Home Blog Page 113

দোলপূর্ণিমার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন

আজ শুরুতেই সবাইকে দোল পূর্ণিমার শুভেচ্ছা জানাই। দোল পূর্ণিমার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য নিয়ে আজ আলোচনা করবো।ব্যবহারিক প্রয়োগ এক হলেও হোলি এবং দোল আদতে আলাদা আলাদা দুটি উৎসব।দোল পূর্ণিমায় ‘দোলযাত্রা’ আয়োজিত হয়। আর ‘হোলি’ পালিত হয় তারপরের দিন।শ্রীকৃষ্ণের জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত মথুরা ও রাধার জন্মস্থান হিসেবে জগদ্বিখ্যাত বৃন্দাবনে ১৬ দিন ধরে এই দোল উৎসব পালিত হয়। কথিত রয়েছে এই দিনেই রাধিকাকে ‘ফাগে’ মানে গুড়ো রঙ দিয়ে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ এবং এই তিথিতেই শ্রীকৃষ্ণ রাধিকাকে প্রেম নিবেদন করেছিলেন।তাই দোল পূর্ণিমা মূলত রাধা কৃষ্ণের প্রেম উদযাপনের উৎসব।আবার হোলির উৎপত্তি এক পৌরাণিক ঘটনা থেকে।রাজা হিরণ্যকশিপুর পুত্র ছিল প্রহল্লাদ। সে ছিল একজন ধর্মপ্রাণ বালক। বিষ্ণুর শত্রু হিরণ্য কশিপু এই প্রহল্লাদকে আগুনে পুড়িয়ে মারার প্রচেষ্টা করেন। হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকা সেই উদ্দেশে প্রহল্লাদকে নিয়ে আগুনে ঝাঁপ দেন । হোলিকা ভেবেছিলেন, তিনি তাঁর মায়াবী ক্ষমতাবলে বেঁচে যাবেন এবং পুড়ে ছাই হয়ে যাবে প্রহল্লাদ। কিন্তু আদতে দেখা যায় তার উল্টোটাই হয়। বিষ্ণুভক্ত বালকের গায়ে আগুনের এতটুকু আঁচও লাগেনি। অন্যদিকে আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয় হোলিকার কন্যার। তারপর থেকেই এই অশুভ শক্তির পরাজয় ও শুভ শক্তির জয়কে উদযাপন করতে পালিত হয় হোলি উৎসব।চৈতন্যদেবের সাথেও ও দোল পূর্ণিমার সম্পর্ক আছে কারন এই দোল পূর্ণিমা তিথি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মতিথি।পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার নবদ্বীপ, মায়াপুর, কৃষ্ণনগরে এই তিথি উপলক্ষে বিশেষ পুজো ও উৎসবের আয়োজন করা হয়। বাংলার বাইরে ওড়িশাতেও ধুমধাম করে পালিত হয় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মতিথি।দোল বলুন আর হোলি বলুন দুটোই নিজেকে রাঙিয়ে নেয়ার উৎসব।তারুণ্যর উৎসব|অশুভ শক্তিকে বিদায় জানিয়ে শুভ শক্তিকে স্বাগত জানানোর উৎসব।সবাইকে আরো একবার জানাই দোল পূর্ণিমার শুভেচ্ছ ও অভিনন্দন। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবীমাহাত্ম – প্রসন্নময়ী কালীর ইতিহাস

বাংলার বিখ্যাত কালী মন্দির গুলির মধ্যে অনেকগুলি ব্রিটিশ আমলের জমিদারদের পৃষ্ঠেপোষকতায় গড়ে উঠেছিল যাদের ঘিরে আছে নানা রকম অলৌকিক ঘটনা। এমনই এক কালী মন্দির আছে উত্তর চব্বিশ পরগনার গোবর ডাঙায়
যা প্রসন্ন ময়ী কালী নামে খ্যাত।

