Home Blog Page 78

প্রজাতন্ত্র দিবসের শুভেচ্ছা

আজ আমাদের দেশের প্রজাতন্ত্র দিবস|

ইংরেজির ১৯৫০ সালে এই দিনেই ভারতের সংবিধান গৃহীত হয়েছিল এবং জন্ম হয়েছিলো বিশ্বের বৃহত্তম প্রজাতন্ত্রের|এই দিন থেকেই বিশ্বের বৃহত্তম লিখিত সংবিধান আনুষ্ঠানিক ভাবে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতবর্ষের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়|প্রজাতন্ত্র দিবসের সূচনা করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি,1950 সালের এই দিনেই স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ তার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন|

যদিও শুরুটা ছিলো অন্যরকম ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি জাতীয় কংগ্রেস ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলি পূর্ণ স্বরাজ ঘোষণা করে এবং তারপর থেকে প্রতি বছর ওই দিনটাকেই স্বাধীনতা দিবস হিসাবে পালন করতে শুরু করে কিন্তু পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতা আসে 1947 সালের 15ই আগস্ট এবং সেই থেকে ওই দিন স্বাধীনতা দিবস ও 26 এ জানুয়ারি সাধারণতন্ত্র দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে|

আমরা গর্বিত আমরা স্বাধীন প্রজাতান্ত্রিক ভারত বর্ষের নাগরিক, আমাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, সামাজিক নিরাপত্তা, মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত আছে যে সংবিধানের মাধ্যমে আজ সেই সংবিধান কার্যকর হওয়ার দিন|আজ প্রতিটা ভারতবাসির গর্বের দিন|

প্রতিবারের মতো এবারও মহা সমারোহে দেশ জুড়ে পালিত হবে প্রজনতন্ত্র দিবস|হবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, রাষ্ট্রপ্রধানদের বক্তৃতা, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা|

আসুন আজ শ্রদ্ধা জানাই দেশের সংবিধানকে, শ্রদ্ধা জানাই দেশের বীর সৈনিকদের যারা রাষ্ট্র রক্ষায় আত্ম ত্যাগ করেছেন|জয় হিন্দ|বন্দে মাতারাম|আপনাদের সবাইকে জানাই প্রজাতন্ত্র দিবসের শুভেচ্ছা|ফিরে আসবো ধারাবাহিক বাংলার কালী পর্ব নিয়ে আগামী দিনে। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – দয়াল ঠাকুরের কালী

দেবী কালী শুধু শাস্ত্র সম্মত মহাকালী বাভদ্র কালী রূপে পূজিতা হন তা নয়। তিনি বাংলার ঘরের মেয়ে। আমাদের ঘরের মেয়েকে আমরা যেমন নানা রকম আদরের নাম্বার দিয়ে থাকি তেমনই দেবী কালীও নানা নামে নানা রূপে আমাদের কাছে ধরা দেন। কোথাও তিনিবড়মা আবার কোথাও তিনি পুটে কালী। এমনইএক কালী মন্দির আছে বজ বজে যেখানে দেবীকে খুকীমা নামে ডাকা হয়।আজকের বাংলার কালী পর্বে

দয়াল ঠাকুরের খুকীমা কালীর কথা লিখবো ।

 

অদ্ভুত এই কালী মূর্তির ইতিহাস। শোনা যায় দয়াল ঠাকুর নামে এক মাতৃ সাধক এক সময়ে এই স্থানে সাধনা করতেন। পাশেই ছিলো শ্মশান এবং আদি গঙ্গা।

 

