Home Blog Page 71

একান্ন পীঠ – গুহ্যেশ্বরী

আজকের একান্ন পীঠ পর্বে আলোচনা করবো শক্তিপীঠ গুহ্যেশ্বরী নিয়ে এই মন্দিরটি নেপালের কাঠমাণ্ডুতে অবস্থিত।
পুরান মতে গুহ্যেশ্বরী মন্দিরটি যেখানে অবস্থিত, সেখানে দেবীর যোনি পতিত হয়েছিল।
গুহ্য শব্দের মানে ‘যোনি’ আর ঈশ্বরী হলেন ‘দেবী’। মন্দিরের অভ্যন্তরে একটি কলস দেবী রূপে পূজিত হন। কলসটি স্বর্ণ ও রৌপ্য এর স্তর দ্বারা আবৃত। মূল মন্দিরটি একটি খোলা প্রাঙ্গণের কেন্দ্রে অবস্থিত।মন্দিরের চূড়ায় চারটি সোনালি সর্প আছে।মন্দিরের দেবী গুহ্যকালী নামেও পরিচিতা।
মনে করা হয় গুহ্যেশ্বরী মন্দিরটি পশুপতিনাথ মন্দিরের শক্তির উৎস । সতেরশ শতকে নেপালের রাজা প্রতাপ মল্ল মন্দিরটি নির্মাণ করেন।
সংস্কৃত শব্দ ‘গুহ্য’ ও ‘ঈশ্বরী’ সন্ধিযুক্ত হয়ে গুহ্যেশ্বরী নামটি গঠন করেছে। ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ এর ললিতা সহস্রনাম অধ্যায়ের ললিতা দেবীর উল্লিখিত সহস্র নামের মধ্যে ৭০৭ তম নামটি হচ্ছে “গুহ্যরূপিণী” যার অর্থ যে দেবীর মাহাত্ম্য মানুষের উপলব্ধির বাইরে এবং যা গুপ্ত। মতান্তরে নামটি ষোড়শী মন্ত্রের ষোড়শ অক্ষর হতে উদ্ভূত। কিছু শাস্ত্রজ্ঞ মনে করেন যোনি নয় দেবীর হাঁটু এই স্থানে পড়েছিল।
গুহ্যেশ্বরী মন্দিরের শক্তি হলেন ‘মহাশিরা’ আর দেবীর ভৈরব হলেন ‘কাপালী’। এই মন্দিরটি তান্ত্রিকদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং এখানে বিবিধ তান্ত্রিক ক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। তন্ত্রশক্তি লাভের জন্য এই মন্দিরটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে কালীতন্ত্র, চণ্ডীতন্ত্র ও শিবতন্ত্ররহস্য গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু হিন্দু নয় বৌদ্ধদের কাছেও এই দেবীর বিশেষ মাহাত্ম রয়েছে।বজ্রযান বৌদ্ধগণ দেবী গুহ্যেশ্বরীকে বজ্রবরাহী রূপে পুজো করেন।
প্রায় সারা বছর এখানে দর্শণার্থীদের ভিড় লেগে থাকে এবং বিজয়া দশমী ও নবরাত্রির সময় মন্দিরে প্রচুর ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম হয়।
আবার আগামী পর্বে ফিরে আসবো অন্য একটি শক্তিপীঠ নিয়ে। থাকবে আধ্যাত্মিক এবং পৌরাণিক ব্যাখ্যা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্নপীঠ – কুরুক্ষেত্র

পীঠ নির্ণয় গ্রন্থ মতে একান্ন পীঠের পঞ্চাশতম শক্তিপীঠটি অবস্থিত হরিয়ানার কুরুক্ষেত্রে। অন্নদা মঙ্গল এবং শিব চরিতেও এই সতী পীঠের উল্লেখ আছে।
শক্তি পীঠ কুরুক্ষেত্রকে সাবিত্রীপীঠ ও বলা হয় কারন দেবী এখানে স্বাবিত্রী রূপে বিরাজ করছেন।
দেবীর ভৈরবের নাম থানেশ্বর।পুরান মতে দেবীর ডান পায়ের গোড়ালি এখানে পড়েছিল।
এই কুরুক্ষেত্র ময়দানে মহাভারতের পান্ডব এবং কৌরব দের যুদ্ধ হয়েছিলো এবং কথিত আছে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরুর আগে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে পঞ্চপাণ্ডব এখানে এসেই দেবীর আরাধনা করেছিলেন। স্মারক হিসেবে নিজেদের ঘোড়াগুলিও দান করেন। আর সেই থেকেই এখানে কোনও কিছু মানত করার আগে ধাতব ঘোড়া দান করার রীতি শুরু হয় যা আজও চলছে।
হরিয়ানার কুরুক্ষেত্র জেলায় দ্বৈপায়ন হ্রদের মনোরম এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশে মা স্বাবিত্রীর
এই মন্দির অবস্থিত।পুরান মতে পরশুরাম ধরিত্রীকে ক্ষত্রিয় শুন্য করার পরে এই হ্রদের জলে পিতৃ পুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পন করেছিলেন।
শাস্ত্র মতে দেবী সাবিত্রী সূর্য্য কন্যা এবং তিনিই গায়েত্রী মন্ত্রের অধীস্টাত্রী দেবী। তার আশীর্বাদে বৈকুণ্ঠ লাভ হয় বলেও বিশ্বাস।
এখানে মায়ের ‘কঠোর রূপ’ বা উগ্র রূপ দেখা যায়।দেশের প্রাচীনতম মন্দিরগুলির মধ্যে এটি একটি। মন্দিরে ঢোকার আগে শ্বেতপাথরের পা এর একটি অবয়বও রাখা আছে।
ভক্তরা আগে সেখানে পুজো করে তারপর মন্দিরে প্রবেশ করেন।সারা বছরই এখানে নিত্যপুজোর ব্যবস্থা থাকলেও কালীপুজোর তিথি ধরে এখানে হয় দেবীশক্তির আরাধনা। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, পবিত্র মনে কালিকাদেবী মায়ের কাছে যা চাওয়া হয় মা সেই মনস্কামনাই পূরণ করেন।
আজ এই শক্তি পীঠ নিয়ে এইটুকুই।ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য একটি শক্তি পীঠ নিয়ে।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – শোনদেশ

