতে কোনো এক সময়ে হয়তো এখানে নয়টি শক্তিপীঠ ছিলো। যদিও এখন একটি শক্তিপীঠ ই জনসমক্ষে অবস্থিত।

 

মনেকরা হয় মূল কামাখ্যার মন্দিরটি নাগারা স্থাপত্যশৈলীর মন্দির ছিল। বর্তমান কামাখ্যা মন্দিরে গর্ভগৃহ ও তিনটি মণ্ডপ সম্বলিত চারটি কক্ষ রয়েছে যেগুলোর স্থানীয় নাম চলন্ত, পঞ্চরত্ন এবং নাটমন্দির। গর্ভগৃহটি পঞ্চরথ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত।বর্তমান মন্দিরটি সংস্কার করেছিলেন কোচ বিহারের রাজা নরনারায়ণ।

 

অম্বুবাচি কামাখ্যা মন্দিরের প্রধান উৎসব। অম্বু বাচির সময়ে দেশ বিদেশথেকে মাতৃ সাধক এবং তীর্থযাত্রীরা এখানে আসেন।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য এক শক্তিপীঠ সংক্রান্ত আলোচনা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্নপীঠ – মঙ্গলচন্ডী

আজকের একান্ন পীঠ পর্বে লিখবো বর্ধমান তথা বাংলার অন্যতম জাগ্রত শক্তিপীঠ মঙ্গলচন্ডী নিয়ে।

পুরান অনুসারে অজয় নদীর পাড়ে দেবীর ডান কব্জি পতিত হয়েছিল।শক্তি পীঠে দেবীর নাম মঙ্গলচন্ডী আর দেবীর ভৈরব কপিলাম্বর।

প্রাচীন মঙ্গল চন্ডীর মূর্তিটি ছিলো পাল যুগের।পরবর্তীতে র্ভগৃহের মধ্যেই মা মঙ্গলচন্ডীর ছোট কালো পাথরের দশভূজা মূর্তি বসানো হয়।
ভৈরবের মূর্তির সামনে নন্দীর কালো পাথরের একটি ছোট্ট মূর্তি আছে। ভৈরবের বাঁদিকে রয়েছে বুদ্ধমূর্তি। তাই স্থানটি একাধারে শাক্ত, শৈব্য এবং বৌদ্ধদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

লোক কাহিনী অনুসারে এক ব্যবসায়ী ব্যবসা করতে গিয়ে সমুদ্রে নিখোঁজ হয়ে যান তারপর তার স্ত্রী খুল্লনা মঙ্গল চন্ডী কে পুজোয় সন্তুষ্ট করে তার স্বামীর ফিরে আসার জন্য প্রার্থনা করেন।
অলৌকিক ভাবে কিছুদিন পর ওই ব্যবসায়ী ফিরে আসেন সুস্থ শরীরে। তারপর দেবীর মহিমা ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে।সেই থেকে মঙ্গলচন্ডীর পূজা হয়ে আসছে অজয় নদীর পাড়ে অবস্থিত এই মন্দিরে।

তবে মা মঙ্গলচন্ডীর আখ্যান আরো প্রাচীনকাল থেকেই নানা শাস্ত্রে লিপিবদ্ধ। কথিক আছে রাজা বিক্রমাদিত্যর কুল দেবী ছিলেন মা মঙ্গলচন্ডী। সপ্নাদেশ দিয়ে দেবী বিক্রমাদিত্যকে বলেন গভীর জঙ্গল থেকে তাকে উদ্ধার করে মন্দিরে স্থাপিত করে পুজো করতে। বিক্রমাদিত্য জ্যোতি রূপে দেবীর উপস্থিতি দেখতে পান এবং দেবীকে জঙ্গল থেকে লোকালয়ে এনে স্থাপন করেন।

পরবর্তীতে মুসলিম শাসন কালে দেবীর লোক চক্ষুর আড়ালে চলে যান এবং নতুন করে তার মহিমা প্রচারিত হয় সেই ব্যবসায়ীর নিখোঁজ হওয়ার এবং ফিরে আসার মধ্যে দিয়ে।

