সাধারণত অম্বুবাচিতে দেবী পুজো নিষিদ্ধ তবে অম্বুবাচি নিবৃত্তির পর যখন শাস্ত্র মতে হোম যজ্ঞ ও দেবী আরাধনার আয়োজন করা হয় সেই সময়ে তন্ত্র মতে গ্রহের প্রতিকার ও হয় এবং সেই তিথি গ্রহ দোষ খণ্ডন ও বিভিন্ন তান্ত্রিক উপাচারের জন্য আদৰ্শ বলে ধরা হয়।আর মাত্র কয়েকটি দিন পরেই অম্বুবাচি। সারা দেশের মাতৃ মন্দির গুলিতে পরিলক্ষিত হবে কিছু বিশেষ রীতি নীতি। আমিও আমার এই অনুষ্ঠানে তাই দেবী মাহাত্ম নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি অম্বুবাচি নিয়ে কিছু লিখবো । যাই হোক শুরু করাযাক আজকের দেবী মাহাত্ম পর্ব।বাংলার কালী পুজো বেশ বৈচিত্র পূর্ণ। অনেক অলৌকিক ঘটনা ও প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী একেকটা কালী ক্ষেত্র। আজ এমন দুটি কালী পুজোর কথা লিখবো যেখানে দুটি বা জোড়া কালী মূর্তি একত্রে পূজিত হয়। আমতায় দুই কালী মূর্তি দুই বোন রূপে একসাথে পূজিতা হয়ে আসছেন বহু বছর ধরে। একজন মা ভদ্রকালী ও অন্যজন মা বিমলা। স্থানীয় এক বনেদি পরিবারের কুলদেবী এই জোড়া কালী।শোনা যায় প্রায় তিনশ বছর আগে এই পরিবারের এক বৃদ্ধা পাশ্ববর্তী নদীতে স্নান করতে গিয়েছিলেন এবং স্নানের পর তার দুই হাত ধরে নাকি দুই মা নদী থেকে উঠেছিলেন।এই মন্দিরে ডানদিকের বড়ো মা বা বড়ো বোন হলেন ভদ্রকালী আর তাঁর পাশে ছোট বোন হচ্ছেন মা বিমলা।মা এর মন্দিরে মূল অনুষ্ঠান হয় প্রতিবৎসরের ফাল্গুনের প্রথম শনিবার।এখানে দেবীর প্রিয় ভোগ মাছ পোড়া আর ভেড়ার মাংস। তাই দিয়েই হয় পুজো এবং প্রসাদ ও বিতরণ করা হয়।দ্বিতীয় জোড়া কালীর পুজোটি হয় বর্ধমানের কাটোয়ায়। সেখানে শর্মা পরিবার এক কালে ছিলো বাংলার নবাবদের স্নেহধন্য।এই পরিবারের এক সদস্য স্বপ্নাদেশ পেয়ে সাড়ে তিনশো বছর আগে কালীপুজো শুরু করেন। প্রথমে একটি মূর্তি পুজো হত। তারপর পরিবার ভাগ হওয়ার পর পারিবারিক অশান্তির জেরে একবছর পৃথকভাবে এক সদস্য কালীপুজো শুরু করেন। তখনই ঘটে বেশ কিছু অলৌকিক ঘটনা শোনা যায় একের পর এক বিপদ আসতে থাকে পরিবারে। তারপর একরাতে দেবী স্বপ্নাদেশে নাকি জানিয়েছিলেন একই বেদিতে জোড়া প্রতিমার পুজো করতে হবে। তখন থেকেই একই মন্দিরে জোড়া প্রতিমার পুজো হয়ে আসছে।আগে বলী প্রথা থাহলেও একবার অদ্ভুত ভাবে বলী প্রদত্ত মাংস থেকে কটু গন্ধ বের হওয়ার ফলে কুলো পুরোহিত বিধান দেন যে মা আর বলী চাননা তাই বন্ধ হয় বলী।বর্তমানে বৈষ্ণব মতে পুজো হয়।দেবী মাহাত্ম নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্ব গুলিতে । সঙ্গে থাকবে অম্বুবাচি নিয়ে অনেক তথ্য।এবং মন্দির রহস্য। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্মা – দেবী মৌলিক্ষা
সামনেই অম্বুবাচি। এই পবিত্র সময়ে বাংলা তথা গোটা রাজ্যর প্রতিটি মাতৃ মন্দিরে কিছু বিশেষ রীতি নীতি পালন করা হয়। শাস্ত্র মতে পুজো অম্বুবাচি চলা কালীন পুজো বন্ধ থাকলেও এই সময় কালী কথার প্রচার ও দেবী মাহাত্মা শোনার জন্য অতি উত্তম সময়। তাই ধারাবাহিক ভাবে চলে আসা দেবী মাহাত্মা পর্ব গুলি চলতে থাকবে। পাশাপাশি অম্বুবাচি এবং কালী তত্ত্ব নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আপনাদের সামনে নিয়ে আসবো। আজকের পর্বে দেবী মৌলিক্ষা ও তার মাহাত্মা।বাংলা যখন অবিভক্ত ছিলো তখন বাংলা বিহার সীমান্তে অবস্থান করতেন মাতা মৌলক্ষী তবে বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের অন্তর্ভুক্ত মলুটি গ্রাম আর এই গ্রামেই রয়েছে দেবী মৌলিক্ষার মন্দির। ‘মৌলি’ অর্থে মাথা এবং ‘ইক্ষা’ শব্দের অর্থ দেখা।