Home Blog Page 3

রামনবমীর শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন

রামনবমীর শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ রাম নবমী। আজকের এই বিশেষ পর্ব শ্রী রামকে উৎসর্গ করবো এবং আপনাদের রাম নবমীর শাস্ত্রীয় ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা জানাবো।

 

বিভিন্ন যুগে ভগবান বিষ্ণু বিশ্ব সংসারের সকল মানুষকে ন্যায়পরায়ণতার ও সত্যের পথ প্রদর্শন করতে মিথ্যার উপর সত্যের জয় প্রতিষ্ঠা করতে

নানা অবতার রূপে আমাদের ধরিত্রী তে অবতরণ করেছেন।ত্রেতা যুগে রাম ভগবান বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রূপে জণ্মেছিলেন।

 

শ্রী রাম ছিলেন সূর্য্য বংশীয় রাজা দশরথের অস্বমেধ যোগ্য লব্ধ যেষ্ঠ পুত্র। শৈশব থেকেই তিনি রাজধর্ম পালন করছেন কারন রামের যখন চোদ্দ বছর বয়স তাকে ঋশি বিস্বামিত্র রাক্ষস দের হাত থেকে যজ্ঞ রক্ষা করার জন্য দশরথের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে যান। সেই থেকে শুরু হয় তার দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন যা শেষ হয় রাবন বধের মধ্যে দিয়ে।

 

শ্রী রামের জীবন এবং দর্শন ভারতের আদর্শ। আজ তার তার জন্ম তিথিকেই আমরা রাম নবমী রূপে পালন করি।রাম নবমী পালন করার মূল উদ্দেশ্য হল অধর্মকে পরাস্ত করে ধর্মকে স্থাপন করা।মন্দ শক্তির বিনাশ করে শুভ শক্তির সূচনা করা।শ্রী রাম নিজেই শুভ শক্তির প্রতীক। ন্যায়ের প্রতীক।সনাতন ধর্মে যতজন ভগবানের অবতার আছেন তাদের মধ্যে রামকে এক কথায় সর্বশ্রেষ্ঠ বলা যায়।রাম নামকে বলা হয় কলিযুগের সব অন্ধকারকে দূর করে এগিয়ে যাওয়ার প্রধান অস্ত্র|

 

ভগবান রামের উল্লেখ যে শুধুমাত্র প্রাচীন হিন্দু গ্রন্থে পাওয়া যায় তা নয়, জৈন এবং বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থেও ভগবান রামের উল্লেখ আছে। বিশ্বের বহু দেশেই রামের মন্দির আছে,ইন্দোনেশিয়ায় রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম রাম মূর্তি|

 

শাস্ত্রমতে এই রাম নবমী উপলক্ষ্যে ধার্মিক ব্যক্তিরা সমগ্র দিন জুড়ে বৈদিক মন্ত্র পাঠ করেন। সমগ্র দিনজুড়ে শাস্ত্র পাঠ পাঠ করা হয় বহু ধার্মিক স্থানে।এই দিনটিতে রাম কথার বর্ণনা করে, রাম কাহিনী পড়ে সহজেই বিষ্ণুর কৃপা লাভ করা যায় বলে বিশ্বাস।আপনারাও আজ শাস্ত্র মতে রাম নবমী পালন করুন। প্রভু শ্রী রামকে প্রনাম করুন। নিজের মনোস্কামনা জানান। শ্রী রামের কৃপায় জীবনের সব অন্ধকার দুর হবে।

সবাইকে জানাই রাম নবমীর শুভেচ্ছা।

 

ফিরে আসবো আগামী দিনে। শিব সংক্রান্ত পৌরাণিক বিষয় নিয়ে আলোচনায়। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

