Home Blog Page 80

একান্ন পীঠ – বিরাট

পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে একান্নটি শক্তি পীঠের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য শক্তি পীঠ হল বিরাট শক্তিপীঠ। উত্তর বঙ্গের দক্ষিন দিনাজপুর জেলায় এই শক্তিপীঠ অবস্থিত।সতীর দেহ অংশগুলি যখন পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়েছিল তখন এই স্থানে দেবীর বাম পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল পতিত হয়েছিল।
স্থানীয় ভাষায় এটি বিদ্যেশ্বরী মন্দির নামে খ্যাত এবং দেবী অম্বিকা বা বিদ্যেশ্বরী নামে পরিচিত
এখানে ভৈরব হলেন অমৃতাক্ষ। আত্রেয়ী নদীর ধারে অবস্থিত মায়ের মন্দির এবং তার পাশেই ভৈরবের থান।
এই মন্দির প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িয়ে আছে মাতৃসাধক মুরারি মোহন ভট্টাচার্যর নাম। কৈশোরে তিনি দেবী কামাখ্যার নির্দেশে গৃহত্যাগ করেন এবং কামাখ্যা ধামে বারো বছর কঠিন সাধনা করতে থাকেন। পরবর্তীতে দেবীর নির্দেশে আত্রেয়ী নদীর তীরে তিনি আসেন। পরে দেবী তাকে ওই স্থানে গার্হস্থ্য ধর্ম পালন করার নির্দেশ দেন।
শোনা যায় একদিন সন্ধ্যার সময় আত্রেয়ীর নদীর তীরে গভীর জঙ্গলে তিনি উজ্জ্বল আলোক ছটা দেখে বুঝতে পারেন যে সেখানেই দেবীর অবস্থান রয়েছে।তারপর জঙ্গল পরিষ্কার করে দেবীর স্থান আবিষ্কার করেন তিনি এবং নিত্য পুজো শুরু করেন । সংসার জীবনে তার এক কন্যার জন্ম হয়। কন্যার নাম রাখেন বিদ্যেশ্বরী। বিদ্যেশ্বরী বাবাকে পুজোর কাজে সাহায্য করত।শোনা যায় একদিন সেই ছোট্ট মেয়ে দেবী মূর্তিতে বিলীন হয়ে যায়। জনশ্রুতি আছে দেবী স্বয়ং বালিকা রূপে সাধক মুরারী মোহনের গৃহে জন্মে ছিলেন। সবই তার লীলা মাত্র। দেবীকে সেই বালিকার নামেই অর্থাৎ বিদ্যেস্বরী নামে ডাকা হয়।
প্রতিদিন বিদ্যেস্বরী মন্দিরের বেদিতে লাল পাড় এর শাড়ি অর্পণ করা হয়। বিশেষ বিশেষ তিথিতে অন্ন ভোগ হয়। এই মন্দির চত্বরে নাকি অনেকেই বিশাল আকৃতির বিষধর সাপেদের দেখা পায় তবে তারা কারুর ক্ষতি করেনা।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। থাকবে অন্য
এক শক্তি পীঠ নিয়ে কথা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – শ্রী সুন্দরী

