Home Blog Page 4

শক্তি পীঠ – শ্রী সুন্দরী

শক্তি পীঠ – শ্রী সুন্দরী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

শ্রী পর্বত বা শ্রী সুন্দরী শক্তিপীঠকে একান্নটি শক্তিপীঠের মধ্যে একটি বলে মনে করা হয়।পীঠ নির্ণয়তন্ত্র এবং তন্ত্র চূড়ামনি গ্রন্থ মতে শ্রী সুন্দরী শক্তিপীঠ ছত্রিশতম এবং শিব চরিত মতে পঞ্চম পীঠ শ্রী সুন্দরী।

এই অঞ্চল বর্তমানে অন্ধ্রপ্রদেশের অন্তরগত যদিও প্রকৃত শ্রী পর্বত এবং শ্রী সুন্দরী শক্তিপীঠের অবস্থান নিয়ে কিঞ্চিৎ বিতর্ক আছে। অনেকের মতে এই স্থান আসলে হিমালয়ের পাদদেশে লাদাখে। তবে পুরান এবং অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ মতে শ্রী শৈল মল্লিকার্জুন সংলগ্ন পার্বত্য অঞ্চলেই অবস্থিত এবং বিজয় নগরের রাজারা এই মন্দির এবং দেবী শ্রী সুন্দরীর পুজোর দায়িত্ব পালন করতেন।

দেবী সতীর গোড়ালি পড়েছিল শ্রী পর্বত শক্তিপীঠে। এখানে মাতা সতী ‘শ্রী সুন্দরী’ এবং ভগবান শিব ‘সুন্দরানন্দ’ নামে পরিচিত।

শক্তি পীঠ টি একটি প্রাচীন কালী মন্দির।

এই কালী মন্দিরটিকে স্থানীয়রা শক্তিপীঠ হিসেবে পূজা করে।দেবী কালীকা রূপে বিরাজ করছেন সঠিক বয়স না জানা গেলেও মনে করা হয় মন্দিরটি প্রায় চারশো বছরের প্রাচীন

মহাভারতে এই শক্তিপীঠের উল্লেখ আছে। সেখানে দেখা যায় অর্জুন এই শক্তি পীঠে এসে পুজো করছেন এবং নিকট বর্তী জ্যোতির্লিঙ্গ শ্রী শৈলতে এসে শিবের কাছে যুদ্ধে জয়ের জন্য প্রার্থনা করছেন। তিনি এখানে মল্লিকা ফুল দিয়ে পুজো করায় এই শিব লিঙ্গ মল্লিকার্জুন নামে খ্যাত।

এই শ্রী পর্বত সংলগ্ন এলাকায় এক সময় আদি সংকরাচার্য্য এসেছিলেন বলে শোনা যায় শুধু তাই নয় কথিত আছে এখানকার তান্ত্রিকরা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেন এবং তাকে এই শক্তিপীঠে বলী দেয়ার ষড়যন্ত্র করেন। সংকরাচার্য্যর শিষ্যরা সব জেনে ফেলেন এবং তার প্রাণ রক্ষা হয়।

শ্রী পর্বতে যেখানে মায়ের মন্দির তা প্রাকৃতিক ভাবে অপূর্ব সৌন্দর্য দিয়ে ঘেরা। পাহাড়ের গায়ে মায়ের মন্দির এবং পাহাড়ে দের হাজার ফুট উঁচুতে ভৈরবের মন্দির। দেড় হাজার সিঁড়ি ভেঙে সেখানে যেতে হয়।এই দুর্গম পথ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এই শক্তি পীঠের অন্যতম আকর্ষণ।

সারা বছর ভক্তদের আগমন লেগে থাকে তবে দুর্গাপূজা এবং নবরাত্রিতে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। অন্য একটি শক্তিপীঠ সংক্রান্ত পৌরাণিক এবং আধ্যাত্মিক আলোচনা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তিপীঠ – বিশালক্ষী

শক্তিপীঠ – বিশালক্ষী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরানে বলা হয়েছে কাশি নগর ভগবান শিবের ত্রিশূলের উপরে অবস্থিত। এই কাশিতেই রয়েছে একটি শক্তি পীঠ শাস্ত্রে যার নাম বিশালক্ষী।

 

