Home Blog Page 3

গুরু কথা – তোতাপুরী মহারাজ

গুরু কথা – তোতাপুরী মহারাজ

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজ ভারতের আধ্যাত্মিক গুরুদের নিয়ে এই ধারাবাহিক উপস্থাপনায় বলবো ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের দীক্ষা গুরু তোতাপুরী মহারাজকে নিয়ে।জানাবো

তার অলৌকিক জীবন কাহিনী।

তোতাপুরীর সন্ন্যাস পূর্ব জীবন,তার জন্ম কাল জন্মস্থান ও পরিবার সম্পর্কে সঠিক তথ্য কমই পাওয়া যায় তায় সেই দিকে না গিয়ে তার অলৌকিক ব্যাক্তিত্ব ও রহস্যময় সন্ন্যাস জীবনর কথাই বলবো।

তোতাপুরী লম্বা-চওড়া সুদীর্ঘ পুরুষ ছিলেন।দীর্ঘ সময় ধ্যান ও যোগ সাধনার মাধ্যমে তিনি সাধনার অত্যন্ত উচ্ছ পর্যায়ে আরোহন করেছিলেন, পুরী সম্প্রদায় ভুক্ত এই নাগা সন্ন্যাসী ছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণর দীক্ষা গুরু তা আগেই বলছি।তোতাপুরী তিন দিনের বেশি কোথাও থাকতেননা কিন্তু ব্যতিক্রম হয়েছিলো দক্ষিনেশ্বর এসে|এখানে বেশ দীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়েছিলেন রামকৃষ্ণর সান্নিধ্যে|গুরুর নাম গ্রহণ করা শাস্ত্রমতে বারণ তাই শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে ‘ল্যাংটা’ বা ‘ন্যাংটা’ বলে উল্লেখ করতেন|গঙ্গার ধারে পঞ্চবটি উদ্যানে ধুনী জ্বালিয়ে তিনি সাধনা করতেন এখানেই তার কাছে দীক্ষা নিয়ে নিয়ে ছিলেন স্বয়ং রামকৃষ্ণ আবার আশ্চর্য জনক ভাবে ঠাকুরের অলৌকিক ক্ষমতা ও তার অগাধ জ্ঞানের পরিচয় পেয়ে গুরু তোতাপুরী বিদায় নেয়ার আগে শিষ্য রামকৃষ্ণর কাছে দীক্ষা নিয়ে যান|

তোতাপুরীর মতে সকলই ছিল মায়া। দেব-দেবীর মূর্তিপূজাকেও তিনি উপহাস করতেন। বিশ্বাস করতেন এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্মে কিন্তু রামকৃষ্ণ তার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেন, এক্ষেত্রে এক অলৌকিক ঘটনার ও উল্লেখ পাওয়া যায়, একবার দক্ষিনেশ্বরে থাকা কালীন পেটের যন্ত্রনায় কাবু তোতাপুরী গভীর রাতে গঙ্গায় প্রান বিসর্জন দিতে গিয়ে দেখলেন কোথাও ডুবজল নেই, হেঁটেই পার হওয়া যায় গঙ্গা, তিনি উপলব্ধি করলেন ভবতারিনীর লীলা, সাক্ষাৎ করলেন স্বয়ং মা জগদম্বাকে, শরীরের সব যন্ত্রনা মুহূর্তে গায়েব হয়ে গেলো|

শিষ্য কে বললেন সব কথা।মেনে নিলেন মায়ের উপস্থিতি।মেনে নিলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণের শ্রেষ্ঠত্ব পাল্টা দীক্ষাও নিলেন তার কাছে,গুরুকে পাল্টা দীক্ষা দানের এই ঘটনা ভারতের আধ্যাত্মিক জগতে এবং গুরু শিষ্য পরম্পরায়

বিরলতম ঘটনা।

আজকের পর্ব এই মহান গুরুকে প্রনাম জানিয়ে শেষ করলাম।আবার আগামী পর্বে দেখা হবে

গুরু কথায়। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – মহাবতার বাবাজি

গুরু কথা – মহাবতার বাবাজি

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

সাধনার জোরে অমরত্ত্ব লাভ করেছেন এমন নজির খুব কমই আছে জগতে। মহাবতার বাবাজি এমনই একজন সিদ্ধ যোগী।আজকের গুরু কথার এই পর্বে ভারতের এই অন্যতম রহস্যময় এবং মহানতম যোগী পুরুষ মহাবতার বাবাজির অলৌকিক জীবন এবং সাধনা নিয়ে লিখবো।

শ্রদ্ধেয় মহাবতার বাবাজি কে নিয়ে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য গল্প, কিংবদন্তি এবং রহস্য|কেউ কেউ মনে করেন ক্রিয়া যোগের মাধ্যমে তিনি অমরত্ব লাভ করেছেন|কঠোর সাধনার মাধ্যমে তিনি সময় কে জয় করে জন্ম মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করেছেন এবং আশ্চর্য জনক ভাবে হাজার হাজার বছর ধরে স্বশরীরে বিরাজ করছেন এই পৃথিবীতে| একাধিক বার তার সাক্ষাৎ লাভ করে ধন্য হয়েছেন একাধিক সাধক|শোনা যায় হিমালয়ের এক দুর্গম স্থানে শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয় কে দীক্ষা দিয়েছিলেন স্বয়ং মহাবতার বাবাজি|পরমহংস যোগানন্দ তার ” অটো বায়োগ্রাফি অফ এ যোগী ” বইয়ে তার মহাবতার বাবাজির দর্শনের কথা বলেছেন|একাধিক বার সামনে এসেছে হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে তার রহস্যময় উপস্থিতির কথা|

বাবাজির জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না তবে মনে করা হয় তামিলনাড়ুর কোনো গ্রামে তার জন্ম হয়েছিলো, তার সঠিক বয়স নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে|কারুর মতে 5000 তো কারুর মতে 2000 বছরের কিছু বেশি তার বয়স|যোগ বলে তিনি তারুণ্য কে ধরে রেখেছেন তাই দেখলে মনে হয় এক যুবক|বাবাজির ইচ্ছে না থাকলে তাকে দর্শন করা যায়না|তিনি ঝড়ের গতিতে প্রকট হন আবার মহাশূন্যে মিলিয়ে যান|একটি প্রচলিত বিশ্বাস মতে হিমালয়ের কোনো এক অজ্ঞাত স্থানে রয়েছে জ্ঞানগঞ্জ নামে এক রহস্যময় মঠ, যেখানে সিদ্ধ পুরুষ ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারেনা, বাবাজির সেই মঠেই থাকেন, শুধু তাই নয় তিনি জ্ঞান গঞ্জের আচার্য|সুক্ষ দেহে তিনি সর্বত্র বিচরণ করেন আবার প্রয়োজন হলে নিজ দেহ ধারন করে প্রকট হন, তবে তার দর্শন করে অতি দুর্লভ ঘটনা, এবং সৌভাগ্যর হাতে গোনা কয়েকজন আজ অবধি তার দর্শন করতে পেরেছেন|

