Home Blog Page 75

কালী কথা – শ্যাম নগরের ব্রহ্মময়ী দেবী

সামনেই দীপান্বিতা অমাবস্যা। দীপাবলী উপলক্ষে শুরু করছি কালী কথার নতুন পর্ব যা চলবে ধারাবাহিক ভাবে।বিগত পর্বগুলিতে কিছু প্রসিদ্ধ এবং জাগ্রত দেবী মন্দিরের কথাআমি আপনাদের সামনে তুলে ধরছি|আজকের পর্বে শ্যাম নগরের অন্যতম প্রাচীন ব্রহ্মময়ী কালী মন্দির নিয়ে।উত্তর চব্বিশ পরগনার শ্যামনগর স্টেশনের কাছেই রয়েছে একটি প্রাচীন গ্রাম যার নাম মুলজোড়া|এই গ্রামেই অবস্থিত প্রসিদ্ধ ব্রহ্মময়ী কালী মন্দির|অবশ্য এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কলকাতার পাথুরিয়াঘাটার জমিদার গোপীমোহন ঠাকুর|এই মন্দির প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িত আছে এক অলৌকিক কাহিনী|প্রাচীন জনশ্রুতি অনুসারে গোপীমোহন ঠাকুরের মেয়ের নাম ছিল ব্রহ্মময়ী|মেয়ের যখন নয় বছর বয়েস তখন তার বিবাহের দিন নির্ধারিত হয়|বিবাহের দিন ব্রহ্মময়ী প্রথা অনুসারে গঙ্গাস্নানে গিয়ে হঠাৎই ডুবে যায় গঙ্গার জলে|অনেক খোঁজা খুঁজির পরেও তাকে আর পাওয়া যায় না|পড়ে দেখা যায় কলকাতার গঙ্গাঘাট থেকে স্রোতের টানে শবদেহ ভেসে এসেছে মূলাজোড়ের ঘাটে|সেই রাতেই দেবী গোপীমোহনকে স্বপ্নাদেশ দেন যে তিনি স্বয়ং তার গৃহে এতদিন ব্রহ্মময়ী রূপে ছিলেন এবং গোপী মোহন যেনো শোক ভুলে মূলাজোড়ে ‘ব্রহ্মময়ী’ নামে একটি কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন|দেবীর আদেশ গোপীমোহন অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন|প্রতিষ্ঠিত হয় এই ব্রহ্মময়ী কালী মন্দির ও কন্যা জ্ঞানে ব্রহ্মময়ীর পূজা শুরু হয়|সেই পুজো চলে আসছে আজও|ভাগীরথী তীরে অবস্থিত কালী মন্দিরটি নবরত্ন শিল্পশৈলীতে নির্মিত রয়েছে উদ্যান ও ১২টি শিবমন্দি|মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রতিষ্ঠিত দেবী বিগ্রহটি কালোপাথরের নির্মিত যা উচ্চতায় প্রায় ফুট তিনেক|দেবী এখানে স্বর্ণালঙ্কারভূষিতা ও সবসনা|দেবী এখানে প্রসন্ন মুখমণ্ডলে বিরাজিতা ও ঘরের মেয়ে রূপে পূজিতা হন|প্রতি দীপান্বিতা অমাবস্যায় এবং রটন্তী চতুর্দশীতে বিশেষ কালীপূজা হয় এখানে এছাড়াও গোটা পৌষমাস ব্যাপী এখানে উৎসব হয় যা দেখতে আসেন অসংখ্য মানুষ|আজকের পর্ব এখানেই শেষ করছি|ফিরে আসবো আগামী পর্বে কালী কথার পরবর্তীপর্ব নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

কালী কথা – চঞ্চলা কালী

বাংলার প্রায় সব জেলায় রয়েছে একাধিক জাগ্রত কালী ক্ষেত্র। উত্তর থেকে দক্ষিনে একাধিক এমন কালী মন্দির আছে যা নিয়ে রয়েছে অসংখ্য অলৌকিক কিংবদন্তী আজকের পর্বে এমনই এক প্রসিদ্ধ এবং প্রাচীন কালী মন্দির নিয়ে লিখবো যা অবস্থান করছে বালুরঘাটে এবং
চঞ্চলা কালী নামে এই কালী ক্ষেত্র প্রসিদ্ধ।

ঠিক কবে এবং কি ভাবে এই কালী পুজোর সূচনা হয়েছিলো তা সঠিক ভাবে বলা না গেলেও স্থানীয় জমিদার পরিবারের পৃষ্ঠা পোষকতায় এই
পুজো প্রসিদ্ধ হয়েছিলো বলে মনে করা হয়। এবং আনুমানিক তিনশো বছর আগে এই পুজোর শুভ সূচনা হয়। তবে মাঝে বেশ কিছুদিন এই পুজো বন্ধ ছিল। তারপর এলাকার এক বাসিন্দা স্বপ্নাদেশ পেয়ে দ্বিতীয় বারের জন্য এই পুজোর সূচনা করেন।
 
সাড়ে দশ হাত এই চঞ্চলা কালীর পুজো অনুষ্ঠিত হয় দোল পূর্ণিমায় পাশাপাশি সারা বছরই পুজো হয় এবং বিশেষ বিশেষ তিথিতে উপচে পরে ভিড়।