অন্নপূর্ণা পূজার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

অন্নপূর্ণা পূজার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আগামী কাল অন্নপূর্ণা পূজা। আজ অন্নপূর্ণার পূজার ঠিক আগের দিনে দেবী অন্নপূর্ণা সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রী তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরবো। যার মধ্যে দিয়ে দেবী অন্নপূর্ণার পুজোর আধ্যাত্মিক গুরুত্ব আপনারা উপলব্ধি করতে পারবেন।

 

চৈত্র মাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে দেবী অন্ন পূর্ণার আবির্ভাব হয় কাশিতে। এই তিথিতেই প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়। শাস্ত্র মতে দেবী অন্নপূর্ণার আশীর্বাদে সংসার থেকে সব অভাব দূর হয়|নিষ্ঠাভরে দেবীর আরাধনায় সংসার হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ|

 

সনাতন ধর্মে দেবী অন্নপূর্ণা অন্নের দেবী, সুখ ও সমৃদ্ধির দেবী|দেবী অন্নপূর্ণা দুর্গার আরেক রূপভেদ।মূলত দ্বিভূজা বা চতুর্ভূজা । গায়ের রঙ লালচে। দ্বিভূজা দেবীর বামহাতে সোনার অন্নপাত্র। ডানহাতে চামচ বা হাতা।মাথায় বিরাজিত অর্ধচন্দ্র। তিনি ক্ষুধার্ত মহাদেবকে অন্নদান করছেন স্মিতহাস্যে তার এক পাশে শ্রী ও অন্য পাশে ভূমি|

 

বাংলায় পৌরাণিক দেবী হওয়ার পাশাপাশি লৌকিক দেবী হিসেবে অন্নপূর্ণা পুজো জনপ্রিয়তা লাভ করে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের মাধ্যমে। তিনি মহা সমারোহে তাঁর রাজত্ব কালে অন্নপূর্ণা পুজোর প্রচলন করেন।

 

বর্তমানে বাংলার বিভিন্ন স্থানে অন্নপূর্ণা পূজো হয়ে থাকে এবং তন্ত্র ও শাক্ত উভয় মতেই হয়ে থাকে দেবীর পূজা।প্রাচীন তন্ত্রসার গ্রন্থে দেবীর পূজা পদ্ধতি রয়েছে, আবার অন্নদামঙ্গল কাব্য রচিত হয়েছে দেবীর মহিমা কীর্তন করে|সব মিলিয়ে সনাতন ধর্মে দেবী অন্নপূর্ণার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য অপরিসীম।

 

সবাইকে জানাই অন্নপূর্ণা পুজোর শুভেচ্ছা।

ফিরে আসবো আগামী দিনে রাম নবমী উপলক্ষে একটি বিশেষ পর্ব নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

রানী রাসমণির পরিবারের অন্নপূর্ণা পূজো

রানী রাসমণির পরিবারের অন্নপূর্ণা পূজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

সাধারণত বাংলার বনেদি বাড়ির পূজো বা জমিদার বাড়ির পূজো কথা উঠলেই দুর্গা পূজো বা কালী পূজো নিয়ে আলোচনা হয়। তবে এক কালে বাংলার কিছু বনেদি বাড়িতে জাঁকজমক পূর্ণ ভাবে দেবী অন্নপূর্ণার পূজো হতো এবং রানী রাসমণির পরিবারের অন্নপূর্ণা পূজো ছিলো তাদের মধ্যে অন্যতম।আজ অন্নপূর্ণা পুজোর প্রাক্কালে রানী রাসমণির অন্নপূর্ণা মন্দির এবং অন্নপূর্ণা পূজো নিয়ে লিখবো।

 

ব্যারাকপুরের অবস্থিত রানী রাসমণির অন্নপূর্ণা অন্নপূর্ণা মন্দির। এই মন্দির নির্মিত হয়েছিল দক্ষিণেশ্বরের মন্দির নির্মাণের বেশ কয়েক বছর পরে।

 