শ্রী পর্বত শক্তিপীঠকে একান্নটি শক্তিপীঠের মধ্যে একটি বলে মনে করা হয়।পীঠ নির্ণয়তন্ত্র এবং তন্ত্র চূড়ামনি গ্রন্থ মতে শ্রী সুন্দরী শক্তিপীঠ ছত্রিশতম এবং শিব চরিত মতে পঞ্চম পীঠ শ্রী সুন্দরী।
দেবী সতীর গোড়ালি পড়েছিল শ্রী পর্বত শক্তিপীঠে। এখানে মাতা সতী ‘শ্রী সুন্দরী’ এবং ভগবান শিব ‘সুন্দরানন্দ’ নামে পরিচিত।
শক্তি পীঠ টি একটি প্রাচীন কালী মন্দির।
এই কালী মন্দিরটিকে স্থানীয়রা শক্তিপীঠ হিসেবে পূজা করে।দেবী কালীকা রূপে বিরাজ করছেন সঠিক বয়স না জানা গেলেও মনে করা হয় মন্দিরটি প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন
মহাভারতে এই শক্তিপীঠের উল্লেখ আছে। সেখানে দেখা যায় অর্জুন এই শক্তি পীঠে এসে পুজো করছেন এবং নিকট বর্তী জ্যোতির্লিঙ্গ শ্রী শৈলতে এসে শিবের কাছে যুদ্ধে জয়ের জন্য প্রার্থনা করছেন। তিনি এখানে মল্লিকা ফুল দিয়ে পুজো করায় এই শিব লিঙ্গ মল্লিকার্জুন নামে খ্যাত।
এই শ্রী পর্বত সংলগ্ন এলাকায় এক সময় আদি সংকরাচার্য্য এসেছিলেন। শোনা যায় এখানকার তান্ত্রিকরা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেন এবং তাকে এই শক্তিপীঠে বলী দেয়ার ষড়যন্ত্র করেন। সংকরাচার্য্যর শিষ্যরা সব জেনে ফেলেন এবং তার প্রাণ রক্ষা হয়।
শ্রী পর্বতে যেখানে মায়ের মন্দির তা প্রাকৃতিক ভাবে অপূর্ব সৌন্দর্য দিয়ে ঘেরা। পাহাড়ের গায়ে মায়ের মন্দির এবং পাহাড়ে দের হাজার ফুট উঁচুতে ভৈরবের মন্দির। দেড় হাজার সিঁড়ি ভেঙে সেখানে যেতে হয়।
এই অঞ্চল বর্তমানে অন্ধ্রপ্রদেশের অন্তরগত যদিও প্রকৃত শ্রী পর্বত এবং শ্রী সুন্দরী শক্তিপীঠের অবস্থান নিয়ে কিঞ্চিৎ বিতর্ক আছে। অনেকের মতে এই স্থান আসলে হিমালয়ের পাদদেশে লাদাখে। তবে পুরান এবং অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ মতে শ্রী শৈল মল্লিকার্জুন সংলগ্ন পার্বত্য অঞ্চলেই অবস্থিত এবং বিজয় নগরের রাজারা এই মন্দির এবং দেবী শ্রী সুন্দরীর পুজোর দায়িত্ব পালন করতেন।
সারা বছর ভক্তদের আগমন লেগে থাকে তবে দুর্গাপূজা এবং নবরাত্রিতে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। অন্য এক শক্তিপীঠ সংক্রান্ত পৌরাণিক এবং আধ্যাত্মিক আলোচনা নিয়ে। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – সর্বানী

