Home Blog Page 36

জয় জগন্নাথ – দারু ব্রহ্ম রহস্য

জয় জগন্নাথ – দারু ব্রহ্ম রহস্য

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রহস্যর শেষ নেই। জগন্নাথ মূর্তি বা দারুব্রহ্ম মূর্তি সেই রহস্যর অন্যতম।আজকের এই বিশেষ পর্বে লিখবো

এই দারুব্রহ্ম রহস্য নিয়ে।

 

দারুব্রহ্ম বলতে সাধারণ কাঠের তৈরী দেব দেবীর মূর্তি বোঝায় তবে এই দারুব্রহ্ম অনেকটাই আলাদা। জগন্নাথ দেবের মূর্তি কাঠ বিশেষ ধরণের নীম কাঠ দিয়ে তৈরী করা হয়।বহু যুগ ধরে এই প্রথা অপরিবর্তিত আছে। প্রথম দারুব্রহ্ম ভেসে আসে সমুদ্রে এবং তাকে মূর্তির রূপ দেন স্বয়ং দেব শিল্পী বিশ্বকর্মা।

 

বর্তমানে জগন্নাথ দেব ও তার দাদা বলভদ্র এবং বোন সুভদ্রার গায়ের রং অনুযায়ী কাঠ নির্বাচন করা হয়।একাধিক শর্ত এবং বিশেষত্ব থাকতে হয়। প্রথম শর্ত কাঠটি একদম নিখুঁত এবং ত্রুটি মুক্ত হতে হবে। জগন্নাথ দেবের মূর্তি নির্মাণে নিমের যে কাঠটি নির্বাচন করা হয়, সেই নিম গাছটিকে চার শাখা বিশিষ্ট হতে হয়।নিম গাছটির নিচের অংশে গাছের শিকড়ে পিঁপড়ের ঘর কিংবা সাপের গর্ত থাকতে হবে। গাছটিকে শশ্মানে তিন মাথার মোড়ে থাকতে হবে।তা নাহলে তিন দিকে পাহাড় বেষ্টিত জায়গায় বেল গাছের সমন্বয়ে আছে এই ধরণের নিম গাছের কাঠ জগন্নাথ দেবের জন্য নির্বাচন করা যেতে পারে।এই সমগ্র পক্রিয়াটি পুরীর দায়িত্বপ্রাপ্ত দৈতাপতিদের তত্ত্বাবধানে হয়ে থাকে।

 

একটি তত্ত্ব অনুসারে এই দারু ব্রহ্ম মূর্তিতে বিরাজমান শ্রী কৃষ্ণের অক্ষত এবং অমর হৃদপিন্ড যা ব্রহ্ম পদার্থ এবং সেই থেকেই দারু ব্রহ্ম নামকরণ হয়।নব কোলবরের সময় এই ব্রহ্ম পদার্থ পুরোনো দার ব্রহ্ম থেকে নতুন দারুব্রহ্মতে স্থানান্তরিত করা হয়। এই ব্রহ্ম পদার্থ দেখা বা স্পর্শ করা নিষেধ তাই সেই সময়ে কিছু বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।

 

চন্দন যাত্রার মধ্যে দিয়ে শুরু হয়ে গেছে রথ যাত্রার দিন গোনা আর কদিন পরেই স্নান যাত্রা। আজ থেকে সেই উপলক্ষে চলবে জগন্নাথ দেব সংক্রান্ত শাস্ত্রীয় আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ফলহারিণী অমাবস্যা এবং গ্রহের প্রতিকার 

ফলহারিণী অমাবস্যা এবং গ্রহের প্রতিকার

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ফল হারিণী অমাবস্যা কোনো সাধারণ অমাবস্যা তিথি নয়। ফল হারিণী অমাবস্যার সাথে জ্যোতিষ তন্ত্র এবং গ্রহ নক্ষত্রর বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।

আজকের এই বিশেষ পর্বে আপনাদের ফল হারিণী অমাবস্যা তিথিতে গ্রহ দোষ খন্ডনের গুরুত্ব নিয়ে কিছু বলবো। জানাবো গ্রহ দোষ বলতে জ্যোতিষ শাস্ত্রে কি বোঝায়। গ্রহ দোষ খণ্ডন কি এবং কেনো ফল হারিণী অমাবস্যায় গ্রহ দোষ খণ্ডন হয়।

