Home Blog Page 80

বাংলার – ঘুমন্ত শিবের কথা

বাংলার – ঘুমন্ত শিবের কথা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আগের পর্বে আপনাদের বলেছি চৈত্র মাস জুড়ে বাংলার প্রাচীন শিব মন্দির গুলি নিয়ে

আলোচনা করবো। আজকের পর্ব একটি অদ্ভুত শিব মন্দির নিয়ে যেখানে কয়েকশো বছর ধরে ঘুমিয়ে রয়েছেন মহাদেব|কেনই বা শিবের এই রূপ এবং এই অদ্ভুত নামকরণ জানতে গেলে পুরোটা

দেখতে হবে।

 

এই ঘুমন্ত শিব আছেন বর্ধমানের ইটাচুনা রাজবাড়িতে। এই শতাব্দী প্রাচীন রাজবাড়িতে অধিষ্ঠিত শিব ঠাকুরকে নিয়ে আছে এক রহস্য, শিব মূর্তি আছে, অর্থবল, লোকবল সবই আছে। তবু গত দেশড় বড়র ধরে ঘুমিয়ে শিব।

 

প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে , ১৮৭১ সালে তদানিন্তন ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে গিরিডি অঞ্চলে রেল লাইন বসাবার কন্ট্রাক্ট পান ইটাচুনা রাজবাড়ির তৎকালীন কর্তা বিজয় নারায়ণ কুণ্ডু। সেখানে কাজ করতে গিয়ে গিরিডির জঙ্গলে এক অদ্ভূত শিব মূর্তির খোঁজ পান তিনি। মূর্তিটির প্রচলিত শিব মূর্তির মত নয়। অভিনব সেই শিব মূর্তি।ঠিক যেন নিজ গৃহে বসে আছেন দেবাদিদেব মহাদেব।মূর্তিটি এনে তিনি স্থাপন করেন রাজবাড়ির শিব মন্দিরে।

 

যথারীতি পুজো শুরু হয়, এরপরই ঘটে কিছু অলৌকিক ঘটনা। শিব মূর্তি স্থাপনের পরই হটাৎ পরলোক গমন করেন পরিবারের একসদস্য।তারপর ক্রমাগত বাধা আসতে থাকে নানা কাজে।এইভাবে বন্ধ হয়ে যায় শিবপুজো।

 

কেনো এমনটা হয়েছিলো তা নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে|অনেকেই মনে করেন শাস্ত্র মতে মা দূর্গা বা মা কালি ছাড়া শিব মূর্তির পুজো হয় না। আবার অনেকে বিশ্বাস করেন, যদিও বা পুজো হয় তবে শুধু শিব লিঙ্গের পুজো হতে পারে, একা শিব মূর্তির পুজো হয় না তাতে মঙ্গলের পরিবর্তে নেমে আসে ঘোর অমঙ্গল এবং এমন টাই ঘটেছিলো এই পরিবারে|

 

সেই থেকে শিব এখানে বিরাজ করেন ঠিকই

তবে তিনি ঘুমন্ত এবং ঘুমন্ত শিব নামেই পরিচিত।

 

গোটা বাংলা জুড়ে এমন অনেক ঐতিহাসিক এবং প্রাচীন শিব মন্দির রয়েছে। রয়েছে অসংখ্য এমন অলৌকিক ঘটনা। ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে

বাংলার আরেক শিব মন্দিরের কথা

নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার শিব – বড়োকাছারি শিব মন্দিরের কথা

বাংলার শিব – বড়োকাছারি শিব মন্দিরের কথা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

চৈত্র মাস শিবের মাস। শিব ভক্তদের প্রিয় মাস

এই মাসেই বহু ভক্ত তারকেশ্বর সহ, বাংলা এবং দেশের প্রায় সব শিবের মন্দিরে জল ঢালতে যান শিবলিঙ্গে। শিবের উদ্দেশ্যে নীল ষষ্ঠী পালন হয় এই চৈত্র মাসে। শুধু তাই নয়। এই চৈত্র মাসে শিব পুরান পাঠ, শিব চালিসা পাঠ, শিব স্তোত্র শ্রবণ এবিং শিব তত্ত্ব নিয়ে আলোচনার বিশেষ তাৎপর্য আছে।এই চৈত্র মাস উপলক্ষে আপনাদের আজ

থেকে বাংলার কিছু প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক শিব ক্ষেত্র নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানাবো।থাকবে নানা অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ আজকের পর্বে বাবা বড়ো কাছারির মন্দির নিয়ে লিখবো।

 

দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বিষ্ণুপুর থানার বাখরাহাটে অবস্থিত এক প্রাচীন শিব মন্দির বাবা বড়ো কাছারি নামেই জগৎ বিখ্যাত|এক সময়ে আজকের বাখরাহাট সংলগ্ন এলাকা ছিলো ঘন জঙ্গলে ঢাকা, এখানেই বাস করতেন এক সাধু, শোনা যায় স্থানীয় অধিবাসীদের সকল বিপদ থেকে রক্ষা করতেন ওই সাধু, তার মৃত্যুর পর

তার মরদেহ না দাহ করে এখানই শশ্মানে

সমাধিস্থ করে তার ভক্তগণ। পরে সেই সমাধিক্ষেত্র হতে এক অশ্বত্থ গাছ জন্মায় এবং ওই স্থানে স্থাপন করা হয় এক শিবলিঙ্গ, স্থানটি ক্রমশঃ সর্বত্র বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং দূর দূর থেকে মানুষ আসতে থাকেন পুজো দিতে|

 

