Home Blog Page 24

শুভ বড়দিন

শুভ বড়দিন

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ বহু প্রতিক্ষিত ও পবিত্র বড়দিন |আজকের এই পবিত্র দিন প্রভু যীশুর জন্মদিন হিসেবেই পালিত হয় গোটা বিশ্বে।সারা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে ভারত এবং অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গ মেতে ওঠে এই উৎসব পালনে।আজকাল বড়দিন আর শুধু ক্রিস্টান ধর্মের মানুষ দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, জাতী ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই বড়দিন পালন করি শুভেচ্ছা বিনিময় করি|আর এখানেই আমাদের দেশের সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের এক মহান চিত্র ফুটে ওঠে।

 

যদিও প্রকৃত অর্থে এই ক্রিসমাস ডে প্রভু যীশুর জন্মদিন কিনা তা বিতর্কের বিষয়|বাইবেলে কিন্তু কোথাও প্রভু যীশুর জন্মের নিদ্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ নেই|অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন এই তারিখের ঠিক নয় মাস পূর্বে মেরির গর্ভে প্রবেশ করেন যিশু। সম্ভবত, এই হিসাব অনুসারেই ২৫ ডিসেম্বর তারিখটিকে যিশুর জন্মতারিখ ধরা হয় হয় এবং উৎসব পালন করা হয়।

 

ভাষার বিশ্লেষণ করে দেখলে বলতে হয় এই দিনকে খ্রিস্টমাস ও বলে আবার এক্স মাস ও বলে কারন ইংরেজি খ্রিস্টমাস শব্দটি “খ্রিস্টের মাস ” বোঝাতে ব্যবহার হয়ে আসছে এবং মূলত গ্রিক ভাষা থেকে এই শব্দের জন্ম হয়েছে|যেহেতু প্রাচীন গ্রিক ভাষায় Χ অক্ষর টি Christ বা খ্রিষ্ট শব্দের প্রথম অক্ষর তাই তাই এই অক্ষরটি খ্রিষ্ট শব্দেরনামসংক্ষেপ|

 

ভৌগোলিক ব্যাখ্যা অনুসারে উত্তর গোলার্ধের দক্ষিণ অয়নান্ত দিবস উপলক্ষে ২৫ ডিসেম্বর তারিখে বড়দিন পালিত হয় বিশ্ব জুড়ে অর্থাৎ আক্ষরিক দিক দিয়ে এই দিন সত্যি বড়ো দিন।

 

তবে ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক বা ভাষাতত্বর উর্ধে এই দিনটির আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। আজ ঈশ্বরের পুত্রের জন্মদিন। যাকে ঈশ্বর পাঠিয়েছিলেন মানুষের মধ্যে শান্তির বাণী প্রচার করতে।

 

ঠাকুর রামকৃষ্ণ প্রভু যীশু প্রসঙ্গে বলতে গেলে ভাব প্রবন হয়ে পড়তেন। সমাধিস্ত হয়ে পড়তেন। তিনি দিব্য চক্ষে প্রভু যীশুর সানিধ্য অনুভব করেছেন।

খ্রিস্ট ধর্ম মতে সাধনা করেছেন। আজও মঠ এবং মিশনের তরফে আন্তরিকতার সঙ্গে প্রভু যীশুর জন্মদিন পালন করা হয়।

 

আজ প্রভু যীশুর কাছে প্রার্থনা জানানোর দিন আজ উৎসব করার দিন|আপনারাও প্রার্থনা করুন উৎসব পালন করুন|আমার তরফ থেকে আপনাদের সবাইকে বড়দিনের অসংখ্য শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

শক্তিপীঠ – মহামায়া

শক্তিপীঠ – মহামায়া

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শাস্ত্র মতে কাশ্মীরের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে দেবী সতীর গলা বা কণ্ঠ পড়েছিলো। এই স্থানটি শক্তি পীঠের অন্তর্গত। এখানে দেবী ভগবতী মহামায়া রূপে পূজিতা হন এবং ভৈরব ত্রিসন্ধ্যেশ্বর।