বর্তমানে প্রতি মঙ্গলবার দেবীর পুজো করা হয়। এছাড়াও সারা বছর ধরে এখানে দুর্গাপূজা, কালীপূজা সবই হয়।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। নতুন একটি
শক্তি পীঠের কথা নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্নপীঠ – গন্ডকী

আজ যে শক্তিপীঠটি নিয়ে লিখবো তা আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপালে অবস্থিত।

এই শক্তি পীঠ গন্ডকী একাধারে বৌদ্ধ, শাক্ত এবং শৈব্য দের কাছে সমান ভাবে পবিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ।

পুরান অনুসারে এখানে সতীর ডান গাল অথবা গন্ডদেশ পড়েছিলো । দেবী হলেন গন্ডকী যিনি চন্ডী রূপেই পূজিতা হন এবং দেবীর ভৈরব এখানে চক্রপাণি। পুরান থেকে আরো জানা যায় যে সমুদ্র মন্থন থেকে উঠে আসা বিষ পান করে ভগবান শিবের অসহ্য জ্বালা শুরু হলে তিনি এই স্থানে এসে গন্ডকী পার্শবর্তী একটি হ্রদে স্নান করে সেই জ্বালা দূর করেন।সেই থেকে এই হ্রদের নাম নীলকন্ঠ হ্রদ।

স্থানটি আদতে একটি শৈব্য তীর্থ কারন মুক্তিনাথ শিব মন্দির রয়েছে এখানেই এবং গন্ডকী চন্ডীর মন্দির পাহাড়ের উপরে অবস্থিত।মুক্তিনাথ মন্দিরের উল্লেখ বিষ্ণু পুরানেও পাওয়া যায়।
বর্তমান মন্দিরটিও বেশ প্রাচীন তবে সুন্দর এবং অপূর্ব তার নির্মাণ শৈলী।মন্দিরের পাঁচিলে একশো আটটি পিতলের নানান জন্তুর মুখ বসানো আছে প্রতিটির মুখ থেকে অজস্র ধারায় অনবরত জল পড়ছে। এই জল শিব ভক্তদের কাছে অমৃতর ন্যায়
পবিত্র। প্রচলিত বিশ্বাস এই শক্তিপীঠ দর্শন করে এই শিব মন্দিরে পুজো দিলে এবং এই জলে স্নান করলে সব দুঃখ যন্ত্রনা থেকে মুক্তি লাভ হয়।

তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু রিনপোচে  মুক্তিনাথে এসে ধ্যান করেছিলেন বলে বৌদ্ধরা বিশ্বাস করেন তাই বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছেও স্থান টি অতি গুরুত্বপূর্ণ।

সব শেষে বলবো এই গন্ডকীতেই পাওয়া যায় শালগ্রাম শীলা। পৃথিবীর অন্য কোনো নদীতে এই শালগ্রাম শীলা দেখা যায় না। ব্যক্তিগত ভাবে আমার নিজের সৌভাগ্য হয়েছে এই পবিত্রস্থান দর্শন করা এবং শালগ্রাম শীলা সংগ্রহ করার।
এই শালগ্রামশীলা কে সাক্ষাৎ বিষ্ণু মনে করা হয়।
কারন পুরান মতে কঠোর তপস্যারত বিষ্ণুর ঘাম থেকে এই গন্ডকী নদীর সৃষ্টি হয়েছে।

ফিরে আসবো আগামীপর্বে অন্য একটি শক্তিপীঠ সংক্রান্ত আলোচনা নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – যশোরেশ্বরী

একান্ন পীঠ পর্বে বাংলা দেশে অবস্থিত শক্তিপীঠ যশোরেশ্বরী নিয়ে লিখবো।

 

