Home Blog Page 67

বাংলার কালী – মঙ্গল পুরের ডাকাত কালী পুজো

আউশগ্রামের সংলগ্ন অজয় নদের তীরবর্তী সেনপাহাড়ি এলাকার কৃষি প্রধান এক গ্রাম মঙ্গলপুর।এই গ্রামেই আছে এক ডাকাত কালী মন্দির। এই পুজো নিয়ে আছে এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ। আজকের পর্বে এই পুজো

নিয়ে লিখবো।

 

এই মঙ্গলপুর গ্রামে প্রাচীন বটবৃক্ষের নীচে গ্রামের ডাকাত সর্দার নলিনাক্ষ মেটে, আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে খয়েরবুনি গ্রামের শ্মশান থেকে কালীকে চুরি করে এনে প্রতিষ্ঠা করেন এবং পুজো শুরু করেন।

 

শোনা যায় একবার মৃতদেহ পোড়াতে গিয়ে ডাকাত সর্দার নেশা করে অচৈতন্য হয়ে পরলে, তাকে ফেলে সহযাত্রীরা পালিয়ে আসে। পরে গভীর রাতে জ্ঞান ফিরতেই ডাকাত সর্দার দেখেন এক অসহায় বৃদ্ধা তার শিয়রের কাছে বসে। মাথায় হাত বুলাচ্ছেন। চমকে ওঠেন নলি ডাকাত। বৃদ্ধা তখন মা কালীর রূপ ধরে সর্দারকে দেখা দেন এবং বলেন শ্মশানে অবিহেলিত হয়ে তিনি পড়ে আছেন। নিয়মিত তার পুজো হয়না। তাকে নিয়ে গিয়ে মন্দির প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু করতে আদেশ করেন।

 

তখনই এই বট বৃক্ষের নিচে এনে মাকে প্রতিষ্ঠা করেন নলি ডাকাত । সে সময় সর্দার মায়ের পুজো করে মশাল জ্বালিয়ে ডাকাতদল নিয়ে বেরুতেন সন্ধ্যা রাতে ডাকাতি করতে আবার ফিরে এসে ভোর রাতে করতেন কালীর পুজো।

 

আজও এখানকার ডাকাত সর্দারের বংশধরাই

পুজোর দায়িত্ব পালন করেন।অতীতে পুজোর সময়ে সারারাত দলবেঁধে খেলা হতো লাঠি। এখনও সে রেওয়াজ বজায় রয়েছে।

 

এখানে পুজোর ক্ষেত্রে আরো একটি অদ্ভুত রীতি আছে।যেহেতু অতীতে ডাকাত দের ভয়ে পুরোহিত পুজো করতে আসতে চাইতেন না তাই ডাকাত সর্দার বামুন চুরি করে এনে পুজো করতো।

আজও এখানে না বলে বাড়ি থেকে বামুন

তুলে এনে কালীর পুজো করতে বাধ্য করা হয়।

এই ঘটনায় আর কোনো আতঙ্ক নেই।এই ঘটনাটি বেশ আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করেন সাধারণ মানুষ।ঠাকুর মশাই ও মেনে নেন এই প্রথা এবং খুশি মনে পুজোর দায়িত্ব নেন।

 

আবার ফিরে আসবো বাংলার কালীর অন্য একটি পর্ব নিয়ে। যথা সময়ে। থাকবে এমন।অনেক ইতিহাস এবং অলৌকিক ঘটনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

স্বরস্বতী পুজো উপলক্ষে বিশেষ পর্ব : বাংলার একটি স্বরস্বতী মন্দিরের ইতিহাস 

বাংলায় কালী মন্দিরের সংখ্যা অসংখ্য যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করছি।

আজ স্বরস্বতী পুজোর এই পুন্য তিথিতে আপনাদের এই বাংলার এক প্রাচীন সরস্বতী মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে কিছু তথ্য জানাবো ।

 

