Home Blog Page 70

একান্ন পীঠ – দেবী অপর্ণা

আজ যে শক্তিপীঠ নিয়ে লিখবো তা আমাদের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের ভবানীপুরে অবস্থিত।এই শক্তি পীঠে দেবীকে অপর্ণা নামে ডাকা হয় আবার কারুর কারুর কাছে তিনি দেবী ভবানী। শক্তি পীঠ সংক্রান্ত প্রায় সব গুলি প্রামান্য গ্রন্থেই এই শক্তি পীঠের উল্লেখ আছে।
দেবীর শ্রী অঙ্গের কোন অংশ এখানে পতিত হয়ে ছিলো তা নিয়ে সামান্য বিতর্ক আছে কিছু শাস্ত্রে আছে দেবী সতীর ডান চোখ পড়েছিল এই স্থানে।
তবে পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে এখানে দেবীর কর্ণ পড়েছিল। ভরত চন্দ্রের মতে এই স্থানে পড়েছিল দেবীর গোড়ালি।দেবীর ভৈরবের নাম বামন।
সুলতানি আমলে এই অঞ্চল শাসন করতেন সেনাপতি রহমত খাঁ।গৌরের শাসক যখন এই স্থান নিজের দখলে নিতে আক্রমণ করেন তখন পালতে গিয়ে রহমত খাঁর নৌকো আটকে যায় নদীর চড়ায়।তারপর দেবী অপর্ণার মন্দিরের পুরোহিতের নির্দেশে বিশেষ পুজো পাঠ হলে হটাৎ নেমে আসে ঝড় বৃষ্টি। নদীতে গিয়ে পড়ে নৌকা। রেহাই পেয়ে পরবর্তীতে সেনাপতি রহমত খাঁ দেবীর মন্দির নতুন করে সংস্কার করান। এসব ঘটনা আজও জনশ্রুতি আকারে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে।
পরবর্তীতে এই স্থান নাটোরের রানী এই অঞ্চলের শাসক হন এবং রানী ভবানী এই মন্দিরের জন্য অনেক ভূ-সম্পত্তি দান করে গিয়েছিলেন।
এই শক্তি পীঠকে কেন্দ্র করে আরো একটি অলৌকিক ঘটনার কথা শোনা যায়।নিজের মন্দিরটি থেকে বেরিয়ে দেবী অপর্ণা বা ভবানী প্রতিদিন দুপুরবেলা মন্দিরের উত্তর পারে সংলগ্ন জঙ্গলঘেরা পুকুরের পাশে সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে বালিকা বধূ সাজে ধুলোমাটি নিয়ে খেলা করতেন। ভবানীপুরের এই মন্দিরের একদা জঙ্গলঘেরা এই পথ দিয়ে এক শাঁখারি শাঁখা বিক্রি করতে যাচ্ছিলেন। দেবী ছল করে বালিকা বেশে সেই শাঁখারির থেকে শাঁখা পড়েছিলেন। সব শুনে মহারানী লোকজন নিয়ে সেই জায়গায় গিয়েছিলেন। মা ভবানী তখন পার্শবর্তী একটি পুকুর থেকে তার দুই হাতের শাঁখা উপরে তুলে দেখিয়ে ছিলেন।বহুকাল অবধি সেই
শাঁখারির পরিবার দেবীর উদ্দেশ্যে শাঁখা
অর্পণ করতো।
সব মিলিয়ে এই শক্তিপীঠের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব এবং দেবীর মহাত্ম অবর্ণনীয়। আজও এখানে
বহু ভক্ত আসেন নিজের মনোস্কামনা নিয়ে। শোনা যায় দেবী কাউকে খালি হাতে ফেরান না। প্রায় প্রতিটি বিশেষ তিথিতেই দেবীর বিশেষ পুজো অনুষ্ঠিত হয়।
ফিরে আসবো অন্য একটি শক্তি পীঠের কথা নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বিশেষ পর্ব – কল্পতরু উৎসব

