Home Blog Page 68

বাংলার কালী – কাটোয়ার ডাকাত কালী

এককালে বর্ধমানের ডাকাতরা ব্রিটিশ পুলিশ এবং পরবর্তীতে এদেশের পুলিশ প্রশাসনের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। তারা একদিকে ছিলো যেমন অত্যাচারি অন্যদিকে ছিলো তেমনই ধার্মিক। কালী সাধনা ছিলো তাদের জীবনের এবং পেশার অংশ।

 

ডাকাতদের শুরু করা সেই পুজো আজও জনপ্রিয় কাটোয়া জুড়ে। এই ডাকাত দের দ্বারা পূজিতা দেবী কালী একটু আলাদা।এখানে না আছে কোন মূর্তি। না আছে কোনও মন্দির। প্রাচীন এক নিমগাছকে এখানে দেবীরূপে পুজো করা হয়।

 

একটি অলৌকিক ঘটনা থেকে এই রীতির সূচনা বলে মনে করা হয়। সে অনেক আগের কথা

এই কাটোয়া শহর লাগোয়া দুর্গম এলাকা দাপিয়ে বেড়াতো ডাকাত দল।জঙ্গলই ছিলো তাদের বাড়ি ঘর অজয় নদ লাগোয়া এই এলাকায় ছিল বন্য জন্তু এবং তন্ত্র সাধক দের আস্থানা তবে সবাই গুটিয়ে থাকতো ডাকাত দের ভয়।

 

একবার এক গভীর রাতে ডাকাতি করতে যাওয়ার সময়ে নাকি ডাকাত দলের সামনেই দেবী কালী প্রকট হন।নিজের পুজো করার আদেশ দেন ডাকাত দলের সর্দার পুজো করার প্রতিশ্রুতি দেন।

শুরু হয় পুজোর ভাবনা। কিন্তু ইংরেজদের কাছে গ্রেফতারির ভয়ে এখানে কখনই মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি তারা তার বদলে জঙ্গলের একটি নিমগাছই কালীর রূপে পুজিত হয়। আর সেই থেকেই ঝোপের গাছ থেকে দেবীর নাম হয়ে যায় ঝুপোমা কালী।আজও সেই পরম্পরা সমান ভাবে চলছে।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। বাংলার কালী নিয়ে।

থাকবে অন্য এক কালী মন্দিরের ইতিহাস এবং নানা অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – চিতু ডাকাতের কালী পুজো

বাংলার কালী মন্দির এবং কালী পুজোর ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে হলে স্বাভাবিক ভাবেই এক কালের দুর্ধর্ষ ডাকাত এবং তাদের দ্বারা পূজিতা কালীর কথা এসে পড়ে। কারন কৃষ্ণানন্দ আগমবাগিশ পূর্ববর্তী বাংলায় কালী ছিলেন মুলত ডাকাত এবং তন্ত্র সাধকদের উপস্য দেবী। আজকের বাংলার কালী পর্বে চিত্তেশ্বরী কালী বা চিতু ডাকাতের কালী কালী পুজো নিয়ে লিখবো।

কলকাতার প্রাচীন কালী মন্দির গুলির মধ্যে একদম প্রথম সারি তে রয়েছে চিত্তেশ্বরী কালী মন্দির|বর্তমান চিৎপুর অঞ্চলে অবস্থিত এই প্রাচীন মন্দির নিয়ে রয়েছে অজস্র কিংবদন্তী ও অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ|

এই মন্দিরের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রতিষ্ঠার সঠিক সময় নিয়ে ঐতিহাসিক ও গবেষক দের মধ্যে রয়েছে মতবিরোধ|অনেকেই বিশ্বাস করেন কথিত, ষোড়শ শতকে এই মন্দির বানিয়েছিলেন তৎকালীন ধনী জমিদার মনোহর ঘোষ যিনি একসময়ে আকবরের মনসাবদার টোডর মলের রাজ কর্মচারী ছিলেন|আবার কেউ কেউ মনে করেন এই মন্দির নির্মান করেন ও দেবীকে এখানে প্রতিষ্ঠা করেন সেই সময়ের এই অঞ্চলের কুখ্যাত ডাকাত চিতে বা চিতু|তার নাম থেকেই নাকি এই অঞ্চলের নাম হয় চিৎপুর এবং দেবীর নাম চিত্তেশ্বরী |তবে চিত্তেশ্বরী’ মন্দির থেকেই এলাকার নাম হয় চিৎপুর হয় একথা প্রায় সবাই বিশ্বাস করেন।