 

শক্তিপীঠের সঠিক স্থান নিয়ে মতপার্থক্য আছে। একটি মত অনুসারে অমরনাথ গুহায় শক্তিপীঠ অবস্থিত। কালীকে পুরানে বা কুলার্ণব তন্ত্রে নাম পাওয়া যায়না তবে কুব্জিকা তন্ত্রের সারদা পীঠের উল্লেখ আছে।

 

সারদা পীঠ, অমরনাথ এবং ক্ষীর ভবানী মন্দিরকে একত্রে শক্তি পীঠের মর্যাদা দেয়া হয়। এর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয় সারদা পীঠকে।

পরবর্তীতে পুরান মতে ঋষি পুলস্ত বহু তপস্যা করে এই স্থানে দেবীকে আহ্বান করেন এবং এই পীঠকে জাগ্রত করেন। মাতঙ্গ মুনির পুত্র শান্ডিল্যকে দেবী এই স্থানে দর্শন দেন।

 

শঙ্করাচার্য্য এই শক্তি পীঠে এসেছিলেন এবং দীর্ঘকাল অবস্থান করেন। বর্তমান শক্তিপীঠ মন্দিরটি প্রায় দু হাজার বছরের পুরোনো। দেবী রূপে রয়েছে সিঁদুর মাখানো শিলা খন্ড যা দেবীর প্রস্তুরীভূত অঙ্গ রূপে প্রতিষ্ঠিত।

 

প্রতিবছর ভাদ্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে দেবী জাগ্রতা হন এবং সেই সময় বিশেষ পুজো পাঠের আয়োজন করা হয়। সেই উপলক্ষে বহু তীর্থ যাত্রী এবং ভক্তের আগমন ঘটে।

 

পর্যটক আলবিরুনির লেখায় এই শক্তি পীঠ, শিলা খন্ড আকারে দেবী এবং গোপন স্থানে দেবী সরস্বতীর দারু নির্মিত অপূর্ব মূর্তির উল্লেখ পাওয়া যায়।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী শক্তিপীঠ নিয়ে আগামী পর্বে। চলতে থাকবে ধারাবাহিক লেখা। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তিপীঠ – গুহ্যেশ্বরী

শক্তিপীঠ – গুহ্যেশ্বরী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে একান্ন পীঠের অন্যতম শক্তিপীঠ গুহ্যেশ্বরী মন্দিরটি নেপালের

কাঠমাণ্ডুতে অবস্থিত।

 

মনে করা হয় গুহ্যেশ্বরী মন্দিরটি পশুপতিনাথ মন্দিরের শক্তির উৎস । সতেরশ শতকে নেপালের রাজা প্রতাপ মল্ল মন্দিরটি নির্মাণ করেন।

ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ এর ললিতা সহস্রনাম অধ্যায়ের ললিতা দেবীর উল্লিখিত সহস্র নামের মধ্যে ৭০৭ তম নামটি হচ্ছে “গুহ্যরূপিণী” যার অর্থ যে দেবীর মাহাত্ম্য মানুষের উপলব্ধির বাইরে এবং যা গুপ্ত। মতান্তরে নামটি ষোড়শী মন্ত্রের ষোড়শ অক্ষর হতে উদ্ভূত।

 

পুরান এই স্থানে দেবীর যোনি পতিত হয়েছিল।আবার কিছু শাস্ত্রজ্ঞ মনে করেন যোনি নয় দেবীর হাঁটু এই স্থানে পড়েছিল।যদিও গুহ্য শব্দের মানে ‘যোনি’ আর ঈশ্বরী হলেন ‘দেবী’। মন্দিরের অভ্যন্তরে একটি কলস দেবী রূপে পূজিত হন। কলসটি স্বর্ণ ও রৌপ্য এর স্তর দ্বারা আবৃত। মূল মন্দিরটি একটি খোলা প্রাঙ্গণের কেন্দ্রে অবস্থিত।মন্দিরের চূড়ায় চারটি সোনালি সর্প আছে।মন্দিরের দেবী গুহ্যকালী নামেও পরিচিতা।