এই স্বরস্বতী মন্দির রয়েছে হাওড়ার পঞ্চানন তলায়। উমেশ চন্দ্র দাস লেনে। বাংলার এটিই একমাত্র সরস্বতী মন্দির না হলেও এই সরস্বতী মন্দিরে মা সরস্বতীর নিত্য পুজো হয় যা আর খুব একটা চোখে পড়েনা।

 

স্থানীয় দাস পরিবার এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করে।

এই মন্দির স্থাপিত হয় আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে।এই বংশের অন্যতম কৃতি সন্তান রণেশ চন্দ্র ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার। তিনি একবার কর্মসূত্রে রাজস্থানে ছিলেন। ফেরার সময় জয়পুর থেকে তিনি মা সরস্বতীর চার ফুটের শ্বেত পাথরের একটি মূর্তি  এনেছিলেন। সেই মূর্তি আনার পর তার বাবা উমেশ চন্দ্র দাসের ইচ্ছেতে এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় শুরু হয় দেবী সরস্বতীর নিত্য পুজো।

 

সে যুগে বনেদি বাঙালি পরিবারে দুর্গাপূজা বা কালী পুজোই হতো প্রধান উৎসব হিসেবে। তাই সরস্বতী পুজো শুরু করে এই দাস পরিবার চলে আসে আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে।শুধু তাই নয় এই পরিবার মা সরস্বতীর বিশেষ কৃপা লাভ করে এবং একের পর এক উচ্চ শিক্ষত এবং কৃতি সন্তান জন্মায় এই বাড়িতে।কেউ ছিলেন বিখ্যাত ডাক্তার।আবার কেউ উকিল।

 

যখন বঙ্কিমচন্দ্র ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলেন, তখন তিনি পঞ্চানন তলার বাড়িতে বেশ কয়েক বছর ছিলেন।বিধানচন্দ্র রায় এবং রবীন্দ্রনাথ সহ বাংলার বহু বিখ্যাত মনীষীরা এই বাড়িতে এসেছেন।

 

বৈশাখ মাসে প্রতিদিন তিন বেলা নিত্য সেবা করা হয় দেবীর। স্বরস্বতী পুজো হয় মহা সমারোহে।মন্দিরের দেওয়াল হাঁস ও বীণা দ্বারা সজ্জিত।

মন্দিরের রঙ মা স্বরস্বতীর প্রিয় রঙ হলুদ।

 

আবার ফিরে আসবো বাংলার কালী নিয়ে যথা সময়ে। আজ সবাইকে জানাই সরস্বতী পুজোর অনেক শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – কৃষ্ণগঞ্জের রক্ষা কালী পুজো

শ্রীচৈতন্য দেবের জন্মভূমি নদীয়া যদিও বৈষ্ণব ধর্মের প্রাণ কেন্দ্র কিন্তু এই নদীয় তেই আছে এমন এক কালী পুজোর ইতিহাস যা নানা কারণে বেশ তাৎপর্য পূর্ণ।মাজদিয়া অঞ্চলের কৃষ্ণগঞ্জ এর ডাকাত কালী রক্ষা কালী রূপেই পূজিত হয়ে আসছেন বহু বছর ধরে।এই পুজোর সঙ্গে জড়িত আছে স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অধ্যায় ।

 

শোনা যায় স্বাধীনতার আগের ব্রিটিশদের অত্যাচার যখন চরমে তখন ইংরেজ দের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গ্রামের মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় তারা সংঘবদ্ধ হয়ে সসস্ত্র সংগ্রাম করবে। প্রয়োজন তারা ব্রিটিশ দের থেকে লুট করবে অর্থ এবং বিপ্লব শুরু করবে।পরিকল্পনা মতো ইংরেজ কোম্পানির ট্রেন লুট করে বিপ্লবীরা আশ্রয় নেয় জঙ্গলে।

 

এই দলের সর্দার ছিলেন হেমন্ত বিশ্বাস। সেই সময়ে সাধারণ মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়েছিল

