Home Blog Page 63

শিব মাহাত্ম – ফুলেশ্বর শিব 

শিব মাহাত্ম – ফুলেশ্বর শিব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শিব মাহাত্মর আজকের পর্বে আপনাদের একটি অদ্ভুত শিব মন্দিরের কথা জানাবো যাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য অলৌকিক জনশ্রুতি বা ঘটনা

শোনা যায়।আজকের পর্বে ফুলেশ্বর শিব মন্দির।

 

ফুলেশ্বর মহাদেবের মন্দিরটি রয়েছে আমতার কুশবেড়িয়া অঞ্চলে।প্রায় তিনশো আশি বছরের প্রাচীন এই ফুলেশ্বর বাবার মন্দির যা বাবার ভক্তদের দ্বারা একাধিক বার সংস্কার হয়েছে।

কিভাবে এই মন্দির বা শিব লিঙ্গ স্থাপন করেছিল তা নিয়ে একটি কিংবদন্তী প্রচলিত আছে এই এলাকায়।

 

শোনা যায় বহু বছর আগে এই এলাকা ছিলো ঘন জঙ্গলে ঢাকা। তখন ডাকাত বা তান্ত্রিক সন্ন্যাসীরা ছাড়া বড়ো একটা কেউ আসতো না এদিকে।সেই জঙ্গলে নাকি স্থানীয় জমিদার বাড়ির কামধেনু গাই যেত নিয়ম করে এবং সেই কামধেনু গাই প্রতিদিন একটি শিলা মূর্তিতে দুধ দিয়ে আসত। এই ঘটনা স্বপ্নাদেশে জানতে পারেন জমিদার এবং তিনি সেখানে গিয়ে পাথর খণ্ডটি দেখে বুঝতে পারেন যে এটি আসলে একটি শয়ম্ভু শিবলিঙ্গ । তারপর আবার স্বপ্নাদেশ হয় এবং সেই স্থানে জমিদার নিজ অর্থ ব্যায়ে একটি সুন্দর শিব মন্দির নির্মাণ করে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিত্য পুজোর ব্যাবস্থা করেন।

 

এখানে আরো একটি অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করতে হয়।আগে বাবার মূর্তি প্রায় দু-ফুট উচ্চতায় জেগে ছিল। বর্তমানে ফুলেশ্বর বাবা প্রায় মাটির অনেকটা গভীরে অবস্থান করছেন। অনেকে মনে করেন মহাদেব ধীরে ধীরে পাতালে প্রবেশ করছেন।

 

এই মন্দিরের ভিতরে নাকি নিয়মিত জোয়ার ভাটা খেলে। রহস্যজনক ভাবে এই জল মন্দিরে আসে পাতাল থেকে এবং আবার যথা সময়ে পাতালেই মিলিয়ে যায়।প্রতিদিন দুপুরে মধ্য গগনে সূর্য অবস্থান করলে এবং সূর্যের রশ্মি বাবার মাথায় পড়লে তবেই পুজো শুরু হয়। এ ভাবেই চলে সারা বছর।দুবেলা পুজো হয় নিয়ম মেনে।

 

শ্রাবন মাস এবং চৈত্র সংক্রান্তি তে নীল ষষ্ঠীর দিন এই মন্দিরে জাঁকজমক করে পুজো হয়।বিশেষ পুজোর পর পাতাল থেকে উঠে আসে বাবা ফুলেশ্বরের চরণামৃত যা যা ভক্তদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া হয়।

 

শিব মাহাত্ম নিয়ে আবার ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে। অন্য একটি শিব মন্দিরের কথা নিয়ে আলোচনা হবে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মাহাত্ম – কেশবেশ্বর শিব

শিব মাহাত্ম – কেশবেশ্বর শিব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

এর আগে আপনাদের উত্তর বঙ্গের বিখ্যাত কয়েকটি শিব মন্দিরের কথা বলেছি আজ আপনাদের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কেশবেশ্বর শিব মন্দিরের ইতিহাস জানাবো।এই মন্দির নিয়ে প্রচলিত আছে বহু মিথ বা কিংবদন্তী।

 

বিখ্যাত সাবর্ণ রায় চৌধুরী বংশের অন্যতম সদস্য ছিলেন জমিদার কেশবরাম রায় যিনি ছিলেন তৎকালীন বঙ্গ সমাজের অন্যতম গুণী ও সন্মানীয় ব্যাক্তি এবং একনিষ্ট শিব ভক্ত। দীর্ঘদিন নিঃসন্তান থাকার পর কেশবরাম রায় বিশ্বনাথের কাছে সন্তান প্রার্থনা করেন এবং পরবর্তীতে বিশ্বনাথ কে স্বপ্নে দেখেন। এই ঘটনার কিছুকাল পরেই কেশব রাম এক পুত্র সন্তান লাভ করেছিলেনএবং তিনি তার নাম রাখেন শিবদেব পরবর্তীতে যিনি সন্তোষ রায় চৌধুরী নামে পরিচিত। কেশবরাম রায় মোঘল আমলে ঔরঙ্গজেবের কাছ থেকে স্বতন্ত্র ‘রায় চৌধুরী’ খেতাব পেয়েছিলেন সেই থেকে তারা রায় চৌধুরী পদবি ব্যাবহার করছেন।