 

গুহ্যেশ্বরী মন্দিরের শক্তি হলেন ‘মহাশিরা’ আর দেবীর ভৈরব হলেন ‘কাপালী’। এই মন্দিরটি তান্ত্রিকদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং এখানে বিবিধ তান্ত্রিক ক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। তন্ত্রশক্তি লাভের জন্য এই মন্দিরটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে কালীতন্ত্র, চণ্ডীতন্ত্র ও শিবতন্ত্ররহস্য গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

শুধু হিন্দু নয় বৌদ্ধদের কাছেও এই দেবীর বিশেষ মাহাত্ম রয়েছে।বজ্রযান বৌদ্ধগণ দেবী গুহ্যেশ্বরীকে বজ্রবরাহী রূপে পুজো করেন।

প্রায় সারা বছর এখানে দর্শণার্থীদের ভিড় লেগে থাকে এবং বিজয়া দশমী ও নবরাত্রির সময় মন্দিরে প্রচুর ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম হয়।

 

আবার আগামী পর্বে ফিরে আসবো অন্য একটি শক্তিপীঠ নিয়ে। থাকবে আধ্যাত্মিক এবং পৌরাণিক ব্যাখ্যা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – কাল মাধব

শক্তি পীঠ – কাল মাধব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

একান্ন পীঠের অন্যতম একটি শক্তি পীঠ হলো কালমাধব সতীপীঠ।পুরান অনুসারে সতীর বাম নিতম্ব পড়েছিলো এই স্থানে।কালমাধব মন্দিরে দেবী কালীরূপে পূজিতা হন এবং এই শক্তি পীঠে দেবীর ভৈরব হলেন অসিতাঙ্গ।ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের অমরকণ্টকে অবস্থিত কালমাধব শক্তিপীঠ।

 

এই শক্তি পীঠ মন্দিরের ইতিহাস অতি প্রাচীন।

প্রাচীন ভারতের এক সূর্য বংশীয় সম্রাট ছিলেন রাজা মান্ধাতা । আজ থেকে আনুমানিক ৬০০০ বছর আগে এই সূর্যবংশীয় সম্রাট শোন নদীর তীরে অমরকন্টকে এই কালমাধব মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। সেই সময়ে শ্বেত শুভ্র পাথরের তৈরি করা হয় মন্দিরটি।আজও এই মন্দিরের সৌন্দর্য এবং নির্মাণ শৈলী দর্শণার্থীদের মুগ্ধ করে।

 

মন্দিরের চারপাশে রয়েছে শ্বেত পাথর দিয়ে বাঁধানো পুকুর এবং মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে শোন নদী।চার দিকে বিস্তৃত পার্বত্য ভূমি যা এখানকার একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

 

সেই প্রাচীনকাল থেকে এই শক্তিপীঠে দেবী

কালীরই পুজো চলে এসেছে । তবে পরবর্তীতে এখানে দেবীকে নর্মদা মা রূপে পুজো শুরু হয় দেবীর বিগ্রহের দুই পাশে জয়া। চামুণ্ডার বিধি মতে এখানে পুজো হয়ে থাকে। পূজারীরা সেই হাজার হাজার বছর থেকে বংশ পরম্পরায় পুজোর দায়িত্ব সামলে আসছেন।

 

যদিও প্রায় সারা বছর ধরেই এখানে অসংখ্য ভক্তদের সমাগম দেখা যায়। তবে দুর্গাপূজা বা নবরাত্রীর সময় এই মন্দিরে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয় এবং ভিড় হয় অনেক বেশি।

