Home Blog Page 23

কালী কথা – ঘোমটা কালী 

কালী কথা – ঘোমটা কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের কালী কথা পর্বে কলকাতার একটি প্রাচীন কালীর পুজোর কথা আপনাদের জানাবো।

 

তিলোত্তমা কলকাতার শ্যামপুকুরে রয়েছেন মা ভবতারিণীর এক প্রাচীন মন্দির এখানে দেবী ঘোমটায় ঢাকা থাকেন।তাই তিনি ঘোমটা কালী।

 

এই মন্দিরের নির্মাণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসতা আগে জানাই।বলরাম ঘোষের উত্তরসূরি তুলসীরাম ঘোষকে স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন দেবী।স্বপ্নে দেখা রূপ অনুযায়ীই এখানে দেবী কালীর মূর্তি তৈরি হয়েছে। মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ প্রথম গ্রহণ করেন সারদা প্রসাদ ঘোষের মা দয়াময়ী দাসী। তুলসীরাম ঘোষ স্বপ্নে দেখা কালী মূর্তি অনুযায়ী একটি ছবি আঁকিয়েছিলেন। সেই ছবিটি এখনও মন্দিরে রাখা আছে। তুলসীরামের পুত্রবধূ দয়াময়ী দেবী স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলের সঙ্গে কলকাতায় এসে জমি কিনে মন্দির তৈরি শুরু করেন এবং তুলসীরামের আঁকানো ছবি অনুযায়ী কালী মূর্তি তৈরি করান। পরবর্তীতে মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় স্থাপিত হয় একটি কষ্টি পাথরের কালী মূর্তি এবং নিয়মিত পুজো শুরু হয়।

 

বর্তমান মন্দিরটি মন্দিরটি ১৮৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত।

দেবী কালিকা আদপে দক্ষিণাকালীরই ভিন্নরূপ। সাধক, সন্ন্যাসীরা দেবীকে ভবতারিণী বলেন। গর্ভগৃহে কষ্টিপাথরের দক্ষিণাকালী ভবতারিণী নামেই নিত্য পূজিতা। মন্দিরের  গর্ভগৃহের একদিকে শ্রীধর অর্থাৎ নারায়ণ শিলা, কৃষ্ণ-রাধিকা মূর্তি, গণেশ, কৃষ্ণ মূর্তিও নিত্য পূজিত হয়।  মন্দিরটি দক্ষিণমুখী। দক্ষিণেশ্বরের আদলে নবরত্নশৈলীতে মন্দিরটি নির্মিত।

 

ভবতারিণী মন্দিরে বৈষ্ণব মতে পুজো হয়।

মন্দিরে প্রতিদিন নিত্য পুজো হয়। কার্তিক অমাবস্যায় ধূমধাম করে কালী পুজো হয়। এছাড়াও জন্মাষ্টমী,দুর্গাপুজো ও জগদ্ধাত্রী পুজো হয়ে থাকে। মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাসন্তী পঞ্চমীর দিন, সেই কারণে, প্রতি বছর বসন্ত পঞ্চমীর দিন মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষ্যে জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে পুজো হয়।

 

গোটা শহরে ঘোমটা কালী খুবই প্রসিদ্ধ।স্থানীয় বাসিন্দারা বিপদে-আপদে মন্দিরে ছুটে আসেন। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবীর কৃপায় যেকোনও বিপদ থেকে পরিত্রাণ মেলে।বর্তমানে এই

মন্দিরটি হেরিটেজ ঘোষিত হয়েছে।

 

ফিরে আসবো পরের অনুষ্ঠানে ।

কালী কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – দেবী চিত্তেস্বরী 

কালী কথা – দেবী চিত্তেস্বরী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের কালী কথা পর্বে চিত্তেশ্বরী কালী বা চিতু ডাকাতের কালী কালী পুজো নিয়ে লিখবো।শহর কলকাতার প্রাচীন কালী মন্দির গুলির মধ্যে একদম প্রথম সারি তে রয়েছে চিৎপুতের চিত্তেশ্বরী কালী মন্দির|