বর্তমানে হিমালয়ের দুর্গম এক স্থানে অবস্থিত একটি গুহাকে মহাবতার বাবাজির গুহা হিসেবে
চিহ্নিত করা হয়েছে। শোনা যায় এটি তার সাধনার স্থল এবং এখানে তিনি মাঝে মাঝে আসতেন। আজ বহু মানুষ এই দুর্গম পথ পেরিয়ে আসেন বাবাজির এই গুহা দর্শন করতে এবং তাদের কাছে এই স্থান অতি পবিত্র এক মন্দির স্বরূপ।

মহাবতার বাবাজিকে বলা হয় গুরুদের গুরু বা জগৎ গুরু|ক্রিয়া যোগের তিনি প্রান পুরুষ|ধ্যান, আধ্যাত্মিকতা এবং যোগাসন কে তিনি এক সূত্রে গেথেছেন কয়েক হাজার বছর আগে|পরবর্তীতে তার পথ অনুসরণ করে আধ্যাত্মিক পথে এগিয়েছেন তার সুযোগ্য শিষ্যরা যার মধ্যে শ্যামাচরণ লাহিড়ী, যুক্তেশ্বর গিরি, পরমহংস যোগানন্দ প্রমুখ।

আগামী পর্ব গুলিতে
এরকম আরো অনেক রহস্যময়
আধ্যাত্মিক গুরুদের জীবন এবং সাধনা
সম্পর্কে নানা তথ্য আপনাদের সামনে নিয়ে আসবো।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – শ্রী প্রেমানন্দ মহারাজ

গুরু কথা – শ্রী প্রেমানন্দ মহারাজ

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

এই মুহূর্তে যে কয়জন প্রকৃত সাধু ভারতের পুন্য ভূমিতে স্বশরীরে বিরাজ করছেন এবং আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে অসংখ্য মানুষকে প্রতিদিন আধ্যাত্মিক মার্গে চলার পথ দেখাচ্ছেন বৃন্দাবনের প্রেমানন্দ বাবা তাদের মধ্যে অন্যতম।আজকের গুরু কথায় এই মহান গুরুর কথা লিখবো।

প্রেমানন্দ জী রাধারানীর ভক্ত এবং রাধাবল্লভ সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসী।বিহারের এক দরিদ্র
কৃষক পরিবারে জন্মানো অনিরুদ্ধ পান্ডে শুরু থেকে ছিলেন শিব ভক্ত।ছোটবেলায়, তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা ধ্যান এবং প্রার্থনায় মগ্ন থাকতেন , প্রায়শই ভক্তিমূলক স্তোত্রের সুরে নিজেকে হারিয়ে ফেলতেন।কৈশোরে গৃহ ত্যাগ করে তিনি পথে ঘুরে বেড়াতেন এবং আশ্রয় নিতেন শিব মন্দিরে। দীর্ঘ দিন তিনি কাশীর বিভিন্ন ঘাটে ঘাটে অভুক্ত অবস্থায় অসুস্থ্য শরীরে কাটিয়েছেন তার পর একদিন নিছক রাস উৎসব দেখতে যান বৃন্দাবনে এখানেই ঘটে যায় তার জীবনের সব থেকে বর পরিবর্তন। তিনি নিজের জীবনের আসল উদ্দেশ্য খুঁজে পান। নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পিত করেন রাধা রানীর চরণে।হয়ে ওঠেন পরম পূজনীয়
প্রেমানন্দ মহারাজ।

বর্তমানে শ্রী প্রেমানন্দ জি মহারাজ রাধাজীর সেবায় এবং ঐশ্বরিক প্রেমের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন তিনি প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা প্রার্থনা এবং ধ্যানে কাটান।রাধাজির ঐশ্বরিক উপস্থিতিতে নিজেকে নিমজ্জিত করে রেখেছেন।

শ্রী প্রেমানন্দ জি মহারাজ বিশ্বাস করেন যে ভক্তির পথ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি শিখিয়েছেন যে ঈশ্বরের প্রতি ভালবাসা সর্বজনীন এবং জীবনের সকল স্তরের ব্যক্তিরা এটি অনুভব করতে পারে। তাই আজ তার অনগিত ভক্ত ভর রাত থেকে তার দর্শন পাওয়ার জন্য এবং তার বাণী শোনার জন্য প্রতীক্ষা করেন।
বহু বিখ্যাত মানুষ তার দর্শন পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করেন।

তার গোটা জীবনটাই অলৌকিক এবং
বিস্ময়কর কারন যার আজ থেকে কয়েক দশক আগে না ছিলো আশ্রয় না কোনো অন্নসংস্থান তিনিই আজ বহু মানুষের একমাত্র আশ্রয়। অনেকে বলেন তিনি ভগবত প্রাপ্ত সিদ্ধ পুরুষ তা নাহলে কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে এতো অসুস্থ শরীর নিয়ে এতো জপ তপ এবং সাধনা অসম্ভব।

নিজের অসংখ্য ভক্ত শিষ্যদের তিনি সাত্ত্বিক জীবন
জাপন এবং নিরন্তর রাধা নাম জপার পরামর্শ
দিয়ে থাকেন।

আবার গুরু কথার পরবর্তী পর্বে এমন কোনো আধ্যাত্মিক গুরুর জীবন এবং সাধনার কথা নিয়ে ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী

গুরু কথা – স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ গুরু কথায় আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীকে নিয়ে লিখবো।

 

সমগ্র হিন্দু সমাজকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।উনবিংশ শতকের এই মহান কর্মযোগী দার্শনিক এবং সনাতন ধর্মের প্রচারক

ভারতে সামাজিক এবং শিক্ষামূলক বিভিন্ন

সংস্কার মূলক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

 