সনাতন ধর্মের ৫১ পীঠের একটি যশোরেশ্বরী মন্দির|দেহত্যাগের পর দেবী সতীর শরীর যে ৫১ খণ্ড হয়ে যায় তার পাঁচটি খন্ড বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে এর মধ্যে এর মধ্যে সাতক্ষীরার ঈশ্বরীপুর গ্রামে সতীর করকমল বা পাণিপদ্ম পতিত হয়|

 

তন্ত্রচূড়ামণিতে বলা হয়েছে—

 

‘যশোরে পানিপদ্ম দেবতা যশোরেশ্বরী,/চণ্ডশ্চ ভৈরব যত্র তত্র সিদ্ধ ন সংশয়।’

 

অর্থাৎ যশোরে সতীর পাণিপদ্ম বা করকমল পড়েছে। দেবীর নাম যশোরেশ্বরী, ভৈরব হলেন চণ্ড। এই সতীপীঠে কায়মনোবাক্যে পুজো করলে ভক্তের মনোবাসনা পূর্ণ হয় বলে সর্বসাধারণের বিশ্বাস।

 

মনেকরা হয় বহু প্রাচীনকাল থেকেই এখানে এক অজ্ঞাত ব্রাহ্মণ কতৃক নির্মিত যশোরেশ্বরী মন্দির অবস্থিত ছিলো পরবর্তীকালে লক্ষ্মণ সেন ও প্রতাপাদিত্য কর্তৃক তাদের রাজত্বকালে এটির সংস্কার করা হয়েছিল|মুঘল আমলে সেনাপতি মান সিংহ এই স্থানে আসতেন পুজো দিতে।

 

মন্দির নিয়ে একটি অলৌকিক ও ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখও পাওয়াযায়, কথিত আছে,মহারাজা প্রতাপাদিত্যর আমলে তার সেনাপতি এখানকার জঙ্গল থেকে একটি আলৌকিক আলোর রেখা বের হয়ে মানুষের হাতেরর তালুর আকারের একটি পাথরখণ্ডের উপর পড়তে দেখেন।পরবর্তীতে তিনি ওই স্থানে কালীর পূজা করতে আরম্ভ করেন এবং এই কালী মন্দিরটি নির্মাণ করেন যা আজ যশোরেশ্বরী কালী মন্দির নামে প্রসিদ্ধ|

 

বর্তমানে মন্দির-বেদির ওপর প্রতিষ্ঠিত মাতৃমূর্তির শুধু মুখমণ্ডলই দৃষ্টিগোচর হয়|মায়ের মাথার ওপর টকটকে লাল রঙের চাঁদোয়া। কণ্ঠে রক্তজবার মালা ও নানা অলংকার। মাথায় সোনার মুকুট। লোলজিহ্বা দেবীর ভীষণা মূর্তি তবে মুখ মন্ডলে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও স্নিগ্ধতা|দেবীর মন্দিরে

বর্তমানে একটি দরজা এবং ছটি জানলা আছে।

 

প্রত্যেক শনি মঙ্গলবার দেবীর পুজো হয়

যশোরেশ্বরীর পুজো তন্ত্রমতে হয় এবং প্রতিবছর মন্দিরে খুব ধুমধাম করে শ্যামাপুজো হয় যা

দর্শন করতে আসেন অসংখ্য মানুষ

যারা নিজেরদের মনোস্কামনা জানান দেবীর কাছে। বিশ্বাস করা হয় দেবী সবার মনোস্কামনা পূর্ণ করেন।

 

