Home Blog Page 2

পুরান কথা – মায়া সীতা

পুরান কথা – মায়া সীতা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

রামায়নের গল্প কম বেশি আমরা সবাই জানি। রাম সীতার বনবাস। রাবন কতৃক সীতা হরণ। সীতার অগ্নি পরীক্ষা। এসবই বহুবার শোনা। কিন্তু কিন্তু রামায়ণের একটি অন্য পৌরাণিক ব্যাখ্যা আছে যেখানে বলা হচ্ছে আসল সীতা নয় মায়া সীতা রামের সঙ্গে বন বাসে গেছিলেন। আজ এই মায়া সীতা কে নিয়ে লিখবো।

 

আধ্যাত্ম রামায়ণ অনুসারে আসলে সীতা ছিলেন পবিত্রতা এবং আদি শক্তির প্রতীক। যেহেতু বনবাস, সীতা হরণ, অগ্নি পরীক্ষা সবই পূর্ব নির্ধারিত ছিলো তাই এই সব কিছু থেকে দেবী সীতাকে দুরে রাখতে আগেই সীতার এক প্রতিরূপ বানিয়ে ছিলেন অগ্নি দেব।

 

ঠিক হয় আসল সীতার বদলে মায়া-সীতা রামের সঙ্গে বনে থাকবেন এবং শ্রীরাম যতদিন বনবাসে থাকবেন, এই মায়া-সীতা তাঁর সঙ্গে বনে থাকবেন, আর আসল সীতা অগ্নি দেবের কাছে সুরক্ষিত থাকবেন। অর্থাৎ রাবনের কুনজর মায়া-সীতার উপর পড়লেও সীতার পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ থাকবে।

 

যথা সময়ে মাতৃ আজ্ঞা পালনের জন্য রাম বন বাসে গেলেন।আসল সীতার বদলে মায়া-সীতা রামের সঙ্গে বনে থাকতে শুরু করলেন।তারপরের ঘটনা রামায়ণ থেকে আমরা সবাই জানি কিভাবে রাবণের বোন শূর্পনখা সীতাকে বিরক্ত করতে শুরু করল। লক্ষ্ণণ শূর্পনখার নাক-কান কেটে দিলেন। অপমানিত শূর্পনখা রাবণের কাছে গেল। বোনের কথা শুনে রেগে গিয়ে রাবণ নিজের মামা মারিচের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কাপুরী নিয়ে গেলেন।জটায়ু প্রান দিলেন। রাম বানর বাহিনী নিয়ে লঙ্কা জয় করে সীতাকে উদ্ধার করলেন।

 

বনবাস কাটিয়ে যখন অযোধ্যায় ফিরে আসলেন রাম ও সীতা তখন সীতাকে নিজের পবিত্রতা প্রমাণ করতে অগ্নি পরীক্ষা দিতে হলো এবং যথা সময়ে মায়া সীতা আগুনে প্রবেশ করলেন। সকলে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে। সেই সময় অগ্নিদেব তাঁকে আসল সীতার সঙ্গে বদলে দিলেন। অগ্নিকুণ্ড থেকে সুরক্ষিত অবস্থায় বেরিয়ে এলেন আসল সীতা।

 

ফিরে আসবো পুরান কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে আবার আগামী পর্বে। চলতে থাকবে

ধারাবাহিক পুরান কথা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

মৎস পুরান এবং মহা প্রলয়

মৎস পুরান এবং মহা প্রলয়

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

মৎস অবতার বিষ্ণুর প্রথম অবতার আর সেই অবতার নিয়েই মৎস পুরান তাই নানা দিক থেকে এই পুরান টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ |মৎস্য পুরাণ অনুযায়ী প্রথম মহাপ্রলয়ের সময় জীবকুলকে রক্ষা করতে ভগবান বিষ্ণু মৎস অবতার রূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

 

মৎস পুরান তিনটি কারনে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত মহাপ্রলয়ের বর্ণনা। দ্বিতীয়ত বাস্তু দেবের জন্ম এবং সব শেষে বিষ্ণুর হয়গ্রীব অবতারের কথা।আজ মহা প্রলয় এবং রাজা

সত্যব্রতকে নিয়ে লিখবো।

 

