Home Blog Page 62

কালী কথা – রাজকুসুম গ্রামের বন কালী

কালী কথা – রাজকুসুম গ্রামের বন কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বর্ধমানের কাঁকসার রাজকুসুম গ্রামে শাল পিয়াল গাছে ঘেরা ঘন জঙ্গলে বন কালী দেবী অধিষ্ঠান করছেন এই পুজোর সূচনা হয়েছিল আনুমানিক সাড়ে চারশো বছর আগে।আজকের কালী কথায় এই বন কালী দেবীর কথা আপনাদের জানাবো।

 

গোড়ার দিকে জঙ্গলের মধ্যেই মূর্তি এনে পুজোর আয়োজন হতো। পুজোর পুরোহিত ছিলেন স্থানীয় ভট্টাচার্য্য পরিবারের এক সদস্য। দুর্গম এই অরণ্যে সেই সময় ছিলো বন্য পশু এবং ডাকাতের ভয়।পুজোর সময়ে পুরোহিতকে রীতিমত লাঠিয়াল সাথে করে জঙ্গলে আনা হত। পুজো অনুষ্ঠিত হতো দিনের বেলায়।

 

একবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য পুজোর স্থানে পৌঁছাতে নানা বাঁধার সৃষ্টি হয়।তারপর স্বপ্নাদেশ পান পুরোহিত । দেবী স্বপ্নে দেখা দিয়ে তাকে তার বাড়িতেই রেখে পুজো করতে বলেন।পুরোহিত দেবীর কাছে জানতে চেয়েছিল যে জঙ্গলে যে পুজো চলে আসছে সেই পুজোর কি হবে?

তার উত্তরে দেবী বলেন জঙ্গলের মধ্যে একটি গাছের গায়ে দুটো চোখের আকৃতি দেখা যাবে সেই গাছেই তিনি বিরাজমান থাকবেন। সেই গাছের গোঁড়ায় মূর্তি ছাড়াই হবে পুজো।

 

সেই থেকে ভট্টাচার্য বাড়িতে দেবী অধিষ্ঠান করছেন আবার একই সাথে জঙ্গলে এক গাছে দেবীর শক্তি উপস্থিত। সেখানেও ভক্তরা এসে পুজো দেন। জঙ্গল বা বনের মধ্যে দেবী বিরাজ করছেন তাই নাম হয় বন কালী

 

সাধারণত বাংলার সব কালী মন্দিরে দীপান্বিতা অমাবস্যা বা কালী পুজোর দিনেই বড়ো করে

কালী পুজোর আয়োজন হয় কিন্তু বর্ধমানের কাঁকশায় বন কালীর পুজো হয় কালী পুজোর পরদিন।এখানে নেই কোনো মূর্তি তার বদলে আছে গাছ এবং গাছে চোখের আকৃতিও দেখা যায়।

 

আবার এমন এক প্রাচীন কালী পুজোর ইতিহাস এবং অলৌকিক ঘটনা নিয়ে ফিরে আসবো

কালীর কথার পরবর্তী পর্বে।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।

কালী কথা – বর্ধমানের কল্যাণী কালী

কালী কথা – বর্ধমানের কল্যাণী কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বর্ধমানের কল্যাণী কালীমন্দিরকে কেন্দ্র করে আছে বহু অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ যা মুলত জনশ্রুতি তাই সবার আগে বলে রাখি যে অলৌকিক ঘটনা গুলির কথা এখন বলতে চলছি সেগুলি মূলত স্থানীয় দের কাছে শোনা যার বেশি ভাগই লোক মুখে প্রচলিত কিংবদন্তী।

 

এই অঞ্চলে কান পাতলেই শোনা যায় এক ঘটনা এই মন্দিরে এক চোর চুরি করেছিল। তবে আশ্চর্য জনক ভাবে প্রণামীর অর্থ সে আর নিয়ে যেতে পারেনি। পথেই আচমকা সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। চোর হলেও সে নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও কোনো রকমে মন্দিরে ফিরে এসে দেবী কল্যাণীকে তার প্রণামীর অর্থ ফিরিয়ে দেয় এবং ক্ষমা চেয়ে নেয় দেবীর কাছে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও পর মুহূর্তে সেরে যায় ওই চোরের রোগ । সে নিশ্চিন্তে ফিরে যায় সুস্থ শরীর নিয়ে।