পরবর্তী শক্তিপীঠ নিয়ে ফিরে আসবো যথা সময়ে

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্নপীঠ – অবন্তীকা

ভরতচন্দ্র তার অন্নদা মঙ্গলে লিখেছেন –
” লম্বকর্ণ ভৈরব অবন্তী দেবী তায় “
এই অবন্তী শক্তি পীঠ শিপ্রা নদীর তীরে ভৈরব পাহাড়ে অবস্থিত। মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে অবস্থিত রয়েছে ভৈরব পর্বত যা প্রায় পৌরাণিক সময়ের ।এক কালে এই তীর্থ হরসিদ্ধি নামেও পরিচিত ছিলো।বন, শ্মশান, নদী সবই ঘিরে আছে এই শক্তি পীঠকে তাই অনেকে শাস্ত্রজ্ঞ মনে করেন এটি একটি আদর্শ তীর্থ ক্ষেত্র।
দেবী ভগবৎ পুরান মতে এই শক্তিপীঠে সতীর উপরের ঠোঁট পড়ে যদিও শ্রী অঙ্গ খুঁজে পাওয়া যায়নি আবার অনেকে বলেন দেবীর শ্রী অঙ্গ থেকেই ভৈরব পর্বতের জন্ম হয়েছে।এখানে
দেবী হলেন অবন্তি এবং ভৈরব হলেন লম্বকর্ণ।
পুরান অনুসারে ত্রিপুরাসুরকে বধ করার আগে মহাদেব দেবী অবন্তীর পুজো করেছিলেন এবং দেবী তাকে খুশি হয়ে পশুপত অস্ত্র দিয়ে ছিলেন সেই অস্ত্র দিয়েই মহাদেব অত্যাচারী ত্রিপুরাসুরকে বধ করে দেবতা এবং সৃষ্টি রক্ষা করেছিলেন।
ভৈরব পর্বতে রয়েছে রঙিন পাথর দিয়ে তৈরী এক প্রাচীন মন্দির যার নির্মাণের সঠিক সাল তারিখ পাওয়া যায়না।মন্দিরের ছাদে এবং দেওয়ালে খুব সুন্দর পাথরের কাজ করা আছে।যা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়।
দেবী দশভুজা অবন্তী বা মহাকালী সিংহ বাহিনী, দেবী দশভূজা তার দশটি হাতে দশ রকমের অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাজানো হয়ে থাকে।দেবীর মাথায় রয়েছে মুকুট এবং গায়ে রয়েছে অনেক অনেক অলংকার বিশেষ তিথিতে ফুলের মালা এবং লাল রঙের শাড়িতে দেবীকে সাজানো হয়।
প্রত্যেক বারো বছর অন্তর শিপ্রা নদীর তীরে এই স্থানে কুম্ভ মেলা অনুষ্ঠিত হয়।সেই উপলক্ষ্যে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী আসেন।
আজকের শক্তি পীঠ নিয়ে আলোচনা এখানেই শেষ করছি ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য
এক শক্তিপীঠ নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – ইন্দ্রাক্ষি

আমাদের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলংকায় রয়েছে একটি বিতর্কিত শক্ত পীঠ যার নাম ইন্দ্রাক্ষি|
আজকের পর্বে জানাবো এই শক্তিপীঠ
সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য|

পীঠ নির্ণয় তন্ত্র, চন্ডীমঙ্গল কাব্য সহ বেশ কিছু প্রাচীন শাস্ত্রে সিংহলে অবস্থিত ইন্দ্রাক্ষি নামক এই শক্তি পীঠের উল্লেখ পাওয়া যায়|

এই পীঠে দেবী ইন্দ্রাক্ষি রূপে পূজিত হন এই পীঠের সাথে জড়িত আছে দেবরাজ ইন্দ্র ও এক পৌরাণিক ঘটনা|পৌরাণিক মত অনুযায়ী,প্রাচীন সিংহলে পড়েছিল সতীর পায়ের মল বা নুপুর| সতী এখানে ইন্দ্রাক্ষ্মী আর শিব হলেন রাক্ষশেশ্বর৷ পৌরাণিক মত অনুসারে ইন্দ্রাক্ষ্মীর মূর্তি বানিয়ে পুজো করতেন স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র কারন বৃত্তাসুরের সাথে যুদ্ধের সময় দেবী ইন্দ্রকে সাহায্য করে ছিলেন ও দেবতাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং যুদ্ধ শেষে তিনি এই স্থানে ইন্দ্রাক্ষি রূপে সদা বিরাজমান থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন|

