Home Blog Page 4

লৌকিক দেবতা – কালু রায়

লৌকিক দেবতা – কালু রায়

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দক্ষিণ বঙ্গ বা বিশেষ করে সুন্দরবন অঞ্চলে একাধিক লৌকিক দেব দেবীর পূজো হয়ে আসছে বহু প্রাচীনকাল থেকে।যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের কথা আপনাদের আগেও বলেছি।এই অঞ্চলের আরো এক প্রসিদ্ধ লৌকিক দেবতা হলেন বাবা কালু রায়।

 

দক্ষিণরায় যেমন বাঘের দেবতা কালু রায় তেমনই কুমিরের দেবতা।সুন্দরবন মানেই জলে কুমির এবং বাঘ। দুদিকেই বিপদ। বাঘের হাত থেকে বাঁচতে মানুষ যেমন বন বিবি বা দক্ষিণ রায়ের পূজো দিতো তেমনই কুমিরের হাত থেকে রক্ষা পাবার বিশ্বাসে কালু রায়ের পুজো দেওয়া হয়।

 

মূলত মৎসজীবি জেলেরা, কাঠুরেরা বা মধু ভাঙতে যাওয়া মানুষেরা কালু রায়ের পূজো দিতো।একটি জনশ্রুতি অনুযায়ী একবার দক্ষিণরায় এবং বড়খাঁ গাজী নামে আরেক লৌকিক দেবতার ভীষণ যুদ্ধ লেগেছিলো। সেই যুদ্ধ থামিয়ে শান্তি স্থাপন করতে আবির্ভাব হয় কালু রায়ের।

 

কিছু দক্ষিণ রায়ের মন্দিরে একই সাথে কালু রায়েরও পূজো হয়। আবার কোথাও গোলাকার প্রস্তরখন্ড এই দেবতার প্রতীকরূপে স্থাপন করে পূজো দিতে দেখা যায়।খুব কম কিছু স্থানে কালু রায়ের মূর্তি দেখা যায়। মূর্তিতে হাতে টাঙ্গি তরোয়াল এবং পিঠে তির ধনুক নিয়ে যোদ্ধার সাজে বিরাজ করেন কালু রায়।

 

কালুরায়ের মন্দির সেভাবে দেখা যায় না, গাছের তলাতেই তার পূজা হয়। মন্দির খুব কম সংখ্যকেই আছে। বছরে একবার বড় করে কালু রায়ের পূজো এবং বাৎসরিক উৎসব হয়। নৈবেদ্য রূপে ফলমূল, কলা, আতপচাল দেওয়া হয়।জাতি ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে সবাই এই উৎসবে মেতে ওঠেন।

 

ফিরে আসবো আগামী আগামী পর্বে। থাকবে শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক নানা বিষয়

নিয়ে উপস্থাপনা । পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – মা ষষ্ঠী

লৌকিক দেব দেবী – মা ষষ্ঠী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলায় বারো মাসে যে তেরো পার্বন অনুষ্ঠিত হয় তার মধ্যে একাধিক ষষ্ঠী ব্রতর উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন জামাই ষষ্ঠী, শীতল ষষ্ঠী ইত্যাদি।এই ষষ্ঠী শুধু একটি তিথি নয় ষষ্ঠী একজন দেবীও বটে।

দেবী ষষ্ঠীর উল্লেখ কিছু পুরানে

থাকলেও লৌকিক দেবী রূপেই তিনি পূজিতা হন।

 

পুরাণ অনুসারে দেবী নন ব্রহ্মার মানস কন্যা এবং লৌকিক দেবী রূপে তিনি মূলত প্রজজনের দেবী, সন্তানদায়িনী। দেবীর আশীর্বাদে সন্তান প্রাপ্তি হয় সংসারে সুখ এবং সমৃদ্ধি আসে।

 

অনেকের কাছেই দেবী ষষ্ঠী আসলে দেবী দুর্গার একটি লৌকিক রূপ। দেবী এখানে উগ্র বা ক্রোধন্মত্তা নন তিনি শান্ত এবং স্নিগ্ধ।দেবী দুর্গাই ষষ্ঠী রূপে গৃহে গৃহে বাস করেন এবং এজন্য তাকে তিনি গৃহদেবীও বলা হয়।