শোনা যায় স্থানীয় জমিদারবাবুর স্ত্রীর গর্ভে কোন পুত্রসন্তান না হওয়ায় তিনি খুবই মনঃকষ্টে ছিলেন। সেই সময় এক সন্ন্যাসী এসে তাঁকে কালীমাতার প্রসাদী ফুল দৈব,ওষুধ হিসাবে ধারণ করতে বলেন। ওই ওষুধ ধারণের ফলে তার স্ত্রী একটি পুত্রসন্তান লাভ করেন। কালী মাতা প্রসন্ন হয়ে এই পুত্রসন্তান দেওয়ায় সেই পুত্রের নাম রাখা হয় কালীপ্রসন্ন এবং কালীমাতার প্রসাদে পুত্রসন্তান লাভ করায় জমিদার বাবু কালীমূর্তি ও কালীমন্দির স্থাপনে উদ্যোগী হন। কিন্তু মন্দির নির্মাণ কার্য শেষ হওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয় এবং পরবর্তীতে পুত্র কালীপ্রসন্ন জমিদার হন এবং মন্দির নির্মাণ কার্য শেষ করেন। এই কালী মন্দির প্রসন্ন ময়ী কালী মন্দির নাম প্রসিদ্ধ হয়।রীতি মেনে আজও ওই বংশের প্রতিটি পুরুষের নামের সঙ্গে ‘প্রসন্ন’ শব্দ যুক্ত করা হয়।

প্রসন্ন ময়ী কালী মন্দির উঁচু ভিত্তিবেদির উপর প্রতিষ্ঠিত। দক্ষিণমুখী মন্দিরটি একটি দালান বিশিষ্ট।গর্ভগৃহে শ্বেত পাথরের বেদির উপর শায়িত স্বেত পাথরের শিবের উপর দণ্ডায়মানা প্রায় ২.৫ ফুট উঁচু কষ্টি পাথরের সুন্দর কালিকা মূর্তি প্রতিষ্ঠিত।

প্রায় চারশো বছরের পুরোনো এই মন্দিরে প্রতিটি বিশেষ তিথি যেমন কৌশিকী বা দীপান্বিতা অমাবস্যায় উৎসব উপলক্ষ্যে আশেপাশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক লোকের সমাগম হয়। শনি-মঙ্গলবারে অনেকে মনোস্কামনা পূরণের জন্য পূজাও দিয়ে থাকেন।

ফিরে আসবো পরের পর্বে। অন্য কোনো মন্দিরের রহস্য বা দেবী মাহাত্ম নিয়ে।ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকবে এই বিশেষ পর্ব গুলি। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম- ঢাকার রক্ষা কালী

দুই বাংলা জুড়েই আছে অসংখ্য জাগ্রত কালী মন্দির যাদের ঘিরে বহু অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। আজ আপনাদের ওপার বাংলার এক প্রসিদ্ধ রক্ষা কালী মায়ের মন্দিরের কথা জানাবো।মন্দিরটি পুরনো ঢাকার শাঁখারী বাজারে আছে এক প্রাচীন রক্ষা কালী মন্দির । চার কাঠা জমির উপর চূড়া আকৃতির এই মন্দিরটি নির্মিত। শোনা যায় এই মন্দিরের মা ভক্তের সকল মনোবাসনা পূর্ণ করেন।তাই ভক্তদের ভিড় সারা বছর লেগেই থাকে।মন্দিরটি কবে এবং কে প্রতিষ্টা করেছিলেন তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়না। তবে কয়েকশো বছর ধরে এই মন্দির এখানে আছে।লোকমুখে শোনা যায়, একটি অলৌকিক ঘটনা।তখন চলছে বাংলাদেশ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ। সেই মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনীর কাছে কোন ঠাসা হয়ে একদল বাঙালি বিপ্লবী আশ্রয় নেয় এই মন্দিরে।তাদের পিছু নিয়ে পাক হানাদার বাহিনী মন্দিরে আসে। বিপ্লবিরা বাইরে আত্মসমর্পন করতে অস্বীকার করলে পাক বাহিনী মন্দির ভাঙতে উদ্যত হয়।সেই সময় আবির্ভাব হয় ছায়া মূর্তির।খর্গ হাতে দাঁড়িয়ে সেই মায়াবী নারী মূর্তি এই মন্দিরকে রক্ষা করেন। অনেকেই মনে করেন আজও কোনো এক অদৃশ্য শক্তি সর্বদা উপস্থিত থাকে মন্দিরে।মানুষের বিশ্বাস স্বয়ং মাকালী এই মন্দিরে সদা বিরাজ করছেন।প্রতি শনিবারে মায়ের বিশেষ পূজা হয় এবং শনিবারে ভক্তদের সমাগম থাকে অনেক বেশি। এছাড়াও প্রতি আমাবস্যার পূজাও হয় এই মন্দিরে। মায়ের পাশাপাশি শিবেরও পূজা করা হয় এই মন্দিরে।শিব রাত্রিতে বহু মানুষের আগমন ঘটে ঢাকার এই মন্দিরে।ফিরে আসবো পরের পর্বে। চলবে দেবী মাহাত্ম নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম – লুঠ কালীপুজো