এই মন্দির নির্মাণের সাথে জড়িত অলৌকিক কাহিনীটি হলো এইরকম – ১৮৪৭ সালে রানি রাসমণি তাঁর জামাই মথুরমোহন বিশ্বাস সহ অন্যান্য আত্মীয় স্বজন নিয়ে জল পথে কাশীযাত্রা করেছিলেন। যাত্রা শুরুর দিন রাতেই রানীমা দেবীর স্বপ্নাদেশ পান যে কাশী না গিয়ে গঙ্গার পাড়েই মন্দির প্রতিষ্ঠা করে তাঁর নিত্যপুজোর ব্যবস্থা করা হোক। রানি কাশীযাত্রা স্থগিত করে ফিরে আসেন। নানা কারণে সেবার মন্দির তৈরী হয়নি ।তারমধ্যে তৈরী হয়ে যায় দক্ষিনেশ্বর মন্দির।এদিকে অন্নপূর্ণা-দর্শন না হওয়ায় মথুরমোহনের মনে মনে ইচ্ছে ছিল দেবী অন্নপূর্ণার মন্দির প্রতিষ্ঠা করার। কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় তা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ করেন তাঁর স্ত্রী রানি রাসমণির ছোটো মেয়ে জগদম্বাদেবী। তৈরী হয় তার মায়ের স্বপ্নদেশ পাওয়া অন্নপূর্ণা মন্দির।

 

মন্দির টি ন’টি চূড়াবিশিষ্ট নবরত্ন মাতৃমন্দির, ছ’টি আটচালার শিবমন্দির, দু’টি নহবতখানা, নাটমন্দির, ভোগের ঘর, গঙ্গায় স্নানঘাট ইত্যাদি তৈরি হয়েছিল।অন্নপূর্ণা মন্দিরটি দেখতে অবিকল দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দিরের মতো।

মন্দিরের গর্ভগৃহে অধিষ্ঠিত শিব ও অন্নপূর্ণার বিগ্রহ অষ্টধাতুর। মাতৃমূর্তি দক্ষিণমুখী।পাশে ভিক্ষা পাত্র হাতে শিব।

 

অন্নপূর্ণা মন্দিরের তোরণদ্বারের ওপর স্থাপিত রয়েছে এক সিংহমূর্তি। যা নিয়ে সেকালে ব্রিটিশরা আপত্তি করে ছিলো কারণ ব্রিটিশদের দাবি ছিল, সিংহ তাদের রাজশক্তির প্রতীক। বিবাদ গড়ায় আদালত পর্যন্ত। তবে আইনি লড়াইয়ে জয় হয়েছিল রাসমণির পরিবারের।

 

ব্যারাকপুরে অন্নপূর্ণা মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে ছ’টি শিবমন্দির।মন্দিরের পাশেই চাঁদনি রীতির গঙ্গার ঘাট আছে যা রানি রাসমণি ঘাট নামে পরিচিত। শোনা যায় এই ঘাটে ঠাকুর স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ স্নান করেছিলেন।

 

মথুরমোহন বিশ্বাসের ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতে জগদম্বা দ্বারা এই মন্দির রানী রাসমণি এবং তাঁর পরিবারের দেবী অন্নপূর্ণার প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভক্তিকে আজও বহন করে চলেছে।

 

ফিরে আসবো পরের পর্বে। দেবী অন্নপূর্ণা সংক্রান্ত আরো কিছু শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী অন্নপূর্না এবং কাশী ধাম

দেবী অন্নপূর্না এবং কাশী ধাম

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আগামী ২৬ এ মার্চ মা অন্নপূর্ণার পূজা। আজ থেকে আগামী দুদিন দেবী অন্নপূর্ণা প্রসঙ্গে শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক আলোচনা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোচনা করবো।দিন প্রথম দিন দেবী অন্নপূর্ণার কাশী ধামের সম্পর্ক নিয়ে লিখবো।

 