স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী জন্মগ্রহণ করেন ১৮২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি।বর্তমান গুজরাটের কাঠিয়ার নামক স্থান ছিল তাঁর জন্মস্থান।বাল্যকালে তাঁর নাম ছিল শঙ্কর তেওয়ারি। কর্শানজি লালজি তিওয়ারি ছিলেন তাঁর পিতা এবং মাতার নাম ছিল যশোদাবাঈ।

 

মাত্র ২২ বছর বয়সেই তিনি জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে ফেলেন।পরবর্তী সময়কাল সত্যের সন্ধানে একজন সন্ন্যাসী হয়ে কাটান। সন্ন্যাস জীবনে গুরু হিসাবে তিনি সান্নিধ্য লাভ করেন ব্রিজানন্দর এবং গুরুদক্ষিণা হিসেবে তিনি সনাতন সমাজে বেদের আদর্শকে পুনঃস্থাপনের ব্রত নেন।

 

স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর মূল বাণী ছিল, ‘বেদের যুগে ফিরে চলো’। এই আদর্শেই তিনি জীবন অতিবাহিত করেছেন।তাছাড়া আর্য সমাজের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই। তিনি শুদ্ধি আন্দোলনও শুরু করেছিলেন। যে সমস্ত হিন্দুরা নানা কারণে ধর্মান্তরিত হতেন, শুদ্ধি আন্দোলনের মাধ্যমে পুনরায় তাঁদের হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনা হত।এই ভাবে বহু সনাতনীর পুনরুদ্ধার করেন স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতি এবং তার আর্য্য সমাজ।

 

বৈদিক সাহিত্যের প্রচারের জন্য তিনি স্কুল এবং কলেজ স্থাপন করেন, ‘সত্যার্থ প্রকাশ’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন।পত্রিকার মাধ্যমে সামাজিক এবং বিভিন্ন ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি আওয়াজ তুলতেন।

 

নারী স্বাধীনতা এবং সমাজের বঞ্চিত শ্রেণির ক্ষমতায়নের পক্ষেও তিনি বহু কাজ করেন।

স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী মনে করতেন, বৈদিক শিক্ষার মাধ্যমেই ভারতের সমাজ এবং সভ্যতার পুনর্জাগরণ সম্ভব। এজন্য তিনি অসংখ্য গুরুকুল স্থাপন করেন। পুরুষ-নারীদের আলাদা আলাদা গুরুকূল তিনি স্থাপন করেছিলেন।

 

তৎকালীন পরাধীন ভারতে রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্যও তিনি সক্রিয় ছিলেন । তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি স্বরাজ কথাটি সর্ব প্রথম ব্যবহার করেছিলেন।ঊনবিংশ শতকের এই মহান কর্মযোগী মাত্র ৫৯ বছর বয়সে ৩০ অক্টোবর ১৮৮৩ সালে প্রয়াত হন।

 

আজও তার আদৰ্শ এবং কর্ম কান্ড নিয়ে এগিয়ে

চলেছে তাঁর আর্য্য সমাজের ভক্ত শিষ্যরা। আজ

এই মহান গুরুকে প্রনাম জানাই।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে আবার গুরু কথা

নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য দেব 

গুরু কথা – মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য দেব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ভারতের মহান আধ্যাত্মিক গুরুদের কথা লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি বাংলার নবজাগরনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ও মহান বৈষ্ণব সাধক শ্রী চৈতন্যদেবের কথা না বলা হয়।আজকের পর্বে

মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যদেব।

 

১৪৮৬ সালের এক দোল পূর্ণিমায় বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার তৎকালীন পীঠস্থান নবদ্বীপে জন্মে ছিলেন গৌরাঙ্গ।নিম গাছের ছায়ায় তিনি জন্মে ছিলেন তাই নাম রাখা হয়ে ছিলো নিমাই।তার জন্মের বহু পূর্বেই একাধিক প্রাচিন শাস্ত্রে তার আবির্ভাব সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করা হয়েছে।

পরবর্তীতে তিনি কৃষ্ণ সাধনায় নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে বিলিয়ে দিয়ে হয়ে উঠলেন মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য|

 

টোলে অধ্যাপনা ছেড়ে, সংসার ছেড়ে নিমাই যখন কৃষ্ণ প্রেমে মজেছেন তখন তার কৃষ্ণনাম এবং নগর সংকীর্তন সেই সময়ে অসংখ্য যুবককে আকর্ষণ করে এবং তারা মহাপ্রভুর শিষ্যত্ত গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে শ্রী ক্ষেত্রে মহাপ্রভু মহা প্রভু

হয়ে ওঠেন অসংখ্য বৈষ্ণবের গুরু এবং পরম আশ্রয়।

 

বৈষ্ণবরা মহাপ্রভুকে বিষ্ণুর অংশ হিসেবেই দেখেন এবং তার সাথে নৃসিংহ অবতারের তুলনাও করা হয়। যুক্তি হিসেবে বলা হয় মহাপ্রভু সিংহ রাশিতে জন্মে ছিলেন। তার দেহের রঙ্গ ছিলো সিংহের ন্যায় সোনালী এবং উজ্জ্বল। তার কেশরাশি এবং হাঁটা চলার সাথেও সিংহের তুলনা করা হয়। সর্বোপরি তার ব্যাক্তিত্ব ছিলো রাজকীয়।

 

একবার মহপপ্রভু শ্রীনিবাস ঠাকুরেরর বাড়িতে এক অপূর্ব অলৌকিক লীলা প্রদর্শন করেন। তখন প্রবলভাবে সংকীর্তন হচ্ছিল। তিনি ভক্তদের জিজ্ঞাসা করলেন যে, তাঁরা কি খেতে চান, এবং তাঁরা জানালেন যে, তাঁরা আম খেতে চান, তখন তিনি আমের আটি চাইলেন। তখন আমের সময় ছিল না, আঁটিটি যখন তাঁর কাছে আনা হল, তখন তিনি সেটি শ্রীনিবাস ঠাকুরের অঙ্গনে পুঁতলেন এবং তৎক্ষণাৎ সেই আঁটিটি অঙ্কুরিত হয়ে ক্রমন্বয়ে বর্ধিত হতে লাগল। অচিরেই সেটি একটি আম গাছে পরিণত হল এবং সেই গাছে এত সুপক্ব আম ধরল যে, ভক্তরা তা খেয়ে শেষ করতে পারলেন না। গাছটি শ্রীনিবাস ঠাকুরের অঙ্গনেই রইল এবং ভক্তরা সেটি থেকে তাঁদের যত ইচ্ছে আম নিয়ে খেল। ভক্তরা মহাপ্রভুর এই অপ্রাকৃত লীলা দেখে মুগ্ধ হল।এখনও সেই গাছ শ্রীনিবাস গৃহের উঠোনে বর্তমান।