সেই লুট করা অর্থ ও খাদ্য সামগ্রী। ব্রিটিশ বাহিনী

যথা সাধ্য চেষ্টা করে স্বাধীনতা সংগ্রামী বা তাদের ভাষায় ডাকাত দের ধরতে। কিন্তু দূর্গম অরণ্য ভেদ করে তাদের কাছে পৌঁছানো সহজ ছিলো না। অবশেষে হাল ছেড়ে দেয় ব্রিটিশ বাহিনী।

দলের কাউকে খুঁজে না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। ব্রিটিশ বাহিনী ফিরে যাওয়ার পরের দিন ছিল দীপান্বিতা আমাবস্যা। সেই দিন থেকে এখানে তারা কালীপুজো শুরু করেছিলেন।

 

স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দলের মনে আস্থা ছিলো যে স্বয়ং মা কালী তাদের সহায়। দেবীর আশীর্বাদেই পরাস্ত হয়েছে ব্রিটিশ বাহিনী। দেবীই তাদের এবং গ্রাম বাসীদের রক্ষা করেছেন।

 

সেই থেকে এইখানে রক্ষা কালী রূপে দেবী কালীর পুজো চলে আসছে। অনেকের কাছেই এই পুজো ডাকাত কালীর পুজো নামে পরিচিত।আজও মানুষ বিশ্বাস করেন এই অঞ্চলকে স্বয়ং এই রক্ষা কালী সব বিপদ থেকে রক্ষা করেন।

 

পুজো হয় শাক্ত মতে। এককালে নর বলীর দেয়া হতো বলে জনশ্রুতি আছে। বর্তমানে পুজোর ভোগে নিরামিষ খিচুড়ি থেকে একাধিক রকম ভাজা তরকারি ফল মিষ্টি দেওয়া হয়।

 

সমগ্র নদীয়া জেলা জুড়ে দেবীর অসংখ্য ভক্ত আছেন। কালী পুজোর সময়ে বহু দূর দূরান্ত

থেকে মানুষ আসেন। কালী পুজোর পাশাপাশি এখানে এসে মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ও শ্রদ্ধা জানিয়ে যান।

 

ফিরে আসবো স্বরস্বতী পুজো উপলক্ষে বিশেষ পর্ব নিয়ে। আগামী দিনে। তারপর যথারীতি চলতে থাকবে বাংলার কালী। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – নীলু ভুলুর কালী পুজো

বাংলার কালী নিয়ে বলতে গিয়ে বার বার উঠে এসেছে ডাকাত কালী নিয়ে আলোচনা। তার মধ্যে জেলার প্রসিদ্ধ ডাকাত কালীর পুজো গুলো নিয়েই আলোচনা হয়েছে বেশি। তবে কলকাতাও পিছিয়ে নেই এক সময়ে এই খাস কলকাতাতেও চলে ফিরে বেড়াত ডাকাতরা। আর সেসব ডাকাতরাও পুজো করতেন কালীর।আজ এমনই এক পুজোর কথা বলবো। এই পুজো বিখ্যাত ছিলো নীলু ভুলুর পুজো নামে।

 

নীলু ভুলু ছিলো দুই ডাকাতের নাম তারা একসাথে দল বেঁধে ডাকাতি করতো জন্মসূত্রে তারকেশ্বরের সাথে যোগ থাকলেও তাদের খ্যাতি এবং কর্মকান্ড ছড়িয়ে পড়েছিল কলকাতা পর্যন্ত চেতলা অঞ্চলে এক কালী মন্দির গড়ে তারা পুজো করতো।এই অঞ্চলের ত্রাস হয়ে উঠেছিলো নীলু ভুলু।

 

চেতলা বাজার অঞ্চলের চেতলা রোডে অবস্থিত এই কালী মন্দির। এখানে কালী মূর্তিটি চব্বিশ ফুট উঁচু।নীচের বেদিটি অসুর মুণ্ডু দিয়ে তৈরি। উগ্রচণ্ডা রূপে দেবী সেই বেদীর উপরে স্বামী সহ বিরাজ করছেন।তবে সব থেকে যে বিষয়টি ব্যতিক্রমী তা হলো এখানে দেবী কালী মূর্তির হাতপা বাঁধা থাকে শেকল দিয়ে।

 