বিশ্ববাসির কাছে পয়লা জানুয়ারি মানে ইংরেজি নব বর্ষের সূচনা হলেও বাঙালির কাছে পয়লা জানুয়ারি মানে কল্প তরু উৎসব।আজকের দিনে কাশীপুর উদ্যানবাটিতে কল্পতরু হয়েছিলেন শ্রী রামকৃষ্ণ। ১৮৮৬ সালের সেই দিনকে স্মরণে রেখেই মঠ মিশন সহ ঠাকুরের গৃহি ভক্তদের গৃহে পালন করা হয় কল্পতরু উৎসব।

 

প্রথমে আসুন শাস্ত্র কল্পতরু সন্পর্কে কি বলছে।

পুরাণ মতে দেবতা এবং অসুরদের মধ্যে সমুদ্র সমুদ্র মন্থনকালে অমৃত, লক্ষ্মীদেবী, ঐরাবত ইত্যাদির সঙ্গে উঠে আসে কল্প তরু বৃক্ষ পরবর্তীতে দেবরাজ ইন্দ্রের বিখ্যাত নন্দনকাননের স্থান পায় এই কল্প তরু বৃক্ষ এবং সেখান থেকে স্ত্রী সত্যভামার আবদারে শ্রীকৃষ্ণ পৃথিবীতে নিয়ে আসেন এই বৃক্ষ। এই বৃক্ষ সবার মনোস্কামনা পূর্ণ করতো অর্থাৎ এই বৃক্ষর কাছে যা চাওয়া হয় তাই পাওয়া যায়।

 

এবার আসুন জেনে নিই কেনো ঠাকুর রামকৃষ্ণকে কল্পতরু বৃক্ষের সাথে তুলনা করা হয় এবং কেনই বা এই বিশেষ দিনটিকে কল্পতরু দিবস রূপে পালন করা হয়।

 

দিন টা ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি কাশীপুর উদ্যান বাড়িতে উপস্থিত রয়েছেন প্রায় ৩০ জন মতো গৃহী ভক্ত।শরীরে মারণ রোগ বাসা বাঁধলে, ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের নির্দেশে ঠাকুর এই বাড়িতে চিকিৎসাধীন আছেন।ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক দুপুর তিনটে। দোতলা ঘর থেকে তিনি নেমে এলেন বাগানে। গৃহী ভক্তরা তাঁদের হাতে রাখা ফুল ঠাকুরের চরণে অঞ্জলি দিতে থাকেন। কথিত আছে, ঠাকুর তখন নাট্যকার গিরিশ ঘোষকে বলেন, “হ্যাঁ গো,তুমি যে আমার নামে এত কিছু চারিদিকে বলো, তো আমি আসলে কী”? গিরিশ ঘোষ উত্তর দিলেন, “তুমিই নররূপ ধারী পূর্ণব্রহ্ম ভগবান, আমার মত পাপী তাপীদের মুক্তির জন্যই তোমার মর্ত্যে আগমন”। সবাই তখন ঠাকুরের চরণ স্পর্শ করল এবং ঠাকুর তাদের আশীর্বাদ করে বললেন, “তোমাদের চৈতন্য হউক”।

 

তখন উপস্থিত ভক্তরা ইচ্ছা পূরণের এক দিব্য অনুভূতি অনুভব করেন নিজেদের অন্তরে।বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো এক অলৌকিক শক্তি যেনো প্রবেশ করে তাদের শরীরে। ঠাকুর তখন ভাব লেশ হীন। তন্ময় অবস্থায় পৌঁছে গেছেন।তিনি যেনো সাক্ষাৎ কল্পতরু।

 

সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত কেই আজ স্মরণ করা হয়।

ভক্তদের বিশ্বাস রয়েছে, এই দিন ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব সকলের মনের ইচ্ছা পূরণ করেন।

 

সবাইকে সবাইকে জানাই ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা এবং কল্পতরু উৎসবের শুভেচ্ছা।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – দাক্ষায়নী

একান্ন পীঠ এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সতীপীঠ হল মানস সতীপীঠ অথবা মানস শক্তিপীঠ। তিব্বতের মানস সরোবরের কাছে অবস্থিত এই শক্তি পীঠ।পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে এখানে সতীর ডান হাত পতিত হয়েছিল।

মানস সতী পীঠে অধিষ্ঠিত দেবী হলেন দাক্ষায়নী এবং হর হলেন ভৈরব।

 

