আজ মহালয়া অর্থাৎ পিতৃ পক্ষের অবসান এবং দেবী পক্ষের সূচনা। আজকের এই বিশেষ পর্বে আপনাদের জানাবো শাস্ত্রীয় দৃষ্টি ভঙ্গী থেকে কি এই মহালয়া এবং কেনো পালন করা হয় কিবা এই মহালয়ার আধ্যাত্মিক গুরুত্ব।মহাভারতে উল্লেখ আছে যে পকর্ণের মৃত্যুর পরে তার আত্মা স্বর্গে গমন করলে, তাকে স্বর্ণ ও রত্ন খাদ্য হিসেবে প্রদান করা হয়। কর্ণ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে ইন্দ্র বলেন, কর্ণ সারা জীবন স্বর্ণ এবং রত্ন দান করেছেন, তিনি পিতৃপুরুষের আত্মার উদ্দেশ্যে কোনোদিনো কোনো খাদ্য দান করেননি।তাদের কাছে প্রার্থনা করেননি তাই স্বর্গে তাকে স্বর্ণই খাদ্য হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। পিতৃ পুরুষের আশীর্বাদ থেকেও তিনি বঞ্চিত। তার পুন্য সঞ্চয় অসম্পূর্ণ।তার উত্তরে কর্ণ বলেন, তিনি যেহেতু তার পিতৃপুরুষ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। তাই তিনি অসহায় এবং অজ্ঞানতা বসত এই অন্যায় করে ফেলেছেন।তারপর কারণে কর্ণকে ষোলো দিনের জন্য মর্ত্যে গিয়ে পূর্ব পুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল প্রদান করার অনুমতি দেওয়া হয়। সেই সময়কালকে পিতৃপক্ষ বলা হয়।একটি শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুসারে জীবিত ব্যক্তির পূর্বের তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃলোকে বাস করেন। এই লোক স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। পিতৃ পক্ষে এই আত্মারা উত্তর পুরুষের তর্পনের মাধ্যমে চীরমুক্তি লাভ করে এবং পরম ব্রহ্মর সাথে বিলীন হয়।এই তর্পনের শাস্ত্র সম্মত তিথি হলো মহালয়া তিথি|জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুসারে অনুযায়ী, সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষ সূচিত হয়।এই সময় পূর্বপুরুষগণ আত্মা রূপে পিতৃলোক পরিত্যাগ করে তাদের উত্তরপুরুষদের গৃহে বা আশেপাশে অবস্থান করেন। এর পর সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করলে, তারা পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান এবং দেবী পক্ষের সূচনা হয়।যাদের জন্মছকে পিতৃ দোষ আছে তারা এই সময়ে গ্রহ দোষ খণ্ডন করালে পিতৃ দোষ থেকে স্থায়ী ভাবে রেহাই পেতে পারেন।যেহেতু মহালয়া মৃত্যু ও শোকের সাথে সংযুক্ত তাই শুভ মহালয়া বলা যায় কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে যেহেতু এই তিথিতে পিতৃ পক্ষের অবসান হয়ে দেবী পক্ষের সূচনা হয় তাই আসন্ন দেবী পক্ষের শুভেচ্ছা এবং শারদৎসবের আগাম শুভেচ্ছা দেয়াই যায়।ফিরে আসবো আগামী পর্বে দূর্গা পুজো উপলক্ষেবিশেষ ধারাবাহিক লেখনী নিয়ে।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দূর্গা কথা – নবকৃষ্ণ দেবের দূর্গা পুজো
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রীজাতক
বাংলার বনেদি বাড়ির পুজো ঐতিহাসিক পুজোর মধ্যে রাজা নব কৃষ্ণ দেবের শোভাবাজার রাজবাড়ীর পুজো থাকবে একদম প্রথম শাড়িতে|
আজকের পর্ব এই ঐতিহাসিক পুজো নিয়ে।
সেকালে বলা হতো দূর্গা পূজোর সময়ে দেবী মর্তে থাকাকালীন তার মনোরঞ্জনের জন্য এই বাড়িতেই আসতেন|এমন ভাবনার পেছনে অনেক কারন আছে|সে বিষয়ে পরে আসছি আগে এই বাড়ি ও তার ইতিহাস সংক্ষেপে জেনে নেয়া দরকার|