এখানে কালীর পায়ের নীচে শিব নেই। আছে অসুর ও সিংহ। তাছাড়াও এই কালী মাতার হাত মোট আটটি। বলা হয়, মহামায়া ও চামুণ্ডার এক রূপ এই চঞ্চলা কালী মাতা।

শোনা যায় একবার এই মন্দির এলাকা থেকে কিছু অলৌকিক নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। তখন মাহিনগর এলাকার মহা রাজা রাজা এই পুজোর প্রচলন করেন। পরবর্তীতে এই পুজোর ভার নেন স্থানীয় জমিদার পরিবার। সেই থেকে আজ অবধি তারাই পুজো পরিচালনা করে আসছেন।

সময়ের সাথে সাথে মাটির মন্দির পরিবর্তিত হয় পাকা মন্দিরে দিকে দিকে ছড়িয়ে পরে এই
চঞ্চলা কালী মায়ের প্রসদ্ধি।এই মন্দির লাগোয়া একটি পুকুর কে ঘিরে আছে নানা রকম জনশ্রুতি শোনা যায় এই পুকুর থেকে একসময় পুজোর কাজের জন্য থালা-বাসন ভেসে উঠত। বর্তমানে এই পুকুরের জল দিয়ে মায়ের পুজো করা হয়। পুজোর পাঁচ দিন আগে ঘট বসে মন্দিরে।রয়েছে বলী প্রথা।চঞ্চলা কালীর পুজো উপলক্ষে এখানে প্রতি বছর মেলা বসে। না না রকম উৎসব হয়।
দুর দুর থেকে দর্শণার্থীরা আসেন।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। দীপান্বিতা অমাবস্যা সামনেই। সেই উপলক্ষে চলতে থাকবে কালী কথা। থাকবে এমন অনেক কালীক্ষেত্র
নিয়ে আলোচনা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – মা ঝিংলেস্বরী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

পূর্ব মেদিনীপুরের ভবানীপুরে রয়েছে এক প্রাচীন মন্দির যা কোনো শক্তি পীঠ বা সিদ্ধ পীঠ
না হয়েও স্থানীয়দের কাছে বিশেষ শ্রদ্ধার এবং অত্যন্ত প্রসিদ্ধ|দেবী আদ্যা শক্তি মহা মায়া এখানে ঝিংলেস্বরী নামে বিরাজ করছেন।
ঝিংলেস্বরী মায়ের মন্দিরের সাথে জড়িয়ে আছে
এক অলৌকিক ঘটনা।

বহু কাল আগ এই স্থান দিয়ে বয়ে যেতো হলদি নদী। নদীতে যাতায়াত করতো বিরাট বিরাট জাহাজ, একবার এমনই একটি জাহাজ নোঙর ফেলেছিলো এই স্থানে|জাহাজের নাবিকরা যখন ধূমপান করতে ব্যাস্ত তখন হটাৎ একটি মেয়ের আবির্ভাব হয় সেখানে, মেয়েটি নাবিকদের কাছে আগুন চায়|নাবিকরা মেয়েটিকে আগুন নিতে জাহাজে আসতে বলে|মেয়েটির রহস্যময়ী ভাবে হেসে বলে সে জাহাজে উঠলে বিপর্যয় ঘটতে পারে|নাবিকরা ছোট্ট মেয়েটির কথায় গুরুত্ব না দিলে অবশেষে মেয়েটিকে জাহাজে উঠতে হয়|মেয়েটি জাহাজে পা দেয়ার সাথে সাথে জাহাজ বসে যায় সবাই যখন ভিত এবং শন্ত্রস্ত সেই সময় ঘটে আরেক অলৌকিক ঘটনা হটাৎ
জাহাজের মাস্তলে দেখা যায় এক দেবী মূর্তি|
সবাই সেই দেবীর কাছে হাত জোর করে প্রাণ ভিক্ষা করলে রক্ষা পায় জাহাজ।

জনশ্রুতি হিসেবে এই অলৌকিক ঘটনা আজও লোকের মুখে শোনা যায়|মানুষের বিশ্বাস সেই স্থানের কাছেই নির্মিত হয়েছে এই প্রাচীন ঝিংলেস্বরী মন্দির|দেবী সেদিন বালিকার বেশে নাবিক দের জাহাজে উঠেছিলেন|আজও তিনি
ঝিংলেস্বরী রূপে সেই স্থানে স্বমহিমায় বিরাজমান|

প্রাচীন মন্দিরটি ঠিক কবে নির্মিত হয়েছিলো এবং কে নির্মাণ করেছিলেন তা সঠিক ভাবে জানা যায়না তবে পরবর্তীতে মহিষাদলের রাজ
প্রচুর জমি দান করেন মন্দিরের উদ্দেশ্যে এবং মন্দিরের পূজার ভার অর্পণ করা হয় একটি বিশেষ পরিবারকে যে পরম্পরা আজও চলছে|

দেবী এখানে উগ্রতারা রূপে বিরাজিতা|দূর্গা পুজো উপলক্ষে এবং পরবর্তীতে দীপান্বিতা অমাবস্যায় এখানে বহু মানুষের সমাগম হয় এবং নিষ্ঠা সহকারে পুজো হয়|

ফিরে আসবো কালী কথার পরের পর্বে এমনই প্রাচীন এবং অলৌকিক ঘটনায় পরিপূর্ন
নতুন কোনো কালী মন্দিরের কথা নিয়ে।
যথা সময়ে।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – শেওড়াফুলির নিস্তারিণী কালী