এক রাতে এক ডাকাত দল এখানে আসে।সাধক কে ডেকে নিয়ে যাওয়ার হয় তাদের সর্দারের কাছে।ডাকাত সর্দারের গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। পানীয় জল ও চিকিৎসারে জন্যই তাই কুটির দেখে দাঁড়িয়ে পড়া শুনশান প্রান্তরে।সেই ফাঁকে হয়ে যাবে ভাগ-বাটোয়ারাও। জানা গেল, সুদূর বর্ধমান থেকে লুঠ করে আসছেন তাঁরা।দয়াল ঠাকুর লুট করা সামগ্রীরে মধ্যে পাথরের তৈরি এক কালী মূর্তি দেখলেন এই মূর্তি যে চুরি করা আনা হয়েছে কোনো রাজবাড়ি থেকে তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল তাঁর কাছে। তার কারণ বিগ্রহের গঠন। অখণ্ড কষ্ঠীপাথরের তৈরি এই মূর্তি বড়ো কোনো পাথর থেকে কেটে বানানো। এমনকি দেবীর গলার নরমুণ্ডের মালাও খোদাই করে তৈরি। এ যে কোনো সাধারণ শিল্পীর হাতের কাজ হতে পারে না তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি তাঁর। তিনি অবহেলায় পড়ে থাকা সেই মূর্তির পুজোর ও ভোগের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ পালন করতেই সেরে ওঠেন ডাকাত সর্দার

 

।তারা বিদায় নেয় এবং কালী মূর্তি ওই স্থানেই স্থাপিত হয় এবং খুকিমা নামে আজও তিনি সেখানে স্বমহিমায় বিরাজিতা।পরে জানা যায় এই মূর্তির পুজো করতেন মাতৃ সাধক কমলাকান্ত। বর্ধমান থেকে এই মূর্তি ডাকাতি করে সেই রাতে আনা হয়। এবং হয়তো দেবীর ইচ্ছাতেই এখানে আরেক মাতৃ সাধক সেইমূর্তির পুজোর দায়িত্ব পান।

 

এমন কতো অজানা দৈব ঘটনা কতো অদ্ভুত অলৌকিক লীলা ঘটেছে এই বাংলায়। আগামী পর্ব গুলিতে আরো অনেক এমন ইতিহাস এবং জনশ্রুতি নিয়ে ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – আমডাঙার কালী মন্দির

আজকের বাংলার কালী পর্বে জানাবো উত্তর চব্বিশ পরগনার আম ডাঙায় অবস্থিত একটি প্রাচীন কালী মন্দিরের কথা|

 

উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যে অবস্থিত কালী মন্দির গুলির প্রাচীন আমডাঙা কালী মন্দির অন্যতম|

এই কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন রাজা মান সিংহ|এই মন্দির প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক অধ্যায়|

 

মুঘল সম্রাট আকবরের সৈনদল দু’বার রাজা প্রতাপাদিত্যের কাছে পরাজিত হন। মুঘল সম্রাটের বিশ্বাস ছিল, যশোরের যশোরেশ্বরী মন্দিরে পুজো দিয়ে তার পর যুদ্ধ শুরু করতেন বলেই জয়লাভ করতেন প্রতাপাদিত্য। প্রতাপাদিত্যের এই রণকৌশল ভবিষ্যতে যাতে আর সফল না হয়, সেই পরিকল্পনা করতে মান সিংহকে নিয়োগ করেন সম্রাট আকবর। মান সিংহ শুরুতেই যশোরেশ্বরী মন্দির থেকে বিগ্রহ সরিয়ে দেন। প্রতাপাদিত্য সে কথা জানতে পারার পরেই রেগে ফেটে পড়েন এবং মন্দিরের পূজারী রামানন্দ গিরি গোস্বামীকে নির্বাসিত করে দণ্ড দেন|

 

নির্বাসিত হয়ে রামানন্দ এই আমডাঙ্গায় এসে উপস্থিত হন এখানে তখন ঘন জঙ্গল তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে সুখবতী নদী|পরবর্তীতে মান সিংহ স্বপ্নাদেশ পান, মায়ের ভক্ত রামানন্দ উন্মাদ অবস্থায় সুখবতী নদীর তীরে রয়েছেন, তাকে সুস্থ করে পুনরায় সাধন মার্গে ফিরিয়ে আনার জন্য ১৫৬১ খ্রিস্টাব্দে আমডাঙা কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন ও কষ্টিপাথর দিয়ে কালীর শান্ত মূর্তি মন্দিরে স্থাপন করেন করেন মান সিংহ|

 