যদিও এই পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিজয় হরি দেব তবে এই পরিবারের স্বর্ণযুগ বলা হয় রাজা নবকৃষ্ণ দেবের সময় কে এবং তার আমলেই শুরু হয় এই দূর্গা পূজা|নব কৃষ্ণদেব ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন সাধারণ কর্মচারী যিনি নিজের দক্ষতায় ও পরিশ্রমে কোম্পানির মুন্সী হয়ে ছিলেন|পলাশীর যুদ্ধে তিনি নানা ভাবে ক্লাইভ কে সাহায্য করেন ও পুরুস্কার স্বরূপ প্রচুর অর্থ লাভ করেন|
মূলত পলাশীর যুদ্ধ জয় কে স্মরণীয় করে রাখতেই নবকৃষ্ণ দেবে দূর্গা পুজো শুরু করেছিলেন তাছাড়াও তার উদেশ্য ছিলো ক্লাইভ কে খুশি করে নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা|বলা বাহুল্য এই উদ্দেশ্যে তিনি সম্পূর্ণ সফল হয়েছিলেন|তার দূর্গা পুজোয় অংশগ্রহণ করেছিলেন স্বয়ং লর্ড ক্লাইভ। সাহেব দের উপস্থিতির জন্য সেকালে এই পুজো কে গোরা দের পুজো বা কোম্পানির পুজো বলা হতো|
উদেশ্য যাই থাকুক শাস্ত্র মতে নিষ্ঠা সহকারে পুজো করতেন নবকৃষ্ণ দেব|প্রচুর অর্থ ব্যায় হতো এই পরিবারের দূর্গা পুজোয়|বসতো গান বাজনার আসর, নাচ, কবি গানের ও ব্যবস্থা থাকতো|দূর্গা পুজো উপলক্ষে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, ভোলা ময়রার মতো কবিয়ালরা এখানে এসেছেন কবির লড়াই করতে আবার গহরজান নুর বক্স প্রমুখ নামী নর্তকীরা এই বাড়িতে এসেছেন নাচ করতে|সব মিলিয়ে এলাহী আয়োজন হতো শোভাবাজার রাজ বাড়ির দূর্গা পুজোয় আর এই কারণেই মনে করা হতো যে এটা মর্তে দেবী দুর্গার মনোরঞ্জনের স্থান|
পরবর্তীতে দুই শরিকের মধ্যে ভাগ হয়ে যায় সম্পত্তি তবে প্রথা মেনে নিষ্ঠা সহকারে আজও শোভাবাজর রাজবাড়ি তে দূর্গা পূজা হয়|উল্টো রথের দিন কাঠামো পুজো দিয়ে শুরু হয় দেবীমূর্তি তৈরির কাজ|শোভাবাজার রাজবাড়ির মাতৃমূর্তির বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এছাড়া, এখানকার পুজোর উপাচারও বেশ চমকপ্রদ।স্বাধীনতার আগে সন্ধিপুজোতে কামানের গোলার শব্দে শুরু হত পুজো এবং শেষও হত একই ভাবে|মা দুর্গা এই বাড়িতে বৈষ্ণবী হিসেবে পূজিতা হন। তাই শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজোয় অন্নভোগ থাকে না। গোটা ফল, গোটা আনাজ, শুকনো চাল, কচুরি, খাজা, গজা, মতিচুর-সহ নানা ধরনের মিষ্টি দেবীকে উত্সর্গ করা হয়|বর্তমানে এখানে বলী প্রথা নেই|এবাড়ির পুজোয়|প্রতিমার সামনে একটা বড় হাড়িতে জল রাখা হয়। সেই জলে দেবীর পায়ের প্রতিবম্বের ছবি দেখে সবাই প্রণাম করে। একে দর্পণ বিসর্জন বলা হয়|তারপর প্রথা মেনে দশমীর দিনই হয় বিসর্জন|আগে নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর রীতি থাকলেও সরকারি নিয়মে তা এখন বন্ধ|
আজও বহু মানুষ শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো দেখার জন্য ভিড় করেন।
আজকের পর্বে এইটুকুই|ফিরবো পরের পর্বে|থাকবে দূর্গা পুজো উপলক্ষে আরো একটি
বিশেষ পর্ব।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।
দূর্গা কথা – দে বাড়ির দূর্গা পুজো
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
যাদের উত্তর কলকাতায় নিয়মিত যাতায়াত আছে তারা হয়তো দেখেছেন সদা ব্যাস্ত বিডন স্ট্রিটে রয়েছে একটি প্রাচীন ভগ্নপ্রায় অট্টালিকা যার পোশাকি নাম রামদুলাল নিবাস|এই বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা রাম দুলাল দে ছিলেন|পুরোনো কলকাতার বাবু সমাজের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র|
তার দূর্গা পুজো ছিলো ব্রিটিশ আমলের কলকাতার একটি বহু আলোচিত পুজো। আজকের পর্ব এই দে বাড়ির পুজো নিয়ে।