আজকের পর্বে লিখবো একান্নপীঠ  শোন্দেশ নিয়ে। দেবীর মন্দিরটি মধ্যপ্রদেশের অমরকন্টক এ অবস্থিত। পুরান অনুসারে এখানে দেবী সতীর ডান নিতম্ব পড়েছিল। এই শক্তি পীঠে নর্মদা রূপে বিরাজ করছেন। দেবীর ভৈরব হলেন ভদ্রসেন।

 

পুরানে মতে মহাদেব যখন ত্রিপুর অর্থাৎ তিনটি প্রাচীন নগরীকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ভষ্মিভূত করেছিলেন সেই সময় কিছু ভস্ম অথবা ছাই পড়েছিল কৈলাসে। কিছুটা পড়েছিল অমর কণ্ঠকে আর কিছুটা ছাই মহাদেব নিজে স্বর্গে সঞ্চিত রেখেছিলেন। এছাড়াও মনে করা হয় যে, যে ভস্ম অর্থাৎ ছাই অমর কন্ঠকে পড়েছিল তা থেকে পরে কোটি কোটি শিবলিঙ্গ সৃষ্টি হয়েছে।তাই এই পীঠটি একাধারে শক্তি পীঠ আবার শৈব্য তীর্থ।

 

মহাভারতের বনপর্বে এই পীঠের উল্লেখ আছে।

ঋষি পুলস্থ রাজা যুধিষ্টিরকে বলেছিলেন এই পবিত্র স্থানে নর্মদা নদীতে স্নান করলে অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ হয়।আজও বিশ্বাস করা হয় যে অমরকন্টক এই জায়গাটিতে দেবতাদের বাসস্থান তাই এখানে যার মৃত্যু হবে সে সরাসরি বৈকুণ্ঠ যাত্রা করবে।

 

এই শোন্দেশ শক্তি পীঠ তথা নর্মদা মন্দিরটি আজ থেকে প্রায় ছয় হাজার বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল। মন্দিরের ভিতরের বেদীতে দেবী বিরাজ করছেন। সুন্দর এই বেদীটি রূপা দিয়ে তৈরি।

প্রাচীন কালে তৈরী এই মন্দিরের কারুকার্য এবং ভাস্কর্য আজও বিস্ময় জাগায়।মন্দিরের চারপাশে ছোট ছোট আরও অনেকগুলি পুষ্করিণী অথবা পুকুর আছে।মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নর্মদা নদী এবং কাছেই বিন্ধ্য পর্বত আর সাতপুরা পর্বত একসাথে মিশেছে।সব মিলিয়ে ওই শক্তি পীঠ সংলগ্ন প্রাকৃতিক পরিবেশ অতি মনোরম।

এই মন্দিরের পাশেই রয়েছে মাঈ কি বাগিয়া অর্থাৎ দেবী মায়ের বাগান। জনশ্রুতি আছে যে এই বাগানে নাকি দেবী নর্মদা নিয়মিত

ফুল তুলতে আসেন।

 

শোনদেশ শক্তি পীঠে সারা বছরই পূজা হয়

এবং প্রতিদিন ভক্তদের ভিড় লেগে থাকে।

তাছাড়া এই শক্তিপীঠ মহাশিবরাত্রি পালনের জন্য খুবই বিখ্যাত।

 

আগামী পর্বে আবার ফিরে আসবো অন্য একটি শক্তি পীঠের কথা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বর্ধমানের তীর্থখেত্রে

শিরোনাম থেকেই নিশ্চই বুঝতে পারছেন আজ আপনাদের সাথে আমার সাম্প্রতিক তীর্থ দর্শনের কিছু অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধি ভাগ করে নেবো।
বেশি দূর নয় এই কাছেই বর্ধমান গেছিলাম গোটা পরিবার নিয়ে, উদ্দেশ্য কয়েকটি মন্দির পরিদর্শন এবং কিছু মানুষের যথা সাধ্য পাশে দাঁড়ানো।


