Home Blog Page 72

জগন্নাথদেবের নানা বেশ

জগন্নাথদেবের নানা বেশ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

চন্দন যাত্রা দিয়ে শুরুকরেছিলাম জগন্নাথ প্রসঙ্গ নিয়ে বিশেষ আলোচনা। আর কয়েকদিন পরেই জগন্নাথের স্নান যাত্রা তাই আবার ফিরে এসেছি জগন্নাথ প্রসঙ্গে অধ্যাত্মিক আলোচনা নিয়ে। প্রভু জগন্নাথ শুধু তার ভোগের জন্য নয় নানারকম বেশ বা সাজ সজ্জার জন্যও বিশেষ ভাবে পরিচিত।

 

নানা সময়ে নানা বেশে সাজেন জগতের নাথ এবং প্রতিটি বেশের আছে আলাদা পরিচয় এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা।আজ সেই বেশগুলির কয়েকটি নিয়ে আলোচনা করবো

 

প্রাচীন গ্রন্থ মাদলা পাঞ্জিতে উল্লেখ আছে ১৪৬০ খ্রিস্টাব্দে উৎকলের গজপতি রাজা কপিলেন্দ্র দেব দাক্ষিণাত্যের এক রাজার বিরুদ্ধে ভীষণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। দীর্ঘ সংগ্রামের পর কপিলেন্দ্র যুদ্ধে জয়লাভ করেন।শত্রু দেশ থেকে লুঠে আনেন ষোলটি হাতির পিঠ বোঝাই করে সহস্র মণ সোনা। সমস্ত সোনা রাজা কপিলেন্দ্র জগন্নাথদেবের মন্দিরের ভাণ্ডারে পাঠিয়ে দিলেন এবং জগন্নাথদেবকে তিনি ওড়িশার প্রকৃত রাজা বলে স্বীকার করলেন ও নিজেকে তাঁর অনুগত সেবক বলে ঘোষণা করলেন। একটি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই ক্ষমতা হস্তান্তর সর্বসাধারণের সম্মুখে উদযাপন করা হয়।এই সময় জগন্নাথের ‘রাজবেশ’-এর প্রবর্তন হয় । সাধারণের কাছে এই ‘বেশ’ আর একটি নাম আছে তা হল, ‘বড়া তাধাও বেশ’।

 

জগন্নাথদেবের দৈনন্দিন জীবনে ব্যাবহিত বেশ গুলির ও আলাদা নাম এবং তাৎপর্য আছে।

জগন্নাথদেবকে পুরীতে সাধারণ দিনগুলিতে যে বেশে দেখা যায়, সেই বেশ পরিচিত সাদা বেশ নামে।এরপর রাতে যে বেশে জগন্নাথ, বলরাম, শুভদ্রাকে রাখা হয় তার নাম বড়সিংহের বেশ। চন্দনলাগি বেশ শুরু হয় বৈশাখ জৈষ্ঠের সময়, এই সময় ভগবানকে চন্দনের প্রলেপে রাখা হয় এবং বেয়াল্লিশ দিন ধরে চলে এই উৎসব।

 

জগন্নাথদেবের আরকেটি বিখ্যাত বেশ হলো হাতি বেশ বা গজ বেশ |হাতিবেশ রথযাত্রার আগে স্নান যাত্রার সময় দেখা যায় । এই সময়ে গণপতির বেশে জগন্নাথকে সাজানো হয় বলে নাম ‘হাতি বেশ’। এই গজ বেশের নেপথ্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা আছে|বহু শতক আগে পুরীর রাজার রাজদরবারে এসেছিলেন পণ্ডিত গণেশ ভট্ট। রাজা তাঁকে জহগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা দেখবার জন্য আহ্বান জানান। তবে তা দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলনা গনেশ ভট্টর। কারণ তাঁর আরাধ্য দেবতা গণপতি স্বয়ং তিনি আর কারুর প্রতি আগ্রহী নন । তবে রাজার অনুরোধে স্নানযাত্রায় গিয়ে গণেশ ভট্ট আবিষ্কার করেন জগন্নাথ গণেশ রূপেই তাকে দেখা দিয়েছেন।সেই ঘটনার পর থেকেই স্নান যাত্রায় জগন্নাথের বেশ হয় হাতিবেশ।

 

এছাড়াও পুরীর জগন্নাদেবের থের বিভিন্ন বেশের মধ্যে অন্যতম হল কালিয়াদলন বেশ। ভাদ্র একাদশীর দিন পুরীর জগন্নাথকে সাজানো হয় এই বিশেষ বেশে। যেভাবে শ্রীকৃষ্ণ দুর্দমনীয় রাক্ষস কালিয়াকে হত্যা করেছিলেন সেই বেশেই এদিন সাজানো হয় জগন্নাথকে।আশ্বিন মাসে যে বেশে জগন্নাথকে সাজানো হয় তার নাম ‘রাধা-দামোদর বেশ’।আশ্বিনের শুক্ল পক্ষের একাদশী তিথিতে ‘রাধা-দামোদর বেশ’ হয়।জগন্নাথদেবের আরো একটি বেশ হলো পদ্মবেশ|মাঘ ও বসন্তের শনিবার ও বুধবার জগন্নাথ ধারণ করেন পদ্মবেশ।