ভক্তদের বিশ্বাস যে এই মন্দিরে দেবী সাক্ষাৎ
অবস্থান করছেন |এখানে মূল মন্দিরে দেবী সর্বমঙ্গলা ছাড়াও আছে তিনটি শিব মন্দির। লোকমুখে শোনা যায় এককালে এই এলাকা
ছিলো অত্যান্ত দুর্গম|ছিলো ভয়ঙ্কর বাঘ ও দুর্ধর্ষ ডাকাতের উৎপাত|সত্যি মিথ্যে প্রমান করা মুশকিল তবে লোক মুখে শোনা যায় এক কালে ডাকাতরা নাকি এখানে নরবলি দিয়ে ডাকাতি করতে বেরোতো|ডাকাত দের আতঙ্কে জমিদার পরিবার এই স্থান ত্যাগ করে চলে যান এলাকা চলে যায় চিতু ডাকাত এবং তার দলের হাতে।

একটি প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে একবার মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়ে গঙ্গার জলে ভেসে আসা নিম কাঠ সংগ্রহ করে তাই দিয়ে মা চণ্ডীর বিগ্রহ তৈরি করেন চিতু ডাকাত৷ মা চিত্তেশ্বরী দশভুজা দুর্গা রূপে পূজিতা হন এখানে আর মায়ের সামনে রয়েছে একটি বাঘ|শোনা যায় চিতে ডাকাতের মৃত্যুর পরে তৎকালীন জমিদার মনোহর ঘোষ ও নৃসিংহ ব্রহ্মচারী পুনরায় এই স্থানে নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই মন্দিরে রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্ব গ্রহন করেন এবং আজীবন তারা নিষ্ঠা সহকারে পূজা করে যান সেই প্রথা আজও চলে আসছে|

বর্তমানে সাবর্ণ রায়চৌধুরীর বংশধররা এই মিন্দিরের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করে থাকেন|দূর্গাপুজোর সময়ে এবং কালী পুজোর সময় বিশেষ পুজো হয়।আজও এখানে
নিমকাঠের বিগ্রহতেই দেবীর পুজো হয়।

যথা সময়ে বাংলার কালী নিয়ে আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – রঙ্কিনী দেবীর কথা

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি

বিখ্যাত ছোট গল্প হলো ‘রঙ্কিণী দেবীর খড়গ’ হয়তো আপনারা অনেকেই অলৌকিক এই গল্পটির বেতার নাট্যরূপ শুনেছেন বা বইটি পড়েছেন বাস্তবেই রয়েছে এই মন্দির এবং তা অবস্থিত জামশেদপুরের কাছে এক পাহাড়ি উপত্যকায়।আজকের বাংলার কালী পর্বে

এই দেবী রঙ্কিনীর মন্দির নিয়ে লিখবো।

 

জনশ্রুতি অনুসারে মাতা রঙ্কিণী এই অঞ্চলের বনে জঙ্গলে বাস করতেন এবং তিনি এই দুর্গম অরণ্যের রক্ষাকতৃ ছিলেন।স্থানীয় আদিবাসীরা তাকে খুব মান্য করতো। তবে তার মন্দির ও মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয় অনেক পরে। শোনা যায় একবার এক স্থানীয় আদিবাসির মেয়ে সন্ধ্যার পর জঙ্গলে পথ হারায় এবং এক অপদেবতার খপ্পরে পরে। দেবী রঙ্কিনি তখন আবির্ভূত হন এবং মেয়েটিকে রক্ষা করেন।

তারপর জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে যান।সেই রাতেই ঐ মেয়েটির বাবাকে দেবী রঙ্কিণী স্বপ্নাদেশ দিয়ে দেবীর একটি মন্দির তৈরি করতে বলেন।

 