পরোক্ষ ভাবে বাংলার নবাব সিরাজ উদ্ দৌলা ও একটি বিশেষ কারনে রাজা কৃষ্ণ চন্দ্রর নাম ও জরিয়ে আছে প্রাচীন এই কালী মন্দিরের সাথে|১৭৫৬ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার কলকাতা অভিযানের সময় রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এখানকার এই কালীমূর্তি দেখতে পান এবং প্রার্থনা করেন|পরবর্তীতে মনস্কামনা পূর্ণ হওয়ার পর তিনি এই মন্দিরে প্রায় ৩৬৫ বিঘা জমি দান করেন|

 

প্রায় পাঁচশো বছরের প্রাচীন এই কালী মন্দিরে দেবীর শান্ত রূপ বিরাজমান, মূর্তিটি কষ্টি পাথরে নির্মিত এবং এখানে রয়েছে কয়েকটি প্রাচীন শিব মন্দির|বহু মানুষ এখানে আসেন তাদের মনোস্কামনা নিয়ে, মনোস্কামনা পূরণ হলে পুজো দেন তবে কালী পুজো উপলক্ষে ভিড় হয় সবথেকে বেশি|

 

ফিরে আসবো বাংলার কালীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে আগামী দিনে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – বীরভূমের কালী পীঠ

তারাপীঠ এবং একাধিক শক্তি পীঠের পাশাপাশি বীরভূমে রয়েছে বেহিরা নিম্ববাসিনী কালীপীঠ, আজকের বাংলার কালী পর্বে লিখবো এই

প্রাচীন মন্দিরের কথা।

 

বীরভূমের পুরন্দরপুর পঞ্চায়েতের বেহিরা গ্রামে কাশীর মা অন্নপূর্ণা বেহিরা নিম্ববাসিনী কালী নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।কিভাবে হলো প্রতিষ্ঠা তা নিয়ে একটি অলৌকিক ঘটনা প্রচলিত আছে।

 

পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, দ্বাপরযুগে অষ্টাবক্র মুনি দেবী অন্নপূর্ণাকে সতীপীঠ বক্রেশ্বরে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে নদীপথে নৌকা করে কাশী থেকে নিয়ে আসছিলেন। সেই সময়, পুরন্দরপুরের বেহিরা গ্রামের কাছে এসে দেবীর নৌকা ক্ষিণশ্রোতা বক্রেশ্বর নদীতে আটকে যায়। সেখানে তপস্যা করছিলেন ভরদ্বাজ মুনি। কথিত আছে, ভরদ্বাজ মুনির আহ্বানে দেবী অন্নপূর্ণা কালী রূপে একটি নিমগাছের তলায় বসে যান। তিনি সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হলেন, নাম হল নিম্নবাসিনী কালী। কালী মায়ের নিত্যসেবা শুরু করলেন ভরদ্বাজ মুনি। আজ সেখানেই তৈরি হয়েছে মন্দির। ভরদ্বাজ মুনির স্মৃতিধন্য তপভূমিতেই যুগ যুগ ধরে পূজিতা হচ্ছে দেবী।

 

প্রতিবছর দুর্গাপুজোর ত্রয়োদশীতে মহাধুমধাম করে বেহিরা কালীতলায় নিম্ববাসিনী মায়ের পুজো হয়। নিম্ববাসিনী মায়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, এখানকার মা দুর্গা পুজোর সময় দুর্গা রূপে এবং পরবর্তী সময়ে অন্নপূর্ণা, কালী এবং অন্যান্য রূপেও পূজিতা হন। বছরের পর বছর ধরে এই প্রথা চলে আসছে। ত্রয়োদশীতে এখানে মেলা বসে।

 

একদা এই অঞ্চল ছিল জঙ্গলে ঘেরা। আজও মন্দিরের চারদিক গাছগাছালি ঘেরা। মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে অতিকায় বাঁধানো যজ্ঞমণ্ডপ। সেখানেই রয়েছে ভরদ্বাজ মুনির মন্দির, পাশে অষ্টাবক্র মুনির মন্দির।

 