প্রথমেই বলবো বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দিরের কথা।টেরাকোটার কাজের অপূর্ব নিদর্শন এই সর্বমঙ্গলা মন্দির।কথিত আছে, প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর আগে বর্ধমানের উত্তরাংশে বাহির সর্বমঙ্গলা পাড়ায় বাগদিরা পুকুরে মাছ ধরতে গিয়ে জেলেরা এই শিলামূর্তি রুপী মা সর্বমঙ্গলা দেবীকে খুঁজে পান।পরবর্তীতে রাজা স্বপ্নাদেশ পেয়ে দেবীকে মন্দির বানিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন।বর্তমানে সিংহবাহিনী দুর্গাই পুজিত হন সর্বমঙ্গলা রূপে। তিনশো পয়ষট্টি দিনই সর্বমঙ্গলা মন্দিরে পুজো হয়।আজ দেবীকে কাছ থেকে দর্শন করে ধন্য হলাম।শুধু তাই নয় আমার নিবেদন করা শাড়িতে মাকে সাজানো হলো। সন্ধ্যা আরতি ও পুজো দেখার সৌভাগ্যহলো।

এর পর দু’হাজার বছরেরও বেশি পুরনো নব রত্ন মন্দিরে স্থাপিত দেবী কঙ্কালেশ্বরীকে দর্শন করতে গেলাম।বর্ধমানের মহারাজ বিজয়চাঁদ মহাতাবের উদ্যোগে এই মূর্তি অতি প্রাচীন কাঞ্চন নগরের মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়। শোনা যায় এক
ধার্মিক পরিব্রাজক কমলানন্দ মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি দামোদরের তীরে থেকে শীলয় খোদাই করা মাতৃ মূর্তি উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিলেন।
বহু তীর্থে ঘুরেছি তবে কালো পাথরে ফুটে ওঠা এমন কঙ্কালসার দেবী মূর্তি বাংলায় আর কোথাও আমি অন্তত দেখিনি।অদ্ভুত এক ভক্তি এবং শ্রদ্ধা জাগরিত হয় এই মন্দির প্রাঙ্গনে এসে দাঁড়ালে। এই অনুভূতি ঠিক শব্দে প্রকাশ করার বিষয় নয়।

বর্ধমান এসে বর্ধমানেশ্বর যাবোনা তাই আবার হয় নাকি। অবশ্য মোটা শিব নামেই এই শিব মন্দির বেশি বিখ্যাত। আকার আয়তনে বিশাল এই
শিব লিঙ্গ।শোনা যায় কুশান যুগে রাজা কণিষ্ক এই শিবলিঙ্গ পুজো করতেন।শুনেছি শিবরাত্রিতে এখানে বিরাট মেলা বসে। যদি ভবিষ্যতে কখনো সুযোগ হয় অবশ্যই শিব রাত্রিতে আসবো এখানে।

আরো একটি শৈব্য ক্ষেত্র আজ ঘুরে দেখলাম।
বর্ধমানের নবাবহাটে প্রায় দুশো তিরিশ বছর আগে বহু অর্থ ব্যয় করে জপ মালার আকারে একশো আটটি শিব মন্দির গড়েছিলেন বর্ধমানের এক মহারানি।বর্ধমানের একশো আট মন্দিরের খ্যাতি এখন ভারত জোড়া। সারা বছর দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে ভক্তরা এই মন্দিরে পুজো দিতে আসেন।আমিও আজ এই অপূর্ব মন্দির দর্শন করে ধন্য হলাম।

তারাপীঠ বললেই যেমন বামা ক্ষেপার কথা মনে আসে বা দক্ষিনেশ্বর বললেই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তেমনই বর্ধমানে এলে মনে পরে মাতৃ সাধক কমলা কান্তের কথা। আজ আজ এই বিখ্যাত এবং অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন মাতৃ সাধকের মন্দির দর্শন করার সৌভাগ্য অর্জন করলাম।এই মন্দিরে পঞ্চমুণ্ডির আসনে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন কমলাকান্ত। তাঁর ইচ্ছা ছিল, মৃত্যুর পর মায়ের চরণতলে তাঁকে ঠাঁই দেওয়া হয় এবং মায়ের থেকে তাঁকে যেন কোনওভাবেই আলাদা না করা হয়। সেই ইচ্ছানুসারে, তাঁর সমাধির উপরই প্রতিষ্ঠা করা হয় মায়ের মূর্তি ও মন্দির। কমলাকান্তকালী বাড়িতে ধাতুর তৈরি এক অনিন্দ সুন্দর মূর্তি আছে যার দর্শন দেহ মনে এক অপার্থিব আধ্যাত্মিক রোমাঞ্চ জাগায়।

সব শেষে বলবো শুধু মন্দির আর মূর্তি দর্শন নয়। শিব জ্ঞানে জীব সেবার আদর্শ কে সামনে রেখে কিছু মানুষকে আহার করিয়ে বা ভান্ডারার আয়োজন করতে পেরে এবং কিছু বস্ত্র তাদের তুলে দিতে পেরে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করছি। এই কাজে আমার সহ যাত্রী অর্থাৎ আমার পরিবারের সদস্য এবং সর্বপরি সংশ্লিষ্ট মন্দির কতৃপক্ষর সহযোগিতার জন্য তাদের আমার ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাই।