 

স্নান যাত্রা উপলক্ষে আগামী দিনেও ফিরে আসবো প্রভু জগন্নাথদেবের মহিমা বর্ণনা করতে| থাকবে স্নান যাত্রা সংক্রান্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

অম্বুবাচি এবং কামাখ্যা

অম্বুবাচি এবং কামাখ্যা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

প্রতিবছর অম্বুবাচি এলেই সারা দেশের নজর থাকে মহাপীঠ কামরুপ কামখ্যার দিকে। কিন্তু এই বিশেষ সময়ে কামাখ্যা মন্দির এতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কেনো তার অনেক গুলি কারন আছে। তবে শুরু করতে হবে পুরান দিয়ে।

 

পুরান অনুসারে সতী বা পার্বতীকে দেহত্যাগ করার পর শিব তাকে নিয়ে প্রলয় নৃত্য শুরু করেছিলেন তাতে পৃথিবী অশান্ত হয়ে পড়েছিল। তখন শিবকে শান্ত করার জন্য বিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ ৫১ টি টুকরা করেন এবং সেইগুলি বিভিন্ন জায়গায় পড়েছিল। যার মধ্যে বিষ্ণুর চক্রে ছিন্ন সতীর যোনী পতিত হয় কামাখ্যায় আবার মতান্তরে দেবী সতীর যোনি এবং গর্ভ দুই এখানে পড়েছিল।

 

কামাখ্যা মন্দিরটি আসামের নীলাচল পাহাড়ে অবস্থিত। এখানে মোট ১০টি রূপ বা দশ মহাবিদ্যার মন্দির রয়েছে। এই মন্দিরের দেবতার রুপ গুলো হল – কালী, তারা,ষোড়শী, ভূবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলামুখী, মাতঙ্গী ও কমলা। মধ্যযুগে হুসেন শাহের অনুপ্রবেশের সময় ১৪৯৮ সালে এই মন্দির ধংস করা হয়েছিল বলে কথিত আছে। ১৫৬৫ সালে পুরনায় মন্দিরটি নির্মান করা হয় কোচ সাম্রাজ্যের রাজা নর নারায়নের সময়ে ১৫৬৫ সালে ৷

 

এই স্থানকে যোনিপীঠ বা তীর্থচূড়ামণি বলা হয়। আর সেই কারণেই কামাখ্যা দেবীকে রক্তক্ষরণকারী দেবীও বলা হয়। কামাখ্যা মন্দির ৫১ পীঠের মধ্যে অন্যতম একটি জনপ্রিয় গুরুত্বপূর্ণ পীঠ যার সাথে অম্বুবাচির রয়েছে বিশেষ সম্পর্ক।

 

সেই অদিকাল থেকে সৃষ্টি, উর্বরতা এবং সর্বোপরি নারী শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে কামাখ্যা। ধীরে ধীরে তাই অম্বুবাচি পালনের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয় এই সতী পীঠ।শুধু তাই নয় তন্ত্র মন্ত্রের জন্য ও বিখ্যাত কামাখ্যা কথিত আছে, মন্ত্রতন্ত্র সাধনার এক রহস্যময় স্থান হল কামরূপ কামাখ্যা। পুরাকালে কোন পুরুষ এই সময় কামাখ্যা মন্দিরে প্রবেশ করলে, মন্ত্র বলে তাকে বশ করে রাখা হত। তাই বহু বছর ধরে বহু বিদেশি শাসক কামরুপ রাজ্য কে আক্রমণ করার সাহস দেখায়নি।

আজও অম্বুবাচি উৎসবে যোগ দেনা বহু তন্ত্র সাধক বহু তন্ত্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয় এই সময়ে।

 

দেশ বিদেশ থেকে বহু ভক্ত এই বার্ষিক অম্বুবাচির সময়ে কামাক্ষায় এসে উপস্থিত হন। কামাক্ষার বিভিন্ন উৎসবের মধ্যে অম্বুবাচি হল বৃহতম উৎসব। বিবাহিত নারীরা যেমন সন্তানের জন্য দেবী কামাক্ষার আরাধনা করেন, সেই রকমই কৃষকরা ভূমি মাতার গর্ভে ফসলের আশায় কামাখ্যা দেবীর আরাধনা করেন। প্রতি বছর অম্বুবাচি নিবৃত্তির পর দেবী স্নান হয় তারপরেই পূজার সূচনা হয় যোগ দেন অসংখ্য মানুষ।

 

পরবর্তী পর্ব গুলিতে আরো বিস্তারিত

আলোচনা করবো এই শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে।

থাকবে আরো অনেক তথ্য এবং

পৌরাণিক ঘটনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

অম্বুবাচির শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

অম্বুবাচির শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

সামনেই অম্বুবাচি। ঋতুমতি হবেন ধরিত্রী। মাতৃ শক্তির এবং একই সাথে সৃষ্টি শক্তির প্রতীক মা কামাখ্যার মন্দিরে বসবে অম্বুবাচি মেলা। এই কটাদিন এই অম্বুবাচি নিয়ে নানা আঙ্গিক থেকে নানা দৃষ্টি কোন থেকে আলোচনা করবো। এই অম্বুবাচির শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা জানবো কেনই বা এই রীতি এতো তাৎপর্যপূর্ণ।