মন্দির প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে এই জনশ্রুতি প্রচলিত থাকলেও ঠিক কোন সময়ে মূল মন্দিরটি তৈরি হয়েছে তা জানা যায়না । তবে মন্দিরের বর্তমান যে রূপ আমরা দেখতে পাই, তা তৈরি হয়েছে দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পর । অনেকের কাছে মা রঙ্কিনী দেবী কালীর একটি রূপ আবার পূর্ব ভারতের বিভিন্ন উপজাতির কাছে তিনি তাদের আরাধ্যা দেবী।

 

ঘাটশিলায় বসবাস করার সময়ে সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় এই মন্দির সম্পর্কে জানেন ও দেবী রঙ্কিনী সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন

প্রসঙ্গত বলে রাখি ঘাট শিলায় শ্রদ্ধেয় বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের বাসস্থান আজও তার স্মৃতি বহন করে চলেছে।

 

যাই হোক আবার দেবী রঙ্কিনীর প্রসঙ্গে ফেরা যাক। শোনা যায় এই মন্দির থেকে কেউ আজ অবধি খালি হাতে ফেরেনি। মা রঙ্কিনী সকলের মনস্কামনা পূর্ণ করেছেন। পাহাড়ি দুর্গম রাস্তা দিয়ে পৌছাতে হয় দেবীর মন্দিরে।মন্দিরের গর্ভগৃহে কোনো মূর্তি নেই। একটি পাথরকে দেবীরূপে পূজা করা হয়।মূল মন্দিরের দুই পাশে রয়েছে আরও দুটো মন্দির। ডানপাশে রয়েছে শিবমন্দির এবং বামপাশের মন্দিরে রয়েছে গণেশের মূর্তি।

 

প্রায় রোজই অসংখ্য তীর্থ যাত্রী এখানে আসেন পুজো দেন। নিজেদের মনোস্কামনা জানান এবং সর্বোপরি দেবী রঙ্কিনি ও তার মন্দির দর্শন করে ধন্য হন।

 

আবার যথা সময়ে ফিরে আসবো

বাংলার কালী নিয়ে।থাকবে এমন সব

অজানা ও রহস্যময় মন্দিরের কথা

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

প্রজাতন্ত্র দিবসের শুভেচ্ছা

আজ আমাদের দেশের প্রজাতন্ত্র দিবস|

ইংরেজির ১৯৫০ সালে এই দিনেই ভারতের সংবিধান গৃহীত হয়েছিল এবং জন্ম হয়েছিলো বিশ্বের বৃহত্তম প্রজাতন্ত্রের|এই দিন থেকেই বিশ্বের বৃহত্তম লিখিত সংবিধান আনুষ্ঠানিক ভাবে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতবর্ষের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়|প্রজাতন্ত্র দিবসের সূচনা করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি,1950 সালের এই দিনেই স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ তার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন|

যদিও শুরুটা ছিলো অন্যরকম ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি জাতীয় কংগ্রেস ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলি পূর্ণ স্বরাজ ঘোষণা করে এবং তারপর থেকে প্রতি বছর ওই দিনটাকেই স্বাধীনতা দিবস হিসাবে পালন করতে শুরু করে কিন্তু পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতা আসে 1947 সালের 15ই আগস্ট এবং সেই থেকে ওই দিন স্বাধীনতা দিবস ও 26 এ জানুয়ারি সাধারণতন্ত্র দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে|

আমরা গর্বিত আমরা স্বাধীন প্রজাতান্ত্রিক ভারত বর্ষের নাগরিক, আমাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, সামাজিক নিরাপত্তা, মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত আছে যে সংবিধানের মাধ্যমে আজ সেই সংবিধান কার্যকর হওয়ার দিন|আজ প্রতিটা ভারতবাসির গর্বের দিন|

প্রতিবারের মতো এবারও মহা সমারোহে দেশ জুড়ে পালিত হবে প্রজনতন্ত্র দিবস|হবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, রাষ্ট্রপ্রধানদের বক্তৃতা, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা|

আসুন আজ শ্রদ্ধা জানাই দেশের সংবিধানকে, শ্রদ্ধা জানাই দেশের বীর সৈনিকদের যারা রাষ্ট্র রক্ষায় আত্ম ত্যাগ করেছেন|জয় হিন্দ|বন্দে মাতারাম|আপনাদের সবাইকে জানাই প্রজাতন্ত্র দিবসের শুভেচ্ছা|ফিরে আসবো ধারাবাহিক বাংলার কালী পর্ব নিয়ে আগামী দিনে। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – দয়াল ঠাকুরের কালী