আজ থেকে বহু যুগ আগে দক্ষিণ ভারতে দ্রাবিড়দের রাজা ছিলেন সত্যব্রত। তিনি ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর উপাসক। একদিন নদীর জলে হাত ধোয়ার সময় একটি ছোট্ট মাছ রাজা সত্যব্রতর হাতে উঠে আসে। রাজা মাছটিকে বাড়িতে এনে একটি পাত্রের মধ্যে রাখেন। দু-একদিনের মধ্যে অস্বাভাবিক ভাবে মাছটি বড় হতে থাকে। তখন রাজা সত্যব্রত মাছটিকে একটি পুকুরে ছেড়ে দেন। কিন্তু মাছের আকার বাড়তেই থাকে। পুকুরে তার স্থান সঙ্কুলান হয়ে পড়লে প্রথমে নদীতে এবং পরে মাছটিকে সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া হয়। সমুদ্রে গিয়ে মাছটি আরো দ্রুত গতিতে বড় হতে শুরু করে। রাজা সত্যব্রতের মনে হল এ কোনো সাধারণ মাছ নয়। তিনি হাত জোড় করে মাছটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তখন সেই রহস্যময় মাছটি ভগবান বিষ্ণুর রূপ ধারণ করে সত্যব্রতকে বললেন, হে রাজন, আর সাত দিন পরেই পৃথিবীতে মহাপ্রলয় ঘটবে। তুমি একটি বড় নৌকা তৈরি করো। তাতে সপ্তার্ষি সহ সকল প্রকার ওষধি, সমস্ত রকমের বীজ, সপ্ত ঋষি, চতুর্বেদ, বাসুকি নাগ ও অন্যান্য সকল প্রণীদের উঠিয়ে নিয়ে নৌকায় অপেক্ষা করো।রাজা তাই করলেন অক্ষরে অক্ষরে |

 

কথা মতো নির্দিষ্ট দিনে মহা প্রলয় শুরু হল। সাগর উত্তাল হলো, প্রকৃতি ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ংকরতর হতে শুরু করল। ঠিক তখনই মৎস্যরূপী বিষ্ণু নৌকার সামনে উপস্থিত হলেন। তার নির্দেশ মতো বাসুকি নাগকে দিয়ে নৌকাটিকে মাছের সাথে বেঁধে দেওয়া হল। নিপুন দক্ষতায় নৌকাটিকে টেনে নিয়ে গিয়ে মৎস্যরূপী বিষ্ণু বাসুকি নাগকে মলয় পর্বতের চূড়ায় বেঁধে দিলেন। মহা প্রলয়ে প্রায় সমস্ত উদ্ভীদ ও প্রাণীকুল বিনষ্ট হল। প্রকৃতির তান্ডব শেষ হলে রাজা সত্যব্রত নৌকা নিয়ে স্থলভাগে ফিরে এলেন। নৌকায় থাকা উদ্ভীদ ও প্রাণীদের বংশ বৃদ্ধি ঘটিয়ে শুরু করলেন এক নতুন সভ্যতা। ইতিহাসে যা আর্য সভ্যতা নামে পরিচিত হল। আর রাজা সত্যব্রত পরিচিত হলেন আর্যপিতা ভগবান মনু রূপে।

 

ফিরে আসবো পুরান কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে। এমন বহু পৌরাণিক ঘটনা নিয়ে চলবে

পুরান কথা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরান কথা – শ্রী কৃষ্ণের সুদর্শন চক্রর মাহাত্ম 

পুরান কথা – শ্রী কৃষ্ণের সুদর্শন চক্রর মাহাত্ম

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরান কথার আজকের বিষয় ভগবান শ্রী কৃষ্ণের সুদর্শন চক্র।আমাদের সনাতন ধর্মের দেবদেবীদের প্রত্যেকের যেমন নিজস্ব বাহন রয়েছে, সৃষ্টি কার্যে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে, তেমনই তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব অস্ত্র রয়েছে, যেমন শিবের ত্রিশূল, ইন্দ্রের বজ্র, পরশুরামের কুঠার। তবে শ্রী কৃষ্ণের অস্ত্র সুদর্শন এদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

 

সুদর্শনচক্র তৈরি করেছিলেন স্বয়ং

বিশ্বকর্মা বৈষ্ণবরা বিশ্বাস করেন সুদর্শন চক্র এবং বিষ্ণু এক এবং অভিন্ন|ভয়ংকর অসুররের কাছ থেকে সৃষ্টি কে রক্ষা করা হোক বা ক্রোধে উন্মত্ত মহাদেব কে শান্ত করতে সতীর দেহকে খণ্ডিত করা হোক সুদর্শন চক্র থাকে মুখ্য ভূমিকায়|

 

পুরানে সুদর্শনকে স্বতন্ত্র দেবতা বা চরিত্র রূপে দেখানো হয়েছে।সুদর্শন একাধারে ভগবানের অস্ত্র আবার তার সর্বক্ষণের সঙ্গী এবং একই সাথে ভগবানের চরণ আশ্রিত পরম ভক্তও।পুরান মতে সুদর্শন সূর্যদেব এবং সুদর্শনার পুত্র। ওঘবতী নামক এক রাজকন্যার সঙ্গে সুদর্শনের বিবাহ হয়।

 

শিব বিষ্ণুকে এই সুদর্শন চক্র প্রদান করে ছিলেন।

সুদর্শন চক্র দানের প্রধান উদ্দেশ্য পালনকর্তা যেনো দৃঢ় হাতে সিস্টের পালন ও দুষ্টের দমন করতে পারেন|সু শব্দের অর্থ মঙ্গল এবং দর্শন মানে দেখা দেয়া অর্থাৎ সুদর্শন হলো মঙ্গলময় দর্শন এবং চক্র মানে যা নিজে থেকে ধাবিত হতে পারে।

 