 

আবার গৌরিতন্ত্র মতে এই মহাপীঠ উড়িষ্যায়

অবস্থিত। উড়িষ্যার রাজাদের কুল দেবী হলেন শ্যামা কালী এবং কাল মাধবের কালী একই এবং উড়িষ্যার রাজারা স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে শ্যামা কালীর মন্দির নির্মাণ করেন।

 

প্রকৃত স্থান এবং পটভূমি নিয়ে যাই বিতর্ক থাক শক্তি পীঠ কাল মাধব অন্যতম শক্তি পীঠ রূপে শাস্ত্র সিদ্ধ।

 

আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য

একটি শক্তি পীঠের ইতিহাস ও পৌরাণিক ব্যাখ্যা নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – ত্রিপুর মালিনী

একান্ন পীঠ – ত্রিপুর মালিনী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পাঞ্জাবের জলন্ধরে রয়েছে অন্যতম তাৎপর্য পূর্ণ শক্তি পীঠ ত্রিপুর মালিনী।আদি শঙ্করাচার্য্য তার অষ্টাদশ পীঠ বর্ণনায় শক্তিপীঠ ত্রিপুর মালিনীর উল্লেখ করেছেন। মহাভারতের বন পর্বেও এই শক্তিপীঠের উল্লেখ আছে।পীঠ নির্ণয় তন্ত্র, শিব চরিতে এবং কালীকা পুরানে এই শক্তি পীঠের উল্লেখ আছে। পুরান মতে দেবীর ডান বক্ষ এই স্থানে পতিত হয়েছিল। দেবীর নাম এখানে ত্রিপুর মালিনী আর ভৈরব হলেন ভীষণ।

 

পুরান মতে বহু প্রাচীন কালে জ্বলন্ধর নামে এক অত্যাচারী অসুর এই স্থানে শাসন করতো তার অত্যাচারে অতিষ্ট ধরিত্রীকে রক্ষা করতে ত্রিশুল দিয়ে জলন্ধর অসুরের মস্তক ছিন্ন করে তাকে বধ করেন শিব এবং ত্রিপুর মালিনী শক্তি পীঠের কাছেই তাকে সমাধি দেওয়া হয়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানে এই ঘটনার উল্লেখ আছে।

 

ত্রিপুর মালিনী শক্তি পীঠে দেবীর মন্দির অতি প্রাচীন এবং খুবই মনোরম পরিবেশে অবস্থান করছে।মন্দিরের গর্ভে রয়েছে লক্ষী, সরস্বতী, মা বৈষ্ণবদেবীর তিনটি মূর্তি। পাশাপাশি মন্দিরের পাশে একটা ঘরে মায়ের শয্যা স্থান রয়েছে যেখানে মায়ের বিছানা সাজানো রয়েছে। লোকোমুখি শোনা যায় দুপুরের ভোগ গ্রহণ করার পর সেই বিছানাতে বিশ্রাম গ্রহণ করেন দেবী ত্রিপুর মালিনী।

 

নবরাত্রি সহ প্রায় সব বিশেষ তিথিতেই এখানে বড়ো আকারে পুজো হয় এবং সেই উপলক্ষে

বহু ভক্তের সমাগম হয়।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। থাকবে অন্য

একটি শক্তি পীঠ নিয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনা এবং পৌরাণিক ব্যাখ্যা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – ফুল্লরা

শক্তি পীঠ – ফুল্লরা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায় যে কটি সতীপীঠ রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম লাভপুরের ফুল্লরা মন্দির । পঞ্চ সতীপীঠের জেলা বীরভূমের অন্যতম সতী পীঠ এটি।

 

তন্ত্রচূড়ামণিতে একান্ন পীঠের ৪৯ তম পীঠ লাভপুরের ফুল্লরা।এই স্থানে দেবীর ঠোঁট পড়েছিলো বলে বিভিন্ন শাস্ত্রে উল্লেখ আছে।