স্থাপত্যরীতিতে বাংলার চারচালা শৈলী দেখা যায়। উভয় মন্দিরেই রয়েছে শিবলিঙ্গ। প্রাচীন নিমগাছের তলায় নিম্ববাসিনী নামে রয়েছেন দেবী অন্নপূর্ণা। নিম্ববাসিনী মন্দির একচূড়া বিশিষ্ট। মন্দিরের একমাত্র কক্ষটিই গর্ভগৃহ। সেখানেই দেবী মূর্তি প্রতিষ্ঠিত। দেবীর অবস্থানটিও আর পাঁচটা মন্দিরের মতো নয়। অন্যান্য মন্দিরে দেবদেবী মন্দিরের মাঝে অবস্থান করেন। এই মন্দিরের একটি কোণায় প্রতিষ্ঠিত রয়েছে দেবীবিগ্রহ। প্রস্তর বেদীর উপরে পদ্মাসনে উপবিষ্টা দেবীমূর্তির কোমর পর্যন্ত দৃশ্যমান। দেবী মূর্তির উচ্চতা প্রায় চার ফুট, মৃন্ময়ী মূর্তি।

 

দেবীর সঙ্গে কোনও শিব নেই। তবে দেবী মূর্তির পাশে স্থাপিত রয়েছে একটি শিবলিঙ্গ। শোনা যায়, কাশিতে বাবা বিশ্বনাথকে একা রেখে দেবী এসেছিলেন বলে, দেবী মূর্তির সঙ্গে মহাদেব নেই।দেবী এখানে নিত্য পূজিতা। পঞ্চব্যঞ্জনে দেবীর নিত্যভোগ হয়।

 

পরের পর্বে আবার ফিরে আসবো

বাংলার কালী নিয়ে। থাকবে অন্য

এক কালী মন্দিরের ইতিহাস এবং

পৌরাণিক ঘটনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – বগুড়ার ডাকাত কালী

অবিভক্ত বাংলার বগুড়ার গ্রামে ছিলো এক প্রাচীন কালী মন্দির যে মন্দিরের পুজোয় এক অদ্ভুত রীতি পালন করা হতো। সেই অদ্ভুত প্রাচীন প্রথা নিয়ে পরে লিখবো আগে এই মন্দির এবং কালী পুজোর ইতিহাস নিয়ে বলে নিই।

 

প্রায় চরশো বছর আগে দুর্গম এই অঞ্চলে ছিলো হিংস্র পশু, ডাকাত এবং অশরীরী আত্মা দের বাস। এই কালী মন্দিরে পুজো দিতে আসতেন সাধারণ মানুষরা তাদের বিশ্বাস ছিলো এই মা তাদের সব বিপদ থেকে রক্ষা করবেন। আবার ডাকাতরা এখানে পুজো দিয়ে অমাবস্যার রাতে ডাকাতি করতে বেরোতো।

 

শোনা যায় মধুসুদন ভাদুরী নামে এক ব্যাক্তি স্বপ্নে দেবীর আদেশ পেয়ে এই পূজা স্থাপনা করেন এবং তার নাম অনুসারেই এলাকার নাম হয় মধু গঞ্জ এবং এই পুজোর মধুগঞ্জেশ্বরী কালী পূজা নামকরণ হয়।পরবর্তীতে মধুসুদন ভাদুরী তৎকালীন জমিদার রমন বিহারী সরকারকে পূজা-অর্চনা ও পরিচালনার দায়িত্ব অর্পন করেন।

 

এই কালী পুজোর অদ্ভুত যে ঐতিহ্য রয়েছে তা হলো পাঠা লুট- বলিকৃত পশু লুটের উদ্দেশ্যে লুটকারীদের মাঝে ছুঁড়ে ফেলা হয়, শক্তি খাটিয়ে নির্দিষ্ট সীমানা অতিক্রম করলেই সেই বলী প্রদত্ত পশু তার। আরেকটি প্রথা হলো থান লুট।

পূজার স্থানে বা প্রতিমার সামনে পূজাকৃত বা উৎসর্গ করা বিভিন্ন ধরনের প্রসাদ সাজানো থাকে যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর যার যে প্রসাদ পছন্দ তাই সেটা নিতে পারবে।

 

বর্তমানে এই পুজো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অপূর্ব

এক নজীর কারন এপার বাংলা ওপার বাংলা দুই বাংলার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এই পুজোয় অংশ গ্রহণ করেন সমান আস্থা এবং উৎসাহ নিয়ে।