ত্রেতাযুগে সীতার স্বয়ংবর সভায় যখন রাম হরধনু ভঙ্গ করে ফেলেন তখন রুষ্ট হয়ে তাঁকে শাস্তি দিতে মহেন্দ্র পর্বত থেকে সেখানে উপস্থিত হন পরশুরাম।কিন্তু বিষ্ণুর আর এক অবতার রামের আসল প্রকৃতি জানতে পেরে তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করেন তিনি। সেই সময় রাম তাঁকে সুদর্শন চক্রটি গচ্ছিত রাখতে অনুরোধ করেন। তিনি বলেন যে দ্বাপর যুগে তিনি যখন আবার জন্ম নেবেন, তখন যেন পরশুরাম সেটি ফিরিয়ে দেন। দ্বাপর যুদে শ্রীকৃষ্ণের রূপ ধরে বিষ্ণু ধরাধামে অবতীর্ণ হলে ধর্ম রক্ষা করার জন্য তাঁকে সুদর্শন চক্রটি ফিরিয়ে দেন পরশুরাম।

 

সুদর্শনকে শ্রী কৃষ্ণ যেমন স্নেহ করতেন তেমনই শাসন ও করেন। একবার সুদর্শন যখন নিজের বল এবং পরাক্রমের জন্য অহংকারী হয়ে উঠেছিলেন তখন বিষ্ণু বজরংবলীকে ডেকে পাঠান এবং সুদর্শনকে বলেন দ্বার রক্ষী থাকতে এবং আদেশ দেন কাউকে যেনো তার অমুমতি ছাড়া অন্দর মহলে প্রবেশ করতে না দেয়া হয়। কিন্তু বজরংবলী অবলীলায় সুদর্শনকে পরাস্ত করে তার প্রভুর কাছে চলে যান।সুদর্শনের অহংকার দুর করতে ভগবান এই লীলা করেছিলেন।

 

প্রকৃত অর্থে সুদর্শন চক্র শুভ শক্তির প্রতীক যা অশুভ শক্তিকে বার বার পরাজিত করেছে|

 

পুরান কথার পরবর্তী পর্বে এমনই কোনো পৌরাণিক এবং শাস্ত্রীয় বিষয় এবং তার ব্যাখ্যা নিয়ে আবার ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরান কথা – শিবের অর্ধনারীশ্বর রূপ

পুরান কথা – শিবের অর্ধনারীশ্বর রূপ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শিবের এমনই এক তাৎপর্য পূর্ণ রূপ তার অর্ধনারীশ্বর রূপ। পুরান কথায় আজকের পর্বে

এই রূপ নিয়ে লিখবো।

 

পুরান মতে শিবের বাহন ভৃঙ্গীর একবার ইচ্ছে হয়েছিল তার আরাধ্য শিবকে প্রদক্ষীণ করার। কিন্তু তাতে বাধ সাধলেন পার্বতী। তিনি তাঁর স্বামীর পাশে বসে থাকায় শিবকে প্রদক্ষীণ করতে পারলেন না ভৃঙ্গী কারন তিনি শুধু শিবকে প্রদক্ষিণ করবেন।কোনো মোতেই তিনি নিজের আরাধ্য মহাদেবের সাথে অন্য কাউকে স্বীকৃতি দিতে রাজি নয় এমনকি আদি শক্তিকেও তিনি মহাদেবের সমান মানতে চাননা।

 

শেষে উপায় না দেখে ভৃঙ্গী মাছির রূপ নিয়ে শিবকে প্রদক্ষীণ করার চেষ্টা করলেন। তখন পার্বতী তাঁর এবং শিবের মধ্যে সব ব্যবধান ঘুচিয়ে মিলে গেলেন মহেশ্বরের শরীরের সঙ্গে।সৃষ্টি হলো অর্ধনারীশ্বর রূপ। ভৃঙ্গী বুঝলেন শিব এবং পার্বতী একই। তারা ভিন্ন নয়। শিব এবং শক্তি আলাদা নয়।

 

অর্ধনারীশ্বর রূপ সম্পর্কে আরো কিছু পৌরাণিক ব্যাখ্যা আছে।একবার শিবের জটায় গঙ্গাকে অবস্থান করতে দেখে ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠেন পার্বতী। তাঁকে শান্ত করার জন্যে পার্বতীর শরীরের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দেন মহেশ্বর। একাংশে বর্তমান থাকে শিবের উপস্থিতি, অন্য অংশে বিরাজ করেন নারী শক্তি পার্বতী।শিব বুঝিয়ে দেন শিব ও পার্বতী এক এবং অভিন্ন।

তারা আলাদা নন|

 