বহু প্রতিক্ষিত দীপান্বিতা অমাবস্যা তিথির সূচনা হবে আর কিছু দিন পরেই। দীপাবলীর এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আজ আপনাদের শেওড়াফুলির নিস্তারিণী কালী মন্দিরের অলৌকিক বৃত্তান্ত জানাবো।কলকাতা থেকে কিছু দূরে শেওড়াফুলিতে ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত এই প্রাচীন কালী মন্দিরটি।প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শেওড়াফুলি রাজবংশের রাজা হরিশ্চন্দ্র রায়|এই মন্দির প্রতিষ্ঠার সাথেও জড়িয়ে আছে এক আশ্চর্য ও অলৌকিক কাহিনী|শোনা যায় রাজা হরিশ্চন্দ্র ছিলেন পরম ধার্মিক। নিষ্ঠাবান এবং দেবী কালিকার ভক্ত। কোনোএক অজ্ঞাত কারণে রাজামশাই একবার অনুতপ্ত ও অনুশোচনায় জর্জরিত হয়ে কাউকে কিছু না জানিয়েই বেরিয়ে পড়লেন আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে|তবে কালী কৃপায় রাজার আর আত্মহত্যা হয়ে ওঠেনি|ঘুরতে ঘুরতে রাজা আশ্রয় নেন গভীর জঙ্গলের মধ্যে এক গাছের তলায়| ক্রমে ঘনিয়ে এল রাত। ক্লান্ত রাজা ঢলে পড়লেন ঘুমে। নিদ্রাকালে রাজা স্বপ্নে পেলেন দেবীকে। দেবী স্বপ্নাদেশ দিলেন রাজাকে। তিনি যেন গঙ্গাতীরে মন্দির ও দক্ষিণা কালীর মূর্তি স্থাপন করেন। যে শিলাখণ্ডের উপর তিনি শুয়ে আছেন সেটি দিয়েই নির্মাণ করতে হবে দেবী বিগ্রহ। হতচকিত রাজা ঘুম থেকে উঠে দেখলেন এক অদ্ভুত কাণ্ড। তিনি যার উপর শুয়েছিলেন সেটি সত্যিই একটি শিলাখণ্ড|রাজার আদেশে সেই শিলা খন্ড তুলে রাজপ্রাসাদে আনা হলো|এর কিছুদিন পরেই নাকি রাজার সাথে দেখা করতে এলেন এক মূর্তিকার যিনি ওই শিলা খন্ড দিয়ে মূর্তি তৈরীর ইচ্ছে প্রকাশ করলেন|তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানালে দৈব আদেশ পালন করতেই তার আগমন|এরপর রাজা মূর্তি নির্মাণের আদেশ দিলেন। যথাসময়ে সঠিক নিয়মে গড়া হল মায়ের মূর্তি। মন্দিরে স্থাপিত হল মূর্তিটি।আরেকটি প্রচলিত জনশ্রুতি মতে রানী রাসমণি এসেছিলে এই মন্দিরে এবং এক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী থেকে ছিলেন।স্বয়ং দেবী একটি বালিকার রূপে রানীকে দর্শন দিয়েছিলে। রানী রাসমণি তার কাছের মানুষদের সেই অদ্ভুত এবং অলৌকিক ঘটনার কথা বলেছিলেন বলে শোনা যায়।শোনা যায় মন্দির প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রাজা হরিশ্চন্দ্র মন্দিরের পশ্চিমে নির্মাণ করলেন একটি কুটির। দিনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি কাটাতেন এই কুটিরে। শোনা যায়, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজা এভাবেই কাটিয়েছিলেন|মন্দিরের পাশেই রয়েছে নাট মন্দির এবং শিব মন্দির|মন্দির প্রাঙ্গনে রয়েছে হাড়ি কাঠ|এই মন্দিরে পঞ্চমুণ্ডির আসনের উপর তামার বেশ বড় একটা পাপড়িওয়ালা পদ্ম। তার উপরেই দুহাত মাথার দিকে তোলা মহাদেবের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে মা নিস্তারিণী। কষ্টিপাথরে খোদাই করা আছে দক্ষিণাকালীর রূপ। দেবী ত্রিনয়নী এবং এলোকেশী। করুণা ভরা চাউনি। দেবীমূর্তি উচ্চতায় আড়াই-তিন ফুট|মন্দির সংলগ্ন একটি বিশেষ কক্ষে রয়েছে মহিষমর্দ্দিনী দশভুজা। কষ্টিপাথরের বহু প্রাচীন এই বিগ্রহ। আছে দেবাদিদেব মহাদেব। লক্ষ্মী, গণেশ এবং শ্বেতপাথরের দেবী অন্নপূর্ণার মূর্তি।আজও দীপান্বিতা অমাবস্যা সহ প্রতি অমাবস্যায় মায়ের পুজো হয়। বলিও হয় সেদিন। বহু দুর দুর থেকে মানুষ আসেন এখানে।আজকের পর্ব এখানেই শেষ করছি|আবার ফিরবো কালী কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে|পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী লক্ষীর আরাধনার শাস্ত্রীয় বিধি নিষেধ