দেবী কালী শুধু শাস্ত্র সম্মত মহাকালী বাভদ্র কালী রূপে পূজিতা হন তা নয়। তিনি বাংলার ঘরের মেয়ে। আমাদের ঘরের মেয়েকে আমরা যেমন নানা রকম আদরের নাম্বার দিয়ে থাকি তেমনই দেবী কালীও নানা নামে নানা রূপে আমাদের কাছে ধরা দেন। কোথাও তিনিবড়মা আবার কোথাও তিনি পুটে কালী। এমনইএক কালী মন্দির আছে বজ বজে যেখানে দেবীকে খুকীমা নামে ডাকা হয়।আজকের বাংলার কালী পর্বে

দয়াল ঠাকুরের খুকীমা কালীর কথা লিখবো ।

 

অদ্ভুত এই কালী মূর্তির ইতিহাস। শোনা যায় দয়াল ঠাকুর নামে এক মাতৃ সাধক এক সময়ে এই স্থানে সাধনা করতেন। পাশেই ছিলো শ্মশান এবং আদি গঙ্গা।

 

এক রাতে এক ডাকাত দল এখানে আসে।সাধক কে ডেকে নিয়ে যাওয়ার হয় তাদের সর্দারের কাছে।ডাকাত সর্দারের গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। পানীয় জল ও চিকিৎসারে জন্যই তাই কুটির দেখে দাঁড়িয়ে পড়া শুনশান প্রান্তরে।সেই ফাঁকে হয়ে যাবে ভাগ-বাটোয়ারাও। জানা গেল, সুদূর বর্ধমান থেকে লুঠ করে আসছেন তাঁরা।দয়াল ঠাকুর লুট করা সামগ্রীরে মধ্যে পাথরের তৈরি এক কালী মূর্তি দেখলেন এই মূর্তি যে চুরি করা আনা হয়েছে কোনো রাজবাড়ি থেকে তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল তাঁর কাছে। তার কারণ বিগ্রহের গঠন। অখণ্ড কষ্ঠীপাথরের তৈরি এই মূর্তি বড়ো কোনো পাথর থেকে কেটে বানানো। এমনকি দেবীর গলার নরমুণ্ডের মালাও খোদাই করে তৈরি। এ যে কোনো সাধারণ শিল্পীর হাতের কাজ হতে পারে না তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি তাঁর। তিনি অবহেলায় পড়ে থাকা সেই মূর্তির পুজোর ও ভোগের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ পালন করতেই সেরে ওঠেন ডাকাত সর্দার

 

।তারা বিদায় নেয় এবং কালী মূর্তি ওই স্থানেই স্থাপিত হয় এবং খুকিমা নামে আজও তিনি সেখানে স্বমহিমায় বিরাজিতা।পরে জানা যায় এই মূর্তির পুজো করতেন মাতৃ সাধক কমলাকান্ত। বর্ধমান থেকে এই মূর্তি ডাকাতি করে সেই রাতে আনা হয়। এবং হয়তো দেবীর ইচ্ছাতেই এখানে আরেক মাতৃ সাধক সেইমূর্তির পুজোর দায়িত্ব পান।

 

এমন কতো অজানা দৈব ঘটনা কতো অদ্ভুত অলৌকিক লীলা ঘটেছে এই বাংলায়। আগামী পর্ব গুলিতে আরো অনেক এমন ইতিহাস এবং জনশ্রুতি নিয়ে ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – আমডাঙার কালী মন্দির

আজকের বাংলার কালী পর্বে জানাবো উত্তর চব্বিশ পরগনার আম ডাঙায় অবস্থিত একটি প্রাচীন কালী মন্দিরের কথা|

 

উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যে অবস্থিত কালী মন্দির গুলির প্রাচীন আমডাঙা কালী মন্দির অন্যতম|

এই কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন রাজা মান সিংহ|এই মন্দির প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক অধ্যায়|

 

