Home Blog Page 78

বাংলার শিব – পাতালেশ্বর শিব মন্দিরের মাহাত্ম

বাংলার শিব – পাতালেশ্বর শিব মন্দিরের মাহাত্ম

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার প্রাচীন এবং প্রসিদ্ধ শিব মন্দির গুলির মধ্যে অন্যতম একটি শিব মন্দির হলো মুর্শিদাবাদের জাগ্রত পাতালেশ্বর শিবমন্দির।

আজকের বাংলার শিব পর্বে এই পাতালেশ্বর শিব মন্দিরের মাহাত্ম নিয়ে লিখবো।

 

একসময় নাকি এখানে একশো আটটি শিব মন্দির ছিল। তার মধ্যে এখন কেবলমাত্র এই একটি মন্দিরই টিকে আছে।এখানকার শিবলিঙ্গ স্বয়ম্ভূ জ্যোতির্লিঙ্গ। শিবলিঙ্গটি যেহেতু পাতাল থেকে মাটি ভেদ করে উঠে এসেছে তাই এখানকার শিবলিঙ্গের নাম দেওয়া হয়েছে পাতালেশ্বর। শিবলিঙ্গকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে মন্দির। প্রায় তিনশো বছর ধরে এখানে শিবের আরাধনা হয়ে আসছে।

 

এই মন্দির বহু প্রাচীন। স্থাপনার সঠিক দিন ক্ষণ নিয়ে মত পার্থক্য আছে তবে একাধিকবার সংস্কার করা হয়েছে এবং মন্দিরে প্রবেশের মুখে প্রায় চল্লিশ ফুট উচ্চতার একটি শিবমূর্তি তৈরি করা হয়েছে। প্রাচীর দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে সমগ্র জায়গাটি। তৈরি হয়েছে সুন্দর বাগান। পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে কাটিগঙ্গা নদী। তা যাতে মন্দিরের কোনও ক্ষতি করতে না-পারে সেজন্য বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে ঘাট।সব। মিলিয়ের নির্মল এবং মনোরম পরিবেশ।

 

এই মন্দিরে গর্ভগৃহে প্রবেশের আগে রয়েছে ছয় ফুট লম্বা বারান্দা। গর্ভগৃহের চারপাশেই এমন বারান্দা রয়েছে। গর্ভগৃহের দেওয়ালের বাইরে রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি। কোথাও রয়েছে শিব পার্বতীর মূর্তি। কোথাও বা অন্য দেবতার মূর্তি। এই সব মূর্তির পুজোও করেন ভক্তরা। বারান্দা থেকে প্রায় ১০ ফুট নীচে রয়েছে গর্ভগৃহের মেঝে ও শিবলিঙ্গ। ভক্তদের বিশ্বাস এখানে শিবের কাছে যা মানত করা হয় অথবা তাঁর কাছে হাতজোড় করে যা চাওয়া হয়, সেই সব কামনা পূরণ হয়।

 

জাগ্রত দেবাদিদেবের দর্শন পেতে সারাবছরই এখানে ভক্তদের সমাগম হয়। দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা নানা প্রার্থনা নিয়ে এই মন্দিরে শিবের দর্শনে আসেন।বিশেষ করে শ্রাবন এবং চৈত্র মাসে

ভিড় হয় বেশি।

 

চৈত্র মাস জুড়ে শিব মহিমা এবং বাংলার শিব মন্দির গুলি নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চলতে থাকবে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার শিব – জল্পেশ শিব মন্দিরের ইতিহাস

বাংলার শিব – জল্পেশ শিব মন্দিরের ইতিহাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার শিব পর্বে আজ উত্তর বঙ্গের বিখ্যাত এক শিব তীর্থর কথা উল্লেখ করবো|আজকের পর্বে বিখ্যাত জল্পেশ শিব মন্দির।

 

পশ্চিম বঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার প্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্র হল জল্পেশ মন্দির।এই মন্দিরের সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে।কোচবিহারের মহারাজা নরনারায়ণের বাবা বিশ্ব সিংহ ১৫২৪ সালে প্রথম এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।১৫৬৩ সালে মন্দিরটি পুনর্নির্মিত হয়। পরবর্তীতে ১৬৬৩ সালে রাজা প্রাণ নারায়ণও একবার মন্দিরটি নতুন করে গড়ে তোলেন।