 

শোনা যায় মহাপ্রভু যখন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হরি নাম করতে করতে এগোতেন তখন বনেরা হিংস্র পশুরাও তার হিংসা ভুলে মোহিত হয়ে তার নাম সংকীর্তন শুনতো।

 

সারা বিশ্ব কে তিনি দিয়েগেছেন কৃষ্ণ নাম যে

নাম আজ ছড়িয়ে পড়ছে দাবানলের মতো সারা পৃথিবীতে|জাতী ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মহা প্রভু সবাইকে আপন করে নিয়ে ছিলেন|তার সাধনা ছিলো একটাই মানুষকে ভালো বাসা, আর কৃষ্ণের চরণ যুগলে নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে সপেঁ দেয়া, তার সাধনার পদ্ধতিও ছিলো সরল মৃদঙ্গ ও হরে কৃষ্ণ মহা মন্ত্র|আজও গুরু পরম্পরার মধ্যে দিয়ে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ এবং ইস্কন মহাপ্রভুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কৃষ্ণ নাম কে জগতের সর্বত্র পৌঁছে দিচ্ছে।

 

গুরু কথায় এখনো অনেক এমন মহান

আধ্যাত্মিক গুরুদের নিয়ে আলোচনা

বাকি আছে।ফিরে আসবো

আগামী পর্বে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবা 

গুরু কথা – শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের গুরু কথায় পরম শ্রদ্ধেয় এবং মহান আধ্যাত্মিক গুরু শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর জীবন এবং সাধনা নিয়ে লিখবো।

 

ইংরেজির ১৭৩৫ খ্রিস্টাব্দে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার চাকলা গ্রামে লোকনাথ বাবার জন্ম হয়েছিল। তার পিতার নাম ছিল রামনারায়ন এবং মায়ের নাম ছিল কমলাদেবী। পিতা-মাতার চতুর্থ সন্তান ছিলেন তিনি। ছোটো থেকেই তার মধ্যে আধ্যাত্মিক জগৎ এবং পরম ব্রহ্মকে জানার অন্তত জিজ্ঞাসা দেখা যায়।তার যখন এগারো বছর বয়সে তখন তাকে উপনয়ন করিয়ে পাশের গ্রামের ভগবান গাঙ্গুলীর হাতে সন্ন্যাস এর জন্য তুলে দেওয়া হয়েছিল। তার বাল্যবন্ধু ছিল বেণীমাধব।ছোট্ট বেণীমাধব এবং লোকনাথ গুরুর হাত ধরে নানা স্থান পরিক্রমা করে বেড়াতে শুরু করেন। এই সময় তিনি ধ্যান জপ এবং সাধনার আরো অনেক কৌশল শেখেন।

 

গুরু ভগবান গাঙ্গুলি নানা ভাবে তার শিষ্যর পরীক্ষা নিয়েছেন।তিনি বালক লোকনাথের মনোসংযোগের পরীক্ষা নেয়ার জন্য প্রতিকূল পরিবেশে তাকে ধ্যানে বসতে বলতেন। এমনকি ধ্যান চলা কালীন চিনি চড়িয়ে পিঁপড়ে দের আকর্ষণ করতেন। প্রথম দিকে ধ্যান ভঙ্গ হলেও ধীরে ধীরে লোকনাথ তার ইন্দ্রিয় জয় করতে শিখলেন এবং একে একে সাধনার একেকটি কঠিন ধাপ পেরিয়ে হয়ে উঠলেন সিদ্ধ যোগী।

 

অসংখ্য ভক্ত শিষ্য তাঁর অনুগামী হন। দুই বাংলা তথা গোটা দেশে রয়েছে বহু আশ্রম। প্রতিবছর ঘটা করে বাবা লোকনাথের জন্ম তিথি এবং

তিরোধান দিবস পালিত হয়।চাকলা ধাম সহ প্রতিটি লোকনাথবাবার মন্দিরে বহু ভক্তের সমাগম হয়। আজীবন তিনি মানুষকে সর্বদা সত্যের পথে চলতে নির্দেশ দিয়ে গেছেন।

অনেকেই তাঁকে শিবের অবতার বলে মনে করেন

এবং যেকোনো বিপদ আপদ থেকে বাবা লোকনাথ

তাদের উদ্ধার করবেন বলেই তাদের বিশ্বাস।

 

একাধিক অলৌকিক ঘটনা আছে বাবা লোকনাথের জীবনে।শোনা যায় বরোদাতে

থাকার সময়ে একবার অহংকারী সাধক লোকনাথ বাবাকে সিদ্ধিলাভের প্রমাণ দিতে বলেন। তিনি বলেছিলেন লোকনাথ বাবা যদি সিদ্ধপুরুষ হন তবে তিনি তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করবেন। লোকনাথ বাবাকে ধুতরা ফুল ও ভয়ংকর সাপের বিষ দেওয়া হয়েছিল। সেই বিষকে পরাজিত করে বাবা লোকনাথ অক্ষত ছিলেন।

 

বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের বারদী আশ্রমে তিনি সমাধিস্থ হয়েছিলেন। জানা যায় যে এক ভক্ত পুত্রের যক্ষ্মারোগ তিনি নিজের শরীরে ধারণ করেছিলেন তাতে বালকটি পুরো সুস্থ হয়ে ওঠে এবং এই ঘটনার কিছুদিন পর যক্ষ্মা রোগে বাবা লোকনাথের মৃত্যু ঘটে। একশো ষাট বছর বয়সে লোকনাথ বাবা পরলোক গমন করেন।

 