মানস সতী পীঠের মাহাত্ম্যের সবচেয়ে বড় একটি কারন পার্শ্ববর্তী মানস সরোবর। এই হ্রদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক পৌরাণিক কাহিনী।অল্প দূরেই কৈলাশ পর্বত তিব্বতে অবস্থিত এই কৈলাস এবং মানস সরোবরকে কেন্দ্র করেই এই মানস শক্তি পীঠটি গড়ে উঠেছে।

 

পুরান মতে ব্রহ্মার মন থেকে সৃষ্ট হয়েছিল এই সরোবর যে সরোবরে স্নান করলে রজ, তমো গুণ দূর হয় এবং সাত্ত্বিক গুন লাভ করা যায়।

 

হিমালয়ের বুকে প্রায় বাইশ হাজার ফুট উঁচু কৈলাস পর্বতের কাছে এই মানস সরবরের পবিত্র কুণ্ডকেই সতী পীঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

 

দাক্ষায়নী দেবী সাক্ষাৎ এখানে বিরাজ করছেন বলে মনে করা হয়।অনেকে রাত্রে কৈলাস পর্বতের উপরে দুটি আলোকছটা দেখতে পান। যাকে দৈব আলোক জ্যোতিও বলা হয়। সেই আলোক ছটা পরস্পরের অনুগামী। মানুষের বিশ্বাস অনুসারে এই আলোক ছটাই আসলে শিব এবং পার্বতীর প্রতিরূপ বা দেবী দাক্ষায়নী এবং তার ভৈরব এই অঞ্চলে নিত্য লীলা করে চলেছেন।

 

কৈলাস পর্বতের অপার সৌন্দর্য আর মানস সরোবরের প্রশান্তি এই সতী পীঠের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলাই যায়। এখানে আলাদা করে কোনরকম মন্দির নির্মাণ করা হয়নি। নেই কোনো আলাদা মূর্তি। দেবী মহামায়া এখানে পরম প্রকৃতির রূপে ধরা দেন ভক্তদের কাছে।

 

প্রচলিত বিশ্বাস মতে স্বর্গের দেবতা, দেবী, গন্ধর্ব, অপ্সরা সকলেই আসেন এই শক্তি পীঠে পাশাপাশি

সারা বছরজুড়ে প্রায় সব সময় এই শক্তি পীঠে ভক্তদের আনাগোনা চলতেই থাকে।

 

ফিরে আসবো আগামী শক্তিপীঠ পর্ব নিয়ে

পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – বিরাট

পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে একান্নটি শক্তি পীঠের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য শক্তি পীঠ হল বিরাট শক্তিপীঠ। উত্তর বঙ্গের দক্ষিন দিনাজপুর জেলায় এই শক্তিপীঠ অবস্থিত।সতীর দেহ অংশগুলি যখন পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়েছিল তখন এই স্থানে দেবীর বাম পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল পতিত হয়েছিল।
স্থানীয় ভাষায় এটি বিদ্যেশ্বরী মন্দির নামে খ্যাত এবং দেবী অম্বিকা বা বিদ্যেশ্বরী নামে পরিচিত
এখানে ভৈরব হলেন অমৃতাক্ষ। আত্রেয়ী নদীর ধারে অবস্থিত মায়ের মন্দির এবং তার পাশেই ভৈরবের থান।
এই মন্দির প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িয়ে আছে মাতৃসাধক মুরারি মোহন ভট্টাচার্যর নাম। কৈশোরে তিনি দেবী কামাখ্যার নির্দেশে গৃহত্যাগ করেন এবং কামাখ্যা ধামে বারো বছর কঠিন সাধনা করতে থাকেন। পরবর্তীতে দেবীর নির্দেশে আত্রেয়ী নদীর তীরে তিনি আসেন। পরে দেবী তাকে ওই স্থানে গার্হস্থ্য ধর্ম পালন করার নির্দেশ দেন।
শোনা যায় একদিন সন্ধ্যার সময় আত্রেয়ীর নদীর তীরে গভীর জঙ্গলে তিনি উজ্জ্বল আলোক ছটা দেখে বুঝতে পারেন যে সেখানেই দেবীর অবস্থান রয়েছে।তারপর জঙ্গল পরিষ্কার করে দেবীর স্থান আবিষ্কার করেন তিনি এবং নিত্য পুজো শুরু করেন । সংসার জীবনে তার এক কন্যার জন্ম হয়। কন্যার নাম রাখেন বিদ্যেশ্বরী। বিদ্যেশ্বরী বাবাকে পুজোর কাজে সাহায্য করত।শোনা যায় একদিন সেই ছোট্ট মেয়ে দেবী মূর্তিতে বিলীন হয়ে যায়। জনশ্রুতি আছে দেবী স্বয়ং বালিকা রূপে সাধক মুরারী মোহনের গৃহে জন্মে ছিলেন। সবই তার লীলা মাত্র। দেবীকে সেই বালিকার নামেই অর্থাৎ বিদ্যেস্বরী নামে ডাকা হয়।
প্রতিদিন বিদ্যেস্বরী মন্দিরের বেদিতে লাল পাড় এর শাড়ি অর্পণ করা হয়। বিশেষ বিশেষ তিথিতে অন্ন ভোগ হয়। এই মন্দির চত্বরে নাকি অনেকেই বিশাল আকৃতির বিষধর সাপেদের দেখা পায় তবে তারা কারুর ক্ষতি করেনা।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। থাকবে অন্য
এক শক্তি পীঠ নিয়ে কথা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – শ্রী সুন্দরী