রামায়নে এই পীঠের উল্লেখ আছে। রাবনকে বধ করার আগে রাম এই দেবীর আশীর্বাদ নিয়েছিলেন।এককালে তন্ত্র মন্ত্রর জন্য বিখ্যাত ছিলো এই স্থান।

যদিও এই পীঠের সঠিক অবস্থান নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে তবে বেশি ভাগ গবেষক ও শাস্ত্র বিশেষজ্ঞই মনে করেন
বৌদ্ধ প্রধান দেশ শ্রীলংকার একসময় গৃহযুদ্ধ বিধ্বস্ত জাফনাতেই আছে এই সতীপীঠ| জাফনার এক মন্দিরে ধুমধাম করে পুজো হয় দেবী ইন্দ্রাক্ষির|

আগামী পর্বে আবার কোনো শক্তি পীঠ নিয়ে বলবো একান্ন পীঠ পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – দেবী অপর্ণা

আজ যে শক্তিপীঠ নিয়ে লিখবো তা আমাদের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের ভবানীপুরে অবস্থিত।এই শক্তি পীঠে দেবীকে অপর্ণা নামে ডাকা হয় আবার কারুর কারুর কাছে তিনি দেবী ভবানী। শক্তি পীঠ সংক্রান্ত প্রায় সব গুলি প্রামান্য গ্রন্থেই এই শক্তি পীঠের উল্লেখ আছে।
দেবীর শ্রী অঙ্গের কোন অংশ এখানে পতিত হয়ে ছিলো তা নিয়ে সামান্য বিতর্ক আছে কিছু শাস্ত্রে আছে দেবী সতীর ডান চোখ পড়েছিল এই স্থানে।
তবে পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে এখানে দেবীর কর্ণ পড়েছিল। ভরত চন্দ্রের মতে এই স্থানে পড়েছিল দেবীর গোড়ালি।দেবীর ভৈরবের নাম বামন।
সুলতানি আমলে এই অঞ্চল শাসন করতেন সেনাপতি রহমত খাঁ।গৌরের শাসক যখন এই স্থান নিজের দখলে নিতে আক্রমণ করেন তখন পালতে গিয়ে রহমত খাঁর নৌকো আটকে যায় নদীর চড়ায়।তারপর দেবী অপর্ণার মন্দিরের পুরোহিতের নির্দেশে বিশেষ পুজো পাঠ হলে হটাৎ নেমে আসে ঝড় বৃষ্টি। নদীতে গিয়ে পড়ে নৌকা। রেহাই পেয়ে পরবর্তীতে সেনাপতি রহমত খাঁ দেবীর মন্দির নতুন করে সংস্কার করান। এসব ঘটনা আজও জনশ্রুতি আকারে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে।
পরবর্তীতে এই স্থান নাটোরের রানী এই অঞ্চলের শাসক হন এবং রানী ভবানী এই মন্দিরের জন্য অনেক ভূ-সম্পত্তি দান করে গিয়েছিলেন।
এই শক্তি পীঠকে কেন্দ্র করে আরো একটি অলৌকিক ঘটনার কথা শোনা যায়।নিজের মন্দিরটি থেকে বেরিয়ে দেবী অপর্ণা বা ভবানী প্রতিদিন দুপুরবেলা মন্দিরের উত্তর পারে সংলগ্ন জঙ্গলঘেরা পুকুরের পাশে সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে বালিকা বধূ সাজে ধুলোমাটি নিয়ে খেলা করতেন। ভবানীপুরের এই মন্দিরের একদা জঙ্গলঘেরা এই পথ দিয়ে এক শাঁখারি শাঁখা বিক্রি করতে যাচ্ছিলেন। দেবী ছল করে বালিকা বেশে সেই শাঁখারির থেকে শাঁখা পড়েছিলেন। সব শুনে মহারানী লোকজন নিয়ে সেই জায়গায় গিয়েছিলেন। মা ভবানী তখন পার্শবর্তী একটি পুকুর থেকে তার দুই হাতের শাঁখা উপরে তুলে দেখিয়ে ছিলেন।বহুকাল অবধি সেই
শাঁখারির পরিবার দেবীর উদ্দেশ্যে শাঁখা
অর্পণ করতো।
সব মিলিয়ে এই শক্তিপীঠের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব এবং দেবীর মহাত্ম অবর্ণনীয়। আজও এখানে
বহু ভক্ত আসেন নিজের মনোস্কামনা নিয়ে। শোনা যায় দেবী কাউকে খালি হাতে ফেরান না। প্রায় প্রতিটি বিশেষ তিথিতেই দেবীর বিশেষ পুজো অনুষ্ঠিত হয়।
ফিরে আসবো অন্য একটি শক্তি পীঠের কথা নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বিশেষ পর্ব – কল্পতরু উৎসব