পুরান মতে সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধির দেবী শ্রীলক্ষ্মী। তিনি শ্রীবিষ্ণুর স্ত্রী।মনে করা হয়, কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো যে বাড়িতে করা হয় সেই গৃহে মা লক্ষ্মী স্থির থাকেন।  গৃহে সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি বজায় থাকে। কোজাগরীলক্ষ্মী দেবীর পুজো করলে ধনসম্পত্তি অক্ষয় হয়|আজ জানবো লক্ষী পুজো সংক্রান্ত কিছু বিধি নিষেধ ও তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা|পুজোর দিন অন্ন বা যেকোনও খাবার নষ্ট করবেন না। এতে মা অসন্তুষ্ট হন। দেবী লক্ষ্মী অন্নের অপচয় সহ্য করেন না। ফলে বাড়িতে অর্থ ও খাবারের অভাব দেখা দিতে পারে। এই দিনে সম্ভব হলে অন্ন দান করুন|লক্ষ্মী দেবীকে কোনও ভাবে সাদা রঙের ফুল দিয়ে পুজো করা যাবে না। সাদা রঙ ছাড়া লাল, হলুদ, গোলাপি রঙের ফুল ব্যবহার করা যাবে।লক্ষ্মীপুজো করার সময় কোনওভাবেই কালো পোশাক পরা যাবে না। কারন সাদা ও কালো রঙ দেবী পছন্দ করেননা তার প্ৰিয় রঙ হলুদ ও লাল|মা লক্ষ্মীর পুজোয় সাদা ফুল যেমন  ব্যবহার করা যায় না, তেমনই আসনে সাদা বা কালো কাপড় পাতার নিয়ম নেই। ব্যবহার করা যেতে পারে লাল, গোলাপি প্রভৃতি রঙের কাপড়। বিশ্বাস, মা লক্ষ্মী এতে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন কারন ওই একই|মনে করা হয়, শ্রীলক্ষ্মীর পূজনে তুলসী ব্যবহার করলে দেবী অসন্তুষ্ট হন| কথিত আছে, তুলসির সঙ্গে শালগ্রাম শিলার বিবাহ হয়। শালগ্রাম গ্রাম শিলা নারায়ণের প্রতিভূ। যেহেতু শ্রীলক্ষ্মীও বিষ্ণুপত্নী তাই দুজনের সম্পর্ক মধুর নয় তাই এই পুজোয় তুলসির ব্যবহার চলে না।পুজোর পর মন্দির বা ঠাকুর ঘরের দক্ষিণমুখে প্রসাদ অর্পণ করার কথা বলে থাকেন অনেকে। এর শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা না থাকলেও বাস্তু শাস্ত্র মতে শুভ| লক্ষ্মীপুজোর প্রসাদে না বলতে নেই। অল্প হলেও মুখে তুলতে হয়।এতে দেবী প্রসন্ন হন|ঢাক – ঢোল- কাঁসর ঘণ্টা লক্ষ্মীপুজোয় বাজানো যাবে না। অত্যধিক শব্দ পছন্দ করেন না শ্রীলক্ষ্মী।  সব পুজোতেই বাদ্যি বাজানো হয়। কিন্তু মা লক্ষ্মীর পুজোয় কাঁসর ঘণ্টা বাজালে দেবীর অসন্তুষ্ট হন বলে মনে করা হয়।এবিষয়ে একটি পৌরাণিক ব্যাখ্যা আছে|পুরাণ মতে, ঘণ্টাকর্ণ নামে এক অসুর দেবী লক্ষীকে একবার অপমান কোরেছিলো। যিনি স্বয়ং বিষ্ণুর অর্ধাঙ্গিনী এবং সুখ সমৃদ্ধি দাত্রী সেই দেবীকেই কিনা অপমানা।এই ঘটনায় দেবী লক্ষ্মী ঘণ্টাকর্ণের উপর বেজায় ক্রুদ্ধ হন।বলা হয় সেই থেকেই অন্যান্য সমস্ত পুজোতে ঘণ্টা বাজালেও, লক্ষ্মী পুজোতে ঘণ্টা বাজানো নিষিদ্ধ। সেই থেকেই মা লক্ষ্মীর পুজোয় কোন ব্যক্তি ঘন্টা বাজালে, তাঁর উপর বেজায় ক্ষিপ্ত হন পদ্মাসনা দেবী লক্ষ্মী|তাই আপনারাও এই নিষেধ মেনে চলবেন।আপনাদর সবাইকে কোজাগরী লক্ষী পুজোর অনেক শুভেচ্ছা|ভালো থাকুন|ফিরে আসবো পরের পর্বে দীপাবলী উপলক্ষে কালী কথা নিয়ে।তুলে ধরবো দেবী কালীর নানা মন্দিরের কথা। থাকবে শাস্ত্রীয় আলোচনা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী লক্ষীর পৌরাণিক ব্যাখ্যা এবং একটি প্রাচীন লক্ষী মন্দিরের ইতিহাস

