Home Blog Page 35

জয় জগন্নাথ – জগন্নাথ দেবের স্বরূপ

জয় জগন্নাথ – জগন্নাথ দেবের স্বরূপ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

জগন্নাথ শব্দের অর্থ জগতের নাথ। কিন্তু এই জগন্নাথ দেবের স্বরূপ বা তার আসল পরিচয় নিয়ে নানা মুনির নানা মত। বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ মহাভারতের মতো গ্রন্থে জগন্নাথ দেবের উল্লেখ নেই আবার কিছু গ্রন্থে দাবি করা হয়েছে বুদ্ধ নন। বিষ্ণুর নবম অবতার হলেন জগন্নাথ।আজকের এই পর্বে জগন্নাথদেবের স্বরূপ অনুসন্ধান করার চেষ্টা করবো।

 

প্রতিবছর ভাদ্র মাসে তাঁকে বিষ্ণুর বামন অবতারের বেশে পুজো করেন। বার্ষিক রথযাত্রার সময়ও তাঁকে বামন রূপে পুজো করা হয়। বলা হয় দধিবামন।শ্রীচৈতন্যদেব আবার জগন্নাথের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণকে খুঁজে পেয়েছিলেন।

 

জগন্নাথ আসলে আদিবাসী দেবতা। ওড়িশার আদিবাসী শবররা ছিল বৃক্ষ উপাসক। তারা নিজেদের দেবতাকে বলত জগনাত। যা থেকে জগন্নাথ নামের উৎপত্তি। আজও অব্রাম্ভন সবর বংশের দৈতাপতিরা জগন্নাথ সেবার দায়িত্বে থাকেন।নিজেদের শবররাজ বিশ্ববসুর বংশধর বলে দাবি করেন যার হাত দিয়ে শুরু হয় নিলমাধবের পুজো।

 

অন্যদিকে শাক্তরা দাবি করেন জগন্নাথ ভৈরব কারন তিনি দেবী বিমলার ভৈরব। জগন্নাথ মন্দিরের পূজারিরাও শাক্ত সম্প্রদায়ভুক্ত। জগন্নাথ মন্দির চত্বরে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে রয়েছে দেবী বিমলার মন্দির যা একান্ন পীঠের একটি এবং শাস্ত্র মতে এখানে দেবী সতীর নাভি পড়েছিল বলে মনে করা হয়।

 

আবার দারুব্রহ্ম রূপে জগন্নাথকে নৃসিংহ স্ত্রোত্র পাঠ করে পুজো করা হয়। সেক্ষেত্রে জগন্নাথ দেবের সঙ্গে নৃসিংহদেবকে এক করে দেখা হয়।

 

জগন্নাথদেবকে নিয়ে এবং তার মন্দির নিয়ে রহস্যর শেষ নেই। আবার ফিরে আসবো জগন্নাথ প্রসঙ্গে আলোচনায়। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জয় জগন্নাথ – জগন্নাথমন্দির এবং যম শীলা

জয় জগন্নাথ – জগন্নাথমন্দির এবং যম শীলা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

মনে করা হয় স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণই দেহত্যাগের পর জগন্নাথ রূপে এখানে আত্মপ্রকাশ করেন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা রহস্য। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে এখানে জগন্নাথ দেবের দর্শন করলে সব পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং মনের সব ইচ্ছে পূরণ হয়।পুরাণে জগন্নাথধামকে মর্ত্যের বৈকুণ্ঠ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।আজ এই জগন্নাথ মন্দিরের একটি রহস্য আপনাদের সামনে তুলে ধরবো।

 

পুরীর মন্দিরের সিঁড়ি হয়তো আপনারা অনেকেই দেখেছেন। এই সিঁড়ি দিয়ে উঠেই জগন্নাথ দেবের রত্নবেদী এবং বিগ্রহ দর্শন করা হয়।মনে করা হয় এই মন্দিরের সিঁড়ির তৃতীয় ধাপে কখনোই পা দিতে নেই। জগন্নাথ মন্দিরের সিঁড়ির তৃতীয় ধাপকে ‘যম শিলা’ বলা হয়।