শ্রী পর্বত শক্তিপীঠকে একান্নটি শক্তিপীঠের মধ্যে একটি বলে মনে করা হয়।পীঠ নির্ণয়তন্ত্র এবং তন্ত্র চূড়ামনি গ্রন্থ মতে শ্রী সুন্দরী শক্তিপীঠ ছত্রিশতম এবং শিব চরিত মতে পঞ্চম পীঠ শ্রী সুন্দরী।
দেবী সতীর গোড়ালি পড়েছিল শ্রী পর্বত শক্তিপীঠে। এখানে মাতা সতী ‘শ্রী সুন্দরী’ এবং ভগবান শিব ‘সুন্দরানন্দ’ নামে পরিচিত।
শক্তি পীঠ টি একটি প্রাচীন কালী মন্দির।
এই কালী মন্দিরটিকে স্থানীয়রা শক্তিপীঠ হিসেবে পূজা করে।দেবী কালীকা রূপে বিরাজ করছেন সঠিক বয়স না জানা গেলেও মনে করা হয় মন্দিরটি প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন
মহাভারতে এই শক্তিপীঠের উল্লেখ আছে। সেখানে দেখা যায় অর্জুন এই শক্তি পীঠে এসে পুজো করছেন এবং নিকট বর্তী জ্যোতির্লিঙ্গ শ্রী শৈলতে এসে শিবের কাছে যুদ্ধে জয়ের জন্য প্রার্থনা করছেন। তিনি এখানে মল্লিকা ফুল দিয়ে পুজো করায় এই শিব লিঙ্গ মল্লিকার্জুন নামে খ্যাত।
এই শ্রী পর্বত সংলগ্ন এলাকায় এক সময় আদি সংকরাচার্য্য এসেছিলেন। শোনা যায় এখানকার তান্ত্রিকরা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেন এবং তাকে এই শক্তিপীঠে বলী দেয়ার ষড়যন্ত্র করেন। সংকরাচার্য্যর শিষ্যরা সব জেনে ফেলেন এবং তার প্রাণ রক্ষা হয়।
শ্রী পর্বতে যেখানে মায়ের মন্দির তা প্রাকৃতিক ভাবে অপূর্ব সৌন্দর্য দিয়ে ঘেরা। পাহাড়ের গায়ে মায়ের মন্দির এবং পাহাড়ে দের হাজার ফুট উঁচুতে ভৈরবের মন্দির। দেড় হাজার সিঁড়ি ভেঙে সেখানে যেতে হয়।
এই অঞ্চল বর্তমানে অন্ধ্রপ্রদেশের অন্তরগত যদিও প্রকৃত শ্রী পর্বত এবং শ্রী সুন্দরী শক্তিপীঠের অবস্থান নিয়ে কিঞ্চিৎ বিতর্ক আছে। অনেকের মতে এই স্থান আসলে হিমালয়ের পাদদেশে লাদাখে। তবে পুরান এবং অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ মতে শ্রী শৈল মল্লিকার্জুন সংলগ্ন পার্বত্য অঞ্চলেই অবস্থিত এবং বিজয় নগরের রাজারা এই মন্দির এবং দেবী শ্রী সুন্দরীর পুজোর দায়িত্ব পালন করতেন।
সারা বছর ভক্তদের আগমন লেগে থাকে তবে দুর্গাপূজা এবং নবরাত্রিতে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। অন্য এক শক্তিপীঠ সংক্রান্ত পৌরাণিক এবং আধ্যাত্মিক আলোচনা নিয়ে। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – সর্বানী