অর্ধ নারীশ্বর রূপ প্রসঙ্গে একটি বৈদিক একটি ব্যাখ্যাও আছে।সৃষ্টির সূচনা লগ্নে ব্রহ্মার খেয়াল হয় যে জগত তো সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু প্রান চাই, আরো সৃষ্টি চাই। সেই ক্ষনে তার সামনে ভেসে উঠলো মহেশ্বরের আকার, যাঁর এক অংশ পুরুষের এবং বাকি অর্ধেক অংশ নারীর। এই দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রহ্মা নিজেকে দু’ভাগে বিভক্ত করে ফেললে তার ডান দিকের অংশ থেকে জন্ম নিল পুরুষ লিঙ্গের সব প্রাণী এবং বাঁ দিক থেকে জন্ম নিল সব প্রাণীর নারী লিঙ্গ।অর্থাৎ সৃষ্টিকর্মে ব্রম্ভাকে পথ দেখিয়েছিলো অর্ধ নারীশ্বর রূপ।

পরবর্তীতে সৃষ্টিতে নারী পুরুষের সমান অধিকার এবং প্রাধান্য বোঝাতে ত্রিদেবের অন্যতম মহাদেব পুনরায় অর্ধনারীস্বর রূপ ধরেন।

 

শাস্ত্রে অর্ধনারীশ্বর রূপ নর এবং নারী শক্তির মিলিত রূপ যেখানে মহেশ্বর ত্রিনেত্র বিশিষ্ট এবং চতুর্ভুজ রূপে বিরাজমান। তার হস্তে রয়েছে

পাশ, রক্ত কমল, নরকপাল এবং শুল।অনন্ত

শক্তি, সৃষ্টিশীলতা এবং তেজের প্রতীক এই মূর্তি।

 

আবার ফিরে আসবো পুরান কথা

নিয়ে আগামী পর্বে।থাকবে অন্য একটি

পৌরাণিক বিষয়।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরান কথা – রাজা নিমি এবং বশিষ্ট মুনির অভিশাপ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ পুরাণ কথায় রাজা নিমি এবং বশিষ্ট দেবকে নিয়ে একটি পৌরাণিক কাহিনী আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছি।

 

রাজা নিমি ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী ও ধর্মপরায়ণ রাজা। তিনি এক দীর্ঘ যজ্ঞের আয়োজন করেন এবং ঋষি বশিষ্ঠকে সেই যজ্ঞের পৌরোহিত্য করার জন্য অনুরোধ জানান। কিন্তু বশিষ্ঠ তখন ইন্দ্রের একটি যজ্ঞে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি নিমিকে জানান যে পাঁচশো বছর পরে তিনি এসে যজ্ঞ সম্পন্ন করতে পারবেন।

 

রাজা নিমি মনে করলেন যে বশিষ্ঠ তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাই তিনি অন্য ঋষি গৌতমকে দিয়ে যজ্ঞ শুরু করলেন। পাঁচশো বছর পর বশিষ্ঠ ফিরে এসে দেখলেন, নিমির যজ্ঞ ইতিমধ্যেই চলছে। এতে তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে রাজা নিমিকে অভিশাপ দিলেন—“তুমি আর তোমার দেহ ধারণ করবে না।”অভিশাপের সঙ্গে সঙ্গে নিমির আত্মা তাঁর দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।

 

পরবর্তীতে যজ্ঞ সম্পন্ন হলে দেবতারা নিমির আত্মাকে পুনরায় দেহে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু নিমি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। তাঁর উপলব্ধি হয়েছিল—দেহ ক্ষণস্থায়ী, অথচ আত্মার অমর এবং শাশ্বত তাই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আরও গভীর।তিনি এমন বর প্রার্থনা করলেন যাতে তাঁর আত্মা সমস্ত জীবের চোখের পাতার সঙ্গে অবস্থান করে। দেবতারা তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ করেন। চোখের পাতা বন্ধ ও খোলার মধ্যবর্তী ক্ষণকে তাই ‘নিমেষ’ নামে অভিহিত করা হয়।

 

কিন্তু নিমির দেহহীন অবস্থায় রাজ্য শাসনের সমস্যা দেখা দিল। তাঁর কোনো পুত্রও ছিল না। তখন ঋষিরা যোগ বলে নিমির ছেড়ে যাওয়া

দেহ থেকে এক পুত্রের সৃষ্টি করলেন। সেই পুত্রের নাম হয় বিদেহ আবার কোথাও তিনি জনক। পরবর্তীকালে তাঁর বংশেই জন্ম নেন দেবী সীতা যাকে বৈদেহী বা জানকী নামে ডাকা হয়।

 

আবার এমনই একটি পৌরাণিক কাহিনী

নিয়ে ফিরে আসবো পুরান কথার পরবর্তী পর্বে।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরান কথা – সূর্যদেব ও মহাদেবের শাস্তি

পুরান কথা – সূর্যদেব ও মহাদেবের শাস্তি

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজ পুরান কথায় আপনাদের সূর্য দেব এবং দেবাদিদে মহাদেবকে নিয়ে একটি পৌরাণিক ঘটনা জানাবো।

অসুররাজ সুকেশী ছিলেন ভগবান শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত। তাঁর ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে দেবাদিদেব মহাদেব তাঁকে এক অপূর্ব আকাশপুরী দান করেন। সেই নগরী ছিল স্বর্গের মতোই মনোমুগ্ধকর—মেঘের উপর ভাসমান, অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা। সেখানে দিন-রাত পাখির কলতান শোনা যেত এবং নগরীর ঐশ্বর্য ছিল কল্পনারও অতীত।