বাংলায় মা কালীর সঙ্গে ডাকাতদের যোগ বেশ আত্মিক এবং প্রাচীন।এক সময়ে রাতের অন্ধকারে ডাকাতদের গোপন আস্তানায় চলত মা কালীর আরাধনা। পুজো শেষে মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে রওনা দিত ডাকাতেরা। পুজোয় বলি দেওয়া হত পাঁঠা থেকে মানুষ সবই।আজ সেইসব ইতিহাস তবে রীতি নীতি বজায় রেখে পুজো চলে আসছে। আজকের পর্বে এমনই এক পুজোর কথা লিখবো।আজ থেকে প্রায় তিন-চার শতাব্দী আগের কথা। তখন গ্রামজুড়ে ঘন জঙ্গল, চারিদিকে ডাকাতদের আধিপত্য। দুর্ধর্ষ এক ডাকাত দলের হাত ধরেই হাওড়ার পাঁচলার সাহাপুর গ্রামে শুরু হয়েছিল কালীপুজো।লুঠ করে হতো পুজো। পুজোর পর প্রসাদ ও ডাকাতরা নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি করে বা লুঠ করে খেতো।মাঝে কেটে গিয়েছে কয়েকশো বছর। গ্রামজুড়ে আজ উধাও জঙ্গল, গ্রামে ডাকাতির ঘটনাও আজ প্রায় অতীত। কিন্তু আজও ঐতিহ্য ও নিয়মে অটুট ডাকাতদের হাতে শুরু হওয়া সাহাপুরের ‘লুট কালী’ পুজো।আজও রীতি মেনে পুজোর বেশ কিছুদিন আগে থেকে প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হলেও পুজোর দিন প্রতিমায় রঙ করে তা পুজো করা হয়।প্রথা মেনে আজও ডাকাত কালীপুজোয় হয় লুঠ। সাহাপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, গ্রামের বহু মানুষ মা’য়ের কাছে পুজো হিসাবে বিভিন্ন ফল নিবেদন করেন। সেই ফল বাঁশ দিয়ে ঘেরা থাকে।বহু প্রাচীন রীতি মেনে আজও পুজো চলাকালীন একাধিক বার সেই ফল বা প্রসাদ লুঠ করেন ভক্তরা।গোটা জেলা থেকে মানুষ এখানে আসেন অদ্ভুত এই লুঠ কালী পুজো দেখতে। এখানে আজও তন্ত্র মতে পুজো হয়। ফিরে আসবো পরের পর্বে।অন্য কোনো দেবী মাহাত্ম নিয়ে আলোচনা করতে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