 

বর্ধমানের কল্যাণী কালী মন্দিরের দেবী কালী ভক্তদের কাছে জীবন্ত কালী নামেই বেশি পরিচিত।

কারণ তাঁদের বিশ্বাস দেবী কল্যাণী আজও জীবন্ত। তিনি কালীরূপে এই মন্দিরে বিরাজিতা।

তিনি আছেন মানেই সব আছে। সব নিরাপত্তা আছে। ভয় এলে তা দূরে চলে যেতে বাধ্য।

এবং এই বিশ্বাস বা শ্রদ্ধা একদিনে আসেনি

এসেছে এই সব অলৌকিক ঘটনার মধ্যে দিয়ে। এসেছে দেবীর ভক্তদের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি এবং নানাবিধ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে।

 

এমন আরো একটি জনশ্রুতি আছে।

শোনা যায় একবার এক মহিলা কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। যখন তাঁর মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। সেই সময়ে তিনি দেবীর কাছে নিজের জীবনভিক্ষা করেন দয়াময়ী কল্যাণী কালী সেই আবেদন যেন কান পেতে শুনেছিলেন ।কিছুদিন পরে দেখা

যায় হটাৎ সেরে গিয়েছেন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ওই মহিলা। পরবর্তীতে তিনি সুস্থ্য শরীরে বহু দিন জীবিত ছিলেন।

 

দেবী কল্যাণী যেমন দয়াময়ী তেমনই আবার তিনি

ক্রোধ ও করেন। একবার দেবী জীবন্ত কালীর ছবি মোবাইলে বন্দি করেছিলেন কোনো এক ভক্ত সেই সময় তিনি হটাৎ জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে দেবীর মন্দিরে প্রণাম করে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে আরোগ্য প্রার্থনা করেন এবং সুস্থ্য হন।আজও অনেক ভক্ত অনুভব করতে পারেন যে দেবী তাঁদের আশপাশেই আছেন। আশপাশেই ঘোরাঘুরি করছেন। এভাবেই এই মন্দিরের দেবী কালী যেন বুঝিয়ে দেন।তিনি জড় বিগ্রহ নন। তিনি জীবন্ত।প্রয়োজন শুধু আস্থা আর তার প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পন।তিনি পরম দয়াময়ী এবং শুন্য হাতে কাউকে ফেরান না।তাই প্রতি অমাবস্যায় বিশেষ পুজো উপলক্ষে কল্যাণী কালী মন্দিরে উপচে পরে ভক্তদের ভিড়।এছাড়া প্রতিদিন দর্শণার্থীদের আনাগোনা তো লেগেই আছে।

 

ফিরে আসবো পরের পর্বে। কালী কথা নিয়ে

ধরাবাহিক আলোচনা চলতে থাকবে। আগামী দিনে এমন অনেক অজানা অবিশ্বাস্য ঘটনা জানতে পারবেন। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – গঙ্গা সাগরের আদি কালী

কালী কথা – গঙ্গা সাগরের আদি কালী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বঙ্গোপ সাগরের মোহনায় অবস্থিত গঙ্গা সাগর দ্বীপ মুখ্যত কপিল মুনির আশ্রমের জন্য তবে এই দ্বীপে আছে এক প্রাচীন কালী মন্দির।আজকের পর্বে এই প্রাচীন কালী মন্দির নিয়ে লিখবো।

সুন্দরবন সংলগ্ন সাগরদ্বীপ তখন তা ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। রুটি-রুজির টানে সুন্দরবনের উপকূলবর্তী এলাকার মানুষ এই দ্বীপে এসে কাঠ ও মধু সংগ্রহ করতেন। তখন জঙ্গলের হিংস্র জীবজন্তু এবং জল দস্যু দের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে বন বিবির পুজোর পাশাপাশি একটি বটবৃক্ষের তলায় কালী পূজা করে জঙ্গলে যেতেন এলাকাবাসীরা। তখন সেই স্থানে কোনো স্থায়ী মন্দির ছিলো না।