বিভিন্ন শাস্ত্রে আলাদা আলাদা ভাবে অম্বুবাচিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যদিও আসল কথা একই।
সংস্কৃত শব্দ “অম্ব ” মানে জল আর “বাচি” মানে আরম্ভ বা সূচনা৷

প্রাকৃতিক ভাবে প্রচন্ড গরমের পর আষাঢ়ের এই সময় বর্ষার জলে ভিজে পৃথিবী হয় সিক্ত ও বীজ ধারনের উপযোগী ৷এই সময় মনে করা হয় মা বসুমতী ঋতুমতী হয়েছেন ৷ তার জীবন চক্রের এই বিশেষ সময় কালকে অম্বুবাচি হিসেবে পালন করা হয়।

জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে রাশি চক্রের ২৭টি নক্ষত্রের মধ্যে সূর্য যখন আদ্রা নক্ষত্রে প্রবেশ করে সেই
তিন দিন কুড়ি দন্ড সময়টাই “অম্বুবাচি ” ৷

রজঃস্বলা নারী যেমন এই সময় অনেক কাজ করেন না তেমনই প্রকৃতির ক্ষেত্রে এই সময়ে বিশেষ কিছু রীতি নীতি পালন করা হয়।
এই দিনগুলিতে চাষিরা কৃষিকাজ বন্ধ রাখেন ৷ সন্ন্যাসী , যোগী , বিধবা মহিলারা এই তিন দিন রান্না করা ও আমিষ খাবার খান না।

শাস্ত্রে আছে –
“ত্বমেব প্রকৃতিদেবী ত্বমেব পৃথিবী জলম্ ৷
ত্বমেব জগতাং মাতা ত্বমেব চ জগন্ময়ী ৷’’
অর্থাৎ পৃথিবী হলেন ধরিত্রী মাতা।বরাহ অবতারে সলীল সমাধি থেকে মাতা ধরিত্রীকে উদ্ধার করেছিলেন বিষ্ণু।

সনাতন ধর্ম এবং সংস্কৃতিতে নারী ও ধরিত্রী এই দুই উর্বরতা এবং সৃষ্টি শক্তির আধার তাই মাতৃ শক্তির এই স্বাভাবিক পর্যায়টি অত্যন্ত পবিত্র সময় রূপে দেখা হয় এবং অম্বুবাচির নিবৃত্তির সময়টি
দেশের নানা প্রান্তে উৎসব রূপে পালিত হয় ।
সেই প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত আলোচনা করবো
ধারাবাহিক ভাবে।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। শাস্ত্র এবং তার ব্যাখ্যা নিয়ে। বাকি আছে অনেক তথ্য অনেক পৌরাণিক ব্যাখ্যা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

স্নান যাত্রা উপলক্ষে বিশেষ পর্ব

স্নান যাত্রা উপলক্ষে বিশেষ পর্ব

জগন্নাথ মূর্তি রহস্য

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

প্রতিবছর রথযাত্রার সূচনা হয় দেবস্নান পূর্ণিমার দিন স্নান যাত্রার মাধ্যমে।এই স্নানযাত্রার দিন একটি বিশেষ কূপের জল মন্ত্র দ্বারা শুদ্ধ করে একশো আট কলস জলে বিগ্রহ স্নান করানো হয়|
আর কয়েকটি দিন পরেই সেই স্নান যাত্রা উৎসব।
সেই উপলক্ষে আজ থেকে শুরু করছি জগন্নাথ দেব সংক্রান্ত ধারাবাহিক আলোচনা। আজ জগন্নাথ মূর্তি সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বেশ রহস্যময় বিষয় সংক্ষেপে
আপনাদের জানাবো।

প্রতি বছর স্নানযাত্রার পর শুরু হয় অনসর। এই অনসরকালে জগন্নাথদেব অসুস্থতার কারণে ভক্তগণের অন্তরালে গোপন স্থানে চিকিৎসাধীন থাকেন এবং সুস্থ হয়ে পুনরায় নিদ্দিষ্ট দিনে রথে চড়ে ভক্ত দের তার দিব্য দর্শন দেন।জগন্নাথ দেবের সেবক যারা এই সময় তার বিশেষ সেবা করেন তারা বলেন এই অসুস্থ্য থাকার সময়ে প্রভুর দেহের তাপ বেড়ে যায়। সত্যি তিনি জ্বরে ভোগেন।

‘নব-কলেবর’ নামের রহস্যময় এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়মিত নিদ্দিষ্ট সময়ের ব্যাবধানে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হয় এই সময় পুরোনো মূর্তির ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হয় এটাই পূজারীদের বিশ্বাস।
জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে – যাতে পুরোনো মূর্তি থেকে ‘আত্মা’ নতুন মূর্তিতে গিয়ে ঢুকছে – এটা তাঁরা অনুভব না করেন। অনেকে মনে করেন এই সময় ব্রহ্ম পদার্থ জগন্নাথ মূর্তিতে স্থাপন করা হয় যা আসলে স্বয়ং শ্রী কৃষ্ণের হৃদয় যা আজও অক্ষত আছে।