 

ব্রিটিশ আমলে সমগ্র দক্ষিণবঙ্গের সমাজপতি কেশবরাম দক্ষিণ ২৪ পরগনার মন্দিরবাজারে যে শিবমন্দির এবং শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে যান তার কেশবরামের নামানুসারে নাম হয় কেশবেশ্বর।

 

মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছেন মহাদেব। লোকমুখে শোনা যায় যে কাশী থেকে আনা হয়েছিল এই শিবলিঙ্গ। শিবমন্দির প্রায় ৬০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটি আটচালা মন্দির। মন্দিরের ২১টি সিঁড়ির মধ্যে ১৬টি ধাপের সিঁড়ির বেশি ভাগই ইতিমধ্যেই মাটির তলায় লীন হয়েছে। সামান্য কয়টি সিঁড়ি দেখা যায়।বিশাল নন্দী মূর্তিও রয়েছে এখানে।

 

শোনা যায় এক কালে দুররোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত বহু মানুষ এই মন্দিরে আসতেন এবং আরোগ্য প্রার্থনা করতেন যাদের উপর বাবা কেশবেশ্বর কৃপা করতেন তারা সুস্থ্য হয়ে বাড়ি ফিরে যেতেন।

জনশ্রুতি আছে এই মন্দিরের নন্দী মূর্তি গভীর রাতে জীবন্ত হয়ে মন্দির চত্বরে বিচরণ করতো।

 

প্রায় সারা বছরই এই মন্দিরে জন সমাগম হয় তবে শ্রাবন মাসে এবং বিশেষ করে শিব রাত্রিতে এছাড়া চৈত্র মাসেরশেষে নীল ষষ্ঠীর সময়ে বিশেষ

পূজা হয় ।সেই সময়ে বিশাল সংখ্যক ভক্ত সমাগম ঘটে এই মন্দির চত্বরে।বহু মানুষ আসেন নিজের মনোস্কামনা নিয়ে। শোনা যায় বাবা কেশবেশ্বর তার ভক্তদের খালি হাতে ফেরান না।বহু মানুষের জীবনের দুঃখ কষ্ট বাবা কেশবেশ্বর দুর করেছেন বলে শিব ভক্তদের বিশ্বাস।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে আবার এক প্রাচীন শিব মন্দিরের কথা নিয়ে।শিব মাহাত্ম নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা

চলতে থাকবে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মাহাত্ম – জল্পেশ শিব

শিব মাহাত্ম – জল্পেশ শিব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শিব মাহাত্মর এই পর্বে উত্তর বঙ্গের বিখ্যাত এক শিব তীর্থর কথা উল্লেখ করবো|আজকের পর্ব বিখ্যাত জল্পেশ শিব মন্দির নিয়ে ।এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু কিংবদন্তী এবং অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ আছে।

 

পশ্চিম বঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার প্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্র হল জল্পেশ মন্দির।এই মন্দিরের সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে।কোচবিহারের মহারাজা নরনারায়ণের বাবা বিশ্ব সিংহ ১৫২৪ সালে প্রথম এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।১৫৬৩ সালে মন্দিরটি পুনর্নির্মিত হয়। পরবর্তীতে ১৬৬৩ সালে রাজা প্রাণ নারায়ণও একবার মন্দিরটি নতুন করে গড়ে তোলেন বা সংস্কার করেন।

 

জল্পেশ মন্দির প্রসঙ্গে একাধিক তত্ত্বর অস্তিত্ব রয়েছে|কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন|জল্পেশ নামে কোনো এক প্রতাপশালী রাজবংশী ক্ষত্রিয় রাজা অথবা সর্দার এই অঞ্চলে এককালে শাসন করতেন । তাঁর নাম অনুসারে মন্দিরের নাম হয়েছে জল্পেশ।অনেকে মনে করেন হয়ত তিনি কোনো দৈব শক্তির অধিকারী ছিলেন। তাই হয়তো

তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁকে দেবতার স্থানে উন্নীত

করা হয়েছে।

 

আবার অনেকে ভাবেন জল্পেশ হয়ত কোনো শক্তিশালী গ্রামদেবতা বা লৌকিক দেবতা ছিলেন পরে কোচবিহারের রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় শিবের সঙ্গে একীভূত হন এবং তিনিই উত্তরবঙ্গের প্রধান দেবতা রূপে স্বীকৃত হয়েছেন।

এবং পরবর্তীতে জল্পেশ থেকেই জলপাইগুড়ি

নাম করণ হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়।

 

তবে শাস্ত্র অন্য কথা বলে। উত্তর বঙ্গের অন্যতম প্রসিদ্ধ শক্তি পীঠ হলো ভ্রামরী দেবীর মন্দির এবং ভ্রামরী শক্তিপিঠের ভৈরব হলেন জল্পেশ। শিব এখানে একটি গর্তের মধ্যে রয়েছেন তাই তিনি অনাদি নামেও পরিচিত।তার আদি এবং অন্ত খুঁজে পাওয়া যায়না। তিনি শয়ম্ভু।

 

