Home Blog Page 70

গুরু কথা – মহাবতার বাবাজি

গুরু কথা – মহাবতার বাবাজি

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

সাধনার জোরে অমরত্ত্ব লাভ করেছেন এমন নজির খুব কমই আছে জগতে। মহাবতার বাবাজি এমনই একজন সিদ্ধ যোগী।আজকের গুরু কথার এই পর্বে ভারতের এই অন্যতম রহস্যময় এবং মহানতম যোগী পুরুষ মহাবতার বাবাজির অলৌকিক জীবন এবং সাধনা নিয়ে লিখবো।

 

মহাবতার বাবাজিকে বলা হয় গুরুদের গুরু বা জগৎ গুরু|ক্রিয়া যোগের তিনি প্রান পুরুষ|ধ্যান, আধ্যাত্মিকতা এবং যোগাসন কে তিনি এক সূত্রে গেথেছেন কয়েক হাজার বছর আগে|পরবর্তীতে তার পথ অনুসরণ করে আধ্যাত্মিক পথে এগিয়েছেন তার সুযোগ্য শিষ্যরা যার মধ্যে শ্যামাচরণ লাহিড়ী, যুক্তেশ্বর গিরি, পরমহংস যোগানন্দ প্রমুখ।

 

মহাবতার বাবাজি কে নিয়ে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য গল্প, কিংবদন্তি এবং রহস্য|কেউ কেউ মনে করেন ক্রিয়া যোগের মাধ্যমে তিনি অমরত্ব লাভ করেছেন|কঠোর সাধনার মাধ্যমে তিনি সময় কে জয় করে জন্ম মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করেছেন এবং আশ্চর্য জনক ভাবে হাজার হাজার বছর ধরে স্বশরীরে বিরাজ করছেন এই পৃথিবীতে| একাধিক বার তার সাক্ষাৎ লাভ করে ধন্য হয়েছেন একাধিক সাধক|শোনা যায় হিমালয়ের এক দুর্গম স্থানে শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয় কে দীক্ষা দিয়েছিলেন স্বয়ং মহাবতার বাবাজি|পরমহংস যোগানন্দ তার ” অটো বায়োগ্রাফি অফ এ যোগী ” বইয়ে তার মহাবতার বাবাজির দর্শনের কথা বলেছেন|একাধিক বার সামনে এসেছে হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে তার রহস্যময় উপস্থিতির কথা|

 

বাবাজির জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না তবে মনে করা হয় তামিলনাড়ুর কোনো গ্রামে তার জন্ম হয়েছিলো, তার সঠিক বয়স নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে|কারুর মতে 5000 তো কারুর মতে 2000 বছরের কিছু বেশি তার বয়স|যোগ বলে তিনি তারুণ্য কে ধরে রেখেছেন তাই দেখলে মনে হয় এক যুবক|বাবাজির ইচ্ছে না থাকলে তাকে দর্শন করা যায়না|তিনি ঝড়ের গতিতে প্রকট হন আবার মহাশূন্যে মিলিয়ে যান|একটি প্রচলিত বিশ্বাস মতে হিমালয়ের কোনো এক অজ্ঞাত স্থানে রয়েছে জ্ঞানগঞ্জ নামে এক রহস্যময় মঠ, যেখানে সিদ্ধ পুরুষ ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারেনা, বাবাজির সেই মঠেই থাকেন, শুধু তাই নয় তিনি জ্ঞান গঞ্জের আচার্য|সুক্ষ দেহে তিনি সর্বত্র বিচরণ করেন আবার প্রয়োজন হলে নিজ দেহ ধারন করে প্রকট হন, তবে তার দর্শন করে অতি দুর্লভ ঘটনা, এবং সৌভাগ্যর হাতে গোনা কয়েকজন আজ অবধি তার দর্শন করতে পেরেছেন|

 

বর্তমানে হিমালয়ের দুর্গম এক স্থানে অবস্থিত একটি গুহাকে মহাবতার বাবাজির গুহা হিসেবে

চিহ্নিত করা হয়েছে। শোনা যায় এটি তার সাধনার স্থল এবং এখানে তিনি মাঝে মাঝে আসতেন। আজ বহু মানুষ এই দুর্গম পথ পেরিয়ে আসেন বাবাজির এই গুহা দর্শন করতে এবং তাদের কাছে এই স্থান অতি পবিত্র এক মন্দির স্বরূপ।

 

গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে আগামী পর্ব গুলিতে

এরকম রহস্যময় সাধক দের জীবন এবং সাধনা সম্পর্কে নানা তথ্য আপনাদের সামনে নিয়ে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরুকথা – স্বামী প্রনবানন্দ মহারাজ

গুরুকথা – স্বামী প্রনবানন্দ মহারাজ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের গুরু কথা দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক গুরু এবং সিদ্ধ যোগী পুরুষ স্বামী প্রনবানন্দ সরস্বতী কে নিয়ে|জানবো তার জীবন কাহিনী এবং একজন আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে তার যাবতীয় কর্মকান্ড|

 

পরাধীন ভারতে ১৮৯৬ সালে ২৯ জানুয়ারি একে মাঘী পূর্ণিমার দিন তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মাদারীপুরে অত্যান্ত সাধারন এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বালক প্রনবানন্দ|পিতার নাম বিষ্ণুচরন ভূইঞা ও মাতা এবং মাতা সারদা দেবী। তার সন্ন্যাস পূর্ব নাম ছিলো বিনোদ।

 