 

কেউ কেউ মনে করেন এই মন্দির নির্মান করেন ও দেবীকে এখানে প্রতিষ্ঠা করেন সেই সময়ের এই অঞ্চলের কুখ্যাত ডাকাত চিতে বা চিতু|তার নাম থেকেই নাকি এই অঞ্চলের নাম হয় চিৎপুর এবং দেবীর নাম চিত্তেশ্বরী।অনেকেই বিশ্বাস করেন ষোড়শ শতকে এই মন্দির বানিয়েছিলেন তৎকালীন ধনী জমিদার মনোহর ঘোষ যিনি একসময়ে আকবরের মনসাবদার টোডর মলের রাজ কর্মচারী ছিলেন।

 

ভক্তদের বিশ্বাস যে এই মন্দিরে দেবী সাক্ষাৎ

অবস্থান করছেন |এখানে মূল মন্দিরে দেবী সর্বমঙ্গলা ছাড়াও আছে তিনটি শিব মন্দির। লোকমুখে শোনা যায় এককালে এই এলাকা

ছিলো অত্যান্ত দুর্গম|ছিলো ভয়ঙ্কর বাঘ ও দুর্ধর্ষ ডাকাতের উৎপাত|ডাকাত দলের নেতা ছিলো চিতু ডাকাত।সত্যি মিথ্যে প্রমান করা মুশকিল তবে লোক মুখে শোনা যায় এক কালে ডাকাতরা নাকি এখানে নরবলি দিয়ে ডাকাতি করতে বেরোতো|ডাকাত দের আতঙ্কে জমিদার পরিবার এই স্থান ত্যাগ করে চলে যান এবং এলাকার অধিকার সম্পূর্ণ রূপে চলে যায় চিতু ডাকাত এবং তার দলের হাতে।

 

শোনা যায় একবার মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়ে গঙ্গার জলে ভেসে আসা নিম কাঠ সংগ্রহ করে তাই দিয়ে মা চণ্ডীর বিগ্রহ তৈরি করেন চিতু ডাকাত৷

মা চিত্তেশ্বরী দশভুজা দুর্গা রূপে পূজিতা হন এখানে আর মায়ের সামনে রয়েছে একটি বাঘ|শোনা যায় চিতে ডাকাতের মৃত্যুর পরে তৎকালীন জমিদার মনোহর ঘোষ ও নৃসিংহ ব্রহ্মচারী পুনরায় এই স্থানে নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই মন্দিরে রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্ব গ্রহন করেন এবং আজীবন তারা নিষ্ঠা সহকারে পূজার দায়িত্ব পালন করেন।

সেই প্রথা আজও চলে আসছে।

 

দূর্গাপুজোর সময়ে এবং কালী পুজোর সময় বিশেষ পুজো হয়।আজও এখানে

নিমকাঠের বিগ্রহতেই দেবীর পুজো হয়।

বর্তমানে রায় চৌধুরী পরিবারের সদস্যদের হাতেই পুজোর ভার রয়েছে।

 

আগামীকাল পর্বে কালী কথা নিয়ে আবার ফিরে আসবো। থাকবে অন্য এক প্রাচীন কালী মন্দিরের ইতিহাস। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – জোড়া কালীর পুজো 

কালী কথা – জোড়া কালীর পুজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

কালী মূর্তি সাধারণত একটি থাকে। কিছু ক্ষেত্রে পঞ্চ কালী বা নব কালীর পুজোর কথা জানা যায় তবে আজ লিখবো দুই কালী বা জোড়া কালীর পুজো নিয়ে।

 

নদিয়ার ভীমপুরের ময়দানপুরের কালীবাড়িতে একই মন্দিরে পাশাপাশি পূজিতা হন রক্ষাকালী ও দক্ষিণকালী।তাঁরা দু’জনেই আবার বসে থাকেন শিবের ওপর।

