Home Blog Page 62

পয়লা বৈশাখের শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন

পয়লা বৈশাখের শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

যতই ইংরেজি নিউ ইয়ার নিয়ে মাতামাতি হোক বাংলির সাথে বাংলা নববর্ষর রয়েছে এক আবেগের সম্পর্ক আত্মার সম্পর্ক।

 

ব্যবসা বাণিজ্যর ক্ষেত্রে পয়লা বৈশাখের ভূমিকা রয়েছে|এক সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব বই বোঝানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাঠের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকনদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন আপ্যায়ন করে থাকে। এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে। বিশেষ করে বড় বাজার, নিউ মার্কেট বা বই পাড়ায় এই ঐতিহ্য আজও টিকে আছে।

 

যদিও আরো একটু পিছিয়ে যাই দেখা যাবে জমিদারির যুগে পয়লা বৈশাখ মানে ছিলো খাজনা আদায়ের শুরু, নতুন ফসল বেচে কৃষকদের হাতে অর্থ আসতো এবং তারা উৎসবে মেতে উঠতেন

আবার ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রুপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে|

 

সনাতন ধর্মে বৈশাখ মাসকে মাধব মাস বা

মধুসূদন মাস বলা হয় যার অর্থ ভগবান কৃষ্ণের মাস। এই মাসে ভগবান বিষ্ণুর আরাধনা করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।বৈশাখ মাসে গঙ্গায় অর্ঘ্য দান করলেন এবং গঙ্গা স্নান করলে নানাবিধ সমস্যা থেকে মুক্তি লাভ হয়।জ্যোতিষ শাস্ত্রের দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে “বৈশাখ” শব্দটি এসেছে বিশাখা নামক নক্ষত্রের নাম থেকে। এই মাসে বিশাখা নক্ষত্রটিকে সূর্যের খুব কাছে দেখা যায়।আগেই বলেছি  এই মাস কৃষ্ণের প্রিয় মাস।বৈশাখ মাসে গীতা পাঠ বা শ্রবণ করা উচিত।তাতে আধ্যাত্মিক উন্নতি হয় ও ভগবানের বিশেষ আশীর্বাদ লাভ হয়।

 

সবাইকে জানাই শুভ নববর্ষ। সঙ্গে থাকুন।ফিরে আসবো পরের পর্বে। থাকবে একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে লেখা। পড়তে থাকুন ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

চড়ক এবং গাজন উৎসবের ইতিহাস

চড়ক এবং গাজন উৎসবের ইতিহাস

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাঙালির নব বর্ষের সূচনা হয় গাজন এবং চড়ক উৎসবের মধ্যে দিয়ে। এই গাজন এবং চড়ক দুটি বেশ প্রাচিন কাল থেকেই বঙ্গদেশে প্রচলিত। শিব পার্বতী ছাড়াও বহু লৌকিক দেব দেবী এই উৎসবে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।

 

কেউ বলেন গর্জন থেকে গাজন, কেউ বলেন ‘গাঁয়ের জন’-এর উৎসব থেকে গাজন।প্রকৃত অর্থ যাই হোক দুটি অর্থই বেশ মানানসই।কারন এককালে ঢাকের বাদ্যি, ভোলা মহেশ্বরের নামে সন্ন্যাসীদের গর্জন ও গাজনগীতিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠতো বাঙালি মেতে ওঠে গাজন উৎসবে।পরবর্তী শহর অঞ্চলে

এই উৎসব কিছুটা জৌলুস হারালেও আজও গ্রাম গঞ্জের মানুষের কাছে পয়লা বৈশাখী আমেজ মানেই গাজন এবং চড়ক উৎসব।

 

চৈত্র মাস হল শিব-পার্বতীর বিবাহের মাস। এই মাসেই তাই গাজনের ধুম। এই গাজনের মাধ্যমে শিব ভক্তরা তাদের আরাধ্য মহাদেব কে এবং দেবী পার্বতীকে স্মরণ করেন।গাজনের শেষ দিনের অনুষ্ঠান চড়ক যা এই উৎসবেরই একটি অঙ্গ।

 

