পুরান কথা – পুরীধাম ও মহাপ্রভু

140

পুরীধাম ও বিখ্যাত রথ যাত্রার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেছে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যর নাম এবং তার হাত ধরেই বাংলা ও পরবর্তীতে দেশের বাইরেও ছড়িয়েছে রথ যাত্রার মহিমা|সন্ন্যাস নেওয়ার অল্প দিন পরে, ১৫১০ সালে পুরীতে প্রথম বার পৌঁছে মহাপ্রভু ভাবে বিভোর হয়ে জড়িয়ে ধরতে গিয়েছিলেন দারুবিগ্রহ। জীবনের ২৪টা বছর শ্রীচৈতন্য পুরীতেই ব্যয় করলেন এই ২৪ বছরের মধ্যে প্রথম ৬ বছর অবশ্য তিনি বৃন্দাবনসহ উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারত সফরের জন্য পুরীকেই কেন্দ্র করেছিলেন। সেখান থেকেই নানা দিকে যাতায়াত করেছিলেন। মায়ের সঙ্গে শেষ বার দেখা করে আসার পর পুরীতে টানা ১৮ বছর বাস করেছেন, ১৫৩৩ সালে সেখানেই রহস্যজনক ভাবে বৈকুন্ঠে লীন হয়ে গেলেন।কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর ‘চৈতন্যচরিতামৃত‘-র মধ্যলীলা পর্যায়ে জানিয়েছেন, রাজা প্রতাপ রুদ্রদেব চৈতন্য ও তাঁর সঙ্গীদের রথযাত্রায় অভ্যর্থনা জানানোর জন্য দাঁড়িয়েছিলেন।আরো বর্ণনা আছে যে বিশাল দারুমূর্তিগুলি কী ভাবে রেশমি দড়িতে বেঁধে সেবকরা মন্দিরের বাইরে নিয়ে আসছেন, পুরু মাদুরের উপর দিয়ে সেগুলি রথে নিয়ে তুলছেন, সেই বর্ণনাও চরিতামৃতে আছে। রাজা নিজে সোনার হাতলওয়ালা ঝাঁটা নিয়ে জগন্নাথদেবের পথ পরিষ্কার করেন, সারা রাস্তায় সুগন্ধি চন্দনজল ছেটানো দেখে মহাপ্রভুও চমৎকৃত হয়েছিলেন।চৈতন্য বারংবার বলেছেন, পুরীর এই নীলমাধবই স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, তিনি তাঁরই আরাধনা করেন এবং তিনি শুধু শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মের ভক্ত, কোনও জাত বা সম্প্রদায়ে বিশ্বাসী নন।উল্লেখ যোগ্য বিষয় হলো পুরীবাসে চৈতন্যের প্রধান শিষ্যরা, যেমন রামানন্দ, শ্যামানন্দ, বলদেব বিদ্যাভূষণ কেউই ব্রাহ্মণ নন। পুরীর তৎকালীন ব্রাহ্মণ পান্ডা ও পুরোহিতেরা সারা বছর এই শূদ্রদের জগন্নাথ দর্শনের বিপক্ষে। শবরদের জগন্নাথ তখন ব্রাহ্মণদের অধিকারে মন্দিরের পুরোহিতেরা বিধান দিলেন, জগন্নাথদেব বছরে এক বারই মানুষের দরবারে বেরোতে পারবেন আর সেই দিনটা হলো রথ যাত্রা|খ্যাতির শীর্ষে থাকা কালীন রহস্যজনক ভাবে পুরী থেকে মহাপ্রভু হারিয়ে গেলেন। অচ্যুতানন্দ দাস, দিনকর দাস, ঈশ্বরদাসের মতো চৈতণ্য জীবনীকার ও টীকাকারেরা বারংবার বলেছেন, নীলমাধব বিগ্রহে মিশে গিয়েছে তাঁর শরীর, কিন্তু সে নিয়ে হরেক সন্দেহ আর বিতর্ক কারন বিভিন্ন ঠিকাকার তার অন্তর্ধান নিয়ে আলাদা আলাদা ব্যাখ্যা করেছেন|কোথাও বলার হয়েছে রথ যাত্রার সময়ে পায়ে আঘাত লেগে তার মৃত্যু হয়েছে আবার কেউ বলেছেন সমুদ্রে তার জলসমাধি হয়েছে|অনেকেই মনে করেন মহাপ্রভুর অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পেছনে অন্য কোনো কারন আছে হয়তো জাতি ভেদ ও বর্ণ ভেদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া অন্য দিকে তার শিষ্য হয়ে পুরীর রাজার যুদ্ধ ও রাজনীতি থেকে দূরে থাকা অনেকেরই পছন্দ হয়নি তাই মহাপ্রভুর বিরুদ্ধে চক্রান্ত হয়েছিলো|সব থেকে বড়ো প্রশ্ন তার যদি স্বাভাবিক মৃত্যু হয়ে থাকে তার কোনো সমাধি স্থান নেই কেনো? আর যদি জগন্নাথ মূর্তিতে তিনি বিলীন হয়ে যাবেন তবে তার সমসাময়িক টিকাকারদের মধ্যে এতো শ্ববিরোধী মন্তব্য কেনো? চৈতণ্য অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে চলেছে গবেষণা একাধিক উপন্যাস ও লেখা হয়েছে|তবে সব প্রশ্ন ও দ্বিধা দূর হয় যদি চৈতণ্যদেবকে অবতার রূপে মেনে নেয়া হয়ে আর যদি তাকে সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখা হয়ে তবে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়|যাই হোক বিতর্ক নয় তার ভক্তি ও আদর্শ তাকে অমর করে রাখবে সারা বিশ্বে|পুরী ও রথ যাত্ৰা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকবে উল্টো রথ অবধি |পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|