মন্দির রহস্য – পঞ্চানন্দ ঠাকুরের মন্দির রহস্য

দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জ এ প্রাচীন এক মন্দিরে পঞ্চানন ঠাকুরের মূর্তি সাড়ে তিনশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পূজিত হয়ে আসছে।আজকের পর্বে জানাবো এই মন্দিরের রহস্যময় ইতিহাস।পঞ্চানন বা পাঁচু ঠাকুর বাংলার এক বিখ্যাত লৌকিক দেবতা। লোকবিশ্বাসে ইনি মহাদেব শিবের এক লৌকিক রূপ আবার অন্যমতে,ইনি শিবের মানস পুত্র। মূলত গ্রামরক্ষক রূপে পঞ্চানন পূজিত শস্যদেবতা হিসাবেও তার পূজার প্রচলন আছে। মহাদেব শিবের সঙ্গে পঞ্চানন ঠাকুরের দেহাকৃতি ও বেশভূষার সাদৃশ্য আছে।পঞ্চাননের গাত্রবর্ণ লাল এবং চোখমুখের ভঙ্গি রুদ্ররূপী; বেশ বড় গোলাকার ও রক্তাভ তিনটি চোখ ক্রোধোদ্দীপ্ত। প্রশস্ত ও কালো টিকালো নাক, দাড়ি নেই, গোঁফ কান অবধি বিস্তৃত। মাথায় পিঙ্গলবর্ণের জটা চূড়া করে বাঁধা এবং তার মধ্যে জটা কিছু বুকে পিঠে ছড়ানো। কানে ধুতুরা ফুল বিরাজমান।গলায় ও হাতে বেশ বড় পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষমালা থাকে। হাতে ত্রিশূল ও ডমরু; পায়ে খড়ম এবং মাথায় বা দেহের উপর সাপ বিদ্যমান। পাশে থাকে পঞ্চরংয়ের বা পাঁচমুখো গাঁজার কলকে।উর্ধাঙ্গ অনাবৃত নিম্নাঙ্গ বাঘছাল পরিহিত।বহুকাল আগে যখন টালিগঞ্জের আদিগঙ্গার পাড়ে জন বসতি সেই ভাবে গড়ে ওঠেনি সেখানে বাস করতে বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য্য নামে এক পূজারী ব্রাহ্মণ। এক রাতে বৈদ্যনাথ স্বপ্ন দেখলেন, পঞ্চানন ঠাকুর এসেছেন। বর্তমানে যে মূর্তি আমরা দেখি, সেই রূপে। ঠাকুর বলছেন, এই গঙ্গার ঘাটে আমি তোর অপেক্ষায় আছি। জলের মধ্য থেকে উদ্ধার করে আমাকে নিয়ে চল দ্রুত।পুজো করার আদেশ ও পেলেন।পরের রাতে আবার একই স্বপ্ন ভোর হতে তখনো খানিকটা সময় বাকি, কিন্তু অপেক্ষা করলেন না তিনি। সেই রাতেই গ্রামের কয়েকজন ভক্তকে ডেকে নিয়ে, সস্ত্রীক চললেন গঙ্গার ঘাটে।ঘাটে এসে তিনি দেখলেন, তিনটে প্রায় চারকোণা আকৃতির পাথর রাখা আছে জলের ধারে, আর তিনটিই রক্তাভ। তিনটে পাথরকে এক বিরাট সাপ জড়িয়ে আছে। সেই পাথর তুলে এনে তিনি স্থাপন করলেন নিজের মন্দিরে। পরবর্তীতে স্বপ্নে দেখা রুপ মিলিয়ে তৈরি হলো মূর্তি শুরু হলো পুজো।এই রকম জনশ্রুতি আর ভক্তির সাথে মিলেমিশে রয়েছে এই পঞ্চানন ঠাকুরের মন্দির ও তার অস্তিত্ব।চলতে থাকবে দেবী মাহাত্ম ও মন্দির রহস্যনিয়ে আলোচনা। ফিরে আসবো পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম: বজ্রবরাহী দেবী