এককালে কলকাতার বাবুরা ঘটা করে চড়ক উৎসব পালন করতো।বাগবাজারের এই চড়ক ছিল কলকাতার বিখ্যাত ও সর্বপ্রধান চড়ক। চড়ক গাছের সঙ্গে উপর উপর চারটি মাচান বেঁধে তার মাঝখানে এক জন করে মহাদেব সাজিয়ে চার কোণে চার জন করে মোট ষোলো জনকে পিঠ ফুঁড়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হত। পিছিয়ে ছিলোনা জেলা গুলির। কোথাও মুখোশ নাচ কোথাও সন্ন্যাসীদের কঠিন সাধনার মাধ্যমে এই উৎসব পালিত হতো।

বিশেষ করে উত্তর বঙ্গে গম্ভীরা রূপে পালন হতো এই উৎসব।

 

পরবর্তীতে শারীরিক নৃশংসতার কারণে কোথাও কোথাও গাজনের কিছু উপাচার নিষিদ্ধ হয়। তবে সন্ন্যাসীদের নিষ্ঠা এবং ভক্তি অটুট থাকে। আজও বাংলা জুড়ে গাজন এবং চড়কের মেলা বসে।আনন্দ এবং উৎসাহ আগের মতোই আছে।

 

আপনাদের সবাইকে জানাই গাজন এবং চড়ক উৎসবের অনেক শুভেচ্ছা এবং শুভ নববর্ষ। ভালো থাকুন। সঙ্গে থাকুন। ফিরে আসবো আগামী পড়বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নীলষষ্টির পৌরাণিক ব্যাখ্যা

নীলষষ্টির পৌরাণিক ব্যাখ্যা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

তিথি অনুসারে আজ নীল ষষ্ঠী বাঙালিরা সারা বছর যতগুলি ব্রত পালন করে তারমধ্যে অন্যতম হল নীল ষষ্ঠীর ব্রত।দুরকম ভাবে এই দিনটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা যায় একটি লৌকিক মতে দ্বিতীয়টি পৌরাণিক মতে।আজ নীল ষষ্ঠীর এই দুটি দিক নিয়ে লিখবো।

 

পুরান মতে দেবাদিদেব শিবের অপর নাম নীলকণ্ঠ বা নীল কারন সমুদ্র মন্থণের সময় উঠে আসা বিষ পান করে তার কণ্ঠ নীল বর্ণের হয়ে যায়।আবার বহু বৈষ্ণব মনে করেন আসলে শিব পরম বৈষ্ণব এবং স্বয়ং শ্রী কৃষ্ণ শিবের কণ্ঠে বিরাজ করছেন তাই তিনি নীল কণ্ঠ। শিবের এই রূপেরই পুজো হয় নীল ষষ্ঠীতে।

 

শাস্ত্র মতে এই তিথিতে শিবের সঙ্গে নীলচণ্ডিকা বা নীলাবতী পরমেশ্বরীর অনুষ্ঠিত হয়।দক্ষযজ্ঞে দেহত্যাগের পর সতী পুনরায় নীলধ্বজ রাজার গৃহে আবির্ভূতা হয়ে ছিলেন এবং রাজা তাঁকে নিজের মেয়ের মতো করে বড় করে শিবের সঙ্গে ফের বিয়ে দেন ৷ সেই বিবাহের তিথি উদযাপন করা হয় নীল পূজায়।এদিক দিয়ে নীলাবতীর

স্বামী রূপে শিব আজ পূজিত হন।

 