প্রণবানন্দকে স্বয়ং বাবা মহাদেবের বরপুত্র

বলা হয়।|ছোটো বেলা থেকেই ঈশ্বর চিন্তা এবং আধ্যাত্মিকতায় গভীর আকর্ষণ ছিলো তার|মাত্র সতেরো বছর বয়সে স্বামী গম্ভীরনাথ এর কাছে দীক্ষা নেন তিনি|মাত্র ২০ বৎসর বয়সে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন এবং ১৯২৪ সালে প্রয়াগে অর্দ্ধকুম্ভমেলায় স্বামী গোবিন্দানন্দ গিরির নিকট আনুষ্ঠানিক সন্ন্যাস গ্রহণ করেন ও হয়ে যান স্বামী প্রনবানন্দ|

 

স্বামী প্রণবানন্দ একাধারে ছিলেন সন্যাসী, সমাজ সংস্কারক এবং স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী এক বীর সন্ন্যাসী|ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতার যুদ্ধে যোগ দিয়ে তিনি গ্রেপ্তার ও হয়ে ছিলেন।

সারা জীবন তিনি একাধিক প্রাচীন হিন্দু তীর্থ ক্ষেত্র সংস্কার করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন|তবে স্বামী প্রনবানন্দর সর্ব শ্রেষ্ঠ অবদান অবশ্যই ভারত সেবাশ্রম তৈরি|তিনি ভারত সেবাশ্রম সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন 1917 সালে|বিশ্ব জুড়ে সমাজ সংস্কার, সেবা মূলক কর্ম সূচি ও সনাতন ধর্মের প্রচারে ভারত সেবাশ্রম আজ এক অতি পরিচিত নাম। একজন আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে তিনি অসংখ্য ভক্ত শিষ্যকে মানব সেবা এবং সমাজ সংস্কারের কাজে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

 

সারাটা জীবন ধরে স্বামী প্রনবানন্দ সক্রিয় ছিলেন দেশের হিন্দু সমাজকে ঐক্য বদ্ধ করতে এবং সংকীর্ণ জাতপাতের বেড়া জাল থেকে সনাতন ধর্ম ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে|তিনি সকল রকম ধর্মীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ছিলেন|তিনি ব্যক্তি চরিত্র নির্মাণ, আদর্শ পরিবার গঠন যথাযত শিক্ষা ইত্যাদিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন|তিনি বলেছিলেন – হিন্দুদের মধ্যে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, চণ্ডাল আদির কোন ভেদ নেই|অর্থাৎ সব হিন্দু সমান, সবার সমান অধিকার এবং সবাইকে সমান চোখে দেখতে হবে|

 

স্বামী প্রণবানন্দর জীবন এক আদর্শ স্বরূপ|নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে তিনি উৎসর্গ করে ছিলেন দেশ সেবায় ও সনাতন ধর্ম রক্ষার কাজে|আজও তিনি ঘরে ঘরে পূজিত হন এক আদর্শ গুরু ও এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক হিসেবে|১৯৪১ সালে ৮ জানুয়ারি মাত্র ৪৫ বৎসর বয়সে তিনি দেহ ত্যাগ করেন|কিন্ত তিনি অমরত্ব লাভ করেছেন তার ত্যাগ, জন সেবা ও আদর্শের মাধ্যমে। আজও তার অগণিত ভক্ত এবং তার সংগঠনের সদস্যরা তার দেখানো পথে সনাতন ধর্মের স্বার্থে কাজ করে চলেছে।জাতী ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সেবাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য।

 

ভারত গুরু পরম্পরার দেশ। আমাদের দেশে এমন বহু আধ্যাত্মিক গুরু জন্মগ্রহণ করেছেন যাদের জীবন এবং সাধনা আমাদের দেশকে এবং আমাদের জীবনকে নানা ভাবে সমৃদ্ধ করেছে। আবার গুরুকথার পরবর্তী পর্বে অন্য

এক গুরুর জীবনী নিয়ে

ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর 

গুরু কথা – শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

গুরু কথার আজকের পর্বে যে গুরুকে নিয়ে আলোচনা করবো তিনি শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর যার সন্যাস জীবনের পূর্বের নাম ছিলো রাম চন্দ্র চক্রবর্তী। তার জীবন এবং সাধনা ভারতের আধ্যাত্মিক জগতে আদৰ্শ স্বরূপ। আজও দেশে বিদেশে তার অসংখ্য ভক্ত রয়েছে।

 

অবিভক্ত বাংলায় ১৮৬০ সালে ফরিদপুর জেলায় শ্রী রাধামাধব চক্রবর্তী ও শ্রীমতি কমলাদেবীর সন্তান হিসাবে শ্রীশ্রী রামঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন|

শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের আরেক যমজ ভাই ছিলো তার নাম ছিলো লক্ষণ। তার সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়না।তাদের পারিবারিক গুরু ছিলেন

শ্রী মৃত্যুঞ্জয় ন্যায়পঞ্চানন|

 