দেবীর মূর্তি বলতে শুধু মস্তক-ই দেখতে পাওয়া যায়।খুব সম্ভবত এই কারণেই দেবী এখানে মৌলিক্ষা নামে পরিচিতা।দেবী মূর্তিটি ল্যাটেরাইট পাথর দ্বারা নির্মিত এবং দেবী মৌলিক্ষার মন্দিরটি অতি প্রাচীন এবং টেরাকোটার কাজের অপূর্ব নিদর্শন এই মৌলিক্ষা দেবীর মন্দির।দেবী মৌলিক্ষার সাথে তারা পিঠের দেবী তারার রয়েছে গভীর সম্পর্ক। দেবী মৌলক্ষীকে তারা পিঠের তারা মায়ের বোন বলে মনে করা হয় করা হয়।অনেকেই মৌলিক্ষা মাকে ছোটোবোন এবং তাঁরা মাকে বড়োবোনও বলে ডাকেন। শুধু তাই নয় তারাপীঠের বামা ক্ষেপা মৌলিক্ষা মায়ের কাছেই প্রথম সিদ্ধি লাভ করেন বলেও শোনা যায় তিনিই ছিলেন এই মন্দিরের প্রথম পুরোহিত পরবর্তীতে বামাখ্যাপা তারাপীঠ চলে যান । মৌলীক্ষা মন্দিরে বামদেবের যে সাধনা কক্ষটি রয়েছে সেখানে আজও বামদেবের ত্রিশূল ও বামদেব ব্যবহৃত বৃহৎ শঙ্খটি সেই ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে চলেছে।আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্দশী তিথি তারামায়ের আবির্ভাব তিথি হিসেবে পালিত হয় এবং ওই দিন তারাপীঠে মা তারাকে পশ্চিমদিকে মুখ করে বসানো হয়। কারণ মলুটি তারাপীঠের পশ্চিমে। বছরের একটি দিনে দুই বোন মুখোমুখি হন এবং নিজে দের মধ্যে গল্প গুজব করেনবলে মানুষের বিশ্বাস। ঠিক কিভাবে এবং কবে থেকে এই প্রথার সূচনা সেই নিয়েও একটি অলৌকিক ঘনার উল্লেখ পাওয়া যায়।কথিত আছে মলুটির রাজা রাখরচন্দ্র তারা মায়ের সামনে একবার আরাধনায় বসেন। সেই সময়ে মন্দিরের পুরোহিত ও পান্ডারা বাঁধা দেন রাজাকে আসন থেকে তুলে পুজোপাঠ বন্ধ করে দেন। রাজা মায়ের প্রতি অভিমান করে চলে এসে দ্বারকা নদের পশ্চিম পাড়ে ঘট প্রতিষ্ঠা করে মায়ের পুজো করে মলুটি গ্রামে ফিরে যান।সেই রাতেই প্রধান পুরোহিতকে তারা মা স্বপ্ন দিয়ে বলেন রাজা রাখরচন্দ্র আমার ভক্ত, সে অভিমান করে চলে গিয়েছে। এবার থেকে পুজোর সময় আমার মুখ যেন পশ্চিমমুখে মলুটির কালীবাড়ির দিকে হয়। সেই থেকে বিশেষ এই তিথিতে তারাপীঠে মা তারাকে পশ্চিমমুখী বসিয়েপুজো করা হয়।এমন অনেক অজানা আধ্যাত্মিক ইতিহাস এবং দেবী মাহাত্ম নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্ব গুলিতে । সঙ্গে থাকবে অম্বুবাচি নিয়ে অনেক তথ্য। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্ম – বর্ধমানের জীবন্ত কল্যাণী কালীর কথা
বাংলার কালী মন্দিরগুলিকে কেন্দ্র করে যেসব অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় তার সবই যে বহু প্রাচীন কালে ঘটেছে তা নয়। আজও অনেক অবিশ্বাস্য এবং অলৌকিক ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। অনেকে জনশ্রুতি বা প্রচলিত কিংবদন্তী বা কাল্পনিক ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেও যারা আস্থাশীল ও শ্রদ্ধাশীল তাদের কাছে সবই সত্যি।এমনই এক কালী মন্দিরের কথাই আজকের পর্বে লিখবো যেখানে দেবীর নিত্য লীলা দর্শন হয়।
তবে সবার আগে বলে রাখি যে অলৌকিক ঘটনা গুলির কথা এখন বলতে চলছি সেগুলি মূলত স্থানীয় দের কাছে শোনা যার বেশি ভাগই লোক মুখে প্রচারিত জনশ্রুতি বা প্রচলিত কিংবদন্তী।
বর্ধমানের কল্যাণী কালী মন্দিরের দেবী কালী ভক্তদের কাছে জীবন্ত কালী নামেই বেশি পরিচিত।
কারণ তাঁদের বিশ্বাস দেবী কল্যাণী আজও জীবন্ত। তিনি কালীরূপে এই মন্দিরে বিরাজিতা।
তিনি আছেন মানেই, সব আছে। সব নিরাপত্তা আছে। ভয় এলে তা দূরে চলে যেতে বাধ্য।