 

বহুকাল পূর্বে নন্দগিরি মহারাজ কেদারনাথ থেকে স্বপ্নাদেশ পেয়ে লাভপুরে এসেছিলেন। তখন এই এলাকা গভীর জঙ্গলে ঢাকা। সেখানেই জঙ্গলের ভিতরে খুঁজে পেয়েছিলেন প্রাচীন শিলাখণ্ড।সেই শিলা খন্ড দেব সতীর প্রস্তুরীভূত দেহ খন্ড রূপে স্থাপন করে পুজো শুরু হয়।তারপর সেখানেই তৈরি হয় দেবীর মন্দির।পরবর্তী কালে ফুল্লরা দেবীর মন্দির প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন ‘কৃষ্ণানন্দ গিরি’ এবং তিনি পুজোর ভার গ্রহন করেন।

 

একসময় মন্দিরের চূড়ায়, ‘স্বর্ণকলস’ শোভা পেত তবে বর্তমানে তা আর দেখা যায়না। বর্তমানে মন্দির চত্বর খুব প্রশস্ত নয়। গর্ভগৃহের সামনে রয়েছে নাট মন্দির। রয়েছে হাড়ি কাঠ। প্রতি বছর মাঘ পূর্ণিমায় ত্রয়োদশী তিথিতে মায়ের বিশেষ পুজো অর্চনা হয়। এখানে প্রত্যেকদিন মায়ের ভোগে থাকে বিশেষ বৈচিত্র মাছ, মাংস ডাল দুরকম সবজি টক, পাঁচ রকম ভাজা ও অন্যান্য সামগ্রী থাকে।মা ফুল্লরার ভোগ দর্শন এবং ভোগ গ্রহন অন্যতম সৌভাগ্যর বিষয় বলে মনে করা হয়।

 

মন্দির সংলগ্ন একটি পুকুর ঘিরে অনেক জনশ্রুতি আছে। কিংবদন্তি অনুসারে শ্রী রামের দুর্গাপূজার সময় স্বয়ং বজরংবলী এই পুকুর থেকেই ১০৮টি পদ্ম সংগ্রহ করেছিলেন।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী শক্তিপিঠের কথা নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – সর্বানী

শক্তি পীঠ – সর্বানী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ পীঠ নির্ণয়তন্ত্র মতে একান্ন পীঠের চল্লিশতম পীঠ কন্যাশ্রম নিয়ে আলোচনা করবো।যদিও প্রকৃত স্থানটি নিয়ে বিতর্ক আছে। কারো মতে স্থানটি দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারী, কারো মতে কন্যাকুব্জে৷ কিন্তু বেশিরভাগ পন্ডিতের মতে এই শক্তিপীঠ বাংলাদেশের কামরুপে অবস্থিত।

 

বারাহী তন্ত্রে উল্লেখ আছে চন্দ্রনাথ মন্দিরের পঞ্চক্রোশ দূরত্বের মধ্যেই কুমারীকুণ্ড শক্তিপীঠ অবস্থিত। বিখ্যাত তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ তাঁর বৃহৎ তন্ত্রসার গ্রন্থে কুমারীকুণ্ডের কথা উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন এই পীঠস্থান তান্ত্রিক দীক্ষা লাভের উপযুক্ত স্থান। বর্তমানে স্থানটি বাংলাদেশের চট্টগ্রামজেলার অন্তর্ভুক্ত।

 

প্রাচীনকালে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরটি অবশ্য বর্তমানে দেখতে পাওয়া যায় না। দুর্গম পাহাড়ে এক গুহায় দেবী বিরাজ করছেন। পাহাড়ের নিচে কুমারী কুন্ড নামে এক রহস্যময় কুন্ড আছে। গভীর রাতে এই কুন্ডে আগুনের শিক্ষা এবং অশরীরী কোনো শক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় বলে জনশ্রুতি আছে।তাই বিশেষ কোনো স্থান মাহাত্ম না বর্ণনা করে এই এই শক্তি পীঠের আধ্যাত্মিক গুরুত্বই আজকের আলোচ্য বিষয়।

