Home Blog Page 71

পুরীর মন্দিরের পাঁচটি বিস্ময়

পুরীর মন্দিরের পাঁচটি বিস্ময়

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীর মন্দির ভারতের অন্যতম রহস্যময় মন্দির যেখানে নিত্যদিন ঘটে চলেছে জগন্নাথ লীলা এবং প্রতিদিন এই মন্দিরে আগত ভক্তরা একাধিক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী থাকেন। আজ পুরীর মন্দিরের পাঁচটি বিস্ময়কর তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরবো।

 

সমুদ্রের কাছেই জগন্নাথ মন্দির অবস্থিত।

পুরীর সমুদ্রের গর্জন কে না জানে। অনেক দূর পর্যন্ত সমুদ্রের গর্জন শোনা যায়। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে জগন্নাথ মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করলে সমুদ্রের গর্জন বা ঢেউয়ের কোনও শব্দ শোনা যায় না। কথিত আছে দেবী সুভদ্রা চেয়েছিলেন মন্দিরের ভিতর নীরবতা বজায় থাকবে। তাই মন্দিরের ভিতর সমুদ্রের শব্দ শোনা যায় না।

 

জগন্নাথ মন্দিরের চূড়ায় একটি সুদর্শন চক্র লাগানো রয়েছে।চক্রটির ওজন প্রায় এক টন। ১২ শতকে মন্দিরটি তৈরির সময় এটি চূড়ায় বসানো হয়েছিল। সেই সময় প্রযুক্তি বিশেষ উন্নত ছিল না। ফলে কীভাবে চূড়ার উপর অত ভারী চক্রটি বসানো হল, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।আশ্চর্যজনক বিষয় হল, যে কেউ যে কোনও প্রান্ত থেকে ওই চক্রের দিকে তাকান, মনে হবে চক্রটি তাঁর দিকেই ঘোরানো।

 

জগন্নাথ মন্দিরটি প্রায় ৪ লক্ষ বর্গফুট এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং ২১৪ ফুট উঁচু। অথচ এই মন্দিরের চূড়ার কোনও ছায়া দেখা যায় না। মাটিতে ছায়া না পড়া পুরীর মন্দিরে আরো একটি বড়ো বিস্ময়।

 

পুরীর মন্দিরের একেবারে চূড়ায় একটি পতাকা লাগানো থাকে। আশ্চর্যজনক বিষয় হল যে

দিকে হাওয়া।চলে সবসময় তার বিপরীত দিকে পতাকাটি ওড়ে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় পতাকা

পরিবর্তন হলেও পতাকা ওড়ার দিক কখনো পরিবর্তন হয়না।

 

সব শেষে যে রহস্যটির কথা বলবো তা হলো পুরীর

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের চূড়ায় কখনও কোনও পাখি বসতে দেখা যায় না। এমনকি মন্দিরের উপর দিয়ে কোনও পাখি উড়তে দেখা যায়নি।যেকোনো প্রাচীন মন্দিরে গেলে সর্বত্র পাখির অবাধ বিচরণ দেখা যায় কিন্তু পুরীর মন্দির সে দিক দিয়ে ব্যাতিক্রম।

 

আবার আগামী দিনে ফিরে আসবো রথ

যাত্রা উপলক্ষে এই বিশেষ ধারাবাহিক পর্ব

নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরীর মন্দিরের চারটি দ্বারের রহস্য

পুরীর মন্দিরের চারটি দ্বারের রহস্য

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীর মন্দিরে প্রবেশের চারটি প্রবেশদ্বার রয়েছে।

এই চারটি প্রবেশ দ্বারের রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। আজকের পর্বে এই চারটি দুয়ারের রহস্য জানাবো।

 

কথিত আছে চারটি গেট এই গেটের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে কিছু বিশেষ তাৎপর্য। জগন্নাথ ধাম প্রবেশের

 

এই চার দুয়ার চারটি প্রাণীর প্রতিনিধিত্ব করে এবং তাদের নাম যথা ক্রমে এই রূপ –

‘সিংহ দুয়ার’, ‘ব্যাঘ্র দুয়ার’ , ‘হস্তি দুয়ার’ এবং

‘অশ্ব দুয়ার’

 

পূর্ব দুয়ার বা সিংহ দুয়ার হলো শ্রী জগন্নাথ

মন্দিরে প্রবেশের প্রধান দরজা।নৃসিংহ ভগবানের একটি বিশেষ অবতার। তিনি বিরত্ব এবং পরাক্রমের প্রতীক। আবার সূর্য পূর্ব

দিক থেকে উদিত হয় যা তেজ এবং শক্তির উৎস এই সিংহ দুয়ার প্রধানত ভক্তি বা মোক্ষ লাভের দুয়ার হিসাবে পরিচিত।

 

পশ্চিম দুয়ার বা ব্যাঘ্র দুয়ার হল ইচ্ছার প্রতীক। জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশের পশ্চিম গেটে বাঘের মূর্তি রয়েছে। এই গেট দিয়ে সাধারনত সাধু সন্ন্যাসী এবং বিশেষ ভক্তরা মন্দিরে প্রবেশ করেন।বাঘ যেমন রাজশক্তির প্রতীক তেই তেমনই এই দ্বার