এই শিব ধাম কেনো বড়ো কাছারি নামে জগৎ প্রসিদ্ধ হলো সে নিয়েও এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ আছে।জনশ্রুতি অনুসারে এই শশ্মানে

নাকি গভীর রাতে স্বয়ং শিবশম্ভু ভূতনাথ বেশে বিচার সভা বসাতেন। সেকারণে স্থানটিকে অনেকে এখনো ভূতের কাছারিও বলেন। আর যেহেতু সে বিচার ভূতনাথরূপী শিবের দরবারে হয় সুতরাং তার বিচারই সর্বশ্রেষ্ঠ তাই সব কাছারির উর্ধে এই দেবাদিদেবের কাছারি ও তার বিচার।তাই

বড়ো কাছারি নামেই পরিচিত হয়েছে এই স্থান|

 

প্রতি শনি ও মঙ্গলবার বেশ ধুমধাম সহ পূজা হয় এখানে, শিব রাত্রিতে ও বিশেষ বিশেষ তিথিতে ব্যাপক জনসমাগম হয়। দূর দূরান্ত থেকে আসেন শিব ভক্তরা বাবার মাথায় জল ঢালতে|

ভক্তরা এক ছোট্ট কাগজে তাদের প্রার্থনা দরখাস্তের আকার লিখে মন্দিরের গায়ে বেঁধে দেন|শোনা যায় এখানে করা কোনো প্রার্থনাই নাকি বিফলে যায় না|এই মন্দিরে জানানো সব অভাব অভিযোগ স্বয়ং বাবা ভোলানাথ শোনেন এবং সঠিক বিচার করেন।দক্ষিণ বঙ্গের শিব ক্ষেত্র গুলির মধ্যে নিঃসন্দেহে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শিব ধাম বড়ো কাছারি।

 

চৈত্র মাস উপলক্ষে চলতে থাকবে এই

ধারাবাহিক আলোচনা ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে বাংলার অন্য এক শিব মন্দিরের কথা নিয়ে।

সঙ্গে থাকুন।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – হাজার হাত কালীর পুজো

বাংলার কালী – হাজার হাত কালীর পুজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার কালীতে কলকাতার এবং জেলার কয়েকটি প্রসিদ্ধ ও প্রাচীন কালী মন্দিরের কথা ইতিমধ্যে আপনাদের বলেছি।এই পরম্পরা কে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে যাবো আজ|আজকের পর্বে হাওড়ায় অবস্থিত হাজার হাত কালীর মন্দির নিয়ে লিখবো।

 

বেশ কিছু শাস্ত্রে দেবীর এই রূপের উল্লেখ রয়েছে|

চণ্ডীপুরাণের বাইশ তম অধ্যায়ে কালীর এই রূপের কথা উল্লেখ আছে|চণ্ডীপুরাণ অনুযায়ী, অসুর বধের সময় দেবী দুর্গা অনেক রূপ ধারন করেছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম হাজার হাতের রূপ। কাত্যায়নী, মহামায়ার পরেই অসুর নিধন করতে আসেন হাজার হাত রূপী মা কালী|দেবী কালীর এই রূপটি খুব একটা জনপ্রিয় বা পরিচিত রুপ নয়, এই রূপ খুব কম কালী মন্দিরেই রয়েছে, দেবীর এই বিশেষ রূপই দেখা যায় হাওড়ার শিব পুরের এই বিশেষ মন্দিরে|

 

মন্দিরের প্রতিষ্টা নিয়েও একটি লোককথা প্রচলিত আছে, শোনা যায় স্থানীয় মুখোপাধ্য়ায় বাড়ির ছেলে তান্ত্রিক আশুতোষ মুখোপাধ্য়ায় মা চণ্ডীর স্বপ্নাদেশে কালীর এই হাজার হাত রূপ দেখতে পান এবং মন্দির প্রতিষ্ঠা করে দেবীর এই রূপের পুজো করতে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন|কিন্তু এই মন্দির নির্মাণের বিপুল ব্যয় ভার বহন করার সাধ্য ছিলোনা তান্ত্রিক আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বা তার পরিবারের|তবে স্বয়ং দেবী যার সহায় তার আর চিন্তা কি! আশুতোষ মুখোপাধ্য়ায়ের এই ইচ্ছাপূরণের জন্য এগিয়ে আসেন স্থানীয় ধনী হালদার পরিবার এবং তাদের চেষ্টায় ১৮৭০ সালে স্থাপিত হয় এই মন্দির এবং দেবীর এই বিশেষ রূপ এখানে প্রতিষ্টিত হয়|

 

এই কালী মন্দির পশ্চিম বঙ্গ এবং হাওড়া ছাড়াও দক্ষিণ ভারতীয়দের মধ্যে বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়, তার কারন জানতে হলে একটি অলৌকিক ঘটনা জানতে হবে।শোনা যায়, প্রায় ৬০ বছর আগে শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের এক শুক্রবার দক্ষিণ ভারতের বাসিন্দা এক দৃষ্টি হীন ব্যাক্তি এই মন্দিরে এসেছিলেন এবং তিনি হাজার হাত কালীর কাছে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেওয়ার প্রার্থনা করেন|অলৌকিক ভাবে এক বছরের মধ্যে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান। তার পর থেকে তিনি মায়ের মাহাত্ম্য প্রচার শুরু করেন দক্ষিণ ভারত জুড়ে। এখন প্রচুর দক্ষিণ ভারতীয় মানুষ এই দেবীর কাছে নিজেদের মনোস্কামনা নিয়ে আসেন।শ্রাবণে শুক্লপক্ষের শুক্রবারে বহু ভক্ত পুজো হাওড়ার দেন এই