 

 

এমন বহু প্রাচীন কালী মন্দির ও কালী পুজো হয়

সারা বাংলা জুড়ে। আগামী পর্বে ফিরে আসবো অন্য এক কালী পুজোর ইতিহাস নিয়ে।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – বীরভূমের লোবা মা

কথিত আছে তিন শতাধিক বছর আগে অবধূত রামেশ্বর দন্ডি নামে এক মাতৃ সাধক অজয় নদের তীরে তার আরাধ্য দেবী লোবা মায়ের তন্ত্র মতে প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর কোনো এক সময় তিনি ওই লোবা গ্রাম ছেড়ে চলে যান। গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার আগে তিনি যৌথ ভাবে পুজোর দায়িত্ব দিয়ে যান এলাকার ঘোষ পরিবারদের এবং চক্রবর্তী পরিবারের হাতে।

 

বর্তমানে বীরভূমে যতগুলো বড়ো কালীপুজো হয়ে থাকে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো এই দুবরাজপুরের লোবা গ্রামের লোবা মা। প্রায় তিন শতাব্দী প্রাচীন এই কালীপুজোকে কেন্দ্র করে মানুষের উৎসাহ উদ্দীপনা থাকে চোখে পড়ার মতো।

 

দায়িত্ব প্রাপ্ত পরিবার গুলির পারিবারিক প্রভাব এবং প্রতিপত্তি কমে এলে স্থানীয় মানুষ জন স্বেচ্ছায় পুজো পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। শুরুর দিন থেকে প্রথা মেনে লোবা মায়ের মূর্তি তৈরি করার ক্ষেত্রে এলাকার বাগদী সম্প্রদায় মানুষদের আনা মাটি দিয়েই মায়ের প্রতিমা তৈরি করা হয়। এক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষত্ব। বিজয়া দশমীর দিন বর্ধমান জেলার গৌরবাজারের তালপুকুরের ঈশান কোণ থেকে আনা হয় মায়ের মূর্তি তৈরি করার জন্য পর্যাপ্ত মাটি। সেদিন থেকেই মূর্তি তৈরি করার কাজ করেন বাউরি বাগদী এবং সূত্রধর সম্প্রদায়ের মানুষেরা।

 

মায়ের মূর্তি রঙের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভেষজ রং ব্যবহার করা হয়ে থাকে।কোনো রূপ রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়না।কালীপুজোর আগের দিন মায়ের গায়ে খড়ি দেওয়া হয়ে থাকে। পুজোর দিন রং করা থেকে সমস্ত কিছু হয়ে থাকে। আর রাতে চক্ষুদান করা হয়।রীতি মেনে প্রতিবছর দীপান্বিতা অমাবস্যার রাতে এই লোবা মায়ের পুজো হয় এবং ঠিক তার পরদিন মায়ের বিসর্জন হয়ে থাকে।

 

মায়ের অঙ্গরাগ থেকে পুজোর বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারিবারিক ভাগ রয়েছে। ঘোষ পরিবারের সদস্যরা মায়ের অলংকার পরান। প্রদীপের জন্য ঘি বংশপরম্পরায় সরবরাহ করে থাকেন গোয়ালা পরিবার।

 

আরো একটি বিষয় উল্লেখ করতেই হয়।

এখানে লোবা মায়ের আরও দুই বোন রয়েছে। পাশের দুই গ্রামে দুই বোনেরা পুজো হয়। প্রতি বছর বিসর্জনের সময়ে পাশের গ্রামের মেজো বোন এবং ছোট বোনকে আনা হয় লোবা মন্দির চত্বরে।

 

এই পুজো উপলক্ষে উৎসবে মেতে ওঠেন জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ।সব মিলিয়ে সত্যি ব্যাতিক্রমী এবং ঐতিহ্যসম্পন্ন

পুজো এই বীরভূমের লোবা মায়ের পুজো।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। অন্য এক কালী মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে। দেখতে থাকুন।