 

জল্পেশ মন্দির প্রসঙ্গে একটি ভিন্ন তত্ত্বর অস্তিত্ব রয়েছে|কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন|জল্পেশ নামে কোনো এক প্রতাপশালী রাজবংশী ক্ষত্রিয় রাজা অথবা সর্দার এই অঞ্চলে এককালে শাসন করতেন । তাঁর নাম অনুসারে মন্দিরের নাম হয়েছে জল্পেশ।অনেকে মনে করেন হয়ত তিনি কোনো দৈব শক্তির অধিকারী ছিলেন। তাই তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁকে দেবতার স্থানে উন্নীত করা হয়েছে।

আবার অনেকে ভাবেন জল্পেশ হয়ত কোনো শক্তিশালী গ্রামদেবতা বা লৌকিক দেবতা ছিলেন পরে কোচবিহারের রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় শিবের সঙ্গে একীভূত হয়ে

তিনিই উত্তরবঙ্গের প্রধান দেবতা রূপে

স্বীকৃত হয়েছেন।জল্পেশ থেকেই জলপাইগুড়ি

নাম করণ হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়।

 

তবে শাস্ত্র মতে ভ্রামরী শক্তিপিঠের ভৈরব হলেন জল্পেশ। শিব এখানে একটি গর্তের মধ্যে রয়েছেন, তাই তিনি অনাদি নামেও পরিচিত।তার আদি এবং অন্ত খুঁজে পাওয়া যায়না।

 

বাবা জল্পেশ্বর এর দর্শন পেতে বহু মানুষ এই স্থানে আসেন |বিশেষ করে শ্রাবন ও চৈত্র মাসে দর্শণার্থী দের ভিড় বেশি হয়। শিব রাত্রি এবং নীল ষষ্ঠীতে বিশেষ পুজো হয় এবং সব মিলিয়ে উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠেন শিব ভক্তরা |বাবা জল্পেশ পরম দয়ালু তিনি ভক্তদের মনোস্কামনা

পূর্ণ করেন বলেই বিশ্বাস।

 

বাংলার শিব নিয়ে আবার পরবর্তী পর্বে

ফিরে আসবো।থাকবে এমনই তথ্য সমৃদ্ধ আলোচন। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার শিব – কেশবেশ্বর শিব মন্দিরের কথা

বাংলার শিব – কেশবেশ্বর শিব মন্দিরের কথা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

সারা বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য শিব মন্দির। চৈত্র সংক্রান্তি তথা নীল ষষ্ঠী উপলক্ষে প্রায় সবগুলি মন্দিরই বিশেষ সাজে সেজে ওঠে।

তেমনই একটি মন্দির দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কেশবেশ্বর শিব মন্দির যা নিয়ে আজকের পর্ব।

 

বিখ্যাত সাবর্ণ রায় চৌধুরী বংশের অন্যতম সদস্য ছিলেন জমিদার কেশবরাম রায় যিনি ছিলেন তৎকালীন বঙ্গ সমাজের অন্যতম গুণী ও সন্মানীয় ব্যাক্তি। কেশবরাম কাশীর বিশ্বনাথের স্বপ্নদর্শনে যে সন্তান লাভ করেছিলেন তাঁর নাম রাখেন শিবদেব, যিনি সন্তোষ রায় চৌধুরী নামে পরিচিত। কেশবরাম রায় ১৬৯৯ সালে ঔরঙ্গজেবের কাছ থেকে স্বতন্ত্র ‘রায় চৌধুরী’ খেতাব পেয়েছিলেন সেই থেকে তারা রায় চৌধুরী পদবি

ব্যাবহার করছেন।

 

ব্রিটিশ আমলে সমগ্র দক্ষিণবঙ্গের সমাজপতি কেশবরাম দক্ষিণ ২৪ পরগনার মন্দিরবাজারে যে শিবমন্দির এবং শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে যান তার কেশবরামের নামানুসারে নাম হয় কেশবেশ্বর।

মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছেন মহাদেব, লোকমুখে শোনা যায় যে কাশী থেকে আনা হয়েছিল এই শিবলিঙ্গ। শিবমন্দির প্রায় ৬০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটি আটচালা মন্দির। মন্দিরের ২১টি সিঁড়ির মধ্যে ১৬টি ধাপের সিঁড়ির বেশি ভাগই ইতিমধ্যেই মাটির তলায় লীন হয়েছে। সামান্য কয়টি সিঁড়ি দেখা যায়।বিশাল নন্দী মূর্তিও রয়েছে এখানে।

 

প্রায় সারা বছরই এই মন্দিরে জন সমাগম হয় তবে শিবরাত্রির দিন এবং চৈত্র মাসেরশেষে নীল ষষ্ঠীর সময়ে বিশেষ পূজা হয় কেশবেশ্বর মন্দিরে।সেই সময়ে বিশাল সংখ্যক ভক্তসমাগম ঘটে এই মন্দির চত্বরে।বহু মানুষ আসেন নিজের মনোস্কামনা নিয়ে। শোনা যায় বাবা কেশবেশ্বর তার ভক্তদের খালি হাতে ফেরান না।বহু মানুষের জীবনের দুঃখ কষ্ট বাবা কেশবেশ্বর দুর করেছেন বলে জানা যায়।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। চৈত্র মাসের এই বিশেষ কয়েকটি দিনে বাংলার প্রাচিন এবং ঐতিহ্য সম্পন্ন শিব মন্দির গুলি নিয়ে

ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা চলতে

থাকবে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার শিব – বাবা বানেশ্বর ধামের মাহাত্ম

বাংলার শিব – বাবা বানেশ্বর ধামের মাহাত্ম

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বহু প্রাচীন শিব মন্দির রয়েছে এই বাংলার বিভিন্ন স্থানে। পুরুলিয়া জেলায় বাবা বানেশ্বর ধাম তার মধ্যে অন্যতম। শুধু পুরুলিয়া জেলা নয়, পার্শ্ববর্তী রাজ্য ঝাড়খণ্ড থেকেও বহু পুণ্যার্থীরা এই মন্দিরে ছুটে আসেন মহা শিবরাত্রি এবং নীল

ষষ্ঠী উপলক্ষে।আজকের পর্বে লিখবো এই শিব মন্দির নিয়ে।

 

এককালে জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল মন্দির চত্বর।বন্যা জন্তু এবং দস্যুদের ভয়ে সেই সময় এই স্থানে কেউ প্রবেশ করতো না। বাবা বানেশ্বর পাতাল ফুঁড়ে এখানে আবীরভূত হয়েছিলেন অর্থাৎ তিনি স্বয়ম্ভু। তার আবির্ভাবের পরে পাতকুমের মহারাজ স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই মন্দির স্থাপন করেন এবং পুজো শুরু করান পরবর্তীতে পুরুলিয়ার কাশিপুরের মহারাজ এই মন্দির সংস্করণ করেন। মন্দির পরিচালনার জন্য সমস্ত ব্যবস্থা করেছিলেন কাশীপুরের মহারাজ।

 

তারপর রাজ পরিবারের সূর্য যখন অস্থামিত এবং মন্দির যখন ক্রমশঃ তার জৌলুস হারাচ্ছে সেই সময়ে উত্তর কাশি থেকে একজন সাধু আসেন তার নাম স্বামী শিবানন্দপুরী মহারাজ। তিনি এই মন্দিরে এসে মন্দির সংস্কার করে মন্দিরটিকে সুন্দর করে সাজিয়ে তোলেন এবং এবার ধুম ধাম করে বাবা বানেশ্বরের পুজো শুরু হয়।

 

বর্তমানে দুটি ভাগে বিভক্ত রয়েছে মন্দির পরিচালনা কমিটি। দেহঘড়িয়া কমিটি যারা বানেশ্বরের সেবার কাজে জড়িত থাকেন ও অপরটি হল চক্রবর্তী ষোলআনা কমিটি যারা মন্দিরের পারিপার্শ্বিক দায়িত্বভার নেন।

 

কথিত আছে এই মন্দিরে ভক্তি ভরে পুজো দিলে সমস্ত মনোবাসনা পূরণ হয় ভক্তদের। তাই দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন বাবা বানেশ্বর ধামের মন্দিরে পুজো দিতে। আসন্ন নীল ষষ্ঠীতেও এই মন্দিরে বিশেষ পুজো অনুষ্ঠিত হবে প্রতিবারের ন্যায়।