আজ একান্ন পীঠের চল্লিশতম পীঠ কন্যাশ্রম নিয়ে আলোচনা করবো।যদিও প্রকৃত স্থানটি নিয়ে বিতর্ক আছে। কারো মতে স্থানটি দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারী, কারো মতে কন্যাকুব্জে৷ কিন্তু বেশিরভাগ পন্ডিতের মতে এই শক্তিপীঠ বাংলাদেশের কামরুপে অবস্থিত।
বারাহী তন্ত্রে উল্লেখ আছে চন্দ্রনাথ মন্দিরের পঞ্চক্রোশ দূরত্বের মধ্যেই কুমারীকুণ্ড শক্তিপীঠ অবস্থিত। বিখ্যাত তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ তাঁর বৃহৎ তন্ত্রসার গ্রন্থে কুমারীকুণ্ডের কথা উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন এই পীঠস্থান তান্ত্রিক দীক্ষা লাভের উপযুক্ত স্থান। বর্তমানে স্থানটি বাংলাদেশের চট্টগ্রামজেলার অন্তর্ভুক্ত।
প্রাচীনকালে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরটি অবশ্য বর্তমানে দেখতে পাওয়া যায় না। দুর্গম পাহাড়ে এক গুহায় দেবী বিরাজ করছেন। পাহাড়ের নিচে কুমারী কুন্ড নামে এক রহস্যময় কুন্ড আছে। গভীর রাতে এই কুন্ডে আগুনের শিক্ষা এবং অশরীরী কোনো শক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় বলে জনশ্রুতি আছে।
কন্যাশ্রমে পীঠাধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বাণী হলেন মূলদুর্গার অনুরূপ। ধ্যানমন্ত্রানুসারে তিনি সিংহবাহিনী, তাঁর কপালে অর্ধচন্দ্র, তাঁর অঙ্গবর্ণ সবুজ৷ তিনি ত্রিনয়নী, তাঁর চার হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও বাণ শোভা পায়। মুক্তা মাণিক্য শোভিত অলংকারে তিনি সুশোভিতা।দেবী সবার মনোস্কামনা পূর্ণ করেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
মহাভারতে ঋষি পুলস্থ্য যুধিষ্টিরকে এই স্থানে এসে পুজো পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আবার
পৌরাণিক দিক দিয়ে এই স্থানের আলাদা মাহাত্ম আছে।ঋষি গর্গের কন্যা মনের মতো বর পাওয়ার জন্য এই স্থানে এসে তপস্যা করেন। কিন্তু যখন তার তপস্যা সম্পূর্ণ হয় তখন তার যৌবন অতিক্রান্ত। রূপ যৌবন কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। এমন সময় দৈব আদেশ পেয়ে শৃঙ্গবান নামে
এক যুবক ঋষি কন্যাকে বিবাহ করতে সম্মত হন।
অলৌকিক ভাবে বিবাহের পরেই সেই কন্যা এক সুন্দরী যুবতীতে পরিণত হন এবং শৃঙ্গবান কে দাম্পত্য জীবন থেকে মুক্তি দিয়ে অদৃশ্য হন।
সেই থেকে এই স্থানে এসে সাধনা করলে সব মনোস্কামনা পূর্ণ হয় বলেই বিশ্বাস।
এই স্থান তন্ত্র সাধনা এবং তন্ত্র মতে দীক্ষা গ্রহণের জন্য অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থান বলে বিবেচিত হয়।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য একটি
শক্তি পীঠ সংক্রান্ত জানা অজানা কথা নিয়ে।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – বরাহী দেবী