বিশেষ ক্ষমতাকে নির্দেশ করে।

 

পুরীর মন্দিরের উত্তরে আছে দুয়ার বা হস্তি দুয়ার

বিদেশী শত্রুর আক্রমণে এই দ্বার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।পরে আবার তৈরী করা হয়। হাতি সম্পদের দেবী মহা লক্ষ্মীর বাহন তাই সম্পদের প্রতীক হিসাবে, মন্দিরের উত্তর গেটে হাতির প্রতীক ছিল। বিশ্বাস করা হয় এই দরজা দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করলে ধনসম্পদ লাভ হয়।

 

দক্ষিণ দুয়ারটির নাম অশ্ব দুয়ার।

জগন্নাথ ধামে দক্ষিণের প্রবেশ দ্বার বিজয়ের রাস্তা হিসাবে পরিচিত। এই প্রবেশদ্বারের বাইরে দুটি ছুটন্ত ঘোড়ার মূর্তি রয়েছে। প্রাচীনকালে রাজারা যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য প্রভুর আশীর্বাদ নিতে এই দরজা দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করতেন। বিশ্বাস করা হয় এই দরজা দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করলে ইন্দ্রিয় অধীনে থাকে।এখানে দেবী লক্ষ্মী, নৃসিংহ এবং তপস্বী হনুমানের প্রতীক রয়েছে।

 

এইরূপ আরো অনেক অজানা বিষয় এবং বিস্ময়কর তথ্য নিয়ে আমি আপনাদের সামনের ফিরে আসবো রথ যাত্রা উপলক্ষে এই বিশেষ

পর্বগুলিতে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাথদেবের রত্ন ভান্ডার

জগন্নাথদেবের রত্ন ভান্ডার

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ভারতের প্রাচীন মন্দির গুলিতে রয়েছে বহু ধন রত্ন এবং সেই নিয়ে চালু রয়েছে বহু কিংবদন্তী। দক্ষিন ভারতের পদ্মনাভ স্বামী মন্দির বা তিরুপতি বালাজি মন্দিরের পাশাপাশি চার ধামের মধ্যে অন্যতম পুরীর মন্দির একদমই পিছিয়ে নেই।

 

প্রভু জগন্নাথের রয়েছে অগাধ সম্পত্তি। সেই তালিকায় রয়েছে বহু মূল্য হীরে, মূল্যবান অনেক রত্ন, সোনার এবং রুপোর নানা রকম অলংকার।

শুধু জগন্নাথ নন বলরাম এবং সুভদ্রার ও রয়েছে নিজস্ব রত্ন ভান্ডার।

 

বিশেষ বিশেষ সময়ে প্রভুর মাথায় ব্রহ্মজ্যোতি হীরা শোভা পায়।সেই হীরের জ্যোতি কি কেউ খালি চোখে সইতে পারেনা।এছাড়া বলরামের মাথার নীলা বা সুভদ্রার মাথার মানিক, সবই রত্নভান্ডারে গচ্ছিত আছে।বিশেষ বিশেষ সময়ে প্রভুকে সোনার গয়নায় সাজানোর জন্য তার রত্ন ভান্ডার থেকে গহনা বের করে আনা হয় তবে তারও একটা নিদ্দিষ্ট পক্রিয়া আছে।

 

মন্দিরের অভ্যন্তরে কয়েকটি বিশেষ কক্ষে এই অতুল ঐশর্য রাখা আছে। সেখানে বাইরের কারুর প্রবেশের অধিকার নেই।বহুকাল এই রত্ন ভাণ্ডারের সমীক্ষা বা হিসেবে নিকেশ হয়নি। ভারত সরকার একবার উদ্যোগ নিলেও চাবি না পাওয়ার জন্য কাজ স্থগিত রাখতে হয়।বর্তমান সময়েও রত্ন ভাণ্ডারের ধন দৌলতের পরিমান জন সমক্ষে আনার জন্য আলোচনা চলছে তবে শেষ মেষ তা হবে কিনা নিশ্চিত করে বলা যায়না। সবই এক কথায় প্রভু জগন্নাথের ইচ্ছার উপর নির্ভর করছে।

 

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সিংহদুয়ারের ঠিক সামনে ইমার মঠ। সেখান থেকে একাধিক বার উদ্ধার হয়েছে গুপ্তধন।২০১১-তে ও ২০২১-এ, পরপর দু’বার এই মঠ থেকে পাওয়া যায় কয়েক কোটি টাকার সম্পদ উদ্ধার হয় অন্তত ৫০০ রূপোর বাট।

 

ভবিষ্যতে হয়তো প্রভু জগন্নাথের রত্ন ভান্ডারে গচ্ছিত ধন দৌলতের পরিমান ঠিক কতো তা জানা যাবে আরো অনেক রহস্য হয়তো প্রকাশিত হবে।

ততো দিন পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

 

আসন্ন রথ যাত্রা উপলক্ষে সারা সপ্তাহ জুড়ে থাকবে জগন্নাথদেব এবং পুরীর মন্দির নিয়ে আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাথদেবের ভোগ নিবেদন 

জগন্নাথদেবের ভোগ নিবেদন

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীর মন্দিরে জগন্নাথের ভোগ নিবেদন নিয়ে আছে অনেক পৌরাণিক ঘটনা অনেক ইতিহাস এই মন্দিরে ভোগ রান্না থেকে ভোগ নিবেদন সবেতেই আছে বৈচিত্র।আজকের পর্বে এই বিষয় নিয়ে লিখবো।