বিখ্যাত হাজার হাত কালীর মন্দিরে|

 

এই রূপে দেবী নীল বর্ণা, বাহন সিংহের উপর তাঁর ডান পা|এখানে দেবী পূজিত হন তন্ত্র মতে তবে বলী প্রথা এখানে নেই এবং প্রাচীন প্রথা মেনে আজ ও মুখোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যরা এখানে পুজো করে আসছেন|দৈনন্দিন পুজোর পাশাপাশি বুদ্ধ পূর্ণিমা ও দীপাবলিতে এখানে বিশেষ পুজো হয় ও সেই উপলক্ষে ব্যাপক জনসমাগম হয়|

 

আজ এখানেই শেষ করছি।আবার ফিরবো পরবর্তী পর্বে। চৈত্র মাস উপলক্ষে শুরু করবো প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক কিছু শিব মন্দির নিয়ে

ধারাবাহিক আলোচনা।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – পুঁটে কালীর পুজো

বাংলার কালী – পুঁটে কালীর পুজো

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

যে শহরের নামের সাথেই জড়িয়ে আছেন দেবী কালী সেই শহরে যে অসংখ্য কালী মন্দির এবং কালী পুজো নিয়ে অজস্র কিংবদন্তী থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।আজ কলকাতার আরেক প্রাচীন কালী মন্দির নিয়ে বলবো |আজকের পর্বে কলকাতার পুঁটে কালীর মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে
আলোচনা হবে।

কলকাতার ব্যাস্ততম অঞ্চল গুলির অন্যতম বড়ো বাজার অঞ্চলে কালীকৃষ্ণ ঠাকুর স্ট্রিটে অবস্থিত বিখ্যাত পুঁটে কালী মন্দির|বর্তমান মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন তান্ত্রিক মানিকচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করা হয় এই মন্দির স্থাপিত হয়েছিল ১৫৫৮ সালে |যদিও দেবী মূর্তি এখানে আরো আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিলো এবং পুজোও হতো তন্ত্র মতে।

বহু প্রাচীন কালে এই অঞ্চল ছিলো দুর্গম ও অরণ্য সংকুল। সেকালে ডাকাতরাই রাজত্ব করতো এখানে|তখন ডাকাতরা এই মন্দিরে নিয়মিত পূজা করতো এমনকি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নর বলীও হতো বলে শোনা যায়|পরবর্তীতে তন্ত্র সাধক মানিকরাম বন্দ্যোপাধ্যায় এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন|

তারপর ১৯৩০ সালে মন্দিরের সংস্কার করা হয়। বর্তমান মন্দিরটি চারচালা ও তিনটি চূড়াবিশিষ্ট। চূড়াগুলির উপর চক্র, ত্রিশূল ও পতাকার চিহ্ন আছে। মন্দিরটির তলায় একটি পাতালকক্ষ আছে|মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত কালীমূর্তিটি ছয়
ইঞ্চি উচ্চতা বিশিষ্ট।

মন্দির এবং দেবী মূর্তির এই অদ্ভুত নামকরণ প্রসঙ্গে দুরকম ব্যাখ্যা রয়েছে|কেউ কেউ মনে করেন পুঁটি” অর্থে ছোটো মেয়ে বোঝায়। সেকালে আদর করে অনেকেই বাছা মেয়েদের পুঁটি বলে ডাকতেন এবং বাচ্ছা ছেলেদের ক্ষেত্রে পুঁটিরাম নাম ব্যবহার হতো।এই মন্দিরের কালীমূর্তিটির উচ্চতা মাত্র ছয় ইঞ্চি এত ছোটো মূর্তি বোঝাতেই তাই “পুঁটিকালী” নামটির প্রচলন হয় এবং পরবর্তীতে লোক মুখে তা বিকৃত হয়ে “পুঁটেকালী” হয়ে যায়|

তবে এই নামের আরো একটি ব্যাখ্যা আছে।
নামের দ্বিতীয় ব্যাখ্যা অনুসারে একবার মন্দিরে হোম চলা কালীন গঙ্গার খাদ থেকে একটি পুঁটিমাছ লাফিয়ে হোমকুণ্ডের মধ্যে পড়ে যায়|পড়ে অর্ধদগ্ধ মাছটিকে তুলে জলে ফেলে দিতেই সেটি আবার জীবন্ত হয়ে হয়ে ওঠে এবং অলৌকিক ঘটনার জন্য দেবীর নাম হয় “পুঁটিকালী” বা “পুঁটেকালী” এক্ষেত্রে পুঁটি মাছ থেকে এই নামের জন্ম হয়েছে এবং দেবীর অলৌকিক ক্ষমতা এই ব্যাখ্যার সাথে জড়িত।

আজও পুঁটে কালীর মন্দিরে পূজা হয় তন্ত্রমতে। দীপান্বিতা কালীপূজার রাতে প্রতিমার স্বর্ণবেশ হয় এবং ভৈরবী পূজাও অনুষ্টিত হয়|এখানে আজও কালী পূজা উপলক্ষে কুমারী পূজা হয়|এছাড়াও বিশেষ বিশেষ তিথিতে পশু বলীর ও ব্যবস্থা
করা হয়|দেবীর উদেশ্যে আমিষ ও নিরামিষ দু রকম ভোগ ই নিবেদিত হয়|

এই মন্দিরে দেবী কালীর পাশে দেবী শীতলার পূজাও করা হয় নিষ্ঠা সহকারে|স্থানীয় দের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই মন্দির এবং বিশেষ বিশেষ তিথিতে বহু দর্শনার্থী ভিড় জমান পুঁটে কালীর মন্দিরে|কলকাতার প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক কালী মন্দির গুলির মধ্যে নিঃসন্দেহে এই পুঁটে কালী অন্যতম।