শোনা যায় রামদুলাল বাবু ছিলেন বাংলার প্রথম লাখপতি|তিন ব্রিটিশ আমলে আমদানি রপ্তানির ব্যবসা করে এই অগাধ সম্পত্তি করেছিলেন|তিনিই প্রথম এই বাড়িতে দূর্গা পূজা শুরু করেছিলেন|তার অবর্তমানে তার দুই পুত্র আশুতোষ এবং প্রমথ নাথ এই বাড়ির রাজকীয় ঠাট বাট এবং দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য এগিয়ে নিয়ে যান।
আশুতোষ এবং তার ভাই প্রমথ নাথ যথাক্রমে ছাতুবাবু এবং লাটুবাবু নামে সুপরিচিত ছিলেন।তাদের সময়েই এই পুজো বেশি বিখ্যাত হয়|প্রতি বছর প্রচুর অর্থ ব্যায় করে ও ব্যাপক ধুম ধাম করে দূর্গা পুজো হতো এই বাড়িতে|দূর্গা পূজা উপলক্ষে প্রায় গোটা কলকাতার নিমন্ত্রণ থাকতো এই বাড়িতে|পুজোর সময় যাত্রা হত নাচ গানের আসর বসতো। বাংলা তথা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিখ্যাত শিল্পীরা আসতেন অতিথিদের মনোরঞ্জন করতে।
সেই পুরোনো জৌলুস আর নেই তবু নিষ্ঠা সহকারে সকল প্রথা মেনে দূর্গা পুজো হয়|রথের দিন কাঠামো পুজোর পর প্রতিপদ থেকে শুরু হয় পুজো|এখানে শুরুর দিন থেকে ষষ্ঠী পর্যন্ত গৃহদেবতা শালগ্রাম শিলার পুজো করা হয় এবং তৃতীয়াতে দেবীকে আসনে বসানো হয়|এই বাড়িতে শাক্ত শৈব এবং বৈষ্ণব তিনটি মতেই পুজো হয়|উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এই বাড়ির পুজোয় দেবীর পাশে লক্ষ্মী সরস্বতী থাকেন না তার পরিবর্তে পদ্মের উপর থাকেন মা দুর্গার দুই সখী জয়া আর বিজয়া|
শোনা যায় এককালে এখানে পশু বলীও দেয়া হতো কিন্তু একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বলী প্রথা বন্ধ হয়ে যায় বহু কাল আগে|বলা হয় একবার বলি দেওয়ার সময় পাঁঠাটি ছুটে চলে আসে সামনে দাঁড়ানো রামদুলাল দের কাছে। সেই থেকে এই পুজোয় পাঁঠাবলি বন্ধ হয়ে তার বদলে এখন
নিয়ম রক্ষায় আঁখ, চালকুমড়ো এবং শসা বলি হয় পুজোর তিন দিন|এছাড়া এখানে কুমারী পুজো হয় নিষ্ঠার সহিত।
বাকি আছে আরো অনেক বনেদি বাড়ির পূজো নিয়ে আলোচনা।দেখা হবে পরের পর্বে।
অন্য এক দূর্গা পূজার কথা নিয়ে
ফিরে আসবো যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দূর্গা কথা – লাহা বাড়ির দূর্গা পুজো
কলকাতার বড়ো বনেদি বাড়ির পারিবারিক পুজো গুলির মধ্যে লাহা বাড়ির পুজো অন্যতম|আজকের পর্বে এই লাহা বাড়ির পুজোনিয়ে লিখবো।কলকাতায় এসে পাকাপাকি ভাবে বাস করার আগে বর্ধমানে প্রথম পুজো শুরু করেন লাহা বাড়ির অন্যতম কর্তা বনমালী লাহা|তারপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয় বর্ধমানের পাট চুকিয়ে লাহারা কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করেন। কলকাতার বাড়িতে দূর্গা পুজো শুরু করেন দুর্গাচরণ লাহা|এই বাড়ির পুজোর এমন কিছু বৈশিষ্ট আছে যা আর বেশ অদ্ভুত এবং আর কথাও চোখে পড়েনা|লাহা বাড়ির কুল দেবী সিংহ বাহিনী।দূর্গা পুজোর সময়ে দশ ভূজা দেবী দূর্গা এবং সিংহ বাহিনী একই সাথে পূজিতা হন|সিংহ বাহিনী কি করে এবাড়ির কুলদেবী হলো সে নিয়েও একটি অলৌকিক ঘটনা আছে|শোনা যায় কোনো এক সময় নাকি দেবীর এই মূর্তি কোন এক গভীর জঙ্গলে অনাদরে অযত্নে পড়ে ছিল।লাহা বাড়িরই এক সদস্য দেবীর কাছে স্বপ্নাদেশ পেয়ে মূর্তি উদ্ধার করতে গিয়ে দেবীকে খুঁজে পান এবং স্বযত্নে দেবীকে তুলে নিয়ে এসে কুলদেবী রূপে পুজো করতে শুরু করেন|সেই থেকেই অষ্ট ধাতুর সেই মূর্তি কুল দেবী রূপে এবাড়িতে প্রতিষ্ঠিত|মনে করা হয় ওই ঘটনার পর থেকে লাহাদের ব্যাপক উন্নত হয়|পরবর্তীতে শিবচরণ লাহা ইংরেজদের সঙ্গে পেন খাতাপত্র এবং মূল্যবান রত্নের ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। পুজোর জাঁকজমকও বাড়ে এই সময়|এই বাড়ির পুজো হয়ে ওঠে কলকাতার বিখ্যাত বনেদি বাড়ির বড়ো পুজোগুলোর একটা|এ বাড়িতে দেবী দুর্গার রূপ অন্য|তিনি এখানে হরপার্বতী রূপে পূজিতা হন|এই রূপে শিবের কোলে দেবী দুর্গা উপবিষ্টা|মহিষাসুর থাকেনা, দেবীর হাতে কোনো অস্ত্রও থাকেনা|লাহাবাড়ির পুজোর রীতিও একটু আলাদা লাহাবাড়িতে কাঠামো পুজো হয় জন্মাষ্টমীর দুই তিন পরে এবং দেবীপক্ষের শুরুতে বোধন হয়|লাহা বাড়ির পুজো হয় বৈষ্ণব মতে।