বিশ্ববাসির কাছে পয়লা জানুয়ারি মানে ইংরেজি নব বর্ষের সূচনা হলেও বাঙালির কাছে পয়লা জানুয়ারি মানে কল্প তরু উৎসব।আজকের দিনে কাশীপুর উদ্যানবাটিতে কল্পতরু হয়েছিলেন শ্রী রামকৃষ্ণ। ১৮৮৬ সালের সেই দিনকে স্মরণে রেখেই মঠ মিশন সহ ঠাকুরের গৃহি ভক্তদের গৃহে পালন করা হয় কল্পতরু উৎসব।

 

প্রথমে আসুন শাস্ত্র কল্পতরু সন্পর্কে কি বলছে।

পুরাণ মতে দেবতা এবং অসুরদের মধ্যে সমুদ্র সমুদ্র মন্থনকালে অমৃত, লক্ষ্মীদেবী, ঐরাবত ইত্যাদির সঙ্গে উঠে আসে কল্প তরু বৃক্ষ পরবর্তীতে দেবরাজ ইন্দ্রের বিখ্যাত নন্দনকাননের স্থান পায় এই কল্প তরু বৃক্ষ এবং সেখান থেকে স্ত্রী সত্যভামার আবদারে শ্রীকৃষ্ণ পৃথিবীতে নিয়ে আসেন এই বৃক্ষ। এই বৃক্ষ সবার মনোস্কামনা পূর্ণ করতো অর্থাৎ এই বৃক্ষর কাছে যা চাওয়া হয় তাই পাওয়া যায়।

 

এবার আসুন জেনে নিই কেনো ঠাকুর রামকৃষ্ণকে কল্পতরু বৃক্ষের সাথে তুলনা করা হয় এবং কেনই বা এই বিশেষ দিনটিকে কল্পতরু দিবস রূপে পালন করা হয়।

 

দিন টা ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি কাশীপুর উদ্যান বাড়িতে উপস্থিত রয়েছেন প্রায় ৩০ জন মতো গৃহী ভক্ত।শরীরে মারণ রোগ বাসা বাঁধলে, ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের নির্দেশে ঠাকুর এই বাড়িতে চিকিৎসাধীন আছেন।ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক দুপুর তিনটে। দোতলা ঘর থেকে তিনি নেমে এলেন বাগানে। গৃহী ভক্তরা তাঁদের হাতে রাখা ফুল ঠাকুরের চরণে অঞ্জলি দিতে থাকেন। কথিত আছে, ঠাকুর তখন নাট্যকার গিরিশ ঘোষকে বলেন, “হ্যাঁ গো,তুমি যে আমার নামে এত কিছু চারিদিকে বলো, তো আমি আসলে কী”? গিরিশ ঘোষ উত্তর দিলেন, “তুমিই নররূপ ধারী পূর্ণব্রহ্ম ভগবান, আমার মত পাপী তাপীদের মুক্তির জন্যই তোমার মর্ত্যে আগমন”। সবাই তখন ঠাকুরের চরণ স্পর্শ করল এবং ঠাকুর তাদের আশীর্বাদ করে বললেন, “তোমাদের চৈতন্য হউক”।