প্রভু জগন্নাথের মূর্তিতে চোখের পাতা নেই|এর একটা কারন তিনি জগতের নাথ এবং তিনি সদা জাগ্রত|একটি মুহূর্তের জন্যও তিনি দেখা বন্ধ করেননা|তিনি পরম দয়ালু তাই প্রতি মুহূর্তে তার ভক্তদের উপর তার কৃপা দৃষ্টি নিক্ষেপিত হয়|তার অসম্পূর্ন দুই বাহু সামনের দিকে প্রসারিত যেনো তিনি যেনো তিনি তার ভক্তদের আলিঙ্গন করতে সদা প্রস্তুত। জগন্নাথ মন্দিরের মুখ্য দরজা
সদা উন্মুক্ত কারন দিনে মানুষ এবং রাতে দেবতারা তাকে দর্শন করতে আসেন।

“যে গাছের কাঠ দিয়ে জগন্নাথের মূর্তি তৈরী হতে পারে, তার এগারোটা বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। ”
“যেমন গাছের গায়ে হাতির শুঁড় ও চোখের আকৃতি স্পষ্ট থাকতে হবে, গাছের সাথে সাপ জড়িয়ে থাকবে, উঁইয়ের ঢিপি থাকবে ইত্যাদি।”
প্রায় দুমাস ধরে কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে ওই গাছ খুঁজে বার করে তারপরে মহাযজ্ঞ এবং আরো অনুষ্ঠান করে শুরু হয় মূর্তি নির্মাণ|.

জগন্নাথ এবং পুরীর মন্দির নিয়ে অলৌকিক ঘটনার শেষ নেই। জগন্নাথ লীলা খুবই বিস্তৃত। তাই এই ধারাবাহিক আলোচনা আপাতত চলতে থাকবে। ফিরে আসবো আগামী পর্বে।পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাথদেবের অসম্পূর্ণ মূর্তির রহস্য

জগন্নাথদেবের অসম্পূর্ণ মূর্তির রহস্য

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীতে প্রভু জগন্নাথের স্নান যাত্রা প্রায় আসন্ন। স্নান যাত্রার মধ্যে দিয়েই রথ যাত্রার সূচনা হয়ে।

পবিত্র এই সময়ে আবার আমি আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছি জগন্নাথ লীলা নিয়ে

ধারাবাহিক আলোচনা। আজ শুরু করবো প্রভু জগন্নাথের অসম্পূর্ণ মূর্তির রহস্য দিয়ে।

 

সাধারণত দেব মূর্তি অসম্পূর্ণ থাকেনা এবং মূর্তি অসম্পূর্ণ হলে তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা বা পুজো হয়না। কিন্তু জগন্নাথ মূর্তি অসম্পূর্ণ এবং এই রূপেই জগতের নাথ নিত্য লীলা করে চলেছেন।

 

জগন্নাথ ভগবান বিষ্ণুরই অন্য রূপ। আবার অনেকের কাছে তিনি সাক্ষাৎ বামন অবতার।

পুরীর রাজা ইন্দ্রদুম্ন ভগবান বিষ্ণুর মন্দির তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিগ্রহের কেমন আকার দেবেন তা নির্ধারণ করতে পারছিলেন না। তখন তিনি এই সমস্যার কথা সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার কাছে জানান। তখন ভগবান ব্রহ্মা ইন্দ্রদুম্নকে বলেন যে, ভগবান বিষ্ণুর ধ্যান করে তাঁর কাছ থেকে জেনে নিতে যে, তিনি বিগ্রহের কেমন আকৃতি চাইছেন। ব্রহ্মার কথামতো রাজা ইন্দ্রদুম্ন ভগবান বিষ্ণুর ধ্যান শুরু করেন।

 

গভীর ধ্যান করার পর স্বপ্নে ভগবান

বিষ্ণু রাজাকে জানান যে, পুরীর কাছে একটি নদীতে একটি কাঠের টুকরো ভেসে যাচ্ছে। সেই কাঠের টুকরো দিয়ে তাঁর বিগ্রহ তৈরি করতে হবে। স্বপ্নাদেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজা সেই জায়গায় দ্রুত যান। গিয়ে দেখতে পান সত্যিই নদীতে একটি কাঠের টুকরো ভেসে যাচ্ছে। কাঠের টুকরোটি তুলে নিয়ে এসে তিনি শিল্পীকে দিয়ে বিগ্রহ তৈরি করানোর কাজ শুরু করেন। কিন্তু যতবারই সেই শিল্পী কাঠের টুকরোটি কাটতে যাচ্ছেন, ততবারই সেটি ভেঙে যাচ্ছে।এমনভাবে কীকরে বিগ্রহ তৈরি হবে? চিন্তায় পড়ে যান রাজা। তখন বিশ্বকর্মা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। কিন্তু বিশ্বকর্মার একটাই শর্ত ছিল যে, তিনি যতক্ষণ কাজ করবেন, তাঁকে কোনওরকম বিরক্ত করা চলবে না। রাজা সেই শর্তে রাজি হয়ে যান। একটি বন্ধ ঘরের মধ্যে বিশ্বকর্মাও বিগ্রহ তৈরির কাজ শুরু করেন। দু- সপ্তাহ পরে একদিন যখন সেই বন্ধ ঘর থেকে কোনও আওয়াজ আসছিল না। রাজা ইন্দ্রদুম্নের স্ত্রী বলেন যে, তাঁদের এখনই ঘরের ভিতরে গিয়ে দেখা উচিৎ যে সব ঠিকঠাক আছে কিনা।