প্রথা মেনে এখানে অন্ন ভোগ হয় না এখানে ভোগের বিশেষত্ব নানা ধরণের মিষ্টি| প্রাণী হত্যার পরিবর্তে বলী হয় কুমড়ো বা শসা|বিসর্জন ঘিরেও এবাড়িতে রয়েছে এক অদ্ভুত প্রথা বিসর্জন দিয়ে ফিরে বাড়ির পুরুষরা জিজ্ঞাসা করেন, ‘মা আছেন ঘরে’ ? তখন বাড়ির কোনও মহিলা ভিতর থেকে উত্তর দেন, ‘হ্যাঁ মা আছেন।‘ বাইরে থেকে ফের জিজ্ঞাসা করা হয় ‘মা আছেন ঘরে ?’ একই উত্তর দেওয়া হয় ভিতর থেকে। এভাবে পরপর তিনবার জিজ্ঞাসা করার পর সবাই ভেতরে প্রবেশ করে|এই প্রথা কেনো এবং কবে শুরু হয়েছে তার ইতিহাস জানা যায়না তবে নিষ্ঠার সাথে বর্তমান লাহাবাড়ির সদস্যরা এই রীতি নীতি সবই আজও পালন করে আসছেন।আসন্ন দুর্গাপুজো উপলক্ষে আগামী পর্ব গুলিতে এমন সব বনেদি বাড়ির পুজো সংক্রান্ত আরো অনেক ইতিহাস, গল্প ও শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নিয়ে যথা সময়ে ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দূর্গাকথা – দাঁ পরিবারের দূর্গা পুজো
কোলকাতা বনেদি বাড়ির পুজো গুলি নানা দিক দিয়ে তাৎপর্য পূর্ণ। এই পুজো গুলির সাথে জড়িয়ে আছে বাংলার ঐতিহ্য এবং ইতিহাস। উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজো গুলির অন্যতম দাঁ বাড়ির পুজো।আজ বনেদি বাড়ির পুজো পর্বে এই দাঁ পরিবারের দূর্গা পুজোর কথ হবে।
কালী প্রসন্ন সিংহ তার বিখ্যাত হুতোম পেঁচার নকশা গ্রন্থে এই পরিবার সম্পর্কে অনেক তথ্যই দিয়েছেন|এই বংশের প্রতিষ্ঠা ও দূর্গা পুজোর প্রচলন করেন এই বংশের সবথেকে প্রভাবশালী ব্যাক্তি গোকুলচন্দ্র দাঁ।সময় টা খুব সম্ভবত 1840 সাল| তিনি পরবর্তীতে শিবকৃষ্ণ দাঁ কে দত্তক নেন|এই শিব কৃষ্ণ দাঁ এর আমলে এই পরিবারের ও তাদের দূর্গা পুজোর নাম ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র|পারিবারিক লোহা, কয়লা আর হার্ডওয়ারের ব্যবসায় প্রভূত লাভ করেন তিনি এবং লাভের একটা বড়ো অংশ ব্যয় করেন নিজের সৌখিনতা ও পরিবারের দূর্গা পুজোয়|শোনা যায় শিবকৃষ্ণ দাঁ সাজগোজ করতে বড় ভালবাসতেন এবং দূর্গা পুজোয় দেবীর রূপ সজ্জায় তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন|
সেকালের কলকাতায় দূর্গা পুজো কে ঘিরে একটি প্রবাদ প্রচলিত ছিলো যে দেবী মর্ত লোকে পা রেখে প্রথমে সাজতে আসেন দাঁ বাড়িতে তার পর এখান থেকে অন্য কোথাও যান|শিব কৃষ্ণ দাঁ ফ্রান্স এবং জার্মানি থেকে বিশেষ কাজ করা অলঙ্কার ও পোশাক আনালেন ঠাকুরকে পরানোর জন্য|সোনা রুপো ও মূল্যবান রত্ন দিয়ে তৈরী ঝলমলে পোশাকে ও গয়নায় দেবীকে সাজানো হতো|তাই দাঁ বাড়ির পুজোয় দেবীর সাসজ্জা বাকি সব বনেদি বাড়িকে টেক্কা দিতো।
আর একটি মজার ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যায়|শোনা যায় জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির সঙ্গে ছিলো এই দাঁ পরিবারের খুব রেষারেষি তাই তাদের দেখিয়ে দেখিয়ে ঠাকুরবাড়ির সামনে দেবীকে বেশ কয়েকবার ঘুরিয়ে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে তারপর গঙ্গায় নিয়ে যাওয়া হতো বিসর্জনের জন্য|