পৌরাণিক ব্যাখ্যার বাইরে যে লৌকিক ব্যাখ্যা আছে নীল ষষ্ঠী নিয়ে সেখানে একটি

ব্রত কথার উল্লেখ পাওয়ার যায়।সেই ব্রত কথা অনেকটা এই রকম – এক গ্রামে এক ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী ছিলেন।তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। মন দিয়ে ঈশ্বরের আরাধনা করলেও তাঁদের সব ছেলে-মেয়েগুলি একে একে মারা যায়। এই ঘটনায় ঈশ্বরের উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন ব্রাহ্মণী। তাঁরা দু-জনে ঘরবাড়ি ছেড়ে মনের দুঃখে কাশীবাসী হন। কাশীতে গিয়ে একদিন গঙ্গায় স্নান সেরে মণিকর্ণিকা ঘাটে বসে আছেন, হঠাত্‍ই এক বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীকে তাদের দেখা দিয়ে একটি উপদেশ দেন। তিনি বলেন – চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন নির্জলা উপবাস রেখে মহাদেবের পুজো করবে। সন্ধেবেলা শিবের সামনে বাতি দিয়ে তবেই জল খাবে।’ ষষ্ঠীবুড়ির কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে ফের সন্তান লাভ করেন ওই নিঃসন্তান ব্রাহ্মণ দম্পতি। ব্রত কথা অনুসারে আসলে ওই বৃদ্ধা ছিলেন মা ষষ্ঠী। এবং সেই থেকে মর্তে নীল ষষ্ঠীর ব্রত প্রচলিত হয়।

 

নীল ষষ্ঠীর ব্রত যারা করেন তারা সারাদিন নির্জলা উপোস রেখে সন্ধের পর শিবলিঙ্গে জল ঢেলে, মহাদেবের পুজো করেন এবং প্রসাদ খেয়ে তবে উপবাস ভঙ্গ করেন। সাধারণত গ্রাম বাংলায় আমাদের মায়েরা এই ব্রত করেন সংসারের এবং বিশেষ করে সন্তানের কল্যাণের জন্য।

 

সবাইকে জানাই নীল ষষ্ঠীর শুভেচ্ছা।

ফিরে আসবো পরের পর্বে।

থাকবে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে আরো একটি বিশেষ তথ্য সমৃদ্ধ লেখা।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার শিব – শ্যামলেশ্বর শিব মন্দিরের ইতিহাস

বাংলার শিব – শ্যামলেশ্বর শিব মন্দিরের ইতিহাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শুরু হতে চলেছে নীল ষষ্ঠীর পুজো এই সময়

সারা বিশ্বের শিব ভক্তদের কাছে অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। আজ এই পবিত্র সময়ে আপনাদের বাংলার আরো এক প্রাচীন শিব মন্দিরের ইতিহাস জানাবো।

 

বাংলা ওড়িশা সীমান্ত এলাকার দাঁতনে আছে হাজার বছরের প্রাচীন শ্যামলেশ্বর শিব মন্দির। পাথরের তৈরি এই মন্দিরে রয়েছে ইতিহাসের নানা নিদর্শন। এই দেবালয় আনুমানিক হাজার বছরের আগে নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরের স্থাপত্যটি বেশ আকর্ষণীয়। প্যাগোডার আদলের ছোঁয়া আছে। মন্দিরটির আদলে প্রাচীনত্বের নানা ছাপ আছে। প্রবেশপথের সামনে কষ্টিপাথরে নির্মিত নন্দী মূর্তিটি অপূর্ব সুন্দর।এই মন্দির চত্বরে ইতিহাসের নানা নিদর্শন আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যা শ্যামলেশ্বর মন্দিরের প্রাচীনত্বর প্রমান।

 

মন্দিরের প্রতিষ্ঠালিপি না থাকায় মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা কে করেছিলেন তা সঠিক জানা যায় না। জানা যায় না প্রতিষ্ঠার সময়কাল।তবে ঐতিহাসিক দের দাবি সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল। একটি মত অনুসারে ওড়িশার সূর্যবংশীয় নৃপতি গজপতি মুকুন্দদেব ষোড়শ শতাব্দীর শেষার্ধে মন্দিরটি শিব মন্দির টি নির্মাণ করেছিলেন। মন্দিরের চারপাশ পাথরের তৈরি প্রায় দশ ফুটের উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ভিতরের অঙ্গনটির আয়তন ১৩,৮৮৩ বর্গফুট।

 

প্রায় ফুট চারেক উঁচু একটি ভিত্তির উপর মন্দিরটি স্থাপিত। মন্দিরের অলঙ্করণ হিসাবে দেখা যায় মূল প্রবেশপথের সামনে একটি নন্দীমূর্তি যার কথা আগেই বলেছি এছাড়াও সামনের দ্বারপথের মাথায় ভগবান বিষ্ণুর অনন্তসজ্জায় সায়িত রূপ খোদাই করা আছে।