দেবী মাহাত্ম নিয়ে এই ধারাবাহিক আলোচনায় আজ পর্যন্ত আপনাদের দেবী দূর্গা দেবী কালী সহ তাদের বিভিন্ন রূপ গুলি নিয়ে আলোচনা করেছি আজ এই পর্বে বৌদ্ধ দেবী বজ্র বরাহীর কথা হবে।উত্তর সিকিমের এক দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে এই বজ্রবরাহীর মন্দির আছে। প্রতি শনিবার রাতে সেখানে পূজা হয়।বলেও শোনা যায় তবে ব্লু পাইন,ফার আর বার্চের গভীর অরণ্যের মধ্যে অবস্থিত সেই মন্দিরে একমাত্র যারা বৌদ্ধ বজ্রযানীতন্ত্রে সিদ্ধ তারাই পূজা দিতে আসে।বহু মানুষ বিশ্বাস করেন তন্ত্রের এই দেবীর পূজা দিলে অনন্ত শক্তির মালিক হওয়া যায়। জগতের সমস্ত সাফল্য অর্জন করা যায়।বৌদ্ধ ধর্মের বজ্রযানি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে এই এই দেবীর মাহাত্ম উল্লেখ করা আছে।আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপালেও বহু প্রাচীন বজ্রবরাহী দেবীর মন্দির আছে।যারা এই দেবীর পুজো করেন তারা বিশ্বাস করেন বজ্রবরাহী দেবী তুষ্ট হলে ভক্তকে অভীষ্ট ঋদ্ধি আর সিদ্ধি প্রদান করেন। আবার,দেবীকে তুষ্ট করতে না পারলে বা সাধনায় কোনো ভণ্ডামি থাকলে দেবী সাধককে কঠোর শাস্তি দেন।দেবীর সঙ্গিনী মেখলা এবং কনখাল নামে দুই মায়াবী নারী অনেকটা সনাতন ধর্মের ডাকিনী যোগিনীর ন্যায়।দেবী বজ্রর ন্যায় কঠিন ও তার মাথা বরাহর। তিনি দুষ্টের দমন ও সিষ্টের পালন করেন।বজ্র বরাহী দেবী আগাগোড়া রহস্যআবৃত। তার মাহাত্ম বৌদ্ধ তন্ত্রে অপরিসীম।তার রূপ থেকে তার পুজো পক্রিয়া সবই রহস্যময় এবং সাধারণ ভাবেই বেশ কৌতূহলের বিষয়।ফিরে আসবো পরের পর্বে। অন্য কোনো দেবী মাহাত্ম নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্মা- সেবকেস্বরী

দার্জিলিং বেড়াতে গেলে অনেকেই একবার সেবক কালীবাড়ি ঘুরে আসেন। শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক যাওয়ার পথে ৩১ নম্বর জাতীস সড়কের ধারে কালী মন্দির।সেবকেশ্বরী নামে খ্যাত এই কালী মন্দির নিয়ে আজকের পর্ব।সেবকেশ্বরী মন্দিরে দেবী দর্শনের জন্য অন্তত ১০৭টি সিঁড়ি পেরতে হয়। খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে তৈরি হয়েছে এই সিঁড়ি। অদ্ভূত নির্জন পরিবেশ।দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে এই মন্দির এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করে।বিশেষ অমাবস্যা তিথি গুলিতে শিলিগুড়ি ও সংলগ্ন এলাকা থেকেই নয়, বহু দূর দূরান্ত থেকে ভক্তরা দেবী দর্শনের জন্য আসেন। রাতভর চলে দেবীর আরাধনা। এরপর সকাল থেকে শুরু হয় খিচুড়ি ভোগ নিবেদন। অন্তত দেড়শো কড়াই খিচুড়ি হয় কালীপুজোর রাতে।কালীপুজোর দিনগুলোতে এই সেবকেশ্বরী কালীমন্দিরে ভক্তদের ঢল নামে। পাহাড়ের নির্জনতায় কালী মায়ের আরাধনা। অনেকেরই বিশ্বাস, দেবী অত্যন্ত জাগ্রতা। দেবীর কাছে অন্তর থেকে প্রার্থনা করলে ভক্তের মনস্কামনা পূরণ করেন তিনি।সেবক পাহাড়ের উপর হয় দেবীর আরাধনা তাই দেবীর নাম সেবকেশ্বরী।মন্দিরের সামনে পঞ্চমুন্ডির আসন রয়েছে। সেটা স্বপ্নাদেশে পাওয়া। পুজোয় সাদা ভাত, পাঁচরকম ভাজা, তরকারি, পায়েস, লুচি, দই, মিষ্টি মাকে নিবেদন করা হয়। তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে বোয়াল মাছ দেবীর ভোগ হিসাবে নিবেদন করা হয়।। রাতভর চলে দেবীর আরাধনা। এরপর সকাল থেকে শুরু হয় খিচুড়ি ভোগ নিবেদন। অন্তত দেড়শো কড়াই খিচুড়ি হয় কালীপুজোর রাতে।শুধু শিলিগুড়ি ও সংলগ্ন এলাকা থেকেই নয়, বহু দূর দূরান্ত থেকে ভক্তরা দেবী দর্শনে। আগামী পর্বে আবার ফিরে আসবো দেবি মাহাত্ম নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম – দশ ভূজা কালী মূর্তি