শুরুতেই আপনাদের জানাই লক্ষীপুজোর অনেক শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন। আজকের এই বিশেষ পর্বে দেবী লক্ষী সংক্রান্ত পৌরাণিক কিছু ব্যাখ্যা আমি আপনাদের সামনের তুলে ধরবো। তারপর একটি প্রাচীন লক্ষী মন্দিরের ইতিহাস এবং কিছু আপনাদের জানাবো।পরাশর-সংহিতায় যে তিনটি শক্তির পরিচয় পাওয়া যায় তার মধ্যে অন্যতম শ্রী|আবার শ্রী শব্দের অর্থ সৌন্দর্য এবং দেবীর লক্ষীর আরেকটি নাম শ্রী। অন্য একটি ব্যাখ্যা অনুসারে যার দ্বারা সকলে আশ্রিত হয় তিনিই শ্রী|আবার শ্রী অর্থে ধন ও হয়|তাই যথার্থ অর্থে দেবী লক্ষী ধন, সম্পদ, শান্তি ও সৌন্দর্যর দেবী|দেবী লক্ষীর উৎপত্তি নিয়েও পুরানে একটি বিশেষ ঘটনার উল্লেখ আছে, বিষ্ণু পুরাণ ও ভাগবত অনুসারে লক্ষ্মী দেবীর উৎপত্তি হয়েছে সমুদ্র থেকে| দুর্বাসা মুনির শাপে স্বর্গ একদা শ্রীহীন বা লক্ষ্মী ছাড়া হয়ে যায়। তখন বিষ্ণুর পরামর্শে স্বর্গের ঐশ্বর্য ফিরে পাবার জন্য দেবগণ অসুরদের সাথে নিয়ে সমুদ্র-মন্থন শুরু করেন সমুদ্র-মন্থনের ফলে উঠে আসলেন দেবী লক্ষ্মী এবং আবির্ভাবের পর লক্ষ্মী দেবীর স্থান হয় বিষ্ণুর বক্ষে|লক্ষী ও বিষ্ণুর বিবাহ নিয়ে পুরানে উল্লেখ আছে যে একবার দেবী লক্ষী বিষ্ণুকে পতি রূপে পাওয়ার জন্য সমুদ্রের মধ্যে প্রবেশ করে বহুকাল কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন হলেন এবং লক্ষ্মীর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে একদিন বিষ্ণু নিজে লক্ষ্মীর সামনে উপস্থিত হলেন এবং তাঁর ইচ্ছায় বিশ্বরূপ দেখালেন তারপর বিষ্ণু ও লক্ষী দেবীর বিবাহ সম্পন্ন হলো|শ্রী বিষ্ণু এবং দেবী লক্ষী এই জগতের সমস্ত শক্তির উৎস এবং আধার।বাংলার কালী মন্দির বা শিব মন্দিরের সংখ্যা অসংখ্য যা নিয়ে আমি বহু অনুষ্ঠান করেছি। এই বাংলায় বীরভূমে রয়েছে এক প্রাচীন লক্ষী মন্দির যা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয়না।এবার সেই মন্দির নিয়ে এক অলৌকিক ঘটনার কথা আপনাদের বলি|জনশ্রুতি আছে প্রায় পাঁচশো বছর আগে বীরভূমে এই গ্রামে আসেন পূর্ববঙ্গের এক পরিব্রাজক সন্ন্যাসী কামদেব ব্রহ্মচারী। এই গ্রামের একটি নিমগাছের তলায় সাধনস্থল হিসেবে চিহ্নিত করে থাকতে শুরু করেন। কিছুদিনে পর এক গ্রামবাসী দীঘির ধারে জমিতে চাষ করছিলেন সে হটাৎ দেখতে পায়,দীঘির জলে একটি পদ্মফুল ভেসে যাচ্ছে।পদ্মফুল তুলতে নেমে পড়েন দীঘিতে ফুটে থাকা পদ্মফুল দেখতে পেলেও নাগাল পান না কিছুতেই।সেই রাতে মা লক্ষ্মীর স্বপ্নাদেশ পান ওই গ্রামবাসী, ওই দীঘির জলেই নিরাকার রূপে দেবী লক্ষী অবস্থান করছেন। পর দিনই দীঘিতে নিম কাঠ ভাসতে দেখেন তুমি । সেই কাঠ তুলে এনে দেবীর নির্দেশ মতো গ্রামের নিম গাছতলায় আসন পাতা কামদেব ব্রহ্মচারীর কাছে নিয়ে যান এবং সাধক ওই নিম কাঠ থেকে লক্ষ্মীমূর্তি গড়ে তোলেন। সেই দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠা হয় গ্রামেই।আজও ওই মূর্তি পূজিত হয় এখানে|ফিরে আসবো পরের পর্বে। থাকবে দেবী লক্ষীর পুজো প্রসঙ্গে শাস্ত্রীয় আলোচনা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী লক্ষীর আটটি রূপের ব্যাখ্যা