 

শাস্ত্র মতে জগন্নাথ মন্দিরে দর্শন করে ভক্তেরা মুক্তি পেয়ে যান। মৃত্যুর পর তাঁদের আর স্বর্গ বা নরকবাস করতে হয় না। এই কারনে যমলোক প্রায় শূন্য হওয়ার উপক্রম হয় তখন বেগতিক দেখে সূর্যপুত্র যমরাজ স্বয়ং জগন্নাথ মন্দিরে এসে প্রভু জগন্নাথের দর্শন করেন এবং তিনি জগন্নাথদেবকে এই সমস্যা সম্পর্কে বলেন এবং সব শুনে জগন্নাথদেব মন্দিরের মূল দরজার সিঁড়ির তৃতীয় ধাপে মৃত্যুর দেবতা যমকে অবস্থান করতে বলেন।

 

সেই থেকে জগন্নাথ মন্দিরের সিঁড়ির তৃতীয় ধাপে বাস করেন স্বয়ং যম এবং সিঁড়ির তৃতীয় ধাপকে তাই ‘যম শিলা’ বলা হয়। জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রাকে দর্শনের পর এই সিঁড়িতে পা দিলেই দর্শনের যাবতীয় পূণ্য নষ্ট হবে এবং ওই ব্যক্তিকে মৃত্যুর পর যমলোক যেতে হবে এমনটা জনশ্রুতি আছে।

 

জগন্নাথ জগতের নাথ। শুধু মানুষ নয় দেবতারাও বিপদে পরে তার স্মরণাপন্ন হন এবং কাউকেই তিনি খালি হাতে ফেরান না।

 

ফিরে আসবো জগন্নাথ সংক্রান্ত পৌরাণিক এবং শাস্ত্রীয় আলোচনা নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জয় জগন্নাথ – জগন্নাথদেব এবং জগদীশ পন্ডিত

জয় জগন্নাথ – জগন্নাথদেব এবং জগদীশ পন্ডিত

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

জগন্নাথদেব জগতের নাথ। তার লীলা শুধু পুরী ধামে সীমাবদ্ধ নয়। সারা দেশে এবং এই বঙ্গে নানা ভাবে নানা সময়ে তার অলৌকিক সত্ত্বা প্রকাশিত হয়েছে। আজকের পর্বে জগন্নাথ ভক্ত জগদীশ পন্ডিত এবং একটি তার সাথে ঘটা একটি অলৌকিক ঘটনার কথা জানাবো।

 

জগদীশ পন্ডিত ছিলেন মহাপ্রভুর শিষ্য এবং অন্যতম ভক্ত। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু তখন সপারিষদ  নিলাচলে  অবস্থান  করছেন। প্রথা অনুসারে সেবার   জগন্নাথ  দেব যখন নবকলেবর  ধারণ করেন।তখন জগদীশ পণ্ডিত

পুরীর  জগন্নাথ  দেবের  পরিত্যক্ত পুরোনো দারুময়  বিগ্রহটি  সংগ্রহ করেন এবং পুরীধাম থেকে  বহন  করে  নবদ্বীপের  উদ্দেশে  যাত্রা  করেন।তার ইচ্ছে ছিলো নবদ্বিপে জগন্নাথ বিগ্রহ  পুনঃ  প্রতিষ্ঠা  করা।

 

বিশাল  বিগ্রহ  দণ্ডে  ঝুলিয়ে  দুজনে  কাঁধে  করে  বয়ে  নিয়ে  চলেছেন। স্বাভাবিক ভাবেই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার ফলে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন এবং এক নির্জন স্থানে রাত্রি  যাপন  করলেন।