 

ভগবান বিষ্ণু মর্ত্যলোকে এসে চার ধামে যাত্রা করেন। এই চার ধাম হল- বদ্রীনাথ ধাম,দ্বারিকা ধাম,পুরী ধাম এবং রামেশ্বরম। প্রথমে হিমালয়ের শিখরে অবস্থিত বদ্রীনাথ ধামে স্নান করেন,তারপর গুজরাটের দ্বারিকা ধামে গিয়ে বস্ত্র পরিধান করেন, ওড়িশার পুরী ধামে ভোজন করেন আর সবশেষে রামেশ্বরমে গিয়ে বিশ্রাম নেন।অর্থাৎ পুরী হলো ভগবানের ভোজনের স্থান তাই এই স্থানে ভোগে কিছু বিশেষত্ব থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।

 

পুরীতে জগন্নাথকে অর্পণ করা হয় ছাপান্ন ভোগ।

পুরাণ মতে, যশোদা বালক কৃষ্ণকে আট প্রহর খেতে দিতেন। যখন ইন্দ্রের রোষে গোকুলে মহাপ্রলয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময় প্রাণীদের রক্ষা করতে নিজের কনিষ্ঠ আঙুলে গোবর্ধন পাহাড় তুলে নিয়েছিলেন তিনি। সাতদিন ওইভাবেই তিনি ছিলেন। এই সময়ে তিনি অনাহারে ছিলেন। প্রলয় থামলে যখন কৃষ্ণ ফিরে আসেন তখন

কৃষ্ণকে মা যশোদা সাতদিন ও আট প্রহরের হিসেবে ছাপান্ন টি পদ পরিবেশন করেছিলেন। আর সেই থেকেই ভগবানের ছাপ্পান্ন ভোগ চলে আসছে।

 

জগন্নাথ মন্দিরের একাংশেই হয়েছে বড় রান্নাঘর। সেখানে রয়েছে ৭৫২ টি উনুন, সেখানে এই ভোগ রান্নার কাজ করেন ৩০০-রও বেশি রাঁধুনি। এরাই বংশ পরম্পরায় যুগ যুগ ধরে ভোগ রান্না করেন।

জগন্নাথের ভোগে মূলত দুই ধরনের খাবার দেওয়া হয়। ভাত, ডাল, তরকারি, খিচুড়ি জাতীয় রান্না করা খাবার থাকে। আর থাকে খাজা, গজা, খই, মুড়কি জাতীয় শুকনো খাবার। সব মিলিয়ে ছাপান্ন টি পদ সর্বোচ্চ রান্না হয় এখানে।

 

এখানে দুটি অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করা যায়।

পুরী মন্দিরের প্রতিদিন সমপরিমাণ প্রসাদ রান্না করা হয়। কিন্তু ওই একই পরিমাণ প্রসাদ দিয়ে কয়েক হাজার বা কয়েক লক্ষ মানুষ সকলেরই পেট ভরে যায়।প্রসাদ কখনও কম পড়ে না বা

নষ্ট হয় না।রান্নার প্রক্রিয়াও বেশ মজার। মন্দিরের রান্নাঘরে একটি পাত্রের উপর আর একটি পাত্র এমন করে মোট ৭টি পাত্র আগুনে বসানো হয় রান্নার জন্য। এই পদ্ধতিতে যে পাত্রটি সবচেয়ে উপরে বসানো থাকে তার রান্না সবার আগে হয়। তার নিচে তারপরে রান্না হয়

 

সারাদিনের ভোগে থাকে নানা বৈচিত্র।জগন্নাথ খিচুড়ি খেতে ভালো বাসেন তাই তার জন্য বিশেষ খিচুড়ি তৈরী হয় এছাড়া বাল্যভোগে জগন্নাথদেবকে দেওয়া হয় খই, চিঁড়ে, বাতাসা, মাখন, মিছরি, কলা, দই এবং নারকেল কোরা। এরপর দেওয়া হয় রাজা ভোগ। এই তালিকায় থাকে মিষ্টি চালের খিচুড়ি, ডাল, তরকারি, ভাজা এবং পিঠেপুলি। দুপুরের ভোগ মূলত অন্নভোগ। সেখানে থাকে ভাত, ডাল, শুক্তো, তরকারি ও পরমাণ্ণ। এছাড়াও থাকে ক্ষীর ও মালপোয়া। সন্ধেবেলায় দেওয়া হয় লেবু, দই দিয়ে মাখা পান্তাভাত। সঙ্গে খাজা, গজায এবং নানা ধরনের মিষ্টি। শয়নের আগে মধ্যরাতে ডাবের জল খেয়ে শুতে যান জগন্নাথ।

 

চলতে থাকবে রথযাত্রা উপলক্ষে

জগন্নাথদেব প্রসঙ্গে আলোচনা। আবার রথ

যাত্রার ইতিহাস নিয়ে আগামী পর্বে

ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী সাধনা – কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ

কালী সাধনা – কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রী জাতক

আজ যে পরিচিত কালী মূর্তির বাংলার ঘরে ঘরে পুজো হয় তা এক মাতৃ সাধকের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা পায় এবং তার মাধ্যমেই ডাকাত এবং শ্মশান বাসি তান্ত্রিক কাপালিক দের পূজিতা দশ মহাবিদ্যার এক বিদ্যা দেবী কালী হয়ে ওঠেন ঘরের মেয়ে।
তিনি মহান তন্ত্র সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। আজকের পর্বে তার কালী সাধনা নিয়ে লিখবো।

তন্ত্র সাধক কৃষ্ণানন্দ সপ্তদশ শতকে পশ্চিমবঙ্গের নবদ্বীপে এক পণ্ডিত বংশে জন্মগ্রহণ করেন। মনে করা হয় বাংলার সাধকগণ যখন তন্ত্রের মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছিলেন তখন আদ্যাশক্তি মহামায়া স্বয়ং তাঁকে তন্ত্রশাস্ত্রের পুনরুদ্ধার এবং তাঁর মাতৃরূপিণী বিগ্রহের পূজা করার নির্দেশ দেন।

কৃষ্ণানন্দ ছিলেন তন্ত্র সাধক এবং তন্ত্র মতেই তিনি মাতৃ আরাধনা শুরু করেন।সাধনার শুরুতে কৃষ্ণানন্দ মহামায়াকে বললেন, ‘‘মা, তোমার যে রূপের পূজা আমি করব আমাকে সে রূপ দেখিয়ে দাও’’। তখন মা বললেন, ‘‘যে ভঙ্গীতে আমার এই বিগ্রহের পূজা তোমার দ্বারা প্রচলিত হবে, তা আমি মানবদেহের মাধ্যমেই দেখিয়ে দেব। এই রাত শেষে সর্ব প্রথম যে নারীকে যে রূপে যে ভঙ্গীতে দেখবে, ঐরকম মূর্তিতে আমার পূজার প্রচলন করবে। মায়ের নির্দেশমত পরদিন ভোরে কৃষ্ণানন্দ গঙ্গার দিকে কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর এক শ্যামাঙ্গিনী বালিকাকে দেখতে পান। ওই বালিকা তখন অপরূপ ভঙ্গীতে কুটিরের বারান্দার উপরে এবং বামপদ ভূতলে দিয়ে দাড়িয়ে ছিলেন। তিনি একতাল গোময়যুক্ত ডান হাত এমনভাবে উচু করে ধরেছিলেন যা দেখে বরাভয় মুদ্রার মত মনে হয়েছিল। বাম হাত দিয়ে তিনি কুটিরের দেয়ালে মাটির প্রলেপ দিচ্ছিলেন। তিনি একটি অতি সাধারণ শাড়ি পড়ে ছিলেন। সেই গ্রাম্য রমণী কৃষ্ণানন্দকে দেখে লজ্জায় জিভ কেটেছিলেন।তাঁর এরকম ভঙ্গী দেখে কৃষ্ণানন্দের মায়ের প্রত্যাদেশের কথা মনে পড়ে গেল। তারপরই তিনি মায়ের ঐরকম মূর্তি রচনা করে পূজার প্রচলন করলেন।

অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা রয়েছে এই মহান মাতৃ সাধকের জীবন জুড়ে। শোনা যায় একবার কৃষ্ণানন্দ কোনো এক ধনী ব্যক্তির বাড়ি দুর্গাপূজা করতে গিয়েছিলেন, সেখানে দুর্গাপূজার শেষে ওই বাড়ির কর্তা নিজের অহংবোধের বশবর্তী হয়ে কৃষ্ণানন্দকে বলেন যে তিনি শাস্ত্র মতে প্রতিমার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেননি। কৃষ্ণানন্দ ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন যে তিনি যদি প্রাণপ্রতিষ্ঠা না করে থাকেন এক্ষুনি তার প্রমাণ দেবেন এই বলে কৃষ্ণানন্দ একটি কুশি ছুঁড়ে দেন দেবী প্রতিমার ঊরুতে। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিমার ঊরু ফেটে রক্তপাত হয়।উপস্থিত সবাই সাধকের এই অলৌকিক কীর্তি দেখে হতবাক হয়ে যান।

একাধিক কঠিন সব সাধনা এবং তাতে সিদ্ধি লাভ করে ধীরে ধীরে তন্ত্র জগতে মাতৃ সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তী বা প্রবাদপ্রতিম|তিনি ছিলেন সাধক রামপ্রসাদ সেনের তন্ত্রগুরু।সারা জীবন ব্যাপী তন্ত্র সাধনার পাশাপাশি কৃষ্ণানন্দ তন্ত্রসার ও শ্রীতত্ত্ববোধিনী নামক দুখানা গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছিলেন যা সর্বত্র সমাদৃত হয়েছিলো এবং আজও তন্ত্র সাধনার ক্ষেত্রে বা মাতৃ শক্তির উপাসনার ক্ষেত্রে এই বই দুটির ভূমিকা অপরিসীম|

এরম বহু মাতৃ সাধক বা কালী সাধক জন্মেছেন বাংলার এই পুন্য ভূমিতে। তাদের জীবন এবং সাধনা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকবে।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী সাধনা – সাধক রামপ্রসাদ