শৈশব থেকেই ধীরে ধীরে বালক রামচন্দ্রের মধ্যে কিছু দৈব্য ক্ষমতা বা সাধকের গুনাবলি প্রকাশ পেতে শুরু করে।বাল্যকাল থেকেই শাস্ত্রে তার খুব আগ্রহ ছিলো মাঝে মাঝেই ঈশ্বর চিন্তা করে তিনি ভাব তন্ময় হয়ে যেতেন |ঈশ্বরে কে কেন্দ্র করে নানা আধ্যাত্মিক প্রশ্ন তার মনে ঘুরপাক খেতো এই ঈশ্বরের খোঁজেই ১৮৭২ সালে সকলের অজ্ঞাতে অজানাকে জানার লক্ষ্যে গৃহত্যাগী হন এবং নানা স্থানে ঘুরে শেষে পৌঁছালেন আসামের শ্রীশ্রী কামাক্ষ্যাদেবীর মন্দিরে এবং এক অক্ষয় তৃতীয়ার দিন শ্রীশ্রী রামঠাকুর দেখেন জটাধারী, দীর্ঘাঙ্গী এক জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে|গুরু হিসাবে তিনি সেই দিব্য পুরুষ কে গ্রহন করলেন শুরু হলো তার সাধনা এবং

আধ্যাত্মিক যাত্রা|

 

বহু কঠিন সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে একসময়

তিনি হয়ে উঠলেন অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন রাম ঠাকুর। পরবর্তীতে আরো কঠোর সাধনা করে তিনি অষ্টসিদ্ধি লাভ করলেন এরপর গুরুর এদেশে গৃহে ফিরে মাতৃ সেবা এবং কর্ম জীবনে কিছুকাল নিজেকে নিয়োজিত করলেন|এসবের মধ্যে থেকেও তার আধ্যাত্মিক শক্তি এবং জ্ঞান গোপন রইলো না বেশি দিন।ধীরে ধীরে তার চারপাশের মানুষরা বুঝতে পারেন তিনি আর কোনো সাধারণ মানুষ নেই।তার মধ্যে অলৌকিক আধ্যাত্মিক শক্তি জন্ম নিয়েছে।

 

শ্রী শ্রী রামঠাকুর রামঠাকুর অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, তিনি একই সাথে দুই স্থানে থাকতে পারতেন, মানুষের মনের কথা পড়তে পারতেন, অদৃশ্য হতে পারতেন|এমন বহু ঘটনা তিনি তার জীবদ্দশায় ঘটিয়েছেন।

 

শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের কাছে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শুচি, অশুচির কোনও ভেদ ছিল না|জীবনের দীর্ঘ সময় কঠিন যোগ সাধনায় মগ্ন থেকেও ভক্ত দের তিনি নিঃস্বার্থ ভাবে জীব সেবা করতে শিখিয়ে গেছেন|তার জীবন ও দর্শন তার অগণিত ভক্ত ও শিষ্য দের কাছে এক আদর্শ স্বরূপ|শ্রীশ্রী রামঠাকুরের নির্দেশে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ১৯৩০ সালে কৈবল্যধাম আশ্রম এবং ১৯৪২ সালে কলকাতার যাদবপুরে কৈবল্যধাম আশ্রম তৈরি হয় যেগুলি তার ভক্ত ও শিষ্য দের কাছে আজ তীৰ্থ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে|এছাড়াও ১৯৪৩ সালে তার জন্মভিটা ডিঙ্গামানিক গ্রামে সত্যনারায়ণ সেবা মন্দির তৈরি হয়। অসংখ্য ভক্ত তার আদর্শে দীক্ষিত। আজও বহু রাম ঠাকুর ভক্ত তার দেখানো

ভক্তি মার্গে চলছেন এবং নানা রকম জন সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

এই মহা মানব এবং মহান গুরু শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের চরনে আমার শত প্রনাম জানিয়ে শেষ করছি আজকের গুরু কথা|গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে চলতে থাকবে গুরু কথা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – শ্রী বিনোদ বিহারী দাস

গুরু কথা – শ্রী বিনোদ বিহারী দাস

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজ গুরু কথায় বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রসিদ্ধ এবং বৈষ্ণব ধর্মের একজন প্রবাদ প্রতিম ব্যাক্তিত্ব বিনোদ বিহারী দাসের কথা লিখবো।

বিনোদ বিহারী বাবার পূর্বের নাম ছিল বিনয় কৃষ্ণ দেবনাথ ।​​​ তিনি 1947 সালে এই বাংলার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। সোনা যায় তার জন্মের পর এক সাধু এসে বলেছিলেন এই পুত্র সন্তান একদিন বিরাট মাপের সাধু হবে।

খুব কম বয়সে বিনোদ বাবা তার পিতা মাতাকে হারান এবং অনেক লড়াই করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখেন।পড়াশোনার পাশাপাশি বাবা সঙ্গীতেও ছিলেন পারদর্শী। তিনি বিখ্যাত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পী আল্লাহ রাখা খানের কাছে সংগীত শিখেছেন। ভালো সেতার এবং হারমোনিয়াম বাজাতে পারেন।

তখন তার বয়স সাতাশ । বারাসাতে তখন তিনি একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। নিরন্ত ভোগ বিলাসে ডুবে আছেন তিনি। আর পাঁচটা সংসারী মানুষের মতোই জীবন যাপন সেই সময় তার বাড়িওয়ালি তাকে কথামৃত পড়তে দেন। যে রাতে তিনি বইটি পড়া শেষ করেন সেই রাতেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন এই সংসার তার জন্য নয়। তাকে পরমাত্মার সন্ধানে বেরোতে হবে। ঘটে যায় বিরাট পরিবর্তন।সংসারের প্রতি বৈরাগ্য আসে। শুরু হয় সন্যাসীর জিবনের জন্য প্রস্তুতি।