পরদিন সকালে জগন্নাথ দেবকে কাঁধে  তুলবার  সময়  আর  ওঠাতে  পারলেন  না। কাঠের মূর্তি যেনো   পাথরের থেকেও বেশি ভারী হয়ে গেছে। পরে জগদীশ পন্ডিত স্বপ্নাদেশ পেলেন যে প্রভু জগন্নাথ বলছেন আমি  এখানেই  অবস্থান  করব। সেই  থেকে  জগন্নাথ  এখানেই  আছেন।স্থানটি নদীয়ার চাকদার কাছে।এখানেই তার মন্দির নির্মাণ হয় জগদীশ  পণ্ডিত তার বাকি  জীবন  এখানেই  বসবাস  করে  জগন্নাথ  সেব  করেন।পরবর্তীতে স্বয়ং শ্রীচৈতন্যদেব  ও  শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু  এখানে  পদার্পণ  করে ছিলেন এবং জগন্নাথ দর্শন করেছিলেন।

 

প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ  পূর্ণিমায়  জগন্নাথ

দেবের  স্নানযাত্রা উপলক্ষে এখানে বিশেষ

পুজোর আয়োজন করা হয়।

 

ফিরে আসবো জগন্নাথ লীলা নিয়ে আবার

আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

জয় জগন্নাথ – প্রভু জগন্নাথের রাজ বেশ

জয় জগন্নাথ – প্রভু জগন্নাথের রাজ বেশ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আর কয়েকদিন পরেই জগন্নাথের স্নান যাত্রা প্রভু নব রূপে সেজে উঠবেন। প্রভু জগন্নাথ শুধু তার ভোগের জন্য নয় নানারকম বেশ বা সাজ সজ্জার জন্যও বিশেষ ভাবে পরিচিত।

 

নানা সময়ে নানা বেশে সাজেন জগতের নাথ এবং প্রতিটি বেশের আছে আলাদা পরিচয় এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা।আজ জগন্নাথের রাজ বেশ নিয়ে আলোচনা করবো

 

প্রাচীন গ্রন্থ মাদলা পাঞ্জিতে উল্লেখ আছে ১৪৬০ খ্রিস্টাব্দে উৎকলের গজপতি রাজা কপিলেন্দ্র দেব দাক্ষিণাত্যের এক রাজার বিরুদ্ধে ভীষণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দীর্ঘ সংগ্রামের পর কপিলেন্দ্র যুদ্ধে জয়লাভ করেন।শত্রু দেশ থেকে লুঠে আনেন ষোলটি হাতির পিঠ বোঝাই করে সহস্র মণ সোনা। সমস্ত সোনা রাজা কপিলেন্দ্র জগন্নাথদেবের মন্দিরের ভাণ্ডারে পাঠিয়ে দিলেন এবং জগন্নাথদেবকে তিনি ওড়িশার প্রকৃত রাজা বলে স্বীকার করলেন ও নিজেকে তাঁর অনুগত সেবক বলে ঘোষণা করলেন। একটি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই ক্ষমতা হস্তান্তর সর্বসাধারণের সম্মুখে উদযাপন করা হয়।এই সময় জগন্নাথের ‘রাজবেশ’-এর প্রবর্তন হয় । সাধারণের কাছে এই ‘বেশ’ আর একটি নাম আছে তা হল, ‘বড়া তাধাও বেশ’।

 

আবার রথের আগে বিশেষ রীতি মেনে জগন্নাথ দেবকে পরানো হয় রুপোর হাত।সেই সময় ও রাজ বেশে সাজানো হয় প্রভুকে। জগন্নাথ দেবের নবযৌবন উৎসব পালিত হয় রাজ বেশে।প্রভু জগন্নাথ রাজার রাজা তাই তার জন্য এই বিশেষ রাজ বেশের আয়োজন।

 