বেশ কিছু কাল আগে জল্পেশ মন্দির সংলগ্ন এক স্থানে খনন করার সময় আরো একটি শয়ম্ভু অনাদি শিব লিঙ্গ উদ্ধার করা হয় যা নিয়ে সেই সময় বেশ আলোচনা হয়।

 

সব মিলিয়ে জল্পেশ শিব মন্দির গোটা বাংলার মানুষের কাছেই অত্যন্ত প্রসিদ্ধ এবং জাগ্রত একটি শৈব্য তীর্থ।বাবা জল্পেশ্বর এর দর্শন পেতে বহু মানুষ এই স্থানে আসেন |বিশেষ করে শ্রাবন ও চৈত্র মাসে দর্শণার্থী দের ভিড় বেশি হয়। শিব রাত্রি এবং নীল ষষ্ঠীতে বিশেষ পুজো হয় এবং মেলা বসে। এই সময়ে উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠেন শিব ভক্তরা। শোনা যায় বাবা জল্পেশ পরম

দয়ালু তিনি ভক্তদের সব মনোস্কামনা পূর্ণ করেন।

 

শিব মাহাত্ম নিয়ে আবার পরবর্তী পর্বে

ফিরে আসবো।থাকবে এমনই তথ্য সমৃদ্ধ আলোচন। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মাহাত্ম – বঙ্গেশ্বর মহাদেব

শিব মাহাত্ম – বঙ্গেশ্বর মহাদেব

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলায় যে সমস্ত শৈবক্ষেত্রগুলি রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রসিদ্ধ হাওড়ার বঙ্গেশ্বর শিব মন্দির। বয়সে খুব বেশি প্রাচীন না হলেও এই শিব মন্দিরে মাহাত্ম কিছু কম নয় ।তার কয়েকটি কারন আছে। আজকের পর্বে সেই দিকগুলি নিয়ে বিস্তারিত ভাবে লিখবো।

এই মন্দিরের বিশেষত্ব হল ভোলেনাথের একান্ন ফুট উঁচু মূর্তি।এতো বিশাল এবং এতো উঁচু শিব মন্দির বাংলায় খুব কমই চোখে পড়ে।রাষ্ট্রপতি থাকা কালীন প্রণব মুখোপাধ্যায় একান্ন

ফুট উঁচু এই শিব মূর্তি উন্মোচন করেন।

দ্বিতীয় বিশেষত্ব হলো বঙ্গেশ্বর মহাদেব মন্দির প্রাঙ্গণে বারো টি জ্যোতির্লিঙ্গের একটি মন্দির তৈরি করা হয়েছে।যারা সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করতে পারেন না তারা এই বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির এই স্থানে একত্রে দর্শন করে পুন্য লাভ করে থাকেন।

এই মন্দিরে মহাদেবের জলাভিষেকের আলাদা মাহাত্ম আছে।শ্রাবণ মাস শুরু হওয়ার পর থেকেই ভক্তদের ঢল নামে এই মন্দিরে। সোমবারে তো অবশ্যই এছাড়াও প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে আসেন কাতারে কাতারে ভক্ত। তাঁরা জল ঢালেন বাবার মাথায়। চলে বিশেষ পুজোপাঠ। ভগবান মহাদেবকে মনের প্রার্থনা জানান ভক্তরা।

প্রত্যকের একটাই আশা জলাভিষেকের মাধ্যমে বাবা মহাদেবকে তুষ্ট করা ও তাঁর আশীর্বাদ পাওয়া।

এই বঙ্গেশ্বর মহাদেব অতি দয়ালু এবং

ভক্তবৎসল। তিনি অল্পেই তুষ্ট হন এবং তার সব

ভক্তের মনোস্কামনা পূর্ণ করেন বলেই বিশ্বাস।

আগামী পর্বে আবার অন্য এক শিব

মন্দিরে ইতিহাস এবং তার মাহাত্ম নিয়ে

ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মাহাত্ম – সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দিরের ইতিহাস 

শিব মাহাত্ম – সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দিরের ইতিহাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শিব মাহাত্মর আজকের পর্বে আপনাদের বীরভূম জেলার মল্লারপুরে অবস্থিত বিখ্যাত সিদ্ধেশ্বর শিবমন্দিরের ইতিহাস এবং তার পৌরাণিক তাৎপর্য সম্পর্কে নিয়ে আলোচনা করবো।

 

শোনা যায় মহাভারতের পাণ্ডবজননী কুন্তী এখানেই মহাদেবের পূজা করেছেন। মহালিঙ্গেশ্বর তন্ত্র যেখানে স্বয়ম্ভূ শিবমন্দিরের তালিকা আছে, সেখানেও সিদ্ধিনাথ নামে এখানকার ওঁ আকৃতি যুক্ত মহাদেবের উল্লেখ আছে। এই মন্দির এমন এক তীর্থ যেখানে পুরাণ ও ইতিহাস একসাথে মিশে গেছে।

 

সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দিরে বিরাজ করছেন এক

অনাদি এবং অখণ্ড শিবলিঙ্গ।আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগে মল্লারপুরের রাজা ছিলেন মল্লেশ্বর। তিনি এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই শয়ম্ভু শিবই নাকি তারাপীঠের দেবী তারার ভৈরব।