 

বহু বছর আগে এক কালীর পুজোর আগের রাতে দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন স্থানীয় এক মহিলা। দেবী তাঁকে স্বপ্নে জানিয়েছিলেন, তাঁর বাড়ির কাছেই মনসা গাছ রয়েছে। সেই গাছের মাটির তলায় তাঁরা আছেন। তাঁদের মাটি থেকে তুলে পুজো করতে হবে।

 

প্রথমে কেউ তাঁকে বিশ্বাস করেননি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তাঁর জোরাজুরিতে শুরু হয় মাটি খোঁড়া। বেশ কিছুটা মাটি খোঁড়ার পর উদ্ধার হয় জোড়া কালীমূর্তি। এরপর যেখান থেকে কালীমূর্তি দুটি উদ্ধার হয়, সেই মনসা গাছের পাশেই তৈরি করা হয় দেবীর বেদী।শুরু হয় পুজো। আজ সেই পুজোই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে গোটা নদীয়া

জেলা জুড়ে।

 

বর্তমানে সেই মহিলার পরিবারের লোকজন বংশপরম্পরায় এই পুজো করে চলেছেন।পাশাপাশি অসংখ্য ভক্ত যুক্ত হয়েছে এই পুজোর সাথে।কালীপুজোর দিনগুলোয় এই মন্দির পরিসর যেন বিরাট এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। বিপুলসংখ্যক ভক্ত এখানে ভিড় করেন।

 

তাছাড়া বিশেষ তিথি তে বিশেষ পুজোর আয়োজন হয়। এখানে দেবীকে এখানে নিত্য পুজো করা হয়। এই মন্দিরে দুই কালী প্রতিমার পাশে দেবী লক্ষ্মীর মূর্তিও রয়েছে। দেবী লক্ষ্মীকেও এখানে নিত্য পুজো করা হয়।

 

আজকের এই পর্ব এখানেই শেষ করছি।

ফিরে আসবো কালী কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে। আসন্ন মৌনী অমাবস্যা উপলক্ষে চলতে থাকবে কালী কথা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

শুভ কল্পতরু উৎসব

শুভ কল্পতরু উৎসব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের দিনে কাশীপুর উদ্যানবাটিতে কল্পতরু হয়েছিলেন শ্রী রামকৃষ্ণ। ১৮৮৬ সালের সেই দিনকে স্মরণে রেখেই মঠ মিশন সহ ঠাকুরের গৃহি ভক্তদের গৃহে পালন করা হয় কল্পতরু উৎসব।

বিশ্ববাসির কাছে পয়লা জানুয়ারি মানে ইংরেজি নব বর্ষের সূচনা হলেও বাঙালির কাছে পয়লা জানুয়ারি মানে কল্প তরু উৎসব।

 

তবে কল্পতরু উৎসব শুধু শ্রী রামকৃষ্ণের সাথে সম্পর্ক যুক্ত হলেও কল্পতরু বিষয়টির পৌরাণিক মাহাত্ম আছে। আজ এই দুটি দিকেই আলোকপাত করবো।

 

প্রথমে আসুন জেনে নিই কেনো ঠাকুর রামকৃষ্ণকে কল্পতরু বৃক্ষের সাথে তুলনা করা হয় এবং কেনই বা এই বিশেষ দিনটিকে কল্পতরু দিবস রূপে পালন করা হয়।

 