আজ একান্ন পীঠের চল্লিশতম পীঠ কন্যাশ্রম নিয়ে আলোচনা করবো।যদিও প্রকৃত স্থানটি নিয়ে বিতর্ক আছে। কারো মতে স্থানটি দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারী, কারো মতে কন্যাকুব্জে৷ কিন্তু বেশিরভাগ পন্ডিতের মতে এই শক্তিপীঠ বাংলাদেশের কামরুপে অবস্থিত।
বারাহী তন্ত্রে উল্লেখ আছে চন্দ্রনাথ মন্দিরের পঞ্চক্রোশ দূরত্বের মধ্যেই কুমারীকুণ্ড শক্তিপীঠ অবস্থিত। বিখ্যাত তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ তাঁর বৃহৎ তন্ত্রসার গ্রন্থে কুমারীকুণ্ডের কথা উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন এই পীঠস্থান তান্ত্রিক দীক্ষা লাভের উপযুক্ত স্থান। বর্তমানে স্থানটি বাংলাদেশের চট্টগ্রামজেলার অন্তর্ভুক্ত।
প্রাচীনকালে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরটি অবশ্য বর্তমানে দেখতে পাওয়া যায় না। দুর্গম পাহাড়ে এক গুহায় দেবী বিরাজ করছেন। পাহাড়ের নিচে কুমারী কুন্ড নামে এক রহস্যময় কুন্ড আছে। গভীর রাতে এই কুন্ডে আগুনের শিক্ষা এবং অশরীরী কোনো শক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় বলে জনশ্রুতি আছে।
কন্যাশ্রমে পীঠাধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বাণী হলেন মূলদুর্গার অনুরূপ। ধ্যানমন্ত্রানুসারে তিনি সিংহবাহিনী, তাঁর কপালে অর্ধচন্দ্র, তাঁর অঙ্গবর্ণ সবুজ৷ তিনি ত্রিনয়নী, তাঁর চার হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও বাণ শোভা পায়। মুক্তা মাণিক্য শোভিত অলংকারে তিনি সুশোভিতা।দেবী সবার মনোস্কামনা পূর্ণ করেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
মহাভারতে ঋষি পুলস্থ্য যুধিষ্টিরকে এই স্থানে এসে পুজো পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আবার
পৌরাণিক দিক দিয়ে এই স্থানের আলাদা মাহাত্ম আছে।ঋষি গর্গের কন্যা মনের মতো বর পাওয়ার জন্য এই স্থানে এসে তপস্যা করেন। কিন্তু যখন তার তপস্যা সম্পূর্ণ হয় তখন তার যৌবন অতিক্রান্ত। রূপ যৌবন কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। এমন সময় দৈব আদেশ পেয়ে শৃঙ্গবান নামে
এক যুবক ঋষি কন্যাকে বিবাহ করতে সম্মত হন।
অলৌকিক ভাবে বিবাহের পরেই সেই কন্যা এক সুন্দরী যুবতীতে পরিণত হন এবং শৃঙ্গবান কে দাম্পত্য জীবন থেকে মুক্তি দিয়ে অদৃশ্য হন।
সেই থেকে এই স্থানে এসে সাধনা করলে সব মনোস্কামনা পূর্ণ হয় বলেই বিশ্বাস।
এই স্থান তন্ত্র সাধনা এবং তন্ত্র মতে দীক্ষা গ্রহণের জন্য অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থান বলে বিবেচিত হয়।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য একটি
শক্তি পীঠ সংক্রান্ত জানা অজানা কথা নিয়ে।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – বরাহী দেবী

পুরান অনুসারে দেবী সতীর নিচের পাটির দাঁত
সমুহ পরে ছিলো হরিদ্বার এর কাছে
পঞ্চসাগরে এই সতী পীঠে দেবী বরাহী নামে পূজিতা হন।পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে এটি চৌত্রিশ
তম সতী পীঠ।দেবীর ভৈরব হলেন মহারুদ্র।
পুরান , মহাভারত সহ একাধিক শাস্ত্রে এই পীঠের উল্লেখ আছে।পুরান মতে নিশাচর নামে এক দৈত্যকে হত্যার জন্য স্বয়ং বিষ্ণু বরাহী কে সৃষ্টি করেছিলেন।বরাহী হলেন বিষ্ণুর নারী শক্তি।
সনাতন ধর্মে যে সাত আট জন মাতৃ দেবীর কল্পনা করা হয়, তার মধ্যে দেবী বরাহী হলেন অন্যতম। দেবীর রূপ শূকরের মত। তার এক হাতে রয়েছে চক্র এবং অন্য আরেক হাতে রয়েছে তলোয়ার।
এই পীঠ বহুকাল অজ্ঞাত ছিলো তারপর মহাভারতের যুগে পান্ডবরা যখন বনবাসে দিন কাটাচ্ছিলেন তখন গভীর এবং দুর্গম স্থানে এই দেবীর পীঠ স্থান সন্ধান করেছিলেন কুন্তী পুত্র ভীম। তিনি সেই গভীর জঙ্গলে মা বরাহীর তপস্যা করলেন, মা বরাহী ভীমকে দর্শন দিলেন এবং তাকে রক্ষা করার আশীর্বাদ দিলেন।
তারপর মহাভারত পরবর্তী সময়ে আবার এই সতী পীঠ লোক চক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুকাল পরে সালে জনৈক প্রভুচন্দ্র নামের একজন মাতৃ সাধক মায়ের এই পীঠ স্থান আবিষ্কার ও সংস্কার করেন।আবার এই সতী পীঠ সবার কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং বহু তীর্থ যাত্রী আসতে শুরু করেন।
অনেকে আবার মনে করেন বৌদ্ধ দেবতা বজ্র বারাহি ও মরিচির মিশ্রনে এই বরাহী দেবী
সৃষ্টি হয়েছেন। দেবী বরাহীকে অনেক জায়গায় মহিষবাহনা হিসেবেও দেখানো হয়
আবার রক্ত বীজের কাহিনীতে দেখা যায় যে, একটি মৃতদেহের উপর বসে শূকরের বেশ ধরে দাঁত দিয়ে বরাহী দেবী শত্রু নিধন করছেন।
সব মিলিয়ে যেনো কোনো জটিল রহস্য জড়িয়ে আছে দেবী বরাহীর সাথে।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য একটি শক্তি পীঠ
এবং তার ইতিহাস নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – ত্রিপুর মালিনী