দেবী দুর্গার স্বপরিবারে কৈলাশ প্রত্যাবর্তনের পর আসেন মা লক্ষী। যদিও সনাতনধর্মবলম্বীরা প্রায় প্রতি দিন বিশেষ করে বৃহস্পতি এবং শুক্রবার দেবী লক্ষীর পুজো করেন তবুও এই কোজাগরী লক্ষী পূর্ণিমার মাহাত্ম অপরিসীম। আজ লক্ষী পুজো উপলক্ষে শাস্ত্রে যে অষ্ট লক্ষী অর্থাৎ দেবী লক্ষীর আটটি রূপের উল্লেখ আছে তাদের প্রতিটি রূপের ব্যাখ্যা ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আপনাদের সামনের তুলে ধরবো।প্রথম রূপ আদি লক্ষ্মী বা মহালক্ষ্মী — তিনি বিষ্ণুপ্রিয়া। বিষ্ণুর সঙ্গেই তিনি চিত্রিত হন।আদি লক্ষী বা মহা লক্ষী হলো আদিরূপ মা লক্ষীর। এই মা লক্ষী হলেন অফুরন্ত ধনসম্পদের অধিষ্ঠাত্রী| দ্বিতীয় রূপ ধনলক্ষ্মী বা ঐশ্বর্য্যলক্ষ্মী — তিনি সম্পদ ও সমৃদ্ধির দেবী।এই দেবীর ছটি হাত এবং মূলত লাল শাড়িতেই অধিষ্ঠাত্রী। প্রতিটি হাতে থাকে একে একে চক্র, শঙ্খ, একটি ঘটে বা পবিত্র কলসি, তীর ধনুক এবং একটি পদ্ম। সর্বশেষ হাতটি অভয় মুদ্রার ন্যায় রাখা এবং তা থেকে সোনার মোহর বা মুদ্রা বের হয়।তৃতীয় রূপ ধান্যলক্ষ্মী—ইনি শস্যর দেবী।শস্য ভালো হয়আর্থিক কষ্ট লাঘব হয় এই রূপের পুজো করলে|এই দেবী খাদ্যশস্যএর প্রতীক। দেবীর এক হাত চাষের জমির শস্য সম্পদের আশীর্বাদ স্বরূপ রয়েছে এবং আরেক হাতে থাকে মানব জীবনের প্রয়োজনীয় পুষ্টিদায়ক শস্যের সমাহার। এই দেবীর পরনে থাকে শস্যের রঙের সবুজ শাড়ি| চতুর্থ রুপ গজলক্ষ্মী— গজ বা হাতির সঙ্গে তাঁকে কল্পনা করা হয়। ব্যক্তির শ্রীবৃদ্ধি ঘটে তাঁর কল্যাণে|। এই দেবী হাতির ওপর সরাসরি অধিষ্ঠাত্রী না হলেও, তার চারিদিক আবর্ত থাকে হাতি দ্বারা। রাজকীয় ধন সম্পদের প্রতীক এই দেবী। কথিত আছে সমুদ্র মন্থন কালে ভগবান ইন্দ্রের হারিয়ে যাওয়া ধন সম্পদ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এই দেবী|পঞ্চম রূপ সন্তানলক্ষ্মী— সন্তানভাগ্য নিরূপণ করেন এই দেবীরূপ। ভালো সন্তান লাভ হয় এই দেবী সন্তুষ্ট হলে|দেবীর ষষ্ঠ রূপ বীরলক্ষ্মী— ইনি সাহসদাত্রী দেবী।সাহস ও আত্মবিশ্বাস যোগান|এই দেবীর আরাধনা মনের শক্তি, ধৈর্য্য যোগায়, যা জীবনের কঠিন ও ভালো সময়কে সঠিকভাবে পরিচালনা করার শক্তিও যোগায়|সপ্তম রূপে দেবী বিদ্যালক্ষ্মী—ইনি বিদ্যা লক্ষী জ্ঞানের দেবী। বিদ্যা লাভ হয় এই দেবীর পূজায়|বিদ্যার প্রতীক এই দেবী। সরস্বতী ঠাকুরের মতোই এই দেবী পদ্মের ওপর সাদা শাড়িতে অধিষ্টাত্রী হন|অষ্টম রূপে দেবী বিজয়লক্ষ্মী বা জয়লক্ষ্মী— ইনি বিজয়ের অধিষ্ঠাত্রী|বিজয় লাভ হয় এই দেবীর আশীর্বাদে|এই দেবী সর্বদা বিজয়এর প্রতীক স্বরূপ। কোনো সমস্যার থেকে মুক্তি পেতে বা বলা সাফল্য পেতে এই দেবীর পূজা হয়ে থাকে|চলবে দেবী লক্ষীকে নিয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনা। ফিরে আসবো আগামী পর্বে।জানাবো দেবী সম্পকে পৌরাণিক ব্যাখ্যা এবং একটি প্রাচীনদেবী লক্ষীর মন্দিরের ইতিহাস। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নব রাত্রি – দেবী কাত্যায়নী