যখনই সুযোগ আসবে আবার তীর্থে যাবো।আবার মানুষের পাশে দাঁড়াবো। আবার যথা সময়ে সেই তথ্য আপনাদের সাথে ভাগ করে নেবো। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – হিংলাজ

আজ শক্তি পীঠ হিংলাজ নিয়ে লিখবো ।
পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে একান্ন পীঠের অন্যতম প্রধান পীঠ হিংলাজ অবস্থিত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানে।পাকিস্তানের বালোচিস্তান প্রদেশের লাসবেলা জেলায় হিঙ্গোল নদীর ধারে এই
শক্তি পীঠটি রয়েছে।
পাকিস্তানে হিন্দুরা ছাড়াও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দেবীর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা এবং
ভক্তি দেখা যায় তারা দেবী হিংগুলা বা দেবী কোট্টরা কে ‘নানী’ বলে ডাকে। মন্দিরের দেবীর নামেই পুরো গ্রামটির নাম হয়ে গিয়েছে হিংলাজ গ্রাম।
শাস্ত্র মতে এই স্থানে দেবী সতীর ব্রহ্মরন্ধ্রটি পড়েছিল তাই দেবীকে এখানে “কোট্টারী” রূপে পুজো করা হয়। দেবীর ভৈরবকে এখানে “ভীমলোচন” রূপে পূজা করা হয়।
পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে হিংলাজ পীঠস্থানটি একান্ন পীঠের প্রথম পীঠ। কুলার্ণব তন্ত্র মতানুসারে আঠারোটি পীঠের তৃতীয় পীঠ আবার কুব্জিকা
তন্ত্র গ্রন্থ অনুসারে বিয়াল্লিশটি সিদ্ধপীঠের
পঞ্চম পীঠ এটি।
এক সময়ে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে মরুভুমির মধ্যে দিয়ে উটের পীঠে চেপে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এই মন্দিরে যেতে হতো। এই কষ্ট সাধ্য যাত্রা নিয়ে একটি সিনেমাও হয়েছে যার নাম মরুতীর্থ হিংলাজ
ওই তীর্থ যাত্রাকে স্থানীয়র বলতো “নানী কি হজ “
শাস্ত্র মতে রাবন কে বধ করে রামের যখন
ব্রহ্ম হত্যার পাপ হয়েছিলো তখন এই হিংলাজ শক্তি পিঠে এসে দেবীকে দর্শন করে সেই পাপ
দূর হয়েছিলো।
দুর্গম অঞ্চলে একটি গুহায় দেবী ও তার ভৈরব অবস্থান করছেন। দীর্ঘ সিঁড়ি অতিক্রম করে সেখানে প্রবেশ করতে হয়। একটি বেদীতে
শিলা রূপে দেবী অধিষ্টান করছেন।
এখানে সিঁদুর দানের রীতি আছে।
বাস্তবে হিংগুলা শব্দের অর্থই সিঁদুর।
বহু ভক্ত এখানে আসেন নিজের মনোস্কামনা নিয়ে এবং বিশ্বাস করেন তাদের সব দুঃখ কষ্ট দূর হবে
দেবীর আশীর্বাদে।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। সাথে থাকবে অন্য একটি শক্তি পীঠের মাহাত্ম এবং
পৌরাণিক ব্যাখ্যা।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – খাদান কালী

শিল্প নগরী দুর্গাপুরে রয়েছে এক অদ্ভুত কালী মন্দির যে মন্দিরে কালীমাকে স্থানীয়রা খাদান কালী বলে ডাকেন। আজকের পর্বে জানাবো এই মন্দিরের ইতিহাস। শুরু করবো একটি
অলৌকিক ঘটনা দিয়ে।
সময়টা ষাটের দশক। খাদান অঞ্চলে একটি কয়লা বোঝাই ট্রাক খনিগর্ভে পড়ে যায়। ট্রাকটি তুলতে বড় বড় ক্রেন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু যতবারই ট্রাকটি তুলতে যায় ততবারই ক্রেনের শেকল ছিঁড়ে যায়। কলকাতা থেকে লোকজন নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যায়। খনির পাশেই ছিল ঝোঁপজঙ্গলে ঘেরা উঁচু ঢিপিতে মা কালীর এক বেদী। কোলিয়ারির ম্যানেজার ছিলেন বেজায় কালী ভক্ত তিনি সেই কালী মায়ের কাছে মানত করেন ট্রাকটি উদ্ধার করার জন্য। এরপরে নাকি সহজেই ট্রাকটি উদ্ধার করা যায় খাদ থেকে। তখন থেকেই অখ্যাত এই জঙ্গল এলাকায় সেই কালীথান বিখ্যাত হয়ে ওঠে ‘খাদান কালী’ নামে।
খাদান কালীর ইতিহাস আরো প্রাচীন যখন এই এলাকা ছিলো ঝোঁপজঙ্গলে ঘেরা তখন ওই উঁচু ঢিবিতে বেদী তৈরি করে কয়েকশো বছর ধরে স্থানীয় মতিলাল চক্রবর্তীর বংশধরেরা কালী মায়ের পুজো করতেন। অর্থাভাবে প্রতিমা তৈরি xtকরতে পারেননি তাঁরা। তাই খোলা আকাশের নীচে বেদী তৈরি করে ছোট পাথরকে কালী রূপেই পুজো করতেন।
ট্রাক উদ্ধারের কিছুদিন পর মা কালীর স্বপ্নাদেশ পান সেই ম্যানেজার । স্বপ্নে দেবীর মন্দির নির্মাণের আদেশ পান তিনি তবে তাকে বলা হয় সেই মন্দিরে যেন কোনও ছাদ না থাকে। মায়ের স্বপ্নাদেশ মতো মন্দির তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন স্থানীয়রা।
যথা সময়ে নির্দেশ মতো সেই প্রাচীন ঢিবিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় মন্দির। বেদীর চারদিক সাজানো হয় কলস দিয়ে। তার উপর দেওয়া হয় ত্রিশূল। এখানে দেবীর কোন মূর্তী নেই। পটের মধ্যে শ্যামবর্ণের কালী মূর্তী আঁকা।
আজও খাদান কালী মন্দিরে নিত্য পুজো হয়। অমাবস্যায় বিশেষ পুজো হয়।বহু দূরদূরান্ত থেকেও ভক্তরা আসেন এখানে পুজো দিতে।
ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে।
নতুন কালী কথা নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