বাংলার কালী – চরণ পাহাড়ি কালী

আজ পুরুলিয়ার এক কালী মন্দিরের কথা আপনাদের জানাবো। এই মন্দির চরণ পাহাড়ি কালী মন্দির নামে খ্যাত এবং একটি বিশেষ কারণে হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের খুব শ্রদ্ধার স্থান এই কালী ক্ষেত্র।

 

স্বাধীনতার আগে পুরুলিয়ার পুঞ্চা নামক এই ছোট্ট স্থান তখন একটা গঞ্জ। ব্রিটিশ আমলে এখানেই ইংরেজ পুলিশ একটি পুলিশ ফাঁড়ি তৈরি করেন। ওসি নিযুক্ত হন এক সৎ এবং কর্মনিষ্ঠ মুসলিম ব্যক্তি তার পুলিশ ফাঁড়ি থেকে কিছুটা দূরেই ছিলো এক দুর্গম পাহাড়ি এলাকা।

 

শোনা যায় জঙ্গলে ঘেরা সেই পাহাড়ি এলাকায় ওই ওসি এক পাথরে দেবীর পায়ের ছাপ দেখেন। এরপরই তিনি দেবীর স্বপ্নাদেশ পানযে ওখানে দেবী পুজো পেতে চান। তাই হয় মন্দির তৈরী করে শুরু হয় পুজো।এই ভাবে শুরু হয় চরণপাহাড়ি কালীপুজোর। যেহেতু মায়ের পদচিহ্ন পড়েছিল এই পাহাড়ে তাই পাহাড়ের নাম হয় চরণপাহাড়ি। আর সেখানকার কালী হয়ে ওঠে চরণপাহাড়ি কালী।

 

পাহাড়ি দুর্গমতার কারণে এখানে খুব কম মানুষই যাতায়াত করতেন। কখনও কখনও তান্ত্রিকরা আসতেন পুজো করতে।বর্তমানে যাতায়াতের সুবিধা হওয়ায় বহু মানুষ আসেন পুজো দিতে তবে আজও সেই সম্প্রীতি বজায় রেখেই পুজো হয়ে চলেছে।পুজোয় যোগ দেন সব ধর্মের মানুষ।

 

প্রাকৃতিক পরিবেশ খুব মনোরম। এখানে পাহাড়ে এক উঁচু টিলার উপর চরণপাহাড়ির মন্দির।

অবস্থিত। পুজো হয় তন্ত্র মতে। কথিত আছে যেকোনো ব্যাক্তি পবিত্র মনে কোনো আশা নিয়ে এসে দেবীর পুজো দিলে দেবী মনের আশা

পূরণ করেন।সব থেকে বেশি ভিড় হয় কার্তিক মাসের অমাবস্যায়।অসংখ্য দর্শণার্থী আসেন সেই

সময়ে।

 

বাংলার কালীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে ফিরে আসবো আগামী দিনে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – সাগর দীপের আদি কালী মন্দির

সাগর দ্বীপ বলতেই মনে আসে গঙ্গাসাগর মেলা এবং কপিল মুনির আশ্রম। কিন্তু এই সাগর দ্বীপে আছে এক প্রাচীন কালী মন্দির যা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয়না।সাগরদ্বীপ যবে থেকে গঠিত হয়েছে তবে থেকেই সেখানে তাঁর অধিষ্ঠান ৷

 

তখন এই স্থান ঘন জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। জল দস্যু, বাঘ কুমির আর অশরীরী আত্মা দের বাস ছিলো এই দুর্গম স্থান সেই সময়ে অর্থাৎ প্রায় চারশো থেকে পাঁচশো বছর আগে স্বপ্নাদেশে পুজো

শুরু হয়

 

তৎকালীন সময়ে জঙ্গলের হিংস্র জীবজন্তুর হাত থেকে নিজেদেরকে বাঁচাতে একটি বটবৃক্ষের তলায় পূজার্চনা করে জঙ্গলে যেতো মৎসজীবি এবং মধু সংগ্রহ কারীরা। পাশাপাশি বণিকরাও এই দেবী মন্দিরে পুজো করে সমুদ্র যাত্রা করতো

 