বাংলায় দশ ভূজা মানে সাধারণ দেবী দুর্গাকেই বোঝায় আর দেবী কালী মানে চতুর্ভুজা।কিন্তু মায়ের এই দুই রূপই বহু বছর ধরে একত্রে পুজিতা হয়ে আসছে দক্ষিণ বঙ্গের প্রত্যন্ত এক অঞ্চলে।দেবী আদ্যাশক্তি এখানে অর্ধ কালী ও অর্ধ দুর্গারূপে বিরাজ করছেন। আজকের পর্বে এই অদ্ভুত কালী মূর্তিনিয়ে আলোচনা করবো।প্রায় দুই শতাব্দী প্রাচীন পুজোটির পিছনে রয়েছে এক অলৌকিক ঘটনা। শোনাযায় ১৮৬৪ সালে পূর্ববঙ্গের ঢাকার জেলায় দারোগা ছিলেন হরিকিশোর ঘোষ একরাত্রে স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন জগজ্জননী মায়ের।মূর্তি গড়ে পুজো করতে হবে।সঙ্গে সঙ্ঙ্গে শুরু হল পুজোর তোড়জোড়। এক শুভতিথিতে সূচনা করলেন মূর্তি তৈরির কাজ। ধীরে ধীরে চিন্ময়ী দেবী রূপ পেতে লাগলেন মৃন্ময়ী প্রতিমায়। কিন্তু মূর্তি তৈরির একেবারে শেষ পর্যায় পটুয়ারা হলুদ রঙ করা মাত্রই মূর্তির ডানদিকের অংশের রঙ বদলে যায় কালো রঙে।সবাই অবাক হলো। কিন্তু তখন হরিকিশোরের মনে পড়ল তার স্বপ্নের দেবীমূর্তিও যেন ঠিক সাধারণ ছিল না বিচিত্র ছিলো তাঁর রূপ। এই সঙ্কটের মুহূর্তে কুলপুরোহিত তাকে উপদেশ দিলেন দেবীকে অর্ধকালী অর্ধদুর্গা রূপ দিতে। কারন দেবীর হয়তো তাই ইচ্ছে। দেশভাগের পর ঘোষ বংশের উত্তরপুরুষরা চলে আসেন এপার বাংলায়।শুরু হয় দশ ভূজা দুর্গা ও ঘোর কৃষ্ণ বর্ণের পুজো একই কাঠামোতে। একই মূর্তিতে।নির্দিষ্ট মাপের পাটাতনের ওপর একচালার প্রতিমা। দেবীর শরীরের ঠিক মাঝ বরাবর চুলচেরা ভাগ- ডানদিকে অমানিশারূপী দেবী কালিকা এবং বামদিকে তপ্তকাঞ্চনবর্ণা দেবী দুর্গা।দূর্গা পুজোর সময় নতুন করে সাজানো হয় পূজা মণ্ডপ এবং দেবী মূর্তিও তৈরী হয় ঠাকুর দালানে।পুজোর আচার-বিধিও কিছু ভিন্ন।মায়ের প্রতীকরূপে দর্পনকে স্নান করানোর রীতি এখানে। স্নানে লাগে ১০৮রকমের জল।নিষ্ঠা সহকারে পুজো পরিচালিত হয় তিথি মেনে তারপর দশমীর সকালে দর্পন বিসর্জন হয়। সন্ধ্যাবেলা বাড়ির সধবা মহিলারা দেবীকে বরণ করেন। এরপর বাড়ির পুরুষেরা মহা সমারহে দেবীকে বিসর্জন দেন বাড়ির পুকুরে। দেবীর এই অদ্ভুত রুপ দেখতে আসেন বহু দর্শণার্থী।দেবী মাহাত্ম নিয়ে চলতে থাকবে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা।ফিরে আসবো পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম – চিনিশ পুর কালী বাড়ি