কাশীকে শিবের নগরী বলা হলেও কাশী আসলে অন্নপূর্ণা দেবীর স্থান। কাশীর অধিস্টাত্রী দেবী হলেন অন্নপূর্ণা।পুরান মতে এক চৈত্র মাসের শুক্ল অষ্টমীতে দেবী অন্নপূর্ণা আবির্ভুতা হয়ে ছিলেন কাশীধামে|তার আবির্ভাব নিয়ে একটি পৌরাণিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় শাস্ত্রে।

 

পুরাণ মতে দেবী পার্বতীর সঙ্গে একবার দেবাদিদেবের কোনো কারণনে গুরুতর মতবিরোধে দেখা দিলে দেবী কৈলাস ত্যাগ করেন। সাথে সাথে ভয়ানক মহামারি, খাদ্যাভাব দেখা দেয়।ভক্তগণকে এই বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য দেবাদিদেব ভিক্ষার ঝুলি নিজ কাঁধে তুলে নেন। কিন্তু দেবীর মায়ায় ভিক্ষারও অভাব ঘটে। তখন দেবাদিদেব শোনেন কাশীতে এক নারী সকলকে অন্ন দান করছেন। দেবীর লীলা বুঝতে পারেন মহাদেব। মহাদেব দেবীর কাছে ভিক্ষা গ্রহণ নিতে কাশীতে আসেন। দেবী তাকে অন্ন ভিক্ষা দেন। সেই অন্ন ভিক্ষা নিয়ে তার ভক্তদের খাদ্যাভাব থেকে রক্ষা করেন মহাদেব।

 

ঘটনাটি থেকে বোঝা যায়। দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়ার আরেক রূপ দেবী অন্নপূর্ণা সুখ সমৃদ্ধি ও অন্নর দেবী। তার উপস্থিত থাকলেই সংসারে বা জগতে সুখ সমৃদ্ধি থাকে। তার অনুপস্থিতি ঘটলেই দেখা দেয় অশান্তি, অভাব এবং দারিদ্রতা।

 

দেবীর কাছে ভিক্ষা গ্রহণের পর মহাদেব দেবীর একটি মন্দির নির্মাণ করেন কাশীতে এবং সেই থেকে তিনি কাশীর অধিষ্টাত্রী দেবী।

পুরান মতে শিবের ত্রিশূলে অবস্থিত কাশী ধাম দেবী অন্নপূর্ণার আবাস তাই কেউ কাশীতে অভুক্ত অবস্থায় থাকেন না। কাশীতে সবার ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিয়েছেন স্বয়ং মা অন্নপূর্ণা।

তিনি অন্নদাত্রী।তাই অন্নদাত্রী দেবী অন্নপূর্ণার আরেকনাম অন্নদা।

 

শাস্ত্র মতে কাশী শাস্বত এবং সর্বকালীন। কাশী মহা প্রলয়ের পরেও বিরাজমান থাকবে।স্ব মহিমায় কাশীধামে বিরাজ করবেন দেবী অন্নপূর্ণা।

কাশী ধামে যারা তীর্থ করতে যান বাবা কাল ভৈরব, বিশ্বনাথ এবং অন্নপূর্ণার দর্শন করলে তবেই কাশী যাত্রার সম্পূর্ণ ফল লাভ হয় বলে বিশ্বাস।

 

দেবী অন্নপূর্ণার পুজোর পর দরিদ্রকে অন্ন দান করলে জীবন থেকে সব অভাব দূর হয়।

দেবী অন্নপূর্ণা কতৃক মহাদেবকে অন্নদানের ছবি বা মূর্তি যে গৃহে থাকে সেই অন্নর অভাব হয়না বলেও শাস্ত্রে আছে।

 

আসন্ন অন্নপূর্ণা পূজো উপলক্ষে চলতে থাকবে এই বিশেষ ধারাবাহিক পর্বগুলি। ফিরে আসবো আগামী পর্বে দেবী অন্নপূর্ণা সংক্রান্ত আরো অনেক শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক আলোচনা নিয়ে।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – বজ্রেশ্বর