এবং এই বিশ্বাস বা শ্রদ্ধা একদিনে আসেনি
এসেছে বহু অলৌকিক ঘটনার মধ্যে দিয়ে। এসেছে দেবীর ভক্তদের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি এবং নানাবিধ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে।
এই অঞ্চলে কান পাতলেই শোনা যায় এক ঘটনা এই মন্দিরে এক চোর চুরি করেছিল। তবে আশ্চর্য জনক ভাবে প্রণামীর অর্থ সে আর নিয়ে যেতে পারেনি। পথেই আচমকা সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। চোর হলেও সে নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও কোনো রকমে মন্দিরে ফিরে এসে দেবী কল্যাণীকে তার প্রণামীর অর্থ ফিরিয়ে দেয় এবং ক্ষমা চেয়ে নেয় দেবীর কাছে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও পর মুহূর্তে সেরে যায় ওই চোরের রোগ । সে নিশ্চিন্তে ফিরে যায় সুস্থ শরীর নিয়ে।
এমন অদ্ভুত জনশ্রুতি আরো অনেক আছে। শোনা যায় একবার এক মহিলা কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। যখন তাঁর মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। সেই সময়ে তিনি দেবীর কাছে নিজের জীবনভিক্ষা করেন দয়াময়ী কল্যাণী কালী সেই আবেদন যেন কান পেতে শুনেছিলেন ।দেখা যায় হটাৎ সেরে গিয়েছেন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ওই মহিলা। পরবর্তীতে তিনি সুস্থ্য শরীরে বহু দিন জীবিত ছিলেন।
দেবী কল্যাণী যেমন দয়াময়ী তেমনই আবার তিনি
ক্রোধ ও করেন। দেবীর ভক্তরা একটা ঘটনার কথা বলেন। গল্পটি এই রকম – একবার দেবী জীবন্ত কালীর ছবি মোবাইলে বন্দি করেছিলেন কোনো এক ভক্ত সেই সময় তিনি হটাৎ জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে দেবীর ছবিতে যখন প্রণাম করেন তখন বুঝতে পারেন তাঁর জ্বর আচমকা উধাও হয়ে গিয়েছে।আজও অনেক ভক্ত অনুভব করতে পারেন যে দেবী তাঁদের আশপাশেই আছেন। আশপাশেই ঘোরাঘুরি করছেন। এভাবেই এই মন্দিরের দেবী কালী যেন বুঝিয়ে দেন, তিনি জড় বিগ্রহ নন। তিনি জীবন্ত।প্রয়োজন শুধু আস্থা আর তার প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পন।তিনি পরম দয়াময়ী এবং শুন্য হাতে কাউকে ফেরান না।
কথায় বলে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহু দূর।সবই বিশ্বাস এর ব্যাপার।বিশ্বাস ও আস্থা যেখানে প্রাধান্য পায় সেখানে বিজ্ঞান বা যুক্তিবাদের প্রশ্ন না তোলাই ভালো। তাই কোনো কুসংস্কার বা অন্ধ বিশ্বাসকে পশ্রয় না দিয়ে শুধু জনশ্রুতি গুলি যেমন প্রচলিত আছে তেমন তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।
ফিরে আসবো পরের পর্বে। দেবী মাহাত্ম নিয়ে ধরাবাহিক আলোচনা চলতে থাকবে। আগামী দিনে এমন অনেক অজানা অবিশ্বাস্য ঘটনা জানতে পারবেন। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।
ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্ম – জরাসন্ধ কালীর ইতিহাস
আজ আপনাদের বাংলার এমন এক প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক কালী মন্দিরের কথা বলবো যার সাথে জড়িয়ে আছে মগধরাজ জরাসন্ধর নাম আবার রানী অহল্য বাই এবং মহারাজা নন্দ কুমারের সাথেও এই মন্দিরের সম্পর্ক আছে।তখন বর্তমানের বিহার ছিল ইতিহাসের মগধ ক্ষেত্রকষ্টিপাথরে তৈরি পদ্মাসনা কালীমূর্তিকে মগধ রাজপুজো করতেন।তার নামেই নাম হয় জরাসন্ধ জরাসন্ধের মৃত্যুর পর সেই মূর্তি স্থান পায়পাতালে থেকে যায়।কেটে যায় বহু বছর। পরবর্তীতে রানি অহল্যাবাই কিছুদিন মগধে থাকাকালীন স্বপ্নাদেশে পাতালে শিবমূর্তির সন্ধান পান।