সেই রাজা আর নেই, রাজত্বও নেই|সবই ধূসর অতীত|তবু দাঁ বাড়িতে পুজো হয়|দেবীর সেই বিখ্যাত সাজ আজও হয়|এখানে রথের দিন গড়ানকাঠ পুজোর মধ্য দিয়ে প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয় এবং জন্মাষ্টমীর দিন কাঠামোতে দেবীর মস্তক স্থাপন করা হয়|এ বাড়ির রীতি অনুসারে
দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠার সময় তেরোটি শাড়ি ও তেরোটি কাঁসার পাত্র দেওয়া হয়। এছাড়াও একশো আটটি পেতলের প্রদীপ সাজানো হয়|এখানে বলী প্রথা নেই কারন পুজো হয় বৈষ্ণব মতে|কুমারী পুজোও এই বাড়ির পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট|
আজকের এই পর্ব এখানেই শেষ করলাম|
ফিরবো আগামী পর্বে|বনেদি বাড়ির দূর্গা পূজোর পরবর্তী পর্ব নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দূর্গা কথা – মিত্র বাড়ির দূর্গাপুজো
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
বাংলার বিশেষ করে কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজো গুলির মধ্যে উত্তর কলকাতার নীলমণি মিত্র স্ট্রিটের মিত্রবাড়ির পুজো ঘিরে রয়েছে
সাধক রামপ্রসাদ এবং মা সারদার স্মৃতি। আছে অনেক গল্প এবং ইতিহাস। সেসব নিয়েই আজকের পর্ব।
তখনো কলকাতা মানে সুতানুটি এবং এবং গোবিন্দ পুর সংলগ্ন গঙ্গা পার্শবর্তী এক আগাছায় ঢাকা গন্ড গ্রাম সেই সময়ে আড়িয়াদহ থেকে ভাগ্যান্বেষণে এখানে আসেন এই পরিবারের আদি পুরুষ জগন্নাথপ্রসাদ মিত্র। নানা রকম ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন তিনি। তার পরবর্তী বংশধররা রত্নের ব্যবসায় নামেন। এমনকি এই বংশের লোকেরাই পলাশীর যুদ্ধের আগে সিরাজউদ্দৌলার ‘কোর্ট জুয়েলার’ ছিলেন অর্থাৎ রত্ন সরবরাহকারী।
ইতিহাস বলছে এই বাড়ির কাছারী বাড়িতে কাজ করতে আসেন সাধক-কবি রামপ্রসাদ সেন। হিসেবের খাতায় তাঁর লেখা গান পড়ে খুশি হয়ে হয়ে তৎকালীন জমিদার দুর্গাচরণ রামপ্রসাদকে আজীবন মাসোহারার ব্যবস্থা করে দেন এবং গ্রামে ফিরে সাহিত্য এবং সঙ্গীত চর্চার পরামর্শ দেন।
তার অনুপ্রেরণাতেই সাধক রামপ্রসাদ হয়ে ওঠেন বিশ্ববন্দিত সাধক ও বহু কাল জয়ী শ্যামা সংগীতের স্রষ্টা।
সেকালে ধনী জমিদার বাড়িতে ধুমধান করে দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হবে এটাই ছিলো রীতি।
সেই রীতি মেনে জমিদার রাধাকৃষ্ণ মিত্র ১৮০৬ সাল নাগাদ মিত্রবাড়ির দুর্গোৎসবের সূচনা করেন।শুধু দূর্গাপুজো নয় দূর্গাপুজো এবং কালী পুজো দুই এখানে বেশ জাঁকজমক সহকারে পালিত হতো।
সেকালে মিত্র বাড়ির পুজোতে নামজাদা সাহেবদের ও আমন্ত্রণ জানানো হতো।
একবার এসেছিলেন লর্ড কর্নওয়ালিস স্বয়ং।ইতিহাস বলছে একবার মা সারদা এই বাড়ির পুজোর জন্য পরমান্ন রেঁধেছিলেন। আজও তাই প্রতি বছর সারদা মঠের সন্ন্যাসিনীরা এই পুজোয় আসেন।
এখানে তিনচালার প্রতিমায় পুজো হয়।
দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতীর দেবীমুখ এবং কার্তিক ও অসুরের মুখ বাংলা ধাঁচের হয় অর্থাৎ স্বাভাবিক মানুষের অবয়ব।সিংহের মুখ হয় ঘোড়ার মতো।
পদ্ম নয়, ১০৮টি নীল অপরাজিতা ফুলে সন্ধিপুজো হয়। এখানে চাল ও ফলের সঙ্গে মিছড়ি-মাখনের নৈবেদ্য দেওয়া হয়।অন্ন ভোগের পরিবর্তে বর্তমানে কাঁচা অনাজের ভোগ দেয়া হয়।
বর্তমানে এখানে পুজো পরিচালনা করেন বাড়ির মহিলারা।
সেই রাজকীয় জাঁকজমক আগের মতো না থাকলেও এই পুজো বাংলার ঐতিহাসিক বনেদি বাড়ির পুজো গুলির মধ্যে অন্যতম। মিত্র বাড়ির পুজো এতটাই জনপ্রিয় ছিলো যে বহু মনীষী এবং বিখ্যাত মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকতো পূজোর সময়ে। এসেছেন মহা নায়ক উত্তম কুমার।