কালী কথা – ব্যাঘ্র কালীর অলৌকিক বৃত্তান্ত

আজও কতইনা না রহস্য লুকিয়ে আছে বাংলার অসংখ্য প্রাচীন কালী মন্দিরগুলিতে। সেই সব রহস্যর সন্ধানে শুরু করেছিলাম কালী কথা।
আজকের পর্বে মুর্শিদাবাদের কান্দির ব্যাঘ্ররুপী কালী বা ব্যাঘ্র কালী মন্দিরের কথা লিখবো।
নামটি শুনতে অবাক লাগতে পারে তবে প্রায় হাজার বছর ধরে মুর্শিদাবাদের কান্দির দোহালিয়া গ্রামে পুজো হয়ে আসছে ব্যাঘ্ররূপী দক্ষিণাকালীর।
এই মন্দির ও দেবীর রূপ নিয়ে রয়েছে অনেক গুলি জনশ্রুতি|কথিত আছে এক অন্ধ পরিব্রাজক সাধক এই কালী মন্দিরের গাছের তলায় তপ্যসা করছিলেন। তাঁর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে দক্ষিণাকালী তাঁকে দেখা দেন। সেই সঙ্গে দক্ষিণাকালীর আশীর্বাদে পরিব্রাজক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান এবং লোক মুখে ছড়িয়ে পরে এই কালী মন্দিরের নাম|
কালী পুজোকে কেন্দ্র করে একটি অদ্ভুত প্রথা রয়েছে এখানে,কালীপুজোর রাতে দোহালিয়া গ্রামে অন্য কোনও পুজো হয় না। গ্রামের এই একটি মন্দিরেই কেবল পুজো হয়|এখানে মা কালী বাঘ রূপে বিরাজিতা।
আগে এই গোটা এলাকা জঙ্গল ছিল। তার মধ্যেই ছিল মন্দিরটি। দ্বিতীয় একটি জনশ্রুতি অনুসারে শোনা যায় বল্লাল সেনের আমলে এখানে এক সন্ন্যাসী সাধনা করতেন। একবার ধ্যান ভঙ্গ হওয়ার পর দক্ষিণাকালীর এই মূর্তি তিনি চোখের সামনের দেখতে পান। তারপর শুরু হয় মূর্তি স্থাপন করে পুজো।সেই থেকে এখানে পুজো চলে আসছে ব্যাঘ্ররুপী মা কালীর|
আজও তন্ত্র মতে পুজো হয়। বিশেষ অমাবস্যা তিথি গুলিতে হয় বিশেষ হোম যজ্ঞ এবং সেই উপলক্ষে বহু মানুষ আসেন।দীপান্বিতা অমাবস্যায় দেবী দক্ষিনা কালীর আশীর্বাদ পেতে এই বিশেষ মন্ত্রটি একশো আট বার উচ্চারণ করে দেবী প্রণাম করুন।
ওঁ কালী কালী মহাকালী কালীকে পাপহারিণী
ধর্মার্থমোক্ষদে দেবী নারায়ণী নমোস্তুতে।’
যারা দীপান্বিতা অমাবস্যায় গ্রহ দোষ খণ্ডন করাতে চান এখনই যোগাযোগ করতে পারেন।
ফিরে আসবো কালী কথায় পরের পর্বে অন্য কোনো রহস্যময় কালী মন্দির নিয়ে|
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – তারাশঙ্করী পীঠ