পাঞ্জাবের জলন্ধরে রয়েছে অন্যতম তাৎপর্য পূর্ণ শক্তি পীঠ ত্রিপুর মালিনী। আজকের পর্বে এই শক্তি পীঠের কথা লিখবো ।জানবো
তার আধ্যাত্মিক মহাত্মা তবে এই যেখানে অবস্থিত সেই জ্বলন্ধর সম্পর্কে পৌরাণিক একটি ঘটনা
বলে দিই।
বহু প্রাচীন কালে জ্বলন্ধর নামে এক অত্যাচারী অসুর এই স্থানে শাসন করতো তার অত্যাচারে অতিষ্ট ধরিত্রীকে রক্ষা করতে ত্রিশুল দিয়ে জলন্ধর অসুরের মস্তক ছিন্ন করে তাকে বধ করেন শিব এবং ত্রিপুর মালিনী শক্তি পীঠের কাছেই তাকে সমাধি দেওয়া হয়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানে এই ঘটনার উল্লেখ আছে।
পীঠ নির্ণয় তন্ত্র এবং কালীকা পুরানে এই শক্তি পীঠের উল্লেখ আছে। পুরান মতে দেবীর ডান
বক্ষ এই স্থানে পতিত হয়েছিল। দেবীর নাম এখানে ত্রিপুর মালিনী আর ভৈরব হলেন ভীষণ।
আদি শঙ্করাচার্য্য তার অষ্টাদশ পীঠ বর্ণনায় শক্তিপীঠ ত্রিপুর মালিনীর উল্লেখ করেছেন। মহাভারতের বন পর্বেও এই শক্তিপীঠের উল্লেখ আছে।
ত্রিপুর মালিনী শক্তি পীঠে দেবীর মন্দির অতি প্রাচীন এবং খুবই মনোরম পরিবেশে অবস্থান করছে।মন্দিরের গর্ভে রয়েছে লক্ষী, সরস্বতী, মা বৈষ্ণবদেবীর তিনটি মূর্তি। পাশাপাশি মন্দিরের পাশে একটা ঘরে মায়ের শয্যা স্থান রয়েছে যেখানে মায়ের বিছানা সাজানো রয়েছে। লোকোমুখি শোনা যায় দুপুরের ভোগ গ্রহণ করার পর সেই বিছানাতে বিশ্রাম গ্রহণ করেন দেবী ত্রিপুর মালিনী।
নবরাত্রি সহ প্রায় সব বিশেষ তিথিতেই এখানে বড়ো আকারে পুজো হয় এবং সেই উপলক্ষে
বহু ভক্তের সমাগম হয়।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। থাকবে অন্য
এক শক্তি পীঠ নিয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনা এবং পৌরাণিক ব্যাখ্যা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – ক্ষীর ভবানী