দেবীকে কেনো শেকলে বেঁধে রাখা হয়েছে তা নিয়ে একটি জনশ্রুতি প্রচলিত আছে।শোনা যায় এখানে নাকি এক সময় চলে ফিরে বেড়াতেন মা কালী। পুরোনো দিনের অনেক মানুষই নাকি মাকে শিবের বুক থেকে নেমে মন্দিরে হেঁটে চলে বেড়াতে দেখেছেন । তাই মনে করা হয় হয় মা কালী যাতে মন্দির ছেড়ে চলে যেতে না পারেন তাই সেইসময়ের ডাকাতরা মাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করেছিল। আজও তাই মায়ের হাত পা শেকল দিয়ে বাঁধা আছে ।

 

এই প্রাচীন কালী মন্দির নিয়ে অনেক কিংবদন্তী আছে।একবার তারকেশ্বর যাওয়ার পথে মা সারদাকে নীলু ও ভুলু নামের দুই ডাকাত ধরে নিয়ে তাদের আখড়ায় বেঁধে রাখে বলে শোনা যায়।

পরে ডাকাতরা দেখে মা সারদার জায়গায় বসে স্বয়ং মা কালী। এরপর নিজেদের ভুল বুঝতে

পেরে তারা মা সারদাকে ছেড়ে দেয়।

 

বাংলার ডাকাত কালী পুজো গুলির মধ্যে এই পুজো নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান

অধিকার করে আছে।

 

ফিরে আসবো বাংলার কালীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে যথা সময়ে। থাকবে এক ঐতিহাসিক কালী পুজো নিয়ে আলোচনা।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – নাক কাটা কালীর পুজো

পুরুলিয়া জেলার প্রাচীন কালীপুজোগুলির মধ্যে চিড়াবাড়ি এলাকার নাক কাটা কালি পুজো অন্যতম । এক প্রাচীন বট গাছের নিচে রয়েছে দেবীর খণ্ডিত মূর্তি । এই কালীমূর্তির নাক কাটা অবস্থায় পুজো হয় নাক কাটা কালী নামেই খ্যাত।

 

শোনা যায় বহুকাল আগে এই অঞ্চলে ডাকাত দের উৎপাত ছিলো সেই সময়ে ডাকাতদের হাত থেকে ফসল বাঁচাতে পুজো শুরু করেছিলেন গ্রামবাসীরা সেই রাগে ডাকাতরা দেবীর মূর্তি ভেঙে দিয়েছিল । কেটে দিয়েছিল মূর্তির নাক ।সেই থেকে দেবী এখানে পূজিত হন নাক-কাটা কালীরূপে।

শুধু নাক নয় দেবী মূর্তি এখানে খণ্ডিত।

পরবর্তীতে মূর্তি ভাঙার অপরাধে সেই ডাকাত দলকে নিশ্চিহ্ন করে দেন দেবী।এমন টাই জনশ্রুতি আছে।

 

এই দেবীর পুজোর পর থেকেই বন্ধ হয় ডাকাতি এবং গ্রাম বাসীরা ফিরে পান তাদের হারানো শান্তি। সে প্রায় দুশো বছর আগের কথা সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই গ্রামকে সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করেন এই দেবী।

 

প্রত্যেক অমাবস্যায় এবং প্রতি বছর কালী পুজোর সময়ে মহা ধুমধামের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে এই পুজো । প্রাচীন প্রথা মেনে ছাগ বলিও হয় এই মন্দিরে এবং পুজো হয় তন্ত্র মতে।নাক কাটা কালীর উপরে গোটা পুরুলিয়া জেলার মানুষের অগাধ আস্থা এবং শ্রদ্ধা।

 

দেখা হবে আগামী পর্বে। সঙ্গে থাকবে অন্য এক কালী মন্দিরের কথা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – ডুমুর দহের কালী পুজো