নব রাত্রির ষষ্ঠ রাতে পুজো করা হয় দেবী কাত্যায়নীর। আজকের পর্বে জানবো দেবী দুর্গার কাত্যায়নী রূপ সম্পর্কে।পুরান অনুসারে ঋষি কাত্যায়ন দেবী দুর্গাকে কন্যারূপে লাভ করার জন্য তপস্যা করেছিলেন। তাঁর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে দেবী দুর্গা কাত্যায়নের কন্যা রূপে জন্মগ্রহণ করে ‘কাত্যায়নী’ নামে পরিচিতা হন।দ্বিতীয় ব্যাখ্যাঅনুসারে ঋষি কাত্যায়ন প্রথম দেবী দুর্গাকে পূজা করেছিলেন বলে তার নাম অনুসারে দেবীর নাম হয় ‘কাত্যায়নী’।দেবী কাত্যায়নী চতুর্ভুজা–তাঁর ডানদিকের দুটি হাত বর ও অভয়মুদ্রা প্রদর্শন করে, বাঁ দিকের দুই হাতে পদ্ম ও খড়্গ। দেবী সিংহবাহিনী। তাঁর গায়ের রং সোনার মতো উজ্জ্বল।তন্ত্রসার-এর ধ্যানমন্ত্রে তাঁকে বর্ণনা করা হয়েছে দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী রূপে। আবার হরিবংশ গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি অষ্টাদশভুজা।পতঞ্জলির মহাভাষ্য ও কৃষ্ণযজুর্বেদীয় তৈত্তিরীয় আরণ্যক-এ কাত্যায়নীর উল্লেখ রয়েছে। দেবীর মাহাত্ম বর্ণিত হয়েছে মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর অন্তর্গত শ্রীশ্রীচণ্ডী, দেবীভাগবত পুরাণ, কালিকা পুরাণ এবং বামন পুরানে।শাস্ত্রে উল্লেখ আছে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীর দিন দেবী কাত্যায়নীর জন্ম। তারপর শুক্লা সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর দিন ঋষি কাত্যায়নের পূজা গ্রহণ করে দশমীর দিন তিনি যুদ্ধ খেত্রে অসুররাজকে বধ করেছিলেন।গৃহস্তরা দেবী কাত্যায়নীর পূজা করলে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ–এই চার ফল লাভ করে এবং তার সমস্ত রোগ-শোক-ভয়এবং জন্ম-জন্মান্তরের পাপ দুর হয় ।ভাগবত পুরাণ-এ আছে, বৃন্দাবনের গোপীগণ কৃষ্ণকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য সারা মাঘ মাস জুড়ে কাত্যায়নী ব্রত পালন করেছিলেন। তাই মনোমত স্বামী প্রার্থনায় এক মাস ধরে কাত্যায়নী ব্রত পালনেরও প্রথা রয়েছে।তাছাড়া শাস্ত্র মতে যাদের সন্তান লাভ করতে সমস্যা হয় দেবী কাত্যায়নীর পুজো করলে তাদের সমস্যা দুর হয়|কাশীর আত্মাবীরেশ্বর মন্দিরের গর্ভগৃহের একটি কুলুঙ্গিতে দেবী কাত্যায়নীর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত।স্বামী বিবেকানন্দের মা ভুবনেশ্বরী দেবী এই আত্মাবীরেশ্বর মন্দিরে মানত করেই স্বামীজিকে পুত্ররূপে লাভ করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে|আত্মাবীরেশ্বর মন্দিরে অষ্টভূজা মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তি রয়েছে|মূর্তিটি কষ্টিপাথরে নির্মিত, উচ্চতা এক হাত।আত্মাবীরেশ্বর শিবই দেবী কাত্যায়নীর ভৈরব। শারদীয়া ও বাসন্তী নবরাত্রির ষষ্ঠ দিনে এখানে প্রচুর ভক্তসমাগম হয়।যারা দেবী কাত্যায়নীর পুজো করবেন তারা সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে শুদ্ধ ভাবে লাল বস্ত্র পড়ে এই বেদীর পূজা করবেন ।পূজার আগে ঠাকুররে আসন ভালো করে পরিস্কার করে দেবীর মূর্তি বা ছবিতে লাল কাপড় পড়াতে হয়। দেবীর উদ্যেশ্যে লাল ফুল নিবেদন করে এবং হাতে চন্দন মালা নিয়ে ১০৮ বার দেবীর বীজ মন্ত্র জপ করলে, দেবীর আশর্বাদ পাওয়া যায়।নব রাত্রি উপলক্ষে চলবে ধারাবাহিক ভাবে দেবীর নয়টি রূপ নিয়ে আলোচনা|আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে|দেবীর পরবর্তী রূপ নিয়ে|পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নবরাত্রি – দেবী কুষ্মান্ডা