শিব অবতার – বজ্রেশ্বর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

চৈত্র মাস শিবের মাস। চৈত্রর অবসান এবং বৈশাখের আগমন হয় নীল পুজোর মাধ্যমে যা শিবেরই রূপ। শিবের অনেক রূপ অনেক অবতার। সেই অবতারগুলি নিয়েই এই ধারাবাহিক আলোচনা। আজকের পর্বে লিখবো শিবের বজ্রেশ্বর অবতার

 

বজ্রেশ্বর হলেন ভগবান শিবের একটি উগ্র যোদ্ধা অবতার, যিনি অসুরদের পরাজিত করে ধর্ম রক্ষা করেন।

 

পুরাকালে যখন অসুররা দেবতা দের যজ্ঞ বেদী আক্রমণ করতেন তাদের যজ্ঞ বন্ধ করে দেবতাদের ক্ষমতা খর্ব করতে তখন বজ্রেশ্বর রূপে অবতীর্ণ হয়ে শিব অসুর নিধন করে দেবতাদের রক্ষা করেন। তাদের পূজো বজায় রাখেন।

 

তাই এই রূপে শিব মন্দের উপর ভালোর বিজয়ের বার্তা দেন এবং সনাতন ধর্মকে শক্তিশালী করেন।

 

এছাড়াও, তান্ত্রিক ঐতিহ্যে জগন্নাথদেবকেও বজ্রেশ্বর নামে অভিহিত করা হয়। ধার্মিকতার রক্ষক এবং দুষ্টের দমনকারী তিনি।

 

“বজ্র” অর্থ অটল, কঠিন ও অপ্রতিরোধ্য শক্তি।

“ঈশ্বর” অর্থ সর্বশক্তিমান প্রভু। তাই বজ্রেশ্বর মানে যিনি বজ্রের ন্যায় অপরাজেয় শক্তির অধিকারী।এই রূপে শিব বজ্রের মতো অদম্য শক্তি, অশুভ বিনাশ এবং ধর্মরক্ষা-র প্রতীক।এই রূপে শিবের দেহ থেকে তেজ ও বিদ্যুতের মতো জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয় হাতে ত্রিশূল বা বজ্রশক্তির প্রতীক অস্ত্র। তিনি ক্রোধময় কিন্তু ন্যায়রক্ষাকারী

 

শাস্ত্র মতে “ওঁ বজ্রেশ্বরায় নমঃ” মন্ত্র জপের মাধ্যমে

শিবের অবতারের পূজো হয়।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে আরো অনেক শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক বিষয় নিয়ে। আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – খান্ডবা

শিব অবতার – খান্ডবা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

খান্ডোবা হলেন ভগবান শিবের একটি জনপ্রিয় অবতার। আজকের পর্বে শিবের এই লৌকিক রূপ এবং বিশেষ অবতার নিয়ে লিখবো।

 

আধ্যাত্মিক দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে এই অবতার শিবের রক্ষাকারী এবং দুষ্টের দমনের রূপকে তুলে ধরে।

তাঁকে শিবের একটি রুদ্র বা উগ্র রূপ বলে গণ্য করা হয়, যিনি এক হাতে তলোয়ার এবং অন্য হাতে ডমরু বা ত্রিশূল ধারণ করেন।

 

লৌকিক বিশ্বাস অনুসারে মণি ও মল্ল নামক দুই রাক্ষসকে বধ করে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শিব খাণ্ডবা রূপে অবির্ভুত হন।যিনি মূলত ভারতের মহারাষ্ট্র ও উত্তর কর্ণাটক অঞ্চলে যোদ্ধা দেবতা হিসেবে পূজিত হন।তাঁর আরেক নাম ‘মার্তণ্ড ভৈরব’। খান্ডবা ঘোড়ায় চড়া বীর যোদ্ধা রূপে চিত্রিত হন।এই রূপেই তাকে পূজো করা হয়।