পুরান অনুসারে ভগবান বিষ্ণু কাশিতে এসে সুদর্শন চক্র দিয়ে একটি পুষ্করিণী খনন করেছিলেন এবং সেখানে বসে হর গৌরীর তপস্যা করেন। সেই সময় ভগবান বিষ্ণুর শরীর থেকে ঘাম নির্গত হয়ে এই পুষ্করিণী টি জলে পূর্ণ হয়।পরবর্তীতে বিষ্ণুর ধ্যানে সন্তুষ্ট হয়ে হর গৌরী দেখা দেন।

শাস্ত্র মতে মা গৌরীর কানের দুল এই জলে পতিত হয়েছিল।তখন থেকেই এই জলাশয়ের নাম হয় মনিকর্নিকা। পরবর্তীতে এই জলাশয় গঙ্গাতে মিলিত হয় এবং গঙ্গার ঘাটটির নাম হয় মণিকর্নিকা।

 

এই কাশিতে বিশালক্ষী মন্দির যে স্থানে আছে সেখানে দেবীর কানের দুল পতিত হয়েছিল।

শিবপুরানেও এই শক্তি পীঠের উল্লেখ আছে এবং বলা হয়েছে এখানে দেবীর দেহের কোন অংশ পড়েনি তবে দেবীর গহনা অথবা অলংকার পড়েছিল। দেবী হলেন অন্নপূর্ণা আর ভৈরব হলেন বিশ্বনাথ।

 

বিশালক্ষী শক্তি পীঠের আশেপাশের পরিবেশ এক কথায় অপূর্ব। মন্দিরে দুটি বিশালক্ষী দেবীর মূর্তি আছে। মনে করা হয় প্রথম মূর্তিটির আড়ালে আছে আদি বিশালক্ষী মূর্তি যা স্বয়ম্ভু অর্থাৎ অলৌকিক ভাবে দেবী নিজেই এখানে প্রকট হয়েছেন।

 

সারা বছর পুজো হলেও নব রাত্রি এই শক্তিপীঠে প্রধান উৎসব। নবরাত্রিতে দেবীর বিশেষ পুজো হয় এবং প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়।

 

আবার অন্য একটি শক্তিপীঠের ইতিহাস এবং পৌরাণিক ব্যাখ্যা সাথে শাস্ত্রীয় তথ্য নিয়ে

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – মঙ্গলচন্ডী

শক্তি পীঠ – মঙ্গলচন্ডী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরান অনুসারে অজয় নদীর পাড়ে দেবীর ডান কব্জি পতিত হয়েছিল।শক্তি পীঠে দেবীর নাম মঙ্গলচন্ডী আর দেবীর ভৈরব কপিলাম্বর।আজকের শক্তি পীঠ পর্বে লিখবো বর্ধমান তথা বাংলার অন্যতম জাগ্রত শক্তিপীঠ মঙ্গলচন্ডী নিয়ে।

 

প্রাচীন মঙ্গল চন্ডীর মূর্তিটি ছিলো পাল যুগের।পরবর্তীতে র্ভগৃহের মধ্যেই মা মঙ্গলচন্ডীর ছোট কালো পাথরের দশভূজা মূর্তি বসানো হয়।

ভৈরবের মূর্তির সামনে নন্দীর কালো পাথরের একটি ছোট্ট মূর্তি আছে। ভৈরবের বাঁদিকে রয়েছে বুদ্ধমূর্তি। তাই স্থানটি একাধারে শাক্ত, শৈব্য এবং বৌদ্ধদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

কথিক আছে রাজা বিক্রমাদিত্যর কুল দেবী ছিলেন মা মঙ্গলচন্ডী। সপ্নাদেশ দিয়ে দেবী বিক্রমাদিত্যকে বলেন গভীর জঙ্গল থেকে তাকে উদ্ধার করে মন্দিরে স্থাপিত করে পুজো করতে। বিক্রমাদিত্য জ্যোতি রূপে দেবীর উপস্থিতি দেখতে পান এবং দেবীকে জঙ্গল থেকে লোকালয়ে এনে স্থাপন করেন।

 