 

এই মন্দিরে প্রতিদিন বহু ভক্ত ভিড় জমান। তবে বছরে বেশ কিছু বিশেষ দিনে বেশি ভিড় হয়।

যার মধ্যে অন্যতম এই নীল ষষ্ঠী।এই সময় অসংখ্য ভক্ত আসেন তাদের আরাধ্য শিবের বিশেষ পুজোয় অংশ নিতে।

 

নীল ষষ্ঠী এবং গাজন উৎসব নিয়ে আগামী দিন গুলিতে বিশেষ আধ্যাত্মিক আলোচনা করবো।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ

বাংলার শিব – সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দিরের ইতিহাস

বাংলার শিব – সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দিরের ইতিহাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের পর্বে আপনাদের বীরভূম জেলার মল্লারপুরে অবস্থিত মল্লারপুর বা সিদ্ধেশ্বর শিবমন্দিরের ইতিহাস এবং পৌরাণিক তাৎপর্য সম্পর্কে নিয়ে লিখবো।

 

এখানে বিরাজ করছে গুপ্ত অনাদি অখণ্ড শিবলিঙ্গ। প্রায় ৯৩০ বছর আগে ১২০২ খ্রিস্টাব্দে মল্লারপুরের রাজা ছিলেন মল্লেশ্বর। তিনি এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই শয়ম্ভু শিবই

নাকি তারাপীঠের দেবী তারার ভৈরব।

 

মহাভারতের পাণ্ডবজননী কুন্তী এখানেই মহাদেবের পূজা করেছেন। মহালিঙ্গেশ্বর তন্ত্র, যেখানে স্বয়ম্ভূ শিবমন্দিরের তালিকা আছে, সেখানেও সিদ্ধিনাথ নামে এখানকার ওঁ আকৃতির মহাদেবের উল্লেখ আছে। এই মন্দির এমন এক তীর্থ যেখানে পুরাণ ও ইতিহাস একসাথে মিশে গেছে।

 

এখানকার শিবলিঙ্গ গুপ্ত। আর, তার ওপরে রয়েছে ওঁ চিহ্ন। মল্লেশ্বর শিবমন্দিরের পাশের মন্দিরেই রয়েছেন দেবী মল্লেশ্বরী বা সিদ্ধেশ্বরী। এই মল্লেশ্বর শিব মন্দিরের পিছনে তান্ত্রিকাচার্য শ্রীকৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের জীবন্ত সমাধি বা ইচ্ছাসমাধির বেদী রয়েছে। এই কৃষ্ণানন্দই ছিলেন কালীসাধক রামপ্রসাদের গুরুদেব।তিনি

বৃহৎতন্ত্রসার গ্রন্থ রচনা করে প্রসিদ্ধ হয়ে ছিলেন।

 

এই মন্দিরের কারুকাজ এবং সৌন্দর্য এক কথায় অপূর্ব। শিব ভক্তদের বিশ্বাস এখানকার শিবলিঙ্গে সাধকদের সাধনার মাধ্যমে ওঁ চিহ্ন তৈরি হয়েছে। যে চিহ্নে রয়েছে মহাদেবের তিন নয়নও।এই মন্দির চত্বরে রয়েছে চারচালা রীতি মেনে স্থাপিত আরও কিছু মন্দির।

 

এই মন্দির তৈরির পর থেকে সেবাইতরা বংশ পরস্পরায় এখানে পুজো করে আসছেন। অন্যান্য শিবলিঙ্গ মাটির ওপরে থাকে। এখানে শিবলিঙ্গের বেশিটাই রয়েছে মাটির নীচে। তাই একে গুপ্ত শিবলিঙ্গ বলা হয়। এখানে শিবকে মাটি খুঁড়ে পাওয়া গিয়েছে বা স্বয়ং প্রকট হয়েছেন দেবাদিদেব এই শিবলিঙ্গ আলাদা করে এনে

প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।

 