 

এদিকে রাজা ইন্দ্রদুম্নের ঘরে প্রবেশের কোনও ইচ্ছাই ছিল না। আবার কোনও আওয়াজ না পাওয়ায় তিনি চিন্তাতেও ছিলেন। তাই তাঁর কাছে ঘরে প্রবেশ করা ছাড়া আর কোনও উপায়ও ছিল না। অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও তিনি ঘরে প্রবেশ করেন। ঘরে ঢুকে দেখেন, সেখানে কোনও কারিগর নেই। শুধু অসম্পূর্ণ একটি বিগ্রহ রয়েছে। রাজা বিশ্বকর্মার আদেশ অমান্য করার জন্য অনুতাপ করেন।

 

তখনই দৈববাণী হয়। ভগবান বিষ্ণুই দৈববাণী করে বলেন যে আকৃতির বিগ্রহ তৈরি হয়েছে

সেই বিগ্রহই যেন প্রতিষ্ঠা করা হয়। ভগবান বিষ্ণুর আদেশ মতো রাজা ইন্দ্রদুম্ন সেই অসম্পূর্ণ বিগ্রহই প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকেই জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার হাত-হীন অসম্পূর্ণ বিগ্রহের পুজো শুরু হয়।

 

স্নান যাত্রা উপলক্ষে সারা সপ্তাহ জুড়ে চলতে থাকবে জগন্নাথদেব প্রসঙ্গে ধারাবাহিক পর্ব। থাকবে অনেক পৌরাণিক ঘটনা

এবং ব্যাখ্যা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – সিয়ারশোল রাজবাড়ির পুজো

কালী কথা – সিয়ারশোল রাজবাড়ির পুজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

সিয়ারসোল রাজবাড়ি কালী পুজো রানী গঞ্জের অন্যতম পুরোনো এবং বিখ্যাত পুজো। এই পুজোর বয়স প্রায় তিনশো বছর এবং পুজো শুরু হয়ে ছিলো একটি বিশেষ কারণে। আজ কালী কথায় এই পুজো নিয়ে লিখবো।

 

এই পুজোর ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায় এক সময় গ্রামে দেখা গেছিল মহামারী কলেরার প্রকোপ। একের পর এক গ্রাম উজাড় হয়ে চলেছে কলেরার প্রকোপে।সেই সময়

এই রোগের ওষুধ পাওয়া ছিলো প্রায় অসাধ্য।

 

সেই সময়কালেই গ্রামকে রক্ষার লক্ষ্যে গ্রামের প্রবীণ সদস্যরা চিন্তা করলেন গ্রামে দেবী আরাধনার মাধ্যমে গ্রাম্য দেবীর পুজোর আয়োজন করবেন তারা। সে মতোই তৎকালীন সময়ে গ্রামের পুরোহিত এবং মাতৃ সাধক অনন্ত লাল ভট্টাচার্যকে মা রক্ষা কালী পুজোর জন্য আবেদন জানান সকলে।

 

সব দিক বিচার করে ভট্টাচার্য মশাই দিনক্ষণ তিথি নক্ষত্র ধরে বৈশাখ মাসের এক অমাবস্যা তিথিতে শাক্ত মতে মা রক্ষা কালীর পুজোর আয়োজন করলেন। পরে মা কালীর স্বপ্নাদেশে নির্দেশ দেন তার মন্দির যেন কখনোই আবৃত না থাকে অর্থাৎ খোলা আকাশের নিচেই যেন তার পুজো করা হয়। সে মতোই গ্রামের শেষ প্রান্তে তেঁতুল গাছের নিচেই পূজিত হন মা রক্ষা কালী।

 

এখানের কালীপুজোর বিশেষত্ব হচ্ছে রক্ষা কালীর মূর্তি একই দিনে গড়ে তোলার পর রাতভর পুজো হোম যজ্ঞ, তন্ত্র মতে বলিদান কর্মসূচির মাধ্যমে সমস্ত উপাচার সম্পন্ন হয়। তারপরে রাতে

ভক্ত দের মধ্যে ভোগ বিতরণ হয় এবং সকালের সূর্য উদয় হওয়ার আগেই প্রীতিমা নিরঞ্জন হয়।

 

শোনা যায় এই রক্ষা কালী শুধু মহামারী থেকে যে গ্রামবাসিদের বাঁচিয়েছে তা নয় তার পুজো যেদিন