আজকের পর্ব এখানেই শেষ করছি|দেখা হবে আগামী পর্বে|থাকবে বাংলার কালীর আরো একটি পর্ব। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী : পাতাল চণ্ডীর পুজো

আগামী আটই মার্চ দুই হাজার চব্বিশ শুক্রবার শিবরাত্রিতে ভান্ডারা ও নয়ই মার্চ শনিবার অমাবস্যায় তারাপীঠ মহাশ্মশানে মহাযজ্ঞের আয়োজন করেছেন মায়াঙ্ক তন্ত্রের মহাগুরু আচার্য্য পলাশ। সব তন্ত্র বারবার মায়াঙ্ক তন্ত্র একবার, করতে গ্রহের প্রতিকার আচার্য্য পলাশের মেটাল ট্যাবলেটের জুড়ি মেলা ভার। বিবাহ, বিদ্যা, কর্ম, ব্যবসা, গ্রহদোষ, বাস্তুদোষ, বশীকরণ, শত্রু দমন সহ সকল সমস্যার ধারন ছাড়া অবাক করা প্রতিকার পেতে আজই যোগাযোগ করুন, কারণ মায়াঙ্ক তন্ত্রের মহাগুরু আচার্য্য পলাশের কাছে না বলে কিছু হয় না।

বাংলার কালী – পাতাল চন্ডীর পুজো

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলায় প্রাচীন কালী মন্দিরের সংখ্যা হাতে গুনে শেষ করা যাবেনা। এদের মধ্যে অনেক মন্দির আজও প্রচারের আলোয় আছে। পরিচিত তীর্থ ক্ষেত্র হিসেবে সুনাম আছে কিন্তু অনেক এমন ঐতিহাসিক মন্দির আছে যেগুলি সেই ভাবে প্রচারে আসেনি। হারিয়ে গেছে লোক চক্ষুর অন্তরালে। এমনই এক ঐতিহাসিক এবং
প্রাচিন মন্দির মালদার পাতাল চন্ডীর মন্দির যা নিয়ে আজকের পর্ব।

বাংলার পাল এবং সেন বংশের ইতিহাস আবর্তীত হয়েছে গৌড়কে ঘিরে।এই গৌড়ে সেন আমলের একটি নিদর্শন পাতাল চন্ডী মন্দির।সেন বংশের কূলদেবী ছিলেন চণ্ডী।রাজা লক্ষণ সেন তার শাসন কালে এই চন্ডী মন্দিরটি নির্মাণ করান।
এক কালে এই চন্ডী মন্দিরকে কেন্দ্র করে নানা অলৌকিক ঘটনা শোনা যেতো। শোনা যায় পাতাল থেকে দেবী চন্ডী স্বয়ং এখানে আবির্ভূতা হয়েছেন তাই দেবীর নাম পাতাল চন্ডী।

বর্তমানে মালদহ শহর থেকে সামান্য দূরে ইংলিশ বাজারে জাতীয় সড়কের পাশে নিরিবিলি পরিবেশে। বিশাল ঝিলের ধারে প্রাচীন এক তেঁতুল গাছের নীচে অবস্থিত সেন আমলের পাতাল চণ্ডী মন্দির ।

সেন বংশের অন্যতম শাসক লক্ষ্মণসেন রামাবতী থেকে দক্ষিণে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যান।নিজের নামানুসারে তার নাম দেন লক্ষ্মণাবতী বা লখনৌতি।এই রাজধানীই পরবর্তী সময়ের গৌড়।এই গৌড়ের নগরদদূর্গের চারদিকের রক্ষাকর্ত্রী চারজন দেবীর চারটি মন্দির বা পীঠ ছিল। তাদের মধ্যে উত্তরদিকে ছিলো মাধাইচণ্ডীর পীঠ যা বর্তমানে গঙ্গাগর্ভে বিলীন, পূর্বদিকে ছিলো জহুরাচণ্ডী, পশ্চিমে দুয়ারবাসিনী ও দক্ষিণে পাতালচণ্ডী।লর্ড ক্লাইভের লেখায় এই প্রাচীন পাতাল চন্ডীর মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়।

দীর্ঘদিন এই পাতাল চন্ডী মন্দিরটির চারিপাশে ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। মন্দির চত্বরে যেতে সাধারণ মানুষ ভয় পেতেন। পরবর্তীতে এই স্থান সংস্কার করা হয় এবং পাতাল চন্ডী মন্দিরটি বর্তমানে মালদার অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

এখনও এই স্থানে অতীত সময়ের কিছু চিন্হ খুঁজে পাওয়া যায়। আজও জাহাজ বাঁধার নোঙর এখানে রয়েছে।অর্থাৎ এর পাশ দিয়ে এক সময়ে বয়ে যেতো নদী।প্রাচীন পাথর দিয়ে ঘাট
বাঁধানো রয়েছে। এখন পাতাল চণ্ডী বিগ্রহ এবং একটি পাতালচণ্ডী কালি মন্দির রয়েছে।
প্রতিবছর বাসন্তী পুজো উপলক্ষে বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন হয় এখানে।

আগামী পর্বে ফিরে আসবো বাংলার এমনই
এক প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক কালী পুজোর কথা নিয়ে।থাকবে নানা ঐতিহাসিক তথ্য এবং
অলৌকিক ঘটনা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বিশেষ পর্ব – শিব চতুর্দশীর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা

বিশেষ পর্ব – শিব চতুর্দশীর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রী জাতক

যদিও শিব ভক্তরা প্রায় সারা বছরই শিব পুজো করেন তবু শিব চতুর্দশী তিথির আলাদা মহাত্ম আছে। এই তিথি শিব পুজো করে শিব কৃপা লাভ করার শ্রেষ্ঠ তিথি। কিন্তু কেনো? দুটি কারন আছে এবং সেই দুটি কারন খুঁজতে হলে আমাদের পুরানের আশ্রয় নিতে হবে।

পুরান অনুসারে ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশী তিথির এই শিব রাত্রির তাৎপর্য সব থেকে বেশি কারন এটা আদি শিব লিঙ্গের আবির্ভাব তিথি ও একি সাথে শিব পার্বতীর বিবাহের দিন। স্বাভাবিক ভাবেই এই দিন উৎফুল্ল চিত্তে থাকেন শিব এবং পার্বতী দুজনেই এবং অল্প তেই তুষ্ট হন তারা। ভক্তের ডাকে এই দিন তাই সহজেই সাড়া দেন দেবাদিদেব এবং তার শক্তি পার্বতী।

শিব পূরাণ মতে এক সময় ভগবান বিষ্ণু এবং ব্রহ্মার মধ্যে নিজেদের শ্রেষ্টত্ত্ব প্রমানের জন্য ভিষণ বিবাদ দেখা দিয়েছিল। লড়াই প্রায় বাঁধে বাঁধে। সেই সময় হঠাৎ করেই আগুনে জ্বলতে থাকা একটা কালো স্তম্ভ দুই দেবাতার মাঝে আর্বিভাব হয়। এই স্তম্ভ হঠাৎ করে এল কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্রহ্মা ঠিক করেন স্তম্ভের উপরের দিকে গিয়ে দেখবেন কোথায় এর শেষ আর বিষ্ণু দেব যাবেন নিচের দিকে। দেখবেন এর সূচনা।

বলা বাহুল্য দুজনেই ব্যর্থ হন। কারন শিব অনাদি এবং সনাতন। তার না আছে আদি না আছে অনন্ত। আছে শুধু অফুরন্ত শক্তি এবং তেজ।
আদি শিব লিঙ্গের সেই সেই আবির্ভাব তিথিকেই
পালন করা হয় শিব রাত্রি রূপে।

কেনো এই শিব রাত্রিতে শিব লিঙ্গে জল ঢালা হয় তার ও নিদ্দিষ্ট কারন আছে, আসলে অগুনে জ্বলতে থাকা ওই কালো থামটি ছিল আদি শিব লিঙ্গ। যার মধ্যে উপস্থিত রয়েছে এ জগতের অনন্ত শক্তি। আর এত মাত্রায় শক্তি যেখানে মজুত রয়েছে তাকে ঠান্ডা রাখতে না পারলে যে বিপদ! আর ঠিক এই কারণেই শিব লিঙ্গের মাথায় জল ঢালার প্রথা শুরু হয়। যেখানে অনন্ত শক্তি বিরাজমান সেই শক্তির উৎস স্থান কে ঠান্ডা রাখা, শান্ত রাখাই মূল উদেশ্য |

আজ অবশ্যই শিব পুজো করুন। চেষ্টা করুন শিব মন্দিরে গিয়ে দেবাদিদেবকে জল অর্পণ করার। শিব লিঙ্গে জল, দুধ বা বেলপাতা অর্পণ করার সময়ে ” ওঁম নমঃ শিবায়ঃ ” মন্ত্র টি জপ করুন।
যদি সম্ভব হয় শিব লিঙ্গ প্রদক্ষিণ করে শিবকে নিজের মনোস্কামনা জানিয়ে প্রণাম করুন। দেবাদিদেব আপনাদের মনোস্কামনা পূর্ণ করবেন।

আপনাদের সবাইকে শিব রাত্রির শুভেচ্ছা জানিয়ে শেষ করছি আজকের বিশেষ পর্ব|সবাই ভালো থাকুন। দেখা হবে যথা রীতি আগামী পর্বে।
সঙ্গে থাকুন।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বামা খ্যাপার সিদ্ধি লাভ

আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে বিশেষ পর্ব

 

বামা খ্যাপার সিদ্ধি লাভ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

তারাপীঠ শক্তি না হলেও সিদ্ধ পীঠ তো বটেই। একাধিক সাধক এই তারাপীঠে সাধনা করে সিদ্ধি লাভ করেছেন তাদের মধ্যে যেমন আছেন বশিষ্ট দেব তেমনই আছেন স্বয়ং বামা ক্ষ্যাপা। আজকের পর্বে বামা ক্ষ্যাপার সিদ্ধি লাভ নিয়ে লিখবো।

 

গুরু কৈলাশ পতি বাবার দেখানো পথে তারাপীঠে অবস্থিত এক স্বেত শিমুল বৃক্ষের নিচে পঞ্চ মুন্ডির আসনে বসে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন বামা ক্ষ্যাপা।

এই পঞ্চমুন্ডির আসন সকলকে গ্রহণ করে না! সাধনার উচ্চস্তরে পৌঁছতে না পারলে পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসা দুঃসহ হয়ে ওঠে সাধকের।বামা নিজ সাধনা বলে এবং মা তারার আশীর্বাদে এবং গুরুর সান্নিধ্যে সেই যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন।

 