নব রাত্রি উপলক্ষে পূজিতা দেবী দুর্গার চতুর্থ রূপ হলো কুষ্মাণ্ডা রূপ এই রূপে দেবী পূজিতা হন নব রাত্রির চতুর্থ রাত্রে|আজকের পর্বে দেবীর এই রূপ নিয়ে লিখবো।দেবীর এইরকম অদ্ভুত নাম এর নিদ্দিষ্ট শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা আছে ‘কু’ শব্দের অর্থ কুৎসিত এবং ‘উষ্মা’ শব্দের অর্থ ‘তাপ’; ‘কুষ্মা’ শব্দের একত্রিত অর্থ কুৎসিত বা তাপ কে হরণ করেন যিনি। কুষ্মান্ডা রূপে দেবী জগতের সকল দুঃখ কষ্ট বা কিছু আপাত দৃষ্টিতে কুৎসিত সব কিছুকে গ্রাস করে নিজের উদরে ধারণ করেন তাই তার নাম ‘কুষ্মাণ্ডা’।মহাপ্রলয়ের পরে যখন সর্বত্র শুধু নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ছেয়ে রয়েছে, তখন এই দেবী কুষ্মাণ্ডা নব রূপে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছিলেন|দেবী অষ্টভুজা” নামেও পরিচিতা আবার দেবীকে “কৃষ্ণমাণ্ড” নামেও ডাকা হয়|দেবী সিংহবাহিনী ও ত্রিনয়নী দেবীর হাতে থাকে সুদর্শনচক্র, ধনুর্বাণ, রক্তপদ্ম, কমণ্ডলু, অমৃত কলস ও জপমালা|মনে করা হয়, দেবী কুষ্মাণ্ডা অল্প পূজাতেই সন্তুষ্ট হন। তার পূজায় কুষ্মাণ্ড বা কুমড়ো বলি দেওয়ার রীতি প্রচলিত আছে।কাশীতে দেবী কুষ্মাণ্ডার মন্দির বিখ্যাত। কাশীতে তিনি দুর্গা নামেই পূজিতা হন।তিনি কাশীর দক্ষিণ দিকের রক্ষয়িত্রী। কাশীখণ্ড তে উল্লেখ রয়েছে, অসি নদীর সঙ্গমস্থলে কুষ্মাণ্ডার অধিষ্ঠান।নব রাত্রিতে যারা দেবীর কুষ্মান্ডা রূপের পুজো করবেন তারা প্রথমে একটি কলস স্থাপন করবেন তারপর সাধ্য মতো অন্যান্য দেবতাদের পূজা করবেন । তাঁদের পূজা করার পর, দেবী কুষ্মান্ডার পূজা শুরু করুন।পুজোর দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে হাতে ফুল নিয়ে দেবীর পূজা করা উচিত।দেবী কুষ্মান্ডার ধ্যান করার পর, তাঁকে ধূপ, লাল ফুল, সাদা ফল নিবেদন করুন। এই ভাবে পুজো করলে দেবীর আর্শীবাদ এবং সৌভাগ্যবান হয়ে উঠতে পারেন।দেবী কুষ্মান্ডার ভোগ হিসেবে হালুয়া এবং দই দিন। আপনি এটিকে প্রসাদ হিসেবে নিতে পারেন।পুজোর শেষে দেবীর আরতি করুন।শাস্ত্র মতে দেবীর কুষ্মান্ডা রূপের আরাধনায় বৈভব, সুখ সমৃদ্ধি ও যশ এবং খ্যাতি বাড়ে বলে মনে করা হয়|আপনারাও নবরাত্রির এই পবিত্র সময়কে শাস্ত্র মতে ব্যবহার করে নিজের জীবনের যাবতীয় সমস্যা দূর করতে পারেন কারন নবরাত্রির এই সময় গ্রহ দোষ খন্ডনের শ্রেষ্ঠ সময়। ফিরে আসবো আগামী পর্বে দেবীর পরবর্তী রুপ নিয়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নব রাত্রি – দেবী স্কন্দমাতা

নব রাত্রি উপলক্ষে দেবীর যে রূপ গুলির পুজো করা হয় তাদের মধ্যে যেমন বিনাশকারিণী কাল রাত্রি রূপ আছে তেমনই আছে স্নেহময়ী স্কন্দমাতা রূপ।নবরাত্রির পঞ্চম দিনে দেবী স্কন্দ মাতার পূজা করা হয়।আজকের পর্বে দেবী স্কন্দ মাতা নিয়ে আলোচনা হবে।দেবাদিদেব মহাদেব এবং দেবী পার্বতীর পুত্র কার্তিকের আরেক নাম স্কন্দ তাই মাতা পার্বতীর অপর নাম স্কন্দমাতা । দেবীর এই স্কন্দমাতা রূপে তিনি শিশু স্কন্দকে কোলে নিয়ে থাকেন । দেবী চতুর্ভুজা এক হাতে তিনি স্কন্দকে ধরে রেখেছে।অন্য দুটি হাতে তিনি দুটি পদ্ম ধারণ করেন এবং তার চতুর্থ হাতটি আশীর্বাদ দেয়ার জন্য ব্যাবহিত হয়|পুরাণ অনুযায়ী দেবী স্কন্দমাতা আগুনের দেবী।দেবীর গায়ের রং সাদা । তিনি একটি পদ্মের উপর উপবিষ্ট। তিনি তার ভক্তদের অমূল্য জ্ঞান দান করেন।সেদিক দিয়ে তিনি জ্ঞান দাত্রী।যারা নবরাত্রির পঞ্চম দিনে বাড়িতে স্কন্দমাতার পুজো করবেন তারপর প্রথমে গঙ্গাজল দিয়ে গৃহ শুদ্ধ করুন। একটি রৌপ্য, তামা বা মাটির পাত্রে নারকেল রেখে একটি কলস স্থাপন করুন। এরপর শ্রীগণেশ, বরুণ, নবগ্রহ ইত্যাদি দেব দেবীর উদ্দেশ্যে সাতটি সিঁদুরের বিন্দু স্থাপন করুন। তারপর বৈদিক মতে এবং ষোড়শপচার সহ সমস্ত প্রতিষ্ঠিত দেবতার পূজা করুন।পুজোর সময় এই মন্ত্রটি এগারো বার জপ করবেন – ” যা দেবী সর্বভূতেষু মা স্কন্দমাতা রূপেন সংস্থা।নমস্তস্য নমস্তস্য নমস্তস্য নমো নমঃ”পুজোর দিনে নীল বর্নের পোশাক পরিধান করা শ্রেয় ভোগে কলা অবশ্যই নিবেদন করবেন।পূজোর পর শিশুদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করলে বিশেষ শুভ ফল লাভ করবেন।পুজোয় সন্তুষ্ট হলে মা স্কন্দমাতা তাঁর ভক্তদের প্রতি অগাধ ভালবাসা ও স্নেহ বর্ষণ করেন।চলতে থাকবে এই ধারাবাহিক আলোচনা।ফিরে আসবো আগামী পর্বে দেবীর পরবর্তী রূপ নিয়ে|পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।