থেকে শুরু হয়েছে সেদিন থেকে এলাকার মানুষের জীবন যাত্রা উন্নত হয়েছে। ফসল বেশি ফলেছে। সুখ সমৃদ্ধি এবং শান্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

তিনশো বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সব দেবীর নিয়ম নিষ্ঠা অক্ষুন্ন রেখে দেবীর পুজো দিয়ে আসছেন এবং বংশ পরম্পরায় আজও সেই ভট্টাচার্য পরিবারের হাতেই রয়েছে পুজোর দায়িত্ব।

 

আবার কালী কথার পরবর্তী পর্বনিয়ে ফিরে আসবো যথা সময়ে তবে সামনেই অম্বুবাচি এবং প্রভু জগন্নাথের স্নান যাত্রা তাই এই দুটি বিষয় নিয়ে আগামী সপ্তাহে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা

চলবে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – মিত্র বাড়ির কালী পুজো 

কালী কথা – মিত্র বাড়ির কালী পুজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ কালী কথায় আপনাদের উত্তরি কলকাতার অন্যতম পুরোনো এবং প্রসিদ্ধ বনেদি বাড়ি মিত্র বাড়ির শতাব্দী প্রাচিন কালী পুজোর কথা লিখবো।

 

আজ যে রাস্তার নাম নীলমণি মিত্র লেন।

সেই রাস্তার পাশেই আছে মিত্র বাড়ি।নীল মণি মিত্র বাড়িরই এক কৃতি সন্তান ছিলেন তার নামেই এই রাস্তার নাম।

 

বাড়ির গৃহ মন্দিরে রয়েছে ছোট্ট কালী প্রতিমা। খেয়াল করলেই দেখা যাবে কালী দাঁড়িয়ে শিবের বুকের ওপর, বাঁ পা এগিয়ে।যদিও দক্ষিনা কালী রূপেই কালী পুজো হয়। তবে কেনো এমন রূপ? তার পেছনে একটা গল্প আছে।

 

এই বংশের অন্যতম প্রাণ পুরুষ প্রাণকৃষ্ণ মিত্র তার শৈশবে অন্যান্য মৃৎশিল্পী বন্ধুদের সঙ্গে খেলার ছলে একদিন কালী প্রতিমা তৈরি করেন। বাঁ পা এগিয়ে রাখলেন।এই কালী দক্ষিণাকালিকার মতোই পূজিত হন এখনও। পরিবর্তন হয়নি আকারে। দক্ষিনা কালী হলেও বাঁ পা আগে আছে।

 

শুরুতে অবস্থা ভাল ছিল না মিত্র দের তাই প্রথম পুজোয় ঢাক বাজেনি । কালী পুজো শুরু হওয়ার পর মিত্র দের অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন হয়। কলকাতার অন্যতম ধনী এবং বিখ্যাত

পরিবারে উত্তীর্ণ হয় মিত্র রা তবে এখনও মিত্র বাড়ির কালী পুজোয় ঢাক বাজে না।এটাই

নিয়ম হয়ে গেছে।

 

বর্তমানে কালী পুজোর বয়স দুশো বছরের বেশি।

কালীপুজোয় কালীকে নিবেদন করা হয় একশো আটটি অপরাজিতা।আগে বলিপ্রথা

থাকলেও এখন আর নেই।শোনা যায় একবার পুজোর সময়ে বলির ছাগশিশু রাজকৃষ্ণ মিত্রর পায়ের কাছে চলে আসে, তারপর থেকে তারপর থেকে বলি প্রথা বন্ধ হয়।

 

এক সময়ে বহু প্ৰখ্যাত মনীষীর আনাগোনা ছিলো এই বাড়িতে। কালী পুজো দেখতে আসতেন শহরের বহু বিখ্যাত ব্যাক্তি। মিত্র বাড়ির কালী পুজোর সাথে জড়িয়ে আছে স্বয়ং সাধক রামপ্রসাদের স্মৃতি।

 

বাংলার এমন আরো বনেদি বাড়ির ঐতিহাসিক কালী পুজোর কথা থাকবে আগামী দিনে।

ফিরে আসবো কালী কথার পরবর্তী

পর্বে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – সোনার কালী বাড়ির ইতিহাস

কালী কথা – সোনার কালী বাড়ির ইতিহাস

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজ কালী কথায় আপনাদের বর্ধমানের এমন এক ঐতিহাসিক কালী পুজোর কথা জানাবো যে
পুজো বর্ধমান রাজ পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

যদিও দেবীকে এখানে ভুবনেশ্বরী রূপে পুজো করা হয়।এই কালী মন্দির সোনার কালীবাড়ি নামেই বেশি জনপ্রিয়। মন্দির বেশ পুরোনো ১৮৯৯
সালে এই সোনার কালীবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বর্ধমানের রাজা মহতাব চাঁদ।