একবার সাগরদ্বীপের এক বাসিন্দা স্বপ্নাদেশ পান। সেইমতো তিনি ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করে সেই বট গাছের নিচে মন্দির তৈরি করে কালী মূর্তির প্রতিষ্ঠা করেন। এই মন্দির ছিলো সম্ভবত এই অঞ্চলের প্রাচীনতম কালী মন্দির তাই এই মন্দির আদি কালীমন্দির নামে পরিচিত।সেই থেকে ওই মন্দিরে কালী পুজাে হয়ে আসছে। জাগ্রত এই কালীমন্দিরে মনস্কামনা জানাতে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু মানুষ ছুটে আসেন পুজো দিতে। প্রতিবছর কালীপুজোর দিন জাঁকজমকের সঙ্গে গঙ্গাসাগরে আদি কালীমন্দিরে পূজিতা হন মা কালী।শোনা যায় আদি কালী মন্দিরে করা মনোস্কামনা দ্রুত পূরণ হয়।

এই আদি কালী মন্দিরে নিত্য পুজোর ব্যবস্থা রয়েছে এছাড়াও প্রতি অমাবস্যা এবং
সপ্তাহে মঙ্গলবার ও শনিবার বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়। বংশ পরম্পরায় সেই শুরুর দিন থেকে মায়ের সেবা করে আসছেন এখানকার পুরোহিতরা।

এমন আরো প্রাচীন এবং প্রসিদ্ধ কালী মন্দিরের কথা বলা এখনো বাকি আছে। আবার ফিরে আসবো কালী কথা নিয়ে আগামী পর্বে।
পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – দেবী নগরের কালী

কালী কথা – দেবী নগরের কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

কালী কথায় আজ জানাবো উত্তর দিনাজপুরের

রায় গঞ্জে অবস্থিত শতাধিক বছরের পুরনো

দেবীনগর কালীবাড়ির কথা।

এই কালী মন্দির প্রসঙ্গে আছে বহু অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ ।

 

ঠিক কবে এবং কে এই পূজা প্রচলন করেন তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও পূজার বয়স শতাধিক সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। অতীতে কোনো এক সময়ে জঙ্গলে ঘেরা এই মন্দিরে পুজো করতো এলাকার দুর্ধর্ষ ডাকাতরা।পরবর্তীতে দিনাজপুরের জমিদার স্যার গিরিজানাথ রায় বাহাদুর এই পূজার দেখভাল শুরু করেন।

তিনি প্রতি বছর দিনাজপুর থেকে এসে এখানে পুজো করতেন।পরবর্তীতে জমিদার পরিবার থেকে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। বর্তমানে এই ট্রাস্টি বোর্ড সব ট্র‍্যাডিশন মেনে আজও নিষ্ঠা সহকারে পূজা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

শোনা যায় একবার স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যাক্তি

ভূপালচন্দ্র রায়চৌধুরির গাড়ি ঝড় জলের রাতে এই মন্দিরের সামনে এসে খারাপ হয়ে পড়ে।

এই অঞ্চল তখন দুর্গম এবং বিপদসংকুল । আর কোনো উপায় না দেখে তিনি দেবীর কাছে নিজের উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা করেন।দেবীর আশিসে গাড়ি ঠিক হয়ে যায়। পরদিন দেবী তাঁকে স্বপ্নাদেশ দেন মন্দিরের চারপাশে ঘিরে দেবার জন্য। তারপর তিনি মন্দিরের পাশে প্রাচীর তুলে দেন।

 

এখানে জমিদার বাড়ির প্রচলিত নিয়ম মেনে কালীপূজার দিন সূর্যাস্তের পর মূর্তি গড়ে, সেই মূর্তিতেই পূজা করে সূর্যোদয়ের আগেই বিসর্জন দেওয়া হয়।বিশেষ বিশেষ তিথিতে পশুবলিও হয়ে থাকে।তবে তা হয় পূজার পরে।

কারণ দিনাজপুরের জমিদাররা ছিলেন বৈষ্ণব তাঁরা বলি দিতেন না। মধ্য রাতে পশুবলি দিত ডাকাতেরা। সেই পরম্পরা মেনেই এই রীতি পালন হয়।মায়ের মন্দিরে কোন ছাদ নেই। খোলা আকাশের নীচে মায়ের স্থান।

 