পুরান অনুসারে দেবী সতীর নিচের পাটির দাঁত
সমুহ পরে ছিলো হরিদ্বার এর কাছে
পঞ্চসাগরে এই সতী পীঠে দেবী বরাহী নামে পূজিতা হন।পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে এটি চৌত্রিশ
তম সতী পীঠ।দেবীর ভৈরব হলেন মহারুদ্র।
পুরান , মহাভারত সহ একাধিক শাস্ত্রে এই পীঠের উল্লেখ আছে।পুরান মতে নিশাচর নামে এক দৈত্যকে হত্যার জন্য স্বয়ং বিষ্ণু বরাহী কে সৃষ্টি করেছিলেন।বরাহী হলেন বিষ্ণুর নারী শক্তি।
সনাতন ধর্মে যে সাত আট জন মাতৃ দেবীর কল্পনা করা হয়, তার মধ্যে দেবী বরাহী হলেন অন্যতম। দেবীর রূপ শূকরের মত। তার এক হাতে রয়েছে চক্র এবং অন্য আরেক হাতে রয়েছে তলোয়ার।
এই পীঠ বহুকাল অজ্ঞাত ছিলো তারপর মহাভারতের যুগে পান্ডবরা যখন বনবাসে দিন কাটাচ্ছিলেন তখন গভীর এবং দুর্গম স্থানে এই দেবীর পীঠ স্থান সন্ধান করেছিলেন কুন্তী পুত্র ভীম। তিনি সেই গভীর জঙ্গলে মা বরাহীর তপস্যা করলেন, মা বরাহী ভীমকে দর্শন দিলেন এবং তাকে রক্ষা করার আশীর্বাদ দিলেন।
তারপর মহাভারত পরবর্তী সময়ে আবার এই সতী পীঠ লোক চক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুকাল পরে সালে জনৈক প্রভুচন্দ্র নামের একজন মাতৃ সাধক মায়ের এই পীঠ স্থান আবিষ্কার ও সংস্কার করেন।আবার এই সতী পীঠ সবার কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং বহু তীর্থ যাত্রী আসতে শুরু করেন।
অনেকে আবার মনে করেন বৌদ্ধ দেবতা বজ্র বারাহি ও মরিচির মিশ্রনে এই বরাহী দেবী
সৃষ্টি হয়েছেন। দেবী বরাহীকে অনেক জায়গায় মহিষবাহনা হিসেবেও দেখানো হয়
আবার রক্ত বীজের কাহিনীতে দেখা যায় যে, একটি মৃতদেহের উপর বসে শূকরের বেশ ধরে দাঁত দিয়ে বরাহী দেবী শত্রু নিধন করছেন।
সব মিলিয়ে যেনো কোনো জটিল রহস্য জড়িয়ে আছে দেবী বরাহীর সাথে।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য একটি শক্তি পীঠ
এবং তার ইতিহাস নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – ত্রিপুর মালিনী