 

কন্যাশ্রমে পীঠাধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বাণী হলেন মূলদুর্গার অনুরূপ। ধ্যানমন্ত্রানুসারে তিনি সিংহবাহিনী, তাঁর কপালে অর্ধচন্দ্র, তাঁর অঙ্গবর্ণ সবুজ৷ তিনি ত্রিনয়নী, তাঁর চার হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও বাণ শোভা পায়। মুক্তা মাণিক্য শোভিত অলংকারে তিনি সুশোভিতা।দেবী সবার মনোস্কামনা পূর্ণ করেন বলে বিশ্বাস করা হয়।দেবীর ভৈরব হলেন নিমিষ।

 

মহাভারতে ঋষি পুলস্থ্য যুধিষ্টিরকে এই শক্তিপীঠে এসে পুজো পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আবার

পৌরাণিক দিক দিয়ে এই শক্তি পীঠের আলাদা মাহাত্ম আছে।ঋষি গর্গের কন্যা মনের মতো বর পাওয়ার জন্য এই স্থানে এসে তপস্যা করেন। কিন্তু যখন তার তপস্যা সম্পূর্ণ হয় তখন তার যৌবন অতিক্রান্ত। রূপ যৌবন কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। এমন সময় দৈব আদেশ পেয়ে শৃঙ্গবান নামে

এক যুবক ঋষি কন্যাকে বিবাহ করতে সম্মত হন।

অলৌকিক ভাবে বিবাহের পরেই সেই কন্যা এক সুন্দরী যুবতীতে পরিণত হন এবং শৃঙ্গবান কে দাম্পত্য জীবন থেকে মুক্তি দিয়ে অদৃশ্য হন।

সেই থেকে এই স্থানে এসে সাধনা করলে সব মনোস্কামনা পূর্ণ হয় বলেই বিশ্বাস।

 

দেবী সর্বানীর আশীর্বাদে সকল দুঃখ কষ্টের অবসান হয় বলেই বিশ্বাস।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য একটি

শক্তি পীঠ সংক্রান্ত লেখনী নিয়ে।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – শ্রী সুন্দরী

শক্তি পীঠ – শ্রী সুন্দরী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

শ্রী পর্বত বা শ্রী সুন্দরী শক্তিপীঠকে একান্নটি শক্তিপীঠের মধ্যে একটি বলে মনে করা হয়।পীঠ নির্ণয়তন্ত্র এবং তন্ত্র চূড়ামনি গ্রন্থ মতে শ্রী সুন্দরী শক্তিপীঠ ছত্রিশতম এবং শিব চরিত মতে পঞ্চম পীঠ শ্রী সুন্দরী।

এই অঞ্চল বর্তমানে অন্ধ্রপ্রদেশের অন্তরগত যদিও প্রকৃত শ্রী পর্বত এবং শ্রী সুন্দরী শক্তিপীঠের অবস্থান নিয়ে কিঞ্চিৎ বিতর্ক আছে। অনেকের মতে এই স্থান আসলে হিমালয়ের পাদদেশে লাদাখে। তবে পুরান এবং অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ মতে শ্রী শৈল মল্লিকার্জুন সংলগ্ন পার্বত্য অঞ্চলেই অবস্থিত এবং বিজয় নগরের রাজারা এই মন্দির এবং দেবী শ্রী সুন্দরীর পুজোর দায়িত্ব পালন করতেন।

দেবী সতীর গোড়ালি পড়েছিল শ্রী পর্বত শক্তিপীঠে। এখানে মাতা সতী ‘শ্রী সুন্দরী’ এবং ভগবান শিব ‘সুন্দরানন্দ’ নামে পরিচিত।