 

এখানকার শিবলিঙ্গর ওপরে রয়েছে ওঁ চিহ্ন যা খুবই দুর্লভ।মল্লেশ্বর শিবমন্দিরের পাশের মন্দিরেই রয়েছেন দেবী মল্লেশ্বরী বা সিদ্ধেশ্বরী। এই মল্লেশ্বর শিব মন্দিরের পিছনে তান্ত্রিকাচার্য শ্রীকৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের জীবন্ত সমাধি বা ইচ্ছাসমাধির বেদী রয়েছে। এই কৃষ্ণানন্দই ছিলেন কালীসাধক রামপ্রসাদের গুরুদেব।তিনি বৃহৎতন্ত্রসার গ্রন্থ রচনা করে প্রসিদ্ধ হয়ে ছিলেন।

 

সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দিরের কারুকাজ এবং সৌন্দর্য এক কথায় অপূর্ব। এই মন্দির চত্বরে রয়েছে চারচালা রীতি মেনে স্থাপিত আরও কিছু মন্দির।এই মন্দির তৈরির পর থেকে সেবাইতরা বংশ পরস্পরায় এখানে পুজো করে আসছেন। অন্যান্য শিবলিঙ্গ মাটির ওপরে থাকে। এখানে শিবলিঙ্গের বেশিটাই রয়েছে মাটির নীচে। তাই একে গুপ্ত শিবলিঙ্গ বলা হয়। এখানে শিবকে মাটি খুঁড়ে পাওয়া গিয়েছে বা স্বয়ং প্রকট হয়েছেন দেবাদিদেব এই শিবলিঙ্গ আলাদা করে এনে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।

 

এখানে শিব লিঙ্গের চার পাশে বিশেষ বিশেষ সময়ে জল লক্ষ করা যায়।শিবলিঙ্গকে ঘিরে যে জলধারা অবস্থান করছে তা আসলে গঙ্গা।শুধু জল নয় মাঝে মাঝে শিবের অনুচর নাগ দেবতার দর্শন ও পাওয়া যায়।সব মিলিয়ে সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দিরে অলৌকিকতা, পৌরাণিক প্রেক্ষাপট এবং ইতিহাসের সংমিশ্রনে সৃষ্টি এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক

পরিবেশ অনুভব করা যায়।প্রতি বছর চৈত্র এবং শ্রাবন মাসে এই সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দিরে বিশেষ পুজো উপলক্ষে বহু ভক্তের ভিড় হয়।

 

আবার আগামী পর্বে অন্য এক প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক শিব মন্দির নিয়ে আলোচনা হবে। চলতে থাকবে শিব মাহাত্ম। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মাহাত্ম – জটেশ্বর শিব

শিব মাহাত্ম – জটেশ্বর শিব

 

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রীজাতক

 

বাংলার অন্যতম প্রসিদ্ধ এবং জাগ্রত শিব মন্দির জটেশ্বর শিব মন্দির।এই শিব মন্দির নিয়ে আছে বহু অদ্ভুত এবং অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ।

আজকের শিব মহাত্ম এই জটেশ্বর শিব মন্দির নিয়ে।

 

আলিপুরদুয়ারে অবস্থিত জটেশ্বর শিব মন্দিরের বয়স আনুমানিক প্রায় দুশো বছর এই দীর্ঘ সময়ে একাধিকবার মন্দিরের সংস্কার হয়েছে।এই জটেশ্বর শিব লিঙ্গের আবিষ্কারের ঘটনাটিও বেশ অলৌকিক এবং রোমাঞ্চকর।

 

শোনা যায় একবার মন্দির সংলগ্ন কাঠালবাড়ি গ্রামের গ্রামবাসীরা লক্ষ্য করেন জঙ্গলের ভিতর একটি স্বেত বর্ণের দুগ্ধবতীর আবির্ভাব হয় মাঝে মাঝে।এই গোমাতা কোথা থেকে যে আসে এবং আবার কোথায় মিলিয়ে যায় তা বোঝা যায়না। অনেকেই গোপনে এই গভীর উপর নজর রাখতে শুরু করেন।একদিন গ্রামবাসিরা গোমাতার পিছু নিয়ে গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করে লক্ষ করেন সেই গাভী গভীর জঙ্গলে মাটির নিচ থেকে উঠে আসা এক শিব লিঙ্গের অভিষেক করছে নিজের দুধ দিয়ে।সবাই এই অলৌকিক দৃশ্য দেখে মোহিত হয়ে যায় এবং দ্রুত এই খবর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

 

পরবর্তীতে স্থানীয় জমিদারের আদেশে লোক জন গিয়ে শয়ম্ভু শিব লিঙ্গটি উদ্ধার করে এবং সেটি বহন করে জমিদার বাড়িতে আনার সময় পথে এক স্থানে তা নামিয়ে রাখলেন বিশ্রামের জন্যে। অলৌকিক ভাবে পরে সেই স্থান থেকে শিব লিঙ্গকে ওঠানো আর সম্ভব হয়নি।এমনকি জমিদারের হাতিও ওই স্থান থেকে শিব লিঙ্গ এক চুল নাড়াতে পারেনি। সবাই বোঝেন এই স্থানেই বাবা মহাদেব বিরাজ করতে চান। পরে ঐখানেই ছোট শিব মন্দির বানিয়ে পুজো শুরু হয়|