প্রচলিত লোক কাহিনী অনুসারে এক ব্যবসায়ী ব্যবসা করতে গিয়ে সমুদ্রে নিখোঁজ হয়ে যান তারপর তার স্ত্রী খুল্লনা মঙ্গল চন্ডী কে পুজোয় সন্তুষ্ট করে তার স্বামীর ফিরে আসার জন্য প্রার্থনা করেন।অলৌকিক ভাবে কিছুদিন পর ওই ব্যবসায়ী ফিরে আসেন সুস্থ শরীরে। তারপর দেবীর মহিমা ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে।সেই থেকে মঙ্গলচন্ডীর পূজা হয়ে আসছে অজয় নদীর পাড়ে অবস্থিত

এই মন্দিরে।

 

বর্তমানে প্রতি মঙ্গলবার দেবীর পুজো করা হয়। এছাড়াও সারা বছর ধরে এখানে দুর্গাপূজা, কালীপূজা সবই হয়।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। নতুন একটি

শক্তি পীঠের কথা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – মেলাই চন্ডী

শক্তি পীঠ – মেলাই চন্ডী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজকের একান্ন পীঠ পর্বে বাংলারই একটি তথাকথিত কম জনপ্রিয় কিন্তু অত্যান্ত জাগ্রত এবং তাৎপর্যপূর্ণ শক্তি পীঠ নিয়ে লিখবো ।

এই পীঠ সর্বজন স্বীকৃত নয় কারন পীঠ নির্ণয় তন্ত্রে এই পীঠকে শক্তিপীঠের মর্যাদা দেয়া হয়নি তবে অন্য কিছু প্রাচীন শাস্ত্রে মেলাই চন্ডীকে পীঠ হিসাবেই দেখানো হয়েছে|১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে রচিত কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কাব্যে আমতার মেলাইচণ্ডীর উল্লেখ পাওয়া যায়।

এই প্রাচীন দেবী মন্দির ও তার পুজো কে কেন্দ্র করে এক কালে বিরাট মেলা বসতো এই অঞ্চলে এবং দেবী এখানে চন্ডী রূপে পূজিতা তাই বহু মানুষের মিলন স্থল এই চন্ডী মন্দির লোক মুখে হয়ে ওঠে মেলাইচন্ডীর মন্দির দেবী প্রসিদ্ধ হন মেলাই চন্ডী রূপে।

যারা বিশ্বাস করেন এটি শক্তিপীঠ তারা মনে করেন দেবী সতীর হাঁটুর মালাইচাকী পতিত হয়ে ছিলো এই স্থানে এবং সেই কারনেই এই পীঠ মালাই চন্ডী নামে পরিচিত|

প্রচলিত একটি জনশ্রুতি আছে যে দামোদর নদ দিয়ে যেসব সওদাগর যাতায়াত করতেন। তাঁরাই মেলাইচণ্ডীকে স্থাপন করেন নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে। পরে জটাধারী চক্রবর্তী নামের এক ব্রাহ্মণ স্বপ্নাদেশ পেয়ে জয়ন্তী গ্রাম থেকে প্রস্তররূপী দেবীকে আমতায় নিয়ে আসেন এবং দেবীকে স্থাপন করেন।সেই অর্থে তিনিই এই মেলাই চন্ডী দেবীর প্রথম সাধক এবং প্রতিষ্ঠাতা।

পরবর্তীতে কলকাতার হাটখোলার নামকরা লবন ব্যবসায়ী কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত স্বপ্নাদেশ পেয়ে মেলাইচণ্ডী মন্দির নতুন করে নির্মাণ করে দেন|বর্তমানে যে মন্দির দেখা যায় ১৩০৯ সালে সেই মন্দিরের সংস্কার হয়েছে।

মূল মন্দিরের মাঝখানে চাতাল ও উঁচু বেদিযুক্ত দুর্গা মণ্ডপ। একটু ঢুকে উপাসনা গৃহ|এই মন্দিরে দেবীর সম্পূর্ণ রূপ নেই। মুখ মন্ডল মালাইচাকির আদলে তৈরি হয়েছে।এখানে দেবীর বাহু এবং পদযুগল নেই।বিশেষ বিশেষ তিথিতে ঘট হিসেবেও দেবী মেলাই চন্ডীর পুজোর রীতি রয়েছে|