দিন টা ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি কাশীপুর উদ্যান বাড়িতে উপস্থিত রয়েছেন প্রায় ৩০ জন মতো গৃহী ভক্ত।শরীরে মারণ রোগ বাসা বাঁধলে, ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের নির্দেশে ঠাকুর এই বাড়িতে চিকিৎসাধীন আছেন।ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক দুপুর তিনটে। দোতলা ঘর থেকে তিনি নেমে এলেন বাগানে। গৃহী ভক্তরা তাঁদের হাতে রাখা ফুল ঠাকুরের চরণে অঞ্জলি দিতে থাকেন। কথিত আছে, ঠাকুর তখন নাট্যকার গিরিশ ঘোষকে বলেন, “হ্যাঁ গো,তুমি যে আমার নামে এত কিছু চারিদিকে বলো, তো আমি আসলে কী”? গিরিশ ঘোষ উত্তর দিলেন, “তুমিই নররূপ ধারী পূর্ণব্রহ্ম ভগবান, আমার মত পাপী তাপীদের মুক্তির জন্যই তোমার মর্ত্যে আগমন”। সবাই তখন ঠাকুরের চরণ স্পর্শ করল এবং ঠাকুর তাদের আশীর্বাদ করে বললেন, “তোমাদের চৈতন্য হউক”।

 

তখন উপস্থিত ভক্তরা ইচ্ছা পূরণের এক দিব্য অনুভূতি অনুভব করেন নিজেদের অন্তরে।বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো এক অলৌকিক শক্তি যেনো প্রবেশ করে তাদের শরীরে। ঠাকুর তখন ভাব লেশ হীন। তন্ময় অবস্থায় পৌঁছে গেছেন।তিনি যেনো সাক্ষাৎ কল্পতরু।

 

সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত কেই আজ স্মরণ করা হয়।

ভক্তদের বিশ্বাস রয়েছে, এই দিন ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব সকলের মনের ইচ্ছা পূরণ করেন।

 

এবার আসুন শাস্ত্রে কল্পতরু সন্পর্কে কি বলছে জেনে নিই।পুরাণ মতে দেবতা এবং অসুরদের মধ্যে সমুদ্র সমুদ্র মন্থনকালে অমৃত, লক্ষ্মীদেবী, ঐরাবত ইত্যাদির সঙ্গে উঠে আসে কল্প তরু বৃক্ষ পরবর্তীতে দেবরাজ ইন্দ্রের বিখ্যাত নন্দনকাননের স্থান পায় এই কল্প তরু বৃক্ষ এবং সেখান থেকে স্ত্রী সত্যভামার আবদারে শ্রীকৃষ্ণ পৃথিবীতে নিয়ে আসেন এই বৃক্ষ। এই বৃক্ষ সবার মনোস্কামনা পূর্ণ করতো অর্থাৎ এই বৃক্ষর কাছে যা চাওয়া হয় তাই পাওয়া যায়।আমাদের বাস্তু শাস্ত্রেও তাই হয়তো কল্পতরু বৃক্ষর প্রতিকৃতি রাখাকে শুভ বলা হয়।

 

সবাইকে সবাইকে জানাই ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা এবং কল্পতরু উৎসবের শুভেচ্ছা।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

উপপীঠ – চট্টেশ্বরী

উপপীঠ – চট্টেশ্বরী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

এপার বাংলার পাশাপাশি ওপার বাংলা অর্থাৎ অধুনা বাংলাদেশে রয়েছে একাধিক শক্তি পীঠ এবং উপপীঠ। প্রধান সতী পীঠ গুলি নিয়ে আগেই বলেছি।আজ একটি জাগ্রত উপপীঠ নিয়ে লিখবো।।

 

বাংলাদেশের চট্টেশ্বরী মন্দিরকে অনেক শাক্ত সাধক সতীর দেহাংশ পতিত অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি উপপীঠ বলে মানেন। আবার অনেকে বিরোধিতা করেন। বেশি ভাগই মনে করেন এটি একটি উপপীঠ তবে দেবীর কোন অঙ্গ বা অলংকার এখানে পড়েছিল তা স্পষ্ট নয়।

 

এখানে দেবী দুর্গা বা ভবানীর রূপে পূজিতা হন।দেবীর নাম থেকেই এলাকার নাম চট্টগ্রাম।প্রাচীন তন্ত্রসাহিত্য ও লোককথায় চট্টেশ্বরীকে বঙ্গভূমির অধিষ্ঠাত্রী দেবীর স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