কালী কথায় বাংলা তথা কলকাতার বহু বিখ্যাত কালী মন্দিরের কথা ইতিমধ্যে বলেছি।আজ কলকাতার বেলগাছিয়া অঞ্চলে অবস্থিত এক প্রসিদ্ধ কালী মন্দিরের নিয়ে লিখবো যা
তারাশঙ্করী পীঠ নামে বিখ্যাত|
পুরানে উল্লেখিত শক্তি পীঠ নাহলেও তারাপীঠের মতো এটিকেও একটি সিদ্ধপীঠ রূপে দেখা হয়। ১৯৫২ সালে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন যোগী মহারাজ পরেশচন্দ্র রায় মৌলিক এবং তন্ত্রমতে মায়ের আরাধনা শুরু করেন ।
আজও লোক মুখে এক অদ্ভুত ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় এই মন্দির কে কেন্দ্র করে।
শোনা যায় অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী যোগী মহারাজ পরেশচন্দ্র রায় মৌলিক। তিনি ভবিষ্যত দেখতে পারতেন|একবার তৎকালীন কংগ্রেস নেতা গনি খান চৌধুরী মন্দিরে এসেছিলেন তখন মাতৃ সাধক ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন, সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হলে রেলমন্ত্রকের দায়িত্ব পাবেন তিনি।পরবর্তীতে বাস্তবে হয়েছিল ঠিক তেমনটাই।
এসবই অবশ্য জনশ্রুতি যার সত্যতা প্রমান করা কঠিন।
বহু প্রাচীন কাল থেকে একটি অদ্ভুত রীতি পালিত হয় এই মন্দিরে|মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় বারাণসীর মণিকর্নিকা মহাশ্মশান থেকে এক সধবার চিতার আগুন আনা হয় এখানে সেই থেকে আজ পর্যন্ত জ্বলছে চিতার আগুন|অত্যন্ত পবিত্র অগ্নি রূপে এই আগুন কে শ্রদ্ধা করা হয় এই মন্দিরে|
মা তারার পাশাপাশি এই মন্দিরের পূজিত হন যশমাধব তার মূর্তি নিমকাঠের তৈরি যা আনা হয়েছিলো বাংলাদেশ থেকে।নিত্য পুজোয়
যশমাধবকে দেওয়া হয় নিরামিষ ভোগ।
একই সঙ্গে তারাশঙ্করী পীঠে পূজিত হন কালভৈরব|তারাশঙ্করী পীঠের আরও এক আকর্ষণ হন ‘নবমুণ্ডি আসন’। বাঘ, হাতি, শেয়াল, সাপ, অপঘাতে মৃত ব্যক্তি, চণ্ডাল ইত্যাদির ৯টি মাথার খুলি দিয়ে সজ্জিত এই আসন তন্ত্র সাধনায় ব্যাবহিত হতো।
প্রায় প্রত্যেক বিশেষ তিথি এবং দীপান্বিতা অমাবস্যায় এখানে বিশেষ পুজো এবং হোম যজ্ঞর আয়োজন হয়।
একটি সহজ উপাচার বলে দিচ্ছি যার মাধ্যমে আপনারাও মা তারাশঙ্করীর বিশেষ আশীর্বাদ পেতে পারেন। এগারোটি আতপ চাল একটি কলা এবং একটি ঘিয়ের প্রদীপ একটি থালায় রেখে অমাবস্যার রাতে মা তারা শঙ্করীকে স্মরণ করে নিজের মনোস্কামনা জানিয়ে প্রবাহ মান জলে ভাসিয়ে দিন।আপনার মনোস্কামনা দ্রুত পূরণ হবে।
আগামী পর্বে আবার ফিরে আসবো অন্য কোনো কালী মন্দিরের কথা নিয়ে|ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকবে কালী কথা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – জয় কালীর মাহাত্ম