যদিও সতীর দেহের আসল প্রস্তুরীভূত মালাই চাকি ঠিক কোন স্থানে অবস্থান করছে সুস্পষ্ট ভাবে জানা যায়না।মূলত একটি গোলাকৃতি প্রস্তর খণ্ড এখানে পূজিতা হয় এবং মনে করা হয় এটি সেই আদি প্রস্তুরীভূত দেহখন্ড হতে পারে।

প্রতি বছর বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন মালাই চন্ডীতে
প্রতিষ্ঠা দিবস পালন করা হয় এবং দুর্গোপুজার সময় এখানে মহোৎসব হয়। দেবী এখানে দুর্গা ও চণ্ডী উভয় রূপেই পুজিত হন। দেবীর সঙ্গে তার ভৈরবকেও নিষ্ঠা সহকারে পুজো করা হয় |
পুজো উপলক্ষে অসংখ্য মানুষের জমায়েত হয় এই পবিত্র মন্দির প্রাঙ্গনে|

আজকের শক্তি পীঠ পর্ব এখানেই শেষ করলাম|
দেখা হবে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – নন্দীকেশ্বরী

শক্তি পীঠ – নন্দীকেশ্বরী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের শক্তিপীঠ নন্দীকেশ্বরী।

তন্ত্রচূড়ামণিতে নন্দিকেশ্বরীকে মূল পীঠ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।বীরভূমের পাঁচটি সতীপীঠের অন্যতম সাঁইথিয়ার দেবী নন্দিকেশ্বরী।

 

বিশাল এক বটবৃক্ষ ছাতার মতো ঘিরে রেখেছে নন্দীকেশ্বর মন্দির অঙ্গনটি। এই বটবৃক্ষের নীচেই দেবী নন্দিকেশ্বরীর অবস্থান। ভৈরব এখানে নন্দিকেশ্বর। পুরান অনুসারে এখানে দেবী সতীর কণ্ঠহাড় পতিত হয়েছিলো।

 

শোনা যায় জনৈক দাতারাম ঘোষ নামে দক্ষিণেশ্বরের বাসিন্দা ভাগ্য অন্বেষণে বীরভূমে আসেন এক ব্রিটিশ দের সাথে ব্যবসা করে বহু অর্থ রোজগার করেন পরে দেওয়ান হন এবং শেষে জমিদার হয়েছিলেন।দেবী নিজেই স্বপ্ন দিয়ে তাঁর অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন এই দাতারাম ঘোষকে।তিনি মন্দির তৈরী করে পুজোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

 

বহু বছর আগে সাঁইথিয়া ছিলো নন্দীপুর। অর্থাৎ দেবী নন্দীকেশ্বরীর নামেই এলাকার নাম ছিলো।

যদিও এখন সাঁইথিয়া নামই ব্যবহার হয়।

 

শক্তি পীঠ হলেও রথ যাত্রা এখানে অন্যতম জনপ্রিয় উৎসব। স্থানীয় ব্যবসায়ী দের উদ্যোগে মন্দির প্রাঙ্গণে শুরু হয় রথযাত্রা উৎসব। পুরী থেকে জগন্নাথ, সুভদ্রা, বলরামের দারুমূর্তি আনা হয়। সেই মূর্তি অভিষেক পর্বের মাধ্যমে নন্দিকেশ্বরী মন্দিরের প্রবেশপথের পাশেই প্রতিষ্ঠা করা হয়। তৈরি করা হয় বিশালাকৃতি রথ এবং জগন্নাথদেবের মন্দির।অমাবস্যা তিথি গুলি ছাড়াও রথের সময় এখান ব্যাপক জন

সমাগম হয়।

 

নন্দীকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গনে মহাসরস্বতী, মহালক্ষ্মী, বিষ্ণুলক্ষ্মী, হনুমান মন্দির, জগন্নাথদেবের মন্দির, কালীয়দমন মন্দির আছে। এগুলির মধ্যে কালীয়দমন মন্দিরটি প্রাচীনতম বলে মনে করা হয়।।সব মিলিয়ে নন্দীকেশ্বরী শক্তি পীঠ বীরভূমের অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে শক্তি পীঠের