পরবর্তীতে আরো অনেক শাস্ত্র পাঠ করেন। সাধু সন্ন্যাসীদের সাথে তীর্থে তীর্থে ঘোরেন এবং তারপর তিনি কিছুদিন হিমালয়ে ও কাটান। এতো কিছু করেও মনের মতো গুরু বা সঠিক আধ্যাত্মিক মার্গ পাচ্ছিলেন না। তারপর হরে কৃষ্ণ মহা মন্ত্রকে তিনি আঁকড়ে ধরেন। মহা মন্ত্র জপ করতে করতে তিনি খুঁজে পান তার সব প্রশ্নের উত্তর।ধীরে ধীরে ভগবত প্রেমে নিজেকে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দেন এবং সম্পূর্ণ সমর্পন করেন রাধা কৃষ্ণের চরণে।

পরবর্তীতে একদিন স্বপ্নে গিরিরাজ গোবর্ধন দর্শন করেন এবং পরে বৃন্দাবনে যান সেখানে তিনি মহান বৈষ্ণব সাধক তিন কড়ি গোস্বামীর সংস্পর্শে আসেন এবং তার কাছে দীক্ষা নিয়ে পুরোপুরি সাধন ভজনে মননিবেশ করেন।

অনেকে বলেন তিনি সাক্ষাৎ রাধাকৃষ্ণ দর্শন করেছেন এবিং নিত্য তাদের সানিধ্য লাভ করে থাকেন। বিনোদ বাবা অবশ্য নিজে প্রচার থেকে দূরে নিজের সাধন ভজন নিয়ে থাকতেই ভালো বাসেন। তবে একথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় তার মতো উচ্চ স্তরে পৌঁছাতে খুব কম সাধুই পেরেছেন। আজ তার সারা দেশে অগণিত ভক্ত এবং শিষ্য।

গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে চলতে থাকবে গুরু কথা। আবার এক গুরুর কথা নিয়ে আগামী পর্বে
ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – শ্রী প্রেমানন্দ মহারাজ

গুরু কথা – শ্রী প্রেমানন্দ মহারাজ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

এই মুহূর্তে যে কয়জন প্রকৃত সাধু ভারতের পুন্য ভূমিতে সশরীরে বিরাজ করছেন এবং আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে অসংখ্য মানুষকে প্রতিদিন আধ্যাত্মিক মার্গে চলার পথ দেখাচ্ছেন বৃন্দাবনের প্রেমানন্দ বাবা তাদের মধ্যে অন্যতম।আজকের গুরু কথায় এই মহান গুরুর কথা লিখবো।

 

প্রেমানন্দ জী রাধারানীর ভক্ত এবং রাধাবল্লভ সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসী। যদিও বিহারের এক কৃষক পরিবারে জন্মানো অনিরুদ্ধ পান্ডে শুরু থেকে ছিলেন শিব ভক্ত।ছোটবেলায়, তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা ধ্যান এবং প্রার্থনায় মগ্ন থাকতেন , প্রায়শই ভক্তিমূলক স্তোত্রের সুরে নিজেকে হারিয়ে ফেলতেন।কৈশোরে গৃহ ত্যাগ করে তিনি পথে ঘুরে বেড়াতেন এবং আশ্রয় নিতেন শিব মন্দিরে। দীর্ঘ দিন তিনি কাশীর বিভিন্ন ঘাটে ঘাটে অভুক্ত অবস্থায় অসুস্থ্য শরীরে কাটিয়েছেন তার পর একদিন নিছক রাস উৎসব দেখতে যান বৃন্দাবনে এখানেই ঘটে যায় তার জীবনের সব থেকে বর পরিবর্তন। তিনি নিজের জীবনের আসল উদ্দেশ্য খুঁজে পান। নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পিত করেন রাধা রানীর চরণে হয়ে ওঠেন পরম পূজনীয় প্রেমানন্দ মহারাজ।

 

বর্তমানে শ্রী প্রেমানন্দ জি মহারাজ রাধাজীর সেবায় এবং ঐশ্বরিক প্রেমের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন তিনি প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা প্রার্থনা এবং ধ্যানে কাটান।রাধাজির ঐশ্বরিক উপস্থিতিতে নিজেকে নিমজ্জিত করে রেখেছেন।

 

শ্রী প্রেমানন্দ জি মহারাজ বিশ্বাস করেন যে ভক্তির পথ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি শিখিয়েছেন যে ঈশ্বরের প্রতি ভালবাসা সর্বজনীন এবং জীবনের সকল স্তরের ব্যক্তিরা এটি অনুভব করতে পারে। তাই আজ তার অনগিত ভক্ত ভর রাত থেকে তার দর্শন পাওয়ার জন্য এবং তার বাণী শোনার জন্য প্রতীক্ষা করেন।

বহু বিখ্যাত মানুষ তার দর্শন পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করেন।

 

তার গোটা জীবনটাই অলৌকিক এবং

বিস্ময়কর কারন যার আজ থেকে কয়েক দশক আগে না ছিলো আশ্রয় না কোনো অন্নসংস্থান তিনিই আজ বহু মানুষের একমাত্র আশ্রয়। অনেকে বলেন তিনি ভগবত প্রাপ্ত সিদ্ধ পুরুষ তা নাকলে কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে এতো অসুস্থ শরীর নিয়ে এতো জপ তপ এবং সাধনা অসম্ভব। আমি নিজে কয়েক মাস আগে বৃন্দাবনে তার দিব্য দর্শন পেয়ে ধন্য হয়েছি।

 

আবার গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে এমন কোনো আধ্যাত্মিক গুরুর জীবন এবং সাধনার কথা নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – গুরু নানকজী 