দেবীর উপস্থিতির জন্য নাকি এই স্থানে হিংস্র জীবজন্তুর আক্রমণে মৃত্যুর পরিমাণ অনেকটাই কমে গিয়েছিল ৷ তখন থেকে বেশ কয়েকজন উপকূল তীরবর্তী এলাকার মানুষজনেরা জঙ্গল পরিষ্কার করে এই সাগরদ্বীপেই বসবাস শুরু করে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বৃহত্তর জন পদ।

 

এখানে দেবীর পাঁচটি বড় মূর্তি রয়েছে ৷ এছাড়াও ছোট ছোট অনেক কালীমূর্তি রয়েছে ৷ মানত করে এগুলি ভক্তরা দিয়ে গিয়েছেন ৷ তখন থেকে সব মূর্তিই পুজো হচ্ছে ৷ নিত্যপুজো ছাড়াও প্রতি মঙ্গল ও শনিবার বিশেষ পুজো হয় এখানে ৷ এছাড়াও প্রতিবছর কালীপুজোর দিন জাঁকজমকের সঙ্গে পুজো হয় ৷ এই মন্দিরের মা খুবই জাগ্রত । এখানে পুজো দিতে বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসে । মা করুণাময়ী সকলের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন ।”

আদি কালী মন্দির নামে সমগ্র দক্ষিণ বঙ্গ বাসির কাছে দেবী পরিচিতা

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। অন্য এক কালী মন্দিরের কথা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শুভ মকর সংক্রান্তির শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

আজ মকর সংক্রান্তি।বাংলা মাস অনুযায়ী পৌষ মাসের শেষ দিনটিতে এই উৎসব পালন করা হয় তবে শুধু বাংলায় বাঙালিরাই নন, আমাদের দেশের নানা প্রান্তে এই দিনটিকে নানা ভাবে বিশেষ বিশেষ উৎসবের সঙ্গে পালন করা হয়, পালন করা হয় কিছু উপাচার ও অবশ্যই গঙ্গা স্নানের মাধ্যমে পূর্ণতা পায় এই মকর সংক্রান্তি|

 

শব্দের মানে খুঁজলে দেখা যায় সংক্রান্তি শব্দের অর্থ সঞ্চার বা গমন করা। সূর্যের মকর রাশিতে গমন হয় এই তিথিতে|সেই দিক দিয়েএই তিথি

জ্যোতিষ শাস্ত্রে একটা বড়ো ইভেন্ট।

 

এই আধুনিক সময়েও এখনও দূর গাঁয়ে পৌষ সংক্রান্তির উৎসব নিয়ে আসে আনন্দ বার্তা। পৌষ সংক্রান্তিতে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় স্নিগ্ধ সবুজ গ্রাম। শহরের ব্যস্ত জীবনেও দোকানে দোকানে সেজে উঠা তিল, কদমা, প্যাকেটের চালের গুঁড়োর প্যাকেট, ঝোলা গুড়ের হাঁড়ি জানান দেয় চলে এসেছে পৌষ সংক্রান্তি। হালে পিঠে থেকে পায়েস সবই সহজলভ্য নির্দিষ্ট দোকানে। তবে শুধু গ্রামে নয়, শহরেও বেশ কিছু পরিবার আজও সমান আন্তরিকতার সঙ্গে এবং নানা আয়োজনে পালন করে পৌষ সংক্রান্তির উৎসব। বাড়িতেই তৈরি করেন পিঠে-পুলি। এই পৌষ বা মকর সংক্রান্তি বাঙালি সংস্কৃতির একটি বিশেষ উৎসব বা বিশেষ ঐতিহ্যবাহী দিন।আবার কৃষি প্রধান বাংলায় এই সময়ে নতুন ফসল বিশেষ করে ধান তোলা হয়।

 

পুরান মতে অনুযায়ী, এই দিনই দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের যুদ্ধ শেষ হয়েছিল। বিষ্ণু অসুরদের বধ করে তাঁদের কাটা মুন্ডু মন্দিরা পর্বতে পুঁতে দিয়েছিলেন, মকর সংক্রান্তি তে, তাই মকর সংক্রান্তির দিনই সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাস হয়ে শুভ শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে আজও মানা হয়ে থাকে, মকর সংক্রান্তির এই মহাতিথিতেই মহাভারতের পিতামহ ভীষ্ম শরশয্যায় ইচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করেছিলেন।