পরবর্তী পর্ব নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – প্রভাস

শক্তি পীঠ – প্রভাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

একান্ন পীঠের অন্যতম শক্তি পীঠ প্রভাস গুজরাটের সৌরাষ্ট্র অঞ্চলের সোমনাথ জেলায় অবস্থিত।সতীর পাকস্থলী অথবা উদারভাগ এই স্থানে পতিত হয়েছিল।প্রভাস শক্তিপীঠে অধিষ্ঠিত দেবী হলেন চন্দ্রভাগা এবং ভৈরব হলেন বক্রতুণ্ড।

 

বর্তমানে সোমনাথ মন্দির থেকে কিছুটা দূরে প্রভাস শক্তি পীঠ বা চন্দ্রভাগা দেবীর এই মন্দিরটি অবস্থিত। সেই পৌরাণিক কালের ধ্বংস হয়ে যাওয়া মন্দিরটির রুপই এখনও বর্তমান।

পাথরের তৈরি এই মন্দিরের গায়ে বিভিন্ন দেবতার মূর্তি খোদাই করা আছে। সঠিক কোন সময়ে এই মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছিল তার কোন ঐতিহাসিক তথ্য আজও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

তবে ঐতিহাসিক তথ্য মতে চন্দ্রভাগা দশভুজা সিংহ বাহনা রূপে রানী অহল্যা বাইকে স্বপ্নে আদেশ দিয়ে বলেন যে, ভূগর্ভে চাপা পড়া সতীর অঙ্গ উদ্ধার করে মন্দির সংস্কার করে পুজো শুরু করতে ।এরপরই দেবীর স্বপ্নের আদেশ মতো অহল্যা বাই সেই অঙ্গশিলা উদ্ধার করে দেবীর মন্দির সংস্কার করে নিত্যদিনের পুজোর আয়োজন করেন।সেই সময় থেকেই প্রভাস শক্তিপীঠের জনপ্রিয়তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।দেবী চন্দ্র ভাগা কে দেবী উমা নামেও ডাকেন

তার ভক্তরা।

 

স্কন্দ পুরান অনুসারে সোমনাথ মন্দির নির্মাণ করেন স্বয়ং চন্দ্রদেব।শিবরাত্রি এবং কার্তিক

পূর্ণিমার সময় সোমনাথ মন্দিরে ভিড় হওয়ার দরুন এখানেও ভিড় হয়। তবে নবরাত্রির সময় এখানে প্রচুর পরিমাণে ভক্তদের সমাগম দেখা যায়।

 

আপাতত প্রভাস শক্তি পীঠ নিয়ে আলোচনা এখানেই শেষ করছি।ফিরে আসবো পরবর্তী শক্তিপীঠ নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – দেবী শিবানী

শক্তি পীঠ – দেবী শিবানী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

মধ্যপ্রদেশের নাগ পুরের কাছে রামগিরিতে চিত্রকুট পর্বতে অবস্থিত শক্তি পীঠ শিবানী।
আজকের শক্তি পীঠ পর্বে শিবানী নিয়ে লিখবো।

ভরতচন্দ্রের অন্নদা মঙ্গল, বাল্মীকি রামায়ণ,কালীকা পুরানে সহ একাধিক প্রাচীন
গ্রন্থে এই শক্তি পিঠের উল্লেখ আছে।

পুরান অনুসারে এই স্থানে সতীর ডান বক্ষ পড়েছিল।আবার মতান্তরে এই স্থানে পড়েছিলো দেবীর জানু দেশ।এখানে অধিষ্ঠিত দেবীর নাম শিবানী এবং ভৈরব হলেন চন্ড।

রামায়কের কালে রাম, সীতা এবং লক্ষণ যখন তাদের চোদ্দ বছরের বনবাস কাটাচ্ছিলেন, তার মধ্যে সাড়ে এগারো বছর সময় অতিবাহিত করে ফেলেছিলেন এই শক্তি পীঠ সংলগ্ন চিত্রকূট পাহাড়ে।

আবার মহাভারতের সময়ে শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে অর্জুন রামগিরি পর্বতে এসে সাধনা করেছিলেন এবং দেবী যোগ মায়া তাকে দেখা দিয়ে নিজের দিব্য শীলরূপটি কোথায় আছে তার নির্দেশ দেন। তারপর অর্জুন নিজে মাটি খুঁড়ে মাতা শিবানীকে শীলা রূপে উদ্ধার করে এই স্থানে মন্দির বানিয়ে স্থাপন করেন এবং তার অনুপস্থিতি তে স্থানীয় ফুলবাহক দের দেবীর নিত্য পুজোর আদেশ দেন।