 

ফিরে আসবো বাংলার শিব নিয়ে আগামী পর্বে। থাকবে আরো একটি শিব মন্দিরের কথা।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার শিব – অমৃতি শিব মন্দিরের ইতিহাস

বাংলার শিব – অমৃতি শিব মন্দিরের ইতিহাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ আপনাদের মালদার ইংরেজ বাজারে অবস্থিত অতি প্রসিদ্ধ এবং জাগ্রত অমৃতি শিব মন্দিরের কথা জানাবো ।

 

এককালে পারিবারিক এই মন্দির স্থাপিত হয় স্থানীয় দাস পরিবারের মাধ্যমে পরে গোটা উত্তর বঙ্গের মানুষের কাছে এই শিব মন্দির অন্যতম আস্থার স্থান হিসেবে গড়ে ওঠে। বিশেষত চৈত্র সংক্রান্তি বা নীল ষষ্ঠীর সময়ে এবং শ্রাবন মাসে শিব রাত্রির সময় এই মন্দির বহু শিব ভক্তের প্রধান গন্তব্য।

 

বাংলার ১৩৫৩ সনে এই শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দাস পরিবারের পূর্বপুরুষ মহানন্দ দাস। তিনি তখন এই এলাকার জমিদার বরাবরই শিব ভক্ত ছিলেন তিনি। একদিন স্বপ্নাদেশে মহাদেবের দর্শন পেয়েছিলেন জমিদার মশাই

তারপরই তিনি এই শিব মন্দির গড়ার পরিকল্পনা নেন। প্রতিষ্ঠার পর তাঁর হাত দিয়েই এই মন্দির পুজো শুরু হয়। সেই সময়ে মহানন্দবাবু নিজেই সেবায়েত ছিলেন।

 

এক সময় তার মাথায় চিন্তা এলো যে তার অবর্তমানে কি হবে। পুজো তো বন্ধ করা যাবেনা। তাই ভবিষ্যতে যাতে কোনও দিন অমৃতি শিব মন্দিরের পুজো বন্ধ না হয় সেই উদ্দেশ্যে চারশো বিঘা জমি তিনি দেবত্ব সম্পত্তি হিসেবে তিনি মন্দিরের নামে লিখে দেন। সেই সম্পত্তির আয় থেকে আজও এই মন্দিরে সব পরম্পরা বজায় রেখে শিব পুজো হয়ে আসছে। পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম ধারাবাহিক ভাবে পুজোর দায়িত্ব পালন করছেন।

 

এই অমৃতি শিব মন্দিরে মহাদেবের বিগ্রহের পাশাপাশি শিবলিঙ্গ রয়েছে। এই মন্দিরে অনেক ভক্ত এসে মানত করেন। পরবর্তীতে  মনস্কামনা পূরণের পর আবারও মহাদেবের কাছে এসে গঙ্গাজল ও দুধ দিয়ে শিব পুজো করে যান।

 

বাংলার জেলায় জেলায় এমন বহু শিব মন্দির আছে। তার মধ্যে এখনো অনেক শিব মন্দির নিয়ে আলোচনা বাকি আছে। ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার শিব – তিলভান্ডেশ্বর শিবের পুজো

বাংলার শিব – তিলভান্ডেশ্বর শিবের পুজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ বাংলার শিব পর্বে আপনাদের মালদা জেলার এই ঐতিহাসিক এবং অদ্ভুত শিব মন্দিরের ইতিহাস জানাবো।এই শিব মন্দিরকে কেউ বলেন তিল ভান্ডেশ্বর আবার কেউ বলেন ভীমডাঙ্গি।আবার অনেকের কাছে এই প্রাচীন

শিবমন্দির হরিহর শিবমন্দির নামে বেশি পরিচিত।

 

মালদা জেলার বামনগোলার কাছে এই শিব মন্দির অবস্থিত। পাল যুগের রাজা মদন পাল এখানে রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। সেই থেকে জায়গাটির নাম মদনাবতী।

 