যদিও পুজো মহিলারা সামলান তবে বিসর্জনের ভার থাকে বাড়ির পুরুষদের কাঁধে।
এমন অনেক বনেদি বাড়ির পূজোর কথা এখনো বাকি আছে। চলতে থাকবে এই ধারাবাহিক পর্ব গুলি। অনেক ইতিহাস অনেক কিংবদন্তী থাকবে আগামী দিনে।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দূর্গা কথা – মুর্শিদাবাদের রায়চৌধুরী বাড়ির পুজো
মুর্শিদাবাদে নবগ্রাম থানার পশলা গ্রামের শতাব্দী প্রাচীন রায়চৌধুরী জমিদার বাড়ির পুজোর ঘিরে রয়েছে নানা গল্প নানা কিংবদন্তী। আজকের এই পর্বে লিখবো এই রায় চৌধুরী বাড়ির পুজো নিয়ে।এই বাড়ির দেবী দূর্গাকে বুড়িমা বলেও ডাকা হয়। কেনো এইরূপ নাম তা জানতে হলে পূজোর ইতিহাস জানতে হবে।যেখানে বর্তমানে পুজো মণ্ডপ রয়েছে আগে সেটি জঙ্গলে ঘেরা উঁচু ভূমি বা ঢিবি ছিল।সে প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগের কথা হটাৎ এক সন্ন্যাসিনী গ্রামে আসেন এবং জঙ্গলে ঘেরা উঁচু ঢিবিতে পঞ্চমুন্ডি আসন স্থাপন করে সাধনায় রত হন এবং সিদ্ধিলাভ করেন। এরপর সিদ্ধা সন্ন্যাসিনী পঞ্চমুন্ডি আসনে ঘট স্থাপন করে দশভূজার আরাধনা শুরু করেন। বৃদ্ধা সন্ন্যাসিনীকে গ্রামবাসীরা বুড়িমা বলে ডাকত। তাই সন্ন্যাসিনীর প্রতিষ্ঠিত এবং পূজিত দুর্গা তখন থেকেই বুড়িমা নামে পরিচিতি লাভ করে। অর্থ্যাৎ রায় চৌধুরী বাড়ির পুজো হলেও এই পুজো রায়চৌধুরী পরিবারের কোন পূর্বপুরুষ কিন্তু শুরু করেননি শুরু হয়েছিলো এক সন্ন্যাসীনীর হাতে।পরবর্তীতে সেই সন্ন্যাসিনীর মৃত্যুর পরে পাশলার জমিদার মথুরানাথ রায়চৌধুরী সন্ন্যাসিনীর নির্দেশে পুজো চালিয়ে যেতে থাকেন। তবে সেই সময়ে ঘট পুজো হত, মূর্তি পুজো হত না। শোনা যায়, পরবর্তী সময়ে জমিদার পরিবারের এক সদস্যকে মূর্তি গড়ে পুজো করার নির্দেশ দেন বুড়িমা। শুরু ঘটের বদলে দূর্গা মূর্তির আরাধনা।রায়চৌধুরী বাড়িতে উমা কিন্তু দশভূজা নন, তিনি এখানে চতুর্ভূজা। এই দুর্গা পুজোর প্রধান বৈশিষ্ট্য, একই মণ্ডপের ছাদের নীচে তিনটি বেদিতে ত্রয়ী দুর্গার আরাধনা।জমিদার পরিবারের দুই শরিকের মধ্যে দ্বন্দ্ব হওয়ায় দুজনে একই মণ্ডপের ছাদের নিচে মূল বেদীর ডান দিকে আরও দুটি বেদী নির্মাণ করে দুর্গা পুজো শুরু করেন। পঞ্চমুণ্ডি আসনে অধিষ্ঠিত থাকেন বুড়িমা। দুই পাশে আরো দুই বিগ্রহর পুজো হয়।এখানে রথের দিন দেবীর কাঠামোয় মাটির প্রলেপ দিয়ে পুজোর সূচনা হয় তারপর ষষ্ঠীর দিন সকালে তিনটি প্রতিমাকে তিনটি বেদীতে স্থাপন করা হয়। নিয়ম অনুসারে গ্রামের পুকুর থেকে তিনজন পুরোহিত তিনটি ঢাক সহযোগে তিনটি ঘট ভরে তিন দেবীকে বেদিতে শাস্ত্র মতে প্রতিষ্ঠা করেন। শুরু হয় পুজো।অতীতে মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন প্রান্ত এমনকি মালদা, নদিয়া ও বীরভূম জেলা থেকেও বহু মানুষ পুজোর চারদিন পাশলা গ্রামে ভিড় জমাতেন। বর্তমানে জমিদারি ঠাট বাট আর নেই। তবে নিয়ম নিষ্ঠা এবং মানুষের আগ্রহ আছে আগের মতোই।ফিরে আসবো বোনেদি বাড়ির পূজোর পরের পর্ব নিয়ে আগামী দিনে। যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
বনেদি বাড়ির পুজো – আঢ্য বাড়ির দূর্গা পুজো