আবার গুরু কথার আগামী পর্বে অন্য এক মহান গুরুর জীবন এবং সাধনার কথা নিয়ে

ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – শ্রী শ্রী ভবা পাগলা

ভবা পাগলা: ভক্তি, মাতৃসাধনা ও অলৌকিক আধ্যাত্মিক জীবনের এক অনন্য অধ্যায়

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলার সাধক-ঐতিহ্যের ইতিহাসে এমন কিছু মহাপুরুষের নাম আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, যাঁদের জীবন ছিল একাধারে রহস্যময়, অলৌকিক এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত। সেই বিরল সাধকদের অন্যতম হলেন ভবা পাগলা। তিনি ছিলেন মাতৃসাধক, শ্যামাসঙ্গীত রচয়িতা, আধ্যাত্মিক গুরু এবং অসংখ্য মানুষের কাছে এক জীবন্ত আশ্রয়। তাঁর গান, তাঁর বাণী এবং তাঁর জীবনদর্শন আজও লক্ষ লক্ষ ভক্তের হৃদয়ে সমানভাবে আলো জ্বেলে রেখেছে। বাহ্যিকভাবে তাঁকে অনেকেই “পাগল” বলে মনে করলেও, প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন ঈশ্বরপ্রেমে আত্মহারা এক বিরল সাধক। তাই মানুষের মুখে মুখে তাঁর নাম হয়ে ওঠে “ভবা পাগলা”।

ভবা পাগলার প্রকৃত নাম ছিল ভবেন্দ্র মোহন চৌধুরী (কিছু সূত্রে ভবেন্দ্রনাথ চৌধুরী নামও উল্লেখ করা হয়েছে)। তাঁর পিতার নাম ছিল গজেন্দ্র মোহন চৌধুরী। তিনি অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার আমতা অঞ্চলে (বর্তমানে বাংলাদেশে) উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, সাধারণভাবে ১৯০২ সালের দিকে জন্মগ্রহণ করেন বলে অধিকাংশ গবেষক মত প্রকাশ করেছেন, যদিও তাঁর জন্মসাল নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ধর্মভাব, সঙ্গীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ এবং দেবী মহামায়ার প্রতি অসীম টান লক্ষ্য করা যেত। সাধারণ খেলাধুলার চেয়ে নির্জনে বসে ঈশ্বরচিন্তা, ভক্তিগান এবং ধ্যানেই তিনি বেশি আনন্দ পেতেন।

শৈশব থেকেই ভবা ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং হৃদয়বান। মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করত। দরিদ্র, অসহায় কিংবা বিপদগ্রস্ত মানুষকে দেখলে তিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের চেষ্টা করতেন। পার্থিব জীবনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ খুব কম ছিল। সংসারের নানা নিয়ম, প্রতিষ্ঠা কিংবা অর্থসম্পদের চেয়ে তিনি ঈশ্বরের সান্নিধ্যকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বলে মনে করতেন। এই কারণেই সমাজের অনেকেই তাঁকে প্রথমদিকে অস্বাভাবিক বা পাগল বলে ভাবতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করে যে এই “পাগলামি” আসলে ছিল মাতৃভক্তির পরম উন্মাদনা।

কৈশোর ও যৌবনে তাঁর জীবনে বহু আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার কথা ভক্তদের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, তিনি প্রায়ই মা কালীকে প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করতেন এবং কখনও কখনও মাতৃভাবাবিষ্ট হয়ে দীর্ঘ সময় ধ্যানমগ্ন থাকতেন। তাঁর কাছে আসা বহু মানুষ দাবি করেছেন যে, তিনি মানুষের অন্তরের কথা বুঝতে পারতেন এবং অনেক সময় এমন কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করতেন যা পরবর্তীকালে সত্য বলে প্রমাণিত হতো। যদিও এসব ঘটনার ঐতিহাসিক প্রমাণ সর্বত্র পাওয়া যায় না, তবুও তাঁর ভক্তদের কাছে এগুলো তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির প্রকাশ হিসেবে আজও সমাদৃত।

ভবা পাগলার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর রচিত ভক্তিগীতি। তিনি হাজারেরও বেশি শ্যামাসঙ্গীত ও আধ্যাত্মিক গান রচনা করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তাঁর গানের ভাষা ছিল সহজ, হৃদয়স্পর্শী এবং গভীর দর্শনে পূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্য জটিল আচার-অনুষ্ঠানের প্রয়োজন নেই; দরকার কেবল নির্মল হৃদয়, অকৃত্রিম ভক্তি এবং মায়ের প্রতি নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণ। তাঁর গান শুনে অসংখ্য মানুষের জীবনে আধ্যাত্মিক পরিবর্তন এসেছে বলে ভক্তরা বিশ্বাস করেন। আজও তাঁর গান বাংলার বিভিন্ন মন্দির, আশ্রম এবং ভক্তসমাজে সমান জনপ্রিয়।

দেশভাগের পর তিনি পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন এবং জীবনের একটি বড় অংশ কাটান এখানেই। তাঁর আশ্রমে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় জমাতেন। কেউ আসতেন মানসিক শান্তির খোঁজে, কেউ পারিবারিক সমস্যার সমাধান চাইতে, আবার কেউ শুধুমাত্র তাঁর সান্নিধ্যে কয়েক মুহূর্ত কাটানোর জন্য। তিনি সকলকে সমান স্নেহে গ্রহণ করতেন। তাঁর কাছে ধনী-গরিব, জাত-পাত বা ধর্মের কোনো ভেদাভেদ ছিল না। তিনি বলতেন, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে একজন মানুষ, আর সেই মানুষ যদি সত্য, প্রেম ও ভক্তির পথে চলে, তবে ঈশ্বর নিজেই তাকে পথ দেখান।

ভবা পাগলার জীবন ছিল অত্যন্ত সরল। তিনি কখনও বিলাসিতা বা প্রচারের প্রতি আকৃষ্ট হননি। সাধারণ পোশাক, সহজ জীবনযাপন এবং সর্বদা ঈশ্বরের নামস্মরণ—এই ছিল তাঁর জীবনের মূল বৈশিষ্ট্য। তিনি ভক্তদের শিখিয়েছিলেন যে অহংকার মানুষকে ঈশ্বর থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু বিনয় ও ভালোবাসা মানুষকে ঈশ্বরের আরও কাছে নিয়ে যায়। তাঁর প্রতিটি আচরণে ছিল মায়ের প্রতি নিঃশর্ত বিশ্বাস এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।

তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু অলৌকিক কাহিনি। অনেক ভক্তের বিশ্বাস, তাঁর আশীর্বাদে কঠিন রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করেছেন অনেকে, আবার অনেকের জীবনের জটিল সমস্যারও অপ্রত্যাশিত সমাধান হয়েছে। এসব ঘটনার সত্যতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয় নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই—ভবা পাগলার ব্যক্তিত্ব মানুষের হৃদয়ে গভীর আস্থা, ভক্তি এবং আশার সঞ্চার করেছিল। তাঁর সামনে এসে বহু মানুষ এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি অনুভব করতেন।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ভক্তদের মধ্যে ঈশ্বরপ্রেম, মানবসেবা এবং মাতৃসাধনার বাণী প্রচার করে গিয়েছেন। দীর্ঘ আধ্যাত্মিক সাধনা ও অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালিয়ে তিনি ১৯৮৪ সালে দেহত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে ভক্তসমাজ গভীর শোকাহত হলেও তাঁর শিক্ষা, তাঁর গান এবং তাঁর আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার আজও সমানভাবে জীবন্ত। প্রতি বছর তাঁর স্মরণোৎসবে অসংখ্য ভক্ত সমবেত হয়ে তাঁর রচিত গান গেয়ে এবং তাঁর আদর্শ স্মরণ করে তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

আজকের ব্যস্ত, উদ্বেগময় এবং স্বার্থকেন্দ্রিক পৃথিবীতে ভবা পাগলার জীবন আমাদের এক অমূল্য শিক্ষা দেয়। তিনি দেখিয়েছেন, সত্যিকারের শক্তি অর্থ, ক্ষমতা বা খ্যাতিতে নয়; প্রকৃত শক্তি নিহিত আছে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, মানবসেবা, বিনয় এবং ঈশ্বরের প্রতি অটল বিশ্বাসে। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে মানুষ নিজের হৃদয়কে ভালোবাসা ও ভক্তিতে পূর্ণ করতে পারে, তার মধ্যেই ঈশ্বরের আবাস ঘটে। তাই ভবা পাগলা শুধুমাত্র একজন সাধক নন; তিনি বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক চিরজাগ্রত আলোকবর্তিকা, যাঁর জীবন ও বাণী আগামী প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করে যাবে।

 

এই মহান কালী সাধককে আমার শ্রদ্ধা এবং প্রনাম জানিয়ে শেষ করছি আজকের পর্ব। পরবর্তী গুরু কথায় অন্য এক গুরুকে নিয়ে

ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – গুরু গোরক্ষ নাথ

গুরু কথা – গুরু গোরক্ষ নাথ

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে ভারতের আধ্যাত্মিক গুরুদের নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা চলছে। আজ গুরু গোরক্ষ নাথ এবং তার অলৌকিক জীবনে কিছুটা আলোকপাত করবো।

গুরু গোরক্ষ নাথ ছিলেন নাথ সম্প্রদায়ের অন্যতম
সন্ন্যাসী। তার সঠিক আবির্ভাব ও তিরোধান দিবস স্পষ্ট করে বলা যায়না। তিনি ছিলেন তিনি মতসেন্দ্র নাথের প্রধান শিষ্য এবং উত্তরসূরি।
অত্যন্ত কঠিন হট যোগ সাধনা করে তিনি সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। তার নানা বিধ অলৌকিক ক্ষমতার কথা আজ কিংবদন্তীর ন্যায় প্রচারিত।

গুরু গোরক্ষ নাথের কর্মকান্ড শুধু ভারত নয় নেপালেও তার বিস্তৃতি রয়েছে।
নেপালের গোরখা জনজাতি মহাযোগী গোরখনাথকে তাঁদের রক্ষাকারী দেবতারূপে পূজা করেন। এমনকি রাজতন্ত্রের যুগে নেপালের মুদ্রায় বা প্রশাসনিক বিভিন্ন চিহ্নে গোরখনাথের ছবি ব্যবহার করা হতো । ধৰ্মপ্রাণ নেপালীরা বিশ্বাস করেন, যুগ যুগ ধরে মহাসাধক গোরখনাথই তাদের রক্ষা করছেন।খুব সম্ভবত গুরু গোরক্ষ
নাথের নাম থেকেই গোর্খা শব্দের উৎপত্তি।

একবার কোনো কারণে গোরখনাথ নেপালবাসীর ওপর প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে নেপাল ছেড়ে চলে যান।
তারপর নেপালের উপর যেন প্রকৃতির অভিশাপ নেমে আসে। অনাবৃষ্টি, দাবানল বা ভূমিকম্পের কবলে পড়ে গোটা দেশ।বহুদিন এই অবস্থা সহ্য করার পরে নেপাল রাজ সিদ্ধান্ত নেন যে সবাই মিলে গোরখনাথের শরণাপন্ন হবেন। সেই মতো দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজা রানি একসাথে গোরখনাথের আরাধনা শুরু করেন।

তারপর গুরু গোরক্ষ নাথের কৃপায় নেপাল আবার শস্য-শ্যামল, সজীব হয়ে ওঠে।আজও নেপালের লোককাহিনিতে এই ঘটনা বিশেষ ভাবে উল্লেখিত আছে।

একবার গুরু গোরক্ষ নাথ তার গুরু মতসেন্দ্র নাথ কে যোগ বলে কামাখ্যার মায়াবী নারীদের থেকে রক্ষা করেছিলেন।বহু দিন গুরুর সান্নিধ্য না পেয়ে একবার ধ্যানস্ত গোরক্ষ নাথ ধ্যানের মধ্যে গুরুকে স্মরণ করলেন। ধ্যানাবিষ্ট অবস্থায় তিনি আশ্চর্য্য হয়ে দেখলেন গুরুদেব রয়েছেন কামরূপে। এবং সেখানে শত শত  তরুণী দ্বারা তিনি বেষ্টিত। ভাবলেন কামরুপ রাজ্যের কুহুকিনি নারীদের মায়া জালে আটকে গুরুদেব ভোগসুখে ডুবে আছেন।  যোগ বলে গোরক্ষনাথ গুরুদেবের উদ্ধারের নিমিত্ত সেখানে উপস্থিত হলেন। এবং অনেক চেষ্টায় সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে আনলেন।
বাস্তবে হয়তো গুরু তার শিষ্যর ভক্তি এবং ক্ষমতার পরীক্ষা নিয়েছিলেন।

বর্তমান উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুর শহর তার নামেই গড়ে উঠেছে। গোরক্ষ নাথ মন্দিরঅ রয়েছে
এই স্থানেই এবং গুরু শিষ্য পরম্পরা মেনে নাথ সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং পরম্পরা বর্তমানে সফল ভাবে বহন করে চলেছেন সুযোগ্য উত্তরসূরীরা। দেশ এবং দেশের বাইরে অসংখ্য
ভক্ত শিষ্য রয়েছে।