বাংলার বহু কালী মন্দিরের ন্যায় এই কালী মন্দির তৈরির সাথেও জড়িত দেবীর স্বপ্নাদেশ।
বর্ধমানের রাজার স্ত্রী রানি নারায়ণী দেবী ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক। শোনা যায় ধর্মপ্রাণ স্ত্রী স্বপ্নে দেবীকে দেখে ছিলেন এবং স্বপ্নাদেশ অনুসারে এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়।

সুন্দর শ্বেতপাথর দিয়ে তৈরী এই মন্দির এবং স্ফটিক দিয়ে তৈরী এই মন্দিরের দেওয়ালে বাহারি কারুকাজ আর নকশা খোদাই করা।প্রবেশপথের উঠোনে দুটো বড় আকারের পাতকুয়ো আছে। যা খরা এবং জলাভাবেও কখনও শুকোয় না।আজও এই কুপের জলেই এই মন্দিরের সমস্ত কাজকর্ম হয়। এই পাতকুয়া নিয়েও মানুষের আগ্রহের শেষ নেই।

প্রবেশ পথ লাগোয়া পরিসরে দেখা মিলবে
বহু প্রাচীন এক নহবতখানার যা রাজা স্বয়ং নির্মাণ করিয়ে ছিলেন।শুরুতে এখানকার কালীমূর্তিটি সোনারই ছিল। একবার সেই মূর্তি চুরি যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় বাসিন্দাদের চেষ্টায় নতুন করে দেবী কালীর মূর্তি স্থাপন করা হয়।সোনার কালী মূর্তির জন্যেই এই মন্দিরেরই নামকরণ হয়
সোনার কালীবাড়ি

এই মন্দিরের অন্যতম আকর্ষণ এবং দর্শনীয় বস্তু দেবীর পায়ের কাছে রাখা এক শঙ্খ। যার শব্দে মুখরিত হয় গোটা কালীবাড়ির সন্ধ্যা আরতি। এই শঙ্খের আয়তন বিরাট । প্রায় একহাত লম্বা।জনশ্রুতি আছে যে মহারানি নারায়ণী দেবী সমুদ্রতট থেকে এই শঙ্খ সংগ্রহ করেছিলেন। দেবীমূর্তিতেও রয়েছে বিশেষত্ব। এখানে দেবী কালীর জিহ্বা দেখা যায়না এবং দেবীর পায়ের নীচে মহাদেব নেই কারন দেবী এখানে উগ্র রনং দেহি রূপে নেই।দেবীর শান্ত এবং সৌম মূর্তি এখানে বিরাজ করছে।

সোনার কালীবাড়ী বা ভুবনেশ্বরী মন্দিরে নিত্যপুজো এবং সন্ধ্যা আরতি হয়। ভোগ বিতরণ হয় নিয়মিত।কার্তিক অমাবস্যার কালীপুজোয় এখানে খিচুড়ি ভোগের সঙ্গে থাকে মাছের টকও। বর্তমানে পশুবলি বন্ধ। বদলে হয় চালকুমড়ো বলি। পুজোর বাকি সব রীতি নীতি সেই
আগের মতোই আছে।

ফিরে আসবো কালী কথার আগামী পর্ব নিয়ে থাকবে অন্য এক পুজোর ইতিহাস এবং নানা অলৌকিক ঘটনা।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – পাশকুড়ার ডাকাত কালীর পুজো

কালী কথা – পাশকুড়ার ডাকাত কালীর পুজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ কালী কথার এই পর্বে আপনাদের পাশকুড়ার আড়াইশো বছরের বেশি পুরোনো

শ্রী শ্রী শ্মশান কালী মায়ের পুজোর ইতিহাস জানাবো। এই পুজোকে অবশ্য অনেকে

বেগুনবাড়ি কালী পুজো বলেও জানে।

 

এই এলাকায় কান পাতলে আজও শোনা যায় একটি প্রচলিত লোককাহিনী। এই কাহিনী অনুসারে এখানকার রাজা রাজনারায়ণ রায়ের প্রধান কুস্তিগীর ছিলেন হিনু দিনু নামে দুই ভাই। এই দুই ভাই ছিলেন অতি দরিদ্র তবে খুব বীর এবং সাহসী যে সময়ের কথা সেই সময়ে, কলেরার কোন চিকিৎসা ছিল না। কলেরার প্রকোপে গ্রামের পর গ্রামের মানুষ মারা যেত। একসময় এই এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে হিনু এবং দিনু দুজনেই কলেরা আক্রান্ত হয়ে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাঁচার আশা যখন প্রায় নেই তখন

তারা দেবী কালীর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন  এবং তার পূজা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আরোগ্য কামনা করেছিলেন। বেশ কিছু দিন পর প্রায় অলৌকিক ভাবেই দুই ভাই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।

 

তবে মন্দির তৈরি বা পূজার ব্যবস্থা করার সামর্থ্য তাদের ছিল না। অন্য উপায় না দেখে শেষে এই দুই ভাই তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ডাকাতি শুরু করেন এবং ডাকাতি করে অর্থ উপার্জন করে মায়ের পুজোর সাথে সাথে একটি মন্দিরও তৈরি করেন।

 