 

এর পর দীর্ঘ সময় কেটে যায়|একদিন হঠাত্‍ করে এক দিগম্বর সাধুর আবির্ভাব ঘটলো সেই গ্রামে। তিনি শিব পুজোর দায়িত্ব নেন।সাধু দীর্ঘদিন পুজো দিয়েছিলন এই শিব মন্দিরে তারপর একদিন তিনি অন্তর্ধান হন |এরপর একদিন মিথিলা থেকে এক পুরোহিত এলেন তিনি এসে স্থানীয়দের জানালেন তিনি স্বপ্নাদেশ পেয়েছেন এখানে আসার জন্য এবং এই স্থানে তিনি এসে দেখেন স্বপ্নে যা যা দেখেছেন সব একশো শতাংশ সত্যি। তিনি স্থানীয় লোকেদের সাথে কথা বলে নিয়মিত পুজোর ব্যাবস্থা করেন তৈরি হয় সুন্দর এক বৃহৎ শিব মন্দির। জটেশ্বর মহাদেব নামে এখানে পূজিত হন শিব|

 

আজও সেই শুরুর দিনের মতো শাস্ত্র মতে এখানে পুজো হয়। বাবার বহু ভক্ত আসেন নিজের নিজের মনোস্কামনা নিয়ে। বাবার দয়ায় সবার মনোস্কামনা পূর্ণ হয়।বিশেষ করে শ্রাবন মাসে এবং চৈত্র মাসে ভিড় হয় সব থেকে বেশি।

 

বাংলায় শিব মন্দিরের সংখ্যা অসংখ্য। অলৌকিক ঘটনার সংখ্যাও প্রচুর।আবার শিব মাহাত্মর পরবর্তী পর্বে বলবো অন্য কোনো প্রাচীন শিব মন্দিরের কথা।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মাহাত্ম – নর্তকেশ্বর শিব

শিব মাহাত্ম – নর্তকেশ্বর শিব
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
দক্ষিণভারতে যেমন শিব নটরাজ রূপে পূজিত হন পূর্বভারতে তেমনই ‘নর্তকেশ্বর’ নামক নৃত্যরত শিবমূর্তির পূজা প্রচলিত ছিল।আজকের পর্বে আপনাদের এমনই এক শিবমূর্তির ইতিহাস জানাবো।
দশম শতকের শেষভাগে পালবংশের রাজা যখন মহীপাল। তখন বাংলা আক্রমণ করলেন সে যুগের ভারতবর্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা চোলরাজ রাজেন্দ্র।চোলরাজ রাজেন্দ্র ছিলেন শিব ভক্ত ।
তাই তার সেনাবাহিনী সোনাদানা বা মূল্যবান রত্ন ছাড়াও বঙ্গবিজয়ের আরও একটি স্মারক নিয়ে যান নিজের রাজ্যে। সেটি হল, নর্তকেশ্বরের বিগ্রহ।
সেই অদ্ভুত সুন্দর শিব মূর্তি দেখে অত্যান্ত খুশি হন চোল রাজা। তার ইচ্ছায় তামিলনাড়ুর অমৃতঘটেশ্বর মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত হলেন বাংলার শিবঠাকুর।
এই নর্তকেশ্বর শিব মূর্তি মূর্তি মূলত দুইপ্রকার। দশভুজ নর্তকেশ্বর এবং দ্বাদশভুজ নর্তকেশ্বর।
বাংলা থেকে নিয়ে যাওয়া সেই শিব মূর্তি ছিলো দশভুজ নর্তকেশ্বর।
অপূর্ব সেই ধাতব বিগ্রহ বৃষরূপী নন্দীশ্বরের পৃষ্ঠে ললিত তাণ্ডবে মত্ত নর্তকরাজ, তাঁর বাহনটি ঊর্ধ্বমুখ হয়ে দেখছে সেই নৃত্যলীলা। মহেশ্বরের মাথায় জটামুকুট, স্কন্ধে নাগ-উপবীত তাঁর মুখ্য দক্ষিণহস্তে রয়েছে গজহস্ত মুদ্রা, বাম হাত উপরে তুলে পতাকামুদ্রায় তার ভক্তদের অভয় দিচ্ছেন। অন্য আটটি হাতে রয়েছে ধনুর্বাণ, খড়গ-চর্ম, ত্রিশূল, খট্টাঙ্গ, কপালপাত্র আর অঙ্কুশ।
তাঁর পায়ের কাছে, তাঁকে ঘিরে রয়েছেন গণপতি, স্কন্দ এবং অন্যান্য অদ্ভুতদর্শন শিবানুচরের দল। মহাদেবের প্রভামণ্ডলের দক্ষিণাংশে শূন্যে মরালপৃষ্ঠে বিরাজ করছেন বীণাধারিণী সরস্বতী, ঊর্ধ্বভাগে হাতে পুষ্পমালা নিয়ে ভেসে রয়েছেন দুই বিদ্যাধর।
ঐতিহাসিকদের মতে এমন নর্তকেশ্বর রূপে শিব মূর্তি প্রাচীনকালে বাংলার আরো অনেক স্থানে দেখা যেতো তবে বর্তমান সময়ে এই মূর্তি বাংলায় খুব একটা দেখা যায়না। বাংলার নর্তকেশ্বর শিব মূর্তির একটি বৈশিষ্ট ছিলো দুইপাশে দণ্ডায়মানা দুই দেবী দক্ষিণভাগে মকরবাহিনী গঙ্গা এবং বামভাগে সিংহবাহিনী উমা।এই মূর্তির দর্শন পাওয়া খুবই সৌভাগ্যের বিষয় কারণ অতি দুর্লভ এই
শিব মূর্তি
বাংলার শিব মূর্তি এবং শিব মন্দির নিয়ে আছে এমন বহু ইতিহাস এবং অলৌকিক ঘটনা।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মাহাত্ম – হাইকোর্টেশ্বর মহাদেব