এককালে হুগলী জেলা ছিলো ডাকাত দের জন্য বিখ্যাত বা বলা ভালো কুখ্যাত আর ডাকাত থাকলে ডাকাত কালীও থাকবেন সেটাই স্বাভাবিক হুগলতেও এই রীতির ব্যতিক্রম হয়নি ।আজ এই হুগলীর ডুমুর দহের বিখ্যাত ডাকাত কালী পুজো নিয়ে লিখবো।

 

এক সময়ে হুগলির গঙ্গা তীরবর্তী দ্বীপ বা দহ ছিলো এই অঞ্চল চারপাশে ছিলো ডুমুর গাছের জঙ্গল।খুব সম্ভবত সেই ঘন ডুমুর গাছের ঝোপ ঝাড় থেকেই নাম হয় ডুমুরদহ।এই ডুমুর দহ ছিলো ডাকাত দের আস্তানা আর এই ডাকাত দের দলকে নেতৃত্ব দিতেন বিশ্বনাথ চৌধুরী।

 

ব্রিটিশ আমলে বিশে ডাকাত ছিলো সমগ্র হুগলী জেলার সব থেকে প্রভাবশালী ব্যাক্তি দের একজন। তার আরো একটি পরিচয় ছিলো। তিনি একাধারে ছিলেন জমিদার আবার ডাকাতিতে ছিলেন সিদ্ধহস্ত।দিনের বেলা বিশ্বনাথ চৌধুরী নামে জমিদারি চালাতেন আবার রাতে বিশে ডাকাত নামে ডাকাতি করে বেড়াতেন। এসবই অবশ্য জনশ্রুতি। শোনাযায় দলবল নিয়ে নৌকোয় চেপে যশোহরে গিয়ে পর্যন্ত ডাকাতি করতেন তিনি । ডাকাতি করতে যাওয়ার সময়ে ডুমুর দহের কালী মন্দিরে পুজো দিয়ে অভিযানে বেরোতেন।

 

এই কালী মন্দির ঠিক কবে এবং কে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়না।

তবে স্থানীয় জমিদার পরিবার এই মন্দিরের রক্ষনা বেক্ষন করতো এমনটাই মনে করা হয়।

অতি সাদামাটা এই মন্দির। দেখতে পিরামিডের মতো। তবে চারতলা এই মন্দিরের একাধিক বার সংস্কার হয়েছে। তাই স্থাপত্যেও রয়েছে আধুনিকতার ছাপ। অতি প্রাচীন কাল থেকেই এই মন্দির এখানে আছে বলে মনে করা হয়।

জঙ্গলে ভরা স্থানে দেবীর অবস্থান তাই অনেকেই দেবীকে বুনো কালীও বলে থাকেন।

 

পুজো পদ্ধতিতেও রয়েছে কিছু বিশেষত্ব।এখানে আগে শাক্তমতে পুজো হত। পরবর্তী সময়ে

শুরু হয় বৈষ্ণব মতে পুজোপাঠ। তবে, আজও এখানে মানত পূরণ করতে পশু বলি দেওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে।

 

অসংখ্য ভক্তদের দাবি, দেবী অত্যন্ত জাগ্রত। মানত করলে, তা পূরণ হয়। শুধু তাই নয়, এই মন্দিরের পাশেই রয়েছে চারচালা ভৈরব মন্দির।

দেবীর ভৈরবও অত্যন্ত জাগ্রত।প্রায় প্রতিটি বিশেষ তিথিতে বহু ভক্তের ভিড় হয় এখানে।

 

বাংলার অনেক কালী মন্দিরের কথা এখনো

বলা বাকি আছে। আবার ফিরে আসবো

বাংলার কালী নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুনা।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পলাশীর যুদ্ধের আগে পর্যন্ত অর্থাৎ নবাব আলিবর্দি খাঁ যখন বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব সেইসময়ে বাংলায় মারাঠা বর্গীদের আক্রমণ ছিলো নিত্য নৈমিত্ত ঘটনা। বার বার মারাঠা দস্যুরা এই বাংলায় হানা দিতো। লুটপাট করে সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার করে আবার ফিরে যেতো। এই মারাঠা বর্গীদের দলের নেতা ছিলেন ভাস্কর পন্ডিত। আজ বাংলার কালী পর্বে যে কালী মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করবো