শক্তি পীঠ টি একটি প্রাচীন কালী মন্দির।

এই কালী মন্দিরটিকে স্থানীয়রা শক্তিপীঠ হিসেবে পূজা করে।দেবী কালীকা রূপে বিরাজ করছেন সঠিক বয়স না জানা গেলেও মনে করা হয় মন্দিরটি প্রায় চারশো বছরের প্রাচীন

মহাভারতে এই শক্তিপীঠের উল্লেখ আছে। সেখানে দেখা যায় অর্জুন এই শক্তি পীঠে এসে পুজো করছেন এবং নিকট বর্তী জ্যোতির্লিঙ্গ শ্রী শৈলতে এসে শিবের কাছে যুদ্ধে জয়ের জন্য প্রার্থনা করছেন। তিনি এখানে মল্লিকা ফুল দিয়ে পুজো করায় এই শিব লিঙ্গ মল্লিকার্জুন নামে খ্যাত।

এই শ্রী পর্বত সংলগ্ন এলাকায় এক সময় আদি সংকরাচার্য্য এসেছিলেন বলে শোনা যায় শুধু তাই নয় কথিত আছে এখানকার তান্ত্রিকরা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেন এবং তাকে এই শক্তিপীঠে বলী দেয়ার ষড়যন্ত্র করেন। সংকরাচার্য্যর শিষ্যরা সব জেনে ফেলেন এবং তার প্রাণ রক্ষা হয়।

শ্রী পর্বতে যেখানে মায়ের মন্দির তা প্রাকৃতিক ভাবে অপূর্ব সৌন্দর্য দিয়ে ঘেরা। পাহাড়ের গায়ে মায়ের মন্দির এবং পাহাড়ে দের হাজার ফুট উঁচুতে ভৈরবের মন্দির। দেড় হাজার সিঁড়ি ভেঙে সেখানে যেতে হয়।এই দুর্গম পথ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এই শক্তি পীঠের অন্যতম আকর্ষণ।

সারা বছর ভক্তদের আগমন লেগে থাকে তবে দুর্গাপূজা এবং নবরাত্রিতে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। অন্য একটি শক্তিপীঠ সংক্রান্ত পৌরাণিক এবং আধ্যাত্মিক আলোচনা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তিপীঠ – বিশালক্ষী

শক্তিপীঠ – বিশালক্ষী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরানে বলা হয়েছে কাশি নগর ভগবান শিবের ত্রিশূলের উপরে অবস্থিত। এই কাশিতেই রয়েছে একটি শক্তি পীঠ শাস্ত্রে যার নাম বিশালক্ষী।

 

পুরান অনুসারে ভগবান বিষ্ণু কাশিতে এসে সুদর্শন চক্র দিয়ে একটি পুষ্করিণী খনন করেছিলেন এবং সেখানে বসে হর গৌরীর তপস্যা করেন। সেই সময় ভগবান বিষ্ণুর শরীর থেকে ঘাম নির্গত হয়ে এই পুষ্করিণী টি জলে পূর্ণ হয়।পরবর্তীতে বিষ্ণুর ধ্যানে সন্তুষ্ট হয়ে হর গৌরী দেখা দেন।

শাস্ত্র মতে মা গৌরীর কানের দুল এই জলে পতিত হয়েছিল।তখন থেকেই এই জলাশয়ের নাম হয় মনিকর্নিকা। পরবর্তীতে এই জলাশয় গঙ্গাতে মিলিত হয় এবং গঙ্গার ঘাটটির নাম হয় মণিকর্নিকা।

 

এই কাশিতে বিশালক্ষী মন্দির যে স্থানে আছে সেখানে দেবীর কানের দুল পতিত হয়েছিল।

শিবপুরানেও এই শক্তি পীঠের উল্লেখ আছে এবং বলা হয়েছে এখানে দেবীর দেহের কোন অংশ পড়েনি তবে দেবীর গহনা অথবা অলংকার পড়েছিল। দেবী হলেন অন্নপূর্ণা আর ভৈরব হলেন বিশ্বনাথ।