 

জাতক জাতিকার জন্মছক বিশ্লেষণ করলে অথবা হস্তরেখা বিচার করলে দেখা যায় অনেকেরই কিছু না কিছু গ্রহদোষ রয়েছে। অর্থাৎ কিছু শুভ গ্রহ এবং কিছু অশুভ গ্রহের গ্রহগত সংযোগ। সেটা দৃষ্টি বিনিময় বা অশুভ স্থানে অবস্থানে ফলে হতে পারে আবার অশুভ গ্রহ দ্বারা কোনো গ্রহ পীড়িত হলেও হতে পারে। আবার অশুভ নক্ষত্রর প্রভাবেও হতে পারে।

 

জ্যোতিষ শাস্ত্রে যতরকম গ্রহের প্রতিকারের কথা উল্লেখ আছে তার মধ্যে শাস্ত্র মতে পুজো পাঠ এবং মন্ত্র উচ্চারনের মধ্যে দিয়ে গ্রহদোষ খণ্ডনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারন প্রতিটি গ্রহের রয়েছে নিজস্ব আধ্যাত্মিক সত্ত্বা এবং অধীস্টাত্রী দেবী।

 

গ্রহের প্রতিকারের সাফল্য এবং

তার স্থায়ীত্ত্ব নির্ভর করে সঠিক তিথি

নির্বাচনের উপর।সঠিক তিথিতে করা শাস্ত্রীয় মতে দোষ খণ্ডন সবথেকে বেশি প্রভাব শালী হয়, এবং এই তিথি গুলির মধ্যে দীপান্বিতা অমাবস্যা, কৌশিকী অমাবস্যা, মৌনী অমাবস্যা এবং ফলহারিনী অমাবস্যা কে অন্যতম শ্রেষ্ঠ তিথি হিসেবে দেখা হয়|

 

জন্ম ছকে অশুভ গ্রহ দোষ সৃষ্টির একটি কারন হচ্ছে জন্ম জন্মান্তরের অর্জিত পাপ। সেই পাপ পূর্ব পুরুষের ও হতে পারে। তাই ফল হারিণী অমাবস্যায় করা গ্রুহ দোষের প্রতিকার সেই

সব কর্ম ফল থেকে মুক্তি দেয় এবং গ্রহের অশুভ

প্রভাব দূর করে সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

ফল হারিণী অমাবস্যার অর্থাৎই হলো জন্ম জন্মান্তরের পাপের ফল থেকে এবং অশুভ শক্তি থেকে চীর তরে মুক্তি লাভ।

 

আবার যথা সময়ে আধ্যাত্মিক এবং পৌরাণিক বিষয় নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনায় ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – বড় দেবীর পুজো

কালী কথা – বড় দেবীর পুজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের কালী কথায় কোচবিহারের বড়ো দেবীর পুজো নিয়ে লিখবো।যে পূজোর বয়স প্রায় পাঁচশো বছর।গোটা উত্তর বঙ্গে এই বড় দেবী অত্যান্ত জাগ্রত এবং জনপ্রিয়।

 

প্রথাগত প্রতিমার থেকে এই প্রতিমা সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে দেবী রক্তবর্ণা এবং উগ্ররূপে তিনি বিরাজ করছেন । সঙ্গে থাকেন দুই সখী জয়া এবং বিজয়া। দেবীর বাহন বাঘ এবং সিংহ উভয়।

 

শতাধিক বছর আগে কোচবিহার রাজ বংশের অন্যতম রাজা মহারাজা নরনারায়ণ স্বপ্নে ওই এই দেবীকে দেখেছিলেন সেই রূপেই আজও এখানে পূজিত হন দেবী।

 

আজ থেকে পাঁচশো বছর আগে এই রাজ বংশের বিশ্ব সিংহ এবং তাঁর ভাই শীষ্য সিংহ খেলার ছলে দেবীর আরাধনা শুরু করেন। ময়নার ডালকেই দেবীরূপ দিয়ে পুজো করেন তাঁরা। পরবর্তীতে সেই কাঠ ‘বড় দেবী’র মন্দিরে এনে, তাকে কাঠামো হিসেবে ব্যবহার করে তার উপর শুরু হয় প্রতিমা তৈরির কাজ।