বামাক্ষ্যাপার সিদ্ধিলাভ নিয়েও প্রচলিত আছে

বহু আখ্যান। তবে সবাই একমত যে এক কৌশিকী অমাবস্যার রাতের তিথিই সাক্ষী ছিল সেই

মহা সাধনার।প্রথমে কৈলাসপতি বাবার কুটিরে গিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল দীক্ষার অনুষ্ঠান। তখন মাতৃদর্শনের পর বাহ্যজ্ঞান লোপ পেয়েছে বামাচরণের। সে দিন অন্ধকারেও যেন এক অপার্থিব জ্যোতি ছড়িয়ে ছিল কৈলাসপতি বাবার কুটিরজুড়ে। বেদমন্ত্র পাঠ করে দীক্ষার উপচার সম্পন্ন করেছিলেন কৈলাসপতি বাবা।

 

তার পর সন্ধ্যায় বামাকে নিয়ে শ্মশানে এলেন কৈলাসপতি বাবা। শ্বেত শিমূল বৃক্ষের তলায় পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসিয়ে দিলেন শিষ্যকে। বললেন বীজমন্ত্র জপ করতে। মন্ত্র জপ করতে করতে ভাবে বিভোর হয়ে গেলেন বামাচরণ। কখন যে রাত ভোর হতে শুরু করেছে তার খেয়াল নেই। এমন সময়ে এক নারী কণ্ঠের ডাকে জ্ঞান ফিরল বামাচরণের। সেই ডাক স্বয়ং তাঁর বড়মায়ের। সিদ্ধিলাভের কথা নিজের ছেলেকে স্বয়ং বলছেন বড়মা। একই সঙ্গে ভবিষ্যদ্বাণী করছেন ওই শিমূল গাছ পড়ে যাওয়ার।কিছুক্ষণ পরেই পড়ে গেল শিমূল গাছ। সেই জায়গায় জ্যোতির মধ্যে আবির্ভূতা হলে স্বয়ং মা তারা।শুধু তাই না সেই রাতে দশমহাবিদ্যার দশ রূপে ধরা দিয়েছিলেন বামাচরণের বড়মা।সিদ্ধি লাভের পর বামা ক্ষ্যাপা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হন এবং সারা জীবন জুড়ে অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা ঘটান।

 

বামা ক্ষ্যাপা পরবর্তী সময়েও বহু সাধক সেই পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে সাধনা করেন এবং তাদের মধ্যে অনেকেই সিদ্ধি লাভ করেছিলেন বলে শোনা যায়। তবু বামা খ্যাপার উচ্চতায় হয়তো আর অন্য কেউ পৌঁছতে পারেননি। বামা ক্ষ্যাপা একজনই এবং তার তুলনা নেই। তিনি অতুলনীয়।

 

আজ আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে প্রণাম জানাই এই মহান সাধককে। পরবর্তীতে পর্বে যথা রীতি

ফিরে আসবো শিব রাত্রি সংক্রান্ত আধ্যাত্মিক আলোচনা নিয়ে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শ্রী শ্রী বামা ক্ষ্যাপা ও তারাপীঠ

আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে বিশেষ পর্ব

 

শ্রী শ্রী বামা ক্ষ্যাপা ও তারাপীঠ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বামা ক্ষ্যাপার সঙ্গে তারা মায়ের সম্পর্ক মানে মা ছেলের সম্পর্ক আর তারা পীঠ বামা ক্ষ্যাপার কাছে মায়ের কোলের মতো। বামা তারা মাকে বলতেন বড়মার এবং মা মৌলাক্ষীকে বলতেন ছোটমা। শুধু বামা নন অনেক সাধকই মনে করেন এই দুই দেবী আসলে দুই বোন। যাই ফিরে আসি বামা ক্ষ্যাপার কথায়।

 

তারা পীঠে আসার পর শুরুর দিন গুলিতে বামাক্ষ্যাপার কাজগুলো ছিল অদ্ভুত। কখনো কখনো সারাদিন পূজা করতেন। কখনও কখনও তিনি দু তিন দিন পূজা করেন না। কখনো দেবীকে মালা পরাতেন আবার কখনো নিজে পরতেন।কখনো নিজে খেয়ে ভোগ দিতে যাচ্ছেন আবার কখনো ভোগ তুলে নিজে খেয়ে নিচ্ছেন। সাধনার এই পর্যায়কে শাস্ত্রীয় পূজা পদ্ধতির সাথে বাকি পান্ডারা মেলাতে পারতেন না। তারা ভাবতেন বামা উন্মাদ। অশাস্ত্রীয় আচরণ করছেন।যদিও পরে তাদের ভুল ভাঙে।

 

একদিন খবর রটে যায় বামা ভোগ নিবেদন করার আগেই দেবীর প্রসাদ খেয়েছেন এবং এতে ঘোর পাপ হয়েছে।দেবী রাগান্বিত হবেন, সারা গ্রামকে তার ক্রোধ বহন করতে হবে তাই গ্রামবাসীরা বামাচরণকে কঠোরভাবে মারধর করে। তাকে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। তার মন্দিরে প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়।

 

যখন জ্ঞান ফিরল তখন বামাক্ষ্যাপা মায়ের উপর রেগে গেল। মাতারার উদ্যেশ্যে বামা বললেন আমি কি দোষ করেছি যে আপনি আমাকে মারধর করলেন। আপনাকে দেওয়ার আগে খাবারটি সুস্বাদু কি না তা পরীক্ষা করছিলাম। এতে আমার কি ভুল ছিল? ওরা অকারণে আমাকে মারধর করেছ তাই আমি এখন আর তোমার কাছে আসব না।

 