বাংলার কালী মন্দির নিয়ে বলতে গেলে এমন কিছু কালী মন্দিরের কোথাও বলতে হবে যা দেশ ভাগের পর ওপার বাংলা অর্থাৎ বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এমনই এক কালী মন্দির ওপার বাংলার চিনিশ পুর কালী মন্দির।যতীন্দ্র মোহন রায়ের ‘ঢাকার ইতিহাস’ গ্রন্থে শ্রী শ্রী চিনিশপুর কালিবাড়ীটির ইতিহাস জানা যায়।আজ এই মন্দির নিয়ে লিখবো।নরসিংদী চিনিশপুর গ্রামে অবস্থিত এই প্রাচীন মন্দির।এই স্থানের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে প্রায় এক একর জমির উপর বেড়ে উঠা বিশালাকার বট বৃক্ষ যা আমাদের হাওড়ার বোটানিক্যাল গার্ডেনের বট গাছের কথা মনে করিয়ে দেয়।ব্রিটিশ আমলে নীলকর জেমস ওয়াইজের দেওয়ান রামকৃষ্ণ রায় বর্তমান মন্দিরটি নির্মাণ করেন।কালীবাড়ীর অদূরেই একসময়ে নীল কুঠি ছিল। বর্তমানে নীল কুঠির ভাঙ্গা ভিটা ও পরিত্যক্ত ইঁদারা কোনো রকমে টিকে আছে।চিনিশ পুর কালীবাড়ীর প্রতিষ্ঠাতা সাধক দ্বীজরাম প্রসাদ ‘চীন ক্রম’ নামের সাধন প্রণালীতে অভ্যস্ত ছিলেন। চীন ক্রম থেকেই চিনিশপুর গ্রামের নামকরণ হয় বলে ধারণা করা হয়।চিনিশ পুর কালী বাড়িতে কোন প্রতিমা নেই।দেবালয়ের মধ্যভাগে একটি চতুস্কোন বেদী এবং বেদীর উপর কালিকা যন্ত্র আঁকা আর এই যন্ত্রেই দেবী মায়ের অধিষ্ঠান।জাগ্রত এই মন্দির নিয়ে একটি অদ্ভুত কিংবদন্তী প্রচলিত আছে শুরুর দিন থেকেই।কথিত আছে এই মন্দিরে কেউ রাতে থাকতে পারে না আজ অবধি রাতে জপধ্যানে বসে কেউ জীবিত আসতে পারেনি এই মন্দির থেকে।শোনা যায় একবার শ্রী শ্রী নিগমানন্দ পরম হংস দেব তার চারজন অন্তরঙ্গ শিষ্য সহ উক্ত চিনিশপুর কালী দর্শন আসেন এবং রাতে থাকা মনস্থির করেন।তারপর গভীর রাতে মন্দিরে ঢুকেই ঠাকুর দরজার বন্ধ করে দিলেন। আসনে বসে একটু ধ্যানস্থ হতেই ঠাকুর কারও উপস্থিতি অনুভব করল। চোখ মেলে দেখেন এক কিশোরী তার বাম পা ঝুলিয়ে ও ডান পা তার বাম উরুতে রেখে বসে আছে, মুক্ত কেশী পরমাসুন্দরী লালচেলী পরা। তার রুপের জ্যোতিতে মন্দির আলোকিত।সাধক মায়ের চরণে প্রণাম জানিয়ে দিব্য অনুভূতি নিয়ে ফিরে এসেছিলেন।চিনিশপুর কালীবাড়ী নিয়ে বহু এমন সব অলৌকিক ঘটনার খোঁজ পাওয়া যায় যেমন কালীবাড়ীর পুকুরে হাত দেখিয়ে একবার দেবী তার ভক্তকে বলেছিলেন দেখ তোর শাঁখা আমি হাতে পরেছি।বহু এমন দেবী মন্দির রয়েছে সারা দেশে। আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য কোনো দেবী মাহাত্ম নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী মাহাত্ম – পুরুষোত্তম পুরের ডাকাত কালী