 

মন্দিরটি বেশ প্রাচীন। তবে কবে কে নির্মাণ করেন তা স্পষ্ট নয়।এক কালে বহু সাধক ও ভক্ত এখানে তন্ত্রসাধনা ও বিশেষ পূজা-পাঠের জন্য আসতো।দুর্গম পরিবেশে ডাকাত এবং বন্য প্রাণীদের আনাগোনা ছিলো।প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা এই মন্দিরে একটি শান্ত ও ধ্যানমগ্ন আবহ বিরাজ করে।

 

বর্তমানে নবরাত্রি, দুর্গাপূজা এবং কালীপূজার সময় চট্টেশ্বরী মন্দিরে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়। অনেক মানুষ আসেন তাদের মনোস্কামনা নিয়ে। শোনা যায় দেবী কাউকে খালি হাতে ফেরান না।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী শক্তি পীঠ বা উপপীঠ নিয়ে আলোচনায়। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – নোয়াজনি

শক্তি পীঠ – নোয়াজনি

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

একান্নটি প্রধান শক্তি পীঠের পাশাপাশি। একাধিক শাস্ত্রে বেশ কিছু উপপীঠ এবং গুপ্ত পীঠের উল্লেখ আছে। যেসমস্ত স্থানে দেবীর বস্ত্র বা অলংকার পড়েছিলো সেগুলি উপ পীঠের মর্যাদা পায়

শিবচরিত গ্রন্থে এই ৫১টি শক্তি ক্তিপীঠ ছাড়াও রয়েছে ২৬টি উপপিঠের উল্লেখ।এমনই

একটি উপপীঠ শান্তি পুরের নোয়াজনি মন্দির।

শাস্ত্র মতে এখানে দেবী সতীর হাতের নোয়া পড়েছিলো।নোয়া থেকেই দেবীর নাম নোয়া জনি।নোয়াজনি মাতার পিঠ অত্যন্ত প্রাচীন এবং গুরুত্ব অপরিসীম।

শোনা যায় শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসের গুরু, তোতাপুরী বাবা আজ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছর আগে সাধনা করতেন এই পিঠে। সেই সময়ে এই অঞ্চলে গভীর বনের মধ্যে ছিল একটি শ্মশান।

দিনের বেলায় থাকতো অন্ধকার। ডাকাত এবং বণ্য জন্তু দাপিয়ে বেড়াতো এই স্থান।

আবার এও শোনা যায় ঘন জঙ্গলের মধ্যে সতীর উপপীঠ নোয়াজনি মাতার মন্দিরের কাছে এক আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাস ছিল এবং তাদের আরাধ্য প্রকৃতি দেবী ছিলেন ঈশ্বরী নোয়াজনি মাতা। এখানে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রস্তর খণ্ডকেই দেবী রূপে পুজো করা হয়।তাছাড়াও মন্দির চত্বরে রয়েছে একটি মনসা আর শিব মন্দির।

এককালে ধুনি জ্বালিয়ে এখানে সাধনা করতেন নাগা সন্ন্যাসীরা। কিছুদিন পুজো পাঠ করে আবার তারা চলে যেতেন নিজেদের রহস্যময় জগতে।

বহু তন্ত্র সাধকের সাধনস্থল ছিলো এই

নোয়াজনি মন্দির সংলগ্ন স্থান।

ফিরে আসবো অন্য একটি শক্তিপীঠের ইতিহাস এবং তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা এবং তাৎপর্য নিয়ে। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তিপীঠ – বিন্ধ্য বাসিনী

শক্তিপীঠ – বিন্ধ্য বাসিনী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শিব চরিত মতে ভারতের একান্ন টি শক্তিপীঠের মধ্যে একটি উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর জেলায় অবস্থিত মা বিন্ধ্যবাসিনী দেবী মন্দির।

 