পুরান মতে কাশ্মীরে পড়েছিল দেবীর কণ্ঠ যদিও ঠিক কোন স্থানে দেবীর শিলারূপ অঙ্গ অবস্থান করছে তা নিয়ে মতভেদ আছে। কাশ্মীরে অবস্থিত অমরনাথ, সারদা পীঠ এবং ক্ষীর ভবানী এই তিনটি মন্দিরকেই শক্তি পীঠের মর্যাদা দেয়া হয়।
যদিও দেবীর অঙ্গ সারদা পীঠে পড়ে ছিলো বলেই মনে করা হয় আমার আজকের আলোচ্য বিষয় সারদা পীঠ এবং ক্ষীর ভবানী।
দেবী এখানে ভগবতী এবং তার ভৈরব স্বয়ং অমরনাথ যদিও কোনো কোনো শাস্ত্রে দেবীর ভৈরব রূপে ত্রিসন্ধ্যেশ্বর এর নাম আছে।
সারদা পীঠ সম্পর্কে জানা যায় ঋষি পুলস্থ্য এই স্থানে সরস্বতী বন্দনা করে ছিলেন এবং দেবী তাকে দর্শন দিয়ে ছিলেন বলে একাধিক শাস্ত্রে উল্লেখ আছে। আবার মাতঙ্গ ঋষি কাশ্মীরের এই স্থানে সাধনা করে ছিলেন এবং দেবী দূর্গা কালী এবং সরস্বতী ত্রিশক্তি রূপে তাকে দেখা দিয়ে ছিলেন। তীর্থে ভ্রমণরত আদি শংকরাচার্য্য এই স্থানে এসে দেবীর স্তব করেছিলেন বলেও ইতিহাস থেকে জানা যায়।
সারদা পীঠ সংলগ্ন ক্ষীর ভবানী মন্দিরটি ও অনেকের কাছে দেবীর শক্তি পীঠের অঙ্গ।
অতি প্রাচীন এই মন্দির সম্পর্কে বলা হয় দেবী এক সময়ে লঙ্কায় থাকতেন রাবণ যখন মা সীতার অপহরণ করেছিলেন তখন দেবী ক্ষোভে ফেটে পড়েন আর নিজের স্থান ছেড়ে দেন। এরপর পবন পুত্র হনুমানকে নিজের মূর্তিকে লঙ্কা থেকে অনেক দূরে নিয়ে যেতে বলেন তিনি। তখন দেবীর আজ্ঞা পালন করে হনুমান মায়ের মূর্তি এখানে স্থাপনা করেন।সেই থেকে দেবী ভবানী এই মন্দিরেই বিরাজ করছেন।
অতীতে কাশ্মীর শাসন করতেন হরি সিংহের মতো হিন্দু রাজারা তারাই এই মন্দির নির্মাণ, মন্দির সংস্কার, রক্ষনাবেক্ষন এবং পুজোর দায়িত্ব পালন করতেন।
এক সময় সব স্থান ছিলো খুবই দুর্গম। সেই দুর্গম পথ অতিক্রম করে শুক্লা অষ্টমী তিথিতে যখন দেবী মন্দিরে বিশেষ পুজো হতো তখন অসংখ্য ভক্ত এই কষ্টসাধ্য পথ পেরিয়ে দেবী ভবানীর কাছে আসতেন। বেশি ভাগ তীর্থ যাত্রী এক সাথে অমরনাথ, সারদা পীঠ এবং ক্ষীর ভবানী মন্দির দর্শন করতেন।সেই পরম্পরা আজও চলছে।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। সাথে নিয়ে অন্য
এক শক্তি পীঠের ইতিহাস এবং পৌরাণিক ব্যাখ্যা নিয়ে। দেখতে থাকুন।