মুঘল সম্রাট আকবরের সৈনদল দু’বার রাজা প্রতাপাদিত্যের কাছে পরাজিত হন। মুঘল সম্রাটের বিশ্বাস ছিল, যশোরের যশোরেশ্বরী মন্দিরে পুজো দিয়ে তার পর যুদ্ধ শুরু করতেন বলেই জয়লাভ করতেন প্রতাপাদিত্য। প্রতাপাদিত্যের এই রণকৌশল ভবিষ্যতে যাতে আর সফল না হয়, সেই পরিকল্পনা করতে মান সিংহকে নিয়োগ করেন সম্রাট আকবর। মান সিংহ শুরুতেই যশোরেশ্বরী মন্দির থেকে বিগ্রহ সরিয়ে দেন। প্রতাপাদিত্য সে কথা জানতে পারার পরেই রেগে ফেটে পড়েন এবং মন্দিরের পূজারী রামানন্দ গিরি গোস্বামীকে নির্বাসিত করে দণ্ড দেন|

 

নির্বাসিত হয়ে রামানন্দ এই আমডাঙ্গায় এসে উপস্থিত হন এখানে তখন ঘন জঙ্গল তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে সুখবতী নদী|পরবর্তীতে মান সিংহ স্বপ্নাদেশ পান, মায়ের ভক্ত রামানন্দ উন্মাদ অবস্থায় সুখবতী নদীর তীরে রয়েছেন, তাকে সুস্থ করে পুনরায় সাধন মার্গে ফিরিয়ে আনার জন্য ১৫৬১ খ্রিস্টাব্দে আমডাঙা কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন ও কষ্টিপাথর দিয়ে কালীর শান্ত মূর্তি মন্দিরে স্থাপন করেন করেন মান সিংহ|

 

পরোক্ষ ভাবে বাংলার নবাব সিরাজ উদ্ দৌলা ও একটি বিশেষ কারনে রাজা কৃষ্ণ চন্দ্রর নাম ও জরিয়ে আছে প্রাচীন এই কালী মন্দিরের সাথে|১৭৫৬ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার কলকাতা অভিযানের সময় রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এখানকার এই কালীমূর্তি দেখতে পান এবং প্রার্থনা করেন|পরবর্তীতে মনস্কামনা পূর্ণ হওয়ার পর তিনি এই মন্দিরে প্রায় ৩৬৫ বিঘা জমি দান করেন|

 

প্রায় পাঁচশো বছরের প্রাচীন এই কালী মন্দিরে দেবীর শান্ত রূপ বিরাজমান, মূর্তিটি কষ্টি পাথরে নির্মিত এবং এখানে রয়েছে কয়েকটি প্রাচীন শিব মন্দির|বহু মানুষ এখানে আসেন তাদের মনোস্কামনা নিয়ে, মনোস্কামনা পূরণ হলে পুজো দেন তবে কালী পুজো উপলক্ষে ভিড় হয় সবথেকে বেশি|

 

ফিরে আসবো বাংলার কালীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে আগামী দিনে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – বীরভূমের কালী পীঠ

তারাপীঠ এবং একাধিক শক্তি পীঠের পাশাপাশি বীরভূমে রয়েছে বেহিরা নিম্ববাসিনী কালীপীঠ, আজকের বাংলার কালী পর্বে লিখবো এই

প্রাচীন মন্দিরের কথা।

 

বীরভূমের পুরন্দরপুর পঞ্চায়েতের বেহিরা গ্রামে কাশীর মা অন্নপূর্ণা বেহিরা নিম্ববাসিনী কালী নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।কিভাবে হলো প্রতিষ্ঠা তা নিয়ে একটি অলৌকিক ঘটনা প্রচলিত আছে।

 

পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, দ্বাপরযুগে অষ্টাবক্র মুনি দেবী অন্নপূর্ণাকে সতীপীঠ বক্রেশ্বরে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে নদীপথে নৌকা করে কাশী থেকে নিয়ে আসছিলেন। সেই সময়, পুরন্দরপুরের বেহিরা গ্রামের কাছে এসে দেবীর নৌকা ক্ষিণশ্রোতা বক্রেশ্বর নদীতে আটকে যায়। সেখানে তপস্যা করছিলেন ভরদ্বাজ মুনি। কথিত আছে, ভরদ্বাজ মুনির আহ্বানে দেবী অন্নপূর্ণা কালী রূপে একটি নিমগাছের তলায় বসে যান। তিনি সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হলেন, নাম হল নিম্নবাসিনী কালী। কালী মায়ের নিত্যসেবা শুরু করলেন ভরদ্বাজ মুনি। আজ সেখানেই তৈরি হয়েছে মন্দির। ভরদ্বাজ মুনির স্মৃতিধন্য তপভূমিতেই যুগ যুগ ধরে পূজিতা হচ্ছে দেবী।