দেবী নগর কালী বাড়ির কালী বহু মানুষের কাছে

পরম দয়াময়ী। ভক্তদের সব বাসনা তিনি পূরণ করেন।তাই প্রতি অমাবস্যায় তার কাছে ছুটে আসেন বহু দর্শণার্থী।

 

আসন্ন কৌশিকী অমাবস্যা উপলক্ষে শুরু করেছি কালী কথা। আবার পরের পর্বে এমনই এক ঐতিহাসিক কালী মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে

ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – সার্ভিস কালী

কালী কথা – সার্ভিস কালী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাঁকুড়ার সোনামুখীতে আছে এক জাগ্রত কালী মন্দির যে কালী মন্দিরে দেবী কালীর সার্ভিস কালী। শুধু বাঁকুড়া নয় গোটা রাজ্য এমনকি রাজ্যের বাইরেও এই কালী মন্দিরের জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কেনো এমন নাম আর কি এই মন্দিরের ইতিহাস সব জানাবো আজকের পর্বে।

আজ থেকে প্রায় বিরাশি বছর আগে স্থানীয় এক পরিবহন ব্যাবসায়ী ব্যবসা সংক্রান্ত নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে এবং ব্যবসায় ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে যখন আর কোনো মুক্তির পথ
পাচ্ছিলেন না তখন তখন তিনি হাজার চেষ্টা তেও যে সমস্যা থেকে মুক্তি সম্ভব হচ্ছিল না সেই সমস্যা পুজো দেয়ার কিছু দিনের মধ্যেই মিটে যায়।দ্রুত এই কালীর মহিমা ছড়িয়ে পড়ে। শোনা যায়, এলাকার কিছু বেকার যুবক যুবতীর চাকরির মনস্কামনাও পূর্ণ করেন দেবী। এর পর থেকেই ওই কালীর নাম লোকমুখে সার্ভিস কালী হয়ে যায়।

চাকরির বাজার যত খারাপ হয়েছে ততোই এই কালী মন্দিরের প্রসিদ্ধি বেড়েছে।জনশ্রুতি এখানে মানত করলেই নাকি চাকরি মেলে।গত বিরাশি বছর ধরে এই বিশ্বাসে ভর করে সার্ভিস কালীর পুজো করে আসছেন বাঁকুড়ার সোনামুখীর মানুষ।পরবর্তীতে এই কালীর মাহাত্মা বাংলা তথা পার্শ্ববর্তী রাজ্যেও ছড়িয়ে পরে এবং বহু মানুষ আসেন তাদের প্রার্থনা নিয়ে।

মন্দিরের সেবায়েত রা বলেন বিভিন্ন মন্দিরে যেমন শারীরিক সমস্যা বা অন্যান্য সমস্যা নিয়ে আসা মানুষের ভিড় থাকে এই মন্দিরে সাধারণত তা হয়না। এই কালী মন্দিরে কর্ম প্রার্থী বা ব্যবসায়ীরাই বেশি আসেন এবং তাদের বিশ্বাস নিষ্ঠাভরে সার্ভিস কালীর পুজো করলে সার্ভিস কালী চাকরি তথা রুজি রোজগারের ব্যবস্থা করে দেন। আজ অবধি অসংখ্য মানুষ এই মন্দিরে এসে পুজো দিয়ে সুফল পেয়েছেন বলে শোনা যায়।

বাংলায় এমন অসংখ্য কালী মন্দির আছে। তাদের নিয়ে আছে অনেক ইতিহাস এবং অলৌকিক সব ঘটনা। আবার পর্বে ফিরে আসবো এমনই এক ঐতিহাসিক কালী মন্দির নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মাহাত্ম – বানেশ্বর শিব

শিব মাহাত্ম – বানেশ্বর শিব

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলার প্রাচীন শিব ধাম গুলির মধ্যে পুরুলিয়া জেলায় বাবা বানেশ্বর ধাম অন্যতম। শুধু পুরুলিয়া জেলা নয় পার্শ্ববর্তী রাজ্য বিহার এবং ঝাড়খণ্ড থেকেও বহু পুণ্যার্থীরা এই মন্দিরে ছুটে আসেন। আজকের পর্বে এই বানেশ্বর শিব
ধাম নিয়ে লিখবো।

আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে বাবা বানেশ্বর পাতাল ফুঁড়ে পুরুলিয়ার অনাড়া নামক এক প্রত্যন্ত গ্রামে আবির্ভুত হয়েছিলেন অর্থাৎ তিনি স্বয়ম্ভু।সেই সময়ে জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল মন্দির চত্বর।বন্য জন্তু এবং দস্যুদের ভয়ে সেই সময় এই স্থানে কেউ প্রবেশ করতো না।তার আবির্ভাবের পরে পাতকুমের মহারাজ স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই মন্দির স্থাপন করেন এবং পুজো শুরু করান পরবর্তীতে পুরুলিয়ার কাশিপুরের মহারাজ এই মন্দির সংস্করণ করেন। মন্দির পরিচালনার জন্য সমস্ত ব্যবস্থা করেছিলেন কাশীপুরের মহারাজ।

তারপর রাজ পরিবারের সূর্য যখন অস্থামিত এবং মন্দির যখন ক্রমশঃ তার জৌলুস হারাচ্ছে সেই সময়ে উত্তর কাশি থেকে একজন সাধু আসেন তার নাম স্বামী শিবানন্দ পুরী মহারাজ। তিনি এই মন্দিরে এসে মন্দির সংস্কার করে মন্দিরটিকে সুন্দর করে সাজিয়ে তোলেন এবং আবার ধুম ধাম করে বাবা বানেশ্বরের পুজো শুরু হয়।

বর্তমানে দুটি ভাগে বিভক্ত রয়েছে মন্দির পরিচালনা কমিটি। দেহঘড়িয়া কমিটি যারা বানেশ্বরের সেবার কাজে জড়িত থাকেন ও অপরটি হল চক্রবর্তী ষোল আনা কমিটি যারা মন্দিরের পারিপার্শ্বিক দায়িত্বভার নেন।এই শিব ধাম অনাড়া বাবা বানেশ্বর শিব ধাম নামে সর্বত্র প্রসিদ্ধ।

বহু মানুষের বিশ্বাস এই মন্দিরে ভক্তি ভরে পুজো দিলে সমস্ত মনোবাসনা পূরণ হয় । তাই দূর-দূরান্ত
থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন বাবা বানেশ্বর ধামের মন্দিরে পুজো দিতে।শ্রাবন মাসে এবং চৈত্র মাসে ভিড় হয় সব থেকে বেশি।

ফিরে আসবো শিব মাহাত্ম নিয়ে আগামী পর্বে। থাকবে আরো একটি শিব মন্দিরের প্রাচীন ইতিহাস। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মাহাত্ম – শ্যামলেশ্বর শিব 

শিব মাহাত্ম – শ্যামলেশ্বর শিব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শ্রাবন মাস সারা বিশ্বের শিব ভক্তদের কাছে অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। আজ এই পবিত্র সময়ে আপনাদের বাংলার আরো এক প্রাচীন শিব মন্দিরের ইতিহাস জানাবো।আজকের পর্বে শ্যামলেশ্বর শিব মন্দির নিয়ে লিখবো।

 

বাংলা ওড়িশা সীমান্ত এলাকার দাঁতনে আছে হাজার বছরের প্রাচীন শ্যামলেশ্বর শিব মন্দির।

এই শিব মন্দির আনুমানিক হাজার বছরের আগে নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরের স্থাপত্যটি বেশ আকর্ষণীয়। প্যাগোডার আদলের ছোঁয়া আছে। মন্দিরটির আদলে প্রাচীনত্বের নানা ছাপ আছে। প্রবেশপথের সামনে কষ্টিপাথরে নির্মিত নন্দী মূর্তিটি অপূর্ব সুন্দর।এই মন্দির চত্বরে ইতিহাসের নানা নিদর্শন আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যা শ্যামলেশ্বর মন্দিরের প্রাচীনত্বর প্রমান।

 