একান্ন পীঠ – দেবী শিবানী

আজকের একান্ন পীঠ পর্বে মধ্যপ্রদেশের নাগ পুরের কাছে রামগিরিতে চিত্রকুট পর্বতে অবস্থিত শক্তি পীঠ শিবানী নিয়ে লিখবো।
পুরান অনুসারে এই স্থানে সতীর ডান বক্ষ পড়েছিল।আবার মতান্তরে এই স্থানে পড়েছিলো দেবীর জানু দেশ।এখানে অধিষ্ঠিত দেবীর নাম শিবানী এবং ভৈরব হলেন চন্ড।
ভরতচন্দ্রের অন্নদা মঙ্গল, বাল্মীকি রামায়ণ,কালীকা পুরানে সহ একাধিক প্রাচীন
গ্রন্থে এই শক্তি পিঠের উল্লেখ আছে।
রাম, সীতা এবং লক্ষণ যখন তাদের চোদ্দ
বছরের বনবাস কাটাচ্ছিলেন, তার মধ্যে সাড়ে এগারো বছর সময় অতিবাহিত করে ফেলেছিলেন এই শক্তি পীঠ সংলগ্ন চিত্রকূট পাহাড়ে।
সেই মহাভারতের সময়ে শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে অর্জুন
রামগিরি পর্বতে এসে সাধনা করেছিলেন এবং দেবী যোগ মায়া তাকে দেখা দিয়ে নিজের দিব্য শীলরূপটি কোথায় আছে তার নির্দেশ দেন। তারপর অর্জুন নিজে মাটি খুঁড়ে মাতা শিবানীকে শীলা রূপে উদ্ধার করে এই স্থানে মন্দির বানিয়ে স্থাপন করেন এবং তার অনুপস্থিতি তে স্থানীয় ফুলবাহক দের দেবীর নিত্য পুজোর আদেশ দেন।
এক সময় এই প্রাচীন মন্দির কালের নিয়মে
ধ্বংস হলে রাজা দ্বিতীয় রঘুজি ভোসলে নতুন ভাবে দেবী শিবানীর মন্দির বানিয়ে দেন।
বর্তমানে সাদা পাথরের তৈরি এই মন্দিরে দেবী শিবানীর শীলা রূপ টি কষ্টি পাথর এবং রুপো দিয়ে ঢাকা তার পাশাপাশি বহু দেবদেবীর মূর্তি খোদাই করা আছে। অনেকগুলি সিঁড়ি পেরিয়ে তারপরে একেবারে মন্দিরের প্রধান ফটকে উঠে আসতে হয়। তারপর এই মন্দিরের মূল অংশ শুরু হয়।
যাত্রাপথ বেশ দুর্গম এবং কষ্টসাধ্য।
অশ্বিন ও চৈত্র মাসের একটি বিশেষ সময়ে এখানে বিশেষ পুজো হয় এবং সেই সময়ে মায়ের প্রকৃত রূপ ভক্তরা দেখতে পান।
আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে।সাথে নিয়ে অন্য এক শক্তি পীঠের কথা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – গুহ্যেশ্বরী