তার নির্দেশে একটি নিদ্দিষ্ট স্থানে শুরু হয় খনন। সেখান থেকে উদ্ধার হয় জরাসন্ধের এই প্রাচীন কালী মূর্তি।দেবী মূর্তিটি কোষ্টি পাথরের তৈরী সাপের কুণ্ডলীর উপর পদ্মাসনে বসেন দেবী। মাথায় তার সহস্র নাগের ফনা। হাতে পায়ে সাপের নকশা।মূর্তিটি যেহেতু মগধে মিলেছে এবং সেই সময়ে ওই স্থান কাশী রাজের অধীনে তাই রানি অহল্যা সেটি তৎকালীন কাশীরাজ চৈতসিংকে দান করেন। সেই সময়ে ব্রিটিশ শাসনধীন ভারতের বড়লাট অর্থাৎ তৎকালীন ইংরেজ শাসক ওয়ারেং হেস্টিংসের নজরে পড়ে মূর্তিটির উপরে তার মনেইংল্যান্ডের মিউজিয়ামে সেটি নিয়েযাওয়ার বাসনা জাগে। সেকথা জানতে পেরে কাশীরাজ চৈত সিং তখন মূর্তিটি বাঁচাতেসেটিকে কাশীর দশাশ্বমেধ ঘাটে গঙ্গার পবিত্র জলে লুকিয়ে দেন।এক কথায় পাতাল থেকে খুঁজে আনা মূর্তির সলীল সমাধি ঘটে।আবার কিছুকাল অতিক্রান্ত হয়। তখন মহারাজ নন্দকুমার বাংলার দেওয়ান।তিনি কাশীধামে যান। তীর্থ করতে এবং গঙ্গাবক্ষ থেকে কালী মূর্তি তুলে আনার স্বপ্নাদেশ পান।আবার উদ্ধার হয় মূর্তিসেই মূর্তি তিনি নলহাটির এই আকালীপুরে এনে প্রতিষ্ঠা করেন এবং পুজোর ব্যাবস্তা করেন।আজও এই আকালীপুরের মন্দিরে পুজো হয় দিনের বেলা। সমস্ত তান্ত্রিক নিয়ম অনুসরণ হয় । তবে সব কিছুই দিনের বেলা। রাতে মা নৈশলীলা করেন। তাই নিঝুম অন্ধকার থাকে এবং পরিবেশ থাকে নিস্তব্ধ।ফিরে আসবো পরের পর্বে। দেবী মাহাত্ম নিয়ে ধরাবাহিক আলোচনা চলতে থাকবে।বাকি আছে বহু এমন অলৌকিক অ ঐতিহাসিক দেবী মাহাত্ম নিয়ে আলোচনা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দেবীমাহাত্ম – মানিকোড়ের ডাকাত কালী পুজো
বাংলার ডাকাতদের কালী পুজো নিয়ে বহু কিংবদন্তী প্রচলিত আছে যার কিছু কিছু আমি আপনাদের আগেই বলেছি। আজও একটি প্রসিদ্ধ ডাকাত কালীর পুজোর কথাই লিখবো যা অবস্থিত ভারত বাংলা দেশ সীমান্তের একটি প্রত্যন্ত এবং ছোট্ট গ্রামে। গ্রামটির নাম মান কোড়।কালী পুজোর রাতে অমাবস্যার তিথিতে আজও দেবী মাতাকে শিকলে বেঁধে এবং সামনে সাদা কাপড় ঝুলিয়ে প্রথম পাঠাবলি দেওয়া হয়। আর যতক্ষণ পাঠাবলির রীতি চলবে ততক্ষণ জ্বলবে দাউদাউ করে অসংখ্য মশাল । অখন্ড ভারত থাকাকালীন ডাকাতদের হাতে শুরু হওয়া এই পুজোর আজও প্রাচীন নিয়ম নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছেন হবিবপুর ব্লকের মানিকোড়া কালী পুজো কমিটির সদস্যরা। মালদার আদিবাসী অধ্যুষিত হাবিবপুর ব্লক ।পুজোড় বয়স প্রায় প্রায় ৫০০ বছর।এই কালীপুজো নিয়ে অনেক অদ্ভুত এবং অলৌকিক ঘটনা শোনা যায় । শোনা যায়পুজোর সময় আশ্চর্যজনক ভাবে দেবী রূদ্র মূর্তি ধারণ করেন। দেবী কালী এখানে ঘোর কৃষ্ণ বর্ণের নরমুন্ডধারিণী তার দিগম্বরী ও এলো কেশি মূর্তি দেখলেই ভক্তি ও শ্রদ্ধা জাগরিত হয় ভক্তদের মধ্যে।প্রতি অমাবস্যায় বিশেষ করে কালী পুজোর রাতে আজও দেবী মাতাকে শিকলে বেঁধে এবং সামনে সাদা কাপড় ঝুলিয়ে পাঠাবলি দেওয়া হয় এবং বিভীন্ন তান্ত্রিক উপাচার পালন করা হয়।যতক্ষণ এই সব উপাচার চলে ততক্ষণ দাউদাউ করে অসংখ্য মশাল জ্বলে চার পাশে।আঞ্চলিক ইতিহাস থেকে জানা যায় ব্রিটিশ আমলে দুর্ধর্ষ এক ডাকাত দল মানিকোড়া গ্রামে এসে জঙ্গলের মধ্যে দেবী কালীর পুজো শুরু করেন। সেই সময়ে এইখান দিয়ে বয়ে যেতো পুনরভবা নদী সেই নদী দিয়ে যেসব বণিকেরা বাণিজ্য করতে যেতেন এবং তাদের ওপর লুঠপাট চালাতো ডাকাত দল।তারপর তন্ত্র মতে চলতো মাতৃ সাধনা। সেই মাতৃ সাধনা আজও চলছে সমান ভাবে।