মন্দিরের প্রতিষ্ঠালিপি না থাকায় মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা কে করেছিলেন তা সঠিক জানা যায় না। জানা যায় না প্রতিষ্ঠার সময়কাল।তবে ঐতিহাসিক দের দাবি সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল। একটি মত অনুসারে ওড়িশার সূর্যবংশীয় নৃপতি গজপতি মুকুন্দদেব ষোড়শ শতাব্দীর শেষার্ধে মন্দিরটি শিব মন্দির টি নির্মাণ করেছিলেন।আবার কেউ কেউ বলেন উজ্জ্বয়িনী রাজ্যের অধিপতি বিক্রমাদিত্যর শ্বশুর ভোজ রাজার শাসনাধীন ছিল দন্তপুর বা আজকের দাঁতন এবং ভোজরাজাই মন্দিরটি গড়েছিলেন।

দণ্ডভুক্তির রাজা বিক্রমকেশরী এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন এমনটাও অনেকে মনে করেন।

 

মন্দিরের চারপাশ পাথরের তৈরি প্রায় দশ ফুটের উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।মন্দিরের ভিতরের অঙ্গনটিও বিশালকৃতির।প্রায় ফুট চারেক উঁচু একটি ভিত্তির উপর মন্দিরটি স্থাপিত। মন্দিরের অলঙ্করণ হিসাবে দেখা যায় মূল প্রবেশপথের সামনে একটি নন্দীমূর্তি যার কথা আগেই বলেছি এছাড়াও সামনের দ্বারপথের মাথায় ভগবান বিষ্ণুর অনন্তসজ্জায় সায়িত রূপ খোদাই করা আছে।

 

এই মন্দিরে প্রতিদিন বহু ভক্ত ভিড় জমান। তবে শ্রাবন এবং চৈত্র এই দুটি মাসে অসংখ্য

ভক্ত আসেন তাদের আরাধ্য শিবের বিশেষ পুজোয় অংশ নিতে।

 

আবার পরের পর্বে শিব মাহাত্মর আরেকটি পর্ব নিয়ে ফিরে আসবো আপনাদের জন্য। থাকবে আরেকটি শিব মন্দিরের ইতিহাস। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

 

 

শিব মাহাত্ম – এক্তেশ্বর মহাদেব

শিব মাহাত্ম – এক্তেশ্বর মহাদেব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শিব মাহাত্মর আজকের পর্বে বাংলার মন্দির নগরী নামে প্রসিদ্ধ বিষ্ণুপুরের কাছেই বাঁকুড়ার একটি বিখ্যাত শিব মন্দিরের কথা আপনাদের জানাবো |এই মন্দির এক্তেশ্বর শিব মন্দির নামে পরিচিত।

 

এই মন্দির ও শিব লিঙ্গ নিয়ে প্রচলিত রয়েছে অসংখ্য লোককাহিনী এবং অলৌকিক ঘটনা|

প্রাচীনকালে এই অঞ্চলে যে জনগোষ্ঠী বাস করতো তাঁরা নিজেদের সূর্যের সন্তান বলে প্রচার করতেন। এই আদিবাসীরা ছিলেন একেশ্বরবাদী অনেকে মনে করেন একঈশ্বর থেকে এক্তেশ্বর নামটি সৃষ্টি হয়েছে|

 

বর্তমানে বাঁকুড়া শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে দ্বারকেশ্বর নদের বাম তীরে এই প্রাচীন শিব মন্দির অবস্থিত|মন্দিরের কুণ্ডের মধ্যে যে শিবলিঙ্গটি রয়েছে সেটি কিছুটা বাঁকা ভাবে অবস্থান করছে|অনেকে মনে করেন এই কিঞ্চিৎ বাঁকা শিবলিঙ্গ থেকেই বাঁকুড়া নামের উৎপত্তি|বর্তমানে ল্যাটেরাইট তৈরি সুগঠিত পশ্চিমমুখী মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট। ভক্তদের একাংশের ধারণা সেই দ্বাপর যুগ থেকে এই শিব এখানে বিরাজ করছেন এই মন্দিরটি পাণ্ডবদের সময় নির্মিত হয়েছিল। যা তৈরি করেছিলেন স্বয়ং দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। মন্দিরের গর্ভগৃহের মধ্যে রয়েছে কুণ্ড। যার মধ্যে রয়েছে শিবলিঙ্গ। অনেকের মতে এই শিবলিঙ্গ নিয়ে এসে এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য।

 