পাল বংশের শাসনকালে বাংলার বিরাট অংশে যে কৈবর্ত বিদ্রোহ দেখা দিয়ে ছিলো সেই বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন কৈবর্ত রাজ ভীম।তার নেতৃত্বে অসংখ্য ভূমিহীন এবং স্বাধীনতা হীন কৈবর্ত সম্প্রদায়ের প্রজা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন এবং পাল বংশের শাসক দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। সেই ইতিহাস জড়িত আছে এই তিল ভান্ডেশ্বর শিব মন্দিরের সাথে।ইতিহাস বলছে কৈবর্তরাজ ভীম এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই এই স্থানকে ভিমডাঙ্গিও বলা হয়।

 

শোনা যায় যুদ্ধে ভীমকে পালবংশের রাজা রামপাল পরাস্ত করেছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভীমকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল হাতির পিঠে চাপিয়ে। পরবর্তীতে মোটা কাঠের গুঁড়ি দিয়ে ভীমকে পিষে মারা হয়েছিল। এই ভীমডাঙ্গিতে পরাজিত এবং নিহত ভীমকে শোয়ানো হয়েছিল বলে মনে করা হয় এবং সেই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে আজও এখানে মাটিতে শায়িত ভীমের মূর্তি গড়া হয় এবং তার পুজো করা হয়।

 

মন্দিরটিকে প্রায় পাঁচশো বছরের পুরোনো এক বটবৃক্ষ চারপাশ থেকে ধরে রেখেছে বা ঘিরে রেখেছে।শিব ভক্তদের মতে এখানে শিবলিঙ্গ দিনকে দিন আকৃতিতে বাড়ছে। দেবাদিদেব এখানে অত্যন্ত জাগ্রত এবং ভীষণ ভাবে তার ভক্তদের জন্যে জীবন্ত।এই মন্দিরের গর্ভগৃহ বেশ প্রশস্ত। একসঙ্গে অনেকে বসে পুজো দিতে পারেন। শ্রাবণ মাসে এবং চৈত্র মাসে এই মন্দিরে অসংখ্য দর্শণার্থীদের ভিড় হয়।

 

সামনেই চৈত্র সংক্রান্তি এবং নীল ষষ্ঠী। এই ধারাবাহিক শিব সংক্রান্ত আলোচনা তাই চলতে থাকবে।আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে বাংলার শিব নিয়ে যথা সময়ে । পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার শিব – ফুলেশ্বর শিব মন্দিরের ইতিহাস

বাংলার শিব – ফুলেশ্বর শিব মন্দিরের ইতিহাস

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

চৈত্র মাস মানেই শিবের মাস । এই শিব মহিমা বর্ণনা করার আলাদা মাহাত্ম আছে। তাই আমি চেষ্টা করি প্রতি দিন আপনাদের জন্য শিব নিয়ে কিছু বলতে ।আজকের পর্বে আপনাদের একটি অদ্ভুত শিব মন্দিরের কথা জানাবো যাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য অলৌকিক জনশ্রুতি বা ঘটনা শোনা যায়।আজকের পর্বে ফুলেশ্বর শিব মন্দির।

ফুলেশ্বর বাবার অবস্থান আমতা কুশবেড়িয়া বিখ্যাত বানেশ্বর শিব মন্দিরের কিছুটা আগে। জায়গাটির নাম তাজপুর।প্রায় তিনশো আশি বছর প্রাচীন এই ফুলেশ্বর বাবার মন্দির। মন্দির বাবার ভক্তদের দ্বারা একাধিক বার সংস্কার হয়েছে। তবে আসলে কবে এবং কে এই মন্দির বা শিব লিঙ্গ স্থাপন করেছিল তা নিয়ে একটি কিংবদন্তী প্রচলিত আছে এই এলাকায়।শোনা যায় বহু বছর আগে এই তাজপুর ছিলো ঘন জঙ্গলে ঢাকা। তখন ডাকাত বা তান্ত্রিক সন্ন্যাসীরা ছাড়া বড়ো একটা কেউ আসতো না এদিকে।সেই জঙ্গলে নাকি জমিদার বাড়ির কামধেনু গাই যেত নিয়ম করে এবং সেই কামধেনু গাই প্রতিদিন একটি শিলা মূর্তিতে দুধ দিয়ে আসত। এই ঘটনা স্বপ্নাদেশে জানতে পারেন জমিদার এবং তিনি সেখানে গিয়ে পাথর খণ্ডটি দেখে বুঝতে পারেন যে এটি আসলে পঞ্চশীরের শিবমূর্তি। তারপর আবার স্বপ্নাদেশ হয় এবং সেই স্থানে জমিদার মন্দির নির্মাণ করে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন।