ধনতেরাসের পরে এবং দীপাবলির আগে আজকের দিনে পালন হয় ভুত চতুর্দশী।
মনে করা হয় মৃত পূর্ব পুরুষরা এই আশ্বিন কৃষ্ণা চতুর্দশীর দিনে মর্ত্যে আসেন।
ভুত চতুর্দশীকে নরক চতুর্দশী ও বলা হয়। পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুসারে বিষ্ণু রাজা বলীকে প্রতি বছর পৃথিবীতে পূজা পাওয়ার আশীর্বাদ করেছিলেন । এরপর থেকে কালীপূজার আগের রাতে রাজা বলি পাতাল থেকে বা নরক থেকে পৃথিবীতে পূজা নিতে আসেন। তাঁর সঙ্গে আসে সহস্র ভূত, প্রেত, অশরীরী আত্মা।
আবার অন্য একটি ব্যাখ্যা অনুসারে দীপান্বিতা অমাবস্যার আগের রাতে চামুণ্ডা রূপে মা কালী এই ভূত চতুর্দশীর দিনে চৌদ্দজন ভূতকে সঙ্গে নিয়ে ভক্তের বাড়ি থেকে অশুভ শক্তিকে দূর করতে।
ফিরে এসি কালী কথায়।আজ কালীক্ষেত্র পর্বে শ্যামবাজারের জয়কালী বাড়ির কথা লিখবো|এই কালী মন্দিরের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে নানা অলৌকিক ঘটনা ও অদ্ভুত সব জশ্রুতি|
শাস্ত্র মতে পুজোয় ডিম ব্যবহার হয়না,কিন্তু এই মন্দিরে পুজোয় ডিম ব্যবহার হয়।
অবিশ্বাস্য হলেও এমনটাই সত্যি। কি করে শুরু হলো ডিম দিয়ে পুজোর তা নিয়েও এক ঘটনা আছে শোনা যায় বহুকাল আগে পরিবারের সদস্যরা এক বিকাল বেলা নিজেদের মধ্যেই আলচনা করছিলেন আলোচনার বিষয় ছিল ঠাকুরের খাবার।” ঠাকুরের খাবারের জন্য মিষ্টি , ফল এসব ব্যবহার হয় । আবার ঠাকুরের মাছ, মাংস ভোগ হিসাবে নিবেদন করার রীতিও রয়েছে। কিন্তু সেদিন তাঁরা আলোচনা করছিলেন কেউ যদি এই পুজোর উদ্দেশ্যে ফল , মিষ্টির জায়গায় ডিম দেয় তখন কি হবে? ঠাকুর কি তা গ্রহন করবেন ? “অদ্ভুত ভাবে কিছুক্ষণ পরেই একজন মন্দিরে পুজো দিতে আসেন ডিম নিয়ে।” ডিম দিয়ে পুজো শুনেই সবাই নাকচ করে দেন। অনেকে আবার কিছুটা ভয়ও পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই ভক্ত নাছোড়বান্দা ছিলেন। কিছুতেই তিনি না পুজো দিয়ে ফিরে যাবেন না। আর পুজো দিলে তিনি দেবেন ওই ডিম দিয়েই। কারন তিনি সম্প্রতি ডিমের ব্যবসা শুরু করেছেন এবং তিনি ঠিক করেছেন ব্যবসা শুরুর আগে মা’কে পুজো দেবেন। আর যেহেতু তিনি ডিমের ব্যবসায়ী তাঁর বিশ্বাস ওই ডিম দিয়ে পুজো অর্পণ করলেই দেবী খুশি হবেন। ব্যবসায় উন্নতি হবে তাঁর। শেষে ডিম দিয়েই পুজো হয় তবে ওই ব্যবসায়ী একবারের জন্যও মন্দিরে প্রবেশ করেননি। বাইরে থেকেই পুজো নিয়ে চলে গিয়েছিলেন।সেই থেকে ডিম দিয়ে পুজোর প্রচলন হয়|
এই মন্দির নির্মাণের সাথেও জড়িত আছে অলৌকিক এক ঘটনা|সাড়ে তিনশো বছর আগে এই পরিবারের পরিবারেরই এক সদস্য গঙ্গার স্নান করার পথে এই মাতৃ মূর্তিকে দেখেন। তিনি সেখানে মা কে প্রনাম করে বাড়ি চলে যান। সেদিনই তিনি স্বপ্নাদেশ পান যে মা চাইছেন তিনিই তাঁর পুজো করুন। সেই শুরু হয় জয়কালির আরাধনা।
প্রায় সাড়ে তিনশো বছর অতিক্রান্ত হয়েছে।
আজও জয়কালি একই ভাবে পূজিতা হচ্ছেন । অবিশ্বাস্য হলেও অত বছর আগে পাওয়া একটি মাটির মূর্তি এখনও অবিকল একরকম থেকে গিয়েছেন। দীপান্বিতা অমাবস্যায় দেবী
জয় কালীর বিশেষ পুজোর আয়োজন হয়।
আগামী পর্বে অন্য কোনো কালী মন্দিরের কথা
নিয়ে আবার ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – বিমলা দেবী