এছাড়াও আরো অনেকগুলি তাৎপর্যপূর্ণ বেশে নানা সময়ে সাজানো হয় জগন্নাথদেবকে সেগুলি নিয়ে আবার পরবর্তী সময়ে আলোচনা করবো। ফিরে আসবো দিনে জগন্নাথ দেবকে নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনায়। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জয় জগন্নাথ – ভৈরব রূপে প্রভু জগন্নাথ

জয় জগন্নাথ – ভৈরব রূপে প্রভু জগন্নাথ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

জগন্নাথ বৈষ্ণবদের কাছে বিষ্ণুর অবতার হলেও শাক্ত দের কাছে তিনি ভৈরব কারন এই পুরী ধাম শুধু জগন্নাথ ধাম নয়। দেবী বিমলা এই শ্রী খেত্রেই অধিষ্টান করেন।পীঠনির্ণয় তন্ত্রে উল্লেখ আছে দেবী শ্রীমন্দিরের কত্রী।প্রভু জগন্নাথ তাঁর ভৈরব হিসেবে অবস্থান করেন।আবার তিনি দেবী মহামায়ার অংশ এবং একান্ন টি সতীপীঠের অন্যতমা দেবী বিমলার মন্দির তাই প্রভু জগন্নাথকে নিয়ে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায় দেবী

বিমলাকে না জানলে।

 

আজও জগন্নাথের ভোগ সবার আগে সমর্পন করা হয় দেবী বিমলাকে । দেবীর পুজো হয় তন্ত্রমতে। মনে করা হয় দেবী বিমলার দর্শন না করা অবধি জগন্নাথ দর্শন সম্পূর্ণ হয় না।

 

পুরান মতে বিষ্ণু দর্শন হেতু মহাদেব একবার বৈকুণ্ঠে হাজির হন এবং নারায়নের প্রসাদ গ্রহন করেন সেই প্রসাদের কিছুটা তাঁর মুখে লেগে যায়। কৈলাসে ফিরে নারদকে দেখতে পান মহাদেব। মুখে লেগে থাকা অবশিষ্ট প্রসাদ নারদ চেয়ে নেন সেই সময় দেবী পার্বতীও সেখানে উপস্থিত হন। প্রসাদ পাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেন কিন্তু শিব তো অপারগ কারন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। ক্রোধান্নিতা পার্বতী হাজির হন নারায়ণের কাছে। সব শুনে নারায়ণ তাঁকে বলেন এবার থেকে পুরী ধামে তাঁর শক্তি রূপে অবস্থান করবেন দেবী।

এবং নারায়ণের প্রসাদ সবার আগে তাঁকে অর্পন করা হবে। যে প্রথা আজও এতটুকু বদল হয়নি। দেবী বিমলাকে অর্পন করার পরই জগন্নাথের প্রসাদ হয়ে ওঠে মহাপ্রসাদ।

 

শ্রীমন্দিরে চত্বরেই দেবী বিমলার মন্দির।

আবার পুরাণমতে সতীর ডান পায়ের কড়ে আঙুল পড়েছিল এই খানে তাই এটি সতী পীঠ।প্রতিটি সতী পীঠে একজন ভৈরব থাকেন। বিমলাদেবীর মন্দিরে আলাদা করে ভৈরব নেই কারন এখানে ভৈরব স্বয়ং জগন্নাথদেব।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে জগন্নাথ প্রসঙ্গে আলোচনা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জয় জগন্নাথ – জগন্নাথ সখা ভক্ত রঘুদাস

জয় জগন্নাথ – জগন্নাথ সখা ভক্ত রঘুদাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

জগন্নাথ প্রসঙ্গে আলোচনা পর্বে আগেই

ভক্ত রঘুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি আপনাদের। রঘু দাস শুধু ভক্ত নন তিনি ছিলেন প্রভু জগন্নাথের সখা। বাৎসল্য ভাবের একটি প্রমান আজকের পর্বে দেবো।

 