 

সারা ভারতে খান্ডবা মন্দির তেমন একটা চোখে পড়েনা তবে মহারাষ্ট্রের জেজুরি

মন্দির হলো খন্ডোবার প্রধান তীর্থস্থান।মণি-মল্লকে বধ করার পর তিনি মহারাষ্ট্রের দেউরি পাহাড়ে অধিষ্ঠান করেন বলেই বিশ্বাস করা হয়।তাঁর ভক্তরা তাঁকে শিব জ্ঞানে পূজা করে থাকে।শিব রাত্রি সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তিথিতে বহু শিব ভক্ত এখনে এসে তাঁর পূজো করেন এবং কৃপা লাভ করেন।

 

খান্ডোবা শুধুমাত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছেই নন, বরং মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জাতি, উপজাতি এবং অনেক ভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছেও শ্রদ্ধেয় সেদিক দিয়ে বলা যায় এই দেবতা সামাজিক ঐক্যের প্রতীক।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী শিব অবতার নিয়ে। সমগ্র চৈত্র মাস জুড়ে চলতে থাকবে এই বিশেষ ধারাবাহিক লেখনী।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – হরিহর রূপ

শিব অবতার – হরিহর রূপ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শিব হলেন দেবতাদের আরাধ্যা দেবতা আর বিষ্ণু হলেন একমাত্র ভগবান। আবার অন্য একটি দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে শিব হলেন ভক্ত এবং তার আরাধ্য হলেন স্বয়ং বিষ্ণু।আজ শিবের এমন একটি অবতারের কথা বলবো যেখানে ভক্ত আর ভগবানের মেল বন্ধন ঘটেছে।

এই অবতারটি হলো শিবের হরিহর অবতার।

 

ভক্তের প্রতি ভগবানের প্রেম এবং ভক্তি বোঝাতে শিব এই রূপে দেখা দিয়ে ছিলেন। এই রূপে ভক্ত শিব এবং ভগবান বিষ্ণু মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।শাস্ত্র মতে এই রূপে অনেকটা অর্ধনারীশ্বরের মতো শিবের শরীরের একপাশে শিবের জটা এবং ত্রিনয়ন এবং অন্য পাশে বিষ্ণুর মুকুট ও প্রসন্ন মুখমণ্ডল থাকে।অর্থাৎ একই দেহে শিব এবং বিষ্ণু বিরাজ করেন।

 

পুরান অনুসারে শৈব ও বৈষ্ণব ভক্তদের মধ্যে যখন বিরোধ দেখা যায় এবং কে শ্রেষ্ঠ এই বিবাদ দেখা দেয় তখন এই বিতর্কের নিরসন করতে শিব হরিহর রূপে দেখা দেন।হরিহর রূপে শিব মহাবিশ্বে ভারসাম্য রক্ষা করেন। একই সাথে তিনি হয়ে ওঠেন পালন কর্তা এবং সংহারকর্তা।এখানে যিনি হরি তিনিই শিব।দুই সত্তা এক এবং অভিন্ন।

 

এটি একটি শৈব্য এবং বৈষ্ণব দর্শনের সম্মিলিত অবতারের বিশেষ।হরিহর অবতার পরম সত্যের একত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রতীক।হরিহর রূপে শিব শান্তি এবং মৈত্রীর বার্তা দেন।

 

ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকবে শিব অবতার নিয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনা। ফিরে আসবো পরবর্তী শিব অবতার নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

শিব অবতার – কৃষ্ণদর্শন রূপ

শিব অবতার – কৃষ্ণদর্শন রূপ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

সনাতন ধর্মে অবতার তত্ত্ব নিয়ে বলতে গেলে শ্রী বিষ্ণুর অবতার গুলি নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। কারন তিনি সৃষ্টির পালন কর্তা এবং প্রতি যুগেই তিনি ভিন্ন ভিন্ন অবতারে ফিরে আসেন অধর্ম নাশ করে ধর্ম স্থাপন করতে। তবে সংহার কর্তা শিব ও একাধিক অবতারে অবতীর্ণ হয়েছেন। তার মধ্যে একটি বিশেষ অবতার কৃষ্ণ দর্শন অবতার।