 

প্রতিবছর দুর্গাপুজোর ত্রয়োদশীতে মহাধুমধাম করে বেহিরা কালীতলায় নিম্ববাসিনী মায়ের পুজো হয়। নিম্ববাসিনী মায়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, এখানকার মা দুর্গা পুজোর সময় দুর্গা রূপে এবং পরবর্তী সময়ে অন্নপূর্ণা, কালী এবং অন্যান্য রূপেও পূজিতা হন। বছরের পর বছর ধরে এই প্রথা চলে আসছে। ত্রয়োদশীতে এখানে মেলা বসে।

 

একদা এই অঞ্চল ছিল জঙ্গলে ঘেরা। আজও মন্দিরের চারদিক গাছগাছালি ঘেরা। মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে অতিকায় বাঁধানো যজ্ঞমণ্ডপ। সেখানেই রয়েছে ভরদ্বাজ মুনির মন্দির, পাশে অষ্টাবক্র মুনির মন্দির।

 

স্থাপত্যরীতিতে বাংলার চারচালা শৈলী দেখা যায়। উভয় মন্দিরেই রয়েছে শিবলিঙ্গ। প্রাচীন নিমগাছের তলায় নিম্ববাসিনী নামে রয়েছেন দেবী অন্নপূর্ণা। নিম্ববাসিনী মন্দির একচূড়া বিশিষ্ট। মন্দিরের একমাত্র কক্ষটিই গর্ভগৃহ। সেখানেই দেবী মূর্তি প্রতিষ্ঠিত। দেবীর অবস্থানটিও আর পাঁচটা মন্দিরের মতো নয়। অন্যান্য মন্দিরে দেবদেবী মন্দিরের মাঝে অবস্থান করেন। এই মন্দিরের একটি কোণায় প্রতিষ্ঠিত রয়েছে দেবীবিগ্রহ। প্রস্তর বেদীর উপরে পদ্মাসনে উপবিষ্টা দেবীমূর্তির কোমর পর্যন্ত দৃশ্যমান। দেবী মূর্তির উচ্চতা প্রায় চার ফুট, মৃন্ময়ী মূর্তি।

 

দেবীর সঙ্গে কোনও শিব নেই। তবে দেবী মূর্তির পাশে স্থাপিত রয়েছে একটি শিবলিঙ্গ। শোনা যায়, কাশিতে বাবা বিশ্বনাথকে একা রেখে দেবী এসেছিলেন বলে, দেবী মূর্তির সঙ্গে মহাদেব নেই।দেবী এখানে নিত্য পূজিতা। পঞ্চব্যঞ্জনে দেবীর নিত্যভোগ হয়।

 

পরের পর্বে আবার ফিরে আসবো

বাংলার কালী নিয়ে। থাকবে অন্য

এক কালী মন্দিরের ইতিহাস এবং

পৌরাণিক ঘটনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – বগুড়ার ডাকাত কালী

অবিভক্ত বাংলার বগুড়ার গ্রামে ছিলো এক প্রাচীন কালী মন্দির যে মন্দিরের পুজোয় এক অদ্ভুত রীতি পালন করা হতো। সেই অদ্ভুত প্রাচীন প্রথা নিয়ে পরে লিখবো আগে এই মন্দির এবং কালী পুজোর ইতিহাস নিয়ে বলে নিই।

 

প্রায় চরশো বছর আগে দুর্গম এই অঞ্চলে ছিলো হিংস্র পশু, ডাকাত এবং অশরীরী আত্মা দের বাস। এই কালী মন্দিরে পুজো দিতে আসতেন সাধারণ মানুষরা তাদের বিশ্বাস ছিলো এই মা তাদের সব বিপদ থেকে রক্ষা করবেন। আবার ডাকাতরা এখানে পুজো দিয়ে অমাবস্যার রাতে ডাকাতি করতে বেরোতো।