শিব মাহাত্ম – হাইকোর্টেশ্বর মহাদেব
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
সনাতন ধর্মে তিন জনকেই ভগবানের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ব্রম্হা বিষ্ণু এবং মহেশ্বর।সৃষ্টি কর্তা,পালন কর্তা এবং সংহার কর্তা।এদের মধ্যে ব্রম্হা এবং বিষ্ণুর ক্ষেত্রে বৈদিক বা পৌরাণিক দেবতার স্তর থেকে খুব একটা অবতরন দেখা যায়নি।
যদিও বিষ্ণু একাধিক অবতারে মর্তে এসেছেন কিন্তু ভগবান ভগবানই থেকে গেছেন। শিব ব্যাতিক্রম। তিনি কোথাও কোথাও লৌকিক দেবতা রূপেও ধরা দিয়েছেন আবার একাধিক নামে এবং পরিচয়ে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে পূজিত হয়েছেন। যেমন কোথাও তিনি পঞ্চানন আবার কোথাও তিনি বাবা বড়ো কাছারি।শিবের এমনই এক ব্যাতিক্রমী রূপ
হলো হাইকোর্টেশ্বর।আজকের শিব মাহাত্মতে আলোচনা করবো বাংলার এই হাইকোর্টেশ্বর মহাদেব নিয়ে।
কলকাতার কিরণশঙ্কর রোডে অবস্থিত এই হাইকোর্টেশ্বর মহাদেবের মন্দির।শোনা যায় প্রায় একশো বছর আগে উড়িষ্যার থেকে আসা জগদীশ চন্দ্র গিরি নামক জনৈক ব্যক্তি হাইকোর্ট অঞ্চলের একটি গাছের তলায় এই শিবলিঙ্গ খুঁজে পান। তখন থেকেই চলে আসছে এই হাইকোর্টেশ্বর বাবার পুজো। তবে মন্দির প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৫৬ সালে এবং তখন থেকে বাবা হাই কোর্টেশ্বর মহাদেবের জনপ্রিয়তা আরো বাড়ে।
বহু মানুষ বিশ্বাস করেন বাবা হাইকোর্টেশ্বর সহায় থাকলে জয় নিশ্চিত এবং তার আদালতে সুবিচার পাওয়া যাবেই।
আজও মামলা মোকদ্দমার রায় বেরনোর আগে, উকিল থেকে মক্কেল সবাই জয়ের আশায় একবার এই দেবতার থানে মাথা ঠেকিয়ে যান এমনকি বাদ যান না বিচারপতিরাও।মামলায় ফেঁসে গিয়ে এখানে অনেকেই মানত। করেনআবার সেই মানত পূর্ণ হলে ফিরে আসেন পুজো দিতে।
বর্তমানে শ্রাবন এবং চৈত্র মাসে এই মন্দিরে বিশেষ পুজো হয় এছাড়া শিব রাত্রিতে বহু ভক্ত এবং দর্শণার্থী আসেন বাবার বিশেষ পুজোয় অংশ যোগ দিতে। সব মিলিয়ে ওই শিব মন্দির এখন বেশ জাগ্রত এবং প্রসিদ্ধ।
বাংলার এমন বহু প্রসিদ্ধ শিব মন্দিরে ইতিহাস এবং তাদের সাথে জড়িত অলৌকিক সব ঘটনা নিয়ে আবার ফিরে আসবো
আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মাহাত্ম – বাবা পঞ্চমুখী শিব ধাম

শিব মাহাত্ম – বাবা পঞ্চমুখী শিব ধাম

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

শ্রাবন মাস শিবের মাস। এই মাসে আমি সাধারণত শিব নিয়েই আলোচনা করে থাকি। আজ শ্রাবনের সোমবার আবার শুরু করছি শিব মহাত্ম নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা। আজকের পর্বে আপনাদের পুরুলিয়ায় অবস্থিত এমন এক প্রাচীন শিব মন্দিরের কথা জানাবো যেখানে শিবের একটি ব্যতিক্রমী রূপ দেখতে পাওয়া যায়। পুজো পদ্ধতিও একটু আলাদা।