 

শোনা যায় একবার মহারাজা বিশ্ব সিংহ খেলার ছলে এক সাথীকে তরোয়াল দিয়ে আঘাত করেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই বালকের মাথা আলাদা হয়ে যায় ধড় থেকে। সেই মাথা দেবীকে নিবেদন করেন বিশ্ব সিংহ। সেই থেকে শুরু হয় এক অদ্ভুত রীতির প্রচলন। আজও ‘বড় দেবী’র পুজোয় একফোঁটা হলেও প্রাণীর রক্তর প্রয়োজন হয় এবং আজও নাকি তাজা রক্ত সংগ্রহ করে দেবীকে উৎসর্গ করা হয়।

 

পুজো হয় তন্ত্র মতে এবং আজও পুজোতে পশুবলি হয়। বিসর্জনের সময় যমুনা দীঘিতে নিয়ে যাওয়া হয় মৃন্ময়ী প্রতিমা এবং দেবী মূর্তি খণ্ডিত করে বিসর্জন দেওয়া হয়।

 

ফল হারিণী অমাবস্যা উপলক্ষে বাংলার বহু এমন ঐতিহাসিক কালীপুজো এবং অলৌকিক ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছি কালী কথায় ।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – ভবতারিণী কালী

কালী কথা – ভবতারিণী কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ কালী কথার এই পর্বে আপনাদের কলকাতার এমন একটি প্রাচীন কালীর পুজোর কথা আপনাদের জানাবো যেখানে দেবী ভবতারিণী রূপে বিরাজ করছেন।

 

ঐতিহাসিক এই মন্দিরটি ১৮৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত।

বর্তমানে এই মন্দিরটি হেরিটেজ ঘোষিত হয়েছে।

গর্ভগৃহে কষ্টিপাথরের দক্ষিণাকালী ভবতারিণী নামেই নিত্য পূজিতা। মন্দিরের  গর্ভগৃহের একদিকে শ্রীধর অর্থাৎ নারায়ণ শিলা, কৃষ্ণ-রাধিকা মূর্তি, গণেশ, কৃষ্ণ মূর্তিও নিত্য পূজিত হয়।  মন্দিরটি দক্ষিণমুখী। দক্ষিণেশ্বরের আদলে নবরত্নশৈলীতে মন্দিরটি নির্মিত এবং আগেই বলেছি দক্ষিনেশ্বরের ন্যায় এখানেও দেবী কালী ভবতারিণী রূপে বিরাজ করছেন।

 

ঠাকুর রামকৃষ্ণর শিষ্য বলরাম ঘোষের উত্তরসূরি তুলসীরাম ঘোষকে স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন দেবী।স্বপ্নে দেখা রূপ অনুযায়ীই এখানে দেবী কালীর মূর্তি তৈরি হয়েছে। মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ প্রথম গ্রহণ করেন সারদা প্রসাদ ঘোষের মা দয়াময়ী দাসী। তুলসীরাম ঘোষ স্বপ্নে দেখা কালী মূর্তি অনুযায়ী একটি ছবি আঁকিয়েছিলেন। সেই ছবিটি এখনও মন্দিরে রাখা আছে। তুলসীরামের পুত্রবধূ দয়াময়ী দেবী স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলের সঙ্গে কলকাতায় এসে জমি কিনে মন্দির তৈরি শুরু করেন এবং তুলসীরামের আঁকানো ছবি অনুযায়ী কালী মূর্তি তৈরি করান। পরবর্তীতে মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় স্থাপিত হয় একটি কষ্টি পাথরের কালী মূর্তি এবং নিয়মিত পুজো

শুরু হয়।

 