তার সাথে জড়িত ভাস্কর পন্ডিতের কথা।

 

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার খড়গপুরের মালঞ্চের দক্ষিণা কালী মন্দিরের কালী এলাকায় পরিচিতি ডাকাত কালি হিসেবে।শোনা যায় মারাঠা দস্যু ভাস্কর পন্ডিত এই মন্দিরে আত্মগোপন করে থাকতেন।সেই সময়ে এই অঞ্চল ছিলো ঘন

জঙ্গলে ভর্তি এবং হিংস্র জীবজন্তুও এই জঙ্গলে থাকতো। যখন দফায় দফায় নবাবের সেনার সাথে দস্যু দের সংঘাত দেখা দিতো তখন ভাস্কর পন্ডিত ধরা না পড়ার জন্য এই মন্দির বেছে নিয়েছিলেন। এই মন্দিরে তিনি আশ্রয় নিতেন এবং কোথাও বেরোনোর আগে এখানে পুজো দিয়ে বের হতেন। সেই থেকেই এই কালির নাম ডাকাত কালী।

আজও কিছু মানুষ ডাকাত কালী বলেই ডাকেন এই দক্ষিনা কালীকে।যদিও এখন এই অঞ্চল উন্নত

এবং সব শ্রেণীর মানুষ আসেন পুজো দিতে।

 

এই পুজোর ভার এক সময় গ্রহণ করেন স্থানীয় জমিদার গোবিন্দ রায় মহাশয় এবং তার প্রচেষ্টায়

মন্দিরের সংস্কার হয়। সেও প্রায় তিনশো বছর আগের কথা।জমিদারের অবর্তমানে গঠন হয় একটি ট্রাস্ট সেই ট্রাস্ট আজও নিষ্ঠার সাথে পুজোর সব দায়িত্ব পালন করে আসছে।

 

প্রতি বছর কালিপুজো ধুমধামে হয় এখানে। সেই তিথিতে প্রচুর ভক্তদের ভিড় হয়। বর্তমানে

এখানে রয়েছে চার চালার মন্দির। মন্দিরের গায়ে রয়েছে টেরাকোটার কাজ। মায়ের মুখশ্রী মোম দিয়ে তৈরি। দক্ষিনা কালীর পুজো হয় তন্ত্র মতে।

বহু মানুষ এখানে নিজের মনোস্কামনা জানিয়ে সুফল পেয়েছেন।

 

আবার ফিরে আসবো বাংলার কালী নিয়ে পরবর্তী পর্বে। থাকবে এমন সব কালী মন্দিরের বর্ণময় ইতিহাস এবং অলৌকিক ঘটনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – বনকালীর পুজো

সাধারণত বাংলার সব কালী মন্দিরে দীপান্বিতা অমাবস্যা বা কালী পুজোর দিনেই বড়ো করে

কালী পুজোর আয়োজন হয় কিন্তু বর্ধমানের কাঁকশায় বন কালীর পুজো হয় কালী পুজোর পরদিন। আজ আপনাদের অদ্ভুত এবং ব্যতিক্রমী এই কালী পুজো কথা জানাবো।

বর্ধমানের কাঁকসার রাজকুসুম গ্রামে শাল পিয়াল গাছে ঘেরা ঘন জঙ্গলে এই দেবী অধিষ্ঠান করছেন
এই পুজোর সূচনা হয়েছিল আনুমানিক সাড়ে চারশো বছর আগে।গোড়ার দিকে জঙ্গলের মধ্যেই মূর্তি এনে পুজোর আয়োজন হতো। পুজোর পুরোহিত ছিলেন স্থানীয় ভট্টাচার্য্য পরিবারের এক সদস্য। দুর্গম এই অরণ্যে সেই সময় ছিলো বন্য পশু এবং ডাকাতের ভয়।পুজোর সময়ে পুরোহিতকে রীতিমত লাঠিয়াল সাথে করে জঙ্গলে আনা হত। পুজো অনুষ্ঠিত হতো দিনের বেলায়।

একবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য পুজোর স্থানে পৌঁছাতে নানা বাঁধার সৃষ্টি হয়।তারপর স্বপ্নাদেশ পান পুরোহিত । দেবী স্বপ্নে দেখা দিয়ে তাকে তার বাড়িতেই রেখে পুজো করতে বলেন।পুরোহিত দেবীর কাছে জানতে চেয়েছিল যে জঙ্গলে যে পুজো চলে আসছে সেই পুজোর কি হবে?
তার উত্তরে দেবী বলেন জঙ্গলের মধ্যে একটি গাছের গায়ে দুটো চোখের আকৃতি দেখা যাবে সেই গাছেই তিনি বিরাজমান থাকবেন। সেই গাছের গোঁড়ায় মূর্তি ছাড়াই হবে পুজো।

সেই থেকে ভট্টাচার্য বাড়িতে দেবী অধিষ্ঠান করছেন আবার একই সাথে জঙ্গলে এক গাছে দেবীর শক্তি উপস্থিত। সেখানেও ভক্তরা এসে পুজো দেন। জঙ্গল বা ববনের মধ্যে দেবী বিরাজ করছেন তাই নাম হয় বন কালী।কালী পুজোর পরদিন বনের মধ্যে দেবীর পুজোর আয়োজন হয়।
এখানে নেই কোনো মূর্তি তার বদলে আছে গাছ এবং গাছে চোখের আকৃতিও দেখা যায় বলে দেবীর ভক্ত দের বিশ্বাস।

আবার এমন এক প্রাচীন কালী পুজোর ইতিহাস এবং অলৌকিক ঘটনা নিয়ে ফিরে আসবো বাংলার কালীর পরবর্তী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – সাত ভাইয়ের কালী পুজো

বাংলায় যেমন কালী মন্দিরের অভাব নেই তেমনই এই সব কালী মন্দির বা কালী পুজো নিয়ে গল্প এবং অলৌকিক ঘটনার কোনো অভাব নেই।

আজ আপনাদের যে কালী পুজোর কথা লিখবো তা সাত ভাইয়ের পুজো নামে খ্যাত।

এই পুজোর ইতিহাস বেশ প্রাচীন এবং বর্ণময় অবিভক্ত বাংলার যশোরের কাছে বাস করতো এক পরিবার। সাত ভাইয়ের পরিবারে সবাই ছিলো ডাকাত।জলে জঙ্গলে ঘেরা এই অঞ্চল তখন দাপিয়ে বেড়াতো এই সাত ভাইয়ের ডাকাত দল। শোনা যায় তাদের নামে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেতো।

এক বার যশোর জমিদার বাড়িতে ডাকাতি করতে যায় সাত ভাই দল।সেখানেই ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা।শোনা যায়, ডাকাতি করে ফেরার সময় ডাকাতদের উদ্দেশ্যে সেই বাড়ির মন্দিরের কালীঠাকুর বলেছিলেন, ’’ তোরা সব কিছু নিয়ে যাচ্ছিস, আমাকে নিবি না?’’  এই শুনে ডাকার দল কালীঠাকুরকে সঙ্গে নিয়ে যায়।

কিন্তু কোথায় রাখবে দেবীপ্রতিমাকে।এবং কেই বা করবে পুজো।শেষ পর্যন্ত আলোচনা করে প্রায় তিনশো কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিয়ে বনগাঁর ইছামতি নদীর ধারে এসে হাজির হল ডাকাত দল। বন-জঙ্গলে ঘেরা বট গাছের নীচে
প্রতিষ্ঠা করা হল কালীমূর্তি তারপর দেবীপুজোর জন্য ডাকাত দল পুরোহিতের খোঁজে বের হয়। স্থানীয় এক চক্রবর্তী পুরোহিতকে খুঁজে পায় তারা
সেই পরিবারের এক ব্রাহ্মণ সন্তান
পুজোর ভার নেন।