আগে বাবার মূর্তি প্রায় দু-ফুট উচ্চতায় জেগে ছিল। বর্তমানে ফুলেশ্বর বাবা প্রায় মাটির অনেকটা গভীরে অবস্থান করছেন। অনেকে মনে করেন মহাদেব ধীরে ধীরে পাতালে প্রবেশ করছেন। এই শিব ক্ষেত্রে অলৌকিক ঘটনার শেষ নেই।

প্রতি বছর নীল ষষ্ঠীতে বাবার অভিষেক হয়। এই দিন ভক্ত ও সন্ন্যাসীরা বাবার মাথায় কয়েকশো ঘরা জল, ডাব, দুধ এবং গঙ্গাজল ঢালেন। বিস্ময়কর ঘটনা হল সর্বশেষ মূল সন্ন্যাসী বাবার মাথায় জল ঢালেন। সেই জল ঢালার পর বাবার কৃপায় চরণামৃত উঠে আসে পাতাল থেকে।

এই মন্দিরের ভিতরে নাকি নিয়মিত জোয়ার ভাটা খেলে। রহস্যজনক ভাবে এই জল মন্দিরে আসে পাতাল থেকে এবং আবার যথা সময়ে পাতালেই মিলিয়ে যায়।প্রতিদিন দুপুরে মধ্য গগনে সূর্য অবস্থান হলে। তার রশ্মি বাবার মাথায় পড়লে তবেই পুজো শুরু হয়। এ ভাবেই চলে সারা বছর।দুবেলা পুজো হয় নিয়ম মেনে।

তবে এই আসন্ন চৈত্র সংক্রান্তি তে নীল ষষ্ঠীর দিন এবং শিব রাত্রিতে জাঁকজমক করে পুজো হয়।ফিরে আসবো পরের পর্বে। নতুন কোনো শিব মন্দিরের কথা নিয়ে।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিবধাম – পঞ্চকেদারের ইতিহাস

শিবধাম – পঞ্চকেদারের ইতিহাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

প্রায় সব শিবভক্তের স্বপ্ন থাকে একবার অন্তত পঞ্চকেদার দর্শন করা। কি এই পঞ্চ কেদার এবং কিভাবেই বা সৃষ্টি হলো পঞ্চ কেদার আর তার মাহাত্মই বা কি। আজকের পর্বে এই সব প্রশ্নের শাস্ত্র সম্মত উত্তর খুঁজবো।

 

পাণ্ডবরা কৌরবদের পরাজিত করার পর যুদ্ধের সময় তাদের দ্বারা করা ব্রাহ্মন হত্যার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে দেবাদিদেব মহাদেবের খোঁজ করতে গেল। প্রথমে কাশীতে যান তারা। শিব কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের মৃত্যু এবং অসততার জন্য গভীরভাবে বিরক্ত ছিলেন তাই পাণ্ডবদের দেখা না দিয়ে নন্দীর রূপ ধারণ করেন এবং গাড়ওয়াল অঞ্চলে লুকিয়ে থাকেন। কাশীতে শিবকে না পেয়ে পাণ্ডবরা গাড়ওয়াল হিমালয়ে চলে যান। ভীম গুপ্তকাশীর কাছে একটি ষাঁড়কে ঘুরে বেড়াতে দেখে তার স্বরূপ উপলব্ধি করেন তৎক্ষণাৎ তিনি ষাঁড় রুপী মহাদেবকে বল পূর্বক ধরতে চেষ্টা করেন তবে লেজ আঁকড়ে ধরার সাথে সাথে

বীর বিক্রমে হিমালয়ের দুর্গম পাদদেশে অদৃশ্য হয়ে গেলো সেই বিশালাকৃতি জীব। পরে কিছু অংশে আবার আবির্ভূত হলো। পাঁচটি স্থানে প্রকাশ পেলো এই রূপ। এই পাঁচটি স্থানকেই একত্রে পঞ্চ কেদার বলা হয়।