আজকের পর্ব এই অবতার নিয়ে।

 

কৃষ্ণ দর্শন অবতার বিশেষ কারন শিব স্বয়ং পরম বৈষ্ণব এবং বৈষ্ণব ধর্মের একজন সংস্থাপক আচার্য্য।পুরান অনুসারে একবার কৈলাসে শিবকে পার্বতী প্রশ্ন করেছিলেন যে তিনি সদা কার ধ্যানে মগ্ন। শিব বলে ছিলেন তিনি তার আরাধ্যা শ্রী কৃষ্ণর ধ্যানে মগ্ন থাকেন।তাই কৃষ্ণ দর্শন অবতার ভক্তের ভগবান রূপে আত্ম প্রকাশ।

 

শাস্ত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে ঋষি অঙ্গিরা যখন যজ্ঞের অবশিষ্ট সম্পদ নভাগকে দান করতে চান তখন শিব এই রূপে সেখানে উপস্থিত হয়ে যজ্ঞের গভীর রহস্য এবং ত্যাগের মহিমা বোঝান।

তিনি বলেন সমস্ত যজ্ঞের ফল নিষ্কাম ভাবে রুদ্র বা শিবের চরণে অর্পণ করা উচিত।সেই আজ্ঞা পালন করে নভাগ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন।অর্থাৎ রাজা শ্রদ্ধাদেবের পুত্র নভাগকে মোক্ষলাভের পথ দেখাতে শিব এই রূপ ধারণ করেছিলেন।

 

প্রতিকী অর্থে এই অবতারটি সততা, বৈরাগ্য এবং ঈশ্বরের প্রতি সমর্পণের গুরুত্ব তুলে ধরে।শিব এই রূপে ভক্তকে সম্পূর্ণ রূপে ভগবানের চরণে স্মরণাগত হওয়ায় আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেন।

যা মানুষকে জাগতিক মায়া

থেকে মুক্ত হতে উৎসাহিত করে।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী শিব অবতার এবং সেই সংক্রান্ত পৌরাণিক এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নিয়ে।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – সুরেশ্বর

শিব অবতার – সুরেশ্বর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শাস্ত্রে উল্লেখিত শিবের অবতার গুলির মধ্যে সুরেশ্বর অবতার অন্যতম।সুরেশ্বর শব্দের অর্থ দেবতাদের প্রভু।সুরেশ্বর অবতারের আবির্ভাব হয় একটি বিশেষ কারণে। কেনো শিব ওই অবতার রূপে আবির্ভূত হলেন তা জানতে হলে একটি পৌরাণিক ঘটনা জানতে হবে।

 

ব্যাঘ্রপাদ ঋষির পুত্র উপমন্যু ছিলেন শিব ভক্ত । তাঁর কঠোর তপস্যা ও শিবের প্রতি একাগ্রতা পরীক্ষার জন্য শিব সুরেশ্বর রূপ ধারণ করেন এবং পার্বতী শচী মাতার রূপ ধারণ করেন । সুরেশ্বর রূপে শিব ইন্দ্রের ছদ্মবেশে শিব ভক্ত উপমন্যুকে শিবের নিন্দা করতে বলেন কিন্তু উপমন্যু তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং শিবের প্রতি ভক্তিতে অবিচল থাকেন।

 

শিব পার্বতী উপমন্যুর অটল ভক্তিতে সন্তুষ্ট হন।তারপর শিব নিজের আসল রূপ প্রকাশ করেন এবং সুরেশ্বরকে বর দান করেন।

 