দেবী মূর্তিকে বেঁধে রাখার কারন পাঠাবলির সময় সামনের দিকে অদ্ভুত ভাবে কিছুটা ঝুঁকে যায় মায়ের রুদ্রমূর্তি। মাকে শান্ত করার জন্য ভক্তেরা দেবী মাতাকে পিছনে শিকল দিয়ে কিছুটা সময়ের জন্য বেঁধে রাখেন।অন্তত প্রত্যক্ষদর্শী এবং প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা জনশ্রুতি তাই বলছে।প্রথম পাঠাবলির সময় সামনে সাদা কাপড় টাঙিয়ে দেওয়া হয়। আর চতুর্দিকে জলে মশাল। এমন ভাবেই যুগ যুগ ধরেই মানিকোড়া গ্রামের দেবী কালীমাতা পূজিত হয়ে আসছেন।মানকোড়েড় ডাকাত কালী খুবই জাগ্রতা এবং সব ভক্তের মনোস্কামনা পূর্ণ করেন বলে বিশ্বাস তাই বহু মানুষ আসেন পুজো দিতে। প্রার্থনা জানাতে।ফিরে আসবো পরের পর্ব নিয়ে। থাকবে এমনই অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর কালী পুজোর কথা। থাকবে নতুন কোনো মন্দিরের রহস্য। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্ম – পাতুন গ্রামের জ্যান্ত কালীর পুজো
বাংলায় এমন কিছু কালী মন্দির আছে এমন কিছু দেবী মূর্তি আছে যেগুলি নানা কারণে বেশ বিখ্যাত বা আলোচিত আবার এমন অনেক মন্দির বা শতাব্দী প্রাচীন পুজোও আছে যার জনপ্রিয়তা স্থানীয় অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ সেই ভাবে প্রচার মাধ্যমে আসনি। এমনই এক কালী পুজো হয় বর্ধমানের পাতুন নামে ছোট্ট একটি গ্রামে।আজকের পর্বে এই পুজো এবং পুজোর সাথে জড়িত কিছু অদ্ভুত প্রথা নিয়ে লিখবো ।এই গ্রামে প্রায় চারশো বছর ধরে পূজিতা হয়ে আসছেন জ্যান্ত কালী। জ্যান্ত কালী মানে সত্যি সত্যি মানব রুপী কালী অর্থাৎ কোনও মূর্তি নয় মানুষই কালীর সাজে সেজে থাকেন এখানে । তাঁকে ঘিরেই চলে পূজা অর্চনা এবং যাবতীয় তান্ত্রিক উপাচার। শুনতে অদ্ভূত লাগলেও এই গ্রামের মানুষের কাছে এটা স্বাভাবিক রীতি।এখানে নেই কোনও কালী মন্দির আছে উৎসব এবং অদ্ভুত সব প্রথা। মূল উৎসব অনুষ্ঠিত হয়চৈত্র সংক্রান্তিতে এই সময়ে মা কালীর বেশে বহুরূপী গ্রামে ঘুরে ঘুরেই করেন গাজনের নাচ। সেই সময়ে ওই শোভা যাত্রায় নানা রকম লোকগান এবং মন্ত্র উচ্চারণ করা হয়। মা কালীর এক হাতে থাকে খাঁড়া বা তরোয়াল এবং অন্য হাতে থাকে কাগজ বা মাটির তৈরি নরমুণ্ড।অদ্ভুত সেই রূপ এবং শোভা যাত্রা দেখতে আসেন বহু মানুষ।তবে একটি নিদ্দিষ্ট পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কেউ দেবী কালীর মুখোশ পড়ে কালী সাজতে পারেননা। এই মুখোশও রাখা থাকে ওই পরিবারের কাছেই। মুখোশকে নিত্য পুজো করা হয়। এবং বছরের এই নিদ্দিষ্ট সময়ে মুখোশ জনসমক্ষে আনা হয়।গ্রামের বাকি পরিবারের সদস্যরাও অংশ নেন তবে তারা সাজেন কালীর চ্যালাচামুণ্ডা আর একজন সাজেন শিব।স্থানীয় রা বলেন পুজোর কিছু বিশেষ সময়ে এবং বিসর্জনের সময়ে একজন ব্যক্তিকে দেবীকে ধরে রাখতে হয়। কারন দেবীর মুখোশ পড়ার পরে সেই দেবীর সাজে সজ্জিত মানুষটির মধ্যে অদ্ভুত শক্তি সঞ্চারিত হয় যা যেকোনো সময়ে নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যেতে পারে এবং কোনো বিপত্তি ঘটে যেতে পারে। তাই সতর্ক থাকতে হয়।গভীর রাতে দেবীর পুজো অনুষ্ঠিত হয়। নিয়ম নিষ্ঠা মেনে সব রীতি পালিত হয়।ঢাকের শব্দ। ধুনীর ধোঁয়া। নাচ গান। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত এবং মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি হয়।এমন কতই না অদ্ভুত সব পুজো এবং রীতি নীতি আছে সারা বাংলা জুড়ে। রয়েছে কতো রহস্যময় দেবী মন্দির।আবার এমন কোনো পুজো বাদেবীর মাহাত্ম নিয়ে ফিরে আসবো যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্ম- সাধক কমলা কান্তের কালীবাড়ি