একদিন সুকেশী ঋষি-মুনিদের সান্নিধ্যে এসে তাঁদের কাছে ধর্ম ও মুক্তির পথ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। ঋষিরা তাঁকে বোঝালেন—জীবনের প্রকৃত উন্নতি বাইরের শক্তিতে নয়, নিজেকে সংযত করা এবং পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণের মধ্যে।তাঁরা ধর্মের বিভিন্ন গুণের কথা বললেন—
দান, ক্ষমা, সংযম, দয়া, শুচিতা, তপস্যা, সত্য, অহিংসা, ধৈর্য এবং অন্যের সম্পদ গ্রহণ না করা।
এই শিক্ষা সুকেশী এবং তাঁর অনুসারীদের মধ্যে পরিবর্তন আনল। তারা বুঝতে শুরু করল যে প্রকৃত মহত্ত্ব অন্যকে পরাজিত করার মধ্যে নয়; বরং নিজের অহংকারকে জয় করার মধ্যেই প্রকৃত বিজয়।অসুর হলেও এই জ্ঞান তাকে একপ্রকার দেবত্বে উন্নীত করলো।তার মধ্যে কিছুটা অহংকার ও জন্ম নিলো।

এদিকে একসময় সুকেশীর আকাশপুরী এতটাই বিশাল ও দীপ্তিমান হয়ে উঠল যে তার আলো সূর্যের দীপ্তিকেও ম্লান করে দিতে লাগল। ধীরে ধীরে সুকেশীর মনে এমন এক ধারণা জন্ম নিল যে তাঁর নগরীর শক্তি ও জ্যোতি যেন সূর্যের চেয়েও বেশি। সূর্য দেবতা এই ঘটনায় অপমানিত বোধ করলেন। আর যখন সুকেশীর নগরীর শক্তি ও অহংকার সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন প্রকৃতির ভারসাম্যও যেন নষ্ট হতে শুরু করল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছল যে সূর্য নিজেই আকাশ থেকে পতিত হতে শুরু করলেন।সূর্যের পতন মানে শুধু একজন দেবতার পতন নয়—এর অর্থ ছিল সমগ্র সৃষ্টির বিপর্যয়। সূর্যের আলো ও তাপ ছাড়া পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ত। দেবতা, ঋষি ও সকলেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন।

অবশেষে সুকেশী উপলব্ধি করলেন তাঁর ভুল। তিনি আবার ভগবান শিবের শরণ নিলেন। সূর্যদেবও নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করলেন। তখন বোঝা গেল—কেউই পরম সত্যের ঊর্ধ্বে নয়।
সুকেশী বুঝলেন, শিবের আশীর্বাদে পাওয়া শক্তিকে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। যে শক্তি ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া, সেই শক্তির জন্য অহংকার করা আসলে নিজের অজ্ঞতাকেই প্রকাশ করে।
ভগবান শিব শেষ পর্যন্ত করুণা করলেন। তাঁর কৃপায় সূর্য আবার আকাশে নিজের অবস্থান ফিরে পেলেন এবং সুকেশীর আকাশপুরীও পুনরায় তার স্থানে ফিরে গেল।

আসলে দেবাদিদেব মহাদেব এই লীলা করেছিলেন তার ভক্তর মন থেকে অহংকার দুর করতে। সূর্যর পতন তাঁর ইচ্ছেতেই হয়েছে। আবার সূর্য তাঁর ইচ্ছেতেই পুনরায় নিজের স্থানে ফিরে যায়।
মহাদেব এই শাস্তির মাধ্যমে তাঁর অসুর ভক্ত এবং সূর্য দুজনকেই শিক্ষা দেন যে কেউই প্রকৃতি এবং ঈশ্বরের নিয়ম লঙ্ঘন করতে পারেন না।
ভক্তি মানুষকে শক্তি দেয় এবং বিনয় সেই শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।

ফিরে আসবো পরের পুরান কথা
নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরান কথা – ঋষি মার্কেণ্ডেয় এবং মহাদেব

পুরান কথা – ঋষি মার্কেণ্ডেয় এবং মহাদেব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শিব পুরানের ষোলো তম অধ্যায়ে আছে ঋষি মার্কেণ্ডেয়র কথা|লেখা আছে তার অমরত্ত্ব প্রাপ্তি নিয়ে একটি গল্প যা আজকের পুরান কথার এই পর্বে আপনাদের জানাবো |

 

শিব পূরাণ মতে বহুকাল পূর্বে মৃকাণ্ডু নামে এক ঋষি বাস করতেন। তিনি ছিলেন ধর্মপরায়ণ ও জিতেন্দ্রিয়। অর্থাৎ সমস্ত ইন্দ্রিয়কে জয় করতে পেরেছিলেন তিনি। তা সেই মৃকাণ্ড পুত্রলাভের আশায় বসলেন ব্রহ্মার তপস্যায়। দীর্ঘ তপস্যায় খুশি হলেন ব্রহ্মা। দিলেন বরও।যথাসময়ে পুত্র সন্তানের মুখ দেখলেন মৃকাণ্ডু।তার নাম রাখা হলো মার্কেন্ডেয়|