 

বাংলায় লৌকিক দেবী হিসাবে পূজিত ষষ্ঠী দেবীর যে রূপ আমারা পাই সেখানে তিনি দ্বিভূজা।

তাঁর কোলে থাকে শিশু এবং দেবী বাহন বিড়াল।

 

বহু গৃহস্ত বাড়িতে মায়ের বাহন রূপে বিড়ালদের সযত্নে লালন পালন করা হয়ে থাকে এবং বিশ্বাস করা হয় বাহনের অবহেলা হলে দেবী রুষ্ট হন তাতে গৃহের অকল্যাণ হয়।

 

কোথাও মূর্তি রূপে কোথাও আবার ষষ্ঠী রূপে শিলাখন্ডকে পুজো করার চল রয়েছে।

বাংলার বহু স্থানে।পরিবারের মঙ্গল কামনায়, বিশেষ করে সন্তান ভাগ্য প্রসন্ন হয়ার জন্য ষষ্ঠী ব্রত পালন পালন করা হয়।

 

ফিরে আসবো লৌকিক দেব দেবীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে আগামী দিনে। ধারাবাহিক লেখা চলতে থাকবে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – ধর্মঠাকুর

লৌকিক দেব দেবী – ধর্মঠাকুর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার অন্যতম প্রসিদ্ধ লৌকিক দেবতা হলেন ধর্ম ঠাকুর। মূলত দক্ষিণ বঙ্গের আঞ্চলিক দেবতা এই ধর্ম ঠাকুর।আজকের পর্বে ধর্ম ঠাকুরের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করবো।

 

আসলে ধর্ম ঠাকুর হলেন যমের একটি লৌকিক রূপ তাঁকে ধর্মরাজ ও বলা হয়।তিনি ন্যায়, সুবিচার এবং নৈতিকতার দেবতা। তিনি অন্যায় করলে শাস্তি দেন আবার যারা ভালো কাজ করেন তাদেরকে কৃপা করে ধন্য করেন।

 

ধর্ম ঠাকুরকে কোথাও শীলা খন্ড রূপে আবার কোথাও সুপুরুষ এক দেবতা রূপে পূজো করা হয় এবং তাঁর বাহন হিসাবে আছে ঘোড়া স্থান পায়।

 

এক সময় সুন্দরবন লাগোয়া দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন জায়গাতেও ধর্ম ঠাকুরের পুজো প্রচলিত ছিলো। বহু ধর্ম ঠাকুরের স্থান আজ ভগ্ন প্রায় তবে তাদের মধ্যে কিছু স্থান আজও জাগ্রত। আজও স্বমহিমায় বিরাজ করছেন ধর্ম ঠাকুর।তেমনই এক স্থান দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার জয়নগর।সেখানে সুপ্রাচীন ধর্ম ঠাকুরের মন্দির আছে এবং জৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে ধর্ম ঠাকুরের বিশেষ

পুজো হয়।

 

অন্যন্য লৌকিক দেব দেবীদের ন্যায় ধর্ম ঠাকুরের পূজোতেও জাতি, ধর্ম, বর্ন নির্বিশেষে সমাজের সব শ্রেণির মানুষই মেতে ওঠেন।জয়নগর থানা এলাকার দক্ষিণ বারাসতে ধর্ম ঠাকুর মন্দির বেশ বিখ্যাত এখানে অসংখ্য মানুষ পুজো দিতে আসেন।

 

ফিরে আসবো আগামী দিনে। থাকবে

আরো একটি নতুন পর্ব। আরো অনেক তথ্য

এবং ব্যাখ্যা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – বড়াম দেবী

লৌকিক দেব দেবী – বড়াম দেবী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ লৌকিক দেব দেবীর এই পর্বে আপনাদের ঝাড়গ্রাম এলাকার বড়াম দেবীর কথা জানাবো।