অর্থাৎ  এই অবতারে শিব ও পার্বতী

সম্মিলিত ভাবে ভক্তের ভক্তি এবং বিশ্বাস

পরীক্ষা করেন এবং ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে দেবাদিদেব তার ভক্তকে সর্বদা রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন।

 

শিব পুরাণে সুরেশ্বর অবতারের কথা বর্ণিত হয়েছে। শিব এই রূপে দেবতাদের রক্ষা কর্তা। যখনই অসুর বা অশুভ শক্তি দেবতাদের বিপদগ্রস্ত করে তখনই শিবসুরেশ্বর রূপে তাদের রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন।তাই সুরেস্বর দেবতাদের প্রভু তাদের আশ্রয়দাতা।

 

ফিরে আসবো শিবের পরবর্তী অবতার নিয়ে শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক আলোচনা আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – বৃষভ অবতার

শিব অবতার – বৃষভ অবতার

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শাস্ত্র মতে শিবের উনিশটি অবতারের মধ্যে একটি বৃষভ অবতার।স্বভাবে এবং আকৃতিতে তেজি এবং শক্তিশালী হলেও এটি শিবের উগ্র রূপের থেকে ভিন্ন, শান্ত ও জ্ঞানী রূপ।আজকের পর্বে শিবের এই বিশেষ অবতার নিয়ে লিখবো।

 

বিভিন্ন শাস্ত্রে বৃষভ অবতার সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।কিছু শাস্ত্র মতে বৃষভ নামে বিষ্ণুর এক অবতার আছে যাকে বৃষভদেব বলা হয় আবার এই পরিচয়ে এক জৈন তীর্থঙ্কর রয়েছেন তবে শিব পুরাণে মতে শিবের বৃষভ অবতার দেবাদিদেব মহাদেবের উনিশটি অবতারের অন্যতম।

 

একটি পুরান কাহিনী মতে একবার পাতাল লোকে বিষ্ণুর এক পুত্র জন্মায় ।পরবর্তীতে শ্রীবিষ্ণুর এই সন্তান যখন গোটা সৃষ্টি ধ্বংস করতে উদ্যত হয়। ব্রহ্মার অনুরোধে বৃষভ নামে ষাঁড়ের রূপ নিয়ে বিষ্ণুর এই সন্তানকে হত্যা করেন মহাদেব।অহংকার এবং অত্যাচারের অবসান ঘটাতে এই অবতারের আবির্ভাব হয়।

 

বিরাট আকার এবং নীল বর্ণের এই রূপ কুর্ম পুরান, লিঙ্গ পুরান এবং শিব পুরানে স্থান পায়। কোথাও উনিশটি আবার কোথাও আঠাশটি শিব পুরানের অন্যতম তিনি।

 

শিবপুরাণ অনুসারে শিবের এই অবতার হলো মহাদেবের একটি শান্ত ও দয়ালু রূপ। বৃষভ রূপে নিবৃত্তি বা ত্যাগের পথ প্রচারের জন্য অবতীর্ণ হন মহাদেব । বৃষভ অবতার শিবের অন্যতম কোমল ও সৎ রূপ হিসেবে পরিচিত। তবে এই রূপেও তিনি তার সংহার কার্য সম্পন্ন করে জগৎ রক্ষা করেছেন।অধর্ম নাশ করে ধর্ম স্থাপন করেছেন।

 

শাস্ত্রে আরো আছে যে দ্বাপর যুগের শেষে শিব বৃষভ রূপে অবতীর্ণ হন।এই অবতারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ত্যাগের পথ প্রচার করা।পরাশর, গর্গ, ভার্গব এবং গিরিশ এই চার জন ঋষিকে শিবের বৃষভ অবতারের প্রধান শিষ্য রূপে ধরা হয়।

 

ফিরে আসবো শিবের পরবর্তী অবতারে কথা নিয়ে। থাকবে অনেক পৌরাণিক এবং শাস্ত্রীয় তথ্য। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।