পুরুলিয়ায় কংসাবতী নদীর উত্তরপাড়ে অবস্থিত ‘বাবা পঞ্চমুখী ধাম’। শোনা যায় মহাভারতের যুগে পান্ডবদের সময়কাল থেকে এই মন্দিরের অস্তিত্ব রয়েছে । এই মন্দিরের সঠিক বয়স সম্বন্ধে কারুরই কোনো ধারণা নেই। এই মন্দিরে অধিষ্ঠান রয়েছে চতুর্মুখী একটি শিবলিঙ্গের কিন্তু এখানে শিব পূজিত হন পঞ্চমুখী রূপে কারণ শিবের পঞ্চম তম মুখটি পুরোহিত নিজের মুখ হিসাবে পরিকল্পনা করেইপূজা করে থাকেন।যুগ যুগ ধরে চলে আসছে
এই প্রথা।

শাস্ত্রে পঞ্চমুখি শিব কে পাঁচটি তত্ত্বর প্রতীক রূপে দেখা হয় আবার অনেকের কাছে পঞ্চমুখি সদাশিব শিবের পঞ্চাক্ষরি মন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করছে।শিবের এই রূপকে পঞ্চানন্দ ও বলা হয়। প্রতিটি মুখের রয়েছে নিজস্ব নাম। নামগুলি যথাক্রমে ইশানা, তৎপুরুষ,অঘোর,বাম দেব এবং ব্রম্হা বা সদ্যজাত।আবার অনেকে মনে করেন এই পাঁচটি মুখ পাঁচটি গুনের প্রতিনিধিত্ব করে জথা সৃষ্টি, সংরক্ষণ, ধ্বংস, গোপনীয়তা এবং অনুগ্রহ।

হিন্দু সনাতন ধর্মে একাধিক দেব দেবীর পুজোর প্রচলন থাকলেও মানুষের মধ্যে ভগবান বসবাস করেন এমনটাই বিশ্বাস রয়েছে। মানুষের মধ্যে যে সত্যিই যে ঈশ্বর বিরাজমান সেই তত্বকে এই মন্দিরে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তাই শিব মূর্তির মধ্যে নিজের প্রতিচ্ছবিকে কল্পনা করে পুজো করেন পুরোহিত। ভক্ত ও ভগবান এই ভাবে এখানে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। এই পুজো পদ্ধতি সম্ভবত বাংলা তথা দেশের আর কোনো শিব মন্দিরে দেখা যায়না সেদিক দিয়ে পঞ্চ মুখী শিব ধাম অনন্য এক শিব মন্দির এবং তার গুরুত্ব অপরিসীম।

পঞ্চ মুখী শিব ধামে সারা বছর দর্শণার্থীরা আসেন তবে চৈত্র মাস এবং শ্রাবন মাসে বহু দুর দূরান্ত থেকে ভক্তদের সমাগম হয় এই মন্দিরে। ভক্তদের বিশ্বাস বাবা পঞ্চমুখী শিব ভক্তদের সমস্ত মনোবাসনা পূরণ করে থাকেন এবং কাউকেই খালি হাতে ফেরান না কারন তিনি পরম দয়াময়।

শ্রাবন মাস জুড়ে বাংলার এমন বহু শিব মন্দির নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করবো।
ফিরে আসবো শিব মাহাত্ম নিয়ে
আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – আদি গুরু শঙ্করাচার্য

গুরু কথা – আদি গুরু শঙ্করাচার্য

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা এবং সম্প্রদায়কে এক সূত্রে গেথে সনাতন ধর্মকে একটি নিরাপদ এবং মজবুত ভিত্তি প্রদান করতে মহাদেব স্বয়ং আদি শঙ্করাচার্য্য রূপে পৃথিবীতে এসেছিলেন। তিনিই আদি গুরু। তার দেখানো পথেই এগিয়েছে সনাতন ধর্ম।তিনিই সনাতন ধর্মের অভিভাবক এবং রক্ষক। আজকের পর্ব আদি শংকরাচার্য্যকে নিয়ে।

 

শংকর বিজয়ম নামক প্রাচীন গ্রন্থ অনুসারে 1788 খ্রিস্টাব্দে কেরল রাজ্যের কালাডি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন শঙ্করাচার্য্য|তার বাবার নাম ছিল শিবগুরু ও মায়ের নাম আর্যাম্বা|কথিত আছে ত্রিশূরের বৃষভচল শিবমন্দিরে পুত্রকামনা করে পূজা দিয়ে আশীর্বাদ স্বরূপ শংকরকে পেয়ে ছিলেন তার বাবা মা|তিনি ছিলেন শিবের বর পুত্র এবং পরবর্তীতে তাকে শিবের অবতার হিসেবেই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে|রক্ষন শীল হিন্দু পরিবারে তার বড়ো হয়ে ওঠা|বাল্যকাল থেকেই শংকর ছিলেন অত্যান্ত মেধাবী ও আধ্যাত্মিক মানসিকতার|মনে করা হয় মাত্র আট বছর বয়সে তিনি চারটি বেদ আয়ত্ত্ব করে ফেলেন অতি সহজে|অল্প বয়সে পিতৃ বিয়োগের পর চরম আর্থিক দুর্দশার সম্মুখীন হতে হয় তাকে|

 