 

তখন উপস্থিত ভক্তরা ইচ্ছা পূরণের এক দিব্য অনুভূতি অনুভব করেন নিজেদের অন্তরে।বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো এক অলৌকিক শক্তি যেনো প্রবেশ করে তাদের শরীরে। ঠাকুর তখন ভাব লেশ হীন। তন্ময় অবস্থায় পৌঁছে গেছেন।তিনি যেনো সাক্ষাৎ কল্পতরু।

 

সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত কেই আজ স্মরণ করা হয়।

ভক্তদের বিশ্বাস রয়েছে, এই দিন ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব সকলের মনের ইচ্ছা পূরণ করেন।

 

সবাইকে সবাইকে জানাই ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা এবং কল্পতরু উৎসবের শুভেচ্ছা।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – দাক্ষায়নী

একান্ন পীঠ এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সতীপীঠ হল মানস সতীপীঠ অথবা মানস শক্তিপীঠ। তিব্বতের মানস সরোবরের কাছে অবস্থিত এই শক্তি পীঠ।পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে এখানে সতীর ডান হাত পতিত হয়েছিল।

মানস সতী পীঠে অধিষ্ঠিত দেবী হলেন দাক্ষায়নী এবং হর হলেন ভৈরব।

 

মানস সতী পীঠের মাহাত্ম্যের সবচেয়ে বড় একটি কারন পার্শ্ববর্তী মানস সরোবর। এই হ্রদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক পৌরাণিক কাহিনী।অল্প দূরেই কৈলাশ পর্বত তিব্বতে অবস্থিত এই কৈলাস এবং মানস সরোবরকে কেন্দ্র করেই এই মানস শক্তি পীঠটি গড়ে উঠেছে।

 

পুরান মতে ব্রহ্মার মন থেকে সৃষ্ট হয়েছিল এই সরোবর যে সরোবরে স্নান করলে রজ, তমো গুণ দূর হয় এবং সাত্ত্বিক গুন লাভ করা যায়।

 

হিমালয়ের বুকে প্রায় বাইশ হাজার ফুট উঁচু কৈলাস পর্বতের কাছে এই মানস সরবরের পবিত্র কুণ্ডকেই সতী পীঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

 

দাক্ষায়নী দেবী সাক্ষাৎ এখানে বিরাজ করছেন বলে মনে করা হয়।অনেকে রাত্রে কৈলাস পর্বতের উপরে দুটি আলোকছটা দেখতে পান। যাকে দৈব আলোক জ্যোতিও বলা হয়। সেই আলোক ছটা পরস্পরের অনুগামী। মানুষের বিশ্বাস অনুসারে এই আলোক ছটাই আসলে শিব এবং পার্বতীর প্রতিরূপ বা দেবী দাক্ষায়নী এবং তার ভৈরব এই অঞ্চলে নিত্য লীলা করে চলেছেন।

 

কৈলাস পর্বতের অপার সৌন্দর্য আর মানস সরোবরের প্রশান্তি এই সতী পীঠের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলাই যায়। এখানে আলাদা করে কোনরকম মন্দির নির্মাণ করা হয়নি। নেই কোনো আলাদা মূর্তি। দেবী মহামায়া এখানে পরম প্রকৃতির রূপে ধরা দেন ভক্তদের কাছে।

 

প্রচলিত বিশ্বাস মতে স্বর্গের দেবতা, দেবী, গন্ধর্ব, অপ্সরা সকলেই আসেন এই শক্তি পীঠে পাশাপাশি

সারা বছরজুড়ে প্রায় সব সময় এই শক্তি পীঠে ভক্তদের আনাগোনা চলতেই থাকে।

 

ফিরে আসবো আগামী শক্তিপীঠ পর্ব নিয়ে

পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।