দেবী বিন্ধ্যবাসিনী দুর্গার একটি রূপ। তিনি বিন্ধ্য পর্বত মালার অধীস্টাত্রী দেবী। পুরান মতে শুম্ভ নিশুম্ভ বধের পর দেবী এই স্থানে এসে বিরাজমান হন। তার নামেই স্থানের নাম করণ হয়।

 

ঠিক কোন অঙ্গ এই স্থানে পড়েছিল তা নিয়ে মত পার্থক্য আছে তবে শিব চরিত অনুসারে এই স্থানে দেবীর বাম পদের আঙ্গুল পড়েছিল।

 

দেবী মহা শক্তির প্রতীক। প্রাচীন মন্দিরে দেবীর তৃণয়না মূর্তি রয়েছে। সাথে মহা কালী এবং মহা লক্ষীর মন্দির ও রয়েছে। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে। গঙ্গার ধারে দেবীর মন্দির অপূর্ব আধ্যাত্মিক শান্তি দেয়। দেবীর ভৈরব পুন্যভাজন।

 

চৈত্র এবং আশ্বিন মাসে নবরাত্রির সময় এখানে ভক্তদের বিশাল ভিড় জমে। সেই সময়ে বিশেষ আরতি, চন্ডীপাঠ এবং হোম যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী শক্তি পীঠের ইতিহাস এবং পৌরাণিক ব্যাখ্যা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – করবীর

শক্তি পীঠ – করবীর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে সিন্ধু প্রদেশের শর্করা জেলার করবীরে দেবীর তৃতীয় নয়ন পড়েছিল। দেবীর এখানে মহিষ মর্দিনী রূপে পূজিতা হন। দেবীর ভৈরব ক্রোধীশ।

 

বর্তমানে করবীর ঠিক কোথায় তা স্পষ্ট নয় তাই এই শক্তি পীঠের সঠিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক আছে। কালীকা পুরান মতে এই করবীর ব্রহ্মবর্ত অর্থাৎ বর্তমান পাঞ্জাব অঞ্চল। আবার অন্য একটি মত অনুসারে এই শক্তি পীঠ মহারাষ্ট্রের কোলা পুরে অবস্থিত।

 

পাঞ্জাবে দেবী রম ভুজার মূর্তি আছে। প্রাচীন মূর্তি আছে। এবং তিনটি নয়ন রূপে দেবীর অস্থিত উপস্থিত। দেবীর এই ত্রি নয়ন দিব্য জ্ঞানের প্রতীক এবং দেবী দিব্য দৃষ্টিতে সকল মনোস্কামনা দেখতে পান এবং তাদের মনোস্কামনা পূর্ন করেন।

 

অন্যদিকে মহারাষ্ট্রে কোলাপুরে রয়েছে প্রাচীন পাথরের মূর্তি। রয়েছে চারটি প্রবেশ দ্বার। পাঁচটি দীপ মালা এবং কোষ্টি পাথরের ত্রি নয়নী মহিষ মর্দিনীর মূর্তি।রুপোর সিংহাসনে স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিতা দেবী বিরাজ করছেন।

 

শোনা যায় আদি শঙ্করাচার্য্য স্বয়ং এই মন্দিরে এসে দেবীর পূজা করেছেন।অত্যন্ত মনোরম পরিবেশে এই মন্দির এবং চারপাশে আরো অনেক দেব দেবীর মূর্তি রয়েছে।

 

আশ্বিন মাসে খুব জাঁকজমক সহকারে পুজো হয় এবং ন দিনের উৎসবে বহু ভক্ত অংশ নেন।

 

শক্তি পীঠের ইতিহাসে এমন উদাহরণ কমই আছে

যেখানে দুটি স্থানকে শক্তি পীঠের মর্যাদা দেয়া হয়। তবে আসল শ্রদ্ধা এবং ভক্তি মানুষের মনে।

দুটি স্থানই স্থান মাহাত্মর জেরে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