 

শোনা যায় মধুসুদন ভাদুরী নামে এক ব্যাক্তি স্বপ্নে দেবীর আদেশ পেয়ে এই পূজা স্থাপনা করেন এবং তার নাম অনুসারেই এলাকার নাম হয় মধু গঞ্জ এবং এই পুজোর মধুগঞ্জেশ্বরী কালী পূজা নামকরণ হয়।পরবর্তীতে মধুসুদন ভাদুরী তৎকালীন জমিদার রমন বিহারী সরকারকে পূজা-অর্চনা ও পরিচালনার দায়িত্ব অর্পন করেন।

 

এই কালী পুজোর অদ্ভুত যে ঐতিহ্য রয়েছে তা হলো পাঠা লুট- বলিকৃত পশু লুটের উদ্দেশ্যে লুটকারীদের মাঝে ছুঁড়ে ফেলা হয়, শক্তি খাটিয়ে নির্দিষ্ট সীমানা অতিক্রম করলেই সেই বলী প্রদত্ত পশু তার। আরেকটি প্রথা হলো থান লুট।

পূজার স্থানে বা প্রতিমার সামনে পূজাকৃত বা উৎসর্গ করা বিভিন্ন ধরনের প্রসাদ সাজানো থাকে যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর যার যে প্রসাদ পছন্দ তাই সেটা নিতে পারবে।

 

বর্তমানে এই পুজো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অপূর্ব

এক নজীর কারন এপার বাংলা ওপার বাংলা দুই বাংলার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এই পুজোয় অংশ গ্রহণ করেন সমান আস্থা এবং উৎসাহ নিয়ে।

 

 

এমন বহু প্রাচীন কালী মন্দির ও কালী পুজো হয়

সারা বাংলা জুড়ে। আগামী পর্বে ফিরে আসবো অন্য এক কালী পুজোর ইতিহাস নিয়ে।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – বীরভূমের লোবা মা

কথিত আছে তিন শতাধিক বছর আগে অবধূত রামেশ্বর দন্ডি নামে এক মাতৃ সাধক অজয় নদের তীরে তার আরাধ্য দেবী লোবা মায়ের তন্ত্র মতে প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর কোনো এক সময় তিনি ওই লোবা গ্রাম ছেড়ে চলে যান। গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার আগে তিনি যৌথ ভাবে পুজোর দায়িত্ব দিয়ে যান এলাকার ঘোষ পরিবারদের এবং চক্রবর্তী পরিবারের হাতে।

 

বর্তমানে বীরভূমে যতগুলো বড়ো কালীপুজো হয়ে থাকে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো এই দুবরাজপুরের লোবা গ্রামের লোবা মা। প্রায় তিন শতাব্দী প্রাচীন এই কালীপুজোকে কেন্দ্র করে মানুষের উৎসাহ উদ্দীপনা থাকে চোখে পড়ার মতো।

 

দায়িত্ব প্রাপ্ত পরিবার গুলির পারিবারিক প্রভাব এবং প্রতিপত্তি কমে এলে স্থানীয় মানুষ জন স্বেচ্ছায় পুজো পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। শুরুর দিন থেকে প্রথা মেনে লোবা মায়ের মূর্তি তৈরি করার ক্ষেত্রে এলাকার বাগদী সম্প্রদায় মানুষদের আনা মাটি দিয়েই মায়ের প্রতিমা তৈরি করা হয়। এক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষত্ব। বিজয়া দশমীর দিন বর্ধমান জেলার গৌরবাজারের তালপুকুরের ঈশান কোণ থেকে আনা হয় মায়ের মূর্তি তৈরি করার জন্য পর্যাপ্ত মাটি। সেদিন থেকেই মূর্তি তৈরি করার কাজ করেন বাউরি বাগদী এবং সূত্রধর সম্প্রদায়ের মানুষেরা।

 

মায়ের মূর্তি রঙের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভেষজ রং ব্যবহার করা হয়ে থাকে।কোনো রূপ রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়না।কালীপুজোর আগের দিন মায়ের গায়ে খড়ি দেওয়া হয়ে থাকে। পুজোর দিন রং করা থেকে সমস্ত কিছু হয়ে থাকে। আর রাতে চক্ষুদান করা হয়।রীতি মেনে প্রতিবছর দীপান্বিতা অমাবস্যার রাতে এই লোবা মায়ের পুজো হয় এবং ঠিক তার পরদিন মায়ের বিসর্জন হয়ে থাকে।