এই অঞ্চলের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে এই শিব মন্দির।একটি প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজার সঙ্গে ছাতনার সামন্তভূমের রাজার রাজ্য সীমানা নিয়ে বিবাদ চরম আকার নিলে তার মীমাংসা করতে আসেন স্বয়ং শিব পরবর্তীতে বিবাদিত অঞ্চলের সীমানার সংযোগস্থলে একতার প্রতীক হিসেবে এই

এক্তেশ্বর শিব মন্দির স্থাপিত হয়|

 

শুধু বাঁকুড়া বা বাংলা নয় সারা দেশের শিব

ভক্ত দের কাছে একটি প্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্র এই এক্তেশ্বর শিব মন্দির|শ্রাবন মাস উপলক্ষে এখানে কয়েক হাজার দর্শনার্থীর সমাগম হয়।সেই সময়ে এই শিব পুজোকে কেন্দ্র করে মেলাও বসে|

 

শিব মাহাত্মর পরবর্তী পর্বে অন্য এক প্রাচীন

শিব মন্দিরের কথা নিয়ে যথা সময়ে

আবার ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মাহাত্ম – পাতালেশ্বর শিব 

শিব মাহাত্ম – পাতালেশ্বর শিব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার এককালের রাজধানী ছিলো মুর্শিদাবাদ যা সাধারণত নবাবী আমলের স্থাপত্য নিদর্শনের জন্য বিখ্যাত কিন্তু এই মুর্শিদাবাদেই রয়েছে বাংলার প্রাচীন এবং প্রসিদ্ধ শিব মন্দির গুলির মধ্যে অন্যতম পাতালেশ্বর শিবমন্দির।

আজকের পর্বে এই পাতালেশ্বর শিব মন্দিরের মাহাত্ম এবং ইতিহাস নিয়ে লিখবো।

 

এই মন্দির বহু প্রাচীন। স্থাপনার সঠিক দিন ক্ষণ নিয়ে মত পার্থক্য আছে তবে একাধিকবার সংস্কার করা হয়েছে।একসময় নাকি এখানে একশো আটটি শিব মন্দির ছিল। তার মধ্যে এখন কেবলমাত্র এই একটি মন্দিরই টিকে আছে।এখানকার শিবলিঙ্গ স্বয়ম্ভূ এবং জ্যোতির্লিঙ্গর সাথে এই শিব লিঙ্গের তুলনা করা হয়।শিবলিঙ্গটি যেহেতু পাতাল থেকে মাটি ভেদ করে উঠে এসেছে তাই এখানকার শিবলিঙ্গের নাম দেওয়া হয়েছে পাতালেশ্বর। শিবলিঙ্গকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে মন্দির। প্রায় তিনশো বছর ধরে এখানে শিবের আরাধনা হয়ে আসছে।

 

বর্তমানে মন্দিরে প্রবেশের মুখে প্রায় চল্লিশ ফুট উচ্চতার একটি শিবমূর্তি তৈরি করা হয়েছে। প্রাচীর দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে সমগ্র জায়গাটি। তৈরি হয়েছে সুন্দর বাগান। পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে কাটিগঙ্গা নদী। নদীর স্রোত যাতে মন্দিরের ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে ঘাট।সব। মিলিয়ের নির্মল এবং মনোরম পরিবেশ।

 

পাতালেশ্বর শিব মন্দিরের পাশে কয়েকটি

বড় বড় অশ্বথ ও বট গাছ রয়েছে তার নিচে

পূজা অর্চনা হয়। নদীর এ তীরটির নাম

সতীদাহ ঘাট। ঘাটের এই নাম অনুযায়ী

অনেকেই এই শিব মন্দিরকে সতীদাহ ঘাটের পাতালেশ্বর মন্দির বলেন।

 

এই মন্দিরে গর্ভগৃহে প্রবেশের আগে রয়েছে ছয় ফুট লম্বা বারান্দা। গর্ভগৃহের চারপাশেই এমন বারান্দা রয়েছে। গর্ভগৃহের দেওয়ালের বাইরে রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি। কোথাও রয়েছে শিব পার্বতীর মূর্তি। কোথাও বা অন্য দেব দেবীর মূর্তি। পাতালেশ্বর মন্দিরে এলে এই সব মূর্তির পুজোও করেন ভক্তরা। বারান্দা থেকে প্রায় দশ ফুট নীচে রয়েছে গর্ভগৃহের মেঝে ও শিবলিঙ্গ।