ফিরে আসবো অন্য একটি শক্তি পীঠের ইতিহাস এবং আধ্যাত্মিক আলোচনা নিয়ে পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – অপর্ণা

শক্তি পীঠ – অপর্ণা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পীঠ নির্ণয় তন্ত্রের উল্লেখ আছে –

 

করতোয়া তটে কর্ণ বামে বামন ভৈরব :

অপর্ণা দেবতা তত্র ব্রহ্মরুপা করোদ্ভবা

 

এখানে বাংলাদেশের ভবানীপুরে অবস্থিত।এই শক্তি পীঠ অপর্ণার কথা বলা হচ্ছে।

শক্তি পীঠ সংক্রান্ত প্রায় সব গুলি প্রামান্য গ্রন্থেই এই শক্তি পীঠের উল্লেখ আছে।দেবীর শ্রী অঙ্গের কোন অংশ এখানে পতিত হয়ে ছিলো তা নিয়ে সামান্য বিতর্ক আছে কিছু শাস্ত্রে আছে দেবী সতীর ডান চোখ পড়েছিল এই স্থানে।তবে পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে এখানে দেবীর কর্ণ পড়েছিল। ভরত চন্দ্রের মতে এই স্থানে পড়েছিল দেবীর গোড়ালি।দেবীর ভৈরবের নাম বামন।

 

সুলতানি আমলে এই অঞ্চল শাসন করতেন সেনাপতি রহমত খাঁ।গৌরের শাসক যখন এই স্থান নিজের দখলে নিতে আক্রমণ করেন তখন পালতে গিয়ে রহমত খাঁর নৌকো আটকে যায় নদীর চড়ায়।তারপর দেবী অপর্ণার মন্দিরের পুরোহিতের নির্দেশে বিশেষ পুজো পাঠ হলে হটাৎ নেমে আসে ঝড় বৃষ্টি। নদীতে গিয়ে পড়ে নৌকা। রেহাই পেয়ে পরবর্তীতে সেনাপতি রহমত খাঁ দেবীর মন্দির নতুন করে সংস্কার করান।

 

পরবর্তীতে এই স্থান নাটোরের রানী এই অঞ্চলের শাসক হন এবং রানী ভবানী এই মন্দিরের জন্য অনেক ভূ-সম্পত্তি দান করে গিয়েছিলেন।

 

এই শক্তি পীঠকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় যার মধ্যে একটিতে বলা হয় একবার এই পথ দিয়ে এক শাঁখারি শাঁখা বিক্রি করতে যাচ্ছিলেন। দেবী ছল করে বালিকা বেশে সেই শাঁখারির থেকে শাঁখা পড়েছিলেন। সব শুনে মহারানী লোকজন নিয়ে সেই জায়গায় গিয়েছিলেন। মা ভবানী তখন পার্শবর্তী একটি পুকুর থেকে তার দুই হাতের শাঁখা উপরে তুলে দেখিয়ে ছিলেন।বহুকাল অবধি সেই

শাঁখারির পরিবার দেবীর উদ্দেশ্যে শাঁখা

অর্পণ করতো।

 

সব মিলিয়ে এই শক্তিপীঠের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব এবং দেবীর মহাত্ম অবর্ণনীয়। আজও এখানে

বহু ভক্ত আসেন নিজের মনোস্কামনা নিয়ে। শোনা যায় দেবী কাউকে খালি হাতে ফেরান না। প্রায় প্রতিটি বিশেষ তিথিতেই দেবীর বিশেষ পুজো অনুষ্ঠিত হয়।

 

ফিরে আসবো অন্য একটি শক্তি পীঠের কথা নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – বুড়ামা কালী

শক্তি পীঠ – বুড়ামা কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলায় বহু শক্তি পীঠ আছে যেগুলির সঠিক অস্তিত্বর খোঁজ পাওয়া যায়না। সেগুলিকে বলা হয়