তারা মা তার সন্তানের যন্ত্রণা সইতে পারেননি।

সেই রাতেই রানীর স্বপ্নে দেখা দিল মা তারা

রাগান্বিত মা রাণীকে ভর্ৎসনা করলো-তোমার পুরোহিতরা আমার ছেলেকে আঘাত করেছে। আমি তোমার মন্দির ছেড়ে চলে যাচ্ছি। এখন তোমাকে ও তোমার রাজ্যকে আমার ক্রোধ সইতে হবে, তুমি যদি তা এড়াতে চাও, কাল আমার ছেলেকে ফিরিয়ে এনে মন্দিরে পূজার দায়িত্ব দাও, নইলে পরিণতি ভোগ করতে প্রস্তুত থাকো।

 

আতঙ্কে সারা রাত জেগে কাটালানে রানীমা ভোরে তিনি মন্দিরে ছুটে গেলেন। সব শুনলেন তারপর সেই সব পান্ডা দের তিরস্কার করলেন এবং তাদের মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ করলেন। তারপর তার ভৃত্যদের আদেশ দিলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বামাখেপাকে নিয়ে আসতে। বামা ক্ষ্যাপা প্রথমে আসতে রাজি হলেননা।অবশেষে রানী নিজেই পৌঁছে গেলেন বামা খ্যাপার কাছে । বামার কিছুক্ষনের মধ্যেই প্রশমিত হলো। তিনি তারাপীঠ মন্দিরে যেতে রাজি হলেন। সেই দিন রানীমা আদেশ জারি করেন এই মন্দিরের পুরোহিত বামাক্ষ্যাপা। সে স্বাধীন। তার পথে কেউ আসলে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।শুধু তাই না তারাপীঠে আগে বামা ক্ষ্যাপাকে ভোগ নিবেদন হবে তারপর তারা মাকে ভোগ দেয়া হবে।অর্থাৎ সন্তানকে খাইয়ে তারপর মা খাবেন। এই রীতি আজও একই ভাবে চলছে।

 

বামা ক্ষ্যাপার আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে তার অলৌকিক জীবন এবং মহিমা নিয়ে

ধারাবাহিক এই আলোচনা চলতে থাকবে।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বিশেষ পর্ব – বামাখ্যাপার অলৌকিক জীবন

বামা খ্যাপার আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে এই বিশেষ ধারাবাহিক অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে বামা ক্ষ্যাপার ব্যাক্তিত্বর একটি বিশেষ দিক নিয়ে আলোচনা করবো।তবে শুরুটা করবো স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে।

 

ভারতের আধ্যাত্মিক জগতের বহু সাধু সন্ন্যাসিদের সাথে সাক্ষাৎ করে ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তালিকায় যেমন ছিলেন কাশির ত্রৈলঙ্গ স্বামী তেমনই তারাপীঠের বামা খ্যাপার সাথেও বিবেকানন্দর সাক্ষাৎ হয়ে ছিলো।

স্বামীজী তখন কলেজ ছাত্র সবে রামকৃষ্ণের সংস্পর্শে এসেছেন সেই সময়ে তারাপীঠে গিয়েছিলেন বামাক্ষ্যাপাকে দর্শন করার জন্য।

এই প্রসঙ্গে এক বন্ধুর প্রশ্নের উত্তরে নরেন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে, ব্রহ্মজ্ঞানী সাধকদের চারটি অবস্থা হয় যথা, বালকবৎ, জড়বৎ, উন্মাদবৎ এবং পিশাচবৎ। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের মধ্যে বাকি তিনটি অবস্থা থাকলেও পিশাচবৎ অবস্থা ছিল না। তাই নরেন্দ্রনাথ পিশাচ লক্ষণধারী বামাক্ষ্যাপার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন।ঠিক কি এই বৈশিষ্ট

তা জানতে হলে একটি অলৌকিক ঘটনার কথা জানতে হবে।

 

সময় টা ১২৭৫ সনের এক গ্ৰীষ্মকাল। সেই বছর বৃষ্টি অভাবে বীরভূম জুড়ে প্রবল খরা। তখন হতাশাগ্ৰস্থ চাষীরা অনাহারে মৃত্যুবরণের ভয়ে বামদেব বাবার শরনাপন্ন হচ্ছে। তাদের আশা বামা খ্যাপা তার অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে এই প্রকৃতির রোষ থেকে তাদের বাঁচাবেন কয়েকজন চাষী একদিন বাবাকে বললো “তুমিতো তাঁরা মায়ের প্রিয় সন্তান তুমি থাকতে মা তাঁরা থাকতে আমরা অনাহারে মরবো? তুমি একটু তাঁরা মাকে বলো না।” সত্যি বিচলিত হলেন বামা খ্যাপা। তিনি

প্রচন্ড ক্রোধান্বিত হয়ে মায়ের মন্দিরে গিয়ে বিগ্ৰহের সম্মুখে বললো-“তুই বেটি দিন রাত বসে বসে খাচ্ছিস,আর তোর সব সন্তানরা উপোস করে মরছে। দাঁড়া তোর মাথায় বাজ ফেলবো।”

 

বামার এই উগ্র রূপ দেখে উপস্থিত সকল চাষী

এবং ভক্তরা সভীত হয়ে বাড়ি ফিরে গেলো।

ঠিক মধ‍্যাহ্নে প্রবল ঝড় বৃষ্টিতে মন্দিরের চূড়ায় বাজ পড়ল তা দেখে সবাই উপস্থিত হয়ে দেখলো মন্দিরের একপাশের কান্নিস ভেঙে পড়েছে কিন্তু গর্ভ গৃহ এবং বিগ্ৰহের কোনো ক্ষতি হয়নি।বামদেব বাবা সব শুনে মায়ের চরন তলে ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। এবং শোনা যায় এই সময়ে বামদেব বাবা তারা মায়ের হাস‍্যরত শ্রীমুখ দেখে বুঝতে পারলেন যে মা স্ব-ইচ্ছায় নিজের মন্দিরে বাজ