কালী সাধনা – সাধক রামপ্রসাদ

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলার কালী সাধক দের মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র সাধক রামপ্রসাদ যিনি একাধারে ছিলেন সাধক এবং শিল্পী। তার সাধন মার্গ ছিলো নানা দিক থেকে ব্যাতিক্রমী। আজ এই মহান সাধকের মাতৃ সাধনা নিয়ে লিখবো।

যদিও তার জন্মতিথি নিয়ে কিছু মত পার্থক্য আছে তবে ধরে নেয়া হয় ১৭২৩ সালে ২৪ পরগণার কুমারহট্টে অর্থাৎ আজকের হালিশহরে রামপ্রসাদের জন্ম। পিতা রামরাম সেন ছিলেন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক। তিনি চেয়েছিলেন ছেলে চিকিৎসক হোক। কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই রামপ্রসাদকে আকর্ষণ করত আধ্যাত্মিক জগৎ দিন রাত ভাব তন্ময় হয়ে কালী চেতনায় ডুবে থাকতেন রামপ্রসাদ। সংসারে তার মন বসতো না। বিষয় আসয় নিয়ে ভাবার তার সময় নেই ইচ্ছেও নেই।একটু বড় হয়ে গান গাইতে, গান লিখতে এবং গানে সুর করার অদ্ভুত প্রতিভা ছিলো তার। স্বরচিত কালী কীর্তন এবং শ্যামা সংগীত ছিলো তার সাধনার মাধ্যম।

বাড়ির ইচ্ছেতে বিবাহ করলেও সেই অর্থে সংসারী হওয়া হয়নি রামপ্রসাদের। পরবর্তীতে তান্ত্রিক যোগী কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তিনি রামপ্রসাদকে তন্ত্রসাধনা ও কালীপুজো পদ্ধতির শিক্ষা দিয়েছিলেন আগমবাগীশ। তবে তন্ত্র মন্ত্রের চেয়ে গানই তাকে বেশি টানতো। কিছুদিন কলকাতায় দুর্গাচরণ মিত্রের কাছারিতে হিসেবে রক্ষকের কাজ করেন রামপ্রসাদ। তবে খুব অল্প দিনেই হালিশহরে ফিরে পঞ্চবটীর আসনে শুরু করলেন মায়ের আরাধনা।

নিজের হাতে ছোট্ট এক ছাউনি তে মাতৃ প্রতিমা গড়ে মায়ের ধ্যান, পূজা, হোম, যজ্ঞ নিয়ে তার দিন কাটতো । মায়ের নাম জপ করতেন অষ্টপ্রহর। এরই ফাঁকে মাকে শোনাতেন স্বরচিত শ্যামাসঙ্গীত। গান গাইতে গাইতে চোখ দিয়ে নেমে আসতো অশ্রু।রামপ্রসাদ রচিত শ্যামাসংগীতে মা কালী ভয়ংকর ও উগ্ররূপিণী দেবী নন। কখনও তিনি মা, কখনও মেয়ে।তার কালী সাধনা ছিলো সহজ সরল এবং আবেগ সর্বস্ব। এই সাধনাতেই তুষ্ট হয়ে মা কালী রামপ্রসাদকে দর্শন দিয়ে ছিলেন।

শোনা যায়, তিনি একবার বাড়িতে নিজে হাতে বেড়া বাঁধছিলেন। সেই সময় কাছেই তাঁর মেয়ে খেলা করছিল। মেয়ের থেকে দড়ি চেয়েছিলেন রামপ্রসাদ। মেয়ে খেলার আনন্দে সেই ডাককে গুরুত্ব দেয়নি। সেই সময়ে দেবী নিজে তাঁর মেয়ের রূপ ধরে রামপ্রসাদের হাতে বেড়ার দড়ি তুলে দিয়েছিলেন। পরে আসল সত্য উপলব্ধি করেছিলেন রামপ্রসাদ। বুঝে ছিলেন তার কালী সাধনা স্বার্থক হয়েছে। তিনি মা কালীর দেখা পেয়েছেন। কন্যা রূপে মা তাকে দেখা দেন।

আবার পরের পর্বে অন্য এক কালী সাধকের জীবন এবং তার সাধনার কথা নিয়ে
ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী সাধনা – ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব

কালী সাধনা – ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

 

বাংলার আধ্যাত্মিক জগতে সব থেকে বেশি আলোচিত হন শক্তির উপাসকরা। আরো সহজ করে বললে বলা যায় বহু অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন মাতৃ সাধক বা কালী সাধকরা এই বাংলার পুন্য ভূমিতে আবীরভূত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই আবার মাকালীর সাক্ষাৎ দর্শন পেয়ে ধন্য হয়েছেন বলে মনে করা হয়। তাদের জীবন তাদের সাধনা এবং তাদের উপলব্ধি নিয়ে আগামী কয়েকটি দিন লিখবো । আজ শুরু করবো

ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেবের কালী সাধনা দিয়ে।

 