শাস্ত্রে আছে ক্রোধে উন্মত্ত মহাদেবের তান্ডব নৃত্য থামাতে বিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র পাঠিয়ে খণ্ডিত করেন সতীর দেহ। একান্নটি খন্ডে বিভক্ত সতীর দেহ একান্নটি স্থানে পতিত হয়। সেই একান্নটি স্থানে রয়েছে একান্নটি সতী পীঠ। আজ থেকে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করবো এই একান্ন পীঠ নিয়ে। শুরু করছি জগন্নাথ ধাম পুরীতে অবস্থিত বিমলাদেবীর মন্দির নিয়ে।
পুরীর কথা উঠলেই আমাদের মাথায় আসে প্রভু জগন্নাথের নাম।তবে অনেকেই হয়তো জানেন না বা সেই ভাবে লক্ষ্য করেন না যে এই পুরীর জগন্নাথ মন্দির প্রাঙ্গনেই বিরাজ করছে একটি অন্যতম শক্তি পীঠ দেবী বিমলার মন্দির|জগন্নাথ মন্দির চত্ত্বরের দক্ষিণ পশ্চিম কোনে অবস্থান করছে দেবী বিমলার ছোট্ট কিন্তু সুন্দর এই মন্দির টি|শাক্ত ও তান্ত্রিক দের কাছে এই দেবী ও তার মন্দির অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ|মনে করা হয় দেবী বিমলা প্রভু জগন্নাথের রক্ষাকতৃ|জগন্নাথ দেবের পূজার পূর্বে দেবী বিমলার পূজা হয় এবং জগন্নাথ দেবের প্রসাদ বিমলা দেবীকে নিবেদন করার পর তা মহাপ্রসাদ হিসেবে গণ্য হয়|
বিমলা দেবীর মন্দিরটি জগন্নাথদেবের মন্দিরের থেকেও প্রাচীন|স্থাপত্য শৈলী ও প্রাচীনত্বের দিক থেকে বলা যায় সোমবংশী রাজবংশের রাজা যযাতি কেশরী এই মন্দিরটি নির্মাণ করিয়েছিলেন পরে তা সংস্কার হয় নানা সময়ে|এক কালে শৈব্য ও তান্ত্রিক দের প্রভাব এখানে বেশি ছিলো এমনকি দেবী কে আমিষ ভোগ ও দেয়া হতো পরে তা বন্ধ হয়|যদিও বিশেষ বিশেষ তিথিতে এখনো দেবী বিমলা কে আমিষ ভোগ নিবেদন করা হয়|জগন্নাথের মিনারের পশ্চিম কোনে বেলে পাথর ও ল্যাটেরাইট নির্মিত পূর্ব মুখী মন্দির টি অবস্থিত |মন্দিরটি চারটি অংশে বিভক্ত, সভা কক্ষ,গর্ভ গৃহ,উৎসব কক্ষ ও ভোগ বিতরন কক্ষ |পাশেই রয়েছে রোহিনী কুন্ড|বর্তমানে মন্দিরের রক্ষনাবেক্ষন এর দায়িত্বে রয়েছে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া
কালিকা পুরাণ গ্রন্থে তন্ত্র-সাধনার কেন্দ্র হিসেবে যে চারটি প্রধান পীঠের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলি ভারতের চার দিকে অবস্থিত। এর মধ্যে পশ্চিম দিকের পীঠটি হল বিমলা দেবী পুরান মতে এখানে দেবী সতীর পা পতিত হয়েছিলো|এই পীঠের ভৈরব স্বয়ং জগন্নাথ কারন এখানে জগন্নাথদেব ও শিব অভিন্ন|এছাড়াও মহাপীঠ নির্ণয় তন্ত্র, বামন পুরান, মৎস পুরান ও দেবী ভাগবত পুরান ইত্যাদি গ্রন্থেও এই শক্তি পীঠের উল্লেখ আছে|তন্ত্রগ্রন্থ কুব্জিকাতন্ত্র মতে, বিমলা ৪২টি সিদ্ধপীঠের একটি| নামাষ্টোত্তরশত গ্রন্থেও দেবী বিমলার নাম পাওয়া যায়|যদিও এই পীঠের স্বরূপ এবং দেবীর দেহের কোন অংশ এখানে পতিত হয়েছিলো তা নিয়ে পন্ডিত দের মধ্যে ও কিছু গ্রন্থের মধ্যে কিঞ্চিৎ মত পার্থক্য ও বিরোধিতা আছে তবে এই শক্তি পীঠের অস্তিত্ব ও গুরুত্ব সর্বত্র স্বীকৃত|আদি শঙ্করাচার্য বিমলা দেবীকে শাস্ত্র মতে প্রতিষ্ঠা করে পুরীতে গোবর্ধন মঠ স্থাপন করেছিলেন|
মন্দিরের কেন্দ্রীয় গর্ভগৃহে রাখা আছে দেবী বিমলার মূর্তিটি। দেবী এখানে চতুর্ভূজা। তাঁর তিন হাতে জপমালা,বরমুদ্রা ও অমৃতকুম্ভ। চতুর্থ হাতের বস্তুটি ঠিক কী, তা এখনো স্পষ্ট নয় | তবে দেবী দুর্গার যে মূর্তি আমরা সচরাচর দেখতে অভ্যস্থ, দেবী বিমলার মূর্তি আদৌ সে রকম নয়। শুধু দেবী পার্বতীর দুই সখি জয়া ও বিজয়াকে দেবী বিমলার দুই পাশে দেখা যায়। মূর্তির উচ্চতা ৪ ফুটের কিছু বেশি।বিমলা মন্দিরের চূড়ার উচ্চতা ৬০ ফুট|
প্রতি বছর আশ্বিন মাসে ষোলো দিন ধরে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপিত হয়|নানান উৎসবের মধ্যে দুর্গাপূজা বিমলা মন্দিরের প্রধান উৎসব|দুর্গাপূজার শেষ দিন, অর্থাৎ বিজয়াদশমীতে পুরীর রাজা প্রথা মেনে বিমলাকে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা রূপে পূজা করেন|এই প্রথা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে|
দেবী বিমলার কৃপা লাভ করতে আপনারা বিমলা দেবীর স্তুতি পাঠ করতে পারেন –
উৎকলে নাভি দেশশ্চ বিরজা ক্ষেত্র মুচ্যতে
বিমলা সা মহাদেবী জগন্নাথস্ত ভৈরব :
এবং পাঠ শেষে দেবী বিমলার উদ্দেশ্যে প্রণাম করে তাকে নিজের মনোস্কামনা জানাবেন।
আজ শক্তি পীঠ বিমলাদেবী নিয়ে আলোচনা এখানেই শেষ করলাম|ফিরে আসছি আগামী পর্বে পরবর্তী শক্তিপীঠ নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।