গুরু কথা – গুরু নানকজী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

গুরু কথার আজকের পর্বে আমরা জানার চেষ্টা করবো শিখ ধর্ম গুরু পরম শ্রদ্ধেয় নানকের জীবন এবং তার আধ্যাত্মিক কর্মকান্ড|

 

শিখ ধর্মের অন্যতম ধর্মগুরু গুরু নানক জন্ম

গ্রহণ করেন ১৪৬৯ সালে তালবন্ডী নামক স্থানে বর্তমানে এটি পাকিস্তানে অবস্থিত ও নানকানা সাহিব হিসেবে পরিচিত|

 

শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন উদাসীন প্রকৃতির|মনে করা হয় মাত্র ৭-৮ বছর বয়সে তিনি স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দেন|এই সময়ে থেকেই তার মধ্যে ভগবত প্রাপ্তি সম্পর্কে নানান প্রশ্ন উঁকি দিতে থাকে|পরবর্তীতে গুরু নানক অধিকাংশ সময় আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনা ও সৎসঙ্গে কাটাতে

শুরু করেন|

 

গুরু নানক প্রায় সব ধর্ম গ্রন্থ পাঠ করে ছিলেন এবং মক্কা সহ দেশ বিদেশের একাধিক তীর্থ স্থান পরিদর্শন করে ছিলেন।কঠোর সাধনার মধ্যে দিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে ঈশ্বর এক এবং অভিন্ন তিনি শুধু প্রথম এবং প্রধান শিখ

ধর্ম গুরু ছিলেন না তিনি ভারত তথা গোটা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক গুরু হয়ে উঠেছিলেন।

 

একটা সময়ের পর তার মধ্যে দৈব শক্তির প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়|বোঝাযায় তিনি কোনো সাধারণ মানুষ নয়|তার জন্ম হয়েছে একটি বিশেষ লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্য নিয়ে|কালক্রমে, আধ্যাত্মিক চর্চা ও সাধনার মধ্যে দিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন সকলের শ্রদ্ধেয় গুরুনানক|শিখ সম্প্রদায় তথা সমগ্র মানব জাতীর কাছে এক প্রণম্য ব্যাক্তিত্ব|গুরুনানকের জন্ম তিথিতেই প্রতি বছর পালিত হয় নানক জয়ন্তী|

 

শিখ ধর্ম গুরুরা নিজেদের অলৌকিক ক্ষমতা জাহির করতেন না। এই সম্পর্কে গুরু নানক কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলতেন আমি ঈশ্বরের আইনের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারি না। তিনিই একমাত্র অলৌকিক কাজ করতে পারেন।তবে একাধিক এমন ঘটনা আছে যেখানে তার অলৌকিক শক্তি প্রকাশ পেয়েছে। একবার তিনি তার এক তৃষ্ণার্থ শিষ্যকে জল পান করানোর জন্য শুষ্ক পাথুরে জমিতে ঝর্ণার সৃষ্টি করেছিলেন

বলে শোনা যায়।

 

এই মহান গুরুকে আমার প্রণাম এবং শ্রদ্ধা জানাই।আবার গুরু কথায় অন্য এক মহান

গুরুর জীবনী নিয়ে ফিরে আসবো যথ পরবর্তী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – তোতাপুরী মহারাজ 

গুরু কথা – তোতাপুরী মহারাজ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ঠাকুর রামকৃষ্ণ ছিলেন তার অসংখ্য ভক্তদের কাছে সাক্ষাৎ ব্রহ্ম স্বরূপ। স্বামী বিবেকানন্দ যেমন রামকৃষ্ণের শিষ্য ছিলেন তেমনই ঠাকুর রামকৃষ্ণ ছিলেন এক অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন যোগীর শিষ্য। ঠাকুর রামকৃষ্ণের দীক্ষা গুরু ছিলেন তোতাপুরী মহারাজ।

 

আজকের গুরু কথার এই পর্ব ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের দীক্ষা গুরু তোতাপুরী মহারাজকে নিয়ে।তোতাপুরীর মহারাজের সন্ন্যাস পূর্ব জীবন, তার জন্ম কাল বা জন্মস্থান এবং পরিবার সম্পর্কে সঠিক তথ্য কমই পাওয়া যায় তায় সেই দিকে না গিয়ে তার অলৌকিক ব্যাক্তিত্ব এবং রহস্যময় সন্ন্যাস জীনেরর কথা বলাই শ্রেয়।

 

তোতাপুরী লম্বা চওড়া সুদীর্ঘ পুরুষ ছিলেন।দীর্ঘ সময় ধ্যান ও যোগ সাধনার মাধ্যমে তিনি সাধনার অত্যন্ত উচ্ছ পর্যায়ে আরোহন করেছিলেন। তিনি ছিলেন পুরী সম্প্রদায় ভুক্ত এই নাগা সন্ন্যাসী।তোতাপুরী মহারাজ তিন দিনের বেশি কোথাও থাকতেন না কিন্তু ব্যতিক্রম হয়েছিলো দক্ষিনেশ্বর এসে|এখানে বেশ দীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়েছিলেন রামকৃষ্ণর সান্নিধ্যে|গুরুর নাম গ্রহণ করা শাস্ত্রমতে বারণ তাই শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে ‘ল্যাংটা’ বা ‘ন্যাংটা’ বলে উল্লেখ করতেন কারণ তিনি ছিলেন জটাধারী কৌপিন পরিহিত সন্ন্যাসী।গঙ্গার ধারে পঞ্চবটি উদ্যানে ধুনী জ্বালিয়ে তিনি সাধনা করতেন।