 

মায়ের অঙ্গরাগ থেকে পুজোর বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারিবারিক ভাগ রয়েছে। ঘোষ পরিবারের সদস্যরা মায়ের অলংকার পরান। প্রদীপের জন্য ঘি বংশপরম্পরায় সরবরাহ করে থাকেন গোয়ালা পরিবার।

 

আরো একটি বিষয় উল্লেখ করতেই হয়।

এখানে লোবা মায়ের আরও দুই বোন রয়েছে। পাশের দুই গ্রামে দুই বোনেরা পুজো হয়। প্রতি বছর বিসর্জনের সময়ে পাশের গ্রামের মেজো বোন এবং ছোট বোনকে আনা হয় লোবা মন্দির চত্বরে।

 

এই পুজো উপলক্ষে উৎসবে মেতে ওঠেন জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ।সব মিলিয়ে সত্যি ব্যাতিক্রমী এবং ঐতিহ্যসম্পন্ন

পুজো এই বীরভূমের লোবা মায়ের পুজো।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। অন্য এক কালী মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে। দেখতে থাকুন।

বাংলার কালী – চরণ পাহাড়ি কালী

আজ পুরুলিয়ার এক কালী মন্দিরের কথা আপনাদের জানাবো। এই মন্দির চরণ পাহাড়ি কালী মন্দির নামে খ্যাত এবং একটি বিশেষ কারণে হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের খুব শ্রদ্ধার স্থান এই কালী ক্ষেত্র।

 

স্বাধীনতার আগে পুরুলিয়ার পুঞ্চা নামক এই ছোট্ট স্থান তখন একটা গঞ্জ। ব্রিটিশ আমলে এখানেই ইংরেজ পুলিশ একটি পুলিশ ফাঁড়ি তৈরি করেন। ওসি নিযুক্ত হন এক সৎ এবং কর্মনিষ্ঠ মুসলিম ব্যক্তি তার পুলিশ ফাঁড়ি থেকে কিছুটা দূরেই ছিলো এক দুর্গম পাহাড়ি এলাকা।

 

শোনা যায় জঙ্গলে ঘেরা সেই পাহাড়ি এলাকায় ওই ওসি এক পাথরে দেবীর পায়ের ছাপ দেখেন। এরপরই তিনি দেবীর স্বপ্নাদেশ পানযে ওখানে দেবী পুজো পেতে চান। তাই হয় মন্দির তৈরী করে শুরু হয় পুজো।এই ভাবে শুরু হয় চরণপাহাড়ি কালীপুজোর। যেহেতু মায়ের পদচিহ্ন পড়েছিল এই পাহাড়ে তাই পাহাড়ের নাম হয় চরণপাহাড়ি। আর সেখানকার কালী হয়ে ওঠে চরণপাহাড়ি কালী।

 

পাহাড়ি দুর্গমতার কারণে এখানে খুব কম মানুষই যাতায়াত করতেন। কখনও কখনও তান্ত্রিকরা আসতেন পুজো করতে।বর্তমানে যাতায়াতের সুবিধা হওয়ায় বহু মানুষ আসেন পুজো দিতে তবে আজও সেই সম্প্রীতি বজায় রেখেই পুজো হয়ে চলেছে।পুজোয় যোগ দেন সব ধর্মের মানুষ।

 

প্রাকৃতিক পরিবেশ খুব মনোরম। এখানে পাহাড়ে এক উঁচু টিলার উপর চরণপাহাড়ির মন্দির।

অবস্থিত। পুজো হয় তন্ত্র মতে। কথিত আছে যেকোনো ব্যাক্তি পবিত্র মনে কোনো আশা নিয়ে এসে দেবীর পুজো দিলে দেবী মনের আশা

পূরণ করেন।সব থেকে বেশি ভিড় হয় কার্তিক মাসের অমাবস্যায়।অসংখ্য দর্শণার্থী আসেন সেই

সময়ে।

 

বাংলার কালীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে ফিরে আসবো আগামী দিনে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।