 

কেদারনাথে কুঁজ,বাহুগুলি তুঙ্গনাথে, মুখ রুদ্রনাথে, নাভি এবং পেট মধ্যমহেশ্বর এবং লোমগুলি কল্পেশ্বরে প্রকাশিত হয়েছিল।

পাণ্ডবরা এই স্থানে পাঁচটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন।সেই মন্দিরই পঞ্চ কেদার ধাম রূপে আজও বিরাজমান।

 

কেদারনাথের চারপাশেই এই শিব মন্দির গুলি ছড়িয়ে রয়েছে। পাঁচটি মন্দিরে পাঁচজন প্রধান পুরোহিত রয়েছেন এবং তারা এক বছরের জন্য পালাক্রমে প্রধান সেবক হিসেবে কাজ করেন।

বছরের একটি দীর্ঘ সময়ে বরফে ঢাকা থাকে এই স্থান। তাপ মাত্রা হিমাংকের নিচে নেমে যায়।তবে এই দুর্গম স্থান হওয়া সত্ত্বেও বহু ভক্ত আসেন প্রতি বছর শিব পুজো করতে।শাস্ত্র বলছে এই পাঁচটি শিব মন্দির একত্রে দর্শন করলে জীব তার কর্মফল থেকে মুক্তি পায়।

 

ফিরে আসবো শিব সংক্রান্ত নতুন এক পর্ব

নিয়ে আগামী দিনে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মহিমা – পৌরাণিক উজ্জ্বয়িনী শিব মন্দিরের ইতিহাস 

শিব মহিমা – পৌরাণিক উজ্জ্বয়িনী শিব মন্দিরের ইতিহাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ আপনাদের যে শিব মন্দিরের ইতিহাস জানাবো পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, মার্কণ্ডেয় ঋষি এই মন্দিরেই যমরাজকে পরাজিত করে সাক্ষাৎ মৃত্যুকে জয় করেছিলেন এবং

চিরঞ্জীবী হয়েছিলেন।

 

আগে সেই পৌরাণিক ঘটনা সংক্ষেপে জেনে নেয়া যাক।পুরান অনুসারে ঋষি মৃকন্দ ব্রহ্মার তপস্যা করে পুত্র লাভের আশীর্বাদ পেয়েছিলেন, কিন্তু জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে তাঁর পুত্র মার্কণ্ডেয়ের আয়ু ছিল কম। যার কারণে ঋষি মৃকন্দ তাঁর পুত্র ঋষি মার্কণ্ডেয়র স্বল্প আয়ু নিয়ে চিন্তিত থাকতেন । পিতাকে চিন্তিত দেখে পুত্রের মনে আঘাত লাগে এবং উদ্বেগ তৈরি হয়। একদিন ছেলের অনুরোধে ঋষি তাঁকে পুরো ঘটনা খুলে বলেন। পিতার দুঃখ দূর করতে এবং দীর্ঘায়ু লাভের জন্য মার্কণ্ডেয় অবন্তিকা তীর্থে গভীর জঙ্গলে ভগবান শঙ্করের কঠোর তপস্যা করেন। যখন তার বয়স বারো বছর পূর্ণ হয় এবং মৃত্যুর সময় এসে উপস্থিত হয় তখন যমরাজ ধৰ্মরাজ রূপে তাঁকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসেন। কিন্তু মৃত্যুকে স্বীকার করতে চান না তিনি। যমরাজকে হারাতে শিবের মূর্তিকে দুই হাতে চেপে ধরেন। সেই মুহূর্তে মহাদেব তাঁকে রক্ষা করার জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং নিজের অন্তত আয়ু থেকে পাঁচ বছর সেই বালককে দান করেন। সেই পাঁচ বছর এতো দীর্ঘ সময় যে আজও ঋষি মার্কেন্ডেয় স্বশরীরে এই পৃথিবীতে বিরাজমান।

 

মনে করা হয়, ভক্তদের রক্ষা করার জন্যই এই মন্দিরে সাক্ষাৎ মৃত্যুকে পরাজিত করেছিলেন মহাকাল। তাই মন্দিরে মহাদেব দর্শনেই

ভক্তরা দীর্ঘায়ু লাভ করেন।

সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হন।

 