শুধু ঝাড়গ্রাম নয়। বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়া সহ মেদিনীপুরের কিছু স্থানে এই পূজো হয় বহু প্রাচীন কাল থেকে।

 

কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন বড়াম’ নামকরণ হয়েছে ‘বুড়ি’ থেকে। যেহেতু এটি মহিলা দেবতা।

দেবীকে বৃদ্ধা রূপে কল্পনা করে পূজো করা হয় তাই এই রুপ নাম করণ।

 

বড়াম দেবীর কোনো নিদ্দিষ্ট রূপ নেই সাধারণত একটি শিলা খন্ডে প্রান প্রতিষ্টা করে সিঁদুর দিয়ে চোখ নাক এঁকে তার পূজো করা হয়।এককালে মূলত আদিবাসীরাই বড়াম দেবীর পূজো করতো।

বড়াম সাধারণত গ্রাম বা অরণ্যের রক্ষাকত্রী।গ্রামের মানুষ তাঁদের পোষা গৃহপালিতদের এবং পরিবেশ বাঁচানোর জন্য শরণাপন্ন হত বড়াম

দেবীর কাছে।

 

বড়ামের নাম ও স্থান ভেদে ভিন্ন ভিন্ন কোথাও বড়াম চণ্ডী, আবার কোথাও বড়াম বুড়ি আবার কোনো স্থানে বড়াম মাঈ বলা হয়ে থাকে।

 

বড়াম দেবীকে দেবী দুর্গা বা দেবীর চন্ডীর লৌকিক রূপ হিসেবে দেখা হয়।আবার অনেকের কাছে তিনি বন দুর্গা বা জয় দুর্গা যা দুর্গারই রূপ।

কিছু স্থানে বড়াম দেবীর পূর্ণাবয়ব মূর্তি বানিয়েও পূজো হয়। সেখানে বাঘের পিঠে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে অথবা অথবা বাঘের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন দেবী। ঠিক যেনো সিংহ বাহিনী

মা দুর্গা।

 

প্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত বড়াম পূজায় কোনো মন্ত্র বা শাস্ত্রীয় রীতি নীতি নেই। ভক্তদের বিশ্বাস, ভক্তি আর শ্রদ্ধাই সব।পৌষ সংক্রান্তির রাতে বড় করে বড়াম পূজা হয়।পূজোর দিন বড়াম থানে পোড়ামাটির হাতি ঘোড়া দেওয়া হয়।পুজোতে নৈবেদ্য রূপে শুয়োর, ছাগল, মুরগি বলিও করা হয়।কোথাও কোথাও চাল ভাজা। ফল, ফুল এবং মহুয়ার ফুল থেকে নির্মিত মদ ব্যবহার করা হয় বলেও শোনা যায়। জাতি, ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই বড়াম পুজোয় অংশ গ্রহন করেন এবং আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠেন।

 

ফিরে আসবো লৌকিক দেব দেবীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে আগামী দিনে। চলতে থাকবে এই

ধারাবাহিক লেখনী।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – ভূত বাবা

লৌকিক দেব দেবী – ভূত বাবা

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলার প্রায় প্রতি জেলাতেই আছে কিছু লৌকিক দেব দেবীর অস্তিত্ব। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার এক বিশিষ্ট লোকদেবতা হলেন ভূতবাবা বা ভূতেশ্বরবাবা।যিনি আসলে মহাদেবেরই
এক লৌকিক রূপ।

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার দুটি ভূত বাবার মন্দির বেশ প্রসিদ্ধ একটির নাম বড় কাছারি অন্যটি ছোট কাছারি নামে বিখ্যাত।

ছোট কাছারি মন্দিরটি তুলনামূলক ভাবে বয়সে
নবীন। কোনো এক ভূত বাবার ভক্ত তার মনোস্কামনা পূর্ণ হওয়ায় সম্ভবত ছোট কাছারি মন্দিরটি নির্মাণ করান।