এক সময় এই প্রাচীন মন্দির কালের নিয়মে
ধ্বংস হলে রাজা দ্বিতীয় রঘুজি ভোসলে নতুন ভাবে দেবী শিবানীর মন্দির বানিয়ে দেন।

বর্তমানে সাদা পাথরের তৈরি এই মন্দিরে দেবী শিবানীর শীলা রূপ টি কষ্টি পাথর এবং রুপো দিয়ে ঢাকা তার পাশাপাশি বহু দেবদেবীর মূর্তি খোদাই করা আছে। অনেকগুলি সিঁড়ি পেরিয়ে তারপরে একেবারে মন্দিরের প্রধান ফটকে উঠে আসতে হয়। তারপর এই মন্দিরের মূল অংশ শুরু হয়।
যাত্রাপথ বেশ দুর্গম এবং কষ্টসাধ্য।

অশ্বিন ও চৈত্র মাসের একটি বিশেষ সময়ে এখানে বিশেষ পুজো হয় এবং সেই সময়ে মায়ের প্রকৃত রূপ ভক্তরা দেখতে পান।

আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে।সাথে নিয়ে অন্য এক শক্তি পীঠের কথা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

মা সারদার জন্মতিথিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

মা সারদার জন্মতিথিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের দিনটি রামকৃষ্ণ ও মা সারদার অনুরাগী দের কাছে একটি স্মরণীয় দিন, আজ দেবী সারদার তিথি|আজ মা সারদার ব্যাক্তিত্বের একটি বিশেষ দিক আলোচনা করে তাকে শ্রদ্ধা জানাবো,তার দিব্য চরনে আমার প্রনাম নিবেদন করবো।

 

একবার মা তার ভক্ত আমজাদকে নিজের হাতে খেতে দিয়েছিলেন, এমনকী খাওয়া শেষে এঁটো থালা পরিষ্কার করতেও তাঁর কোনও দ্বিধা ছিল না। আমজাদের পরিচয় সম্পর্কে মাকে মনে করিয়ে দেওয়ায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমার শরৎ যেমন ছেলে, ওই আমজাদও তেমন ছেলে’, এখানে শরৎ, অর্থাৎ পরবর্তী কালে স্বামী সারদানন্দ মহারাজ।এই সামান্য ঘটনাটির তাৎপর্য মোটেও সাধারণ নয়। আজকের এই জটিল আর্থ-সামাজিক দুনিয়ায়, যেখানে অসহিষ্ণুতার একটা বিষময় বাতাবরণ, সেখানে মা সারদার এই সহজ অভিব্যক্তিটা খুব বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। আজও আমরা সর্বস্তরে জাতপাতের সীমানা লঙ্ঘন করতে পারছি না। আমরা সবাই এক এবং অভিন্ন, এই শাশ্বত বোধ আমাদের সবার মধ্যে আসছে না|কিন্তু পথ দেখাতে পারেন মা সারদা ও তার ত্যাগ এবং আদর্শ যিনি সেই যুগে দাঁড়িয়ে প্রকৃত সমাজসেবী হিসেবে এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে দিয়েছিলেন, ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন, ‘আমরা ওরা’র বন্ধন।মা সারদা প্রকৃত অর্থেই হয়ে উঠেছিলেন সৎ এর ও মা আবার অসৎ এর ও মা|

তার কাছে নরেন ও যা রঘু ডাকাত ও তাই|

 

প্রতিটি মানুষকে নিজের মধ্যে দেবতাজ্ঞানে গ্রহণ করতেন। সাড়া দিয়েছেন সবার ডাকে, এমনকী পশুপাখিদেরও সন্তানস্নেহে আপ্লুত করেছেন। তার অলৌকিক সত্ত্বা ভক্তদের থেকে আড়ালে থাকতো।

 

এক বার এক সহজ সরল ভক্ত নিজেকে সংযত করে রাখতে না পেরে মাকে সরাসরি প্রশ্ন করলেন, মা, আপনি কি সাক্ষাৎ মা কালী? সারদা দেবী মৃদু হেসে বলেছিলেন – ওই, লোকে বলে কালী’!