 

তোতাপুরীর মতে সকলই ছিল মায়া। দেব-দেবীর মূর্তিপূজাকেও তিনি উপহাস করতেন। বিশ্বাস করতেন এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্মে কিন্তু রামকৃষ্ণ তার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেন, এক্ষেত্রে এক অলৌকিক ঘটনার ও উল্লেখ পাওয়া যায়, একবার দক্ষিনেশ্বরে থাকা কালীন পেটের যন্ত্রনায় কাবু তোতাপুরী গভীর রাতে গঙ্গায় প্রান বিসর্জন দিতে গিয়ে দেখলেন কোথাও ডুবজল নেই, হেঁটেই পার হওয়া যায় গঙ্গা, তিনি উপলব্ধি করলেন ভবতারিনীর লীলা, সাক্ষাৎ করলেন স্বয়ং মা জগদম্বাকে, শরীরের সব যন্ত্রনা মুহূর্তে গায়েব হয়ে গেলো|

শিষ্য কে বললেন সব কথা মেনে নিলেন মায়ের উপস্থিতি|মেনে নিলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণের শ্রেষ্ঠত্ব।

 

দক্ষিনেশ্বরের পঞ্চবটি বনে তোতাপুরীর কাছে দীক্ষা নিয়ে নিয়ে ছিলেন স্বয়ং রামকৃষ্ণ আবার আশ্চর্য জনক ভাবে ঠাকুরের অলৌকিক ক্ষমতা এবং তার অগাধ জ্ঞানের পরিচয় পেয়ে গুরু তোতাপুরী বিদায় নেয়ার আগে শিষ্য রামকৃষ্ণর কাছে দীক্ষা নিয়ে যান|গুরুকে পাল্টা দীক্ষা দানের এই ঘটনা ভারতের আধ্যাত্মিক জগতে বিরলতম|

 

যেহেতু পুরী সম্প্রদায়ভুক্ত তোতাপুরী মহারাজ ঠাকুর রামকৃষ্ণের দীক্ষা গুরু তাই সেই পরম্পরার অন্তরগত হয়ে রামকৃষ্ণ মিশন এবং মঠ

আজও পুরী সম্প্রদায়ের অংশ।

 

তোতাপুরী মহারাজ সম্পর্কে বলা হয় তিনি ছিলেন দীর্ঘ জীবী। আজ থেকে কয়েক বছর আগেই তাকে পুরী সহ বিভিন্ন তীর্থ স্থানে স্বশরীরে ঘুরে বেড়াতে গেছে বলে অনেকে দাবী করে থাকেন। তবে তার সত্যতা প্রমান করা সহজ নয়।

 

আজকের পর্ব এই মহান গুরুকে প্রনাম জানিয়ে শেষ করলাম।আবার আগামী পর্বে অন্য

এক গুরু প্রসঙ্গে আলোচনা নিয়ে ফিরে

আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

রথযাত্রার শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন

রথযাত্রার শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন

 

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রীজাতক

 

আজ পবিত্র রথযাত্রা সারা। আজ জগন্নাথ দেব তার রাজকীয় রথে করে পথে নামেন তার অগণিত ভক্তদের দর্শন দিতে।

 

মনে করা হয় দীর্ঘ বিরতির পর শ্রী কৃষ্ণর বৃন্দাবন যাত্রাকেই উদযাপন করা হয় রথ যাত্রা পালনের মাধ্যমে|প্রথম এবং প্রধান রথ যাত্রা নিঃসন্দেহে পালিত হয় জগন্নাথ ধাম পুরীতে|প্রথমে রাজ পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় ও পরবর্তীতে সরকার জনসাধারণএর উদ্যোগে প্রতি বছর পুরীতে ওই বিশেষ তিথী তে বিরাট আকারে পালিত হয় রথ যাত্রা|এই পরম্পরা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে|

বোন সুভদ্রা ও দাদা বলরাম বা বলভদ্রকে নিয়ে রথে চড়ে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের পত্নী গুন্ডিচারবাড়ি যান জগন্নাথদেব। সেখান থেকে সাতদিন পরে আবার নিজের মন্দিরে ফিরে আসেন। এই যাওয়াটাকেই জগন্নাথের মাসির বাড়ি যাওয়া বলে।

 

রথের দিন তিনটি রথ পর পর যাত্রা করে মাসির বাড়ি। প্রথমে যায় বলরামের রথ, তারপর সুভদ্রা এবং সবশেষে জগন্নাথের রথ। রথে চড়ে এই গমন ও প্রত্যাগমনকে সোজা রথ এবং উল্টোরথ বলে|তিনটি রথের প্রত্যেকের নিজস্ব বৈশিষ্ট আছে|জগন্নাথের রথের নাম নন্দী ঘোষ, বলরামের রথের নাম তালধ্বজ ও সুভদ্রার রথের নাম দর্পদলন|এই রথ নির্মানে কোনো আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি ব্যবহার হয়না এবং বংশ পরম্পরার কারিগররা সকল নিয়ম নিষ্ঠা ও প্রথা মেনে রথ প্রস্তুত করেন|আজও পুরীর বর্তমান রাজা সোনার ঝাড়ু ব্যবহার করে রথের যাত্রার আগে তার পথ পরিষ্কার করে থাকেন|প্রচলিত বিশ্বাস রথে পুরীতে

বৃষ্টিপাত হবেই|

 