 

তবে বরদানের সময় প্রজাপতি ব্রহ্মা জানালেন, প্রবল ধার্মিক হওয়া সত্ত্বেও মাত্র সাত বছর বয়সে মৃত্যু হবে সেই পুত্রের।অর্থাৎ তার ভাগ্যে রয়েছে অকাল মৃত্যু।

 

ঋষি মৃকাণ্ডু বিষ্ণুর আরাধনা করেও এই দুর্ভাগ্য খণ্ডন করতে পারলেন না।পরবর্তীতে বালক মার্কেন্ডেয় মায়ের কাছ থেকে জানতে পারলেন যে তাঁর স্বল্পায়ুর কারনে সর্বদা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত তাঁর পিতা-মাতা।তাঁকে সাহায্য করলেন তার গুরুদেব ঋষি পুলহ। তিনি সব শুনে তাকে বলেন জগতের গুরু মহেশ্বরই একমাত্র পারবেন মার্কণ্ডেয়কে দীর্ঘজীবন লাভের বর দিতে। একইসঙ্গে তাঁকে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করারও পরামর্শ দেন ঋষি। পুলহের কথামতো তপস্যা শুরু করল সেই বালক। গুরুর চরণ বন্দনা করে সে চলে গেল সাগর তীরে। সেখানেই মাটি দিয়ে সে তৈরি করল এক শিবলিঙ্গ। তার সামনে বসে শুরু হল মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রের জপ।

 

যথা সময়ে যখন তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো তখন যমের আজ্ঞা পেয়ে একদল যমদূত হাজির হল মার্কণ্ডেয়-র সামনে। ভয়ঙ্কর তাদের মূর্তি। তবে সেদিকে যেন ভ্রূক্ষেপই নেই মার্কণ্ডেয়র। একমনে ধ্যান করে চলেছে সেই ছোট্ট বালক।তারপর নিদ্দিষ্ট সময়ে যমদূতেরা তার প্রাণ নিতে উদ্যত হতেই মাটির ওই শিবলিঙ্গের সামনেই প্রকট হলেন স্বয়ং মহেশ্বর এবং যমদূত দের সামনে তিনি রুখে দাঁড়াতেই ভয়ে চম্পট দিল যমদূতেরা।

 

এরপর মার্কণ্ডেয়-র প্রাণ নিতে সেখানে হাজির হলেন স্বয়ং যমরাজ। কিন্তু মহেশ্বরের ক্রোধের সামনে পরাজিত হলেন তিনিও উপায় না দেখে ব্রহ্মার দ্বারস্থ হলেন যম। ওদিকে মহাদেবের ক্রোধাগ্নিতে তো তখন তিন লোক কম্পমান । মহাদেবকে শান্ত করতে অগত্যা এগিয়ে এলেন সমস্ত দেবতা। অবশেষে রাগ পড়ে মহাদেবের। দেবাদিদেব তার আয়ু থেকে কিছুটা তার ভক্ত মার্কেন্ডেয় কে দান করলেন। এই সময় কাল এতোই বেশি যে সেই বালক প্রায় অমরত্ত্ব লাভ করে বসলো। মহাদেব আরো জানান যে যদি কোনো ভক্ত শিবলিঙ্গের সামনে বসে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করে তাহলে দীর্ঘজীবন লাভের বরদান পাবে।

 

আগামী পর্বে আবার পুরান থেকে অন্য কোনো বিষয় এবং তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নিয়ে

ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরান কথা – ভস্মাসুরের কথা

পুরান কথা – ভস্মাসুরের কথা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আমাদের পুরান তথা অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থে বর্ণিত সর্বাধিক আলোচিত, জনপ্রিয় এবং রোমাঞ্চকর বিষয় হলো দেবাসুর দ্বন্দ|একদিকে যেমন আছেন প্রবল পরাক্রমী দেবতারা অন্যদিকে তেমন আছেন একাধিক শক্তিশালী অসুর।আজ পুরান কথায় এমনই এক শক্তিশালী অসুর ভস্মাসুর এবং

তার বরদান নিয়ে লিখবো।

 

দেবাদিদেব মহাদেবে শুধু দেবতাদের আরাধ্য দেবতা নন তিনি ভূত প্রেত অসুর দৈত্য দেরও আরাধ্য দেবতা|এই দেবাদিদেব মহাদেবকে তপস্যায় তুষ্ট করে অমরত্বের বর চেয়ে বসলেন এক অসুর তার নাম ভস্মাসুর|কিন্তু অমরত্ব প্রদান করা সম্ভব নয় তাই মহাদেব অন্য বর চাইতে বললেন|ভষ্মাসুর চাইলেন যার মাথায় সে হাত রাখবে সেই যেনো ভষ্ম হয়ে যায়|হাসি মুখে বরদান করলেন মহাদেব।বর পেয়ে তার প্রথম শিকার হিসেবে ভস্মাসুর স্বয়ং মহাদেবের মাথায় হাত রাখতে চাইলেন।কারণ ভক্ত হলেও আসলে সে অসুর এবং অশুভ শক্তির প্রতীক। দেবাদিদেবকে পরাজিত করলে স্বর্গ মর্ত এবং পাতালে তার শ্রেষ্টত্ব প্রমাণিত হবে।