 

শিব ভক্তদের বিশ্বাস বাবা পাতালেশ্বরের কাছে যা মানত করা হয় সেই সব মনোস্কামনা পূরণ হয়।

জাগ্রত দেবাদিদেবের দর্শন পেতে সারাবছরই এখানে ভক্তদের সমাগম হয়। দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা নানা প্রার্থনা নিয়ে এই মন্দিরে শিবের দর্শনে আসেন।বিশেষ করে শ্রাবন এবং চৈত্র মাসে ভিড় হয় বেশি।

 

এই শ্রাবন মাস জুড়ে শিব মহিমা এবং বাংলার শিব মন্দির গুলি নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চলতে থাকবে।ফিরে আসবো আগামী পর্বে শিব মাহাত্ম নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মাহাত্ম – চন্দ্রচুড় শিব

শিব মাহাত্ম – চন্দ্রচুড় শিব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের শিব মাহাত্ম পর্বে আপনাদের আসানসোলের চন্দ্রচুড় শিব মন্দিরের কথা জানাবো। এই মন্দির বর্ধমানের অন্যতম প্রাচীন এবং প্রসিদ্ধ শিব মন্দির। শিব রাত্রি এবং নীল ষষ্টির সময়ে এই শিব মন্দিরকে কেন্দ্র করে এখানকার মানুষ উৎসবে মেতে ওঠেন।

 

আসানসোল শহর থেকে১১কিলোমিটার দূরে ১৯ নম্বার জাতীয় সড়কের পাশে এই মন্দির স্থাপিত রয়েছে।মন্দিরের বয়স আনুমানিক সাড়ে তিনশো বছর।

 

আসানসোলের চন্দ্রচূড় শিব মন্দিরকে নিয়ে অনেক রকম কাহিনী প্রচলিত রয়েছে।কিভাবে এই শিব লিঙ্গ পাওয়া গেলো এবং মন্দির তৈরী হলো তা নিয়েও আছে এক ঘটনার উল্লেখ।শোনা আজ থেকে বহু বছর আগে যখন এই অঞ্চলে শিল্পাঞ্চল রূপে গড়ে ওঠেনি তখন এই অঞ্চলে চাষ বাসই ছিলো প্রধান জীবিকা। বেশি ভাগ এলাকা ছিলো কৃষি জমি এবং বন জঙ্গলে ভর্তি সেই সময়

একজন কৃষক একদিন মাঠে লাঙল চালাতে

গিয়ে হটাৎ লক্ষ্য করেন তার লাঙ্গল একটা কিছুতে আটকে গেছে। মাটি খুঁড়ে তিনি একটি পাথরের শিব লিঙ্গ পান।তিনি সেই শিবলিঙ্গ উদ্ধার করেন। তারপর গ্রাম বাসিদের চেষ্টায় সেই শিব লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করা হয়। তৈরি করা হয় মন্দির। মন্দির তৈরির পর থেকে প্রতিদিন বেড়েছে ভক্ত সমাগম। মন্দির পরিচালনার জন্য তৈরী হয়েছে বিশেষ কমিটি।

 

বর্তমানে জেলার অন্যতম পুরনো এবং বড় শিব মন্দির এই আসানসোলের চন্দ্রচূড় মন্দির। সারা বছরই এই মন্দিরে শিব ভক্তদের আনাগোনা লেগে থাকে। বিশেষ করে শ্রাবণ মাসের সোমবার। তাছাড়া শিবরাত্রি তিথিতে চন্দ্রচূড় মন্দিরে প্রচুর সংখ্যক ভক্তদের সমাগম হয়। এই সময় গুলিতে সংসারের মঙ্গল কামনায় বহু মানুষ চন্দ্রচুড় শিবের আরাধনা করেন।শুধু বাংলা নয় পার্শ্ববর্তী রাজ্যযেমন ঝাড়খন্ড, বিহার থেকেও প্রচুর মানুষ চন্দ্রচুড় শিবের পুজো করতে আসেন।

 

আবার পরবর্তী পর্বে শিব মাহাত্ম নিয়ে ফিরে আসবো। থাকবে বাংলার আরো একটি প্রাচীন শিব মন্দিরের ইতিহাস। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।