পুরীতে ভক্ত রঘু দাস একসময় গুরুতর অসুখে পড়ল। তাঁর স্বাস্থ্য এতই ভেঙে গেল যে, তাঁর আর বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াবার শক্তি ছিলোনা।প্রায় মৃত্যু সজ্জায় রঘু দাস রোগ-পীড়ায় কাতর হয়ে ঘন ঘন অচৈতন্য হয়ে পড়ছিল। এ অবস্থায় তাঁর নিজেকে সাহায্য করার কোনও ক্ষমতা ছিল না।

তিনি একা থাকতেন এবং জগন্নাথ প্রেমেই দিন কাটাতেন।সঙ্গী সাথী তেমন ছিলোনা। তাই এই খবরও কেউ পায়নি।

 

সেসময় একদিন একটি ছোট বালক রঘু দাসের সেবা করতে এল। বালকটি রঘুর অসুস্থ্য দেহ, বিছানা, কুটির সবকিছু পরিষ্কার করল। তাঁর দেহ সে চন্দনে প্রলিপ্ত করল এবং ঘরে সুগন্ধিত দ্রব্য দিয়ে ঘরের দুর্গন্ধ দূর করে ঘরকে শুদ্ধ করলো।

তারপর শুরু হলো রোগীর সেবা।

 

রঘুর যখন একটু সুস্থ্য হলো তখন সে দেখল একটি বালক তার সেবা করছে । পরিচয় জিগেস করলে বালক জগন্নাথ রূপে দর্শন দিলেন। অশ্রু সিক্ত নয়নে রঘু জগন্নাথকে বলল তোমার সেবা পেয়ে আমি ধন্য কিন্তু তুমি তো সহজেই আমার রোগ ভোগ দুর করতে পারতে তবে আমাকে সুস্থ করে দেওয়ার পরিবর্তে কেন তুমি আমার এমন সেবা সুশ্রসা করলে?

 

জগন্নাথ দেব উত্তরে বললেন কর্ম ফল সবার ভোগা উচিৎ, তোমার সকল প্রারব্ধ কর্ম নাশ করতেই আমি আমার শক্তি প্রয়োগ করে তোমাকে সুস্থ্য করিনি যাতে তুমি দেহান্তে আমার ধামে ফিরে আসতে পারো। তাছাড়া আমার ভক্তগণ যেমন আমার সেবা করে আনন্দ পায়, তেমনি আমিও আমার ভক্তগণের সেবা করে আনন্দ লাভ করি।” এইভাবে প্রভু জগন্নাথ ও রঘুর মধ্যে ভক্তি এবং সখ্যতার মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো।

 

এই ঘটনা প্রমান করে যে জগন্নাথ প্রেমে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পন করতে পারলে জগন্নাথ তার সেবা করতে এবং নিজের সখার স্থান দিতে

দ্বিধা করেননা।

 

ফিরে আসবো প্রভু জগন্নাথের আরো অনেক

লীলা এবং জগন্নাথ মকন্দিরের রহস্য নিয়ে।

পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জয় জগন্নাথ – জগন্নাথ পত্নী মহালক্ষী

জয় জগন্নাথ – জগন্নাথ পত্নী মহালক্ষী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

জগন্নাথ দেব প্রসঙ্গে আলোচনা হলে মূলত পুরী ধাম, সুভদ্রা বলরাম রথ যাত্রা নিয়েই বেশি কথা হয়। প্রচারের আড়ালে থেকে যান জগন্নাথদেবের স্ত্রী মহা লক্ষী। আজকের পর্বে মহালক্ষীকে নিয়ে আলোচনা করবো।

মহা লক্ষী স্বয়ং আদ্যা শক্তির রূপ। তিনি বিশ্ব সংসারের আদি শক্তি এবং জগন্নাথ স্বয়ং নিজ বৈভব এবং শক্তির জন্য মহামায়ার উপর নির্ভর করেন। কিন্তু এমন একটি ঘটনা প্রতি বছর পুরীতে ঘটে যেখানে মহা লক্ষীকে ছেড়ে জগন্নাথকে থাকতে হয় এবং মহালক্ষী রুষ্ট হন জগন্নাথের উপরে।