 

কোনো ক্রমে নিজেকে রক্ষা করে সেই স্থান ত্যাগ করলেন মহাদেবে কিন্তু তার পিছু নিলেন ভষ্মাসুর|অবশেষে বিষ্ণুর স্মরণ নিলেন মহাদেব|

 

বিষ্ণু মোহিনী অবতারে ভষ্মাসুরের সম্মুখে অবতীর্ন হলেন মোহিনীর রূপে মুগ্ধ হয়ে ভষ্মাসুর তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন|শর্ত হিসেবে নারী রুপী বিষ্ণু ভষ্মাসুরকে তার সাথে নৃত্যে অংশ নিতে বাধ্য করলেন|নৃত্যরত ভষ্মাসুর সবকিছু ভুলে হটাৎ নিজের মাথায় হাত রেখে বসলো|ব্যাস ফলে গেলো মহাদেবের বর|ভষ্ম হলেন ভষ্মাসুর স্বয়ং এবং সে যাত্রায় রক্ষা পেলেন মহাদেব|

 

আরকেটি পৌরানিক ব্যাখ্যা অনুসারে বিষ্ণুর মোহিনী অবতার ভষ্মাসুর কে বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নদীতে স্নান করে পবিত্র হয়ে আসতে বলেন|স্নান কালে ভুল বসত মাথায় হাত দিয়ে নিজেকে নিজে ভষ্ম করে ফেলে ভষ্মাসুর এবং স্বয়ং বিষ্ণুর কৃপায় সে যাত্রায় কোনোক্রমে রক্ষা পেয়েছিলেন মহাদেব।

 

আমাদের পুরানে অসংখ্য বার এমন দেবাসুর দ্বন্দ্ব বেঁধেছে এবং অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে জয়ী হয়েছে শুভ শক্তি|রক্ষা পেয়েছে স্বর্গ মর্ত সহ গোটা সৃষ্টি। পুরানের এমন সব রোমাঞ্চকর জানা অজানা কাহিনী নিয়ে আবার ফিরে আসবো

যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরান কথা – বিষ্ণুর বাহন গরুড়দেব

পুরান কথা – বিষ্ণুর বাহন গরুড়দেব

 

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রীজাতক

 

পুরানে দেবতা অসুর ও মানুষের পাশাপাশি কিছু অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন অদ্ভুত প্রাণীর ও উল্লেখ আছে|গরুড় দেব এদের অন্যতম|তিনি স্বয়ং ভগবান বিষ্ণুর বাহন|তিনি মহাবীর, তার প্রশ্নের উত্তরে সৃষ্টি হয়েছে গরুড় পুরান। আজ পুরান কথায় গরুড় দেবকে নিয়ে লিখবো।

 

গরুড় কশ্যপ মুনির সন্তান। কশ্যপের অনেক স্ত্রী ছিলেন। বিনতা তাঁদের অন্যতমা। এই বিনতার দুই পুত্র: গরুড় এবং অরুণ। কশ্যপের আর এক স্ত্রীর নাম কদ্রু। তাঁর অনেক সন্তান, সবাই সাপ।

সৎ মায়ের অত্যাচার গরুর কে তার ভাইদের শত্রুতে পরিণত করে।এখানেই পারিবারিক ভাবে গরুড় ও সাপেদের শত্রুতার সূত্রপাত।পরবর্তীতে বিষ্ণু গরুড় কে তার বাহন হিসেবে নির্বাচন করেন।তার পেছনেও আছে এক রোমাঞ্চকর পৌরাণিক ঘটনা।

 

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে গরুড়ের একবার অমৃতর খুব প্রয়োজন হয়ে পড়ে । অমৃত আছে দেবতাদের কাছে। গরুড় দেবলোকে অভিযান করলেন। দেবতাদের যুদ্ধে হারিয়ে অমৃতের ভাণ্ড নিয়ে গিয়ে দিলেন বিষ্ণুর কাছে। কিন্তু নিজে সেই অমৃত পান করলেন না। এই সংযম ও ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু গরুড়কে বর দিতে চাইলেন। গরুড় অমৃত চাইলেন না, কিন্তু অমরত্ব চাইলেন। তার সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থনা করলেন যে, তিনি বিষ্ণুর রথের উপরে থাকতে চান। বিষ্ণু তাঁর সেই প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। সেই থেকে গরুড় বিষ্ণুর বাহন।

 