বিষ্ণুপুরে বাখরাহাট অঞ্চলে অবস্থিত বড় কাছারি মন্দিরের ইতিহাস বেশ প্রাচীন।এক সময়ে আজকের বাখরাহাট সংলগ্ন এলাকা ছিলো ঘন জঙ্গলে ঢাকা, এখানেই বাস করতেন এক সাধু, শোনা যায় স্থানীয় অধিবাসীদের সকল বিপদ থেকে রক্ষা করতেন ওই সাধু, তার মৃত্যুর পর তার মরদেহ না পুডিয়ে সেই শশ্মানে সমাধিস্থ করে ভক্তগণ। পরে সেই সমাধিক্ষেত্র হতে এক অশ্বত্থ গাছ জন্মায় এবং ওই স্থানে স্থাপন করা হয় এক শিবলিঙ্গ, স্থানটি ক্রমশঃ সর্বত্র বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং দূর দূর থেকে মানুষ আসতে থাকেন পুজো দিতে|

কেনো বড়ো কাছারি নাম হলো সে নিয়েও এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ আছে,জনশ্রুতি অনুসারে এই শশ্মানে নাকি গভীর রাতে স্বয়ং শিবশম্ভু ভূতনাথ বেশে বিচার সভা বসাতেন। সেকারণে স্থানটিকে অনেকে এখনো ভূতের কাছারিও বলেন। আর যেহেতু সে বিচার ভূতনাথরূপী শিবের দরবারে, সুতরাং তাঁর বিচারই সর্বশ্রেষ্ঠ তাই সব কাছারির উর্ধে এই কাছারি ও তার বিচার তাই বড়ো কাছারি নামেই পরিচিত হয়েছে এই স্থান|

ভূতবাবার মূর্তির সাথে পাঁচু ঠাকুরের মূর্তির কিছু মিল চোখে পড়ে। দুটিই শিবের লৌকিক রূপ হওয়ায় এই সাদৃশ্য থাকা স্বাভাবিক। সাধারণত সিংহাসনের উপর বামপদ ঝুলিয়ে বসে থাকেন ভূত বাবা। গলায় রুদ্রাক্ষ দেখা যায়। বিস্তৃত মোটা গোঁফ। দেবতার দুই হাত। এক হাতে গাঁজার কলকে। মাথায় ঝাঁকড়া চুল।সৌম্য ও শান্ত মুখ। ভূতবাবার ডানদিকে ও বামদিকে তাঁর দুই
সঙ্গী থাকেন।

ভূত বাবার ভক্তরা বিশ্বাস করেন ভূত
বাবার পূজো করলে অশুভ শক্তি নাশ হয়।
শত্রু বিজয় হয়। দুর্ভাগ্য দুর হয়। প্রতি শিব রাত্রিতে
ভূত বাবার বিশেষ পূজো হয়।

ফিরে আসবো লৌকিক দেব দেবীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে আগামী দিনে। চলতে থাকবে এই
ধারাবাহিক আলোচনা। দেখতে থাকুন।

লৌকিক দেব দেবী – দেবী বাসুলী

লৌকিক দেব দেবী – দেবী বাসুলী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দেবী বাসুলী বাংলার অন্যতম জাগ্রতা লৌকিক দেবী। দেবী সর্বাধিক জনপ্রিয় বাঁকুড়ায় । বাঁকুড়া ছাড়াও পুরুলিয়া এবং দক্ষিণবঙ্গের কিছু

স্থানেও দেবী বাসুলীর পূজো হয়।

 

বাঁকুড়ার ছাতনা অঞ্চলে রয়েছে অতি প্রাচীন বাসুলী দেবীর মন্দির।এককালে ছাতনা অঞ্চল ছিলো বাঁকুড়া রাজধানী। একবার বাঁকুড়ার এক রাজা স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন মা বাসুলির ৷ স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী বাসুলি দেবীর মূর্তি তৈরি করান। পূজো শুরু করেন।তারপর থেকে গোটা বাঁকুড়ার জনপ্রিয় দেবী হিসেবে বাসলী মায়ের পূজা হতে শুরু হয়।তৈরী হয় বাসুলী দেবীর একাধিক মন্দির।কালের নিয়মে বহু মন্দির আজ অস্তিত্ব হারিয়েছে তবু টিকে আছে কিছু।