পরবর্তী পর্বে আরো এক অলৌকিক ক্ষমতা
সম্পন্ন গুরুর জীবন কাহিনী নিয়ে ফিরে আসবো।
গুরু কথায়। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব

গুরু কথা – ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে গুরুদের নিয়ে যে লেখনী শুরু করেছি তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি প্রেমের ঠাকুর ও বাংলার আধ্যাত্মিক জগতের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণদেব প্রসঙ্গে না লিখি।

অন্যান্য আধ্যাত্মিক গুরুদের তুলনায় শ্রী রামকৃষ্ণ ছিলেন অনেকটাই আলাদা ১৮৩৬ সালে একটি সাধারণ বাঙালি গ্রামীণ পরিবারে জন্মগ্রহণকারী রামকৃষ্ণ ছিলেন একজন মাতৃ সাধক, দার্শনিক ও ধর্মগুরু। তিনি ছিলেন উনিশ শতকের এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি বাঙালি নবজাগরণে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

তার গর্ভে থাকাকালীন তার বাবা-মা আধ্যাত্মিক শক্তির প্রকাশ অনুভব করেছিলেন এবং যেমনটি প্রত্যাশা করা হয়েছিল তেমন টাই হয় পরবর্তীতে।শৈশবকালেই তিনি রহস্যময় ও অলৌকিক শক্তির অধিকারী ছিলেন ।পরবর্তীতে বাংলায় হিন্দু ধর্মের পুনর্জাগরণের ক্ষেত্রে প্রধান ব্যক্তি ছিলেন শ্রী রামকৃষ্ণদেব।গুরু শিষ্য পরম্পরার মাধ্যমে ও বিবেকানন্দের নেতৃত্বে তৎকালীন বাংলার শিক্ষিত যুব সমাজের একটি বড়ো অংশ যুক্ত হয় রামকৃষ্ণর আধ্যাত্মিক কর্ম কাণ্ডের সাথে|

শ্রী রামকৃষ্ণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসেছিলেন তার লীলা করতে, পরমহংসদেব যখন জগৎ সমক্ষে উদিত হন, তখন ঘোরতর ধর্মবিপ্লব চলছে চারপাশে, “জড়বাদী মুক্তকণ্ঠে বলছেন – “জড় হইতেই সমস্ত,জড়ের সংযোগেই আত্মা, জড় ব্যতীত আর কিছু নাই ”
ব্রাহ্ম সমাজ বলছে – “বেদ, বাইবেল, কোরান প্রভৃতি কিছুই মানিবার আবশ্যক নাই, কোনটিই অভ্রান্ত নয়, কোনটিই ঈশ্বর বাক্য নয়”
এমন সময় পরমহংসদেব প্রচার করলেন “কোন ধর্ম কোন ধর্মের বিরোধী নয়। বাহ্য দৃষ্টিতেই বিরোধ কিন্তু সকল ধর্মই মূলত এক কথা বলে
আরো সহজ করে বললেন ” যত মত ততো পথ ”

কথিত আছে, ঠাকুর যখন জন্মগ্রহন করেছিলেন, কামারপুকুর বাটিতে তাদের শিব মন্দির চন্দ্রালোতে আলোকিত হয়ে উঠেছিল। রামকৃষ্ণদেবের গড়নে ছিল দৈবিকভাব|
সেটাই স্বাভাবিক, তিনি কোনো স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন না, একাধারে সাধক ও দার্শনিক এই মানুষ টাকে হয়তো এখনো বাঙালি ঠিক চিনে উঠতে পারেনি, তার অবতার তত্ত্ব নিয়েও দ্বিমত আছে, তবে সাধনার যে উচ্চস্তরে তিনি গিয়েছিলেন তা কল্পনা করা কঠিন।

১৮৬১ সাল থেকে ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত মহিলা সাধু এবং ভৈরবী ব্রাহ্মণীর কাছ থেকে তন্ত্র পদ্ধতি শিখেছিলেন। রামকৃষ্ণ তন্ত্রের ৬৪ টি সাধনা পূরণ করেছিল|১৮৬৪ সালে তোতাপুরী নামক জনৈক পরিব্রাজক বৈদান্তিক সন্ন্যাসীর কাছ থেকে রামকৃষ্ণ সন্ন্যাস গ্রহণ করেন|পরবর্তীতে বিদায় বেলায় তোতাপুরী আবার তার এই শিষ্যের কাছে দীক্ষা গ্রহন করেন|গুরু শিষ্য পরম্পরায় এ এক বিরল ঘটনা|

তিনি শিব জ্ঞানে জীব সেবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তার ভাব শিষ্য নরেন কে, সেই আদর্শ আজও এগিয়ে নিয়ে চলেছে রামকৃষ্ণ মঠ।

বেশ অল্প সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ১৮৭৯ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নিজের প্রধান শিষ্যদের সঙ্গে রামকৃষ্ণ পরমহংসের সাক্ষাৎ হয়। এঁদের অনেকেই ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত। কেউ আবার ছিলেন একান্তই নাস্তিক|নিছক কৌতূহলের বশেই তাঁরা শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশ এঁদের সকলের মধ্যেই গভীর প্রভাব বিস্তার করে এবং এঁরা সকলেও তাঁর অনুরাগী ভক্তে পরিণত হন। প্রবল যুক্তিবাদী সুরেন্দ্রনাথ মিত্র তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন,তাকে সমালোচনা করার জন্যে|কিন্তু শেষপর্যন্ত তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের একনিষ্ঠ ভক্তে পরিণত হন। তাঁর অননুকরণীয় ধর্মপ্রচারের ভঙ্গি অনেক সংশয়বাদী ব্যক্তির মনেও ভক্তির উন্মেষ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল|

রামকৃষ্ণ পরমহংস সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “পরমহংস রামকৃষ্ণদেবের প্রতি” কবিতাটি লিখেছিলেন:

বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা,
ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা;
তোমার জীবনে অসীমের লীলাপথে
নূতন তীর্থ রূপ নিল এ জগতে;
দেশ বিদেশের প্রণাম আনিল টানি
সেথায় আমার প্রণতি দিলাম আনি।