রানী রাসমণি দক্ষিনেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠা করার পর দাদা রামকুমারের হাত ধরে গদাধর দক্ষিনেশ্বরে এসে ছিলেন পুরোহিত হিসেবে পুজোর কাজে সাহায্য করতে। প্রথম যেদিন মন্দির বিগ্রহের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন, সেদিন কিন্তু তিনি সাধক ছিলেন না। শুরুর দিকে তিনি নির্জনে ধ্যান জপ করতেন, তন্ময় হয়ে গান গাইতেন, শিবপূজা করতেন এবং মাঝেমধ্যে ভাবসমাধিতেও ডুবে যেতেন। ধীরে ধীরে মা ভবতারিণীর সান্নিধ্যে এসে তার মধ্যে মা কালীর প্রতি অমোঘ টান জন্মায় এবং বহু অভিজ্ঞতা এবং সাধনার মধ্যে দিয়ে গিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন মাতৃ সাধক রামকৃষ্ণ। নিজের অন্তরে উপলব্ধি করলেন কালীকে। মৃন্ময়ী মাতৃ প্রতিমার মধ্যে খুঁজে পেলেন সাক্ষাৎ জগৎ জননীকে।

 

একাধিক বার তিনি মা কালীকে আকুল ভাবে বলতেন ‘মা তুই রামপ্রসাদকে দেখা দিয়েছিস, আমায় কেন তবে দেখা দিবি না? আমি ধন, জন, সুখভোগ কিছুই চাই না, আমায় দেখা দে’অর্থাৎ মা কালী কে সাক্ষাৎ দর্শন করার এক ব্যাকুলতা তার মধ্যে সৃষ্টি হয়ে ছিলো। তার পুজো পক্রিয়া ছিলো ব্যতিক্রমী।পুজোর জন্য সকালে ফুল তুলে মালা গেঁথে দেবীকে সাজাতেই অনেকটা সময় চলে যেত। পূজায় বসে যথাবিধি নিজের মাথায় একটা ফুল দিয়েই ধ্যানস্থ হয়ে মাঝে মাঝে বসে থাকতেন আবার অন্ননিবেদন করে মা গ্রহণ করছেন ভেবে অনেকক্ষণ কাটিয়ে দিতেন । দেবীকে প্রসন্না করতে কখনও পূজার মাঝখানে গান ও গেয়ে উঠতেন।কাঁদতে কাঁদতে চোখের জলে বুক ভেসে যেত মাঝে মাঝে।তার এই মতী গতি দেখে অনেকেই তাকে পাগল ভাবতেন। অনেকে সমালোচনা করতেন আবার বিজ্ঞ জনেরা বুঝতেন এ মহান সাধকের লক্ষণ।

 

তার এই ভাব তন্ময় অবস্থা দিনে দিনে চরম পর্যায় যায়।কখনো পূজাসন ছেড়ে মা-র কাছে গিয়ে তাঁর চিবুক ধরে আদর করছেন। নানা রকম পরিহাস করছেন। হাত ধরে নাচছেন।পূজা না করে ভোগ নিবেদন করে দিচ্ছেন কিংবা নিবেদিত ভোগ নিজহাতে দেবীকে খাওয়াতে যাচ্ছেন আবার কখনো নৈবেদ্যর খানিকটা নিজেই খেয়ে দেবীকে খাওয়াতে চেষ্টা করছেন। বৈষ্ণব দর্শনে এই অবস্থা কে বলে সখা ভাব। অর্থাৎ ভক্ত এবং ভগবানের মধ্যে তৈরী হয় এক প্রকার বন্ধুত্ব মুছে যায় সব রকম ভেদাভেদ।

 

পরবর্তীতে ঠাকুর তন্ত্র সাধনা করেছেন। ইসলাম এবং খিস্টান মতে সাধনা করেছেন। আবার তোতা পুরী মহারাজের সান্নিধ্যে এসে দীক্ষা ও নিয়েছেন। সব শেষে তিনি আবিষ্কার করেছেন যত মত ততো পথ। সব পথ গিয়ে সেই পরম শক্তিতে মিশেছে সেই শক্তি তার কাছে মা কালী স্বয়ং যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে মাতৃ রূপে। স্বয়ং মা সারদার মধ্যেও তিনি মা কালীকে দেখছেন তার পুজোও করছেন তিনি।

 

এমন বহু মাতৃ সাধক আছেন যাদের জীবন জুড়ে আছে অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা এবং আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। আগামী পর্বে আবার এক মাতৃ সাধক এবং সাধনা নিয়ে আলোচনা করবো বিশেষ

এই পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

অম্বুবাচি মেলা বা অম্বুবাচি উৎসব

অম্বুবাচি মেলা বা অম্বুবাচি উৎসব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

প্রায় সারা দেশ বিশেষ করে পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে অম্বুবাচির এই কয়েকটা দিন কে নানা ভাবে পালন করা হয় তবে আসামে এটি সর্ব

বৃহৎ উৎসব।কামাখ্যা মন্দিরের কাছে অনুষ্ঠিত অম্বুবাচী মেলা হল পূর্ব ভারতের অন্যতম বড় ধর্মসভা যা সনাতন ধর্মের মানুষদের এক বিরাট মিলন উৎসব বা মেলার রূপ নেয়।

 

দেবী কামাখ্যা মাতৃ শক্তিকে মূর্ত করে। প্রতি

বছর আষাঢ় মাসের সপ্তমী থেকে দশম দিন পর্যন্ত অম্বুবাচীর সময়কালে মন্দিরের দরজা সকলের জন্য বন্ধ থাকে। অম্বুবাচির নিবৃত্তির আবার আনুষ্ঠানিক ভাবে দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং সেই দিন মন্দির চত্বরে একটি বড় মেলা বসে।