আজও স্বমহিমায় রাঢ় বঙ্গে বিরাজ করছেন

দেবী বাসুলী।

 

দেবীকে মা কালীরই একটি লৌকিক রূপ বলে মনে করা হয়।আবার কারোর কাছে তিনি দেবী

দুর্গার লৌকিক রূপ।দেবী দ্বিভূজা ও রক্তবর্ণা। দেবী কালীর মতোই মহাদেবের উপর দণ্ডায়মানা এবং মুণ্ডমালা ও পরিহিতা।হাতে রয়েছে হাতে খড়গ দেবীকে রক্তসরস্বতী হিসেবে ভাবা হয়।আবার মূলত দক্ষিণ বঙ্গের দেবী বিশালক্ষী মাতাকেও অনেকে বাসুলী দেবীর একটি রূপ বলেই মনে করেন।

 

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস বাসুলী দেবীর আরাধনা করতেন এমন তথ্য প্রাচীন কিছু গ্রন্থে পাওয়া যায়।কিছু বাসুলী দেবীর মন্দিরে সম্পূর্ণ তন্ত্রমতে তিনি পুজো পান। আবার কিছু স্থানে তান্ত্রিক এবং বৈষ্ণব উভয় মিশ্রিত পদ্ধতিতে পুজো হয়।

 

বাঁকুড়ার পাত্রসায়রের বাসুলী মন্দিরে মূলত গন্ধবণিক সম্প্রদায়ের লোকজনের বাস। এরা জলপথে বাণিজ্যের লবণ ব্যবসায়ের সঙ্গেই জড়িত ছিল।লবন ব্যাবসায়ী গন্ধবণিক সম্প্রদায়ের মধ্যে দেবী বাসুলীর জনপ্রিয়তার জন্য অনেকে মনে করেন হয়তো দেবী এক সময়ে লবণের দেবী ছিলেন।নদীমাতৃক বাংলায় একদিকে যেমন দক্ষিণরায় বা বনবিবি পূজিত হতেন তেমনই ব্যাবসার কল্যানে লবণের একজন অধিস্টাত্রী দেবী থাকবেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

 

দেবী বাসুলী হন বা বিশালক্ষী বা রক্ত সরস্বতী। তার ভক্তদের কাছে তিনি পরম দয়াময়ী এবং

সবার মনোস্কামনা পূরণ করেন বলেই বিশ্বাস।

 

এখনো বহু লৌকিক দেব দেবী নিয়ে লেখা

বাকি আছে। ফিরে আসবো আগামী পর্বে। ধারাবাহিক লেখা নিয়ে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – দেবী সন্তোষী

লৌকিক দেব দেবী – দেবী সন্তোষী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দেবী সন্তোষী বৈদিক না পৌরাণিক নাকি লৌকিক তা নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। ধৰ্মর প্রামান্য শাস্ত্রগুলিতে সেই ভাবে মা সন্তোষীর উল্লেখ পাওয়া যায়না। আবার সনাতন ধর্মের সর্বোচ্চ গুরু শঙ্করাচার্য্যর মতেও সন্তোষী লৌকিক দেবী। অর্থাৎ লোককথা এবং জনশ্রুতি তেই তাঁর মাহাত্ম

বর্ণনা করা হয়েছে।

 

একটি পৌরাণিক কাহিনী মতে একবার রাখি পূর্ণিমার দিন ভগবান গণেশের বোন তাঁর হাতে রাখি বাঁধছিলেন। তাই দেখে গণেশের দুই ছেলে শুভ আর লাভেরও ইচ্ছা হয়, তাঁরা বোনের হাতে রাখি পরবেন। দুই ছেলের মন রাখতে গণেশ সৃষ্টি করেন এক কন্যার।সেই কন্যাই সন্তোষী।

 

দেবী তার ভক্তদের সন্তোষ প্রদান করেন। মনোস্কামনা পূরণ করেন। সুখ সমৃদ্ধি এবং সৌভাগ্য দেন বলে বিশ্বাস করা হয়।