কবি গুরুর এই কবিতা থেকে আধ্যাত্বিক জগতে ঠাকুর রামকৃষ্ণের গুরুত্ব খুব ভালো করেই বোঝা যায়।

আবার আগামী পর্বে পরবর্তী
আধ্যাত্মিক গুরুকে নিয়ে লেখায়
ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – আদি গুরু শংকরাচার্য্য

গুরু কথা – আদি গুরু শংকরাচার্য্য

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শাস্ত্র মতে সনাতন ধর্মের অভিভাবক এবং রক্ষক আদি গুরু শংকরাচার্য্য। ভারতীয় গুরু শিষ্য পরম্পরা তার দেখানো পথেই অগ্রসর হয়েছে।আজকের পর্ব আদি গুরু শংকরাচার্য্যকে নিয়ে।

 

বিভিন্ন মতবাদে বিভক্ত সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা এবং সম্প্রদায়কে এক সূত্রে গেথে সনাতন ধর্মকে একটি নিরাপদ এবং মজবুত ভিত্তি প্রদান করতে মহাদেব স্বয়ং আদি শঙ্করাচার্য্য রূপে পৃথিবীতে এসেছিলেন। তিনিই আদি গুরু। তার দেখানো পথেই এগিয়েছে সনাতন ধর্মের ঐতিহ্য।

 

আদি গুরুর পিতার নাম শিবগুরু ও মায়ের নাম আর্যাম্বা|কথিত আছে ত্রিশূরের বৃষভচল শিবমন্দিরে পুত্রকামনা করে পূজা দিয়ে আশীর্বাদ স্বরূপ শংকরকে পেয়ে ছিলেন তাঁরা।

তিনি মাত্র আট বছর বয়সে তিনি চারটি বেদ আয়ত্ত্ব করে ফেলেন অতি সহজে|অল্প বয়সে পিতৃ বিয়োগের পর চরম আর্থিক দুর্দশার

সম্মুখীন হতে হয় তাকে|

 

কৈশোর থেকেই শঙ্করের ইচ্ছে ছিলো সন্ন্যাস নেয়ার কিন্তু মা রাজি ছিলেন না পরবর্তীতে তাকে রাজি হতে হয়,এ নিয়েও আছে এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ|একবার বালক শংকর পূর্ণা নদীতে স্নান করছিলেন। এমন সময় একটি কুমির তার পা কামড়ে ধরে। শঙ্করের মা তখন সেখানেই উপস্থিত ছিলেন|তিনি মা-কে বলেন, মা যদি সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দেন, তাহলে কুমিরটি তার পা ছেড়ে দেবে। ছেলের প্রাণ বাঁচাতে মা তাকে সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দিলেন|কুমির ও সাথে সাথে পা ছেড়ে অদৃশ্য হলো|এরপর সন্যাস নিয়ে গৃহ ত্যাগ করলেন শঙ্করাচার্য্য|গুরুর খোঁজে বেড়িয়ে পড়লেন পথে|

 

দীর্ঘ সময় পদব্রজে সারা উত্তর ভারত পরিভ্রমণ করার পর অবশেষে গুরুর সাথে সাক্ষাৎ হলো|নর্মদানদীর তীরে ওঙ্কারেশ্বরে তিনি গৌড়পাদের

শিষ্য গোবিন্দ ভগবদপাদের শিষ্যত্ব গ্রহন করলেন শঙ্করাচার্য্য|গুরু শঙ্করাচার্য্যকে অদ্বৈত মত প্রচার করতে বলেন|পরবর্তীতে তিনি কাশী,বদ্রিনাথ সহ বহু স্থানে ঘুরে বেড়ান|অসংখ্য ভাষ্য ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন এবং তার পাশাপাশি চালিয়ে যান

অদ্বৈতবাদের প্রচার|এই সময় অসংখ্য অনুগামী ও ভক্ত তার সংস্পর্শে আসেন ও তার শিষ্যত্ব গ্রহন করেন|বহু ধর্মীয় বিতর্কে অংশগ্রহন করে সেকালের ধর্মজগতের বহু সনামধন্য পন্ডিতকে শাস্ত্র আলোচনায় পরাস্ত করে শংকরাচার্য্য হয়ে ওঠেন এক অতি পরিচিত কিংবদন্তী স্বরূপ|মনে করা হয় কাশীতে বিশ্বনাথ মন্দিরদর্শন করতে যাওয়ার সময় স্বয়ং শিব এক চন্ডাল রূপে

তাকে দর্শন দিয়ে ছিলেন|

 

শঙ্করাচার্য্য সারাটা জীবন ধরে অদ্বৈতত্ত্বের প্রচার করে বেদ বিমুখী সমাজকে আবার বেদান্তের পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন| শঙ্করাচারজ্যর অদ্বৈত ত্বত্ত্বের মূল কথা ছিল- ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা। জীব ও ব্রহ্মে কোনো প্রভেদ নেই|অর্থাৎ, জীব ও ব্রহ্মকে এক ভাবাই অদ্বৈতবাদ।সকল জীবের অভ্যন্তরে যে আত্মা বিরাজমান, তা পরমাত্মারই প্রকাশ। এ তত্ত্বে জীবাত্মা ও পরমাত্মা এক|

 

একাধিক গ্রন্থ এবং শ্লোক রচনা করেন শংকরাচার্য্য। শঙ্করা চার্য্য নির্বাচন পদ্ধতিও তিনি

একটি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে যান।

 

শঙ্করাচার্য্য দেশের চার প্রান্তে চারটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন|পুরী, জোশীমঠ, দ্বারকা এবং শৃঙ্গেরী।

আজও এই পরম্পরা মেনে চারটি মঠের প্রধান অর্থাৎ চারজন শঙ্করাচার্য্য পদাধিকারী সনাতন ধর্মের কল্যানে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন সর্বদা|চার টি মঠের একেটির অধীনে একেকটি বেদ কে রাখা হয়েছে।যদিও কাঞ্চিপীঠ চারটি পীঠের অন্তর্গত নয় তবু যেহেতু শংকরাচ্যার্য্য এই পিঠে স্বয়ং আসীন ছিলেন তাই কাঞ্চিকেও একটি পীঠের মর্যাদা দেয়া হয়।

 

গুরু কথা আজ এখানেই শেষ করলাম।তবে ভারতের আধ্যাত্মিক গুরুদের সাধনা এবং তাদের জীবনী নিয়ে আবার পরবর্তী পর্বে

ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।