এখানে শিব লিঙ্গের চার পাশে বিশেষ বিশেষ সময়ে জল লক্ষ করা যায়।শিবলিঙ্গকে ঘিরে যে জলধারা অবস্থান করছে তা আসলে গঙ্গা।শুধু জল নয় মাঝে মাঝে শিবের অনুচর নাগ দেবতার দর্শন ও পাওয়া যায়।

 

ফিরে আসবো বাংলার শিব নিয়ে আরো একটু পর্বে। আগামী দিনে। যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার শিব – পাতালেশ্বর শিব মন্দিরের মাহাত্ম

বাংলার শিব – পাতালেশ্বর শিব মন্দিরের মাহাত্ম

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার প্রাচীন এবং প্রসিদ্ধ শিব মন্দির গুলির মধ্যে অন্যতম একটি শিব মন্দির হলো মুর্শিদাবাদের জাগ্রত পাতালেশ্বর শিবমন্দির।

আজকের বাংলার শিব পর্বে এই পাতালেশ্বর শিব মন্দিরের মাহাত্ম নিয়ে লিখবো।

 

একসময় নাকি এখানে একশো আটটি শিব মন্দির ছিল। তার মধ্যে এখন কেবলমাত্র এই একটি মন্দিরই টিকে আছে।এখানকার শিবলিঙ্গ স্বয়ম্ভূ জ্যোতির্লিঙ্গ। শিবলিঙ্গটি যেহেতু পাতাল থেকে মাটি ভেদ করে উঠে এসেছে তাই এখানকার শিবলিঙ্গের নাম দেওয়া হয়েছে পাতালেশ্বর। শিবলিঙ্গকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে মন্দির। প্রায় তিনশো বছর ধরে এখানে শিবের আরাধনা হয়ে আসছে।

 

এই মন্দির বহু প্রাচীন। স্থাপনার সঠিক দিন ক্ষণ নিয়ে মত পার্থক্য আছে তবে একাধিকবার সংস্কার করা হয়েছে এবং মন্দিরে প্রবেশের মুখে প্রায় চল্লিশ ফুট উচ্চতার একটি শিবমূর্তি তৈরি করা হয়েছে। প্রাচীর দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে সমগ্র জায়গাটি। তৈরি হয়েছে সুন্দর বাগান। পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে কাটিগঙ্গা নদী। তা যাতে মন্দিরের কোনও ক্ষতি করতে না-পারে সেজন্য বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে ঘাট।সব। মিলিয়ের নির্মল এবং মনোরম পরিবেশ।

 

এই মন্দিরে গর্ভগৃহে প্রবেশের আগে রয়েছে ছয় ফুট লম্বা বারান্দা। গর্ভগৃহের চারপাশেই এমন বারান্দা রয়েছে। গর্ভগৃহের দেওয়ালের বাইরে রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি। কোথাও রয়েছে শিব পার্বতীর মূর্তি। কোথাও বা অন্য দেবতার মূর্তি। এই সব মূর্তির পুজোও করেন ভক্তরা। বারান্দা থেকে প্রায় ১০ ফুট নীচে রয়েছে গর্ভগৃহের মেঝে ও শিবলিঙ্গ। ভক্তদের বিশ্বাস এখানে শিবের কাছে যা মানত করা হয় অথবা তাঁর কাছে হাতজোড় করে যা চাওয়া হয়, সেই সব কামনা পূরণ হয়।

 

জাগ্রত দেবাদিদেবের দর্শন পেতে সারাবছরই এখানে ভক্তদের সমাগম হয়। দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা নানা প্রার্থনা নিয়ে এই মন্দিরে শিবের দর্শনে আসেন।বিশেষ করে শ্রাবন এবং চৈত্র মাসে

ভিড় হয় বেশি।

 

চৈত্র মাস জুড়ে শিব মহিমা এবং বাংলার শিব মন্দির গুলি নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চলতে থাকবে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার শিব – জল্পেশ শিব মন্দিরের ইতিহাস