 

মকর সংক্রান্তির দিন সাধারণত সূর্যদেবের পুজো করা হয়। তাঁর আশীর্বাদে আমাদের সকল রোগ-ব্যাধি দূর হয় বলে শাস্ত্রে উল্লেখ আছে তাই এই বিশেষ দিনটিতে সকলেই নিজের ঘরবাড়ি, বিশেষ করে রান্নাঘর ও রন্ধন দ্রব্যাদি পরিষ্কার করেন, যাতে সমস্ত রকম ‘অপরিশুদ্ধতা’ দূর হয়।

 

নিজের মতো করে অল্প কথায় আজ এই বিশেষ তিথি অর্থ্যাৎ মকর সংক্রান্তির আধ্যাত্মিক এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করলাম এই পুন্য তিথিতে। আশা করি এই প্রচেষ্টা আপনাদের ভালো লাগবে।সবাইকে মকর সংক্রান্তির অসংখ্য শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।ভালো থাকুন।

পড়তে থাকুন।ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – বিশ্বেস

প্রাচীন কুব্জিকা তন্ত্র গ্রন্থে স্বয়ং শিব একটি শক্তি পীঠের উল্লেখ করে দেবী পার্বতীকে বলছেন –

” কামগিরি মহাপিঠঙ তথা গোদাবরী প্রিয়ে ”

এই শক্তি পীঠ বিশ্বেসী নামে খ্যাত এবং বাস্তবে দক্ষিন ভারতের গোদাবরী নদীর তীরে অবস্থিত।

জনশ্রুতি আছে যে কয়েকশো বছর আগে বিশু নাথ নামে এক সিদ্ধ যোগী এই দুর্গম অরণ্যঘেরা অঞ্চলে তপস্যা করতেন।এক রাতে তার আরাধ্যা দেবী কালী তাকে স্বপ্নে দেখা দেন এবং বলেন কাছেই দক্ষিণ দিকে এক জলাশয়ে একটি রুপোর ঘটে দেবী বিরাজ করছেন এবং তিনি যেনো তাকে উদ্ধার করে মন্দিরে স্থাপন করেন। আদেশ অনুসারে সেই মাতৃ সাধক পুকুর থেকে ঘট তুলে এনে পুজো শুরু করেন।

এর কিছুদিন পরে আবার এক সপ্নাদেশ এলো।
দেবী বললেন সামনেই আছে এক নীম গাছ সেই নীম গাছের ডাল থেকে যেনো দেবীর মূর্তি তৈরী হয়।একই সাথে রাজাও সেই রাতে স্বপ্ন দেখলেন যে মাতৃ সাধক বিশুনাথকে তিনি যেনো দেবীর মূর্তি নির্মাণ এবং মন্দির তৈরীতে সাহায্য করেন।
শুধু তাই নয় ভৈরব দন্ডপানি কে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করার কথাও দেবী বলে দেন।সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন হয়।

শাস্ত্র মতে এই এই অলৌকিক ঘটনা থেকে দেবীর শক্তি পীঠের হদিশ পাওয়া যায়। এখানেই পড়েছিলো দেবীর গন্ডদেশ। যদিও দেবীর শ্রী অঙ্গ এবং স্থান টি নিয়ে কিঞ্চিৎ মতপার্থক্য আছে।
তবে একাধিক শাস্ত্রে এই স্থানকে একান্ন পীঠের অন্যতম স্থানের মর্যাদা দেয়া হয়েছে।

দেবী এখানে বিশ্বেশী। শান্ত, স্নিগ্ধ এবং মমতাময়ী রূপে দেবী এখানে বিরাজ করছেন। এই স্থান তন্ত্র সাধনার উপযুক্ত বলে মনে করা হয়। শোনা যায় বহু মানুষ এই স্থানে পুজো দিয়ে স্বপ্নে
দেবীকে দর্শন করেছেন এবং তাদের সমস্যার সমাধান পেয়েছেন।

ফিরে আসবো আগামী পড়বে। চলতে থাকবে বাংলার নানা কালী ক্ষেত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।