ভবতারিণী মন্দিরে বৈষ্ণব মতে পুজো হয়।

প্রতি অমাবস্যায় বিশেষ পুজো হয় তবে

কার্তিক অমাবস্যায় বেশি ধূমধাম করে কালী পুজো হয়। এছাড়াও জন্মাষ্টমী, দুর্গাপুজো এবং জগদ্ধাত্রী পুজো হয়ে থাকে। মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাসন্তী পঞ্চমীর দিন সেই কারণে, প্রতি বছর বসন্ত পঞ্চমীর দিন মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষ্যে জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে পুজো হয়।

 

স্থানীয় বাসিন্দারা বিপদে-আপদে মন্দিরে ছুটে আসেন তাদের ভবতারিণী মায়ের মন্দিরে ভক্তদের বিশ্বাস দেবীর কৃপায় যেকোনও বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে অন্য এক কালী মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে। কালী কথায়।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – বন কালী

কালী কথা – বন কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বর্ধমানের অখ্যাত রাজকুসুম গ্রামে আজ থেকে আনুমানিক সাড়ে চারশো বছর আগে।বন কালীর পুজো শুরু হয়। প্রাচীন এই কালী পুজো নিয়ে আজকের কালী কথা।

 

ঠিক কবে কে এই পুজো শুরু করেন তা নিশ্চিত ভাবে বলা না গেলেও এটুকু জানা যায় যে

পুজোর পুরোহিত ছিলেন স্থানীয় ভট্টাচার্য্য পরিবারের এক সদস্য। দুর্গম এই অরণ্যে সেই সময় ছিলো বন্য পশু এবং ডাকাতের ভয়।পুজোর সময়ে পুরোহিতকে রীতিমত লাঠিয়াল সাথে করে জঙ্গলে আনা হত। পুজো অনুষ্ঠিত হতো দিনের বেলায়।

 

একবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য পুজোর স্থানে পৌঁছাতে নানা বাঁধার সৃষ্টি হয়।তারপর স্বপ্নাদেশ পান পুরোহিত । দেবী স্বপ্নে দেখা দিয়ে তাকে তার বাড়িতেই রেখে পুজো করতে বলেন। দেবী আরো বলেন জঙ্গলের মধ্যে একটি গাছের গায়ে দুটো চোখের আকৃতি দেখা যাবে সেই গাছেই তিনি বিরাজমান থাকবেন। সেই গাছের গোঁড়ায় মূর্তি ছাড়াই হবে পুজো।সেই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়।

 

সেই থেকে ভট্টাচার্য বাড়িতে দেবী অধিষ্ঠান করছেন আবার একই সাথে জঙ্গলে এক গাছে দেবীর শক্তি উপস্থিত। সেখানেও ভক্তরা এসে পুজো দেন। জঙ্গল বা বনের মধ্যে দেবী বিরাজ করছেন তাই নাম হয় বন কালী

 

সাধারণত বাংলার সব কালী মন্দিরে দীপান্বিতা অমাবস্যা বা কালী পুজোর দিনেই বড়ো করে

কালী পুজোর আয়োজন হয় কিন্তু বন কালীর পুজো হয় কালী পুজোর পরদিন।এখানে নেই কোনো মূর্তি তার বদলে আছে গাছ এবং গাছে চোখের আকৃতিও দেখা যায়।পাশাপাশি ভট্টাচার্য বাড়তেও বন কালীর আরাধনা হয়।

 

আবার এমন এক প্রাচীন কালী পুজোর ইতিহাস এবং অলৌকিক ঘটনা নিয়ে ফিরে আসবো

কালীর কথার পরবর্তী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – পোদ্দার কালী বাড়ির পুজো

কালী কথা – পোদ্দার কালী বাড়ির পুজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

মেদিনীপুরের প্রাচীন কালী পুজো গুলির মধ্যে পোদ্দার কালীবাড়ির কালীপুজো অন্যতম।আজকের কালী কথায় এই কালী পুজোর অলৌকিক ইতিহাস বর্ণনা করবো।

 