বাংলার কালী মন্দির গুলি নিয়ে লিখতে বা বলতে গেলে অনিবার্য ভাবে ডাকাত কালী প্রসঙ্গ আসবেই।আজ আপনাদের জানাবো।হুগলির পুরুষোত্তম পুরের সনাতন ডাকাতের কালীপুজোর কথা।স্বাধীনতার বহু আগে। দুর্গম এই অঞ্চলে ডাকাতরাই দাপিয়ে বেড়াতো। প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে যারা একটু অর্থবান তারা সনাতন ডাকাতের ভয়ে সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকতো।দুঃসাহসী ডাকাত সর্দার ছিলেন সনাতন বাগদী। নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে দেবী কালীর উপাসনা করতেন তিনি।তার ডাকাত দল নিয়ে বহু কিংবদন্তী প্রচলিত আছে যার একটি আজ আপনাদের বলছি।একদিন সনাতন বাগদী ডাকাতি করতে বের হবেন। অমাবস্যার রাতে মায়ের পূজা দিয়ে তবেই কাজে বেরোবে তারা। সেইমতো নানা পূজার উপাচারে সেজে উঠেছে মন্দির। এদিকে সেদিকে ছড়িয়ে বসে আছে ডাকাত দল। সবাই অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত এবং সুরাপনে মত্ত। হঠাৎ সনাতন উচ্চকণ্ঠে ‘বলি কোথায়?’ বলে চিৎকার করে উঠলো। সবাই দেখলো তাইতো। মায়ের বলীর ব্যবস্থা করা হয়নি।দলের ডাকাতেরা ভয়ে জানালো চৈত্র মাস! ঝড় বৃষ্টি লেগেই আছে! সব ওলট-পালট করে দিচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ । ঘর থেকে বের হতে পারেনি কেউ।তাই মায়ের বলীর ব্যবস্থাও করা হয়নি।সর্দার সনাতন রাগে গর্জে উঠলো ‘সে কী! চৈত্র মাস বলে মা অনাহারে থাকবেন? বলী হবেনা।না তা হবে না! গভীর রাতেই হুকুম হলো।যে ভাবে পারিস বলি ধরে আন।’ কিন্তু সেদিন ডাকাতরা তার কথা শুনলোনা কারন ডাকাতির ভাগবখরা নিয়ে আগে থেকেই দলে অসন্তোষ ছিল। সর্দারের বিরুদ্ধে তলে তলে বিদ্রোহ হচ্ছিলো আগে থেকেই।নিজের চ্যালাদের এই অবহেলায় ক্ষেপে উঠলেন সনাতন ডাকাত ।রাগে কাঁপতে কাঁপতে তিনি বললেন, “আমার আদেশ অমান্য করা! এত বড় স্পর্ধা! তোদের সবকটাকে আজ মায়ের পায়ে বলি দেব।”এই বলে হুঙ্কার দিয়ে রাগে আক্রোশে উন্মুক্ত তরবারি হাতে নিজের দলের লোকেদের ওপরেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন ডাকাত-সর্দার সনাতন।বহু ডাকাত নাকি সেদিন তার হাতে প্রাণ হারায়। তার দল ও ক্ষমতা হারায় এবং ক্রমে ডাকাতি প্রায়বন্ধ হয়।তবে আজও ডাকাত কালীর পুজো হয় নিষ্ঠা সহকারে। দেবী খুবই জাগ্রত এবং বহু মানুষ নিজের মনোস্কামনা নিয়ে আসেন দেবীর কাছে।ফিরে আসবো পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।