বাংলার শিব – জল্পেশ শিব মন্দিরের ইতিহাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার শিব পর্বে আজ উত্তর বঙ্গের বিখ্যাত এক শিব তীর্থর কথা উল্লেখ করবো|আজকের পর্বে বিখ্যাত জল্পেশ শিব মন্দির।

 

পশ্চিম বঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার প্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্র হল জল্পেশ মন্দির।এই মন্দিরের সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে।কোচবিহারের মহারাজা নরনারায়ণের বাবা বিশ্ব সিংহ ১৫২৪ সালে প্রথম এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।১৫৬৩ সালে মন্দিরটি পুনর্নির্মিত হয়। পরবর্তীতে ১৬৬৩ সালে রাজা প্রাণ নারায়ণও একবার মন্দিরটি নতুন করে গড়ে তোলেন।

 

জল্পেশ মন্দির প্রসঙ্গে একটি ভিন্ন তত্ত্বর অস্তিত্ব রয়েছে|কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন|জল্পেশ নামে কোনো এক প্রতাপশালী রাজবংশী ক্ষত্রিয় রাজা অথবা সর্দার এই অঞ্চলে এককালে শাসন করতেন । তাঁর নাম অনুসারে মন্দিরের নাম হয়েছে জল্পেশ।অনেকে মনে করেন হয়ত তিনি কোনো দৈব শক্তির অধিকারী ছিলেন। তাই তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁকে দেবতার স্থানে উন্নীত করা হয়েছে।

আবার অনেকে ভাবেন জল্পেশ হয়ত কোনো শক্তিশালী গ্রামদেবতা বা লৌকিক দেবতা ছিলেন পরে কোচবিহারের রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় শিবের সঙ্গে একীভূত হয়ে

তিনিই উত্তরবঙ্গের প্রধান দেবতা রূপে

স্বীকৃত হয়েছেন।জল্পেশ থেকেই জলপাইগুড়ি

নাম করণ হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়।

 

তবে শাস্ত্র মতে ভ্রামরী শক্তিপিঠের ভৈরব হলেন জল্পেশ। শিব এখানে একটি গর্তের মধ্যে রয়েছেন, তাই তিনি অনাদি নামেও পরিচিত।তার আদি এবং অন্ত খুঁজে পাওয়া যায়না।

 

বাবা জল্পেশ্বর এর দর্শন পেতে বহু মানুষ এই স্থানে আসেন |বিশেষ করে শ্রাবন ও চৈত্র মাসে দর্শণার্থী দের ভিড় বেশি হয়। শিব রাত্রি এবং নীল ষষ্ঠীতে বিশেষ পুজো হয় এবং সব মিলিয়ে উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠেন শিব ভক্তরা |বাবা জল্পেশ পরম দয়ালু তিনি ভক্তদের মনোস্কামনা

পূর্ণ করেন বলেই বিশ্বাস।

 

বাংলার শিব নিয়ে আবার পরবর্তী পর্বে

ফিরে আসবো।থাকবে এমনই তথ্য সমৃদ্ধ আলোচন। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার শিব – কেশবেশ্বর শিব মন্দিরের কথা

বাংলার শিব – কেশবেশ্বর শিব মন্দিরের কথা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

সারা বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য শিব মন্দির। চৈত্র সংক্রান্তি তথা নীল ষষ্ঠী উপলক্ষে প্রায় সবগুলি মন্দিরই বিশেষ সাজে সেজে ওঠে।

তেমনই একটি মন্দির দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কেশবেশ্বর শিব মন্দির যা নিয়ে আজকের পর্ব।

 

বিখ্যাত সাবর্ণ রায় চৌধুরী বংশের অন্যতম সদস্য ছিলেন জমিদার কেশবরাম রায় যিনি ছিলেন তৎকালীন বঙ্গ সমাজের অন্যতম গুণী ও সন্মানীয় ব্যাক্তি। কেশবরাম কাশীর বিশ্বনাথের স্বপ্নদর্শনে যে সন্তান লাভ করেছিলেন তাঁর নাম রাখেন শিবদেব, যিনি সন্তোষ রায় চৌধুরী নামে পরিচিত। কেশবরাম রায় ১৬৯৯ সালে ঔরঙ্গজেবের কাছ থেকে স্বতন্ত্র ‘রায় চৌধুরী’ খেতাব পেয়েছিলেন সেই থেকে তারা রায় চৌধুরী পদবি