এই পুজোর প্রতিষ্ঠাতা স্থানীয় জমিদার লক্ষ্মী নারায়ণ । তিনি একদিন স্বপ্নাদেশ পান। দেবী তাকে স্বপ্নে মন্দির প্রতিষ্ঠা করে কালী পুজো শুরু করার নির্দেশ দেন।জনশ্রুতি আছে তার দিন কয়েক পরেই মধ্যরাতে লক্ষ্মীনারায়ণ দের কানে ভেসে আসে যেনো এক নূপুর পরিহিতা মহিলা বাড়ির মধ্যে বিচরণ করছেন পরে আরেকবার স্বপ্নাদেশে বলা হয় নূপুরের শব্দ যেখানে গিয়ে বন্ধ হবে সেখানে মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

 

সেই আদেশ অনুযায়ী স্থান নির্বাচন করে সূচনা হয় এ পুজোর । লক্ষ্মী নারায়ণ বাবুর নামের অংশ লছমী কালী বাড়ি নাম হয়।লক্ষী নারায়ণ বাবুর পদবি দে হলেও পেশায় তিনি পোদ্দারি বা হিসেব রক্ষকের কাজ করতেন তাই তার থেকে পুজোর নাম হয় লছি বা লছমী পোদ্দার কালী বাড়ির পুজো।

 

তন্ত্র মতে পুজো হয় তবে বর্তমানে পশু বলীর পরিবর্তে পুজোতে হয় বিভিন্ন সবজি বলি । পুজোতে একশো আট কেজি চাল উৎসর্গ করা হয়। বংশানুক্রমে বর্তমানে এই পুজো করছেন বংশের ছয়জন উত্তরসূরি বা সেবাইত । শুরুর দিন থেকে আজ অবধি পুজোর আচার নিয়মে বিশেষ পরিবর্তন হয়নি ।কয়েক বছর আগে পর্যন্ত প্রথা অনুযায়ী গরুর গাড়িতে নিরঞ্জন হতো এবং তা দেখতে বহু মানুষ ভিড় জমাতেন।

 

ফিরে আসবো কালী কথা নিয়ে আবার আগামী পর্বে। থাকবে আরো একটি কালী মন্দিরের ইতিহাস।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – মালদার ডাকাত কালী

কালী কথা – মালদার ডাকাত কালী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলার ডাকাতদের কালী পুজো নিয়ে বহু কিংবদন্তী প্রচলিত আছে যার কিছু কিছু আমি আপনাদের আগেই বলেছি। আজ কালী কথায় একটি প্রসিদ্ধ ডাকাত কালীর পুজোর কথা জানাবো যা অবস্থিত মালদায়।

অখন্ড ভারত থাকাকালীন ডাকাতদের হাতে শুরু হওয়া এই পুজোর আজও প্রাচীন নিয়ম নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছেন মালদার আদিবাসী অধ্যুষিত হাবিবপুরের বাসিন্দারা

কালী পুজোর রাতে অমাবস্যার তিথিতে আজও দেবী মাতাকে শিকলে বেঁধে এবং সামনে সাদা কাপড় ঝুলিয়ে প্রথম পাঠাবলি দেওয়া হয়। আর যতক্ষণ পাঠাবলির রীতি চলবে ততক্ষণ জ্বলবে দাউদাউ করে অসংখ্য মশাল ।

পুজোড় বয়স প্রায় প্রায় পাঁচশো বছর।
এই কালীপুজো নিয়ে অনেক অদ্ভুত এবং অলৌকিক ঘটনা শোনা যায় । শোনা যায়
পুজোর সময় আশ্চর্যজনক ভাবে দেবী রূদ্র মূর্তি ধারণ করেন। দেবী কালী এখানে ঘোর কৃষ্ণ বর্ণের নরমুন্ডধারিণী তার দিগম্বরী ও এলো কেশি মূর্তি দেখলেই ভক্তি ও শ্রদ্ধা জাগরিত হয় ভক্তদের মধ্যে।

প্রতি অমাবস্যায় বিশেষ করে কালী পুজোর রাতে আজও দেবী মাতাকে শিকলে বেঁধে এবং সামনে সাদা কাপড় ঝুলিয়ে পাঠাবলি দেওয়া হয় এবং বিভীন্ন তান্ত্রিক উপাচার পালন করা হয়।যতক্ষণ এই সব উপাচার চলে ততক্ষণ দাউদাউ করে অসংখ্য মশাল জ্বলে চার পাশে।