প্রতিবার স্নান যাত্রার পর ত্রীমূর্তি রথে চেপে গুণ্ডিচা বাড়ি বেড়াতে গেলেও জগন্নাথের স্ত্রী মহালক্ষ্মী মন্দিরেই থেকে যান। এতে স্বাভাবিক ভাবেই মহালক্ষ্মী জগন্নাথের উপরে ক্রুদ্ধ হন এবং কথিত আছে দেবী মহা লক্ষী গুণ্ডিচা মন্দিরে এসে যত শীঘ্র সম্ভব মন্দিরে ফেরার জন্য জগন্নাথকে ভয় দেখান। তবে প্রভুর ছুটি কাটানোর এই অবসরে তাঁর স্ত্রীর স্বামী সাক্ষাৎ এর সৌভাগ্য ঘটে না। দূর থেকেই গুন্ডিচায় প্রভুকে দর্শন করে ক্ষান্ত দিতে হয় মহা লক্ষ্মীকে। তবে মন্দিরের সামনে আরতি সম্পন্ন করেন লক্ষ্মীদেবী। তারপরে রাগের চোটে রথের একখান কাঠ ভেঙে শ্রী মন্দিরে ফিরে যান জগন্নাথজায়া এবং রীতিকে বলা হয় রথ ভঙ্গ উৎসব।

যে সাতটি দিন প্রভু মাসির বাড়ি থাকেন তার মধ্যে একটি বিশেষ দিন হল— ‘হেরাপঞ্চমী’। রথযাত্রার চতুর্থ দিনে পঞ্চমী তিথিকে বলা হয় ‘হেরাপঞ্চমী’। ওই দিনই গুণ্ডিচা মন্দিরে রথভঙ্গোত্‍সব হয়।

আবার প্রভু যখন উল্টো রথের সময়ে প্রভু যখন মন্দিরে ফিরে আসেন তিনি মহালক্ষীর জন্য নানাবিধ মিষ্টি এবং উপহার নিয়ে আসেন তার মানভঞ্জনের জন্য এমন জনশ্রুতিও আছে।

ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে। প্রভু জগন্নাথকে নিয়ে আরো অনেক আলোচনা বাকি আছে।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জয় জগন্নাথ – ত্রিমূর্তি রহস্য

জয় জগন্নাথ – ত্রিমূর্তি রহস্য

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আর কদিন পরেই প্রভু জগন্নাথের স্নান যাত্রা।
সেই উপলক্ষে cজগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা কে নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করছি।আজ এই ত্রিমূর্তি সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করবো।

জগন্নাথ একা নন বলরাম এবং সুভদ্রা তার সাথেই পুরী ধামে বিরাজমান সুভদ্রা আসলে সেই যোগমায়া, যাঁকে তাঁর জন্মের রাতেই বাবা-মায়ের থেকে সরিয়ে এনে তুলে দেওয়া হয়েছিল কংসের হাতে। সদ্যোজাত কৃষ্ণকে রক্ষা করতে এবং অন্যদিকে বলরাম হলেন কৃষ্ণের জ্যেষ্ঠভ্রাতা। তিনি বলদেব, বলভদ্র ও হলায়ুধ নামেও পরিচিত।

আমরা প্রত্যেকে নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছি যে জগন্নাথ সুভদ্রা এবং বলরামের কারও হাত নেই। এমনকি চোখের পাতাও নেই।

হিন্দু ধর্মের অন্যান্য দেবতাদের মূর্তি বা প্রতিমার সঙ্গে জগন্নাথের বিগ্রহের কিছু পার্থক্য রয়েছে। বিগ্রহের আকারও বিচিত্র। চৌকো মাথা, বড় বড় চোখ এবং অসম্পূর্ণ হাত।