আজকের একান্ন পীঠ পর্বে আলোচনা করবো শক্তিপীঠ গুহ্যেশ্বরী নিয়ে এই মন্দিরটি নেপালের কাঠমাণ্ডুতে অবস্থিত।
পুরান মতে গুহ্যেশ্বরী মন্দিরটি যেখানে অবস্থিত, সেখানে দেবীর যোনি পতিত হয়েছিল।
গুহ্য শব্দের মানে ‘যোনি’ আর ঈশ্বরী হলেন ‘দেবী’। মন্দিরের অভ্যন্তরে একটি কলস দেবী রূপে পূজিত হন। কলসটি স্বর্ণ ও রৌপ্য এর স্তর দ্বারা আবৃত। মূল মন্দিরটি একটি খোলা প্রাঙ্গণের কেন্দ্রে অবস্থিত।মন্দিরের চূড়ায় চারটি সোনালি সর্প আছে।মন্দিরের দেবী গুহ্যকালী নামেও পরিচিতা।
মনে করা হয় গুহ্যেশ্বরী মন্দিরটি পশুপতিনাথ মন্দিরের শক্তির উৎস । সতেরশ শতকে নেপালের রাজা প্রতাপ মল্ল মন্দিরটি নির্মাণ করেন।
সংস্কৃত শব্দ ‘গুহ্য’ ও ‘ঈশ্বরী’ সন্ধিযুক্ত হয়ে গুহ্যেশ্বরী নামটি গঠন করেছে। ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ এর ললিতা সহস্রনাম অধ্যায়ের ললিতা দেবীর উল্লিখিত সহস্র নামের মধ্যে ৭০৭ তম নামটি হচ্ছে “গুহ্যরূপিণী” যার অর্থ যে দেবীর মাহাত্ম্য মানুষের উপলব্ধির বাইরে এবং যা গুপ্ত। মতান্তরে নামটি ষোড়শী মন্ত্রের ষোড়শ অক্ষর হতে উদ্ভূত। কিছু শাস্ত্রজ্ঞ মনে করেন যোনি নয় দেবীর হাঁটু এই স্থানে পড়েছিল।
গুহ্যেশ্বরী মন্দিরের শক্তি হলেন ‘মহাশিরা’ আর দেবীর ভৈরব হলেন ‘কাপালী’। এই মন্দিরটি তান্ত্রিকদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং এখানে বিবিধ তান্ত্রিক ক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। তন্ত্রশক্তি লাভের জন্য এই মন্দিরটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে কালীতন্ত্র, চণ্ডীতন্ত্র ও শিবতন্ত্ররহস্য গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু হিন্দু নয় বৌদ্ধদের কাছেও এই দেবীর বিশেষ মাহাত্ম রয়েছে।বজ্রযান বৌদ্ধগণ দেবী গুহ্যেশ্বরীকে বজ্রবরাহী রূপে পুজো করেন।
প্রায় সারা বছর এখানে দর্শণার্থীদের ভিড় লেগে থাকে এবং বিজয়া দশমী ও নবরাত্রির সময় মন্দিরে প্রচুর ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম হয়।
আবার আগামী পর্বে ফিরে আসবো অন্য একটি শক্তিপীঠ নিয়ে। থাকবে আধ্যাত্মিক এবং পৌরাণিক ব্যাখ্যা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্নপীঠ – কুরুক্ষেত্র

পীঠ নির্ণয় গ্রন্থ মতে একান্ন পীঠের পঞ্চাশতম শক্তিপীঠটি অবস্থিত হরিয়ানার কুরুক্ষেত্রে। অন্নদা মঙ্গল এবং শিব চরিতেও এই সতী পীঠের উল্লেখ আছে।
শক্তি পীঠ কুরুক্ষেত্রকে সাবিত্রীপীঠ ও বলা হয় কারন দেবী এখানে স্বাবিত্রী রূপে বিরাজ করছেন।
দেবীর ভৈরবের নাম থানেশ্বর।পুরান মতে দেবীর ডান পায়ের গোড়ালি এখানে পড়েছিল।
এই কুরুক্ষেত্র ময়দানে মহাভারতের পান্ডব এবং কৌরব দের যুদ্ধ হয়েছিলো এবং কথিত আছে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরুর আগে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে পঞ্চপাণ্ডব এখানে এসেই দেবীর আরাধনা করেছিলেন। স্মারক হিসেবে নিজেদের ঘোড়াগুলিও দান করেন। আর সেই থেকেই এখানে কোনও কিছু মানত করার আগে ধাতব ঘোড়া দান করার রীতি শুরু হয় যা আজও চলছে।
হরিয়ানার কুরুক্ষেত্র জেলায় দ্বৈপায়ন হ্রদের মনোরম এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশে মা স্বাবিত্রীর
এই মন্দির অবস্থিত।পুরান মতে পরশুরাম ধরিত্রীকে ক্ষত্রিয় শুন্য করার পরে এই হ্রদের জলে পিতৃ পুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পন করেছিলেন।
শাস্ত্র মতে দেবী সাবিত্রী সূর্য্য কন্যা এবং তিনিই গায়েত্রী মন্ত্রের অধীস্টাত্রী দেবী। তার আশীর্বাদে বৈকুণ্ঠ লাভ হয় বলেও বিশ্বাস।
এখানে মায়ের ‘কঠোর রূপ’ বা উগ্র রূপ দেখা যায়।দেশের প্রাচীনতম মন্দিরগুলির মধ্যে এটি একটি। মন্দিরে ঢোকার আগে শ্বেতপাথরের পা এর একটি অবয়বও রাখা আছে।
ভক্তরা আগে সেখানে পুজো করে তারপর মন্দিরে প্রবেশ করেন।সারা বছরই এখানে নিত্যপুজোর ব্যবস্থা থাকলেও কালীপুজোর তিথি ধরে এখানে হয় দেবীশক্তির আরাধনা। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, পবিত্র মনে কালিকাদেবী মায়ের কাছে যা চাওয়া হয় মা সেই মনস্কামনাই পূরণ করেন।
আজ এই শক্তি পীঠ নিয়ে এইটুকুই।ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য একটি শক্তি পীঠ নিয়ে।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – শোনদেশ