 

বিশালক্ষী শক্তি পীঠের আশেপাশের পরিবেশ এক কথায় অপূর্ব। মন্দিরে দুটি বিশালক্ষী দেবীর মূর্তি আছে। মনে করা হয় প্রথম মূর্তিটির আড়ালে আছে আদি বিশালক্ষী মূর্তি যা স্বয়ম্ভু অর্থাৎ অলৌকিক ভাবে দেবী নিজেই এখানে প্রকট হয়েছেন।

 

সারা বছর পুজো হলেও নব রাত্রি এই শক্তিপীঠে প্রধান উৎসব। নবরাত্রিতে দেবীর বিশেষ পুজো হয় এবং প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়।

 

আবার অন্য একটি শক্তিপীঠের ইতিহাস এবং পৌরাণিক ব্যাখ্যা সাথে শাস্ত্রীয় তথ্য নিয়ে

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – মঙ্গলচন্ডী

শক্তি পীঠ – মঙ্গলচন্ডী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরান অনুসারে অজয় নদীর পাড়ে দেবীর ডান কব্জি পতিত হয়েছিল।শক্তি পীঠে দেবীর নাম মঙ্গলচন্ডী আর দেবীর ভৈরব কপিলাম্বর।আজকের শক্তি পীঠ পর্বে লিখবো বর্ধমান তথা বাংলার অন্যতম জাগ্রত শক্তিপীঠ মঙ্গলচন্ডী নিয়ে।

 

প্রাচীন মঙ্গল চন্ডীর মূর্তিটি ছিলো পাল যুগের।পরবর্তীতে র্ভগৃহের মধ্যেই মা মঙ্গলচন্ডীর ছোট কালো পাথরের দশভূজা মূর্তি বসানো হয়।

ভৈরবের মূর্তির সামনে নন্দীর কালো পাথরের একটি ছোট্ট মূর্তি আছে। ভৈরবের বাঁদিকে রয়েছে বুদ্ধমূর্তি। তাই স্থানটি একাধারে শাক্ত, শৈব্য এবং বৌদ্ধদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

কথিক আছে রাজা বিক্রমাদিত্যর কুল দেবী ছিলেন মা মঙ্গলচন্ডী। সপ্নাদেশ দিয়ে দেবী বিক্রমাদিত্যকে বলেন গভীর জঙ্গল থেকে তাকে উদ্ধার করে মন্দিরে স্থাপিত করে পুজো করতে। বিক্রমাদিত্য জ্যোতি রূপে দেবীর উপস্থিতি দেখতে পান এবং দেবীকে জঙ্গল থেকে লোকালয়ে এনে স্থাপন করেন।

 

প্রচলিত লোক কাহিনী অনুসারে এক ব্যবসায়ী ব্যবসা করতে গিয়ে সমুদ্রে নিখোঁজ হয়ে যান তারপর তার স্ত্রী খুল্লনা মঙ্গল চন্ডী কে পুজোয় সন্তুষ্ট করে তার স্বামীর ফিরে আসার জন্য প্রার্থনা করেন।অলৌকিক ভাবে কিছুদিন পর ওই ব্যবসায়ী ফিরে আসেন সুস্থ শরীরে। তারপর দেবীর মহিমা ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে।সেই থেকে মঙ্গলচন্ডীর পূজা হয়ে আসছে অজয় নদীর পাড়ে অবস্থিত

এই মন্দিরে।

 

বর্তমানে প্রতি মঙ্গলবার দেবীর পুজো করা হয়। এছাড়াও সারা বছর ধরে এখানে দুর্গাপূজা, কালীপূজা সবই হয়।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। নতুন একটি

শক্তি পীঠের কথা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।