প্রভু জগন্নাথের মূর্তিতে চোখের পাতা নেই|এর একটা কারন তিনি জগতের নাথ এবং তিনি সদা জাগ্রত|একটি মুহূর্তের জন্যও তিনি দেখা বন্ধ করেননা|তিনি পরম দয়ালু তাই প্রতি মুহূর্তে তার ভক্তদের উপর তার কৃপা দৃষ্টি নিক্ষেপিত হয়|
মূর্তির হাত অসম্পূর্ণ কারন দেব শিল্পী বিশ্বকর্মার শর্ত অনুযায়ী নিদ্দিষ্ট দিনের পূর্বেই মূর্তি নির্মাণ কক্ষের দ্বার উন্মুক্ত হওয়ায় মূর্তি অসম্পূর্ণ থেকে যায় এবং সেই অর্ধ সম্পূর্ণ মূর্তি রত্ন বেদীতে স্থাপন করা হয়।

‘নব-কলেবর’ নামের রহস্যময় এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়মিত নিদ্দিষ্ট সময়ের ব্যাবধানে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হয় আর পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হবে – এটাই পূজারীদের বিশ্বাস।
এ জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে – যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে – এটা তাঁরাও দেখতে না পান।

জগন্নাথ দেব সংক্রান্ত আরো অনেক রহস্য এবং পৌরাণিক ঘটনা আপনাদের জানাবো ধারাবাহিক ভাবে। ফিরে আসবো আগামী পর্বে।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাদেব এবং ভক্ত রঘুদাস

জগন্নাদেব এবং ভক্ত রঘুদাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

একসময় পুরীধামে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের একজন মহান ভক্ত ছিল।তার নাম ছিলো রঘু দাস।

এই ভক্ত রঘু দাসকে বিশেষ স্নেহ করতেন জগন্নাথদেব। আজকের পর্বে ভক্ত রঘু দাসের জীবনে ঘটা দুটি অলৌকিক ঘটনা আপনাদের জানাবো।

 

একবার পুরীর ভক্ত রঘুদাস পুরীর মন্দিরের বিগ্রহবেদীতে রাম, লক্ষ্মণ ও সীতাদেবীর দর্শন পান এবং উপলব্ধি করেন যে শ্রীজগন্নাথ এবং শ্রীরামচন্দ্র এক এবং অভিন্ন।তারপর থেকে সে জগন্নাথকে শ্রী রাম জ্ঞানেই পুজো করতো।

একবার রঘু শ্রীজগন্নাথের জন্য একটি সুন্দর মালা গেঁথে জগন্নাথকে দেয়ার জন্য পূজারীকে দেয়।কিন্তু পূজারী সেটি ভগবানকে দিতে চাইলেন না কারন মালাটি ছিলো অতি সাধারণ এবং সস্তা।

তাঁর মালাটি জগন্নাথকে দেয়া হল না দেখে রঘু অত্যন্ত দুঃখিত, বিমর্ষ হয়ে মন্দির ত্যাগ করে।

 

সেই রাতে ভগবান শয়নে যাওয়ার পূর্বে জগন্নাথের বড়-শৃঙ্গার বেশের সময় ভগবান কোনও ফুলই গ্রহণ করলেন না। পূজারীরা বুঝলেন যে তারা নিশ্চয়ই কোন গর্হিত অপরাধ করেছেন।

সেই রাত্রেই জগন্নাথ প্রধান পূজারীর নিকট স্বপ্নে আবির্ভূত হয়ে বললেন, “আমার ভক্ত রঘু দাস আমার জন্য একটি ফুলের মালা এনেছিল। সে কত ভক্তি ও প্রীতি সহকারে সেটি গেঁথেছিল! তুমি কেবল বাইরে থেকে সূতোটি দেখে তাঁকে ফিরিয়েছ,আমাকে মালা অর্পণ করার অনুমোদন দেওনি। আমার ভক্তের ইচ্ছাপূরণ হয়নি তাই আমিও বড় শৃঙ্গার ত্যাগ করেছি।