বিষ্ণুর আশীর্বাদে অমর হয়ে অমৃতের ভাণ্ডটি নিয়ে গরুড় আবার ডানা মেললেন, সেটি যথাস্থানে রেখে আসতে হবে। দেবরাজ ইন্দ্র অমৃত কেড়ে নেওয়ার জন্য চড়াও হলেন বজ্র দিয়ে আঘাত করলেন গরুড় কে । গরুড় তো অমর, কিন্তু দেবরাজের অস্ত্র বলে কথা, তার ওপর দধীচীর সম্মানও রক্ষণীয়, অতএব গরুড় তাঁর দেহের একটি পালক নিক্ষেপ করলেন, অর্থাৎ যুদ্ধে অক্ষত থাকলেন না তিনি। ইন্দ্র তাতেই সন্তুষ্ট হলেন।

 

প্রাকৃতিক ভাবে গরুড়ের সাথে নাগেদের সম্পর্ক খাদ্য ও খাদকের |গরুড়ের প্রধান খাদ্য সাপ তাই গরুড় কে সাপেরা ভয় পাবে এটাই স্বাভাবিক|প্রাকৃতিক নিয়মে এরা একে অপরের শত্রু|

গরুড় ও সাপেদের শত্রুতা নিয়ে শাস্ত্র গুলিতে একাধিক ঘটনার বর্ণনা আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য রামায়ণ এর একটি ঘটনা যখন রাম সেনা নাগ পাশে আবদ্ধ তখন তাদের উদ্ধার করতে আসে স্বয়ং গরুড় দেব | তার আসার পর সকলে নাগ পাশ থেকে মুক্ত হয়ে আবার রাবন সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ন হয়।আবার গরুড় যখন নিজের গতির জন্য অহংকারী হয়ে উঠেছিলেন তখন বিষ্ণুর আদেশে হনুমান গতিতে গরুড়কে পরাস্ত করে তাকে সঠিক দিশা দেখিয়েছিলেন।

 

আবার পর্বে অন্য এক পৌরাণিক দেবতা এবং

তার সাথে জড়িত একাধিক পৌরাণিক ঘটনা নিয়ে ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরান কথা – বিষ্ণুর হয়গ্রীব রূপ

পুরান কথা – বিষ্ণুর হয়গ্রীব রূপ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বিষ্ণু যেমন নানা সময়ে অবতার রূপে পৃথিবীতে এসেছেন তেমনই তার কয়েকটি বিশেষ রূপ ও রয়েছে যা বিশেষ কিছু কার্য সম্পাদন করার জন্য তিনি ধারন করেছিলেন যেমন মোহিনী রূপ বা হয়গ্রীব রূপ|আজ পুরান কথায় লিখবো

বিষ্ণুর হয়গ্রীব রূপ নিয়ে ও জানাবো তার তাৎপর্য।

 

একটি পৌরাণিক ব্যাখ্য অনুসারে দিতির পুত্র হয়গ্রীব ছিলেন এক অসুর যিনি বর পেয়েছিলেন যে হয়গ্রীব রূপেই তাকে কেউ বধ করতে পারবেন। যখন এই অসুর অত্যাচারী হয়ে ওঠে তখন তাকে বধ করতে বিষ্ণুকে হয়গ্রীব রূপে অবতীর্ণ হতে হয়।

 

আবার পুরান মতে দেবতা ও অসুরদের দ্বন্দ্ব

বহু বার হয়েছে|কথিত আছে, একবার মধু আর কৈটভ নামের দুই অসুর ব্রহ্মার কাছ থেকে বেদ চুরি করে পালায়। ব্রহ্মা উপায় না পেয়ে বিষ্ণুর দ্বারস্থ হন। বিষ্ণু তখন ‘হয়গ্রীব’ তথা ‘অর্ধেক ঘোড়া, অর্ধেক মানুষ’ রূপ ধরে অসুরদের পিছনে ধাওয়া করেন ও তাদের পরাস্ত বেদ উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।কিন্তু পথের মাঝে বেদ সহ ঘুমিয়ে পড়েন। সেই ফাঁকে অসুররা আবার ফেরত আসে এবং বিষ্ণুকে আক্রমণ করে। এই স্থানে দুপক্ষের প্রবল যুদ্ধ হয় এবং অসুররা পরাজিত হয়।সেই যুদ্ধের স্থান ছিলো আসাম এর মনীকুট পাহাড়‘মণিকূট’-এর ওপর রয়েছে তীর্থস্থল ‘হয়গ্রীব মাধবমন্দির’। এই মন্দিরের মূল দেবতা রূপে ‘হয়গ্রীব’ রূপে বিষ্ণু বিরাজমান।

 

আবার তিব্বতি বৌদ্ধদের তান্ত্রিক শাখার মতে ‘হয়গ্রীব’ মূর্তি তিব্বতি বজ্রযান বৌদ্ধমূর্তি। আর গৌতম বুদ্ধ এই স্থানেই নির্বাণ লাভ করেন। তাই এই মন্দির তিব্বতি বৌদ্ধদেরও তীর্থক্ষেত্র।

 

 

আবার আগামী পর্বে এমনই কোনো পৌরাণিক বিষয় নিয়ে ফিরে আসবো|ধারাবাহিক ভাবে চলবে পুরান কথা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।