বাংলার মাটিতে জন্ম নেয়া সিদ্ধ মাতৃ সাধকদের মধ্যে অন্যতম সাধক কমলাকান্ত। তার সাধন পীঠ আজ কমলা কান্তের কালী বাড়ি নামে প্রসিদ্ধ। আজকের পর্বে আসুন জেনে নিই এই মহান সাধক ও তার কালী বাড়ি সম্পর্কে কিছু অদ্ভুত এবং ঘটনা।
একবার এই মন্দিরের প্রতিমায় বেলকাটা ফোঁটানোয় বেরিয়ে এসেছিল রক্ত। সেই অলৌকিক কাণ্ড করে সবাইকে হতভম্ব করে দিয়েছিলেন সাধক কমলাকান্ত। আজও যারা এই বিখ্যাত কালীবাড়িতে যান সেই কথা স্মরণ করেন।
শোনা যায় সাধক কমলাকান্ত এক অমাবস্যার দিনে বর্ধমানের মহারাজাকে পূর্ণিমার চাঁদ দেখিয়েছিলেন।তার অলৌকিক ক্ষমতায় প্রসন্ন হয়ে মহারাজ তাকে রাজ গুরুর পদ দিয়েছিলেন।
সাধক কমলা কান্তের মন্দিরে রয়েছে নর্মদেশ্বর শিব। যাঁরা সেই শিবলিঙ্গের ছবি তোলেন, তাঁদের ছবিতে শিবলিঙ্গের সঙ্গেই নাকি এক আবছা রক্তমাখা খাঁড়ার ছবি ওঠে। যদিও বাস্তবে শিবলিঙ্গের পাশে কোনও রক্তমাখা খাঁড়া থাকে না। যদিও এই দাবীর সত্যতা প্রমান করা সহজ নয়। তবু এই জনশ্রুতিতে বিশ্বাস করেন অনেকেই।
সাধকের লোকান্তরিত হওয়া নিয়েও একটি অলৌকিক ঘটনা শোনা যায়।বিষধর সর্প রূপে স্বয়ং মহাকাল নাকি সাধকের বুকে এক ছোবল দেয় এবং সেই কালকেউটের ছোবলেও তার ধ্যানভঙ্গ হল না তবে মুহুর্তের মধ্যে ঘুচে গেল অন্ধকার। ছিন্ন হল সব মায়াজাল। মাতৃ সাধক ফিরে গেলেন মাতৃক্রোড়ে।চীরনিদ্রায়।
আবার অন্য একটি জলনশ্রুতি মতে সাধক কমলাকান্ত শেষ সময়ে গঙ্গায় যেতে চাননি। তখন দেখা গিয়েছিল, এই কালীবাড়ির মাটি ফুঁড়ে আচমকা উঠে এসেছিল জল। যা আসলে গঙ্গা বলেই বিশ্বাস ভক্তদের। সেই জল যে স্থান থেকে উঠে এসেছিল। আজও সেই জলাধার কুয়োর মত বাঁধিয়ে রাখা হয়েছে কমলাকান্তের কালীবাড়িতে।
এই মন্দিরে পঞ্চমুণ্ডির আসনে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন কমলাকান্ত। তাঁর ইচ্ছা ছিল, মৃত্যুর পর মায়ের চরণতলে তাঁকে ঠাঁই দেওয়া হয় এবং মায়ের থেকে তাঁকে যেন কোনওভাবেই আলাদা না করা হয়। সেই ইচ্ছানুসারে, তাঁর সমাধির উপরই প্রতিষ্ঠা করা হয় মায়ের মূর্তি ও মন্দির। কমলাকান্তকালী বাড়িতে ধাতুর তৈরি এক অনিন্দ সুন্দর মূর্তি আছে। জা আমি নিজে দর্শন করেছি। অপূর্ব সেই অনুভূতি।
ফিরে আসবো পরের পর্বে দেবী মাহাত্মর নতুন পর্ব নিয়ে।চলবে মন্দির রহস্য।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্ম : সাধক রাম কানাইয়ের বামা কালীর পুজো
সিউড়ির ইন্দ্রগাছা গ্রামের বামা কালী রাম কানাইয়ের কালী নামে সু প্রসিদ্ধ। এই দেবীর পুজোর রয়েছে কিছু অদ্ভুত রীতি নীতি এবং সাধক রামকানাইয়ের অলৌকিক অভিজ্ঞতা এবং তার মাতৃ সাধনা আজও আলোচিত হয় বীরভূমের এই অঞ্চলে। পুরোটা জানতে হলে পড়তে হবে।
শোনা যায়। স্থানীয় হরকুনার গভীর জঙ্গলে সাধনা করতে গিয়ে মায়ের সাক্ষাৎ পান সাধক রামকানাই। মায়ের জীবন্ত সাক্ষাৎ সেই রূপ তিনি থালায় এঁকে নেন। জীবন্ত মায়ের সেই রূপের ছবি দেখে বানানো হয় মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তি। পুজোর জন্য লেখেন প্রার্থনার মন্ত্র। যা আজ লোকমুখে রাম কানাইয়ের পুঁথি নামে পরিচিত।
সাধক রাম কানাইয়ের গোপন পুঁথির গুপ্ত
নিয়ম মেনেই পুজো হয় শতাব্দী প্রাচীন ইন্দ্রগাছার কালীর। যে থালায় মায়ের জীবন্ত রূপ দেখে ছবি এঁকেছিলেন, সেই থালা বহু গোপনে সযত্নে রেখে দিয়েছে ইন্দ্রগাছায়। প্রায় ৫০০ বছর ধরে পুজিত হয়ে চলেছেন এই দেবী ।