আঞ্চলিক ইতিহাস থেকে জানা যায় ব্রিটিশ আমলে দুর্ধর্ষ এক ডাকাত দল এই গ্রামে এসে জঙ্গলের মধ্যে দেবী কালীর পুজো শুরু করেন। সেই সময়ে এইখান দিয়ে বয়ে যেতো পুনরভবা নদী সেই নদী দিয়ে যেসব বণিকেরা বাণিজ্য করতে যেতেন এবং তাদের ওপর লুঠপাট চালাতো ডাকাত দল।তারপর তন্ত্র মতে চলতো মাতৃ সাধনা। সেই মাতৃ সাধনা আজও চলছে সমান ভাবে।

দেবী মূর্তিকে বেঁধে রাখার কারন পাঠাবলির সময় সামনের দিকে অদ্ভুত ভাবে কিছুটা ঝুঁকে যায় মায়ের রুদ্রমূর্তি। মাকে শান্ত করার জন্য ভক্তেরা দেবী মাতাকে পিছনে শিকল দিয়ে কিছুটা সময়ের জন্য বেঁধে রাখেন।অন্তত প্রত্যক্ষদর্শী এবং প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা জনশ্রুতি তাই বলছে।

প্রথম পাঠাবলির সময় সামনে সাদা কাপড় টাঙিয়ে দেওয়া হয়। আর চতুর্দিকে জলে মশাল। এমন ভাবেই যুগ যুগ ধরে ডাকাত কালীর পূজিত হয়ে আসছে ।হাবিব পুরের ডাকাত কালী খুবই জাগ্রতা এবং সব ভক্তের মনোস্কামনা পূর্ণ করেন বলে বিশ্বাস তাই বহু মানুষ আসেন পুজো দিতে। প্রার্থনা জানাতে।

ফিরে আসবো কালী কথার পরের পর্ব নিয়ে। থাকবে এমনই অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর কালী পুজোর কথা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – কোন্নগড়ের শ্মশান কালী

কালী কথা – কোন্নগড়ের শ্মশান কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

 

দেবী কালীর বিভিন্ন রূপের মধ্যে শ্মশান কালী রূপ অন্যতম।সাধারণত তন্ত্র সাধকরাই দেবীর এই রূপের আরাধনা করে থাকেন|আজ কালী কথায় একটি শ্মশান কালী মন্দির নিয়ে লিখবো।

 

দেবীর এই রূপকে শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনে করা হয়। শ্মশানকালী দেবীর গায়ের রং কাজলের মতো কালো। তিনি সর্বদা বাস করেন। তাঁর চোখ দুটি রক্ত পিঙ্গল বর্ণের। চুলগুলি আলুলায়িত, দেহটি শুকনো ও ভয়ংকর। বাঁ-হাতে মদ ও মাংসে ভরা পানপাত্র, ডান হাতে নর মুণ্ড। শ্মশানকালীর আরেকটি রূপে তার বাঁ-পা শিবের বুকে স্থাপিত এবং ডান হাতে ধরা খড়্গ। এই রূপটি ভয়ংকর এবং উগ্র একটি রূপ।

 

একটা সময় ছিল যখন বাংলা বিশেষ করে কলকাতার গঙ্গার প্রায় প্রত‍্যেকটা ঘাটের পাশেই শ্মশান ছিল এবং সেগুলি ছিলো ডাকাত এবং তান্ত্রিকদের আস্তানা। তারা ছিলেন শ্মশান কালীর উপাসক।আজ সেই ডাকাত ও নেই সেই প্রকৃত তান্ত্রিকের সংখ্যাও কমেছে কিন্তু কালী মন্দির গুলো রয়েছে। এমনই এক শ্বশান কালী আছেন হুগলীর কোন্নগরে।

 

কোন্নগরের এই শ্মশান কালী মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা।মন্দিরটি প্রায় দুশ বছর আগেকার। প্রথমে মায়ের মূর্তিটি মাটির তৈরী ছিল।সেই সময়ে এই অঞ্চল ছিলো বেশ দুর্গম। ঘন বনে দিনের বেলায় সূর্যের আলো পৌঁছতো না। ডাকাত রা এই অঞ্চল শাসন করতো। আর ছিলো কাপালিক তান্ত্রিকদের আসা যাওয়া। তখন থেকেই এখানে শ্মশান কালীর পুজো হয়ে আসছে।