ব্যাবহার করছেন।

 

ব্রিটিশ আমলে সমগ্র দক্ষিণবঙ্গের সমাজপতি কেশবরাম দক্ষিণ ২৪ পরগনার মন্দিরবাজারে যে শিবমন্দির এবং শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে যান তার কেশবরামের নামানুসারে নাম হয় কেশবেশ্বর।

মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছেন মহাদেব, লোকমুখে শোনা যায় যে কাশী থেকে আনা হয়েছিল এই শিবলিঙ্গ। শিবমন্দির প্রায় ৬০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটি আটচালা মন্দির। মন্দিরের ২১টি সিঁড়ির মধ্যে ১৬টি ধাপের সিঁড়ির বেশি ভাগই ইতিমধ্যেই মাটির তলায় লীন হয়েছে। সামান্য কয়টি সিঁড়ি দেখা যায়।বিশাল নন্দী মূর্তিও রয়েছে এখানে।

 

প্রায় সারা বছরই এই মন্দিরে জন সমাগম হয় তবে শিবরাত্রির দিন এবং চৈত্র মাসেরশেষে নীল ষষ্ঠীর সময়ে বিশেষ পূজা হয় কেশবেশ্বর মন্দিরে।সেই সময়ে বিশাল সংখ্যক ভক্তসমাগম ঘটে এই মন্দির চত্বরে।বহু মানুষ আসেন নিজের মনোস্কামনা নিয়ে। শোনা যায় বাবা কেশবেশ্বর তার ভক্তদের খালি হাতে ফেরান না।বহু মানুষের জীবনের দুঃখ কষ্ট বাবা কেশবেশ্বর দুর করেছেন বলে জানা যায়।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। চৈত্র মাসের এই বিশেষ কয়েকটি দিনে বাংলার প্রাচিন এবং ঐতিহ্য সম্পন্ন শিব মন্দির গুলি নিয়ে

ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা চলতে

থাকবে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার শিব – বাবা বানেশ্বর ধামের মাহাত্ম

বাংলার শিব – বাবা বানেশ্বর ধামের মাহাত্ম

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বহু প্রাচীন শিব মন্দির রয়েছে এই বাংলার বিভিন্ন স্থানে। পুরুলিয়া জেলায় বাবা বানেশ্বর ধাম তার মধ্যে অন্যতম। শুধু পুরুলিয়া জেলা নয়, পার্শ্ববর্তী রাজ্য ঝাড়খণ্ড থেকেও বহু পুণ্যার্থীরা এই মন্দিরে ছুটে আসেন মহা শিবরাত্রি এবং নীল

ষষ্ঠী উপলক্ষে।আজকের পর্বে লিখবো এই শিব মন্দির নিয়ে।

 

এককালে জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল মন্দির চত্বর।বন্যা জন্তু এবং দস্যুদের ভয়ে সেই সময় এই স্থানে কেউ প্রবেশ করতো না। বাবা বানেশ্বর পাতাল ফুঁড়ে এখানে আবীরভূত হয়েছিলেন অর্থাৎ তিনি স্বয়ম্ভু। তার আবির্ভাবের পরে পাতকুমের মহারাজ স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই মন্দির স্থাপন করেন এবং পুজো শুরু করান পরবর্তীতে পুরুলিয়ার কাশিপুরের মহারাজ এই মন্দির সংস্করণ করেন। মন্দির পরিচালনার জন্য সমস্ত ব্যবস্থা করেছিলেন কাশীপুরের মহারাজ।

 

তারপর রাজ পরিবারের সূর্য যখন অস্থামিত এবং মন্দির যখন ক্রমশঃ তার জৌলুস হারাচ্ছে সেই সময়ে উত্তর কাশি থেকে একজন সাধু আসেন তার নাম স্বামী শিবানন্দপুরী মহারাজ। তিনি এই মন্দিরে এসে মন্দির সংস্কার করে মন্দিরটিকে সুন্দর করে সাজিয়ে তোলেন এবং এবার ধুম ধাম করে বাবা বানেশ্বরের পুজো শুরু হয়।