কৈশোর থেকেই শঙ্করের ইচ্ছে ছিলো সন্ন্যাস নেয়ার কিন্তু মা রাজি ছিলেন না পরবর্তীতে তাকে রাজি হতে হয়,এ নিয়েও আছে এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ|একবার বালক শংকর পূর্ণা নদীতে স্নান করছিলেন। এমন সময় একটি কুমির তার পা কামড়ে ধরে। শঙ্করের মা তখন সেখানেই উপস্থিত ছিলেন|তিনি মা-কে বলেন, মা যদি সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দেন, তাহলে কুমিরটি তার পা ছেড়ে দেবে। ছেলের প্রাণ বাঁচাতে মা তাকে সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দিলেন|কুমির ও সাথে সাথে পা ছেড়ে অদৃশ্য হলো|এরপর সন্যাস নিয়ে গৃহ ত্যাগ করলেন শঙ্করাচার্য্য|গুরুর খোঁজে বেড়িয়ে পড়লেন পথে|

 

দীর্ঘ সময় পদব্রজে সারা উত্তর ভারত পরিভ্রমণ করার পর অবশেষে গুরুর সাথে সাক্ষাৎ হলো|নর্মদানদীর তীরে ওঙ্কারেশ্বরে তিনি গৌড়পাদের

শিষ্য গোবিন্দ ভগবদপাদের শিষ্যত্ব গ্রহন করলেন শঙ্করাচার্য্য|গুরু শঙ্করাচার্য্যকে অদ্বৈত মত প্রচার করতে বলেন|পরবর্তীতে তিনি কাশী,বদ্রিনাথ সহ বহু স্থানে ঘুরে বেড়ান|অসংখ্য ভাষ্য ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন এবং তার পাশাপাশি চালিয়ে যান

অদ্বৈতবাদের প্রচার|এই সময় অসংখ্য অনুগামী ও ভক্ত তার সংস্পর্শে আসেন ও তার শিষ্যত্ব গ্রহন করেন|বহু ধর্মীয় বিতর্কে অংশগ্রহন করে সেকালের ধর্মজগতের বহু সনামধন্য পন্ডিতকে শাস্ত্র আলোচনায় পরাস্ত করে শংকরাচার্য্য হয়ে ওঠেন এক অতি পরিচিত কিংবদন্তী স্বরূপ|মনে করা হয় কাশীতে বিশ্বনাথ মন্দিরদর্শন করতে যাওয়ার সময় স্বয়ং শিব এক চন্ডাল রূপে

তাকে দর্শন দিয়ে ছিলেন|

 

শঙ্করাচার্য সারাটা জীবন ধরে অদ্বৈতত্ত্বের প্রচার করে বেদ বিমুখী সমাজকে আবার বেদান্তের পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন| শঙ্করাচারজ্যর অদ্বৈত ত্বত্ত্বের মূল কথা ছিল- ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা। জীব ও ব্রহ্মে কোনো প্রভেদ নেই|অর্থাৎ, জীব ও ব্রহ্মকে এক ভাবাই অদ্বৈতবাদ।সকল জীবের অভ্যন্তরে যে আত্মা বিরাজমান, তা পরমাত্মারই প্রকাশ। এ তত্ত্বে জীবাত্মা ও পরমাত্মা এক|

 

শঙ্করা চার্য্য দেশের চার প্রান্তে চারটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন|পুরী, জোশীমঠ, দ্বারকা এবং শৃঙ্গেরী।

আজও এই পরম্পরা মেনে চারটি মঠের প্রধান অর্থাৎ চারজন শঙ্করাচার্য্য পদাধিকারী সনাতন ধর্মের কল্যানে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন সর্বদা|চার টি মঠের একেটির অধীনে একেকটি বেদ কে রাখা হয়েছে।যদিও কাঞ্চি এই চারটি মঠের অন্তর্গত নয় তবে যেহেতু আদি শঙ্করাচার্য্য স্বয়ং এই মঠে তার জীবনের বেশিভাগ সময় কাটিয়েছেন এবং এই মঠের সাথে যুক্ত ছিলেন তাই এই মঠের আচার্য্যকেও শংকরাচার্য্য রূপে স্বীকৃতি দেয়া হয়।আদি গুরু শংকরাচার্য্য পরম ব্রহ্মতে বিলীন হলেও গুরু শিষ্য পরম্পরার মধ্যে দিয়ে তিনি আজও সনাতন ধর্মের শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করে আছেন।

 

এই মহামানবের জীবনের আরো অনেক বিষয়ের ন্যায়ে তার দেহ ত্যাগের প্রকৃত স্থান নিয়েও পন্ডিতদের মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে| কেদারনাথ মন্দিরের পিছনে আদি শঙ্করের প্রতি উৎসর্গীকৃত সমাধি মন্দির রয়েছে মনে করা হয় 1820 খ্রিস্টাব্দে শঙ্করাচার্য্য মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে এই স্থানেই দেহত্যাগ করেন|এই স্থান আজ এক পবিত্র তীর্থ স্থানে পরিণত হয়েছে।

 

গুরু কথা আজ এখানেই শেষ করলাম। তবে ভারতের আধ্যাত্মিক গুরুদের সাধনা এবং

তাদের জীবনী নিয়ে আবার পরবর্তী সময়ে

আলোচনা করবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।