গায়ের রং চক্ষুদান হয় কালীপুজোর তিথিতে গভীর রাতে তারপর সেই মূর্তি কাঁধে চাপিয়ে গঠন মন্দির থেকে পুজো মন্দিরে নিয়ে আসা হয়।
শতাধিক ভক্তের কাঁধে চড়ে গঠন মন্দির থেকে পূজার মন্দিরে পাড়ি দেযার এই দৃশ্যা দেখতে আসেন বহু মানুষ।প্রায় ১৩ ফুটের এই বামা কালীর মূর্তিকে ৪০ ফুট বড় লাল কাঠের ওপর চাপিয়ে কাঁধে করে নিয়ে আসা হয় মূল মন্দিরে। প্রতিবার দীপান্বিতা অমাবস্যায় পুজোর পর ভাইফোঁটার দিন প্রতিমার বিসর্জন হয়। ৫০০ বছর ধরে চলা এই রীতির আজও কোনও পরিবর্তন হয়নি।
ফিরে আসবো পরের পর্বে দেবী মাহাত্মর নতুন পর্ব নিয়ে। জানাবেন ধারাবাহিক এই আলোচনা আপনাদের কিরকম লাগছে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
দেবী মাহাত্ম- রঙ্কিনী দেবীর কথা
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি বিখ্যাত ছোট গল্প হলো ‘রঙ্কিণী দেবীর খড়গ’ হয়তো আপনারা অনেকেই অলৌকিক এই গল্পটির বেতার নাট্যরূপ শুনেছেন। বাস্তবেই রয়েছে এই মন্দির এবং তা অবস্থিত জামশেদপুরের কাছে এক পাহাড়ি উপত্যকায়।এই মন্দিরকে ঘিরে থাকা কিছু অলৌকিক ঘটনা বা জনশ্রুতি নিয়ে আজকের
পর্ব।
জনশ্রুতি অনুসারে মাতা রঙ্কিণী এই অঞ্চলের বনে জঙ্গলে বাস করতেন এবং তিনি এই দুর্গম অরণ্যের রক্ষাকতৃ ছিলেন।স্থানীয় আদিবাসীরা তাকে খুব মান্য করতো। তবে তার মন্দির ও মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয় অনেক পরে। শোনা যায় একবার এক স্থানীয় আদিবাসির মেয়ে সন্ধ্যার পর জঙ্গলে পথ হারায় এবং এক অপদেবতার খপ্পরে পরে। দেবী রঙ্কিনি তখন আবির্ভূত হন এবং মেয়েটিকে রক্ষা করেন।
তারপর জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে যান।সেই রাতেই ঐ মেয়েটির বাবাকে দেবী রঙ্কিণী স্বপ্নাদেশ দিয়ে দেবীর একটি মন্দির তৈরি করতে বলেন।
মন্দির প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে এই জনশ্রুতি প্রচলিত থাকলেও ঠিক কোন সময়ে মূল মন্দিরটি তৈরি হয়েছে তা জানা যায়না । তবে মন্দিরের বর্তমান যে রূপ আমরা দেখতে পাই, তা তৈরি হয়েছে দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পর । অনেকের কাছে মা রঙ্কিনী দেবী কালীর একটি রূপ আবার পূর্ব ভারতের বিভিন্ন উপজাতির কাছে তিনি তাদের আরাধ্যা দেবী।
ঘাটশিলায় বসবাস করার সময়ে সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় এই মন্দির সম্পর্কে জানেন ও দেবী রঙ্কিনী সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন
প্রসঙ্গত বলে রাখি ঘাট শিলায় শ্রদ্ধেয় বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের বাসস্থান আজও তার স্মৃতি বহন করে চলেছে।
যাই হোক আবার দেবী রঙ্কিনীর প্রসঙ্গে ফেরা যাক। শোনা যায় এই মন্দির থেকে কেউ আজ অবধি খালি হাতে ফেরেনি। মা রঙ্কিনী সকলের মনস্কামনা পূর্ণ করেছেন। পাহাড়ি দুর্গম রাস্তা দিয়ে পৌছাতে হয় দেবীর মন্দিরে।মন্দিরের গর্ভগৃহে কোনো মূর্তি নেই। একটি পাথরকে দেবীরূপে পূজা করা হয়।মূল মন্দিরের দুই পাশে রয়েছে আরও দুটো মন্দির। ডানপাশে রয়েছে শিবমন্দির এবং বামপাশের মন্দিরে রয়েছে গণেশের মূর্তি।
প্রায় রোজই অসংখ্য তীর্থ যাত্রী এখানে আসেন পুজো দেন। নিজেদের মনোস্কামনা জানান এবং সর্বোপরি দেবী রঙ্কিনি ও তার মন্দির দর্শন করে ধন্য হন।
ফিরে আসবো আরো এমন সব অজানা ও রহস্যময় মন্দিরের কথা ও দেবী মাহাত্ম নিয়ে আলোচনায়। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