ফেলে তাকে বাক্ সিদ্ধ প্রমাণ করতে চেয়েছেন আসলে এই বাজ পাড়া মায়ের‌ই এক লীলা।

এবং এই ঘটনা থেকে হয়তো বোঝা যায় স্বামীজী সেদিন তার বন্ধুকে কি বলতে চেয়েছিলেন।

সত্যি যখন রেগে যেতেন বামা খ্যাপার মধ্যে

জেগে উঠত এক উগ্রতা। এক ধরণের

তামসিক পৈশাচিকতা। আবার ঠান্ডা হলে তিনি শিশুর মতোই সহজ এবং স্বাভাবিক।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে। চলবে এই ধারাবাহিক আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে বিশেষ পর্ব : শ্রী শ্রী বামা ক্ষ্যাপার শৈশবের অলৌকিক ঘটনা 

শিবচতুর্দশীর আর দেরি নেই। শিব চতুর্দশী যেমন আদি শিব লিঙ্গের আবির্ভাব তিথি তেমনই মহান সাধক শ্রী শ্রী বামা ক্ষ্যাপার আবির্ভাব তিথি সেই উপলক্ষে শুরু করেছি তার অলৌকিক জীবন নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা। শ্রী শ্রী বামা ক্ষ্যাপার শৈশব এবং পরবর্তী সাধক জীবন অসংখ্য জনশ্রুতি এবং কিংবদন্তী প্রচলিত আছে।আজকের পর্বে তার শৈশবের একটি বিশেষ ঘটনা নিয়ে লিখবো।

 

কিশোর বামাচরণ একবার আটলা গ্রামের নিজের বাড়ি থেকে তারাপীঠ মহাশ্মশানের দিকে যাচ্ছেন। এই সময় পিছন থেকে তাঁর নাম ধরে শিশুকন্ঠের ডাক। ডাকটি এলো পথের ধারে অবস্থিত চক্রবর্তীর বাড়ির দোতলা থেকে।বামা সেদিকে তাকিয়ে দেখেন বাড়ির দোতলায় জানালার ওপাশে এক দিব্য দর্শন ছেলে দাঁড়িয়ে।

বামা তখন এগিয়ে এসে তাকে পরিচয় জিজ্ঞেস করলে ছেলেটি জবাব দেয়, “আমি এ বাড়ির নারায়ণ। কিন্তু এরা আমাকে জলটুকুও দেয় না। তুই আমাকে নিয়ে চল।” কিন্তু দোতালায় বামা পৌঁছাবেন কিকরে। আবার স্বয়ং নারায়ণ তাকে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে বলছেন।

বামার অসহায় অবস্থা বুঝে সেই শিশু নিজেই একটি কাপড় ঝুলিয়ে দিলেন। উপরে উঠে এলেন বামা তারপর সেই শিশু নারায়ণ তাঁর হাতে রুপোয় বাঁধানো একটি শালগ্রাম শিলা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এক্ষুনি এটা নিয়ে চলে যা।”

 

আদেশ অনুসারে বামা অবিলম্বে সেই শালগ্রাম শিলা নিয়ে চলে আসেন দ্বারকা নদীর পাড়ে।এবং নদীর জলে শালগ্রাম শিলাকে বেশ খানিকক্ষণ ডুবিয়ে রেখে তারপর তাঁকে বালির ওপর শুইয়ে দিয়ে বললেন, “তুমি এবার একটু ঘুমোও, ঠাকুর। আমি আমার বড়মাকে এই বলে বামা চলে গেলেন।তারা পীঠে তারা মায়ের কাছে।

 

চক্রবর্তী বাড়ির নারায়ণ শিলা উধাও হয়েছে এই সংবাদ রটতে দেরি হয়নি গোটা এলাকা তন্ন তন্ন করে খুঁজে সবাই প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছে সেই সময়ে কোনো ভাবে বাড়ির কর্তা বামার খবর পায়

ক্ষ্যাপা হিসেবে তার কিছুটা খ্যাতি ছিলই

তাই সবাই ভাবলো এই কাজ তার পক্ষে মোটেই অসম্ভব নয়।

 

সকলে মিলে চড়াও হয় ব্রজবাসী কৈলাসপতির কুটীরে।তার কাছে প্রায় আসে বামা একথা সবার জানা।নিজ কুটিরেই ছিলেন কৈলাশপতি বাবা তিনি ভাবী শিষ্য বামাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, “এরা যা বলছে, তা কি সত্য?” সবাই বলছিল বামা নারায়ণ শিলা চুরি করে এনেছিলেন। বামা বলেন, “চুরি করতে যাব কেন? এঁদের নারায়ণ নিজেই আমাকে বলেছে, সে সামান্য জলটুকুও পায়না। তাই আমি তাঁকে জল খাওয়াতে নিয়ে এসেছিলাম।

সবাই সব শুনে হতবাক। যে নারায়নের দর্শন পেতে সাধক দের বছরের পর বছর সাধনা করতে হয় তিনি নিজে যে কিশোরের কাছে ধরা দিয়েছেন তিনি নিশ্চই কোনো সাধারণ মানুষ নয়। একথা সবাই সেদিন উপলব্ধি করেছিলেন।

 

সারা জীবনে বামা ক্ষ্যাপা অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছেন। তার কিছু নিয়ে আলোচনা হবে

সারা সপ্তাহ ধরে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।