 

তবে দেবী সন্তোষী সর্বাধিক জনপ্রিয়তা লাভ করেন ১৯৭৫ সালে মুক্তি প্রাপ্ত বলিউডের ছবি ‘জয় সন্তোষী মা’ এর মাধ্যমে। তারপর গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে সন্তোষী মায়ের কথা।

শুক্রবারে দেবীর আবির্ভাব হয়েছিলো বলে বিশ্বাস করা হয় তাই ওই দিন সন্তোষী মার ব্রত

পালন করা হয়।

 

ভারতে রাজস্থানের যোধপুরে রয়েছে সন্তোষী মাতার মন্দির। মন্দিরের সঙ্গেই রয়েছে অমৃত কুণ্ড।বহু সন্তোষী মায়ের ভক্ত সেখানে

পুজো করতে আসেন

 

দেবী সন্তোষী চতুর্ভুজা। পরনে লালবস্ত্র। একটি হাতে ত্রিশূল, একটিতে তলোয়ার, একটি হাত আশীর্বাদের, চতুর্থ হাতটি রয়েছে সংহার মুদ্রায়। তাঁর ত্রিশূল সত্ত্ব, রজ ও তমগুণের প্রতীক এবং তলোয়ার জ্ঞানের প্রতীক।

 

ফিরে আসবো লৌকিক দেব দেবীর পরবর্তী

পর্বে। ধারাবাহিক লেখনী চলতে

থাকবে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – মাকাল ঠাকুর

লৌকিক দেব দেবী – মাকাল ঠাকুর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

সুন্দরবন অঞ্চলের আরো এক জনপ্রিয় লৌকিক দেবতা হলেন মাকাল ঠাকুর।কে এই মাকাল দেব তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। অনেকে মনে করেন মহাকাল থেকে মাকাল বা মাখাল উৎপত্তি। সেক্ষেত্রে মাকাল শিবের লৌকিক রূপ হতে পারেন।

 

সাধারণত মাটির তৈরী স্তূপ কে মাকাল দেব রূপে প্রান প্রতিষ্টা করে পূজো করা হয়।মাকালদেবের স্তূপে সর্বদা একটি স্তূপ থাকে না বেশি ভাগ ক্ষেত্রে একাধিক স্তূপের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

 

মাকাল দেব মূলত মৎসজীবিদের আরাধ্য দেবতা। সেই অর্থে তিনি মাছ বা নদী নালার ঠাকুর।বছরের বিভিন্ন সময় মাকাল দেবতার পূজা হয়ে থাকে। তবে বর্ষাকালে তাঁর পূজার প্রাধান্য বেশি।মৎস জীবিরা মাছ ধরতে যাওয়ায় আগে চাপা ফুল দিয়ে মাকাল ঠাকুরের পূজো করেন।এই পূজায় কোনো ব্রাহ্মণ লাগে না। সাধারণত মৎস্যজীবী দলের প্রধানই পূজা সারেন। আতপ চাল, নিরামিষ বাতাসা আর পাকা কলা নৈবেদ্য হিসেবে দেওয়া হয়। জ্বালানো হয় প্রদীপ। মাকাল ঠাকুরের সামনে কোথাও কোথাও মাটির কুমির মূর্তি বানানো হয়।

 

কবিশেখরের ‘কালিকামঙ্গল’-এ মাকাল ঠাকুরের উল্লেখ আছে। আবার দেবী মাকালচণ্ডী বাংলার এক বিশেষ লৌকিক দেবী যাকে অনেকে মাকাল ঠাকুরের স্ত্রী রূপ বলে মনে করেন।

 

প্রাচীন বঙ্গে বিশেষ করে গাঙেও দক্ষিণ বঙ্গে ‘আট মাকাল’ পূজো প্রচলিত ছিলো । এই আট মাকালের ক্ষেত্রে বেদিতে আটটি মাটির পর্বতআকৃতি স্তূপ বানানো হতো । আটটি স্তূপের মাঝের স্তূপটিকে ‘আটেশ্বর’ দেবতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।অর্থাৎ মাকাল ঠাকুরের আটটি রূপের খোঁজ পাওয়া যায়।সাধারণত গবাদী পশুদের হিংস্র জন্তুদের হাত থেকে বাঁচতে এই পূজো করা হতো।