 

বর্তমানে দুটি ভাগে বিভক্ত রয়েছে মন্দির পরিচালনা কমিটি। দেহঘড়িয়া কমিটি যারা বানেশ্বরের সেবার কাজে জড়িত থাকেন ও অপরটি হল চক্রবর্তী ষোলআনা কমিটি যারা মন্দিরের পারিপার্শ্বিক দায়িত্বভার নেন।

 

কথিত আছে এই মন্দিরে ভক্তি ভরে পুজো দিলে সমস্ত মনোবাসনা পূরণ হয় ভক্তদের। তাই দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন বাবা বানেশ্বর ধামের মন্দিরে পুজো দিতে। আসন্ন নীল ষষ্ঠীতেও এই মন্দিরে বিশেষ পুজো অনুষ্ঠিত হবে প্রতিবারের ন্যায়।

 

ফিরে আসবো বাংলার শিব নিয়ে আগামী পর্বে। থাকবে আরো একটি শিব মন্দিরের কথা।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার শিব – অমৃতি শিব মন্দিরের ইতিহাস

বাংলার শিব – অমৃতি শিব মন্দিরের ইতিহাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ আপনাদের মালদার ইংরেজ বাজারে অবস্থিত অতি প্রসিদ্ধ এবং জাগ্রত অমৃতি শিব মন্দিরের কথা জানাবো ।

 

এককালে পারিবারিক এই মন্দির স্থাপিত হয় স্থানীয় দাস পরিবারের মাধ্যমে পরে গোটা উত্তর বঙ্গের মানুষের কাছে এই শিব মন্দির অন্যতম আস্থার স্থান হিসেবে গড়ে ওঠে। বিশেষত চৈত্র সংক্রান্তি বা নীল ষষ্ঠীর সময়ে এবং শ্রাবন মাসে শিব রাত্রির সময় এই মন্দির বহু শিব ভক্তের প্রধান গন্তব্য।

 

বাংলার ১৩৫৩ সনে এই শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দাস পরিবারের পূর্বপুরুষ মহানন্দ দাস। তিনি তখন এই এলাকার জমিদার বরাবরই শিব ভক্ত ছিলেন তিনি। একদিন স্বপ্নাদেশে মহাদেবের দর্শন পেয়েছিলেন জমিদার মশাই

তারপরই তিনি এই শিব মন্দির গড়ার পরিকল্পনা নেন। প্রতিষ্ঠার পর তাঁর হাত দিয়েই এই মন্দির পুজো শুরু হয়। সেই সময়ে মহানন্দবাবু নিজেই সেবায়েত ছিলেন।

 

এক সময় তার মাথায় চিন্তা এলো যে তার অবর্তমানে কি হবে। পুজো তো বন্ধ করা যাবেনা। তাই ভবিষ্যতে যাতে কোনও দিন অমৃতি শিব মন্দিরের পুজো বন্ধ না হয় সেই উদ্দেশ্যে চারশো বিঘা জমি তিনি দেবত্ব সম্পত্তি হিসেবে তিনি মন্দিরের নামে লিখে দেন। সেই সম্পত্তির আয় থেকে আজও এই মন্দিরে সব পরম্পরা বজায় রেখে শিব পুজো হয়ে আসছে। পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম ধারাবাহিক ভাবে পুজোর দায়িত্ব পালন করছেন।

 

এই অমৃতি শিব মন্দিরে মহাদেবের বিগ্রহের পাশাপাশি শিবলিঙ্গ রয়েছে। এই মন্দিরে অনেক ভক্ত এসে মানত করেন। পরবর্তীতে  মনস্কামনা পূরণের পর আবারও মহাদেবের কাছে এসে গঙ্গাজল ও দুধ দিয়ে শিব পুজো করে যান।

 

বাংলার জেলায় জেলায় এমন বহু শিব মন্দির আছে। তার মধ্যে এখনো অনেক শিব মন্দির নিয়ে আলোচনা বাকি আছে। ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।