এই সময়ে দেশের এই অঞ্চলে বর্ষার আগমন ঘটে এবং বৃষ্টির জল পৃথিবীকে উর্বর করে তোলে এবং পুনরায় প্রজননের জন্য প্রস্তুত হয় ধরিত্রী।

 

পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত কামাখ্যা মন্দির যেখানে অবস্থিত সেখানেই পতিত হয়েছিলো দেবীর যোনি তাই অম্বুবাচি উৎসব এই অঞ্চলের প্রধান উৎসব

তবে সারা ভারত, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং আসাম থেকে হাজার হাজার মানুষ

এই উৎসবটি দেখতে আসেন এবং দেবীর কাছ থেকে আশীর্বাদ গ্রহণ করেন।

 

এই স্থানটি তন্ত্র সাধনার জন্যও খুব বিখ্যাত।

অম্বুবাচি উপলক্ষে বহু তন্ত্র সাধক আসেন এখানে।

আজও এখানে একটি গুপ্ত তান্ত্রিক সমাজ রয়েছে বলে মনে করা হয় এবং তাদের সমস্ত তান্ত্রিক আচার অনুষ্ঠান গোপনে পরিচালিত হয় কোন রূপ বাহ্যিক প্রদর্শন নেই অম্বুবাচি মেলায় তাদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকেন বলে ধরে নেয়া হয়।

 

সেদিক দিয়ে দেখতেগেলে অম্বুবাচি উৎসব বা অম্বুবাচি মেলা আধ্যাত্মিক জগৎ বিশেষ করে তন্ত্র জগতের সব থেকে বড়ো মিলন উৎসব।

 

আগামী পর্বে আবার আধ্যাত্মিক এবং

শাস্ত্রীয় কোনো বিষয় সম্পর্কে বিশেষ পর্ব সাথে

নিয়ে ফিরে আসবো পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

অম্বুবাচীর শাস্ত্রীয় বিধি নিষেধ

অম্বুবাচীর শাস্ত্রীয় বিধি নিষেধ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

অম্বুবাচী উৎসব নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলাম আগেই আজকের পর্বে আলোচনা করবো অম্বুবাচী সংক্রান্ত নানা শাস্ত্রীয় নিয়ম কানুন এবং তার তাৎপর্য।জানাবো এই সংক্রান্ত নানা বিধি নিষেধ এবং তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য|

 

শাস্ত্র মতে অম্বুবাচীর প্রথম তিন দিন কৃষি কাজ ছাড়াও আরো অনেককিছুই করা নিষেধ। এই সময় কোনো শুভ বা মাঙ্গলিক কাজের সূচনা করা হয়না যেমন বিবাহ,অন্নপ্রাসন গৃহ প্রবেশ বা মন্দিরের স্বাভাবিক পূজাঅর্চনা ইত্যাদি|

 

আসলে এই বিশেষ সময় ধরিত্রী যেহেতু ঋতুমতী হয় তাই লৌকিক আচার বা প্রথা গুলিকে সাময়িক ভাবে স্থগিত রাখা হয় এর পেছনে আছে বা বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং হাজার হাজার বছরের প্রাচীন পরম্পরা সাথে শাস্ত্রীয় বিধান|যদিও চতুর্থ দিন অম্বুবাচির নিভৃতির পর থেকে শুভ কাজে আর কোনো রকম বাধা থাকেনা|

 

শাস্ত্র মতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও কয়েকটি বিধি নিষেধ এই অম্বুবাচী চলাকালীন মেনে চলা শ্রেয় যেমন আদি শক্তির বিভিন্ন রূপকে যারা পূজা করেন অর্থাৎ কালী, চন্ডি, দূর্গা জগদ্ধাত্রী ইত্যাদি তারা দেবীমূর্তি কে একটি লাল কাপড়ে ঢেকে রাখতে পারেন |এই সময় দেবী মূর্তিকে স্পর্শ করা বা মন্ত্রউচ্চারণ করা উচিৎ নয়|যারা দীক্ষিত তারা গুরু পূজা করতে পারেন এছাড়া জপ চলতে পারে তাতে কোনো দোষ নেই|গৃহী রা এই সময় কয়েকটি নিয়ম মেনে চললে গৃহের কল্যাণ হয় যেমন নতুন বৃক্ষ রোপন না করা বা দাম্পত্য জীবনে সংযম এবং শুদ্ধতা বজায় রাখা ইত্যাদি।

 

গ্রাম বাংলার বহু স্থানে নিষ্ঠার সাথে অম্বুবাচী পালন করা হয়|সাধারণত বিধবা মহিলারা অম্বুবাচী চলা কালীন আগুন জ্বালিয়ে খাবার রান্না করেন না|যারা ব্রহ্মচর্য পালন করেন তাদের এই সময় আমিষ খাবার বর্জন করে মূলত ফল মুল খেয়ে থাকতে হয়|এই কটাদিন বেদ পাঠ করা যায়না এবং উপনয়ন অনুষ্ঠান করা যায়না|অম্বুবাচীর আগের দিনটিকে বলা হয় ‘অম্বুবাচী প্রবৃত্তি’। তিন দিনের পরের দিনটিকে বলা হয় ‘অম্বুবাচী নিবৃত্তি’ যার পর আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সূচনা হয় ধীরে ধীরে|