পরবর্তীতে পুরীর বাইরে বাংলায় রথযাত্রা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং মনে করা হয় এই সংস্কৃতির সম্ভবত সূচনা হয়েছিল শ্রীচৈতন্যদেবের নীলাচল অর্থাৎ পুরী যাওয়ার পর থেকে| চৈতন্যভক্ত বৈষ্ণবরা বাংলায় পুরীর অনুকরণে রথযাত্রার শুরু করেন এবং দেখতে দেখতে বহু রাজপরিবার ও এই মহা সমারোহে এই উৎসব পালন করতে শুরু করে|আরো কিছু কাল পরে ইসকন ও শ্রীল প্রভুপাদের হাত ধরে রথ যাত্রা দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে পা রাখে ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে সারা বিশ্ব জুড়ে|

 

আজ বাংলার নানা স্থানে বিরাট আকারে রথ যাত্রা উৎসব পালন হয় যার মধ্যে মাহেশের রথ যাত্রা বিশেষ উল্লেখযোগ্য|যাত্রা শব্দের প্রকৃত অর্থ গমন তাই জগন্নাথের রথযাত্রা এবং উল্টোরথ হিন্দু-বাঙালিদের কোনও কাজ বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সূচনার পবিত্র দিন হিসেবে গণ্য করা হয়| বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব দূর্গাপূজোর সূচনাও হয় এই রথ কিংবা উল্টোরথের দিন|

 

আজ আপনাদের সবাইকে জানাই পবিত্র

এই রথ যাত্রার অসংখ্য শুভেচ্ছা এবং

অভিনন্দন। জয় জগন্নাথ।

জগন্নাথদেবের ভোগ নিবেদন 

জগন্নাথদেবের ভোগ নিবেদন

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রীজাতক

 

পুরীর মন্দিরে জগন্নাথের ভোগ নিবেদন নিয়ে আছে অনেক পৌরাণিক ঘটনা অনেক ইতিহাস এই মন্দিরে ভোগ রান্না থেকে ভোগ নিবেদন সবেতেই আছে বৈচিত্র।আজকের পর্বে এই বিষয় নিয়ে লিখবো।

 

ভগবান বিষ্ণু মর্ত্যলোকে এসে চার ধামে যাত্রা করেন। এই চার ধাম হল- বদ্রীনাথ ধাম,দ্বারিকা ধাম,পুরী ধাম এবং রামেশ্বরম। প্রথমে হিমালয়ের শিখরে অবস্থিত বদ্রীনাথ ধামে স্নান করেন,তারপর গুজরাটের দ্বারিকা ধামে গিয়ে বস্ত্র পরিধান করেন, ওড়িশার পুরী ধামে ভোজন করেন আর সবশেষে রামেশ্বরমে গিয়ে বিশ্রাম নেন।অর্থাৎ পুরী হলো ভগবানের ভোজনের স্থান তাই এই স্থানে ভোগে কিছু বিশেষত্ব থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।

 

পুরীতে জগন্নাথকে অর্পণ করা হয় ছাপান্ন ভোগ।

পুরাণ মতে, যশোদা বালক কৃষ্ণকে আট প্রহর খেতে দিতেন। যখন ইন্দ্রের রোষে গোকুলে মহাপ্রলয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময় প্রাণীদের রক্ষা করতে নিজের কনিষ্ঠ আঙুলে গোবর্ধন পাহাড় তুলে নিয়েছিলেন তিনি। সাতদিন ওইভাবেই তিনি ছিলেন। এই সময়ে তিনি অনাহারে ছিলেন। প্রলয় থামলে যখন কৃষ্ণ ফিরে আসেন তখন

কৃষ্ণকে মা যশোদা সাতদিন ও আট প্রহরের হিসেবে ছাপান্ন টি পদ পরিবেশন করেছিলেন। আর সেই থেকেই ভগবানের ছাপ্পান্ন ভোগ চলে আসছে।

 

জগন্নাথ মন্দিরের একাংশেই হয়েছে বড় রান্নাঘর। সেখানে রয়েছে ৭৫২ টি উনুন, সেখানে এই ভোগ রান্নার কাজ করেন ৩০০-রও বেশি রাঁধুনি। এরাই বংশ পরম্পরায় যুগ যুগ ধরে ভোগ রান্না করেন।

জগন্নাথের ভোগে মূলত দুই ধরনের খাবার দেওয়া হয়। ভাত, ডাল, তরকারি, খিচুড়ি জাতীয় রান্না করা খাবার থাকে। আর থাকে খাজা, গজা, খই, মুড়কি জাতীয় শুকনো খাবার। সব মিলিয়ে ছাপান্ন টি পদ সর্বোচ্চ রান্না হয় এখানে।

 

এখানে দুটি অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করা যায়।

পুরী মন্দিরের প্রতিদিন সমপরিমাণ প্রসাদ রান্না করা হয়। কিন্তু ওই একই পরিমাণ প্রসাদ দিয়ে কয়েক হাজার বা কয়েক লক্ষ মানুষ সকলেরই পেট ভরে যায়।প্রসাদ কখনও কম পড়ে না বা

নষ্ট হয় না।রান্নার প্রক্রিয়াও বেশ মজার। মন্দিরের রান্নাঘরে একটি পাত্রের উপর আর একটি পাত্র এমন করে মোট ৭টি পাত্র আগুনে বসানো হয় রান্নার জন্য। এই পদ্ধতিতে যে পাত্রটি সবচেয়ে উপরে বসানো থাকে তার রান্না সবার আগে হয়। তার নিচে তারপরে রান্না হয়