একটি খুব প্রচলিত জনপ্রিয় ছড়া হয়তো আপনারা সবাই শুনেছেন। এই ছড়া টির কথা বলছি – “আইকম বাইকম তাড়াতাড়িযদু মাষ্টার শ্বশুরবাড়িরেল কম, ঝমা ঝমপা পিছলে আলুর দমআজকের বনেদিবাড়ির দূর্গাপুজোর এই পর্বের সাথে এই ছড়ার সম্পর্ক আছে।আজ আলোচনা করবো চুঁচুড়ার আঢ্য বাড়ির পুজো নিয়ে যা প্রায় তিনশো বছরের পুরোনো একটি বিখ্যাত পুজো।এই পরিবারের একজন অন্যতম প্রাণপুরুষ, ছিলেন যোগীন্দ্রলাল আঢ্য ওরফে যগু মাস্টার।যখন বাংলায় প্রথম রেলগাড়ি চলতে শুরু হয়সেই সময় হুগলি স্টেশনের স্টেশন মাস্টার ছিলেন যগুবাবু। লোক মুখে বিকৃত হয়ে পরবর্তীতে তিনি যদু মাস্টার উচ্চারিত হন এবং তিনিই এই ছড়ার যদু মাস্টার।তার হাত ধরেই এই পুজোর সূচনা। তারপর থেকে বংশানুক্রমে আঢ্য বাড়িতে হয়ে আসছে পুজো আজও চলছে সেই পুজো।এখানে প্রতিমা শিল্পী থেকে শুরু করে পুরোহিত, রান্নার বামুন ঠাকুর প্রত্যেকেই বংশানুক্রমিকভাবে যুক্ত রয়েছেন আঢ্য বাড়ির পুজোর সঙ্গে। কুমারী পুজোতে যে মেয়েটি বর্তমানে পূজিতা হয়, সেও প্রথম যুগের কুমারী মেয়েটির বংশেরই কন্যা।আঢ্য বাড়িতে দেবী দূর্গা দশভুজা নন তিনি দ্বিভুজা। তিনি এখানে শিবের কোলে অধিষ্ঠাতা। তবে শিবদুর্গার সঙ্গে তাদের পুত্র কন্যারাও থাকেন।আঢ্য বাড়িতে বৈষ্ণব মতে পুজো হয় তবে কুমারীপুজো, যজ্ঞ এবং চণ্ডীপাঠ পালন করা হয় শাক্ত মতে। এই বাড়ির পুজোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য মিষ্টি৷ পুজোর ফলমূল আর মিষ্টি পরিবেশন করা হয় কাঠের বিশাল তেপায়াতে করে।সেই পাত্রের নাম লটকান।আঢ্য বাড়িতে মহালয়ার দিন থেকেই প্রতি সদস্য নিরামিষ আহার করেন। দশমীর দিন পুজো শেষে বাড়ির বিবাহিত মহিলারা আরশিতে মায়ের প্রতিবিম্ব দেখার পর খাওয়া হয় আমিষ । সুদূর অতীতে এই পরিবারে কাঙালি ভোজন এবং বিদায়ের রেওয়াজ ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে আসতেন প্রচুর দরিদ্র মানুষ। এলাহী আয়োজন থাকতো তাদের জন্য। বর্তমানে সেই প্রথা নেই।তবে বাকি সব রীতি নীতি আজও মানা হয়।বনেদি বাড়ির দূর্গা পূজোর পরের পর্ব নিয়েফিরে আসবো যথা সময়ে। থাকবে অন্য কোনো বনেদি বাড়ির দূর্গাপূজোর কথা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দূর্গা কথা – বর্ধমানের মুখোপাধ্যায় বাড়ির পুজো
বাংলার প্রায় প্রতি জেলায় আছে কিছু ঐতিহাসিক পুজো যার মধ্যে প্রায় বেশি ভাগই কোনো না কোনো অভিজাত বাড়ির পুজো। তেমনই বর্ধমানের সোঁয়াই গ্রামে মুখোপাধ্যায় বাড়ির প্রায় সাড়ে তিনশো বছরেরও বেশি পুরনো দুর্গাপুজোর নিজস্ব ইতিহাস আছে।সেই ইতিহাস জানাবো আজকের পর্বে।বর্ধমানের সোঁয়াই গ্রামের মুখোপাধ্যায় পরিবারের বাসুদেব মুখোপাধ্যায় আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে একদিন হঠাৎই স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নাদেশে মা দুর্গা তাঁকে বলেন তিনি অপূজিত অবস্থায় ফরিদপুরে পড়ে আছেন। এই স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর আর সময় নষ্ট করেননি বাসুদেববাবু স্বপরিবারে সোজা চলে যান তাদের আদি বাস ভূমি ফরিদপুরে তাঁর পৈতৃক ভিটেয়। তারপর তাঁর পারিবারিক দুর্গার কাঠামো কাঁধে করে সোঁয়াই গ্রামে ফিরে আসেন।ফেরার পথে যখন প্রায় সোঁয়াই গ্রামের কাছে পৌঁছে গেছেন তাঁরা। সে সময়ে যে রাস্তা ধরে তাঁরা আসছিলেন সেই রাস্তার উল্টোদিক থেকে বর্ধমানের মহারাজা ভ্রমণ সেরে ফিরছিলেন। রাজা যে পথে যাবেন সেই পথ আগলে কারা এভাবে আসছে তা দেখতে রাজার পাইক, বরকন্দাজ ছোটে। তারা বাসুদেব মুখোপাধ্যায়কে রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়াতে বলে। কিন্তু বাসুদেববাবু জানিয়ে দেন মায়ের কাঠামো নিয়ে তাঁরা রাস্তা ছাড়বেন না। বরং রাজা সরে দাঁড়ান। মা যাবেন। শুরু হয় বাগ বিতন্ডা সব শুনে রাজা এবার স্বয়ং এগিয়ে আসেন। ধর্মপ্রাণা রাজা যেই শোনেন যে মা দুর্গার কাঠামো যাচ্ছে তিনি তৎক্ষণাৎ রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়ান।