 

ভক্তদের কাছে মা সারদা ছিলেন সাক্ষাৎ জগৎজননী। ঠাকুর রামকৃষ্ণর যদি অবতার হন তাহলে মা সারদা ছিলেন ভগবানের লীলা সঙ্গিনী।

 

আজ জন্মতিথিতে বিশ্ব জননী, সংঘ জননী মা সারদার চরনে আমার শত কোটি প্রনাম এবং শ্রদ্ধাঞ্জলি।জয় মা সারদা।

শক্তি পীঠ – দেবী বহুলা 

শক্তি পীঠ – দেবী বহুলা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ আপনাদের একটি রহস্যময় শক্তি পীঠের কথা বলবো যা বাহুলা বা বহুলা নামে পরিচিত।

পীঠনির্ণয় তন্ত্রে এবং শিবচরিত গ্ৰন্থে এই পীঠের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

 

পীঠনির্ণয়তন্ত্র অনুসারে কেতুগ্রামে ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র দ্বারা খণ্ডিত খন্ডিত সতীর বাম বাহু পতিত হয়।সেই স্থানে দেবী বহুলা মন্দিরটি গড়ে ওঠে।কেতুগ্ৰামের ভিতরে অজয় নদীর তীরে অবস্থিত মায়ের ধামটি।এই পীঠে দেবীর ভৈরবের নাম ভীরুক বা ভূতনাথ।

 

রায়গুণাকর কবি  ভারতচন্দ্র রায় অন্নদামঙ্গল কাব্যে লিখেছেন:

 

–“বহুলায় বামবাহু ফেলিল কেশব।বহুলা চন্ডিকা তায় ভীরুক ভৈরব।”

 

এককালে দেবী বহুলার নামেই ছিলো এই এলাকার নাম। পরে রাজা চন্দ্রকেতুর নাম অনুসারে হয় কেতুগ্রাম।

 

দেবী বহুলা চন্ডীরর এক রূপ এবং তিনি এই গ্রামের আরাধ্যা দেবী।এই কেতুগ্ৰামে অজয় নদের তীরে দেবীর প্রথম মন্দির কবে তৈরী হয় এবং কে তৈরী করেন তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়না তবে আধুনিক সময়ে নতুন করে দেবীমন্দির ও নাট মন্দির সংস্কার করা হয়েছে। নতুন মন্দিরে আছে কষ্টিপাথরে নির্মিত দেবী বহুলার প্রাচীন মূর্তিটি। এখানে দেবীর ডানপাশে অষ্টভুজ গনেশ। সম্ভবতঃ রাজা চন্দ্রকেতুই কার্তিক এবং গণেশসহ দেবীর পাথর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

এই অষ্টভুজ গণেশ মূর্তি সারা ভারতে মোট চারটি মন্দিরে রয়েছে।দেবীর অন্য দিকে রয়েছেন তাঁর পুত্র কার্তিক। প্রতিদিন মাকে অন্নভোগ নিবেদন করা হয়।দেবীর মন্দিরের ঠিক পাশে রয়েছে একটি পুকুর। বহু ভক্তের বিশ্বাস, এই পুকুরে স্নান করলে পুন্য লাভ হয় এবং মনের বাসনা পূর্ণ হয়।

 

বহুলা কে বলা হয় যুগ্ম পীঠ কারন প্রায় পাশাপাশি রয়েছে আরো একটি শক্তি পীঠ। শাস্ত্র মতে এখানে দেবীর ডান কনুই পড়েছিল। এই স্থানটির অপর নাম রণখণ্ড। দেবীর নাম বহুলাক্ষী। এবং দেবীর ভৈরব হলেন মহাকাল শিব।

 

এই পীঠ সম্পর্কে বহু অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় অনেকের মতে এখানে নাকি রাত দুপুরে দেবীর নূপুরের শব্দ শোনা যায়। বহু তন্ত্রসাধকদের আগমন ঘটে এই সতীপীঠে। মূর্তি ছাড়াই মা’কে পুজো করা হয় কালিকা পুরাণে রচিত দেবীর বীজমন্ত্র সহ। বহু বছর ধরে এই যুগ্ম পীঠে আদ্যা শক্তি মহামায়া মা কালী এবং মা দুর্গা রূপেই পূজিতা হয়ে আসছেন।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে।অন্য একটি