 

সারাদিনের ভোগে থাকে নানা বৈচিত্র।জগন্নাথ খিচুড়ি খেতে ভালো বাসেন তাই তার জন্য বিশেষ খিচুড়ি তৈরী হয় এছাড়া বাল্যভোগে জগন্নাথদেবকে দেওয়া হয় খই, চিঁড়ে, বাতাসা, মাখন, মিছরি, কলা, দই এবং নারকেল কোরা। এরপর দেওয়া হয় রাজা ভোগ। এই তালিকায় থাকে মিষ্টি চালের খিচুড়ি, ডাল, তরকারি, ভাজা এবং পিঠেপুলি। দুপুরের ভোগ মূলত অন্নভোগ। সেখানে থাকে ভাত, ডাল, শুক্তো, তরকারি ও পরমাণ্ণ। এছাড়াও থাকে ক্ষীর ও মালপোয়া। সন্ধেবেলায় দেওয়া হয় লেবু, দই দিয়ে মাখা পান্তাভাত। সঙ্গে খাজা, গজায এবং নানা ধরনের মিষ্টি। শয়নের আগে মধ্যরাতে ডাবের জল খেয়ে শুতে যান জগন্নাথ।

 

চলতে থাকবে রথযাত্রা উপলক্ষে

জগন্নাথদেব প্রসঙ্গে আলোচনা। আবার রথ

যাত্রার ইতিহাস নিয়ে আগামী পর্বে

ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাথ দেব এবং কোহিনুর

জগন্নাথ দেব এবং কোহিনুর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীর মন্দিরেরের সাথে এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে বিশ্বের সবথেকে মূল্যবান হীরে কোহিনুরের।

আজ হয়তো ব্রিটিশ পরিবারের পরিবর্তে কোহিনুর জগন্নাথ দেবের রত্ন ভাণ্ডারে থাকতো। কিন্তু তা হয়নি। কি ভাবে তা সম্ভব হতো আর কেনো হয়নি সেই ইতিহাস নিয়ে আজকের পর্ব।

 

সকলেই জানেন যে কোহিনুরের যাত্রা গোলকুণ্ডায় শুরু হয়েছিল এবং মুঘল দিল্লি, পারস্য এবং আফগানিস্তানে পৌঁছেছিল তারপর ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে শিখ সাম্রাজ্যের প্রথম শাসক মহারাজা রঞ্জিত সিং কোহিনুর অধিকার করেন তার মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকার রাজা দিলীপ সিংহর হাত থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ইংল্যান্ডের রানী কোহিনুর উপহার হিসেবে পান।

 

মহারাজা রঞ্জিত সিং 1839 সালে তাঁর মৃত্যুর আগে হীরাটি পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে পাঠানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু মহারাজার অধীনে থেকেও পাঞ্জাবের তৎকালীন কিছু ক্ষমতাবান আমলা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন।

কিছু ইতিহাস বইয়ে মহারাজা রঞ্জিত সিং কর্তৃক পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের কাছে কোহিনূর বন্ধক হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।

 

মহারাজ রঞ্জিত সিংহ তার ইচ্ছে প্রকাশ করে কোহিনুরকে জগন্নাথ মন্দিরে দান করার জন্য একটি উইল ও লেখেন যাকে ভিত্তি করে আজও পুরীর মন্দির কতৃপক্ষ কোহিনুর তাদের বলে দাবী করে আসছেন এবং সেই সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আইনি লড়াই লড়তেও তারা প্রস্তুত।

রুঞ্জিত নিজেই মারা যান তার এই শেষ ইচ্ছে অপূর্ন রেখে এবং রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তার নাবালক উত্তরাধিকারের হাত থেকে কোহিনুর এক প্রকার ছিনিয়ে নেয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা।

 

এখন প্রশ্ন জাগে মহারাজা রঞ্জিত সিং মূল্যবান কোহিনুর দেওয়ার জন্য জগন্নাথ মন্দির বেছে নেওয়ার কারণ কী? আসলে বাঙালিদের মতো শিখ দের সাথে জগন্নাথ দেবের রয়েছে বিশেষ সম্পর্ক।উড়িষ্যার সাথে শিখদের এই নিবিড় সংযোগ প্রথমে গুরু নানকের সময়ে শুরু হয়।

শোনা যায় গুরু নানক একবার জগন্নাথ মন্দির দর্শন করতে এসেছিলেন এবং অন্য ধর্মের হওয়ায় তিনি প্রবেশেধিকার পাননি। পরে পুরীর সমুদ্র সৈকতে তারা যখন অভুক্ত অবস্থায় ছিলেন তখন প্রভু জগন্নাথ তাদের নিজের ভোগ পাঠিয়ে তাদের সেবা করেন। তারপরে গুরু গোবিন্দ সিংয়ের সময়েও শিখ ধর্মের মানুষ রা জগন্নাথের বিশেষ কৃপার পাত্র ছিলেন। আজও সেই পরম্পরা চলছে। তাই মহারাজা রঞ্জিত সিং তার দখলে থাকা সবচেয়ে দামি রত্ন কোহিনূরকে পুরী জগন্নাথ মন্দিরে দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।

 

এমন বহু রহস্য এবং অজানা ইতিহাস আছে পুরীর মন্দিরকে কেন্দ্র করে। রথ যাত্রা উপলক্ষে আবার এক বিশেষ পর্ব নিয়ে আগামী পর্বে ফিরে আসবো পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।