 

পরবর্তী কালে মানিক সাধু নামে এক মাতৃ সাধক । মায়ের মাটির মূর্তিটির পরিবর্তন করে পাথরের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করান। মন্দির ও সংস্কার হয়।বর্তমানে মায়ের মন্দিরের ঠিক বিপরীত দিকে শান বাঁধানো আর একটি মন্দির আছে।

 

এই মন্দিরের সাথে ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের স্মৃতি জড়িত আছে।কথিত আছে ১৮৮২ সালের ৩ রা ডিসেম্বর রবিবার শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরম হংস দেব গঙ্গা পার হয়ে এই ঘাটে এসেছিলেন। এবং এখানে বেশ কিছু সময় অতিবাহিত করেছিলেন।প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে হয় ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণও এক সময় শ্মশান কালীর আরাধনা করে ছিলেন।

 

এই মন্দিরে নিত‍‍্য পূজোর পাশাপাশি দীপান্বিতা অমাবস্যা বিশেষ গুরুত্ব সহকারে পালিত হয়।

এছাড়াও তারা মায়ের আবির্ভাব দিবসেও বিশেষ পূজো হয়। বহু ভক্ত আসেন এই সময়গুলিতে।

 

ফিরে আসবো কালী কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে

যথা সময়ে। থাকবে বাংলার আরেকটি

প্রাচীন কালী মন্দিরের ইতিহাস।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন।

কালী কথা – মুক্ত কেশি কালী

কালী কথা – মুক্ত কেশি কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলায় এমন অনেক কালী মন্দির আছে যেগুলি শাস্ত্র মতে সিদ্ধ পীঠ না হলেও অতি জাগ্রত এবং শক্তি পীঠের মর্যাদা পায়।এমনই এক পীঠস্থান আরিয়াদহর মুক্তকেশী কালী মন্দির।

 

বহু প্রাচীন কাল থেকেই আড়িয়াদহ শ্মশান তান্ত্রিক সাধকদের সাধনক্ষেত্র হিসেবে বিখ্যাত। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মায়ের শেষকৃত্য এই শ্মশানে সম্পন্ন হয়েছিল।এই শ্মশানের কাছেই রয়েছে মুক্তকেশী কালী মন্দির। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এই মন্দিরে আসতেন এবং পুরোহিতের আসনে বসে তিনি দেবীর পূজাও করেছেন।

 

প্রথমদিকে একটি তালপাতার এবং মাটির ছোট্ট কুঠিরে দেবী বিরাজ করতেন পরে, ১২৪৭ বঙ্গাব্দে স্থায়ী ভাবে পাকা মন্দির নির্মাণ হয় । এই মন্দিরের বিশেষত্ব হলো দেবীর গর্ভগৃহ দক্ষিণমুখী। তবে মন্দিরটি পশ্চিমমুখী। মন্দিরের প্রবেশ পথের প্রতিদিন নিত্য সেবা হয় তাছাড়া শ্যামাপূজা, দুর্গাপূজা, অক্ষয় তৃতীয় ও অন্নকূট উৎসবে এই মন্দির সারাদিন খোলা থাকে।সেই সময়ে বহু দর্শক সমাগম হয়।

 

পুজো তন্ত্র মতে হয় এবং আগে এখানে পাঁঠা বলি হত। বর্তমানে পশু বলি নিষিদ্ধ তার বদলে এখন দেওয়া হয় চালকুমড়া, আখ, কলা বলি।বাকি সব রীতি নীতি আগের মতোই আছে।

 

জ্যৈষ্ঠ মাসে ফলহারিণী কালী পূজা, কার্তিক মাসে দীপান্বিতা কালী পূজা, মাঘ মাসের কৃষ্ণা চতুর্থীতে রটন্তী কালী পূজা এখানে মহাসমারোহে আয়োজিত হয়।

 

এই শক্তিপীঠের ভৈরব শান্তিনাথ। যাঁকে শিবলিঙ্গ রূপে নিত্য পুজো করা হয়। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, দেবী মুক্তকেশী অত্যন্ত জাগ্রত।