 

অম্বুবাচী নিবৃত্তির সময় তন্ত্র সাধনা এবং শাস্ত্র মতে গ্রহ দোষ খণ্ডনের উপযুক্ত সময় |যারা শাস্ত্র মতে গ্রহের প্রতিকার করাতে চান তারা চাইলে এই সময়কে কাজে লাগাতে পারেন।

 

আগামী পর্বে আবার অম্বুবাচি সংক্রান্ত একটি বিশেষ পর্ব নিয়ে আপনাদের সামনে আসবো। থাকবে অম্বুবাচি উৎসব বা অম্বুবাচি মেলা নিয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

স্নান যাত্রার মাহাত্ম

স্নান যাত্রার মাহাত্ম

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীর মন্দিরে অবস্থিত জগন্নাথ বিগ্রহ সব দিক দিয়ে বৈচিত্র পূর্ণ। তিনি সাক্ষাৎ জগতের নাথ।

প্রতিনিয়ত তিনি নানা লীলার মাধ্যমে নিজের নিজের দিব্য উপস্থিতি প্রমান করে চলেছেন। তার এমনই এক লীলা এই স্নান যাত্রা যা এই দেবস্নান পূর্ণিমায় প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়।

 

স্কন্দপুরাণ অনুসারে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন যখন কাঠের দেবতাদের স্থাপন করেছিলেন তখন তিনি এই স্নান অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। এই দিনটিকে ভগবান জগন্নাথের আবির্ভাব তিথি বলে মনে

করা হয়।যেহেতু এই তিথিতে জগন্নাথ দেব স্নান করেন তাই এই এই পূর্ণিমা তিথি দেবস্নান পূর্ণিমা নামে পরিচিত।

 

জগন্নাথকে তাঁর আদি রূপ অর্থাৎ নীলমাধব রূপে পূজা করছিলেন বিশ্ববাসু নামে একজন সাভার প্রধান। আজও জগন্নাথের অঙ্গ সেবক দের সাথে মিলে সাভার জাতীর লোকেরা স্নান যাত্রার আয়োজন করেন।প্রথা মেনে স্নান যাত্রার আগের দিন জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার মূর্তি আনুষ্ঠানিকভাবে গর্ভগৃহ থেকে স্নান-বেদীতে নিয়ে আসা হয়। পুরীর মন্দির চত্বরে এই বিশেষ প্যান্ডেলটিকে বলা হয় স্নান মন্ডপ।

 

স্নানের আগের দিন যখন দেবতাদের শোভাযাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়, তখন পুরো প্রক্রিয়াটিকে পাহান্দি বা পাহান্ডি বিজয় বলা হয়। স্নানের দিন মঙ্গলা আরতির পরে তামা ও সোনার একশত ত্রিশটি পাত্রে সোনা কুয়া নামক বিশেষ কূপ থেকে জল আনতে একটি আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রায় যায়। তারপর সেই জল চন্দন, আগুরু, ফুল, সুগন্ধি এবং ভেষজ ঔষধি দিয়ে শুদ্ধ করা হয়।

ভরা পাত্রগুলি ভোগ মন্ডপ থেকে স্নান বেদী পর্যন্ত

নিয়ে আসার রীতিকে বলা হয় ‘জলধিবাসা’

তারপর একশো আট কলস জলে স্নান করানো হয় জগন্নাথকে

 

স্নান যাত্রার পরে, দেবতাদের পনের দিনের জন্য জনসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দূরে রাখা হয় এবং এই সমস্ত দিনগুলিতে মন্দিরের দৈনন্দিন অনুষ্ঠান স্থগিত থাকে। এই অনুষ্ঠানের পরে তাকে এক পাক্ষিক দেখা যায় না। মন্দিরের ভিতরে রতন বেদী নামে একটি বিশেষ “অসুস্থ ঘরে” দেবতাদের রাখা হয়। এই সময়কে বলা হয় ‘অনাবাসর কাল’ অর্থাৎ উপাসনার অনুপযুক্ত সময়। ভগবান জগন্নাথকে স্নান করানোর পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চৌদ্দ দিন বিশ্রামে থাকেন। তারপর রথযাত্রা পর্যন্ত তাকে বিশেষ যত্নে রাখা হয় এবং বৈদ্যরা তার সেবা সুশ্রসা করেন।

 

সুস্থ্য হয়ে রাজ বেসে সুসজ্জিত রথে প্রভু পথে নামেন তার ভক্তদের দর্শন দিতে।শাস্ত্র মতে স্নান যাত্রা এবং রথ যাত্রা এই দুই তিথিতে সবাই তাকে দর্শন করতে পারেন এবং এই সময়ে তার দর্শন পেলে জন্ম জন্মান্তরের পাপ খণ্ডন হয় এবং পরম পুন্য লাভ হয়।

 

আবার রথ যাত্রা উপলক্ষে জগন্নাথ প্রসঙ্গে বিশেষ আধ্যাত্মিক আলোচনা নিয়ে ফিরে আসবো। চলতে থাকবে অম্বুবাচি নিয়ে শাস্ত্রীয়

আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।