 

বাংলা তথা গোটা দেশে ছড়িয়ে আছে এমন অসংখ্য লৌকিক দেব দেবী। ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।

ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – বুলেট বাবা

লৌকিক দেব দেবী – বুলেট বাবা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শুধু মাত্র বাংলাতেই লৌকিক দেব দেবীদের অস্তিত্ব আছে এমনটা নয়। দেশের নানা প্রান্তে বিরাজ করছেন একাধিক লৌকিক দেব দেবী। মূলত জনশ্রুতি। প্রচলিত কিংবদন্তী এবং লোককথা তেই তারা দেবতা। তবে তাঁদের ভক্তদের শ্রদ্ধা ভক্তিতে কোনো খুঁত নেই। এদের মধ্যে অনেকেই এক কালে মানুষ হলেও পরবর্তীতে নিজেদের অলৌকিক শক্তির জোরে দেবত্বে উন্নীত হয়েছেন। এমনই এক লৌকিক দেবতা রাজস্থানের বুলেট বাবা।

 

রাজস্থানের এক মন্দির আরাধ্য দেবতা একটি বুলেট বাইক এবং মন্দিরটি বুলেট বাবার মন্দির নামে বিখ্যাত|বিখ্যাত এই মন্দির প্রতিষ্ঠার পিছনে রয়েছে অলৌকিক এক গল্প। তিন দশক আগে ১৯৯৮ সালে ওম সিং রাঠৌর নামে এক তরুণের মৃত্যু হয় পথদুর্ঘটনায়। স্থানীয় গ্রামবাসীর ছেলে ছিলেন তিনি। বুলেট বাবা মন্দিরে পুজো হওয়া বাইকটি আসলে ওম সিং রাঠৌরের । ওই বাইকটি নিয়ে ফেরার পথে পালির কাছে দুর্ঘটনায় পড়েন তিনি। পরদিন পুলিশ তাঁর শবদেহ এবং বাইকটি উদ্ধার করে নিয়ে যায়। কিন্তু গ্রামবাসীদের দাবি, রাতে আচমকা উধাও হয়ে যায় বাইকটি। সেটিকে খুঁজে পাওয়া যায় ওম সিং রাঠৌরের দুর্ঘটনার স্থানে। স্থানীয় সূত্রে দাবি, এরকম ঘটনা এক নয় একাধিকবার ঘটে। ট্যাঙ্ক থেকে তেল খালি করে, চেন দিয়ে বেঁধে রাখলেও উধাও হয়ে গিয়েছে বাইকটি।স্থানীয়দের দাবি, আপনাআপনি ইঞ্জিন স্টার্ট হয়ে চালু হয়ে যায় বাইকটি। তারপর থেকেই একটি বিশ্বাস ছড়িয়ে যায় ওম বাবা নিজে ওই বাইকের মাধ্যমে বেঁচে আছেন। পথদুর্ঘটনায় আর যাতে কারও মৃত্যু না হয় তাই তিনি পাহারা দিতে বেরোন। এরপরই দুর্ঘটনাস্থলের গাছের নীচে প্রতিষ্ঠিত হয় বুলেট বাবার মন্দির।

 

রাজস্থানের যোধপুর থেকে পালির দিকে ৫০ কিমি গেলেই দেখা মিলবে এই বুলেট বাবা মন্দিরের। যেখানে পূজিত হয় ৩৫০ সিসি রয়্যাল এনফিল্ডের এক বহুমূল্য বাইক। বুলেট বাবার মন্দির বা ওম বাবার মন্দির বলে বিখ্যাত রাজস্থানের এই মন্দির। স্থানীয়দের বিশ্বাস বুলেট বাবার পূজো দিলে পথদুর্ঘটনা থেকে বাঁচাবেন বুলেট বাবা । তাই এদিকে যাত্রার আগে স্থানীয় থেকে পর্যটক, সমস্ত গাড়ি চালকরাই এই মন্দিরে পুজো দেন।শুধু তাই নয় গ্রামবাসীদের দাবী বাইকের কাছে যেকোনও সমস্যার কথা জানালে তা সমাধানও হয়ে যায়|