সেই থেকে চলে আসছে এই সাত ভাইয়ের পুজো।অতিক্রান্ত হয়েছে কয়েকশো বছর। আজও সেই চক্রবর্তী পরিবারই বংশপরম্পরায় পুজো করে আসছেন।এখন বহু মানুষে এখানে আসেন পুজো দিতে। নিজেদের মনোস্কামনা জানাতে।এই স্থান এখন এক জনপ্রিয় এবং প্রসিদ্ধ কালী তীর্থে পরিণত হয়েছে।

ফিরে আসবো পরের পর্বে বাংলার কালী নিয়ে।
এখনো অসংখ্য কালী পুজোর ইতিহাস নিয়ে আলোচনা বাকি আছে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – তেলো ভেলোর কালী পুজো

আরামবাগের তেলো ভেলোর কালী পুজো গোটা হুগলী জেলার মধ্যে বলা যায় সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।

এই পুজোর সাথে জড়িত সাধক রামপ্রসাদ এবং মা সারদার নাম। রয়েছে একাধিক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ। আজ এই পুজোর কথা আপনাদের জানাবো।

 

প্রথমে বলি মা সারদার কথা।একবার মা সারদা দক্ষিণেশ্বর যাওয়ার পথে তেলো ভেলোর কালী মন্দির চত্বরে রাত কাটিয়েছিলেন। সেদিন তিনি যাত্রা পথে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং সেই রাতে স্বপ্ন দেখেন এক মায়াবী নারী তাঁর গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন এবং ভোরেই তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন বলে তাকে আশ্বস্ত করছেন। মা সারদা পরদিন সুস্থ হয়ে উঠে দক্ষিণেশ্বরে ফিরে যান। জন শ্রুতি আছে সেই রাতে মা কালী স্বয়ং এসেছিলেন সারদা মায়ের কাছে।

 

আরামবাগের তেলুয়া গ্ৰামের এই মন্দিরে আজও পশ্চিমে মুখ করে রক্ষাকালীর পুজো হয়। তবে শুরু থেকে এমন ছিলোনা। আগে মায়ের মূর্তি

নিয়ম মতো দক্ষিণমুখীই ছিলো শোনা যায়

একবার সাধক রামপ্রসাদ মেদিনীপুর যাওয়ার পথে এই স্থানে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। রাতের বেলায় রামপ্রসাদ মন্দিরের পশ্চিম চাতালে বসে গান গেয়েছিলেন।সেই রাতে  দক্ষিণমুখী দেবী গান শুনতে পশ্চিম দিকে ঘাড় ঘুরিয়েছিলেন। পরেরদিন সকালে গ্ৰামবাসীরা এসে দেখেন কালীর ঘাড় পশ্চিম দিকে ঘুরে গিয়েছে। মাটির প্রতিমার গলায় চিড় ও ধরেছে। সেই রাতেই মন্দিরের পুরোহিত দেবীর স্বপ্নাদেশ পান। দেবী তাঁকে বলেন, পশ্চিম দিকে দরজা রাখতে এরপরেই মন্দিরের পশ্চিম দিকে দরজা করা হয়। বেদী পশ্চিম দিক করে নতুন করে গড়া হয়। এরপরেই পশ্চিমমুখী দেবীর পুজো শুরু হয়।আজও তাই মন্দিরে দক্ষিণ এবং পশ্চিমদিকে দুটো দরজা আছে।

 

তবে শুধু প্রাচীন ইতিহাস নয় এই মন্দির নিয়ে আছে একাধিক অলৌকিক ঘনার উল্লেখ।

শোনা যায় একবার এই গ্ৰামে কলেরায় বহু মানুষ যখন মারা যাচ্ছে তখন দেবীর কাছে বিশেষ প্রার্থনা জানানো হয় এবং পুজো করা হয়

এরপরেই গ্ৰামে কলেরার প্রকোপ কমে যায়।

 

আজও যেকোনো বিপদে এই দেবীর কাছে ছুটে আসেন তার ভক্তরা।দেবী কাউকে খালি হাতে ফেরান না বলেই বিশ্বাস।পুজোর সময়

আজও রামপ্রসাদের গান বাজে।

 

যথা সময়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বে।

বাংলার কালীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।