পাঞ্জাবের জলন্ধরে রয়েছে অন্যতম তাৎপর্য পূর্ণ শক্তি পীঠ ত্রিপুর মালিনী। আজকের পর্বে এই শক্তি পীঠের কথা লিখবো ।জানবো
তার আধ্যাত্মিক মহাত্মা তবে এই যেখানে অবস্থিত সেই জ্বলন্ধর সম্পর্কে পৌরাণিক একটি ঘটনা
বলে দিই।
বহু প্রাচীন কালে জ্বলন্ধর নামে এক অত্যাচারী অসুর এই স্থানে শাসন করতো তার অত্যাচারে অতিষ্ট ধরিত্রীকে রক্ষা করতে ত্রিশুল দিয়ে জলন্ধর অসুরের মস্তক ছিন্ন করে তাকে বধ করেন শিব এবং ত্রিপুর মালিনী শক্তি পীঠের কাছেই তাকে সমাধি দেওয়া হয়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানে এই ঘটনার উল্লেখ আছে।
পীঠ নির্ণয় তন্ত্র এবং কালীকা পুরানে এই শক্তি পীঠের উল্লেখ আছে। পুরান মতে দেবীর ডান
বক্ষ এই স্থানে পতিত হয়েছিল। দেবীর নাম এখানে ত্রিপুর মালিনী আর ভৈরব হলেন ভীষণ।
আদি শঙ্করাচার্য্য তার অষ্টাদশ পীঠ বর্ণনায় শক্তিপীঠ ত্রিপুর মালিনীর উল্লেখ করেছেন। মহাভারতের বন পর্বেও এই শক্তিপীঠের উল্লেখ আছে।
ত্রিপুর মালিনী শক্তি পীঠে দেবীর মন্দির অতি প্রাচীন এবং খুবই মনোরম পরিবেশে অবস্থান করছে।মন্দিরের গর্ভে রয়েছে লক্ষী, সরস্বতী, মা বৈষ্ণবদেবীর তিনটি মূর্তি। পাশাপাশি মন্দিরের পাশে একটা ঘরে মায়ের শয্যা স্থান রয়েছে যেখানে মায়ের বিছানা সাজানো রয়েছে। লোকোমুখি শোনা যায় দুপুরের ভোগ গ্রহণ করার পর সেই বিছানাতে বিশ্রাম গ্রহণ করেন দেবী ত্রিপুর মালিনী।
নবরাত্রি সহ প্রায় সব বিশেষ তিথিতেই এখানে বড়ো আকারে পুজো হয় এবং সেই উপলক্ষে
বহু ভক্তের সমাগম হয়।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। থাকবে অন্য
এক শক্তি পীঠ নিয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনা এবং পৌরাণিক ব্যাখ্যা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

একান্ন পীঠ – ক্ষীর ভবানী

পুরান মতে কাশ্মীরে পড়েছিল দেবীর কণ্ঠ যদিও ঠিক কোন স্থানে দেবীর শিলারূপ অঙ্গ অবস্থান করছে তা নিয়ে মতভেদ আছে। কাশ্মীরে অবস্থিত অমরনাথ, সারদা পীঠ এবং ক্ষীর ভবানী এই তিনটি মন্দিরকেই শক্তি পীঠের মর্যাদা দেয়া হয়।
যদিও দেবীর অঙ্গ সারদা পীঠে পড়ে ছিলো বলেই মনে করা হয় আমার আজকের আলোচ্য বিষয় সারদা পীঠ এবং ক্ষীর ভবানী।
দেবী এখানে ভগবতী এবং তার ভৈরব স্বয়ং অমরনাথ যদিও কোনো কোনো শাস্ত্রে দেবীর ভৈরব রূপে ত্রিসন্ধ্যেশ্বর এর নাম আছে।
সারদা পীঠ সম্পর্কে জানা যায় ঋষি পুলস্থ্য এই স্থানে সরস্বতী বন্দনা করে ছিলেন এবং দেবী তাকে দর্শন দিয়ে ছিলেন বলে একাধিক শাস্ত্রে উল্লেখ আছে। আবার মাতঙ্গ ঋষি কাশ্মীরের এই স্থানে সাধনা করে ছিলেন এবং দেবী দূর্গা কালী এবং সরস্বতী ত্রিশক্তি রূপে তাকে দেখা দিয়ে ছিলেন। তীর্থে ভ্রমণরত আদি শংকরাচার্য্য এই স্থানে এসে দেবীর স্তব করেছিলেন বলেও ইতিহাস থেকে জানা যায়।
সারদা পীঠ সংলগ্ন ক্ষীর ভবানী মন্দিরটি ও অনেকের কাছে দেবীর শক্তি পীঠের অঙ্গ।
অতি প্রাচীন এই মন্দির সম্পর্কে বলা হয় দেবী এক সময়ে লঙ্কায় থাকতেন রাবণ যখন মা সীতার অপহরণ করেছিলেন তখন দেবী ক্ষোভে ফেটে পড়েন আর নিজের স্থান ছেড়ে দেন। এরপর পবন পুত্র হনুমানকে নিজের মূর্তিকে লঙ্কা থেকে অনেক দূরে নিয়ে যেতে বলেন তিনি। তখন দেবীর আজ্ঞা পালন করে হনুমান মায়ের মূর্তি এখানে স্থাপনা করেন।সেই থেকে দেবী ভবানী এই মন্দিরেই বিরাজ করছেন।
অতীতে কাশ্মীর শাসন করতেন হরি সিংহের মতো হিন্দু রাজারা তারাই এই মন্দির নির্মাণ, মন্দির সংস্কার, রক্ষনাবেক্ষন এবং পুজোর দায়িত্ব পালন করতেন।
এক সময় সব স্থান ছিলো খুবই দুর্গম। সেই দুর্গম পথ অতিক্রম করে শুক্লা অষ্টমী তিথিতে যখন দেবী মন্দিরে বিশেষ পুজো হতো তখন অসংখ্য ভক্ত এই কষ্টসাধ্য পথ পেরিয়ে দেবী ভবানীর কাছে আসতেন। বেশি ভাগ তীর্থ যাত্রী এক সাথে অমরনাথ, সারদা পীঠ এবং ক্ষীর ভবানী মন্দির দর্শন করতেন।সেই পরম্পরা আজও চলছে।
ফিরে আসবো আগামী পর্বে। সাথে নিয়ে অন্য
এক শক্তি পীঠের ইতিহাস এবং পৌরাণিক ব্যাখ্যা নিয়ে। দেখতে থাকুন।