মন্দির রহস্য – বুড়িমার মন্দিরের রহস্য
তেহট্টর কাছে ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া এক ছোট্ট গ্রাম ইলশেমারিতে আছে এক অদ্ভুত মন্দির যে মন্দিরে কালী নয় দূর্গা নয় বা দেবীর কোনো পরিচিত রূপের পুজো হয়না তার বদলে পুজো হয় এক বৃদ্ধার মূর্তির। স্থানীয় দের কাছে
তিনি পরম শ্রদ্ধার বুড়িমা। কিন্তু কে এই বুড়ি মা আর কেনই বা তার পুজো করেন স্থানীয়রা? সেই কথাই বলবো আজকের মন্দির রহস্য পর্বে।
ঘটনার সূত্রপাত দেশ ভাগ পরবর্তী সময়ে।
ছিন্নমূল কিছু উদ্বাস্তু পরিবারকে ইলশেমারীতে জমি দেওয়া হয়েছিল বসবাসের জন্য।তখন এখানে জমি মানে ঘন শেওড়ার জঙ্গল।
সরকারি উদ্যোগে বেশিরভাগ জঙ্গল কেটে
ফেলে বা গাছ পালা পোড়ানো গেলেও একটি জায়গায় জঙ্গল পোড়ানো দূরের কথা গাছই কাটা যাচ্ছিল না। অনেক চেষ্টাতেও মাঝের একটু জঙ্গল না কাটতে পেরে শেষ পর্যন্ত আর গাছ কাটতে সাহস করেননি লোকজন।সেই সময় প্রথম দেখা দেন বুড়িমা। শোনা যায় রাতে ওই জঙ্গল থেকে নাকি লাঠি হাতে সেই বৃদ্ধাকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যেত মাঝে মাঝেই। কাছে গেলেই নাকি সেই মূর্তি উধাও।মনে করা হতো তিনিই ওই অরণ্য বা গাছেদের রক্ষাকতৃ। তার পর আর কেউ সেখানে গাছ কাটার চেষ্টা করেনি। শুরু হয় মানুষ ও প্রকৃতির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।
সৌজন্যে বুড়িমা।প্রথম দিকে বিষম ভয় পেয়ে ওই বৃদ্ধাকে কোনও অলৌকিক দেবী বলেই ভেবে নেয় গ্রামের মানুষ। পরে সেই ভয় ভক্তিতে পরিবর্তিত হয়।মূর্তি গড়ে শুরু হয় ওই বৃদ্ধার পুজো।
পরে মন্দির ও তৈরী হয়।
গ্রামের মানুষের আশা ভরসার স্থান হয়ে ওঠে বুড়িমার মন্দির এমন ও শোনা যায় যে একটা
সময় বৃষ্টি না হওয়ায় চাষবাস বিপন্ন হলে এই বুড়িমাকে পুজো দিয়েই নাকি বৃষ্টি পেয়েছিলেন গ্রামের চাষীরা। নাহলে খরা দেখা দিতো।
জনশ্রুতি আছে এক সময় রেলওয়ের তরফ
থেকে মন্দিরটি সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হলে অলৌকিক কোনো শক্তির প্রভাবে তা সম্ভব হয়নি বাধ্য হয়ে ঘুরিয়ে দিতে হয় রেলপথই। পরে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ মন্দিরটি সংস্কারও করে দেন।
বুড়িমার মন্দির প্রাঙ্গনে বহু পুরনো একটি অশ্বত্থ গাছও রয়েছে এবং এই গাছেরও রয়েছে আলাদা ইতিহাস। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস এই অশ্বত্থ গাছ কাটলে রক্তপাত হয়। কেউ কাটার চেষ্টা করলে তার ক্ষতি হয়। তাই গাছটিও মানুষের শ্রদ্ধার বস্তু।
আগে বৃদ্ধার মৃন্ময়ী মূর্তিই পরবর্তীতে সিমেন্টের মূর্তি হয়।আজও গ্রামে বুড়িমার পুজো শেষ হলে তবেই অন্য দেব-দেবীরা পুজো পান।প্রত্যেক অমাবস্যা এবং বিশেষ বিশেষ তিথিতে বহু মানুষ এখানে আসেন বুড়িমার পুজো দেখতে এবং
তার আশীর্বাদ নিতে।স্থানীয় মানুষের কাছে
তাদের বুড়িমা সাক্ষাৎ জগৎজননী।
সামনেই ফল হারিণী অমাবস্যা।সেই উপলক্ষে
দেবী মাহাত্ম এবং মন্দির রহস্য নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা চলতে থাকবে। তবে শুধু দেবী প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা শোনা নয় দেবীর অলৌকিক উপখ্যান জানা নয় নয়।
এই তিথির গুরুত্ব তখনই সম্পূর্ণ রূপে উপলব্ধি করতে পারবেন যখন এই তিথিতে গ্রহ দোষ খণ্ডন করিয়ে জীবনের জটিল সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন।ফিরে আসবো পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।