গুপ্ত শক্তি পীঠ। শাস্ত্রে সেই ভাবে উল্লেখ না থাকলেও বা স্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এই গুপ্ত শক্তি পীঠ গুলি sসকল শাক্তদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এমনই এক গুপ্ত শক্তিপীঠ আছে

দক্ষিণ দিনাজপুরে।বুড়ামা কালী নামেই বেশি জনপ্রিয় এই শক্তিপীঠ।

 

শোনাযায় কোনো এক তন্ত্র সাধক আত্রেয়ী নদীর জলে প্রথম দেখা পান এক বিগ্রহের। তিনি সেটিকে স্থাপন করেন আত্রেয়ী নদীর ধারেই। তবে সেই ইতিহাস কবেকার তা কেউ ঠিক মনে করতে পারেন না।তবে আনুমানিক কয়েকশো বছর ধরে এখানে বুড়ি মা পূজিতা হয়ে আসছেন।

 

ভক্তদের বিশ্বাস এই কালী মন্দির আসলে সতীর একান্ন পীঠের কোনও গুপ্তপীঠ। দেবী এখানে স্বয়ম্ভূ। কালো পাথরের খণ্ডকেই এখানে দেবী রূপে পুজো করা হয়।তবে পুজোর দিন সেই শিলা খন্ডকে পড়ানো হয় সোনার মুখাবয়ব। সঙ্গে বিগ্রহ সাজানো হয় সোনা-রূপোর বিভিন্ন অলঙ্কারে। মনে করা হয়, দেবী ডাকড়া চন্ডী,বয়রা কালী এবং বুড়িমা তিন বোন এবং প্রতি বছর ডাকড়া চন্ডী আত্রেয়ীতে বিসর্জন পূর্বে দেখা করে যান তাঁর দুই বোনের সঙ্গে। এই রীতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।

 

আবার মন্দির সৃষ্টির সাথে জড়িয়ে আছে এক অলৌকিক ঘটনা। কথিত আছে, বহু বছর আগে এলাকার এক বাসিন্দার গাভী হারিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুজির পরেও সেটিকে পাওয়া যায় না। পরে বৃদ্ধারূপী মা কালী তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে নির্দেশ দেন আত্রেয়ী নদী পাড়ের জঙ্গলে গিয়ে খুঁজতে। তাঁর দেখানো দিক-নির্দেশ অনুযায়ী সেই ব্য়ক্তি যান। গিয়ে দেখেন, জঙ্গলের ভিতর বালির মধ্যে পড়ে থাকা একটি পাথরের খণ্ডকে গরুটি নিজে থেকে দুধ ঝরিয়ে স্নান করিয়ে দিচ্ছে। এর পরেই তিনি পাথরটি স্বযত্নে এনে আত্রেয়ীর পাড়েই সেটিকে প্রতিষ্ঠা করে মা বুড়িমা কালীর পুজো শুরু করেন।যা দিনে দিনে জনপ্রিতা লাভ করে এবং আজও সেই পরম্পরা চলছে।

 

গোটা উত্তর বঙ্গের মানুষের কাছে

তাদের বুড়িমা কালী পরম আস্থার স্থান।

দেবী কালিকার ভয়াল রূপের অন্তরালে যে ব্রহ্মময়ী মাতৃরূপ তাতেই আস্থা রেখে বুড়িমা ঈশ্বর এবং ভেদাভেদ কাটিয়ে যেন হয়ে উঠেছে এলাকাবাসীর আপন মা।

 

এই গুপ্ত পীঠে সারা বছর সকাল-সন্ধ্যে পুজো হয়। আর শ্যামাপূজার দিন বিশেষ পুজো হয়। লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম হয় ওই দিন। কৌশিকী অমাবস্যা তিথিতেও দেবীর বিশেষ পূজোর আয়োজন হয়।

 

চলতে থাকবে ধারাবাহিক শক্তি পীঠ নিয়ে লেখা।

ফিরে আসবো আগামী দিনে।

নতুন পর্ব নিয়ে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।