সেই সময়ে এখানকার বেগুন ছিলো বিখ্যাত এবং প্রচুর বেগুন চাষ হতো চারপাশে ফলতো এই বেগুন বাড়ি নামেও পরিচিত ছিলো সেই সময়ে তাই কালী মন্দিরের নাম হয়

বেগুনবাড়ি কালী মন্দির।

 

ডাকাতরা যখন এখানে পুজো করতো তখন

নর বলীর কথা শোনা গেলেও বর্তমানে ছাগ বলি প্রথা চালু রয়েছে আগত তীর্থযাত্রী গণ তাদের মানত পূরণের জন্য হাজার হাজার ছাগল বলি দেন এবং বহু মানুষ বিশ্বাস করেন বেগুন

বাড়ির মা কালী সবার মনোস্কামনা পূর্ণ করেন।

প্রতি বছর কালী পুজো এবং অন্যান্য অমাবস্যায় অসংখ্য তীর্থযাত্রী জড়ো হন।

 

এমন বহু জাগ্রত এবং প্রাচীন কালী মন্দির আছে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে। তাদের নিয়ে আছে অসংখ্য গল্প এবং অলৌকিক ঘটনা। সেসব নিয়ে চলতে থাকবে কালী কথা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – দেবী জহুরার মাহাত্ম

কালী কথা – দেবী জহুরার মাহাত্ম

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

দেবী জহুরা বা জহুরা কালী মন্দির মালদা তথা বাংলার অন্যতম প্রসিদ্ধ কালী মন্দির।
আজকের পর্বে জানবো এই দেবী
জহুরার মাহাত্ম।

কিছু ইতিহাস বিদ মনে করেন এই দেবীর পুজোর সূচনা হয়েছিলো সেন বংশের রাজা বল্লাল সেনের আমলে আবার মন্দিরের গায়ে যে পাথরের ফলক আছে তা থেকে অনুমান করা যায়,আজ থেকে তিনশো বছর আগে উত্তরপ্রদেশের কোনো এক মাতৃ সাধক স্বপ্নাদেশ পেয়ে এখানে দেবী জহরা চণ্ডীর বেদি স্থাপন করেছিলেন|

মালদার জহুরা এই প্রাচীন এবং জাগ্রত এই কালী মন্দিরকে কেন্দ্র করে অনেক রহস্যময় ও অলৌকিক ঘটনা প্রচলিত আছে।কেনো কালী মন্দিরের নাম জহুরা কালী মন্দির তার পেছনেও এক রোমাঞ্চকর গল্প আছে।

ইংরেজবাজার থানা এলাকায় একটি প্রাচীন আমবাগানের মধ্যে রয়েছে এই প্রাচীন জহুরা কালীমন্দির।শোনো যায় এক কালে এই অঞ্চলে ছিলো ঘন অরণ্য|ডাকাতরাই একপ্রকার শাসন করতো এই এলাকা এবং এই দেবী এক সময়ে ছিলেন ডাকাতদের আরাধ্যা। এখানে দেবী চণ্ডীর পুজো করে ডাকাতরা যেত ডাকাতি করতে। ডাকাতি করে প্রচুর ধনরত্ন আনত তারা, তারপর সেগুলোকে এখানেই মাটির তলায় রাখত। সেই ধনরত্নের ওপরই দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয় যেহেতু ধনরত্নকে হিন্দিতে বলে ‘জওহর’ বা জহরত তাই দেবীমূর্তির নিচে প্রচুর ধনরত্ন রাখা থাকত বলেই এখানে দেবী চণ্ডী ‘জহরা’ বা ‘জহুরা’ নামে বিখ্যাত|

শোনা যায় বহুকাল আগে এখানে দেবীর পূর্ণ অবয়ব মূর্তি ছিলো তবে বিদেশী শত্রুর আক্রমণের ভয়ে তা মাটির নিচে লুকিয়ে ফেলেন পুরোহিতরা|
বর্তমানে মন্দিরের অভ্যন্তরে লাল রঙের ঢিবির ওপর রয়েছে এক মুখোশ এবং ঢিবির দু’পাশে আরও দু’টি মুখোশ দেখা যায়। এছাড়া গর্ভগৃহে আছে শিব আর গণেশের মূর্তি|এখানে বৈশাখ মাসের মঙ্গল ও শনিবার থাকে বিশেষ পুজোর আয়োজন|উল্লেখযোগ্য বিষয় অন্যান্য কালীমন্দিরের মতো এখানে রাত্রিবেলা কোনো পুজো হয় না পুজো হয় দিনে|

দেবী জহুরা চন্ডিরই রূপ তিনি অত্যন্ত জাগ্রত ও প্রসিদ্ধ তার পুজো উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও বিহার, ঝাড়খণ্ড থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ সমবেত হন এই মন্দির প্রাঙ্গনে|প্রতিটি অমাবস্যা তিথিতে জহুরা কালী মন্দিরে তন্ত্র মতে পুজো হয় এবং বহু দর্শণার্থী আসেন সেই পুজো দেখতে।

আবার কালী কথার পরের পর্বে ফিরে আসবো নতুন কোনো কালী মন্দিরের রোমাঞ্চকর ইতিহাস নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।