একান্ন পীঠ – দেবী শিবানী

আজকের একান্ন পীঠ পর্বে মধ্যপ্রদেশের নাগ পুরের কাছে রামগিরিতে চিত্রকুট পর্বতে অবস্থিত শক্তি পীঠ শিবানী নিয়ে লিখবো।
পুরান অনুসারে এই স্থানে সতীর ডান বক্ষ পড়েছিল।আবার মতান্তরে এই স্থানে পড়েছিলো দেবীর জানু দেশ।এখানে অধিষ্ঠিত দেবীর নাম শিবানী এবং ভৈরব হলেন চন্ড।
ভরতচন্দ্রের অন্নদা মঙ্গল, বাল্মীকি রামায়ণ,কালীকা পুরানে সহ একাধিক প্রাচীন
গ্রন্থে এই শক্তি পিঠের উল্লেখ আছে।
রাম, সীতা এবং লক্ষণ যখন তাদের চোদ্দ
বছরের বনবাস কাটাচ্ছিলেন, তার মধ্যে সাড়ে এগারো বছর সময় অতিবাহিত করে ফেলেছিলেন এই শক্তি পীঠ সংলগ্ন চিত্রকূট পাহাড়ে।
সেই মহাভারতের সময়ে শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে অর্জুন
রামগিরি পর্বতে এসে সাধনা করেছিলেন এবং দেবী যোগ মায়া তাকে দেখা দিয়ে নিজের দিব্য শীলরূপটি কোথায় আছে তার নির্দেশ দেন। তারপর অর্জুন নিজে মাটি খুঁড়ে মাতা শিবানীকে শীলা রূপে উদ্ধার করে এই স্থানে মন্দির বানিয়ে স্থাপন করেন এবং তার অনুপস্থিতি তে স্থানীয় ফুলবাহক দের দেবীর নিত্য পুজোর আদেশ দেন।
এক সময় এই প্রাচীন মন্দির কালের নিয়মে
ধ্বংস হলে রাজা দ্বিতীয় রঘুজি ভোসলে নতুন ভাবে দেবী শিবানীর মন্দির বানিয়ে দেন।
বর্তমানে সাদা পাথরের তৈরি এই মন্দিরে দেবী শিবানীর শীলা রূপ টি কষ্টি পাথর এবং রুপো দিয়ে ঢাকা তার পাশাপাশি বহু দেবদেবীর মূর্তি খোদাই করা আছে। অনেকগুলি সিঁড়ি পেরিয়ে তারপরে একেবারে মন্দিরের প্রধান ফটকে উঠে আসতে হয়। তারপর এই মন্দিরের মূল অংশ শুরু হয়।
যাত্রাপথ বেশ দুর্গম এবং কষ্টসাধ্য।
অশ্বিন ও চৈত্র মাসের একটি বিশেষ সময়ে এখানে বিশেষ পুজো হয় এবং সেই সময়ে মায়ের প্রকৃত রূপ ভক্তরা দেখতে পান।
আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে।সাথে নিয়ে অন্য এক শক্তি পীঠের কথা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।