তিনি ভক্তের প্রতিটি কামনা,

বাসনা পূরণ করেন।

 

ফল হারিণী অমাবস্যা উপলক্ষে চলতে থাকবে কালী কথা থাকবে।ফিরে আসবো কালীকথার নতুন পর্ব নিয়ে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – দয়াময়ী কালী 

কালী কথা – দয়াময়ী কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দেবী কালী নানা রূপে নানা নানা নামে এই বঙ্গের নানা প্রান্তে পূজিতা হন। আজ দেবীর যে রূপটির কথা বলবো তা দয়াময়ী নামে খ্যাত।

বর্তমান হুগলি জেলার চুঁচুড়ায় দয়াময়ী কালী মন্দির যার পথ চলা শুরু সেই মোঘল যুগে।

 

বাদশা আকবরের বিশ্বস্ত কর্মচারী

রাজা টোডরমল চুঁচুড়া অঞ্চলটি রেখেছিলেন তার অনুগত জায়গীরদার জিতেন রায়ের তত্ত্বাবধানে। শাক্ত জিতেন ছিলেন দেবী কালিকার ভক্ত।

তিনিই এইখানে নির্মাণ করেন মন্দির এবং দেবী দয়াময়ীকে প্রতিষ্ঠা করেন শাস্ত্র মতে।

 

প্রাচীন এই মন্দির নির্মাণ হয় বাংলার পরিচিত স্থাপত্য শৈলীতে।সেই আমলে তৈরী বিশেষ পাতলা ইট দিয়ে গড়ে ওঠে এই মন্দির।অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে মন্দিরপ্রাঙ্গণ। উন্মুক্ত প্রাঙ্গনের পূর্বদিকে দেবী দয়াময়ীর মন্দির।পাশেই পরপর দাঁড়িয়ে চারটি শিবমন্দির। সে যুগে কালী মন্দিরের সাথে ভৈরব রূপে শিব মন্দির নির্মাণের রীতি ছিলো। দেবী মন্দিরের চুড়ো গম্বুজাকৃতি। ছোট ছোট সিঁড়ির ধাপের মতো উঠে গিয়েছে নিচ থেকে উপর পর্যন্ত। মন্দির বিশাল নয় তবে ভারী সুন্দর গঠনশৈলী এবং প্রাচীনত্ত্ব এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্যর দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই দয়াময়ী দেবীর মন্দির।

 

পুরোনো এই মন্দিরের গর্ভগৃহে দেবী দক্ষিনা

কালীর একটি বিগ্রহ রয়েছে যার উচ্চতা প্রায় দেড় থেকে পৌনে দু-হাত এবং মূর্তিটি কষ্টিপাথরে নির্মিত। পাথরের বেদিতে মহাদেব শুয়ে আছেন দয়াময়ীর পদতলে। কষ্টি পাথরের হলেও এখানে দেবী মূর্তি হাল্কা খয়েরি আভাযুক্ত তাই বিগ্রহের আকর্ষণই আলাদা।তীক্ষ্ণ নাক। উন্মুক্ত কেশ রাশি।বিগ্রহের মুখমণ্ডল সামান্য লম্বাটে।দেবীর ত্রিনয়ন এবং জিহ্বা স্বর্ণমণ্ডিত। কণ্ঠহার মুণ্ডমালা, হাতের খড়গ রুপোয় তৈরি।সব মিলিয়ে দয়াময়ী কালীর অপরূপ রূপ প্রত্যক্ষ করলে হৃদয় ও চোখ জুড়িয়ে যায়।

 

স্থানীয় দের কাছে অত্যান্ত জাগ্রত দেবী দয়াময়ী।

প্রতিদিন দূর দূরান্ত থেকে অগণিত ভক্তের সমাগম ঘটে।প্রতি ফল হারিণী অমাবস্যায় বিশেষ পুজোর আয়োজন হয়।

 

ফল হারিণী অমাবস্যা উপলক্ষে চলবে কালী কথা

ফিরে আসবো আগামী দিনে।কালী কথার নতুন পর্ব নিয়ে।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।