আজকের পর্বে লিখবো একান্নপীঠ  শোন্দেশ নিয়ে। দেবীর মন্দিরটি মধ্যপ্রদেশের অমরকন্টক এ অবস্থিত। পুরান অনুসারে এখানে দেবী সতীর ডান নিতম্ব পড়েছিল। এই শক্তি পীঠে নর্মদা রূপে বিরাজ করছেন। দেবীর ভৈরব হলেন ভদ্রসেন।

 

পুরানে মতে মহাদেব যখন ত্রিপুর অর্থাৎ তিনটি প্রাচীন নগরীকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ভষ্মিভূত করেছিলেন সেই সময় কিছু ভস্ম অথবা ছাই পড়েছিল কৈলাসে। কিছুটা পড়েছিল অমর কণ্ঠকে আর কিছুটা ছাই মহাদেব নিজে স্বর্গে সঞ্চিত রেখেছিলেন। এছাড়াও মনে করা হয় যে, যে ভস্ম অর্থাৎ ছাই অমর কন্ঠকে পড়েছিল তা থেকে পরে কোটি কোটি শিবলিঙ্গ সৃষ্টি হয়েছে।তাই এই পীঠটি একাধারে শক্তি পীঠ আবার শৈব্য তীর্থ।

 

মহাভারতের বনপর্বে এই পীঠের উল্লেখ আছে।

ঋষি পুলস্থ রাজা যুধিষ্টিরকে বলেছিলেন এই পবিত্র স্থানে নর্মদা নদীতে স্নান করলে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ হয়।আজও বিশ্বাস করা হয় যে অমরকন্টক এই জায়গাটিতে দেবতাদের বাসস্থান তাই এখানে যার মৃত্যু হবে সে সরাসরি বৈকুণ্ঠ যাত্রা করবে।

 

এই শোন্দেশ শক্তি পীঠ তথা নর্মদা মন্দিরটি আজ থেকে প্রায় ছয় হাজার বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল। মন্দিরের ভিতরের বেদীতে দেবী বিরাজ করছেন। সুন্দর এই বেদীটি রূপা দিয়ে তৈরি।

প্রাচীন কালে তৈরী এই মন্দিরের কারুকার্য এবং ভাস্কর্য আজও বিস্ময় জাগায়।মন্দিরের চারপাশে ছোট ছোট আরও অনেকগুলি পুষ্করিণী অথবা পুকুর আছে।মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নর্মদা নদী এবং কাছেই বিন্ধ্য পর্বত আর সাতপুরা পর্বত একসাথে মিশেছে।সব মিলিয়ে ওই শক্তি পীঠ সংলগ্ন প্রাকৃতিক পরিবেশ অতি মনোরম।

এই মন্দিরের পাশেই রয়েছে মাঈ কি বাগিয়া অর্থাৎ দেবী মায়ের বাগান। জনশ্রুতি আছে যে এই বাগানে নাকি দেবী নর্মদা নিয়মিত

ফুল তুলতে আসেন।

 

শোনদেশ শক্তি পীঠে সারা বছরই পূজা হয়

এবং প্রতিদিন ভক্তদের ভিড় লেগে থাকে।

তাছাড়া এই শক্তিপীঠ মহাশিবরাত্রি পালনের জন্য খুবই বিখ্যাত।

 

আগামী পর্বে আবার ফিরে আসবো অন্য একটি শক্তি পীঠের কথা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।