 

তৎক্ষণাৎ পূজারীরা ভক্ত রঘুদাসের কাছে গিয়ে তাদের অপরাধ স্বীকার করলেন এবং শ্রীজগন্নাথদেবকে তাঁর মালা অর্পণ করতে বললেন। রঘু দাস অত্যন্ত খুশি হল এই শুনে যে, ভগবান এতই করুণাময় যে, তিনি স্বয়ং তাঁর মালা গ্রহণের জন্য অপেক্ষা করছেন এবং তার ইচ্ছে আজ পূরণ করবেন।

 

প্রভু জগন্নাথ পরম করুনাময়। শুধু ভাব এবং ভক্তি দিয়েই তাকে সন্তুষ্ট করা যায়। আবার পরের পর্বে জগন্নাথের অন্য একটি লীলা নিয়ে ফিরে আসবো।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জয় জগন্নাথ – গুন্ডিচা দেবীর কথা

জয় জগন্নাথ – গুন্ডিচা দেবীর কথা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আসন্ন স্নান যাত্রা উপলক্ষে শুরু করেছি প্রভু জগন্নাথকে নিয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনা। আগের পর্বে। জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি বা গুন্ডিচা মন্দির নিয়ে কিছু তথ্য আপনাদের জানিয়েছি। আজ গুন্ডিচা সম্পর্কে আরো বিস্তারিত লিখবো।

 

বহু প্রাচীন কাল থেকেই বেশ কিছু লোকশ্রুতি ঘিরে রয়েছে পুরীর গুন্ডিচা মন্দিরকে।

অনেকের মতে এই মন্দির আসলে স্থানীয় এক দেবীর। তাঁর নামই গুন্ডিচা। মনে করা হয়, তিনি দেবী দুর্গার রূপ।আদ্যা শক্তি মহামায়ার একটি রূপের প্রকাশ ঘটেছে গুন্ডিচা রূপে।

 

আবার স্থানীয়রা মনে করেন ওড়িয়া ভাষায় গুটিবসন্ত রোগকে ‘গুন্ডি’ বলা হয়। এই দেবী গুণ্ডিচা আসলে সেই রোগ নিরাময়ের দেবী।

অনেক টা আমাদের মা শীতলার ন্যায় গুন্ডিচ দেবীও এক লৌকিক দেবী।

 

প্রভু জগন্নাথ বছরে সাতদিন কাটাতে আসেন এই দেবীর মন্দিরে এবং স্থানে বিশ্রাম করেন প্রভু সেই সময়ে একাধিক উৎসবের আয়োজন করা হয় গুন্ডিচা মন্দিরে।গোপীদের সঙ্গে লীলায় মত্ত হন জগন্নাথ তাই ছল করে দেবী লক্ষীকে জগন্নাথ মন্দিরে রেখে আসেন তিনি। তাই ফেরার সময়

স্ত্রী লক্ষ্মীর মানভঞ্জন করতে রস গোল্লা নিয়ে আসেন প্রভু জগন্নাথ।

 

জনশ্রুতি আছে পুরীতে থাকা কালীন প্রতিবার রথের আগে নিয়ম করে গুন্ডিচা মন্দির পরিষ্কার করতেন চৈতন্য মহাপ্রভু। সেই রীতি বজায় রেখে এখনও পুরীর সময়ে গৌড়ীয় মঠের সদস্যরা গুন্ডিচা মন্দির পরিস্কার করতে যান।

 

শ্রী ক্ষেত্র পুরী এবং পুরীর রথ যাত্রার সাথে জড়িত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান এই গুন্ডিচা মন্দির। পুরী ভ্রমনের সময় এই মন্দির অবশ্যই দর্শন করবেন।

 

চলতে থাকবে জগন্নাথদেব সংক্রান্ত শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক এবং শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা। ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।