আজ রাজস্থানের তথা দেশের অন্যতম জনপ্রিয় লৌকিক দেবতা এই বুলেট বাবা।

 

ফিরে আসবো আগামী দিন নতুন পর্ব নিয়ে।

চলতে থাকবে লৌকিক দেব দেবী নিয়ে ধারাবাহিক লেখা । পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেবদেবী – ক্ষেত্র পাল

লৌকিক দেবদেবী – ক্ষেত্র পাল

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার আরো এক জাগ্রত এবং প্রসিদ্ধ লৌকিক দেবতা হলেন ক্ষেত্র পাল।ক্ষেত্রপাল মূলত ভূমিরক্ষক রূপে পূজিত হন আবার কোথাও কোথাও তিনি কৃষির দেবতা। ক্ষেত্রপালের কৃপায় কৃষকদের ভূমি রক্ষা পায় এবং ফসল ভালো হয় বলেই বিশ্বাস।কিছু ক্ষেত্রে তাকে চারটি দিকের দেবতা অর্থাৎ উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম দিকের দেবতা বলা হয়। শুধু হিন্দু ধর্ম নয় বৌদ্ধ ধর্মেও ক্ষেত্র পালের উল্লেখ আছে।

 

লৌকিক দেবতা হলেও কিছু পুরান এবং তন্ত্র শাস্ত্রে ক্ষেত্র পালের উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘প্রয়োগসার ’ নামক তন্ত্রগ্রন্থে ক্ষেত্রপালের নাম ‘ঘণ্টাদ ’ সেখানে ক্ষেত্র পালের রূপ, পূজো পদ্ধতি এবং মন্ত্রের উল্লেখ আছে।আবার তন্ত্রশাস্ত্রে শিবের একটি নাম ক্ষেত্রপাল বা ক্ষেত্রেশ এবং তিনি কৃষি কাজে যুক্ত থাকেন তাই ক্ষেত্রপালকে শিবের লৌকিক রূপ হিসেবেও দেখা হয়।

 

মৎস পুরান অনুসারে ক্ষেত্রপাল দিগম্বর , বিশালকৃতি, জটাধারী এবং সর্বদা

কুকুর ও শৃগাল বেষ্টিত হয়ে থাকেন।

বিভিন্ন শাস্ত্রে ক্ষেত্রপালের মোট উনোপঞ্চাশ

প্রকার রূপ বর্ণনা করা হয়েছে।প্রতিটি রূপের আলাদা আলাদা নাম আছে।

 

বাংলায় ক্ষেত্রপালের পূজো বহু প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে তবে তাঁর মন্দিরের সংখ্যা খুবই কম।

বর্ধমানের পানাগড়ের অধীনস্থ ক্ষেত্রপাল মন্দিরের পুজো আনুমানিক পাঁচশো বছরের পুরনো৷

ক্ষেত্রপাল এখানে প্রস্তরখণ্ড রূপে বিরাজ করছেন প্রথমে ক্ষেত্রপাল ছিল খোলা আকাশের নীচে৷ পরে স্থানীয়দের উদ্যোগে এবং বর্ধমান রাজপরিবারের

চেষ্টায় ক্ষেত্রপাল মন্দির নির্মাণ হয়।

কথিত আছে এই মন্দিরে ঘন্টা বাঁধলে সব মনস্কামনা পূর্ণ হয় তাই ক্ষেত্র পালের আশীর্বাদ পাবার আশায় ভক্তগণ মন্দিরে ঘন্টা অর্পণ করেন। তাছাড়া নিত্য পূজো উপলক্ষে প্রায় রোজই বহু ভক্তের আগমন হয়।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে ধারাবাহিক লৌকিক দেব দেবী প্রসঙ্গে লেখা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।