শক্তি পীঠের কথা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – প্রয়াগ 

  • শক্তি পীঠ – প্রয়াগ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

প্রয়াগে গঙ্গা, যমুনা এবং সরস্বতী নদীর মিলন স্থলে অবস্থিত শক্তিপীঠ প্রয়াগ শক্তিপীঠ নামেই বিখ্যাত।সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত একান্ন

পীঠের অন্যতম শক্তি এটি।

 

পুরান অনুসারে এখানে সতীর হাতের দশটি আঙুল পতিত হয়েছিল। এখানে অধিষ্ঠিত দেবীকে অলোপি মাতা বা ললিতা রূপে পুজো করা হয়।

অলোপী কথার অর্থ হল লুপ্ত না হওয়া।সতীর দেহ যখন বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের আঘাতে খন্ড-বিখন্ড হয়ে যাওয়ার পরেও দেবীর অস্তিত্ব রক্ষিত ছিল তার দেহ খণ্ড গুলির মধ্যেই। তাই লুপ্ত হয়ে লোপ না পাওয়ায় দেবীর নাম হয় অলোপি।

দেবীর ভৈরব হলেন ভব যিনি অনেকের কাছে বেনীমাধব।

 

পুরান মতে সত্য যুগে ভন্ডাসুর নামে এক অসুর শিবের বর পেয়ে দেবতাদের হেনস্থা করতে শুরু করে।স্বর্গ অধিকার করে নেয়ার উপক্রম দেখা দিলে ইন্দ্র এবং আরও অন্যান্য দেবতারা যজ্ঞের মাধ্যমে মহাশক্তির জাগরণ ঘটান।তখনই যজ্ঞের আগুন থেকে রক্ত বস্ত্র পরিহিতা চতুর্ভূজা দেবী ললিতার আবির্ভাব ঘটে। ভন্ডাসুর এর সঙ্গে যুদ্ধ করে সর্বলোক পুনরায় অসুর মুক্ত করে দেন।

দেবীর সেই ললিতা রূপেই এই শক্তিপীঠে

পূজিতা হন।

 

প্রাচীনকালে এই ত্রিবেণী সঙ্গম অঞ্চল ঘন বন জঙ্গলে ঢাকা ছিল, আর সেই সব ঘন জঙ্গলে থাকতো দুর্ধর্ষ সব ডাকাত। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যখনই কোন বিবাহ যাত্রীর দল যেত, ডাকাতরা তাদেরকে আটক করে সর্বস্ব লুট করে নিত।

সেই সময়ে দেবী ললিতা রূপে এই অঞ্চলের রক্ষাকত্রী রূপে দেখা দেন।

 

প্রয়াগ শক্তিপীঠে মূলত তিনটি মন্দির আছে, অক্ষয়বট, মীরাপুর এবং অলোপি।

এই মন্দিরের বিশেষত্ব হলো এখানে একটি পালকিকে দেবী রূপে পূজা করা হয়।তার একটি কারন হলো দেবী পালকিতে করে নববধূ রূপে এখানে আবীরভূতা হয়েছিলেন বলে মনে করা হয়।

 

যদিও পালকির পাশাপাশি দেবীর নব দুর্গা রূপের পুজোও হয় দেবীর বেদির নিচে একটি গর্ত তে জল আছে। মনে করা হয় যে, এই জল আসলে স্বয়ং মা গঙ্গার। অক্ষয় বটের নিচে দেবীর

ভৈরবের মন্দির রয়েছে।

 

প্রয়াগ এই জায়গাটি সাধারণভাবে কুম্ভ মেলার জন্য বিখ্যাত হলেও প্রয়াগ শক্তি পীঠে নবরাত্রি উৎসব খুবই জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে পালন করা হয়।নবরাত্রীর সময় এখানে প্রচুর লোক জমা হয়, নিয়ম মত নারকেল ফাটিয়ে নারকেলের জল দেবীকে অর্পণ করে অর্ধেক নারকেল মন্দিরের সমর্পণ করেন ভক্তরা।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য একটি শক্তিপীঠের কথা নিয়ে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।