শুধু তাই নয় নয়, এই পুজো যাতে ধুমধাম করে হতে পারে সেজন্য মুখোপাধ্যায় পরিবারকে প্রচুর জমি, পুকুর, সম্পত্তি দান করেন রাজা।হয়তো মহারাজা ব্রাহ্মণ সন্তানের ভক্তি ও প্রতিবাদী চরিত্র দেখে খুশি হয়ে ছিলেন।যায় হোক সে বছরই সেই কাঠামোয় মাটি লেপে তাতে রং করে প্রতিমাকে মৃন্ময়ী রূপ দেওয়া হয়। শুরু হয় পুজো। সেই যে পুজো শুরু হয়েছে তা আজও চলছে । এখনো চিরাচরিত রীতি মেনে, পুরনো পারিবারিক পুঁথি অনুসরণ করে হয় পুজো।মহানবমীতে পশু বলি হয়। সেই বলির পর মৃত এবং বলী প্রদত্ত পশুটি নিয়ে স্থানীয় আদিবাসীরা চলে যান। এটাই এখানকার রীতি। এই মুখোপাধ্যায় পরিবারে পুজোর তিন দিন একটি মহাপ্রদীপ প্রজ্বলিত থাকে। যা ঘি দিয়ে জ্বালিয়ে রাখা হয়। প্রদীপের দীপশিখা কখনও নিষ্প্রদীপ হয়না এই তিন দিনে। প্রতিদিন এই প্রদীপকে নিরন্তর জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব পড়ে পরিবারের এক এক জন সদস্যের ওপর।এই পুজোর বিসর্জনের রীতি ও একটু আলাদা প্রতি বছর বিসর্জনের পর তুলে আনা হয় মায়ের কাঠামো। রেখে দেওয়া হয় সযত্নে। পরের বছর ফের তাই দিয়েই নির্মাণ হয় নতুন প্রতিমা।ফিরে আসবো অন্য কোনো বনেদি বাড়ির দূর্গা পূজো নিয়ে আগামী পর্বে। থাকবে এমনই কোনো প্রাচীন দূর্গা পূজো সম্পর্কে ঐতিহাসিক কিছু তথ্য।থাকবে অলৌকিক কিছু ঘটনা। পড়তে থাকুন ।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দূর্গা কথা – ভাঙ্গর জমিদারবাড়ির দূর্গা পুজো
ধারাবাহিক এই লেখায় ইতিমধ্যে উত্তর বঙ্গের বেশ কয়েকটি বিখ্যাত জমিদার বাড়ির পুজো নিয়ে আলোচনা করেছি।দক্ষিণ বঙ্গের অন্যতম পুরোনো ভাঙ্গর জমিদার বাড়ির পুজো নিয়েআজকের পর্বে লিখবো।ভাঙড়ের স্বস্ত্যয়নগাছি গ্রামে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন মজুমদার বাড়ি এই মজুমদাররাই ছিলেন ভাঙ্গর অঞ্চলের জমিদার। তাদের বিরাট প্রাসাদপ্রম জমিদার বাড়ির দূর্গা মণ্ডপে শুরু হয়েছিলো দূর্গা পুজো। তবে কবে এবং কোন জমিদারের আমলে এই বাড়িতে দূর্গা পুজো প্রথম শুরু হয় তা নিয়ে নিদ্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়না।এই বাড়িতে গোবিন্দের নিত্যপুজো হয় এবং দূর্গা পুজোর জন্য একজন আলাদা পুরোহিত রাখা আছে। আদতে বিষ্ণু উপাসক হলেও শক্তি সাধনা হয় তন্ত্র মতে যদিও আগের মতো এখন আর পশু বলী হয়না। প্রতি বছর জন্মাষ্টমীতে কাঠামো পুজোর পর শুরু হয় মূর্তি গড়ার কাজ।সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের একসাথে অংশগ্রহণ এই পুজোয় অন্য মাত্রা যোগ করে।বলা যায় এটাই এই পুজোর বৈশিষ্ট্য। দূর্গা পুজো সবাই এক সাথে আনন্দে মেতে ওঠেন।অতীতে সর্বদা লোকজনে গমগম করত মজুমদারদের এই বিশাল জমিদার বাড়ি।পুর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ মিলে তিন মহলার দ্বিতল বাড়ি ছিল মজুমদারদের। নাট মন্দির ছিলো অপূর্ব সুন্দর। বিশাল আকার দূর্গা মণ্ডপে হতো দুর্গাপুজো। সব কিছুরই এখন ভগ্নদশা। একটি মহলার অস্তত্বই বিলোপ হয়েছে। তবে দুটি মহলার দ্বিতল জমিদার বাড়ি এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবু নিয়ম মেনে প্রতি বছরই সাধারণ গ্রামবাসী ও জমিদার বাড়ির বর্তমান সদস্যরা মিলে দূর্গা পুজোর আয়োজন করেন।অষ্টমীর দিনে সবাই মিলে একসঙ্গে বসে হয় খাওয়াদাওয়ার রীতি সেই জমিদারির স্বর্ণ যুগ থেকে আজও চলে আসছে।ফিরে আসবো পরের পর্বে। অন্য কোনো বনেদি বাড়ির পুজোর ইতিহাস নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।