ধর্মীয় নগরী উজ্জয়নীত শিবের এই প্রাচীন এবং পৌরাণিক মন্দির রয়েছে। মনে করা হয় বেশ কয়েক বছরের পুরনো এই মন্দিরটি সম্রাট বিক্রমাদিত্যের আমলের নির্মাণ করা হয়েছিল। এখানে শিবলিঙ্গটি দক্ষিণমুখী।শিব লিঙ্গে একটি চোখ খোদাই করা আছে।শিব কে এখানে মার্কন্ডেশ্বর মহাদেব রূপে পুজো করা হয়।

 

শিব মহিমা এবং বাংলার শিব মন্দির গুলি নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চলতে থাকবে সমগ্র

চৈত্র মাস জুড়ে। ফিরে আসবো আগামী পর্বে যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার শিব – পঞ্চমুখী শিব মন্দিরের ইতিহাস

বাংলার শিব – পঞ্চমুখী শিব মন্দিরের ইতিহাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ আপনাদের পুরুলিয়ায় অবস্থিত এমন এক প্রাচীন শিব মন্দিরের কথা জানাবো যেখানে শিবের একটি ব্যতিক্রমী রূপ দেখতে পাওয়া যায়। পুজো পদ্ধতিও একটু আলাদা।

 

পুরুলিয়ায় পিঁড়রা গ্রাম সংলগ্ন কংসাবতী

নদীর উত্তরপাড়ে অবস্থিত ‘বাবা পঞ্চমুখী ধাম’।

শোনা যায় মহাভারতের যুগে পান্ডবদের সময়কাল থেকে এই মন্দিরের অস্তিত্ব রয়েছে । এই মন্দিরের সঠিক বয়স সম্বন্ধে কারুরই কোনো ধারণা নেই। এই মন্দিরে বাসস্থান রয়েছে চতুর্মুখী একটি শিবলিঙ্গের কিন্তু এখানে শিব পূজিত হন পঞ্চমুখী রূপে কারণ শিবের পঞ্চম তম মুখটি পুরোহিত নিজের মুখ হিসাবে পরিকল্পনা করেই

পূজা করে থাকেন।যুগ যুগ ধরে চলে আসছে

এই প্রথা।

 

শাস্ত্রে পঞ্চমুখি শিব কে পাঁচটি তত্ত্বর প্রতীক রূপে দেখা হয় আবার অনেকের কাছে পঞ্চমুখি সদাশিব

শিবের পঞ্চাক্ষরি মন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করছে।শিবের এই রূপকে পঞ্চানন্দ ও বলা হয়। প্রতিটি মুখের রয়েছে নিজস্ব নাম। নামগুলি যথাক্রমে ইশানা, তৎপুরুষ,অঘোর,বাম দেব এবং ব্রম্হা বা সদ্যজাত।

 

হিন্দু সনাতন ধর্মে একাধিক দেব দেবীর পুজোর প্রচলন থাকলেও মানুষের মধ্যে ভগবান বসবাস করেন এমনটাই বিশ্বাস রয়েছে। মানুষের মধ্যে যে সত্যিই যে ঈশ্বর বিরাজমান সেই তত্বকে এই মন্দিরে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তাই শিব মূর্তির মধ্যে নিজের প্রতিচ্ছবিকে কল্পনা করে পুজো করেন পুরোহিত। ভক্ত ও ভগবান এই ভাবে এখানে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। এমন টা সম্ভবত বাংলা তথা দেশের আর কোনো শিব মন্দিরে দেখা যায়না।

 

সারা বছর দর্শণার্থীরা আসেন তবে চৈত্র মাস এবং শ্রাবন মাসে বহু দুর দূরান্ত থেকে ভক্তদের সমাগম হয় এই মন্দিরে। ভক্তদের বিশ্বাস বাবা পঞ্চমুখী শিব ভক্তদের সমস্ত মনোবাসনা পূরণ করে থাকেন। তিনি কাউকেই খালি হাতে ফেরান না তিনি পরম দয়াময়।

 

ফিরে আসবো বাংলার শিব নিয়ে আগামী পর্বে এখনো বাংলার বহু প্রাচীন শিব মন্দির নিয়ে আলোচনা বাকি আছে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।